আঠারো কড়ি

দুলেন্দ্র ভৌমিক

এককড়ি মুখুজ্যের চার ছেলে। আঁতুড়ঘরে জন্মাবার পর এককড়ি নাকি ভীষণ অসুখে পড়েছিল। কবিরাজ, হোমিওপ্যাথি এবং ঘোড়ায় চড়া ফিরিঙ্গিডাক্তার কেউ বাঁচাবার প্রতিশ্রুতি দিতে পারেনি। এরই তিন বছর আগে এককড়ির দাদা নাকি জন্মে তেরাত্রি পেরোবার আগেই আঁতুড়ে মারা যায়। এককড়ির বেলাতেও যখন তেমনটাই ঘটতে যাচ্ছে, তখন গোটা বাড়ি জুড়ে কান্নাকাটি শুরু হয়ে গিয়েছিল।

সেই সময় ধাইমা চপলা বললে, ‘আমার সাত-সাতটা সন্তান ফনফনিয়ে বেড়ে উঠে দিব্যি পাড়া জ্বালাচ্ছে। এই ছেলে আমাকে দাও, এই নাও এক কড়ি। এই কড়ি দিয়ে ছেলে কিনে নিলুম। এবার যমের বেয়াইয়ের সাধ্যি নেই আমার কোল থেকে ছেলে কাড়ে।'

চপলা আঁচল থেকে একটা কড়ি বার করে এককড়ির মা’র হাতে গুঁজে দিয়ে বলেছিল, ‘এই নাও কড়ি। ছেলে এবার আমার। রইল আমার কোলে আঁচল ঢাকা। এবার দেখি, যমের মুরোদ।' এইসব যখন চলছে তখন সদ্যোজাত এককড়ির ছোটমামা খুব সরলভাবে এককড়ির বাবা নিবারণ মুখুজ্যেকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘জামাইবাবু, যমের বেয়াইমশাইয়ের নামটা কী?’

জামাইবাবু যথারীতি উত্তর দেননি। উলটে ছোট শ্যালককে একটি মৃদু ধমক দিয়েছিলেন।

কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এককড়ি কয়েকদিনের মধ্যেই কিন্তু দিব্যি সুস্থ হয়ে গেল। কবিরাজমশাই বললেন, ‘বনস্পতির ব্যাপার তো। বিলম্বে হলেও ফলে।' হোমিওপ্যাথির ডাক্তারবাবু বললেন, ‘রোগটা গোড়াতেই ধরেছিলাম। যতটুকু ওষুধ গিলিয়েছি তাতেই ফল ফলেছে। ওই ঘোড়ায় চড়া ফিরিঙ্গিডাক্তার কী করবে।

ফিরিঙ্গিডাক্তার ঘোড়ার পিঠে চাপড় মেরে বললেন, ‘প্রথমেই যদি আমাকে কল দিত, তা হলে এতটা সাফার করতে হত না। বাট, বেটার লেট দ্যান নেভার।' ফিরিঙ্গিডাক্তারের নাম গজানন ঘোষ। তাঁকে ফিরিঙ্গিডাক্তার বলার একটা কারণ ছিল। গজাননবাবুর চোদ্দো পুরুষের কেউ ফিরিঙ্গি ছিল না। ওঁদের আদি বাড়ি গোবরডাঙায়। ওই অঞ্চলে কখনও কোনও ফিরিঙ্গি ছিল বলে জানা যায় না। গজাননবাবুর বাবা শুভানন ঘোষ জীবিকার সন্ধানে কিছুকাল ব্যান্ডেলে ছিলেন। তারও কিছুকাল পরে গজাননবাবু এক ফিরিঙ্গি মেয়েকে বিয়ে করে ব্যারাকপুরে চলে আসেন। বিয়েতে যৌতুক হিসেবে নাকি একটি ঘোড়া পেয়েছিলেন। অতএব, সাইকেল ছেড়ে বিয়ের পর থেকে ঘোড়ায় চড়ে রোগী দেখতে যেতেন। কেউ কেউ অবশ্য ডাকতেন, ‘গজাডাক্তার’ বলে। তবে গজাডাক্তার সম্পর্কে এসব কথা কতটা সত্য তা আমি বলতে পারব না।

ঘোড়ায় চড়া ব্যাপারটা রপ্ত করতে গজাডাক্তারের বেশ কিছুদিন সময় লেগেছিল। তারপর যখন রপ্ত হয়ে গেল তখন আর কোনও অসুবিধে হত না। ঘোড়া ছুটিয়ে রোগী দেখতে আসতেন। গজাডাক্তারের পোশাকটা ছিল সেকালের ওভারশিয়ারের মতো। পায়ে বুটজুতো, মোজাটা প্রায় হাঁটুর কাছাকাছি। গায়ে হাফশার্ট, মাথায় খাকি রঙের টুপি। সেই টুপি আবার ফিতে দিয়ে বাঁধা থাকত। ঘোড়া থেকে নেমেই চিৎকার করে ডাকতেন, ‘রোগী কোথায়?’

এককড়ি মুখুজ্যের সঙ্গে পরবর্তীকালে গজাডাক্তারের বেশ পরিচয় হয়ে গিয়েছিল। পরিচয় হয়েছিল বটে, কিন্তু তাঁর ছেলেদের জন্মের সময় তিনি গজাডাক্তারের পরামর্শ নিতেন না। এই ব্যাপারে তাঁর গভীর বিশ্বাস জন্মে গিয়েছিল ধাইমা চপলার ওপর। কিন্তু ততদিন পর্যন্ত চপলার বেঁচে থাকার কথা নয়। চপলার বড় মেয়ে তরলা ছিল মায়ের হাতে তৈরি। সুতরাং এককড়ি মুখুজ্যের সন্তান জন্মালেই এককড়িবাবু গোড়া থেকে আর কোনও ঝুঁকি না নিয়ে সরাসরি কড়ি পদ্ধতিতে চলে গিয়েছিলেন। তরলার মাধ্যমে আগে থেকেই লোক ঠিক করা থাকত। সন্তান জন্মালেই কড়ি দিয়ে কেউ না কেউ সন্তান কিনে নিত। সেই কারণেই এককড়ি মুখুজ্যের চার ছেলের নাম ছিল যথাক্রমে দু’কড়ি, তিনকড়ি, পাঁচকড়ি, আর সাতকড়ি।

এককড়ি মুখুজ্যে মারা যাওয়ার সময় ছেলেরা সবাই বেশ বড় হয়ে গেছে। চপলার কড়ির জোর ছিল বলতে হবে। বিরানব্বই বছর পর্যন্ত বেঁচে থেকে তিনি মারা গেলেন। ততদিনে ছেলেরা পুরনো বাড়ি ভেঙে হালফ্যাশনের নতুন বাড়ি তৈরি করে ফেলেছে। বাবার সঙ্গে পরামর্শ করে ছেলেরা বাড়ির নাম রেখেছিল ‘আঠারো কড়ি ভবন’। বাড়ির এমন বিচিত্র নাম কেউ আগে শোনেনি। বাড়ির গেটে বড় বড় করে ওই নামটা লেখা। রাত্রিবেলা গেটে আলো জ্বললে নামটাও জ্বলজ্বল করত।

এই পাড়ায় নতুন এসেছেন গোপালবাবু। রেলের গার্ড ছিলেন। এখন অবসর নিয়ে এখানে বাড়ি করেছেন। কৌতূহল চাপতে না পেরে একদিন দু’কড়ি মুখুজ্যেকে বললেন, ‘দু’কড়িবাবু, যদি কিছু মনে না করেন, তা হলে একটা কথা জিজ্ঞেস করি।'

দু’কড়ি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলল, “মনে করার কিছু নেই। বলুন কী জানতে চান?’ গোপালবাবু বললেন, 'আপনাদের বাড়ির নামটা বড় বিচিত্র। ‘আঠারো কড়ি’ কেন?’

দু’কড়ি মাথা দুলিয়ে হাসতে হাসতে বলল, ‘কৌতূহল থেকেই জ্ঞানের জন্ম। দেখুন আমরা হচ্ছি গিয়ে একান্নবর্তী পরিবার। আমার স্বর্গত পিতৃদেব এককড়ি মুখুজ্যে এই জমিতে বাড়ি করেছিলেন। পরবর্তীকালে আমরা সব ভাই মিলে পুরনো বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি তৈরি করি। অতএব, এই জমি এবং কড়িতে সবারই অবদান আছে। তাই এমন একটা নাম ঠিক করা হল, যাতে সকলেরই ভূমিকা থাকে।'

গোপালবাবু খুব মন দিয়ে কথাগুলো শুনলেন কিন্তু কিছুই বুঝতে পারলেন না। তাই খুব সংকোচের সঙ্গে বললেন, ‘ভারী চমৎকার বলেছেন, কিন্তু আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না।' দু’কড়ি একটু হেসে বলল, ‘এতে লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই। এটা বুঝতে হলে একটু অঙ্ক জানতে হবে। কঠিন অঙ্ক নয়, স্রেফ একটু যোগ। কাগজ-কলম নিন, আমার স্বর্গত পিতা এককড়ি, আমি প্রথম পুত্ৰ দু’কড়ি, মেজোভাই তিনকড়ি, সেজো পাঁচকড়ি, ছোট সাতকড়ি। এবার যোগ দিয়ে দেখুন আঠারো কড়ি হচ্ছে। এই আঠারো কড়ির মধ্যেই আমরা সবাই বিরাজ করছি। তাই বাড়ির নাম ‘আঠারো কড়ি’’

গোপালবাবু একটা ঢোক গিলে বললেন, ‘চমৎকার! আমরা এভাবে কেউ কখনও ভাবি না। এটা একটা দারুণ ব্যাপার।'

দু’কড়ি বলল, ‘হয়তো দারুণ। তবে আমাদের পরিবারে নিদারুণ ব্যাপারও ঘটেছে। আমার বাবার যৌবনকালে ফোটা তোলার তেমন রেওয়াজ ছিল না। মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে আমার মেজোভাই তিনকড়ি তার এক বন্ধুকে নিয়ে এল আমার বাবার একখানা ছবি আঁকাবে বলে। সেই বন্ধুর নাম গগন গড়াই। পর পর পাঁচদিন বাবার সামনে বসে ছবি আঁকতে লাগল। ছবিটা শেষ করে গগন গড়াই ফ্রেমে বাঁধিয়ে যেদিন ছবিটা বাবাকে দেখাতে এল সেই দিনটি আমাদের কাছে স্মরণীয়। বাবা ছবিটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে দুর্বল গলায় প্রশ্ন করলেন, ‘গগন এটা কার ছবি?

গগন উত্তর দিল, ‘জেঠু, এটা আপনার ছবি। কেমন হয়েছে?’

বাবা আর উত্তর দিতে পারলেন না, দু’বার ঢেকুর তুলে মারা গেলেন। ডাক্তার ডাকার অবসর পেলাম না। পরে ডাক্তার এসে বললেন, ‘ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক’

গোপালবাবু যেন খুব ব্যথিত হয়েছেন এমন ভাব করে বললেন, 'আপনার কি ধারণা ওই ছবিটাই আপনার বাবার মৃত্যুর কারণ?’

দু’কড়ি বলল, ‘এ শুধু আমার ধারণা নয়। শশীডাক্তারের একই ধারণা। বিরানব্বই বছর বয়সে বাবা মারা যাওয়াতে আমার মা যতটা আঘাত পেয়েছেন, তার দ্বিগুণ আঘাত পেয়েছেন ওই ছবিটা দেখে। বাবার মৃত্যুতে নয়, ওই ছবি দেখেই মা মূর্ছা যান।'

গোপালবাবু বললেন, ‘ছবিটা কি আপনাদের বাড়িতে আছে?’

দু’কড়ি বলল, ‘অমন জিনিস কেউ বাড়িতে রাখে? গগন গড়াই অবশ্য তারপর থেকে আমাদের বাড়িতে আসেনি। অন্যদের বলেছিল, ছবিটা আমরা নাকি বুঝতে পারিনি। ওটা নাকি অত্যন্ত আধুনিক পদ্ধতিতে আঁকা।’

এর পর আরও কিছুক্ষণ গল্প করে গোপালবাবু উঠে গিয়েছিলেন। মনে মনে তাঁর বড় ইচ্ছে ছিল ছবিটা দেখার। এমন ছবি, যা দেখে একজনের ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হতে পারে, যা দেখে স্ত্রী মূর্ছা যেতে পারে, তেমন ছবি দেখতে কার না শখ হয়! কিন্তু শখের কথাটা কীভাবে বলা যায় সেটা ভাবতে ভাবতে গোপালবাবুর অনেকগুলো দিন চলে গেল।

দু’কড়িবাবুদের অবশ্য সচ্ছল অবস্থা। বাজারে মস্ত বড় মুদি দোকান, স্টেশনের কাছে কাপড়ের দোকান। এ ছাড়াও বাড়িভাড়া থেকে রোজগারও ভাল। চার ভাইয়ের মধ্যে শখের কোনও অভাব নেই। সকালে এবং সারাদিন ব্যাবসাপত্তর দেখে রাত্রিবেলা চার ভাই নিজেদের ঘরে এসে চারজন চার রকমের চর্চা করে। দু’কড়িবাবুর শখ এস্রাজ বাজানো, তিনকড়িবাবুর সংগীতচর্চা, পাঁচকড়ি আসন করে আর সাতকড়ি প্ল্যানচেট করার চেষ্টা করে। কোনও কাজটাই কেউ ঠিকঠাক করতে পারে না, তবুও তাদের চেষ্টার কোনও ত্রুটি নেই।

এইরকম একটা বাড়ির প্রতি সকলেরই কৌতূহল থাকা স্বাভাবিক। দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে তাদের পাড়ারও চেহারা বদল হয়েছে। গোবিন্দপুর এখন আর গ্রাম নয়। রীতিমত শহরের চেহারা নিয়েছে। বহু এস টি ডি বুথ, রকমারি ফাস্ট ফুডের দোকান, বড় বড় বাড়ি, পুকুর বুজিয়ে সারি সারি ফ্ল্যাটবাড়ি। নতুন ফ্ল্যাটবাড়িতে নানা ধরনের লোক। অবাঙালির সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। প্রমোটার নামক ব্যাপারটাও ফাস্ট ফুডের দোকানের মতো বেড়ে চলেছে।

নতুন ফ্ল্যাটবাড়িতে নানারকমের লোক। ধেড়ে ধেড়ে লোকগুলো হাফপ্যান্ট পরে বাজারে আসে। ওই হাফপ্যান্টের নাম নাকি বার্মুডা। অনেকের হাতেই ছোট ছোট টেলিফোন। হাতে অথবা কোমরে গুঁজে ঘুরে বেড়ায়। নতুন ফ্ল্যাটবাড়িতে কিছুদিন আগে এসেছেন কিরণশঙ্কর গুপ্ত নামে এক ভদ্রলোক। তিনি নাকি একদা ভারত সরকারের বিরাট এক চাকুরে ছিলেন। অত্যন্ত রাশভারী চেহারা, গম্ভীর গলা। একদিন তাঁর সঙ্গে পরিচয় হল সাতকড়ির। কথায় কথায় জানতে পারলেন, সাতকড়িবাবু প্ল্যানচেট করে। তিনি একদিন সকালবেলা চলে এলেন ‘আঠারো কড়ি ভবন’-এ। এসেই বললেন, 'আমার নাম কিরণশঙ্কর গুপ্ত। ওই গীতাঞ্জলি কমপ্লেক্সে থাকি। আমি একটিবার সাতকড়িবাবুর সঙ্গে দেখা করতে চাই। তিনি কি আছেন?’

এই বাড়িতে দুটি লোক কাজ করে। একজনের নাম নিত্যানন্দ, সংক্ষেপে নেত্য; দ্বিতীয়জন কালীপদ, সংক্ষেপে কালী। এই বাড়ির কারও কোনও প্রয়োজনে দরকার হলে সবাই ডাকে নেত্য-কালী। একসঙ্গে দু’জনকে ডাকার অর্থ, কেউ না কেউ আসবে। কিরণশঙ্করবাবু যার সঙ্গে কথা বলছিলেন, সে নেত্য। নেত্য বলল, যদি দেখা করতে চান তা হলে অপেক্ষা করতে হবে। যদি কথা বলতে চান, তা হলে আমার সঙ্গে আসুন।'

কিরণশঙ্করবাবু বললেন, ‘সে আবার কী কথা! বেশ চলুন, কথাই বলি। লোক তো দেখা করে তারপর কথা বলে।

নেত্য বলল, ‘ওসব সেকেলে নিয়ম এই বাড়িতে চলে না। আপনি আমার সঙ্গে আসুন।' প্রয়োজনটা যখন তাঁর, অগত্যা কিরণশঙ্করবাবু নেত্যর পিছন পিছন হাঁটতে লাগলেন। বেশ বড় বাড়ি। একটা উঠোন পেরিয়ে, দু'পাশের ঘরগুলোর দিকে তাকাতে তাকাতে কিরণশঙ্করবাবু হাঁটতে লাগলেন। একটা ঘর থেকে কেউ একজন হেঁড়ে গলায় গেয়ে চলেছে, ‘কলিয়না য়ানা সঙ্গ করতা।’ যখন গান হচ্ছে তখন তবলা বাজছে না। আবার যখন তবলা বাজছে তখন গান হচ্ছে না। এরকম কেন হচ্ছে কিরণশঙ্করবাবু বুঝতে পারছেন না। অন্য ঘর থেকে একটা বাজনার আওয়াজ আসছিল। সেই বাজনা কোন যন্ত্রের, তা বোঝা গেল না। কিরণশঙ্করবাবু অন্য একটা ঘরের দিয়ে তাকাতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তাকাতে পারলেন না। নেত্য বলল, “ওই যে সাতকড়িবাবু, যান কথা বলুন।'

কিরণশঙ্কর সামনে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেলেন না। নেত্যর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কই, কাউকেই তো দেখতে পাচ্ছি না।'

নেত্য বলল, ‘সামনে নিমগাছটা দেখতে পাচ্ছেন তো? ওখানে দুটো বেতের চেয়ার রয়েছে, তার একটাতে বসে পড়ুন।'

কিরণশঙ্কর দেখলেন, প্রমাণ সাইজের একটা বাথটব নিমগাছের তলায়। আর সেখানেই দুটে বেতের চেয়ার। নেত্য কিরণশঙ্করবাবুকে বাথটবটার কাছে নিয়ে এসে ডাকল, ‘ছোটকর্তা, ইনি এয়েছেন।'

কিরণশঙ্করবাবু এবার এগিয়ে গিয়ে দেখলেন, খোলা আকাশের নীচে একটা জলপূর্ণ বাথটব। একজন ভদ্রলোক সেখানে মানে ওই জলে শুয়ে আছেন। এ বড় বিরল দৃশ্য মনে হল কিরণশঙ্করের কাছে। তিনি কিছু বলবার আগেই সাতকড়ি বলে উঠল, ‘প্লিজ, সিট ডাউন’

কিরণশঙ্কর বসতে বসতে বললেন, ‘আমার নাম কিরণশঙ্কর গুপ্ত। অবসরপ্রাপ্ত আই এ এস, বহুকাল দিল্লিতে ছিলুম। বর্তমানে...’

সাতকড়ি কথা শেষ করতে না দিয়ে বলল, 'বর্তমানে আঠারো কড়ি ভবনে। বলুন, আপনার কোন কাজে লাগতে পারি?

কথা বলতে গিয়ে প্রথমে ঢোক গিললেন। সরকারি আমলা হিসেবে দীর্ঘদিন চাকরি করে গামলা গামলা মন্ত্রীদের দেখেছেন। এক সময় তাঁর ধারণা ছিল মন্ত্রী হতে দেদার যোগ্যতা লাগে, কিন্তু নিজে আমলা হওয়ার পর নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। একসময় বহু মন্ত্রীদের তিনিই দাবড়ে দিতেন। কিন্তু সাতকড়িবাবুর প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনি একটু সময় নিলেন। পরে বললেন, ‘এখন আপনি স্নানে ব্যস্ত, তাই বলছিলাম কি পরে আপনার সময়মতো...’

কিরণশঙ্করবাবুর কথা শেষ হওয়ার আগেই সাতকড়ি বলে উঠল, ‘এর চেয়ে ভাল সময় আর পাবেন না। যা বলতে এসেছেন দয়া করে বলে ফেলুন। এই গঙ্গাস্নানের সময় আমার মন বড় পবিত্র থাকে।'

কিরণশঙ্করবাবু বাথটবের জলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘গঙ্গাস্নান?’ সাতকড়ি কিরণশঙ্করবাবুর দিকে তাকিয়ে একই শব্দ করে হাসল। পরে বলল, ‘অবাক হচ্ছেন তো? হওয়ারই কথা। গোবিন্দপুরের গঙ্গার ঘাটে কখনও গেছেন? জল তো মাঝগঙ্গায়। জোয়ার এলেও ঘাটের সিঁড়ি পর্যন্ত পৌঁছয় না। বিকেলে ছেলেরা ওখানে ফুটবল খেলে। একদিন দেখবেন কোনও এক বা একাধিক মন্ত্রী দয়ায় গঙ্গার চড়াও প্রমোটার কিনে বহুতল বাড়ি বানাচ্ছে। দোতলায় গাড়ি রাখার গ্যারেজ, গ্রাউন্ড ফ্লোরে নৌকো। যদি কখনও কাজে লাগে, সেইজন্য।'

কিরণশঙ্করবাবুর মনে হল, তিনি যেন না জেনে জটিল একটা বিষয়ের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন। আরও একবার ঢোক গিলে বললেন, 'আপনার এই বাথটবের জলটা কি গঙ্গার?’ সাতকড়ি উত্তর দিল, ‘আলবাত, আমাদের দোকানের মালপত্র আসে বড়বাজার থেকে। তার জন্যে আমার দু'খানা ম্যাটাডোর আছে। তারই একটাতে, রোজ সকালে দক্ষিণেশ্বরের ঘাট থেকে পাঁচখানা ড্রামে গঙ্গার জল আসে শুধু আমার জন্যে। ওই ঘাটে সবসময় জল থাকে।'

কিরণশঙ্করবাবু দিল্লিতে থাকতে এক মন্ত্রীকে দেখেছিলেন, দফতরের কাজ শুরু করার আগে হনুমানের ফোটোতে প্রণাম করতেন। কত লোকের কতরকমের অভ্যাস থাকে। তবে এর জন্য তো কাউকে দোষ দেওয়া যায় না। রেল দফতরের মন্ত্রীর ঘরে একখানা রেলগাড়ির ছবি থাকতেই পারে। বন দফতরের মন্ত্রীর ঘরে হনুমানের ছবি থাকলে ক্ষতি কী৷ কিরণশঙ্করবাবু বললেন, ‘আমি যে কাজে আপনার কাছে এসেছি, এবার সেটা বলতে চাই। যদি একটু শোনেন।'

সাতকড়ি বলল, ‘আপনি বলুন, আমি শুনছি।'

কিরণশঙ্করবাবু চেয়ারটাকে বাথটবের একটু কাছে টেনে নিয়ে এসে বললেন, 'আমি শুনেছি, আপনি নাকি প্ল্যানচেট জানেন। সেই বিষয়ে আমি আপনার সঙ্গে একটু আলোচনা করতে চাই।'

বাথটবের ভিতর জলের ওপর আধশোয়া হয়ে এতক্ষণ কথা বলছিল সাতকড়ি। এবার বাথটবের মধ্যে বসে কিরণশঙ্করের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘আপনি কি কোন মৃত ব্যক্তির আত্মাকে আনতে চান? তিনি কে?’

কিরণশঙ্কর বললেন, তিনি আমার পিতা উদয়শঙ্কর গুপ্ত।'

সাতকড়ি মিনিটখানেক চোখ বুজে জলের মধ্যে বসে রইল। যেন এখনই কিরণশঙ্করের বাবা উদয়শঙ্কর গুপ্তকে এই বাথটবের মধ্যে টেনে আনবেন। চোখ খোলবার পর বলল, ‘আজ রাত আটটায় আমার এখানে আসতে পারবেন?’

কিরণশঙ্করবাবু বললেন, ‘এখানে মানে এই নিমগাছের তলায়, বাথটবে?’

সাতকড়ি একটু হেসে বলল, ‘না। আমার ঘরে। আমি দোতলায় থাকি। ঘর চেনবার জন্য কারও সাহায্য নিতে হবে না। কাঠের দরজায় পর পর সাতটা কড়ি লাগানো থাকলেই বুঝবেন, ওটি এই সাতকড়ি মুখুজ্যের ঘর। ঠিক আটটায় চলে আসুন।'

রাত আটটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে কিরণশঙ্করবাবু ‘আঠারো কড়ি’-তে এসে দরজার বেল বাজালেন। যে দরজা খুলে ছিল, সকালবেলা তাকে কিরণশঙ্করবাবু দেখেননি। তাই বললেন, ‘আমি সাতকড়িবাবুর ঘরে যাব। আগে থেকে বলা ছিল। উনি আমায় এই সময় আসতে বলেছেন।'

যে দরজা খুলে দিয়েছিল তার নাম কালী। কালী বলল, ‘দোতলায় চলে যান। কড়ি গুনে দরজায় সাতবার টোকা দেবেন। সাতের কম হলে ছোটবাবু দরজা খুলবেন না।'

কিরণশঙ্কর গুপ্ত কালীকে দেখতে দেখতে চশমাটা খুলে লম্বমান ধুতির কেঁাঁচা দিয়ে চশমার কাচজোড়া মুছে আবার চোখে পরতে পরতে বললেন, ‘এই বুঝি নিয়ম?’

কালী উত্তর দিল, ‘আজ্ঞে হ্যা। বড়বাবুর দরজায় দু’বার টোকা দিতে হবে। কারণ উনি দু’কড়ি। মেজোবাবুকে তিনবার, সেজোবাবুকে পাঁচবার, আর...’ কিরণশঙ্করবাবু বললেন, ‘ব্যস, ব্যস, বুঝে গেছি। এবার ওপরে ওঠার সিঁড়িটা একটু দেখিয়ে দাও।'

কালী এগিয়ে গিয়ে সিঁড়িটা দেখিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছিল। কিরণশঙ্করবাবু বললেন, ‘সকালে নীচের ঘরে গান, বাজনা এসব হচ্ছিল, এখন তো কিছু শুনতে পাচ্ছি না।'

কালী বলল, ‘ধৈর্য হারাবেন না। রাতের বেলা ওসব ওপরে হয়। তেনারা একবার ওপরে উঠে গেলে নীচে নামেন না, যদি না তেমন প্রয়োজন নয়।'

কিরণশঙ্করবাবু ওপরে উঠতে লাগলেন। প্রথমেই সেই গানটা কানে এল, যা আজ সকালে শুনেছিলেন। কলিয়ানা সঙ্গ করতা...। কিরণশঙ্করবাবু দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সেখানে তিনটি কড়ি বসানো। উলটোদিকের দরজায় দুটো কড়ি। দরজার ফাঁক দিয়ে বাজনা আসছিল। কীসের বাজনা সেটা সকালেও যেমন বোঝেননি, রাতেও বুঝতে পারলেন না। অন্য একটা দরজায় পাঁচটা কড়ি। কিন্তু ঘরের ভিতর থেকে কোনও শব্দ আসছে না। তার পরের ঘরটাই সাতকড়িবাবুর হওয়ার কথা। সেই ভেবে দরজায় টোকা দিতে গিয়ে দেখলেন, সেখানে মাত্র একটা কড়ি আটকানো। কিরণশঙ্করবাবু একটু ভেবে নীচে তাকালেন। ভাবলেন, যদি কোনও কারণে ছ'টা কড়ি খসে গিয়ে থাকে। কিন্তু নীচে কোনও কড়ি না দেখে উলটোদিকের দরজায় চোখ রাখতেই দেখলেন, পর পর সাতখানা কড়ি। কিরণশঙ্করবাবু ইচ্ছে করেই তাঁর ঘড়ি দু’ মিনিট ফার্স্ট করে রাখেন। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন, আটটা বেজে এক মিনিট হয়েছে। তিনি দরজায় টোকা দিলেন। গুনে গুনে সাতটা টোকা দেওয়ার পর ভিতর থেকে সাতকড়িবাবুর গলা শোনা গেল, ‘দরজা খোলা আছে। ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করুন।'

কিরণশঙ্করবাবু ভিতরে ঢুকেই দেখলেন সাতকড়িবাবু রক্তবর্ণের পাঞ্জাবি আর ঢোলা পাজামা পরে একটা আরাম কেদারায় শুয়ে আছেন। কিরণশঙ্করবাবু ঘরে ঢুকতেই সাতকড়ি উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করে বলল, 'কী খাবেন? বেলের পানা? ঘোলের শরবত, কিংবা গরম চা??

কিরণশঙ্করবাবু প্রতি নমস্কার করে বললেন, 'আজ্ঞে, কিছুই খাব না। কাজের কথাটা আগে বলে নিতে চাই।'

সাতকড়ি আরাম কেদারায় বসতে বসতে বলল, ‘বেশ, কাজের কথাই শোনা যাক। এক মিনিট অপেক্ষা করুন।'

সাতকড়ি উঠে গিয়ে একটা টেপ রেকর্ডার এনে কিরণশঙ্করবাবুর সামনে রেখে ঘরের বড় বাতিটা নিভিয়ে দিল। নীল রঙের একটা বাতি জ্বেলে দিয়ে বললেন, ‘এবার বলতে শুরু করুন। আমি সব রেকর্ড করে রাখছি।'

কিরণশঙ্করবাবু টেপ করার যন্ত্রটার দিকে একবার তাকালেন। পরে বললেন, ‘আমি দিল্লিতে থাকতেও প্ল্যানচেটে বাবার আত্মাকে আনবার চেষ্টা করেছিলুম। কৈলাসানন্দ গিরি বলে একজন অনেকবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু...’

সাতকড়ি বলে উঠল, 'আপনার বাবা আসেননি?’

কিরণশঙ্কর উত্তর দিলেন, ‘না। যতবার বাবাকে ডেকেছি, ততবার আমার কাকা এসে গেছে। আমার বাবা আর কাকা যমজ ছিলেন তো? বাবা মাত্র কুড়ি মিনিটের বড়।' সাতকড়ি এবার উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল, ‘আপনার বাবা এবং কাকা কতদিন আগে মারা গেছেন?’

কিরণশঙ্কর বললেন, 'বাবা মারা গেছেন তা প্রায় ছ' বছর আগে। তখন চাকরি করছি।'

পুলিশের জেরা করার ভঙ্গিতে সাতকড়ি প্রশ্ন করল, ‘আর আপনার কাকা?’ কিরণশঙ্কর উত্তর দিলেন, 'কাকা মারা গেছেন বাবার আগে। বাবার দু’ বছর আগে।' সাতকড়ি আরাম কেদারায় বসতে বসতে জিজ্ঞেস করল, ‘প্ল্যানচেট করে বাবার আত্মাকে আনতে চাইছেন কেন? বিশেষ কোনও উদ্দেশ্য আছে কি?’

কিরণশঙ্কর কথার উত্তর দিতে গিয়ে একটু থেমে গেলেন। সাতকড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনার কাছে কোনও কথা গোপন করা উচিত হবে না। আমার বাবার একটা সোনার ঘড়ি ছিল। আগেকার পকেট ঘড়ির মতো। বাবা ওটা জামার ঘড়িপকেটে রাখতেন। বেশিদিন ব্যবহার করেননি। আমাদের বাড়িতে মাইসোর গোল্ডের তৈরি একটা ময়ূর ছিল। বাবা শখ করে ওটা কিনেছিলেন রাজস্থানের এক দোকান থেকে। ঘড়িটা ওই ময়ূরের পেখমের মধ্যে অদ্ভুতভাবে সেট করা ছিল। গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের নীচে তখন বেশ বড় একটা জুয়েলারি শপ ছিল। ওঁরাই সেট করে দিয়েছিলেন। ঘড়িটা যখন বাজত, তখন জলতরঙ্গের মতো মিষ্টি আওয়াজ হত। যাতে কেউ চুরি করে নিয়ে যেতে না পারে সেজন্য বাবা তাঁর মৃত্যুর আগে ঘড়িটা বাড়ির কোথাও লুকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু বাবার তো হঠাৎ সেরিব্রাল হল। একেবারে কোমা স্টেজে চলে গেলেন। আমরা কেউ জানতেই পারলাম না ঘড়িটা কোথায়? তাই…….

সাতকড়ি মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ‘তাই বাবার আত্মাকে এনে জেনে নিতে চান ঘড়িটা কোথায়? তাই তো?’

কিরণশঙ্কর বললেন, ‘ঠিক তাই।’

সাতকড়ি বলল, ‘আপনার কেসটা অনেকটাই গোয়েন্দা দফতরের আন্ডারে। যদিও ইদানীং আমি ওটা নিয়েও চর্চা করছি। এ ব্যাপারে আমার সহকারী হচ্ছে নেত্য। আগে প্ল্যানচেটটা করেই দেখা যাক, উনি কী বলেন।'

কিরণশঙ্কর জিজ্ঞেস করলেন, 'কবে করবেন?'

সাতকড়ি উত্তর দিল, ‘আগামী অমাবস্যা পর্যন্ত আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে। অমাবস্যার রাত্রে এসব কাজ করতে হয়। তাতে আত্মার যাতায়াতের সুবিধে। এখন আপনি উঠতে পারেন।'

কিরণশঙ্কর উঠতে উঠতে বললেন, ‘আমি কিন্তু আপনার ওপর অনেকখানি ভরসা করছি।'

সাতকড়িও উঠে দাঁড়াল। কিরণশঙ্করকে নিয়ে দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলল, ‘সমস্যা কী জানেন মি. গুপ্ত, এদেশের জল, বাতাস, শব্দ, মানুষের আচার-আচরণ সবই তো দূষিত। পলিউশন পলিউশন করে এত চিৎকার করেও তো কিছু করা যাচ্ছে না। আত্মাদের মধ্যেও এর প্রভাব পড়েছে। রামকে ডাকলে শ্যাম চলে আসে। সেদিন এক মাস্টারমশাইয়ের আত্মাকে ডাকলুম, তিনি এলেন না। এক মন্ত্রীর আত্মা চলে এল। ওখানেও তো কেউ কাউকে মানছে না। বেলাইনে দুষ্ট আত্মা ঢুকে পড়ছে।'

কিরণশঙ্করবাবু দরজা দিয়ে বেরিয়ে জুতো পরতে পরতে বললেন, ‘মানুষ তো মরলে স্বর্গে যায়। তা সেখানেও কি...’

সাতকড়ি বলল, ‘ভুল ধারণা। লেখাপড়া শিখলেই কি চাকরি হয়? পাশ করলেই কি জ্ঞান হয়? চাকরি পেলেই কি সুখে থাকা যায়? ওসব পুরনো ধারণা। স্বর্গের পাসপোর্ট পাওয়া বড় কঠিন। নরকেও আর জায়গা নেই। আমি এইসব প্ল্যানচেট করে যা জেনেছি, তাতে দেখবেন যমরাজ অচিরেই ভারত সরকারের কাছে জায়গা চাইবে। ওখানে আর জায়গা নেই।'

কিরণশঙ্কর এবার ভীত চোখে সাতকড়ির দিকে তাকালেন। তাঁর মনে হল, লোকটা স্বাভাবিক তো? মুখে কিছু বললেন না। যেমন এসেছিলেন তেমনভাবেই নীচে নেমে গেলেন।

কিরণশঙ্করবাবু বাড়িতে ফিরে এসে স্ত্রীকে সব বললেন। সব শুনে কিরণশঙ্করবাবুর স্ত্রী উমা দেবী বললেন, ‘বেশ ভাল লোক তো। ভদ্রলোককে দেখতে বড় সাধ হচ্ছে। ওনাকে একদিন বাড়িতে চায়ের নেমন্তন্ন কর না। নিজের বাড়িতে মন খুলে কথা বলা যাবে’

কিরণশঙ্করবাবু ভেবে দেখলেন কথাটা মন্দ নয়। নিজের বাড়িতে এলে মন খুলে আরও কথা বলা যাবে। সকালে গেলে সেই তো নিমগাছের নীচে বাথটবের সামনে কথা বলতে হবে। তার চেয়ে কোনও একটা বিকেলে স্টেশনের কাছে সাতকড়িবাবুর কাপড়ের দোকানে গিয়ে চায়ের নেমন্তন্ন করে আসা যেতে পারে। ‘শুভস্য শীঘ্রম’ এই ভেবে পরদিন বিকেলেই কিরণশঙ্করবাবু সাতকড়ির দোকানে হাজির হলেন। দোকানটা তাঁর চেনা। যাতায়াতের পথে অনেকবার দেখেছেন। কিন্তু সাতকড়িবাবুর সঙ্গে পরিচয় ছিল না।

তখন বেলা প্রায় পাঁচটা। দোকানে বেশ ভিড়। কিরণশঙ্করবাবু এদিক-ওদিক তাকিয়ে, চোখ দিয়ে সাতকড়িবাবুকে খুঁজছেন। একজন কর্মচারী বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী চাই? শাড়ি, ধুতি, না কি...

কিরণশঙ্করবাবু বললেন, ‘আজ্ঞে, আমি একটু সাতকড়িবাবুর সঙ্গে দেখা করব। উনি কি দোকানে আছেন?’

সেই কর্মচারীটি এবার একটা আঙুল তুলে দোকানের ভিতরের দিকে দেখিয়ে বলল, ‘একটু কষ্ট করে, গুঁতিয়ে গাঁতিয়ে ক্যাশ কাউন্টারে চলে যান। উনি ওখানে বসেন।'

কর্মচারী মিথ্যে বলেনি। গুঁতিয়ে গাঁতিয়েই ক্যাশ কাউন্টারে পৌঁছতে হল। তাঁকে দেখেই সাতকড়িবাবু বললেন, ‘কী ব্যাপার মশাই? কী কিনলেন?’

কিরণশঙ্কর একটু হাসলেন। দোকানে এসে কিছুই কেনেননি, এই কথাটা বলতে তাঁর খারাপ লাগছিল। তাই বললেন, ‘কেনাকাটার ব্যাপারটা দেখেন আমার স্ত্রী। তাকে নিয়ে একদিন আসব। আজ আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি বিশেষ একটু অনুরোধ নিয়ে। অনুরোধটা অবশ্য আমার স্ত্রীর।'

সাতকড়িবাবু তার পাশে বসা লোকটাকে কী যেন একটা কথা বলে কিরণশঙ্করবাবুর, দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার স্ত্রীর অনুরোধ? ব্যাপারটা তো তা হলে শুনতে হচ্ছে। বলুন, কী অনুরোধ?’

স্ত্রীর অনুরোধটুকু কিরণশঙ্করবাবু শোনালেন। সব শুনে সাতকড়ি বলল, ‘এই যে চায়ের নেমন্তন্ন। মানে টি পার্টি, এসব হচ্ছে ইংরেজদের দান। কিন্তু বৃহস্পতিবার ছাড়া তো বিকেলে আমার কোথায় যাওয়ার উপায় নেই। ওইদিন এই স্টেশন বাজার বন্ধ।'

কিরণশঙ্করবাবু বললেন, ‘বেশ, তবে এই বৃহস্পতিবারেই আসুন। আমি বাড়িতে আপনার জন্যে অপেক্ষা করব। আপনাকে কি আর একবার মনে করিয়ে দিতে হবে?’

সাতকড়ি মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ‘না, না, মনে করাতে হবে না।'

কিরণশঙ্করবাবু দোকান থেকে সোজা বাড়িতে এলেন। স্ত্রীকে সব বললেন। যদিও সাতকড়িবাবু বলেছেন তাকে মনে করাবার দরকার নেই তবুও পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না বলে, বুধবার গিয়ে আবার মনে করিয়ে দিয়ে এলেন।

বৃহস্পতিবার বেলা চারটে নাগাদ সাতকড়ি নেত্যকে নিয়ে কিরণশঙ্করবাবুর ফ্ল্যাটে এসে উপস্থিত। আজ আর রক্তবর্ণের পোশাক নয়। চওড়া পাড়ের ময়ূরপুচ্ছ ধুতি এবং ফিনফিনে আদ্দির পাঞ্জাবি। কিরণশঙ্করবাবু দরজা খুলে দিতেই সাতকড়ি বলল, ‘আমি কিন্তু আমার চাখাওয়ার টাইমে এসে গেছি। আপনাদের যদি এটা বে-টাইম হয় তা হলে দুঃখিত।'

কিরণশঙ্করবাবু কিছু বলার আগে তাঁর স্ত্রী উমা দেবী বললেন, ‘না, না। কোনও বে-টাইম নয় আমার চা তৈরি।'

সাতকড়ি আঁতকে উঠে নেত্যর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘নেত্য, এ কী শুনছি? চা তৈরি? তার মানে দুপুরের রান্নার সঙ্গে চা-ও তৈরি করে ফ্লাস্কে পুরে রেখেছেন? সেই চা এখন খাওয়াবেন?’

উমা দেবী ভারী অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। সাতকড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘না ভাই, তেমন নয়। আপনি ঘরে ঢোকার পর চায়ের জল চাপালাম। চায়ের সঙ্গে নোনতা কিছু খাবেন তো?’

সাতকড়ি উত্তর দিল, ‘সেইরকম ইচ্ছেই তো মনে পোষণ করছি। যদি সিঙাড়া খাওয়ান তা হলে আমার একটি জিজ্ঞাসা আছে।'

কিরণশঙ্করবাবু বললেন, ‘কী জিজ্ঞাসা?’

নাতকড়ি বলল, 'ওই কালো মশলা দেওয়া সিঙাড়া হলে খাব না। আজকাল দেখি সিঙাড়ার ভিতরে কালো রঙের রকমারি মশলার পিণ্ড। আমি ভালবাসি বাঙালি সিঙাড়া। হালকা মশলা। ভিতরে শিশুর মতো পবিত্র আলু। কিরণশঙ্করবাবু একটা ঢোক গিলে স্ত্রীর দিকে তাকালেন। উমা দেবী বললেন, ‘সিঙাড়া ছাড়া বিকেলের জলখাবার আপনি কী কী খেতে ভালবাসেন?’

সাতকড়ি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘যা যা ভালবাসতাম, যা যা ভালবাসি, বহুকাল থেকেই তা দুর্লভ। আজ আর কেউ ডালপুরি করে না, করতে পারে না। জিবেগজার ডিজাইন বদলে গেছে। দরবেশকে ল্যাং মেরে পিছনে ফেলে লাড্ডু এগিয়ে যাচ্ছে। রসগোল্লাকে নাকি টেক্কা দিতে আমদানি হয়েছে গোলাপজামের। এ যেন ব্রাজিলের রোনাল্ডোর সঙ্গে বাইচুং-এর তুলনা। না না মশাই, খাওয়াদাওয়া সব উঠে গেছে।'

উমা দেবী সমস্যায় পড়লেন। এরকম অতিথিকে তিনি কখনও আপ্যায়ন করার সুযোগ পাননি। ভাগ্যিস পাননি। কিন্তু তাই বলে তো শুধু চা দেওয়া যায় না। তাই বললেন, ‘কী খাবেন? মানে কোনটা আপনার পছন্দ?’

সাতকড়ির সঙ্গে সঙ্গে নেত্যও এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠল, ‘পছন্দের কথা বলে ছোটবাবুকে কষ্ট দেবেন না। সেদিন, বাগবাজার দিয়ে আসতে আসতে ছোটবাবু হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন...।'

কিরণশঙ্করবাবু বড় বড় চোখ করে নেত্যর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কেন, কেঁদে উঠলেন কেন? কেঁদে উঠে কী বললেন?’

নেত্য বলল, ‘সে বড় দুঃখের কথা। বাগবাজারের দিকে তাকিয়ে বললেন, বাগবাজার তোমার অতীত গৌরব আজ বড় মলিন। জনগণ তোমাকে ভুলে গেছে। তোমার ভুবনবিখ্যাত তেলেভাজার গৌরব আজ কেড়ে নিয়েছে মির্জাপুর। রসগোল্লা আছে, থাকবে কিন্তু তোমার একচেটিয়া অধিকার খর্ব হয়ে গেছে। বাড়ির বউরা যা পায় তাই ফ্রিজে পুরে দেয়। ফ্রিজে পোরা রসগোল্লা দু'দিন পরে বেঁচে থাকে বটে, কিন্তু সে আর রসগোল্লা থাকে না। রস শুকিয়ে স্রেফ গোল্লা। ফ্রিজ তো আসলে...।'

উমা দেবী বললে, ‘ফ্রিজ আসলে কী?’

নেত্য বলল, ‘গেরস্ত ঘরের মর্গ।'

কিরণশঙ্করবাবু এবং উমা দেবী দু'জনেই চমকে উঠে নিজেদের সামলে নিলেন। রান্নাঘরের দরজাটা বন্ধ। কিন্তু খাবার জায়গাটা এখান থেকে দেখা যাচ্ছে। উমা দেবীর প্রথমেই নজর গেল ঘরের ফ্রিজটার দিকে। খাবার টেবিলের কাছেও ওটা রাখা। মনে মনে ভীষণ অস্বস্তিতে পড়লেন দু'জনে। কিরণশঙ্করবাবু এবং উমা দেবী দু’জনেই দু’জনের দিকে তাকালেন। সাতকড়ি বোধ হয় ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলল, 'আমার জন্য ভাবতে হবে না। ঘরে চিঁড়ে আছে তো? তাই একবাটি ভেজে দিন। ভাজা চিঁড়ে তেল, নুন, কিঞ্চিৎ আদা কুচি আর কাঁচালংকা দিয়ে মেখে দিলেই দিব্যি খেয়ে নেব।'

কিরণশঙ্করবাবু স্ত্রীর দিকে তাকালেন। উমা দেবী বললেন, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, চিঁড়ে থাকবে না কেন? চিঁড়ে আছে।'

উমা দেবী নিজে বিলক্ষণ জানেন তাঁদের ঘরে চিঁড়ে নেই। মাসকাবারি ফর্দে চিঁড়ের কথা বহুদিন ধরেই লেখা হয় না। জলখাবার বলতে টোস্ট, জেলি, অমলেট, কখনও বা স্যান্ডউইচ, না হয় লুচি আর তরকারি। কিন্তু চিঁড়ে কোথায় পাওয়া যাবে। সাতকড়ি ‘ঘরে চিঁড়ে আছে তো?’ এমনভাবে বলেছে, যেন প্রত্যেকের ঘরে চিঁড়ে থাকাটা জরুরি। উমা দেবী স্টোর রুমের দরজা দিয়ে নিজের ফ্ল্যাটের বাইরে এলেন। সামনের ফ্ল্যাটের দরজায় বেল টিপতে গিয়ে দেখলেন, তাঁদের কাজের লোক মন্টু সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে। সাতকড়ি আসবার খানিক আগে এই মন্টুকেই পাঠিয়েছিলেন সিঙাড়া আর রসগোল্লা কিনতে। মন্টু তার গিন্নিমাকে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে এসে বলল, ‘গরম সিঙাড়া এনেছি।'

উমা দেবী বললেন, ‘এই দরজা দিয়ে গিয়ে আস্তে করে রান্নাঘরে রেখে আয়। কাছাকাছি কোনও দোকানে চিঁড়ে পাওয়া যাবে?’

মন্টু উত্তর দিল, ‘মুদিখানার দোকান ছাড়া পাওয়া যাবে না।’

মন্টু স্টোর রুমের ভেতর দিয়ে রান্নাঘরে সিঙাড়া আর রসগোল্লা রাখতে গেল। উমা দেবী সামনের ফ্ল্যাটের দরজায় বেল বাজালেন। দরজা খুলে দিলেন মিসেস ঘোষাল। উমা দেবীকে দেখে বললেন, ‘আসুন।'

দরজায় দাঁড়িয়েই উমা বললেন, ‘আসবার জো নেই ভাই। একটা জিনিস ধার চাইতে এলাম। আপনার ঘরে চিঁড়ে আছে?’

‘চিঁড়ে!’ মিসেস ঘোষাল যেন অবাক হলেন। তাঁর ভাব দেখে মনে হল কেউ যেন মাঝরাত্তিরে তাঁর ঘুম ভাঙিয়ে জানতে চাইছে, তাঁর ঘরে কি বোমা আছে? মনে মনে বিরক্ত বোধ করলেও উমা দেবী মুখ ফুটে কিছু বলতে পারলেন না, মিসেস ঘোষাল বললেন, ‘সরি মিসেস গুপ্তা, ওসব জিনিস আমাদের বাড়িতে আসে না।'

অগত্যা মন্টুকেই সাইকেল করে আবার দোকানে পাঠাতে হল। চিঁড়েভাজা আর চা খাওয়ার পর কিরণশঙ্করবাবু বললেন, ‘অমাবস্যা আসতে এখনও আটদিন বাকি। আমি ক্যালেন্ডারে দাগ দিয়ে রেখেছি। বাবার কাছ থেকে যদি ওই জিনিসটির হদিশ জানতে পারি তা হলে...।'

সাতকড়ি প্রশ্ন করল, 'তা হলে কী হবে? নিজের সংগ্রহে রাখবেন, না বাজারে বেচে দেবেন??

কিরণশঙ্কর বললেন, “ছিঃ! বেচব কেন? ওটা তো আমাদের কাছে একটা অ্যাসেট। ওটা যত্ন করে রেখে দেব।'

সাতকড়ি মুখটাকে বিকৃত করে কয়েক মুহূর্ত কিরণশঙ্করবাবুর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘দুনিয়ার এত জিনিস থাকতে পকেট ঘড়িটা ময়ূরের পুচ্ছে গুঁজতে গেলেন কেন? গোঁজাগুঁজির কি অন্য জায়গা ছিল না?’

কিরণশঙ্করবাবু বললেন, ‘সেইটা তো আমার কাছেই একটা রহস্য। সেইজন্যই আপনার শরণাপন্ন হয়েছি। শুনেছি, আপনি আসনে বসে যাকে ডাকেন, তিনিই চলে আসেন।'

সাতকড়ি ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘এক সময় তাই হত। কিন্তু এখন দেখি গণ্ডগোল হচ্ছে। সেদিন বগলাবাবু মাকে ডাকলাম, কিন্তু মা না এসে ঠাকুমা চলে এল। ঠিক বুঝতে পারছি না, আত্মার আসা-যাওয়াতে স্যাটেলাইটের কোনও এফেক্ট আছে কিনা। দেখি আপনার বাবার ক্ষেত্রে কী হয়। বাবার একখানা ছবি চাই। পুরো বায়োডাটা দু'দিন আগে পৌঁছে দেবেন।'

কিরণশঙ্করবাবু বললেন, 'অবশ্যই। সেদিন গিয়ে আপনাদের অন্যান্য ভাইদের সঙ্গে আলাপ করে আসব।'

সাতকড়ি বলল, ‘আমি ছাড়া আমার দাদারা সবাই গুণী। বড়দা, মানে দু'কড়ি মুখুজ্যে এস্রাজ বাজান, মেজদা তিনকড়ি মুখুজ্যে সংগীতসাধক। এসব হয়তো আমার বাড়িতে গিয়ে আপনি জেনে থাকবেন। কিন্তু ছোড়দা পাঁচকড়ি মুখুজ্যের ঘর থেকে আপনি কোনও আওয়াজ পাবেন না।'

কিরণশঙ্করবাবু মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘সত্যি বটে। একটা ঘরের ভিতর থেকে কোনও আওয়াজ পাইনি।'

সাতকড়ি একটু হাসল। নেত্য বলল, ‘পাবেন কেমন করে। উনি তো নিজের ঘরে আসন করেন। পদ্মাসন, গোমুখ আসন, শীর্ষাসন এইরকম বহু আসন। আর ছোটবাবু, সেই সময় আত্মাদের সঙ্গে বসে আড্ডা দেন।'

কিরণশঙ্করবাবু বললেন, 'আপনার মেজদা উচ্চাঙ্গ সংগীতের সাধনা করেন তাই না?’

সাতকড়ি একটু চুপ করে থেকে বলল, “মেজদার কেসটা ভেরি স্যাড! ভেরি, ভেরি প্যাথেটিক। ছাদের ওপর টব বসিয়ে তাতে ঝুমকো জবাফুলের গাছ পুঁতে মেজদা দেড় বছর সকাল-সন্ধ্যা গেয়েছেন, ‘মায়ের পায়ের জবা হয়ে ওঠ না ফুটে মন।’ দুঃখটা কোথায় জানেন, দাদা গলা ফাটিয়ে দেড় বছর গাইলেন, জবা ফোটা তো দূরের কথা, গাছটাই মরে গেল। মেজদা মনের দুঃখে গান...’

উমা দেবী গলায় মাত্রাতিরিক্ত সহানুভূতি ঢেলে বললেন, ‘গান ছেড়ে দিলেন?'

মাথা নাড়তে নাড়তে সাতকড়ি বলল, ‘ছেড়ে দেওয়ার পাত্র আমার মেজদা নয়। মেজদা গানটা চেঞ্জ করল। এইবার গাইতে লাগল, ‘গঙ্গা-যমুনা নির্মল পানি...।' গানটা যখন গলায় বেশ বসে গেছে, তখনই ফলাও করে সব কাগজে খবর বেরুল, গঙ্গা আর যমুনার জল অতিমাত্রায় দূষিত হয়ে যাচ্ছে। মানে ভয়ানক ওয়াটার পলিউশন। মনের দুঃখে সেই গানটাও চেঞ্জ করে এখন কলিয়ানা সঙ্গ করতা গেয়ে যাচ্ছেন। মেজদার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য কী জানেন??

উমা দেবীর গানের প্রতি একটু আগ্রহ আছে। তাই বললেন, ‘কী বৈশিষ্ট্য?’

সাতকড়ি উমা দেবীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মেজদা কিন্তু গানের সঙ্গে হারমোনিয়ম বা তানপুরা বাজিয়ে গান না। নিজের গানে নিজেই তবলা বাজান। এমন কাউকে দেখেছেন? কন্ঠে গান, নিজ হস্তে তবলা।'

কিরণশঙ্কর আর উমা দেবী দু’জনেই বিস্ফারিত চোখে সাতকড়িবাবুর দিকে তাকিয়ে রইলেন।

‘আঠারো কড়ি’ বাড়িটাকে নিয়ে গোবিন্দপুরে সকলেরই কম-বেশি কৌতূহল আছে। যাঁরা পুরনো লোক, তাঁরা আরও বেশি জানেন। তাঁদের এই জানাজানি কতটা সত্য, তা অবশ্য আমরা জানি না। রথতলার নাড়ু চাটুজ্যের বয়স এখন তিরাশি। গোবিন্দপুরের প্রবীণতমদের একজন। আঠারো কড়ির পয়লা কড়ি এককড়িকে বিলক্ষণ চিনতেন। নাড়ু চাটুজ্যের ভাল নাম নারায়ণ। সবাই তাঁকে ‘নাডু’ বলেই জানে। তিনিই একদা আমাদের বলেছিলেন, প্রয়াত হওয়ার পরেও নাকি হীরু গাঙ্গুলি মশাই আঠারো কড়িতে এসে তিন কড়িকে তবলা শিখিয়ে গেছেন। একসময় তো বছরে দু'বার আঠারো কড়িতে জলসা হত। বড় বড় গাইয়ে বাজিয়েদের আত্মা এসে গান গাইতেন, বাজাতেন। এককড়ি মুখুজ্যের কাছ থেকেই তো মেজ ছেলে পেয়েছে সংগীতের প্রেরণা আর ছোট সাতকড়ি পেয়েছে আত্মাদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশার সুযোগ।

একবার ইলেকশনের আগে জগবন্ধু সাঁতরা এসে সাতকড়িকে ধরে বলল, ‘আমার ভাইটি, একটি উপকার করতে হবে।'

জগবন্ধু এমন সময় এলেন, যখন সাতকড়ি নিমগাছের নীচে বাথটবে বসে, শুয়ে এবং গড়িয়ে গড়িয়ে স্নান করে। নিমের ডাল দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে সাতকড়ি বলল, ‘জগুদা, উপকারটা কেমন? মানে উপকারের ক্যারেকটারটা কী?’

জগবন্ধু সাঁতরা মুখটা যতদূর সম্ভব বাথটবের কাছে এগিয়ে এনে বলল, ‘এই ইলেকশনে আমি জিততে পারব কিনা? জিতলে কত ভোটে জিতব। তুমি যদি ভাই প্ল্যানচেট করে কোনও বড় নেতার আত্মাকে...।'

সাতকড়ি জলের ওপর এমনভাবে থাপ্পড় মারল যে, বাথটবের জল ছিটকে গিয়ে জগবন্ধু সাঁতরার গোটা মুখ আর শরীরটাই ভিজিয়ে দিল না, দু’-চার ঢোক জল তার গলাতেও গেল। সাতকড়িই বলল, ‘আপনার কি মাথা খারাপ। নেতা বা মহাপুরুষের আত্মা তো দূরের কথা, স্বর্গের কেন্দ্রীয় কমিটির তিন সদস্য ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরের চোদ্দো পুরুষের ক্ষমতা নেই ভোটের ফল অগ্রিম বলে। এসব জিনিস আমার দ্বারা হবে না।'

জগবন্ধু সাঁতরা হতাশ হয়ে সেদিন ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিল।

সাতকড়ির কাছে কেউ এলে স্পষ্ট জানিতে দিত, জগতে, সংসারে এমন কতকগুলি বিষয় বিদ্যমান, যার উত্তর বা মীমাংসা কোনওটাই আত্মা করতে পারে না। অতএব, তাঁদের ডেকে এনে মিছিমিছি কেন কষ্ট দেওয়া। অন্যদিকে কিরণশঙ্করবাবু মনে মনে বেজায় ব্যস্ত হয়ে প্রায় রোজই বিকেলে একবার করে দোকানে গিয়ে সাতকড়িবাবুর সঙ্গে দেখা করে আসেন। তাঁর কেবলই মনে হয়, অমাবস্যা যেন এবার বড্ড দেরি করে আসছে। জীবনে অমাবস্যার জন্য এমন ব্যাকুলতা তিনি কখনও অনুভব করেননি। যেহেতু বৃহস্পতিবার ‘স্টেশন বাজার’ বন্ধ, তাই তিনি হাঁটতে হাঁটতে বিকেল নাগাদ ‘আঠারো কড়ি’-তে এলেন। শীতের বেলা, তাই তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা নামে। তখনও সন্ধ্যা নামেনি বটে, তবে দিনের আলোর উজ্জ্বলতা অনেকখানি কমে এসেছে। সদর দরজা খোলাই ছিল। কিরণশঙ্করবাবু ভিতরে এলেন। আর একটু এগুলেই হাতের ডান দিকে নিমগাছ আর তার তলাতেই সাতকড়িবাবুর সেই বিখ্যাত বাথটবটি।

কিরণশঙ্করবাবু এদিকে-ওদিক তাকাতেই নেত্যকে দেখতে পেয়ে হাতের ইশারায় ডাকলেন। নেত্যকে দেখে কিরণশঙ্করবাবুর মনে হল সে যেন বেজায় ব্যস্ত। নেত্য কাছে এসে জানতে চাইল, ‘কাকে চাই? ছোটবাবুকে? তিনি তো আজ ব্যস্ত। তবু আসুন আমার সঙ্গে।' নেত্যর পিছন পিছন কিরণশঙ্করবাবু সাতকড়ির ঘরে এলেন। সাতকড়ি কিরণশঙ্করবাবুকে

দেখে বলল, ‘কী ব্যাপার? হঠাৎ আপনি? আপনার তো অমাবস্যার দিন আসার কথা।'

কিরণশঙ্করবাবু মাথা নেড়ে বললেন, ‘তা ঠিক! তবে কি জানেন, এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তাই ভাবলাম আপনার সঙ্গে একটু দেখা করে যাই। নেত্যর কাছে শুনলাম, আপনি নাকি আজ ব্যস্ত। তাই বেশিক্ষণ বসব না।'

সাতকড়ি বলল, ‘আজ্ঞে, তেমন কিছু নয়। আজ সন্ধ্যার পর আমাদের বাবা আসছেন তো, তাই একটু আর কি!’

কিরণশঙ্করবাবু প্রথমে ‘ও তাই নাকি’ বলে পরক্ষণেই চমকে উঠলেন। তাঁর মনে হল, সাতকড়িবাবুর বাবা সে তো কবেই গত হয়েছেন। তবে আজ কার বাবা আসছেন? কৌতূহলটা দমন করতে না পেরে সামনে দাঁড়ানো নেত্যকেই জিজ্ঞেস করলেন। ‘কার বাবা আসছেন?’

নেত্য পরম শ্রদ্ধাভরে উত্তর দিল, ‘আমাদের কর্তাবাবু। সব কড়ির বড় কড়ি এককড়ি মুখুজ্যে। উনি মাসে একবার করে ছেলেদের দেখতে আসেন। ছেলে অন্ত প্রাণ তো।’

কিরণশঙ্করবাবু মনে মনে শিহরিত হয়ে সাতকড়ির দিকে তাকালেন। সাতকড়ির মুখে কোনও ভাবান্তর নেই। ঠিক সেই সময় এস্রাজ হাতে দু’কড়ি মুখুজ্যে ঘরের চৌকাঠে পা রেখে বলল, ‘সাতকড়ি, বাবার আসার টাইমটা কখন?’

সাতকড়ি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এখনই এসে যাবে। চল, বাবার ঘরে গিয়ে বসি।'

কিরণশঙ্করবাবুর ভিতরে কৌতূহল হচ্ছিল ঠিকই, তবে এই কড়ি ভাইদের পারিবারিক ব্যাপারে তাঁর উপস্থিত থাকাটা সংগত হবে কিনা সেই কথাটা ভেবে বিব্রত বোধ করছিলেন। দু’কড়ি মুখুজ্যে হঠাৎ কিরণশঙ্করবাবুকে দেখে বললেন, ‘সাতকড়ি, ইনি কে?’

কিরণশঙ্করবাবু বলার আগেই সাতকড়ি কিরণশঙ্করবাবুর পরিচয় এবং তাঁর প্রয়োজনের কথাটা জানিয়ে দিতেই দু’কড়ি বলে উঠল, ‘আজ খুব ভাল দিনে এসেছেন। আজ আমাদের বাবা আসছেন, চলুন, আমরা সবাই বাবার ঘরে যাই।'

কিরণশঙ্করবাবুর যেন কিছুই করার নেই, অনেকটা নিশিতে পাওয়া মানুষের মতো হাঁটতে হাঁটতে সেই দরজাটার সামনে এসে দাঁড়ালেন। সেই দরজার গায়ে একটিমাত্র কড়ি বসানো। কিরণশঙ্করবাবু ভেবেছিলেন, ঘরটা বুঝি অন্ধকার থাকবে। ঘরের ধূপের ধোঁয়া-ঢোঁয়াও থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু ঘরটা মোটেও সেরকম নয়। একদিকে একটি খাটে পরিপাটি করে বিছানা সাজানো। ঘরের মধ্যে ভেলভেটে মোড়া একটি চেয়ারে একটি মানুষের বিচিত্র একটি ছবি। কোনও মানুষের এমন ফোটো কিরণশঙ্করবাবু কখনও দেখেননি। ঘরের সবক’টা আলোই দিব্যি জ্বলছে। ওই ফোটোর সামনে বাঁয়া আর তবলা নিয়ে যিনি বসে, সম্ভবত তিনিই সংগীতসাধক তিনকড়ি। দু’কড়ি এবং সাতকড়িকে চেনেন, তিনকড়িকেও অনুমানে চিনে নিতে কষ্ট হল না। অতএব, অন্যজন যে পাঁচকড়ি তাতে আর সনে থাকার কথা নয়। কিন্তু কড়ির চিন্তার থেকেও কিরণশঙ্করবাবুকে এই মুহূর্তে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি পীড়ন করছিল তা হল চেয়ারে বসানো, মাল্যভূষিত ওই ছবিটি। তিনি সাতকড়িবাবুকে বললেন, ‘এই ছবিটি কি আপনার পিতৃদেবের?'

সাতকড়ি তার পিতৃদেবের ছবির দিকে চোখ রেখেই উত্তর দিল, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ।' কিরণশঙ্করবাবু আবার একই ভাবে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার পিতৃদেবের দু’চোখে ওসব কী?’

সাতকড়ি এবার চোখ ফিরিয়ে কিরণশঙ্করবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ও কিছু নয়। তুলসিপাতা। আসলে তখন অত ছবি তোলার চল ছিল না। এখন তো কথায় কথায় রঙিন ছবি। জন্মদিনেও ভিডিও তোলা হচ্ছে। আমার বাবার আমলে তেমন ছিল না। শখ করে বাবার একখানা ছবি আঁকানো হয়েছিল। কিন্তু ছবিটা দেখে নিজেদের বাবাকে আমরা চিনতে পারিনি। বাবাও ওই ছবিটা দেখার পর রোগশয্যাতেই দু’বার হিক্কা তুলে মারা গিয়েছিলেন। আমার মা বাবার মৃত্যুতে নয়, ওই ছবি দেখেই অজ্ঞান হয়ে যান। তারপর...।'

এবার দু’কড়ি মুখুজ্যে বলল, ‘তারপর আর কী? বাবা তো মারা গেলেন। আত্মীয়স্বজনরা, বিশেষ করে মা বলল, তোর বাবার একটা ছবি না থাকলে কি চলে? শ্রাদ্ধকর্মেও একটা ফোটো দরকার। তখন আমি ব্যারাকপুর থেকে একজন ফোটোগ্রাফার ধরে আনি। তখন তো বাবা মারা গেছেন। কী আর করা যাবে। ওই অবস্থাতেই আমরা ভাইয়েরা মিলে বাবাকে পিছন থেকে ঠেলে তুলে ধরি। খুবই কঠিন কর্ম। কিন্তু কঠিন বলে পিছিয়ে যাওয়ার ছেলে তো আমরা নই। এটা হচ্ছে সেই ঠেলে তোলা ছবি। তখন তো চোখে অলরেডি তুলসিপাতা চাপানো হয়ে গেছে। তাই আমরা আর ওটাকে ডিসটার্ব করিনি।'

তবলায় একটা চাঁটি মেরে তিনকড়ি বলল, 'কী রে, ছোট, বাবা এত লেট করছে কেন? আত্মাও কি ট্রেন আর প্লেন হয়ে গেল?’

সাতকড়ি বলল, ‘স্পেসের অবস্থা তো সবসময় একরকম থাকে না। তা ছাড়া বয়স্ক লোক। আসতে একটু দেরি হতেই পারে। তোর মনে নেই। ভজুর ঠাকুর্দা একবার আসতে গিয়ে ডিশ অ্যান্টেনায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে কী বিপদ। ওই ফ্ল্যাটবাড়িটার চুয়ান্নটা টিভি চিরতরে খারাপ হয়ে গেল। ভাগ্যিস, খবরটা প্রচার হয়নি। প্রচার হলে টিভি সেট বানাবার কোম্পানিগুলো বেজায়...।'

ঘরের বড় বাতিটা দপদপ করে হঠাৎ নিভে গেল। বাতি নিভে যেতেই তিনকড়ি জোরে জোরে তবলায় চাঁটি মেরে গেয়ে উঠল, কলিয়না সঙ্গ করতা। সেইসঙ্গে বেজে উঠল দু’কড়ির এস্রাজ। পাঁচকড়ি সঙ্গে সঙ্গে পা দু’টো ওপরে তুলে মাথা মেঝেতে রেখে শীর্ষাসন আরম্ভ করে দিল। কিরণশঙ্করের মনে হল, এসবই যেন স্বর্গত পিতার আত্মার প্রতি সন্তানদের শ্রদ্ধাঞ্জলি। কিরণশঙ্করবাবুর অবস্থা খুবই শোচনীয়। ভয়, আতঙ্ক, কৌতূহল সব যেন মিলেমিশে একটা পিণ্ড হয়ে গিয়ে তাঁর বুকের মধ্যে পিং পং বলের মতো লাফাচ্ছে।

হঠাৎ তাঁর পাশ থেকে সাতকড়ি মুখুজ্যে উঠে গিয়ে সুসজ্জিত চেয়ারটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলল, ‘বাবা, মনে প্রশ্নের উদয় হয়েছে। সেদিক কাগজে পড়লুম, মশার নাকি সাতচল্লিশটা দাঁত। ওই শরীরের ওই ক্ষুদ্র মুখে সাতচল্লিশটা দাঁত থাকে কেমন করে? ওদের কি দন্ত মাজনের ব্যাপার আছে? ওদের কি মানুষের মতো দাঁত ব্যথা হয়?’

এবার আর ঘরের মধ্যে কোনও আওয়াজ নেই। একেবারে শব্দহীন স্তব্ধ নীরবতা। হঠাৎ অতি চিকন গলায় উত্তর এল, ‘জীবিত অবস্থায় মশার কামড় খেয়েছি কিন্তু দাঁত গুনিনি। যে গুনে লিখেছে তাকে জিজ্ঞেস কর।'

পরক্ষণেই ওই চিকনগলা গম্ভীর হয়ে প্রশ্ন করল, ‘ঘরের মধ্যে একটা কড়ি বেশি কেন? আমি তো চারজনকে রেখে চোখ বুজেছিলাম। পঞ্চমটি আমদানি হল কোত্থেকে?’

কিরণশঙ্করবাবু বুঝতে পারলেন, তিনি আঠেরো কড়ির একেবারে পয়লা কড়ির চোখে পড়ে গেছেন। ঘরের জ্যান্ত কড়ির দল এখন তাঁর দিকে তাকিয়ে। কিরণশঙ্কর এতকালের চাকরিতে নানা সমস্যা সংকটে পড়েছেন। দু’বার দু’-দুটো রুগ্ন শিল্পকে চাঙ্গা করার দায়িত্ব তাঁর ওপরে দেওয়া হয়েছিল। কর্তব্যে ত্রুটি করেননি। তাঁর চাকরিজীবনেই কোম্পানি দুটির রুগ্নতা কমা তো দূরের কথা, এত দ্রুত বেড়ে গিয়েছিল যে, কোম্পানি দুটোর অস্তিত্বই আর নেই। তবুও অবসর নেওয়ার সময় তাঁর বিদায় সংবর্ধনা সভায় তাঁরই স্টেনো কাম পি এ সুরুচি সমাদ্দার হারমোনিয়ম বাজিয়ে গান গেয়েছিলেন, 'তোমার বিজয় মুকুট স্বপ্নে দেখি...।' এই গানটা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি না কটাক্ষ, সেটা তিনি আজও বুঝতে পারেননি। যেমন এখন বুঝতে পারছেন না তিনি কী করবেন? তিনি যখন এইসব ভাবছেন, তখন সাতকড়ি সংক্ষেপে কিরণশঙ্করের পরিচয়টা দিয়ে ফেলেছেন। সাতকড়ি আবার প্রশ্ন করল, ‘বাবা, পৃথিবী জুড়ে তো অশান্তি। এই অশান্তি দমনের উপায় কী?’

আবার সেই চিকন গলায় উত্তর এল, ‘পিপীলিকার পাখা যখন গজায়, সেটা ছোটবেলায় পড়িসনি?’

কিরণশঙ্করবাবু আস্তে করে সাতকড়িকে বললেন, ‘আমি কি কোনও প্রশ্ন করতে পারি?’ সাতকড়ি উত্তর দেওয়ার আগেই সেই চিকন গলা বলে উঠল, 'বদ্যির বেটা আবার কী শুধোতে চায়?’

কিরণশঙ্কর গলাটা কেশে নিয়ে প্রথমে পরিষ্কার করলেন। তারপর ‘জেঠু’ বলে সম্বোধন করতে গিয়ে ধন্দে পড়ে গেলেন। অদৃশ্য আত্মাকে জেঠু-কাকু বললে তিনি যদি কিছু মাইন্ড করেন। একবার দিল্লিতে এক মন্ত্রীকে আবেগবশে ‘দাদা’ সম্বোধন করে ভীষণ গালি খেয়েছিলেন। চোখ পাকিয়ে মন্ত্রী বলেছিলেন, ‘নো দাদাগিরি। এই ‘দাদা’ ব্যাপারটা প্রিইন্ডিপেন্ডেন্ট যুগে ছিল না। এটা আমদানি হয়েছে স্বাধীনতার পর। কেউ কোনওদিন গাঁধীজিকে গাঁধীদা বলে ডেকেছে, না কি নেহরুজিকে জহরদা বলেছে। আপনাদের বেঙ্গলে দাদা-দিদির ছড়াছড়ি।

কিরণশঙ্কর চুপ করে ছিলেন বলে সেই চিকন গলা আবার জিজ্ঞেস করল, 'বদ্যির ব্যাটা চুপ করে আছে কেন?’

কিরণশঙ্কর সাহস সঞ্চয় করে বললেন, 'আজ্ঞে, আত্মা তো দৃষ্টির অগোচর। আপনি যদি স্বর্গবাসী হন। তবে মর্ত্যে আমাদের কাছে আসতে কত সময় লাগে? আপনার আসার রুটটা...'

চিকনগলা এবার হেসে উঠে বলল, ‘তুমি কি স্বর্গ টু কলকাতার আর টি ও হবে? আমাদের এখন রুট বদলে বদলে আসতে হয়। আত্মায় আত্মায় প্রায়ই জ্যাম-জট হয়ে যাচ্ছে। এবার কথা নয়। যাওয়ার সময় হল।'

‘যাওয়ার সময় হল’ বলার সঙ্গে সঙ্গে এস্রাজ আর তবলা বেজে উঠল। ঘরের সব ক’জন জ্যান্ত কড়ি কোরাস গাইতে লাগল, ‘ধন্য জগৎ পিতা এককড়ি। তুমি থাকলে মাথার পরে/ ভবের ভাবনা কে করে/ আমরা সবাই কড়ির দাস। কড়ির ঘরেই মোদের বাস।'

এই বন্দনাগীতি শেষ হওয়ার পর কিরণশঙ্করবাবু যখন তাঁর গীতাঞ্জলি কমপ্লেক্সের দিকে রওনা দিলেন, তখন রাত ন'টা বেজে গেছে। হেঁটে যেতে যেতে তাঁর কেবলই মনে হতে লাগল, কেউ যেন ক্রমাগত তাঁর ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলে যাচ্ছে আর চিকন গলায় ডাকছে, ‘বদ্যির ব্যাটা—।’

প্রথম-দুটো দিন কিরণশঙ্করের কাটল গভীর আচ্ছন্নতার মধ্যে। যাকে বলে, ‘যাচ্ছেতাই’ অবস্থা। পেটের গোলমাল দেখা দিল। একেবারে বিশ্রী রকমের গোলমাল। স্ত্রী উমা দেবী বাধ্য হয়ে ডাক্তার ডাকলেন। ডাক্তারের নামটি ছোট, কিন্তু ডিগ্রির লেজটা দীর্ঘ। ডাক্তারের নাম বীর সেন, তার পাশে হরেক জায়গার ডিগ্রি, লন্ডন, ডাবলিন, জার্মানি, ভিয়েনা ইত্যাদি। অতসব জায়গায় গিয়ে কী কী শিখেছেন সেটা কিরণশঙ্করবাবু জানেন না। বাড়িতে রোগী দেখতে বিশেষ আসেন না। যেহেতু একই কমপ্লেক্সে থাকেন তাই বাইরের সব কাজ সেরে রাত দশটা নাগাদ কিরণশঙ্করবাবুকে দেখতে এলেন। যত কাছেই থাকুন না কেন, ঘরে পা দিলেই পাঁচশো টাকা।

বীর সেন দোতলায় উঠে প্রথমে রোগের বিবরণ শুনলেন। তারপর জিভ বার করতে বলে চোখটা টেনে দেখে নিলেন। প্রেশার মাপলেন। পেটে হাত দিয়ে টিপতে টিপতে বললেন, ‘কী খেয়েছিলেন? এই বয়সে খাওয়াদাওয়া...’

এইটুকু বলার পরই উমা দেবী বললেন, ‘তেমন কিছুই খাননি। আসলে দু'দিন আগে আঠারো কড়ি-তে গিয়েছিলেন। সেইদিন রাত্রে ওই বাড়িতে কড়ি ভাইদের বাবা এককড়ি মুখুজ্যে এসেছিলেন। সেই উপলক্ষে বাতাসা ভোগ দেওয়া হয়েছিল। তারই একটা বাতাসা খেয়েছিলেন। তারপর থেকেই তো এই অবস্থা।'

বীর সেন ভ্রূ কুঁচকে বললেন, ‘আঠারো কড়ির এককড়ি? তিনি তো শুনেছি বহুকাল আগে মারা গেছেন। তিনি কেমন করে আসবেন?’

কিরণশঙ্করবাবু ক্ষীণ গলায় বললেন, তিনি সশরীরে আসেননি। তাঁর আত্মা এসেছিল। মাসে একবার করে ছেলেদের সঙ্গে কথা বলতে আসেন। আমার সঙ্গেও তাঁর কথা হয়েছে। উনি বাতাসা পছন্দ করেন বলে সাদা বাতাসা দেওয়া হয়েছিল। উনি একটা খেয়েছেন। বাকিগুলো থেকে প্রসাদ হিসেবে আমি একটা খেয়েছি।'

কিরণশঙ্করবাবুর কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার বীর সেনের কান থেকে স্টেথোর নল খসে পড়ল। ব্যাগ গুটিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘কাল প্রেসক্রিপশন করে পাঠিয়ে দেব। আজ বড্ড টায়ার্ড।’

টাকা বার করে দিতে গিয়ে উমা দেবী দেখেন ডাক্তার বীর সেন ঘর থেকে বারান্দায় গিয়ে মন্টুকে বলছে, ‘আমাকে একটু সামনের ফ্ল্যাটটা পর্যন্ত এগিয়ে দাও তো।'

মন্টুকে নিয়ে ডাক্তারবাবু নীচে নেমে যাচ্ছেন দেখে উমা দেবী বললেন, ‘ডাক্তারবাবু, আপনার ভিজিটটা...।'

সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নামতে নামতে কাঁপা কাঁপা গলায় বীর সেন বললেন, 'কাল সকালে পাঠিয়ে দেবেন। এখন আর ওপরে উঠব না।'

কিরণশঙ্কর তখন শুয়ে শুয়ে ভাবছিলেন, অন্যের অচেনা বাপের আত্মার কণ্ঠস্বর শুনে আমার যদি এই হাল হয়, তা হলে নিজের বাপের বেলায় কী হবে? কিন্তু তাই বলে তো পিছিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সামনেই সেই বহুবাঞ্ছিত অমাবস্যা। বাবার অত দামি ঘড়ি আর ময়ূরটার সন্ধান পাওয়া জরুরি। ওই ময়ূর ঘড়ির মধ্যে আরও বিবিধ রত্ন থাকা অসম্ভব নয়।

পরদিন ডাক্তার বীর সেনের কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন আনতে গিয়ে মন্টু শুনল, ডাক্তারবাবু নিজেই অসুস্থ। তাঁর শরীরে সুগারের মাত্রা হঠাৎ কমে গিয়ে তিনি শয্যাশায়ী। তাঁকেই কল দিয়ে অন্য ডাক্তার দেখাতে হচ্ছে। অগত্যা উমা দেবী সাতকড়িবাবুকে খবর পাঠালেন। সাতকড়িবাবু এসে কিরণশঙ্করবাবুকে দেখে-টেখে বললেন, ‘এ সামান্য ব্যাপার! মনে মনে বাবার নাম করুন, সেরে যাবে।

কিরণশঙ্করবাবু উঠে বসতে বসতে বললেন, ‘কার বাবার নাম?’

সাতকড়ি বলল, ‘এখন আমার বাবার নাম করুন। বাবার বন্দনাগীতিটা মনে আছে তো? সেটা মনে মনে আউড়ে যান। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ফিট হয়ে যাবেন!’

কিরণশঙ্করবাবু যখন এককড়ির বন্দনাগীতিটা মনে করবার চেষ্টা করছিলেন তখন সাতকড়ি উমা দেবীর দিকে তাকিয়ে বলল, 'আমার বাবার ব্যাপারই আলাদা! কতকাল আগে দেহ রেখেছেন, অথচ সন্তানদের এখনও ভোলেননি। ভালবাসা একটুও কমেনি। এই তো, আর কিছুদিন পরেই সরস্বতী পুজো। আমাদের ঘুড়ির মাঞ্জা এখনও বাবার ফরমুলায় হয়। ওইদিন বাবা স্বয়ং আমাদের ছাদে ঘুরে বেড়ান। আজ পর্যন্ত কারও কাছে শুনবেন না, আঠারো কড়ির ছাদ থেকে কখনও কোনও ঘুড়ি কাটা গেছে। বেলা এগারোটায় মা সরস্বতীর খিচুড়ি ভোগ খেয়ে আমরা চার ভাই চারখানা ঘুড়ি আকাশে ছাড়ি। বিকেলবেলা ওই চারখানাই আবার নামিয়ে আনি। আমাদের ঘুড়ি তো কাটা যায় না। ও যে বাবার ঘুড়ি। বাবার মাঞ্জা। একবার কী হল জানেন?’

উমা দেবী হঠাৎ স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'কী হল? আবার বাথরুমে যাবে?’ কিরণশঙ্করবাবু একগাল হেসে বললেন, ‘না। বড্ড খিদে পাচ্ছে। এই ক’দিন তো শুধু ত্যাগ করেছি। গ্রহণ কিছু করিনি। তাই।'

উমা দেবী সাতকড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী খেতে দিই বলুন তো?’ সাতকড়ি উত্তর দিল, ‘এনি থিং। বিস্কুট, চিঁড়ে ধোয়া, সেঁকা পাউরুটি।’

উমা দেবী উঠে গিয়ে বিস্কুটের প্যাকেট এনে কিরণশঙ্করবাবুর হাতে দিয়ে বললেন, ‘প্যাকেট খুলে একটা একটা করে খাও।’

কথা শেষ করেই উমা দেবী সাতকড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী যেন বলছিলেন?’

সাতকড়ি বলল, ‘ওই আমার বাবার ঘুড়ি মাহাত্ম্য। গোবিন্দপুরের এক উঠতি সন্তান। নাম হচ্ছে ভজা। সে আমাদের ঘুড়ি কাটবে বলে চন্দননগর থেকে সুতোয় মাঞ্জা দিয়ে এল। চন্দননগর মাঞ্জার কী জানে। গিয়ে উঠলে মল্লিকদের ছাতে। ফাঁই ফাঁই করে একটা চৌখুপ্পি বেড়ে এল। মেজদা তিনকড়ি বললেন, বাবা টেনে খেলব না ছেড়ে? বাবা বললেন, বাড়তে দে। পরে হাতের নুড়ো থেকে টেনে দিবি। তাই হল, একশো গজের ওপর বেড়ে গেছে আর মেজদার পেটকাট্টিটা বাচ্চা ছাগলছানার মতো ভজার হাতের কাছে গোত্তা দিয়ে সুতোর তলায় মারলে এক টান। একেবারে এককড়ি মুখুজ্যের সনাতনী টার্ন। বাপের বাহুর বল ছেলের হাতে। নিমেষে ভজার ঘুড়ি ভোকাট্টা। দ্রৌপদীর আঁচলের মতো ভজার ঘুড়ির লম্বা সুতো বেণীবাবুদের লাউমাচার ওপর দিয়ে নাকখত দিতে দিতে পেরেক কলের দিকে চলে গেল।'

কিরণশঙ্করবাবু ক'খানা বিস্কুট ততক্ষণে খেয়েছেন বোঝা গেল না। কিন্তু বিস্কুটের প্যাকেটটাকে খুব দুর্বল দেখাচ্ছিল। সেই টান টান ভাবটা নেই। বিছানায় বিস্কুটের গুঁড়ো ছড়িয়ে আছে। খেতে খেতেই বললেন, ‘ভজার মস্তানি ঠাণ্ডা হল?'

সাতকড়ি বলল, ‘অত সহজে হয়! পরপর তিনটে ঘুড়ি কাটার পর আমাদের ছাতে ইট ছুড়তে লাগল। বাবাকে বললুম, বাবা, ভজা ইট ছুড়ছে। বাবা বলল, তোরা চারখানা ঘুড়ি নামিয়ে আন। আমরা নামিয়ে আনলুম। বাবা বললেন, আমি এখন চারটে ঘুড়ি নিজেই অপারেট করব। চারখানা ঘুড়ি দিয়ে ভজার মাথায় গোত্তা মেরে ঠোকরাব। আশ্চর্য ব্যাপার, হাওয়ার বিপরীত দিকে ঘুরে গিয়ে চারখানা ঘুড়ি ভজার মাথায় ঠোকরাতে লাগল। দেখে মনে হবে, ঘুড়ি নয়, যেন বাজপাখি। লক্ষ করে দেখবেন, ভজার মাথার চুল একরকম নয়। দু’টো জায়গায় ওপেন স্পেস। ওখানে স্টিচ্ করার পর আজ অব্দি আর চুল গজাল না।’

বাচ্চা ছেলেরা যেমন করে রূপকথার গল্প শোনে, কিরণশঙ্করবাবু আর উমা দেবী তেমন করেই এককড়ি মুখুজ্যের কীর্তিকাহিনি শুনছিলেন। কিরণশঙ্করবাবু দেহে মনে বল পেয়ে এবার জোরে গেয়ে উঠলেন, ‘ধন্য জগৎ পিতা এককড়ি। তুমি থাকলে মাথার পরে/ ভবের ভাবনা কে করে/ আমরা সবাই কড়ির দাস/ কড়ির ঘরেই মোদের বাস।

কিরণশঙ্করবাবুর কাছ থেকে উঠে আসার সময় সাতকড়ি বলল, ‘পরশু কিন্তু পূর্ণ অমাবস্যা। আপনার বাবা কী খেতে ভালবাসতেন?’

কিরণশঙ্করবাবু বললেন, 'দরবেশ।'

চিন্তিত মুখে সাতকড়ি বলল, 'দরবেশের কদর তো কমে গেছে। তবু পুরনো বনেদি দোকানে চেষ্টা করে দেখুন পেয়ে যাবেন। বেজোড় সংখ্যক দরবেশ নিয়ে সূর্য ডোবার আগে আসবেন। বাবার ফোটোও সঙ্গে থাকে যেন।

মন্টুকে সঙ্গে নিয়ে গীতাঞ্জলি কমপ্লেক্সের নীচে নেমে এল সাতকড়ি। মন্টুকে দেখে গাড়ি থেকে নামতে নামতে ডাক্তার বীর সেন মন্টুকে প্রশ্ন করল, ‘কিরণশঙ্করবাবু কেমন আছেন?’ মন্টু উত্তর দিল, ‘দিব্যি ভাল। এই যে, উনি সাতকড়িবাবু আসাতেই চাঙ্গা হয়ে গেছেন। উনি...’

সাতকড়ি নমস্কার করে বলল, 'আজ্ঞে, আমি আঠারো কড়ির ছোট কড়ি’

বীর সেন ভদ্রতাবশত হাত তুলে নমস্কার করতে যাচ্ছিলেন কিন্তু করা হল না। ড্রাইভারকে বললেন, ‘কানাই, আবার বোধ হয় সুগার ফল করছে। আমাকে ধরে ওপরে তোল।'

সাতকড়ি ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, 'বড্ড পুওর হেলথ!’

একে অমাবস্যা, তায় লোডশেডিং। গোবিন্দপুর যেন অন্ধকার ছাতা দিয়ে ঢাকা। সন্ধ্যার দিকে নিজেদের জেনারেটরে দোকানের আলোগুলো জ্বলছিল, কিন্তু রাত আটটার পর দোকানগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গোবিন্দপুরের স্টেশন রোডটা যেন আলকাতরায় ডোবা রাস্তা। এইরকম ঘনঘোর অন্ধকারে গোবিন্দপুরে একটা আপত্তিকর ব্যাপার প্রায়ই দেখা যায়। লেচো ঘোষ অর্থাৎ লোচন ঘোষের পালিত কৃষ্ণবর্ণের অতিকায় ষাঁড়টি লোডশেডিং হলেই অন্ধকার দেখতে পরমানন্দে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে এবং মন্থর গতিতে যত্রতত্র ঘুরে বেড়ায়। নিজে গায়ে পড়ে কাউকে কোনওদিন কিছু না করলেও অন্যরা দেখতে না পেয়ে তার গায়ে পড়েছে বহুবার। এ নিয়ে অতীতে বিস্তর ঝামেলা হয়ে গেছে। পুরসভা থেকে লোচন ঘোষকে ডেকে বলা হয়েছিল, ‘তোমার ষাঁড় অন্ধকার হলে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। এতে জনজীবন বিঘ্নিত হচ্ছে। অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে। ষাঁড় ঘরে বেঁধে রাখতে পারো না?’

লোচনের সেই একই জবাব, ‘এই ষাঁড় থাকে, খায় আমার বাড়িতে, এ কথা ঠিক। কিন্তু এই ষাঁড়ের মালিক আমি নই। আজ থেকে দু’ বছর আগে আমার মানত পূর্ণ করতে এই ষাঁড় বাবা ভোলানাথকে উৎসর্গ করেছি। যা কিছু বলবার, বাবাকে বলুন।'

পুরপিতা এবং মাতারা পরস্পরের দিকে তাকালেন। জনৈকা পুরমাতা বললেন, ‘কিন্তু লোডশেডিং-এর সময়টা একে অন্তত বেঁধে রাখুন।'

লেচো ঘোষও সঙ্গে সঙ্গে বলে, ‘তার চাইতে ভাল লোডশেডিংটা বন্ধ রাখা। রাতে না করে দিনে করলেও তো হয়। আমার কেলো যে লোডশেডিং হলেই ঘরে থাকতে চায় না। দড়ি ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়ে। তাকে যে রোখা যায় না।'

পুরপিতা কেলোর গলায় ঘণ্টা লাগাবার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু ঘণ্টা বাঁধার লোক থাকলেও তিরিশ টাকা পঞ্চাশ পয়সা দিয়ে ঘণ্টা কিনবে কে? পুরসভা ঘণ্টা কেনার টাকাটা কোন খাতে খরচ দেখাবে এই নিয়ে পুরপিতা ও মাতাদের দুটো আলোচনাসভায় চা, সিঙাড়া আর অমৃতের বিল হল মোটে বাহাত্তর টাকা পঁচাত্তর পয়সা। কিন্তু ঘণ্টা কেনার সমস্যা মিটল না। পুরপিতা পরমানন্দ পুরকাইত অনেক ভেবেটেবে নিজের পকেট থেকেই ঘণ্টা কেনার সাড়ে তিরিশ টাকা দিলেন। লোচন ঘোষ সবার সামনে কেলোর গলায় ঘণ্টা বেঁধে দিয়েছিলেন। মুশকিল হল, ভোলানাথের চরণে উৎসর্গীকৃত কেলো চললে ফিরলে তো ঘণ্টা বাজবে। যদি ঘাপটি মেরে কোনও গলির মোড়ে শুয়ে থাকে, তা হলে তো ঘণ্টা বাজার কোনও চান্স নেই। এই ব্যাপারটা কেউ ভেবে দেখেননি বলেই বিশ্রী ব্যাপারটা ঘটে গেল। ঘণ্টা পাওয়ার জন্য অথবা পুরপ্রধান টাকা দিয়ে ঘণ্টা কিনে দিয়েছেন যে কোনও কারণেই হোক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য কোনও এক অমাবস্যা এবং লোডশেডিং, অন্ধকারের এই যুগল মিলনের রাত্রে কেলো ঘাপটি মেরে শুয়ে ছিল পুরপিতার বাড়ির গেটের সামনে। যা হওয়ার তাই হল। পুরপিতা হাতের ব্যাগসুদ্ধ আছড়ে পড়লেন কেলোর ওপর। চিৎকার, চ্যাঁচামেচির পর ঘর থেকে আলো নিয়ে আসার পর দেখা গেল পুরপিতা রিক্ত হস্তে দাঁড়িয়ে এবং তাঁর হাতের ব্যাগটি কেলোর শিঙে দোদুল্যমান। এই ঘটনার পর জনৈকা পুরমাতা প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কেলোর পিছনে অথবা সামনে ব্যাটারির সাহায্যে কোনও লাল আলো জ্বালিয়ে রাখা সম্ভব কিনা। পুরমাতার প্রস্তাবটি এখনও বিবেচনাধীন।

লেচো ঘোষের কেলো সম্পর্কে এই তথ্যটুকু জানিয়ে রাখা এই জন্যই দরকার যে, আজ ঘোর অমানিশা এবং লোডশেডিং কবলিত গোবিন্দপুর, প্রাক্তন আই এ এস কিরণশঙ্কর গুপ্ত যাবেন তাঁর স্বর্গত পিতার আত্মার সঙ্গে কথা বলতে। পিতৃ অনুরাগের প্রধান কারণ অবশ্যই সেই ময়ূর ঘড়ি। আঠারো কড়ি বাড়ির সামনে ছোট একটি ওলাইচণ্ডী মন্দির। বেলা সাড়ে চারটা নাগাদ যাওয়ার সময় কিরণশঙ্করবাবু সেই বিখ্যাত ‘কেলোকে’ ওলাইচণ্ডীতলায় বিচরণ করতে দেখেছেন। তখন থেকেই তিনি ফেরার কথা ভাবছিলেন। তাঁর যেন মনে হয়েছিল, কেলো একবার অলসভাবে চোখ তুলে তাঁর দরবেশের ঠোঙাটির দিকে তাকিয়েছিল। বাবার স্পর্শের পর দরবেশ তো আর নিছক দরবেশ থাকবে না। মহাপ্রসাদ হয়ে যাবে, কেলো কি তখনও ওলাইচণ্ডীতলায় বিরাজ করবে?

এইরকম অবান্তর কথা ভাবতে ভাবতেই কিরণশঙ্কর আঠারো কড়ির সদর দরজায় পৌঁছে গেলেন। তখনও চারপাশে আলো ছিল। কিন্তু এই একটু আগে সাতকড়ির সঙ্গে চিলেকোঠার ঘরে আসতে গিয়ে দেখলেন, গোবিন্দপুর অন্ধকারে ডুবে আছে। চিলেকোঠায় প্রবেশ করবার আগে কিরণশঙ্করবাবু ওলাইচণ্ডী মন্দিরের চাতালের দিকে তাকাবার বৃথা চেষ্টা করেছিলেন। কারণ, এখান থেকে ওলাইচণ্ডী মন্দিরের চাতাল দেখা যায় না। দেখা গেলেও বা কি? অন্ধকারের মধ্যে কোনও কালো জীবকে দেখতে পাওয়া সহজ ব্যাপার নয়।

চিলেকোঠার ঘরটি ছোট, কিন্তু কিরণশঙ্করবাবু দেখলেন, ঘরটি পরিপাটি করে সাজানো। দিনের আলো থাকতে থাকতেই কিরণশঙ্করবাবু পিতৃদেবের ছবিটি সাতকড়িবাবুর হাতে দিয়েছিলেন। এই ঘরের একটি সাদা কাপড় ঢাকা হাতলবিহীন চেয়ারে সেই ছবিটি গাঁদাফুলের একটি মালায় শোভিত হয়ে আছে। নেত্য একটা রেকাবিতে পরম যত্নে দরবেশ সাজাতে ব্যস্ত।

কিরণশঙ্করবাবু এদিক-ওদিক তাকিয়ে বললেন, ‘ভাই সাতকড়ি, ঘরটা খুব ছোট হয়ে গেল না তো?”

সাতকড়ি একগোছা ধূপকাঠি জ্বালতে জ্বালতে বলল, ‘ছোট-বড়তে কিছু যায় আসে না। আপনার বাবার জন্য চিলেকোঠাটা কেন বাছলাম জানেন?’

কিরণশঙ্করবাবু মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘না, তা তো জানি না।'

ধূপদানিতে ধূপকাঠির গুচ্ছটা গুঁজে গুঁজে দিতে দিতে সাতকড়ি বলল, ‘আপনার বাবার পক্ষে এই বাড়িটা একদম নতুন তো। তাই রিস্ক না নিয়ে ছাতের চিলেকোঠাতেই ব্যবস্থা করলাম। আপনার বাবার এখানে সরাসরি ল্যান্ড করতে কোনও অসুবিধে হবে না।'

সাতকড়ি যত সহজে এবং স্বচ্ছন্দে কথাগুলো বলে যাচ্ছিলেন, কিরণশঙ্করবাবু কিন্তু তত সহজ হতে পারছিলেন না। তাঁর শরীরের মধ্যে কেমন যেন একটা হচ্ছে। অথচ কী যে হচ্ছে সেটা বুঝিয়ে বলার মতো নয়। নেত্য দরবেশ সাজানোর কাজ শেষ করে ঘরের একটিমাত্র জানলা নিপুণভাবে বন্ধ করে দিল। একখানা মোটা মোমবাতি জ্বেলে দিতেই সাতকড়িবাবু দরজাটাও বন্ধ করে দিল। ওই একটিমাত্র মোমবাতির আলো ছাড়া ঘরের মধ্যে আর কোনও আলো নেই। সাতকড়ি এবার কণ্ঠস্বর গম্ভীর করে বলল, 'ওই মোমের আলোর দিকে চোখ রেখে নিজের বাবার কথা ধ্যান করুন।'

কিরণশঙ্কর জানতেন, তাঁকে এখন এইরকমই করতে হবে। তিনি মানসিকভাবে তৈরিই ছিলেন। মোমের আলোর দিকে চোখ রেখে স্বর্গত পিতৃদেবের ধ্যান যখন বেশ পাকাপোক্ত হতে যাচ্ছে, তখনই ওলাইচণ্ডীতলা থেকে লেচো ঘোষের ‘কেলো’ বিকট স্বরে ডেকে উঠল। এই তল্লাটে এই ডাক কে না চেনে। কেলোর হঠাৎ ডেকে ওঠার ভাবটা যেন, কিরণশঙ্করকে জানান দিয়ে বলা, ‘ভয় নেই, আমি আছি।' অথচ এখন এই অভয়বাণীর কোনও প্রয়োজন ছিল না।

কিরণশঙ্কর আবার মনঃসংযোগ করার চেষ্টা করলেন। তিনি দেখলেন, মোমের শিখাটা কাঁপতে কাঁপতে হঠাৎ নিভে গেল। আর ঘরভরতি অন্ধকারের মধ্যে সাতকড়ির কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ‘মহাশয় যদি এসে থাকেন তবে আসন গ্রহণ করুন। জল-মিষ্টি খান। পরে আপনার পুত্র...।'

সাতকড়ি সবে এই পর্যন্ত বলেছে, তখনই অন্যরকম গলায় একটি ধমক এল, ‘শাট-আপ! স্ট্যান্ড আপ অন দ্য বেঞ্চ।

সাতকড়ি বিচলিত হল না। সে জানত, কিরণশঙ্করবাবুর পিতৃদেব হেডমাস্টারমশাই ছিলেন। শুধু প্রশ্ন করল, ‘কাকে বলছেন স্যার?’

সেই গলা এবার বলল, ‘আমার ইডিয়ট ছেলেটাকে। আমার ফোটোর সামনে বসে মনে মনে কেলো ষাঁড়ের কথা ভেবে যাচ্ছে। আমার কিরণ যে এত দু’ নম্বরি, তা তো জ্যান্ত থাকতে বুঝতে পারিনি।'

সাতকড়ি এবার আদেশের গলায় বলল, “পিতার কাছে করজোড়ে ক্ষমা ভিক্ষা করে বিনীতভাবে প্রশ্ন নিবেদন করুন।'

কিরণশঙ্কর তাই করলেন। পিতৃদেবের আত্মা তাতে কতদূর সন্তুষ্ট হলেন সেটা বোঝা না গেলেও তিনি যে কিছুটা শান্ত হয়েছেন সেটা বোঝা গেল। সেই কণ্ঠস্বর এবার বলে উঠল, ‘যথেষ্ট হয়েছে, আর ন্যাকামো করতে হবে না। আমার হাতে সময় কম। আসছে হপ্তায় আন্তর্জাতিক আত্মা সম্মেলন হচ্ছে আমেরিকায়। সেখানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। আগে কথা ছিল এবারের সম্মেলন হবে ভারতের গুজরাতে। কিন্তু বিদেশি আত্মারা আসতে রাজি হল না। স্বয়ং যমরাজ, যিনি সম্মেলনের উদ্বোধক, তিনি গুজরাতকে তাঁর পক্ষে নিরাপদ বিবেচনা করছেন না। তাই আমেরিকায় যেতে হচ্ছে। বেঁচে থাকতে তো দেশটা দেখা হয়নি। এবার একটু ঘুরেফিরে দেখব। তোর যা জানবার চটপট বল।'

কিরণশঙ্করের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। চাপা উত্তেজনায় তাঁর গলা শুকিয়ে আসছিল। তিনি একটা ঢোক গিলে বললেন, ‘বাবা, আপনার সেই ময়ূর ঘড়িটির হদিশ যদি বলে দেন, তা হলে পিতৃস্মৃতি হিসেবে সেটাকে বুকে করে রাখতে পারি।'

কিরণশঙ্করবাবুর পিতৃদেবের আত্মা এবার কলকলিয়ে হেসে উঠে বলল, ‘তাই তো বলি, এত বাবা-বাবা কেন? এরই জন্যে আমার আত্মাকে এমন টানাহ্যাঁচড়া। জীবনে তো হাত পেতে নিয়ে গেলি, অর্জন করতে তো শিখলি না।'

কিরণশঙ্কর করুণ কণ্ঠে বলে উঠল, ‘বাবা, বাবা গো, তোমার চরণ...’ আত্মা আবার একটা ধমক দিয়ে খ্যানখেনে গলায় বলে উঠল, ‘আর চরণ ধরে টানাটানি করতে হবে না। বলে যাচ্ছি লিখে নাও। চেষ্টা করে খুঁজে নাও। এর বেশি বলা বারণ। বললেই সব্বোনেশে মরণ। লেখো...।'

কিরণশঙ্কর অন্ধকারেই লিখতে লাগলেন। আত্মা সেই একই রকম গলায় বলল, ‘ওল ফলে যেখানে, তারই কাছাকাছি। সাত থেকে সাঁতরে নন্দীর ঘাটে। ভগ্নরথের পশ্চিমে, নন্দী বসে ফন্দি করে কালো কোটের আড়ালে। বাপের ব্যাটা হলে খুঁজে দ্যাখো এবারে। চললুম। গুডবাই।'

হঠাৎ দরজাটা খুলে গেল। সাতকড়ি ঘরে বাতি জ্বালতে গিয়ে বুঝলেন, লাভ নেই। লোডশেডিং তখনও চলছে। নেত্য মোমবাতিটা জ্বেলে দেওয়ার পর গুনে দেখা গেল, একখানা দরবেশ কম। তার মানে কিরণশঙ্করবাবুর বাবা খেয়ে গেছেন।

সাতকড়ি কিরণশঙ্করবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হদিশ কিছু পেলেন?’

হতাশায় ভেঙে পড়ে কিরণশঙ্করবাবু বললেন, ‘বাবা তো আজেবাজে ছড়া বলে সবটাই গুলিয়ে দিয়ে গেলেন। এবার কী হবে?’

একখানা দরবেশ মুখে দিয়ে খেতে খেতে সাতকড়ি বলল, ‘এবারে কেসটা আর আত্মার স্টেজে নেই। পুরোপুরি গোয়েন্দা দফতরে চলে গেল।'

কিরণশঙ্করবাবু বললেন, ‘আমি তো এটা নিয়ে থানা-পুলিশ করতে চাই না।'

সাতকড়ি বোতল থেকে ঢক ঢক করে জল খেয়ে বলল, 'আমি নিজে একজন পার্টটাইম শখের গোয়েন্দা। নেত্য আমার জুনিয়র। আজকের রাতটা আমাকে ভাবতে হবে। আপনি বাবার প্রসাদ নিয়ে বাড়ি চলে যান।'

ছাতের ঘর থেকে নীচে নেমে আসার পরই আলো লক্ষণ। প্রসাদ সবাইকে দিয়ে খেতে হয়। খানকয়েক দরবেশ আমার হাতে ছেড়ে যান।' দরবেশ দেওয়াতে কিরণশঙ্করবাবুর কার্পণ্য ছিল না। শুধু জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই প্রসাদের আফটার এফেক্টটা কেমন হবে? বাতাসার মতো কি?’

এল। নেত্য বলল, ‘স্যর, এটা শুভ

নেত্য খানকয়েক দরবেশ নিয়ে পাত্রটা ফিরিয়ে দিতে দিতে বলল, “নিজের বাপ তো! মনে হয় ব্যাড কিছু হবে না। নিশ্চিন্তে চলে যান।'

ওলাইচণ্ডীতলা তখন শূন্য। অবশ্য আলো জ্বললে তার তো ঘরে ফিরে যাওয়ারই কথা।

দু’দিন ধরে সাতকড়িবাবুর আর দেখা পাওয়া গেল না। বাড়িতে এবং দোকানে খোঁজ নিতে গিয়েও ব্যর্থ হতে হল। সাতকড়ি না হয় কোনও কাজে কোথাও যেতে পারে, কিন্তু সাতকড়ির সঙ্গে নেত্যও যে কেন উধাও হল, তা বুঝতে পারছেন না কিরণশঙ্করবাবু। উমা দেবীও স্বামীর মতো হতাশ এবং বিষাদগ্রস্ত।

তিনদিনের মাথায় বেলা ন'টা নাগাদ সাতকড়ি আর নেত্য দু'জনেই কিরণশঙ্করবাবুর ফ্ল্যাটে এসে উপস্থিত। কিরণশঙ্করবাবু দু'জনকে দেখে বলে উঠলেন, ‘কোথায় ছিলেন মশাই? আপনাকে আমি হন্যে হয়ে খুঁজছি। আমার বাবা তো আমাকে বিষম এক ধাঁধায় ফেলে আমেরিকার সম্মেলনে যোগ দিতে চলে গেলেন।'

উমা দেবী অত্যন্ত দুঃখিতভাবে বললেন, ‘নিজের বাপ মরে গিয়ে যে নিজের ছেলের সঙ্গে এমন হেঁয়ালি করতে পারে, তা আগে জানতাম না।'

সাতকড়ি চেয়ারে বসতে বসতে বলল, ‘বাবা তো গোড়াতেই বলেছেন, নিজে অর্জন করো। আপনি আমায় খুঁজছেন আর আমি ধাঁধার মানে বার করে, ইনভেস্টিগেশন কমপ্লিট করে ফেলেছি।'

কিরণশঙ্কর আনন্দের আতিশয্যে প্রায় লাফিয়ে উঠে বললেন, ‘অল কমপ্লিট?’ সাতকড়ি উত্তর দিল, ‘অলমোস্ট। এবার যাওয়ার জন্য তৈরি হোন।'

কিরণশঙ্করবাবু একবার স্ত্রীর দিকে তাকালেন। পরে সাতকড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কোথায় যাব?’

সাতকড়ি কণ্ঠস্বরে বিরক্তি প্রকাশ করে বলল, 'আচ্ছা মুশকিলে পড়া গেল। ময়ূর ঘড়িটা আনতে যেতে হবে না? ওটা কি আমাকে দেবে! আপনার বাবার লিখিত নির্দেশ। আপনাকে গিয়ে আনতে হবে। সঙ্গে আপনিই যে কিরণশঙ্কর গুপ্ত, তার বৈধ পরিচয়পত্র লাগবে।'

কিরণশঙ্করবাবু সাতকড়ির হাতটা চেপে ধরে বললেন, 'আপনি মশাই জিনিয়াস ! আপনি অসাধ্য সাধন করতে পারেন।'

সাতকড়ি বলল, ‘আমার একার সুবাদে হয়নি। আমেরিকা যাওয়ার আগে বাবা অসময়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে এসেছিলেন। তখন বাবার হেল্প নিতে হয়েছে।'

সাতকড়ি একটু থেমে চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘বাবার বলার পর ধাঁধাটা ইজি হয়ে গেল। ওল ফলে যেখানে। কথাটার মানে বুঝতে পারছেন? কোথায় ভাল ওল ফলে? সাঁতরাগাছি। তারই কাছাকাছি সাত থেকে সাঁতরে নন্দীর ঘাটে। মানে হল সাঁতরাগাছির কাছাকাছি বিরাট পুকুরের ওপারের ঘাটটার নাম নন্দী ঘাট। ভগ্নরথের পশ্চিমে নন্দী বসে ফন্দি করে কালো কোটের আড়ালে। অর্থাৎ একটা মন্দিরের গায়ে একখানা ভাঙা রথ। রথের আগে ওটা সারানো হয়। অন্য সময় এমনি পড়ে ওই রথের পশ্চিমে নন্দীদের বাড়ি। তাঁদেরই একজন সুকুমার নন্দী পেশায় উকিল৷ মানে কালো কোট। ময়ূর ঘড়ি তাঁর কাছে। উনিই আপনার বাবার উকিল। এবার প্রমাণ দিয়ে নিয়ে আসবেন চলুন।'

কিরণশঙ্করবাবু আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলেন না। তিনি উঠে এসে সাতকড়িকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘ঘড়িটা আনার পর আপনাকে কিন্তু মুখ ফুটে বলতে হবে আপনার কী চাই? আপনাকে কিছু দিয়ে আমরা ধন্য হতে চাই।'

সাতকড়ি কিরণশঙ্কর আর তাঁর স্ত্রীর দিকে একবার তাকালেন। পরে বললেন, ‘কিছু চাইতে হলে তো মুখ ফুটেই চাইতে হয়। কিন্তু চাইলেই কি আপনি দিতে পারবেন?’ কিরণশঙ্করবাবু

বলে উঠলেন, ‘আলবত দেব। চেয়েই দেখুন না!’

সাতকড়ি হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘আপনাকে দুটো অপশন দিচ্ছি। হয় আমাদের আঠারো কড়ির জন্য আগেকার সেই তামার আঠারোটা ফুটো পয়সা, না হয় ওই ময়ূর ঘড়ি।'

কিরণশঙ্কর চমকে উঠে বললেন, ‘সে কী? ময়ূর ঘড়ি?’

সাতকড়ি বলল, ‘আমি জানতাম কোনওটাই পারবেন না। সুকুমার নন্দীর কাছে গেলেই জানতে পারবেন। ঘড়িটা আপনার বাবার নয়। ওটি নীলমণি মুখুজ্যের খোয়া যাওয়া সম্পত্তি। নীলমণি হচ্ছে আমার প্রপিতামহ। আপনার বাবার লেখা চিঠি সুকুমার নন্দীর কাছে আছে। আমাদের কোনও দাবি নেই। এবার আপনার যা অভিরুচি।'

কিরণশঙ্কর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘এই বাজারে আপনার চাওয়া দুটো জিনিসই দুষ্প্রাপ্য। সোনা মিললেও তামার ফুটো পয়সা, না, না অসম্ভব! আচ্ছা, আজ না গিয়ে আগামীকাল গেলে হয় না?’

কিরণশঙ্কর করুণ চোখে সাতকড়ির দিকে তাকালেন।

.

আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী, ১৪০৯

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%