গুপির গুপ্তধন

দুলেন্দ্র ভৌমিক

মন মেজাজ ইদানীং ভাল যাচ্ছে না গুপিচাঁদের। গত মাসে বাবা নদেরচাঁদ মারা যাওয়ার পর থেকেই তার মন খারাপ। তার ওপরে দুই ভাই আছে। নিতাইচাঁদ এবং নিমাইচাঁদ। তাদের দেখে অবশ্য বোঝা যায় না যে, তাদের মনে কোনও কষ্ট আছে। দিব্যি দোকানদারি করছে, বড়বাজারে গিয়ে জিনিস কিনছে, গোছা গোছা পান খাচ্ছে, যত্রতত্র পানের পিক ফেলছে। দেখে মনেই হয় না যে, তাদের মধ্যে পিতৃবিয়োগের জন্য কোনও দুঃখবোধ জমেছে। ইছাপুর থেকে বড় পিসেমশাই এসেছিলেন গুপির বাবা নদেরচাদের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে। বাবার কাজ তো কবেই চুকেবুকে গেছে, কিন্তু পিসেমশাই আর ইছাপুরে যাননি। পিসিমা চলে যাওয়ার সময় আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বলেছিলেন, 'আমার তো সংসার ফেলে বেশিদিন থাকার উপায় নেই, তাই তোর পিসেমশাইকে রেখে গেলাম। অফিস তো ভি আর এস দিয়ে দিয়েছে। মানে গিলিয়ে দিয়েছে। বলতে গেলে বেকারই। ওই পিসেমশাই তোদের দেখেশুনে রাখবে। কিছুদিন অন্তত তোদের কাছে থাক।'

এই কিছুদিনটা যে কতদিন সেটা গুপির মতো তার দাদারাও জানে না। সবার বড় হল গিয়ে নিতাইচাঁদ। মেজো নিমাইচাঁদ। নিতাই একদিন পান চিবোতে চিবোতে বলল, হ্যা রে নিমে, পিসেমশাইয়ের পেটে গোত্তা মেরে দ্যাখ তো, উনি কতদিন এ-বাড়িতে থেকে শোক পালন করবেন।'

মেজোভাই নিমাই উত্তর দেওয়ার আগে সকলের ছোট গুপিচাঁদ বলল, ‘পিসিমা বলে গেছেন, আমরা তো নাবালক, তাই আমাদের আগলে রাখছেন।'

নিতাই জ্বলন্ত তুবড়ির মতো হুশ করে জ্বলে উঠে বলল, ‘কে বলল আমরা নাবালক? আমি তিরিশে পা বাড়াচ্ছি, নিমে ছাব্বিশে, মাঝখানে একটা ভাই ছিল, সে মারা গেছে। সবার শেষে গুপি। তা গুপির বয়সও তো প্রায়...’

গুপি এবার নিজেই বলল, ‘একুশ চলছে।’

মেজোভাই নিমাই বলল, ‘বাপ মরার শোক আমরা ভুলে গিয়ে নিজেদের কাজকম্মে মেতে উঠলাম, অথচ বোনের জামাইয়ের শোক পিসেমশাই যে এতদিনেও কেন ভুলতে পারলেন না কে জানে। তা ছাড়া আমাদের বাবা তো নিতান্ত অল্প বয়সে যাননি। সাতাশি শেষ করে অষ্টআশিতে পা দিয়ে গেলেন। এটাকে অকালমৃত্যু বললে স্বয়ং যমরাজও ঠাট্টা ভেবে হেসে উঠবে৷’ মাঝেমধ্যে ভাইদের মধ্যে এই বিষয়ে আলোচনা হয় বটে, কিন্তু পিসেমশাইয়ের ব্যাপারে কোনও ফয়সালা হয় না। গুপিচাদরা হল কালীপুরের খুব বনেদি পরিবার। পরিবারের সুনামের কথা ভেবে পিসেমশাইকে তাড়াতেও পারে না। অথচ তিনি ক্রমেই সহ্যাতীত হয়ে উঠছেন। গুপিচাঁদের ঠাকুর্দার নাম হল দুনিচাঁদ ঘোষাল। একেবারে ডাকসাইটে মানুষ। গুপি তার ঠাকুর্দাকে দেখেনি, কিন্তু ঠাকুর্দার তৈরি করা বাজারটা সে আজও দেখেছে। ঠাকুর্দার মৃত্যুর পর ওই বাজারটার নাম হয় 'দুনিবাবুর বাজার’। একখানা মস্ত বাজার থেকে তো কম আয় হয় না। অতএব, ঘোষালদের সচ্ছলতার কোনও কমতি ছিল না। সবই দুনিচাদের জন্য। নিতাই এবং নিমাইয়ের অনুমান এই বাজারের মধ্যে একটা বড় সাইজের দোকান বাগাবার তালে মনে মনে ফন্দি আঁটছেন পিসেমশাই।

ঘোষালবাড়ির একমাত্র জামাই, তাও আবার স্বর্গত দুনিচাঁদের মেয়ের জামাই, অতএব বাজারে এই পিসেমশাইয়ের হম্বিতম্বি অন্যরকম। ইদানীং দোকানগুলোর কাছ থেকে পিসেমশাই নবকুমার হালদার সম্পর্কে একটু-আধটু অভিযোগ আসতে শুরু করেছে। নিতাইচাঁদের ধারণা, এই অভিযোগের মাত্রা বেড়ে গেলে এবং তার কোনও প্রতিকার না হলে দুনিবাবুর বাজারে লাগাতার স্ট্রাইক শুরু হয়ে যেতে পারে। অতএব, পিসেমশাইয়ের ব্যাপারে নিতাই এবং নিমাই দু’জনেই খুব চিন্তিত। গুপি অবশ্য চিন্তিত নয়। সে জানে যা করবার তার দুই দাদাই করবে।

ইতিমধ্যে একটা ছোট ঘটনা ঘটে গেল। ঘটনাটা ছোট হলেও গুপির কাছে তার তাৎপর্য কিন্তু মোটেও ছোট নয়। বরং বেশ বড় এবং গভীর অর্থবহ বলা যায়। তাদের বাজারেই খ্যাপাদার দোকান। খ্যাপাদার ভাল নামটা শুধু ভাড়ার রসিদবই, রেশন কার্ড আর দোকানের ট্রেড লাইসেন্সে আছে। ওই নীতিন্দ্রনারায়ণ চট্টরাজ নামটা সম্ভবত খ্যাপাদার নিজেরও মনে নেই। মজা করার জন্য গুপি ও তার বন্ধুরা ছেলেবেলায় ‘নীতিন্দ্ৰবাবু’ বলে ডেকে দেখেছে, খ্যাপাদা কোনও সাড়া দেয়নি। তার নামটা যে কেন ‘খ্যাপা’ হল সে রহস্য কেউ জানে না, আমরাও জানি না। খ্যাপাদা খুব শান্ত স্বভাবের মানুষ। আস্তে আস্তে কথা বলে। কখনও কেউ তাকে রাগতে দেখেনি। তার দোকানে নানারকম জিনিস পাওয়া যেত। যতরকম জিনিস পাওয়া যায় তার অধিকাংশের নামই ছোট ছোট টিনের চাকতিতে লিখে দোকানে ঝুলিয়ে রাখতেন। ফলে, দোকানে এতরকম চাকতি ঝোলাতে হত যে, দোকান খুলে ওই চাকতিগুলো টানাতে পাক্কা এক ঘণ্টা এবং দোকান বন্ধের সময় চাকতি খুলতেও এক ঘণ্টা। পরে অবশ্য সনাতন বলে একটা ছোকরাকে দোকানে রাখা হয়েছিল। সে দোকান খোলার সময় এসে ওই চাকতিগুলো সাজাত। আবার বন্ধের সময় খুলে নিয়ে হিসেব করে সাজিয়ে রাখত। এটাই সনাতনের প্রধান কাজ। হাওয়া দিলে দড়িবাঁধা সেই টিনের চাকতিগুলো দুলত আর পরস্পরের গায়ে ধাক্কা লেগে একটা টুং টাং শব্দ উঠত। খ্যাপাদা তখন হাঁক দিয়ে বলত, ‘সনাতন, ওসব কীসের শব্দ?’

সনাতন নির্বিকার গলায় জবাব দিত, ‘ময়দা ডালডাকে ধাক্কা দিচ্ছে।' কখনও বলত, ‘পাঁপড় গোত্তা দিচ্ছে ডালের বড়িকে।’

নতুন লোক এসব কথার মানে বুঝতে পারত না। ওই সব ছোট ছোট টিনের চাকতিতে লেখা থাকত, ‘ডালডা,’ অন্যটাতে ‘ময়দা’। ফলে যখন হাওয়া লেগে ঠোকাঠুকি হত তখন সনাতন ওইভাবেই খ্যাপাদাকে ব্যাপারটা বোঝাত। খ্যাপাদার দোকানে কোন জিনিসটা পাওয়া যেত না সেটা বলা মুশকিল। বামুনের গলার পৈতে থেকে জুতোর কালি, মাছ ধরার ছিপ-বঁড়শি থেকে মাছের চারের মশলা, মাথা ধরার মলম থেকে বাতের ব্যথার দৈব ওষুধ। যা যা পাওয়া যেত তার তালিকা তৈরি করলে সেটা লম্বায় প্রায় একশো গজ ছাড়িয়ে যাবে।

সেদিন বাজারে ঢুকতে গিয়ে দেখল খ্যাপাদা খুব বিরক্ত মুখে গুপির ঠাকুর্দা দুনিচাঁদের কাছে দাঁড়িয়ে। দুনিচাঁদের তো সশরীরে এই মর্ত্যধামে আসবার উপায় নেই। কিন্তু বাজারের মধ্যে দুনিচাঁদের যে পাথরের মূর্তিটা স্থাপিত আছে তার কাছে মর্ত্যধামের যে কোনও লোকই যেতে পারে। গুপিকে দেখতে পেয়ে খ্যাপাদা হাতের ইশারায় ডাকল। গুপি কাছে গিয়ে খ্যাপাদার বিরক্তিভরা মুখটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কী হয়েছে খ্যাপাদা?’

খ্যাপাদা গুপির দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, ‘এসব কী হচ্ছে? এই অসভ্যতার শেষ কোথায়? বাজার কমিটি করে টা কী?’

গুপি চারপাশে তাকিয়ে একবার দেখে নিল। এরকম সময় রোজ যেমন থাকে বাজার আজও তাই আছে। কোনও অসংগতি চোখে পড়ল না, কোনওরকম অসভ্যতাও নয়। গুপিকে তাই বলতে হল, ‘কোন অসভ্যতার কথা আপনি বলছেন?'

খ্যাপাদা এক পা এগিয়ে এসে বলল, ‘এই বাজার যিনি প্রতিষ্ঠা করলেন সেই দুনিচাঁদ ঘোষাল, অর্থাৎ তোমার পিতামহ, তিনি কি সামান্য লোক! তিনি তাঁর স্বর্গগতা মা'র নামে প্রিয়বালা প্রাইমারি বিদ্যালয়ও স্থাপন করেছেন কদমখণ্ডীতে। বলতে গেলে তিনি একজন প্রাতঃস্মরণীয় মনীষী

গুপি বারদুই চোখ পিটপিট করে বলল, ‘কদমখণ্ডীটা আবার কোথায়?’

খ্যাপাদা বলল, ‘লাও ঠ্যালা। নিজেদের আসল দেশটার নাম জানো না। তোমার বাপ-ঠাকুর্দার জন্মভিটে। কাশীপুর তো তোমাদের দেশ নয়। তোমার ঠাকুর্দা পরে এসে এখানে বিস্তর জমিজায়গা কিনে জাঁকিয়ে বসেছে। কদমখণ্ডী হচ্ছে বীরভূমে। অজয় নদীর ধারে। একেবারে আউল-বাউলদের দেশ।'

গুপি মনে মনে ধন্দে পড়ে গেল। এসবের সঙ্গে ‘অসভ্যতা'র সম্পর্ক কোথায়? তাই বাধ্য হয়ে বলতে হল, ‘এর মধ্যে অসভ্যতার কী দেখলেন?’

খ্যাপা যেন তার কথার ‘সমে’ ফিরল। বলল, ‘এই যে শ্বেতপাথরের শুভ্র মর্মর মূর্তিটি, সেটি কার?’

গুপি বলল, ‘আমার ঠাকুর্দার।'

খ্যাপাদা প্রতিবাদের ভঙ্গিতে উঁহু উঁহু শব্দ করে মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল, ‘শুধু ওইটুকু বললে কি এই মহান মানুষটার পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যাবে? দুনিয়াতে তো ঠাকুর্দা, গ্র্যান্ডফাদার লাখে লাখে আছে। তাঁদের মধ্যে ক’জন প্রাতঃস্মরণীয় দুনিচাঁদ হয়েছেন। আমি বাজারে ঢুকবার সময়ে রোজ তোমার ঠাকুর্দাকে প্রণাম করি। কিন্তু বেশ ক’দিন ধরে দেখছি বাজারের কিছু লোক, স্নান করে এসে ভেজা গামছা, ভেজা লুঙ্গি তোমার ঠাকুর্দার হাতের ওপর, কাঁধের ওপর শুকোতে দেয়। কেউ বারণ শোনে না। আজ দেখি কোন হতচ্ছাড়ার একটা লাল জাঙিয়া তোমার ঠাকুর্দার টাকে শুকোচ্ছে। এসব অসভ্যতা নয়? তোমার দাদাদের অনেকবার বলেছি একটা ব্যবস্থা করতে। কিন্তু কিছু করেনি।

এতক্ষণে গুপি ব্যাপারটা বুঝল। এ-জিনিস গুপি নিজেও দেখেছে। তিনশো চৌষট্টি দিন এইরকমই চলে। মাথায় কাক বসা তো সাধারণ ঘটনা। মহাপুরুষদের পাথর এবং ব্রোঞ্জের মাথাটা কাকদের প্রিয় বসবার জায়গা, কেন কে জানে। মাথায় কাক না বসলে মূর্তির যেন স্টেটাস বাড়ে না। শুধু একটা দিন অন্যরকম হয়। সেটা না হলে বছরের তিনশো চৌষট্টি দিন না হয়ে তিনশো পঁয়ষট্টি দিনই এক রকম হত। সেই ব্যতিক্রমী দিনটা হল দোসরা আগস্ট। ওইদিন দুনিচাঁদের জন্মদিন বলে খুব ভোরে পাথরের মূর্তিটা জল দিয়ে সাফসুতরো করা হয়। তারপর গলায় ঝোলানো হয় খানকয়েক মালা। একটা মালা দেয় বাজার কমিটি, বাকি তিন-চারটে নিতাই আর নিমাইরাই নিজেদের পয়সায় কিনে আনে। গলায় দেওয়ার সময় অন্যদের নাম বলে। এইরকম ব্যাপার তো অনেকদিন থেকেই দেখে আসছে গুপি। এগুলো নিয়ে সে কখনও উত্তেজিত হয়নি। আজ মনে হল, তার উত্তেজিত হওয়া উচিত ছিল। এবং উত্তেজিত হওয়ার রাইট তার ছিল। গুপি খ্যাপাদাকে বলল, ‘আপনি ভাববেন না, আমি আজই এই ব্যাপারে দাদাদের সঙ্গে কথা বলে একটা বিহিত করব। সবাইকে নোটিস দেব।'

খ্যাপাদা বলল, ‘সেসব না হয় হবে। কিন্তু আপনি বাঁচলে বাপের নাম। উজান বেয়ে ঠাকুর্দার জন্য না ভেবে আগে নিজের বিহিত করো। আমার তো তোমাকে নিয়েই বেশি ভাবনা।'

গুপির ভ্রূ কুঁচকে গেল। বলল, ‘আমাকে নিয়ে ভাবনা? কীসের ভাবনা?

খ্যাপাদা তার অসংখ্য ব্রণলাঞ্ছিত মুখটাকে যথাসম্ভব করুণ করে বলল, ‘তোমাকে তো কাশীপুর ছেড়ে কদমখণ্ডীতে পাঠাবার ব্যবস্থা হচ্ছে।'

গুপি যেন হঠাৎ খেপে গেল। তবুও নিজেকে যথাসম্ভব সংযত রেখে বলল, ‘কে’ ব্যবস্থা করছে?’

খ্যাপা বলল, ‘তোমার দুই দাদা। দেশের বাড়িতে গিয়ে পুরনো বাড়ি আর জমিজমা দেখার কাজ তোমাকে করতে হবে।'

গুপি গম্ভীর হয়ে গেল। এরকম একটা প্রস্তাব তাকে আগেও দেওয়া হয়েছিল। তখন বাবা বেঁচে। অসুস্থ বাবার সেইরকম কোনও ইচ্ছা ছিল কিনা তা গুপি জানে না। তবে দাদাদের ইচ্ছে যে ষোলো আনা সেটা গুপি টের পায়। খ্যাপাদা যত সহজে ব্যাপারটা তাকে বলল, গুপি তত সহজে ঘটনাটা নিতে পারল না। তার বুকের মধ্যে একটা রাগ ফোঁস ফোঁস করতে লাগল। দাদারা কি তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে? চক্রান্ত করে সম্পত্তি থেকে বাদ দিতে চাইছে? কিন্তু সম্পত্তির সব কাগজপত্রেই তো তার নাম আছে। বেআইনি কাজ করলে সে আইনের সাহায্য নেবে। বাপ-ঠাকুর্দার সম্পত্তিতে অন্য ভাইদের মতো তারও পূর্ণ অধিকার।

বাজারের মধ্যে যতক্ষণ ছিল ততক্ষণ তার বুকের ভিতরে থমথম করছিল একটা রাগ। সময় যত গড়িয়ে যেতে লাগল, বুকের ভিতরের থমথমে রাগটা ক্রমশ তীব্র অভিমানের চেহারা নিতে আরম্ভ করল। তার মনখারাপ হতে লাগল। ঠাকুর্দাকে সে চোখে দেখেনি, কিন্তু বাবাকে দেখেছে। খুব বেশি করে বাবার কথা মনে হতে লাগল। মাকে গুপির খুব ভাল করে মনে পড়ে না। তার সাত বছর বয়সের স্মৃতিতে মা’র ছবিটা খুব একটা উজ্জ্বল নয়। তবু আজ মাকে খুব মনে করতে ইচ্ছে হল।

অন্যদিনের চাইতে একটু দেরি করে বাড়ি ফিরল গুপি। বাজারের দোকান বন্ধ করে দাদারা বাড়ি ফিরে এসেছে। নিজেদের বাজারে ঠাকুর্দার আমল থেকেই দুটো দোকান , নেওয়া ছিল। বাবা সেই দুটো দোকানের একটা বস্ত্র বিপণি ও অন্যটায় চালের দোকান করেছিলেন। দুটোই চালু দোকান। বড়দা আর মেজদা দোকান দুটো সামলায়। সেদিক থেকে দেখলে গুপির সত্যি কোনও কাজ নেই। দাদারা কি সেইজন্যেই গুপিকে কাজে লাগাতে চাইছে।

গুপিকে দেখে বড়দা নিতাইচাঁদ হাঁক দিয়ে ডাকল, ‘অ্যাই গুপি, এত রাত্তির পর্যন্ত বাড়ির বাইরে থাকিস কেন? দেখতেই তো পাচ্ছিস, দিনকাল ভাল নয়। জলজ্যান্ত লোকগুলো দিনদুপুরে ছিনতাই হচ্ছে। তোকে যদি ছিনতাই করে!’

গুপি মনে মনে বলল, ‘দিনকাল যে বেজায় খারাপ সে তো হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।' কিন্তু মুখে বলল, ‘আমাকে কেন ছিনতাই করবে? আমাদের অত টাকা কোথায়?’

নিমাইচাঁদ বলল, ‘ব্যবসায়ী হিসেবে আমরা যেমন নীচের দিকে, তেমনই ছিনতাইবাজরাও সবাই এক স্ট্যান্ডার্ডের নয়। তাদেরও আপার-লোয়ার আছে। আমাদের, মানে তোকে না হয় লোয়ার ক্যাটিগরির কেউ ছিনতাই করল। পাঁচ কোটি না হেঁকে পাঁচ লাখ হাঁকল।’

নিতাই বলল, ‘তেমন তো হতেই পারে। তাই আমরা তোকে নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবছি। তোকে কোনও একটা কাজকম্মে জুড়ে দিতে হবে। জানিস তো, বাবা বলতেন, অলস মস্তিষ্ক শয়তানের বাসা।'

খ্যাপাদার কথাটা এবার মনের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠতেই গুপি বলল, “তোমরা সিরিয়াসলি কোন ধরনের কাজকম্মে আমাকে জুড়তে চাইছ?’

নিতাইচাঁদ বলল, ‘দোকানদারি করার কাজ তোর দ্বারা হবে না। ওদিকে দেশের বাড়িতে জমিজিরেত যতটুকু আছে সেগুলো ঠিকমতো দেখভাল না করলে বারো ভূতে খাবে, না হয় বেদখল হয়ে যাবে। তাই ভাবছি...'

গুপি বড়দাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘তাই আমাকে কদমখণ্ডীতে জমির চৌকিদার করে পাঠাতে চাইছ?’

নিতাইচাঁদের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল। একবার মেজোভাই নিমাইচাঁদের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল, ‘বাঃ! তুই তো সবই জেনে গেছিস। তা হলে এবার শুভদিন দেখে রওনা দিলেই হয়।'

গুপি তার দাদাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি কোনওমতেই কদমখণ্ডী যাব না।' গুপি কথাটা বলে ঘর থেকে চলে আসবার সময় দেখল, তার দুই দাদা বিস্ফারিত চোখে পরস্পরের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করছে। গুপি যে ফস করে এমন একটা কথা বলে ফেলবে এটা যেন দাদাদের কাছে অকল্পনীয় ছিল।

কিন্তু অনেক অকল্পনীয় ব্যাপারও কল্পনার মধ্যে এসে যায় এবং লোকে মেনেও নেয়। দুই দাদা এবং দুই বউদি তাকে খেপে খেপে বোঝাতে লাগল। পিসেমশাইও যেন একটা জবরদস্ত কাজ পেয়েছেন সেইভাবে তিনিও গুপিকে বোঝাতে বললেন, ‘আরে বাবা, শহরে এমন কোন সুখটা আছে যা গ্রামে নেই। গ্রাম দেখেই তো দেশ চেনা যায়। রবীন্দ্রনাথ বড় আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর।' তিনি তো মিছে কথা বলার লোক নন। এমন না যে পঞ্চায়েত ইলেকশনের কথা ভেবে এই কবিতাখানি লেখা। চিৎপুর ছেড়ে তাই তো তিনি মাঝে মাঝে চলে যেতেন শিলাইদহ, পদ্মার পারে। পাকাপাকি আস্তানা গাড়লেন বোলপুরে। সেও তো গ্রাম বই তখন অন্য কিছু নয়। তুই বা কম কীসে? পদ্মা না পাস অজয় আছে। তার পারেই না হয় ডেরা বাধলি।'

কদমখণ্ডীতে যাওয়ার কোনও আগ্রহ গুপির কখনও হয়নি। আজও হচ্ছিল না। তার কেবলই মনে হচ্ছিল, দাদারা তাকে ঠকাচ্ছে। মনের মধ্যে চেপে না রেখে কথাটা পিসেমশাইকে বলেই ফেলল গুপি। পিসেমশাই শুনে প্রথমে একচোট হাসলেন। পরে বললেন, ‘ওরে বোকা, তোকে ঠকানো অত সহজ। সবই তো লেখাজোকা আছে। বাজার থেকে যে টাকা পাওয়া যায় তা তিন ভাগ হয়। তোর ভাগের টাকা তোর নামে ব্যাংকে জমা হচ্ছে।'

পিসেমশাইয়ের সঙ্গে কথা বলার পর গুপি বুঝল, তাকে দাদারা ঠকাচ্ছে বা সম্পত্তির ভাগ থেকে বঞ্চিত করছে বলে তার যে ধারণা হয়েছিল সেটা ঠিক নয়। তবুও কলকাতা ছেড়ে কদমখণ্ডীতে যেতে গুপির মন চাইছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গুপিকে যেতেই হল। গুপির ছেলেবেলার বন্ধু পল্টন। পল্টনের আপন বলতে কেউ নেই। সেই কোন ছেলেবেলায় বাবা-মা দু'জনেই মোটর অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছেন। সেই থেকে দিদিমার কাছে মানুষ। দিদিমা আর বড়মামা যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন পল্টনের মোটামুটি ভালই কেটেছে। তাঁরা মারা যাওয়ার পর পল্টনের যাচ্ছেতাই অবস্থা। ভাঙা আসবাবপত্র যেমন অবহেলায় বাড়ির এক অন্ধকার কোণে ডাঁই করে রাখা হয়, পল্টনেরও মামার বাড়িতে কয়েক বছর ধরে সেই অবস্থা। গুপিই তাকে তাদের চালের দোকানে কাজ জুটিয়ে দিয়েছে। গুপি কলকাতা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছে শুনে পল্টনও তার সঙ্গী হল। ওকে নিষেধ করবার কেউ নেই। মামা-মামিরা ভাবল, যাক আপদ বিদেয় হল। গুপির দ্বিতীয় সঙ্গীটি জুটল একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবে। তিনি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে গুপির স্বঘোষিত অভিভাবক বনে গিয়ে গুপির সঙ্গে রওনা হলেন। এই সঙ্গীটির নাম নবকুমার হালদার অর্থাৎ গুপির একমাত্র পিসেমশাই। ইতিপূর্বে পিসেমশাই কখনও কদমখণ্ডীতে এসেছেন কিনা গুপি জানে না। গুপি যুক্তি দিয়ে মোটামুটি এইটুকু বোঝে যে, কদমখণ্ডীতে পিসেমশাইয়ের আসার কোনও কারণই নেই। কেনই বা কারণ থাকবে। ঠাকুর্দা কদমখণ্ডী ছেড়ে কাশীপুরে যখন পাকাপাকি বাস করতে লাগলেন তখন তো গুপির জন্মই হয়নি। পিসির বয়স মোটে বারো। তারও দশ বছর পর কাশীপুরের বাড়িতেই পিসির বিয়ে হয়। ঠাকুর্দা তখন ইহলোক ছেড়ে পরলোকে। গুপি তখন নিতান্তই নাবালক।

যাওয়ার একদিন আগেই পল্টন এসে উপস্থিত। তার ভারী উৎসাহ। পল্টন লেখাপড়া করার বেশি সুযোগ পায়নি। মামাদের সেই ব্যাপারে কোনও আগ্রহও ছিল না। কিন্তু পল্টনের মধ্যে অনেকরকম গুণ ছিল। সে নানারকম গলা করে ডাকতে পারত। ওই হরবোলার শিল্পীরা যেমন পারে আর কি! কুকুর, বেড়াল, শেয়াল, গোরু, এমনকী, মুখে কাগজের চোঙা দিয়ে বাঘের গর্জনও করতে পারত। পল্টন ঘরে ঢুকেই পিসেমশাইকে দেখে বলল, ‘আপনিও তো যাচ্ছেন আমাদের সঙ্গে?’

পিসেমশাই গম্ভীর চোখে পল্টনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমাদের সঙ্গে আমি যাচ্ছি না, তোমরা যাচ্ছ আমার সঙ্গে।'

পল্টন নিজেকে শুধরে নিয়ে বলল, ‘ভুল হয়ে গেছে। কদমখণ্ডীতে আপনি আগে কখনও গেছেন?’

প্রায় অট্টহাস্য করার ভঙ্গিতে হাসতে হাসতে পিসেমশাই বললেন, ‘মেনি মেনি টাইমস গেছি। পিকনিক করতে অন্তত দশবার গেছি, পাখি শিকারে গেছি তা প্রায় সাত-আটবার।’ পল্টন অবাক চোখে পিসেমশাইকে দেখতে দেখতে বলল, ‘আপনি শিকার করতে

জানেন?’

পিসেমশাই পা দোলাতে দোলাতে বললেন, 'অনেক কিছুই জানা ছিল হে পল্টন, কিন্তু কোনওটাই প্রপার কাজে লাগাতে পারলাম না। আমার মতো সাঁতারু ইছাপুর তো দূরের কথা, গোটা নর্থ চব্বিশ পরগনায় পাবে না। আজও পাবে না। আজও এই বয়সে স্রেফ ডুব সাঁতারে দেড় থেকে দু’কিলোমিটার চলে যেতে পারি।'

পল্টনের সরল জিজ্ঞাসা, ‘আগে কি এর চেয়ে বেশি পারতেন?’

পিসেমশাই শব্দ করে হাসলেন। শব্দটা এমনই হল যে, কেউ যেন হঠাৎ একফালি পুরনো কাপড় ফচাং করে ছিঁড়ে ফেলল। সেই কাপড় ছেঁড়া হাসিটি হেসে নিয়ে পিসেমশাই বললেন, ‘আমার যৌবনকালের কথা আর শুনতে চেয়ো না, তা হলে চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যাবে। ইছাপুর নবাবগঞ্জের ঘাটে ডুব মারতুম আর মাথা তুলতুম খড়দা শ্যামের ঘাটে। আমাদের ইছাপুরে গেলে জানতে পারবে। খোকা দত্তকে চেনো তো?’

পল্টন বলল, ‘কোন খোকা দত্ত?’

পিসেমশাই বললেন, ‘ও হরি, তুমি খোকা দত্তকে চিনবে কেমন করে। সে থাকে ইছাপুরে। রাইফেল ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। ওর ছোট ভাইকে শঙ্খচূড়ে কাটল। একেবারে জব্বর হিট। ওঝা, ডাক্তার কিছুতেই কিছু হল না, খোকার ছোটভাই ডেড। খোকার ছোট ভাইয়ের নাম ছিল শিশু দত্ত।'

পল্টনের পরিবর্তে এবার গুপি বলল, ‘কোনও মানুষের নাম ‘শিশু’ হয় নাকি?’

পিসেমশাই একটুও বিচলিত না হয়ে বললেন, ‘যার দাদার নাম খোকা, তার ছোট ভাইয়ের নাম শিশু না হয়ে কি বুড়ো হবে? কত বুড়ো লোকের ডাকনাম কচিদা। দরকচা মেরে যাওয়ার পরও যদি ওই লোকগুলো কচি থাকে তবে খোকার ছোটভাই শিশু হতে পারবে না কেন? খোকার সঙ্গে মিলিয়ে নাম রেখেছে শিশুর বাবা। আমরা তো সেটা বদলাতে পারি না। চেহারায় হস্তিনী এমন অনেক মেয়ের নাম লতা। ওসব নিয়ে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।'

গুপি প্রশ্ন করল, ‘সাপের দংশনে শিশু দত্ত মারা গেল। শিশু দত্তের মারা যাওয়ার সঙ্গে আপনার সাঁতারের কী সম্পর্ক?’

পিসেমশাই কৌটো থেকে একটা পান মুখে দিয়ে বললেন, ‘সম্পর্ক আছে বলেই তো প্রসঙ্গটা উঠল। আশা করি তোমরা এটা জানো যে, সাপে কাটা মড়া আগুনে পোড়াতে নেই।'

গুপি বলল, ‘তা জানি। ভেলায় করে তাকে নদীতে ভাসিয়ে দিতে হয়।'

পিসেমশাই জানলা দিয়ে পানের পিকটা পচ করে ফেলে মুখটা ডান হাতের তালু দিয়ে মুছতে মুছতে বললেন, ‘ভেলায় ভাসিয়ে দিলেই তো দায় মেটে না। ভেলাটা না হয় ভাসতে ভাসতে যাবে। গিয়ে কোন চড়ায় ঠেকবে, কোন দিকে যেতে, ঢেউয়ের টানে কোন দিকে যাবে তার কোনও ঠিক আছে। সন্ধের দিকে ভাটার মুখে যদি চড়ায় আটকায় তা হলে তো শেয়াল-কুকুরে খাবে। সেইসব ভেবেই বর্ষার এক সকালে শিশু দত্তর ভেলার সঙ্গে সঙ্গে আমি সাঁতার কাটতে নবাবগঞ্জের গঙ্গায় নেমে পড়লাম।'

রূপকথা শোনার মতো বিস্ময়ে বড় বড় চোখ করে পল্টন জিজ্ঞেস করল, ‘ভেলার সঙ্গে সাঁতার কেটে কদ্দুর গেলেন?’

পিসেমশাইয়ের চটপট জবাব, ‘আপ টু বে অফ বেঙ্গল।'

গুপি যেন বিষম খাওয়ার ভঙ্গিতে কেঁপে উঠল। একবার পিসেমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তৈরি হয়ে নিন। কাল সকাল আটটায় ট্যাক্সি বলা আছে।'

গুপি ঘর ছেড়ে নিজের ঘরে এল। বড় বউদি গুপির জিনিসপত্র গুছিয়ে দু'খানা সুটকেসের মধ্যে সাজাচ্ছিল। গুপিকে দেখে বড় বউদি বলল, ‘এতদিন তোমায় খোঁচাচ্ছিলাম কদমখণ্ডী যাওয়ার জন্য। আজ যখন সত্যিই তুমি যাচ্ছ তখন মনটা ভারী- খারাপ লাগছে। এত বড় বাড়িটা শুধু তোমার জন্যেই ফাঁকা ফাঁকা লাগবে।'

গুপি বলল, ‘আমি ছাড়া সবাই তো রইল। তেমন ফাঁকা লাগবে না।’

বড় বউদি কাজ করতে করতে বলল, ‘আমি জানি, কয়েক দিনেই সব সয়ে যাবে। তুমি এ বাড়িতে থাকা মানে তোমার ক্লাবের বন্ধুদের আনাগোনা, হইচই, সেসব তো বন্ধ হয়ে যাবে। প্রাণে বেঁচে থাকার মধ্যেও একটা আলাদা প্রাণ থাকে। সেটা না থাকলে বাঁচাটাই বড্ড ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে।

গুপি বাইরের দিকে তাকাল। বাণীপুরের এই অঞ্চলটা গুপির বড় চেনা। অনেক আবেগ আর স্মৃতি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এতদিন তেমন করে টের পাওয়া যায়নি, আজ যাওয়ার আগে টের পাচ্ছে। নিজের দেশ, জন্মভূমি, ঠিক যেন মায়ের মতো। যতদিন মা থাকেন ততদিন একরকম। যখন মা থাকেন না, একেবারেই অদৃশ্য হয়ে যান, তখন বুকের মধ্যে শব্দহীন একটা হাহাকার বাজে, বাজতেই থাকে। সে কেবলই একটা শূন্যতার কথা মনে করিয়ে দিতে থাকে। স্মৃতি তখন নিষ্ঠুর ব্যাধি। সে কেবলই তার তীক্ষ্ণ তিরের ফলায় এক-একটা করে স্মৃতি খুঁচিয়ে দেয়, জাগিয়ে রাখে।

গুপি আস্তে আস্তে ছাদে এল। তিনতলার ছাদ থেকে অনেকদূর অবধি একসময় দেখা যেত। এখন আশেপাশে উঁচু মাথাওলা অনেক বাড়ি উঠে গেছে বলে আগের মতো সবকিছু দেখা যায় না। কিছুক্ষণ ছাদে দাঁড়িয়ে থেকে গুপি আস্তে আস্তে নীচে নেমে এল। বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে।

সন্ধে হয়ে যাওয়ার কিছুটা পরে কদমখণ্ডীর বাড়িতে তিনজনে পৌঁছল। অনেকটা জায়গা জুড়ে বেশ বড়সড় একটা বাগান। বাগানে অনেকরকম গাছ আছে বটে, তবে সেগুলো কোন ধরনের গাছ তা অন্ধকারে বোঝা গেল না। ওই বাগানের মধ্যেই একতলা একটা বাড়ি। বাড়িতে বিজলিবাতির ব্যবস্থা নেই। এতদিন বাগানের মধ্যে এই বাড়িটায় থেকে যে কেয়ারটেকারের কাজ করত তার নাম আদিনাথ। গুপির বাবার আমলের লোক। আতপ চাল আর কালোজিরে একসঙ্গে মিশিয়ে দিলে যেমন দেখতে হয়, আদিকাকার মাথার চুলগুলোর সেই অবস্থা। ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটের এমন চমৎকার মিশেল সচরাচর দেখা যায় না। এই আদিকাকা এক সময় দুর্ধর্ষ লেঠেল ছিল। বয়স হলেও শরীরের গঠন এখনও বেশ মজবুত।

ঘরের মধ্যে জিনিসপত্র সাজিয়ে রাখতে রাখতে আদিকাকা বলল, ‘বড় খোকার পত্তর পেয়েছি। একা হাতে যতটা পেয়েছি ঘরদোর সাফা করে রেখেছি। আসছে কাল দিনমানে লোক লাগিয়ে আরও সাফা করতে হবে। ঠিকমতো দেখভাল না করলে তাজমহলেও শ্যাওলা ধরে। এ বাড়ি কি আজকের। সবাই কলকাতা চলে যাওয়ার পর এই বাড়ি তো দুয়োরানি হয়ে গেল। চারখানা পত্তর দিলে তবে কিছু টাকা আসে। তাই দিয়ে বাড়ির কাজ। তোমার বাবা অসুখে পড়ার পর থেকে তাও বন্ধ। এখন যদি তোমাদের সুদৃষ্টি পড়ে।'

পিসেমশাই ঘরের চারদিকে চোখ বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘ধানের জমিটমিগুলো কোথায়? ওগুলো দেখতে হবে।'

আদিকাকা পিসেমশাইয়ের দিকে খরদৃষ্টিতে দেখতে দেখতে বলল, ‘এ কেমন ধারা উদো লোক গো! রাত্তিরবেলা ধানজমি দেখতে চায়? ধান আর জমি দুটোই থাকবে। কাল দিনমানে আমার সঙ্গে গিয়ে দেখে এসো।'

পাশাপাশি দুটো ঘরের একটাতে গুপি আর পল্টন। অন্যটায় পিসেমশাই। আদিকাকা একটা ক্যাম্পখাট পেতে বারান্দায় শুয়ে পড়ার ব্যবস্থা করল। গুপি এগিয়ে এসে বলল, ‘তুমি বারান্দায় শোবে কেন? ঘরে এসে শোও।'

আদিকাকা বলল, ‘বর্ষা নামার আগে পর্যন্ত আমি বারান্দাতেই শুই। বারান্দার কোলাপসিবল গেট আটকে দিলেই এটা ঘরের মতো হয়ে যায়। নদীর দিক থেকে বিস্তর হাওয়া আসে।'

এই বাড়িতে বিজলিবাতি না থাকায় আলো-পাখার কোনও ব্যবস্থা নেই। ঘরের দরজা বন্ধ করলে বেশ গরম বোধ হয়। এই দুটো ঘর ছাড়াও আরও দুটো ঘর আছে। কিন্তু সেগুলো পরিষ্কার করা হয়নি। রাত্রে শোয়ার পর পল্টন নিজের চৌকির ওপর এপাশ-ওপাশ করতে করতে বলল, ‘একেবারে কাঁঠালপাকা গরম। এতে ঘুম আসছে না।'

গুপি মশারির ভিতর থেকে বলল, ‘ট্রেনে-বাসে এতটা পথ আসার ধকল গেছে তো। শরীর এমনিতেই ক্লান্ত। নতুন জায়গা বলে একটু অসুবিধা হচ্ছে। তবে চোখ বুজে শুয়ে থাক, দেখবি ঘুম এসে যাবে।'

গুপির নির্দেশমতো পল্টন চোখ বুজে শুয়ে ঘুমের সাধনা করছিল। হঠাৎ পাশের ঘরে টর্চলাইট জ্বেলে পিসেমশাই হাঁকলেন, ‘তোরা কি ঘুমোলি নাকি?’

গুপি উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ, ঘুমোচ্ছি।'

সঙ্গে সঙ্গে পল্টনও বলল, ‘আমিও।’

পিসেমশাই টর্চ জ্বেলে গুপিদের ঘরে ঢুকতে ঢুকতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ঘুমটা কোন স্টেজে? পাকা না কাঁচা?’

গুপি বলল, ‘কারবাইডে পাকানো হচ্ছে।'

গুপিদের ঘর আর পিসেমশাইয়ের ঘর পাশাপাশি। মাঝখানের দরজাটা এতটাই জীর্ণ যে, কোনওদিক থেকে আটকানোর উপায় নেই। গুপি দরজাটা আটকাবার চেষ্টা করেছিল কিন্তু পারেনি। তার মনে হয়েছিল, বেশি টানাটানি করলে দরজা বন্ধ হবে না কিন্তু কাঠামোসুদ্ধু দরজাটাই খুলে পড়বে। তার চাইতে যেমন আছে তেমন থাক। পিসেমশাই টর্চের আলো গুপি আর পল্টনের মশারির মধ্যে ফেলে নিজের মনেই বললেন, ‘কাছে নদী। ভাবলুম নদীর বাতাসে ঘরটা শীতল হবে। এখন মনে হচ্ছে নদী নয়, পাশেই মরুভূমি।

গুপি বলল, ‘মরুভূমি তো রাত্রে ঠাণ্ডা হয়।'

টর্চের আলো নিভিয়ে দিয়ে পিসেমশাই বললেন, ‘নদীর চড়া সারাদিন বীরভূমের চড়া রোদ গিলেছে। এখন তাই কুলকুচি করে দিচ্ছে আমাদের। পেটের নাড়িভুঁড়ি পর্যন্ত ঘেমে গেল।'

গুপি আর পল্টন কেউ কোনও জবাব না দেওয়ায় পিসেমশাই একটু পরে নিজের ঘরে চলে গেলেন। পরদিন সকালে বাড়ির বারান্দায় জলখাবারের ব্যবস্থা করল আদিকাকা। ধামাভর্তি মুড়ি। গুপিকে যে পরিমাণ মুড়ি দেওয়া হয়েছে ততটা মুড়ি কলকাতার কোনও মুড়িমশলা বা ভেলপুরীর দোকানেও মজুত থাকে না। গুপি চোখ কপালে তুলে বলল, ‘এত মুড়ি কে খাবে?’

আদিকাকা বলল, ‘এখন দেখতে অমন লাগছে। মনে হচ্ছে মুড়ির পাহাড়। যখন জল মারব তখন দেখবে পাহাড় মিইয়ে গিয়ে নুড়িপাথর হয়ে গেছে।'

সত্যি তাই হল। মুড়ির বড় বাটিতে বারকয়েক জলের ঝাপটা মারতেই মুড়িগুলো যেন নিল ডাউন হয়ে গেল। পরিমাণটাও কমে এল। এবার এল বাটিতে বেগুনপোড়া। ওই মুড়ি আর বেগুনপোড়াই হল সকালের জলখাবার। আদিকাকা বলল, ‘খাওয়া শেষ করে একজোড়া গুড়ের লাল বাতাসা পাবে। তারপর তেষ্টা মিটিয়ে জল খাও। তোমাদের তো শহরের পেট। ভালমন্দ কিছুই সইতে পারে না।'

সকালে জলখাবারের পাট চুকিয়ে আদিকাকার সঙ্গে গুপিরা গেল জমিজমা দেখতে। বেশ ভালই লাগছিল গুপির। গাঁয়ের লোকের সঙ্গে পরিচয় হতেই সবাই হাত তুলে নমস্কার করছিল। অনেকেই আশাতীত খাতির করছিল গুপিদের। শহরে এমনটা হয় না। তার ঠাকুর্দার তৈরি বাজারেও এমন জিনিস, অর্থাৎ এতটা ভক্তিশ্রদ্ধা তাকে কেউ কখনও দেখায়নি। যে বাজারে প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত দুনিচাদের টাকে বাজারের লোক ভেজা লুঙ্গি অথবা গামছা শুকোতে দেয় সেই বাজারের মানুষজনের কাছ থেকে ভক্তিশ্রদ্ধা আশা করাই তো বৃথা। গুপি গ্রামের মধ্যে দিয়ে হেঁটে আসতে আসতে প্রায়ই ঘাড় ঘুরিয়ে পিসেমশাইয়ের দিকে দেখছিল। তাঁর হাবভাব দেখে মনে হচ্ছিল দিল্লি অথবা কলকাতা থেকে কোনও মন্ত্রী এসেছেন গ্রামের অবস্থা দেখতে। খানিকটা পথ আসার পর আদিকাকা একটা বটগাছের নীচে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এর নাম বটতলা। বড় পুণ্য জায়গা। লোকে বলে, কবি জয়দেব নাকি এই বটতলায় বসে বিশ্রাম করতেন। তাই সবাই এখানে এলে প্রণাম করে।'

আদিকাকার দেখাদেখি গুপি আর পল্টনও প্রণাম করল। পিসেমশাই প্রণাম করার আগে বললেন, ‘তাই তো জায়গাটা এত চেনা চেনা লাগছে। পদ্মাবতীও এখানে নিশ্চয়ই আসতেন।'

আদিকাকা বলল, ‘সে কথা আমি জানি না। লোকমুখে শুনেছি উনি একাই আসতেন। বউ নিয়ে কখনও এসেছেন কি না বলতে পারব না।'

ওদের দেখে গাঁয়ের দু’-চারজন এসে ওদের চারপাশে দাঁড়াল। গ্রামের এই লোকগুলোকে দেখলেই বোঝা যায় এরা মাঠে কাজ করে। আদিকাকার দিকে তাকিয়ে ওদের একজন বলল, ‘কী গো কাকা, এরা বুঝি সব কইলকাতার লোক?’

আদিকাকা বলল, ‘এরা আমার মনিব গো, মনিব। কইলকাতার থনে এইয়েছে।' লোকগুলো সম্ভ্রমের চোখে গুপিদের দিকে তাকাল। পিসেমশাই নিজের মাথার চুলে হাত বুলিয়ে নিয়ে বললেন, 'আপনাদের এখানে ইরিগেশন প্রবলেমটা কেমন?’

মাঠের কাজ করতে করতে যারা এসেছিল তাঁরা প্রথমে ভ্রূ কুঁচকে পিসেমশাইয়ের দিকে তাকাল, পরে আদিকাকার দিকে। এমন সহিষ্ণু শ্রোতা পেয়ে পিসেমশাই আর থেমে থাকতে পারলেন না। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, 'আপনাদের এখানে এখন কটা করে ক্রপ হয়?’

যারা এসেছিল তাদের একজনের মুখে এবার স্পষ্টতই বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল। সে হাত নেড়ে বলে উঠল, ‘ওসব এখানে হয় না।'

কথা শেষ করে আদিকাকার দিকে ফিরে বলল, ‘ও কাকা, এই শহুরে কোলাব্যাঙটাকে কোত্থেকে জোটালে?’

এই কথায় বাকিরা হেসে উঠতেই পিসেমশাই এবার নিজেই লজ্জিত হলেন। ওরা চলে যাওয়ার পর খানিকটা স্বীকারোক্তির ভঙ্গিতে বললেন, ‘ওই আমার এক দোষ, খোলা হাওয়ায়, উদার প্রকৃতিতে এলেই আমার মুখ দিয়ে ইংরেজি বেরোয়। পুরীর সি বিচে, কলকাতার উন্মুক্ত ময়দানে বসে কত যে ইংরেজি চর্চা করেছি তার আর হিসেব নেই।'

বিকেল ঘন হওয়ার পর আমরা সবাই এসে উঠোনে বসলাম। উঠোনে সব সময় একটা বড় সাইজের চৌকি পাতা থাকত। চৌকিটা উত্তর দিকের পাঁচিল ঘেঁষে। এই চৌকিতে বসলে অদূরেই অজয় নদ দেখা যায়। মনে হয় খুব কাছে। কিন্তু বাস্তবে অতটা কাছে নয়। এখানে বসলে দুর্গাপুরের কারখানার চিমনি দেখা যায়। দক্ষিণ বিলকুল খোলা থাকায় হু হু করে বাতাস এসে উঠোনটা ভরিয়ে দেয়। পিসেমশাই চৌকির ওপর বসে চা খেতে খেতে বললেন, ‘মাথায় আইডিয়া এসে গেছে।'

পল্টন বলল, ‘কী আইডিয়া?’

পিসেমশাই বললেন, ‘ঘরের গরম থেকে বাঁচতে এবং গ্রামের ফ্রেশ হাওয়া-বাতাস পেতে আমি উঠোনের এই চৌকিতেই রাত্রে শোব।'

পিসেমশাইয়ের প্রস্তাব শুনে আদিকাকা হায় হায় করে উঠে বলল, ‘এই চৌকিতে শোবেন কী গো ! কতদিন থেকে বাইরে পড়ে আছে। ওর গায়ে বীরভূমের রাঙাধুলো কিলো কিলো জমে আছে।'

পিসেমশাই পারলে এখনই চৌকি সংস্কারে লেগে যান। রাত হয়ে আসছে বলে আমরা পিসেমশাইকে সেই রাতের মতো থামালাম। পরদিন সকাল থেকে চৌকি সংস্কারে লোক লেগে গেল। সেই চৌকি ডেটল জলে ধোওয়া হল। রোদে শুকোবার পর পিসেমশাই ধুলো থেকে বাঁচতে চট দিয়ে চৌকি ঢেকে রাখলেন। ভাবখানা এমন যেন, পিসেমশাই বলতেই উনি বললেন, ‘ক্রিকেট পিচের চেয়েও দামি শোবার চৌকি। পিচে বল গড়ায়, চৌকিতে মানুষ গড়ায়। ক্রিকেটের চাইতে মানুষ বড়। ওরে, ক্রিকেট মানুষকে আনেনি, প্রমোটও করেনি। মানুষই ক্রিকেট এনেছে এবং তাকে প্রমোট করেছে। সারাজীবন ক্রিকেট না খেলে মানুষ দিব্যি থাকতে পারে, কিন্তু না শুয়ে মানুষ থাকতে পারবে? মানুষ তো ঘোড়া নয় যে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমোবে।'

গুপিরা কেউ কথা না বাড়িয়ে ঘরে এল। ঘরে পা দিয়েই টের পাওয়া গেল ঘরের ভিতরটা বেজায় গুমোট। তার চাইতে উে ওই তত্ত্ব নাশট যতক্ষণ বসে ছিল ততক্ষণ শরীরটা অনেক বেশি আরাম পাচ্ছিল।

পল্টন গলায় একটু আক্ষেপ মিশিয়ে বলল, ‘পিসেমশাইয়ের আইডিয়াটা কিন্তু দারুণ। আজ ওঁর তোফা ঘুম হবে।'

গুপি কিছু বলল না। খানিক পরে বাইরে এসে দেখল পিসেমশাইয়ের তক্তপোশটার চারধারে চারটি সরু সরু লাঠি পোঁতা। লাঠিগুলো দেখতে অনেকটা ছাতার বাঁটের মতো। গুপি পিসেমশাইকে জিজ্ঞেস করল, ‘এই ছড়ির মতো কঞ্চিগুলো পুঁতেছেন কেন?’

পিসেমশাই জবাব দিলেন, ‘মশারি টাঙাব।'

গুপি বলল, ‘এই হাওয়াতে মশা নেই। বরং টাঙাবার পর আপনার মশারিই না উড়িয়ে নিয়ে যায়।'

পিসেমশাই বললেন, ‘মশার জন্য তো টাঙাচ্ছি না। টাঙাচ্ছি অন্য কারণে। ভেবে দেখলাম খোলা আকাশের নীচে শোয়াটা সেফ নয়। রাতের নিশাচর পাখিগুলো যেতে যেতে চলমান অবস্থায় নোংরাটোংরা ফেলতে পারে অর্থাৎ ত্যাগ। সেই ত্যাগ করা বস্তু আমার গায়ে পড়া বিচিত্র নয়। তোমার পিসিমা জানে, ঘুমোলে আমার জ্ঞানগম্যি থাকে না।

গুপি চলে আসছিল, পিসেমশাই এগিয়ে এসে গুপিকে নিশ্চিন্ত করার জন্য বললেন, ‘মশারি উড়িয়ে নেওয়ার ভয় নেই। মশারির নীচের খুঁটগুলো আমার সঙ্গে বেঁধে রাখব। হাওয়া তো আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারবে না।'

যদিও এসব বিষয় নিয়ে গুপির মধ্যে কোনও চিন্তা ছিল না। সে মনে মনে অন্য একজনের কথা ভাবছিল। আজ সকালে আদিকাকা তাকে একা ডেকে নিয়ে সেই লোকটার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। লোকটা তার নাম নিজে মুখে বলেনি। লম্বা সাদা দাড়ি, মাথার চুলও. লম্বা। পুরোপুরি জটা না হলেও কিছুটা জটাযুক্ত তো বটেই। আদিকাকা বলে, ভদ্রলোকের নাম ত্রিশূলবাবা। টানা পাঁচবছর ত্রিশূলের ওপর বসে সাধনা করেছিলেন বলে সবাই ‘ত্রিশূলবাবা’ নামে ডাকে। আসল নাম কেউ জানে না। জানবার দরকারও বোধ করেনি। এই ত্রিশূলবাবার বয়স কত তা কেউ বলতে পারে না। তবে তিনি যেসব ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী বা প্রত্যক্ষদর্শী বলে প্রচার করেন সেগুলো সত্যি হলে তিনি আলিবর্দি খাঁর সমসাময়িক। পলাশির যুদ্ধ তো হয়েছিল ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে। তারিখটা তেইশ জুন। ত্রিশূলবাবা নাকি তখন অজয়ের চড়ায় ত্রিশূলের ওপর বসে গভীর ধ্যানে মগ্ন। গুপি খুব আস্তে করে আদিকাকাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আদিকাকা, পিছনে ত্রিশূল দিয়ে সত্যি কি কেউ বসতে পারে?

আদিকাকা বলেছিল, ‘জানি না বাবা। আমি তো কখনও কাউকে বসে থাকতে দেখিনি। তবে তোমার বাবার মুখে শুনেছি, কদমখণ্ডীর এই বাড়িটা যখন তোমার ঠাকুর্দা তৈরি করেন তখন নাকি এক যোগীপুরুষ এই বাড়ির ভিতপুজো করেছিলেন। তখন তো আমি ছিলাম না, ছিলেন তোমার ঠাকুর্দা। তিনি থাকলে বলতে পারতেন সেদিনের সেই যোগী আজকের এই ত্রিশূলবাবা কি না।'

বিস্ময়ে চোখ বড় বড় হয়ে গেল গুপির। সে বলল, ‘এই ত্রিশূলবাবা এই বাড়ির ভিতপুজো করেছিলেন?’

আদিকাকা উত্তর দেন, ‘তাই তো উনি বলেন।'

গুপি মনে মনে হিসেব করে বলে, ‘১৭৫৭ থেকে দু'হাজার তিন সাল, মানে প্রায় দুশো ছেচল্লিশ বছর। এত দীর্ঘ পরমায়ু কি কোনও মানুষের হয়? প্রাণিজগতে নাকি কচ্ছপ বেশিদিন বাঁচে। কিন্তু দু’শো বছর পর্যন্ত কোনও কচ্ছপের বেঁচে থাকার রেকর্ড নেই।'

আদিকাকা ঠোঁট উলটে বলে, ‘কে জানে কোনটা ঠিক। এই যে তোমার পিসেমশাই আজই আমাকে বলছিলেন, উনি নাকি ডুবসাঁতারে বর্ষার গঙ্গা পেরিয়ে যান। ঘুড়ি এত উঁচুতে ওড়াতেন যে, একবার নাকি মধ্যমগ্রামের এক দোতলা বাড়ির ছাদ থেকে ঘুড়িকে উড়ন্ত উড়োজাহাজের পিছনে গোঁত খাইয়েছিলেন। কান থাকলে মানুষকে কত কিছু শুনতে হয়।'

ত্রিশূলবাবার ব্যাপারটা গুপিকে অনেকখানি আচ্ছন্ন করে রাখল। ত্রিশূলবাবা নাকি আদিকাকাকে বলেছেন, ‘এই ছেলে সামান্য ছেলে নয়। এই ছেলে গুপ্তধন পাবে। অনেক মানীগুণী, মাতব্বর ওর সামনে এসে হাত কচলাবে।'

গুপি জানে ধনবান হলে তার সামনে হাত কচলাবার লোকের অভাব হবে না। এ যুগে ধনবান মানেই বলবান। কিন্তু গুপি গুপ্তধন পাবে কেমন করে? তবে কি এই বাড়ির কোথাও গুপ্তধন লুকনো আছে? যার সন্ধান ওই ত্রিশূলবাবা জানে? গুপির মনের মধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরতে থাকে। বিষয়টা এমনই যে, এটা নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা করার উপায় নেই। ত্রিশূলবাবা এবং আদিকাকা দু’জনেই নিষেধ করে দিয়েছে। আদিকাকা অবশ্য ত্রিশূলবাবার কথাটাকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে রাজি নয়। কিন্তু ত্রিশূলকে এতটা হেলাফেলা করার সাহস গুপির নেই। যদিও আজই সকালে ত্রিশূলবাবার সঙ্গে তার প্রথম পরিচয়। মানুষটাকে দেখলে একটা ভক্তিভাব জাগে।

ত্রিশূলবাবা এবং গুপ্তধনের কথা ভাবতে ভাবতেই গুপির চোখে তন্দ্রা এসে গিয়েছিল। পল্টন নিশ্চয়ই এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। পাশ ফিরে পল্টনকে দেখার মতো উৎসাহও গুপির মধ্যে এখন আর নেই। তার দু'চোখ ভরে ঘুম আসছে।

কিন্তু একটু পরেই বিষম গোলযোগ শুরু হল। একাধিক কুকুরের চিৎকারের সঙ্গে অদ্ভুত ভাঙা একটা কণ্ঠস্বর। কিছুটা মানুষের গলার মতো। কিন্তু কণ্ঠস্বরটা মানুষেরই কিনা তা নিশ্চিত করে বোঝা যাচ্ছে না। গুপি বিছানার ওপর উঠে বসে দেখল, পল্টনও উঠে বসেছে। এত গণ্ডগোলে কি কারও ঘুম না ভেঙে পারে। নিজের তক্তপোশের ওপর থেকে নামতে নামতে গুপি ডাকল, ‘আদিকাকা, জেগে আছ?’

বারান্দা থেকে আদিকাকার উত্তর এল, ‘জেগে ছিলাম না, এই জাগলাম।'

টর্চ জ্বেলে নিজের দরজা খুলতে খুলতে গুপি বলল, ‘শব্দটা কীসের? এত কুকুর ডাকছে কোত্থেকে?’

আবছা আলোয় মোড়া বারান্দায় এসে টর্চ জ্বালতেই গোটা বারান্দাটা যেন আলোয় ভরে উঠল। আদিকাকার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল, মধ্যরাতের এই চিৎকারে আদিকাকাও বেশ ভয় পেয়ে গেছে। ঘরের মধ্যে থেকে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে পল্টনও ততক্ষণে বারান্দায় এসে উপস্থিত। সেই অদ্ভুত ভাঙা কণ্ঠস্বরটা এবার আরও জোরে শোনা গেল। কুকুরদের গলা ছাপিয়ে যে গলাটা এই মুহূর্তে উচ্চকিত হল, সেই গলাটা কোনও মানুষের কিনা তা এখনও স্পষ্ট করে বুঝতে পারল না গুপি। গুপি বলল, ‘আওয়াজটা আমাদের উঠোনের দিক থেকেই তো আসছে বলে মনে হচ্ছে।'

আদিকাকা ভয়ধরা গলায় বলল, ‘আমারও তো তাই মনে হচ্ছে। আমাদের উঠোনে এত কুকুরের হল্লা কেন?’

পল্টন একটু অসহিষ্ণু গলায় বলে উঠল, ‘এখানে বসে গবেষণা না করে চলুন না বাইরে গিয়ে দেখি। দরজা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকলে তো কিছু হবে না।'

গুপি টর্চটা আবার জ্বেলে নিয়ে বলল, ‘আদিকাকা, আমরা দরজা খুলে বাইরে যাচ্ছি। তুমিও এসো।'

সবার পিছনে আদিকাকা বাইরে এল। গুপি আর পল্টন পাশাপাশি। গোটা উঠোন জুড়ে তরল অন্ধকার। তারই মধ্যে কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাক। সে দিকে তাকাতেই গোটা দুই কুকুরের জ্বলজ্বলে চোখগুলো দেখা গেল। পল্টন হ্যারিকেনটা উঁচু করে তুলে ধরল। গুপি টর্চ জ্বালতেই সেই আলোতে বড় বিচিত্র একটা দৃশ্য চোখে পড়ল। উঠোনের পাঁচিলের দিকে যে তক্তপোশটাতে মশারি টাঙিয়ে পিসেমশাই আরাম করে শুয়ে ছিলেন সেই তক্তপোশের তিনদিকে গোটাচারেক বলবান কুকুর ক্রমাগত ঘেউ ঘেউ করে ডেকে যাচ্ছে। তক্তপোশের ওপর মশারিটা আর টাঙানো নেই। বাঁশের ডান্ডা ভেঙে গোটা মশারিটা একটা বিশালকায় পুঁটলির মতো তক্তপোশের ওপর পড়ে আছে। গুপির বুকের ভিতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। তা হলে পিসেমশাই কোথায়? ঘুমন্ত মানুষকে কুকুর কি কখনও মশারি ভেদ করে আক্রমণ করে? নাকি কুকুরের ভয়ে পিসেমশাই তক্তপোশের নীচে তাকিয়ে ঘেউ ঘেউ করবে কেন? গুপি নিচু হয়ে বসে তক্তপোশের নীচে টর্চের আলো ফেলল। বলাই বাহুল্য, নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়েই এই কাজটা করতে হল। গুপি পল্টনকে বলল, ‘দেখ তো, তক্তপোশের তলায় পিসেমশাই আছেন কি না।’

পল্টনও নিচু হয়ে বসে দূর থেকে উঁকিঝুকি মারতে মারতে বলল, ‘নীচে তো মানুষের মতো কাউকে দেখছি না। মনে হচ্ছে ওখানেও কুকুরের মতো কিছু একটা ঢুকে বসে আছে।' ‘তবে পিসেমশাই কোথায়?’ গুপির মধ্যে আশঙ্কা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। অত বড় একটা মানুষকে কি কুকুরে খাবে? গুপি ভয়ে ভয়ে বলল, ‘আদিকাকা, এখানকার কুকুররা কি জ্যান্ত মানুষ খায়?’

আদিকাকা শুকনো গলায় এবং কিছুটা শোকার্ত ভঙ্গিতে বলল, ‘জ্যান্ত পেলে কেউ কি সাধ করে বাসি-পচা খাবে। তা ছাড়া এখানকার কুকুর তো সাধারণ কুকুর নয়। শ্মশানজাগানো মড়াখেকো কুকুর। ওদের অসাধ্য কিছু নেই। কদমখণ্ডীর কুকুরকে সবাই তাই ভয় করে। দিল্লির এক মান্যগণ্য ভদ্রলোক একটা কাজে এসে ঘুরে ঘুরে গ্রাম দেখছিলেন। কদমখণ্ডীর কুকুর পিছন থেকে ছুটে এসে পায়ের গুলিতে এমন কামড় দিল যে, তারপর থেকে সেই ভদ্রলোক আর পশ্চিমবঙ্গমুখো হননি। ভোটের সময় হবু এম এল এ জনার্দন জানাকে পিছনে এমন কামড়ে দিল যে, জনার্দন ভোটে দাঁড়ানোই ছেড়ে দিল।

পল্টন শুকনো গলায় বলল, ‘পিসেমশাইকে যদি খেয়েই থাকে তবে কি দু’-চার পিস হাড় উঠোনে পড়ে থাকবে না। পিসেমশাইকে তো ওরা বোনলেস করে খায়নি।'

গুপি বলল, ‘কুকুরের উন্মত্ত কলরবের মধ্যে খানিকটা মানুষের মতো ভাঙা গলায় যে আওয়াজটা পাচ্ছিলাম সেটাই বোধহয় পিসেমশাইয়ের অন্তিম ডাক।'

পল্টন সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘অসম্ভব নয়। কিন্তু এখন আমরা কী করব? গুপি একটু চুপ করে থেকে জোর গলায় হাঁক দিল, ‘পিসেমশাই, ও পিসেমশাই, আপনি কোথায়?’

তক্তপোশের ওপর পড়ে থাকা মশারির বিশাল পিণ্ডটা যেন একটু নড়েচড়ে উঠল। পরক্ষণেই ক্ষীণতম গলায় উত্তর এল, ‘আই অ্যাম হিয়ার। হেল্প মি।'

কণ্ঠস্বর যতই ক্ষীণ হোক, তবুও বুঝতে অসুবিধা হল না এটা পিসেমশাইয়ের ভয়ার্ত কণ্ঠস্বর। পল্টন বলল, ‘আপনি উঠে আসুন।'

সেই একইভাবে পিসেমশাইয়ের উত্তর এল, ‘আমার পক্ষে উঠে যাওয়া অসম্ভব। আমি মশারির মধ্যে বিচিত্রভাবে জড়িয়ে গেছি। তিনদিক খোলা মঞ্চের মতো আমার তক্তপোশের তিনদিকে তিনটি অতিশয় বদ প্রকৃতির হিংস্র কুকুর।'

গুপি বলল, ‘আপনাকে কুকুরে ঘিরে ধরল কেন?’

আগের মতোই ক্ষীণ গলায় পিসেমশাই বললেন, 'আমাকে ধরতে আসেনি। আসলে আমি ঘটনাচক্রে... এই যা, তক্তপোশে জব্বর গুঁতো মারছে।'

আদিকাকা আর গুপি দুটো লাঠি নিয়ে বারান্দা থেকে নীচে নামল। মশারি জড়িয়ে তক্তপোশের ওপর পড়ে থাকলেও পিসেমশাই বোধ হয় বারান্দার দিকে তাকিয়ে ওদের দেখতে পাচ্ছিলেন। তাই বললেন, ‘শুধু শুধু কুকুর না তাড়িয়ে তক্তপোশের তলায় সেঁধিয়ে পড়া মালটাকে আগে তাড়াও। তা হলেই কুকুরমুক্ত হব আমি।'

তক্তপোশের তলায় কিছু একটা সেঁধিয়ে আছে ঠিকই, তবে সেটা যে কী বস্তু তা গুপিরা জানে না। গুপি বলল, ‘আপনার তক্তপোশের তলায় কে সেঁধিয়ে আছে?’

পিসেমশাই কাতর কণ্ঠে প্রায় কেঁদে ফেলার ভঙ্গিতে বললেন, ‘একটা বজ্জাত শেয়াল। ওকে কুকুরগুলো তাড়া করতেই আমার তক্তপোশের তলায় সেঁধিয়ে গেছে। কুকুরগুলোর জন্যে বেরোতে পারছে না। তাই থেকে থেকে ওপরে গোত্তা মারছে। কী ভয়ংকর বিশ্রী গন্ধ। বিছানার এত কাছে কখনও শেয়াল-কুকুর দেখিনি তো, তাই গা গুলিয়ে উঠছে। প্রেশার একেবারে লো হয়ে যাচ্ছে। তোরা কিছু একটা কর। এমন সন্ত্রাসবাদী শেয়াল-কুকুর বাপের জন্মেও দেখিনি।'

পল্টন বলল, ‘গুপি, একটা কাজ করব?’

গুপি বলল, ‘কী কাজ?'

পল্টন বলল, ‘আমি বরং বাঘের ডাক ডাকি। তা হলে ভয় পেয়ে শেয়াল-কুকুর সবাই পালাবে।'

গুপি বলল, ‘চেষ্টা করে দ্যাখ।'

পল্টন দ্রুত ঘরে গিয়ে একটা টিনের চোঙা নিয়ে এসে মুখের কাছে দিল। একটু পরেই ভয়ংকর বাঘের গর্জন হতেই পিসেমশাইয়ের আর্তনাদ শোনা গেল, ‘এবার বাঘ। মানুষ পেলে কি শেয়াল-কুকুর খাবে। হরি হে, এই ছিল মনে। আগে জানলে কে কদমখণ্ডীতে ‘আসে।'

বাঘের গর্জনে কুকুরের ডাকাডাকিটা হঠাৎ বেড়ে গিয়ে একেবারে থেমে গেল। আদিকাকা ইট তুলে কুকুরদের লক্ষ্য করে ছুড়ছিল। সব কটা নিশানা তো ঠিক হচ্ছিল না, হওয়ার কথাও নয়। দু’–একটা গিয়ে তক্তপোশের ওপর পড়ছিল। পিসেমশাই প্রায় আর্তনাদের মতো চিৎকার করে বললেন, ‘গুপি, এ কোথাকার বাঘ রে। আমাকে ঢিল ছুড়ছে।' তক্তপোশের কাছ থেকে কুকুরগুলো একটু সরে যেতেই বন্দুকের নল থেকে যে গতিতে গুলি বেরিয়ে যায়, প্রায় সেইরকম গতিতে তক্তপোশের তলা থেকে একটা ক্ষীণকায় শেয়াল ছুটে বেরিয়ে গেল। মুহূর্তে সে চোখের নাগাল পেরিয়ে উধাও হয়ে গেল। এবার গুপির নেতৃত্বে পল্টন আর আদিকাকাকে নিয়ে যাওয়া হল পিসেমশাইকে উদ্ধার করতে। মশারির বেড়াজাল থেকে পিসেমশাইয়ের শরীরটাকে বার করা যে এত কঠিন কাজ তা দুঃস্বপ্নেও কেউ ভাবেনি। কেউ যে সর্বাঙ্গে এমন করে মশারি জড়াতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

অনেক চেষ্টা করে অক্ষত শরীরে পিসেমশাইকে বার করে আনার পর পিসেমশাই বললেন, ‘আমায় এবার জল খাওয়া।

আদিকাকা বলল, ‘ভয়ে বুক-গলা শুকিয়ে আছে। এসময় শুধু জল খেতে নেই। গুড়-জল খেতে হয় আগে ঘরে চলুন।'

গুড়-জল খেয়ে একটু শান্ত হওয়ার পর পল্টন বলল, ‘আপনি গোড়াতেই আমাদের ডাকতে পারতেন।'

পিসেমশাই বললেন, ‘ওই বলবান কুকুরগুলোকে কতবার বিনয় করে বললুম, ‘মাই ডিয়ার ডগ, ডোন্ট ডু দিস।’ আমার অনুরোধ কানেই নিল না। তক্তপোশের নীচে শেয়াল থাকলে কোনও ভদ্রলোক কি মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারে। তক্তপোশের ওপর চাঁটি মেরে শেয়ালকে যত বলি, ‘গেট আউট’, শেয়াল ততই জোরে তক্তপোশে গোত্তা মারে। আমি কালই কলকাতা চলে যাব। সেখান থেকে ইছাপুর। দাও ফিরে সে অরণ্যতে আর আসার সাধ নেই। গুড বাই কদমখণ্ডী।’

পিসেমশাই পল্টনের বিছানার ওপর শুয়ে পড়লেন। শুয়ে পড়ামাত্র পল্টন বারান্দা থেকে শিয়ালের ডাক শুরু করতেই পিসেমশাই তড়াক করে বিছানার ওপর উঠে বসে ভয়ের গলায় বলে উঠলেন, 'গুপি, মনে হয় রিভেঞ্জ নিতে এবার ঝাঁকে ঝাঁকে শেয়াল আসছে। কুকুরগুলোও আসবে। শেয়াল-কুকুরে দাঙ্গা বেধে যাবে। আমি হচ্ছি ওদের কমন এনিমি। এই যে মশাই আদিকাকা, দাঙ্গার ব্যাপারে পুলিশকে খবর দিলে কোনও লাভ হবে?’

আদিকাকা একটা হাই তুলে বলল, ‘মানুষে মানুষে দাঙ্গা থামাতে পুলিশ আসে না, এখন কি পুলিশ আসবে কুকুর-শেয়ালদের ঝগড়া মেটাতে। সত্যি বলতে কী, গ্রামে-শহরে এখন তো কুকুর-শেয়ালদেরই কাজিয়া চলছে। পুলিশ কী করবে?’

পিসেমশাই বললেন, ‘কী করবে মানে? উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে। দাঙ্গাবাজদের ধরে ঠাণ্ডা করবে। সে কুকুর-শেয়াল, মানুষ-অমানুষ যাই হোক।'

আদিকাকা আবার হাই তুলে বলল, ‘পুলিশ অত বোকা নয়। তারাও লেখাপড়া জানে। তারাও দিব্যি জানে যে সাপের মাথায় লাঠি পড়লে সে লাঠি শিবের মাথাতেই পড়ে। কে আর সাধ করে শিবের মাথায় লাঠি মারতে যাবে। অত সাহস কার?’

বিছানার ওপর উৎকর্ণ হয়ে পিসেমশাই বসে ছিলেন। তাঁর ধারণা কুকুরদের হাতে হেনস্থা হওয়ার জন্য শেয়াল সম্প্রদায় প্রতিশোধ নিতে দল বেঁধে আসছে। ওদের মোকাবিলায় কুকুররাও পিছিয়ে থাকবে না। হায় রে, এই শান্ত নির্জন কদমখণ্ডী অচিরেই না আর-একটা কেশপুর বা চমকাইতলা হয়ে যায়। বিবদমান গোষ্ঠী তো মানুষের ভাষা বুঝবে না। বুঝলে না হয় একদফা চেষ্টা করা যেত। পিসেমশাই ঘরের খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘গুপি, ডোন্ট হঠকারী আচরণ, নো ফারদার ম্যাসাকার। দরজাটা ভাল করে বন্ধ করে দাও। আদিবাবুকেও ঘরে আসতে বলো। আজ আর বারান্দায় শুয়ে কাজ নেই। এই কাজিয়ার মধ্যে বারান্দায় শুলে ওঁর বাড়িতে আর আদি-অন্ত খুঁজে পাওয়া যাবে না।'

সকালে ঘুম থেকে উঠেই গুপি বেরিয়ে পড়ল ত্রিশূলবাবার খোঁজে। ত্রিশূলবাবার নির্দিষ্ট কোনও ঠিকানা নেই। কখন কোথায় গেলে পাওয়া যাবে, সে হদিশ শুধু দিতে পারে আদিকাকা। গত রাত্রে গুপির ভাল ঘুম হয়নি। পল্টনের পাশে শুয়ে পিসেমশাই সারা রাত কুকুরাতঙ্কে নিজেও জেগে ছিলেন, ঘরের সবাইকে জাগিয়েও রেখেছিলেন। কিছুক্ষণ পর নাক ডাকার প্রবল আওয়াজ শুনে মালুম হল আদিকাকা ঘুমিয়ে পড়েছে। পিসেমশাইয়ের তাতেও আপত্তি। প্রথমে বললেন, ‘মোটরসাইকেল নিয়ে বাড়ির চারপাশে কে চক্কর মারছে বল দিনি? মানুষের মধ্যে যারা পাড়ায়-বেপাড়ায় মস্তানি করে তারা নাকি দল বেঁধে বাইক নিয়ে চক্কর দেয়। কুকুর অথবা শেয়ালদের মধ্যেও কোনও মস্তান সম্প্রদায় আছে নাকি? ওরা কি বাইক চালাতে পারে?’

গুপি বলল, ‘বাইক নয়, আদিকাকা নাক ডাকছে।'

গুপি বলল, বটে, কিন্তু তার মনে হল পিসেমশাই খুব একটা ভুল বলেননি। আদিকাকার নাম ডাকার আওয়াজটা ওইরকমই। পিসেমশাই বিছানার ওপর উঠে বসে আদিকাকাকে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে দেখতে বললেন, ‘এটা তো একেবারে গণ্ডগ্রাম, এখানে পাওয়া যাবে না, শহরে খোঁজ করলে নির্ঘাত পাওয়া যাবে।'

গুপি বলল,

‘কী?’

পিসেমশাই বললেন, ‘নাকের সাইলেন্সার। নাকে লাগিয়ে দিলে নাক ডাকার শব্দ আর শোনা যাবে না।'

গুপি প্রশ্ন করল, ‘এরকম যন্ত্র আছে নাকি?

পিসেমশাই উত্তর দিলেন, ‘আছে কিনা জানি না। তবে খোঁজ করলে নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। শহরে নিত্যনতুন কত জিনিস বেরোচ্ছে, আর এরকম একটা ভাইটাল যন্ত্র এখনও বার হয়নি তা কি কখনও হয়।'

গুপি পাশ ফিরে শুতে শুতে ভাবল, যারা মস্তানি করে বেড়ায়, মারধোর করে, তারা আবার একটা সম্প্রদায় নাকি? সম্প্রদায় বলতে গুপি জানে সাধু সম্প্রদায়, শিক্ষক সম্প্রদায়, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, এই সব। এর মধ্যে মস্তান ঢুকে পড়ার তো কথা নয়। গুপি আবার পাশ ফিরে শুয়ে পিসেমশাইকে কথাটা বলতেই পিসেমশাই বললেন, ‘বোকা ছেলে। সম্প্রদায় কথাটার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে দল, সমাজ, গোষ্ঠী ইত্যাদি। এ রাজ্যে মস্তানরা একটি বিশিষ্ট এবং আদরণীয় গোষ্ঠী।' গুপি অবিশ্বাসের ঢঙে ‘ধ্যাত’ বলে আবার পাশ ফিরে শোয়ার আগেই পিসেমশাই বলে উঠলেন, ‘অমনি তাচ্ছিল্য করে ধ্যাত করলি কেন? আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কোনও হালহকিকত জানিস। আগে তো বইয়ে পড়েছিলি, জনগণের দ্বারা গঠিত জনগণের সরকার। পৃথিবীর কোথাও জনগণ সরকার গঠন করে না। ওটা হচ্ছে ঘটি গরম চানাচুরের মতো। ছোট্ট মাটির হাঁড়িতে একটু টিকের আগুন। ওই আগুনটা হল গণতন্ত্র। ওটা বসানো থাকে চানাচুরের ওপর। তাতে করে ওই হাঁড়ির নীচের সামান্য একটু চানাচুর গরম হয়। বাকিগুলো, মানে গরম ঘটির পাশে এমনকী তলার দিকে চানাচুর গরম হয় না। অতএব, গণতন্ত্রের ওই টিকের আগুনের পাশে কারা থাকে? বড় বড় ব্যবসায়ী, মন্ত্রী, আমলা, মস্তান, এরা সব। নীচের তলার মানুষ ওই নীচের চানাচুরের মতো ঠাণ্ডা মেরে } থাকে।'

গুপি বলল, ‘আপনার সব আজেবাজে কথা।'

পিসেমশাই এবার উঠে বসলেন। গুপি চিত হয়ে শুয়ে ছিল। গুপির দিকে বড় চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বললেন, ‘ও রে পাগল, তোর-আমার মতো জনগণ সরকারের কোন কাজে লাগে রে? বাড়িতে পুজো, গৃহপ্রবেশ, বিয়ে, পৈতে এইসব ব্যাপারে যেমন পুরোহিত লাগে, তেমনই মস্তান সম্প্রদায়ও নানা কাজে লাগে। ভোট, বুথ জ্যাম, গৃহপ্রবেশ মানে এলাকা দখল, তোকে আমাকে দিয়ে এসব কাজ হবে? থানার একটা সেপাইও তোকে পাত্তা দেবে না। যদি তেমন মস্তান হতে পারিস তা হলে খোদ ও সি এসে তোকে তোয়াজ করবে। এস পি ডি সি এসব তোর বন্ধু। দেখবি কালে কালে এটাও একটা ভাল ব্যাবসা হয়ে যাবে। এসব হচ্ছে বিজনেস আন ইউজুয়াল। এরও প্যাকেজিং হবে।'

গুপি যেন রূপকথা শুনছে ঠিক সেইভাবে বলে উঠল, ‘কেমন প্যাকেজিং?’

পিসেমশাই একটু আড়মোড়া ভেঙে বললেন, ‘রিগিং এবং বুথ জ্যাম একসঙ্গে হলে কম রেট হবে। যখন এই ব্যাবসায় প্রতিযোগী বেড়ে যাবে তখন ব্যবসা বাড়াতে অন্য বুদ্ধি খাটাতে হবে। এখন যেমন গায়ে-মাখা সাবানের সঙ্গে একপাতা ডিটারজেন্ট ফ্রি দেয়। ধূপকাঠির সঙ্গে দেশলাই, তেমনই তখন কিছু কিছু মস্তানিও ফ্রি পাওয়া যাবে। পাড়া ছাড়া করার অর্ডার দিলে ঘর দখলটা ফ্রি হয়ে যাবে। আমি কী ভাবছি জানিস?’

গুপি প্রশ্ন করল, ‘আবার কী ভাবছেন?’

পিসেমশাই বালিশটা কোলে নিয়ে বললেন, 'আমি যদি মস্তানি শিক্ষার একটা কলেজ খুলি তা হলে কেমন হয়?’

গুপি উত্তর দেয়, ‘এসব সমাজবিরোধী কাজে সরকার আর জনগণ কেউই অনুমতি দেবে না।'

পিসেমশাই বলে উঠলেন, ‘জনগণের অনুমতি কে চাইছে। আমি কি কলেজটার নাম দেব মস্তান কলেজ? কলেজটার নাম থাকবে ক্যালকাটা জিম। জিমে যা যা হবে, এই কলেজের ছাত্র, প্রয়োজনে ছাত্রীও, যা তৈরি হয়ে বেরোবে তারা তো দেশসেবকদেরই সেবা করবে।' পিসেমশাই আরও খানিকক্ষণ বকবক করে যাচ্ছিলেন, কিন্তু গুপি আর তা শুনতে পায়নি। সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। আজ সকালে ঘুম ভাঙল সেই কুকুরদের ডাকাডাকিতে। সকালবেলাতেই গুপি বেরিয়ে পড়েছিল ত্রিশূলবাবার খোঁজে। যেহেতু আদিকাকা হদিশ জানিয়ে দিয়েছিল তাই ত্রিশূলবাবাকে খুঁজে পেতে গুপির বেশি দেরি হল না। গত রাতে পিসেমশাইয়ের আবোলতাবোল কথাগুলো মনে পড়তেই মনটা সেদিকে চলে গিয়েছিল। ওসব কথা না ভাবলেও চলবে। গুপি ভেবেছিল, ত্রিশূলবাবাকে ত্রিশূলের ওপর বসে থাকতেই দেখবে, কিন্তু তা দেখা গেল না। একখানা হাতল ছাড়া কাঠের চেয়ারের ওপর বাঘছাল বিছানো। ত্রিশূলবাবা তার ওপরে চোখ বুজে বসে। চেয়ারের নীচে মাটির ওপর জনাবিশেক লোক। সম্ভবত ত্রিশূলবাবার ভক্ত। গুপি গিয়ে একপাশে দাঁড়াল। একটু পরে চোখ মেলে সবার দিকে তাকালেন। অমাবস্যার দু'দিন পরে যেমন সরু চাঁদ দেখা যায়, তেমনই সরু একচিলতে হাসি দেখা গেল ত্রিশূলবাবার চোখে। তিনি গম্ভীর গলায় ডাকলেন, ‘বাবা ঊষারঞ্জন।'

থলথলে চেহারার একজন লোক হাতজোড় করে বলে উঠল, ‘আদেশ করুন বাবা।’ ত্রিশূলবাবা বললেন, ‘তোমার বাঞ্ছা বড় কঠিন বাঞ্ছা। সহজে তা পূরণ হবার নয় ঊষারঞ্জন।'

ঊষারঞ্জন নামের সেই থলথলে চেহারার লোকটা এবার হাঁটু গেড়ে নিল ডাউন হওয়ার ভঙ্গিতে বসে বলল, ‘বাবা, আপনার অসীম ক্ষমতা। আপনার দয়ায় ক্লাইভ সহজেই পলাশির যুদ্ধ জিতেছে। এদেশে কোম্পানির রাজত্ব কায়েম হয়েছে। আপনি ইচ্ছে করলে কী না হতে পারে।'

ত্রিশূলবাবা গম্ভীর গলায় বললেন, ‘কী করব? মুর্শিদাবাদের মহাশ্মশানে ত্রিশূল গেড়ে তার ওপর বসেছিলুম। মাঝরাত্তিরে আমার ঝুলন্ত পা দু'খানা কে একজন বুকে চেপে ধরে ‘বাবাগো বাবাগো’ বলে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। বিরক্ত গলায় বললাম, ‘কৈ তুই? কী চাস?’ নাম বলল জগৎ শেঠ। একগাদা নোটের গোছা রাখল পায়ের কাছে। ব্যাবসাদার লোক তো, টাকা ছাড়া কিছু বোঝে না। এমন দৃষ্টি দিলাম যে, নোটগুলো পুড়ে ছাই হয়ে গেল। এর কিছুদিন পর আদিগঙ্গার ধারে বসে আছি। আমার সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ল ক্লাইভ। বিদেশি ছেলে। ওর কান্না শুনে মায়া হল। সাহেবরা তো তোদের মতো হেদিয়ে হেদিয়ে কাঁদে না, কান্নার মধ্যে বেশ স্মার্টনেস আছে। বললুম, ‘নিজের মুরোদে জিততে পারবে না, তবে তোমাকে সাহায্য করার জন্য লোক জুটে যাবে। বিভীষণের দেশ গো সাহেব।' শেষ পর্যন্ত তাই হল। আলিবর্দির নাতিটা হেরে গেল। তারপর তো মরেই গেল।'

থলথলে উষারঞ্জন হঠাৎ হিক্কা তুলে কাঁদতে লাগল আর বলতে লাগল, ‘আমার কী হবে বাবা?’

ত্রিশূলবাবার চেয়ারের পিছনেই পাটের দড়ির মতো পাকানো চেহারার একজন লোক দাঁড়িয়েছিল। ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছিল, উনি যেন ত্রিশূলবাবার খুব কাছের লোক। সেই পাকানো চেহারার লোকটি বলল, ‘ওঁর কী সমস্যা বাবা?’

ত্রিশূলবাবা বললেন, ‘ওঁর সমস্যা বড় কঠিন। কয়েক বছর ধরে প্রমোটারির ব্যবসা করছে। এই ক’বছরেই কোথাও দাদা ধরে, কোথাও পুরপিতা বা মাতা ধরে খানাডোবা, পুকুর যা ছিল বুজিয়ে ফেলেছে। ওর এলাকায় আর বোজাবার কিছু নেই। ঊষা তাই ফাঁকা জমি খুঁজছে। কিন্তু পাচ্ছে না।'

ঊষারঞ্জন এবার আরও জোরে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, ‘আমায় রক্ষা করুন বাবা। আপনি সব পারেন। উপায় বললে, আপনার চরণ ছাড়ছি না। সাগরপারের ফিরিঙ্গি সাহেবকে কৃপা করলেন অথচ দেশের ছেলেকে কৃপা করবেন না??

গুপি মনে মনে ভাবল, জমি না থাকলে ত্রিশূলবাবা কোত্থেকে জমি দেবেন। কিন্তু ত্রিশূলবাবা তো সামান্য মানুষ নন। টানা বারো বছর ত্রিশূলে বসে সাধনা করেছেন। এখনও মাঝেমধ্যে বসেন। কিন্তু কেমন করে যে বসেন সেটা গুপি কিছুতেই ভেবে পায় না। ত্রিশূলের তিনটি ফলাই তো বেশ তীক্ষ্ণ। কেন যে এতদিনেও রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটেনি কে জানে। ওটাই বুঝি বাবার শক্তি এবং লীলা।

ত্রিশূলবাবা চুপ করে ছিলেন। এবার চোখ ও মুখ দুটোই একসঙ্গে খুললেন। দৈব নির্দেশের মতো গলায় বললেন, আসলে দেবতারা তাঁদের দৈব নির্দেশ কেমন গলায় দেন তা গুপি জানে না। জানবার কথাও নয়। যেহেতু সে কখনও শোনেনি। সিনেমায় অনেক ধর্মীয় ছবিতে দেখেছে এবং শুনেছে দেবতারা গম্ভীর গলায়, স্পষ্ট উচ্চারণে একই স্কেলে দৈব আদেশ দিয়ে থাকেন। যাঁদের মধ্যে দৈবশক্তি বিরাজ করে তাঁদের কণ্ঠস্বরও বুঝি একই স্কেলে থাকে। এখন যেমন ত্রিশূলবাবার কণ্ঠস্বর একই স্কেলে। ত্রিশূলবাবা বললেন, 'আমি মানসচক্ষে দেখছি গঙ্গার উত্তরদিক অর্থাৎ ত্রিবেণী-র কাছে গঙ্গার অনেকটা অংশ চড়া পড়ে আছে। দীর্ঘমেয়াদি চড়া। কেউ কেউ বাঁশের বেড়া আর টালি দিয়ে ঘর করে বাস করছে। তুমি বাবা উষা ওই জমিতে বাড়ি করতে আরম্ভ করো। ওখানে ফ্ল্যাট হলে বহু লোক পাবে। অন্তর্জলি যাত্রা করতে হবে না। ফ্ল্যাটে বসেই গঙ্গাদৰ্শন।'

ঊষারঞ্জন তার থলথলে চেহারাটা নিয়ে বাবার চেয়ারের কাছে ঘষটে ঘষটে আরও এগিয়ে এসে বলল, ‘বাবা, গঙ্গা না হয় পোর্ট আর জলপুলিশের আন্ডারে। কিন্তু চড়াটা কার আন্ডারে? কার দপ্তরে সিধে চড়াতে হবে?’

ত্রিশূলবাবা হেসে বললেন, ‘ওরে বোকা! তোকে খুঁজতে হবে কেন? দু’লরি ইট ফেলে ফ্ল্যাট হবে বলে সাইনবোর্ড লাগা, দেখবি তোকেই লোকে খুঁজছে। পারমিশন দেবার লোক তোর দোরগোড়ায়।'

ঊষারঞ্জন প্রসন্ন হয়ে প্রণাম করে উঠে দাঁড়াল। হাতজোড় করে বলল, ‘খোলা গঙ্গার পাশে ফ্ল্যাট। কমপ্লেক্সটার কী নাম দেওয়া যায় বলুন তো?’

ত্রিশূলবাবা হাত তুলে উষারঞ্জনের মাথায় স্পর্শ করে বললেন, ‘নাম দাও গঙ্গাযাত্রা। এর থেকে ভাল নাম আর হয় না।'

ঊষারঞ্জন বোধহয় সঙ্গে লোকজন নিয়ে বাবাদর্শনে এসেছিল। কারণ তার সঙ্গে সঙ্গে আরও তিন-চারজন লোক অনুগতের মতো তার পিছু পিছু গেল। আরও খানিকক্ষণ পর ত্রিশূলবাবা গুপির দিকে ফিরে বললেন, ‘বাবা গুপিচাঁদ, নিকটে এসো। তুমি তো অত্যন্ত ভাগ্যবান ছেলে। এসো, কাছে এসো।'

নামিয়ে বলল, 'আপনার সঙ্গে গুটিকয় কথা ছিল।' ত্রিশূলবাবা বললেন, ‘সেটাই তো স্বাভাবিক। একটু অপেক্ষা করো। ভক্তদের ভিড় পাতলা করি।' '

গুপি কাছে এসে গলাটা

ত্রিশূলবাবা নানাজনকে নানা পরামর্শ আর উপদেশ দিয়ে যেতে লাগলেন। একজনকে বললেন, ‘বুকের ব্যারাম আর মাথার রোগ তো শহুরে লোকদের হয়। তুমি গাঁয়ের লোক। তোমার কেন হবে?’

লোকটা বলল, ‘এতদিন তো ছিল না। মেয়ের বিয়ে দিয়েছি কলকাতায়। ছেলে চাকরির জন্য হাওড়ায় থাকে। স্বামী-স্ত্রীতে মিলে মাসতিনেক কলকাতা আর হাওড়ায় ছিলাম। তারপর থেকেই রোগ বাধল।'

ত্রিশূলবাবা বললেন, ‘সকালের মুক্ত বায়ু বুক ভরে নাও। আসছে শনিবার সন্ধ্যায় দেখা করবে। অজয়ের ধারে ত্রিশূলে বসে থাকব। তখন ওষুধ দেব।'

ত্রিশূলবাবার কোনাকুনি একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক বসেছিলেন। ইদানীং মানুষের মুখ দেখে বোঝবার উপায় নেই। তবুও ওই প্রৌঢ়কে দেখে গুপির মনে হল, ভদ্রলোক খুব সাদাসিধে এবং সরল প্রকৃতির। গুপি সেই প্রৌঢ় ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে ছিল। ত্রিশূলবাবা সেটা লক্ষ করে বললেন, ‘এই যে ভদ্রলোককে দেখছেন, এর নাম রামমোহন। এরা সবাই মোহন।

তোমাদের যেমন পশ্চাতে চাঁদ, অর্থাৎ দুনিচাঁদ, নদেরচাঁদ, তুমি গুপিচাঁদ, তেমনই এদেরও পশ্চাতে মোহন। হরিমোহন, তস্যপুত্র রাধামোহন, তস্যপুত্র মণিমোহন। মণিমোহনের পুত্র এই রামমোহন। এঁর ছেলের নাম লালমোহন। ছেলের ঘরে নাতি হয়েছে। ওদের বংশের সবার নামই আমার দেওয়া। এমনভাবে ছেলেদের নাম রাখতে হবে যে, কেউ যেন মোহন ছাড়া না হয়। তাই লালমোহনের ছেলের নাম দিলুম দস্যু মোহন। জব্বর নাম। তামাম বাঙালির কাছে নামটা পরিচিত অথচ কোনও বাঙালির এই নাম নেই। শশধর মশাইয়ের কপিরাইট ছিল তো, তাই কেউ নিতে পারেনি। এখন তো কপিরাইট উঠে গেছে, তাই আর কোনও বাধা নেই।'

এতক্ষণে গুপি জানতে পারল ওই শান্তশিষ্ট সরল প্রৌঢ় ভদ্রলোকটির নাম রামমোহন। গুপি বলল, ‘আপনি কি এই গাঁয়েই থাকেন?’

উত্তর দেওয়ার আগে রামমোহনবাবু বললেন, ‘নানান গ্রাম বদলে বদলে আপাতত এই গাঁয়েই আছি।'

গুপি অবাক চোখে রামমোহনবাবুকে দেখতে দেখতে বলল, ‘নানান গ্রাম বদলে বদলে কেন? আপনার নিজের কোনও গ্রাম নেই? যাকে স্বদেশ বা জন্মভূমি বলে।'

রামমোহনবাবু বললেন, ‘সেসব বাবা বিস্তর কথা। বলতে শুরু করলে রাত কাবার হয়ে যাবে। তোমারও ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটবে। তার থেকে বরং আজ থাক।'

যদিও গুপির খুব শুনতে ইচ্ছে হচ্ছিল, কিন্তু রামমোহনবাবু বলতে না চাইলে আর কী করে শুনবে। ত্রিশূলবাবা বললেন, ‘গুপিচাঁদ খুব গুণী ছেলে। তুমি না হয় সারসংক্ষেপ করে বলো। কথা সংক্ষেপ করতে জানো তো?’

রামমোহনবাবু একফালি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘বলার আর কী আছে। আপনি মহাপুরুষ। আপনি তো সবই জানেন। আপনিই বরং বলুন।'

ত্রিশূলবাবা রামমোহনবাবুর দিকে তাকিয়ে একটু স্নেহের হাসি হেসে বললেন, ‘লজ্জা পাচ্ছ, না ভয় পাচ্ছ? কিছুই পাওয়ার দরকার নেই। দোষ তো তোমার নয়, দোষ এই সমাজের।'

গুপি মনে মনে শঙ্কিত হল। শহরে তো মিটিঙে, আলোচনাসভায়, খবরের কাগজে ‘সমাজ’ নামে অদৃশ্য এক বস্তুকে গালাগাল দেওয়া হয়। যেন যত নষ্টের গোড়া ওই সমাজ। গুপি ভেবে পায় না। সমাজটা কে? সে তো কোনও গাছের ফল বা জঙ্গলের হিংস্র কোনও পশু নয়। আমাদেরই হাতে তৈরি অথচ দায়িত্ব এড়াবার জন্য আমরাই সুযোগ পেলে তাকে গাল দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাই।

গুপি ত্রিশূলবাবার দিকে তাকাবার সঙ্গে সঙ্গে ত্রিশূলবাবা বললেন, ‘এই রামমোহন হচ্ছে দাঁতের ডাক্তার। দাঁত তোলা এবং দাঁত বাঁধানো, এই দুটোই ওদের পারিবারিক পেশা। হরিমোহনকে বাদ দিলে আর সবাই একই কাজ করে আসছিল। রাধামোহন থেকে শুরু। মণিমোহন পেরিয়ে এই রামমোহন পর্যন্ত দিব্যি দাঁত তোলা আর বাঁধানো চলছিল। রামমোহনে এসে কিঞ্চিৎ গোলযোগ দেখা গেল।'

গুপি বলল, ‘গোলযোগ মানে? দাঁতের খদ্দের কি কমে গেল?’

ত্রিশূলবাবার পরিবর্তে এবার রামমোহনবাবু বললেন, ‘খদ্দের কমেনি বাবা, কমে গেল আমার পসার। ভারী বিচিত্রভাবে কমে গেল। যদিও এর জন্য আমি কাউকে দোষ না দিয়ে নিজের লোভ-লালসাকেই দোষ দিই। কথায় বলে না, লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। আমারও তাই হল।'

গুপি রামমোহনবাবুকে বারদুই দেখে নিয়ে বলল, ‘কিন্তু আপনার তো মৃত্যু হয়নি। আপনি তো বেঁচেই আছেন।'

রামমোহনবাবু বললেন, ‘বেঁচে যে আছি সেটা ত্ৰিশূলবাবার দয়ায়। প্রাণে না মরে জীবন্মুত হয়ে আছি।'

ত্রিশূলবাবা ছোট্ট একটা ধমক দিয়ে রামমোহনকে বললেন, ‘ও রে মূর্খ, চোখ থেকেও দেখতে পাস না। জগতে সবাই তাই। যাঁরা বেঁচে আছে বলে বড়াই করে তাঁরাও তোর মতো জীবন্মুত।'

গুপি প্রশ্ন করল, ‘ওঁর ব্যাপারটা তো বোঝা গেল না।’

ত্রিশূলবাবা বললেন, ‘বুঝিয়ে দিচ্ছি। সেবার আমি সপ্ততীর্থ পরিক্রমা করে সবে ফিরেছি। রামমোহন এসে আমার সঙ্গে দেখা করল। তখন আমি...’

কথা শেষ হওয়ার আগেই গুপি বলল, “ত্রিশূলে বসেছিলেন?’

ত্রিশূলবাবা বললেন, ‘না। ত্রিশূল আমার পাশে। সদ্য সদ্য হিংলাজ থেকে আকাশগঙ্গার পবিত্র জল নিয়ে ফিরেছি। ওই জল সংসারীদের কাজে লাগে। আমি তো সেই অর্থে সংসারী নই। তবে গোটা জগৎসংসারই তো আমার সংসার। মানবকল্যাণে এই পবিত্র বারি বিতরণ করব, এই ছিল ইচ্ছা। এরই মধ্যে রামমোহন এল। বললুম, ডাক্তারি কেমন চলছে?’

রামমোহন বলল, ‘কই আর চলছে। দাঁত নড়ে উঠলেই সবাই গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় ছুটছে। আমাদের পৈতৃক ব্যাবসার সেই রমরমা নেই। আমার ঠাকুর্দার কাছে সাহেব কালেক্টর থেকে উকিল পর্যন্ত লাইন দিয়ে দাঁত তুলেছে এবং বাঁধিয়েছে। কত সাহেবের বাঁধানো দাঁতের পাটি এখনও ঠাকুর্দার আলমারিতে পড়ে আছে। অর্ডার দিয়ে গেছে। কিন্তু দাঁত ডেলিভারি নিতে আসেনি। প্রথম কারণ, ম্যালেরিয়ার ভয়ে গ্রাম ছেড়ে কলকাতা সটকে পড়েছে, নয়তো বিপ্লবীদের গুলিতে মারা গেছে। ওই দাঁতগুলোর ধুলো ঝেড়ে বাজারে চালু করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু লালমুখো সাহেবদের দাঁত কিছুতেই দেশের লোকদের মুখে ফিট করল না। উলটে কে যেন রটিয়েছিল, রামমোহন শ্মশান থেকে মরা মানুষের দাঁত এনে জ্যান্ত মানুষের মুখে ঢোকাচ্ছে। ব্যস, ওই একটি অপপ্রচারেই গ্রাম ছাড়তে হল। নতুন জায়গায় কিছুতেই ব্যাবসা জমছে না। এমন একটা গাঁয়ে এলাম, যেখানে কারও দাঁত নড়ে না। এমন দন্তবাগীশ গ্রাম আগে কখনও দেখিনি।'

ত্রিশূলবাবা থামলেন। বোধহয় দম নেওয়ার জন্য। এবার রামমোহনবাবু বললেন, ‘তখন বাবা বললেন, আমি তো খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দাঁত ফেলতে বা নাড়াতে পারব না। তোকে একটা বিদ্যা শিখিয়ে দিই। আমি বাবাকে বললাম, ‘কেমন বিদ্যা?’ বাবা বললেন, ‘অক্ষয় দন্তবিদ্যা। তোর বাঁধানো দাঁত আসল দাঁতের থেকে মজবুত এবং ভাল হবে। আমৃত্যু সেই দাঁত থাকবে।

দাঁতের পরমায়ু তো মানুষের থেকে বেশি হয়। তাই তো কত লোক একমুখ দাঁত নিয়েই মরে যায়। অক্ষয় দন্তবিদ্যার সাহায্যে যে দাঁত বাঁধিয়ে দিবি তারও পরমায়ু মানুষের থেকে অনেক গুণ বেশি হবে। তবে এই দাঁত মুখে লাগিয়ে মিথ্যে কথা বলা যাবে না। বললেই দাঁত ছিটকে পড়ে যাবে।' আমি লোভে পড়ে বাবার কথায় রাজি হয়ে গেলাম। তখন কি জানতাম, মানুষজন এত মিথ্যা বলে। ফলে যা হবার তাই হল। আমার কাছে দাঁত বাঁধিয়েছিলেন গোবর্ধন প্রামাণিক। ডাকসাইটে জননেতা। ভোটের মিটিঙে যেই মাইক বাগিয়ে বক্তৃতা শুরু করলেন, কী বলব বাবা, দু’মিনিট যেতে না যেতেই মুখের ভেতর থেকে দাঁতের পাটিগুলো শিলাবৃষ্টির মতো বেরিয়ে এল। শুধু কি বেরিয়ে আসা, সেই দাঁত গিয়ে আছড়ে পড়ল মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান দীনবন্ধু সাঁতরার মসৃণ টাকের ওপর। চকচকে টাকে এক পাটি দাঁতের গভীর দাগ। মানুষের টাকে মানুষ তো কখনও কামড়াতে যায় না। কিন্তু এই ঘটনার কী ব্যাখ্যা দেব? শুধু কি গোবর্ধনবাবু। অন্য যাঁরা দাঁত বাঁধিয়েছিলেন তাঁদেরও দাঁত খুলে এসে রাস্তায় গড়াতে লাগল। মারাত্মক বিশ্রী ব্যাপারটা ঘটল পঞ্চায়েত প্রধানের অফিসে। কলকাতার মন্ত্রী কী একটা জিজ্ঞেস করতেই পঞ্চায়েত প্রধান যেই না কথা বললেন, অমনি তাঁর মুখের ভেতর থেকে জোড়া দাঁতের পাটি বন্দুকের গুলির মতো ছিটকে বেরিয়ে গিয়ে এমনভাবে মন্ত্রীর চশমার কাচে ঠিকরে পড়ল যে, কাচ ভেঙে রক্তারক্তি। মন্ত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করতে হল। এর পর কি আর আমার পসার থাকে, না থাকতে পারে।'

গুপি বলল, ‘কিন্তু ওঁরাই বা এত মিথ্যে বলেন কেন?’

রামমোহন বড় করুণ করে একটু হাসলেন। তারপর বললেন, ‘এ কেমনধারা কথা বলছ বাবা। দেশসেবার ব্যাবসা বড় ব্যাবসা। এতে সেলসট্যাক্স নেই, ইনকামট্যাক্সও নেই। এই ব্যবসার ক্যাপিটাল হচ্ছে মিথ্যা কথা, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি। আমি সামান্য দাঁতের ডাক্তার। সেই আমি যদি ব্যবসার ক্যাপিটালে হাতুড়ি মারি তা হলে আমার পক্ষে সেটা অন্যায় নয়? ঘোরতর অন্যায়।

গুপি একটু সহানুভূতি দেখাবার মতো করে বলল, ‘আপনার তো তা হলে খুবই মুশকিল। এইসব ঘটনার পর থেকে কি আর দাঁত বাঁধান না?’

রামমোহন সখেদে বললেন, ‘এত কিছু জানার পর আমার কাছে কোন মানুষ দাঁত বাঁধাতে আসবে। আমার যা বদনাম রটেছে, তাতে মহাভারতের যুধিষ্ঠির ছাড়া আমি আর কোনও পেশেন্ট পাব না। কলিতে তো তাকে পাওয়ার কোনও চান্সই নেই।'

রামমোহনবাবু মুখ নিচু করে বসে রইলেন। তাঁর মুখটা বিষণ্ন দেখাচ্ছিল। গুপির খুব কষ্ট হতে লাগল। তাই গুপি বলল, ‘কলকাতায় আমাদের একটা বাজার আছে। আপনি চাইলে সেই বাজারে আপনাকে একটা দোকান...’

গুপি এই পর্যন্ত বলার পর রামমোহন বললেন, ‘না বাবা। মানুষের দাঁত আর বাঁধাব না। এখন আমি কুকুরের দাঁত তোলা এবং বাঁধানোর কাজ করছি। তাতেই ভাত-ডালের সংস্থান হয়ে যাচ্ছে। কুকুরের দাঁতে রিস্ক কম, কারণ কুকুর তো কথা বলে না!’

রামমোহনবাবু উঠবার উদ্যোগ করছিলেন। ত্রিশূলবাবা গুপিকে বললেন, ‘বাবা গুপিচাঁদ এবার তোমার সঙ্গে আমার গোপন কথা আছে। খোলা জায়গাটা নিরাপদ নয়। চলো ঘরের ভিতরে যাই।'

ত্রিশূলবাবা উঠে দাঁড়ালেন। চোখ দিয়ে গুপিকে ইশারা করতেই গুপি তাঁর পিছন পিছন একটা ঘরে এল।

ঘরটা বেশ বড়। কিন্তু ঘরের মধ্যে কোনও জানালা নেই। একটিমাত্র কাঠের দরজা। যে দরজা দিয়ে ত্রিশূলবাবার পিছন পিছন এইমাত্র গুপি ঘরে এল। ওই দরজা ছাড়া ঘরের চারদিকেই কঠিন দেওয়াল। গুপির মনে হল, কোনও মানুষকে আটকে রেখে শাস্তি দিতে হলে এইরকম ঘরই দরকার হয়। গোটা ঘরটার মধ্যে ক্রুর নৈঃশব্দ্যের ভিতর একটা নিষ্ঠুরতাও যেন জেগে আছে। এরকম অদ্ভুত ঘর গুপি কখনও দেখেনি। ত্রিশূলবাবা তাকে এই ঘরে নিয়ে এলেন কেন? কোনও গুপ্তধনে গুপির লোভ নেই। যা গুপ্ত তাকে গুপ্ত থাকতে দেওয়াই ভাল। গুপি ত্রিশূলবাবাকে কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল। ত্রিশূলবাবা বুঝতে পেরে ঠোঁটের ওপর নিষেধের ভঙ্গিতে একটা আঙুল রেখে শিই-ইস করে দীর্ঘ এবং চাপা একটা শব্দ করলেন। গুপির মনে হল, ত্রিশূলবাবার মুখের ওই শব্দটা ঠিক যেন প্রেশার কুকারের সিটির মতো। দিদির প্রেশার কুকার থেকে প্রায়ই এইরকম শব্দ হয়। আগে রকে বসে উঠতি ছেলেরা সিটি দিত। এখনকার ছেলেরা ভাল করে সিটি দিতেই জানে না। গুপি তো জানে না। কিন্তু পল্টন জানে। পল্টন হরবোলা করে বলে মুখে অনেকরকম শব্দ করতে পারে। মুখে শব্দ করে এমন রেলগাড়ি চালাতে পারে যে, মনে হবে কয়লার ইঞ্জিনওলা ট্রেনটা সত্যি সত্যি স্টেশন ছেড়ে দূরে, অনেকদূরে চলে গেল। তার শব্দটাও আস্তে আস্তে দূরে মিলিয়ে গেল। এখন সিটি দেওয়ার পীঠস্থান সেই রকই নেই তো ছেলেরা সিটি দেবে কোত্থেকে। হারমোনিয়ম কিংবা বাঁশি যদি নাই থাকে তা হলে সুর তুলবে কীসে। হালফ্যাশনের বাড়িতে রক নেই, উঠোন নেই, স্রেফ ব্যালকনি আছে। তাই রকের সিটি মানুষের মুখের বদলে এখন যন্ত্রের মধ্যে দিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছে। সিটি না হয় তেমন কোনও ভাল জিনিস নয়। কিন্তু হাসি? সেই হাসিও লোকের মুখে তেমন দেখা যায় না। আগে মানুষ কেমন প্রাণ খুলে হাসত, দিব্যি হাসতে পারত। এখন সেই দিলখোলা হাসিও লুপ্তপ্রায় বলে পাড়ায় পাড়ায় ‘হাসি ক্লাব’ তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ লাফিং ক্লাব। সেখানে গিয়ে ঘড়ি ধরে হাসতে হয়। হাসিও কি ক্লাব করে মানুষকে শেখাতে হয়? কে জানে দিনকাল যা বদলে যাচ্ছে তাতে করে অনেক কিছুই হয়তো নতুন করে শিখতে হবে। এখন পর্যন্ত তিনটে জিনিস আছে, যা মানুষকে শেখাতে হয় না, মানুষ নিজে নিজেই শিখে যায়। সেই তিনটে জিনিস হচ্ছে, খাওয়া, মিথ্যা কথা বলা এবং পরনিন্দা করা।

গুপি যখন ঘরের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে এইসব ভেবে যাচ্ছিল ত্রিশূলবাবা ততক্ষণ ওই কঠিন দেওয়ালের নানা জায়গায় ত্রিশূল দিয়ে টুকটুক আওয়াজ করে দেওয়ালে কান পেতে কিছু একটা শোনার চেষ্টা করছিলেন। গুপির মনে হল ত্রিশূলবারা কি সত্যিই সাধক নাকি অন্য কিছু! সাধক মানুষরা এত দেওয়াল ঠোকাঠুকি করে কান পেতে কী শুনবেন! কাশীপুরের গণেশ চক্রবর্তী মস্ত বড়লোক। পেল্লায় বাড়ি, বড় বড় গাড়ি, আর তেমনই জাঁকজমক। সেই বাড়িতে ভোররাত্তিরে গাড়ি বোঝাই করে কারা যেন এল। যারা এল, তাদের মধ্যে সাদা পোশাকের পুলিশও ছিল, খাকি পোশাকের পুলিশও ছিল। তারা নাকি গণেশ চক্রবর্তীর দেওয়াল, মেঝে, ছাদ— সবই ঠোকাঠুকি করে পরে ভেঙে ফেলেছিল। ভেঙে ফেলে বিস্তর টাকা, সোনার গয়না আরও কীসব আপত্তিজনক জিনিস পেয়েছিল। ত্রিশূলবাবাও কি সেইরকম মতলবে এই ঘরের কঠিন. দেওয়ালগুলো ঠোকাঠুকি করছেন? খানিকক্ষণ দেখার পর গুপি বলল, ‘আপনি এত ঠোকাঠুকি করছেন কেন? দেওয়ালে কান পেতে শুনছেনই বা কী?’

ত্রিশূলবাবা ঘুরে দাঁড়ালেন। ঘরের চারদিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওপরের যে ছাদ দেখছ, সেই ছাদ পরে হয়েছে। আজ থেকে এক যুগ আগে এই ঘরে, খোলা আকাশের নীচে বসে শবসাধনা করেছিলুম।'

গুপি বলল, ‘সেটা আবার কেমন সাধনা?’

ত্রিশূলবাবা বললেন, ‘কদমখণ্ডীর শ্মশান থেকে সদ্য মৃত এক যুবাপুরুষকে তুলে এনে তার বুকের ওপর পদ্মাসনে বসে তে-রাত্রি যে সাধনা করেছিলুম তারই নাম শবসাধনা।’

গুপি এবার চোখে-মুখে বিরক্তিভাব প্রকাশ করে বলল, ‘বেচারি মরেও শান্তি পেল না। তার বুকের ওপর পদ্মাসন ছাড়া আপনার কি আর কোথাও আসন করার জায়গা ছিল না। একেই বলে মরার ওপর খাড়ার ঘা।'

ত্রিশূলবাবা গুপির দিকে এগিয়ে এসে বললেন, ‘এতসব করেছিলুম বলেই তো সব জ্ঞান অর্জন করেছি। মানুষের সব দুঃখের প্রতিকার করতে পারছি। তোকে যে গুপ্তধনের সন্ধান দেব তাও তো এইসব সাধনার ফলেই।'

গোড়ার দিকে ত্রিশূলবাবার প্রতি গুপির ভক্তিভাবটা যতখানি গাঢ় ছিল, এখন তার চাইতে একটু ফিকে হয়ে আসছে। তাই মনে মনে বলল, মানুষের সব দুঃখের প্রতিকার ভগবানও করতে পারে না। ত্রিশূলবাবা আর যাই হন, তিনি তো ভগবান নন। এই গ্রামেই তো কত দুঃখী মানুষ আছে। এখানকার ছেলেরা বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার চাইতে ঝুড়ি নিয়ে মাঠে যায় মাটি কাটার কাজ করতে। ইস্কুল থেকে ছেলে শুকনো বিদ্যে নিয়ে ঘরে ফেরে। বিদ্যে জ্ঞান বাড়ায়, খিদে মেটায় না। পেটের অন্ন দেয় না। কিন্তু মাঠ থেকে ছেলে ফেরে পকেটে রোজ কামাইয়ের টাকা নিয়ে। লেখাপড়া না শিখলে কোথায় কতখানি ক্ষতি সে কথা এরা বোঝে না, ওদের তেমন করে কেউ বোঝায়ও না। কোনও এক অদৃশ্য পাঁচালিকার সেই কবে, কত যুগ আগে এঁদের দুঃখের পাঁচালি লিখতে শুরু করেছিলেন আজও সেই লেখা চলছে। এর মধ্যে অজয়ের জলে কতবার জোয়ার-ভাটা খেলেছে কিন্তু এই গ্রামের মানুষগুলোর অদৃষ্ট থেকে ভাটার অভিশাপ মেটেনি। এর মধ্যে ইংরেজ এল, ইংরেজ চলে গেল, দেশ স্বাধীন হল, দেশীয় দাদারা মাতব্বর হলেন তাদের মাতব্বরি ক্রমেই বাড়তে লাগল। তারাই যেন কলির দেবতা। ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের মতো ত্রিদেব।

ত্রিশূলবাবার সাধনা তো এদের কিছু করতে পারেনি। মানুষ মারার মারণ অস্ত্র যে আবিষ্কার করে এবং বানায় সেও তো সাধনা করে, বিদ্যার সাধনা, বিজ্ঞানের সাধনা। সেও দিবারাত্রি পরিশ্রম করে, কিন্তু সেই পরিশ্রম এবং সাধনা মানুষের কোনও কাজে লাগে না। ত্রিশূলবাবার নানারকম সাধনাও বুঝি সেইরকম। ওই দাঁতের ডাক্তারকে অক্ষয় দন্তের আশীর্বাদ দিয়ে ত্রিশূলবাবা যে তার কত বড় সর্বনাশ করেছেন সেটা বেচারি রামমোহনবাবু আর তার পরিবার হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। এই গ্রামে এত লোক থাকতে ত্রিশূলবাবা বেছে বেছে তাকেই কেন গুপ্তধনের সন্ধান দিতে আগ্রহী সেটা সহজ বুদ্ধিতে গুপির মাথায় ঢুকছে না।

গুপির ধৈর্য চলে যাচ্ছিল। তবু খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে বলল, ‘বেলা হচ্ছে, এবার আমি বাড়ি যাব।'

ত্রিশূলবাবা বললেন, ‘চল, তাই যাওয়া যাক।’

গুপি ত্রিশূলবাবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি তো আমার বাড়ি যাব। আপনি কোথায় যাবেন?’

ত্রিশূলবাবা উত্তর দিলেন, ‘আজ যে মধ্যাহ্নে তোদের বাড়িতে আমার মধ্যাহ্নভোজের নিমন্ত্রণ। আদিনাথ অত করে বলে গেল। আমি কি না গিয়ে পারি। চল, রওনা হওয়া যাক।' মনে মনে অবাক হলেও গুপি কিছু বলল না। সে ভেবে পেল না, আদিকাকা কখন এসে ত্রিশূলবাবাকে নিমন্ত্রণ করে গেল। বাবা কি মিথ্যে বলছেন? সামান্য একটু খাবার, তার জন্য মিথ্যে বলবেন এটা বিশ্বাস করতে গুপির কষ্ট হল। আধঘণ্টার হাঁটাপথেই বাড়ি ফিরে এল, সঙ্গে ত্রিশূলবাবা। বাড়ির উঠোনে পা দিয়েই গুপি টের পেল, আজ মধ্যাহ্নের আহার যথার্থই ভোজ হবে। আদিকাকা রান্না করছে। চমৎকার গন্ধ বেরোচ্ছে। আদিকাকার সঙ্গে কোমরে গামছা জড়িয়ে রাঁধতে লেগেছেন পিসেমশাই। পিসেমশাই কি রাঁধতেও জানেন নাকি? ত্রিশূলবাবাকে দেখে আদিকাকা যেমন আপ্যায়ন করতে লাগল, তাতে মনে হল, ত্রিশূলবাবা মিথ্যে বলেননি। আদিকাকা নিশ্চয়ই তাকে মধ্যাহ্নভোজে নিমন্ত্রণ করেছে। যেখানে রান্না হচ্ছিল তার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে গুপি স্নান করতে গেল।

কদমখণ্ডীতে আসার পর থেকে দিনগুলো বেশ শান্তিতেই কেটে যাচ্ছিল। জমিজমার ব্যাপারটা প্রথমে যেমন জটিল মনে হয়েছিল এখন আর তত জটিল মনে হচ্ছে না। ধানের ফলন, জমির হিসেব, ডিপ টিউবওয়েলের খরচ, ফসলের খেতে পোকা মারার ওষুধ, এসব ব্যাপার আদিকাকা এই ক’দিনে দিব্যি বুঝিয়ে দিয়েছে। নিজের গাছে ফল এলে মনে যে এত আনন্দ হয় সেটা গুপির জানা ছিল না। তাদের বাজারে ঝুড়ি বোঝাই ঝিঙে আসে। এখানে এসে সে প্রথম ঝিঙেফুল দেখল। বেশ রোমাঞ্চকর ব্যাপার।

কিন্তু গতকাল থেকে অন্যরকম ব্যাপার ঘটতে আরম্ভ করেছে। ঘোর অমাবস্যার মতো নিকষ কালো রঙের একটা ভ্যানগাড়ি তাদের বাড়ি থেকে পঞ্চাশ গজ দূরে গতকাল অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। গাড়িটা যে পুলিশের তা চিনতে গুপির ভুল হয়নি। বাড়ির কাছে পুলিশের গাড়ি কেন? গুপি ভাবল, পিসেমশাই কোনও গণ্ডগোল বাধাননি তো? হয়তো শেয়ালদের উৎপাত নিয়ে পুলিশকে নালিশ করেছেন। শেয়ালদের বিরুদ্ধে ডায়েরিও করতে পারেন। পিসেমশাইয়ের পক্ষে অসম্ভব কিছুই নয়। গুপি এটাও বিলক্ষণ জানে যে, শেয়াল মারার ব্যাপারে পুলিশের উৎসাহের অভাব নেই। কয়েক বছর আগে কলকাতার কাছেই কোনও একটা পার্কে নাকি পুলিশ শেয়াল মেরেছিল। কলকাতার সব কাগজে সেই খবরও বেরিয়েছিল। এখানে তা হলে পুলিশ শেয়াল মারতে এসেছে?

পুলিশের ভ্যান আর ভ্যানে-বসা পুলিশকর্মীদের নির্বাক এবং ভাবলেশহীন মুখ দেখে কিছুই বোঝবার উপায় নেই। গুপি পল্টনকে বলল, 'সকালবেলা একটা পুলিশভ্যান অনেকক্ষণ বাড়িটার দিকে মুখ করে দাঁড় করানো ছিল। এইমাত্র চলে গেল। ওদের মতলবটা বুঝতে পারছি না।'

পল্টন বলল, ‘থানায় গিয়ে জিজ্ঞেস করব?'

গুপি উত্তর দিল, ‘কোনও দরকার নেই। গতকাল দুপুরেও ছিল। সন্ধ্যার দিকেও একবার টহল দিয়ে গেছে। আবার আজ সকালে এসেছিল। আমি জমিজমার কাজে যাচ্ছি। তুই বারান্দায় বসে থাকবি। পুলিশের গাড়িটা আর আসে কি না এবং এলে কতক্ষণ দাঁড়ায় এইসব লক্ষ করবি। কাউকে কিছু বলার দরকার নেই।'

পল্টনকে বলে গুপি চলে গিয়েছিল। ফিরে এসে পল্টনের মুখ থেকে যা রিপোর্ট পেল তাতে গুপির চোখ ছানাবড়া। এবার ওই কালো ভ্যানটা আসেনি। এসেছিল একটা জিপ। তাতে জনাপাঁচেক লোক। তাদেরই দু’জন লোক জিপ থেকে তাদের বাড়িটার দিকে তাকাচ্ছিল। ওই দু'জনের মধ্যে একজনের হাতে ছিল গোল করে গোটানো একটা কাগজ। মাঝে মাঝেই সেই কাগজটা খুলে দু’জনে দেখছিল। কাগজটা দেখছিল আর আমাদের বাড়িটার দিকে তাকাচ্ছিল। এমন সময় মাঠের ওপর দিয়ে একজন রঙিন পোশাক পরা বাউল হেঁটে আসছিল। ওই লোক দুটোর একজন বাউলকে ডাকল। ডেকে কীসব জিজ্ঞেস করল। বাউল ভদ্রলোক চলে যাওয়ার পরেও অনেকক্ষণ জিপটা দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর জিপটা চলে গেল।

গুপি চিন্তিত মুখে বলল, ‘জিপটা কি পুলিশের?’

পল্টন বলল, ‘আলবত পুলিশের।’

গুপি ফের প্রশ্ন করল, ‘কেমন করে বুঝলি?’

পল্টন বলল, ‘প্রথমে বুঝলাম ধোঁয়া দেখে। জিপ গাড়িটার পিছন থেকে দেদার কালো ধোঁয়া গলগল করে বেরোচ্ছিল। কলকাতাতেও দেখেছি, পুলিশের জিপ আর ভ্যান থেকে ধোঁয়া বেরোবেই। দ্বিতীয় প্রমাণ আরও মোক্ষম, গাড়িটা ঘুরতেই পিছনে দেখলাম, লেখা আছে ডবলিউ বি পুলিশ। ব্যস, আর কোনও সন্দেহ রইল না।'

গুপি মনে মনে ভাবল, এই ব্যাপারটাকে তুচ্ছ ভাবা ঠিক হবে না। পিসেমশাইকে বলে লাভ নেই। আজই আদিকাকাকে ব্যাপারটা জানানো দরকার। পুলিশের কিছু জানবার থাকলে সরাসরি জেনে যাক না। অমন জলঘোলা করছে কেন। আদিকাকার কাছে এখনই জিজ্ঞেস করা যেত, কিন্তু এই মুহূর্তে আদিকাকার সঙ্গে গল্পে মেতে আছেন পিসেমশাই। অতএব আপাতত কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা ছাড়া আর উপায় নেই।

প্রতীক্ষার প্রহর বড় দীর্ঘ মনে হয়। পিসেমশাইয়ের গালগল্প যে কখন শেষ হবে তার।’

তো কোনও ঠিকঠিকানা নেই। বরং পল্টনকে দিয়ে বারদুই শেয়াল-ডাক ডাকিয়ে দিলেই পিসেমশাই সুড়সুড় করে গল্প ছেড়ে ঘরে চলে আসবেন। সেই সুযোগে আদিকাকাকে কথা বলা যাবে। গুপি পল্টনকে কাছে ডেকে বলল, ‘তুই একবার শেয়াল-ডাক ডেকে ওঠ তো।'

পল্টন জানলা দিয়ে ঘরের বাইরে তাকিয়ে বলল, ‘তোর কি মাথা খারাপ? এখনও দগদগে বিকেল। এই বিকেলে কি শেয়াল ডাকে? আগে আঁধার নামতে দে। তারপর তো শেয়ালের ডাক।’

গুপি বুঝল পল্টনের কথায় সত্যি যুক্তি আছে। অসময়ে ডাকের ফলে যদি পল্টন পিসেমশাইয়ের কাছে ধরা পড়ে যায় তা হলে রাতের দিকে শেয়াল-ডাক ডেকে পিসেমশাইকে আর ভয় পাওয়ানো যাবে না। পিসেমশাইয়ের শেয়ালাতঙ্ক চলে গেলে তিনি আবার বাড়াবাড়ি করতে আরম্ভ করবেন। পল্টন রাতের দিকে শেয়াল-ডাক ডাকলে পিসেমশাই এখনও বিশ্বাস করেন যে, শেয়ালরা তাঁকেই খুঁজছে। তাড়া-খাওয়া সেই শেয়ালটিই ওদের পথপ্রদর্শক। কেননা, একমাত্র ওই শেয়ালটিই নাকি পিসেমশাইকে চেনে বলে পিসেমশাইয়ের এখনও বদ্ধমুল ধারণা। তবে রোজই সন্ধেবেলা পল্টনকে হরবোলা হয়ে শেয়াল ডাকতে হয় না। সত্যিকারের শেয়ালরা কদমখণ্ডীর বাঁশবাগান থেকে অভ্যাসমতো ডেকে ওঠে। শেয়ালের ডাক শুনলেই গুপি পল্টনের দিকে তাকায়। পল্টন ইশারায় বুঝিয়ে দেয়, এটা আমার নয়। ওরিজিনাল। মাঝে মধ্যে গোলও বাধে। হঠাৎ পল্টনের ডাক শুনে বাঁশবাগানের ভেতর থেকে শেয়ালরা ভাবে, তাদের কেউ কি দলছুট হয়ে ওই বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়েছে। ফলে অসময়ে তারাও স্বজন হারানোর শোকে কান্নার মতো করে ডাকতে থাকে। পিসেমশাই ভয়ে এবং বিরক্তিতে বলে ওঠেন, ‘জায়গাটার নাম কদমখণ্ডী না হয়ে শেয়ালখণ্ডী হলে জুতসই হত। এত শেয়ালের ডাক জোব চার্নক বোধহয় শিয়ালদহতেও শোনেননি।'

আদিকাকাকে পুলিশের ব্যাপারটা না বললে কিছুতেই মনে শান্তি পাচ্ছে না গুপি। তাই ঘরের মধ্যে ব্যাজার মুখে অপেক্ষা করতে লাগল।

অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর আদিকাকাকে একা পাওয়া গেল। গুপি আদিকাকাকে নিয়ে বারান্দা থেকে নেমে উঠোনে এল। এই বাড়ির উঠোনটা বেশ বড়। সেই উঠোনের এক কোণে আদিকাকাকে নিয়ে গিয়ে পুলিশের ব্যাপারটা গুপি বলল, না বলে উপায় নেই বলে বলতেই হল। আদিকাকা মন দিয়ে সমস্তটা শুনল। তারপর বলল, ‘এই থানার দারোগাবাবু খুব সজ্জন প্রকৃতির। আমার সঙ্গে চেনাশোনা আছে। চল না, একদিন গিয়ে দারোগাবাবুর সঙ্গেই কথা কই।'

গুপির মনের মধ্যেও সেইরকম ইচ্ছে। তাই বলল, ‘থানা এখান থেকে কত দূর?’

আদিকাকা উত্তর দিল, ‘সে আর বেশি দূর কই। মাইলপাঁচেক হবে। একখানা সাইকেল করে দিব্যি চলে যাওয়া যাবে। তা তুমি সাইকেল চালাতে জানো তো?’

গুপি বলল, “দিব্যি জানি। কাশীপুর থেকে বালি ব্রিজ পেরিয়ে কতবার বেলুড় গেছি শুধু সাইকেল চালিয়ে।'

আদিকাকা যেন খুশি হল। সারামুখে তৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘আমি এখনও দু’-তিন মাইল সাইকেল চালিয়ে দিব্যি যাওয়াআসা করতে পারি। তা হলে আর দেরি কেন, এখনই বেরিয়ে পড়া যাক।'

গুপিও বেশি দেরি করতে চাইছিল না। যা ফয়সালা হওয়ার আজই হয়ে যাক। একটা লোকের নাকের ডগায় যদি কোনও একটা বেয়াড়া মাছি উড়ে এসে ক্রমাগত বসতে থাকে তা হলে লোকটার যেমন অস্বস্তি হয়, পুলিশের আচরণ তেমনই অস্বস্তি দিচ্ছিল গুপিকে। আদিকাকা একটা সাইকেল জোগাড় করে আনতেই গুপি সাইকেলের পিছনের সিটে আদিকাকাকে বসিয়ে থানার উদ্দেশে রওনা দিল। তাদের কাশীপুরের বাড়িতে গুপির একটা বাইক আছে। গুপি মনে মনে ভাবল, এবার কাশীপুর থেকে বাইকটা এখানে আনিয়ে নিতে হবে। কদমখণ্ডীতে একটা বাইক থাকলে কাজকর্মের বিস্তর সুবিধা।

লাল মাটির কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে সাইকেলটা পাকা রাস্তায় পড়তেই গুপি গতি বাড়িয়ে দিল। রাস্তার একদিকে ছাড়া ছাড়া কয়েকটা বাড়ি। অন্য দিকে শালবন। হাওয়ায় শালগাছের শুকনো পাতাগুলো খসে গিয়ে কাঁপতে কাঁপতে মাটির দিকে নেমে আসছিল। কয়েকজন অল্পবয়সি মেয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে শুকনো শালপাতা কুড়োচ্ছিল। গুপি ইচ্ছে করেই সাইকেলের ঘণ্টি বাজাল। সেই শব্দে তারা একবার চোখ তুলে তাকাল। সাইকেলের পিছনে বসে আদিকাকা অনেক কিছু বলে যাচ্ছিল। যেহেতু আদিকাকার কথার দিকে তার মন ছিল না বলে সে কিছুই তেমন করে শুনতে পাচ্ছিল না।

অনেকটা পথ পেরিয়ে থানায় আসা গেল। আদিকাকা গুপিকে নিয়ে থানায় ঢুকে সোজা দারোগাসাহেবের দরজার সামনে এল। দরজায় একটা পরদা ঝুলছে। গুপি একবার দেখেই বুঝল, কেনার পর থেকে এই পরদা দীর্ঘকাল সাবান-সোডার স্পর্শ পায়নি। আদিকাকা পরদার এপাশ থেকে বলল, ‘দারোগাবাবু, আমি কদমখণ্ডীর আদিনাথ। ভিতরে আসব?’

ভিতর থেকে চিকন গলায় উত্তর এল, ‘আসুন, আসুন।'

ঘরে ঢুকে গুপি দেখল বেশ মোটাসোটা চেহারার দারোগাবাবু চেয়ারে বসে বাঁ হাতে একটা ছোট আয়না নিয়ে ডান হাতে ধরা কাঁচি দিয়ে খুব সতর্কভাবে নিজের গোঁফ ছাঁটছেন। দারোগাবাবুর চেহারা বেশ প্রমাণসাইজের। এমন লোকের এইরকম চিকন গলা যে কেমন করে হয় তা কিছুতেই গুপি ভেবে পেল না। কলকাতায় যে ক’জন দারোগাকে গুপির দেখার সৌভাগ্য হয়েছে, তাদের প্রত্যেকেরই আর কিছু থাকুক না-থাকুক গলাটি কিন্তু দারুণ। অমন বাজখাঁই গলায় জোরে ধমক দিলে লোকের পিলে চমকে যাবে। এমন চিকন গলার দারোগা হয় নাকি? এমন গলা তো একসময় শোনা যেত যাত্রাদলে যাঁরা মহিলা সাজতেন তাঁদের। গুপির মনে হল পুলিশের চাকরিতে উচ্চতা, স্বাস্থ্য, চোখ, শারীরিক সক্ষমতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এসব দেখার নিয়ম থাকলেও কণ্ঠস্বর পরীক্ষা নিশ্চয়ই আবশ্যিক নয়। পুলিশে চাকরি করতে যাচ্ছে, সে তো আর রেডিয়োতে গানের অডিশন দিতে যাচ্ছে না।

গুপি যখন এইসব ভাবছিল, তারই মধ্যে দারোগাবাবুর গোঁফ পরিচর্যা শেষ হয়ে গেল। আয়না আর কাঁচি সরিয়ে রেখে বললেন, ‘বলুন আদিনাথ, কী দরকার?’

গুপির দিকে নজর পড়তেই বললেন, ‘এই যুবকটি কে?’

আদিকাকা উত্তর দিল, ‘এর নাম গুপি, গুপিচাঁদ ঘোষাল। স্বৰ্গত দুনিচাঁদ ঘোষালের ছোট নাতি, নদেরচাঁদ মহাশয়ের ছোট ছেলে।'

পরিচয়পর্ব মিটতেই গুপি হাত তুলে দারোগাবাবুকে নমস্কার করে বলল, 'আজ্ঞে, আমরা বিশেষ একটা কারণে আপনার কাছে এসেছি।'

দারোগা সদ্য-ছাঁটা গোঁফে একবার আঙুল বুলিয়ে নিয়ে বললেন, 'ভাগ্যিস এসেছেন, নইলে তো আজ অথবা কালই আমাকে যেতে হত আপনার কাছে।'

গুপি একবার আদিকাকার দিকে তাকাল, তারপর বলল, 'আমার কাছে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।'

দারোগাবাবু বললেন, ‘বুঝিয়ে না দিলে আপনি বুঝবেন কেমন করে! এতকাল পুলিশের চাকরি করছি, কত কিছু শিখলুম এবং বুঝলুম, কিন্তু এই কেসটা বুঝতে আমারও অনেক সময় লেগে গেল। কলকাতা এবং দিল্লি থেকে স্পেশ্যাল অফিসাররা এসে না বোঝানোর আগে পর্যন্ত আমিও কিছুই বুঝিনি। তাও যে পুরো বুঝেছি এমন মনে হয় না।'

গুপি মনে মনে ঘাবড়ে যেতে লাগল। কলকাতা এবং দিল্লির স্পেশ্যাল অফিসার আসা মানে বেশ বড়সড় ব্যাপার। জল ইতিমধ্যেই কদমখণ্ডী থেকে ভায়া কলকাতা হয়ে দিল্লি গড়িয়ে গেছে। গুপির বুকের মধ্যে একই সঙ্গে ভয় আর অসহায়তা জেগে উঠল। কথায় বলে, বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশ ছুঁলে ছত্রিশ ঘা। বাঘের হাত থেকে কোনওক্রমে প্রাণে বাঁচলে সেই ঘা অর্থাৎ ক্ষত সারাবার অনেক ইঞ্জেকশন, ওষুধ এবং আধুনিক চিকিৎসা বেরিয়ে গেছে। পুলিশ ছুঁলে যে ঘা হয় তার চিকিৎসা এখনও অনাবিষ্কৃত। গুপি একবার আদিকাকার দিকে তাকাল। তার ভুরুজোড়া কুঁচকে আছে। অর্থাৎ আদিকাকাও বিশেষ স্বস্তিতে নেই।

মনে মনে ভয় পেলেও গুপি মুখে সেটা প্রকাশ করতে চাইল না। বরং চোখে-মুখে জোর করে একটা বেপরোয়া ভাব এনে বলল, ‘ব্যাপারটা আমি বুঝতেই আপনার কাছে এসেছি। সকাল, বিকেল, দুপুর, পালা করে আপনাদের কালো ভ্যানগাড়ি আর জিপ গাড়িটা গিয়ে আমাদের কদমখণ্ডীর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকছে। এটা আমাদের মোটেও ভাল লাগছে না।'

দারোগাবাবু বললেন, ‘ওই ব্যাপারে আমার কোনও হাত নেই। আপনাদের বাড়িতে পালা করে করে যাচ্ছে কপু আর দিপু।'

গুপি বলল, ‘এই কপু আর দিপু কি সাংকেতিক শব্দ?’

দারোগাবাবু বললেন, 'আজ্ঞে না। ওটা সংক্ষিপ্ত শব্দ। কপু মানে কলকাতা পুলিশ, আর দিপু মানে দিল্লি পুলিশ।

আদিকাকা এতক্ষণ পর বলল, ‘যাওয়া-আসা যে করছে তা তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু কেন যাচ্ছে, এই যাতায়াতের কারণটাই বা কী, সেটা জানতেই আপনার কাছে আসা।'

দারোগাবাবু একটু ভাবলেন। হাতের আঙুল নিয়ে গোঁফের ওপর বোলালেন। তারপর বললেন, ‘ব্যাপারটা তো আপনাদের জানানো দরকার। তবে কী জানেন, বিষয়টা অত্যন্ত গোপনীয় বলে এখনই পাঁচকান করতে চাই না। তবে, আজ সন্ধের আগেই আমি দিল্লির উধম সিংজি এবং কলকাতার গৌরাঙ্গ প্রধান মহাশয়কে নিয়ে আপনাদের কদমখণ্ডীর বাড়িতে যাব। সেখানে গিয়েই সব কথা হবে। আমাকে এখন উঠতে হবে।'

দারোগাবাবু উঠে পড়লেন। গুপি আর আদিকাকা সাইকেলে করে আবার নিজেদের বাড়িতে ফিরে এল। গুপি বলল, ‘আমি, পল্টন আর তুমি ছাড়া পুলিশের ব্যাপারটা কেউ জানে না। সন্ধ্যার আগে পুলিশরা বাড়িতে এলে পিসেমশাই তো জেনে যাবেন। জানবার পর উনি যে কী করবেন আর কী করবেন না, সেটা আমার অনুমানের বাইরে।'

আদিকাকা একটু ভেবে বলল, ‘এখন তো আমাদের মধ্যে জানাজানি হবেই। না জানিয়ে তো উপায় নেই। বেশি বাড়াবাড়ি করলে পরে তার একটা ব্যবস্থা করা যাবে।'

সত্যিই তো! এখন আর গোপন রাখার কোনও উপায় নেই। গুপি আলাদা করে ডেকে শুধু পল্টনকে থানা এবং দারোগার ব্যাপারটা বলল। পল্টনকে বলল, ‘পিসেমশাই এখনও কিছু

জানেন না। আমাদের আগ বাড়িয়ে আগে কিছু জানানোর দরকার নেই। সময়কালে জেনে যাবে।' পল্টনকে বেশ চিন্তিত দেখাল। সে গুপির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কলকাতা আর দিল্লি পুলিশ জয়েন্টলি কোন কল্মে এই কদমখণ্ডীতে মরতে এল। এখানে আছেটা কী? এমন একটা আলুভাতে মার্কা গ্রাম যে, ভাল জাতের একটা ডাকাত নেই, পিলে চমকাবার মতো কোনও মস্তান নেই, দলবেঁধে পাড়া চড়াও হবার মতো কোনও সুসংহত দল নেই। এসব ব্যাপারে কেশপুর, চমকাইতলা, বানতলা, গোয়ালতোড় অল্পদিনেই কেমন নাম করে ফেলেছে। কাগজ আর টিভির দৌলতে রাজধানী দিল্লির মতোই এদের নাম এখন সবাই জানে। ওইসব বিখ্যাত তীর্থে না গিয়ে কলকাতা আর দিল্লির স্পেশ্যাল পুলিশ এই কদমখণ্ডীতে এল কেন? ভবিষ্যতে সিলেবাসে ওই তীর্থধামের নাম উঠে যাবে।'

গুপি চুপ করে বসে বসে দারোগাবাবুর কথাগুলো ভাবছিল। পল্টন বলল, ‘গুপি, আমাদের ত্রিশূলবাবা তো সর্বজ্ঞানী। একবার চোখ বুজলেই জগতের সব খবর জানতে পারেন। চল না তাঁকে গিয়ে কথাটা বলি। তিনি এখন কোথায়?'

এতরকম ভাবনা আর তালগোলের মধ্যে ত্রিশূলবাবার কথাটা মনেই পড়েনি। তাই গুপি বলল, ‘তুই খুব ভাল কথা মনে করিয়ে দিয়েছিস। তিনি এখন কোথায় সেটা আমি না জানলেও আদিকাকা জানে। চল, আদিকাকার কাছে যাই।'

দুপুরে খাওয়ার পর আদিকাকা মুখে গামছা চাপা দিয়ে ঘুমোচ্ছিল। ওটাই আদিকাকার স্বভাব। একটু ইতস্তত করে গুপি ডাকল, ‘আদিকাকা, ও আদিকাকা।’

মুখের গামছা সরিয়ে আদিকাকা চোখ খুলল। তার দুই চোখে জিজ্ঞাসা। ক্যাম্পখাটের ওপর উঠে বসতে বসতে বলল, 'কী হল? ডাকাডাকি কেন? তেনারা তো বিকেলে আসবেন। এখনও তো বিকেল হয়নি।'

কথা বলতে বলতেই আদিকাকা উঠে বসে গুপি আর পল্টনের দিকে তাকাল। গুপি বলল, ‘ক’দিন থেকে ত্রিশূলবাবাকে দেখছি না। এখন উনি কোথায়?

আদিকাকা বলল, ‘তাঁকে তোমাদের কীসের দরকার?’

গুপি উত্তর দিল, ‘তিনি তো মহাপুরুষ। তার ওপর সর্বজ্ঞ। এই সব পুলিশ-দারোগার ব্যাপারটা তাঁকে বললে কেমন হয়? তিনি নিশ্চয়ই একটা কিছু বিধান দেবেন।'

আদিকাকার মুখে কোনও অভিব্যক্তি দেখা গেল না। শুধু বলল, ‘কখন কোথায় থাকেন তার কি কোনও ঠিকঠিকানা আছে? সময় বুঝে তিনি আবার উদয় হবেন। তাঁকে এমনিতে ধরা যায় না। তিনি নিজেই ধরা দেন। অবশ্য যদি তিনি ইচ্ছা করেন।'

সূর্য ডোবার অনেক আগেই জিপগাড়িতে করে দারোগাসাহেব এলেন। মাথায় পাগড়ি এবং ফিনফিনে কালো কাপড়ে বাঁধা দাড়ি দেখেই গুপি বুঝে গেল ইনিই দিল্লির উধম সিং এবং সঙ্গে সাফারি-পরা ভদ্রলোক অবশ্যই কলকাতার গৌরাঙ্গ প্রধান। দারোগাবাবুকে তো আগেই চেনা ছিল। গৌরাঙ্গ প্রধানের নামটি একেবারে যথার্থ। গুপি খুব ছেলেবেলায় বাবার সঙ্গে হাওড়া নাট্য সমাজের ‘নদের নিমাই’ পালা দেখছিল। সেই ক্ষীণতনু লম্বা গৌরাঙ্গকে তার বেশ ভাল লেগে গিয়েছিল। কলকাতার পুলিশ গৌরাঙ্গও অনেকখানি সেইরকম দেখতে। যেন যমজ ভাই। সাফারি খুলে গেরুয়া ধুতি আর উত্তরীয় গলায় দিলে চিৎপুর পাড়ায় এই গৌরাঙ্গের দিব্যি কদর হবে।

গুপি এগিয়ে গিয়ে আদর করে তাঁদের বারান্দায় বসাল। চারদিকে তাকাতে তাকাতে উধম সিং ভাঙা ভাঙা বাংলায় বললেন, ‘এই বাড়িতে পার্মানেন্টলি কে কে থাকেন?’ গুপি উত্তর দিল, ‘আমরা তিনজন অর্থাৎ আমি, আমার বন্ধু পল্টন আর আমার পিসেমশাই, মাসখানেক হল এসেছি। এখানে পার্মানেন্টলি থাকে আদিকাকা।’

উধম সিং চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘হু ইজ আদিক্যাকা? ইখন সে কুথায় আছে?’

আদিকাকা হাতজোড় করে উত্তর দিল, 'আজ্ঞে স্যার, আই অ্যাম হ্যায় আদিকাকা। মাই গুড নেম আদিনাথ। কিন্তু চালু নেম আদি অ্যান্ড আদিকাকা।’

এবার গৌরাঙ্গ প্রধানমশাই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘এই বাড়িতে ক’টা ঘর?’

আদিকাকা উত্তর দিল, 'স্যার চারখানা। মনিবের ছেলে আসবে বলে দুটো ঘর সাফসুতরো করেছিলাম। প্রয়োজন হচ্ছে না বলে বাকি দুটো করব করব করেও করা হয়নি।' গৌরাঙ্গ প্রধান নিচু গলায় ফিসফিস করে উধম সিংকে কিছু একটা বলতেই উধম সিং বলে উঠল, ‘ইয়েস, লেট আস মুভ।'

গুপি ভাবল ওরা বুঝি চলে যাবেন। কিন্তু তা নয়। গৌরাঙ্গ প্রধান বললেন, 'চারটে ঘরই একবার দেখতে চাই।'

গুপি বলল, ‘আসুন আমার সঙ্গে। পল্টন, একটা টর্চ সঙ্গে নিস। বন্ধ ঘর দুটো অন্ধকার। হয়তো ইঁদুর-আরশোলাও থাকতে পারে।'

উধম সিং, গৌরাঙ্গ প্রধান এবং দারোগাবাবু, তিনজনেই ঘুরে ঘুরে ঘর চারটে দেখলেন। ফিরে এসে আদিকাকাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কতদিন এখানে আছেন?’

আদিকাকা উত্তর দিল, ‘গুপিচাঁদের বাবা নদেরচাঁদের আমল থেকে।'

উধম সিং বলে উঠলেন, ‘রাবিশ। আপনি টাইমটা বলুন।'

গৌরাঙ্গ প্রধান বুঝিয়ে বলার ভঙ্গিতে বললেন, ‘বাপের আমল বললে তো সময় বোঝা যায় না। সময়টা বলুন।'

আদিকাকা ভাবতে ভাবতে বলল, ‘নদেরচাঁদ মহাশয়ের কাছে আমি যখন আসি, তখন আমার বয়স আঠারো বছর। সেই থেকেই আছি। তা প্রায় পঞ্চাশ বছর হবে। আমার নিজের বয়সই এখন হল গিয়ে...'

দারোগাবাবু বলে উঠলেন, ‘প্রায় আটষট্টি।’

আদিকাকা বলল, ‘তা হবে।'

গৌরাঙ্গ প্রধান প্রশ্ন করলেন, ‘তার আগে কোথায় ছিলেন? আপনার দেশ কোথায়?’ আদিকাকা বলল, ‘তার আগে ছিলুম মুর্শিদাবাদের সুকি। থানা নবগ্রাম। দেশ হচ্ছে বলগনা।’

গৌরাঙ্গ প্রধান বললেন, 'বলগনা কোথায়?'

আদিকাকা উত্তর দিল, ‘বর্ধমান থেকে রেলে কাটোয়া যাবার পথে বলগনা স্টেশন পড়ে।' উধম সিং ভ্রূ কুঁচকে আদিকাকার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। এবার প্রশ্ন করলেন, ‘ওই সুকি থেকে বহরমপুর কতদূর? কিংবা বহরমপুরের গঙ্গা?’

আদিকাকা উত্তর দিল, ‘তা প্রায় ছ’কিলোমিটার হবে।'

ওঁরা তিনজনেই বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। ওঁদের পিছন পিছন গুপিরাও। পিসেমশাইকে কঠোরভাবে নিষেধ করা ছিল, তিনি যেন আগ বাড়িয়ে কথা না বলেন। কিন্তু এতক্ষণ চুপ করে থাকার পাত্র তিনি নন। তাই হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘ভাই উধম সিংজি অ্যান্ড গৌরাঙ্গবাবু, আপনাদের দু'জনকে আমি আমার কৌতূহল নিরসনের জন্য আপাতত একটি প্রশ্ন করতে পারি?’

গৌরাঙ্গবাবু হাতঘড়িটা দেখে নিয়ে বললেন, ‘অবশ্যই পারেন।'

পিসেমশাই বললেন, ‘ধন্যবাদ। আপনারা যে এ বাড়িটা ঘুরে দেখলেন, নোটবইয়ে নোট করলেন, তার থেকে মনে প্রশ্ন উদিত হওয়া স্বাভাবিক যে, এই বাড়িটাতে দেখার কী আছে? দিস ইজ নট তাজমহল আর খাজুরাহো। আপনারা কি কোনও আশঙ্কা করছেন?’ গৌরাঙ্গবাবু

পিসেমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সব কথা এখনই বলা যাবে না। শুধু এইটুকু জেনে রাখুন, আপনারা সবাই খুব বিপদের মধ্যে আছেন।'

পিসেমশাই বললেন, ‘সে তো আছিই। এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ কুকুর আর শেয়াল কদমখণ্ডীর এই জায়গাটাতে থাকে। এত জায়গা থাকতে আমার স্বর্গত শ্বশুরমশাই কেন যে বেছে বেছে শেয়ালপল্লী আর কুকুর কলোনিতে বাড়ি করেছিলেন কে জানে।'

গৌরাঙ্গবাবু বললেন, ‘এখানে শেয়াল-কুকুর আছে ঠিকই, তবে সব শেয়ালই আসল শেয়াল নয়। সাবধানে থাকবেন। আপনাদের মধ্যে কেউ খুনও হয়ে যেতে পারেন।'

পিসেমশাই আঁতকে উঠে বললেন, ‘জয়দেবের পুণ্যভূমিতে মার্ডার! মানে রক্তপাত! পল্টু, আমি কালই ইছাপুর যাব। খুন যদি কপালে লেখা থাকে সেটা না হয় ইছাপুরে স্ত্রী-পুত্রদের কাছেই হোক’

গৌরাঙ্গবাবু চোখের ইশারায় গুপিকে ডেকে উঠোনের দিকে হাঁটতে লাগলেন। পল্টন পিসেমশাইয়ের কাণ্ড দেখে মৃদু একটা ধমক দিল। আদিকাকা সেই যে চুপ করে আছে তো আছেই। তার মুখে আর কোনও কথা নেই। পল্টন আর পিসেমশাই বারান্দা থেকে নেমে দেখলেন, জিপগাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে গৌরাঙ্গ প্রধান আর উধম সিং দু’জনেই গুপিকে যেন কী বলছেন। দারোগাবাবুও কিছু একটা বললেন। পিসেমশাই বললেন, ‘নির্ঘাত বলে যাচ্ছে কে কে খুন হতে পারে। ওঁরা উগ্রপন্থীদের টার্গেট লিস্ট হাতে পেয়ে গেছেন। আমার নামটা আছে কি না কে জানে। ভি আর গেলানো লোকের নাম কি থাকবে? তোমার কী মনে হয় পল্টন?’

পল্টন পিসেমশাইয়ের কথার কোনও জবাব দিল না।

খানিক বাদেই গুপি ফিরে এল। ওরা চলে যাওয়ার পর থেকেই সময়টা খুব বিশ্রীভাবে কাটতে লাগল। গুপির তো কিছুতেই খিদে পাচ্ছিল না। আদিকাকার বলাবলির জন্য খেতে বসল। সামান্য একটু খেয়েই গুপি উঠে পড়ল। পিসেমশাই সেটা দেখে গুপিকে বললেন, ‘ওরে পাগল, তুই খাওয়া ছাড়লে কি খুনিরা পালিয়ে যারে? বরং মরবার আগে মনের সুখে খেয়ে নে।'

পল্টন খেতে খেতে পিসেমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি বড্ড বাজে কথা বলেন। আপনি কেমন করে জানলেন যে গুপিই খুন হবে?’

জলের গেলাসটা মুখে তুলতে তুলতে পিসেমশাই উত্তর দিলেন, ‘কেউ একজন তো হবে? গুপির জায়গায় আমিও হতে পারি। তার জন্য খাওয়া ছাড়ব কেন? আসলে গুপিকে আমি সাহস দিচ্ছিলাম।'

পিসেমশাই জল খেলেন। হাত-মুখ ধুয়ে এসে বললেন, ‘হ্যাঁ রে গুপি, যাওয়ার সময় তোকে একান্তে ডেকে নিয়ে গিয়ে কী বলল? তুই কেন ফাইনাল টার্গেট লিস্ট দেখতে চাইলি না। তা হলে বোঝা যেত আমাদের কার কার নাম আছে।'

গুপি একটা লবঙ্গ মুখের মধ্যে ফেলে দিয়ে বলল, “সেসব বিষয়ে কোনও কথা হয়নি। আমাদের খালি সতর্ক থাকতে বলেছেন। আর...’

গুপি কথা থামিয়ে আদিকাকার দিকে তাকাল। আদিকাকা বাইরের বারান্দা থেকে সবে ঘরে ঢুকল। পিসেমশাই গুপিকে তাড়া দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, ‘আর কী বলল?’ হঠাৎ প্রসঙ্গ পালটে গুপি আদিকাকার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, 'আমাদের খেতের চাল আর আনাজ রাখার জন্য ঠাকুর্দা কি কোনও গোডাউন বানিয়েছিলেন??

ক্যাম্পখাটের ওপর বিছানা করতে করতে আদিকাকা বলল, ‘তোমার ঠাকুর্দা করেননি। তোমার বাবা নদেরচাঁদ করেছিলেন বটে। কিন্তু কয়েক বছর পর তা বিক্রি করে দেন।' গুপি আবার প্রশ্ন করে, ‘কার কাছে বিক্রি করেন?’

ক্যাম্পখাটের ওপর বসতে বসতে আদিকাকা বলে, ‘কত কাল আগের কথা। তার নামধাম কি মনে আছে? শুনেছি সে কলকাতার লোক। যখন বিক্রি হয় তখন আমি আমার এক জ্ঞাতির বিয়ে উপলক্ষে মুর্শিদাবাদে গিয়েছিলুম। ফিরে এসে শুনলুম বিক্রি হয়ে গেছে।'

আদিকাকার মুখের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে নিতে গুপি বলল, ‘সেই বাড়িটা কোথায়? এখনও আছে কি?'

আদিকাকা দু’হাতে তাচ্ছিল্যের মুদ্রা করে বলল, ‘কে জানে এখনও আছে কি না। হয়তো ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে।'

পিসেমশাই জিজ্ঞেস করলেন, 'আমাদের কোনও একজনের ওপর যখন খুনের খাঁড়া ঝুলছে, তখন লোকাল পুলিশ কি আমাদের নিরাপত্তার কোনও ব্যবস্থা করবে?’

গুপি বলল, ‘দারোগাবাবুকে বলেছিলাম। উনি স্পষ্টই বললেন, আপাতত আমাদের কিছু করণীয় নেই। আগে কেউ খুন হোক তারপর আমরা অ্যাকশনে নামব। তখন আমাদের কাজ। খুনি ধরতে না পারলেও ধরপাকড় যা হবে তাতে গ্রামের লোক গ্রাম ছেড়ে পালাবার পথ পাবে না। না মরলে তো ময়না তদন্ত হয় না। তেমনই খুন না হলে খুনের তদন্ত হবে কেমন করে? খুনিই বা পাব কোথায়? তাই আগে খুনটা হতে দিন। যদি সম্ভাব্য খুনির তালিকা, নাম এবং ধাম দিতে পারেন তা হলে অগ্রিম কিছু একটা চেষ্টা করা যেতে পারে। তা ছাড়া কেসটা এখন কপু আর দিপু-র আন্ডারে। আমার কিছু করার নেই।'

পিসেমশাই হতাশ হয়ে শুয়ে পড়লেন। শুয়ে পড়তে পড়তে বললেন, ‘কাল সকালে উঠে কাকে দেখব আর কাকে দেখতে পাব না কে জানে। আমার ইছাপুর চলে যাওয়াই উচিত ছিল। কিন্তু নিতান্ত নাবালক দুটি বালককে বিপদের মুখে রেখে কেমন করে যাই?’

ঘরের মধ্যে একটা হ্যারিকেন জ্বালিয়ে রাখা ছিল। তার আলোয় শোয়ার ঘরটার জমাট অন্ধকার কিছুটা তরল হয়েছে। গুপি এবং পল্টনের কারও চোখেই ঘুম আসছিল না। অন্য দু’জনের কোনও সাড়াশব্দ নেই। অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার, ঘুমিয়ে পড়লেও আজ কিন্তু একবারও আদিকাকার সেই বিখ্যাত নাসিকা গর্জন শোনা গেল না। এমনটা তো হয় না। তবে কি আদিকাকা ঘুমোয়নি? গুপি আদিকাকার বিছানার দিকে একবার তাকাল। অল্প আলোয় কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। এরও অনেকক্ষণ পর, যখন গুপির চোখের পাতায় ঘুম জড়ো হতে আরম্ভ করেছে, তখন বারান্দার দিক থেকে একটা আওয়াজ এল। আওয়াজটা খুব স্পষ্ট নয়। মনে হচ্ছে বারান্দার কোলাপসিবল গেটটার গায়ে কেউ মৃদু ধাক্কা দিচ্ছে। গুপি ভাবল, হয়তো কোনও কুকুর। সত্যিই বুঝি তাই। একটু পরে কুঁই কুঁই করে একটা বাচ্চা কুকুরের কান্নার আওয়াজ হল। কান্নাটা এমনই যে, জেগে না থাকলে কারও শুনতে পাওয়ার কথা নয়। গুপি দেখল, ওই ক্ষীণতম কান্নার আওয়াজেই ঘরের মধ্যে একজন বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। দু’সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে খুব সন্তর্পণে ঘরের দরজার ডালাটা খুলে বাইরে গেল। এত আস্তে দরজাটা খোলা হল যে, কেউ জেগে না থাকলে দরজা খোলার আওয়াজ কিছুতেই তার কানে যাবে না। গুপি নিজের বিছানার ওপর উঠে বসল। এই মধ্যরাতে যে দরজা খুলে বাইরে যাওয়ার কারণটা বুঝতে পারছে না। গুপি বিছানা থেকে নামল। পা টিপে টিপে দরজার কাছে গেল। দরজাটা বাইরে থেকে ভেজিয়ে রাখা। গুপি খুব সাবধানে দরজাটা সামান্য ফাঁক করল যাতে দরজার কোনও শব্দ না হয় এবং ঘরের কোনও আলোর আভাস দরজার ফাঁক দিয়ে বারান্দায় না আসে। দরজার ওই ফাঁক দিয়ে গুপি যা দেখল তাতে তার চক্ষু চড়কগাছ। সে দেখল, বারান্দার কোলাপসিবল গেট ফাঁক করা। বারান্দার দিক থেকে যে তালা দেওয়া থাকে, সেই তালা খোলা। বারান্দায় কেউ নেই। গুপি ঘরে এসে নিজের বিছানায় চুপ করে বসে রইল। বিছানা থেকে উঠে মধ্যরাতে যে দরজা খুলে বাইরে গেল এবং কোলাপসিবল গেট খুলল, তাকে গুপি চেনে। কিন্তু আদিকাকা হঠাৎ বাইরে গেল কেন? এত রাত্রে বাইরে তার কীসের দরকার। কুকুরছানার সেই কান্নাটাও আর শোনা যাচ্ছে না। গুপির মনে হল, সে একবার পল্টনকে সঙ্গে নিয়ে উঠোনে যায়। পল্টনকে ডাকার কথা ভেবে যেই না পল্টনকে ডাকতে গেল, তখনই বারান্দার দিক থেকে একটা শব্দ এল। মনে হল কেউ যেন খুব সন্তর্পণে গেটটা টানছে। গুপি চট করে নিজের বিছানায় শুয়ে ঘুমের ভান করে পড়ে রইল। আদিকাকা ঘরে এল। ঘরের দিকে সাবধানী দৃষ্টিতে তাকাল, তারপর যাতে কোনও শব্দ না হয় এমনভাবে দরজাটা বন্ধ করে দিল।

এর পর আদিকাকা নিশ্চয়ই ভাল মানুষের মতো শুয়ে পড়বে। কিন্তু আদিকাকা শুয়ে পড়ল না। পা টিপে টিপে গুপির বিছানার কাছে এসে একটু দাঁড়াল, তারপর আরও একটু এগিয়ে গিয়ে কাঠের আলমারিটার পাল্লা খুলে ফেলল। ওই আলমারির মধ্যে গুপির জামা-প্যান্ট এবং তার দু’খানা সুটকেস। আলমারিটা গুপির মাথার দিকে। ফলে গুপির এবার দেখতে অসুবিধা হচ্ছিল। কিন্তু বুঝতে পারছিল, আদিকাকা তার সুটকেসটা আলমারির ভিতর থেকে বোধহয় বার করল। এখন গুপির কী করা উচিত। আদিকাকাই বা কী করতে চায়। এইরকম সময় পিসেমশাই ঘুমের ঘোরেই কীসব বলতে বলতে পাশ ফিরলেন। আদিকাকা সুটকেস দুটো আলমারিতে রেখে পা টিপে টিপে নিজের বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।

আদিকাকাকে নিয়ে কখনও কোনও সন্দেহ বা রহস্য গুপির মধ্যে ছিল না। কিন্তু আজ রাতের ঘটনা তার ধারণা বদলে দিল। পুলিশ বলেছে, এই বাড়ির যে-কেউ খুন হতে পারে। সেই যে-কেউটা যে গুপি নিজে সেটা বুঝতে এখন আর গুপির কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। তার সন্দেহের কথাটা মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারছে না। কার মনে কী আছে কে জানে। এদের মধ্যে একমাত্র পল্টনই সবচেয়ে নিরাপদ। ওর মধ্যে কোনও বদ মতলব নেই।

পরদিন সকালে পল্টনকে কথাটা বলতেই পল্টন বলে উঠল, ‘সামান্য ব্যাপার বলে তোকে বলিনি। এখন মনে হচ্ছে বলা দরকার। এর আগেও মাঝরাত্তিরে আদিকাকাকে দরজা খুলে বাইরে যেতে দেখেছি। আমি ভেবেছি, গাঁয়ের মানুষ তাই উঠোনের ওদিকে ছোট বাথরুম করতে যায়। এখন মনে হচ্ছে এর পিছনে কোনও কারণ আছে।'

গুপি বলল, ‘সেই কারণটাই তো খুঁজে পাচ্ছি না। আদিকাকার দিকে এখন থেকে নজর রাখতে হবে। তেমন বুঝলে পুলিশকে জানাতে হবে।'

এর পরের রাতটা নির্বিঘ্নে কাটল। কিন্তু তার পরের দিনই বিষম উৎপাত। দুপুরবেলা জমিজমার তদারকি করে ফিরে আসার পর দেখা গেল সবই ঠিক আছে, শুধু গুপির সুটকেস দুটোই তছনছ হয়ে আছে। কোনও জিনিস খোয়া যায়নি, কিন্তু যে এসেছিল সে যে সাধারণ চোর নয়, তা বোঝা গেল। সুটকেস দুটো ঘাঁটাঘাটি করে সেই চোর বোধহয় অন্যকিছুর সন্ধান করছিল। কিন্তু সেই অন্যকিছুটা যে কী সেটা গুপি আর পল্টন বুঝতে পারল না। আজ পিসেমশাই ওঁদের সঙ্গেই জমিতে গিয়েছিলেন। বাড়িতে ছিল শুধু আদিকাকা। কিন্তু আদিকাকা গুপিদের সঙ্গে বেরিয়ে অন্য কাজে দইহাটা গিয়েছিল। দইহাটা থেকে ফিরে সেও তো একই দৃশ্য দেখেছে। অথচ বারান্দার কোলাপসিবল গেটের তালা ভাঙা নয়। তা হলে কি কেউ চাবি দিয়ে তালা খুলেছে। তালার দুটো চাবির একটা তো গুপির কাছে, অন্যটা আদিকাকার কাছে। কিন্তু আদিকাকা তো দইহাটা থেকে গুপিদের সঙ্গে ফিরল। পিসেমশাই বললেন, ‘থানায় ডায়েরি করা দরকার।'

থানাকে যথারীতি জানানো হল। দারোগাসাহেব বললেন, 'আমরা কিন্তু খুবই সজাগ। চারদিকে আমাদের চোখ। তবে আপনারা সাবধানে থাকবেন।'

পুলিশ তাঁদের কথামতো যথেষ্ট সজাগ এবং চারদিকে চোখ রেখে বসে ছিল, তবু তারই মধ্যে আদিকাকা খুন হয়ে গেল। থানা থেকে ফিরে এসে ওরা কেউই আদিকাকাকে বাড়িতে দেখতে পেল না। কোলাপসিবল গেটের তালা বন্ধ ছিল বলে ওরা ভেবেছিল আদিকাকা কাছে পিঠে কোথাও গেছে, হয়তো এখনই ফিরে আসবে। গুপি ভেবেই রেখেছিল, আজ ফিরে আসার পর আদিকাকার সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলবে। প্রায় রাতেই পা টিপে টিপে দরজা খুলে আদিকাকা কেন ঘরের বাইরে যায়। কেন কুকুরছানা ডাকলেই আদিকাকা উঠে পড়ে। কিন্তু কিছুই জিজ্ঞেস করা হল না। ওরা যখন আদিকাকার জন্য বারান্দায় বসে অপেক্ষা করছিল সেই সময় গ্রামেরই একজন এসে খবর দিল, ‘আদিকাকা খুন হয়েছে। কারা যেন তাকে খুন করে অজয়ের চড়ায় ফেলে দিয়ে গেছে।'

এসব খবর মিথ্যে হয় না। আদিকাকার নিথর দেহ অজয়ের চড়ায় পড়ে ছিল। বুকে তিনটে ক্ষতচিহ্ন। ক্ষতের মুখে রক্তটা শুকিয়ে জমাট বেঁধে আছে। গুপি মনে মনে ভাবল, আদিকাকার আচরণ ইদানীং সন্দেহজনক মনে হলেও সে যে এভাবে খুন হয়ে যাবে, সে কথা কখনওই মনে আসেনি। গুপির ধারণা ছিল খুনির দৃষ্টি তার নিজের দিকে। কিন্তু গুপিকেই বা কেন খুন করতে আসবে তার কোনও যুক্তি গুপির মাথায় আসছে না। সব খুনেরই তো একটা মোটিভ থাকে। এক্ষেত্রে কী মোটিভ হতে পারে?

খবর পেয়ে পুলিশ এল। আদিকাকার বডি নিয়ে গেল ময়না তদন্তের জন্য। যাওয়ার সময় দারোগাবাবু বললেন, ‘দেখলেন তো, আমাদের আশঙ্কা কেমন ফলে গেল। এবার আপনারা সাবধানে থাকুন। আরও মার্ডার হতে পারে।'

গুপিরা কেউ কোনও কথা বলল না। গুপিদের জমিতে যারা কাজ করত খবর পেয়ে তাদের অনেকেই এসেছিল। আদিকাকাকে এরা যে ভালবাসত সেটা বোঝা গেল। ওদেরই একজন হচ্ছে গিয়ে নিমাই কাহার। আদিকাকা না থাকায় বাবুদের রান্না-খাওয়ার কষ্ট হবে বলে সে নিজেই থেকে গেল। নিমাই কাহারকে এ বাড়িতে আদিকাকা থাকতেও বার কয়েক দেখেছে গুপিরা। আদিকাকা নেই, রান্নার জন্য একটা লোক তো দরকার। তাই নিমাই এই বাড়িতে গুপিদের কাছে থেকে গেল। শুধু পিসেমশাই বললেন, ‘মনে হয় ছেলেটা ভালই হবে। তবুও একটা কথা কী জানো তো, যেচে এলে যাচাই করে নিতে হয়। তোমরা ছোকরাটার ওপর নজর রেখো।'

বিপদের মুখে পিসেমশাইয়ের ওই এক দোষ। সম্বোধনে গণ্ডগোল করে বসেন। আদিকাকার খুন হওয়ার খবর পেয়ে গুপি আর পল্টনকে অনেকক্ষণ ‘আপনি আপনি’ করে কথা বলছেন। এখন আবার ‘তুই’ থেকে ‘তুমি’ হয়ে গেছে। পিসেমশাই একবার পাগলা ষাঁড়ের তাড়া খেয়ে এমন ঘাবড়ে গিয়েছিলেন যে, নিজের ছেলেকে বাবলুর বদলে ‘বাবলুদা’ এবং ‘আপনি’ বলতে আরম্ভ করেছিলেন। পুরো দু’দিন নাকি ছিল।

আদিকাকার ঘটনায় সবারই খুব মনখারাপ হয়ে গেল। গুপি কলকাতায় দুই দাদাকে চিঠি লিখে আদিকাকার খুন হওয়ার ঘটনা জানাল। এর ঠিক তিনদিন পর ঘটল সেই ঘটনাটা। গুপি দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি, তাকে কখনও এরকম অবস্থার সামনে পড়তে হবে।

আদিকাকা সন্দেহের ঊর্ধ্বে ছিল না ঠিকই, তবে সে যে এমনভাবে মারা যাবে এটা কেউ ভাবেনি। আদিকাকার মৃত্যুটাই কেউ চায়নি। বেশ কয়েকদিন ধরে সে মাঝরাত্তিরে যেসব কাণ্ডকারখানা করছিল, তার কোনও ব্যাখ্যা গুপিদের কাছে নেই। নিমাই ছেলেটাকে ওরা খুবই নজরে রেখেছিল। শুতে দিত বারান্দায়, আগে যেখানে আদিকাকা শুত। নিমাই তাতে কোনও আপত্তি করেনি। কিন্তু নিমাইয়ের আবার আর এক সমস্যা। আদিকাকা ঘরের দরজা আর বারান্দার গেট খুলে বাইরে যেত, নিমাই ঠিক তার উলটো। নিমাই প্রথম রাত্তিরের পর বারান্দা থেকে ঘরে আসতে চায়। দরজার আওয়াজ শুনে গুপি আর পল্টন দরজা খুলে দেখে নিমাই ভয় পেয়ে কাঁপছে। ওকে নাকি নিশিতে ডাকছে। শুধু ডাকছে না, রীতিমতো খোঁচা দিচ্ছে।

পিসেমশাই বললেন, ‘নিশির ডাক বলে একটা ব্যাপার ছিল জানি। তবে নিশি শুধু ডাকে, সে তো খোঁচাটোচা দেয় না। এ আবার কেমন নিশি?’

গুপি ব্যাপারটাকে খুব হালকাভাবে নিতে পারল না। তৃতীয় রাত্রে নিমাইকে ঘরে শুতে দিয়ে গুপি চাদরমুড়ি দিয়ে নিমাইয়ের জায়গায় শুয়ে পড়ল। পল্টন ঘরের দরজাটা বন্ধ না করে ভেজিয়ে রাখল, যাতে চট করে বারান্দায় যেতে পারে। বাইরে রাত বাড়তে লাগল। বাঁশবাগানের দিক থেকে শেয়ালের ডাকও বন্ধ হয়ে গেল। অন্ধকার ঘরে শুয়ে রাত অনুমান করার উপায় নেই। বারান্দা থেকে কোনও আওয়াজ এলেই পল্টন গিয়ে হাজির হবে। সেইরকমই গুপি বলে রেখেছে।

চাদরমুড়ি দিয়ে এমনভাবে গুপি শুয়ে ছিল যে, তার মুখটা দেখা যাচ্ছিল না। তা ছাড়া মুখটা ঘরের দরজার দিকে ফেরানো। গুপি মনে মনে প্রতীক্ষা করছিল কিছু একটা ঘটবে বলে। কিন্তু কখন ঘটবে তা জানা যাচ্ছে না, জানার উপায়ও নেই। বাইরে রাত বেড়ে যাচ্ছে। নদীর দিক থেকে বাতাস আসছিল। বাইরে কোনও শব্দ নেই। এমন শব্দহীন রাত তাদের বাণীপুরে আসে না। অনেক রাত্রেও লরি, অ্যাম্বুলেন্স এরকম কিছু গাড়ির আওয়াজ সে দোতলার ঘর থেকে পায়। হঠাৎ তার মনে হল, পায়ের দিকে কে যেন খোঁচাচ্ছে। গুপি পা সরিয়ে নিল। একটু পরে ফিসফিস করে একটা ডাক। ‘নিমাই, অ্যাই নিমাই। উঠে আয়।'

গুপি গায়ে-মাথায় ভাল করে চাদরমুড়ি দিয়ে বিছানার ওপর উঠে বসেছে। তাই দেখে বারান্দার গেটের ওপাশ থেকে কণ্ঠস্বরটা খুশি হল, ‘শাবাশ, এবার গেট খুলে উঠে আয়। চাবিটার হদিশ পেলি?'

কোলাপসিবল গেটটা খুলতে গিয়ে শব্দ হল। অন্ধকারের লোকটা বলল, ‘আস্তে।'

গুপি ইচ্ছে করেই শব্দটা করেছিল। সে জানে এই শব্দে পল্টন দরজার কাছে দাঁড়াবে। তেমন হলে গুপি আওয়াজ করবে। আওয়াজ পাওয়ামাত্র টর্চ নিয়ে পল্টন বাইরে আসবে। গুপি গেট খুলে বাইরে এল। অন্ধকারে কোনও কিছুই স্পষ্ট নয়। তবুও অনুমানে বুঝল, তার সামনে যে দাঁড়িয়ে সে প্রায় ছ'ফুট লম্বা। তার হাতে এমন একটা কিছু আছে যা এই অন্ধকারেও চকচক করছে। কিন্তু জিনিসটা যে কী তা বোঝা যাচ্ছে না। জিনিসটা লোকটার বাঁ হাতে এবং শরীরের পিছনের দিকে রাখার ফলে পুরো জিনিসটা দেখা যাচ্ছে না। অন্ধকারে দাঁড়ানো লোকটা বলল, ‘চাবিটা পেলি?’

কথা বললেই যদি ধরা পড়ে যায় তাই উত্তর না দিয়ে অন্ধকারে কেবল মাথা নাড়ল। লোকটা বলল, ‘তুইও কি আদিনাথের মতো মরতে চাস? জানিস না আমার হাতে সময় নেই। এখানে আমার আর থাকা চলবে না। ওই যে গুপি, ওর কাছেই চাবিটা আছে। চাবিটা যে সাতরাজার ধন সেটা ওই বোকাটা জানে না। কিন্তু চাবিটা কোথায় রেখেছে সেটা জানা দরকার। কালকের মধ্যে হদিশ কর। না হলে তোর মরণ।

লোকটার শরীর যেন অন্ধকার দিয়ে তৈরি। বাঁশবাগানের দিকে যেতে যেতেই লোকটা যেন অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। গুপি বারান্দায় ফিরে এসে ঘরের দরজায় ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে গেল। দরজা খুলে যেতেই পল্টন টর্চ জ্বেলে দিল। ও দাঁড়িয়ে ছিল দরজার কাছেই।

গুপি গোটা ঘটনাটা পল্টনকে বলল বটে, তবে সবটাই তার কাছে ধোঁয়া ধোঁয়া, রহস্যময়। কীসের চাবি? যেমন চাবিই হোক চাবিটা যে খুব মূল্যবান তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তার কাছে তো তেমন কোনও চাবি নেই। থাকলে তো গুপি নিজেই জানত। না জেনে এমন একটা মূল্যবান এবং বিপজ্জনক চাবি তার কাছে কেন রাখবে? আদিকাকার মৃত্যুর পিছনে কি এই চাবি? এই চাবির খোঁজেই কি একবার মাঝরাত্তিরে গুপির জিনিসপত্র, সুটকেস ঘাঁটাঘাঁটি করেছিল? একদিন দুপুরে বাড়ি ফিরে গুপি তার সুটকেস ঘাঁটাঘাঁটি করা অবস্থায় দেখতে পেয়েছিল। সেসময় বাড়িতে কেউ ছিল না। এমনকী, আদিকাকাও নয়। সে তো দইহাটা থেকে গুপিদের সঙ্গেই বাড়িতে ফিরে এসেছিল। গুপির মনে হল, এর পিছনে আরও লোক আছে। আদিকাকা আসল লোক নয়। তা হলে সে খুন হত না। আসল লোকটা কে? রাত্রে যে নিমাইকে ডাকতে আসে সে কে? অন্ধকারে ডাকতে আসা লোকটাই বা কে?

গুপি মনে মনে অনেক কিছু ভেবে যাচ্ছিল। ভাবতে ভাবতেই সে পথ হাঁটছিল। উলটো দিকের মাঠের ভিতর থেকে তাপ্পি দেওয়া একটা ঢিলেঢালা আলখাল্লা গোছের পোশাক পরা এক বাউল আপন মনেই গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে আসছিল। কাছে এলে শোনা গেল, সে গাইছে, ‘আমার সুখের ঘরের চাবি, হারিয়ে গেল নদীর ওই ঘোলা জলে।'

গুপির মনের মধ্যে ছ্যাঁত করে উঠল। এর গানেও দেখি চাবি। চাবি এখন আতঙ্কের মতো। শব্দটা শুনলেই বুকের মধ্যে কাঁপন জাগে। গুপি একা একা দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ভাবল। তারপর একা একাই বাড়ির দিকে ফিরে আসছিল। তখন দিনের আলো ফুরিয়ে আসছে। ঘরে-ফেরা পাখিরা তাদের উড়ন্ত ডানায় দিনের আলো শুষে নিয়ে সার বেঁধে ঘরে ফিরে যাচ্ছে। দূরে মাঠের ওপর দিয়ে ধীর গতিতে চলে যাচ্ছে একটা গোরুর গাড়ি। পাকা রাস্তা ছেড়ে গুপি কাঁচা রাস্তায় নামল। রাঙা ধুলোতে রাস্তার পাশের ঘাস এবং ছোট ছোট গাছের পাতাগুলো রঙিন হয়ে আছে। এই দিকটায় কেমন যেন ছায়া ছায়া অন্ধকার। গুপি অন্যমনস্কের মতো হাঁটছিল। হঠাৎ কে যেন তাকে পিছন থেকে সজোরে জাপটে ধরে তৎক্ষণাৎ মুখটা চেপে ধরল। মুখ থেকে কোনও শব্দ করবার উপায় নেই। ন্যাকড়ার মতো কীসের একটা দলা যেন তার মুখে জোর করে পুরে দেওয়া হয়েছে। এবার কালো একটা কিছু তার মাথায় এমনভাবে গলিয়ে দেওয়া হল যে, সে চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। সিনেমায় দেখেছে ফাঁসির আগে কালো রঙের একটা টুপি পরিয়ে দেওয়া হয়, যাতে সে কিছু দেখতে না পায়। ‘এরা কি আমাকে ফাঁসি দেবে?’ নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করল গুপি। তার মনে হল, চাবি-সন্ধানীরা সহজে তাকে মারবে না। গুপিকে প্রায় পাঁজাকোলা করে নিয়ে যাচ্ছিল। গুপি ইচ্ছে করেই তার বাঁ পায়ের চটিটা রাস্তায় ফেলে দিল। খানিক পর ডান পায়ের চটিটা। এবার গুপির মনে হল, তাকে দরজা খুলে একটা ঘরে ঢোকানো হল। মুখের ঢাকনা খুলে দেওয়ার পর ঘরটার চারদিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারল, এই ঘরে সে এর আগেও এসেছে। নৈঃশব্দ্যে ভরা এই ঘরের কঠিন দেওয়ালগুলো তার দেখা। ত্রিশূলবাবা এই ঘরের দেওয়ালে ত্রিশূল দিয়ে ঠুকে ঠুকে কান পেতে কী যেন শুনছিলেন।

আশ্চর্য, ঘরের মধ্যে কেউ নেই। যারা তাকে আনল তারা কোথায় গেল? গুপি ঘরের মধ্যে উঠে বসে ছিল। তার সামনের দেওয়ালটা মারুতিভ্যান গাড়ির পিছনের দরজার মতো হড়হড় করে একপাশে সরে যাওয়ার পর বোঝা গেল ইটের তৈরি মনে হলেও আসলে ওটা বুঝি কাঠের বা অন্যকিছু। দেওয়ালটা সরে যাওয়ার পর ভাবল, সে সত্যিই এবার বিপদে পড়েছে। এবার গুপি দেখল, দেওয়ালটা সরে যাওয়ার পর যে জায়গাটা দেখা যাচ্ছিল সেখানে এসে দাঁড়ালেন ত্রিশূলবাবা। খপাত করে গুপির হাতটা ধরে টানতে টানতে সরে যাওয়া দেওয়ালটার দিকে নিয়ে গেলেন। হাতের টর্চ জ্বালতেই দেখা গেল নীচে নামার খাড়া সিঁড়ি। যেন পাতালের দিকে নেমে গেছে। সেই সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে আসার পর ত্রিশূলবাবা ডান হাতের একটানে মাথার জটা খুলে ফেলে বললেন, ‘এবার চিনতে পারছিস? আমি হচ্ছি তোর জ্ঞাতিকাকা বীরেন ঘোষাল। তোর বাবা আমাকে ঠকিয়েছে। তোর ঠাকুর্দা নিলামে আমাদের কাশীপুরের জমি-বাড়ি কিনে নিয়েছে। শেষ সম্বল এই বাড়িটা। তাই নিয়েও তোদের চালাকি। আজ পনেরো বছর ত্রিশূলবাবার ভেক ধরে আছি। এই যে ঘর দেখছিস, এই ঘরের পাথরের দেওয়ালে আলমারি ফিট করা। এই বাড়িটা তোর বাবা আমায় বিক্রির নামে দান করে গেছে। এই নীচের ঘরগুলোতে তোদের বাড়তি ফসল অর্থাৎ ধান-চাল লুকনো থাকত। তোর বাবাকে বললুম, ওটা আবার ব্যাবসা। তোমার গোপন গোডাউন আমি সাতরাজার ধনে ভরে দেব। তাই দিলুম। ত্রিশূলবাবা সেজে দল করলুম।

পাঁচখানা গ্রামীণ ব্যাংক ডাকাতি, ব্যাংকের লকার ভাঙা, তারপর নদিয়ার রাজবাড়ি থেকে সাধু সেজেই অষ্টধাতুর বিষ্ণুমূর্তি আর সোনার গৌরাঙ্গ হাতালুম। বীরভূম আর বহরমপুর এখন আমার পক্ষে নিরাপদ নয়। আমি আরব দেশে চলে যাব। এত টাকা নিয়ে আমি কী করব। এই টাকা ওদেশে চলবে না। টাকাগুলো তুই নে। আমি সোনা আর বিষ্ণুমূর্তি, সেইসঙ্গে সোনার গৌরাঙ্গ নিয়ে দেশ ছেড়ে পালাই। কিন্তু চাবি তোর কাছে। সেই চাবিটা না পেলে কিছুই হবে না।'

গুপি বলল, ‘আমার কাছে কোনও চাবি আছে তা তো আমি জানি না।'

ত্রিশূলবাবা ওরফে বীরেন ঘোষাল বললেন, ‘না জানারই কথা। তোর কোমরে একটা বড় মাদুলি আছে। ওই মাদুলির মধ্যেই চাবি। আমি আর তোর বাবা ছাড়া সেটা কেউ জানে না। তোর বাবা নেই। ফলে একমাত্র আমি জানি।'

অন্ধকার সিঁড়ির মুখ থেকে পিসেমশাইয়ের গলা পাওয়া গেল, ‘আমরাও জানি

গুপি আর বীরেন ঘোষাল চোখ ফেরাতেই ওদের দু’জনের চোখ ধাঁধিয়ে গেল জোরালো আলোয়। গুপি দেখল পিসেমশাই একা নন, সঙ্গে পল্টন, উধম সিংজি এবং কলকাতা পুলিশের গৌরাঙ্গবাবু এবং তাঁদের পিছনে জনাদশেক সশস্ত্র পুলিশ। গৌরাঙ্গবাবু বীরেন ঘোষালকে বললেন, 'প্রায় পনেরো বছর ধরে যে খেলা আপনি খেলছিলেন, এবার তা শেষ হল।'

গুপির দিকে ফিরে গৌরাঙ্গবাবু বললেন, ‘গুপিবাবু, আপনি যে আসল টার্গেট সেটা আমরা বুঝতে পেরেছিলাম। তাই আপনাকে না জানিয়ে আমরা আপনাকে গার্ড দিতাম। চটিজুতো পরে থাকায় আমাদের চিনে আসতে সুবিধে হয়েছে। আদিবাবুর বুকে তিনটে পর পর ক্ষতচিহ্নই আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে এটা ত্রিশূলের ক্ষত। এইভাবে বহরমপুর আর বোলপুরের তিনজনকে ত্রিশূল দিয়ে বীরেন ঘোষাল খুন করেছেন।'

পিসেমশাই এগিয়ে এসে গুপির পিঠে হাত রেখে বললেন, ‘এবার বুঝলি তো, কেন আমার মতো সাহসী লোকের দরকার। তোর বড়দা আজই চিঠিতে ওই চাবির ব্যাপারটা আমাকে জানিয়েছে। এটা নাকি তোর বাবার দলিলে উল্লেখ করা ছিল। বেচারি আদিনাথ জানত না! তাই বেঘোরে প্রাণ দিল।'

হাতকড়া পরিয়ে ওপরে আনার পর দেখা গেল বীরেন ঘোষালের শাগরেদরাও আছেন। তাঁদের হাতেও হাতকড়া। পিসেমশাই বললেন, ‘যাক, গুপ্তধনের দৌলতে গ্রামটার নাম এবং গ্ল্যামার বাড়ল। এবার পুজোয় টুরিস্ট বাড়বে।'

বাইরে তখন রাত। বাঁশবাগানের মাথার ওপর আধখানা চাঁদ দেখা যাচ্ছে।

.

আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী, ১৪১০

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%