দুলেন্দ্র ভৌমিক

আজকের দিনটা অন্যান্য দিনের চেয়ে আলাদা। সেজন্যই কেশবপুরের সকালটাও আজ অন্যরকম। সূর্য ওঠার একটু পরেই বাজারের মোড়ে, হাটখোলার সামনে এবং সদর রাস্তার ওপরে নানা বয়সের লোক হাতে ফেস্টুন নিয়ে ছোট ছোট দলে জমায়েত হয়েছেন। ওঁদের কড়া নজর কেশবপুরের কোনও দোকান যেন না খোলে। কেননা, আজ ভোর ছ'টা থেকে আগামীকাল ভোর ছ'টা পর্যন্ত বাংলা বনধ। গত সাতদিন ধরে বনধের সমর্থনে নানা মিটিং, মিছিল আর দেওয়াল লিখন চলেছে। আজ ভোরবেলা রাস্তার মোড়ে মোড়ে যারা জমায়েত হয়েছে তাদের কাজ হচ্ছে নজরদারি করা। কেউ যেন বনধ অমান্য করে দোকান না খুলতে পারে, রাস্তায় যেন কোনও গাড়ি না চলে।
সকালের মেঘলা ভাবটা কেটে গিয়ে যখন দিনের আলো ধীরে ধীরে ফুটতে আরম্ভ করেছে তখন ঘড়িতে সবেমাত্র পৌনে পাঁচটা। দুধের গাড়ি, রোগী নিয়ে যাওয়ার অ্যাম্বুলেন্স কিংবা খবরের কাগজ নিয়ে ছুটে যাওয়া সাইকেলের হকারদের বাধা দেওয়ার হুকুম নেই। কিন্তু ছ'টা বাজার মুখে মুখে রিকশা আসবে কেন? আজ তো কোনও রিকশার বেরোবার কথা নয়! ওই রিকশাতে কোনও সওয়ারি থাকলে তাকে নামিয়ে দিতে হবে।
যারা দূর থেকে রিকশাটাকে দেখছিল তারা পরস্পরের দিকে তাকাল। একজন বলল, ‘সওয়ারি থাকলে ঘাড় ধরে নামিয়ে দিতে হবে।'
অন্য একজন চাপা স্বরে বলল, ‘উত্তেজিত হোয়ো না। দেখো না, কেউ ডাক্তার-ফাক্তার ডাকতে যাচ্ছে কি না। এপাড়ার রিকশা ইউনিয়ন আমাদের।'
সকলের চোখ এখন ওই রিকশাটার দিকে। এবার বোঝা যাচ্ছে রিকশাতে কোনও সওয়ারি নেই। তবে কেন সাতসকালে রিকশাটা পথে বেরোল? বেআক্কেলে রিকশাচালক জানে না আজ বাংলা বনধ? আজ কোনও যানবাহনের চাকাই ঘুরবে না।
অল্পবয়সি একটা ছোকরা হাতের ঝান্ডাটা বন্ধ দোকানের গায়ে ঠেস দিয়ে রেখে বলল, ‘একবার আসতে দাও, ব্যাটার চাকার হাওয়া খুলে দেব।'
শেষ ফাল্গুনের ভোরের হাওয়ায় গাছের পাতা দুলছিল, সকালের কোমল রোদ মেখে দেবদারু গাছগুলো যেন অতিরিক্ত সবুজ হয়ে আছে। বকুল গাছের পাতার আড়াল থেকে ডেকে যাচ্ছে একটা কোকিল। ভোরের কেশবপুর এখন সুনসান। সুনসান থাকারই কথা, কিন্তু গোল বাধাল ওই রিকশাটা। নির্জন রাস্তায় ওই রিকশা যেন একটা বিষম উৎপাতের মতো এগিয়ে আসছে বাজারের মোড়ের দিকে। ঠিক উৎপাতও নয়, যেন নিয়মভাঙা একটা বেপরোয়া বিশৃঙ্খলা। এ জিনিস সহ্য করা যায় না। পতাকা, ফেস্টুন নিয়ে নানা বয়সের মানুষরা চোয়াল শক্ত করে রাস্তা আটকে দাঁড়াল। এবার নজরে পড়ল দৃশ্যটা, অর্থাৎ সম্পূর্ণ দৃশ্যটা। রিকশার পেছন পেছন ছুটে আসছে চোদ্দো বছরের একটা ছেলে, ওর নাম রাখাল। পুরো নাম রাখাল মণ্ডল। ছেলেটা এবার রিকশার পাশাপাশি। রিকশাওলা দাঁতে দাঁত চেপে রিকশার গতি বাড়াচ্ছে, কিন্তু রাখাল রিকশাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে আসছে সামনের দিকে। রিকশা ওকে ধরতে চাইছে, আর রাখাল রিকশাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে চাইছে। যেন মানুষের পায়ের গতির সঙ্গে রিকশার চাকার তুমুল প্রতিযোগিতা।
যারা রাস্তা আটকে দাঁড়িয়েছিল তারা এবার রাস্তা ছেড়ে দিয়ে দু’পাশে সরে যেতে লাগল। বয়স্ক একজন বলল, ‘বাপ-ব্যাটার রেস! রোজ সকালে এমনটাই হয়।'
এবার দেখতে দেখতে ছুটন্ত রাখাল ওদের সামনে এসে পড়ল। দু’পাশে তাকিয়ে দৌড়ের গতি একটুও না কমিয়ে পুব পাড়ার মাঠের দিকে ছুটতে লাগল। ঠিক তার দু’ হাত পেছনে রাখালের বাবা কানাই মণ্ডলের রিকশা। শেষ ফাল্গুনের হিমেল হাওয়াতেও তার সারা মুখ ঘামে ভেসে যাচ্ছে। সে প্যাডেল ঘোরাতে ঘোরাতে দু’পাশের ঝান্ডাধারী মানুষদের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল, তারপর বলল, ‘জিন্দাবাদ।
কিন্তু সে থামল না। রিকশার গতিও কমাল না। যারা জানে না, তারা অবাক চোখে দেখল কানাই মণ্ডলের রিকশা এখন আর রাখালের পেছনে ছুটছে না, ছুটছে পাশাপাশি। কানাই চিৎকার করে হাঁকছে, ‘খোকা, ধরে ফেলেছি, আরও জোরে, আরও জোরে ছোট।'

সকালের নবীন আলোর মধ্যে দিয়ে ওরা আরও খানিকটা এগিয়ে গিয়ে বকুলতলা থেকে ডাইনে ঘুরে গেল।
গ্রাম পঞ্চায়েতের গৌর কর্মকার নাকে নস্যি নিয়েছিলেন। এবার রুমাল দিয়ে নাক মুছতে মুছতে বললেন, ‘কানাইয়ের এনার্জিটা একবার বোঝ। ঘেমে-নেয়ে একশা। তবুও ছেলের সঙ্গে রেস করছে।' পুবপাড়ার নিরঞ্জন ঘোষাল সিগারেটে টান দিয়ে বলল, ‘কানাইয়ের ছেলেটা আমাদের ক্লাবে খেলে না? ডিস্টিক-ফিস্টিকেও বোধহয় খেলে।'
গৌর কর্মকার একবার নস্যি নিলে রুমাল দিয়ে নাক মুছতে সময় নেন প্রায় পাঁচ মিনিট। নাক মোছার কায়দাটাও বড় বিচিত্র। রুমালটিকে লম্বা করে গুটিয়ে তার দুটি প্রান্ত দু’ হাতে ধরে নাকের কাছে আনেন। তারপর একবার ডানদিকে আর একবার বাঁদিকে টানেন। এই টানাটানিটা এমনই যে, নতুন কেউ দেখলে ভাববে ভদ্রলোক বুঝি ডিসকো ড্যান্সের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দু’ হাতে তুড়ি বাজাচ্ছেন। রুমাল টানাটানির পর্ব শেষ করে গৌর কর্মকার বললেন, ‘কিছুই খবর রাখো না। ছেলেটা এবার জুনিয়ার ইন্ডিয়াতে যাওয়ার চেষ্টা করছে। পিন্টু-বাবনদের কাছে খেলা শিখত, এখন পিন্টুদের কাছে কোচিং করতে যায়।'
কিন্তু এই আলোচনা নিয়ে মেতে থাকার অবসর ছিল না। কেউ বুঝি দোকানের ঝাঁপ খুলছে টের পেয়ে কয়েকজন হইহই শব্দে সেদিকে ছুটে গেল। ইতিমধ্যে গণসংগীত গাইবার জন্য গানের স্কোয়াড নিয়ে টুনু ব্যানার্জির নেতৃত্বে দলবল এসে গেছে। লাইটপোস্টের সঙ্গে লাউডস্পিকার লাগাবার কাজও আরম্ভ হয়েছে। হঠাৎ গৌর কর্মকার দেখলেন, হাতে একটি ঝোলা নিয়ে গজুবাবু লম্বা লম্বা পায়ে এগিয়ে আসছেন। নিরঞ্জন ঘোষালও দেখতে পেয়েছিল। তাই সে ফিসফিস করে বলল, ‘গজুবাবু কি আজকেও অফিস যাচ্ছেন নাকি?’
গৌর কর্মকার বললেন, ‘এক কোটি মানুষের মধ্যে খুঁজলে গজুবাবুর মতো এক পিস পেলেও পেতে পারো। আমরা যারা জানি, তারা দুধের গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স আর দমকলের মতো গজুবাবু আর কানাই মণ্ডলকে ছাড় দিয়ে রাখি।'
নিরঞ্জন ঘোষাল বলল, 'কিন্তু ট্রেন-বাস তো বন্ধ, অফিস যাবে কেমন করে? আবার ওদিকে অফিসও তো বন্ধ থাকবে। গজুবাবু গিয়ে করবেনটা কী?’
গৌর কর্মকার চাপা গলায় বললেন, 'তুমি এপাড়ায় নতুন তাই জানো না। দেখো না একবার জিজ্ঞেস করে।'
গজুবাবুর ভাল নাম গজেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী। অতবড় নামে কেউ তো সবসময় ডাকতে পারে না, তাই সংক্ষেপে গজু, গজুদা, গজুকাকা, গজুবাবু। যে যেমন পারে তেমনভাবে ডাকে। গজুবাবুর বাবা ডাকতেন গজা বলে। গজুবাবুর চেহারাতে কিছুটা বিশেষত্ব ছিল। শরীরের ওপরের অংশ, অর্থাৎ কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত যতটুকু, কোমর থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত যেন তার দ্বিগুণ। সত্যিই হয়তো দ্বিগুণ নয়, কিন্তু দেখে তেমনই মনে হত। লম্বা, রোগা, দীর্ঘ দুটি পা। পরনের ধুতি কখনও হাঁটুর নীচে নামতে কেউ দেখেনি। গায়ে সেই আদ্যিকালের বোতাম দেওয়া ফতুয়া, কাঁধে একটা ঝোলা। কেউ কেউ বলেন, শুধু বিয়ের দিন নাকি গজুবাবুকে পায়ের পাতা অবধি কোঁচা দুলিয়ে কাপড় পরতে দেখা গেছে। কিন্তু এ বিষয়েও প্রচুর মতভেদ আছে। কোনও কোনও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অনুযায়ী, গজুবাবুর বিয়ের ধুতি হাঁটুর নীচে ছিল ঠিকই, কিন্তু কোঁচা কখনওই পায়ের পাতা অবধি নামেনি। তা সেই গজুবাবু এসে পড়লেন নিরঞ্জন ঘোষালের সামনে। নিরঞ্জন ঘোষাল জিজ্ঞেস করল, ‘গজুদা কোথায় চললেন?’
গজুদার নির্বিকার জবাব, ‘কেন, অফিস।’
নিরঞ্জন জিজ্ঞেস করল, 'আজ তো বাংলা বনধ। যাবেন কীসে? অফিসেও তো ঢুকতে পারবেন না।'
গজুদা উত্তর দিলেন, ‘অফিস তো নোটিশ দিয়ে বলেনি যে আজকে ছুটি। তাই হেঁটেই যাব। পঁচিশ কিলোমিটার পথ হাঁটতে বেশিক্ষণ লাগবে না।'
নিরঞ্জন বলল, ‘কিন্তু অফিস তো বন্ধ। বেকার যাবেন আবার হেঁটে হেঁটে ফিরবেন?’ গজুদা গলায় উষ্মা ফুটিয়ে বললেন, ‘তাতে তোমার কী? অফিস বন্ধ দেখলে দরোয়ানের হাতে স্লিপ দেব। তাতে লেখা থাকবে, এসেছিলাম। বন্ধ দেখিয়া গৃহে ফিরিয়া গেলাম। ধন্যবাদ সহ গণনা চৌ, মানে গজেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী।
নিরঞ্জন গজুদা বললেন, ‘মিথ্যে কথা। পিতৃবিয়োগে একদিন কামাই হয়েছে। বিয়ের দিন হাফ ডে অফিস করেছি। বিয়ের পরের দিন হাফ ডে। তার মানে পুরো দু’ দিন। বত্রিশ বছরের সার্ভিসে দু’ দিন আর পুরো একদিন কামাই হয়েছিল সোনা যেদিন কিডন্যাপ হল। চললুম ভাই, রোদ তেতে ওঠবার আগে যতটা পারি এগিয়ে যাই।'
আবার জিজ্ঞেস করল, ‘শুনেছি আপনি নাকি একদিনও অফিস কামাই করেননি?’
নিরঞ্জন ঘোষাল গৌর কর্মকারের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘সোনা কিডন্যাপ হয়েছিল কি এই গ্রামে? কারা করেছিল?’
গৌর কর্মকার বললেন, ‘সোনা কে বলো তো?’ সোনা হচ্ছে ওঁর গোরুর নাম। কারা যেন ধরে গোরুটাকে খোঁয়াড়ে দিয়েছিল। গোরু খুঁজতেই একদিন অফিস কামাই। এ গপ্পো পাড়ার সবাই জানে। গজুদা আর রিকশাচালক কানাই, ওদের কখনও কাজে কামাই নেই। কোনওদিন অসুখও করে না। আমি অন্তত দেখিনি। রোজ সকালে ছেলেকে রিকশার সঙ্গে দৌড় করিয়ে তারপর স্ট্যান্ডে যায়। আবার বিকেলে ছেলেকে দেখতে সংঘশ্রীর মাঠে।
নিরঞ্জন বলল, ‘ছেলেবেলায় আমরাও খেলাধুলো করেছি। কিন্তু বাবা কাকাদের এমন মদত কখনও পাইনি। কেমন যেন একটা অলিখিত নিয়ম ছিল, বিকেলবেলা ছেলেরা একটু-আধটু খেলবে আর মেয়েরা হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান শিখবে। কোনও সিরিয়াসনেস ছিল না।'
গৌর কর্মকার বললেন, ‘সবাই স্বপ্ন দেখতে জানে না। সবার মধ্যে স্বপ্ন থাকেও না। কানাই মণ্ডল স্বপ্ন দেখতে জানে, নিজের স্বপ্নটা সে এবার তার ছেলের বুকের মধ্যে গেঁথে দিতে চাইছে।'
স্বপ্ন-টপ্ন দেখার অভ্যেস কানাইয়ের নেই। সে জানে তার বাবা যৌবনে পাটের আড়তদারের কাছে কাজ করত। গোরুর গাড়িতে পাট বোঝাই করে নিয়ে যেত বারাসাতের হাটে। বাবা চেয়েছিল তার ছেলেও তারই মতো গোরুর গাড়ি চালাক। কিন্তু সেটা আর হয়নি। শেষবয়সে জীর্ণ শরীরে পেট চালাবার জন্য বাবাকেও রিকশার প্যাডেল ঘোরাতে হয়েছিল। কিন্তু বেশিদিন পারেনি। বুকে রোগ ধরল। গলা দিয়ে রক্ত বেরোত। প্রথমে অল্প-স্বল্প, পরে একটু কাশলেই চাকা চাকা রক্তে বেরিয়ে আসত গলা দিয়ে। এ রোগের কেমন চিকিৎসা সেকথা কানাই জানত না। কোবরেজমশাই বলতেন, ‘কানাই, এর নাম রাজরোগ। ট্যাঁকে পয়সা না থাকলে রোগের চিকিৎসা বিধিমতো হবে না।
কানাই তখন সতেরো বছরের ছেলে। একমাত্র ভরসা ছিলেন মালিক গোবিন্দ সাহা। কানাই কেঁদে-কেটে গিয়ে পড়েছিল তাঁরই কাছে। তিনিই বা কী করবেন! বন্ধকি কারবার করে তাঁর রোজগার। তিনি বললেন, ‘ঘরে আটটা পেট। তিনখানা রিকশা থেকে আয় যত, ব্যয় তার চাইতে বেশি। তোর বাবার কাছেই পাই ছাপ্পান্ন টাকা আট আনা। আয় হলে তবে তো ব্যয় করা যায়। তার চেয়ে তোর বাবার রিকশাটা বরং তুই-ই চালা। যা হোক কিছু রোজগার হবে। খান কয়েক ডেইলি ধরতে পারলে ডাল-রুটি জুটে যাবে।'
সেই থেকে রিকশা চালিয়ে যাচ্ছে কানাই। নিজেকে নিয়ে সে কখনও স্বপ্ন দেখেনি, দেখতে শেখেনি। কিন্তু রাখালকে নিয়ে তার একটা সাধ আছে। সে মনে মনে ভাবে, রাখাল যেন রিকশা না চালায়। ওর পায়ে প্যাডেল নয়, থাকবে বল। সেই বল পায়ে নিয়ে বৈশাখের ঝড়ের মতো সে ছুটে যাবে মাঠের এপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। মাঠে রাখাল যখন খেলে, যখন মাঠের চারপাশ থেকে ভদ্রবাড়ির ছেলেরা হাত তুলে চিৎকার করে বলতে থাকে ‘রাখাল, জ্বলে ওঠ, জ্বালিয়ে দে · চিয়ার্স রাখাল—’ তখন দু’চোখ জলে ভরে যায় কানাইয়ের। তার বুকের মধ্যে লক্ষ তারার আলো জ্বলে ওঠে। গলার কাছে একটা টনটন করা কষ্ট, অথচ বুক ভরে যায় অপরূপ এক আনন্দে। আজ পর্যন্ত আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তাদের বংশের কারও নাম কেউ এমন সোল্লাসে চিৎকার করে উচ্চারণ করেনি। সবাই ডাকে রিকশাওলা বলে।
ঠিক এইরকম মুহূর্তে ঝাপসা চোখে সে দেখতে পায় তার ছেলে রাখাল যেন লক্ষ লোকের মাথার ওপর দিয়ে রাজহাঁসের মতো উড়ে যাচ্ছে। তার ধবধবে সাদা ডানায় ভালবাসার আবির মাখানো। সে তখন ছেলের দিকে তাকিয়ে মনে মনে অনেক কিছু ভাবে। যতটা সে ভাবতে পারে তার চেয়ে বেশি ভাবতে ইচ্ছে করে তার। এই ভাবনাটার নামই কি স্বপ্ন? স্বপ্নের স্বাদ কি এত নোনতা? চোখ ঝাপসা না হলে কি স্বপ্ন দেখা যায় না?
কানাই এতসব বোঝে না, বুঝতে পারে না। সে শুধু জানে, তার ছেলের পা অন্যরকম। তাদের সাতকুলে এমন পা কারও ছিল না। এই পা থেকে বিদ্যুতের গতিতে যখন ছিটকে ছিটকে বলগুলো চলে যায় গোলের সীমানা বরাবর, তখন যেন ওই দুটি কালো পায়ের তালে তালে সারা মাঠ নাচতে থাকে। কিসে মানুষের গর্ব হয় তা কখনও কানাই জানতে পারেনি। কিন্তু এই যে সবাই যখন গোল হয়ে দাঁড়িয়ে রাখালকে ঘিরে নাচতে থাকে তখন তার বুকের মধ্যে যে উথাল-পাথাল, সেটা কি গর্ব? পুবপাড়ার অশ্বিনী মুখার্জির ছেলেরা যখন গোল করার পর রাখালকে কাঁধে নিয়ে ছোটাছুটি করে তখন রিকশার ওপর বসে কানাইয়ের দু’ চোখ খুশিতে নেচে উঠতে থাকে, কিন্তু মনটা চলে যায় অনেক দূরে, তার চোদ্দো বছর বয়সে। অপমান, অবজ্ঞা আর লাঞ্ছনার সেই দিনগুলিতে। দেরিতে কাজে আসার জন্য যে অম্বিকা মুখুজ্যে তার বাবাকে আড়তের সামনে চড় মেরেছিলেন আজ তার নাতিরাই মাথায় তুলে নাচছে সেই শিবু মণ্ডলের নাতিকে নিয়ে। এমন অঘটন ঘটাল কে? ওই গোলাকার একটা জিনিস, যার নাম ফুটবল। যার ওজন মাত্র সাতাশ কি আটাশ আউন্স!
চৌধুরীপাড়ার গজুদা বলেন, গোরু হল সাক্ষাৎ নারায়ণ। তিনি গোরুর মধ্যে নারায়ণের দর্শন পান। এই দর্শন পাওয়ার ব্যাপারটা ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারে না কানাই, কিন্তু সে জানে ফুটবলের অনেক মহিমা। অতীতের অনেক অসম্মান, লাঞ্ছনা আর যন্ত্রণাকে ধুইয়ে দিতে পারে এই ফুটবল। মন্দিরের ঠাকুরমশাই বলেন, জগতের প্রতিটি ধূলিকণায়, অণুতে-পরমাণুতে নারায়ণ আছেন। হয়তো আছেন। আর তাই যদি থাকেন তবে ফুটবলের মধ্যেও আছেন। শুধু ফুটবল নয়, খোকা যে মাঠে খেলে ওই মাঠের মাটিতে, তার ঘাসে ঘাসে, সকালবেলার নবীন আলোয়, দগ্ধ দুপুরের তাপে আর পড়ন্ত বেলার আলোতেও বুঝি ঈশ্বর থাকেন। ঈশ্বরের অন্য নামই বুঝি প্রেম আর সাধনা। খোকার সাধনা সেই ঈশ্বরকে পাওয়ার জন্য, যে ঈশ্বর রয়েছেন গোলাকার বিশ্বের মতো ওই ফুটবলে আর মাঠের ঘাসে ঘাসে।
এই যে এখন, গোটা গ্রাম যখন ঘুম ভেঙে সবেমাত্র জেগে উঠতে চাইছে, ঝাঁক ধরে উড়ে যাচ্ছে পাখির দল, সূর্যের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে গাছগাছালির মাথায়, স্তব্ধ হয়ে আছে রোজকার চেনা জীবনযাত্রা, তখনও থেমে নেই রাখাল আর তার বাবা কানাইয়ের নিত্য কর্মপদ্ধতি। সংঘশ্রীর খেলার মাঠে ছুটছে রাখাল, আর মাঠের চারপাশে রিকশা নিয়ে চক্কর দিচ্ছে কানাই। কেশবপুরের সবাই এদের বলে বাপ-ব্যাটার রেস। বাপ ব্যাটার এই রেস শুরু হল কবে থেকে? কেমন করে?
তখন ছিল শীতের শুরু। অগ্রহায়ণের পাতলা কুয়াশা ভোরের দিকে ছেঁড়া ন্যাকড়ার ফালির মতো ঝুলে থাকে সরষের খেতে, কাঁটাঝোপের মাথায় আর ঘাসের বুকে। ঠিক এইরকম এক অঘ্রানের ভোরে ঘুম ভেঙে গেল কানাইয়ের। তার মনে হল কেউ যেন দরজা খুলে ঘরের বাইরে যাচ্ছে। দেড়খানা ঘরে প্রাণী মোট দু'জন। কে এখন বাইরে যাবে? তক্তপোশের ওপর শুয়ে ছিল কানাই। বালিশ থেকে মাথা তুলে দেখল, কেউ নয়, খোকা দরজার খিল খুলে পা টিপে টিপে বাইরে যাচ্ছে। এত সকালে কোন আহ্লাদে খোকা দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ছে? ওকে কি নিশিতে ডেকেছে? নিশি নাকি রেতের বেলা ঘরের মানুষকে ডেকে বাইরে নিয়ে যায়। তারপর ধলাডাঙার জলার ধারে নিয়ে গিয়ে পাঁকে ডুবিয়ে মেরে ফেলে। তবে এখন তো রাত নয়। কুয়াশার জন্য তেমন বোঝা না গেলেও একটুখানি নজর করে দেখলে বোঝা যায় এখন ভোর হচ্ছে। ইস্টিশনে দিনের প্রথম ট্রেন ধরতে হলে এখনই ঘর থেকে বেরোতে হয়। খোকা কী ট্রেন ধরবে?
কানাই বিছানার ওপর উঠে বসল। দরজা পেরোবার সঙ্গে সঙ্গে ডাকল, ‘খোকা, কোথায় যাচ্ছিস?’
খোকা, অর্থাৎ রাখাল যেন আশাই করেনি এত সকালে বাবা জেগে থাকবে। লাস্ট ট্রেনের প্যাসেঞ্জার আসা পর্যন্ত রাত্রে ভাড়া টানে বাবা। রাত একটায় বাড়ি ফিরে খাওয়ার পাট চুকিয়ে শুতে শুতে দুটো বেজে যায়। সেজন্য বাবা সকালের দিকে স্ট্যান্ডে যায় দেরি করে। ন'টার একটু আগে গিয়ে স্ট্যান্ডের লাইনে রিকশা লাগায়। এত সকালে তার ঘুম ভাঙার কথাই নয়। একটু আগেও তো সে বাবাকে গাঁক-গাঁক নাক ডাকতে শুনেছে। তাই হঠাৎ বাবার গলা পেয়ে যতটা চমকাল তার চেয়ে বেশি চমকাল বাবাকে বিছানার ওপর উঠে বসতে দেখে।
কানাই ছেলের দিকে তাকিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘এত সকালে কোথায় যাচ্ছিস?' রাখাল বাবার মুখের ওপর থেকে চোখ নামিয়ে নিয়ে মৃদু গলায় উত্তর দিল, 'মাঠে যাচ্ছি।'
কানাই যেন কাকভোরেই বিষম খেল। এত সকালে মাঠে যায় চাষ-আবাদ করতে, ধান কাটতে, না হয় খেত নিড়োতে। খোকা কি ওইসব করে নাকি! কানাই অবাক গলায় প্রশ্ন করল, ‘মাঠে! সেখানে তোর কম্মটা কী?’
রাখাল ভীরু গলায় উত্তর দিল, ‘প্র্যাকটিস করতে।'
কানাইয়ের যেন আজ কেবলই অবাক হওয়ার পালা! ‘প্র্যাকটিস, সেটা আবার কেমন জিনিস! কথাটা তো ইংরেজি। অনেকেই বলে-টলে। মানে নিশ্চয়ই একটা আছে। খোকার বিদ্যে তো পঞ্চায়েতের ফ্রি প্রাইমারি পর্যন্ত। ওর বাপ মেরে-কেটে দশের ঘরের নামতা পর্যন্ত বলতে পারে। তারই ব্যাটা কাকডাকা ভোরে ইংরেজি কপচাচ্ছে? দিনকালের ধারা কি বিস্তর বদলে গেল নাকি!
কানাই ব্যাপারটা না বুঝলেও বোঝার মতো ভঙ্গি করে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ‘ওসব ইংরেজি বুকনি রাখ। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে হবে না। পুকুর থেকে জল এনে রিকশাটা ধুয়ে রাখ।
হুকুমটা দিয়েই কানাই পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। ঘরের সামনে একটুকরো উঠোন। উঠোনের কোণে নিমগাছ। সেই গাছের সঙ্গে শিকল দিয়ে বাঁধা থাকে বাবার রিকশা। ওই রিকশার চাকা ঘুরলেই তাদের অতি ক্ষুদ্র সংসারের চাকাটাও ঘোরে, ঘুরতে পারে। কানাই একবার নিজের ঘরের দিকে তাকাল, যে ঘরের ভেতরে রয়েছে তার বাবা। আর-একবার রিকশাটার দিকে। যার তিনটে চাকাতেই কাদা-মাটির শুকনো দাগ। অঘ্রানের হিম পড়ে রিকশাটার যেন কোনও ক্ষতি না হয় সেজন্য গোটা শীতকালটা চট দিয়ে ঢেকে রাখে তার বাবা। বাবাকে অগ্রাহ্য করতে শেখেনি রাখাল। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও বারান্দার কোণ থেকে বালতি নিয়ে সে পুকুরে গেল। কোনওরকমে দু’ বালতি জল দিয়ে তিনটে চাকা ধুয়েই ছুট লাগাল মাঠের দিকে। মাঠে যাদের আসবার কথা তারা সবাই এসে গেছে। রাখাল এল সকলের পরে।
কিন্তু গোল বাধল মাঠ থেকে ফিরে আসার পর। কানাই তখন নিমগাছের সঙ্গে বাঁধা রিকশাটা শিকল খুলে নিয়ে এসেছে উঠোনের মধ্যিখানে। নারকোলের ছোবড়া জলে ভিজিয়ে গাড়ির চাকা থেকে, স্পোক থেকে নিপুণভাবে ঘষে ঘষে কাদামাটির দাগ তুলছে। ছেলেকে দেখতে পেয়ে সে হিংস্ৰ চোখে তাকাল। রাখালের পা আটকে গেল মাটিতে। বাপের ক্রুদ্ধ চোখের দিকে সে তাকাতে পারছে না। কানাই হাতের ছোবড়া আর জল ন্যাকড়া ফেলে উঠে এল ছেলের কাছে। বাঁ হাতে চুলের মুঠি ধরে একটানে আছড়ে ফেলল মাটির ওপর। রাগে সর্বাঙ্গ জ্বলে যাচ্ছে কানাইয়ের। যা থেকে পেটের অন্ন জোটে তাকে এমন অবহেলা করতে শিখল কোত্থেকে? কানাই চিৎকার করে উঠে বলল, ‘তোর প্র্যাকটিসের নিকুচি করেছে। কীসের প্র্যাকটিস? এই যে দেখছিস, এটার নাম আমার কাছে রিকশা নয়, এটা অন্নদাতা। এটাকে নিয়েই তোর বাপ-ঠাকুরদা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভাত ভিক্ষে করে বেড়াত— তোকেও একদিন তাই করতে হবে।'
মাটির ওপর উঠে বসতে বসতে রাখাল বলল, ‘না, আমি খেলব। আমি প্লেয়ার হব। এবার চড়াত করে মাথায় রক্ত উঠে গেল কানাইয়ের। বলল, ‘কী করবি? খেলবি? পেলেয়ার হবি? রিকশাওলার ছেলে পেলেয়ার। ভাঙা ঘরে শুয়ে খোয়াব দেখা!’
কানাই আবার চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলে ছেলেকে দাঁড় করাল, তারপর বলল, ‘চল, আজ থেকেই তোকে লাইনে নামতে হবে। আয় আমার সঙ্গে।'
রাখালের সাধ্য ছিল না বাপের বিরুদ্ধে কথা বলার। কানাইয়ের মাথায় যেন সেদিন বিষম জেদ চেপে গিয়েছিল। সেদিনই ওকে রিকশার ওপর বসিয়ে পিঠে এক চড় কষিয়ে দিয়ে হুকুমের গলায় বলেছিল, ‘টান, টান রিকশা।
রাখাল একটু-আধটু চালাতে জানত। প্যাডেল ঘোরাতেই রিকশা এগিয়ে যেতে লাগল। চলন্ত রিকশার ওপর লাফ দিয়ে উঠে বসল কানাই। সিটে বসে বলল, ‘টান, সওয়ারি সমেত টেনে দেখ কেমন লাগে। এবার থেকে এটাই তোর কাজ। হপ্তাখানেকের মধ্যে তোকে স্ট্যান্ডে দাঁড়াতে হবে। অন্য গাড়ি পাই ভাল, না পেলে আমার গাড়ি চালাবি।'
এবার টানতে খুব কষ্ট হচ্ছিল রাখালের। এতক্ষণ প্র্যাকটিসের পর শরীর ক্লান্ত ছিল। সেই ক্লান্ত শরীরে রিকশা টানার সামর্থ্য ছিল না রাখালের। মুখ দিয়ে ঘন ঘন হাওয়া টানছিল রাখাল। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে চড়চড় করে। অথচ বলবার সাহস নেই। মনে হচ্ছে বুকের ছাতিটা এখনই ফুটির মতো ফেটে যাবে। নিজের কষ্টের কথাটা বলবার জন্য মরিয়া হয়ে ঘাড় ফেরাতে যাওয়ার মুহূর্তেই মনে পড়ে গেল পিন্টুদার কথাটা। ‘নব্বই মিনিট খেলার পর ড্র। আরও পনেরো মিনিট একস্ট্রা টাইম খেলতে খেলতে দম ফুরিয়ে এসেছে। শেষ হাফের খেলা শেষ হতে আড়াই মিনিটের মতো বাকি। তখনই একটা বল এল আমার পায়ে। গোলপোস্ট আমার থেকে প্রায় তিরিশ গজ দূরে।
‘বল পায়ে নিয়ে ছুটতে আরম্ভ করলাম। ওদেরও তো দমের ঘাটতি ছিল। তাই আগুয়ান ডিফেন্সের দু’জনের মধ্যে দিয়ে বলটা নিয়ে গোলের দিকে ছুটছি। কিন্তু বুঝতে পারছি, শরীরে কেমন তেজ নেই, হঠাৎ লক্ষ করলাম আমার বাঁদিক থেকে কোনাকুনি ধেয়ে আসছে ওদের রাইটব্যাক। ধাঁ করে মনে পড়ে গেল, ওই রাইটব্যাক নব্বই মিনিটের খেলা শেষ হওয়ার পনেরো মিনিট আগে মাঠে নেমেছে। আমাদের মতো একশো পাঁচ মিনিটের খেলা ওকে খেলতে হচ্ছে না। ফলে ওর শরীরের তেজ, দৌড়বার ক্ষমতা আমার চেয়ে এখনও বেশি আছে। আমার সামনে ফাঁকা জমি, বক্সের মধ্যে গোলকিপার একা। এবার যদি গতিতে ওই রাইটব্যাককে আমি হারাতে না পারি, তা হলে গোল পাওয়ার কোনও চান্স নেই। খেলাটা ড্র থাকার ফলে টাইব্রেকারে যাবে। আমি মুহূর্তের মধ্যে ভেবে নিলাম, যদি মরেও যাই কোনও পরোয়া নেই। বুকের ছাতি ফেটে যাওয়ার আগে গোলে শট নেওয়ার মতো জায়গায় আমাকে পৌঁছতে হবে। তার জন্য রাইটব্যাক যে গতিতে ছুটে আসছে তার চেয়ে জোরে আমাকে ছুটতে হবে। আমি দাঁতে দাঁত চেপে জীবন বাজি রেখে দৌড়ের গতি বাড়ালাম। গোলকিপার ততক্ষণে নিজের শরীর ডানদিকে ঝুঁকিয়েছে। বুঝে গেলাম আমি শট নেওয়ার আগেই গোলকিপার ডানদিকে নিজেকে সারেন্ডার করে ফেলেছে। আমি ‘জয় মা’ বলে বলটা বাঁদিকে গোলে মারলাম। বলটা পা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরই ওদের রাইটব্যাক এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল আমার গায়ে। সেকেন্ডের চেয়ে অনেক কম সময়। যদি গতি বাড়িয়ে শট নিতে এক সেকেন্ড দেরি করতাম, তা হলে আর গোল পেতাম না। জীবনের সাফল্য এইরকম চরম কষ্টের মধ্য দিয়েই আসে। সেই কষ্ট থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য কখনও কখনও জীবনটাকে বাজি রাখতে হয়। কিন্তু তারপর? যখন বলটা গোলে ঢুকে যায়, রেফারির দীর্ঘ বাঁশি জানিয়ে দেয় আমার সাফল্যের কথা, মাঠ জুড়ে যখন মানুষের উল্লাস, চিৎকার আর জয়ধ্বনির সঙ্গে পটকা ফাটতে থাকে তখন কী মনে হয় জানিস? মনে হয়, তুচ্ছ এই জীবন, অতি তুচ্ছ এই বেঁচে থাকা। জীবনের আনন্দ এইখানে এই জয়ধ্বনির মধ্যে। গোলটা করতে না পেরে যদি মরে যেতাম, তাহলে আমার চরম ব্যর্থতার গ্লানির মধ্যে সেই মৃত্যুটাও হত অতি সাধারণ, অতি নগণ্য একটা ঘটনা। কিন্তু এখন মরে গেলে সেই মৃত্যু হবে বিজয়ীর মৃত্যুর মতো মহান। যুদ্ধে পরাজিত সৈনিকের মৃত্যু নিয়ে কেউ ভাবে না। কিন্তু যে জয়ী, যে দেশের জন্য জয় এনে দেয় তার মৃত্যুতে গোটা দেশ শোকে অবনত হয়।'
পিন্টুদার এই কথা রাখালকে যেন মুহূর্তের জন্য জেদি আর বেপরোয়া করে তুলল। নিজের কষ্টের কথা বলবার জন্য সে মুখ ঘুরিয়েছিল বাবার দিকে। তার সেই দৃষ্টিতে ছিল আকুল প্রার্থনা আর আর্তি। কিন্তু সে বাবার মুখের দিকে আর তাকাল না। মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে সামনের দিকে তাকাল। তার দুই চোখে এখন মরিয়া জেদ আর কঠিন প্রতিজ্ঞা। তার মনে হল, নিজের গতি বাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে পেছনে ফেলতে না পারলে জয় তার নাগালে আসবে না। বুক ভরে শ্বাস টেনে রাখাল শরীরের শেষ শক্তিটুকু নিংড়ে প্যাডেলে চাপ দিল। এবার গাড়িটা এগোতে লাগল ঝড়ের গতিতে। রাস্তার অন্য যানবাহন, দু'পাশের দৃশ্যাবলি, মানুষজন সবাইকে ক্রমাগত পেছনে ফেলে রাখালের গাড়ি এগিয়ে যেতে লাগল। কানাই হতবাক! এমন কাণ্ড সে আশা করেনি। এবার তার ভয় করতে লাগল, সে চিৎকার করে নিষেধের ভঙ্গিতে বলতে লাগল, ‘খোকা থাম, খোকা এবার থাম।'
কিন্তু খোকা থামল না। তার গোটা শরীর দিয়ে ঘাম গড়াচ্ছে। বিস্ফারিত দুটি চোখ সামনের দিকে। নাকের পাটা ফুলে ফুলে উঠছে। চোয়াল শক্ত। যেন এক কঠিন প্রতিজ্ঞা তার বুকের মধ্যে। কষ্টের মধ্যে দিয়েই তো সাফল্যের স্বাদ আসে। রাখাল একবারের জন্য সেই স্বাদ পেতে চায়।
সেদিন রাত্রেই জীবনের ছকটা বদলে গেল রাখালের, হয়তো বা কানাইয়েরও। কানাই ভাড়া খেটে সবেমাত্র স্টেশনের স্ট্যান্ডে এসে লাইনে গাড়ি লাগিয়েছে। তখন রাত আটটা বেজে গেছে। হঠাৎ স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়াল পিন্টুবাবু। পিন্টুবাবুকে কে চেনে! কলকাতা কাঁপানো যে দু’জন খেলোয়াড় স্টেশনের এপারে থাকেন তাঁদের মধ্যে পিন্টুবাবু একজন। অন্যজন বাবন। পিন্টুবাবুর সঙ্গে সাঁতরাপাড়ার মানসবাবু। ওই লম্বা মানুষটা কলকাতার খবরের কাগজে চাকরি করেন। খেলাধুলো নিয়েই তাঁর মাতামাতি বেশি। পিন্টুবাবু ডাকলেন, ‘এই যে কানাইদা, এদিকে শুনুন তো।'
কানাই একটু ঘাবড়ে গেল। পাড়ার বিস্তর ভদ্রলোক তার গাড়িতে সওয়ারি হয় বটে কিন্তু কেউ স্ট্যান্ডে এসে তাকে ‘আপনি’ বলে ডাকে না। তা ছাড়া পিন্টুবাবু আর মানসবাবুরা তো ফ্যালনা লোক নন। একজনের ছবি কাগজে ছাপা হয়, আর-একজন কাগজে লেখেন। কানাই রিকশার সিট থেকে লাফ দিয়ে নেমে সামনে এসে দাঁড়াল। পিন্টুবাবু কানাইকে দেখতে দেখতে বললেন, ‘রাখাল আপনার ছেলে সেটা আমরা জানি। কিন্তু আপনি কেমন বাপ?’
কানাই একথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারল না। সে পিন্টুবাবু আর মানসবাবুর মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ‘খুবই গরিব বাপ! তার মানে অকেজো বাপ।
পিন্টুবাবু বললেন, ‘আপনি রাখালকে দিয়ে সকালে রিকশা টানিয়েছেন? ওকে রিকশা চালাতে বলেছেন?
কানাই বলল, ‘তা বাবু, রিকশাওলার ছেলে কি উড়োজাহাজ চালাবে? ওই দিয়েই তো পেটের ভাত জোগাড় করতে হয়।'
এবার পিন্টুবাবু নন, মানসবাবু বললেন, ‘আপনি না জেনে কত বড় অন্যায় করেছেন সেটা যদি বুঝতে পারতেন তা হলে নিজেই কপাল চাপড়াতেন।'
অন্যায়টা যে কী এবং কোথায় সেটা কানাই বুঝতে পারল না। সে কেবল মনে মনে বলল, ‘এট্টু বেশি রিকশা টেনেছে, কিন্তু তাতে এমন কী অন্যায়! ওকে তো জোর করে দমকল চালাতে দেয়নি যে আগুন নেভাবার জন্য বিপদের মধ্যে ছোটাছুটি করতে হয়েছে।' অতএব কানাই বোকার মতো দু’চোখ তুলে ওঁদের দিকে তাকাল।
পিন্টু বললেন, ‘আপনি হয়তো জানেন, রাখাল আমাদের কোচিং সেন্টারে ফুটবল খেলা শিখতে যায়। আমিই ওকে নিয়ে গিয়েছি। ওর খরচপত্তর আমিই দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু কেন দিচ্ছি?’
এ বড় জটিল প্রশ্ন। ভদ্রলোকের নামী ছেলে কেন রিকশাওলার ছেলেকে খরচপত্র দিচ্ছে সেকথা কানাই কেমন করে বলবে! আর খরচপত্তরটা যে কী, সেটাও তো সে জানে না। সকাল-বিকেল মাঠে গিয়ে ফুটবলে লাথি মারে, এতে আবার খরচপত্তর হয় নাকি! কানাই মনে মনে সাত-পাঁচ ভাবতে লাগল। কানাইয়ের দিক থেকে কোনও উত্তর না পেয়ে পিন্টুবা বললেন, ‘ওর পেছনে খরচ করছি কেন জানেন, ওর ভেতরে জিনিস আছে। একদিন বড় প্লেয়ার হওয়ার চান্স আছে। ওকে জুনিয়ার বেঙ্গলে ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করছি। আর আপনি এমনই বাপ, ছেলেটাকে দিয়ে সারা সকাল রিকশা টানিয়ে ওর এমন হাল করেছেন যে, আজ বিকেলে সিলেকশন কমিটির সামনে প্রথম খেলাটাতে মাঠেই নামতে পারল না।'
সকালে রিকশা টেনেছে বলে বিকেলে কেন মাঠে নামতে পারবে না এটাও কানাইয়ের কাছে খুব রহস্য মনে হল। সে শুধু বলল, 'মাঠে নামতে কে বারণ করেছে?’
এবার বিরক্ত গলায় মানসবাবু বললেন, ‘নামবে কেমন করে! এতক্ষণ রিকশা টানার কি অভ্যাস আছে? বেশ কষ্ট হয়েছে। পায়ের শিরায় টান ধরেছে। এসব করলে খেলা হবে? আপনি কী চান? রিকশাওলার ছেলে রিকশাওলাই হবে? ওর ভেতর যদি বড় হওয়ার আগ্রহ আর সম্ভাবনা থাকে, তা হলে ওকে কেন বড় হতে দেবেন না??
কানাই যেন মহা ধন্দে পড়ে গেল। তার ছেলে বড় হবে? কেমন করে হবে? তাদের সাতপুরুষে কেউ কখনও বড় হওয়ার কথা ভেবেছে, না ভাববার সময় পেয়েছে! শরীরে রোগ-ব্যাধি ঢুকে অকালে মরে না গেলে, মানে বেঁচেবর্তে থাকলে সব মানুষই তো একদিন বড় হয়। বয়স বাড়ে, শরীরে বাড়ে, বিয়ে-থা করে ছেলেপুলের বাবা হয়, চুলে পাক ধরে, দাঁত পড়ে। এই তো একরকমের বড় হওয়া। এর বাইরে আর-একরকমের বড় হওয়া আছে। তাঁরা সব জ্ঞানী-গুণী মানুষ। তাঁদের কথা বইয়ে পড়তে হয়, তাঁদের ছবি দিয়ে ক্যালেন্ডার হয়, তাঁদের কারও কারও পাথরের মূর্তি তৈরি করে রাস্তায় রাখা হয় বেদির ওপর। এই দুইয়ের বাইরে আবার কোনওরকম বড় হওয়া আছে নাকি? রাখাল, মানে খোকা কোনওরকমে বড় হতে চাইছে। কিন্তু চাইলেই কি সব হয়? কপালের লিখন যেমনটি বিধাতাপুরুষ জন্মাবার পর লিখে দিয়েছেন, তার অন্যথা হবে কেমন করে? কানাই রিকশাওলার ছেলে, বয়সে বড় হয়ে উঠতে পারে, তার বাইরে অন্যরকম কোনও বড় হওয়া কি সম্ভব?
কানাই অবিশ্বাসের গলায় বলল, 'আপনারা সব বাবুমশাই। আপনারা বলেন বড় ভাল, শুনতে শুনতে ঘোর লেগে যায়। তা ভেবেচিন্তে একবার বলেন তো, ওই যে বড় হওয়া, সেটা কেমন? এ তল্লাটের বিশ-পঁচিশটা গাঁয়ের কোনও রিকশাওলার ছেলে তেমনটি হয়েছে? ওটি হওয়ার নয়। ওইখানেই ভগবানের মারপ্যাঁচ।
মানসবাবু এবার ধমকের সুরে বলে উঠলেন, 'আপনার চারপাশের বিশ-পঁচিশটা গ্রাম নিয়েই পৃথিবীটা তৈরি হয়নি। গোটা পৃথিবীর খবর রাখেন? কারও কপালে কিছু লেখা থাকে না। বিধাতাপুরুষের অত সময় নেই যে, দেড় কোটি মানুষের কপালে বসে বসে সব লিখে রাখবেন। পৃথিবীতে প্রতিদিন প্রায় দেড় কোটির বেশি মানুষ জন্ম নিচ্ছে। মানুষ নিজেকে নিজে তৈরি করে। তৈরি করার কাজে কেউ সফল, কেউ-বা অসফল। রাখালকেও তৈরি হতে হবে। কিন্তু আপনি সে সুযোগটা কেড়ে নিচ্ছেন।'
কানাইয়ের অবস্থাটা তখন বর্ণনাতীত। যেন খুব কঠিন একটা অঙ্ক তাকে কষতে দেওয়া হয়েছে। সে নির্বোধের মতো ফাঁকা দৃষ্টিতে পিন্টুবাবু আর মানসবাবুর দিকে তাকাল। পিন্টু অবস্থাটা বুঝতে পেরে বললেন, 'কাল সকালে আপনি একবার সংঘশ্রীর মাঠে আসতে পারবেন? যদি আসেন, তা হলে ব্যাপারটা আপনাকে বুঝিয়ে বলতে পারব। আসবেন কি?
কানাই ঘাড় নাড়ল। ঘাড় নেড়ে বুঝিয়ে দিল, সে আসবে। কিন্তু ওরা চলে যেতে কানাইয়ের মনে হল, খোকার কি খুব বড় ধরনের অসুখ-টসুখ হয়েছে? বড় ধরনের অসুখের কথা মনে হলেই তার মনে পড়ে বাবার অসুখের কথা। খোকাকে নিয়ে কানাইয়ের একটু ভাবনা হল। নিজেকে অপরাধী মনে হতেই সে নিজেকে হালকা করবার জন্য মনে মনে বলল, ‘গরিব-গুরবোদের ওরকম অসুখ-টসুখ হয়েই থাকে। যিনি দেন তিনিই আবার নিয়ে নেন। আর সময় হলে ওই অসুখেই কাত।'
সারাদিন আর গোটা সন্ধেটা খোকার কথাটা থেকে থেকে তাকে উৎপাত করতে লাগল। রাত্রিবেলা ঘরে ফিরে দেখল, খোকা ঘুমিয়ে আছে। খোকার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে মনে পড়ল সাত বছর বয়সে ছেলেটা মাতৃহারা হয়েছে। গরিব মাতৃহারা ছেলের বুকেও কোনও স্বপ্ন থাকে নাকি? হঠাৎ কানাইয়ের মনটা আস্তে আস্তে বদলে যেতে লাগল। যেমন করে নিঃশব্দে বর্ষার মেঘ আকাশকে ঢেকে দিয়ে চারপাশে থমথমে বিষণ্নতা জাগিয়ে তোলে, তেমন করেই কানাইয়ের মনটা কেমন খারাপ হয়ে যেতে লাগল। সে খোকার দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে বলল, ‘খোকা, আজ সকালে তোকে খুব কষ্ট দিয়েছি, তাই না রে। আমি মাঝে মাঝে বড্ড পাষণ্ড হয়ে যাই। তুই ক্ষমা করে দিস বাবা!’
কানাইয়ের গলা বুজে আসতে লাগল। কিন্তু তার চেয়েও বড় বিস্ময়, খোকা কি তার কথা শুনতে পেয়েছে? নইলে ঘুম ভেঙে খোকা বিছানার ওপর উঠে বসল কেমন করে? খোকা ঘুমভাঙা চোখে তার দিকে তাকিয়ে। সে ডাকল, ‘খোকা খোকা বলল, ‘তুমি নাকি কাল সকালে আমাদের মাঠে যাবে?’
কানাই মুখে কোনও কথা বলল না, শুধু ঘাড় নাড়তে লাগল।
মাঠে এসে কানাই ছুটন্ত ছেলেদের মধ্যে প্রথমে রাখালকে খোঁজবার চেষ্টা করল। বড় মাঠটাতে প্রায় বিশ-পঁচিশটা ছেলে জার্সি পরে ছোটাছুটি করছে। যেন নানা রঙের একঝাঁক পাখি। রাখালকে এখন আর আলাদা করে চেনা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে একজন রাখাল নয়, মাঠ জুড়ে অনেক রাখাল ছুটছে। সকালের কচি আলোর মধ্যে একঝাঁক পাখি। কানাই রিকশাটাকে জামগাছের নীচে লাগাল। তার সাহস হল না মাঠের মধ্যে গিয়ে পিন্টুবাবুকে ডাকে। বড় বড় জিনিস সে ভাবতে পারে না। তবুও তার কেন যেন মনে হল, মন্দিরে গিয়ে পুজোর সময় পূজারীকে যেমন ডাকতে নেই, এখানেও তেমনই পিন্টুবাবুকে ডাকা ঠিক হবে না। চলতে ফিরতে নজরে পড়লে তিনিই ডেকে নেবেন।
জামগাছের নীচে কানাইয়ের রিকশা, তারই সিটে বসে কানাই দেখতে লাগল মাঠের ছেলেদের, যার মধ্যে রাখালও আছে। কালো আর সাদা ফুটকি দেওয়া গোটাতিনেক বল নিয়ে ছেলেরা তিনটে দলে ভাগ হয়ে নানা কসরত করছে। একবার মনে হল, রাখাল শূন্যে লাফিয়ে উঠে মাথা দিয়ে একটা বল ঠেলে দিল অন্যের মাথায়। অন্য একটি ছেলে সেই বল মাথা দিয়ে নামিয়ে আনল পায়ের কাছে। মাঠে যেমন দল করে ফুটবল খেলা হয়, এটা ঠিক তেমন হচ্ছে না। খোকা যে বলে প্র্যাকটিস, এটা বুঝি তাহলে তাই।
একটু পরে মানসবাবু এলেন। কানাইকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে আসছিলেন। কানাই নিজে রিকশা থেকে নেমে গিয়ে তাঁর সামনে দাঁড়াল।
মানসবাবু বললেন, ‘ও, আপনি এসে গেছেন! কতক্ষণ এসেছেন?’
কানাই উত্তর দিল, ‘আজ্ঞে, একটু আগে। তা ধরুন, দশ-পনেরো মিনিট হবে।'
মানসবাবু গিয়ে বসলেন কানাইয়ের রিকশার ওপর। পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরাতে যাওয়ার আগে বললেন, ‘খাবেন নাকি?’
কানাই একটু লজ্জা পেল। লাজুক চোখে মানসবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তা দিন একখান।'
সিগারেটে টান দিয়ে মানসবাবু বললেন, ‘এ গ্রুপে, মানে যে গ্রুপে রাখাল আছে তাদের আজ হেড প্র্যাকটিস করানো হচ্ছে। ফুটবল খেলাটা যখন দেখেন তখন কি আপনার মনে হয় একটা খেলোয়াড়কে কতরকমভাবে তৈরি হতে হয়। তার শরীরের নানা অংশকে নানা পরিস্থিতিতে কেমনভাবে কাজে লাগাতে হয়। পায়ের কোন অংশ দিয়ে মারলে বলটা ওপরে উঠবে, আর কেমনভাবে শট নিলে বলটা মাটি কামড়ে ছুটে যাবে, মাথার কোন জায়গা দিয়ে হেড করলে বল কোথায় যাবে এরকম নানা জিনিস আছে যা খেলোয়াড়দের শিখতে হয়। শিখতে শিখতে মনের মধ্যে, শরীরের মধ্যে মিশিয়ে নিতে হয়। তার সঙ্গে যোগ করতে হবে নিজের বুদ্ধি। তা এসব জিনিস কী একদিনে হয়? এর জন্য রোজ প্র্যাকটিস চাই। প্র্যাকটিসের পর একটু খাবার-টাবার।’
মানসবাবু সিগারেটে টান দেওয়ার জন্য একটু থামতেই কানাই বলে উঠল, ‘এ তো হক কথা। গতরকে খাটালে তাকেও তেমন খাবার দিতে হয়। আমার বাপের যে রাজরোগ হয়েছিল সে তো না খেয়ে-খেয়ে। আমি সারাদিন জান নিংড়ে রিকশা চালাই। সেজন্য এট্টু ফাঁক পেলেই মনার দোকানে গিয়ে পাউরুটি আর ঘুগনি খেয়ে নিই। আর দু’বার দুধজল। এখন ভেবেচিন্তে বলেন দেখি, খোকার তরে ওইসব খাবার, মানে মাংস, দুধ, ডিম, ছানা-টানা এগুলো আমি কোথায় পাব। লাইনে এখন বিস্তর গাড়ি। দু'খানা মোটে ডেলি। রোজ সাত টাকা করে মালিককে জমা দিতে হয়। তারপর মেরামতের খরচ। পথঘাটের যা হাল, ঢাকা তো হপ্তায় দু’বার করে লিক হচ্ছে। তাই বলছিলুম, রিকশাওলার ছেলের ওসব হওয়ার নয়।'
সিগারেটে শেষ টান দিয়ে মানসবাবু কানাইয়ের দিকে তাকালেন। কানাইয়ের মুখে এখন যে নির্বিকার নিস্পৃহতা, সেটা যে একধরনের হতাশা থেকেই জন্ম নেয়, সেটা মানসবাবু বুঝতে পারলেন। কানাইয়ের মুখের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে নিতে বললেন, ‘পিন্টু একটু পরে এসে আপনার সঙ্গে কথা বলবে। কথা বলার পর বুঝবেন, আপনি আগে থেকেই যতটা ভয় পাচ্ছেন ততটা ভয় পাওয়ার অথবা হতাশ হওয়ার কোনও কারণ নেই।'
কানাই নিজের সিগারেটে জোরে একটা টান মেরে বলল, ‘ছোট মুখে একখান বড় কথা বলি বাবু, কথাখান হল গিয়ে গ্রহের ফের। এই যে সব খেলাধুলো, গান-বাজনা, গণ্যি-মান্যি লোক হওয়া এসবের জন্য সাতপুরুষের পুণ্যি চাই। পুণ্যি না থাকলে এসব হয় না। রিকশাওলার ঘরে এমন অঘটন ঘটে না। ঘটলেও তেনার সহ্যি হবে না।”
কানাই ‘তেনার’ কথাটা বলার সময় হাতের আঙুলটা আকাশের দিকে তুলল। ওই আঙুলের মধ্যেই যেন কানাইয়ের পুঞ্জীভূত বেদনা আর অভিযোগ। কানাই যেন বিশ্বাসই করে উঠতে পারে না, তার ছেলে বড় কিছু হতে পারে, বড় কিছু করতে পারে। তার সমস্ত স্বপ্ন, সাধ আর উচ্চাশার গলায় সে নিজে চেপে রেখেছে রিকশার তিনটে চাকা। রিকশা চালানো আর রিকশাওলা হওয়া যেন তার কাছে ছিল নিয়তি-নির্দিষ্ট, অতএব নিয়তির বাইরে কিছু হওয়ার নয়। মানসবাবু বললেন, ‘দেখুন আপনি বড্ড বেশি বকেন। কিছু না জেনে কেবল ভগবান আর অদৃষ্টকে দুষছেন। ইচ্ছে আর সাধনা, পরিশ্রম আর প্রতিজ্ঞা একসঙ্গে হলে কী হয় সেটা আপনি জানেন? ঊর্মিলা ছেত্রীর নাম শুনেছেন?
কানাই বার-দুই চোখ পিটপিট করতে করতে বলল, ‘কোন পাড়ায় থাকেন? মেয়ে ইস্কুলের বড় দিদিমণি
মানসবাবু বললেন, ‘না। উনি দিদিমণি নন। ওই ঊর্মিলা সাঁতারের মেয়ে। সাঁতারে ওর রেকর্ড আছে। ন্যাশনালে গিয়েছিল। সেখানে ঊর্মিলা চ্যাম্পিয়ান। মানে ভারতের সেরা মেয়ে-সাঁতারুর সম্মান ও পেয়েছে। কাগজে ছবি বেরিয়েছে।'
কানাই বলল, ‘তা হবে। বড় ঘরের ছেলেমেয়েরা তো বড় বড় কাজ করবেই।'
মানসবাবু বললেন, ‘খুব বড় ঘরের মেয়ে তাই না? বড্ড জেনে গেছেন। ওই ঊর্মিলার বাবাও আপনার মতো রিকশা চালায়। রাখাল যেমন রিকশাওলার ছেলে, ওই ঊর্মিলাও তেমনই রিকশাওলার মেয়ে। কিন্তু তার জন্য সে থেমে থাকেনি। আপনার মতো ভাগ্যের দোহাই দিয়ে ঘরে বসে দিন কাটায়নি। নিজের ছোট্ট ঘরকে সে দেশের সামনে বড় করেছে। মানুষ যে কোনও ঘরে, যে কোনও জাতে জন্মাতে পারে। সেটা কোনও ব্যাপার নয়। সবদিক থেকে মানুষ হয়ে ওঠা আর দেশের মানুষের ভালবাসা অর্জন করাটাই আসল কথা। নিজের ঘরে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে কে যাবে আপনাকে তাদের ভালবাসা জানাতে? তার জন্য কাজ করতে হবে, লড়তে হবে, অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে হবে। বলবান সময়ের পিঠে সওয়ার হতে হবে। কিন্তু আপনার মতো এমন বাপ যিনি সবসময় নিজেকে ক্ষুদ্র করে রাখেন, হতাশায় ভোগেন, পদে পদে ভাগ্যকে মানেন আর মেনে নেন, তেমন বাপ দিয়ে চলবে না। রাখালের মতো আপনারও ট্রেনিং দরকার।'
কানাই যেন বোবা হয়ে গেল। মানসবাবু গড়গড় করে যা বলে গেলেন তা কি সত্যি! ওই সাঁতারের মেয়েটা, যার নাম ঊর্মিলা, তার বাবা কি তারই মতো রিকশা চালায়? রিকশাওলার ঘরেও তা হলে অঘটন ঘটে! এসব রূপকথা নয়তো!
কানাই দুনিয়া দেখেনি। সারা বিশ্বের কোনও খবরও সে রাখে না। সে জানে শুধু তার তিন চাকাওলা রিকশাটাকে। রিকশাটা সে চালায় কিন্তু রিকশার মালিক সে নয়। তার স্বপ্ন পয়সা জমিয়ে জমিয়ে একটা রিকশা কেনা। কতবার শ্যামনগরে গিয়ে রিকশার দরদাম করেছে, নতুন রিকশার গায়ে হাত বুলিয়ে মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে আর ভেবেছে কতদিনে একখানা নতুন রিকশা, নিজের রিকশা কেনার সামর্থ্য হবে তার! ওই একটাই সম্পত্তি সে রেখে যেতে চায় খোকার জন্য। মাথা গোঁজার সোয়া দু’ কাঠা জমি তার বাবা দান হিসেবে পেয়েছিলেন চৌধুরীবাবুদের কাছ থেকে। ওঁদের দেদার জমি। সোয়া দু’ কাঠা দান করতে খ্যাতি আর পুণ্য যত হয়, ক্ষতি হয় তার চাইতে অনেক, অনেক কম। তার বাবা চৌধুরীদের হয়ে সারাজীবন নানা কাজ করেছেন। সবই গায়ে খাটার কাজ। সেই কাজের জন্য টাকা মিলত না, মিলেছিল মাথা গোঁজার আশ্রয়। কালক্রমে সেটাই দানপত্র করে দিয়ে গেছেন বড় চৌধুরীবাবু। এখনকার দিনে এসব ভাবাই যায় না! কানাই জানে, গজুদাকে কত লোক বুঝিয়েছে, কানাইকে হাজার কয়েক টাকা দিয়ে দানপত্রটা ফিরিয়ে নাও। এখন ওই জমি কাঠাপ্রতি দর পাবে ষাট হাজার টাকা।
গজুদা গোরুর পা ধুইয়ে দিতে দিতে বলতেন, ‘ফিরিয়ে নেব কী! কাগজপত্র তো সব আমার কাছে। বাবা দান করেছেন আর আমি সেটা ভজিয়ে ভাজিয়ে ফিরিয়ে নেব! আমি কি তোমার মতো নরাধম নাকি!’
এইরকমই তো জীবন কানাই মণ্ডলের। এই জীবনে অত বড় স্বপ্ন সে দেখবে কেমন করে। বড় স্বপ্ন দেখার জন্যও বড় মন দরকার। তেমন তো কানাইয়ের নেই। অভাবে, কষ্টে আর অপমানে জ্বলতে জ্বলতে তার ভেতরটা তো কবেই পুড়ে গেছে। পোড়া কাঠে নতুন করে পাতা গজায় না। সে শুধু ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে মানুষের পায়ে পায়ে লেগে মাটিতে মিশে যাওয়ার অপেক্ষায় পথের ধারে পড়ে থাকে।
প্র্যাকটিস শেষ করে পিন্টুবাবু আসেন। তাঁর গেঞ্জি ঘামে ভিজে সপসপ করছে। কানের পাশে জুলফির মধ্যে দিয়ে ঘাম গড়িয়ে নেমে আসছে গালে। একটা তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে গেঞ্জিটা গা থেকে খুলে ফেললেন পিন্টুবাবু। কানাই লক্ষ করল ছেলেরা একটা গামলা থেকে হাতের মুঠোয় কী যেন তুলে নিয়ে খাচ্ছে। কানাই বলল, ‘ওরা কী খাচ্ছে?'
পিন্টুবাবু ম্লান হাসলেন। বললেন, ‘প্র্যাকটিসের পর কিছু খেতে দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। এখানে যাদের দেখছেন তাদের মধ্যে পাঁচ-সাতজন আছে যারা বাড়িতে গিয়ে ভাল-মন্দ খেতে পারে। বাকিরা সবাই আপনার রাখালের মতো। হয়তো উনিশ-বিশের তফাত। ছোলা ভিজিয়ে রাখি, সেই ভেজানো ছোলা, তার সঙ্গে একটু শসার টুকরো আর আদা। প্র্যাকটিসের পর ও-ই চিবোয়। টাকা-পয়সা জোগাড় করতে পারলে আর-একটু ভাল ব্যবস্থা হয়।'
একটা ছেলে একমুঠো ছোলা নিয়ে এসে পিন্টুবাবুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “পিন্টুদা, নিন।'
পিন্টুবাবু জিজ্ঞেস করলেন, 'সবার নেওয়া হয়েছে তো?'
পিন্টু কিছু ছোলা কানাইয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘নিন, আমাদের টিফিন একটু খেয়ে দেখুন।'
কুণ্ঠিতভাবে কানাই হাত বাড়াল। পিন্টুবাবু বললেন, ‘এখানে যত ছেলে প্র্যাকটিস করছে সবারই হয়তো শেষপর্যন্ত খেলা হবে না। ডিস্ট্রিক্ট পর্যন্ত যাবে। কিন্তু যারা, অন্তত যে ক’জন ভবিষ্যতে ন্যাশনালেও যেতে পারে বলে আমার ধারণা, রাখাল কিন্তু তাদের মধ্যে একজন। সে কারণেই ওর দিকে বিশেষ নজর দেওয়া দরকার। ওকে অনেক খাটতে হবে, অনেক লড়াই করতে হবে। আপনি যদি ওর পাশে না থাকেন তা হলে ওর পক্ষে এগনো মুশকিল। আপনি দেখবেন ওর ঘরের দিকটা, আমি মাঠের দিকটা।'
ছোলা চিবনো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে মনে মনে ভাবতে লাগল, আমি ‘ঘরের দিকটা দেখব’ কথাটার মানে কী। ওর পাশে থাকতে হবে একথাটাও তো নতুন কিছু নয়। বাপ তো ছেলের পাশে থাকেই। কতই বা বয়স। চোখে চোখে তো রাখতেই হবে। কিন্তু পিন্টুবাবু কী অন্যরকম কিছু বলতে বা বোঝাতে চাইছেন? পিন্টুবাবুর কথাটা খোলসা করে জানতে না পারলে তার অসুবিধে হচ্ছে। সে পিন্টুবাবুর দিকে জিজ্ঞেস করল, ‘তা আমায় কী করতে হবে?'
পিন্টুবাবু বললেন, ‘তেমন কিছু নয়। শুধু ওকে উৎসাহ দিয়ে যাবেন। ওকে বুঝতে দেবেন আপনিও ওর খেলাধুলোর অংশীদার। আপনিও ওকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। আপনি ঘরের ভেতর থেকে ওকে মনের শক্তি জোগাবেন।'
ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলে কানাই গুম হয়ে গেল। মাঠে রোদের তাপ চড়চড় করে বেড়ে যাচ্ছে। একটু পরেই তাকে স্ট্যান্ডের লাইনে রিকশা লাগাতে হবে। তার কাছে স্ট্যান্ডে গিয়ে রিকশা লাগানো আর সকাল দশটায় ডেলি নিতে যাওয়াটাই এই মুহূর্তে জরুরি কর্তব্য বলে মনে হল। জামগাছের নীচ থেকে রিকশা নিয়ে যেতে যেতে কানাই বলল, ‘দেখেন চেষ্টা করে। আমারে যা বলবেন, করে দেব।'
রিকশা নিয়ে কানাই বাড়ি না গিয়ে স্ট্যান্ডের দিকে যেতে লাগল। তার মাথার মধ্যে কেমন যেন হচ্ছে। ঢেউ লেগে জলের মধ্যে গাছের ছায়া যেমন কেঁপে কেঁপে ভেঙে যায় আর ছায়া পড়ে, তেমনই তার মনের মধ্যে একটা স্বপ্ন ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে, আবার মাথাচাড়া দিচ্ছে।
এই ওঠাপড়ার যেন বিরাম নেই। মাঝরাত্তিরে বারান্দায় উঠে এল সে। নিমগাছের মাথার ওপরে চাঁদ। চাঁদের আলো লেগে পাতাগুলো চিকচিক করছে। সাদা মেঘের দল গড়িয়ে গড়িয়ে ভেসে যাচ্ছে আকাশ দিয়ে। এমন দৃশ্য তো মাঝেমধ্যেই হয়, কানাই বারান্দায় বসে বাঁশের খুঁটিতে হেলান দিয়ে দেখেও সেসব। কিন্তু আজ তার মনটা অন্যরকম হয়ে আছে। বিলকুল অন্যরকম। তার চোখের সামনের আকাশটা আস্তে আস্তে কোনও এক জাদুমন্ত্রে যেন গলে যেতে থাকে। সেটা আর আকাশ থাকে না। বেশ বড় টলটলে একটা দিঘি হয়ে যায়। তার নীল জলে সাঁতার কাটে একটা মেয়ে আর দিঘির পারে রিকশা নিয়ে চক্কর দিতে দিতে তাই দেখে যায় এক প্রৌঢ় পিতা। ওই মেয়েটাই কি একদিন ঊর্মিলা ছেত্রী হয়ে ওঠে?
কানাইয়ের দু’চোখে স্বপ্ন জমতে থাকে। টলটলে নীল জলের পুকুরটা সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ। মাঠের দু'দিকে গোলপোস্ট। সেই মাঠে রঙিন জামা পরে ছুটছে খোকা, তার পায়ে সাদা-কালো ফুটকি দেওয়া একটা বল। খোকার পায়ে যেন ঝড়ের গতি। দু'পাশে কানে তালা-ধরানো চিৎকার, ‘রাখাল, রাখাল।'
হঠাৎ করে সংবিৎ ফিরে আসে কানাইয়ের। কে যেন বাইরে ডাকছে, ‘রাখাল, রাখাল।' কানাই দাওয়া থেকে উঠে দাঁড়ায়। একটু এগিয়ে গিয়ে হাঁক দেয়, ‘কে?’
এবার ভেতরে আসে দু’জন ছেলে। কানাইকে দেখে বলে, ‘পিন্টুদা খবর পাঠিয়েছেন। কাল আবার সিলেকশন কমিটির সামনে রাখালের খেলা। আজ অফিসে গিয়ে পিন্টুদা খবর পেয়েছেন। রাখাল যেন সকালবেলাতেই পিন্টুদার সঙ্গে দেখা করে। জুনিয়ার বেঙ্গলের যে সিলেকশন হচ্ছে, তাতে এটাই শেষ খেলা।'
কানাই বিমূঢ়ের মতো শুধু জিজ্ঞেস করল, ‘এখন ক’টা বাজে?’
একটি ছেলে ঘড়ি দেখে নিয়ে বলল, 'বারোটা বেজে বাইশ মিনিট।
কানাই জানে না, জুনিয়ার বেঙ্গল কথাটার মানে কী? সেখানে খেলতে পাওয়ার নিশ্চয়ই একটা গৌরব আছে, সেটা সে অনুভব করতে পারে। কিন্তু সেই গৌরবের গুরুত্বটা সে জানে না। তার শুধু মনে হয়, ‘খোকা পারবে তো?’
ঘরে এসে খোকার মুখের দিকে তাকায়। মায়ের মুখের আদল পেয়েছে খোকা। ওই মেয়েটা, মানে খোকার মা, খুব স্বপ্ন দেখতে পারত। সে বলত, ‘আমাদের একটাই খোকা। খোকা একদিন বড় হবে। দশজনের একজন হবে।'
কানাই বিড়ি টানতে টানতে হাসত। মেয়েমানুষের কথায় সে কান দিত না। কিন্তু শেষপর্যন্ত কি ওর স্বপ্নটাই সত্যি হবে? নিজে কখনও স্বপ্ন দেখতে শেখেনি। রিকশাওলার বউ এত স্বপ্ন দেখতে শিখল কেমন করে!
কানাই দাওয়া থেকে উঠে এসে ছেলেকে ডাকল। পিন্টুদার দেওয়া খবরটা ছেলেকে জানিয়ে দিয়ে সে ছেলের পাশে শুয়ে পড়ল। তার চোখে ঘুম আসছে না। সে চোখ বন্ধ করে ঘুমের চেষ্টা করে আর বন্ধ চোখের ভেতরে একটা সবুজ মাঠ ভেসে উঠতে থাকে। থাকতে না পেরে একসময় খোকার মাথায় হাত রেখে ডাকল, ‘খোকা, অ্যাই খোকা।’
খোকা বিছানায় উঠে বসতে যাচ্ছিল। কানাই ছেলেকে শুইয়ে দিয়ে বলল, ‘পিন্টুবাবুর লোক এসে খবর দিয়ে গেল কাল নাকি সিলেকশন কমিটির সামনে তোর খেলা। তুই পারবি তো?’ খোকা বলল, ‘তোমার আশীর্বাদ থাকলে নিশ্চয়ই পারব।'
কানাইয়ের বুকের মধ্যে মোচড় দিল। সে ছেলের মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বলল, ‘ভগবানের আশীর্বাদ থাকলে সব হয়। আমার নয়, তুই ভগবানের আশীর্বাদ ভিক্ষে কর।'
জেগে জেগে রাত শেষ হয়ে যেতে দেখল কানাই। ভোরের আলো ফোটার পর বারান্দায় এল। নিমগাছের পাতাগুলো ভোরের হাওয়ায় তিরতির করে কাঁপছে। পুব আকাশটা লাল করে সূর্য উঠছে দত্তদের আমবাগানের মাথা ছাড়িয়ে। কানাইয়ের মনে আশা আর আশঙ্কা। খোকা পারবে তো? অত লোকের মধ্যে, কলকাতার বাবুদের সামনে কানাই রিকশাওলার ছেলে তার ক্লাবের মান, পিন্টুবাবুর সম্মান রাখতে পারবে তো?
কানাইয়ের ইচ্ছে ছিল সেও কলকাতার মাঠে গিয়ে খোকার খেলা দেখে। কিন্তু কথাটা বলতে তার লজ্জা হল। সকাল দশটার ট্রেনে খোকাকে নিয়ে পিন্টুবাবু কলকাতায় চলে গেলেন। প্ল্যাটফর্মে কানাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওদের চলে যেতে দেখল। গাড়ি আসার একটু আগে কানাই ফতুয়ার পকেট থেকে পাঁচটা টাকা বের করে খোকার হাতে গুনে দিয়ে বলল, ‘খিদে পেলে খাস!'
খোকা অদ্ভুত চোখে তার দিকে তাকাল। সে চোখে বিস্ময় আর কী যেন একটা ছিল, যাতে তার চোখও জ্বালা করে উঠল। ট্রেন যখন প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে তখন খোকা ঢিপ করে তাকে প্রণাম করল। চোখের জ্বালা এবার জল হয়ে দু’ গালে গড়িয়ে এল কানাইয়ের। সে মুখ ফেরাল। ট্রেনটা থামল এবং ভোঁ বাজিয়ে আবার চলেও গেল।
স্ট্যান্ডে ফিরে এসে শুনতে পেল তার লাইন কেটে গেছে। এবার দাঁড়াতে হবে সবার শেষে। কিন্তু আজ আর তাতে কিছু যায়-আসে না কানাইয়ের। সে সবার পেছনেই থাকতে চায়। কিন্তু খোকা যেন এগিয়ে যায়। ভগবান যেন খোকাকে এগিয়ে যেতে দেন।
দুপুরের পর থেকেই তার ছটফটানি বাড়তে লাগল। তিনটে চল্লিশে খোকা খেলতে নামবে। এখন ক'টা বাজে? সওয়ারিকে জিজ্ঞেস করতে থাকে কানাই। তার বুকের মধ্যে চাপ চাপ উত্তেজনা। স্ট্যান্ডে ফিরে এসে মন্টুদার দোকানে ঘড়ি দেখে। তিনটে পঞ্চান্ন। তার মানে খোকা এখন খেলছে। মাঠের চারপাশে লোক। একটা তুমুল প্রতিযোগিতা। আর তার মধ্যে খেলছে কেশবপুরের রিকশাওলার ছেলে রাখাল।
প্যাসেঞ্জার ফিরিয়ে দেয় কানাই। প্যাসেঞ্জার গাল পাড়ে। কিন্তু কানাই কেমন করে বোঝাবে এখন সে রিকশা টানতে পারবে না। বুকের মধ্যে টানটান উত্তেজনা, মন সহস্ৰচক্ষু মেলে ঘুরছে খোকার পায়ে পায়ে। এখন সে রিকশার প্যাডেলে চাপ দেবে কেমন করে। কানাই রিকশাটা লাইনের বাইরে এনে নিজেই পেরেক ঢুকিয়ে চাকা ফুটো করে দেয়। সবাই যেন বুঝতে পারে কানাইয়ের রিকশার চাকা লিক হয়ে গেছে। এতে প্যাসেঞ্জার নেওয়া যাবে না। রিকশা স্ট্যান্ডের কাছে কালীমন্দির। মায়ের পাশে বড়ঠাকুর। কানাই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। বেলা গড়িয়ে যেতে থাকে। কলকাতা থেকে আসা ট্রেনগুলো থেকে অফিস ফেরত বাবুরা নামে। কিন্তু খোকা কেন ফেরে না? কানাইয়ের বুকের মধ্যে উথাল-পাথাল হতে থাকে। সন্ধ্যা বাড়তে বাড়তে কেশবপুরের স্টেশনে রাত নামে। মনে মনে বড় ভাবনা হয় কানাইয়ের। সে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের মুখটাতে দাঁড়ায়, লোক নামিয়ে দিয়ে আবার চলে যায়। কানাই আবার ঝুঁকে পড়ে লাইনের দিকে তাকায়।
অবশেষে খোকা ফেরে। খোকার সঙ্গে পিন্টুবাবু। ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে কানাই কিছু বুঝতে পারে না। ওরা এগিয়ে আসে আর কানাই একবুক টসটসে উত্তেজনা নিয়ে ওদের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে। কানাইকে দেখতে পেয়ে পিন্টুবাবু রাখালকে বলেন, ‘যা, বাবাকে প্রণাম কর।'
রাখাল মাথা নিচু করে হাত বাড়ায় আর কানাই আকাশের দিকে মুখ তুলে নিজের মনে মনেই বলে, ‘তবে কি সত্যিই অঘটন ঘটল!’
পিন্টুবাবু বলেন, ‘ও সিলেকটেড হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ওর আজকের পারফরমেন্স আমার ভাল লাগেনি। এর চাইতে দশগুণ বেশি আশা করেছিলাম। তোর দমে ঘাটতি আছে। রোজ সকালে তোকে ছুটতে হবে। দম বাড়াতে হবে। এখনকার ফুটবলে দমের ঘাটতি হলে দাঁড়াতে পারবি না।'
বাপ-ব্যাটার রেস শুরু তার পরদিন সকাল থেকেই। কিন্তু তার জন্য গালমন্দ কম শুনতে হয়নি কানাইকে। মালিক ধমকেছেন। মালিকের ছেলে ঠাট্টা করে বলেছেন, ‘তোমার ছেলে কি পেলে-মারাদোনা হবে নাকি! সকালে তো ছেলের সঙ্গে রেস করেই হাঁপিয়ে পড়ো। তারপর স্টেশন অবধি দু’ খেপ মেরেই জিরেন নিতে হয়। আজ তিন হপ্তা ধরে তো জমার টাকা পুরোটা দিতেই পারছ না। তার চাইতে বাকি টাকা মিটিয়ে রিকশাটা ছেড়ে দাও।'
কানাই এসব কথার উত্তর দেয়নি, দিতে পারেনি। ততদিনে সে বুঝে গেছে তাকে আরও অনেক কষ্ট সহ্য করতে হবে। নিজের জীবনটা সে কোনওরকমভাবে কাটিয়ে দিতে পারবে, কিন্তু খোকার জীবনটা সে অন্যরকম করতে চায়। সে বুঝতে পারে, তার সামান্য রোজগারে খোকার জন্য সে কিছুই করে উঠতে পারবে না। এমনকী রোজ একটা করে ডিম, দিনে এক টুকরো মাছ, একপোয়া দুধ এসব কিনে খাওয়াবার ক্ষমতা তার নেই। পেটের ভাত জোটাতেই তার ঘাম বেরিয়ে যায়, ওসব জিনিস সে পাবে কোত্থেকে! পিন্টুবাবু আর মানসবাবুরা তাকে মারাদোনার গল্প শোনান। কোনও এক ফ্যাক্টরিতে সামান্য মাইনের ফিটারের চাকরি করতেন মারাদোনার বাবা। আট সন্তানের বোঝা সেই বাপের ঘাড়ে। থাকতেন গরিবদের বস্তিতে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অভাবের দানবটা তাঁদের তাড়া করে ফিরত। তবু সেই অভাব, অনটন আর দুঃস্থ জীবনের মধ্যে থেকেই একদিন মাথা তুলে দাঁড়াল একটা ছেলে, যার নাম মারাদোনা— ফুটবলের দুনিয়া কাঁপানো একটা নাম।
আর খোকা? সে ভাবে অন্য কথা। তার দু’ চোখে স্বপ্ন ভিড় করে আসে। তার স্বপ্নের মধ্যে শুধু সবুজ ঘাসে ঢাকা একটা মাঠ, দু’পাশে দুটো গোলপোস্ট আর সাদা কালো ফুটকি দেওয়া একটা বল। তার মনে হয় বিপক্ষ দলের গোলপোস্টের পেছনে, ঠিক জালের পেছনটাতেই তার বাবা দাঁড়িয়ে। সারাটা জীবন মানুষের উপেক্ষা আর অপমানে তার মুখ যেন কালো হয়ে আছে। তার বাপের মুখ থেকে দুঃখের কালো মেঘ সরিয়ে দিতে না পারলে রাখালের যেন শান্তি নেই। কত ছেলে পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করে তাদের বাবাকে সবার সামনে গর্বিত করে তোলে, কত ছেলে বড় চাকরি করে বাবাকে খুশি করে, কিন্তু সেসব করার সাধ্য নেই রাখালের। রাখাল শুধু খেলতে পারে। এই খেলা দিয়েই সে বাবার সব দুঃখ মুছে দিতে চায়। কিন্তু কেমন করে, কতদিনে সেটা হবে? জুনিয়ার বেঙ্গলের খেলা ছিল কেরলে। কেরল জায়গাটা কোথায় সেটা তখনও জানা ছিল না রাখালের। বাবা শুধু জানতে চাইত, ‘হ্যাঁ রে, খোকা, সেটা কোন দেশ? কেমন দেশ?’
রাখাল উত্তর দিতে পারত না। কেরল যাওয়ার কয়েকদিন আগে হঠাৎ একদিন গজুদা এলেন। গজুদার আসাটা কোনও নতুন ঘটনা নয়। মাঝেমধ্যেই আসেন। আজ এলেন রাস্তা থেকে ডাক ছাড়তে ছাড়তে। কানাই ব্যস্ত হয়ে তার ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোনে এল। গজুদা বললেন, ‘হ্যারে কানাই, খোকা নাকি জুনিয়ার বেঙ্গল খেলতে কেরল যাচ্ছে?’ কানাই মাথা নাড়ল।
গজুদা হাঁক দিলেন, ‘অ্যাই রাখাল, রাখাল।'
রাখাল বাইরে এল। গজুদা তাকে আপাদমস্তক দেখতে দেখতে বললেন, ‘ব্যাটা বড্ড লায়েক হয়ে গেছিস তাই না? নিজে মুখে খবরটা দিতে পারিসনি, ওই পিন্টের কাছ থেকে শুনতে হল। তা খুব তো ড্যাং ড্যাং করে যাচ্ছিস, ওখানে যাওয়ার মতো জামাকাপড় আছে? এখানেই বা খাওয়া-দাওয়ার কেমন ব্যবস্থা??
কানাই চুপ করে রইল। রাখাল একবার বাবার মুখের দিকে তাকাল, তারপর গজুদার চোখের দিকে।
গজুদা প্রায় গর্জন করে ওঠার ভঙ্গিতে বললেন, ‘এইজন্যই লোকে তোদের অবহেলা
করে। তোরা একেবারে যা-তা। বাপ-ব্যাটায় মিলে একবার কথাটা আমার কানে পৌঁছে দিতে পারলি না। আমার গোয়ালে তো আটখানা গোরু। তোদের কোনও আক্কেল আছে?’ কানাই হাতজোড় করে বলে উঠল, ‘বাবু, অপরাধ নেবেন না। আমার সাহসে কুলোয়নি। আপনাদের দয়ায় মাথা গোঁজার আস্তানা পেয়েছি। তার ওপর আর কিছু চাইলে যদি জুলুম মনে করেন, তাই...'
গজুদা কাঁধের গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললেন, 'আমি মনে করব সেটাও তুই বুঝে ফেলেছিস। শোন, কাল সকালে রাখাল যেন আমার বাড়িতে যায়। অফিস যাওয়ার পথে ওকে দোকানে নিয়ে গিয়ে জামা-প্যান্ট করিয়ে দিতে হবে। এখন আর বানাবার সময় হবে না, রেডিমেড কিনতে হবে। যদি জিতে ফিরতে পারিস আর গোল করতে পারিস তা হলে যতদিন আমি বাঁচব ততদিন একপো করে দুধ তোর বাঁধা। আর হেরে ফিরলে,আমার দেওয়া জামা-প্যান্ট টেনে খুলে নেব।'
সেবার জুনিয়ার বেঙ্গল কেরল থেকে জিতেই ফিরেছিল। কাগজে কাগজে নাম বেরিয়েছিল রাখাল মণ্ডলের। ফাইনালের দিন পঞ্জাবকে হারিয়েছিল তিন-এক গোলে। তিনটে গোলের মধ্যে দুটোই রাখালের। সেই সুবাদে কাগজে রাখালের ছবি বেরিয়েছিল। কিন্তু ফেরার সময় হাওড়া স্টেশনে নামতেই একজন লোক রাখালকে বলল, ‘আমি তোমার জন্যই দাঁড়িয়ে আছি। কলকাতার বড় মাঠে লিগ-শিল্ড খেলতে চাও? যদি চাও তা হলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ কোরো। এই নাও আমার কার্ড। এতে ঠিকানা আছে, ফোন নাম্বার আছে।'
লোকটা চলে যেতেই পিন্টুদা এলেন। কার্ডটা পিন্টুদাকে দেখাল রাখাল। পিন্টুদা কার্ডটা দেখতে দেখতে বললেন, ‘জানতাম এরকমই হবে। ব্যাটা কেরল থেকেই জ্বালাচ্ছে। ইউনাইটেড স্পোর্টিং ক্লাবের একজন কর্তা। অনূর্ধ্ব আঠারোর জন্য ছেলে খুঁজছে।'
রাখাল বলল, 'আমাকে যোগাযোগ করতে বলেছেন।'
পিন্টুদা বললেন, ‘সময় এলে আমিই যোগাযোগ করিয়ে দেব। তোকে এখনও তৈরি হতে হবে। বল নিয়ে ঘুরতে এখনও তোর সময় লাগে। রানিং বলে এখন অব্দি চিপ করতে শিখলি না। আরও অনেক কিছু শিখে তোকে ঘেরা মাঠে নামতে হবে।'
স্টেশন পেরিয়ে ট্যাক্সিতে উঠতে উঠতে রাখাল বলল, ‘ঘেরা মাঠে খেললে তো টাকা পাওয়া যায়। ওরাও বোধহয় টাকা দেবে।'
ট্যাক্সির দরজাটা শব্দ করে বন্ধ করে দিলেন পিন্টুদা। জানলার বাইরে চোখ রেখে বললেন, ‘তোর টাকার দরকার, তা আমি জানি। কিন্তু এখনই টাকার লোভে পা দিস না। আগে খেলাটা শেখ। তোকে আরও শিখতে হবে।'
রাখাল চুপ করে গেল। পিন্টুদাকে সে বোঝাতে পারবে না, অভাব এখনও তাদের কেমন করে খুবলে খুবলে খায়। টাকাই যে এখন তার সবচাইতে জরুরি। জুনিয়ার বেঙ্গলের স্টপার শ্যামনগরের কান্তি হালদার তাকে বলেছে, ‘যদি খেপ খেলতে চাও তা হলে আমার কাছে এসো। পঞ্চাশ-একশো খেলা প্রতি হয়ে যাবে। কবে কাকে তেলিয়ে মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গলে খেলব সে ভেবে ভেবে সময় নষ্ট করবে না। বড় ক্লাবের বড় বড়রাও খেপ খেলে।'
খেপ খেলার কথাটা পিন্টুদাকে ভয়েই বলতে পারল না রাখাল। শুধু মনে মনে ভাবল হপ্তায় একটা খেললেও তো একশো টাকা রোজগার হয়। বাপের হাতে দিতে পারলে তার দুর্ভাবনা অনেকটা কমে। কিন্তু সে জানে, পিন্টুদা এতে রাজি হবেন না।
কিন্তু টাকাটা হাতে পেলে বাবা তো খুশি হবে। বাবাকে খুশি করতেই একদিন কান্তি হালদারের ডাকে রাখাল চলে গেল নৈহাটিতে একটা টুর্নামেন্ট খেলতে। নক-আউট সিস্টেমে খেলা। দু’দিনে বারোটা দল খেলবে।
কান্তি বলল, ‘আমাদের রোজ দুটো করে দু’দিনে চারটে খেলা খেলতে হবে। প্রত্যেক খেলায় পঞ্চাশ টাকা পাবি। ফাইনালে উঠলে একশো টাকা। গোল করলে গোল প্রতি আরও পঞ্চাশ। যদি ফাইনালে দলকে টেনে তুলতে পারি আর তুই একটাও গোল করতে পারিস তাহলে তোর রোজগার কত হবে হিসেব করে দেখ।'
রাখাল মনে মনে হিসেব করল। ফাইনালে উঠে একটা গোল করতে পারলে তিনশো টাকা রোজগার। এখন এই মুহূর্তে তিনশো টাকা তার কাছে অনেক। মালিকের কাছে বাবার ধার হয়ে আছে আশি টাকার ওপর। মালিক যত বলেন, তার ছেলে বলেন তার চাইতে বেশি। স্টেশনের ওপারে মনোহারি দোকান। সেই দোকানে বসে রাখালকে দেখলেই ডাকেন। ডেকে বলেন, ‘তুই তো পেলে না হয় মারাদোনা হবি। কিন্তু সেসব হওয়ার আগে বাপের দেনাগুলো শোধ করতে বল।'
রাখাল উত্তর দিতে পারে না। মালিকের ছেলে বলে কথা! তা সেই ছেলে, মানে ভানুবাবু মাঝে মাঝে হুকুম করেন, ‘যা তো স্টেশন থেকে এই গ্লাসে করে দুটো চা নিয়ে আয়।'
রাখাল আপত্তি করতে পারে না। পাছে তার ওপর রেগে গিয়ে বাপের রিকশাটা কেড়ে নেন। দেনাটা শোধ করা থাকলে তবু বুকে খানিকটা ভরসা থাকত। দেনার জন্য সেটুকুও তার নেই। এই দোকানেই ভানুবাবু একদিন যাচ্ছেতাই একটা কাণ্ড করে ফেললেন। প্যারাগন মাঠ থেকে খেলে ফিরছিল রাখাল। সাইকেল করে এসে পুবপাড়ার গোবিন্দ খবর দিল, ‘রাখাল শিগগির চল। ভানুবাবু তোর বাবাকে কান ধরে ওঠবোস করাচ্ছে।'
বি টি রোডের ধার থেকে কানাই ছুটতে আরম্ভ করল। এই দৌড় কোনও গোলপোস্টের দিকে নয়। অপমান আর লাঞ্ছনার কঠিন ডিফেন্স তার সামনে। সে ছুটছে তার মধ্যে দিয়ে, যেখানে রয়েছে তার অপমানিত পিতা। রাখাল এসে বাবার সামনে দাঁড়াল। সে ঘেমে গেছে। তার নাক ফুলে ফুলে উঠছে, চোয়াল শক্ত হচ্ছে। দোকানের সামনে জনা তিরিশেক লোকের জটলা। ভানুবাবু উত্তেজিত হয়ে তাদের বোঝাচ্ছে, ‘এটাকে পুলিশে দেওয়া উচিত। বাসের সঙ্গে ইচ্ছে করে রিকশার ধাক্কা লাগিয়ে কেঁদে এসে পড়ল টাকার জন্য। দেড়শো টাকা দিলুম। কিন্তু রিকশাটা সারাল না। টাকা মেরে নিজের উঠোনে রিকশা আটকে রেখেছে। ওকে না মেরে শুধু কান ধরে ওঠবোস করিয়েছি।'
জটলার মধ্যে থেকে অন্য রিকশাওলারা চিৎকার করে উঠে বলতে লাগল, ‘ওঠবোস করাবার আপনি কে? আপনি কি হাকিম?’
ভিড় ঠেলে রাখাল সামনে এল। ছেলেকে এখানে দেখে কানাইয়ের চোখ ছলছলিয়ে উঠল। সে অন্যদিকে মুখ ঘোরাবার চেষ্টা করল। কিন্তু মুখ লুকোবার মতো নির্জনতা এখানে কোথায় ! রাখাল গিয়ে বাবার হাত ধরল। টান দিয়ে বলল, ‘উঠে এসো।'
রাখাল টের পেল তার বাবার হাত কাঁপছে। শুধু সেইদিন সে অন্যরকম চোখে ভানুবাবুর দিকে তাকিয়েছিল। তার মনে পড়ে গিয়েছিল পিন্টুদা আর বাবনদার কথা। ওঁরা বলতেন, ‘একজন খেলোয়াড়ের লড়াই করার জায়গা হচ্ছে তার মাঠ। জীবনে যত দুঃখ, অপমান আর লাঞ্ছনা পাবি তার জবাব দিবি মাঠে।'
ভানুবাবুর জন্যও জবাবটা সেদিন তুলে রাখল রাখাল। আজও রেখেছে। কিন্তু জবাবটা ফিরিয়ে দেওয়ার দিন কবে আসবে? রিকশা সারাবার দেড়শো টাকা অবশ্য তাকে শোধ করতে হবে না। ও টাকাটা সব শোনার পর গজুদাই দিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু রোজদিন যে টাকাটা জমা দিতে হয়, সেটা সবসময় পুরোটা দিয়ে উঠতে পারে না বাবা। একটু একটু করে বাকি পড়তে পড়তে আশি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। ওই টাকাটা শোধ করার তাগিদ রাখালকে ভেতরে ভেতরে খুবলে খাচ্ছিল। পিন্টুদা কলকাতায় থাকলে তাকে কিছুতেই খেপ খেলতে দিতে চাইতেন না। ভাগ্যিস অফিসের কাজে কলকাতার বাইরে গেছেন, তাই কাউকে না জানিয়ে আসতে পেরেছে।
প্রথমদিন খেলতে নেমেই সে দেখতে পেল, শুধু সে বা কান্তি নয়, আরও অনেকে বিভিন্ন দলের হয়ে খেলতে এসেছে। এমনকী কলকাতার বড় টিমের দু’-তিনজনও আছে। জুনিয়ার বেঙ্গলে যারা তারই সঙ্গে কেরল গিয়েছিল তাদের মধ্যেও অনেকে এসেছে খেলবে বলে। ছোট মাঠে নাইন সাইড খেলা। একটু বেশি এগিয়ে গেলেই অফসাইডে পড়ে যেতে হয়। কান্তি মাঠে নামবার আগে বলে দিয়েছিল, ‘এখানে খেলার ছকটা আলাদা। মেপে মেপে পাস বাড়াবি। বক্সের কাছাকাছি গেলেই সোজা গোলে শট করবি। তিনটে মারতে পারলে একটা গোল পাবি। তোর তো দু’ পায়েই শট আছে। তুই দূর থেকে গোলে মারলেও গোল হয়ে যেতে পারে।'
প্রথম খেলাটাতে জিতলেও রাখাল নিজে খুব একটা ভাল খেলতে পারল না। দ্বিতীয় খেলাটায় একটু উন্নতি হল। কিন্তু পরের দিন রাখাল মাঠে নামার আগেই বুঝে গিয়েছিল এখানে কেমন করে খেললে খেলাটাকে নিজেদের কবজায় রাখা যায়! দ্বিতীয় দিনের দুটো খেলাতেই দারুণ খেলল রাখাল। সেমিফাইনাল খেলার আধঘণ্টা পরেই ফাইনাল খেলতে হল রাখালদের। মাঠে নামবার আগে তার শুধু একটাই প্রার্থনা, ফাইনালে যেন একটা গোল করতে পারি। তিনশো টাকার হিসেবটা যেন গোলমাল না হয়ে যায়।
রাখালের তিনশো টাকার হিসেবটা একটু গোলমাল হল, তবে অন্যভাবে। ফাইনালে একটা নয়, দুটো গোল করল। কিন্তু কাঠের সিঁড়ি বেয়ে মঞ্চে প্রাইজ নিতে ওঠার সময় তার বুকের রক্ত হিম হয়ে যেতে লাগল। দুটো পা প্রবলভাবে কাঁপছে। মঞ্চে পি কে ব্যানার্জি আর সুভাষ ভৌমিকের পাশে কে বসে? এত অল্প সময়ে কেমন করে ফিরে এলেন পিন্টুদা।
সুভাষ ভৌমিক ডাকলেন, ‘উঠে এসো। আমাদের বিচারে তুমিই ম্যান অব দ্য ম্যাচ। কাম অন।'
কিন্তু রাখাল কেমন করে উঠবে! তার পা যেন আটকে যাচ্ছে কাঠের সিঁড়িতে। গলা এমনভাবে শুকিয়ে আসছে। যা একশো কুড়ি মিনিট খেললেও এমনটি হয় না।
এবার মঞ্চ থেকে ডাকলেন পিন্টুদা, ‘রাখাল, উঠে আয়।' রাখাল সিঁড়ি ভেঙে এবার উঠতে লাগল।
টাকা আর প্রাইজ ব্যাগে নিয়ে ভয়ে ভয়ে রাখাল এল নৈহাটি স্টেশনে। এখন সে একা। পিন্টুদা নির্ঘাত ওঁদের সঙ্গে গাড়ি করে কেশবপুরে চলে গেছেন। আজ একটাও কথা বলবার সুযোগ পায়নি পিন্টুদার সঙ্গে। তাঁর পক্ষে রেগে থাকাই স্বাভাবিক। প্র্যাকটিস করার পর সবাইকে নিয়ে গোল হয়ে বসে পিন্টুদা নানা গল্প করতেন। সবই খেলাধুলোর গল্প। তিনিই অনেকদিন বলেছেন, ‘খেলাকে রুটির সঙ্গে মেশাতে না পারলে এদেশে আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় কিংবা খেলা কোনওটাই সম্ভব নয়। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ক্যামেরুন— এই দেশগুলো আয়তনে এবং জনসংখ্যায় ভারতের চাইতে ছোট। তবুও ফুটবলে তারা আছে ভারতের অনেক ওপরে। আমাদের দেশের ছেলেদের দুর্ভাগ্য, শুধু দারিদ্র্যের জন্য নয়, গোটা সিস্টেমটাই এর জন্য দায়ী। বিদেশের বহু খেলোয়াড় আছেন, যাঁরা কেউই সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মাননি। ভারতেও এমন অনেকে আছেন। কিন্তু এখন বলে লাথি মারতে পারলেই দেদার খেপ খেলার ডাক আসে। খেললেই হাতে হাতে নগদ এক-দেড়শো টাকা। খেপ খেলতে খেলতেই জীবনের সেরা সময়গুলো চলে যায়। প্র্যাকটিস হয় না, খেলার জন্য যে মনোযোগ আর ধ্যান, সেটা নষ্ট হয়ে যায়। একসময় আমিও কিছু কিছু খেপ খেলেছি, কিন্তু পরে বুঝেছি ওগুলো খেলা নয়।'
এইসব কথা যিনি বলেন এবং বিশ্বাস করেন তাঁর পক্ষে আজকে রাখালের এই খেলাটাকে মেনে নেওয়া সহজ নয়। রিকশা থেকে নেমে স্টেশনের ভেতরে আসতেই সে অবাক হয়ে গেল। টিকিটঘরের সামনে পিন্টুদা দাঁড়িয়ে। তবে কি পিন্টুদা ওঁদের সঙ্গে গাড়িতে যাননি?
রাখাল ভয়ে ভয়ে পিন্টুদার দিকে তাকাল। পিন্টুদা একখানা টিকিট রাখালের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘এই নে, তোর টিকিট।'
রাখাল হাত বাড়িয়ে টিকিটটা নিল। প্ল্যাটফর্মে নৈহাটি লোকাল দাঁড়িয়েছিল। এ সময় কলকাতা থেকে আসার লোক যত, কলকাতায় যাওয়ার লোক তত নেই। একটা কামরায় দু’জনে মুখোমুখি বসল। পিন্টুদার মুখ জানলার বাইরে। ভেতরে এখনও রাগ রয়েছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। গাড়িটা ছাড়বার একটু আগে রাখাল ভীরু গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘পিন্টুদা, তুমি রাগ করেছ?’
পিন্টুদা উত্তর দিলেন না। গাড়িটা চলতে আরম্ভ করল। গাড়ির চাকা থেকে ঘটাং ঘটাং আওয়াজ আসছে। আস্তে আস্তে প্ল্যাটফর্মটা ছাড়িয়ে এল ট্রেনটা। রাখাল আবার জিজ্ঞেস করল, ‘পিন্টুদা, তুমি রাগ করেছ?'
পিন্টুদা মুখ ঘোরালেন। কয়েক মুহূর্ত রাখালের দিকে তাকিয়ে থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে নিতে বললেন, ‘করেছিলাম, তবে এখন আর নেই। কান্তি আমায় সব বলেছে। কিন্তু একটা কথা—'
রাখাল বলল, ‘কী কথা।’
পিন্টুদা বললেন, ‘এখানে নয়। স্টেশনে নেমে বলব।'
পিন্টুদার রাগ নেই শুনে যতটুকু স্বস্তি ফিরে এসেছিল, এবার ওই না বলা ‘একটা কথা’ শোনার জন্য তার অস্বস্তি এবং আশঙ্কা দ্বিগুণ হয়ে উঠতে লাগল।
স্টেশনে নেমে পিন্টুদা বললেন, ‘তোর আজকের খেলাটা আমার খুব ভাল লেগেছে। তোর দ্বিতীয় গোলটা দেখে আমার মনে হয়েছে, কলকাতার মাঠে ওইরকম একটা গোল যদি আমি করতে পারতাম! কলকাতার ফার্স্ট ডিভিশন লিগে আমি দু’বার হায়েস্ট স্কোরার ছিলাম। কিন্তু ওইরকম গোল কখনও করতে পারিনি। তোর অ্যান্টিসিপেশন, পজিশন নেওয়া আর নিখুঁত টাইমিং আমার সব রাগ জল করে দিয়েছে।'
রাখাল মনে মনে কৃতজ্ঞ বোধ করল। সে কোনও কথা না বলে পিন্টুদার পাশে পাশে হাঁটতে লাগল। স্টেশনের রিকশা স্ট্যান্ডে এসে পিন্টুদা বললেন, ‘ও, তুই তো পাড়ার রিকশাতে উঠিস না। ঠিক আছে চল, দু’জনে হেঁটেই যাই।'
স্ট্যান্ডের সামনে এসে রাখাল তার বাবাকে খুঁজল। কিন্তু কোথাও দেখতে পেল না। পিন্টুদার সঙ্গে হেঁটে আসতে আসতে সে লক্ষ করছিল, তার পাশ দিয়ে যত রিকশা যাচ্ছে এবং আসছে তার কোনওটাই তার বাবার নয়। পিন্টুদা বললেন, ‘তোর খেলা দেখে পি কে-দা আর সুভাষদার খুব ভাল লেগেছে। ‘জুনিয়ার ইন্ডিয়া’-তে তোর জায়গা হয়ে যাবে। তার চাইতে বড় কথা, সুভাষদা তোকে মোহনবাগানে অনূর্ধ্ব উনিশে এই সিজনেই খেলাতে চান। তুই কী করবি?
রাখাল তাজ্জব বনে গেল। তার কী করার আছে! এসব ব্যাপারে তো পিন্টুদাই বলে দেবেন তাকে কী করতে হবে। রাখাল একবার পিন্টুদার মুখের দিকে তাকাল, তারপর সামনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি যা বলবে তাই করব।'
পিন্টুদা বাজারের মোড়ে এসে বললেন, ‘জুনিয়ার ইন্ডিয়াটা খেলে নে। ওই খেলাটার জন্য তোকে বিদেশে যেতে হবে। ভারতের বাইরে।'
রাখাল প্রশ্ন করল, ‘কেমন করে যাব?’
পিন্টুদা হাসতে হাসতে উত্তর দিলেন, ‘রিকশা কিংবা ট্রেনে-বাসে যাওয়া যায় না। হংকং ভারত থেকে অনেক দূরে। যেতে হবে উড়োজাহাজে। প্রথমে কলকাতা থেকে ব্যাংকক, সেখান থেকে হংকং।
রাখাল চুপ করে গেল। ওই দেশটার নাম সে কারও মুখে হয়তো শুনেছে, কিন্তু দেশটা কোথায়, কেমন দেখতে, ওখানকার মানুষরা কেমন, কোন ভাষায় কথা বলে, এসব ব্যাপারে তার কোনও ধারণা নেই। সে চুপ করে মনে মনে একটা দেশ আর তার খেলার মাঠটা ভাবতে লাগল। পিন্টুদা বলতে লাগলেন, ‘এশিয়ান গ্রুপের খেলাগুলো হবে ওখানে। ওই দেশটা এখনও ব্রিটিশ কলোনি হিসেবে চিহ্নিত। '৯৯ সাল পর্যন্ত ওদের তাই থাকতে হবে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেই ওরা পুরোপুরি স্বাধীনতা পেয়ে যাবে। ওরা প্রধানত দুটো ভাষায় কাজকর্ম চালায়। চিনা আর ইংরেজি।'
জুনিয়ার ইন্ডিয়ার প্রথম খেলা ছিল বাংলাদেশের সঙ্গে। খুব সহজেই রাখালরা দু’গোলে জিতে গেল। পরের খেলাটার আগে কোচ সমরেশদা বললেন, ‘এই টিমটা খুব শক্ত। বাংলাদেশের সঙ্গে যেমন খেলেছিস, এদের সঙ্গে তার দশগুণ ভাল খেলতে হবে। আধুনিক ফুটবলে সাউথ কোরিয়ানদের খুব নাম আছে। যে কোনও সময় খেলার গতি বদলে দিতে পারে। ওদের স্ট্রাইকার আর দুটো লিঙ্কম্যান খুব সাংঘাতিক। বিশেষ করে ওই বেঁটে স্ট্রাইকারটা, ওর নাম লিং সন, পায়ে বল পড়লে হরিণের বেগে ছোটে। শুধু একটাই ড্র ব্যাক, বল ধরে ছোট্ট জায়গায় ঘুরতে পারে না। গোলে কিক নেওয়ার জন্য পজিশন খুঁজতে দেরি করে ফেলে। ডান পায়ের চেয়ে বাঁ পায়ের কিকের জোর বেশি।'
কিন্তু খেলা শুরু হওয়ার পর রাখাল টের পেল, সমরেশদার সব কথাই ঠিক, তবে ওঁর ডান পায়ে কোনও কাজই নেই। অতএব, বল যতক্ষণ বাঁ পায়ে মারবার সুযোগ না পাচ্ছেন, ততক্ষণ গোলে শটই নিতে পারবেন না। ডান পায়ে মারলেও সে বল কোনও বিপদ ঘটাতে পারে না। প্রথম দশ মিনিট কোরিয়ান ছেলেরা রাখালদের কোণঠাসা করে রাখল। পরপর দুটো গোলের সুযোগ ওরা তৈরি করেছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্য, প্রথম বলটা বারের কোনায় লেগে ফিরে এল, দ্বিতীয় বলটা ক্রশবারের সিকি ইঞ্চি ওপর দিয়ে উড়ে গেল। দুটো শটই বাঁ পায়ে নিয়েছিল ওই লিং সুন। জুনিয়ার ইন্ডিয়া তখন দেওয়ালে পিঠ দিয়ে লড়ছে। নিজেদের পায়ে বল এলেও সে বল নিয়ে বেশিদূর যেতে পারছে না। মাঝমাঠে ওরা যেন দুর্ভেদ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাখাল নিজেদের স্টপার বলাই পালকে বলল, ‘তোরা উঁচু করে ওদের বক্সের কাছে বল ফেল। ওরা বেঁটে, বল মাথায় নিতে পারবে না।'
কিন্তু ফ্যাল বললেই তো ফেলা যায় না। বারকয়েক চেষ্টা করার পর কুড়ি মিনিটের মাথায় বলাই একটা বল উঁচু করে ওদের বক্সের কাছাকাছি ফেলল। ওদের স্টপার লাফিয়ে উঠে বলটা মাথা দিয়ে সামনে ঠেলতে চেয়েছিল, কিন্তু হেডটা ঠিকমতো না হওয়ায় বল গেল শঙ্করের পায়ে। হাওড়ার শঙ্কর এক মুহূর্ত দেরি না করে বল ঠেলে দিল মহারাষ্ট্রের প্রভাকরের পায়ে। প্রভাকর দেখল তার পাঁচ-সাত গজ দূরে রাখাল দাঁড়িয়ে। রাখালকে বলটা বাড়িয়ে দিয়ে প্রভাকর ছুটে গেল বক্সের কোনায়। রাখাল মনে মনে আন্দাজ করেছিল, প্রভাকর এমনটাই করবে। সে বল নিয়ে তিরবেগে ছুটতে লাগল সামনের দিকে। এই প্রথম বোঝা গেল, হংকংয়ের কাউলুন স্টেডিয়ামেও ভারতীয় সমর্থক আছে। বক্সের এক কোনায় রাখাল, অন্য কোনায় প্রভাকর। রাখালের সামনে আগুয়ান দুই খেলোয়াড়। ওদের দু’জনের মাঝখান দিয়ে মাটিঘেঁষা শট করল রাখাল, উদ্দেশ্য প্রভাকরের পায়ে দেওয়া। প্রভাকর বল ধরেই যদি গোলে শট নেওয়ার চেষ্টা করত, তা হলে কী হত তা রাখাল জানে না, কিন্তু প্রভাকর তা করল না। বল নিয়ে মাঠের সাইড লাইনের দিকে কয়েক পা গিয়ে বল বাড়াল পঞ্জাবের কুনালকে। কিন্তু কুনাল ছুটে এসে বল ধরবার আগেই বল সাইড লাইন পেরিয়ে গেল। বিশ মিনিটের খেলায় এটাই ভারতীয়দের প্রথম পজিটিভ মুভমেন্ট।
বিরতির আগে পর্যন্ত গোল করার চেয়ে গোল আটকানোই ভারতীয় দলের প্রথম এবং প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়াল। গোটা দলটাই প্রায় নেমে এসেছে সেন্টার লাইনের নীচে। কখনও কখনও মনে হচ্ছিল, এগারোজনই যেন ডিফেন্স হয়ে গেছে। এ ধরনের আত্মরক্ষামূলক খেলায় যে কোনও সময় একটা গোল হয়ে গেলে সেই গোল শোধ করবার মতো মনোবল আর ফিরে পাওয়া যায় না। কিন্তু রাখালদের কিছু করার ছিল না। তারা খেলতে গিয়ে পদে পদে নিজেদের দুর্বলতাগুলো বুঝতে পারছিল। কোরিয়ানদের চেয়ে তাদের স্কিল কম, দম আর পরিশ্রম করার ক্ষমতা কম, বল দেওয়া-নেওয়ার মধ্যে যে বোঝাপড়া থাকে, সময় বুঝে হঠাৎ হঠাৎ জায়গা বদল করার যে বুদ্ধি, তাও কোরিয়ার ছেলেদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম। ওরা ভারতীয় লিঙ্কম্যান দু'জনকে প্রায় অকেজো করে ফেলেছে। বল পায়ে ধরে সতীর্থ খেলোয়াড়দের খোঁজবার আগেই পা থেকে বল ছিনিয়ে নিচ্ছে ওরা। রাখাল নিজেও বিভ্রান্ত হয়ে পরপর দুটো মিস পাস করল।
কিন্তু বিরতির ঠিক দু’ মিনিট আগে ওদের একজন লিঙ্কম্যান প্রভাকরের পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে সামনের দিকে দৌড়ে যেতে যেতে হঠাৎ টাল খেয়ে পড়ে গেল। কারও সঙ্গে কোনও ধাক্কা লেগে নয়, একা একাই পড়ে গেল। ছেলেটা আর ওঠে না। একটা পা সোজাই করতে পারছে না। মাঠের মধ্যে ডাক্তারবাবু এলেন। তাঁরই নির্দেশে স্ট্রেচার আনা হল। ব্যাপারটা যে কী হল, সেটা রাখালদের কেউ বুঝতেই পারল না। বিরতির পর শোনা গেল, ছেলেটির ডান পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেছে। অতএব, বিরতির পর যখন দ্বিতীয় পর্বের খেলা শুরু হতে যাচ্ছে, তখন রাখাল দেখল সেই ছেলেটি নেই, সেখানে অন্য একজন। এই ছেলেটি কেমন সেটা রাখাল জানে না। শুধু অনুমানে বুঝে নিল, নিশ্চয়ই আগের জনের মতো নয়। তাই যদি হত তাহলে ওকে তো আগেই নামাত। ওর জন্যই রাখাল ফার্স্ট হাফে বল নিয়ে খুব একটা সুবিধে করতে পারছিল না।
নামবার আগে সমরেশদা বলে দিয়েছেন, ‘খেলায় হারজিত আছে। কিন্তু হারটা যেন কাপুরুষের মতো না হয়। তোরা আশি কোটি মানুষের দেশ থেকে এসেছিস। সেটা এমন দেশ যে দেশের অনেক মহাপুরুষ বিশ্বজয় করেছেন। তোরা ফাইট কর। ফাইট করে বীরের মতো হেরে গেলেও মনে সান্ত্বনা থাকবে। সপ্তরথীতে মিলে বালক অভিমন্যুকে ঘিরে ধরেছিল। সবাই ছিলেন মহাযোদ্ধা। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও অভিমন্যু কিন্তু যুদ্ধ থেকে সরে আসেননি। নতুন উদ্যমে, প্রবল পরাক্রমে সেই বালক একাই সাতজনের সঙ্গে লড়াই করে গিয়েছেন। সেই যুদ্ধে তাঁর পরাজয় এবং মৃত্যুটা তাই এত গৌরবের। তোরাও লড়াই কর।
লড়াই করে ওদের বুঝিয়ে দে। কোরিয়ান কোচ তোদের যতটা এলেবেলে ভেবে নিয়েছেন, তোরা ঠিক তাই নোস। ওদের তো দেখলি, এশিয়ান স্টাইলেই খেলে, তবে প্রো-ইউরোপিয়ান।'
কথা থামিয়ে সমরেশদা রাখালের পিঠে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সাউথ কোরিয়ার লোকসংখ্যা কত জানিস? দুই থেকে সোয়া দুই কোটি। আর তোরা আশি কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছিস।'
রাখাল দেখল হাওড়ার শঙ্কর আর বেহালার মৃগাঙ্ক মুখ টিপে হাসতে হাসতে বলছে, ‘বাপ চালায় তিন চাকা, ওকে জিজ্ঞেস করছে...'
শেষের কথাগুলো শোনা গেল না। রেফারির বাঁশি বাজছে মাঠে নামবার জন্য। মুহূর্তে রাখালের চোখ জলে ভিজে এল। সে তো জানে সে রিকশাওলার ছেলে। কিন্তু তাতে ওদের কী! ওর অশিক্ষা, দারিদ্র্য আর বাবার বৃত্তি নিয়ে ওরা কেন ঠাট্টা করে? পিন্টুদা আর মানসবাবুরা যে বলেন, ‘কে কোথায় জন্মেছে, কে কোন বৃত্তিতে আছে সেটা বড় কথা নয়, মানুষ হওয়া, মানুষের জন্য, দেশের জন্য কিছু করে যাওয়া। রিকশা চালানো হীন বৃত্তি কেন হবে! ওটাও একটা প্রয়োজনীয় কাজ। আমি কি পারব ওটা চালাতে? মানুষের কোনও জাত নেই, জাতেরও ছোট-বড় নেই। মানুষকে শুধু চেষ্টা করে মানুষ হয়ে উঠতে হয়। দেশের জন্য কাজ করতে হয়।’ এসব কথা লেখাপড়া শিখেও শঙ্কর আর মৃগাঙ্করা কেন বুঝতে পারে না?
মাঠের মাঝখানে সেন্টারে বল বসানো। দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু করার আগে রেফারি ঘড়ি দেখছেন। রাখাল টের পাচ্ছে, তার মনে অপমানের স্পর্শ লেগেছে। এখনও চোখটা ভিজে ভিজে যাচ্ছে। হঠাৎ মনে পড়ল, পিন্টুদা আর বাবনদার কথা, ‘তোর লড়াইয়ের জায়গা মাঠ। সব অন্যায় আর অপমানের জবাব দেওয়ার জন্য তোর হাতে একটাই অস্ত্র। তা হল ফুটবল। অর্জুনের হাতে যেমন গাণ্ডীব ছিল, তোর পায়ে তেমনই একটা বল। ওই বল দিয়ে বিপক্ষের দেওয়াল ভেঙে দিতে পারলে সম্মান আপনা থেকেই তোর পায়ে এসে লুটিয়ে পড়বে।'
খেলা শুরু হয়ে যাওয়ার পর অসম্ভব একটা জেদ ভেতরে ভেতরে রাখালকে তাতিয়ে দিতে লাগল। তার মনে হল, এই মাঠে তার প্রতিপক্ষ সাউথ কোরিয়ানরা নয়, তার প্রতিপক্ষ তারই সতীর্থরা, তারই সমাজ আর সংস্কার। একমাত্র সাফল্যই পারে ওদের চোখের ভাষাকে বদলে দিতে। সেই চোখের ভাষা সত্যি সত্যি বদলে গেল দ্বিতীয়ার্ধের বাইশ মিনিটে। প্রভাকর একটা আলগা বল পেয়ে শঙ্করকে দিল। শঙ্করের সামনে বিপক্ষের দু’জন খেলোয়াড়। শঙ্কর সেই বলটা নিয়ে সামনে না এগিয়ে বাঁদিকে কোনাকুনি শট করল রাখালকে। রাখাল ছুটে এসে বলটা ধরল। কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে ঠান্ডা মাথায় ওদের আগুয়ান রাইট ব্যাককে কাটিয়ে বক্সের মধ্যে ঢুকল। গোলের সামনে জনাতিনেক সাউথ কোরিয়ার প্লেয়ার। গোলে শট নেওয়ার সুযোগ নেই। রাখাল এক পা এগিয়ে গোলকিপারের বাঁদিক আর নিজের ডানদিকের বার লক্ষ্য করে জোরে শট নিল। নিশানা ছিল অব্যর্থ। বলটা বারে লেগে ফিরে আসতেই কাউলুন স্টেডিয়ামের শ’ দুয়েক ভারতীয় দর্শক যখন কপাল চাপড়াতে যাচ্ছেন, ঠিক তখনই ওই ফিরতি বলে শূন্যে লাফিয়ে উঠে হেড নিল রাখাল। ওদের ডিফেন্সের ছেলেরা তখন গোলমুখের জটলা ভেঙে একটা ব্যর্থ গোলের দিকে তাকিয়েছিল, ওরা অনুমানও করতে পারেনি, ওই ফিরতি বলে হেড নেবে রাখাল এবং সেটাই তার উদ্দেশ্য। বলটা গোলকিপার কিছু বুঝে ওঠার আগেই গোলে ঢুকে গেল।
তারপর? তারপর বড় অপরূপ দৃশ্য। দল বেঁধে ছুটে আসছে জুনিয়ার ইন্ডিয়ার প্লেয়াররা। সবার আগে ছুটে এসে হাওড়ার শঙ্কর ওকে জড়িয়ে ধরল। মৃগাঙ্ক ততক্ষণে ওর পিঠে মুখ ঘষতে ঘষতে বলছে, ‘রাজার মতো গোল করেছিস। তুই আমাদের রাজা।'
ওই এক গোলে জুনিয়ার ইন্ডিয়া জিতে গেল খেলাটা। খেলা শেষে টেন্টে আসার পর ভাটপাড়ার ব্রাহ্মণ সমরেশ ব্যানার্জি, অর্থাৎ সমরেশদা, নিজে রাখালের পায়ের বুট খুলে দিতে এলেন। রাখাল ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, ‘না, না, এ কী করছেন। আপনি ব্রাহ্মণ মানুষ, আমি—'
‘শাট-আপ,’ গর্জে উঠলেন সমরেশদা। রাখালের পায়ের কাছে নিচু হয়ে বসতে বসতে বললেন, ‘ফুটবলে কোনও বামুন-কায়েত নেই। এখানে একটাই জাত, তা হল আমরা ভারতীয়। এখানে একটাই ধর্ম, তা হল খেলা। এখানে একজনই ঈশ্বর, তা হল ফুটবল।’
রাত্রে খেতে বসবার আগে সমরেশদা বললেন, 'কলকাতা থেকে রূপক সাহা টেলিফোন করেছিল। ওকে রেজাল্টটা বলতেই আনন্দে প্রায় চিৎকার করে উঠে বলল, ‘বলছেন কী! সাউথ কোরিয়া তো ভাল দল। ওদের তিনজন ওখানকার ফার্স্ট ডিভিশন টিমের স্টার প্লেয়ার। কে গেল দিল?’ তখন রাখালের নাম আর ওর গোলের বর্ণনাটা দিলাম। রিকোয়েস্ট করেছি যদি স্পেস পায় তা হলে যেন রাখালের একটা ছবি দেয়। গোলটা তো দারুণ করেছে। এমন গোল ছোটবেলায় দেখেছি আমেদ খাঁকে করতে। পরে একবার করেছিল শ্যাম থাপা।'
হোটেলের জানলা দিয়ে রাখাল রাতের আকাশটাকে দেখল। কেশবপুরের আকাশের সঙ্গে হংকং-এর আকাশের বড়রকমের কোনও তফাত নেই। কিন্তু শহরটার সঙ্গে নিশ্চয়ই আছে। একটু আগেও বারান্দা থেকে শহরের একাংশ দেখা গেছে। অন্য কিছু দেখা যায়নি, শুধু দেখা গেছে শহরের ঝলমলে আলো। যেন গোটা শহর জুড়ে দেওয়ালি চলছে। সমরেশদা রাত্রি দশটার মধ্যেই সবাইকে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে বলে গেছেন, ‘ঘুমিয়ে পড়। কাল ছ'টা থেকে প্র্যাকটিস। পরশু চিনের সঙ্গে খেলা।'
কিন্তু আজ ঘুম আসছে না রাখালের। বারবার বাবার কথা মনে পড়ছে। বাবা এখন স্টেশনের স্ট্যান্ডে রিকশা লাগিয়ে বসে আছেন। কলকাতা থেকে শেষ ট্রেন আসা পর্যন্ত তাকে থাকতে হয়। বাবার কাছে আজকের খেলার কোনও খবর এখনও পর্যন্ত পৌঁছয়নি। কাল সকালে যদি কাগজে তার ছবি বের হয়, তা হলে বাবা কি দেখবে? বাবার তো কাগজ পড়ার অভ্যেস নেই। অন্য কেউ যদি বাবাকে বলে, তা হলে হয়তো বাবা দেখবে।
রাখালের চোখ আস্তে আস্তে বুজে আসছিল। তন্দ্রাজড়ানো চোখে, তখনও ঘুম গাঢ় হয়নি, হালকা ঘুমের মধ্যে সে দেখতে পেল, একটা নতুন রিকশা সে কিনে এনেছে বাবার জন্য। বাবা সেই রিকশাটার গায়ে হাত বুলোচ্ছে। তারপর সে আর কিছু দেখতে পেল না। তার ঘুমের মধ্যে ভেসে উঠল কাউলুন স্টেডিয়াম। চিনের ডিফেন্স ভেঙে সে এগিয়ে যাচ্ছে। স্টেডিয়াম জুড়ে একটাই বাংলা শব্দ ‘রাখাল, রাখাল।' এশিয়ান গ্রুপে চ্যাম্পিয়ান হচ্ছে জুনিয়ার ইন্ডিয়া। মাঠের মধ্যে পটকা ফাটছে, আকাশে উড়ে যাচ্ছে রঙিন হাউই। মাঠের মধ্যে সবার ওপরে উড়ছে ভারতের তেরঙা পতাকা।
কিন্তু বাস্তবে তেমনটা হল না। সাউথ কোরিয়াকে হারালেও চিনকে হারাতে পারল না ভারত। প্রথম হাফের পর চিন ঘূর্ণিঝড়ের মতো আছড়ে পড়তে লাগল ভারতের সীমানায়। দুটো লোক নজরবন্দি করে রেখেছে রাখালকে। তবুও ওরই মধ্যে আচমকা একটা বল এল রাখালের পায়ে। দশ গজ দূরে ওদের পেনাল্টি বক্স। বিনা বাধায় খানিকটা এগিয়ে গিয়ে প্রভাকরকে বল দিল। প্রভাকরের পা থেকে শঙ্কর এবং শঙ্কর এক মুহূর্ত দেরি না করে রাখালকে বল বাড়াল। রাখাল বল পায়ে নিয়ে দেখল, গোল ছেড়ে গোলকিপার বেরিয়ে এসেছে। চিনের তিনজন ডিফেন্ডার ছুটে আসছে তার দিকে। রাখাল গোলে কিক করল। একেবারেই অপ্রত্যাশিত ব্যাপার। বলটা গড়াতে গড়াতে পোস্টের দু’ হাত দূর দিয়ে চলে গেল। রাখাল দু’ হাতে কপাল চাপড়ে মাটিতে বসে পড়ল। কেন যে এমন হল, সেটা রাখাল বুঝতে পারল না। এর দু’ মিনিট পরেই চিন গোল করল। এক গোলে হেরে রাখালরা যখন মাঠ ছাড়ছে, তখন সমরেশদা বললেন, ‘ওই সহজ গোলটা যদি রাখাল করতে পারত তাহলে খেলাটা ঘুরে যেত। সাউথ কোরিয়া এর থেকে অনেক ভাল দল। তবু আমরা জিতেছিলাম। অথচ আজ...'
সমরেশদা কথা শেষ করতে পারলেন না। কান্না এসে তাঁর গলা বুজিয়ে দিল। হোটেলের বিছানায় শুয়ে সারারাত কেঁদে গেল রাখাল। তার কেবলই মনে হতে লাগল তার জন্য, শুধু তারই জন্য ভারত আজ হেরে গেল! এই পরাজয়ের লজ্জা শুধু তার একার। সমরেশদার চোখের জল সে শুধু তারই একক ব্যর্থতার জন্য। গোটা দল যে মাথা হেঁট করে কাউলুন স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে এল তার জন্য সে একাই দায়ী। আত্মগ্লানিতে তার বুক ভরে গেল। সে বিছানা ছেড়ে নেমে এল নীচে। নিজের অক্ষমতায় সে নিজেকেই ঘৃণা করতে আরম্ভ করল। সে ঘরের মেঝের মধ্যে মাথা ঠুকতে ঠুকতে বলতে লাগল, ‘আমার জন্য দল হেরেছে, আমার জন্য হেরেছে, আমার জন্য...'

হোটেলের মেঝেতে কার্পেট ছিল বলে রাখালের মাথা ফাটল না। কিন্তু ওর কান্নায় ঘুম ভেঙে গেল প্রভাকরের। সে দু’ হাতে রাখালকে জাপটে ধরে বলতে লাগল, ‘রাখাল, তু পাগল হো গয়া, রাখাল, হোঁশ মে আ যা, রাখাল।'
সেদিন ছিল রবিবার। প্র্যাকটিস থেকে ফিরে রাখাল নিজের বুট পরিষ্কার করছিল। বুটটার অবস্থা বিশেষ সুবিধের নয়। পিন্টুদাকে বললে একজোড়া নতুন বুট পাওয়া যায়, কিন্তু বলতে বড্ড লজ্জা করে রাখালের। অন্যরা তো পিন্টুদাকে কত কিছু উপহার-টুপহার দেয়। সে কোনওদিন কিছু দিতে পারেনি। দেওয়ার সামর্থ্যও তার নেই। তাই সে সবসময় কুণ্ঠিত হয়ে থাকে। শুধু তার বাবা কখনও-সখনও স্টেশন থেকে পিন্টুদাকে রিকশা করে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে বলে, ‘আপনার কাছ থেকে ভাড়া চাইব কোন মুখে! আপনি এত করেন, আমার তো সাধ হয়, কিন্তু সাধ্যিতে কুলোয় না। তাই ভাড়াটা দেবেন না।'
পিন্টুদা শোনেন না, বাবাও ছাড়ে না। অবশেষে কখনও কখনও হার মানতে হয় পিন্টুদাকে। হংকং থেকে ফেরার পর একদিন দাওয়ায় বসে গল্প করতে করতে কানাই ছেলেকে প্রশ্ন করে, ‘হ্যাঁ রে খোকা, ওদেশটায় রিকশা আছে?’
রাখাল উত্তর দেয় না। অন্ধকারে বাবার মুখের দিকে তাকায়। বাবা নিজের মনেই বলে যেতে থাকে, ‘কখনও তো কাগজ কিনিনি। তোর ছবি ছেপেছে দেখে তিনখানা কাগজ কিনলাম। স্ট্যান্ডের শৈলও একখানা কাগজ কিনে তোর ছবি দেওয়া পাতাটা স্ট্যান্ডে লটকে রেখেছিল। দুনিয়ার লোক দেখেছে। গজুবাবু কাগজ নিয়ে লোক ডেকে ডেকে দেখিয়ে বলেছেন, ‘দ্যাখ, পাড়ার ছেলে হংকংয়ে গিয়ে বিদেশিদের গোল দিয়েছে। এটা পাড়ার গর্ব। ওই বয়সে গজুদার সে কী নাচানাচি।'
এইসব কথা ভাবতে ভাবতে নিজের বুট পরিষ্কার করছিল রাখাল। বাইরে থেকে ডাকতে ডাকতে উঠোনে এসে দাঁড়ালেন পিন্টুদা। বললেন, ‘তুই দশটার মধ্যে তৈরি থাকিস। তোকে নিয়ে সুভাষদার কাছে যাব। মনে হচ্ছে তোর একটা হিল্লে হয়ে যাবে।'
পিন্টুদার কথায় রাখালের বুকের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে যেতে লাগল। আনন্দের সঙ্গে ভয় মিশে গেলে যেমন উত্তেজনা হয়, এটাও ঠিক তেমনই।
পিন্টুদার সঙ্গে ট্রেনে চেপে শিয়ালদা, সেখান থেকে ট্যাক্সি করে ময়দানে। মোহনবাগান টেন্টের গেটে ট্যাক্সি থেকে নামতে নামতে পিন্টুদা বললেন, ‘এই টেন্টের ভেতরে কখনও ঢুকেছিস?’
রাখাল বলল, ‘বাইরে থেকে দেখেছি, কিন্তু ভেতরে কখনও যাইনি।'
পিন্টুদা গেটের দিকে হেঁটে যেতে যেতে বললেন, ‘কলকাতা ফুটবলের প্রধান তীর্থ হচ্ছে এই টেন্ট। কত নামকরা খেলোয়াড় এই টেন্টে ঢুকেছে জানিস?’
টেন্টের ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল বাইরের লনে একটা বেতের চেয়ারে বসে আছেন সুভাষ ভৌমিক। পিন্টুদাকে দেখে বললেন, ‘এসে গেছিস! আয় !’
রাখালকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ দিয়ে জরিপ করার ভঙ্গিতে একবার দেখলেন। তারপর বললেন, ‘তুমিই নৈহাটির মাঠে একটা গোল করেছিলে না?’
পিন্টুদা বললেন, ‘হংকং থেকে জুনিয়ার ইন্ডিয়া খেলে এল। সাউথ কোরিয়ার বিরুদ্ধে একটা দারুণ গোল করেছে।'
সুভাষ ভৌমিক বললেন, ‘জানি। কিন্তু সে খেলাটা তো আমি দেখিনি। আমার চোখে ওর নৈহাটির খেলাটা এখনও ভাসছে। ওরকম আর-একটা গোল তুমি করতে পারবে?’
জবাব দেওয়ার আগে রাখাল পিন্টুদার দিকে তাকাল। তারপর আস্তে আস্তে বলল, ‘পিন্টুদা জানেন, ওই হংকং-এ সাউথ কোরিয়ার সঙ্গে প্রায় ওইরকমই একটা গোল করেছি।'
সুভাষ ভৌমিক হাসলেন। রাখাল এত কাছে থেকে সুভাষ ভৌমিককে কখনও দেখেনি। একসময় কাগজ থেকে খেলোয়াড়দের ছবি কেটে কেটে খাতায় আটকে রাখার অভ্যাস ছিল রাখালের। তার খাতায় এখনও হাবিব আর সুভাষ ভৌমিকের ফোটো পাশাপাশি আঠা দিয়ে সাঁটা আছে। সুভাষদা একজন লোককে ডেকে বললেন, ‘অ্যাই, দেখ তো নঈমদা এসেছেন কিনা।'
কিন্তু লোকটা খবর নিয়ে ফিরে আসার আগেই গেট দিয়ে নঈমুদ্দিন ঢুকলেন। রাখাল একটু দূর থেকে তাঁকে দেখল। সুভাষদা উঠে গিয়ে নঈমের সঙ্গে কথা বলতে বলতে টেন্টের ভেতরে ঢুকে গেলেন। একটু পরে পিন্টুদাও গেলেন। বাইরের লনে রাখাল একা। কলকাতার আকাশ তখন রোদ মেখে চকচক করছে। দক্ষিণের হাওয়ায় থেকে থেকে শব্দ করে কেঁপে উঠছে গাছের পাতা। টেন্টের ভেতর থেকে লোক বেরিয়ে বাইরে চলে যাচ্ছে, আবার কেউ কেউ বাইরে থেকে এসে সোজা টেন্টের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই এঁরা সামান্য লোক নন। এঁদের যে কোনও একজন তার মতো ফুটবলারের ভাগ্য অনায়াসে বদলে দিতে পারেন। পিন্টুদা আজ সকালেই বলেছিলেন, ‘তার একটা হিল্লে হয়ে যাবে।' কিন্তু কেমন সে হিল্লে? এখন সুভাষদার সঙ্গে মোহনবাগানের কতটুকু সম্পর্ক? ইস্টবেঙ্গল টেন্টে ডাকলে না হয় বোঝা যেত। মোহনবাগানে তার হিল্লে কে করবেন? রাখাল আস্তে আস্তে ঘাসের ওপর বসে পড়ল। যদিও লনে খানচারেক বেতের চেয়ার পাতা ছিল, কিন্তু রাখাল কোনও চেয়ারে বসল না।
একটু পরে টেন্টের ভেতর থেকে বাইরে এলেন নঈম, সুভাষদা আর পিন্টুদা। পিন্টুদা ইশারা করতেই রাখাল নঈমকে প্রণাম করল। উনি দু’ হাত দিয়ে রাখালকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘একশো কুড়ি মিনিট একনাগাড়ে খেলার দম আছে?’
রাখাল মুখে কিছু না বলে শুধু মাথা নাড়ল। মাথা নেড়ে জানিয়ে দিল সে পারবে।
নঈমসাহেব সুভাষদা আর পিন্টুদার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। তারপর বললেন, ‘সাউথ কোরিয়ার সঙ্গে তোমার খেলার ভিডিও ক্যাসেট পেয়ে গেছি। তোমার গোলটা খুবই ভাল।'
কথাটা শেষ করে নঈমসাহেব কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘যদি সুযোগ পাও তাহলে তুমি মোহনবাগানে খেলবে?’
হঠাৎ যেন নিশ্বাস ফুরিয়ে যেতে লাগল রাখালের। অতিরিক্ত বিস্ময় মানুষকে শুধু বোবাই করে না, তাকে বিমূঢ়ও করে তোলে। যে ইচ্ছা এখন পর্যন্ত তার স্বপ্নের মধ্যে ভীরু পায়ে ঘুরে বেড়ায়, যে স্বপ্ন সে শুধু নিজের বুকের মধ্যে লালন করে, সেই স্বপ্নের কথা এখন তারই সামনে উচ্চারণ করছেন স্বয়ং নঈমুদ্দিনসাহেব। সে কি দিনের বেলাতেও জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছে? রাখালের যেন কথা হারিয়ে গেল। সে শুধু নঈমুদ্দিনের চোখের দিকে একবার তাকিয়ে মাথা নামিয়ে ফেলল।
তার হয়ে পিন্টুদা তখন বলে চলেছেন, ‘নিশ্চয়ই খেলবে। ও তো আমার কাছে শেখে। ওকে একটা ব্যবস্থা করে দিলে আমি নিশ্চিন্ত হই।'
নঈমসাহেব বললেন, ‘নতুন নিয়মে সব দলেই অনূর্ধ্ব উনিশ এমন খেলোয়াড়দের খেলাতে হবে। তা তোমার বয়স উনিশের নীচে তো?’
পিন্টুদা বললেন, ‘ওসব ও জানে না। নিজের বাড়িতে জন্মেছে। বোধহয় বার্থ সার্টিফিকেটও নেই।'
নঈমসাহেব বললেন, ‘কিন্তু ভাই, সার্টিফিকেট তো লাগবে।'
পিন্টুদা বললেন, ‘ও নিয়ে ভাববেন না। আমি কোর্টে গিয়ে নতুন করে সব করে দেব।' নঈমসাহেব টেন্টের দিকে মুখ করে কাকে যেন ডাকলেন। রোগামতো একটা লোক দুটো বল হাতে করে টেন্ট থেকে বেরিয়ে এল। নঈমসাহেব বল দুটো হাতে নিয়ে মাঠের দিকে যেতে যেতে বললেন, ‘রোদটা বড্ড তেতে গেছে।'
মাঠে এসে একটা বল সেন্টার লাইনের দিকে গড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘যাও, ছুটে গিয়ে বলটা ধরো।'
জীবনে এই প্রথম মোহনবাগান মাঠে নামতে হচ্ছে তাকে। সে নামবার আগে মাথা নিচু করে মাঠকে প্রণাম করল। তার মনে পড়ল, ফুটবল ইতিহাসের অনেক ঘটনা এই মাঠেই ঘটে গেছে। এর প্রত্যেকটি ঘাসের নীচে লুকিয়ে আছে অনেক স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের কাহিনি। অনেক বিখ্যাত প্লেয়ারের বুটের ছাপ রয়ে গেছে এই মাঠের নানা প্রান্তে। সেই মাঠেই আজ নামছে কেশবপুরের এক অনামী ছেলে। তার স্বপ্নের সমাধিও কি এই মাঠেই হবে? আজই কি সেই ভয়ংকর দিন? এখন এই তপ্ত দুপুরে মাঠে নেমে সে কী করতে পারে? কতটুকু খেলা দেখাতে পারে?
রাখালের পায়ে ছিল অতি শস্তার কোলাপুরি চটি। চটি খুলে খালি পায়েই মাঠে নামল। বলটা গড়িয়ে যাচ্ছে তখনও। রাখাল ছুটল বলের দিকে। বলের গায়ে পা লাগাবার সঙ্গে সঙ্গে সুভাষদা চিৎকার করে উঠে বললেন, ‘গোলের দিকে বল নিয়ে ছোটো, যত জোরে পারো।'
রাখাল ছুটতে লাগল। সে টের পেল মাঠের মধ্যে নেমে এসেছেন নঈমসাহেব, সুভাষদা আর পিন্টুদা। বল নিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই পেনাল্টি বক্সের মাথায় পৌঁছে গেল রাখাল। পৌঁছবার সঙ্গে সঙ্গে নঈমসাহেব চিৎকার করে আদেশ দিলেন, ‘ছুটতে ছুটতে সেকেন্ড বারে কিক করো। গোলপোস্টের ভেতর।'
এমন আচমকা নির্দেশ আসবে, সেটা রাখাল ভাবতেই পারেনি। জীবনের কঠিন মুহূর্তগুলো বুঝি এইভাবেই আসে। রাখাল নির্দেশ পাওয়ার পর মাত্র কয়েক সেকেন্ড দেরি করেছিল। তাই বক্সের বাইরে থেকে নয়, বক্সের ভেতরে পৌঁছে সেকেন্ড বারে শট নিল। কামানের গোলার মতো বলটা গোলপোস্টের গায়ে হাওয়া লাগিয়ে গোলে ঢুকে গেল।
রাখালই বলটা কুড়িয়ে নিয়ে এসে ওঁদের তিনজনের সামনে দাঁড়াল। ঘামে জামা ভিজে গেছে। ওঁরা তিনজনেই রাখালের দিকে তাকালেন। নঈমসাহেব বললেন, ‘কাল সকাল আটটায় বুট নিয়ে মাঠে এসো। তোমাকে একটু প্র্যাকটিস করিয়ে দেখতে চাই।'
একদিন নয়, পরপর দু’দিন প্র্যাকটিস করাবার পর নঈমসাহেব বললেন, ‘তোমাকে আমি মোহনবাগানে নিয়ে নিচ্ছি। তবে এখনও অনেক কিছু শিখতে হবে। অনেক খাটতে হবে তোমাকে। পরিশ্রম করতে ভয় পাও না তো?’
রাখাল কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর দিল, ‘আমি স্যার খাটতে পারব। আপনি আমাকে শিখিয়ে নেবেন।'
নঈমসাহেব সেদিনই রাখালকে আলাপ করিয়ে দিলেন টুটু বোসের সঙ্গে। কাগজে তো নাম দেখেছে, শুনেছেও অনেকের মুখে, কিন্তু এই প্রথম চোখে দেখা। তিনি বললেন, ‘আপনি টিমের কোচ, আপনি যা ভাল বুঝবেন তাই করবেন। ওই স্টার প্লেয়ারদের পাশাপাশি নতুনদের তৈরি করুন। আমি টাটার মতো মোহনবাগানেও ফুটবল আকাদেমি তৈরি করতে চাই। গ্রাম-গঞ্জ থেকে ছেলে জোগাড় করুন। ক্যালকাটা হচ্ছে ফুটবল সিটি। বেঙ্গলকে টপে থাকতে হবে। এই ছেলেরাই একদিন ছিনিয়ে আনবে এশিয়ান কাপ। কী গো, পারবে তো?’
রাখাল উত্তর দিতে পারল না। তার বুকের মধ্যে জমে থাকা স্বপ্ন এখন রাজহাঁসের মতো পাখা মেলে দিয়ে মোহনবাগান মাঠের ওপর উড়ছে। সে দেখছে মাঠের সবক'টা গ্যালারি কানায় কানায় পূর্ণ। উপচে-পরা মানুষের ভিড় আর প্রবল উত্তেজনার মধ্যে পায়ে বল নিয়ে বিপক্ষের বাধা চূর্ণ করে এগিয়ে যাচ্ছে সবুজ-মেরুন জার্সিপরা একটা ছেলে। তার দু’ কানে এখন আর হাজার হাজার কণ্ঠের উন্মাদ চিৎকার নেই, সেই চিৎকার ছাপিয়ে প্রবল হয়ে উঠছে একটি কণ্ঠ। সেই কণ্ঠ তার বাবার। সে যেন গলার শিরা ফুলিয়ে বলে যাচ্ছে, ‘খোকা এগিয়ে যা, যা খোকা এগিয়ে যা, তোর সঙ্গে সঙ্গে আমরাও এগিয়ে যাব — খোকা—!
মোহনবাগানে খেলতে পারাটা রাখালের কাছে স্বপ্ন ছিল। খাতায়-কলমে সেই স্বপ্ন পূর্ণ হয়েছে ঠিকই। সে দশজনকে বলতে পারে, নিশ্চয়ই বলতে পারে সে মোহনবাগানের খেলোয়াড়। লিগেঁর দশটা খেলার মধ্যে মাত্র তিনটে খেলায় তাকে মাঠে নামিয়ে দশ মিনিটের মধ্যে তুলে নেওয়া হয়েছে মাঠ থেকে। ওই দশ মিনিটে তার শরীরটাও ভাল করে ঘামেনি। তিনটে খেলায় সে যতক্ষণ মাঠে ছিল তার সময় যোগ করলে তিরিশ থেকে বত্রিশ মিনিট। পায়ে বল পেয়েছে বড়জোর চার-পাঁচবার। সে এমনই বল, যা থেকে কিছু করা যায় না। প্রথমে বুঝতে না পারলেও পরে বুঝেছে এই অনূর্ধ্ব উনিশ ব্যাপারটা নেহাতই নিয়মরক্ষার ব্যাপার। তাই বাইরে গোটাটাই একটা বিশ্রীরকমের তামাশা। সব দলই এই তামাশা করে যাচ্ছে। একদিন পিন্টুদাকে রাখাল জিজ্ঞেস করল, ‘আমাকে কি কোনওদিনই গোটা একটা খেলা খেলাবে না?’
পিন্টুদা উত্তর দেওয়ার আগে একটু ভাবলেন। রাখালের মনে হল বলবার মতো কিছু একটা কথা পিন্টুদা নিজেই হাতড়াচ্ছেন। তাই কিছুটা সময় নিয়ে পিন্টুদা বললেন, ‘তোকে ধৈর্য ধরতে হবে। প্র্যাকটিসে ঢিলে দিবি না। আজ না হয় কাল তোর সুযোগ আসবে। অনেককেই গোড়ার দিকে এসব সহ্য করতে হয়।'
কিন্তু ধৈর্যের কি কোনও শেষ নেই? প্রায় খেলাতেই জার্সি পরে সাইডলাইনের ধারে বসে থাকে রাখাল। খেলা শুরু হয়, আবার শেষও হয়ে যায়। রাখাল উৎকণ্ঠিত হয়ে থাকে, আকুল আগ্রহে দু’ চোখ দিয়ে কেবলই কোচ নঈমকে খুঁজতে থাকে। কিন্তু ডাক আসে না। কখনও এমন হয় না যে, নঈমসাহেব তাকে ইশারায় ডেকে বলবেন, ‘রাখাল ওয়ার্মআপ কর, তোকে মাঠে নামতে হবে।' রোজই একই আশা নিয়ে জার্সি পরে, বুটের ফিতে বাঁধে আর অন্যদের সঙ্গে ওয়ার্মআপ করতে আরম্ভ করে। মনে মনে ভাবে, যত লোক জার্সি পরেছে তাদের সবাই খেলার ডাক পাবে, শুধু বাদ যাবে কেশবপুরের রাখাল। জার্সি পরে সে যখন রিষড়ার সুকান্ত পালের পাশে সাইডলাইনের ধারে বসে থাকে তখন অনেকেই কেমন যেন করুণার চোখে তাদের দিকে তাকায়। একদিন কে একজন রাখালকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এরাও খেলবে নাকি?’ যে লোকটি উত্তর দিল, সে কথা বলবার আগে ফ্যাস-ফ্যাস করে একটু হেসে নিয়ে বলল, ‘এরা সব অনূর্ধ্ব উনিশ। ইন্ডিয়ান ফুটবলের নয়া ফ্যাকড়া।'
কিন্তু ওই ফ্যাসফেসে হাসি আর ‘ফ্যাকড়া’ কথাটায় রাখাল কিছু মনে করেনি। কিন্তু তার মনটা বিশ্রীভাবে ভেঙে গেল আজ। আজই মাত্র দশ মিনিটের জন্য তাকে মাঠে নামিয়েছিলেন নঈমসাহেব। রেলের সঙ্গে খেলা। রাখাল বুঝে গিয়েছিল, তার জন্য বরাদ্দ মাত্র দশ মিনিট। ওই দশ মিনিটেই তাকে কিছু একটা করে ফেলতে হবে। কিন্তু ফুটবল এগারোজনের খেলা। একজন খেলোয়াড় একা সেখানে কিছু করতে পারে না। কেউ তাকে বলই দিচ্ছে না। মরিয়া চেষ্টায় সে একটা বল কেড়ে নিল রেলের পা থেকে। তার দু'পাশে রেলের কড়া পাহারা। বাধ্য হয়ে বল ঠেলে দিল কৃশানুর দিকে। কৃশানু দু’জন খেলোয়াড়কে কাটিয়ে বলটা বাড়ালেন রাখালের দিকে। কেননা, একমাত্র রাখালই ছিল রেলের বিনা পাহারায়। কেউ ওকে গুরুত্ব দিচ্ছিল না। রাখাল ছুটে গিয়ে কৃশানুর বাড়ানো বলটা ধরল। এবার বল নিয়ে গোলের দিকে একটা ছোট্ট দৌড়। গোটা মাঠে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে। গ্যালারিতে বাজছে ভেঁপু, সমর্থকদের প্রবল চিৎকার। রেলের বিরুদ্ধে মোহনবাগানের হয়ে জীবনের প্রথম গোল করতে যাচ্ছে কেশবপুরের রাখাল মণ্ডল। উত্তেজনা উথালপাথাল তার বুকের মধ্যেও। বক্সের মধ্যে ঢুকে ছুটন্ত রাখাল গোলে শট নিল। গ্যালারির প্রবল চিৎকারটা তীব্র বিদ্রুপে রূপান্তরিত হয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যে। রাখাল দেখল, তার শট পোস্টের দু’ হাত বাইরে দিয়ে চলে যাচ্ছে। এমন বল যে কেউ বাইরে মারতে পারে, এমন সুযোগ যে কেউ হারাতে পারে সেটা রাখালই বিশ্বাস করে উঠতে পারছিল না। অনুশোচনা আর আত্মগ্লানিতে তার বুক ভরে গেল। তার মনে হল, সে এখনই মাঠের মধ্যে মাথা কুটে মরে যায়।
কিন্তু সেদিন আর সুযোগ পাওয়া যায়নি। একটু পরেই তাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হল। নঈমদা কিছু বলেননি। কিন্তু ড্রেসিংরুমে গিয়ে তার কানে এল, কে যেন বলছেন, ‘রিকশাওলার ছেলের গায়ে মোহনবাগানের জার্সি, এটা ভাবা যায়! ওই ছেলেকে বল রিকশা চালাতে, মোহনবাগানে ফুটবল খেলা ওর দ্বারা হবে না। একটা অন্ধ ছেলেও ওই গোলটা করতে পারত।'
অন্যজন খোশামুদে ভঙ্গিতে বললেন, ‘যাই বলুন না কড়িদা, ব্লাডের একটা ব্যাপার আছে। দু’ পায়ে প্যাডেল মারা বাপের ছেলে কলকাতা মাঠের স্ট্রাইকার হতে পারে না।'
এতক্ষণ রাখালের বুক ভরে ছিল অনুশোচনা আর গ্লানিতে। এবার তাতে অপমানের জোয়ার এল। রাখাল চোয়াল শক্ত করতে গিয়ে দেখল তার শরীর শিথিল হয়ে আসছে। ব্যর্থতার গ্লানি আর অপমানের জ্বালা তার দু’ চোখ ভাসিয়ে দিতে লাগল। দুই হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে অসহায় রাখাল আকুলভাবে কেঁদে উঠল।
বাড়ি ফেরার পথে পিন্টুদা আর মানসবাবুর সঙ্গে স্টেশনে দেখা হয়ে গেল রাখালের। রাখালের থমথমে বিষণ্ন মুখের দিকে তাকিয়ে পিন্টুদা বললেন, ‘গোলটা খুব সহজ ছিল সন্দেহ নেই। ওটা তোর পক্ষে কোনও কঠিন কাজও ছিল না। তবু মাঝে মাঝে এরকম হয়। বড় বড় খেলোয়াড়রাও সহজ গোল মিস করে ফেলেন। গোলের সামনে গিয়ে স্ট্রাইকারকে মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়। যেমন পৃথিবীর সেরা ব্যাটসম্যানরা নব্বইের কোঠায় গেলেই সেঞ্চুরি পাওয়ার জন্য নিজের মাথাকে ঠান্ডা রাখেন, ব্যাট চালাবার ব্যাপারে সংযমী হয়ে ওঠেন। খিদিরপুরের হয়ে ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে খেলতে গিয়ে আমিও সহজ গোল মিস করেছিলাম।'
মানসবাবু রাখালের পিঠে হাত রেখে বললেন, ‘আজকের ম্যাচটা আমি কভার করিনি। ওটা রূপায়ণ করেছে। তোমার খেলা দেখতেই মাঠে ছিলাম। কিন্তু তুমি টেন্টে বসে মুখ গুঁজে কাঁদছিলে কেন? নিজেকে আরও ভালভাবে তৈরি করো। নিজের ভেতরে জেদ তৈরি করো।'
নিজের দুঃখের সঙ্গে যে চরম অপমান আজ সে পেয়েছে সেটা সে কাউকে বলতে পারছে না। কিন্তু সেই কথাটাই বাধ্য হয়ে বলে ফেলল নিজের বাড়িতে এসে। কানাই বিড়ি টানতে টানতে বলল, ‘এ আর নতুন কথা কী! আমি তো আগেই কয়েছিলুম।'
মানসবাবু চাপাস্বরে গর্জন করে বললেন, ‘এসব কথা নিয়ে ভাববেন না। ফুটবলে ওসব নেই। আপনি জানেন, অনেক বিখ্যাত খেলোয়াড় নিজেদের দারিদ্র্য, জাতপাত আর নানা বাধার মধ্যে থেকে কেমনভাবে বড় হয়ে উঠেছেন? টেস্ট ক্রিকেটার একনাথ সোলকারের নাম শুনেছেন? শর্টস্কোয়ার লেগে ফিল্ডিং করে তিনি আজও বিখ্যাত। ওই পজিশন থেকে ক্যাচ নেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তাঁর। তাঁর বাবা ছিলেন বোম্বাইয়ের ব্রেবোর্ন স্টেডিয়ামের মালি। বাপের সঙ্গে বল কুড়োতেন সোলকার। সেই ছেলেই একদিন ভারতীয় টেস্ট টিমে এসে তাঁর জায়গা করে নিলেন। দৌড়বীর মিলখা সিংয়ের ছেলেবেলা কেটেছে দারুণ দারিদ্র্যে। আমাদের এখানকার মতো দেশভাগের অভিশাপ বর্তেছিল পঞ্জাবের ওপরেও। দাদা খুন হয়ে যান দাঙ্গার সময়। বিধবা বউদিকে নিয়ে ভারতে আসেন। অনেক কষ্টে একটা চাকরি জোটে ফিরোজপুর ক্যান্টনমেন্টে। কাজটা কী ছিল জানেন? ওই ক্যান্টনমেন্টের জওয়ানদের জুতো পালিশ করা। বিনিময়ে সামান্য টাকা আর জওয়ানদের খাবার থালার উচ্ছিষ্ট। ওই খাবার ভাগ করে খেতেন মিলখা আর তাঁর বিধবা বউদি। কখনও সখনও বাড়িতে জুটত শুকনো রুটি। সঙ্গে আর কিছু নয়। মিলখার অসুবিধে হত না। চোখের জলে রুটি ভিজে যেত। চোখের জল তো, তাই নুনের প্রয়োজনও মিটে যেত। কিন্তু জীবনের দৌড়ে হার মানেননি মিলখা। তাই একদিন তাঁর গলায় ঝুলেছিল এশিয়ার সেরা দৌড়বীরের পদক। অলিম্পিকের পদকও। জার্নাল সিংও সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মাননি। বেঁচে থাকার জন্য তাঁকেও লড়াই করতে হয়েছে। লড়াই করতে করতেই তিনি একদিন ভারতবিখ্যাত হয়ে ওঠেন। কেরলের ত্রিচুর থেকে আসা একটি ছেলে এখন কলকাতার মাঠে ফুটবল খেলে। শোনা যায় খেলোয়াড় হিসেবে তার দাম এক মরশুমে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। সেই ছেলেটির মা ছিলেন সামান্য পরিচারিকা। অনেক কষ্টে ছেলেকে তিনি বড় করেছেন।
সেই ছেলেটির নাম বিজয়ন। অতএব, জাত-পাত, বাবা-মায়ের বৃত্তি বা পেশা, দারিদ্র্য এসব কখনও কারও বড় হয়ে ওঠবার পথে বাধা হতে পারে না, যদি তার মনে বড় হয়ে ওঠার সংকল্প থাকে। অলস আর অকর্মণ্যদের কাছে তো দেশের মানুষের কোনও প্রত্যাশা থাকে না।'
কানাই চুপ করে যায়। রাখাল মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকায়। নিমগাছের মাথার ওপরে একফালি চাঁদ উঠেছে। টুকরো টুকরো সাদা মেঘ ভেসে যাচ্ছে উত্তরে। রাতের বাতাসেও দিনের তাপ টের পাওয়া যায়। কিন্তু আজকের সমস্ত তাপ তার শরীরে। তার বুক এতক্ষণ অপমানের আগুনে জ্বলছিল, এবার সেই আগুন তার সর্বাঙ্গ ঘিরে জ্বলতে লাগল। জীবনে আর-একটা সুযোগ চাই, অন্তত আর একটিবার। আজকের ব্যর্থতাকে চির দিনের জন্য মুছে দেওয়ার মতো একটা সুযোগ তার দরকার। তারপর যদি সে মরেও যায় তাহলে কোনও দুঃখ থাকবে না। সারারাত রাখাল বিছানা শুয়ে এপাশ-ওপাশ করতে লাগল। মানসবাবু আর পিন্টুদা বলেন, ‘ফুটবলারের মধ্যে একটা মহৎ জেদ চাই। সেই জেদ তাকে লড়াই করতে শেখায়। প্রতিকূল অবস্থার সঙ্গে যুদ্ধ করবার সাহস আর মানসিকতা তৈরি করে। কিন্তু তেমন সুযোগ কি নঈমসাহেব তাকে আর কখনও দেবেন? অন্তত আজকের পর?’
ধীরে ধীরে সময় চলে যায়। লিগের খেলা শেষ হয়ে গেল মোহনবাগানের। কিন্তু সাইডলাইনের ধারে বসা রাখালের আর ডাক এল না। সকালে মোহনবাগান মাঠে প্র্যাকটিসের কামাই নেই, তবু খেলার মাঠে কেউ তাকে ডাকেন না। নঈমদাকে কখনও জিজ্ঞেস করতে সাহস পায়নি রাখাল।
একদিন প্র্যাকটিসের পর নঈমদা তার বুটের দিকে তাকালেন। রাখালের বুট নিজে হাতে নিয়ে উলটেপালটে দেখে বললেন, 'তুমি এই বুটে খেলো?’
রাখাল ভেতরে ভেতরে আড়ষ্ট হয়ে গেল। অপরাধীর মতো মাথা নিচু করল। নঈমদা বললেন, ‘এই বুটে কখনও খেলা যায়। তোমার পায়ের তো বারোটা বেজে যাবে। কালই নতুন বুট নিয়ে প্র্যাকটিসে আসবে।'
নতুন বুট? রাখাল যেন মনে মনে বিষম খেল। মোটামুটি খেলা যায় এমন একজোড়া বুট কিনতে তিনশো টাকা দরকার। কে দেবে এই তিনশো টাকা এবং আজ রাতেই? ক’দিন থেকে ঘুসঘুস জ্বরে ধরেছে বাবাকে। চিকিৎসা করাবার পয়সা নেই। বেলা বেড়ে গেলে ইদানীং আর রিকশা টানতে পারে না কানাই। গাড়ি বসিয়ে দিয়ে নিজের দাওয়ায় এসে হাঁফায়। চোখ দুটো কোটরে ঢুকে গেছে এখন। নাক দিয়ে কুলোয় না বলে দুপুররোদে মুখ ফাঁক করে শ্বাস টানে। বেতের মতো ছিপছিপে টানটান শরীর এখন দুমড়ে গেছে। পিঠটাও ক্রমশ বেঁকে যাচ্ছে। আজই সমীর ডাক্তার বাইকে করে এসে তার বাবাকে দেখে গেছেন। বিনে পয়সার রোগী দেখেছেন, এই তো ঢের, কিন্তু ওষুধ কেনার টাকা আসবে কোত্থেকে?
নিজের অবস্থাটা নঈমকে শোনাতে পারল না রাখাল। সে কেবল মাথা নিচু করে নির্দেশটুকু শুনল। যা এই মুহূর্তে তার পক্ষে অসম্ভব তা নিয়ে ভাবতে ভাল লাগে না রাখালের। সে নিঃশব্দে বাড়িতে ফিরে এল। দাওয়ায় বসে ছিল কানাই। সে ছেলের মুখের দিকে তাকাল। ছেলে দেখল বাবার পাশে কয়েকটা ওষুধ। রাখাল কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই কানাই বলল, ‘ডাক্তারবাবু নিজেই দিয়ে গেলেন। গজুদা এয়েছিল। আমায় দশটা টাকা দিয়ে বলেছে, কাছে রেখে দে, দরকার লাগলে খরচ করিস।'
রাখাল ঘরের ভেতরে গেল। সে শুনতে পেল বাবা বাইরের দাওয়া থেকে বলছে, 'আজ আর রাঁধবার ক্ষ্যামতা নেই। ঘরেও তেমন কিছু নেই যা ফুটিয়ে তোকে খেতে দেব। তুই গজুদার এই টাকাটা দিয়ে কিছু নিয়ে আয়।'
বিকেলের দিকে ক্লাবের খেলা খেলে এসে রাখাল নিজেই উনুন ধরাতে বসল। কানাই ক্ষীণগলায় বলল, ‘তুই থাম, আমিই যাচ্ছি। তোর কাল সকালে প্র্যাকটিস আছে।'
রাখাল পাখা দিয়ে উনুনে হাওয়া করতে করতে বলল, ‘কাল প্র্যাকটিসে যাব না।' কানাই প্রশ্ন করল, ‘কেন? যাবি না কেন?’
রাখাল উত্তর দিল না। মিথ্যে করে বানিয়ে একটা কিছু বলে দেওয়া যায়। কিন্তু বাবার কাছে মিথ্যে বলতে শেখেনি রাখাল। অতএব, উত্তরটা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য চুপ করে রইল। কানাই আবার জিজ্ঞেস করল, 'কী রে, যাবি না কেন?’
রাখাল জানে, যতক্ষণ রাখাল উত্তর না দেবে ততক্ষণ তার বাবা একই প্রশ্ন করে যাবে। তাই বাধ্য হয়ে বলল, ‘একটু অসুবিধে আছে।'
কানাই এবার এগিয়ে এল ছেলের কাছে। ছেলের পাশে উবু হয়ে বসে বলল, ‘কীসের অসুবিধে?’
রাখাল আর থাকতে পারল না। সে বলে ফেলল, ‘কোচ বলেছেন, নতুন বুট নিয়ে প্র্যাকটিসে যেতে। কালকের মধ্যে নতুন বুট কোথায় পাব?’
কানাই ছেলের কাছ থেকে উঠে গিয়ে বসল দাওয়ায়। একটি কথাও বলল না। কেবল উঠোনের কোণের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ওখানে, ওই অন্ধকারে দেখার মতো কোনও দৃশ্য ছিল না। কেবল কয়েকটি জোনাকি ছাড়া ছাড়া ভাবে জ্বলছিল। রাত্রে শুতে আসার অনেক পরে কানাই ডাকল, ‘খোকা, খোকা ঘুমোলি?’
রাখাল সাড়া দেয়, 'না।'
কানাই জিজ্ঞেস করে, ‘খোকা, একজোড়া বুটের কত দাম রে?’
রাখাল পাশ ফিরে জবাব দেয়, ‘তিনশো টাকার মতো।'
কানাই চুপ করে যায়। অনেক রাত্রে রাখাল শুনতে পায়, তার বাবা বেদম কাশছে। রাখাল বিছানায় উঠে বসে। ডাকতে থাকে, ‘বাবা, একটু জল খাবে, ও বাবা—
ঈশ্বর কেমন দেখতে, সত্যি তিনি আছেন কি না, তাঁর করুণা কখন কেমন করে মানুষের মাথায় আশীর্বাদ হয়ে ঝরে পড়ে, সে-কথা রাখাল কখনও জানতে পারেনি। তার দারিদ্র্যপীড়িত কুড়ি বছরের জীবনে সে দেখেছে অভাব, সহ্য করেছে ক্ষুধার কষ্ট আর উপেক্ষা, বুক পেতে গ্রহণ করেছে অপমান আর লাঞ্ছনা। বিদ্যুৎচমকের মতো কখনও কখনও সাফল্য এসেছে কিন্তু তার পরক্ষণেই আবার হতাশার অন্ধকার। সে নিজেকে প্রকাশ করতে পারে না, নিজের কতটুকু অধিকার তাও সে জানে না। খেলোয়াড়, কর্মকর্তা আর অন্যদের সামনে সে কুণ্ঠিত হয়ে থাকে। লিগের অধিকাংশ খেলায় সে সাইডলাইনের ধারে বসে থেকেছে। খেলেছে মাত্র চারটে খেলা। দশ-পনেরো মিনিট তাকে মাঠে থাকতে হয়েছিল। সে যে খেলতে পারে, তার কোনও প্রমাণ সে দেখাতে পারেনি। শুধু রেলের বিরুদ্ধে একটি সহজ গোল নষ্ট করা ছাড়া কলকাতার মাঠে মনে রাখার মতো সে কিছুই করেনি। সবাই একসময় বলত কাউলুন স্টেডিয়ামে সাউথ কোরিয়ার বিরুদ্ধে সে নাকি দুর্দান্ত গোল করেছিল। কিন্তু রাখাল বুঝতে পারে আজ আর সেকথা কেউ মনে রাখেনি, তার চাইতে বেশি মনে রেখেছে রেলের বিরুদ্ধে সেই সহজ গোলটা নষ্ট করার কথা। এখন কেউ কেউ ঠাট্টা করে বলে, ‘ওটা একটা ফ্লুক।' কিন্তু রাখাল কাউকে বোঝাতে পারে না তার মনের অবস্থাটা। মাঠে নামতে পারবে কিনা জানে না, হঠাৎ করে নামার ডাক পেলেও সে জানে না কখন আবার হঠাৎ করেই মাঠ থেকে চলে আসার ডাক আসবে। একটা অনিশ্চয়তা তাকে সবসময় সন্ত্রস্ত করে রাখে। এইরকম মনের অবস্থায় কি খেলা যায়?
মোহনবাগান মাঠেই একদিন সমরেশদার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। টেন্ট থেকে বেরিয়ে দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে আসছিল। সমরেশদা বললেন, ‘তোর মধ্যে তো খেলা আছে। কিন্তু যে ক’বার মাঠে নামলি কিচ্ছু করতে পারলি না। নঈমদা তো ভাল কোচ।'
রাখাল বলল, ‘সিনিয়াররা কেউ বল দেয় না। স্রেফ নিয়মরক্ষার জন্য নামায়। রেলের সঙ্গে ওই গোলটা মিস করার পর কেউ আর ফিরেও তাকায় না। আপনিই বলুন, দশ মিনিটের জন্য মাঠে নেমে আমি কী করতে পারি?’
সমরেশদা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে ছোলাভাজা কিনলেন। একটা ঠোঙা রাখালের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘সতীর্থ খেলোয়াড়দের সহযোগিতাটা খুব জরুরি। তবে একজন খেলোয়াড়ের কাছে দশ মিনিট কোনও ব্যাপার নয়। ওই দশ মিনিটেই সে খেলার চরিত্র বদলে দিতে পারে। কলকাতার মাঠেই এরকম ঘটনা অনেক ঘটেছে। আমার বিচারে সবচেয়ে বড় ঘটনাটা কলকাতার মাঠে ঘটিয়েছিল পি দে। খড়দার ছেলে পরিমল। ওকেও অনেক লড়াই করে ওপরে উঠতে হয়েছিল। ইরানের প্যাস ক্লাবের সঙ্গে আই এফ এ শিল্ড ফাইনাল খেলছে ইস্টবেঙ্গল। খেলা ভাঙার একটু আগে পর্যন্ত খেলাটা ড্র যাচ্ছে। সবাই ধরে নিয়েছে ফাইনাল নির্ঘাত একস্ট্রা টাইমে যাবে। ওই দশ মিনিট আগে চোট পেয়ে হাবিব মাঠের বাইরে চলে গেল। বদলি খেলোয়াড় নামল পরিমল দে। অর্থাৎ পি দে। নামার পরেই স্বপন সেনগুপ্তর পা থেকে বল পেল। ওটাই প্রথম বল। একেবারে স্কেল দিয়ে মাপা শট করল পরিমল। বলটা তিরের গতিতে বাঁক খেয়ে গোলে ঢুকে গেল। শিল্ড এল ইস্টবেঙ্গলের ঘরে। অতএব, যায়, দশ মিনিটেও ম্যাজিক দেখানো যায়।'
রাখালের মনে হল, যদি সেদিন ফ্রিকিকটা জংলাদাকে নিতে না দেওয়া হত তাহলে? মাঠে তার পায়ের দিকে কেউ তো বলই ঠেলে না। সে যে মাঠে আছে, সেটা যেন কেউ মনেই রাখে না। এরকম অবস্থায় সে কী করতে পারে?
কিন্তু কথাটা সমরেশদাকে বলা গেল না। আজ সমরেশদা ছিলেন, তাই বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। নইলে সে একা একা হেঁটে যেত বাবুঘাটের কাছে। গঙ্গার পারে একা একা অনেকক্ষণ বসে থাকত তারপর ক্লান্ত পায়ে হেঁটে এসে উঠে পড়ত সেভেনটি এইট বাই ওয়ান বাসে। এই বাস যাবে রহড়া বাজারে। ওখান থেকে কেশবপুর তো সামান্য রাস্তা। আরও অনেক স্বপ্ন-দেখা ছেলেদের মতো তার ফুটবল-জীবনও হয়তো একদিন অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। কেউ কখনও তাকে মনে রাখবে না। শুধু কলকাতা ফুটবল লিগের খাতায় লেখা থাকবে রাখাল মণ্ডল নামের একজন স্ট্রাইকার রেলের বিরুদ্ধে অতি সহজ একটি গোল নষ্ট করেছিল। এর চেয়ে বেশি আর কী তার প্রাপ্য থাকতে পারে!
সেদিন ছিল বুধবার। সে শুনেছে এই বুধবারেই গজুদাদের গোয়ালের এককোণে সে জন্মেছিল। ব্যাংককে চিনের বিরুদ্ধে যে গোলটা সে মিস করেছিল, সেটা ছিল বুধবার। কাকতালীয় হলেও সত্যি যে, রেলের বিরুদ্ধে তার চূড়ান্ত ব্যর্থতার দিনটাও ছিল বুধবার। অথচ আজকের বুধবারে নঈমদা বললেন, 'আমরা রোভার্স খেলতে বোম্বাই যাচ্ছি। তোকেও দলে রেখেছি। তুই তৈরি থাকিস।'
রাখাল বিমূঢ় বিস্ময়ে অনেকক্ষণ নঈমদার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। মোহনবাগান রোভার্স খেলতে বোম্বাই যাচ্ছে আর সেই দলে রাখালকেও রাখা হয়েছে! কিন্তু কেন? এখানে তো অনূর্ধ্ব উনিশ খেলাবার কোনও নিয়ম নেই। আনন্দ এবং হতাশা দুটোই একই সঙ্গে রাখালের মধ্যে কাজ করতে লাগল। আনন্দ দলে জায়গা পাওয়ার জন্য, হতাশা এইজন্য যে, সে জানে, বোম্বাইয়েও সে জার্সি পরে সাইডলাইনের ধারে বসে থাকবে।
বোম্বাই যাওয়ার আগের দিন কানাই বেদম কাশতে কাশতে জিজ্ঞেস করল, ‘খোকা, কাল কখন যাবি?’
রাখাল উত্তর দিল, ‘সকাল দশটার ট্রেন ধরে টেন্টে যাব। শুনেছি বিকেলের প্লেনে আমাদের যাওয়ার কথা।'
কানাই জিজ্ঞেস করে, “হ্যাঁ রে খোকা, এই যে উড়োজাহাজগুলো যায়, ওরা রাস্তা চেনে কেমন করে?’
রাখাল উত্তর দেয়, ‘আমি জানি না।'
উড়োজাহাজের ভেতরটা কেমন সেটা জানতে বড্ড ইচ্ছে করে কানাইয়ের। রাখাল বলে বটে, তবে তাতে মনের আশ মেটে না। পিন্টুবাবু বলেন, ‘রাখাল যাবে এয়ারবাসে।’ তা এই কথাডার মানে কী! আকাশ দিয়ে তো কখনও কোনও বাস যেতে দেখেনি কানাই। বাস কি আকাশে উড়তে পারে? কানাই নিজের মনেই সাত-পাঁচ ভেবে যায়। ভাবতে ভাবতে তার চোখের সামনে রাত ফুরোয়। সাতসকালে গজুদা এসে রাখালের হাতে শিবমন্দিরের ফুল আর দুশোটা টাকা দিয়ে বলেন, ‘এগুলো রাখ। বাবা ভোলানাথের আশীর্বাদ। টাকাটা কাজে দেবে। মোহনবাগানের হয়ে খেলতে যাচ্ছিস এ কী চাট্টিখানি কথা! দেখিস বাবা, ধেড়িয়ে আসিস না।’
বাবাকে প্রণাম করে বেরোবে এটাই ভাবা ছিল। কিন্তু কোথায় বাবা! সাতসকালেই ‘এই আসছি’ বলে বাবা বেরিয়ে গেছে। যাওয়ার আগে কি বাবার সঙ্গে দেখা হবে না? সত্যিই হল না। বিষণ্ন মনে রাখাল বেরিয়ে পড়ল। পাড়ায় মোহনবাগানের বিস্তর সমর্থক। সবাই জানে রাখাল রোভার্স খেলতে বোম্বাই যাচ্ছে। কেউ কেউ তাকে দেখে হাসল। দুটো বাচ্চা ছেলে ছুটে এসে বলল, ‘রাখালদা, একটা গোল করে পাড়ার মান রেখো। আমরা তোমার জন্য বাজি ফাটাব।'
রাখাল কখনও রিকশায় ওঠে না। সে হেঁটে যেতে লাগল। তখন রিকশায় উঠছিলেন গুরুদাসদা। চিৎকার করে ডেকে বললেন, ‘এই কানাইয়ের ব্যাটা, রিকশায় আয়।' রাখাল বলল, ‘না, আপনি যান।'
গুরুদাসদা আগের মতোই চিৎকার করে বললেন, ‘গোটা সিজন তো সাইডলাইনের ধারে বসে ঘাস ছিঁড়লি। এবার মোহনবাগানের পয়সায় বোম্বাই ঘুরে আয়।'
রাখাল রিকশাটাকে চলে যেতে দেখল। স্টেশনে পৌঁছেও তার মনে স্বস্তি ছিল না। কেবলই বাবার কথা মনে হচ্ছিল। বাবা তো জানে, সে দশটার ট্রেন ধরবে। তবুও বাবা কেন ফিরল না? ট্রেনের সিগন্যাল হয়ে যাওয়ার পর সে এগিয়ে যাচ্ছিল প্ল্যাটফর্মের মাঝামাঝি। হঠাৎ পেছন থেকে ডাক শুনতে পেল, ‘খোকা, অ্যাই খোকা।’
চকিতে মুখ ফেরাল রাখাল। প্ল্যাটফর্মের ওপর দিয়ে যাত্রীদের ভিড় ঠেলে ঠেলে বাবা ছুটে আসছে। কিন্তু বাবার হাতে ওটা কী!
কাছে এলে দেখা গেল বাবার এক হাতে একজোড়া নতুন বুট। অন্য হাতে একজোড়া পুরনো বাতিল বুট। বাবা ছুটে আসায় হাঁফাচ্ছে। কাছে এসে বলল, ‘খোকা, তোর জন্যে নতুন বুট এনেছি। এই পুরনোটার মাপে। তোর হবে তো?’ রাখাল জিজ্ঞেস করল, ‘টাকা পেলে কোথায়?’
শিশুর মতোই হাসল কানাই। হাসতে হাসতে বলল, ‘তোর মায়ের দু’গাছা সোনার চুড়ি ছিল। মরবার আগে বলেছিল, এটা তোর বউকে দিতে। তা কবে বউ আসবে কে জানে! ওই দু’গাছা বেচে তিনশো নব্বই টাকা পেলুম। বুটের দাম নিল তিনশো, পাঁচ টাকার পুজো দিলুম।'
ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে মন্থরগতিতে। রাখাল এগোতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে কানাই। প্রণাম করে ট্রেনে উঠে পড়বার পর কানাই জানলা দিয়ে মুখ বাড়াল। রাখাল ভিড় ঠেলে জানলার কাছে আসতেই বাবা বলল, ‘ওই বুট পরে মাঠে নামিস খোকা। নামবি তো?’
রাখাল ঘাড় নাড়ল। পর বাবার মুখটা ঝাপসা হয়ে গেল। তার মনে হল, এই ট্রেন কামরার ভেতরের লোকজন, বাইরের চলমান দৃশ্যাবলি সব যেন ভিজে উঠছে। বিলকুল ঝাপসা।
বোম্বাই পৌঁছবার পর বোঝা গেল, কেন মোহনবাগান তাদের নিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। প্লেনে পাশাপাশি বসেছিল সুকান্তর সঙ্গে। সুকান্তই ঘটনাটা তাকে প্রথম বলে। কিন্তু সুকান্তর কথা সে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেনি। বোম্বাইয়ের হোটেলে এসে নঈমদা আর টুটু বোসের কথা বলার মধ্যে দিয়ে ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে গেল। মোহনবাগানের বড় ভরসা চিমা চলে গেছেন লন্ডনে। ব্যাংক ফুটবল খেলার জন্য মোহনবাগানের ছ’জন ফুটবলারকে ছেড়ে দিতে হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছেন শিশির ঘোষ, তনুময় বসু, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য সহ আরও তিনজন। রোভার্সে খেলার জন্য মোহনবাগান টিমই তৈরি করতে পারছে না। শেষ পর্যন্ত জেদ ধরলেন টুটু বোস। তিনি বললেন, ‘কিছুতেই নাম উইথড্র করা যাবে না। টিমের একটা প্রেস্টিজ আছে। ম্যাক্সিমাম কী হতে পারে? আমরা হারব। অতীতেও তো কয়েকবার ফুল টিম নিয়ে ডুরান্ডে, ফেডারেশন কাপে আর রোভার্সে হেরেছি এবার না হয় ভাঙা টিম নিয়ে হেরে যাব। আপনি জুনিয়ারদের নিয়ে টিম করুন।'
নঈমদা জুনিয়ারদের নিয়েই টিম করলেন। প্রথম খেলাটায় রাখালকে মাঠেই নামানো হল না। মানসদা গেছেন রোভার্স কাপের খেলার রিপোর্ট করতে। প্রথম খেলার শেষে মানসদা বললেন, ‘তোকে নামাল না কেন?’
রাখাল দীর্ঘশ্বাস ফেলে ম্লানমুখে বলল, ‘জানি না।'
মানসদা একটু ভেবে নিয়ে বললেন, ‘মুশকিল হচ্ছে কলকাতা মাঠে তোর কোনও ব্রিলিয়ান্ট পারফরম্যান্স নেই। তাই বড় খেলায় রিস্ক 'নিতে ভরসা পাচ্ছে না।'
রাখাল চুপ করে রইল। মানসদা যাওয়ার আগে বললেন, 'আমি কাল একবার নঈমদা আর টুটুদার সঙ্গে তোর ব্যাপারে কথা বলব।'
মানসদা কথা বলেছিলেন কিনা রাখাল তা জানে না। কিন্তু পরের খেলায় হাফ টাইমের পর রাখালের ডাক পড়ল। মাঠ থেকে উঠে আসছে তপন সাহা। তার পরিবর্তে মাঠে গেল রাখাল। জে সি টি দল আর মোহনবাগানের খেলা তখনও ড্র। গোটাচারেক সুযোগ মোহনবাগান নষ্ট করেছে প্রথম হাফেই। খেলতে নেমে প্রথম তিন-চার মিনিট রাখাল খেলাটা ধরতে পারল না। শুরুতেই একটা মিস পাস। তার পরেপরেই বোকার মতো জে সি টি-র ফাঁদে পা দিয়ে অফসাইডে পড়ল, ফলে মোহনবাগানের একটা ভাল মুভমেন্ট নষ্ট হয়ে গেল তার জন্যে।
নিজের ওপর ঘেন্না ধরে যাচ্ছিল রাখালের। সে কেন নিজের মতো খেলতে পারছে না? এরকম হলে একটু পরেই তাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হবে। জীবনে আর কখনও রোভার্স খেলার সুযোগ আসবে না তার কাছে। ভেতরে ভেতরে মরিয়া হয়ে উঠল রাখাল। নিজের মধ্যে থেকে একটা তেজ তৈরি হচ্ছে। সে দেখল, বিপক্ষ দলের একজন বল নিয়ে নিজেদের সীমানা পেরিয়ে আসছে। সে ছুটে গেল ঝড়ের গতিতে। একটা টোকায় বলটা তুলে নিল নিজের পায়ে। তারপর সামনের ফাঁকা জমি দিয়ে একটা দৌড় মেরে চলতি বলেই সেন্টার করল। বলটা পড়ছে বক্সের কোনায়। ওই বলে মাথা ঠেকাবার জন্য একসঙ্গে তিনজন শূন্যে লাফাল। কার মাথায় লাগল সেটা খেয়াল করার সময় ছিল না। বল এসেছে তার বুকের কাছে। বুক দিয়ে বল নামিয়ে চকিতে শট নিল গোলে। বক্সের এক হাত ভেতর থেকে নেওয়া শট বুলেটের মতো ক্রশবারের আধ ইঞ্চি নীচ দিয়ে গোলে ঢুকে গেল।
‘গোল’ শব্দটা কয়েকশো কণ্ঠে চিৎকার করে বোম্বাইয়ের আকাশ কাঁপিয়ে দেওয়ার পরও রাখালের বিশ্বাস হচ্ছে না, সত্যিই সে গোল করতে পেরেছে কি না! সতীর্থরা ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরেছে। মাঝমাঠে আবার বল বসানো হয়েছে সেন্টার করার জন্য। এবার একটু একটু তার বিশ্বাস হচ্ছে, সে গোল করেছে। মাঠে নামবার দশ মিনিটের মাথায় তার গোলে মোহনবাগান এগিয়ে গেল। অথচ কলকাতা মাঠে এই সময়ই তাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হত। এর পর খেলার ছকটা বদলাতে লাগল। বল পেয়েই সবাই ঠেলে দিচ্ছে রাখালকে। বিপক্ষের ডিফেন্সে রাখাল তখন সমস্যা হয়ে উঠছে। ডিফেন্সের কড়া নজর পেরিয়েও রাখাল ঝাঁপিয়ে পড়ছে বক্সের ওপর। একটা বল বারের কোনায় ধাক্কা লেগে ফিরে আসার মিনিট দুয়েক বাদে ওদের রাইট ব্যাক এগিয়ে এসে বক্সের অনেকটা বাইরে আগুয়ান রাখালকে বিশ্রীভাবে ফাউল করল। রাখার লুটিয়ে পড়ল মাঠের ওপর। আর উঠতে পারল না। স্ট্রেচারে করে তাকে মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হল। খেলা শেষ হতে তখনও চোদ্দো মিনিট বাকি। স্ট্রেচারে মাঠের বাইরে যেতে যেতে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, ‘আমি খেলতে চাই। আমাকে খেলতে দাও, মাঠের বাইরে নিয়ে যেয়ো না।'
ফাইনালে উঠল মোহনবাগান। বি এস এফের সঙ্গে কুপার্স মাঠে ফাইনাল খেলা। মানসদা জানালেন, ‘তুই এখনও ফিট নোস! তবুও নঈমদা চেষ্টা করছেন তোকে সেকেন্ড চান্সে রাখার।'
রাখাল মনে মনে দমে গেল। তার মানে তাকে ফাইনালে খেলানো হবে কি না সেটা এখনও অনিশ্চিত। খেলার দিন কেউ তাকে জার্সিও পরতে বলল না। নঈমদা তার সামনে দিয়ে দু’বার হেঁটে গেলেন, কিন্তু কিছু বললেন না। টুটুবাবু নিজেই এত ব্যস্ত যে, তাঁকে কিছু বলার সাহস রাখালের হল না। খেলা শুরু হওয়ার পর রিজার্ভ প্লেয়ারদের জায়গায় গিয়ে ম্লানমুখে সে বসল। মাঠের তিনদিকে টিভির ক্যামেরা। এই খেলা দেখা যাবে কেশবপুরের ঘরে ঘরে। অথচ তাকে কেউ দেখতে পাবে না। খেলা শুরুর আগে একবার মানসদাকে দেখল রাখাল। মানসদা তার দিকে ভাল করে তাকালেন না। তার মনে হল, সবাই যেন তার মুখটা ভুলে গেছে। এখানে কেউই তার পরিচিত নয়। খেলা শুরুর একটু পরেই নঈমদা ডেকে পাঠালেন। ফিসফিস করে বললেন, ‘তোমার দু’ পায়ে এখনও চোট। তবুও জার্সি পরে রেডি হয়ে থাকো। জানি না, নামাতে পারব কি না!’
কথাটা বলেই নঈমদা গম্ভীর হয়ে গেলেন। অগত্যা রাখাল নিজেকে তৈরি করে রাখল। কেবল বুট পরল না। হাফ টাইমের আগে গোল খেল মোহনবাগান। বি এস এফের জওয়ানরা আকস্মিকভাবে গোল পেয়ে যাওয়ায় তাদের উদ্যম যেন তিনগুণ বেড়ে গেল। খেলায় ওদের আধিপত্য যত বাড়তে লাগল মোহনবাগান ততই গুটিয়ে যেতে আরম্ভ করল। জয়ের স্বপ্ন তখন ক্ষীণ হয়ে আসছে। আশঙ্কা হচ্ছে জওয়ানরা হয়তো গোলের ব্যবধান বাড়িয়ে ফেলবে। এইরকম চলতে চলতেই হাফ টাইম হল। এক গোলে পিছিয়ে থাকা মোহনবাগান হাফ টাইমেই যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে এমন ভঙ্গিতে ড্রেসিংরুমে এল।
নঈম আর টুটু বোসকে ঘিরে ঘরের মধ্যে জটলা। ছোটখাটো তর্ক। নঈম কথা বললেন না। ঘরের মধ্যে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সবাইকে দেখতে দেখতে বললেন, ‘খেলায় হার-জিত আছে। কিন্তু আমরা হারতে আসিনি। আমরা জিতব। চেষ্টা থাকলে এখনও গেমটাকে বের করে আনা যায়। তোমরা মনে মনে হেরে যেয়ো না। কোনও কোনও দল খেলার আগেই হেরে বসে থাকে। মোহনবাগান তেমন দল নয়। সে ফাইটার। ফাইট করতে জানে।'
রাখাল মানসদাকে ড্রেসিংরুমে দেখতে পেল। মানসদা নঈম আর টুটু বোসের সঙ্গে কথা বলছেন। নঈমদার নির্দেশে টিম আবার মাঠে যাচ্ছে। লাইন করে এগারোজন যাবে মাঠে। রাখাল টিমকে যেতে দেখে অন্যদিকে মুখ ফেরাল। ড্রেসিংরুমের মধ্যে একটা বাঘের ছবি। বাঘটা গর্জন করছে। তার পায়ে লোহার শিকল। সামনে লোহার শিক। রাখাল ওই ছবিটার দিকে তাকাল। হঠাৎ দরজার মাথা থেকে একটা চিৎকার, ‘রাখাল, বি রেডি। তোকে নামতে হবে।'
দু’ চোখে অবিশ্বাস নিয়ে রাখাল দরজার দিকে তাকাল। দরজার সামনে নঈমদা, পাশে টুটু বোস, আর পেছনে মানসদা।
মানসদা ধমকের সুরে বললেন, ‘হাঁ করে দেখছিস কী! টিম মাঠে নামছে। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে।'
টুটুদা বললেন, ‘অরুণের জ্বর এসে গেছে। ওকে তুলে নিয়ে হোটেলে পাঠিয়ে দিন। আমি ডাক্তারের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।'
নঈমদা বললেন, ‘জ্বর গায়েই তো ওকে নামতে হয়েছিল। ভাল হেড নিতে পারে। সেজন্যই নামানো৷'
রাখাল তখন উঠে দাঁড়িয়েছে। নঈমদা ভর্ৎসনা করার ভঙ্গিতে বললেন, ‘খেলার শুরুতেই তোকে রেডি থাকতে বলেছিলাম। এখনও বুট পরা হয়নি?’
টুটুদা বললেন, ‘আপনি রেফারিকে খবর পাঠান। একজন তুলে নিয়ে নতুন প্লেয়ার দিচ্ছি। এক মিনিট সময় যেন দেন।'
রাখাল মোহনবাগানের দেওয়া আটশো টাকা দামের বুটজোড়া সরিয়ে রেখে নিজের ব্যাগ থেকে তিনশো টাকা দামের বুটজোড়া বের করল। তার মনে হল ওই চামড়ার মধ্যে বাবার কথা লুকিয়ে আছে। বাবা যেন এখানেও বলছে, ‘ওই বুট পরে মাঠে নামিস খোকা। নামবি তো?’
কেশবপুরের রাখাল, রিকশাওলা কানাই মণ্ডলের খোকা মাঠে নামল। গোটা মাঠে উত্তেজনাটা থমকে আছে। কেশবপুরের মানুষ টিভিতে দেখছে তাদের গ্রামের ছেলেকে। বাবা কি আজ টিভি দেখছে? সেন্টারে বল বসানো। বলের দিকে তাকিয়ে রাখাল মনে মনে বলল, ‘আমার জীবনে এটা এমন একটা সুযোগ, যার ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যতে আমি মাঠের ভেতরে থাকব, না মাঠের বাইরে। মাঠের ভেতরে থাকতে হলে তাকে লড়তে হবে। লড়াই করে সম্ভ্রম আদায় করতে হবে, আর এই হারা খেলাটাকে জেতাতে হবে।'
সেন্টার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে বল কেড়ে নিল রাখাল। রাখালের কাছে আজকের খেলাটা শুধুই খেলা নয়। তার মরণ অথবা বাঁচন নির্ভর করছে এই খেলার ওপর। কুপার্স মাঠের ওপর দিয়ে ছুটছে রাখাল। তার দু'পাশে তাকে আটকানোর জন্য ছুটছে আরও দু’জন। কিন্তু আজ রাখাল আটকে পড়ার জন্য আসেনি। রাখাল ছুটে গিয়ে নিখুঁত সেন্টার করল। কিন্তু পজিশন নিয়ে গোল করার মতো কেউ ছিল না। ওদের পা থেকে বল মাঝমাঠ পেরোবার আগেই গোটা মাঠে আবার ঝলসে উঠল রাখাল। উন্মত্ত ঝড়ের বেগে রাখাল ছুটে যাচ্ছে বিপক্ষের সীমানা। দু’জনকে ছোট্ট দুটো ডজে দু’পাশে ছিটকে দিয়ে রাখাল গোলে শট নিল। ক্রশবারে বলটা আছড়ে পড়ল।
মোহনবাগান সমর্থকরা চিৎকার করছে। তারা বুঝতে পারছে, একটা ছেলেই খেলার চেহারাটা বদলে দিচ্ছে। এগিয়ে থাকা জওয়ানরা টের পাচ্ছে তাদের সীমানায় বাঘের থাবা। ওদের জমাট ডিফেন্সে ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে একটা কালো রঙের ছেলে।
সাইডলাইনের পাশে, যেখানে কর্মকর্তাদের বসবার জায়গা, সেখান থেকে চিৎকার করছেন টুটু বোস, চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছেন নঈমদা। মনে হচ্ছে বাংলা ফুটবলের সিংহ মোহনবাগান গা ঝাড়া দিয়ে কেশর ফুলিয়ে জেগে উঠছে। ঠিক এগারো মিনিটের মাথায় গোল শোধ করল রাখাল। বড় অদ্ভুত গোল। বক্সের কিছুটা আগে বল পেয়ে রাখাল বল ঠেলল নারায়ণকে। নারায়ণ সেই বল পেয়ে বক্সের মধ্যে ঢুকতে গিয়ে ব্যাকপাস করে পাঠাল রাখালকে। রাখাল দু'জনের মধ্যে দিয়ে ছুটে এসে সেই বল ধরে একজনকে টপকে বক্সের মধ্যে ঢুকে বল নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। এখন তার পেছনটা গোলের দিকে। বলটা আলতো করে বুটের ডগায় এমনভাবে তুলল, যেন সামনে দাঁড়ানো নারায়ণকে দেওয়াই তার উদ্দেশ্য। কিন্তু না, বুটের ডগায় তোলা বলটায় চকিতে শরীর অর্ধেক ঘুরিয়ে আচমকা শট নিল গোলে। এক সেকেন্ডেরও কম সময়ের মধ্যে ঘটনাটা ঘটাল রাখাল। গোলকিপার বিভাস সাহা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বল নেটে জড়িয়ে গেছে। এই গোলের পর মাঠে পটকা ফাটতে আরম্ভ করল। রাখাল দেখল, নঈমদা, দু’ হাত তুলে তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন।
পটকা ফাটছে কেশবপুর গ্রামেও। রিকশা স্ট্যান্ডে টিভি বসিয়েছে রিকশাওলারা। পটকার সঙ্গে সঙ্গে বাজছে রিকশার হর্ন। নিজের বারান্দায় নাচছেন গজুদা। কানাই অবাক হয়ে দেখছে ওই ছোট্ট বাক্সটার মধ্যে তার খোকা ছুটছে, খোকাকে জড়িয়ে ধরে নাচছে খেলোয়াড়রা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে জয়োল্লাস! এত সুখ সহ্য হচ্ছে না কানাইয়ের। তার বুকের পাঁজর কাঁপিয়ে কাশি উঠছে। পাছে লোকের অসুবিধে হয় তাই সে কাপড়ের খুঁট মুখে চেপে কাশি চাপতে শুরু করল। বুকের ভেতরে বড্ড কষ্টের উথালপাথাল হচ্ছে। টিভির সামনে বড্ড ভিড়। শৈল কানাইকে হাত ধরে টানতে টানতে টিভির সামনে এনে বসিয়ে দিয়ে বলল, ‘দেখ, নিজের ছেলেকে দেখ।'
টিভিতে রাখালের মুখ। কে একজন যেন বলল, ‘রাখালের কথা বলছে।' কানাইয়ের চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। বুকের কাশিটা গলায় এসে ধাক্কা মারছে। কানাই মুখে কাপড় চেপে রাখল।
বোম্বাইয়ের কুপার্স মাঠে তখন থরথর উত্তেজনা। মোহনবাগানের পতাকা উড়ছে গ্যালারিতে। খেলার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে। রাখালের নাম ধরে চিৎকার করছেন মোহনবাগানের কর্মকর্তারা। তিনজন জওয়ান কড়া পাহারায় রেখেছে রাখালকে। ফাউল করে হলেও রাখালকে আটকানোই তাদের উদ্দেশ্য। খেলা শেষ হওয়ার সাত মিনিট আগে কর্নার পেল মোহনবাগান। নারায়ণের চমৎকার সেন্টার সেকেন্ড বার থেকে এক হাত ছুটে এসে শূন্যে লাফিয়ে ডান হাতে চাঁটি মেরে কোনওরকমে বক্সের বাইরে বলটা পাঠাল ওদের গোলকিপার। বলটা তখনও মাটিতে পড়েনি। বক্সের মধ্যে দু’ দলের খেলোয়াড়দের যে জটলা ছিল তার মধ্যে থেকে জ্যা-মুক্ত তিরের ফলার মতো ছুটে গেল কালো রঙের একটা ছেলে, যার গায়ে মোহনবাগানের জার্সি। বলটা মাটিতে পড়ার আগেই ছেলেটির শরীর শূন্যে ভেসে উঠল এবং পরক্ষণেই গোটা মাঠ জুড়ে জেগে উঠল কোলাহল। রাখাল মাটিতে শুয়ে। সে দেখল হতভম্ব জওয়ানরা গোলের দিকে তাকিয়ে। নেটের ভেতর থেকে বলটা কুড়িয়ে নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে ওদের গোলকিপার। মোহনবাগানের দশজন খেলোয়াড় ছুটে এসে তাকে মাটি থেকে তুলে নিয়েছে কাঁধে। সতীর্থদের কাঁধে সে ঘুরছে গোটা মাঠ।
আকাশের দিকে একবার চোখ তুলে তাকাল রাখাল। মনে মনে বলল, ‘ফুটবল বড় নিষ্ঠুর, তবুও বড় সুন্দর। সে যখন নেয় তখন নিংড়ে নেয়। কিন্তু যখন দেয়? তখন যেন দেওয়ার শেষ নেই।'
সেদিন রাত্রেই কেশবপুর থেকে টেলিফোন গেল বোম্বাইয়ের হোটেলে। ফোন করেছিলেন পিন্টুদা। রাখালকে কেউ কিছু বুঝতে দেয়নি। টুটুদা আর মানসবাবু ভোরের প্লেনে তাকে নিয়ে এলেন কেশবপুরে। বাড়িতে এসে রাখাল দেখল তার বাবার শরীর সাদা চাদরে ঢাকা। রাখাল সবার মুখের দিকে তাকাল। কেউ কথা বলছে না। পিন্টুদা নিমগাছের কাছে দাঁড়িয়ে। তার সামনে টুটুদা আর মানসবাবু। শুধু গজুদা এগিয়ে এসে রাখালকে টেনে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘তুই তোর বাবার কেনা বুটে খেলেছিলি তো?’ রাখাল ঘাড় নাড়ল।
গজুদা বললেন, ‘তোর গোটা খেলাটাই কানাই দেখেছে। মরবার আগে দেখেছিলাম, ওর দুই চোখে অপার তৃপ্তি। কানাই যেন এক যোদ্ধা, তুই ছিলি তার অস্ত্র। যুদ্ধে জিতে বীরের মতো চলে গেল।'
টুটু বোস পিন্টুকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘খেলার পর রাখালকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তুই কী চাস? যা চাইবি তাই দেব। রাখাল বড় অদ্ভুত একটা জিনিস চেয়েছিল। বলেছিল, একটা নতুন রিকশা কিনে দেবেন? এখন বুঝতে পারছি ও কেন রিকশা চেয়েছিল।'
স্ট্যান্ডের সবক'টা রিকশা চলেছে সার বেঁধে, আগে চলেছে কানাই মণ্ডলের দেহ। ফুলে ফুলে সাজানো ওই খাট কাঁধে নিয়েছেন তাঁরাই, যাঁরা এতদিন বসতেন কানাইয়ের রিকশায় আর রিকশা টানত কানাই নিজে। আজকের ছবিটা অন্যরকম। রিকশামালিকের ছেলেরাও কাঁধ দেওয়ার জন্য সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে। স্ট্যান্ডের সব রিকশা আজ বন্ধ, সবাই চলেছে শবযাত্রায়। পিন্টুদা আর মানসবাবুর সঙ্গে সঙ্গে হেঁটে যেতে যেতে রাখাল দেখল, রোভার্স জয়ের আনন্দে যারা রাস্তায় রাস্তায় মোহনবাগানের ফ্ল্যাগ ঝুলিয়ে মালা দিয়ে সাজিয়েছিল, এখন উত্তরের এলোমেলো হাওয়ায় সেই ফ্ল্যাগ থেকে ফুলগুলি খসে খসে তার বাবার খাটের পাশে পড়ছে। এর নামই কি পুষ্পবৃষ্টি?
রাখাল চোখ বন্ধ করে ফেলল। বুকের মধ্যে থেকে বাবা কথা বলে উঠল, ‘খোকা, এগিয়ে যা, তোর সঙ্গে সঙ্গে আমরাও এগিয়ে যাব, তুই থামিস না খোকা, থামিস না...
রাখাল এখন আর চোখ খুলতে পারল না। তার দুই চোখে যেন কান্নার বান আসছে।
.
[কাহিনিটিকে বাস্তবানুগ করার তাগিদে কিছু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির নাম করা হয়েছে, যেগুলি বাস্তব। এ ছাড়া সবই কাল্পনিক।]
.
আনন্দমেলা, পূজাবার্ষিকী ১৪০০
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন