ভূতনাথের ভিটে

দুলেন্দ্র ভৌমিক

এই অঞ্চলে ভূতনাথের ভিটের বেশ নামডাক আছে। ভূতনাথবাবু বহুকাল আগে মরে গিয়ে স্বর্গে গেছেন কিংবা মরে ভূত হয়ে মর্ত্যে তাঁরই ভিটের মধ্যে আনাগোনা করছেন কিনা এ বিষয়ে নানা জটিল তর্ক আছে। গলসি স্টেশন থেকে অনেকটা ভেতরে গেলে সোনাডাঙা বলে একদা একটি গ্রাম ছিল। একালের লোকেরা কেউই ওই নামের সঙ্গে আর পরিচিত নয়। সোনাডাঙার চলতি নাম ভূতনাথের ভিটে। সরকারি কাগজপত্রে পুরনো নাম বহাল থাকলেও লোকে বোঝবার আর বোঝাবার জন্য ভূতনাথের ভিটে বলেই উল্লেখ করে থাকে। কিন্তু গোটা সোনাডাঙা গ্রামটাই তো আর ভূতনাথবাবুর ভিটে ছিল না, তবুও লোকের মুখে রটতে রটতে ভূতনাথের ভিটেটাই চালু হয়ে গিয়ে এখন স্থায়ী হয়ে গেছে।

এই অঞ্চলে যত লোক বাস করে তাদের চিঠিপত্রের ঠিকানায়ও লেখা থাকে ভূতনাথের ভিটে। এখানকার ডাক্তার অনাদি নন্দীর জামাই থাকে কানাডায়। কানাডা থেকে শ্বশুরমশাইকে চিঠি লিখলে ঠিকানায় লেখে ‘ল্যান্ড অব লেট ভূতনাথ’। অন্যরা ইংরেজি হরফে লেখে 'Bhuthnather Vetay |

কিন্তু কে এই ভূতনাথ? ভূতনাথ সম্পর্কে বিশদ জানাবার জন্য ওড়িশা আর দিল্লি থেকে গবেষক গোছের দু’জন লোক এসেছিলেন। তাঁরা কতখানি জেনেছিলেন সেটা আমাদের জানা নেই। আমরা, অর্থাৎ এই অঞ্চলের লোকেরা সত্য-মিথ্যা যতটুকু যা জানি তা ওই ভূতনাথের একমাত্র নাতি ভোলানাথের কাছ থেকে। ভোলানাথ, মানে ভোলাদা’র মুখোমুখি হওয়ার আগে ভূতনাথ এবং তাঁর পরিবার সম্পর্কে যতটুকু সংবাদ আমাদের জানা আছে সেটা আগে একটু বলে নেওয়া দরকার। সত্য-মিথ্যা, কল্পনা অথবা অতিকল্পনা, যাই বলা হোক না কেন, ওইটুকু আগে শুনে না নিলে প্রথম সাক্ষাতে ভোলানাথকে চট করে হজম করা কঠিন হবে।

স্বর্গত ভূতনাথ হালদার ছিলেন গম্ভীর প্রকৃতির তান্ত্রিক। তবে ‘গম্ভীর’ কথাটা না বললেও চলত। তরলমতি এবং হাসিখুশি রসিক তান্ত্রিক বড় একটা দেখা যায় না। নিজেদের পুকুর, বাগান এবং বসতবাটি নিয়ে অনেকটা জায়গা ভূতনাথবাবু পৈতৃক সূত্রে পেয়েছিলেন। পিতৃবিয়োগের আগে থেকেই একটু একটু তান্ত্রিক ভাব দেখা গিয়েছিল। পিতৃবিয়োগের পর বছরখানেক যেতেই ঘোরতর তান্ত্রিক হয়ে গেলেন। শুরু হয়েছিল গোটা পাঁচেক শিষ্য নিয়ে। শিষ্যসংখ্যা বাড়তে বাড়তে যখন একশো ছাড়িয়ে গেল, তখন সোনাডাঙা গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ভূতনাথের অনুরক্ত হয়ে পড়ল। সপ্তাহের প্রতি শনি-মঙ্গলবার ভূতনাথের তন্ত্রসাধনা আর শিষ্যদের ত্রিশূল হাতে নৃত্য দেখবার জন্য অন্য গ্রামের মানুষও ভিড় করত।

প্রণামীর থালায় দেদার টাকা-পয়সা পড়ত। মিষ্টি, ফল, ধুতি, শাড়ি, চাদর সবই প্রণামী হিসেবে পাওয়া যেত। কিন্তু ভূতনাথের এসব ব্যাপারে কোনও লোভ ছিল না। ধুতি, শাড়ি, চাদর সবই গ্রামের দুঃস্থদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। প্রত্যেক অমাবস্যার দিন সকালে এসব বিলি করা হত। এই দান উৎসবের নাম ভূতনাথ দিয়েছিলেন ‘সেবাব্রত’। এ ছাড়াও গাছগাছড়ার শিকড় থেকে নানারকম ওষুধ বানিয়ে গ্রামের মানুষকে দিতেন। ভূতনাথ নিজেই তাঁর বসতবাটির নাম দিয়েছিলেন ভূতনাথের ভিটে। কালো রঙের একটা সাইনবোর্ডে সাদা রং দিয়ে নামটা লেখা ছিল। তার তলায় লেখা ছিল, 'চোর, ডাকাত, সাধু, দুঃস্থ এবং অসুস্থদের অভয়াশ্রম'।

সেই থেকেই লোকের মুখে মুখে ভূতনাথের ভিটের নাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে। রোগের ওষুধ নেওয়ার জন্য দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে লোক এসে খোঁজ করত ‘মশাই, ভূতনাথের ভিটেটা কোথায়?’ গঙ্গাসাগর মেলার সাতদিন আগে থেকে এই ভিটেতে সাধু-সন্তদের সঙ্গে ভক্তদের ভিড় বেড়ে যেত। মেলার শেষেও দেশে ফেরার পথে কিছু কিছু সাধু এসে এখানে কয়েকদিন কাটিয়ে যেতেন। বড় বড় হাঁড়িতে তখন ভাত রান্না হত। কিন্তু এজন্য ভূতনাথবাবু নাকি কারও কাছ থেকে কোনও চাঁদা নিতেন না। কেউ ইচ্ছে করে দিতে এলে বলতেন, ‘হ্যাঁ রে, তোর নিজের ঘরে খাবার জোগাড় আছে তো?’ যদি শুনতেন জোগাড় আছে, তাহলে বলতেন, ‘যা দেওয়ার ওই মালসায় চোখ বুজে দিয়ে যা। দান দেওয়ার সময় গুনতে নেই, চোখ মেলে দেখতেও নেই।'

এগুলো ছিল ভূতনাথ বাবাজির একটা দিক। এসব নিয়ে তেমন বিতর্ক নেই। বিতর্ক অন্য দিক নিয়ে। এই অঞ্চলের দেদার ভূত আর ভূতনিরা নাকি মধ্যরাত্রে এসে ভূতনাথের ভিটেয় ভিড় করত। ভূতনাথের ভাষায়, 'কী করবে বলো, ভূত হয়ে গেলে তো মানুষ তাদের সঙ্গে মেশে না, বরং তাদের ত্যাগ করে। বাপ মরে ভূত হয়ে ছেলেটাকে দেখছে কিন্তু কথা কইতে পারছে না। ছলছল চোখে তাকিয়ে দেখে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এ কি কম জ্বালা। এই জ্বালা জুড়োতেই আমার কাছে আসে। দু’দণ্ড কথা হয়। রেখে আসা আত্মীয়স্বজনদের খবর নেয়। সবাইকে আমার আলাদা আলাদা টাইম দেওয়া থাকে। রাত বারোটা বত্রিশ মিনিট গত হলেই ওরা এসে পুকুরধারে বসে। আমি ডেকে ডেকে কথা কই। গান টান শোনাই।'

ভূতনাথ বাবাজির এই কথা থেকে যে ছবিটা ফুটে ওঠে, সেটা যেন একজন বিখ্যাত ডাক্তারের চেম্বারের মতো। রোগীরা নির্দিষ্ট সময়ের পর চেম্বারের বাইরে বেঞ্চিতে এসে বসছেন আর ডাক্তারবাবু স্লিপ দেখে একজন একজন করে ডেকে নিচ্ছেন।

ভূতনাথ বাবাজি যেসব ওষুধ দিতেন তাতে নাকি রোগ সারত। কিন্তু মরা-বাঁচাবার ব্যাপারটা নিয়ে যেসব গল্প চালু আছে সেগুলো এখনকার লোকেরা বিশ্বাসই করে না। উনি নাকি খান চোদ্দো মরা মানুষকে কীসব সাধনা-টাধনা করে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। পঞ্চদশ মড়াটি বাঁচাতে গিয়ে একটু গণ্ডগোল হয়ে গিয়েছিল। সে ছিল তাঁতিপাড়ার ছেলে। ছেলেটা ছিল বেজায় রোগা। টাইফয়েডে ভুগে ভুগে আরও রোগা হয়ে গিয়ে এমনই চেহারা হয়েছিল যে, যাকে বলে অস্থিচর্মসার। দেখে মনে হত বুকের হাড়ের ওপর পাতলা আদ্দির কাপড়ের মতো চামড়া দেওয়া। সেই তাঁতিপাড়ার ছেলেটার নাম ছিল, ফড়িং। বলা বাহুল্য, এটা ওর ডাকনাম। ভাল নাম ছিল ভীম। এমন নামমাহাত্ম্য বিশেষ শোনা যায় না। সবাই ডাকত ফড়িং ফড়িং বলে।

সূর্য ডোবার খানিক বাদে ফড়িং মারা গেল। মরে গেলে দাহকার্যের জন্য শ্মশানে নিয়ে যাওয়াই নিয়ম। কিন্তু ফড়িঙের ঠাকুমা আর মা’র ইচ্ছে ‘একটিবার ভূতনাথ বাবাজির শ্রীচরণে নিয়ে চল।' অগত্যা নিয়ে আসা হল ভূতনাথের ভিটেতে। বাবাজি তখন মাটির গেলাসে লেবু চা খাচ্ছিলেন। শোরগোল শুনে উঠে দাঁড়ালেন। হুংকার দিয়ে বললেন, ‘গোল কীসের? আমার ভিটেয় কাঁদে কে র‍্যা?’

বাবাজি যখন হুংকার দিতেন তখন মনে হত বাজ পড়ার শব্দ হল। শোনা যায়, ওই হুংকারে লোকে এবং কান্নায় কাহিল ফড়িংয়ের সত্তর বছরের ঠাকুমা বিষম একটা হেঁচকি তুলে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। বাবাজি এগিয়ে এসে বললেন, ‘জোড়া বড়ি?’

ভিড়ের মধ্য থেকে একজন উত্তর দিল, ‘না বাবাজি! সিঙ্গল।'

এর পর ফড়িঙের মা বাবাজির পা জড়িয়ে ধরে পুত্রের মৃত্যু এবং তার জীবন ভিক্ষা চাইবার পর বাবাজি বললেন, ‘আগে ওই বৃদ্ধার জ্ঞান ফেরানো যাক।'

দু’ আঁজলা জল মুখে ঝাপটা দিয়ে আবার একটা হুংকার ছাড়তেই ফড়িঙের ঠাকুমা কাঁপতে কাঁপতে উঠে বসে হাত জোড় করে বললেন, ‘বাবাজি, তোমার হুংকারে মুচ্ছো গিয়েছিলাম।'

বাবাজি বললেন, ‘তাই তো আর-এক হুংকার দিয়ে তোমার মূর্ছা ভাঙলাম। একেই বলে বিষে বিষে বিষক্ষয়। মানে, ডায়মণ্ড কাট ডায়মণ্ড।'

এর পর বাবাজি ফড়িংকে দেখলেন। বড় বড় দুই চোখ দিয়ে পা থেকে মাথা, আবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত বারকয়েক দেখে নিয়ে বললেন, ‘ওকে আমার সাধনবেদিতে চিত করে শুইয়ে দাও।'

চিত করে বেদিতে শুইয়ে দেওয়া হল। রক্তবর্ণের সিমেন্টে বাঁধানো গোলাকৃতি বেদি। মাথার ওপর বটগাছ। বেদির চারপাশে নিম, আমলকি আর যজ্ঞডুমুরের গাছ। ফড়িং বেদির ওপর শুয়ে আছে। বাবাজি নিজের ঘরে গেলেন। তাঁর দুই শিষ্য বেদির ওপর স্থাপিত যজ্ঞবেদিতে আগুন জ্বালিয়ে দিলেন। বাবা এলেন ত্রিশূল হাতে। কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে থেকে মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে বেদি প্রদক্ষিণ করতে লাগলেন। এক পাক করে ঘোরেন আর তাঁর দুই শিষ্য ফড়িঙের শায়িত দেহে খাবলা খাবলা জলের ছিটে ছুড়ে মারেন এবং বাবা হুংকার ছাড়েন। সেই হুংকারে উপস্থিত তাঁতিপাড়ার লোক এবং অন্য যারা আশপাশ থেকে বাবাজির এই অলৌকিক কাণ্ড দেখতে জড়ো হয়েছিল তারা কেঁপে কেঁপে ওঠে। ঘণ্টাখানেক এই রকম চলবার পর বাবাজি স্থির হয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর দুই প্রিয় সহচর এবং শিষ্য যাঁদের নাম ঘণ্টা এবং কর্ণ (একসঙ্গে ডাকেন ঘণ্টা-কর্ণ বলে) তাঁরা পিতলের ঘড়া থেকে বাবার মাথায় হড়হড় করে দুই ঘড়া জল ঢালবার পর বাবা বেদিতে উঠলেন। চারপাশ একেবারে শব্দহীন। আগেই সতর্ক করা হয়েছিল কেউ কোথাও শব্দ করবে না। যে শব্দ করবে তার সমূহ বিপদ। অতএব, কেউ শব্দ করার সাহস পাচ্ছে না। শ্বাস-প্রশ্বাসও এমনভাবে চলছে, যাতে তার থেকেও কণামাত্র শব্দ নিজের কানে না যায়। তাঁতিপাড়ার গোবিন্দর আবার খুকখুক করে কাশার অভ্যাস। যাতে কাশি না ওঠে তাই সে গামছা দিয়ে মুখ বেঁধে একটু তফাতে দাঁড়িয়ে আছে।

বাবা বেদিতে উঠে ফড়িংকে তিনবার প্রদক্ষিণ করে ফড়িঙের বুকের ওপর পদ্মাসন করে বসলেন। হুংকার দিয়ে বারতিনেক মন্ত্র পড়তেই প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অনুযায়ী ফড়িং দু’পা তুলে শানবাঁধানো মেঝের ওপর আছড়াতে আছড়াতে চিৎকার করে উঠল, ‘বাপ রে, গেলুম রে। বুকের ওপর এ কোন ব্যাটা রে—’

ফড়িঙের চিৎকার শুনে বাবাজির জয়ধ্বনি শুরু হয়ে গেল। ফড়িঙের মা মরা ছেলে বেঁচে উঠে চিৎকার করছে শুনে ছেলের বুকের ওপর আবেগে ঝাঁপিয়ে পড়তেই ফড়িং বিষম যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠে বলল, ‘আমায় ধোরো না গো, ধোরো না।'

ছেলে বাঁচল বটে, কিন্তু উঠে বসতে পারে না। কেবলই গোঙরাচ্ছে। ‘ছেলে এমন করছে কেন?’ শঙ্কিত গলায় ফড়িঙের বাবা-মা জানতে চাইলেন। সেইসঙ্গে আরও অনেকে।

ফড়িঙের ঠাকুমা বললেন, ‘বাবাজি, এ তোমার কেমন লীলা।'

বাবাজি রুষ্টগলায় বললেন, ‘এটা কোনও লীলা-ফিলা নয়। এ তো রোগা, হাড় জিরজিরে ছেলে। ওর ওজন কত? আমার তো আশি মন। ওর বুকের ওপর পদ্মাসন করে বসতেই পাঁজরের হাড়গুলো ভেঙেছে। এখন বুকে প্লাস্টার করাও। মৃত্যুর চেয়ে প্লাস্টার ভাল।'

কথিত আছে, এই ঘটনার পর, তিনি আর কারও বুকের ওপর পদ্মাসন হয়ে মড়া বাঁচাবার চেষ্টা করেননি। ফড়িঙের পাঁজর ভাঙার জন্য অনুতপ্ত হয়ে তিনি নাকি বলেছিলেন, ‘আমার বংশের কারও ওজন বেশি হবে না। ক্রমে ক্রমে হ্রাস পাবে।’ ভূতনাথ বাবাজি পুরোদস্তুর তান্ত্রিক হওয়ার আগে বিয়ে করেছিলেন। মা-মরা ছেলে শিবনাথ কলকাতায় পড়াশোনা করত। ভূতনাথ বাবাজি সত্যি সত্যি রোগা হতে আরম্ভ করলেন। মৃত্যুকালে তাঁর ওজন হয়েছিল মোটে পঞ্চাশ মন। ছেলে শিবনাথও রোগা হয়ে মারা গেলেন একচল্লিশ কেজিতে। ততদিনে ‘মন’ বাতিল হয়ে ‘কেজি’ এসেছে। শিবনাথের ছেলে ভোলানাথ বাড়তে বাড়তে সতেরো বছর বয়সে সেই যে একত্রিশ কেজিতে আটকে গেল, আজ চল্লিশ বছর বয়সেও সেই একত্রিশ। একশো গ্রামও বাড়তে পারল না। ভোলানাথের কথায়, ‘সিদ্ধপুরুষ ছিলেন আমার ঠাকুর্দা। যা ভেবেছেন এবং বলেছেন, তাই হবে। অন্যথা হবে না। বলেছিলেন ক্রমে ক্রমে হ্রাস পাবে। ঠিক তাই হল। মৃত্যুকালে তিনি আশি থেকে পঞ্চাশে নামলেন। পিতৃদেব বিয়াল্লিশ পেরোতে পারলেন না। আমি একত্রিশে আটকে আছি। এর পর থেকে দশ কিলো করে কমতে থাকবে। সেটাই নাকি ঠাকুর্দা নিয়ম করে গিয়েছিলেন। আমার যদি বিয়ে হত এবং সন্তান জন্মগ্রহণ করত, তা হলে এই হ্রাসের মাত্রা কোথায় যেত বল তো! প্রথম সন্তান একুশে আটকে যেত, দ্বিতীয় এগারোতে, তৃতীয় তো বয়সে বাড়ত কিন্তু ওজন তো এক কিলোর বেশি হত না। গোঁফ-দাড়িওলা ছেলের ওজন এক কিলো, এটা ভাবা যায়? কারণ, পিতৃদেবের পর থেকে তো দশ কিলো করে কমছে। এইজন্যই আর বিয়ে করার ভরসা পেলাম না।'

মোটামুটি এই হল ভূতনাথ হালদার এবং তাঁর পরবর্তী বংশধরদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। এই ইতিহাস কারও লেখা নয়। সবটাই লোকমুখে শোনা। ভূতনাথ বাবাজি যে পনেরোজন মৃত ব্যক্তির বুকের ওপর পদ্মাসন করে বসে তাঁদের প্রাণদান করেছিলেন, তার নাকি অনেক প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। কিন্তু পিতৃদেবের এইসব কাণ্ডকারখানার কোনও প্রত্যক্ষদর্শীকে শিবনাথও কোনওদিন দেখেননি। বিস্তর অনুসন্ধান করে বুঝেছিলেন, সবাই বলছে অন্য কারও কাছ থেকে শুনে। কিন্তু সেই ‘অন্য ব্যক্তি’টির দেখা তিনি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত পাননি। তবে ঠাকুর্দার অতুল কীর্তি ও কিংবদন্তি ভূতনাথ সম্পর্কে তাঁর সুযোগ্য পৌত্র ভোলানাথ এখন গবেষণায় রত। অচিরেই ঠাকুর্দাকে নিয়ে একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনা করবার ইচ্ছে তার আছে। বলে রাখা ভাল, ভোলানাথ বহু গুণের অধিকারী। নানা বিষয়ে পুস্তক রচনা করে কিছু পরিচিতি সে পেয়েছে। এ যাবৎ তার প্রকাশিত গ্রন্থগুলির নাম হল, ‘হাঁস-মুরগি পালন পদ্ধতি’, ‘সচিত্র রন্ধন শিক্ষা’, ‘সচিত্র হারমোনিয়ম বাদন শিক্ষা’, ‘গাঁদা ফুলের চাষ’, ‘সচিত্র কুস্তি শিক্ষা’, ‘সচিত্র লাঠিখেলা শিক্ষা’, ‘সচিত্র হস্তরেখা বিচার’, ‘চোর ধরিবার উপায়', ‘ঘুড়ির মাঞ্জা ও ঘুড়ি তৈরির শিক্ষা’, ‘তুবড়ি তৈরির পদ্ধতি’। সব বইই বার হয় নিজের প্রকাশন থেকে ‘ভোলানাথ গ্রন্থমালা সিরিজ’ এই শিরোনামে। প্রকাশনার নাম ‘ভূতনাথ প্রকাশন’। ভোলানাথের মাথায় আরও যেসব বই লেখার পরিকল্পনা আছে সেগুলি সম্পর্কে আমরা পরে জানতে পারব। আপাতত ভোলানাথের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যাক।

ধানজমি এবং পুকুর বাগান সহ ভূতনাথের বিষয়-আশয় নিতান্ত কম ছিল না। অধিকাংশই শিষ্যদের দান। তস্যপুত্র শিবনাথ পেশায় ছিলেন উকিল। তিনি কিছু জমিজমা কিনেছিলেন। একবার এই অঞ্চলে প্লেগের মহামারী হয়েছিল। প্রাণ বাঁচাতে সবাই জলের দরে ভিটে-মাটি বিক্রি করে অন্যত্র চলে গিয়েছিল। সেই সময় বুদ্ধি করে সস্তা দামে আরও জমি-বাড়ি কিনে ফেলায় হালদার পরিবারে জমি-জমার বাড়বাড়ন্ত।

আস্তে আস্তে দিনকাল বদলে গেল। জমি খালি ফেলে রাখলে নানা উৎপাত শুরু হয়ে যায়। সেই আশঙ্কায় শ্রীমান ভোলানাথ কুড়ি বছর বয়সেই অনেকটা জমি নিয়ে তৈরি করে ফেলেছিল ‘ভূতনাথ আবাসন'। তারই সঙ্গে পরবর্তীকালে ‘ভূতনাথ বাজার’, ‘ভূতনাথ ভাণ্ডার’, ‘ভূতনাথ ঔষধালয়’। এই ঔষধালয়ে মোট চারটি বিভাগ। একটি ‘অ্যালোপ্যাথি', দ্বিতীয়টি ‘হোমিওপ্যাথি’, তৃতীয় ‘আয়ুর্বেদিক’, এবং চতুর্থ হচ্ছে ‘ভূতনাথের স্বপ্নপ্রদত্ত টোটকা’। আশ্চর্যের ব্যাপার, শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এই চতুর্থ বিভাগ অর্থাৎ ভূতনাথের স্বপ্নপ্রদত্ত টোটকা-র দোকানেই বিক্রি বেশি। ভূতনাথ প্রকাশনীর ভোলানাথ সিরিজের বইয়েরও ছোট্ট একটা দোকান ভূতনাথ বাজারে আছে। ভোলানাথ ওখানে বিক্রির একটা নতুন নিয়ম করেছে। নিয়মটা হল এই সিরিজের তিনটি বই একসঙ্গে কিনে ভূতনাথ বাজারে ক্যাশমেমো দেখালে এক কিলো চামরমণি চাল অথবা এক কিলো মুগডাল ফ্রি। অতএব, ভোলানাথের বই কেনার জন্য স্কুটারে চেপে অন্য গ্রাম থেকেও লোক ছুটে আসে।

এইসব ব্যাপার দেখে দিব্যি বোঝা যায় ভোলানাথের অর্থাভাব নেই। সে সারাদিন নানারকম কাজে ব্যস্ত থাকে। শিশুদের স্কুল চালায়, ঘুড়িতে মাঞ্জা দেওয়ার ব্যবস্থা করে, তুবড়ি বানায়। এসব জিনিস সে বেচে না। আবাসনের ছেলেদের বিনে পয়সায় দিয়ে দেয়। ঘুড়ি বানাবার দোকানও তার আছে। আর আছে ‘ভূতনাথ ব্যায়ামগার’।

একবার কলকাতার বিখ্যাত এক ব্যায়ামবীরকে আনা হয়েছিল ভূতনাথ ব্যায়ামাগারের চতুর্থ প্রতিষ্ঠাবার্ষিক অনুষ্ঠানে। সঙ্গে তার দুই কৃতী ছাত্র। গুরুর নির্দেশে শিষ্যরা শরীরের পেশি ফুলিয়ে নানারকম খেলা দেখালেন। তারপর বিশ মন ওজনের ‘ওয়েট লিফটিং’ দেখাবার আগে ব্যায়ামবীর, যিনি ‘লৌহমানব’ খেতাব পেয়েছেন, সেই মাননীয় অতিথি, কিশলয় সামন্ত বললেন, ‘এই ভূতনাথ ব্যায়ামাগারের খ্যাতি তিনি শুধু কলকাতায় বসেই শোনেননি। সুদূর রোম অলিম্পিকে গিয়েও এর কথা তিনি তাঁর সাহেব-বন্ধুদের মুখে শুনেছেন। অতএব, এই সংগঠনের ছাত্রদের মধ্যে কেউ কি প্রথমে এই ভারোত্তোলনে অংশ নেবেন। মাত্র বিশ মন। এগিয়ে আসুন।'

প্রথমে বিশেষ কেউ এগোল না। ভোলানাথ একজন মোটাসোটা লোককে কানে কানে কিছু বলতেই লোকটা এগিয়ে গেল। স্থানীয় লোকেরা তাকে বিলক্ষণ চেনে। লোকটার নাম গিরি। গিরি পাণ্ডা। ধানকল থেকে চালের বস্তা পিঠে করে এসে লরিতে তোলে। মোট বওয়া ওর অভ্যেস আছে। তা সেই গিরি গিয়ে দাঁড়াল লৌহমানব কিশলয়বাবুর কাছে। তিনি করমর্দন করে বললেন, ‘আপনার নাম?’

গিরি উত্তর দিল, ‘বাবু, আমার নাম মি. গিরি’

কিশলয়বাবু বললেন, ‘বিশ কিলো আছে। তুলতে পারবে তো?’

‘বিশ-তিরিশ কোনও ব্যাপার নয়। পিঠে তুলে দিলে দিব্যি আধমাইল হেঁটে যাব। নিন, তুলে দিতে বলুন।'

কিশলয় সামন্ত অর্থাৎ লৌহমানবের চোখ তখন গোল হতে শুরু করেছে। তিনি শুধু বললেন, ‘তুলে দেব মানে! ওটা তো তোমাকেই তুলতে হবে। তাতেই তো বোঝা যাবে তুমি কতটা ওয়েট তুলতে পারো।' গিরির মুখ দেখে মনে হল, সে যেন ব্যাপারটা বোঝাতে পারছে না। একটু বিরক্ত ভাবেই বলল, ‘পিঠে তুলে না দিলে বুঝবেন কেমন করে যে, আমি ভার বইতে পারি কিনা।'

কিশলয়বাবু বললেন, ‘এটা পিঠে তোলার নিয়ম নেই। দু’হাতে করে একবারে মাথার ওপর তুলতে হবে।'

গিরি বলল, ‘এমন খেলায় আমি নেই।'

কিশলয়বাবু একটু অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, ‘তা হলে বেরিয়ে যান। আই সে গেট আউট।' এই ‘গেট আউট’ কথাটার মানে গিরি জানে। বুকে রাগ চেপে সে সরে গেল। এর পর কিশলয়বাবু বললেন, ‘বিশ মন তোলার মতো কেউ নেই এই ক্লাবে। তা হলে কেমন শিক্ষা হয়!'

এবার ভোলানাথের আত্মসম্মানে ঘা লাগল। সে লোক দিয়ে খবর পাঠাল, ‘বিশ নয়, চল্লিশ মন করুন। আমাদের পরমারাধ্য শিক্ষক ভোলানাথদা নিজে আসছেন।'

কিশলয়বাবু বললেন, ‘আমরা পুরনো অভ্যাসবশে বিশ মন, চল্লিশ মন বলছি বটে, আসলে এগুলো এখন কিলোর হিসেবে হয়। তোমরাও ওতে চল্লিশ কিলো লাগাও। ভোলানাথবাবু আসছেন।'

প্রথমে মাইকে ঘোষণা। তারপর হাততালি। হঠাৎ কিশলয়বাবুর হাততালি থেমে গেল। তার দুই চোখ বিস্ফারিত। তিনি দেখলেন, খাদি রঙের ঢলঢলে একটা হাফপ্যান্ট আর সাদা রঙের স্যান্ডো গেঞ্জি পরে একমুখ পান চিবোতে চিবোতে যে আসছে সে একটা রোগা লিকলিকে মানুষ। প্যান্টের নীচের পা দুটো যেন দুটি শুকনো আখ, দোদুল্যমান হাত দুটি কঞ্চিকেও লজ্জা দেয়। সবাই চিৎকার করছে, ‘ভোলানাথ জিন্দাবাদ। থ্রি চিয়ার্স ফর ভোলানাথ।'

ভোলানাথ নিজেই এগিয়ে এসে কিশলয়বাবুর সঙ্গে করমর্দন করে বলল, ‘নাইস টু মিট ইউ’

কিশলয়বাবুর কপালে তখন বিন্দু বিন্দু ঘাম। একটা ঢোক গিলে বললেন, ‘আপনি চল্লিশ কিলো তুলবেন?’

ভোলানাথের গলায় একটা মোটা গাঁদাফুলের মালা এইমাত্র কে যেন পরিয়ে দিয়ে গেল। ভোলানাথ গলা থেকে মালাটা খুলে নিয়ে বলল, ‘হোয়াই নট?’

কিশলয়বাবু মনে মনে শঙ্কিত হলেন। তাঁরই চোখের সামনে যদি মারাত্মক কিছু ঘটে যায়, তাহলে তার দায় তিনি এড়াতে পারবেন না। পুলিশ থেকে পাবলিক সবাই বলবে, ‘আপনি তো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লোক। আপনি কি ভোলানাথকে দেখেও বুঝলেন না এটা ওর কম্ম নয়। চল্লিশ কিলো তো দূরের ব্যাপার, পাঁচ কিলোও ওর পক্ষে ‘ওভার ডোজ’ হয়ে যাবে।'

কিশলয়বাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার নিজের ওজন কত?’

ভোলানাথ পানের পিক ফেলে উত্তর দিল, ‘থারটি ওয়ান কেজি স্যর।'

কিশলয়বাবু ধপাস করে বসে পড়ে বললেন, ‘আমি এ কাজ করতে আপনাকে অনুমতি দিতে পারি না। আপনি আমায় ক্ষমা করবেন।'

ভোলানাথ কারও নিষেধ শোনার পাত্র নয়। ভূতনাথ ব্যায়ামাগারের অসম্মান সে সইতে পারবে না। এই অসম্মান গোটা গাঁয়ের। অতএব, সে কারও তোয়াক্কা না করে বারবেলটার দিকে এগিয়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে তিনবার প্রণাম করল। কিশলয়বাবু নির্বাক। তিনি কেবলই ঘেমে যাচ্ছেন। শেষবারের মতো বললেন, “প্লিজ ভোলানাথবাবু, আপনি তুলবেন না। বিপদ হতে পারে।'

ভোলানাথ গ্রাহ্যই করল না। প্রণাম শেষ করে বারবেলটা দু’হাতের মুঠিতে ধরে ঠাকুর্দার মতোই হুংকার দিয়ে বলল, ‘জয় ভূতনাথ বাবাজির জয়। জয় পবননন্দনের জয়। জয় ভূতনাথের জয়।'

হুংকার শেষ করেই এক ঝটকায় ভোলানাথ চল্লিশ কিলো ওজন দেওয়া বারবেল মাথার ওপরে তুলে দু’বার দু’পাক ঘুরে আস্তে আস্তে মাটিতে নামাবার পর কিশলয়বাবু প্রায় অজ্ঞান হওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছে বললেন, ‘ওয়াটার, প্লিজ গিভ মি ওয়াটার।'

কিশলয়বাবুকে জল দিতে এল গিরি। জল খাওয়ার পর তিনি উঠে দাঁড়াতেই গিরি জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার ওজন কত বাবু।

কিশলয়বাবু বললেন, ‘আটষট্টি।’

‘আটষট্টি’ উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গিরি একঝটকায় চালের বস্তার মতো কিশলয়বাবুকে পিঠে ফেলে মাঠের মধ্যে ছুটতে আরম্ভ করল। কিশলয়বাবু চিৎকার করে বলতে লাগলেন, ‘এটা কী করছ গিরি? এই যে গিরিবাবু।'

কিশলয়বাবু যত চেঁচান, গিরি তত জিজ্ঞেস করে, ‘ওজন কত?’ কিশলয়বাবু এবার চিৎকার করে উঠে বললেন, ‘বলছি তো, সিক্সটি এইট কিলো।’

এবার গিরি মাঠের ওপর কিশলয়বাবুকে নামিয়ে দিয়ে কোমরের গামছা খুলে মুখ মুছে বলে, ‘সিক্সটি এইট যদি পিঠে নিতে পারি, টোয়েনটিও পারতাম। খালি, হাতের জোরটাই দেখলেন, পিঠের দিকে তাকালেন না। অলিম্পিকে পিঠোত্তোলন করুন। সব সোনারুপো এদেশে। সস্তায় মোট বইবার কুলি এদেশ ছাড়া কোথায় পাবেন। তিন পুরুষের অভ্যাস। খালি পেটেও চল্লিশ বইতে পারি। এই প্র্যাকটিসটার দাম দিলেন না।'

কিশলয়বাবু হতচকিত এবং বিমূঢ়ের মতো খানিকক্ষণ চারদিকে তাকালেন। পরে কাতর কণ্ঠে বললেন, ‘আমায় ছেড়ে দিন। আমি কলকাতা যাব।'

কিশলয়বাবুকে আপ্যায়ন জানাবার জন্য জনাই থেকে মনোহরা আর কলকাতা থেকে রসগোল্লা আনানো হয়েছিল। দুই প্লেট ভর্তি করে তাঁর সামনে দেওয়ার পর কিশলয় একবার করুণ চোখে প্লেট দুটোর দিকে তাকালেন। তাঁর সামনে ভোলানাথ দাঁড়িয়ে। ভোলানাথের পাশেই কোমরে গামছা বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে গিরি। এমনভাবে কোমরে গামছা জড়িয়ে রেখেছে যে, দেখলেই মনে হবে এখনই শবযাত্রায় ঘাটে যাবে। কিশলয়বাবু প্লেটের দিকে হাত বাড়াতে গিয়ে গুটিয়ে নিলেন। একবার গিরির দিকে চোরা চোখে তাকিয়ে নিয়ে ভোলানাথকে বললেন, ‘ভোলানাথবাবু, আমার মিষ্টি খাওয়া বারণ।'

ভোলানাথ বলে উঠল, ‘কিছু হবে না। সুগারের ভয় পাচ্ছেন তো। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। মিষ্টির পর দুটো কাঁচা উচ্ছে চিবিয়ে খেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। এটা আমার ঠাকুর্দা ভূতনাথের টোটকা। এই টোটকার জন্য এই গাঁয়ে কারও সুগার নেই।'

কিশলয়বাবুর মনে হল, গিরিও যেন কিছু বলতে চাইছে। তিনি আর কথা বাড়াবার ভরসা পেলেন না। খান দুই মিষ্টি খেয়ে উঠে পড়লেন। গাড়িতে তুলে দেওয়ার সময় ভোলানাথের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গিরিও বলে উঠল, ‘আমাদের ভুলে যাবেন না স্যর। মনে রাখবেন। আবার ডাকলে পায়ের ধুলো দেবেন।'

কিশলয়বাবু হাসবার চেষ্টা করলেন কিন্তু হাসি ফোটাতে পারলেন না। মনে মনে বললেন, ‘আমরণ তোমাদের কথা আমার মনে থাকবে বাবা।'

কিশলয়বাবু চলে যাওয়ার পর সভাভঙ্গ হল। বৃদ্ধ গঙ্গাধর মণ্ডল ভোলানাথের বাবার সমসাময়িক। তিনি থুথুড়িয়ে এগিয়ে এসে বললেন, ‘হ্যাঁ রে ভোলা, ওই চল্লিশ কিলো তুই এই চেহারায় তুললি কেমন করে। এটাও কি ভূতনাথের আশীর্বাদ?’

ভোলানাথ উত্তর দিল, ‘একরকম তাই ধরতে পারেন। যে কোনও সৎ কাজে ঠাকুর্দা আমাকে সাহায্য করেন। একমাত্র নাতি তো, তাই আমার সঙ্গে সময়-সুযোগ বুঝে প্রায় রোজই একবার দেখা করতে আসেন। হাজার হোক, রক্তের টান তো।'

গঙ্গাধর মণ্ডল ভোলার মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ পিটপিট করতে করতে বললেন, ‘হয়তো তাই হবে। নইলে এমন অসাধ্য সম্ভব হলে কেমন করে।'

ভোলানাথ বলল, ‘কাকু, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সবই তাঁর লীলা। ওই খালপাড়ের বাচ্চা ছেলেগুলো তো খালি পেটেই মাথায় ইটের পাঁজা নিয়ে দু'খানা বাঁশের ওপর পা রেখে খালের নৌকো থেকে ডাঙায় উঠে আসে। একদিনও কারও পা হড়কায়নি। আমি-আপনি পারব!’

গঙ্গাধরবাবু মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘তাও তো সত্যি বটে। কাজের পর রোজ পেলে তবে খেতে পায়। এসব তো অভ্যেস। যাকে বলে প্র্যাকটিস।'

ভোলানাথের সঙ্গে গঙ্গাধর মণ্ডলও এসে বসলেন ভূতনাথের সাধনবেদিতে। বেদিতে কেউ জুতো পরে বসে না। গঙ্গাধরবাবুও বসলেন না। ভোলানাথ বলল, ‘এই যে দেখুন, লৌহমানব কিশলয়বাবু। কেমন চমৎকার স্বাস্থ্য। কিন্তু দেখলেন তো, সুগারের ভয়ে দুটোর বেশি মিষ্টি খেতে সাহস করলেন না। আর আমার ঠাকুর্দা, গুনে গুনে বিশ-পঁচিশটা রসগোল্লা খেতেন। নো সুগার, নো কোলেস্টেরল, নো কোনও রোগ-ফোগ।'

গঙ্গাধর মণ্ডল বললেন, 'আমারও ওসব সুগার, সল্ট হিজিবিজি জিনিস নেই। তা হ্যা রে ভোলা, মিষ্টি কি গুনে গুনে কিনেছিলি?’

ভোলানাথ উত্তর দিল, ‘সব গিরির কাছে আছে। শালপাতা নিয়ে বসে যান। প্রাণভরে খেয়ে যান। ঠাকুর্দার টোটকা আছে।'

ভোলানাথকে নিয়ে এই অঞ্চলের লোকেদের বিস্ময়ের শেষ নেই। ভূতনাথের চেহারা দেখে এবং তাঁর চালচলন লক্ষ করলে বোঝা যেত ইনি যিনিই হোন, সামান্য মানুষ নন। কিন্তু ভোলানাথ তো তেমন নয়। চোখে ধরবার মতো ধরতাই তো চেহারায় নেই। রোগা লিকলিকে গোবেচারা-মার্কা চেহারা। ওই চেহারা নিয়ে মাঝেমধ্যে অসম্ভবকে সম্ভব করে ছাড়ে। একবার ভোলানাথ তালগাছের মাথায় উঠেছিল তালশাঁস খাওয়ার জন্য। খান দুই কোপ মারার পর হাতের দা’খানা হাত থেকে ছিটকে পড়ল নীচে। ভোলানাথ অর্ধেক কাটা কাঁচা তালের কাঁদি ধরে ‘জয় ভূতনাথ’ বলে ঝুলে পড়তেই কাঁদিশুদ্ধু ভোলানাথ পড়ল নীচে। আমগাছ, পেয়ারাগাছ, এমনকী নারকেলগাছ থেকেও লোক পড়ার কথা শোনা যায়। কিন্তু তালগাছ থেকে ওই ভাবে কাঁদিশুদ্ধু ভোলানাথ ছাড়া আর কেউ কখনও পড়েছে কিনা সেটা কারও জানা নেই। অত উঁচু থেকে পড়ে ভোলানাথ মিনিট দশেক অজ্ঞান হয়ে ছিল। সবাই মিলে ঠাকুর্দার সাধনবেদিতে শুইয়ে রেখেছিল ওই দশ মিনিটের মতো। তারপরেই ভোলানাথ উঠে বসে বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘পড়লুম কী করে বলদিনি?’

সকালে যে ভোলানাথ তালগাছ থেকে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল সেই ভোলানাথকে বিকেলবেলা দেখা গেল ভূতনাথ বাজারে বসে সঙ্গীদের সঙ্গে তাল কেটে শাঁস বার করে খাচ্ছে। এই খবর শুনে তাঁতিপাড়ার দিদিমা বলেছিলেন, ‘ধন্যি ছেলে বটে! কালে কালে ভোলানাথও ভূতনাথ বাবাজির মতো হয়ে উঠবে। ওর মধ্যে অবতারের লক্ষণ স্পষ্ট হচ্ছে। ওকে হেলাফেলা কোরো না।'

ভোলানাথকে অবশ্য হেলাফেলা করার প্রশ্নই ওঠে না। যাঁরা বয়সে বড় ছিলেন তাঁরা মনে মনে মান্যি করতেন। ভোলানাথ সারাদিনই নানা কাজে ব্যস্ত থাকত। শুধু রাত বারোটা একত্রিশ মিনিট গতে তাকে ডাকা নিষেধ। ওই একত্রিশ মিনিট পার হওয়ার পর আধঘণ্টা ভোলানাথ তার পরমারাধ্য ঠাকুর্দার সঙ্গে তিরিশ মিনিট কথা বলত। ভোলানাথের ভাষায়, এটা নিতান্তই ‘সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎকার।' ওই সময়টুকু সাধনবেদির কাছে কারও যাওয়া নিষেধ।

এই ছিল ভোলানাথের দৈনন্দিন কাজ-কারবার। কিন্তু সম্প্রতি ভোলানাথ বেজায় চিন্তিত। চিন্তাটা শুধু ভোলানাথের একার নয়, ভূতনাথ আবাসনের সবাইকার। ঘটনার শুরু এক রবিবার সকালে। ভোলানাথ নিজের বাড়ির বারান্দায় বসে মুড়ি আর তেলেভাজা খাচ্ছিল। সবে গরম আলুর চপে দাঁত বসিয়েছে তখনই ভোলানাথ সবিস্ময়ে দেখল, ভূতনাথ আবাসনের দিক থেকে শ্রীযুক্ত ঘৃতগন্ধি চন্দ এবং তাঁর স্ত্রী চন্দনা চন্দ অতি দ্রুত তার বাড়ির দিকে হেঁটে আসছেন। এমনভাবে হেঁটে আসছেন যাকে ঠিক হাঁটা বললে ঠিক বলা হয় না। দ্রুত হাঁটা এবং দৌড়ে আসা এই দুইয়ের মাঝামাঝি যদি কিছু থাকে তা হলে সেটা তাই। চপ খাওয়া বন্ধ রেখে ভোলানাথ উঠে দাঁড়াল। এবার দেখল, শুধু দু’জন নয়, তাঁদের পেছনে আরও জনাচারেক লোক। ভোলানাথের চোখ কুঁচকে উঠল। মনে মনে ভাবল, ‘ব্যাপারটা কী? আবাসনের ব্যাপারে তো কারও কোনও অভিযোগ নেই। তবে কী অন্য কোনও কারণ? কাগজে প্রায়ই দেখে কলকাতার এখানে-ওখানে ঘেরাও হচ্ছে। আবাসনের লোকেরা কি তাকে ঘেরাও করতে আসছে? কিন্তু তার তো কাজে কোনও গাফিলতি নেই।'

ওই গতিতে আসতে আসতে চন্দনা চন্দ’র হাওয়াই চটি খুলে গিয়ে তিনি মৃদু একটা হুমড়ি খেলেন। স্বামী ঘৃতগন্ধিবাবু তাঁকে এক হাতে তুলে নিয়ে প্রায় টানতে টানতে ভোলানাথের সামনে হাজির। ভোলানাথের হাতে তখনও চপটা ধরা। তাতে একটা কামড় দেওয়ার সময় এই বিপত্তি। কামড়েছিল কিন্তু গিলতে পারেনি। ফলে চপের একাংশ একটু নড়বড়ে হয়ে ঝুলে আছে। পাছে মাটিতে পড়ে যায় তাই গিরি এসে নড়বড়ে অংশটা নিয়ে নিজের মুখে পুরে ফেলল। গিরি আবার অপচয় সহ্য করতে পারে না।

ভোলানাথ ব্যগ্র কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, 'কী হয়েছে ঘৃতগন্ধিদা? বউদি অত হাঁপাচ্ছেন কেন?’

ঘৃতগন্ধিবাবু জোরে জোরে বার শ্বাস নিয়ে বললেন, ‘ভয়ানক, মানে ডেঞ্জারাস, সত্যি বলতে কী, রিয়েল ডেঞ্জারাস ব্যাপার।'

ভোলানাথ দু’জনকে বসতে দিল। ততক্ষণে পেছনের দলটিও উপস্থিত। তাদের মধ্যে গঙ্গাধর আছেন। ঘৃতগন্ধিবাবু কিছু বলার আগে গঙ্গাধরবাবু বললেন, ‘বাবা ভোলানাথ, এসব কী শুনছি বাবা। তোমার পিতৃদেব আমার বাল্যবন্ধু। তারই অনুরোধে এই ভূতনাথ আবাসনে ফ্ল্যাট নিলাম। এখন এই বয়সে কোথায় যাব বলো তো বাবা।

ভোলানাথ সবার মুখের দিকে তাকাল। সবার মুখেই উদ্বেগের ছায়া। কিন্তু কেন এই উদ্বেগ সেটা ভোলানাথ বুঝতে পারছে না। ভোলানাথ সবাইকে বসতে অনুরোধ করল। গিরি বারান্দার ওপর একটা মাদুর বিছিয়ে দিতেই সবাই গুটিগুটি মাদুরে বসলেন। গঙ্গাধর মণ্ডল দেখলেন শালপাতার ঠোঙায় তখনও দুটো চপ আর দুটো বেগুনি রয়েছে। একটা বেগুনি হাতে তুলে নিতে নিতে বললেন, ‘এগুলো ঠান্ডা করে খেতে নেই বাবা। খেতে খেতে বেত্তান্তটা শোনো। এই ঘৃতগান্ধি, তুমি বলো।'

ঘৃতগন্ধিবাবুর স্ত্রী চন্দনা চন্দ সংশোধন করে দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, ‘গান্ধি নয়, গন্ধি।' বেগুনিতে কামড় দিয়ে গঙ্গাধরবাবু বললেন, ‘ওই হল। এখন কী আর মাথার ঠিক থাকে মা!’

গিরি ঘর থেকে জল আর বাতাসা এনে সবাইকে দিয়ে বলল, ‘একটু জল-বাতাসা পান করুন। উত্তেজনা কমে আসবে।'

সবাই জল-বাতাসা খেলেও ঘৃতগন্ধিবাবু আর তাঁর স্ত্রী শুধু জল খেলেন। অপচয় সহ্য হয় না বলে গিরি বাকি বাতাসাগুলো নিজের মুখে পুরে চিবোতে লাগল। মিনিট পাঁচেক এইভাবে চলার পর ভোলানাথ বলল, ‘এবার বলুন কী হয়েছে??

ঘৃতগন্ধিবাবুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করা হয়েছে তাই ঘৃতগন্ধিবাবু বললেন, ‘গতকাল রাত দুটোয়।'

এইটুকু বলেই স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী গো, তখন রাত দুটো তো?’

চন্দনা চন্দ মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘না, তখন একটা চল্লিশ হবে।'

ঘৃতগন্ধিবাবু অস্বীকার করার ভঙ্গিতে বললেন, ‘একটা চল্লিশে কেমন করে হবে। একটা চল্লিশে তো বাবুনকে বাথরুম করাতে নিয়ে গেলাম। ওই দুটোই হবে।'

চন্দনা চন্দ প্রবল আপত্তিতে মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘দুটো কিছুতেই হতে পারে

না। দুটোতে আমি তো ভয় পেয়ে কাঁপছি। শোনো, সময়টা খুব মূল্যবান। এক মিনিটের এদিক-ওদিকে কেস গণ্ডগোল হয়ে যেতে পারে।'

এবার ভোলানাথের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। একটা হুংকার দিয়ে উঠে বলল, ‘চোপ! ধরা যাক, বলুন। কেসটা কী?’

দেড়টা থেকে দুটো— এর মধ্যবর্তী কোনও সময়। কী হয়েছে

ঘৃতগন্ধিবাবু ভোলানাথের আকস্মিক হুংকারে চমকে উঠে ভোলানাথের দিকে তাকালেন। ইতিপূর্বেও তাঁর মনে হয়েছে, ওই সরু চিচিঙের ভেতর থেকে এমন বজ্রনিনাদ কেমন করে বার হয়। ঘৃতগন্ধিবাবু বললেন, ‘ওই যে সময় আপনি বললেন, ওই সময়ে একটি ফোন এল। আমি ভাবলাম, এত রাত্রে কে ফোন করছে। তবে কি হালতু থেকে ফোন এল? না কি ডোমজুড় থেকে?’

ভোলানাথ প্রশ্ন করল, ‘হালতু আর ডোমজুড়, এই দুটো জায়গার কথা মনে এল কেন?’ ঘৃতগন্ধিবাবু উত্তর দিলেন, ‘হালতুতে শ্বশুরালয়। তিনি রোগে শয্যাশায়ী। ভাবলাম, বোধহয় তিনি দেহ রেখেছেন। আর ডোমজুড়ে আমার কারিগররা থাকে। সেখান থেকে বোধহয় দুঃসংবাদ। কেননা, সেদিন দুপুরেই কিছু গয়না নিয়ে গেছে স্টোন সেট করবে বলে। হয়তো বাসে বা ট্রেনে ছিনতাই হয়েছে। কিন্তু তা নয়। অত্যন্ত দুর্বিনীত একটু পুরুষ কণ্ঠ। সেই কণ্ঠ আমাকে বলল...’

ভোলানাথ প্রশ্ন করল, 'কী বলল?’

ঘৃতগন্ধিবাবু বললেন, ‘ওই রাত দুটোয়—'

কথাটা বলেই ঘৃতগন্ধিবাবু স্ত্রীর দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘না, না, দুটো নয়।

ওই দেড়টা থেকে দুটোর মধ্যবর্তী সময়। যেটা ভোলানাথবাবু বেঁধে দিয়েছেন।' সেই সময়ে আমাকে ঘুম থেকে তুলে দুর্বিনীত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘তোর বাবার নাম কী?’

আমি একটু ঘাবড়ে গিয়ে ভাবতে লাগলাম এত রাতে বাপের নাম শুধোয় কে? আমি বললাম, ‘সুগন্ধি চন্দ।'

বারান্দায় বসা জনা ছয়েক লোক। তাঁদের মধ্যে থেকে মৃদু গলায় কে যেন মন্তব্য করল, ‘দুগ্ধগন্ধি হলেই তো ভাল ছিল। দুধ থেকেই তো ঘি।'

ভোলানাথ ঘাড় ফিরিয়ে একবার সবার দিকে তাকাল। এবার প্রশ্ন করল, তারপর কী বলল?’

ঘৃতগন্ধিবাবু বললেন, ‘তারপর বলল, ‘তোর বাবার নাম ভুলিয়ে দেব।' আমি বললাম, ‘কেন?’ লোকটা বলল, ‘সেসব পরে জানবি। আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে এক লাখ টাকা আমাকে দিবি। না দিলে তোর ছেলেকে তুলে নিয়ে যাব। তখন ছেলে ফেরত পাওয়ার রেট হবে পাঁচ লাখ। মঙ্গলবার রাত্রে তিন নম্বর রেলগেটের কাছে রাত্রি দশটায় বাজারের ব্যাগে এক লাখ টাকা নিয়ে হাজির থাকবি। আমি ঠিক সময়ে এসে টাকা নিয়ে যাব। না এলে ছেলে যাবে। তখন দিতে হবে পাঁচ লাখ।'

ঘৃতগন্ধিবাবু একটু দম নিয়ে বললেন, ‘এবার আমি কী করব। আপনার তো অনেক ক্ষমতা। ঠাকুর্দাকে স্মরণ করে কিছু একটা উপায় বাতলে দিন।'

ভোলানাথ গম্ভীর হয়ে গেল। গম্ভীর গলাতেই বলল, ‘ঠাকুর্দার সময়ে এইসব কেস হত না। তাই ঠাকুর্দার ডায়েরিতে এর কোনও টোটকা বা বিধান নেই।'

ঘৃতগন্ধিবাবু এবার কাহিল গলায় বললেন, 'তা হলে আমার কী গতি হবে?’

চন্দনা চন্দ ফ্যাস করে কেঁদে ফেলে বললেন, ‘একে তো আমার ছেলে বাবুনকে তুলে নিয়ে যাবে। আপনি ভাই কিছু একটা ভেবে বার করুন।'

ভোলানাথের মনে পড়ল ঠাকুর্দার ডায়েরিতে লেখা আছে ‘যখনই কোনও কঠিন সমস্যার প্রতিকার করতে হবে এবং প্রতিকার করার বুদ্ধি বা উপায় যখন মনে আসবে না, তখনই গম্ভীর হয়ে চোখ বুজে থাকবে। তাতে নিজের ভাবনাশক্তি সংহত হবে এবং প্রতিকারপ্রার্থী ওই অবস্থা দেখে-কিছুটা মনোবল পাবে।' অতএব, ভোলানাথ গম্ভীর হয়ে গেল এবং চোখ বন্ধ করে ভাবনাচিন্তা সংহত করতে লাগল। সবাই ভোলানাথের দিকে তাকিয়ে। ভোলানাথ চোখ আর খোলে না।

ইতিমধ্যে একটা বিশ্রী ব্যাপার ঘটল। ভোলানাথের একটা পোষা ষাঁড় ছিল। গভীর কৃষ্ণবর্ণের সেই ষাঁড়টির বলবান শিং জোড়াকে এই অঞ্চলের সবাই সমীহ করত। ভোলানাথের অনুগত সেই ষাঁড়টির নাম ভোলানাথ রেখেছিল ‘কালোমানিক’। ভোলানাথ, গিরি এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গরা ছাড়া সবাই কালোমানিককে যে সমীহ করত সেটা ভয়ে। ভোলানাথ চোখ বুজে ভাবনাচিন্তা সংহত করছিল বটে, কিন্তু অন্যরা তো চোখ খুলেই ছিলেন। তাঁরা দেখলেন, কালোমানিক আসছে। আর কালোমানিক বোধহয় ভেবেছিল, তার গুরুর চারপাশে এত লোক কেন? গুরুকে বসিয়ে এরা কি কোনও বদ মতলব আঁটছে? প্রভুভক্ত কালোমানিক মুহূর্তে খেপে গিয়ে শিং বাগিয়ে দৌড় শুরু করল। ভীত কণ্ঠে ঘৃতগন্ধি ভোলানাথের পদ্মাসনের একটি পায়ের পাতা কোনওরকমে খুঁজে পেয়ে বলে উঠলেন, ‘এসে গেছে। ও এসে গেছে।'

চোখ না খুলে নির্বিকার কণ্ঠে ভোলানাথ বলল, ‘ওকে আসতে দিন। আমি জানতাম ওকে আসতে হবে। আপনারা স্থির হয়ে বসুন।'

স্থির হয়ে বসার উপায় ছিল না। কালোমানিক প্রবল প্রতাপে ক্রমশ নিকটবর্তী হচ্ছে। গঙ্গাধর মণ্ডল হাতের লাঠিটা তুলে নিয়ে বললেন, ‘এটা ভূতনাথ বাবাজির সিদ্ধপীঠ হলেও এতটা রিস্ক নেওয়া যায় না। আমি চললুম।'

চন্দনা চন্দের পরনে ছিল লাল রঙের শাড়ি। ঘৃতগন্ধিও পরেছেন লাল গেঞ্জি। অতএব, স্বাভাবিক ভাবেই কালোমানিকের দৃষ্টি তাদের দিকে। উপায়ান্তর না দেখে ওঁরাও ছুটতে আরম্ভ করলেন। হই হট্টগোলে কি ভাবনাশক্তি সংহত করা সম্ভব? এতএব, ভোলানাথকে চোখ খুলতে হল। চোখ খুলেই দেখল তার প্রিয় কালোমানিক ভূতনাথ আবাসনের সম্মানিত আবাসিকদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ভোলানাথ হাঁক দিল, ‘কালোমানিক অসভ্যতা না করে এদিকে এসো। কাম হিয়ার। কুইক।'

কালোমানিক মাথা নিচু করে ভোলানাথের সামনে এসে দাঁড়াল। ভোলানাথ গিরিকে ডেকে বলল, ‘গিরি ওকে বাতাসা আর জল দে। মাথা আর শরীর ঠাণ্ডা হবে।'

পায়ে গাউটের ব্যথা আছে বলে প্রাণবল্লভ প্রামাণিক মুদ্রিতচক্ষু ভোলানাথের পেছনে লুকিয়ে ছিলেন। কালোমানিক যখন গিরির দেওয়া বাতাসা কড়মড়িয়ে খাচ্ছে তখন প্রাণবল্লভবাবু বললেন, 'আপনার কালোমানিক তো দেখছি ইংরেজিও বোঝে।'

ভোলানাথ বলল, ‘কেন বুঝবে না। আপনার কুকুর যদি ইংরেজি বোঝে, আমার কালোমানিক কেন বুঝবে না। ষাঁড় বলে, না কি গোরু বলে। গোরুর সবটাই পজিটিভ প্রোডাক্ট। দুগ্ধ থেকে মূত্র পর্যন্ত। এমনকী তার বিষ্ঠাও অতি পবিত্র।'

প্রাণবল্লভবাবু বললেন, 'আমি তা হলে এবার উঠি। আপনি একটু মাই ডিয়ার কালোমানিকদার প্রতি নজর রাখুন।'

ঘৃতগন্ধি চন্দর ব্যাপারটা ধীরে ধীরে ভূতনাথ আবাসনের সবাইকে ভাবিয়ে তুলল। এক লাখ টাকা তো চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। টাকা দিলেই যে চিরতরে ঝামেলা মিটে যাবে এমন ভরসাই বা কোথায়। কে বলতে পারে, এক লাখ টাকা পাওয়ার এক বছর বাদেই আবার টাকার বায়না করবে না। আর একে তো ঠিক বায়না বলা যায় না, এ যেন হুমকি। একবার যদি ভূতনাথ আবাসনের কারও কাছ থেকে এক লাখ টাকা আদায় করতে পারে, তা হলে তো ওই আবাসনটাই লুঠেরাদের কোষাগার হয়ে যাবে। খুশি হলেই মাঝরাত্তিরে ফোন করে প্রথমে বাবার নাম জিজ্ঞেস করবে, তারপরই লাখ টাকা দাবি করে বসবে।

এরকম অবস্থায় সবারই চিন্তা হওয়ার কথা। নানাজন নানারকম পরামর্শ দিচ্ছেন ঘৃতগন্ধিবাবুকে। কেউ বলছেন, ‘পুলিশে খবর দেওয়া হোক।’ কারও পরামর্শ, ‘পুলিশে হবে না, মিলিটারি ডাকা হোক।’ ঘৃতগন্ধিবাবুর স্ত্রী চন্দনা চন্দকে আবাসনের মহিলারা পরামর্শ দিচ্ছে, ‘ছেলে নিয়ে বাপের বাড়ি পালাও।

সব কথাই ভোলানাথের কানে আসছে। যত সে শুনছে ততই ভেতরে ভেতরে সে ব্যস্ত হয়ে উঠছে। ভূতনাথের ডায়েরিই তার সম্বল। কিন্তু সেই ডায়েরিতে এসব কথা তো থাকবে না। ভোলানাথ বড় বেকায়দায় পড়ে গেল। এতদিন শুধু আবাসনের লোকেরাই নয়, অন্য লোকেরাও নানা ব্যাপারে ভূতনাথের সাহায্য আর পরামর্শ পেয়ে এসেছে। এবার যদি সে কিছু করতে না পারে, তা হলে তার ওপর লোকের বিশ্বাস টলে যাবে। ভোলানাথ একা একাই ভাবতে থাকে। ইতিমধ্যে আবাসনের গজাননবাবু বললেন, ‘একটা কিছু বিহিত না করলে তো ঘৃতগন্ধির স্ট্রোক হয়ে যাবে। শুনতে পাই রোজ মধ্যরাতে স্বর্গীয় ভূতনাথ বাবাজির সঙ্গে তোমার নাকি সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎকার হয়। তুমি না হয় সেই সিদ্ধপুরুষকেই একাধিকবার জিজ্ঞেস করে দেখো।'

বিকেলের দিকে গিরি এসে বলল, ‘গুরু, কেসটার কোনও ফয়সালা হল।'

ভোলানাথ মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল এখনও কিছু হয়নি। ভোলানাথকে গোড়া থেকেই গিরি ‘গুরু’ বলেই সম্বোধন করে। গিরি একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘ঘৃতগন্ধিবাবু লোকটাও খুব সুবিধের নয়। সোনার দোকান আছে, আবার বন্ধকি কারবারও করে। সোনা মারার অভ্যেসও আছে। আমার মা’র বালাজোড়ার কী হাল করে ছেড়েছিল।'

ভোলানাথ বলল, ‘ওসব কথা এখন ভাবলে চলবে না গিরি। ওঁরা ভূতনাথ আবাসনের লোক। ওঁদের স্বার্থ আমাকে আগে দেখতে হবে।'

গিরি বলল, ‘তা কী করবে ভেবেছ?’

ভোলানাথ বলল, ‘কিছুই তো ভেবে উঠতে পারছি না। মাথার ভেতরটা একেবারে খাঁ খাঁ করছে। ভাবছি আজ রাতে ঠাকুর্দার সঙ্গে এই বিষয়ে একটা কথা বলব।'

ভোলানাথ আজ আর কোথাও বের হল না। কিন্তু নিজের বারান্দায় বসেও শান্তি নেই। দফায় দফায় লোক আসছে। হরেক রকম জিজ্ঞাসা আর পরামর্শ। কিন্তু কোনওটাই ভোলানাথের মনে ধরল না। এইসব বিষয়ে ঠাকুর্দার এখন আর কোনও আগ্রহ আছে কিনা সেটা ভোলানাথ বুঝতে পারছে না। যদি একবার রেগে যান তা হলে সাতদিন পর্যন্ত এই ‘সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎকার’ বন্ধ থাকবে। সে আবার আর এক বিপদ। তবুও আবাসনের বিপদে এইটুকু ঝুঁকি তাকে নিতেই হবে। ভোলানাথ লক্ষ করল আবাসনের ঘরের বাতিগুলো রাত দশটার মধ্যেই নিভে যেতে লাগল। অন্যদিন রাত সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত কারও কারও ঘরের জানলায় বাতি দেখা যায়। এসব যে ভয় পাওয়ার লক্ষণ তা ভোলানাথ বুঝতে পারে। গিরির নেতৃত্বে স্পেশ্যাল পাহারার ব্যবস্থা হলেও ভোলানাথ জানে এটা তেমন কিছু নয়। লোকটা তো টাকা নিতে এই ভূতনাথ আবাসনে আসবে না। মঙ্গলবার রাত দশটায় সে অপেক্ষা করবে তিন নম্বর রেলগেটের কাছে। ওই জায়গাটা এমনিতেই নির্জন। রাত আটটার পর পথচারী প্রায় থাকেই না। দু’পাশে জলাজমি আর জঙ্গল। মাঝেমধ্যে কিছু লরি যাতায়াত করে।

ভোলানাথের ভাবনা বেড়েই চলে। ভোলানাথ লক্ষ করে দেখেছে, রোগযন্ত্রণা আর ভাবনা, বিশেষ করে দুশ্চিন্তা, রাত হলেই বাড়তে থাকে। এরই মধ্যে গিরি এসে একবার বলে গেল, ‘ঠাকুর্দার কাছে কথাটা একবার পেড়ে দেখবেন। যদি দয়া করে কিছু বলে দেন।'

গিরির বিশ্বাস, একমাত্র নাতিকে কিছু না কিছু একটা বলবেনই। গিরির মধ্যেও চিন্তা হচ্ছে তার গুরুকে নিয়ে। গুরুর সম্মান তার কাছে বড় কথা। ভোলানাথ সতর্ক করে দিয়ে বলল, ‘রাত একটার আগে আমার খোঁজ করবি না।

গিরি এল একটা বাজার পরেই। গুরুর দিকে তাকিয়ে বুঝল গুরু চিন্তিত। কপালে ভাঁজ। ভাঁজ আর সোজা হয় না। মনে মনে শঙ্কিত হয়ে গিরি ভাবল, তবে কি ঠাকুর্দা কিছুই বলেনি! নাতিকে ফিরিয়ে দিল। এতদিনের সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎকারের এই ফল।

একটুক্ষণ চুপ করে থেকে গিরি বলল, ‘গুরু, উনি কি কিছুই বলেননি?’ ভোলানাথ উত্তর দিল, ‘একটা কিছু বলেছেন বটে, কিন্তু কী যে বলেছেন সেটাই বুঝতে পারছি না।'

গিরি অবাক গলায় বলল, 'সে কী গো ! এমন বলা বললেন যে, তুমি বুঝতে পারলে না?’ ভোলানাথ বলল, 'না।'

গিরি আবার প্রশ্ন করল, ‘যাই হোক কিছু তো একটা বলেছেন। সেটা কেমন কথা? কী বলেছেন?’

ভোলানাথ বলল, ‘মনে হচ্ছে সাংকেতিক ভাষায় কিছু বলেছেন। আমার কথা শুনে বললেন, কা-কা দুই ছেড়ে এক ধা/ মা ধরে দূরে যা/ রসুলের নিকা দেখে কা ছেড়ে ঘাস খা। লোকটার লো আগে রাখ।'

গিরি বলল, ‘বাবা, এ যে কঠিন অঙ্ক। এর সমাধান হতে হতে মঙ্গলবার এসে যাবে। তার চেয়ে বরং পুলিশকে বলো ওরা যা পারে করবে। ওদের অনেক বুদ্ধি। তা ছাড়া, বন্দুক-টন্দুক ওদের কাছে থাকে।'

ভোলানাথ বলল, ‘আমাকে আরও একটু ভাবতে দে। মঙ্গলবার হতে একদিন বাকি। ঠাকুর্দার ডায়েরি ঘেঁটে দেখি কোনও সূত্র পাই কি না।’

গিরি চলে গেল। ভোলানাথ বারান্দা ছেড়ে ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল। গিরি দেখল গুরুর ঘরের বাতি জ্বলে উঠল। তার মানে গুরু কাজে বসেছেন।

সোমবার দুপুরেই গিরির ডাক পড়ল। গিরিকে দেখে ভোলানাথ বলল, ‘পেয়ে গেছি। ঠাকুর্দার কথার অর্থ বুঝতে পেরে গেছি।'

গিরি অবাক চোখে তার গুরুকে দেখতে দেখতে বলল, ‘মানেটা কী?'

ভোলানাথ হাসতে হাসতে বলল, 'খুব সোজা। ওই কথাটার মানে আমাদের কালোমানিক।'

গিরি গুরুর পায়ের কাছে বসে পড়ে বলল, ‘কালোমানিক কোন হিসেবে হল?’ বলল, ‘কা-কা দুই ছেড়ে এক ধা’— মানে দুটো কা-কা-র মধ্যে একটাকে

ভোলানাথ ধারণ কর। মা ধরে দূরে যা, মানে ‘মা’ শব্দটা ধর। রসুলের নিকা দেখে কা ছেড়ে ঘাস খা। অর্থাৎ তিন নম্বর রেলগেট ওই জায়গাটার পুরনো নাম রসুলগঞ্জ। নিকা দেখে ঘাস খা। ঘাস কে খায়? গোরু। এবার লোকটা ‘লো’ আগে রাখতে বলছে। এবার দ্যাখ কালোমানিক হয়ে গেল। ‘নিকা’র কা ছাড়তে বলেছে।'

সাংকেতিক অর্থের সমাধান হয়ে যাওয়ার পর গিরি বলল, ‘কিন্তু এই কেসে আমাদের কালোমানিক কী করবে?’

ভোলানাথ বলল, ‘করবে না, করাতে হবে। কী করাব, কেমনভাবে করাব, সেটাই ঠান্ডা মাথায় প্ল্যান করতে হবে। তুই একটু লেবু চা বানা। আমি প্ল্যান কষতে থাকি।'

সোমবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত ভোলানাথ তার সাধের কালোমানিককে নিয়ে যত্রতত্র ঘুরল। সন্ধে হওয়ার পর গিরিকে বলল, ‘আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত আমার ঘরে থাকিস। আমি একটু ঘুরে আসছি।'

রাত্রি ন'টা নাগাদ ভোলানাথ আর কালোমানিক ফিরে এল। ভোলানাথের বাড়ির সামনে আবাসনের লোকেরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে। ভোলানাথ সবার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল, “গিরি কালোমানিককে কিছু খেতে দে। বেচারার বড্ড খিদে পেয়েছে।'

ভোলানাথের কথা শেষ হতেই গঙ্গাধর মণ্ডল এগিয়ে এসে বললেন, ‘বাবা ভোলা, তুমি তো দিব্যি তোমার আদরের কালোমানিককে নিয়ে চরে বেড়ােচ্ছ। কিন্তু এদিকে যে আমরা উৎকণ্ঠায় মরছি।'

ভোলানাথ বলল, ‘নতুন কিছু হল নাকি?’

গঙ্গাধর মণ্ডল বললেন, ‘আজ একটু আগে সেই দুর্বিনীত কণ্ঠের লোকটা ঘৃতগন্ধিবাবুকে ফোন করে মনে করিয়ে দিয়েছেন আগামীকাল ঠিক দশটায় যেন টাকাসমেত হাজির থাকেন। পুলিশে খবর দেওয়ার চেষ্টা করলে আমি জানতে পারব। তাতে প্রাণহানির আশঙ্কা।'

ভোলানাথ বলল, ‘প্রাণহানি কেন হবে। আমরা তো পুলিশকে কোনও খবর দিইনি।' ঘৃতগন্ধিবাবু বললেন, ‘তা দিইনি। কিন্তু টাকাটা তো তা হলে দিতেই হচ্ছে। কিন্তু অত টাকা আমি পাব কোথায়?’

ভোলানাথ অভয় দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘যা পারেন ব্যবস্থা করুন। বাকিটা আমি দেখছি আপনি কাল সকালে আমার কাছে একটিবার আসবেন। আমি সব ব্যবস্থা করে দেব।'

আবাসনের লোকেরা চলে গেলেন বটে কিন্তু বেশ বোঝা গেল ভোলানাথের এহেন ব্যবস্থায় তাঁরা কেউই খুশি হননি। সবাই চলে যাওয়ার পর গিরি এসে বসল গুরুর কাছে। আস্তে আস্তে বলল, ‘গুরু, কালকের ব্যবস্থাটা কেমন হবে?’

ভোলানাথ উত্তর দিল, ‘প্ল্যান কষা হয়ে গেছে। ঘৃতগন্ধিদা বাজারের ব্যাগে টাকা নিয়ে যাবে। তুই তার সঙ্গে থাকবি। চার নম্বর রেলগেটের একটু আগে গোটাকয়েক বকুলগাছ আছে। আমি তার যে কোনও একটা গাছে চড়ে বসব। তারপর ঘৃতগন্ধিদা তোকে নিয়ে এগিয়ে যাবে। লোকটা টাকা নিতে এলে ব্যাগটা দেওয়ার আগে দু’-চারটে কথা বলে মিনিট পাঁচ-সাত সময় নিবি। লোকটা যেন বুঝতে না পারে তুই ফালতু বকছিস। ওই পাঁচ মিনিটেই যা হওয়ার হবে। প্ল্যানটা ঘৃতগন্ধিবাবুকেও জানাবার দরকার নেই।'

কথা শেষ করে ভোলানাথ বলল, “গিরি, সিধুর দোকানে জিলেপি ভাজছে?’

গিরি উত্তর দিল, ‘নিশ্চয়ই ভাজছে। কেন, তুমি খাবে?’ ভোলানাথ বলল, ‘কালোমানিককে এট্টু জিলেপি খাওয়া।'

সাতসকালেই ঘৃতগন্ধিবাবু এসে হাজির। ভোলানাথ তখন ব্যায়ামাগারে তার শিষ্যদের কুস্তি শেখাচ্ছে। জনাকয়েক বয়স্ক লোক এই ব্যায়ামাগারে নানারকম আসন শিখতে আসেন। গজাননবাবু আর প্রাণবল্লভবাবু রোজ সকালে ভোলানাথের এখানে আসেন শবাসন শিখতে। আসনে নাকি প্রেসার ঠিক থাকে। ভূতনাথ আবাসনের সবার প্রেসারই এখন কম-বেশি ঊর্ধ্বগামী। প্রায়ই শবাসন করতে করতে গজাননবাবু আর প্রাণবল্লভবাবু ঘুমিয়ে পড়েন। মাঝে মাঝে নাকি তাঁদের নাক ডাকার আওয়াজও অন্যরা শুনতে পান। আজ একটু ঘুমিয়ে পড়লেও নাক ডাকছিলেন না। অন্যদিকে দীনবন্ধু সাঁতরা আর নীলরতনবাবু রোজই বজ্রাসন শিখতে আসেন। কিন্তু বজ্রাসনের প্রস্তুতি নিতে নিতেই সময় চলে যায়, কোনওদিনই আর বজ্রাসন সম্পূর্ণ হয় না। আজও তাঁদের সেই নিত্যকার মতো প্রস্তুতিপর্ব চলছিল। এমন সময় ঘৃতগন্ধিবাবুকে এখানে দেখে সবাই এগিয়ে এলেন। শুধু আসতে পারলেন না গজাননবাবু আর প্রাণবল্লভবাবু। কারণ, তাঁরা ঘুমিয়ে পড়ায় ঘৃতগন্ধিবাবুর উপস্থিতিই টের পাননি। ।'

ভোলানাথ এগিয়ে আসতেই ঘৃতগন্ধিবাবু বললেন, ‘আজ সেই অভিশপ্ত মঙ্গলবার ভোলানাথ বলল,

‘জানি।'

ঘৃতগন্ধিবাবু বললেন, ‘হাজার পঁচিশেক কুড়িয়ে বাড়িয়ে জোগাড় হয়েছে। এসব কেসে কি ইনস্টলমেন্ট চলে?’

ভোলানাথ উত্তর দিল, ‘বোধহয় চলে না। তবে টাকা নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। একটা দামি বাজারের ব্যাগ জোগাড় করুন, নয়তো কিনুন। কিনে ব্যাগটা আমাকে দেবেন। তারপর যখন যেতে হবে তখন আপনাকে খবর দেব।'

ঘৃতগন্ধিবাবু বললেন, ‘এখন আমি কী করব?

ভোলানাথ বলল, ‘রোজ এই সময় যা করেন তাই করবেন। আমি খবর পাঠালে চলে আসবেন।'

দুপুরের পর ভূতনাথ আবাসনের লোকেরা ভোলানাথের খোঁজ করতে এসে দেখল ভোলানাথ নেই। ভোলানাথ, গিরি, এমনকী কালোমানিক, কেউ নেই। কেউ একজন বলল, ‘ভোলা কি কেটে পড়ল?’

অন্যজন বলল, ‘তিনপুরুষের ভিটে ছেড়ে ভোলা যাবে কোন চুলোয়?’

নানা লোকে নানা কথা বলে আর ঘৃতগন্ধিবাবু কেঁপে কেঁপে ওঠেন। কিন্তু ভোলানাথ ছাড়া তাঁর আর কোনও গতি নেই বলে তিনি ঘরের মধ্যে পায়চারি করেন, না হয় খাটে শুয়ে পড়েন। মনে মনে অপেক্ষা করেন, কখন ভোলানাথের ডাক আসবে। ঘন ঘন ঘড়ির দিকে তাকান আর থেকে থেকে জানলা দিয়ে বাইরে উঁকি মেরে দেখেন খবর দেওয়ার লোক আসছে কি না। এরকম একটা দুঃসময়ে কারও মাথাই ঠিক থাকে না। থাকতে পারার কথাও নয়। ঘৃতগন্ধিবাবুর বাড়িতে আজ আর রাতের রান্নার আয়োজন নেই। কেই বা করবে। স্ত্রী চন্দনা চন্দর তো শরীর হিম হয়ে আসছে। তাঁর কেবলই মনে হচ্ছে পুরো টাকার ব্যবস্থা না থাকলে ওই দুর্বিনীত লোকটা হয়তো তার স্বামীকে মারধোর করবে। যে লোকটার কণ্ঠস্বর এত দুর্বিনীত এবং কর্কশ, তার হাতের মার কখনওই কোমল হতে পারে না। হয়তো পেটে ছোরাই ঢুকিয়ে দেবে।

চন্দনা তাঁর স্বামীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হ্যাঁ গো, ওদের হাতে কি অস্ত্র থাকে। যেমন ধরো, ছোরা, রিভলভার এইসব।'

ঘৃতগন্ধিবাবু ভয় পাওয়া গলায় বললেন, ‘থাকতে পারে। এই ধরনের লোকেরা খালি হাতে আসে না।”

চন্দনা এবার জেদের গলায় বললেন, 'তা হলে আমাকেও সঙ্গে নিয়ে চলো।'

ঘৃতগন্ধিবাবু প্রশ্ন করলেন, ‘কোথায়?’

চন্দনা বললেন, ‘ওই তিন নম্বর রেলগেটে।'

ঘৃতগন্ধিবাবু এবার ঈষৎ খেপে গিয়ে বিরক্ত গলায় বললেন, 'আমি কি জামাইষষ্ঠীতে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছি যে, জোড়ে যেতে হবে। তুমি দরজা-জানলা বন্ধ করে ঘরে থাকবে। আমি ছাড়া কারও ডাকে দরজা খুলবে না।'

চন্দনা এবার স্বামীর আরও একটু কাছে এসে বললেন, ‘তোমায় যদি লোকটা মারধোর করে?’

ঘৃতগন্ধিবাবু উত্তর দিলেন, ‘কপালে থাকলে মার খেতে হবে।'

চন্দনা চন্দ-র আবার প্রশ্ন, ‘যদি পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দেয়?’

ঘৃতগন্ধিবাবু হতাশ গলায় বললেন, ‘কপালে থাকলে তাও হতে পারে। হয়তো তিন নম্বর রেলগেটের কাছেই মরে পড়ে থাকব। তোমরা ভোরবেলা গিয়ে আমার বডিটা কালেক্ট কোরো।’

চন্দনা এবার বললেন, ‘সেইজন্যই তো সঙ্গে যেতে চাইছি। বাসি বডির চাইতে টাটকা বডিই তা হলে কালেক্ট করতে পারব।'

একে তো ভয় এবং দুশ্চিন্তা ঘৃতগন্ধিবাবুকে কুরে কুরে খাচ্ছে। তার মধ্যে স্ত্রী চন্দনার এইরকম কথা শুনে রেগে যাওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু স্ত্রীর ওপর রাগ করার মতো শান্তিটুকু এখন তাঁর নেই। তাই তিনি কিছুটা কাতর গলাতেই বললেন, 'তা হলে তুমি একা কেন। আমার ছেলে বাবুনকেও সঙ্গে নিয়ে চলো। ছোরা খেয়ে মরবার সময় বাপের মুখে জল দিতে পারবে।'

ঘৃতগন্ধিবাবু আবার জানলা দিয়ে উঁকি দিলেন। ইতিমধ্যে চন্দনা আবার একবার ঠাকুরঘর থেকে ঘুরে এসে পকেটে আরও দুটো ফুল ঢুকিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘এটাও পকেটে রাখো। বিশরকম ঠাকুরের পায়ের ফুল জোগাড় করেছি। এটা হচ্ছে ঘরের ঠাকুর। এবার হাঁ করে এই চরণামৃতটুকু গিলে ফ্যালো’

চরণামৃত গিলতে গিলতে ঘৃতগন্ধিবাবুর মনে হল, দুপুরের পর থেকে এতরকমের চরণামৃত পেটে পড়েছে যে, পেটে ছুরি বসালে রক্তের বদলে প্রথম দফায় খালি চরণামৃতই কলকল করে বেরিয়ে আসবে। এ ছাড়া গলা, কোমর এবং দুই হাতে অন্তত খান পনেরো মাদুলি বাঁধা হয়ে গেছে। কিন্তু কোনও কিছুতেই ঘৃতগন্ধিবাবু স্বস্তি পাচ্ছেন না।

ঠিক এইরকম সময়েই দরজায় টোকা পড়ল। বেল না বাজিয়ে টোকা দিচ্ছে কে? প্রথমে ঘৃতগন্ধি এবং চন্দনা দু’জনেই শঙ্কিত হলেন। পরে ঘৃতগন্ধিবাবুর মনে হল, হয়তো ভোলানাথ লোক পাঠিয়েছে। স্ত্রীকে বললেন, ‘দরজার আলোটা জ্বেলে দাও। আমি দরজা খুলছি। মনে হচ্ছে ভোলানাথের লোক এসে গেছে।'

ঘৃতগন্ধিবাবু প্রথমে দরজার ছিটকিনি খুললেন। দরজার ডাঁশাটা নামিয়ে দরজা একটু ফাঁক করতেই ঘরের বাতি নিভে গিয়ে ঘরটা বিলকুল অন্ধকার হয়ে গেল। আসলে চন্দনা দরজার বাতি জ্বালাতে গিয়ে উত্তেজনায় আর ভুলক্রমে ঘরের বাসি সুইচ টিপে জ্বলন্ত বাতি নিভিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু প্রাণবল্লভবাবু তো এতশত জানেন না। তিনি ওপরতলার প্রতিবেশী ঘৃতগন্ধিবাবুকে একটু সাহস জোগাতে দেখা করতে এসেছিলেন। দরজা ফাঁক হতেই তিনি ঘরের মধ্যে পা বাড়িয়েছেন আর তখনই ঝুপ করে ঘর অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় ঘৃতগন্ধিবাবুও ভয় পেয়ে দরজা বন্ধ করার চেষ্টা করছেন কিন্তু পারছেন না। পারবেন কেমন করে ! প্রাণবল্লভবাবুর আধখানা শরীর ঘরের মধ্যে ঢুকেছে, বাকি আধখানা দরজার বাইরে। ওই অবস্থায় দরজা বন্ধ হবে কী করে। অন্ধকারে কেউ কাউকে দেখতে না পাওয়ায় এই বিপত্তি। প্রাণবল্লভবাবু দরজার পাল্লা চাপা খেয়ে চ্যাচাচ্ছেন, ‘এটা কার ফ্ল্যাট? বলি এটা হচ্ছে কী?’

অন্ধকারে এই হুড়োহুড়িতে চন্দনার হাতে ধাক্কা লেগে টেবিলের ওপর থেকে চিনেমাটির ফুলদানিটা মেঝেতে পড়ে ঝনঝন শব্দ করে ভেঙে গেল। চন্দনা চন্দও চিৎকার করে উঠে বললেন, 'আমার ঘরের জিনিস ভাঙছে কে?’

প্রাণবল্লভবাবু দরজা চাপা পড়ে কাতর গলায় বলছেন, ‘দরজা ছাড়ুন। মরে যাব যে।' চন্দনা ভয় আর রাগ-মেশানো গলায় বলে চলেছেন, ‘তিন নম্বর রেলগেট ছেড়ে আপনি এখানে এলেন কেন? যান, রেলগেটে গিয়ে অপেক্ষা করুন।'

চন্দনার কথা শুনে ঘৃতগন্ধিবাবুও চিৎকার করে উঠে বললেন, ‘এবার বাছাধনকে বাগে পেয়েছি। ভেবেছ এখান থেকেই টাকা নিয়ে চলে যাবে।'

দরজাটা দু’হাতে চেপে ধরে ঘৃতগন্ধিবাবু, তাঁর স্ত্রীকে বললেন, ‘থানায় ফোন করো। তাড়াতাড়ি করো। বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারছি না। পা কাঁপছে। জলদি ফোন লাগাও। বলো, এখনই গাড়ি নিয়ে চলে আসতে।'

ঘরের বাতি জ্বালার কথা কারও মনে পড়ল না। অন্ধকারে ডায়েরিটা ফোনের কাছ থেকে নিয়ে চন্দনা থানার নম্বর খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু কিছুই দেখা যাচ্ছে না। চন্দনা নম্বরটা মনে করার চেষ্টা করতে করতে স্বামীকে বললেন, ‘নম্বর কত?’

ঘৃতগন্ধিবাবু নম্বরটা বললেন। অন্ধকারেই চন্দনা চন্দ ডায়াল ঘোরালেন। ওদিক থেকে ‘হ্যালো’ শোনামাত্র চন্দনা চঞ্চল কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘দেখুন স্যর, আমি ভূতনাথের ভিটের ভূতনাথ আবাসন থেকে বলছি। ফ্ল্যাট নম্বর দুই-বাই-চার। মানে দোতলার চার নম্বর ফ্ল্যাট। আমার নাম মিসেস চন্দনা চন্দ। গাড়ি নিয়ে চলে আসুন। আসছেন তো? প্লিজ, দেরি করবেন না।

ফোন নামিয়ে রেখে চন্দনা বললেন, ‘আসছে। গাড়ি নিয়ে আসছে। এবার মজা দেখাব। তুমি চেপে ধরে রাখো।'

ঘৃতগন্ধিবাবু বললেন, ‘একা পারছি না। তুমিও হেল্প করো। ঘরে আর-একটা পুরুষ মানুষ থাকলে ব্যাটাকে বস্তায় ঢুকিয়ে বেঁধে রাখতাম।'

প্রাণবল্লভবাবুর অবস্থা অতীব শোচনীয়। কাঠের দরজার মধ্যে তার আধখানা শরীর। এবার দু’জনের চাপে তার কথা বলার শক্তিও ফুরিয়ে গেল। কেবলই গোঙাতে লাগলেন। দরজার পাল্লার চাপ যে এমন ভয়ংকর সে অভিজ্ঞতা ইতিপূর্বে প্রাণবল্লভবাবুর হয়নি। প্রতিবেশীকে সাহস জোগাতে এসে তিনিই এখন শহিদ হতে চলেছেন। ব্যাপারটা কতদূর পর্যন্ত গড়াত কে জানে। কিন্তু গিরি এসে পড়ায় ঘটনাটা আর গড়াল না। ঘৃতগন্ধিবাবু অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাইলেন। চন্দনা চন্দও স্বামীর সঙ্গে গলা মিলিয়ে বারংবার ক্ষমা চাইতে লাগলেন। কিন্তু প্রাণবল্লভবাবুর শরীরের যা কাহিল অবস্থা তাতে ক্ষমা করবার মতো অবস্থাও নেই। গিরি তাকে ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে ফ্ল্যাটে দিয়ে এলেন। প্রাণবল্লভবাবুর স্ত্রী একটি বেসরকারি স্কুলে সংস্কৃত পড়ান। তিনি স্বামীকে দেখে আঁতকে উঠে বললেন, ‘তোমার এইরূপ দশা কী প্রকারে হইল। লঙ্কাকাণ্ডে অথবা ঘটোৎকচ বধে কিংবা অধুনা কারগিলেও তো এমন হয় নাই। তোমার অর্ধ অঙ্গে কোন পিশাচ এইরূপ লাঞ্ছনা দিল।'

প্রাণবল্লভবাবু কাতরাতে কাতরাতে বললেন, 'বৃথা বাক্যব্যয় না করিয়া দ্রুত ডাক্তার ডাকো। সময়ে-অসময়ে অত মাস্টারনি সাজিতে হইবে না।'

ওদিকে গিরি ততক্ষণে কম্পিত ঘৃতগন্ধিবাবুকে নিয়ে তিন নম্বর রেলগেটের দিকে রওনা দিচ্ছে।

কিছু পথ আমবার পর দেখা গেল সৎকার সমিতির একটা গাড়ি বড় রাস্তা থেকে ভূতনাথ আবাসনের দিকে যাচ্ছে। গাড়িটা গিরিকে দেখে একটু গতি কমাল। ড্রাইভারের পাশে বসা

লোকটা জিজ্ঞেস করল, ‘দাদা, এটাই তো ভূতনাথ আবাসনে যাওয়ার রাস্তা।

গিরি বলল, ‘হ্যাঁ। কোথায় যাবেন?’

লোকটি উত্তর দিল, ‘ফ্ল্যাট নম্বর দুই-বাই-চার। মিসেস চন্দনা চন্দ।'

গিরি মাথা নাড়তেই গাড়িটা চলে গেল। ঘৃতগন্ধিবাবু বললেন, ‘কার নাম বলল?’ গিরি হাঁটতে হাঁটতে উত্তর দিল, ‘মিসেস চন্দনা চন্দ।'

ঘৃতগন্ধিবাবু বললেন, ‘ওটা তো আমার বউয়ের নাম। আমার বাড়িতে সৎকার সমিতির গাড়ি যাচ্ছে কেন? ও গিরি, ও গাড়ি আমার বাড়িতে কেন?’

গিরি নিজের হাতঘড়ি দেখে বলল, 'ওসব পরে ভাবা যাবে। পা চালিয়ে চলুন। সময় নেই।'

তিন নম্বর রেলগেটের কাছাকাছি এসে ঘৃতগন্ধিবাবু হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন। গিরির দিকে তাকিয়ে ফিসফিসে গলায় বললেন, 'বাবা গিরি, তোমার হাতে যে ব্যাগ তাতে পুরো এক লাখ আছে তো?

গিরি ব্যাগটা ডান হাত থেকে বাঁ হাতে নিয়ে উত্তর দিল, ‘ওসব আপনাকে ভাবতে হবে না। নিজেকে শক্ত করুন।'

ঘৃতগন্ধিবাবুর কণ্ঠস্বর সকাল থেকেই অন্যরকম হয়ে গেছে। শব্দ বেরোতেই চায় না। তিনি কোনওরকমে বললেন, ‘দেহে-মনে শক্তি থাকলে তো শক্ত হব। আমার যে বড্ড পেট গোলাচ্ছে।'

গিরি বিরক্ত গলায় বলল, ‘পেট গোলাচ্ছে মানে? সকাল থেকে কিছু খাননি? একদম খালি পেট নাকি?'

ঘৃতগন্ধিবাবু সন্তর্পণে খুকখুক করে কাশলেন। তারপর বললেন, ‘একেবারে খালি পেট তা কেমন করে বলি। ঠাকুরের প্রসাদ হিসেবে খানকয়েক নকুলদানা, গোটা দুই বাতাসা আর দেদার চরণামৃত পেটে জমা আছে।'

গিরি বলল,.‘যা জমা আছে তা জমিয়ে রাখুন। এখন যেন পায়খানা না পায়।

ঘৃতগন্ধিবাবু আরও কাহিল গলায় বললেন, ‘বেশি ভয় পেলে আমার তো ওটাই পায়। এখন একটু একটু পাচ্ছে।'

গিরি এবার ধমক দেওয়ার মতো করে বলল, ‘ওসব চলবে না। চেপে রাখুন।'

তিন নম্বর রেলগেটের কাছটা বেজায় অন্ধকার। এদিকের রাস্তাতেও কোনও আলো নেই। কোনওকালে ছিল কি না তাও ঘৃতগন্ধিবাবু জানেন না। রাস্তার দু'পাশে ঝাঁকড়া মাথাওলা অনেক রকম গাছগাছালি থাকায় অন্ধকার আরও ঘন হয়ে গেছে। ঘৃতগন্ধিবাবু ভয়ে ভয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে গিরির পেছনে পেছনে আসছেন। গিরি এবার দাঁড়াল। ফিসফিস করে ঘৃতগন্ধিবাবুকে বলল, ‘ঠিক জায়গায় এসে গেছি।'

ঘৃতগন্ধিবাবু অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে গিরির একটা হাত ধরে বললেন, 'আমরা তো এসে গেছি। কিন্তু তিনি কি এসেছেন?’

গিরি নিজের হাতঘড়িটা চোখের সামনে তুলল কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। মনে মনে সময়ের হিসেব করে নিয়ে বলল, ‘বোধ হয় দশটা বাজেনি। বাজলেই এসে যাবে। এখন চুপ করে দাঁড়ান।'

গিরি রেলগেটের দিকে পেছন ফিরে রাস্তার দু'পাশে তাকাল। তার গুরু যে কোন গাছে চড়ে বসে আছে সেটা বোঝার উপায় নেই। গুরুর সঙ্গে কালোমানিকেরও আসবার কথা। তাকে এই অন্ধকারে খুঁজে পাওয়া মানুষের সাধ্যের বাইরে। অন্ধকারের সঙ্গে ওর গায়ের রং মিশে যায়। ভূতনাথ আবাসনের অনেক লোক লোডশেডিং-এর রাতে শায়িত কালোমানিকের গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। যার জন্য গুরুর নির্দেশে লোডশেডিং হলেই গিরি হাঁক পেড়ে ডাকে, ‘কালোমানিক ঘরে আয়।'

সাবধানতার জন্য ইদানীং কালোমানিকের গলায় পেতলের ছোট্ট একটা ঘণ্টা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। যাতে চলাফেরার সময় লোকেরা বুঝতে পারে কালোমানিক আসছে।

ওরা দু'জনে তিন নম্বর রেলগেটের কাছে অপেক্ষা করতে থাকে। যদিও এটা নামে রেলগেট, কিন্তু সত্যিকারের কোনও গেট নেই। কোনও লরি বা গাড়ি এসে খোলা গেটের সামনে দাঁড়ায়। কেউ একজন নেমে দু’পাশ দেখে হাতের ইশারা করলে তবে গাড়ি লাইন পেরোয়। এই খোলা গেটে কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনও দুর্ঘটনার খবর নেই। অন্তত গিরি জানে না।

ওরা দু’জনে প্রায় দশ মিনিট ধরে অপেক্ষা করছে, এর মধ্যে একটা গাড়িকেও ওরা এই পথে যেতে দেখেনি। ঘৃতগন্ধিবাবু বললেন, ‘গিরি, আর কতক্ষণ? আমার যে পা কাঁপছে। দাঁড়াতে পারছি না। ওদিকে মানে পেটের অবস্থাও তেমন সুবিধের নয়।'

গিরি বলল, ‘তা হলে চেপে বসুন। আমাদের তো অপেক্ষা করতেই হবে।'

একটু পরে রাস্তার ওপর আলো দেখা গেল। গিরি বলল, ‘মনে হচ্ছে কোনও গাড়ি আসছে।'

গিরি পকেট থেকে ছোট্ট একটা টর্চ বার করে জ্বালল। জ্বেলেই নিভিয়ে দিয়ে বলল, ‘চলুন ওই গাছটার পেছনে যাই। কোনও শব্দ করবেন না।’

ঘৃতগন্ধিবাবু বললেন, ‘আমার যে কাশি পাচ্ছে।'

গিরি এবার ধমকের গলায় বলল, ‘চেপে থাকুন।'

ঘৃতগন্ধিবাবুর গলা জলে-ডোবা মানুষের মতো অসহায় এবং বিপন্ন। সেইভাবেই বললেন, ‘এত জিনিস কি একসঙ্গে চাপা যায় গিরি।'

গিরিও সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘অসময়ে আপনার এত জিনিস পায়-ই বা কেন? আপনি অত্যন্ত বে-আক্কেলে লোক। আমার পিসেমশাইয়ের মতো। নৌকোয় উঠে মাঝগঙ্গায় গেলেই তাঁর ওসব পেত। নৌকো থেকে কি গঙ্গার বুকে ওইসব করা যায়!’

গিরির ধমক খেয়ে ঘৃতগন্ধিবাবু চুপ করে গেলেন। গাছের আড়াল থেকে ওরা দেখল এবড়ো-খেবড়ো রাস্তার ওপর গাড়ির হেডলাইটের আলোটা জোরালো হয়েছে। তার মানে গাড়িটা বেশ কাছাকাছি এসে গেছে। ঘৃতগন্ধিবাবু জীবনে এদিকে আসেননি। আজই অন্ধকারে হোঁচট খেতে খেতে এসেছেন। এসেছেন মানে আসতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি গিরিকে বললেন, ‘ভাই গিরি, প্রবল ভূমিকম্প হয়ে পথঘাট, বাড়ি সব ওলটপালট হয়েছিল তো লাতুরে। কাগজে ছবি দেখেছি। তিন নম্বর রেলগেটের রাস্তাতেও তার প্রতিক্রিয়া হয়েছিল?’

গিরি বলল, ‘আপনি কেমন লোক, একবার বলছেন ‘বাবা গিরি’ এখন বলছেন ভাই গিরি। বাপ-ভাই যে গুলিয়ে ফেলছেন।'

ঘৃতগন্ধিবাবু বললেন, ‘পেট গোলালে কি মাথার ঠিক থাকে বাবা।’

গিরি ফিস করে একটু আওয়াজ করে বলল, 'চুপ।'

একটা ত্রিপল ঢাকা দেওয়া লরি আস্তে আস্তে এসে রেলগেটের কাছে দাঁড়াল। হেডলাইটের আলোয় রেললাইনটা চকচক করছে। ড্রাইভারের পাশ থেকে কে একজন লাফ দিয়ে নামল। ঘৃতগন্ধিবাবু শঙ্কিত গলায় বললেন, ‘ব্যাটা টাকা নেওয়ার জন্য লরি নিয়ে এসেছে। ছোরাটোরাগুলো কি কোমরে গুঁজে রেখেছে?’

গিরি কোনও উত্তর দিল না। লোকটা নেমে যেতেই লরিটা আস্তে আস্তে লাইন পেরিয়ে চলে গেল। লোকটা আর লরিতে উঠল না। গিরি প্রথমে ভেবেছিল, লোকটা বুঝি ড্রাইভারের সহকারী। সিগন্যাল দেখতে নেমেছে। কিন্তু এবার মনে হল, না এই হচ্ছে সেই লোক। কিন্তু লোকটা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কিছু একটা করছিল। কী করছিল সেটা বোঝা গেল না। গিরি ঘৃতগন্ধিবাবুকে নিয়ে গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। পেছনদিক থেকে এবার কা-কা শব্দে তিনবার কাকের ডাক শোনা গেল। গিরি জানে, এটাই গুরুর সংকেত। তার গুরু একসময় মাস্টার রেখে হরবোলা শিখেছিল। সেই বিদ্যে নানা সময় অনেক কাজে এসেছে। গিরি তার গুরুর কাছ থেকে শুধু কুকুর আর বেড়ালের ডাক রপ্ত করেছিল। গিরি হাতের ব্যাগটা ঘৃতগন্ধিবাবুর হাতে দিয়ে বললেন, ‘এটা ধরুন।’

ঘৃতগন্ধিবাবুর শরীর কাঁপছে। তিনি বললেন, ‘রাতে কাকের ডাক অত্যন্ত অমঙ্গলজনক। আসবার সময় দেখলাম, মিসেস চন্দনা চন্দর কাছে সৎকার সমিতির গাড়ি যাচ্ছে। মানে ওই লোকটাই আমার বডি নেওয়ার জন্য আগেভাগে আমার বউয়ের নাম করে গাড়ি ডেকেছে।'

গিরি বলল, চুপ করুন। এবার শুরু হচ্ছে আসল খেলা। আমরা এখন খতরো কা খিলাড়ি।'

ঘৃতগন্ধিবাবু কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আমি যে বাবা আনাড়ি।'

গিরি ঘৃতগন্ধিবাবুকে নিয়ে গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামল। আবার কাকের ডাক শোনা যেতেই গিরি টর্চ জ্বেলে বলল, ‘আমরা হাজির।'

মুখে কালো কাপড় বাঁধা একটা লোক এগিয়ে এসে বলল, 'আপনারা

ঘৃতগন্ধিবাবু কাঁপতে কাঁপতে হাত তুলে নমস্কার করে বললেন, ‘আমি ঘৃতগন্ধি চন্দ। আপনার টেলিফোন পেয়ে...’

ঘৃতগন্ধিবাবুকে কথা শেষ করতে না দিয়ে লোকটা বলল, ‘টাকা এনেছেন?’

ঘৃতগন্ধিবাবু বললেন, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ।'

লোকটা প্রশ্ন করল, ‘পুরো টাকা আছে

কে?’

তো?

ঘৃতগন্ধিবাবু গিরির দিকে তাকাতেই গিরি বলল, “হ্যাঁ স্যর। আপনি গুনে দেখতে পারেন।'

লোকটা বলল, ‘অত টাকা গোনার সময় নেই। কিন্তু আপনি কে?

ঘৃতগন্ধিবাবু বললেন, ‘ও হচ্ছে গিরি। সম্পর্কে আমার ভাইপো।'

লোকটা বলল, ‘কেমন ভাইপো? আপনার তো কোনও ভাইপো নেই।' ঘৃতগন্ধিবাবু বললেন, 'আপনি নয়। আমি ওর কাকাতো কাকা।’

লোকটা বলল, ‘সেটা আবার কেমন জিনিস?'

এবার গিরি এগিয়ে এল। গুরু তাকে পাঁচ-সাত মিনিট সময় নিতে বলেছেন। অতএব সে বলল, ‘স্যর, আমি আপনাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি। আমার কাকা স্বর্গীয় হরধনু হালদার এবং ঘৃতগন্ধিবাবুর কাকা মধুগন্ধ এবং তাঁদের মামাতো মামা সৌগন্ধবাবু এদের মধ্যে আত্মীয়তার নিবিড় সম্পর্ক ছিল। হরধনুবাবু যখন ধনুষ্টংকার রোগে হুমড়ি খেয়ে মারা গেলেন তখন মধুগন্ধবাবু আর সৌগন্ধবাবু দু’জনে মিলে আমাকে দত্তক নিলেন। সেই সুবাদে

লোকটা রুষ্ট গলায় গিরিকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘অত বংশ বৃত্তান্ত আমার জানার দরকার নেই। ওই ধনুষ্টংকার রোগটা কী থেকে হয়?’

গিরি বলল, ‘স্যর, রোগটার নাম কেউ কেউ জানে, কিন্তু কীসে থেকে হয়তো সেটা অনেকেই জানে না। আপনার এই যে জানবার ইচ্ছে সেটা কিন্তু আপনার জ্ঞানপিপাসার লক্ষণ। ধনুষ্টংকার হচ্ছে ধনুক নিয়ে খেলা করতে করতে টংকার অর্থাৎ চিৎকার করে উপুড় হয়ে পড়ার নামই ধনুষ্টংকার। এই রোগটা আসে পেট এবং পাকস্থলি থেকে।'

লোকটা বলল, ‘ব্যস, ব্যস, ওতেই হবে। আপনারা কে কার আত্মীয়, কে কোন রোগে মরল, তা জানার আমার দরকার নেই। টাকা দিন।'

গিরি বলল, ‘স্যর, টাকা এবং মালপোয়া দুটোই আপনার জন্য এনেছি। আমাদের ভূতনাথ বাজারে সিধুদা যা মালপোয়া ভাজে না, অমন জিনিস এশিয়াতে পাবেন না। সিধুদার বাবা দ্বারকাজ্যাঠা ছিলেন প্রাইজ পাওয়া কারিগর। তাঁর মালপোয়া বিদেশে যেত উড়োজাহাজে চেপে।'

লোকটা এবার ধমক দিয়ে উঠে বলল, ‘ফালতু কথা শোনবার সময় আমার নেই। টাকা দিন। ব্যাগটা কোথায়?'

গিরি মনে মনে ভাবছে পাঁচ-সাত মিনিট বোধহয় হয়ে গেছে। গুরু কখন দেখা দেবে। ঘৃতগন্ধিবাবু ব্যাগটা আগের কথামতো গিরির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘বাবা গিরি, তুমিই ওঁর হাতে ব্যাগটা তুলে দাও।'

গিরি বাঁ হাতে ব্যাগটা নিয়ে ডান হাত পকেটে ঢুকিয়ে কিছু একটা বার করল। অন্ধকার বলে কেউ কিছু দেখতে পাচ্ছে না। ব্যাগটা দিতে যাওয়ার মুখে বলল, ‘না কাকু। হাজার হোক, আপনি আমার সাক্ষাৎ কাকাতো কাকা। নিজের সৎ রোজগারের টাকা মহাপুরুষের হাতে আপনিই তুলে দিন।'

আগে শেখানো ছিল তাই ঘৃতগন্ধিবাবু বললেন, ‘না না, তা হয় না। এই শ্রদ্ধার্ঘ্য তোমার হাত দিয়েই দিতে চাই। তুমি তো আমার সন্তানতুল্য।'

লোকটার যেন ধৈর্যচ্যুতি ঘটে গেল। কর্কশ গলায় ধমক দিয়ে বলে উঠল, ‘কী ন্যাকামি হচ্ছে। যে কোনও একজন দিলেই হবে। দিন।'

লোকটা অন্ধকারে হাত বাড়াল। গিরি অন্ধকারেই ব্যাগটা তার হাতে দিতেই লোকটা বলল, ‘ব্যাগের হ্যান্ডেলটা এমন আঠা আঠা কেন?’

গিরি বলল, ‘বোধ হয় মালপোয়ার রস লেগে গেছে।'

লোকটা বলল, ‘আমি মালপোয়া চাই না। টাকা চাই।' গিরি বলল, 'স্যর, টাকাটা ওই ব্যাগেই আছে। মালপোয়া হাঁড়িতে।'

লোকটা অন্ধকারে ব্যাগটা ধরে বলল, ‘এক লাখ টাকার এত ওজন?’

গিরি বলল, ‘কেন হবে না স্যর। মানুষের চাইতে টাকার ওজনই তো বেশি। তা ছাড়া টাকাটা আছে একটা কাঠের বাক্সে। তা ছাড়া ওর মধ্যে রয়েছে মালপোয়ার হাঁড়ি। ওটা হল দানের দক্ষিণা।'

লোকটা ‘ঠিক আছে’ বলে রওনা দিতে যাচ্ছিল। তখনই অন্ধকার জঙ্গলের ভেতর থেকে ঘণ্টাধ্বনি এগিয়ে আসতে লাগল। গিরি ব্যাপারটা বুঝতে পেরেও বলল, ‘এই নির্জন অন্ধকারে ঘণ্টা বাজায় কে?’

ঘৃতগন্ধিবাবু তো সত্যি কিছু জানেন না। তাই তিনি বললেন, ‘জঙ্গলের মধ্যে কোনও মন্দির-টন্দির নেই তো। মঙ্গলবার অমাবস্যায় সেখানে হয়তো পুজো হচ্ছে। নরবলিও হতে পারে।'

যেদিক থেকে ঘণ্টাধ্বনি এগিয়ে আসছিল ওরা তিনজনেই সেই দিকে তাকাল। ঘৃতগন্ধিবাবু আর লোকটা দেখল বিচিত্র একটা দৃশ্য। কালো অন্ধকারে দুধের মতো সাদা দুটো ডাণ্ডা এগিয়ে আসছে। ওই সাদা ডাণ্ডার নীচে জ্বলজ্বল করছে দুটো চোখ। গিরি ‘ওরে বাবা রে’ বলে লোকটাকে জড়িয়ে ধরল। লোকটা বলল, ‘ওটা কী?

গিরি বলল, ‘জানি না স্যর।'

ঘৃতগন্ধিবাবুও লোকটাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে বললেন, ‘এ কে রে বাবা।

এবার তীব্র একটা শিসের আওয়াজ। সেইসঙ্গে নাকিসুরে ছড়ার মতো কে যেন খনখনে গলায় বলতে লাগল, ‘অন্ধকার ধন্ধ পুরি/ মাঠের পরে নামল বুড়ি/ বুড়ির মাথায় জটার ছটা/ তার পরে কালো মানিক গাঁথা। হই হই হুররে।'

অন্ধকারে যে বস্তুটিকে এগিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছিল সে এবার দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসতেই গিরি আর ঘৃতগন্ধি লোকটাকে সামনে ঠেলে দিল। টর্চের জোরালো আলো চারপাশ ঘুরে লোকটার চোখের ওপর পড়ল। এবার ভোলানাথের কণ্ঠস্বর শোনা গেল। ‘কালোমানিক, অ্যাকশন’

সঙ্গে সঙ্গে কালোমানিক দুই শিং দিয়ে লোকটার প্যান্টের বেল্টসহ শূন্যে তুলে ধরলা লোকটা ঝুলছে অথচ ব্যাগটা হাতছাড়া করেনি। লোকটার হাত থেকে ব্যাগটাও তারই মতো শূন্যে ঝুলছে।

ঘৃতগন্ধিবাবু এবার মনে একটু জোর পেয়ে বললেন, ‘চমৎকার। জয় বাবা ভোলানাথ। জয় বিপদবন্ধু কালোমানিক। লোকটা কদর্য লোভী। ব্যাগটা হাতছাড়া করেনি।'

গিরি বলল, ‘করবার উপায় নেই। ব্যাগের হ্যান্ডেলে গরাল গাছের আঠা মাখানো আছে। যে-কোনও কেমিক্যাল আঠার ঠাকুর্দা। ব্যাগের হ্যান্ডেল না কাটলে ওইরকমই ঝুলে থাকবে।' টর্চের আলোয় এবার সবই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ঘৃতগন্ধিবাবু বললেন, ‘কালোমানিকের শিং দুটো অত সাদা হল কেমন করে ভোলা?’

ভোলানাথ উত্তর দিল, ‘হয়নি, করতে হয়েছে। অন্ধকারে ওকে তো দেখা যাবে না, কিন্তু দুধ-সাদা শিং দুটো খালি এগিয়ে আসবে। সেইসঙ্গে গলার ঘণ্টা। একটা মানুষের ভয় পাওয়ার পক্ষে এটাই যথেষ্ট। তাই শিং দুটোকে হোয়াইট করে দিয়েছি। পাকা রঙে। রোদ জলে নষ্ট হবে না। এবার থেকে লোডশেডিং হলে আপনারাও বুঝতে পারবেন কালোমানিক আসছে।'

কালোমানিকের শিঙের ওপর ঝুলতে ঝুলতে লোকটা বলল, ‘আমাকে নামাবার ব্যবস্থা করুন। এভাবে ঝোলাই ওয়াশ করলে আমি তো মরে যাব।'

ভোলানাথ বলল, ‘একটু অপেক্ষা করো বাবা। ঠিক সময়ে এসে সরকারি লোকেরা তোমাকে নিয়ে যাবে।

এবার দেখা গেল আলো জ্বালিয়ে পুলিশ জিপ এসে দাঁড়াল কালোমানিকের সামনে। ভোলানাথ বলল, ‘কালোমানিক, নামিয়ে দে।'

ব্যাগশুদ্ধ নামানো হল। পুলিশ অফিসার বললেন, ‘ব্যাগে কত টাকা আছে?’ ভোলানাথ বলল, ‘একটাও টাকা নেই। আছে কাঠের বাক্স আর এক হাঁড়ি ঘুঁটে। ওটাই লোকটার মালপোয়া।'

একই গাড়িতে ভোলানাথ, গিরি আর ঘৃতগন্ধিবাবু এলেন। আসতে আসতে পুলিশ অফিসার বললেন, ‘আপনাকে ধন্যবাদ ভোলানাথবাবু। যে লোকটাকে ধরিয়ে দিলেন এ হচ্ছে একটা ক্রিমিনাল। জেল থেকে পালিয়েছিল। পুলিশ ওকে খুঁজছে। ওর ভাল নাম গোপীচাঁদ। ডাকনাম গেঁড়ি।'

ভোলানাথ বলল, “ঠিকই আছে। গেঁড়ি নাম তো, তাই গুগলি দিয়ে আউট করলাম।' ভূতনাথ আবাসনের মোড়ে ভোলানাথ, গিরি আর ঘৃতগন্ধিবাবুকে নামিয়ে দেওয়ার সময় পুলিশ অফিসার বললেন, ‘ভোলানাথবাবু, তাড়াতাড়ি আবাসনে যান। ওখানে সৎকার সমিতির গাড়ি নিয়ে কী একটা ঝামেলা হচ্ছে। আপনি গিয়ে মেটান।'

আবাসনের সামনে ঝামেলা তখন তুঙ্গে। সৎকার সমিতির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ‘এভাবে ডেকে এনে আমাদের হ্যারাস করার অর্থ কী? ডেডবডি নেই। তা হলে আমাদের ন্যূনপক্ষে আসা-যাওয়া বাবদ পেট্রোল খরচটা দিন। কিন্তু মিসেস চন্দ সেটা না দিয়ে খালি অপেক্ষা করতে বলছেন। কে কবে কখন মরবে তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করার নিয়ম নেই। মরবার আগে নয়, খাবি খাওয়ার সময়েও নয়, ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়ার পর খবর দিতে হয়।'

ঘৃতগন্ধিবাবু স্ত্রীকে বললেন, 'তুমি যদি আমার জন্য ওদের অপেক্ষা করতে বলে থাকো, তা হলে তোমার কথা রাখতে আমি ওই গাড়িতে গিয়ে শুয়ে পড়ি।

সৎকার সমিতির লোকেরা বলল, ‘জ্যান্ত লোক তোলার নিয়ম নেই।' এবার ভোলানাথ এগিয়ে এসে বলল, ‘দেখুন, মিসেস চন্দ বোধ হয় অন্য কোনও জায়গায় ফোন করতে গিয়ে ভুল করে আপনাদের ওখানে ফোন করে ফেলেছেন।'

মিসেস চন্দ এবার জোর গলায় বললেন, ‘ঠিক তাই। ঘর অন্ধকার ছিল। পুলিশ স্টেশনে

ফোন করতে গিয়ে অন্ধকারে ভুল করে অন্য নম্বর ঘুরিয়ে ফেলেছি।' ভোলানাথ বলল, ‘তা হলে এক্ষেত্রে কী করণীয়?’

ওঁরা বললেন, ‘এটা সৎকার সমিতির গাড়ি। এর কিছু নিয়ম আছে। আগে আমাদের যাতায়াতের পেট্রোল খরচ এবং গাড়িভাড়া সব মিলিয়ে সাকুল্যে তিনশো তিরিশ টাকা দিতে হবে।'

ভোলানাথ বলল, ‘এটা কিন্তু ঘৃতগন্ধিদা, আপনারই দেওয়া উচিত।'

ঘৃতগন্ধিবাবু বললেন, ‘অবশ্যই। এক লাখের পরিবর্তে তিনশো তিরিশ টাকা তো কিছুই নয়।'

চন্দনা চন্দ টাকাটা ঘর থেকে নিয়ে এসে দিতে দিতে বললেন, ‘দোষ নেবেন না। আমি ছেলেবেলা থেকেই গুছিয়ে কাজ করতে ভালবাসি। আমার স্বামীর আজ জীবন সংশয় ছিল। সেই কারণেই টাকা না দিয়ে অপেক্ষা করতে বলছিলাম। এখন আর সেই দুর্ভাবনা নেই। আপনারাই বলুন, কেই বা চায়, দোরগোড়ায় সৎকার সমিতির মড়া-টানা গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখতে। এটা তো আইসক্রিম, ভেলপুরি অথবা ফুচকার ঠেলাগাড়ি নয়।'

টার্কা নিয়ে সৎকার সমিতির লোক ভোলানাথকে বললেন, ‘দেখুন, সময়মতো না এলে আমাদের গালমন্দ করেন। টাকাটাই সব নয়। গাড়ি খালি ফিরে যাচ্ছে। এটা তো ভাল নয়।'

ভোলানাথ বলল, ‘বুঝতে পারছি দাদা। তবে খালি ফিরতে হবে না। যাওয়ার পথেই সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র তথা হাসপাতাল আছে। ওখানে গেলে নির্ঘাত একটা-না-একটা পাবেন। ওখানটা একটু ঘুরে যান।'

সৎকার সমিতির লোকেরা বলল, ‘ধন্যবাদ। তা হলে ঘুরেই যাই।'

ভূতনাথ আবাসনের সব বাতি আজ জ্বলছে। কালোমানিকের গলায় গাঁদাফুলের মালা। ভোলানাথ বলল, ‘রাত বাড়ছে। আপনারা উৎসব করুন। আমি ঠাকুর্দার সঙ্গে সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎকারটা সেরে আসি।'

.

আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী, ১৪০৭

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%