দুলেন্দ্র ভৌমিক

সাতসকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে নইয়াচকে এসে পৌঁছতে বিকেল ফুরিয়ে গেল। বাক্স-প্যাঁটরা বেঁধে বাড়ি থেকে বেরোবার আগে বোঝেনি পৌঁছতে এত হ্যাপা। বিজন ভেবেছিল, ট্রেন থেকে নইয়াচকে যাওয়ার বাস পাওয়া যাবে, কিন্তু গেল না। একটা বাস গুমটি অবশ্য আছে, কিন্তু সেই গুমটি সারা গায়ে নানা পোস্টার নিয়ে রাস্তার পাশে কাত হয়ে দাঁড়িয়ে। ওটাকে ঠিক দাঁড়ানো বলে না। দেখে মনে হয়, জোরে বাতাস দিলে অথবা কোনও বাচ্চা ছেলে একটু ধাক্কা দিলেই মাটিতে কাত হয়ে পড়বে। চারপাশে ছড়ানো-ছিটোনো কয়েকটা দোকান। রাস্তার ধার ঘেঁষে বসা একটা দোকানে তেলেভাজা কেনার জন্য খানকয়েক ছোট ছোট ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে। দোকানের পাশে বাঁশের বেঞ্চ। তার ওপর লুঙ্গি আর পাজামা পরে জনাচারেক লোক। শালপাতার ঠোঙা হাতে নিয়ে তেলেভাজা খাচ্ছে। বিজন একটু এগিয়ে গেল। হাত তো মোটে দুটো, কিন্তু সুটকেস আর বিছানার দুটো বোঝা দু’ হাতে বইতে বেশ কষ্ট হচ্ছে।
লোহার কড়াইয়ে তখন ফুলুরি ভাজা চলছে। ওই ভাজাভুজির গন্ধে নিজের খিদেটা বেড়ে উঠল। ট্রেনে এক টাকার ঝালমুড়ি খেয়েছিল। সে অনেকক্ষণ হয়ে গেল। বিজন এসে বাঁশের বেঞ্চিটার পাশে দাঁড়াল। হাতের জিনিস দুটো মাটিতে রাখতেই বাঁশের বেঞ্চিতে বসা লোক চারজন ঠাসাঠাসি করে বসে বিজনকে জায়গা দিল। বিজন বসল না। ওই লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘নইয়াচকে যাওয়ার বাস কখন আসবে?
তেলেভাজা খাওয়া থামিয়ে লোকগুলো বিজনকে দেখছিল। এবার বিজনের প্রশ্ন শুনে একজন উত্তর দিল, ‘বাস আর আসবিনে। পঞ্চায়েত ভোটের আগে ছ্যাল। তারপর উঠে গেছে।'
বিজন অবাক গলায় বলল, ‘উঠে গেল?’
অন্য একজন বলল, ‘একেবারে উঠে গেছে তেমন কথা কইতে পারিনে। লোক পরম্পরায় শুনলুম বিরিজের কাজ হচ্ছে। রাস্তার মেরামতি চইলছে। এসব ঠিকঠাক হলে আবার বাস চলতি পারে।'
ওই চারজনের মধ্যে যার বয়স অপেক্ষাকৃত কম বলে মনে হচ্ছে সে এবার উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘দাঁইড়ে ক্যান, বসেন। তা আপনি যাবিন কোথায়?’
বিজন এবার বসতে বসতে উত্তর দিল, ‘নইয়াচক পোস্ট অফিসে '
ওই চারজনের ভেতর থেকে একজন বলল, ‘সে তো বাবু এট্টুখানি পথ নয়। আপনি বরং ভ্যানে চলি যান।'
বিজন বলল, ‘এখানে ভ্যান পাওয়া যায়?’

উঠে দাঁড়ানো লোকটি ডালবড়া খেতে খেতে বলল, ‘এখানে তো ভ্যানই ফ্যান-ফ্যান করে ঘুরে বেড়ায়।'
বিজন এদিক-ওদিক তাকিয়ে কোনও ভ্যানগাড়ি দেখতে পেল না। আবার লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ভ্যান কোথায় পাওয়া যায়?’
এবার একজন বয়স্ক লোক ফুলুরির সঙ্গে এক খাবলা মুড়ি মুখে দিয়ে চিবোতে চিবোতে বলল, ‘এট্টুখানি সবুর করুন। সবে তো কোলকেতে থেকে টেরেন এল। প্যাসেঞ্জার নিয়ে বেইরে গেছে। এট্টু পরে ঘুরে আসবে।'
অন্য একজন প্রশ্ন করল, ‘বাবুর কি
বিজন মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ‘হ্যাঁ।'
কোলকেতে থেকে আসা হচ্ছে?’
অন্য আরেকজন জিজ্ঞেস করল, ‘কোলকেতেতেই থাকা হয়?’
বিজন এবারও মাথা নাড়তে নাড়তে উত্তর দিল, 'হ্যাঁ।'
বিজন বুঝতে পারছে কলকাতার লোক বলে তাকে নিয়ে ওদের বেশ কৌতূহল হচ্ছে। এরকম যে হয় সেটা বিজনের জানা ছিল না। এখানকার লোক কি কখনও কলকাতায় যায়নি, না কি কলকাতা দেখেনি। শিয়ালদা স্টেশন থেকে লোকাল ট্রেনে চারঘণ্টার পথ। যদিও আজ তার ট্রেন একঘণ্টার মতো দেরিতে এসেছে।
তেলেভাজা ভাজতে ভাজতেই দোকানদার ওদের কথা শুনছিল। এবার শালপাতায় দুটো ডালবড়া মুড়ে বিজনের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘নেন, আমার হাতের ডালবড়া খান। খেতে খেতে ভ্যান এসে যাবে।'
বিজনের খিদে পেয়েছিল ঠিকই, তবু নিতে ইতস্তত করছিল। অন্যরা বিজনকে বলল, ‘ন্যান না কেনে। কেষ্টা সাধ করে খাওয়াচ্ছে। এমন ডালবড়া কোলকেতেতে পাবেন না। ডালে-তেলে ভেজাল নেই।'
বিজন বুঝল, দোকানির নাম কৃষ্ণ। লোকে কেষ্ট বা কেষ্টা বলে ডাকে। হাত বাড়িয়ে ডালবড়া নেওয়ার সময় সেই কেষ্ট বলল, ‘একই সঙ্গে দু’গাল মুড়ি দিই। বিজন হাত নেড়ে বলল, ‘না। ওসবের দরকার নেই।'
ডালবড়া খেতে খেতে ওদের সঙ্গে দিব্যি গল্প জমে গেল। গল্প জমে গেলেও গল্পের দিকে বিজনের খুব একটা মন নেই। বিকেল তো ফুরিয়ে যাচ্ছে। চারপাশে ছায়া ছায়া অন্ধকার ঘন হতে শুরু করেছে। নতুন জায়গায় এসে দিনে দিনেই পৌঁছনোই ভাল। ডালবড়া শেষ করে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর একজন বলল, 'হরন মারছে। তার মানে ভ্যান এবার এসে যাবে।'
বিজন এতক্ষণ মোটরভ্যানের কথা ভাবছিল। কিন্তু এখন পরপর যে দুটো বস্তু এসে দাঁড়াল তা হল সাইকেল রিকশাভ্যান। কলকাতায় জিনিসপত্র নেওয়ার জন্য এই ভ্যান ব্যবহার হয়। এতে করে কি মানুষও যায়? নিশ্চয়ই যায়। বনগাঁর দিকে একবার পিকনিক করতে গিয়ে এইরকম ভ্যানে মানুষ যাতায়াত করতে দেখেছে।
বিজনকে ডাকতে হল না। যাদের সঙ্গে এতক্ষণ গল্প করছিল তাদেরই একজন ডাকল, ‘এই মেধো, ইদিক পানে আয়।'
সাইকেল রিকশাভ্যানের সিট থেকে নেমে মেধো এল দোকানের সামনে। গলায় গামছা জড়ানো। সেই গামছায় হাত মুছতে মুছতে বলল, ‘কেষ্টাদা, দুটো গরমাগরম ফুলুরি চমকাও। বড্ড খিদে পেয়েছে।'
বাঁশের বেঞ্চে বসা লোকদের একজন বলল, ‘মেধো, ইনি কোলকেতে থেকে এয়েচেন। যাবেন নইয়াচকের পোস্ট অফিসে। তুই পৌঁছে দেব’
বিজন বলল, ‘যাবেন ভাই, আমার একটু তাড়া আছে।'
মেধো হাত বাড়িয়ে ফুলুরি নিতে নিতে বলল, ‘আগে পেটের খোলে ফুলুরি দুটো চালান করি। আপনাকে একা নিয়ে গেলে তো আমার পোষাবে না। আরও প্যাসেঞ্জার আসতে দিন।'
বিজন বুঝল এখানকার ভ্যানগুলো কলকাতার অটোর মতো। পেটের খোল বোঝাই না হলে গাড়ি ছাড়ে না। কিন্তু এখন তো সন্ধ্যা নামার সময়। এইসব অঞ্চলে এখন কি প্যাসেঞ্জার পাওয়া যাবে!
মেধো পরম আনন্দে ফুলুরি খেয়ে যাচ্ছে। খাওয়ার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে ছুটির দিনে নিশ্চিন্তে বসে কইমাছের চচ্চড়ি খাচ্ছে। ফুলুরি শেষ করেই মেধো শালপাতাসুদ্ধু হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘কেষ্টাদা, দুটো ডালবড়ি চমকাও।'
বিজন কেষ্টদার কড়াইয়ের দিকে তাকাল। গরম তেলে আলুর চপ ছাড়া হচ্ছে। মেধো কি ডালবড়ার পর চপও খাবে! ওর খাওয়া-খাওয়ি শেষ হবে কখন? মনে মনে অধৈর্য হলেও আপাতত আর কিছু করার নেই। বিজন অন্য ভ্যানটার দিকে তাকাল। লোকটা নিজের ভ্যানের ওপর বসে পা দুলিয়ে দুলিয়ে বিড়ি খাচ্ছে। বিজন হাতের ইশারায় তাকে ডাকল। লোকটার মাথায় পাগড়ির মতো করে গামছা বাঁধা। লাফ দিয়ে ভ্যান থেকে নামল। দপদপিয়ে এগিয়ে এসে প্রথমেই সুটকেস আর হোল্ডঅলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যাবেন কোথা?’
বিজনকে উত্তর দিতে হল না। ডালবড়া খেতে খেতে মেধো বলল, ‘তোর উলটো লাইন। নইয়াচক।'
ওই ভ্যানচালক বলল, ‘আমি যাব শসাপাড়া। আমি ওদিক পানে যাই না।'
মেধোর সময়জ্ঞান ভারী অদ্ভুত। ডালবড়া শেষ হওয়ার আগেই পিলপিল করে অনেক লোক এসে গেল। মেধো বলল, 'স্যার, জিনিসের আলাদা ভাড়া লাগবে।' বিজন বলল, ‘কত?’
মেধো উত্তর দিল, ‘আপনার যা ভাড়া, জিনিসেরও তাই। আপনার ছ'টাকা, দুটো জিনিসের জন্য বারো টাকা।’
কথা শেষ করেই বিজনের জিনিসদুটো তড়িঘড়ি নিজেই ভ্যানে তুলে দিয়ে হাঁকতে লাগল, ‘মানিকচক, জোড়াচক, নইয়াচক৷’
অন্য ভ্যানরা হাঁকছে, ‘লঙ্কাপাড়া, আলুমোড়, ঝিঙেডাঙা, পটলডাঙা, শসাপাড়া।'
বিজন মনে মনে ভাবল, একদিকে খালি চক। চকে চকে চকাচকি। অন্যদিকটা পুরো ভেজিটেরিয়ান। ওখানে লঙ্কা, আলু, ঝিঙে আর পটল। আহা রে, ওখানে যদি একটা পোস্তপাড়া থাকত তাহলে আর ভাবনা ছিল না।
সিমেধো বিজমকে বলল, ‘বড় হাটের প্যাসেঞ্জার আসছে। তাড়াতাড়ি গিয়ে নিজের জায়গা নিন।
বিজনকে ভ্যানের ওপর তুলে দিল মেধো। জিনসের ফুলপ্যান্ট পরে পা গুটিয়ে বসতে অসুবিধা হয়। বিজন মেধোকে বলল, ‘প্যান্ট পরে তো এভাবে বসা যায় না। কী করি বলুন মেধো বলল, নইয়াচকের পোস্ট অফিস হচ্ছে আমার শেষ স্টপ। আমি নইয়াচকের সদর হাট পর্যন্ত যাই। সেরেফ আপনার জন্যে তিন মিনিট পথ বেশি যাব। মানে ওই ডাকঘর পর্যন্ত। আপনিই লাস্ট খদ্দের। আমার সিটের পেছনে বসে দু'দিকে পা ঝুলিয়ে দিন। তাড়াতাড়ি করুন!'
যেমন দেশের যেমন ধারা। বিজন তাই করল। নিজের জিনিসগুলো রাখল ডানদিকে আর বাঁদিকে। হাট-ফেরতা লোকজন পিলপিল করে সাইকেল রিকশাভ্যানে উঠছে। এই মুহূর্তে যত লোকের ভিড় তারা কি সবাই এই ভ্যানে উঠবে। কেননা, মেধো জোর গলায় চেঁচাচ্ছে, ‘লাস্ট এক্সপ্রেস।’ ততক্ষণে আরও তিনটে সাইকেল রিকশাভ্যান এসে গেছে।
পী বিজন দেখল তাদের ভ্যানে শুধু মানুষই উঠছে না। হাট থেকে কেনা একটি কৃষ্ণবর্ণের পাঁঠাত ভ্যানে উঠল এবং প্যাঠাটি ব্যা ব্যা করতে করতে তারই পেছনে এসে দাঁড়াল। বিজন মুখ ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। একটা সাইকেল রিকশাভ্যানের কতটা আয়তন সেটা সে আগে কখনও ভেবে দেখেনি। কিন্তু সাইকেল রিকশাভ্যানের এখন যা অবস্থা তাতে মনে হল, একটা ম্যাটাডোরেও বুঝি এত লোকের জায়গা হয় না। কিন্তু ঠেসে-ঠুসে একটি পাঁঠাসমেত সবারই যে কেমন করে জায়গা হল সেটা গভীর গবেষণার বিষয়। এখানে বসেই মেধোর মুখ থেকে জানা গেল এখানকার প্রত্যেকটা সাইকেল রিকশাভ্যানের নাকি একটা করে নাম আছে। চালকের সামনে ছোট্ট টিনের প্লেটে সেটা লেখা থাকে। কোনওটার নাম ‘তুফান মেল', কোনওটার নাম ‘পঞ্জাব মেল’, কোনওটা বা ‘হিমগিরি এক্সপ্রেস। বিজন এসব শুনে মেধোকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি যেটাতে উঠে বসে আছি তার নাম কী?’
মেধো গলার গামছা ভাল করে গলায় জড়িয়ে নিয়ে উত্তর দিল, ‘রাজধানী এক্সপ্রেস।’ বাঁশের বেঞ্চিতে বসে যারা তেলেভাজা খাচ্ছিল এবং যাদের সঙ্গে বিজনের আলাপ হয়েছে তারা সাইকেল রিকশাভ্যানটার দিকে এগিয়ে এসে মেধোকে বলল, ‘কলকেতের বাবুকে পোস্ট আপিসে পৌঁছে দিস।'
সাইকেল রিকশাভ্যান ছাড়ার আগে ওই চারজন বিজনের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল। লোকগুলোকে বিজনের খুব ভাল লেগেছে। কোলকেতের লোক বলে কেষ্টদা দুটো ডালবড়া তাকে বিনে পয়সায় খাইয়ে দিয়েছে। কিছুতেই পয়সা নেয়নি। কলকাতার লোকের এত সম্মান এটা 'বিজন আগে কখনও টের পায়নি।
টা সাইকেল রিকশাভ্যান চলতে শুরু করল। সিকি কিলোমিটার আসার পর বোঝা গেল, এই ভ্যান রাজধানীর ঠাকুরদা। ভ্যান রাস্তার গর্তে পড়ে লাফায়। আর কারও না কারও জিনিস-ছিটকে রাস্তায়প্পড়ে। ভ্যানকে দাঁড়াতে হয়। বিজন সেই থেকে পা ঝুলিয়ে বসে। পা দুটো এবারটনটন করছে কিন্তু ওঠাবার উপায় নেই। উঠিয়ে রাখবে কোথায়? যদি হাঁটুর নীচ থেকে পা দুটো খুলে নেওয়ার কোনও উপায় জানা থাকত তাহলে ওই পা দুটো দিব্যি নিজের কোলে রাখতে পারত বিজন। কিন্তু বিজনের তখনও জানা ছিল যে, এর থেকেও বড় বিপদ তার জন্যে অপেক্ষা করছে।
কিছুটা পথ আসার পর মেধোর রাজধানী এক্সপ্রেস দাঁড়াল। বিজন ভাবল, যাক, এই টইটম্বুর রাজধানী এক্সপ্রেস থেকে এবার হয়তো দু’-তিনজন নামবে। কিন্তু নামা তো দূরের কথা উলটে উঠে পড়ল দু’জন। ওরা যে কেমন করে উঠল, কোথায় বসল, কেমন করে বসল সেটা বিজন বুঝতে পারল না। তার কেবল মনে হল, একটি পাঁঠা, দুটি মুরগি সহ যত লোক এই রিকশাভ্যানে সওয়ারি হয়েছে তাদের একটা ছবি তুলে পাঠালে বিদেশের কাগজে নির্ঘাত ছাপা হত। সেই সুবাদে ওয়ার্ল্ড গিনেসবুকেও নাম ছাপা হয়ে যেত।
রাজধানী এক্সপ্রেস থামিয়ে দিয়ে মেধো নিজের সিট থেকে নেমে গিয়েছিল। কোথায় গিয়েছিল সেটা বিজন জানে না। এই জায়গাটায় পরপর অনেক দোকান। বিজন একজনকে জিজ্ঞেস করল, ‘এই জায়গাটার নাম কী?
প্যাসেঞ্জারদের ভেতর থেকে একজন বলল, ‘হেলা বটতলা।'
বিজন মনে মনে ভাবল, এই দেশের কত বটগাছ হেলে আছে। কলকাতার বাগুইহাটি থেকে পুবদিকে গেলে একটা পরগনার জায়গার নাম হেলা বটতলা। বাঁকুড়া, মেদিনীপুর, উত্তর চব্বিশ পরগনার বিভিন্ন জায়গায় বোধহয় বটবৃক্ষ হেলে আছে। এরকমই হয়। গ্রামগঞ্জের কত বিচিত্র নাম। যেমন, ‘রাজাভাতখাওয়া’, ‘বাছুর ডোবা’, ‘দেতো', ‘ঘোমটাপুকুর’, ‘দেগঙ্গা’, আরও কিছু নাম মনে আসছিল কিন্তু ভাবনাটা থেমে গেল। মেধো একটা দোকান থেকে বেরিয়ে নিজের গাড়ির কাছে এসে বলল, 'স্যার আপনি কোলকেতের লোক। কিন্তু তাই বলে ভাববেন না, আমরাও কিছু কম। আমার গাড়িতেও গানের ব্যবস্থা আছে।'
বিজন এবার বিষম ঘাবড়ে গেল। সাইকেল রিকশাভ্যানে টেপ রেকর্ডারের কথা সে আগে কখনও শোনেনি। এ যেন পলতা পাতা কিনে ক্যাশমেমো চাওয়ার মতো ব্যাপার। মেধোর হাতে একটা বাজারের থলে। তার থেকে সওয়া বিঘত সাইজের একটা টেপ রেকর্ডার বার করে একবার নিজে দেখল। তারপর টেপ রেকর্ডারের সঙ্গে লাগানো চামড়ার লম্বা ফিতেটা গলা পরে রেকর্ডারটা নিজের পিঠের ওপর ঝুলিয়ে দিল। তার থেকে তখন গান বেরোচ্ছে, ‘বেদের মেয়ে জোস্না আমায় কথা দিয়েছে...'
মেধোর রাজধানী এক্সপ্রেসের প্যাসেঞ্জাররা আনন্দে ডগমগ হয়ে উঠল। বিজনের তখন অন্য বিপদ শুরু হয়ে গেছে। এই সাইকেল রিকশাভ্যানে ওঠার খানিক পরে সে অবগত হয়েছিল, যে পাঁঠাটি তারই সহযাত্রী সেটি বড় হাট থেকে কেনা। এই অঞ্চলে বড় হাট মানে কলকাতার বড়বাজার। এটি আগামী কোনও দিনে কালীপুজো উপলক্ষে বলি দেওয়া হবে। তার মানে বলির পাঁঠা। এটা মানতের পুজো। যারা কিনেছিল তারা কেনার সময় ওই হাট থেকে খানপাচেক কাঁঠালপাতাও কিনেছিল অথবা কোনও জায়গা থেকে সংগ্রহ করেছিল। কিন্তু কিছুটা পথ আসার পরই কাঁঠালপাতা ফুরিয়ে গেল। পাঁঠার খিদে বোধহয় মেটেনি। একদিকে মেধোর টেপ রেকর্ডারে তখন গান হচ্ছে ‘ওরে তারা তুই দিলি ধরা’... আর ক্ষুধাতুর পাঁঠা কাঁঠালপাতার জন্য বিজনের জামার কলার, কান এবং চুল টেনে এবং চিবিয়ে যাচ্ছে। থেকে থেকে তার শিশু শিং দিয়ে বিজনের পিঠে আর ঘাড়ে গুঁতিয়ে চলেছে। যখন ব্যাপারটা সহ্যাতীত হয়ে উঠল তখন বিজন বাধ্য হয়ে মেধোকে বলল, 'ভাই মেধো, এই পাঁঠার স্টপেজ কোথায়? মানে কোথায় নামবে?’
মেধোর টেপ রেকর্ডার গমগম করে বেজে চলেছে। বিজনের কথা ওর কানে গেল কিনা
সেটা বিজন নিজেই বুঝতে পারল না। মেধো মুখ ঘুরিয়ে বলল, 'স্যার, কিছু বলছেন?’ বিজন ঘাড় উঁচু করে মেধোকে বলল, ‘এই পাঁঠা নামবে কোথায়?’ মেধো বলল, ‘তারানগর, পাঁঠা নামার তিন মিনিট পরেই আপনাকে নামতে হবে।'
বিজন মনে মনে বলল, ততক্ষণে বোধহয় পাঁঠাটা আমার কান খেয়ে ফেলবে। হোল্ডঅলের দড়ি তো চিবিয়ে চিবিয়ে ভিজিয়ে দিয়েছে। নইয়াচক পোস্ট অফিস পর্যন্ত আমি অখণ্ড থাকব কিনা সেটাই বা কে জানে! পাঁঠাটি বয়সে শিশু হলেও তার শিঙের জোর তুচ্ছ করার নয়। এরকম একটা জায়গায় পোস্ট অফিসে চাকরি করতে আসার মানেই হয় না।
ওই গাদাগাদি ভিড় তারই মধ্যে একাধিক পুরুষ বিড়ি খেয়ে যাচ্ছে। বিড়ির গন্ধে বিজনের খুব অস্বস্তি হয়। কিন্তু কী করা যাবে। যেমন দেশের যেমন ধারা তাকে তো মানতেই হবে। ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ একজন বলে উঠল, ‘পাইলট, রূপবানের গান দাও দিনি।'
মেধো বলল, ‘দাঁড়াও। ওটা পরের স্টপেজে গিয়ে হবে।'
বিজনের মনে হল, বেশি টাকা দিয়েও যদি সে একা আসত তাহলে এই যন্ত্রণা তাকে ভোগ করতে হত না। মেধোর টেপ যেন বিরামহীন। পিঠের দিক থেকে টেপ ঘুরিয়ে ক্যাসেট বদলে দিয়েছে। সেই ক্যাসেটে এক মহিলাকণ্ঠ গেয়ে চলেছে, ‘বারো দিনের স্বামী...’
গান শেষ হওয়ার আগেই মেধোর রাজধানী এক্সপ্রেস থামল। তিনজন নামল বটে, কিন্তু পাঁঠার স্থান বদল হল না। সে আপাতত বিজনের কাঁধে মুখ রেখে ফোঁস ফোঁস করে বিজনের গালে গরম নিশ্বাস ছেড়ে যাচ্ছে।
মেধোর রাজধানী এক্সপ্রেসের যাত্রা এক সময় থামল। শিশু পাঁঠাটি আর বিশেষ কিছু করেনি। কিন্তু রিকশাভ্যান থেকে হোল্ডঅলটা নামাবার সময় বুঝল ওর ওপরটা বেশ ভিজে ভিজে। কিন্তু তখন অত ভাববার সময় কোথায়। সামনেই পোস্ট অফিস। বারান্দায় টর্চ হাতে সুখময়বাবু দাঁড়িয়ে। বিজনকে দেখে এগিয়ে আসতে আসতে বললেন, ‘আশা করি আপনারই নাম বিজন বসু। আমি পোস্টমাস্টার সুখময় দত্ত। আপনার জন্যই অপেক্ষা করছি।'
বিজন তার জিনিসপত্র পোস্ট অফিসের বারান্দায় নামিয়ে রাখার পর সুখময়বাবু হাঁক দিলেন, ‘ভণ্ডুল, অ্যাই ভণ্ডুল।'
পোস্ট অফিসের চারপাশে তখন বেশ অন্ধকার। ওই অন্ধকারের ভেতর থেকেই গভীর কৃষ্ণবর্ণের একটি ছেলে বেরিয়ে এসে বলল, ‘অত হাঁক পাড়ছেন কেনে। নিকটেই তো ছিলাম।'
সুখময়বাবু বারান্দার ওপর রাখা বিজনের জিনিসগুলো দেখিয়ে বললেন, ‘এগুলি নিয়ে আমার বাড়িতে রাখ। আমরা আসছি। সাবধানে যাস।'
ভণ্ডুল জিনিসগুলো তুলতে তুলতে বলল, ‘আমারে সাবধান করতে হবে না। আপনারা সাবধানে এসুন। পথে-ঘাটে তেনারা গা-গতরে বেরিয়েছেন। গায়ে পা পড়লেই ফোঁস।
সুখময়বাবু টর্চ জ্বালালেন। বিজন ভয় পাওয়া চোখে সুখময়বাবুর দিকে তাকাতেই সুখময় ভয়ের কারণটা বুঝতে পেরে বললেন, ‘ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ভণ্ডুল একটু বাড়িয়ে বলে। আলো দেখলে সরে গিয়ে পথ দেয়। আপনি আসুন আমার সঙ্গে।'
বিজন একটা ঢোক গিলল। তারপর সুখময়বাবুর পেছন পেছন হাঁটতে লাগল। এই রাস্তাটা বেশি চওড়া নয়। হাত মাপলে আড়াই-তিন হাত হবে। কোনও একসময় এই রাস্তায় বোধহয় ইটের খোয়া ফেলা হয়েছিল। এখন সেসব নেই। থেকে থেকে ইটের টুকরোগুলো মাটির ওপর মাথা জাগিয়ে আছে। রাস্তার দু'পাশে জঙ্গল। পথের ওপর শুকনো পাতা। জঙ্গলের মধ্যে কিছু শব্দ হলেই বিজন চমকে উঠছে। সুখময়বাবু যাচ্ছেন আগে আগে। যেতে যেতে বললেন, ‘রাস্তার হালটা তেমন ভাল নয়। গোরুর গাড়ি গিয়ে গিয়ে আরও খারাপ হয়েছে। তবে প্রথমে অসুবিধা হলেও পরে সয়ে যাবে।'
পোস্ট অফিস থেকে সুখময়বাবুর বাড়ি কাছেই। মিনিট তিনেক হাঁটার পরই বাড়ি আসা গেল। বারান্দায় একটা হ্যারিকেন জ্বলছিল। বারান্দায় ওঠার সিঁড়িতে পা দিয়ে সুখময়বাবু বললেন, ‘কই গো, তোমরা সব কোথায়?’
দরজা খুলে প্রথমে ভণ্ডুলই বেরোল। তার পেছনে মাথায় ঘোমটা দেওয়া এক মহিলা। বিজন অনুমানে বুঝল ইনিই বোধহয় সুখময়বাবুর স্ত্রী। ঘরের মধ্যে হ্যারিকেন জ্বলছিল। ভণ্ডুল এবার বারান্দার হ্যারিকেনটাও নিয়ে এল। সুখময়বাবু পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘কই গো, এই ইনি, ইনি হচ্ছেন বিজন বাসু। পোস্ট অফিসের চার্জ ইনিই নেবেন। আমার এবার থেকে ছুটি।'
বিজন বলল, ‘ছুটি কেন হবে! আপনি তো বদলি হচ্ছেন।'
সুখময়বাবু বললেন, ‘ওই একই হল। আর তো মোটে তিন বছর চাকরি। সরকারের কাছে আবেদন করেছিলুম শেষ তিনটে বছর হোম স্টেশনে দিন। তা সে আবেদন রেখেছেন।' বিজন জিজ্ঞেস করল, ‘এখান থেকে আপনি আড়িয়াদহে যাবেন?’
সুখময়বাবু বললেন, ‘না, না, ওটা আমার হ্রোম নয়। ওখানে কয়েক বছর ভাড়া ছিলুম। চাকদাতে জমি কিনে বাড়ি করেছি। ওখানেই যাব।'
সুখময়বাবুর স্ত্রী মাথার ঘোমটা আরও টেনে দিয়ে বললেন, 'তোমরা কি দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে গল্প করবে। উনি এতটা পথ এলেন। একটু জিরোতে দাও। আমার জলখাবার তৈরি হয়ে আছে।'
খাবারের নাম শুনে বিজনের পেটের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠল। খিদের সঙ্গে সঙ্গে বোঝা গেল গায়ে-গতরে বেশ ব্যথা। মেধোর রাজধানী এক্সপ্রেস সারা রাস্তা যেভাবে নাচাতে নাচাতে এসেছে তাতে শরীরের দু’-চারটে পার্টস যদি খুলে গিয়েও থাকে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এতটা পথ পা ঝুলিয়ে বসার ফলে পায়ের পাতা ফুলে গেছে। পা থেকে জুতো আর খুলতে চায় না। ভণ্ডুল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিজনের জুতো খোলার চেষ্টা দেখতে দেখতে ফিক করে হেসে ফেলে বলল, ‘আপনি ভুল করে অন্যের জুতো পরে আসেননি তো?’
বিজন জুতোর ফিতে খুলে গোড়ালি পর্যন্ত বার করে টানাটানি করছিল। বেশি জোরে টানলে পায়ের পাতা টনটনিয়ে ওঠে। সেই টনটনানি পৌঁছে যায় মাথা অবধি। ভণ্ডুলের কথায় বিজন বলল, ‘না ভাই, ব্যাপারটা হয়েছে কী জানো, এতটা পথ পা ঝুলিয়ে বসেছিলুম। পায়ের পাতা ফুলে গিয়ে জুতোজোড়া একেবারে পা কামড়ে ধরেছে। খুলতে কষ্ট হচ্ছে।'
ভণ্ডুল বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়তে নাড়তে এগিয়ে এসে বলল, ‘এরও পিতিকার আছে। তবে কিনা ডাক্তার-বদ্যি ডাকতে হবে না। টোটকা ঝাড়তে হবে।'
বিজন মনে মনে ভাবল, ‘পায়ের জুতো খোলার জন্য এ গাঁয়ে ডাক্তার-বদ্যি ডাকার রেওয়াজ আছে নাকি? কিন্তু মনে মনে যা ভাবল সেটা মুখে বলল না। মুখে বলল, ‘টোটকাটা কেমন?’
ভণ্ডুল ঘরের ওপরের দিকে তাকাল। তারপর চোখ নামিয়ে এনে বলল, ‘এতক্ষণ পা ঝুইলে থাকার জন্যি শরীরের রস-রক্ত গিয়ে পায়ের পাতায় জমা বেঁধেছে। তাই এবার উইলটে দিতে হবে। তালেই শরীর ঠিক হয়ে যাবে।'
বিজন প্রশ্ন করল, ‘সেটা কেমন করে হবে?’
ভণ্ডুল যেন পাশকরা ডাক্তার। তেমন ভঙ্গিতে বলল, ‘হওয়ালেই হবে। বারান্দায় গিয়ে আধঘণ্টাটাক উলটে হয়ে ঝুইলে থাকুন। ওপরে পা দিয়ে মাথা নীচে। রস-রক্ত ক্রেমে ক্রেমে পা থেকে নেইমে আসবে।'
বিজন ভণ্ডুলের দিকে তাকাল। চোখের দৃষ্টিতে বিরক্তি এবং রাগ দুটোই ছিল। ভণ্ডুল সেটা বুঝতে পেরে বলল, ‘আগেই বুঝেছিলুম, আপনি কথাডা বিশ্বেস করবেন না। উলটে রাগ করবেন। তাই তো করলেন।'
বিজন আর কোনও কথা বলল না। ভণ্ডুল এসে বসল বিজনের পায়ের কাছে। বলল, ‘আপনি হাত সরান। আমি টেরাই করি।'
বিজন বলল, ‘আমি আমার জুতো খুলতে পারছি না, তুমি পারবে কেমন করে?’ ভণ্ডুল বলল, ‘শহরের লোকদের ওই এক দোষ। মোটে কথা শোনে না। আমি কাটা পাঁঠার ছাল ছাড়াতে পারি আর পায়ের জুতো ছাড়াতে পারব না। হাত সরান।'
বিজনকে আর কোনও কথা বলবার সুযোগ না দিয়ে খাবলা মেরে দু’হাতে জুতো ধরে এমন মোক্ষম টান দিল যে, জুতোর সঙ্গে মোজাও খুলে এল। অন্য পায়ের জুতো খোলার পর বিজনের মনে আর কোনও সন্দেহই রইল না যে, ভণ্ডুল পাঁঠার ছাল ছাড়াতে পারে।
হাত-মুখ ধুয়ে জলখাবার খেতে বসার সময় সুখময়বাবু বললেন, ‘আপনাকে একটা কথা বলার আছে। এখানকার কাজকর্ম বুঝে যেতে আপনার চার-পাঁচদিন লাগবে। আমি চলে যাব দিন দশেক পর। তা এই ক'টা দিনের জন্য সরকার তো আপনাকে আলাদা বাড়ি দেবেন না। দিন দশেক আপনি আমার এই বসবার ঘরেই থেকে যেতে পারেন। পরে তো গোটাটাই আপনার। যদি এতে আপনার অসুবিধা হয়, তার জন্য একটা বিকল্প ব্যবস্থাও করে রেখেছি। যেটা আপনার পছন্দ।'
লুচি দিয়ে বোঁদে খেতে খেতে বিজন বলল, ‘বিকল্প ব্যবস্থাটা কেমন?’
সুখময়বাবু বললেন, ‘একটু এগিয়ে গেলেই মহাকালী সংঘ। ওদেরও পাকা বাড়ি। ইচ্ছে করলে দশটা রাত ওখানে কাটাতে পারেন।'
বিজন মনে মনে কিছু একটা ভাবছিল। ক্লাবঘরে রাত কাটানোটা কেমন হবে? ক্লাবটাই বা কেমন! রিজন বলল, ‘কাল একবার ক্লাবঘরটা দেখব। দেখার পর ভাবা যাবে।' এইসময় সুখময়বাবুর স্ত্রী ঘরে এলেন। দরজার পাশ থেকে বোধহয় সব শুনেছেন। তাই বললেন, ‘মোটে তো দশটা দিন। আপনি এখানেই থেকে যান। ক্লাবঘরে কষ্ট হবে।'
বিজন মুখ তুলে একবার সুখময়বাবুর স্ত্রীর দিকে তাকাল। তারপর একটু হেসে বলল, ‘দেখি কী করা যায়।'
মহাকালী সংঘে থাকা হল না। বিজন ভেবে দেখল ক্লাবঘরে থাকার চেয়ে সুখময়বাবুর বসবার ঘরে থাকা ভাল। ক্লাবঘরের দিক থেকে ফিরে আসার পর ভণ্ডুল বলল, ‘কেলাবে তো এখন যাত্রাপালার মহলা চলে। চারটে থেকে রাত আটটা পর্যন্ত। কোনও কোনওদিন সন্ধে থেকে রাত ন'টা। ওই টাইম পর্যন্ত কোনও বিশ্রাম নেই।'
বিজন পোস্ট অফিসেই আসছিল। গতরাত থেকে ভণ্ডুলই তার সঙ্গী। ছেলেটা সবসময় বকর বকর করে বটে কিন্তু বেশ কাজের। গতরাত্রে এই ভণ্ডুলই নীচে বিছানা করে তার ঘরে শুয়েছিল। বালিশে মাথা দেওয়ার পাঁচ-সাত মিনিট পর থেকেই এমন নাক ডাকতে শুরু করেছিল যে, বিজনের মনে হয়েছিল ঘরের মধ্যে কেউ যেন ক্রমাগত মোটর সাইকেল স্টার্ট দিয়ে চলেছে। শরীর বেজায় ক্লান্ত ছিল বলে, ওই শব্দদূষণের মধ্যেও কোনও সময় সে ঘুমিয়ে পড়তে পেরেছিল। ভণ্ডুলের সঙ্গে হেঁটে আসতে আসতে বিজন বলল, ‘এবার কী পালা হবে?’
ভণ্ডুল জবাব দিল, ‘রাজার মা দাসী।'
বিজন বলল, 'তুমি যে বললে তোমাকে মহলাতে যেতে হয়। কেন যেতে হয়? তুমি কি অভিনয় করো নাকি?
ভণ্ডুল এবার বেশ গর্বের সঙ্গে উত্তর দিল, ‘আপনি আমাকে কী ভাবেন বলেন তো! আমি তো ফি-বছর অ্যাকটো করি। গাঁয়ে আমার নাম আছে। কথাডা বললাম, এবার খোঁজ নিয়ে দেখবেন।'
বিজন বলল, ‘তুমি রেগে যাচ্ছ কেন? আমি জানি না বলেই তো জানতে চাইলাম। ওই কী যেন নাম বললে, ‘রাজার মা দাসী’- তা সেই পালায় তোমার কী পার্ট?’ - ভণ্ডুল উত্তর দিল, ‘রাজার মামা।’
পোস্ট অফিসে এসে খানিকক্ষণ কাজ করার পর বিজন সুখময়বাবুকে জিজ্ঞেস করল, ‘নইয়াচকের গ্রামগুলোর তো ভারী অদ্ভুত নাম!'
সুখময়বাবু বললেন, ‘কিকরোখালি, গরানকাঠি, গোটাগোড়, মোষমারি এসব ছোট ছোট অঞ্চল। কিন্তু পাড়ার নামগুলো আরও অদ্ভুত।'
বিজন বলল, ‘সেগুলো কেমন নাম?’
সুখময়বাবু বললেন, ‘ডাকাতপাড়া, চোরপাড়া, ভূতপাড়া, শেয়ালপাড়া এরকম বিস্তর নাম। এখানেই তো থাকবেন। আস্তে আস্তে সব জেনে যাবেন। তখন আর কিছুই অদ্ভুত মনে হয় না।'
মোটামুটি কিছুটা জেনে যেতে বিজনের দিন সাতেক লাগল। তার মনে হল, আপাতত এর বেশি জানার দরকার নেই। সাতদিনের শিক্ষা হজম না হলে নতুন কিছু জানা উচিত হবে না। বিজনের সহ্যক্ষমতা অসীম নয়। বিজন পোস্ট অফিসে বসে কাজ করতে করতে সুখময়বাবুকে বলল, ‘আচ্ছা, প্রত্যেকটা নামের পেছনে তো একটা করে ইতিহাস থাকে। এখানকার গ্রামগুলোর নামের ইতিহাসটা কী? ডাকাতপাড়া মানে কি ওখানে একসময় খুব ডাকাত থাকত?’
সুখময়বাবু কৌটো খুলে পান মুখে দিলেন। চিবোতে চিবোতে বললেন, ‘সবই আমার শোনা কথা। আমি শুনেছি একসময় অনেক ডাকাত ওই অঞ্চলে থাকত। আজ অবশ্য তাদের বংশধরদের কেউ কেউ আছে।'
বিজন প্রশ্ন করল, ‘তারা কি এখনও ডাকাতি করে?’
সুখময়বাবু বললেন, ‘একেবারে যে করে না তা নয়। তবে আগের মতো নয়।' বিজন আবার জিজ্ঞেস করল, 'আর চোরপাড়া? ওখানে কি চোরেরা আছে?’
সুখময়বাবু চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে জানলা দিয়ে পানের পিক ফেলে এসে বললেন, ‘হেভি ইন্ডাস্ট্রির পাশে ছোট কুটিরশিল্পও তো থাকে। তাই ডাকাতপাড়ার পাশেই চোরপাড়া। মধ্যখানে মোষমারি খাল। শীতকালে খটখটে, বর্ষা হলে টইটম্বুর। আগে খাল পেরোবার জন্য বাঁশের সাঁকো ছিল। পরে কাঠের ব্রিজ হল। আমি আসার পর পাকা ব্রিজ। তা কয়েক ঘর চোর এখনও আছে।'
বিজন যেন এক রূপকথার জগতে এসে পড়েছে। তার বিস্ময় আর ঘোচে না। সে আবার প্রশ্ন করে, ‘পুলিশ কিছু বলে না?’
সুখময়বাবু বললেন, ‘পুলিশ খামোকা বলতে যাবে কেন? পৃথিবীর কোন রাজ্যে চোর-ডাকাত নেই বলুন তো! কলকাতাতেও কি কিছু কম আছে! এখানে কেউ গিয়ে পুলিশে ডায়েরি করলে তবেই না পুলিশ আসবে! দশ মাইল দূরে পুলিশ স্টেশন। কেউ বড় একটা যেতে চায় না। তা ছাড়া এখানে চুরি-ডাকাতিটা ইদানীং উৎসবের মতো দাঁড়িয়ে গেছে।'
বিজন ঢোক গিলল। টেবিলের ওপর গ্লাস ছিল। গলা শুকিয়ে আসছে বোধ হওয়ায় জল খেয়ে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘চুরি-ডাকাতির উৎসব? সেটা আবার কেমন জিনিস?’
সুখময়বাবু হাসতে হাসতে বললেন, ‘থাকবেন তো এখানে, তখন ধীরে ধীরে সব জেনে যাবেন। স্থানীয় পোস্টমাস্টার বলে আপনাকেও নিমন্ত্রণ করে যাবে।'
বিজন বলল, ‘আমাকে নিমন্ত্রণ? কিন্তু কেন? চুরি করতে, না ডাকাতি করতে।'
সুখময়বাবু বললেন, ‘ওসব করতে নয়। এখানে চারটে বড় অকেশন আছে। চৈত্র সংক্রান্তি, মাঘী পূর্ণিমা, মহালয়া আর একটা হয় দোলের আগের দিন ন্যাড়া-পোড়ার সময়।'
বিজন বললেন, ‘ওইসব দিনে কী হয়?’
সুখময়বাবু বললেন, ‘সেদিন চোরপাড়ার প্রবীণ, নবীন সব চোরেরা যায় ডাকাতপাড়ায় চুরি করতে, আর ডাকাতপাড়ার ডাকাতরা আসে চোরপাড়ায় ডাকাতি করতে।' বিজন বলল, ‘সে কী!
সুখময়বাবু অভয় দেওয়ার ভঙ্গি করে বললেন, ‘এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। মারদাঙ্গা, লাঠালাঠি, রক্তপাত এসব কিছু হয় না। রাত এগারোটা থেকে শুরু, শেষ ভোর চারটেতে। এবার যে পাড়া অন্যপাড়ার চোর কিংবা ডাকাত বেশি সংখ্যায় ধরতে পারবে, তার জিত। যেমন, চোরপাড়া যদি ছ'টা ডাকাত ধরে ফেলে আর ডাকাতপাড়া যদি চারটে চোর ধরে, তবে সংখ্যার বিচারে চোরপাড়ার জয় হল। এর জন্য মেডেল দেওয়া হয়।'
বিজন বলল, ‘মেডেল দেওয়া হয়?’
সুখময়বাবু বললেন, ‘হয় বই কী! এই পুরস্কার বিতরণী সভায় অঞ্চলের পোস্টমাস্টার, স্কুলের হেডমাস্টার, থানার দারোগাবাবু, বিডিও সাহেব, অঞ্চল প্রধান এরকম অনেকেই উপস্থিত থাকেন। এটা এই অঞ্চলের একটা প্রাচীন রিচুয়াল। এতে তো কারও কোনও ক্ষতি হচ্ছে না। এগুলোকে যদি একটু প্যাট্রনিজ করা যায় তাতে গ্রামে শান্তি থাকে।'
বিজন ছোট করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল, কত বছর এখানে থাকতে হবে কে জানে! এর চেয়ে ভবানীপুরের মেস অনেক ভাল ছিল। ছাত্র পড়িয়ে কোচিং ক্লাস করে কেটে যাচ্ছিল। কেন যে পোস্টমাস্টারের ট্রেনিং নিয়ে চাকরি করতে গেল! প্রথম যেতে হল সিমলাগড়। সেখান থেকে সদরহাটি। সদরহাটি থেকে এবার নইয়াচক। কলকাতা থেকে বেশিদূর নয়। মোটরগাড়িতে এলে পাঁচ ঘণ্টার মতো লাগে। খুব দূর বলা যায় কী! এত কাছে এমন একটা আজব জায়গা আছে সেটা বিজনের জানা ছিল না।
একটু পরে ভণ্ডুল এল। সুখময়বাবুর এখন তেমন কাজ নেই। শুধু বিজনের জন্য রোজ ঘণ্টা কয়েক পোস্ট অফিসে আসেন। এই ক’দিন সুখময়বাবুই অনেকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। ভণ্ডুল এসেই জিজ্ঞেস করল, ‘কাকু কোথা?’
ভণ্ডুলের কাকু মানে সুখময়বাবু। বিজন বলল, ‘বাড়ি গেছেন।'
ভণ্ডুল পাশে বসল। টেবিলের ওপর কিছু চিঠি সেগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে বলল,
‘কাকু তো চলে যাবেন। তারপর আপনিই আমার বাবু। তা বিয়ে-থা করেছেন তো?’ বিজন মাথা নেড়ে বলল, 'না।'
ভণ্ডুল যেন স্বস্তি পেল। সেইভাবেই বলল, “যাক, বাঁচা গেল। শুধু আমি আর আপনি থাকব। আপনার কোনও ভাবনা নেই।'
বিজন বলল, ‘আমি বিয়ে-থা করলে কি তোমার দুর্ভাবনা হত?’
ভণ্ডুল চটপট জবাব দিল, ‘তা একটু হত। আপনার ইস্ত্রি কেমন তা তো জানি না। আমাকে হয়তো আপনার বাড়িতে থাকতেই দিল না। তালে তো আমার মুশকিল।'
ভণ্ডুলের কাহিনি সুখময়বাবু যতটুকু বলে গেছেন তাতে বিজনের মনে হয়েছে ছেলেটা ভাল, সরল এবং একটু একরোখা। এই সরলতাই ওর জীবনে সর্বনাশ করেছে। জ্ঞাতিরা জমিজমা ভাগাভাগির সময় ভণ্ডুলকে ঠকিয়েছে। হাজার বিশেক টাকা হাতে পেয়েছিল।
ভণ্ডুল অতশত বোঝে না। আপনজনরা ঠকাতে পারে তেমন কথা ওর মাথাতেই আসেনি। নগদ বিশ হাজার টাকা হাতে পেয়ে ভেবেছিল, অনেক পাওয়া গেল। কিন্তু ওর ন্যায্য পাওনা যে এর চেয়ে বেশি সেটা ভণ্ডুল বুঝতেই পারেনি। ওই বিশ হাজার টাকা থেকে এক জ্ঞাতিভাইয়ের পরামর্শে ভাইয়ের বন্ধুকে দশ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল। কথা ছিল, ছ'মাস পরে ওকে বারো হাজার দেবে। সেই টাকা আজও পাওয়া যায়নি। তখন সুখময়বাবু ওর বাকি দশ হাজার টাকা পোস্ট অফিসে রেখে দিয়েছেন। ভণ্ডুল ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়ায়। যে ডাকে তার বাড়ি গিয়েই গায়ে গতরে খেটে দেয়। কেউ দু'খানা রুটি দেয়, ভণ্ডুল পরম আনন্দে তাই খায়। সারাদিনই লোকের নানা কাজ করে বেড়ায়। খাওয়া-থাকার কোনও ঠিক-ঠিকানা নেই। সুখময়বাবু সেইসব দেখে নিজের কোয়ার্টার্সে এনে রাখেন। পোস্ট অফিস থেকে ফিরে গিয়ে হ্যারিকেনের আলোয় ভণ্ডুলকে লেখাপড়া শেখাতে থাকেন। ভণ্ডুল যেদিন কালো স্লেটের ওপর চক দিয়ে নিজের নাম লিখতে শিখল সেই দিনটা ছিল ভণ্ডুলের পরম আনন্দের দিন। নিজের খাতায় কাঠের পেনসিল দিয়ে বড় বড় করে নিজের নাম প্রথমে বাংলায়, পরে ইংরেজিতে লিখতে শেখার পর সেই খাতা নিয়ে গোটা পাড়া ঘুরে ঘুরে দেখিয়েছিল।
পোস্টমাস্টার মশাইয়ের হয়ে ভণ্ডুল একটা কাজ করত। সেই কাজের কথাটা সুখময়বাবু বিজনকেও বলে গিয়েছিল। কথাটা মনে ছিল বলে বিজন জিজ্ঞেস করল, ‘ভণ্ডুল, তোমার কাকুর হয়ে যে কাজটা করতে, অর্থাৎ টাকা পাঠানোয়...
ভণ্ডুল কথা শেষ করতে না দিয়ে বলল, ‘বুঝে গেছি। ও কাজ যেমন ছিল, তেমনই চালু থাকবে। খালি মনে রাইখবেন য্যাত দুরে যাবে ত্যাত রেট বেড়ে যাবে। একেবারে বায়োস্কোপের মতো। সামনে বসলে কম দাম, য্যাত পিছে যাবে ত্যাত দাম চড়বে।'
ব্যাপারটা বিজনের জানা ছিল বলে মনে মনে হাসল। এই গ্রামের যেসব মানুষ গ্রামের বাইরে মানি-অর্ডারে টাকা পাঠায় তাদের অধিকাংশ লোকই মানি-অর্ডার ফর্ম লিখতে পারে না। ভণ্ডুল তাদের ধরে এনে পোস্ট অফিসের বারান্দায় লাইন দিয়ে দাঁড় করায়। পোস্টমাস্টারবাবু তাদের ফর্ম লিখে দেন। এই লেখালেখির রেট ঠিক করে ভণ্ডুল। টাকা পাঠাবার জন্য তো একটা রেট আছেই। সেটা সরকারি। এটা হল লিখে দেওয়ার রেট। কলকাতা হলে ফর্ম প্রতি এক টাকা, হাওড়া হলে দেড় টাকা। বাঁকুড়া, মেদিনীপুর, গুসকরা হলে দু’ থেকে তিন। মাটি কাটার সময় বিহার আর ওড়িশা থেকে কিছু কামিন আসে কাজ করতে। ওরা টাকা পাঠায় বিহার আর ওড়িশাতে তাদের ক্ষেত্রে ভণ্ডুল সাড়ে তিন টাকা রেট নেয়। বিহার শুনেই ভণ্ডুল বলে, ‘ওরে বাপ, সে যে অনেক দূর গো। টাকা বেশি লাগবে।'
কেউ যদি বলে, ‘ক্যানে বাবু, লিখার রেট তো একই হবে।'
ভণ্ডুল প্রথমে হেসে ফেলে, পরে গম্ভীর হয়ে বলে, ‘ইখান থেকে তুমার দেশে যেতে কত গাড়িভাড়া লাগে! তা তুমার টাকা তো হাওয়ায় উড়ে উড়ে যাবে না। তারেও তো টেরেনে, বাসে, একবারে ভিত্রে হলে গো-গাড়িতে যেতে হবে। সেই যাওয়ার একটা খরচা নেই। যাবে তো লিখনের জোরে। কম টাকা দিলে তুমার টাকা মাঝপথে গে থেমে যাবে। সেটা কি ভাল হবে?’
এরপর কেউ আর বিশেষ আপত্তি করে না। করবার সাহসও পায় না। এর থেকে পোস্টমাস্টার মশাই যা রোজগার করেন তার একটা ভাগ ভণ্ডুল পায়। ওই টাকাতেই ভণ্ডুল খুশি। থাকা-খাওয়া তো পোস্টমাস্টারবাবুর জন্য ফ্রি। ভণ্ডুলের ভাষায়, ‘ফিরি।’
বিজনের বাজার করা, ঘরদোর পরিষ্কার, রান্না, বাসন ধোয়া সব কাজই ভণ্ডুল করে দেয়। মাঝেমধ্যে বিডিও সাহেবকে পোস্ট অফিসে ধরে নিয়ে আসে ভণ্ডুল। যেমন আজ এল। ভণ্ডুলের যেসব জ্ঞাতি তাকে ঠকিয়েছিল তারা ছাড়া সবাই ভণ্ডুলকে ভালবাসে। বিডিও সাহেবও ভালবাসেন। সাইকেলটা পোস্ট অফিসের বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রাখতে রাখতে বিডিও সাহেব অর্থাৎ নেপাল সরকার বললেন, ‘যাচ্ছিলুম ভূতগঞ্জের হাটে। পথে এই পাগলটার সঙ্গে দেখা। জোর করে ধরে নিয়ে এল।'
বিজন একটা চেয়ার এগিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘ভণ্ডুল ভালই করেছে। বিকেলবেলাটা বড্ড একা একা লাগে। আপনি এলে মন খুলে কথা বলবার লোক পাই।'
নেপাল সরকার বলল, ‘তা যা বলেছেন। তবে আপনার কাছ থেকে ইংরেজি শিখে ভণ্ডুল তো গাঁয়ের লোকদের সঙ্গে ইংরেজি ছাড়া কথাই বলে না। সেদিন হাটে গিয়ে আলুওলাকে বলছে, হ্যালো, পটেটো রেট বল। বেচারি রেট বলবে কী, সে তো হাঁ হয়ে গেছে। মুখের হাঁ আর বুজছে না।'
বিজন বলল, । ইংরেজি বিদ্যার পুরো কৃতিত্ব আমার নয়, সুখময়বাবুর। কোনও কিছু কিনতে দিলে ও তার ইংরেজি নামটা জেনে নেয়।'
কথা বলতে বলতে ভণ্ডুল এল কাচের গ্লাসে চা নিয়ে। গ্লাস দুটো টেবিলে নামিয়ে রেখে বলল, ‘হ্যালো, প্লিজ ইট টি।'
যে কোনও ইংরেজি শব্দ বলার আগে ভণ্ডুল ‘হ্যালো’ শব্দটা বলবেই। বিজন আর নেপাল চায়ের গ্লাস তুলে নিতে নিতে দু’জনেই দু’জনের দিকে তাকিয়ে হাসল, নেপাল বলল, ‘ভণ্ডুল, তুই যেমন ইংরেজি বলিস, সেটা কোনও সাহেব শুনলে তোকে ইংল্যান্ডে নিয়ে যাবে।'
ভণ্ডুল বলল, ‘রোববার হলে যেতে পারি। ওইদিন ডাক অফিস বন্ধ। সকালে গে বিকেলে ফিরে আসব। ভিন গাঁয়ে রাত কাটাব না।'
বিজন বলল, ‘হ্যাঁ রে, এই ভণ্ডুল নামটা তোর কে রেখেছিল?’
ভণ্ডুল উত্তর দিল, ‘তা আমি বলতে পারিনে। তবে শুনেছি, উলটোরথে জন্মেছিলুম বলে
আমার সব কাজই উলটো হয়ে গিয়ে ভণ্ডুল হয়ে যায়। সেই থেকেই আমি ভণ্ডুল।' চা শেষ করে নেপাল বলল, ‘একদিন আমার ওখানে চলে আসুন। জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে।'
নেপালের সঙ্গে সঙ্গে বিজন বারান্দায় এল। সাইকেলটা বারান্দা থেকে নামাতে নামাতে নেপাল বলল, ‘ভূতগঞ্জের হাটের পাশে চার কাঠা জমি আছে। জমিটা আসলে ভণ্ডুলের বাবার। বাবা তো মারা গেছে। দাবি করবার মতো কোনও কাগজপত্র ভণ্ডুলের কাছে নেই। উলটে আবার জ্ঞাতিভাইদের কথায় সাদা কাগজে টিপ ছাপ দিয়ে বসে আছে। জমিটা উদ্ধার হওয়া উচিত।'
বিজন বলল, ‘টিপ ছাপ দিল কেন? ও তো দিব্যি নাম সই করতে পারে।' নেপাল বলল, ‘সে তো এখন পারছে। আগে তো পারত না। অনেক আগেই এসব কাণ্ড ঘটেছে।'
বিজন বলল, 'তবে তো মুশকিল। ওই জমির আশা ছাড়তে হবে।'
নেপাল বলল, ‘ভণ্ডুলের কোনও আশা-টাশা নেই। কিন্তু আমরা যারা ওকে ভালবাসি তাদের কাছে ব্যাপারটা খারাপ লাগে।'
নেপাল সাইকেলে উঠে পড়ল। ভণ্ডুল চলন্ত সাইকেলের পেছন পেছন খানিকটা পথ দৌড়ে গিয়ে আবার ফিরে এল বিজনের কাছে।
বিজন বলল, ‘হ্যাঁ রে ভণ্ডুল, তুই যে বলেছিলি ডাকাতপাড়ায় নিয়ে গিয়ে ডাকাতদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিবি। কবে আলাপ করাবি?’
ভণ্ডুল ছোলা খাচ্ছিল। খেতে খেতে বলল, ‘সে আর এমন কী কথা। আপনি হুকুম করলেই হবে।'
বিজন পোস্ট অফিসের দরজায় তালা লাগিয়ে রাস্তায় নেমে আসতে আসতে বলল, ‘কাল তো শনিবার। তবে কাল যাই।'
ভণ্ডুল মাথা নেড়ে বলল, ‘তাই চলেন। ডাকাত সর্দারের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব।' দিনের আলো কমে আসছিল। শেষ রোদ্দুরের আভা তখনও জেগে। কাঁচা রাস্তায় গোরুর গাড়ির চাকার দাগ। রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বিজন বলল, ‘ভূতগঞ্জের হাটটা কি খুব বড়?’
ভণ্ডুল বলল, ‘তেমন না। ওই হাটে আমি যাই না।'
বিজন জিজ্ঞেস করল, ‘কেন? ভূতের ভয়ে?’
ভণ্ডুল কোনও উত্তর দিল না। হাতের মুঠোর মধ্যে কয়েকটা ছোলার দানা ছিল, সেগুলো রাস্তায় ফেলে দিয়ে চুপচাপ পথ হাঁটতে লাগল। এতটা চুপচাপ, যা ভণ্ডুলকে একেবারেই মানায় না।
ভণ্ডুলের সঙ্গে ডাকাতপাড়ায় এল বিজন। নইয়াচক থেকে আসতে হলে মোষখালির খাল পেরোতে হয়। এখন তো পাকা ব্রিজ। ব্রিজের নীচে খালের গলা পর্যন্ত জল। সেই জলে জাল টাঙানো। বিজন শুনেছে এই খালে জল থাকলে অনেকরকম মাছ পাওয়া যায়। কেউ কেউ ছিপ ফেলেও মাছ ধরে। ব্রিজ পেরিয়ে কিছুটা পথ আসার পর বিজনের নাকে পচাগন্ধ এসে লাগল। বিজন বলল, ‘এটা কীসের গন্ধ?’
ভণ্ডুল উত্তর দিল, ‘জলে পাটগাছ পচাচ্ছে।'
বিজন পৰ্থ চলতে চলতে জিজ্ঞেস করল, ‘ভণ্ডুল, ডাকাতপাড়ার সবচেয়ে বড় ডাকাত কে?’
ভণ্ডুল পথ চলতে চলতেই একটা গাছ থেকে সাদা রঙের ফুল ছিঁড়ে নিয়ে ফুলের ভেতরে মুখ দিয়ে কী একটা চুষে চুষে খাচ্ছিল। বিজনের কথায় মুখ তুলে বলল, ফুল। ভেতরে মিষ্টি রস আছে। চুষে খেলে বেশ নেশা নেশা লাগে। তা কী যেন বলতিছিলেন?’
বিজন আগের কথাটাই আবার বলল। ভণ্ডুল উত্তর দিল, ‘ডাকাতপাড়ার দু’জন হল গিয়ে মস্ত বড় ডাকাত। দু'জনেই সর্দার। একজন হুলোডাকাত অন্যজন নুরোডাকাত। হুলো ডাকাতকে সবাই বলে টাইগার।
বিজন জিজ্ঞেস করে, ‘আর নুরোডাকাতকে?’
ভণ্ডুল উত্তর দেয়, ‘লায়ন।'
উত্তর দেওয়ার একটু পরেই বলে, 'টাইগার মানে তো বাঘ। কিন্তু লায়ন মানে কী?’ বিজন একটা কাঁচামাটির গর্ত পেরিয়ে এসে বলে, ‘সিংহ।’
বিজন আর কিছু জিজ্ঞেস না করলেও ভণ্ডুল বলে যায়, ‘হুলো ডাকাতের ভাল নাম হচ্ছে হলধর। নুরো ডাকাতের ভাল নাম নূর মহম্মদ।
বিজন জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কখনও ডাকাতি হতে দেখেছ?’
ভণ্ডুল এমনভাবে হেসে উঠল যেন বিজন নিতান্ত বোকার মতো একটা কথা জিজ্ঞেস করে ফেলেছে।
হাসি থামিয়ে ভণ্ডুল বলল, ‘জলে নামব অথচ গা-গতর ভিজবে না এমনটা হয় নাকি? আমাদের পাশেই ডাকাতপাড়া। এক-আধবার বাড়িতে ডাকাত না এলে লোকে কী বলবে বলুন তো?’
বিজন অবাক হয়ে গেল। অবাক গলাতেই বলল, ‘কী বলবে?’
ভণ্ডুল বলল, ‘লোকে গরিব ভাববে না। আমার বাবা তো গরিব ছেল না। মাসে একবার করে হুলো ডাকাত দলবল নিয়ে আসত। তবে হ্যাঁ, হুটহাট আসত না। আগে খবর পাঠিয়ে তবে আসত।'
বিস্ময়ের শেষ নেই। কলকাতার কাছেই এমন গ্রাম এখনও আছে। ভণ্ডুল যা বলছে তা সত্য-মিথ্যা যাই হোক, বিজনের শুনতে ভাল লাগছে। রূপকথার গল্পের মধ্যেও তো একটা আকর্ষণ থাকে। বিজন পকেটে হাত দিয়ে সিগারেটের প্যাকেট বার করতে করতে বলল, ‘তুমি কখনও তোমাদের বাড়িতে হুলোডাকাতকে দলবল নিয়ে আসতে দেখেছ?’
ভণ্ডুল যেতে যেতে পথের পাশ থেকে একটা কঞ্চি কুড়িয়ে নিয়ে তলোয়ার চালানোর মতো শূন্যে বার দুই চালাল। সাঁ সাঁ করে একটা আওয়াজ উঠল। এবার কঞ্চিটা বাঁ হাতে নাচাতে নাচাতে বলল, ‘কখনও কি বলছেন, অনেকবার দেখেছি।'
বিজন বলল, ‘অনেকবার দেখেছ? কেমন দেখলে?’
ভণ্ডুল এবার থমকে দাঁড়িয়ে বিজনের মুখের দিকে তাকাল। তারপর বলল, ‘সেটা ছিল পৌষের গোড়ার দিক। সন্ধেবেলা বাবা বললেন, 'তোমার সব খেয়েদেয়ে নাও গো। হুলোডাকাত খবর পায়েছে, আজ আমার বাড়িতে আসবে।' আমরা সবাই তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে নিলুম। বাবা হ্যারিকেন জ্বেলে বারান্দায় বসে রইলেন কখন হুলোডাকাত আসে।
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর বাবা বললেন, ‘হুলোটা দেরি করছে কেন? কাল সাতসকালে খেতে যেতে হবে। হুলোর কোনও সময়জ্ঞান নেই।'
‘বাবার কথা শেষ হওয়ার একটু পরেই হে-রে-রে করে হুলোডাকাতের দল এইসে গেল। মাথায় লাল পাগড়ি, কপালে লাল ফোঁটা, কাঁধে পাঁঠা বলি দেওয়ার খাঁড়া। আমাদের উঠোনে এসেই হাঁক দিল, ‘পরানদা, এসে গেছি।’ পরান দাস হচ্ছে গিয়ে আমার বাবার নাম। বাবা তখন হুঁকোর টিকে ধরাতে ঘরে গেছেন। ঘর থেকে বেইরে এসে বললেন, ‘হুলো তোর কোনও আক্কেল নেই। ডাকাত বলে কি সময়ের জ্ঞান-গম্যি থাকবে না। এত দেরি করতে হয়?’ হুলোকাকা কাঁধের খাঁড়াটা উঠোনের ওপর তৈরি বাঁশের বেঞ্চির উপরে রেখে বলল, ‘কী করব দাদা! দলের লোকজন জোগাড় করে আসতে দেরি হয়ে গেল। আমার দেরি হল বলে তুমি যেন আবার দেরি কোরো না। যা দেওয়ার হাত খুলে দাও।”
সিগারেটে টান দিয়ে কাশি উঠে গেল বিজনের। কাশতে কাশতে বলল, ‘তোমার বাবা কী দিলেন? ঘরে যা ছিল সব?’
ভণ্ডুল বলল, ‘খবর পাওয়ার পর সব তো তৈয়ারি ছিল। দশ সের চাল, গাছের খানকয়েক পেঁপে, সের দুই আলু, দুটো মোচা, বিশটা হাঁসের ডিম আর দশটা টাকা।'
‘সব দেখে-টেখে হুলোকাকা বলল, ‘পরানদা, এই তোমার হাত খুলে দেওয়া!’ বাবা বললেন, ‘হাত যে বাঁধা পড়ে গেছে হুলো, খুলতে পারছিনে। বছরের গোড়ায় মেয়ের বে দিলুম। তিনমাস পর ছেলের বে। হাত কি আর খোলা আছে?’
‘হুলোকাকা বলল, ঝরনার বে-তে তা পেটপুরে খেয়ে গেলুম। কিন্তু ছেলের বে-তে বাদ দিলে কেন?’
‘বাবা বললেন, ‘তুমি তখন ছিলে কোথায়? নবিগঞ্জে গিয়েছিলে তো।'
‘হুলোকাকা জিভ কেটে বলল, ‘হক কথা। তাহলে আর তোমার উপরে জোর চলে না। তা হ্যা পরানদা, নতুন বউমাকে একবার দেখাও।'
‘বাবা বললেন, ‘সে আর বেশি কথা কী। এখুনি দেখাচ্ছি। গাঁয়ে বে হয়ে আসা অব্দি হুলোডাকাতের নাম শুনে যাচ্ছে। দেখবার বড্ড শখ। দাঁড়াও ডাকছি।'
‘বাবা হাঁক দিলেন, ‘কই গো, মেজো বউমাকে নিয়ে এসো। হুলো এয়েচে।'
‘একটু পরে মা’র সঙ্গে মেজো বউদি এল। পেছন পেছন আমি। বাবা বললেন, ‘এই যে বউমা, এই হচ্ছে গিয়ে হুলো ডাকাত। গাঁয়ের মস্তবড় ডাকাত। গাঁয়ের মুখ উজ্জ্বল করে রেখেছে। ওকে পেন্নাম করো।”
বিজন জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার বউদি প্রণাম করল?’
ভণ্ডুল বলল, ‘কেন করবে না! হুলোকাকা বয়সে বড় না! বউদি পেন্নাম করল। হুলোকাকা বলল, ‘খালি হাতে তোমাকে কেমন করে আশীর্বাদ করি। দাঁড়াও, ট্যাঁকে কী আছে দেখি।' ট্যাঁক থেকে পাঁচটা কাঁচা টাকা বেরোল। কাঁচা টাকা বোঝেন?’
বিজন বলল, ‘আম-কাঁঠালের কাঁচা-পাকা বুঝি। টাকার কাঁচা পাকা জানি না।' ভণ্ডুল বলল, ‘কাগজের টাকা নয়। এমনি টাকা হয় না। রুপোর মতো দেখতে। গোল গোল।'
এবার বিজন বুঝতে পেরে মাথা নাড়ল। ভণ্ডুল বলে যেতে লাগল, ‘সেই পাঁচটা কাঁচা টাকা মেজো বউদির হাতে দিয়ে হুলোকাকা বলল, ট্যাঁকে আর কিছু নেই মা। ডাকাতদের সঙ্গে করে কিছু আনতে নেই কিন্তু সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হয়। আজ যা নিলাম সেটা সামান্য। তোমার মুখটা দেখে মন ভরে গেল। পরানদা আর বউদিকে সেবাযতন কোরো।'
‘বাঁশের বেঞ্চি থেকে খাঁড়াটা তুলে নিতে নিতে হুলোকাকা বলল, ‘চলি পরানদা। এবার মুকুন্দ জেঠুর বাড়িতে যেতে হবে। দেরি হলে বুড়ো আমার ছাল ছাড়িয়ে নেবে।”
বিজন বলল, ‘এই তোমার হুলোডাকাতের ডাকাতি! এ তো মনে হচ্ছে মাধুকরী।' ভণ্ডুল বলল, ‘মাধুকরী? তিনি আবার কে?’
বিজন বলল, ‘এটা তো ডাকাতি নয়। এটা বৈষ্ণবমতে ভিক্ষা। একে ডাকাতি বলে? ভণ্ডুল খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, শহরে-গেরামে অনেক ফারাক। ওসব আপনি বুইঝবেন না।'
বিজন মনে মনে ভাবল, জেনারেশন গ্যাপের মতো শহর আর গ্রামের মধ্যেও বিশাল একটা ফারাক তৈরি হয়ে আছে। কেউ কারও মনের কাছে পৌঁছতে পারে না। ভণ্ডুলদের কাছে যা স্বাভাবিক সেটাই বিজনের কাছে চরম অস্বাভাবিক।
ভণ্ডুল বলল, ‘হুলোকাকার ডেরায় এসে গেছি।'
বিজন চমকে উঠে চারপাশে তাকাল। একেবারেই নিরীহ একটা পাড়া। রাস্তার ওপর একটা ফেস্টুন ঝুলছে। সেই ফেস্টুনে যেমন লেখা আছে তা হল এইরকম: দুর্গাপূজা উপলক্ষে ডাকাতপাড়ার নিবেদন বিরাট যাত্রাপালা ‘সতীশের ছেলে'। যাত্রা পরিচালনায় ডাকাতসর্দার হলধর বর (হুলো)। সবার নিমতন। সবাই আসুন। না এলে মুণ্ডু যাবে।
বিজন মনে মনে বলল, এমন ভয়ংকর নিমন্ত্রণ এর আগে সে কখনও শোনেনি। ভণ্ডুলের দিকে তাকিয়ে বিজন বলল, 'তোমার হুলোকাকাকে কি পাওয়া যাবে? না পাওয়া গেলে এখানে আসাটাই বৃথা।
ভণ্ডুল বলল, ‘এতটা মিইয়ে পড়বেন না। দোকানে না থাকলে বাড়ি যাব। আমি বাড়ি চিনি। আপনি আসুন দিনি।'
কিছুটা পথ আরও হাঁটতে হল। হাঁটতে হাঁটতে ভণ্ডুল এসে একটা ছোট্ট মুদিখানার দোকানের সামনে দাঁড়াল। বিজন দোকানটার দিকে তাকাল। গাঁয়ের মুদিখানার দোকান এইরকমই হয়। দোকানের সামনে বাঁশের বেঞ্চি। দোকানে ঝুলছে রঙিন বেলুন। সেগুলো প্লাস্টিকের প্যাকেটে মোড়া। হজমিগুলি, মুখশুদ্ধি আর মাথাব্যথার বিচিত্র ওষুধ ‘আশ্চর্য বাম। একবার লাগালেই আরাম।'
ভণ্ডুল বলল, ‘হুলোকাকার দোকান।'
বিজন বলল, ‘দোকান তো দেখলাম হুলোডাকাত কোথায়??
ভণ্ডুল বিরক্ত গলায় উত্তর দিল, ‘অত তড়িঘড়ি কইলে হবে? শান্ত হয়ে দাঁড়ান দিনি। আমি হুলোকাকাকে ডাকি।'
বিজন দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। দুটো বাচ্চা মেয়ে দোকান থেকে কীসব কিনে চলে গেল। দোকানদারি করছিল একটা যুবক ছেলে। বয়স কত হবে? বড়জোর কুড়ি-বাইশ। মিশমিশে কালো চেহারা। সেই ছেলেটা বিজনকে বারকয়েক খুঁটিয়ে দেখে বলল, ‘কী চাই?’
বিজনের তো কিছুই কেনার নেই। অতএব প্রশ্নটা তাকে অস্বস্তিতে ফেলল। কিছু একটা বলতে হয় বলে সে বলল, ‘সিগারেট আছে?'
দোকানি ছেলেটা উত্তর দিল, ‘সিগারেট নেই। বিড়ি আছে। মধু বিড়ি। একবার খেলে আর সিগারেট খেতে ইচ্ছে করবে না। দেব?’
বিজন মাথা নেড়ে বলল, 'না।'
দোকানের সামনে পায়চারি করতে করতে বিজন ভাবতে লাগল, ভণ্ডুল হুলোডাকাতকে ডাকতে কোথায় গেল? এই দোকানের সামনে তাকে কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে? মাঝেমধ্যে দু’-একজন খদ্দের আসছে। দোকান থেকে কেউ এক প্যাকেট দাঁতে দেওয়ার গুল কিনছে, কেউ আড়াইশো আলু, কেউ-বা একপোয়া ডাল। যারা কিনতে আসছে তারা সবাই বিজনকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। গাঁয়ে অচেনা মানুষকে সবাই এইভাবেই দেখে। বিজন এবার ঘড়ি দেখল। ভণ্ডুল তো প্রায় দশ মিনিট হল হুলোডাকাতের সন্ধানে গেছে। এখনও ফিরছে না কেন? ভাবতে ভাবতেই ভণ্ডুল এল। বিজন প্রশ্ন করল, ‘কোথায় গিয়েছিলে?’
ভণ্ডুল জবাব দিল, ‘হুলোকাকাকে খবর দিতে। কাকা তো যাত্রার মহলা দিচ্ছিল। আপনার নাম করায় বলল, তুই এগ্য়ে যা, আমি আসছি।'
বিজন আবার জিজ্ঞেস করল, ‘হুলোডাকাত আবার যাত্রাপালাতেও অভিনয় করে?’ ভণ্ডুল উত্তর দিল, ‘করে বই কী! ‘সতীশের ছেলে’ পালায় হুলোকাকার মস্তবড় পার্ট। সতীশের শ্বশুর।’
বিজন ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে বলল, ‘তা তিনি আসছেন কখন?’
ভণ্ডুল বলল, ‘মোষ পেলেই চলে আসবেন।'
বিজন সিগারেট ধরাতে গিয়ে থেমে গেল। অবাক দৃষ্টিতে ভণ্ডুলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘পেলেই চলে আসবেন মানে?’
ভণ্ডুল দোকানের সামনে বাঁশের মাচায় বসতে বসতে বলল, ‘হুলোকাকার বয়েস হয়েছে তো। তা ছাড়া গেঁটে বাতের ব্যথা আছে। বেশি হাঁটতে পারে না। তাই মোষের পিঠে চলাফেরা করে। এট্টু সবুর করুন। হুলোকাকা এল বলে।'

মিনিট দুয়েক অপেক্ষা করার পর একটি কালো মোষকে দেখা গেল। তার পিঠে চেপে আসছে ততোধিক কালো এক শীর্ণকায় প্রৌঢ়। ভণ্ডুলের কাছ থেকে জানা গেল সে বিখ্যাত ডাকাত সর্দার হুলো। গাঁয়ে যার নাম টাইগার। জীবনে অনেকবার অনেক কাজ করতে গিয়ে বিজন হতাশ হয়েছে কিন্তু আজকের মতো এতখানি হতাশ আগে কখনও হয়নি। মনে হচ্ছে ভবিষ্যতে হওয়ার সম্ভাবনাও কম। এতকাল সিনেমা-থিয়েটারে কতরকমের ডাকাত দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে। বিজন ভেবেছিল, মাথায় পাগড়ি, কপালে লাল ফেঁাঁটা, ইয়া গালপাট্টা আর গলায় পৈতের মতো ঝোলানো গুলির মালা— এই না হলে ডাকাত মানায়! কিন্তু এ কেমন ডাকাত!
মোষটা সামনে এসে দাঁড়াল। ভণ্ডুল দোকান থেকে একটা টুল এনে মোষের পাশে রাখল। হুলোডাকাত তাতে পা দিয়ে নামল। নেমেই বিজনের দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে নমস্কার জানিয়ে বলল, ‘দাঁইড়ে ক্যানে, বসেন। ওরে গুলে, বাবুরে মুড়ি-মুড়কি দে। ভাল করে চা বানাতে বল।
এতক্ষণ দোকানে বসে যে ছেলেটা দোকানদারি করছিল তারই নাম গুলে। গুলে চটপট একটা পাঁচছটাকি ঠোঙায় মুড়ি-মুড়কি ভরে বিজনের দিকে এগিয়ে দিল। হুলোডাকাত বলল, ‘ভণ্ডুলকেও দিস।'
হুলো এসে বসল বাঁশের বেঞ্চিতে। তার পাশে বিজন। বিজন মনে মনে ভাবছিল, কী দিয়ে কথা শুরু করা যায়। একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘নইয়াচকে আসা অবধি আপনার নাম শুনেছি। তাই ভণ্ডুলকে নিয়ে দেখতে চলে এলাম।'
হুলোডাকাত একটু হেসে বলল, 'আমারে আর দেখাদেখির কী আছে। এখন তো গাঁয়ে ডাকাতি পেরায় উঠে গেছে। বাপ-ঠাকুরদার পেশাটা টিম-টিম করে রক্ষে করছি।' বিজন প্রশ্ন করল, ‘আপনার বাবা-ঠাকুরদা সবাই ডাকাত ছিলেন?’
হুলোডাকাত বলল, ‘অবশ্যই ছিলেন। তখন ডাকাতিতে মজা ছ্যাল। এখন তো সবারই নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। আসা-যাওয়াই সার। তাই এসব দেখেটেখে আমার ছেলেরা আর ও লাইনে গেলই না। দোকান করে, মাছের ভেড়ি আগলায়, এইসব করে পেট চালাচ্ছে। বংশের ডাকাতির ধারাটা আর রাখা গেল না।’
হুলোডাকাত এমনভাবে আফশোস করতে লাগল' যেন মহৎ একটা পেশা উঠে যাচ্ছে বলে তার বড় দুঃখ।
বিজন বলল, ‘শেষ কবে ডাকাতি করেছিলেন?’
কাউকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় শেষ কবে বিদেশ গিয়েছিলেন অথবা কোনও প্রাক্তন খেলোয়াড়কে যদি বলা হয়, লর্ডসে শেষ ম্যাচ্ কবে খেলেছেন তিনি তখন যেমন ভাবতে ভাবতে উত্তর দেন হুলোডাকাতও তেমন করে উত্তর দিল, ‘বড়সড় ডাকাতি করেছিলুম বছর পাঁচেক আগে। এখন তো নিয়মরক্ষের জন্য বছরে তিনবার ডাকাতি করতে হয়।'
বিজন একবার করে হুলোডাকাতের দিকে তাকায় আর অবাক হয়। বিজন জিজ্ঞেস করে, ‘আপনার দলে কতজন লোক আছে?'
হুলো বলে, ‘বেশি নেই। ভালগুলো তো বাজার মন্দা দেখে কলকাতা চলে গেল। ওখানে ট্রেনিং নিয়ে ব্যাংক ডাকাতি করে। এখানে লোকজন জোগাড় করতেই রাত কাবার। নুরোরও একই অবস্থা। সেদিন মোষমারির খালের ধারে বসে নুরো খুব দুঃখ করছিল।' বিজন আবার জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কখনও কলকাতা গেছেন?
হুলো উত্তর দেয়, ‘গেছি বইকী! একবার পাড়া ঝেঁটিয়ে লোক নে গেল কলকাতার মিটিংয়ে। আমিও গেলুম। হাঁ করে দেখবার মতো একখানা গ্রাম বটে। যেখানে মিটিং বসেছিল তারই পাশেই হল গিয়ে রানির মন্দির। সাদা মন্দিরের মাথায় পরি উড়ছে। ওপরে ডাঙা দিয়ে যান চলেছে আবার দেখি মাটির নীচ দিয়েও হুশ করে টেরেন যাচ্ছে। দেখে দেখে তো হাঁ হয়ে যেতে হয়। ওই একবারই গেছলুম।'
বিজন প্রশ্ন করল, ‘ছেলেবেলা থেকে অনেকের অনেকরকম ইচ্ছে থাকে। আপনার কি ডাকাত হওয়ার ইচ্ছেই ছিল, নাকি অন্য কিছু হতে চেয়েছিলেন?’
হুলোডাকাত কাঁধ ঝাঁকিয়ে মুখে ব্যাজার ভঙ্গি করে বলল, ‘মাস্টারের ছেলে মাস্টার হবে, ডাকাতের ছেলে ডাকাত। এটাই তো নিয়ম। তা আমি সেই ডাকাতই হলুম। ভেবেছিলুম গাঁয়ে একটা ডাকাতি শিক্ষার পাঠশালা করব। তা আর হল কই?'
হুলোডাকাতের এই ভাবনাটাও চমকে ওঠার মতো। বিজন জিজ্ঞেস করল, 'সেই পাঠশালা যদি হত-তালে কী শেখাতেন?’
হুলো বলল, ‘শান্তভাবে ডাকাতির শিক্ষা। আমরা তো ডাকাতি করতে গিয়ে কখনও মারধোর, লুটপাট করিনি। সেসব করে শয়তান ডাকাতরা। হ্যাঁ, হাতে খাঁড়া, লাঠি বল্লম এসব থাকত বটে, কিন্তু ব্যবহার করায় মানা ছিল। ওগুলো নিতে হয় বলেই নেওয়া। ওগুলোকে বলি ডাকাতের গয়না। আসলে, পেশায় ডাকাত হলেও জাতে তো মহাপ্রভুর ছিরিচরণের দাস। এখন এসব নিয়মধম্ম কেউ মানে না।'
বিজন এবার একটা সিগারেট ধরাল। হুলোডাকাত বলল, ‘সে কী, মুড়ি-মুড়কি যে ঠোঙাসুদ্ধু পড়ে রইল। দু’গাল খেয়ে যান।'
বিজন বাধ্য হয়ে একটু মুড়ি-মুড়কি গালে ফেলল। হুলোর ছেলে গুলো অর্থাৎ গুলে কাচের গেলাসে চা নিয়ে এল। চায়ে মুখ দিয়েই বিজন টের পেল গুড়ের চা। চা শেষ করে বিজন বলল, ‘তবে যে শুনেছিলুম, বেশ বোমা-টোমা ফাটাতে ফাটাতে ডাকাতি করতে যেতেন।'
হুলোডাকাত বলল, ‘এখন তো আর নিয়ম করে ডাকাতি হয় না। মহালয়ায় দেখবেন, আগের রাতে চোর-ডাকাতের প্রতিযোগিতা হবে। সে সময় বোমাও ফাটবে। তবে সে মানুষমারা বোমা নয়। বোমার আওয়াজ আমি মুখেই করতে পারি।'
বিজন বলল, ‘মুখে বোমার আওয়াজ!’
ভণ্ডুল এবার বায়না ধরার ভঙ্গিতে বলল, ‘ও হুলোকাকা, মুখে একবার বোমা ফাটাও না। মাস্টারদাদা শুনবেন।'
হুলোডাকাত বলল, ‘অ্যাতদূর এলেন, আপনারে না শোনালে চলে। দাঁড়ান, এট্টু দম নিয়ে নিই।'
হুলোডাকাত বাঁশের বেঞ্চি থেকে উঠে দাঁড়াল। একটা হাতের তালু চোঙার মতো করে রাখল মুখের কাছে। অন্য হাতটা নাভির ওপর। এবার একটু নিচু হয়ে দম নিয়ে মুখে বোম বোম করে শব্দ করেই কাশতে লাগল। কাশতে কাশতে বসে পড়ার পর ভণ্ডুল হুলোডাকাতের বুকে-পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে গভীর মমতার সুরে বলতে লাগল, ‘হুলোকাকার বয়স হয়েছে তো। এখন আর আগের মতো হয় না। দু’বার ফাটালেই বুকে-পেটে হাঁফ ধরে যায়।'
ভণ্ডুল কথা শেষ করেই হাঁক দিল, ‘অ্যাই গুলো, কুঁজো থেকে জল দে। হুলোকাকা দু’ ঢোক জল গিলে নাও। বুকের কষ্ট কমে যাবে।'
বিজন মনে মনে বিব্রত বোধ করল। হুলোডাকাত যদি মুখে রোমা ফাটানোর আওয়াজ করতে গিয়ে এই মুহূর্তে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলে তার জন্য বিজনও পরোক্ষ দায়ী। অতএব, ভণ্ডুলের সঙ্গে বিজনও অনুরোধের গলায় বলতে লাগল, ‘হুলোবাবু, একটু জল খান।'
বাতাসা আর জল খেয়ে হুলোডাকাত সুস্থ হল। বিজনের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে ফেলে বলল, ‘মাঝেমধ্যে এরকম হয়। এখন তো আর আগের মতো দম পাই নে। কলজের জোরও কমে এয়েচে।'
বিজন হুলোডাকাতকে সন্তুষ্ট করার জন্য বলল, ‘এখনও যা আছে তাই যথেষ্ট।'
হুলোডাকাত একটু হাসল। কথায় কথায় ভূতগঞ্জের প্রসঙ্গ উঠল। বিজন বলল, “ওখানে কি এখনও ভূত-টুত আছে?’
হুলোডাকাত উত্তর দিল, ‘এই গাঁয়ে কে থাকবে বলুন তো। এটা একটা মরা গাঁ। আমাদের কোথাও যাওয়ার নেই। গাঁকে ভালবেসে থেকে গেছি। ভূতেরা তো তেমন নয়। তেনারা থাকবেন কেন?’
এসব কথায় বিজন খুব মজা পায়। বিজন জিজ্ঞেস করে, ‘তার মানে এখন আর কোনও ভূত নেই?’
হুলোডাকাত জবাব দেয়, ‘একেবারে নেই তা নয়। ওই আমাদের মতো গাঁকে ভালবেসে দু’-তিনটে ভূত-পরিবার থেকে গেছে। একখানা বাড়-বাড়ন্ত গ্রামে ভূত, ডাকাত, চোর, গোলাভরা ধান, খালে-বিলে মাছ, মাঠভরা ফসল, পাঠশালা, রগচটা বুড়োবুড়ি, খান দুই পাগল আর গোয়ালভর্তি গোরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি না থাকলে সেই গেরামের কি শ্রী বাড়ে? এই মরা গাঁয়ে একসময় সব ছ্যাল। ক্রেমে ক্রেমে সবাই চলে গেল।'
বিজন জানতে চাইল, ‘ভূতগুলো সব গেল কোথায়?’
হুলোডাকাত বলল, ‘কে জানে কোন চুলোয় গেল। দু'-তিনটে পরিবার আছে। অন্যরা কলকাতা, দিল্লি বা ওইসব দিকে গেছে। তেনাদের তো যেতে-আসতে টেরেনে ভাড়া লাগে না।”
ডাকাতপাড়ায় ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে আসছিল। বিজন একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হুলোডাকাতকে বলল, ‘হুলোবাবু, আজ উঠি৷’
সঙ্গে সঙ্গে হুলোডাকাত উঠে দাঁড়িয়ে অতিথি বিদায়ের ভঙ্গিতে বলল, ‘মাঝেমধ্যে এপাড়ায় চলে আসবেন। এটা হল আমার দোকান। আপনি এলে বড্ড ভাল লাগবে।'
ভণ্ডুলকে সঙ্গে নিয়ে বিজন উঠে দাঁড়াল। হুলোডাকাত সঙ্গে সঙ্গে মোষমারির খাল পর্যন্ত এল। খালের বুকে তখন অন্ধকার জমতে শুরু করেছে। দু'পাশে গাছগাছালি থাকার জন্য খালের জল আর তেমন দেখা যাচ্ছে না। খালের জলে খলবল করে শব্দ হচ্ছে। হুলোডাকাত বলল, ‘জালে বড় মাছ আটকেছে। বেশি দেরি করলে জাল ছিঁড়ে ফেলবে। এটা কার জাল?’
কথা শেষ করেই হুলোডাকাত গর্জন করে উঠে ডাকল, ‘কার জাল?’
খালের দু’পাড়ে গাছগাছালি আর ছাড়া ছাড়া জঙ্গল। ওই জঙ্গলের দিক থেকে উত্তর এল, ‘হুলোদাদা, আমার জাল।'
হুলোডাকাতের আবার গর্জন, ‘ইদিকে আয়।'
হুলোডাকাতের গায়ে-গতরে কতটা জোর তা বিজন জানে না, কিন্তু গলার জোর যে যথেষ্ট তা দিব্যি টের পাওয়া যাচ্ছে। একটু বাদেই বেঁটেখাটো একজন লোক লুঙ্গি বাঁধতে বাঁধতে এল। হুলোডাকাত তাকে দেখে বলল, শম্ভু, তোর জালে বড় মাছ আটকেছে। খলবলানির আওয়াজ পাচ্ছিস নে। এইবেলা জাল গুটিয়ে নে। আবার ঠাকুরের নাম দিয়ে নতুন করে জাল পেতে রাখ। রেতের বেলা জোয়ার আসবে।'
বোঝা গেল লোকটার নাম শম্ভু। শম্ভু বলল, ‘গুপিকে বাড়ি পায়ে দিচ্ছি লণ্ঠন আনতে। আলো না হলে জলে নামতে পারব না।'
হুলোডাকাত বিজনকে দেখিয়ে বলল, ‘এনারে চিনিস? আমাদের নইয়াচকের ডাকঘরের মাস্টারবাবু। আমাদের দেখবে বলে এয়েছিল। কী গো মাস্টার, আমাদের দেখতে আসেননি?’
বিজন বলল, ‘হ্যাঁ দেখতে এসেছিলাম! এখানে এসে ইস্তক হুলোডাকাতের নাম শুনছি। একবার না দেখলে চলে!’
হুলোডাকাত বলল, ‘তোর লন্ঠন আনতে কতক্ষণ লাগবে রে। মাস্টারবাবু আমাদের গাঁয়ে নতুন। তারে একটা মাছ দিবিনে?’
বিজন কিছু বলতে যাওয়ার আগেই শম্ভু বলে উঠল, ‘এ আবার একটা কথা হল? মাস্টারবাবু, এট্টু সবুর করুন। একবার যখন সাক্ষাৎ হল, তেখুন খালি হাতে যেতে দিবনি।' বিজন আবার কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু বলা হল না। ভণ্ডুল ফিসফিস করে বলল, ‘একদম মানা করবেন না। তাতে শম্ভুকাকা মনে কষ্ট পাবে।'
কথা শেষ হওয়ার আগেই দুটো লণ্ঠন নিয়ে দু’জন লোক এসে গেল। শম্ভু ভণ্ডুলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভণ্ডুল, আমি জাল তুলছি তুই আর ন্যাপা গিয়ে মাছগুলো ধর।'
পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরা দেখার অভিজ্ঞতা বিজনের ছিল কিন্তু এখানে পাতা জাল পুরোটা টেনে তুলল না। জালের যে দিকটা ফাঁকা ছিল সেই ফাঁকটুকু প্রথমে বন্ধ করে জালটা জলের ওপরে তুলে শম্ভু ঝাঁকাতে লাগল। লন্ঠনের অল্প আলোতে বিজন মাছগুলোকে দেখতে পেল। সেইসঙ্গে জালে বন্দি মাছগুলোর ছটফটানির শব্দ। ভণ্ডুল পরনের লুঙ্গিটা খুলে হাফপ্যান্ট পরে জলে নামল। সঙ্গে আরও একজন। একজন জালের ফাঁকা দিকটা আটকাচ্ছে আর ভন্ডুল বড় বড় মাছগুলোকে ধরে ডাঙায় ছুড়ে ছুড়ে দিচ্ছে। কয়েকটা ছোট মাছ জাল তোলবার সময় লাফিয়ে পালাল। মোষমারির খালের এদিকে তখন বড় বড় ঘাসের ওপর নানা সাইজের অনেক মাছ। মাছগুলো প্রথমে বিশু গুনল। একটা মাছ হাতে নিয়ে বিড়বিড় করে কীসব বলে সেটা একটা থলেতে ভরে দিল। এবার কিলো দেড়েক ওজনের একটা রুইমাছ তুলে তার কানকোতে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে এসে দাঁড়াল বিজনের কাছে। বিনীত ভঙ্গিতে বলল, ‘নেন মাস্টারবাবু। মোষমারির খালের মাছ, তার সোয়াদ বড় ভাল। হাতে করে নেন।
বিজনকে নিতেই হল। ব্রিজ পেরিয়ে আসার পর এপার থেকে বিজন দেখল অন্ধকারে হ্যারিকেন দুলিয়ে হুলোডাকাত আর শম্ভু তাদের তখনও বিদায় জানিয়ে চলেছে।
রাত্রে ওই মাছের ঝোল রাঁধল ভণ্ডুল। ওর রান্নার হাতটি বড় ভাল। খাওয়া শেষ করে বারান্দায় এসে বসল বিজন। গোটা নইয়াচক যেন অসাড় হয়ে ঘুমোচ্ছে। বারান্দার সামনে গাছের মাথায় থোকা থোকা জোনাকি। পেছনের বাঁশবাগান থেকে শেয়ালের ডাক আসছে। রোজই বারকয়েক আসে। ঘরের কাজ মিটিয়ে ভণ্ডুল এসে বসেছে পাশে। সিগারেট খেতে খেতে বিজন বলল, ‘হ্যাঁ রে ভণ্ডুল, তোর ওই ভূতগঞ্জের জমিটা উদ্ধারের একটা ব্যবস্থা করবি না?’
ভণ্ডুল মৌরি চিবোতে চিবোতে বলল, ‘আমি কেমন করে উদ্ধার করব। না জানি নেকাপড়া, না আছে নোকবল। কপালে না থাকলে কিছুই হবে না। কথায় বলে না, ভাগ্যে নেই ঘি ঠকঠকালে হবে কী।
বিজন সিগারেটে টান দিয়ে চুপ করে থাকে। একটু পরে বলে, ‘তোর জ্ঞাতিরা তোকে ঠকিয়েছে। লেখাপড়া জানা থাকলে এটা পারত না। তোকে গ্রামে ঘুরে ঘুরে গ্রামসেবা করতে হবে না। তুই লেখাপড়া শেখ। আমি শেখাব।'
ভণ্ডুল কোনও উত্তর দিল না। অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে রইল।
এক রবিবারে ভণ্ডুলকে সঙ্গে নিয়ে বিজন এল ভূতগঞ্জের হাটে। হাটে আসার উদ্দেশ্য কিছু কেনাকাটা নয়। আগে থেকে খবর দেওয়া ছিল বলে। হুলোডাকাতও এসে অপেক্ষা করছিল হাটে। হুলোডাকাত একটা কাঠের টুলে বসে কলাপাতায় জিলিপি খাচ্ছিল আর কড়াইয়ে জিলিপি ভাজা দেখছিল। বিজনকে দেখে হুলোডাকাত উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘কই রে বিপনে, মাস্টারবাবুকে বসবার জায়গা দে।'
হুলোডাকাত বলার সঙ্গে সঙ্গে একটা ছেলে বিজনের সামনে দিয়ে দৌড়ে গিয়ে উলটোদিকে কাঠের টুল বেলন-চাকি আর বারকোশ বিক্রি করছিল যে লোকটা তার কাছ থেকে একটা কাঠের টুল তুলে এনে পেতে দিল। দোকানদার কী যেন একটা বলল। জিলিপি ভাজতে ভাজতে বিপিন বলে উঠল, ‘অত হ্যাক্কাই কীসের রে! তোর সব টুল কি একসঙ্গে বিক্রি হবে? মাস্টারবাবুর জন্য নিলাম। ডাকঘরের মাস্টারবাবু।'
লোকটা মিইয়ে গেল। হাতজোড় করে বিজনকে নমস্কার করতে করতে বলল, ‘পেন্নাম মাস্টারবাবু। অপরাধ নেবেন না।’
কড়াই থেকে গরম জিলিপি কাঠের বারকোশে ঢালতে ঢালতে বিপিন বলল, ‘মাস্টারবাবু, জিলিপি খাবেন না?’
বিজন বলল, ‘এখন না, আগে হাটটা ঘুরে দেখি।'
বিজন কথা শেষ করে হুলোডাকাতের দিকে তাকাল। ফিসফিস করে বলল, ‘তেনাদের সাক্ষাৎ কখন পাব? আপনি তো বলেছিলেন যে দু’-তিনটে ভূত পরিবার আছে তাদের সঙ্গে মোলাকাত করাবেন।'
জিলিপি খাওয়া শেষ করে হুলোডাকাত ঢকঢক করে এক ঘটি জল খেয়ে নিয়ে বলল, ‘তেনারা অ্যাখন হাটেই আছেন। আঁধার নামলে যেতে হবে।'
অতএব, হুলোডাকাতকে সঙ্গে করে বিজন হাটে ঘুরতে বেরোল। এই হাটে সবই লভ্য। নিমগাছের গায়ে আয়না ঝুলিয়ে একটা সেলুন। সেলুনের নাম ‘গ্র্যান্ড হেয়ার কাটিং সেলুন'। একটা লোক হাতল ছাড়া চেয়ারে বসে দাড়ি কামাচ্ছে। পেটের যাবতীয় রোগ সারিয়ে দেওয়ার মহৌষধ বিক্রি হচ্ছে আট আনায়। একটা জায়গায় পিচবোর্ডের ওপর লেখা, ‘এইখানে উত্তমরূপে দাঁত তোলা এবং বাঁধানো হয়।'
দাঁত তোলার দোকানের সামনে এসে বিজন থমকে দাঁড়াল। একটা ছোট কাঠের টেবিলের ওপর নানারকম শিশি। ডাক্তার বসেছেন হাতল ছাড়া একটা চেয়ারে। গাছের সঙ্গে একটা আঁকশিতে ঝুলছে তেল চিটচিটে কালো রঙের কোট। সম্ভবত ওটা দাঁতের ডাক্তারের। মোটা এবং খর্বকায় সেই ডাক্তারের নাকের নীচে বিশাল এক গোঁফ। দেখে মনে হচ্ছে ঠিক যেন গোঁফ নয়। কিছু খুচরো চুল মোটা করে নাকের নীচে আটকে দেওয়া হয়েছে। একটা লোকের তখন দাঁত তোলার উদ্যোগ হচ্ছে। ভণ্ডুল বলল, ‘সম্ভবত ডাক্তার সুতো দিয়ে দাঁত তোলে।'
মস্ত বড় ডাক্তারবাবুর দাঁত তোলা দেখার জন্য বিজন দাঁড়িয়ে গেল। গোড়া থেকেই সে লক্ষ করেছিল, ডাক্তারবাবুর কাঁধে একটি লাল রঙের গামছা। দাঁত তুলতে গামছার কী প্রয়োজন সেটা বিজন বুঝতে পারল না। ডাক্তার সামনে দাঁড়ানো লোকটাকে হুকুম করার ভঙ্গিতে বললেন, ‘দাঁইড়ে থাকলে হবে না। হাঁটু মুড়ে মাটিতে বোসো।'
রোগী তাই করল। ডাক্তার বললেন, ‘বড় করে হাঁ করো। আরও বড় করো। হ্যাঁ। মুখ নোটে বুজবে না। দাঁতে তো পোকা লেগে দফারফা। একখানি তুললে হবে না। পাশের দুষ্ট দাঁতটিও তুলতে হবে। এবার মুখ বন্ধ করো। দুটি দাঁত দু’ টাকা। আগে টাকা বার করো।' দাঁতের রোগী দুটো টাকা বার করে ডাক্তারের হাতে দিল। ডাক্তার টাকা দুটো পকেটে
পুরে বললেন, ‘সেই আগের মতো বড় করে হাঁ করো।'
রোগী তাই করল। ডাক্তারবাবু এবার একটা সুতো হাতের আঙুলে পাকিয়ে কী একটা করলেন। নিজের কাঁধের গামছাটা রোগীর গলায় পেঁচিয়ে দিয়ে বাঁ হাতে শক্ত করে ধরলেন। মনে হচ্ছে কাউকে যেন গলায় গামছা দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে। সুতো দিয়ে দাঁতে টান দিতেই রোগী ‘আঁ’ বলে আর্তনাদ করে উঠে ছটফট করতে লাগল। ডাক্তারবাবু ধমক দিয়ে বলে উঠলেন, ‘চোপ! একদম আওয়াজ করবে না। এবার পরেরটা।'
আর একটা দাঁত তোলার পর রোগীর আর বসে থাকার ক্ষমতা নেই। হাঁটু মুড়ে বসেছিল। এবার এই অবস্থাতেই চিত হয়ে শুয়ে পড়ল। ডাক্তার এবার রোগীর বুকে হাঁটু ঠেসে বসেছেন। গলার গামছা ধরে টান মেরে মাথাটা তুলে বললেন, ‘সবুর করো। ব্যথাবেদনা দূর করে দিচ্ছি।' বাঁ হাতের গামছা এবার ডান হাতে। বাঁ হাত দিয়ে টেবিল থেকে একটা শিশি এনে ময়দার গুঁড়োর মতো কিছু একটা বার করে রোগীর মুখের মধ্যে চেপে ধরে দুই গালে দুটো চড় মেরে বলল, ‘ওই বাবলা গাছের নীচে গিয়ে বসে থাকো। ডাকলে আসবে। যাও।'
লোকটা এক হাতে গাল চেপে বাবলা গাছের নীচে গিয়ে বসল। বিজন দেখল, এখানে আরও কয়েকজন লোক গালে হাত দিয়ে বসে কাতরাচ্ছে আর ডাক্তারের ডাকের প্রতীক্ষা করছে।
‘মস্তবড় ডাক্তার’-এর দাঁত তোলা দেখে বিজনের নিজের দাঁতেই যেন ব্যথা শুরু হয়ে গেল। মেলাতে আরও খানিকক্ষণ ঘোরাঘুরি করতে হল। কেননা, হুলোডাকাত বলেছে, আঁধার না হলে তেনাদের দেখা মিলবে না। ওই মেলাতেই কোষ্ঠীবিচার, হাত দেখা, জরিবুটি সব রয়েছে। সব ঘুরে ঘুরে দেখতে বিকেল হয়ে এল। গাছের মাথা চুঁইয়ে অন্ধকার নামছে। যাওয়া যাক।'
হুলোডাকাত বলল, 'চলুন এবার ওদের পাড়ায়।'
বিজন বলল, ‘এখান থেকে কতদূর?’
হুলোডাকাত বলল, ‘বেশি না, এক ক্রোশের কম। চলুন রওনা দিই।'
হুলোডাকাত, ভণ্ডুল আর বিজন হাঁটতে আরম্ভ করল। যত এগোয় গ্রাম ততই ঘন হয়ে ওঠে। বাঁশবাগান, আমকাঁঠালের বাগান আর ঝোপ-জঙ্গলে চলার পথটা যেন অন্ধকার। মনে হয় যতটুকু দিনের আলো ছিল, সব যেন শুষে নিয়েছে এই গাছপালা। থেকে থেকে এক একটা তালগাছ। শেষ বেলায় বাতাস লেগে তালগাছের শুকনো পাতায় খড় খড় আওয়াজ উঠছে। হুলোডাকাত বাঁদিকের একটা ডোবার দিকে দেখিয়ে বলল, ‘ওটি হচ্ছে ভূতগঞ্জের ভাগাড়। এ তল্লাটে একটাই ভাগাড়।'
বিজন বলল, ‘তেনারা কি ভাগাড়েই থাকেন?’
হুলোডাকাত বলল, ‘না। এটি পেরিয়ে গেলেই আসল ভূতপাড়া। তেনাদের দর্শন ওখানেই পাবেন।'
আরও কিছুটা আসার পর একখানা টিনের দোচালা বাড়ি দেখা গেল। বাড়ির সামনে মস্তবড় উঠোন। বাঁশের বেড়া দিয়ে উঠোনটা ঘেরা। বেড়া বোধহয় দেওয়া হয়েছিল অনেকদিন আগে। অযত্নে সেই বেড়া জায়গায় জায়গায় ভেঙে খসে গেছে। উঠোনে এত রকমের গাছপালা, দেখলে জঙ্গল মনে হয়। বিজন কিছু বলতে যাচ্ছিল, হুলোডাকাত ইশারায় চুপ করতে বলল। উঠোন পেরিয়ে ঘরের বারান্দায় যেতে হলে বাঁশের গেট খুলতে হয়। সেটা একেবারে রাস্তার ওপর। হুলোডাকাত সেই বাঁশের গেটটা খুলতেই ক্যা ক্যা করে গেটটার আওয়াজ উঠল। সেই আওয়াজ পেয়ে অন্ধকার বারান্দা থেকে খসখসে গলায় কেউ একজন প্রশ্ন করল, ‘কে? কে আসে?'
হুলোডাকাত উত্তর দিল, ‘বনমালীদা, আমি হুলো, হুলোডাকাত।'
ওই অন্ধকার বারান্দা থেকে বনমালী বলল, ‘সে কী! সন্ধে বেলাতেই ডাকাতি করতে এলি। তোদের নিয়মকানুনের কোনও বালাই নেই বাছা। আগে একটা খবর দিতে হয় তো। ঘরে তো কিছুই জোগাড় নেই।'
উঠোন পেরিয়ে বিজনরা ততক্ষণে বারান্দায় পা রেখেছে। বনমালী বলল, ‘দাঁড়া, লণ্ঠনটা আনি।'
কিন্তু বনমালী উঠল না। বারান্দার ওপর একটা তক্তপোশ। ওখানে বসেই হাঁক দিল, 'ওই পটু, লণ্ঠনটা নে আয়।'
একটু পরে লন্ঠন জ্বালিয়ে একটি মেয়ে এল। বয়স বিশ-একুশ হবে। পরনে সাদা শাড়ি। দেখলেই বোঝা যায় বিধবা। লন্ঠন এনে বারান্দায় রাখতে রাখতে বলল, ‘হুলোকাকা ভাল আছ?’
হুলোডাকাত ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘তোরে এই সাজে দেখলে মনটা বড় কামড়ায়। ভাল থাকি কেমন করে!’
বনমালী এবার নিজে হ্যারিকেন তুলে সবার মুখ দেখতে দেখতে বলল, ‘এটা তো ভণ্ডুল। তা এটা কে? এই বুঝি তোর ডাকাতের দল? হিঃ, দল বাড়াতে পারিস না?’
বনমালীর কণ্ঠে ভর্ৎসনা। হুলোডাকাত বলল, ‘ডাকাতি করতে আসিনি। ইনি হচ্ছেন গিয়ে ডাকঘরের মাস্টারবাবু। ভূত দেখবে বলে তোমায় ঠাঁয় এয়েচে। তেনারা তো তোমার কথা শোনে।'
বনমালী লন্ঠন বারান্দায় নামিয়ে রাখতে রাখতে বলল, ‘যা দিনকাল পড়েছে তাতে বাপের কথা ছেলে শোনে না। তবু যে ওঁরা শুনছেন সেই আমার চোদ্দোপুরুষের ভাগ্য।' বিজন বলল, ‘আপনার এখানে তেনাদের দেখা যায়?’
বনমালী বলল, ‘দেখব বললেই কি আর দেখা যায় ! বাঘ বল, ভূত বল আর দত্যি-দানো যাই বল, সবাই তো মানুষকে ভয় করে। মানুষের চাইতে অদ্ভুত তো আর কেউ নেই।'
বিজন এবার তক্তপোশের ওপর বসতে বসতে জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে কি তেনাদের দেখা যায় না!’
বনমালী বলল, 'অনুভবে বুঝতে হয়। তেনারা তো ফিঙে পাখি নয় যে, মানুষের উঠোনে নেচে নেচে বেড়াবে। ভূত আর ভগবান, তেনাদের দেখতে হবে মনের ভিরে। অমনি অমনি দেখা যাবে না।'
বিজন মনে মনে হতাশ হয়ে পড়ল। ভগবান দেখার সৌভাগ্য তার নেই। ভেবেছিল এ গাঁয়ে এসে ভূতটা অন্তত দেখা হবে। কিন্তু তাও বুঝি হচ্ছে না। বিজনের মনের ভাবটা আন্দাজ করে ভণ্ডুল বলল, ‘ও কাকা, একখানা কচি-কাঁচাও দেখা যাবে না?’
বনমালী বলল, ‘দেখবি কেমন করে। মোটে তো তিন ঘর ভূত আছে। তাও ক’দিন থাকবে কে জানে। মানুষরা তো ভূতদের নিয়ে কম ঠাট্টা-ইয়ারকি করে না। সেদিন সন্ধেবেলা ওই উঠোনের গাবগাছে পা ঝুলিয়ে বসে মুকুন্দকাকা খুব দুঃখ করছিলেন।'
বিজন মনে মনে ভাবল, গাঁয়ের একজন বয়স্ক লোক ভর সন্ধেবেলায় গাবগাছে পা ঝুলিয়ে বসে দুঃখ করবে কেন? দুঃখপ্রকাশের জন্য আর কোনও উপযুক্ত জায়গা ছিল না? কিন্তু এই ভাবনাটা বেশিক্ষণ ভাবতে হল না। একটু পরেই বোঝা গেল, মুকুন্দ পাড়ুই আজ থেকে দশ বছর আগে মরে গিয়ে ভূত হয়ে গেছে। ভূত হয়ে যাওয়ার পর খুব স্বাভাবিকভাবেই ভূতদের নিজস্ব পাড়া ভূতগঞ্জে চলে এসেছে। উনিই আপাতত এই অঞ্চলের প্রবীণ ভূত।
বিজন জিজ্ঞেস করল, ‘মুকুন্দবাবুর সঙ্গে প্রায়ই তাহলে আপনার কথাবার্তা হয়?’ বনমালী উত্তর দিল, ‘হয় বই কী!’
বিজন বলল, ‘সেদিন উনি কী নিয়ে দুঃখপ্রকাশ করছিলেন?’
বনমালী উত্তর দিল, ‘এই গেরামের কথা হচ্ছিল। মুকুন্দদা বলতিছিলেন, দেখ বনমালী, গাঁখানা মরে এয়েচে। বাইরে থেকে চোর-ডাকাত এসে গেরামে হামলা করছে। আগে এমনটা হত? হুলো আর নুরোরা আপসে ডাকাতি করত, সেইসঙ্গে গ্রাম রক্ষে করত। এখন কতকাল গাবগাছে বসে ঠ্যাং ঝুলিয়ে গ্রাম রক্ষে করব বলদিনি। মরে গিয়ে ভূত হয়েও নিস্তার নেই।'
বাইরের উঠোন জুড়ে থকথকে অন্ধকার। সেই অন্ধকারে জোনাকির ওড়াউড়ি চলছে। বিজন বলল, ‘আপনার এখানে বিস্তর গাছপালা তাই না?’
বনমালী উত্তর দিল, ‘সবই তো গাঁয়ের লোকের জন্য করেছিলুম। কালমেঘের গাছ, পাথরকুচি পাতা, নিশিন্দে পাতা, বাকসপাতা, আরও কতরকম। এখনও অনেকে এসে নে যায়। গাঁয়ে এসব থাকলে ডাক্তার বদ্যির দরকার হয় না।'
বনমালীর বিধবা মেয়ে পটু ততক্ষণে নারকোলকোরা, মুড়ি আর তালপাটালি এনে খেতে দিয়েছে। বনমালী মেয়েকে বলল, ‘পটু, সরায় করে তেনাদের খাবার দে। গাবতলায় দিয়ে আসি।'
বিজন মুড়ি খেতে খেতে বলল, ‘এই ভূতগঞ্জেই ভণ্ডুলের কিছুটা জমি বেদখলি হয়ে রয়েছে। ওই জমিটা উদ্ধারের কী ব্যবস্থা করা যায়?’
বনমালী মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, 'সবই জানি। কোর্ট-কাছারি করার পথ বন্ধ। কারণ ভণ্ডুলের কাছে কোনও কাগজপত্তর নেই। দ্বিতীয় পথ লাঠালাঠি। সেটা ভণ্ডুল চায় না। ওকে তো মেরে রেখেছে ওর জ্ঞাতিরা। ঘরের ইঁদুর বাঁধন কাটলে তারে আটকাবে ক্যামনে। জ্ঞাতি শত্তুরের চাইতে বড় শত্রুর হয় না।'
ভণ্ডুল যেন প্রসঙ্গটা চাপা দেওয়ার জন্যই বলল, ‘ওসব কথা থাক কাকু। এক গাঁয়ে বাস করে লাঠালাঠি করতে পারবুনি।'
বনমালী বলল, ‘করবি ক্যামনে? গাঁয়ে আর লাঠি ধরার ছেলে আছে! কোনও শরীর শিক্ষে নেই। হুলো বলেছিল ডাকাতির পাঠশালা করবে। তা করলেও শরীর শিক্ষে হত, গাঁয়ের বিপদে লাঠি ধরার ছেলে পাওয়া যেত। কিন্তু হুলো তো করতেই পারল না।'
হুলোডাকাতকে এবার বেশ লজ্জিত দেখাল। সে বলল, 'ইচ্ছেটা এখনও মরে যায়নি। সেরেফ.দমে আছে। দেখি কী হয়!’
বিজনরা যখন উঠে আসছে তখন পটু মাটির সরায় কলাপাতা ঢাকা দিয়ে কিছু একটা নিয়ে এল। বনমালীর হাতে দিয়ে বলল, ‘বাবা, খাবারটা নাও।'
বনমালী দু’হাতে মাটির সরা ধরে গাবগাছের তলায় গেল। গাছের তলায় সরা রেখে বলল, ‘মুকুন্দদা, খাবার রইল। কুকুর-বেড়ালে মুখ দেওয়ার আগে নেমে এসে খেয়ে নিয়ো। ওরা বোধহয় হাট থেকেই খেয়ে আসবে।'
বিজনরা গেট পেরিয়ে আসবার সময়ও গাবগাছের তলায় কারও ছায়া পর্যন্ত দেখতে পেল না। কিন্তু শুনতে পেল, বনমালীদা বলছেন, ‘বাজারে জিনিসপত্রের আকাল। ভাল-মন্দ জোটাতে পারি নে। যা জোটে তাই মুখে দাও।'
ক্রমাগত অবিশ্বাস্য ঘটনার মধ্যে থাকতে থাকতে একসময় সবই বিশ্বাস্য মনে হতে থাকে। নইয়াচক আর তার আশপাশের গ্রামের ঘটনাগুলোও ক্রমে ক্রমে বিজনের গা-সওয়া হয়ে গেল। কোনও কিছুতেই আর অবিশ্বাস হয় না। রাত্রিবেলা ভণ্ডুলকে পড়াতে পড়াতে ভণ্ডুল যখন বলে, ফি বছর মনসাপুজোয় শনাপাড়ার মনসা মন্দিরে হাজার হাজার সাপ আসে এবং গ্রামের লোকের দেওয়া দুধ-কলা চেটেপুটে খেয়ে নাচতে নাচতে চলে যায়, তখন বিজন কোনও প্রতিবাদ করে না। যদিও সে জানে চুকচুক করে অথবা চেটেপুটে দুধ খাওয়ার ক্ষমতা সাপেদের নেই। বছরে একবার কোটালের বানে মোষমারির খালে ঝাঁকে ঝাঁকে কুমির যদিও ঢুকে পড়ার ঘটনাও বিজনের কাছে আর অবিশ্বাস্য মনে হয় না। এদের বিশ্বাস, ভালবাসা আর আবেগ এতটাই নিখাদ যে, বিজন শহরের মন আর মানসিকতা দিয়ে তাকে ছুঁতে পারে না।
এই গ্রামেই বিজনের দিন-রাত্রি কেটে যায়। গাঁয়ের লোকদের কাছে ডাকঘরের মাস্টারবাবুর অনেক খাতির। কেউ দিয়ে যায় গাছের পাকা পেঁপে, কেউ বাতাবি লেবু, কেউ বা মাচার শসা, লাউ, পুকুরের মাছ। গাঁয়ের লোকের কাছে ভণ্ডুল তাকে প্রায় দেবতা বানিয়ে ফেলেছে। পুজোতে ডাকাতপাড়া আর নইয়াচকের আসরে গিয়ে ভণ্ডুলের পীড়াপীড়িতে বিজন গানও গেয়েছিল। এসব গান এ গাঁয়ে কেউ একটা শোনেনি। রবীন্দ্রনাথের দু'খানা গান গাওয়ার পর ‘কোনও এক গাঁয়ের বধূ’ গাইবার পর আসরে হইচই পড়ে গেল। শহরে যেমন ভাল লাগলে দেদার হাততালি এখানে শুধু শুকনো তালি নয়। আসরের মধ্যে ছুটে এসে সেফটিপিন দিয়ে জামায় আটকে দিচ্ছে এক টাকা দু’ টাকার নোট।
পুজো চলে গেলে কালীপুজো। ডাকাতপাড়ার কালীপুজো এ তল্লাটে বিখ্যাত। কালীপুজোর পর শীত নামতে আরম্ভ করল। মাঠে মাঠে পাকা ধানের সোনালি শিহরন। পাড়ায় পাড়ায় ধান সেদ্ধ করার গন্ধ। ঢেঁকির পাড় দেওয়ার আওয়াজ। অভাবি গ্রামের মুখে অঘ্রাণের হাসি।
সময় থেমে থাকে না। চাকা ঘুরতে ঘুরতে আবার রুক্ষ বোশেখ আসে। মোষমারির খালে জল শুকিয়ে তলানিতে পৌঁছয়। রোদের তাপে নইয়াচক পুড়তে থাকে। ঝলসে যায় গাছগাছালির পাতা। থেকে থেকে মাঠের ওপর দিয়ে ঘূর্ণি হাওয়ার পাক খেয়ে ঘুরতে ঘুরতে উড়ে যায় শুকনো পাতা, ধুলো আর কাগজের ছেঁড়া টুকরো। মাঝে মাঝে ঝড় ওঠে। গাছের ডাল ভেঙে রাস্তায় পড়ে আবার ঝড় থেমে গেলে নইয়াচক শান্ত হয়ে যায়। এবার আষাঢ়ের মাঝামাঝি আকাশ কাঁপিয়ে ঝড় আর বৃষ্টি এল। গরানকাঠির মাঠের ওপর দিয়ে বৃষ্টিগুলো ছুটে আসে যেন বর্গি হানাদারের মতো। ঝড়ের বেগ কমে-বাড়ে কিন্তু বৃষ্টি ধরে না। মোষমারির খাল ভেসে হড়হড় করে গাঁয়ের দু’দিকে জল ঢুকে পড়ে। তিনদিনের ঝড়-জলে মানিকচকের বাঁধ ভেঙে গিয়ে মোষমারির খাল যেন পুরোপুরি বে-আব্রু। ঝুপঝাপ করে পাড়ের মাটি খসে পড়ে গোটা গ্রাম নদী হয়ে যায়।
ভণ্ডুলদের এখন নাওয়া-খাওয়ার সময় নেই। সবাই বানভাসি গ্রাম রক্ষা করতে কোমর রেঁধে নেমে পড়েছে। হুলোডাকাত আর নুরোডাকাত হেঁকে হেঁকে বলছে, ‘গ্রামবাসী, গ্রাম রক্ষে কর। মা-রে আমার ভেসে দিবুনি।'
সবার কাতর চিৎকারে গ্রামের বাতাস কাঁপে, তবু গ্রাম ভাসতে থাকে। কলকল করে জল ঢুকে পড়ে ঘরের মধ্যে। সেই জলে ভেসে আসে কচুরিপানা। কিলবিল করে সরু সরু সাপ।
শহর থেকে বিকেলের দিকে কাগজ আসে বিজনের কাছে। বিজন তন্নতন্ন করে কাগজ খোঁজে। অন্য জায়গার খবর থাকলেও বানভাসি নইয়ারচকের কোনও খবর নেই। বিডিও সাহেব বিরক্ত হয়ে বিজনকে বলেন, “চিঠি লিখে লিখে আঙুল ব্যথা হয়ে গেল। রিলিফের কোনও ব্যবস্থা নেই। মনে হয় চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে যাই। গাঁয়ের লোকগুলো এবার মরবে।'
বিডিওর অফিসে-বাড়িতে আর্ত লোকদের ভিড় বাড়তে থাকে। হুলোডাকাত বলে, ‘বিডিও সাহেব, আপনি চিঠি পাঠাচ্ছেন তা জানি। কিন্তু গাঁয়ে কিছু আসছে না। আপনি আজ্ঞে করুন, আমি আর নুরো মিলে সদরে গে সত্যিকারের ডাকাতি করি। চাল-ডাল, চিড়ে-মুড়ি যা পাই লুটপাট করে নে আসি। চোখের সামনে তো গেরামের লোকদের না খেয়ে মরতে দিতে পারি না।'
নুরো ডাকাতের বিশাল গোঁফ। সেই গোঁফে ঘনঘন হাত বোলানো মানে তার ভেতরে উত্তেজনা বাড়ছে। নুরো উত্তেজিত গলাতেই বলল, 'উঠোনে জল খলবল করছে। যতটা সাধ্যি ছিল তারই মধ্যি বাঁশের মাচা বানিয়ে লোক রেখেছি। আমার ঘরেও গাঁ লোক। কিন্তু এতগুলান লোক খেতে দেবার সামথ্যি আমার নেই। একটা কিছু বিহিত করুন।'
নুরো আর হুলোর সঙ্গে গাঁয়ের লোক মিলে দিনে পাড়ায় পাড়ায় ভিক্ষে করে চাল, ডাল, চিড়ে সংগ্রহ করে, ভণ্ডুল লোকজন নিয়ে খিচুড়ি রাঁধে। কিন্তু ভিক্ষে দেওয়ার লোকও তো কম। পঞ্চায়েতের লোকজনও দিশেহারা। সন্ধের পর গভীর আঁধার নেমে আসে সারা গ্রামে। কলার ভেলায় জলের ওপর ঘুরতে ঘুরতে হুলোডাকাত আর নুরোডাকাতের লোক গ্রাম পাহারা দেয়। হাক পেড়ে পেড়ে বলে, ‘সাবধান। জল বাড়তিছে। ভয় পেয়ো না, আমরা আছি।'
গ্রামে জল ঢোকার পথ বন্ধ করার সব চেষ্টাই জলের তোড়ে ভেসে যায়। হুলো আর নুরো আলো ফোটার পর আবার মাটি কেটে বাঁধ বানায়। এই করতে করতে একসময় জল সরতে থাকে। রোদের আলোয় ভেজা গ্রাম জাগতে থাকে। পথেঘাটে তখন দুর্গন্ধ। বিডিও অফিস থেকে আনা ব্লিচিং পাউডার আর ফিনাইল ছড়ানো হয়। আস্তে আস্তে গ্রাম শুকোতে থাকে। দুঃখের প্লাবনের পর মানুষজন আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যায়।
একদিন ভণ্ডুল পোস্ট অফিসে এসে বলে, ‘যাক, আপদ গেছে।'
বিজন জিজ্ঞেস করে, ‘কীসের আপদ?’
ভণ্ডুল বলে, ‘আমার জ্ঞাতিরা ভূতগঞ্জের জমিটা দখল করে নিয়েছিল তো, কিন্তু বানের জল এসে সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। নুরোদা এখন তার লোক দিয়ে, ওই জমি বেড়া দিয়ে দিচ্ছে। আর কেউ দখল নিতে পারবে না।'
বিজনের কাছে এটা অবশ্য খুব ভাল খবর। বিজন বলল, ‘জল শুকিয়ে জমিটা খটখটে হয়ে গেলে ওখানে ঘর বানা। জমি ফেলে রাখলে আবার দখল করে নেবে।'
ভণ্ডুল বলল, ‘তাই করব। কিছু একটা করতে হবে। নিজের জন্যে কিছু চাই না। আমি তো আপনার এখানে দিব্যি থাকি। আমার আবার থাকাথাকির কী ব্যাপার।'
জীবনে চাহিদাহীন এমন মানুষ কখনও দেখেনি। সে অবাক হয়ে ভণ্ডুলের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর কালো মুখে তখন চাঁদের আলো।
দেড় বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিজন বদলি হয়ে পলতায় চলে এল। নইয়াচকের মানুষগুলো অনেকদিন তার স্মৃতিতে ছিল। সেই স্মৃতিও ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে এসেছে। নইয়াচক ছেড়ে আসার অনেকদিন পর তার নামে একটা চিঠি এল। খামের ওপরে ইংরেজিতে ঠিকানা লেখা। চিঠিটা খুলে প্রথমে চিঠির মাথার দিকে তাকাল। সেখানে বাংলায় লেখা ‘নইয়ার চক’। বিজন চমকে চিঠির শেষটা দেখল। চিঠির তলায় লেখা ‘ইতি আপনার স্নেহধন্য ভণ্ডুল।'
বিজনের মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এখানে এসে একটা চিঠি ভণ্ডুলকে সে লিখেছিল। কোনও উত্তর না পেয়ে আর লেখেনি। এবার ভণ্ডুলের চিঠি পড়ে জানা গেল, সে নিজে চিঠি লিখতে পারবে না বলে লজ্জায় লেখেনি। সেদিন থেকে সে আরও মন দিয়ে লেখাপড়া শুরু করে। নতুন মাস্টার তাকে ইংরেজি লিখতেও শিখিয়ে দিয়েছে। খামের ওপরে ইংরেজি লেখাটা তারই। গ্রামের সবাই কুশলে আছে। ভূতগঞ্জে তার যে জমি তাতে নুরোদা আর হুলোদা মিলে ডাকাতির পাঠশালা করেছে। সেখানে শারীরশিক্ষা হয়। বনমালীকাকা আর বেঁচে নেই। পটু এখন গাঁয়ের হাটেই আনাজ বিক্রি করে। কিন্তু মুকুন্দজেঠু এখনও গাবগাছে পা ঝুলিয়ে বসে একই সঙ্গে গ্রাম আর পটুকে পাহারা দিচ্ছে। পটু বড় দুঃখী। আমি যদি পটুকে বিয়ে করি তাহলে কি দোষ হবে? আপনার অনুমতি পেলে পটুকে বিয়ে করব। পটু রাজি হয়েছে। আপনি আমার বিয়েতে আসবেন তো? এখন আর রাজধানীর ঝাঁকানি নেই। রাস্তা ভাল হয়ে গেছে। ডাকঘর পর্যন্ত বাস আসে। কবে আসবেন? আপনি এলে বিয়ের কথা পাকা হবে।
চিঠি শেষ করে বিজন আনন্দে হুররে বলে চিৎকার করে উঠল। বিজনের নতুন বউ বলে উঠল। 'কী হল? কার চিঠি?’
বিজন বলল, ‘তোমাকে নইয়াচক আর ভণ্ডুলের কথা বলেছিলুম মনে আছে? সেই ভণ্ডুল এখন লিখতে শিখেছে। নিজে হাতে আমাকে চিঠি লিখেছে। ওর বিয়ে। বিয়ের জন্য আমার অনুমতি চায়।'
বিজনের বউ রত্না বলল, ‘অনুমতি দিয়ে দাও।
বিজন বলল, ‘চিঠি লিখে নয়। আমাকে যেতে বলেছে।'
বিজন ক্যালেন্ডার দেখতে দেখতে বলল, ‘আমি ছুটির দরখাস্ত করছি। নইয়াচকে যাব। সেই নইয়াচক। তুমি যাবে আমার সঙ্গে?’
রত্না উত্তর দেয়। ‘আমার বড্ড দেখার শখ। তুমি নিয়ে যাবে?’
.
আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী, ১৪০৫
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন