দুলেন্দ্র ভৌমিক

দামুদাদুর চেহারাটি যৌবনে কেমন ছিল, বলতে পারব না। কেননা, তাঁর যৌবনকালে আমার মতো বয়সিরা কেউ জন্মায়নি। যদিও আমাদের চেয়ে বড় তেমন বয়সি কেউ জন্মালেও, তারাও দেখেনি। দামুদাদুর কথা যদি সত্যি হয়, হওয়া খুব কঠিন, তা হলে তিনি তখন থাকতেন মুর্শিদাবাদে। মুর্শিদাবাদ থাকাটা কঠিন নয়, কত লোকই তো মুর্শিদাবাদে থাকত বা এখনও থাকছে। দামুদাদু যখন থাকতেন, তখন নাকি মুর্শিদাবাদ বাংলার রাজধানী ছিল। শুধু এই পর্যন্তই নয়, বৃদ্ধ আলিবর্দী খাঁর মৃত্যুর সময়ও তিনি তাঁর অর্থাৎ আলিসাহেবের শয্যার পাশে হাজির ছিলেন।
এরকম গল্প দামুদাদুর কাছ থেকে ছেলেবেলায় আমরা অনেক শুনেছি। তখন না বুঝলেও পরে বুঝেছিলাম, এসব নেহাতই বানানো গল্পকথা। খুব স্বাভাবিকভাবেই এখন আর দামুদাদুর গল্পের প্রতি আমাদের কোনও আগ্রহ নেই। তবে একটা ব্যাপার স্বীকার করতেই হবে, দাদুর আমার অভিজ্ঞতা অনেক। নানা লোকের সঙ্গে চেনাশোনা। বহুবিধ বিষয় জানেন। দাদুর কথাতেই বলি, ‘আমি তো তোমাদের মতো এক গোয়ালের গোরু নই। ডালহৌসিতে গিয়ে একটা বাড়িতে কেরানি হয়ে ঢুকে গেলে তো ব্যস, মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই থেকে গেলে। এখন তো শুনছি, মেয়াদের আগেই তাড়িয়ে দেয়। এই তাড়িয়ে দেওয়ার গালভরা নাম হল ‘স্বেচ্ছা অবসর’। ইংরেজিতে সংক্ষেপে বলে, ‘ভি আর এস’। আমার সেসব বালাই ছিল না। তাড়াবে কী, আমি তো তার আগেই ওদের ছেড়ে দিয়ে চলে আসতাম।'
আমরা প্রশ্ন করতাম, ‘আপনি কোন কোন কোম্পানিতে চাকরি করেছেন?’ দামুদাদু উত্তর দেওয়ার আগে করুণার দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকাতেন। পরে বলতেন, ‘যত ধরনের কাজ করেছি, তোমরা সেসব কাজের নামও জানো না, করতেও পারবে না। ধৈর্য, ধৈর্য বোঝো? সব কাজেই ওটা লাগে। পি এস বোঝো?’
এই জগতে কোন চাকরির নাম পি এস, তা জানা না থাকায় আমরা পরস্পরের দিকে তাকাতাম। দামুদাদু বলতেন, ‘জানতাম পারবে না। মূল কথাটার এটা হল সংক্ষিপ্ত। আসল কথাটা হল পট্যাটো সিলেকশন। আমার কর্মস্থল ছিল কোলে মার্কেট। আমার চারপাশে বস্তা বস্তা আলু। লরি বোঝাই হয়ে আলু আসছে। আমরা মাত্র জনাকয়েক লোক। এক-একটা করে বস্তার মুখ খুলে দিচ্ছে, আর বস্তার ভিতর থেকে হড়হুড়িয়ে বেরিয়ে আসছে নানা সাইজের আলু। এবার তোর কাজ হল, বড় আলু আর ছোট আলু বেছে বেছে আলাদা করে রাখা। দুটো আলাদা জায়গা আছে। এই কাজটারই আমি নাম দিয়েছি পি এস। একটা ইংরেজি নাম না দিলে কি এদেশে কাজটার ইজ্জত বাড়ে!’

তবে একথা ঠিক, দামুদাদু অনেক বিষয়েই খোঁজখবর রাখেন। এক সময় নাকি উত্তরপ্রদেশের কোনও একটা গ্রামে গিয়ে কবিরাজিও করেছেন। ওই গ্রামে তাঁর বেশ নামডাকও হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু একজন সমৃদ্ধ কৃষককে মাথায় চুল গজানোর জন্য তাঁর তৈরি একটি ওষুধ চকচকে টাকে মালিশ করতে দিয়ে বলেছিলেন যে, মাত্র সাতদিনের মধ্যেই এই টাক ছাপিয়ে মাথায় কালো চুলের প্লাবন আসবে। দামুদাদুর কথায়, ‘ওষুধ তৈরিতে আমার হেলপার কিছু একটা গন্ডগোল করে ফেলায়, চুল গজাতে সাতদিন লাগল না। তিনদিনের মধ্যেই মাথায় অজস্র ফোঁড়া গজিয়ে গেল এবং চতুর্থদিন সন্ধ্যার পর থেকে ফোঁড়াগুলো ফাটতে আরম্ভ করল, সেইসঙ্গে বিশ্রী দুর্গন্ধ। আয়নায় নিজের মাথার দুর্গতি দেখে সেই জোতদার তো রেগে লাল। তারই হুকুমে লাঠি, লোহার ডান্ডা, বর্শা, নানাবিধ প্রহার-যন্ত্র নিয়ে রে রে করে ছুটে এল তার মাইনে করা অনুগামীর দল।'
সেই রাতেই দামুদাদু উত্তরপ্রদেশের গ্রাম থেকে পালালেন। আজ পর্যন্ত আর কখনও উত্তরপ্রদেশের সীমানায় পা রাখেননি।
আগেই বলেছি, দামুদাদু নানা বিষয়ে খোঁজখবর রাখতেন। সেই কারণেই আমাদের অনেককেই দামুদাদুর কাছে নানা কাজে যেতে হত। আমাকেও যেতে হল। দামুদাদু সাধারণত সকালের দিকে বাড়ির বারান্দায় একটা ইজিচেয়ারে বসে কাগজ পড়েন। কিন্তু আজ সেরকম কোনও দৃশ্য দেখা গেল না। তাই দামুদাদুর ছোট ছেলে অজয়কে জিজ্ঞেস করতে হল। অজয় বারান্দার এককোণে বসে দাড়ি কামাচ্ছিল। আমি বললাম, ‘অজয়দা, দামুদাদু বাড়ি নেই?'
অজয় আয়না থেকে চোখ তুলে আমাকে দেখল। পরে বলল, ‘বাবা ঘরের ভিতরে বসে দু'খানা আলো জ্বেলে কুষ্ঠি দেখছেন।'
আমি বললাম, ‘বলো কী! এই দিনের বেলাতেও দু’টো আলো? খুব কঠিন কুষ্ঠি বুঝি?’ অজয়দা বলল, ‘কঠিন মানে, বেজায় কঠিন। দারোগা, তাঁর মেয়ে আর মেয়ের জামাইয়ের কুষ্ঠি। মেয়ের জামাই কী একটা কারণে চাকরি থেকে পনেরো দিনের জন্য সাসপেন্ড হয়েছে। তাই দারোগাশ্বশুর খুব দুশ্চিন্তায় আছেন।'
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘খুব দেরি হবে কি?
অজয়দা বলল, ‘অত তাড়া কীসের? বোসো না একটু।'
আমি বারান্দায় বসে অপেক্ষা করতে করতেই দেখলাম, অজয়ের দাদা রূপনারায়ণ, সংক্ষেপে রূপদা রিকশা করে বাজারের ব্যাগ নিয়ে ফিরলেন। এখানে বলে রাখা ভাল, দামুদাদুর পরিবারের সকলের নামই নদের নামে। যেমন, দামুদাদুর নাম দামোদর নন্দী। বড় ছেলে রূপনারায়ণ, ছোট ছেলে অজয়। দুই মেয়ের একজনের নাম যমুনা, অন্যজনের নাম সরস্বতী। দামুদাদুর স্ত্রী, অর্থাৎ দিদিমার নাম পদ্মা। এই নাম দামুদাদুর সঙ্গে বিয়ের আগে থেকেই ছিল, নাকি বিয়ের পর দামুদাদু বদলে দিয়েছেন, সেকথা আমরা জানি না। খানিকক্ষণ অপেক্ষা করার পর অজয়দা বলল, ‘এবার একবার হাঁক দাও।'
আমি হাঁক দিলাম। ভিতর থেকে দাদুর গলা শোনা গেল, ‘কে র্যা?’ আমি বললাম, ‘আমি অভয়।'
দামুদাদু ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে বললেন, ‘চারদিকে অরাজকতা, অশান্তি, অভয় দেওয়ার কেউ নেই। এক তুই সবেধন নীলমণি অভয়। কাজে না হলেও নামে বিদ্যমান। তা, কীসের জন্য এত হাঁকডাক?’
অভয় অর্থাৎ আমি বললাম, ‘দাদু, আপনি যে বলেছিলেন আপনার চেনা কোথায় যেন মাটির মূর্তি গড়া শেখায়, সেই জায়গাটার নাম আর আপনার সেই চেনা
ভদ্রলোকটির ...’ এই পর্যন্ত বলার পরই দামুদাদু বললেন, ‘বুঝতে পেরেছি। কিন্তু মূর্তিগড়া শিখবে কে?’ অভয় বলল, ‘ছেলেটি সম্পর্কে আমার ভাগ্নে। কারও কাছে শেখেনি, কিন্তু নিজে-নিজে দিব্যি তৈরি করে। ভাল কারও হাতে পড়লে হয়তো ওর ভিতরে যদি কোনও প্রতিভা থাকে, তা হলে বিকশিত হবে। এই সব ভেবেই আপনার কাছে আসা।'
দামুদাদুর মুখে সব দাঁত নেই। হামানদিস্তায় থেতো করে পান খান। এখন সেই থেতো করা পান একটা কৌটো থেকে বের করে মুখে দিয়ে, খানিকক্ষণ মাড়ি দিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বললেন, ‘চেষ্টা আর ধৈর্য থাকলে হবে। ওকে হরিপদর কাছে পাঠাব। অজ পাড়াগাঁয়ে পড়ে আছে, তাই কেউ নাম জানে না। তোদের কুমোরটুলি ওর কনুইয়ের যুগ্যি নয়। হরিপদর কাছে গেলে শুধু মাটির মূর্তি গড়া নয়, নানারঙের লুঙ্গি, গামছা, বেডকভার, দরজা-জানলার পরদা, এমনকী, শাড়ি পর্যন্তও...'
অভয় তড়িঘড়ি করে দামুদাদুকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘মাটি দিয়ে লুঙ্গি, গামছা তৈরি
করে ওটা কোন কাজে লাগবে? কে সাধ করে পয়সা দিয়ে মাটির লুঙ্গি কিনতে যাবে?’
দামুদাদু অভয়কে হাতের ইশারায় থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তুই একটা শ্যাম্পু করা ছাগল। মাটির লুঙ্গি, গামছা কেন হবে! হরিপদর ভাই ভক্তিপদর আছে তাঁতের ব্যাবসা। হাতে চলে না, মেশিনে। মূর্তি গড়ে পয়সা নেই বলে অফ সিজনে যা কিছু রোজগার তাঁত থেকে। তবে কালীতলা ছিল বলে এখনও দিব্যি আছে। গেলে বুঝতে পারবি কালীতলা কেমন জিনিস।'
অভয় বলল, ‘কেমন করে কার কাছে যাব, তার হদিশ জানতেই তো আসা।' দামুদাদু বললেন, ‘প্রথমে বাবুডাঙা।’
পেরে বলল, 'কী ডাঙা? সাবুডাঙা?’ দামুদাদু ধমক দিয়ে বললেন, ‘সাবুডাঙা হতে যাবে কেন? বাবুডাঙা। এমন ডাঙাওলা জায়গার নাম আগে শুনিসনি? ঘুঘুডাঙা, উলটোডাঙা, ফরাসডাঙা, চড়কডাঙা, কম আরও কত ডাঙা ছড়িয়ে আছে এই বঙ্গে।'
অভয় দামুদাদুর ফোকলা মুখের কথা ঠিক বুঝতে না
ধমক খেয়ে অভয় চুপ করে যেতেই দামুদাদু বলতে শুরু করলেন, ‘মন দিয়ে শোন। আমি হরিপদকে ব্যক্তিগতভাবে একখানা পত্র লিখে দেব। কিন্তু যাওয়ার রাস্তা, অর্থাৎ পথের হদিশটা জেনে নে। বাবুঘাট থেকে বসিরহাটের বাসে চেপে বাবুডাঙা। বাবুডাঙায় নেমে দেখবি, অনেক দোকান। ছেলে-ছোকরাকে না জিজ্ঞেস করে বয়স্ক কাউকে জিজ্ঞেস করবি, ‘হেলাবটতলায় যাব।” এবার হেলাবটতলায় পৌঁছে জানতে চাইবি, ‘ঝাউখালি যাব কোন রাস্তায়।’ ঝাউখালি পৌঁছেই দেখবি, রাস্তার পাশে মিষ্টির দোকান। ওখানে জিজ্ঞেস করবি, ‘গণেশময়রার দোকান কোনটা।' সেই গণেশময়রার দোকানে গিয়ে নিখুঁতি আর চমচম খাবি। অমন জিনিস গোটা এশিয়ায় নেই।'
অভয় মনে মনে ভাবছিল, আসল জায়গায় পৌঁছব কখন। ততক্ষণে অজয়ের দাড়ি কাটা, চা খাওয়া এবং কাগজের প্রথম পাতা পড়া শেষ। অভয় কাতর চোখে অজয়দার দিকে তাকাতেই অজয়দা অন্য দিকে মুখ ফেরাতে ফেরাতে বলল, ‘তোমার পৌঁছতে সন্ধে হয়ে যাবে মনে হচ্ছে।'
অভয় বলল, ‘দাদু, গণেশময়রার দোকান থেকে এবার কোন দিকে যাব?’
দামুদাদু বললেন, ‘এবার গণেশময়রাকে শুধোতে হবে, ‘মশাই, হাতিপোতা যাব কীভাবে?’ গণেশ পথ বাতলে দেওয়ার পর হাতিপোতায় পৌঁছে, যে কোনও দোকানদার, পথচারী যে কাউকে বলবে, ‘মশাগ্রাম কোন দিকে?’’
অভয় একটা ঢোক গিলে বলল, 'হাতির পর মশা?’
দামুদাদু বললেন, ‘চোপ! কথার মাঝে হামলে পড়ে কথা কোস না। এর জন্য ছোট্ট সিরাজকে ওর দাদুর সামনেই একবার কান মলে দিয়েছিলাম। এবার শোন, মশাগ্রাম পৌঁছেই সন্ধান করবি কালীতলা। কালীতলা হয়ে যাবি বেলতলা, তার পরেই হরিপদর...' অভয় বলল, ‘হরিপদবাবুর বাড়ি।
দামুদাদু ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘না, তার পরেই হরিপদর বাড়ি নয়। বেলতলা গাঁয়ের পর জোড়াদিঘি। এই জোড়াদিঘিতেই হল হরিপদর শ্বশুরবাড়ি। ব্যস, এর পর পলাশপুর, আর পলাশপুরের শেষেই রুদ্রপুর। এই রুদ্রপুরেই হরিপদর বাড়ি এবং কর্মশালা। তোর ভাগ্নেকে নিয়ে যেতে হবে ওই রুদ্রপুরে।'
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অভয় বলল, ‘বাস থেকে নেমে রুদ্রপুর বললেই তো লোকে বলে দিতে পারে। পারে না?’
দামুদাদু বললেন, ‘না, ওখানে ওভাবে কেউ বলে না। বলার রেওয়াজ নেই। তুই কি ক্লাস ফাইভ থেকে লাফ দিয়ে গিয়ে মাধ্যমিকে বসতে পারিস? ওই গ্রামেও তাই নিয়ম হচ্ছে ধাপে ধাপে এগোতে হয়। গণেশময়রাকে যদি বলিস, ‘জোড়াদিঘি কোন পথে যাব?’ তা হলে তোকে শুনতে হবে, ‘আগে 'হাতিপোতায় যান, তবে তো আরও এগোবেন। আমি হাতিপোতা পর্যন্ত বলতে পারি।' ব্যাপারটা লোকাল ট্রেনের সিগনালের মতো। তবে তোর চিন্তা নেই। আমি জায়গাগুলোর নামের পরপর একটা সংক্ষিপ্ত সাংকেতিক তালিকা করে দেব। যেমন মোগল সাম্রাজ্যের ব্যাপারে করা আছে। জানিস তো?’
অভয় বুঝতে না পেরে বলল, ‘আমি কিছুই বুঝতে পারছি না দাদু।’
দামুদাদু বললেন, ‘বুঝেছি, বয়ঃবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তোর মূর্খামি বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন বাবর। সেই সাম্রাজ্যের পতন শুরু ঔরঙ্গজেবের আমল থেকে। অতএব, বাবর থেকে ঔরঙ্গজেব, এই ছ’জন মোগল নৃপতির নামের তালিকা স্কুলবয়সে আমরা শিখেছিলাম। কীভাবে জানিস?’
অভয় ঘাড় নেড়ে জানিয়ে দিল, সে জানে না।
দামুদাদু বললেন, ‘আমরা মনে মনে আওড়াতাম, ‘বাবার হইল আবার জ্বর, সারিল ঔষধে’। বাবার ‘বা’ হল বাবর, ‘হইল’ মানে তস্য পুত্র হুমায়ুন, ‘আবার’ থেকে বেরিয়ে এল আকবর, ‘জ্বর' মানে জাহাঙ্গির আর ‘ঔষধে’ ঔরঙ্গজেব দিনের আলোর মতো প্রকটিত। কিন্তু এর মধ্যে একটু ফাঁক ইচ্ছে করেই রেখেছিলাম। বল তো, কোথায় ফাঁক রয়ে গেল?'
দামুদাদুর এত হেঁয়ালি শোনার ধৈর্য অভয়ের ছিল না। হরিপদর মৃৎশিল্পের কারখানা পর্যন্ত পৌঁছবার যে জটিল পথনির্দেশ সে শুনেছে, তাতেই তার মাথা ঘুরছে। এর পর মোগল সাম্রাজ্যের ফাঁক খোঁজার ধৈর্য তার নেই। তাই অভয় বলল, ‘মোগলদের চোদ্দোপুরুষের কাউকে দেখিনি। জানিও না। অতএব, তাঁদের মধ্যে কার কোথায় ফাঁকফোকর রয়ে গিয়েছে, সেকথা জানেন ঐতিহাসিকরা। আমি কেমন করে জানব?’
দামুদাদু খিঁচিয়ে উঠে বললেন, ‘ঐতিহাসিকরা কি সব জানার ঠিকা নিয়ে নিয়েছেন? ওসব চালাকি আমার সঙ্গে যেন করতে না আসেন। ওই যে নামের তালিকার ছড়াটি বললুম, তাতে ‘সারিল ঔষধে’ বলে কথাটার মধ্যে সারিল মানে কী? সারিল মানে ঔরঙ্গজেবের বাবা শাহজাহান। শাহজাহান নিয়ে তো তোদের খুবই গদগদ ভাব। ওঁর নাম তো শাহজাহান নয়। শাহজাহান হল উপাধি। ওঁর বাবা জাহাঙ্গির উপাধি দিয়েছিলেন। ওঁর আসল নাম খুম। যেমন ওঁর বাবার নাম সেলিম। শেখ সেলিম চিস্তির দয়ায় এই সন্তানের জীবনরক্ষা হয়েছে, এই বিশ্বাস থেকেই নাম রাখা হয় সেলিম। আকবরের মৃত্যুর পর সেলিম সিংহাসনে বসার আগে কী নাম নেন জানিস? নাম নেন নূরউদ্দিন মহম্মদ জাহাঙ্গির পাদশাহ গাজি।'
অভয় মনে মনে বিরক্ত হয়ে বলল, ‘হরিপদর মৃৎশিল্পালয়ে যাওয়ার মতোই দীর্ঘ নাম!' অভয়ের কথাটা দামুদাদুর কান এড়াল না। বয়স হলে কী হবে, শ্রবণক্ষমতা এখনও আশ্চর্য রকমের ভাল। দামুদাদু বললেন, 'আগামীকাল সকাল সকাল বেরিয়ে পড়িস। ভাগ্নেকেও সঙ্গে নিয়ে যাস। ওর কী যেন নাম?’
অভয় বলল, ‘অশোক। ওটা ভাল নাম। ডাকনাম ‘লব’। ছেলেটা কিন্তু এক অর্থে প্রতিবন্ধী।'
দামুদাদু দু’চোখ মেলে অভয়ের দিকে তাকালেন। অজয় তাকিয়ে আছে অভয়ের দিকে। দামুদাদু বললেন, ‘কেমন প্রতিবন্ধী?’
অভয় উত্তর দিল, ‘লব বলতে গেলে প্রায় বোবা। শুনতে পায়, কিন্তু মুখফুটে কিছু বলতে পারে না। বলার চেষ্টা করলে, মুখ দিয়ে কেবল গোঁ গোঁ করে একটা অর্থহীন শব্দ বেরোয়। কিন্তু মূর্তি গড়তে তো কথা লাগে না।'
দামুদাদু বললেন, ‘ও নিয়ে ভাবিস না। ভারত সম্রাট শাহজাহানও তো এক অর্থে পঙ্গু। প্রতিবন্ধীও বলা চলে। গোটা পৃথিবীর কত জায়গায় কত প্রতিবন্ধী রাজ্য চালাচ্ছে, কে তার খোঁজ রাখে! তবে, নাম যখন লব, তখন ওর জীবন ব্যর্থ হবে না। লব মানে জানিস?'
দামুদাদুর এত সব তত্ত্বকথায় অভয়ের কোনও আগ্রহ ছিল না। কিন্তু হঠাৎ করে উঠে
যাওয়ারও উপায় নেই। তাই বলল, ‘লব রামের ছেলে। লব আর কুশ। এর বেশি জানি না।' দামুদাদু আবার মাড়ি দিয়ে মুখের পান নাড়াচাড়া করতে করতে বললেন, ‘প্রায় মাঝরাতে বাল্মীকির আশ্রমে সীতা যমজ সন্তানের জন্ম দেন। বাল্মীকি কুশগুচ্ছ দিয়ে’ ভূত রক্ষোবিনাশিনী রাখি বানিয়ে ধাইমা গোছের যে বা যাঁরা ছিলেন, তাঁদের বলেন, ‘যে আগে জন্মেছে সেই অগ্রজ, তার শরীর এই মন্ত্রপূত কুশগুচ্ছের অগ্রভাগ দিয়ে মার্জনা করো। তার নাম কুর্শ হবে। যে পরে জন্মেছে, তার শরীর লব অর্থাৎ কুশগুচ্ছের অধোভাগ দিয়ে মার্জনা করো। তার নাম লব হবে। অতএব, লব-কুশ নয়। বলতে হবে কুশ-লব। দু'জনেই যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী। বাল্মীকির মতো আমিও ভবিষ্যদ্বাণী করে দিলাম, তোর এই ভাগ্গ্নে একদিন একটা কিছু করে দেখাবে।''
দামুদাদু সম্পর্কে দু'টি কথা বলে রাখা ভাল। দামুদাদু পাড়া এবং বেপাড়ার চেনা ও অচেনা যে কোনও মানুষের সঙ্গে কথা শুরু করেন ‘তুমি’ অথবা ‘আপনি’ দিয়ে, তারপর কথা চলতে চলতেই কখন যে ‘তুই’ তে নেমে আসেন, সেটা হুট করে কেউ বুঝতেও পারে না। ভগবতী বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষিকা তো বুঝতে পেরেও কিছু বলতে পারলেন না। সেই বড়দিদিমণি শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনি কি আমাদের লাইব্রেরি উদ্বোধনের দিন দয়া করে আসতে পারবেন? আপনার কার্ড বাড়িতে পাঠিয়ে দেব।'
দামুদাদু মহিলার দিকে খর চোখে তাকালেন। পরে হেসে ফেলে বললেন, ‘এগুলো তোমাদের পণ্ডশ্রম। আজকের ছেলেমেয়েরা বাংলা বই পড়ার জন্য লাইব্রেরিতে যায় না। ওদের পছন্দ ফাস্ট ফুড, ডিসকো থেক, কাঁকড়াবিছে কামড়ানো নাচ। আর সেই সঙ্গে আছে তোদের মতো দিদিমণিদের প্রশ্রয়। তোরা স্কুলে পড়াতে যাস, না ফ্যাশন প্যারেডে যাস, বোঝা মুশকিল। পেশার সঙ্গে পোশাকের একটা সমতা থাকা দরকার। লুঙ্গি বা ধাক্কাপাড় ধুতি পরে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করা যায় না।’
দামুদাদুর দ্বিতীয় ব্যাপারটি হল, তিনি সকলকে চেনেন, সকলকে জানেন। কত দীৰ্ঘ আয়ু হলে আলিবর্দী খান থেকে শুরু করে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত তাঁর চেনাশোনা হয়! দামুদাদুর এসব ব্যাপার নিয়ে এখন আর আমরা খুব একটা ভাবি না। তবে, মানুষটি বড় বিচিত্র। দামুদাদু একবার নাকি এক কাবুলিওয়ালার কাছ থেকে দু'হাজার টাকা ধার করেছিলেন। কাবুলিওয়ালারা টাকা ধার দেওয়ার সময়ই সেই টাকা থেকে প্রথম মাসের সুদ কেটে নেয়। ব্যস, ওই সুদটুকুই শুধু কাবুলিভাই পেয়েছিল। পরে সুদ আর আসল বাবদ একটা নয়াপয়সাও পায়নি। দামুদাদু যে দিতে চাননি, তা নয়। কাবুলিওয়ালা নিজেই আর এই রাস্তা মাড়ায়নি। প্রথম কিছুদিন আফগানিস্থানের ইতিহাস, কাবুলের রাজনৈতিক পটভূমি, আমেরিকা ইত্যাদি সংক্রান্ত ভয়ংকর ভয়ংকর সব গল্প বলে কাবুলিওয়ালাকে ঘাবড়ে দিয়ে তারপর শুরু করলেন, কাবুলিওয়ালাদের প্রাণায়াম শেখানো। তার আগে একজন-দু’জন নয়, দশজন কাবুলিওয়ালার হাত দেখে কুষ্ঠি তৈরি এবং কুষ্ঠি বিচার করে কী যে বলেছেন, জানি না। শুধু দেখতাম, রোজ পড়ন্ত বিকেলে জনাদশেক কাবুলিওয়ালা দামুদাদুর উঠোনে বসে প্রাণায়াম করত। প্রাণায়াম শেষ হলে শুরু হত নানা ধরনের আসন। সবচেয়ে দর্শনীয় ছিল শীর্ষাসন। সন্ধের মুখে মুখে স্বল্পালোকিত উঠোনে দশজন কাবুলিওয়ালার শীর্ষাসন করার সেই দৃশ্য দেখে দামুদাদুর কত ঘনিষ্ঠ আত্মীয় যে দামুদাদুর বাড়ি আসা ত্যাগ করেছেন, তা বলার নয়। সকলের শেষে থাকত শবাসন। এই আসন করার সময় অনেক দিনই দু’-তিনজন কাবুলিওয়ালা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। কেউ কেউ নাক ডাকতেও শুরু করত। সেই নাসিকা গর্জন যিনি শোনেননি, মনে হয় কোনও বাঙালির ভাগ্যেই সেই সুযোগ বিশেষ আসেনি, সেই গর্জন বর্ণনাতীত, ব্যাখ্যাতীতও বটে।
এরকম নানা কাণ্ডের জন্য দামুদাদু সর্বদাই আমাদের কাছে আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠতেন। দামুদাদু হরিপদর নামে একখানা চিঠি লিখে অভয়ের হাতে দিয়ে বললেন, ‘সকালের পয়লা বাসটা ধরতে পারলে ভাল। কোনও চিন্তা নেই। তোর ভাগ্নের ভাগ্য ফিরে যাবে।'
সকাল আটটার বাসে উঠে অভয় তার ভাগ্গ্নে লবকে নিয়ে বাবুডাঙা যখন নামল, তখন বেলা দশটা বেজে গিয়েছে। বাবুডাঙা বাসস্টপের কাছে রাস্তার উপর ছোটখাটো বাজার। নানা রকমের দোকান। দামুদাদুর নির্দেশমতো অভয় একজন বয়স্ক লোকের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘মশাই, হেলাবটতলায় যাব কোন রাস্তায়?’
প্রশ্ন শুনে সেই প্রৌঢ়টি অভয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবলেন। বললেন, ‘হেলাবট এখন আর হেলে নেই বটে, তবে জায়গাটার নাম হেলাবটতলাই হয়ে গিয়েছে। অত বড় গাছটা হেলল কী করে জানেন?
অভয় বলল, 'আজ্ঞে না।'
সেই প্রৌঢ় বললেন, ‘ওই জায়গাটি বড় পুণ্যস্থান। মহাবীর হনুমান যখন গন্ধমাদন পর্বত কাঁধে নিয়ে সবেগে লঙ্কার দিকে যাচ্ছেন লক্ষ্মণকে বাঁচাতে, তখন ওই বিশাল বটবৃক্ষকে পথের বাধা মনে করে হনুমান তার লেজ দিয়ে মৃদু ঝাপটা মারায়, বটগাছটি একদিকে হেলে পড়েছিল। সেই থেকে জায়গাটার নাম হেলাবটতলা। কম দিন তো হেলে নেই। সেই রামরাবণের যুদ্ধের সময় থেকে হেলে আছে। কম ধকল তো সয়নি। তাই তিন বছর আগে এক ঝড়-জলের রাতে গোড়া উপড়ে ঘটোৎকচের ডেডবডির মতো আশপাশের বাড়ি, দোকান, টেলিফোনের তার, বিদ্যুতের খুঁটি, ছাদের অ্যান্টেনা, সব ধূলিসাৎ করে সেই বটবৃক্ষ চিরশয্যা নিলেন। তাঁরই স্মৃতিতে নতুন বটবৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। তবে, এখন তেমন বড় হয়নি। ওই বটবৃক্ষতলে একটি হনুমানমন্দিরও তৈরি হয়েছে।'
অভয় মনে মনে বিরক্ত হয়ে ভাবে, এত ইতিহাস না বলে পথের ভূগোলটা বললেই তো হয়। তাই সে বলল, ‘কিন্তু যাব কোন পথে?
প্রৌঢ় বললেন, ‘সেটা আপনার ইচ্ছে। আপনি বারিপোতা হয়ে যেতে পারেন, নয়তো কদমগড় হয়ে। তবে তাড়াতাড়ি যেতে হলে, সামনে গিয়ে হাতের ডান দিকের রাস্তা দিয়ে চলে যান। বেশি দূর তো নয়। বারিপোতার মাঠ পেরিয়ে গেলেই হেলাবটতলা। আগেই বলে দিচ্ছি, ওখানে কিন্তু হেলেপড়া কোনও বটগাছ নেই। স্থানমাহাত্ম্য বা নামমাহাত্ম্য, জানি না কার গুণে ওখানকার স্কুল, পঞ্চায়েত অফিস, বিডিও দফতর, হেল্থ সেন্টার, এমনকী, রেশনদোকান পর্যন্ত হেলে আছে। অনেক গবেষণা করেও জানা যায়নি, আলুর ধসারোগের মতো এমন হেলারোগ এল কোত্থেকে।'
কথা শেষ করে প্রৌঢ় তাঁর ডান হাতের তালুটি অভয়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘দিন, এক বান্ডিল বিড়ির দাম ছাড়ুন।'
অভয় বলল, ‘অ্যা!’
প্রৌঢ় বললেন, ‘অ্যা না, হ্যাঁ। বেশি নয়, মোটে তো তিনটে টাকা। যতক্ষণ বকালেন, তার তুলনায় কিছুই নয়। এখানে শহরের লোককে, অচেনা মানুষকে রাস্তা বাতলে দেওয়ার সর্বনিম্ন রেট ওই তিন টাকা। এটা ইউনিয়নের বাঁধা রেট।'
অভয় কথা না বাড়িয়ে তিনটে টাকা সেই প্রৌঢ়ের হাতে দিয়ে সামনের দিকে পা বাড়াল। কোনও ছুতোয় আবার কিছু কথা
বলতে শুরু করলে, হয়তো দেশলাইয়ের দামও চাইবে। কাঁচা রাস্তা নয়। কোনও এক সময় পিচ ঢালা হয়েছিল, কিন্তু সে যে কোন যুগে, তা বোধ হয় গাঁয়ের কারও মনে নেই। ভাগনের হাত ধরে অভয় হেঁটেই চলেছে। অধুনালুপ্ত হেলাবটতলা আর আসছে না। অভয়ের মনে হল, সেই প্রৌঢ়ের এক বান্ডিল বিড়ি শেষ না হওয়া পর্যন্ত বোধ হয় হেলাবটতলা আসবে না। এই সময়ই ভাগ্গ্নে লব মুখ দিয়ে একটা গোঁ গোঁ শব্দ করতেই অভয় মুখ ফিরিয়ে ভাগনের দিকে তাকাল। ভাগ্নে আঙুল তুলে যেদিকে দেখাচ্ছিল, সেদিকে তাকিয়ে দেখল, একখানা হলদে রঙের দোতলা বাড়ি কোমরভাঙা খুনখুনে বৃদ্ধের মতো সামনের দিকে এমনভাবে হেলে আছে যেন, মনে হবে কাউকে মাথা নুইয়ে প্রণাম করতে যাচ্ছে। অভয় দেখল পরপর কয়েকটা হেলেপড়া বাড়ি। যার মধ্যে স্কুল, ক্লাব ঘর, পঞ্চায়েত অফিস, এই রকম সব বাড়ি আছে। বাড়িটা হেলে আছে বলে সাইনবোর্ডগুলো একদিকে হেলে রয়েছে। এবার যেতে যেতে নতুনভাবে পোঁতা বটগাছ এবং সেটাও যে ভবিষ্যতে হেলেই উঠবে, তা এখনই বোঝা যাচ্ছে। শুধু হনুমানমন্দিরটিই কেবল সোজা। এবার হনুমানমন্দির থেকে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, আরও খানিকটা এগোলেই ঝাউতলা। কিন্তু ঝাউতলায় গেলেই তো হবে না। ওখানে গিয়ে গণেশময়রার খোঁজ করতে হবে। দামুদাদুর নির্দেশমতো অভয় আর তার ভাগ্গ্লে লব যখন কালীতলায় পৌঁছল, তখন আকাশে তারা ফুটে গিয়েছে। কিন্তু চাঁদ নেই। কালীতলায় খুব ঢাক বাজছে। একটু পরে জানা গেল আজ অমাবস্যা, তায় আবার শনিবার হওয়ায় খুব ধুমধাম করে কালীপুজো হচ্ছে। যাঁকে জিজ্ঞেস করে কালীতলা থেকে বেলতলা যাওয়ার হদিশ নিতে হচ্ছিল, তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল খুব বড় কালীসাধক। পরনে রক্তবস্ত্রের মতো ঘন লাল পোশাক। মাথায় চুল না থাকায় কপাল আর টাক একেবারে একাকার। তারপর প্রায় রেড রোডের মতো চওড়া আর চকচকে একটি গোলা সিঁদুরের রেখা কপাল ছাড়িয়ে টাক অতিক্রম করে গিয়েছে। ঢাকের মতো গোলাকার বপু। পেট এবং তার বিস্তার এতটাই যে, সেই কালীসাধকের বুকটাই খুঁজে পাওয়া কঠিন। অভয় তার ভাগ্নের দিকে তাকিয়ে দেখল, তার দু’চোখে ভয় আর বিস্ময়। ওই দু’টো যত বাড়ছে, লব তার মামার হাত তত শক্ত করে ধরে রাখতে চাইছে। সেই সাধক বললেন, ‘এ আর কী দেখছেন! প্রতিদিনই পুজো হয়। তবে শনি-মঙ্গলবার বেশি। আজ আবার অমাবস্যা, তাই আয়োজন এরকম। এই কালীতলায় ছোট-বড় মিলিয়ে একশো একান্নটা মন্দির আছে। সব মন্দিরে পুজো, বলি আর প্রসাদ বিতরণ হয়। বড় ভাল দিনে এসে পড়েছেন। তবে ষাট-পঁয়ষট্টি বছর আগে এরকম দিনে এসে পড়লে, দিনটা আপনার কাছে বিশেষ ভাল বলে মনে হত না।'
অভয় প্রশ্ন করল, ‘কেন? মনে হত না কেন?’
সাধক বললেন, ‘তখন তো এই কালীতলায় নরবলি চালু ছিল। আপনাকে দেখেই মনে করা হত, মা আপনাকে পাঠিয়েছেন। আপনি মা'র সন্তান। মা আপনার রক্ত চাইছেন। তখন কোন মন্দিরে আপনার বলি হবে, তাই নিয়ে আপনাকে নিলামে তোলা হত। নিলামে যিনি বেশি দাম দিতেন, তিনি আপনাকে নিয়ে গিয়ে বলি দিতেন।'
অভয় দেখল, সে যেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছে, তার হাতপাঁচেক তফাতে সিঁদুরমাখা একটি হাঁড়িকাঠ। চারদিকেই কয়েকটি পাঁঠার ব্যা-অ্যা-অ্যা কান্না শোনা যাচ্ছে। অভয় আর বেশি কথা বলার সাহস পেল না। খুব নরম গলায় প্রশ্ন করল, 'আচ্ছা বলতে পারেন, বেলতলা যাব কোন পথ দিয়ে?’
সেই সাধক বললেন, ‘বেশি দূর নয়। দিব্যি হেঁটেই যাওয়া যায়। তা ছাড়া এখন তো 'কোনও রিকশা, সাইকেলভ্যান পাবেন না। সকলেই কালীতলায় আসছে। কালীতলা থেকে কেউ যাচ্ছে না। রাতটা না হয় কোনও মন্দিরের চাতালে শুয়ে-বসে কাটিয়ে দিন। আপনাদের শহরের হিসেবে বেলতলা মোটে সাত কিলোমিটার।
অভয় এবার টের পেল, বাবুডাঙা থেকে সে এতক্ষণ কত কিলোমিটার এসেছে। বিশ্রাম দরকার। কালীতলায় থাকতে পারলে ভাল হত, কিন্তু লবকে নিয়ে থাকতে ভরসা পেল না। সে বলল, ‘আজ্ঞে, জরুরি কাজে বেরিয়েছি। থাকার উপায় নেই। কোন পথে যাব, তাই যদি দয়া করে বলে দেন!’
সেই কালীসাধকের কাছ থেকে পথের হদিশ নিয়ে অভয় কালীতলার মাঠটা পেরিয়ে এল। গোটা কালীতলায় যেন মেলা বসেছে। সেই তুলনায় এই দিকটা কিছুটা ফাঁকা। তবে দিব্যি আলো আছে। লোডশেডিং থেকে বাঁচার জন্য জেনারেটরও রয়েছে। এখানে এসেই সে দেখল, টালির চালে একটা বড় মাটির ঘর। সেই ঘরের বারান্দায় লুঙ্গি পরে মাঝবয়সি একটা লোক বিড়ি খাচ্ছে। তার পিছনে, বারান্দার উপর ঘরের দেওয়ালে পাতলা টিনের উপর একটা সাইনবোর্ড। এখানে আলো ছিল। অভয় তবু এক পা এগিয়ে গিয়ে দেখল, কালো রঙে সেই সাইনবোর্ডে লেখা, ‘এখানে পাঁঠার কলপ করা হয়’।
অভয় তো অবাক। পাঁঠারা আবার কলপ করে নাকি! অভয় বারান্দার লোকটার কাছে এগিয়ে গিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই লোকটা বলে উঠল, ‘কই, পাঁঠা কোথায়? ক'টা পাঁঠা?’
অভয় লোকটার পাশে বসে বলল, ‘মানুষ চুলে কলপ দেয় শুনেছি। টিভিতে, কাগজে, রেডিওয় কলপের বিজ্ঞাপন হয় জানি। কিন্তু পাঁঠার কলপ তো শুনিনি। ব্যাপারটা জানতে এলাম।'
লোকটা বিড়িতে টান দিয়ে যেন নড়েচড়ে বসল। ভাব দেখে মনে হল, অভয়ের মতো এমন আগ্রহী শ্রোতা সে হয়তো বহুকাল পায়নি। তাই হাতের বিড়িতে আরও একটা টান দিয়ে বিড়িটার আগুন মাটির দেওয়ালে টিপে টিপে নিভিয়ে দিয়ে বলল, ‘কখনও শোনেননি বলেই অবাক লাগছে। কিন্তু অবাক লাগার কিছুই নেই। বাজারের চাহিদা বুঝে জোগান দিতে পারলেই ব্যাবসা চলে, নয়তো নয়। আজ এখানে একশো একান্নটা পাঁঠাবলি হবে। তার উপর আছে অনেকের মানত করা পাঁঠা। বছরে কত পাঁঠা লাগে বলুন তো! সবই চাই, কালো পাঁঠা। মাসের জোগান দিতেই নাকাল হয়ে যাচ্ছি। একে এত পাঁঠা তার উপর কালো পাঁঠা। তাই সাদা পাঁঠা এলে কিংবা আংশিক সাদা হলেও সেই পাঁঠা আসে আমার কলপঘরে। চারজন কর্মচারী আছে। এই অমাবস্যার দু’ দিন আগে থেকে পাঁঠার কলপ চলছে। কালীপুজোর সময়, মানে দেওয়ালিতে যে কালীপুজো, তাতে তো আরও কর্মচারী নিতে হয়। ওভারটাইম দিতে হয়।' অভয় প্রশ্ন করল, ‘যাঁরা মানত করেন, তাঁরা এসব জানেন?’
লোকটা বলল, ‘জানাজানির কী আছে? তাঁরা ওই কালো পাঁঠা খোঁজাখুঁজির হ্যাপা নিতে যাবেন কেন? তাঁরা জানেন, কালীতলায় মন্দির কর্তৃপক্ষকে বলে রাখলে, তাঁরাই ন্যায্য দামে নিখুঁত কালো পাঁঠা খুঁজে দেওয়ার দায় নেবে। শুধু দাম দিলেই চলবে।'
অভয় বলল, ‘নিখুঁত কালো পাঁঠা মানে কী?’
লোকটা আবার একটা বিড়ি ধরিয়ে নিয়ে বলল, ‘এক পিস নিখুঁত মানুষ যেখানে পাওয়া যায় না, সেখানে নিখুঁত পাঁঠা পাওয়াও সহজ নয়। ওই জোড়াতালি দিয়ে চালিয়ে নেওয়া আর কি। নরবলি উঠল কেন জানেন?’
অভয় বলল, ‘সে তো ছিল অন্যায়। বেআইনি। তাই বোধ হয় সরকার আইন করে বন্ধ করে দিয়েছে।'
লোকটা এমন খ্যাকখ্যাক করে হাসল যে, সে যেন অভয়কে বিদ্রূপ করছে।
অভয় বলল, ‘হাসছেন কেন?’
লোকটার সাবলীল উত্তর, ‘হাসার কথা বলছেন তো, হাসব না কেন? সরকার তো আইন করে কত কিছু বন্ধ করেছে। করতে বলেছে। কিন্তু আদতে তাই হয়েছে কী? আসলে, যে ধরনের নিখুঁত মানুষকে বলি দিয়ে দেবতার কাছে উৎসর্গ করতে হয়, তেমন মানুষ তো কমে গেল। তাই নরবলিও বন্ধ হয়ে গেল। কলপ করে চুলের রং কাঁচা করা যায়, কিন্তু কাউকে মানুষ করা যায় কী?
এই সময়ই ঘরের ভিতর থেকে কাঁঠালপাতা হাতে একটা লোক বেরিয়ে এসে বলল, ‘এবার কিন্তু তোমার সাপ্লায়ারকে একটু কড়কে দিতে হবে। এবার যে পাঁচজোড়া মাল দিয়েছে, তার মধ্যে চারখানাই ধবধবে সাদা। কত সময় লাগছে বলো তো!’
লোকটা বলল, ‘এবার আসুক, পেমেন্ট আটকে দেব।'
অভয় আর বেশিক্ষণ দাঁড়াল না। শুধু ‘চলি ভাই,’ বলে চলে এল। আসার আগে লোকটা বলল, ‘আমাদের এই রং কিন্তু পাকা। বলির আগে যখন স্নান করানো হয়, তখনও কিন্তু রং একটুও ফ্যাকাশে হয় না। এই জিনিস কলকাতায় পাবেন না।'
কালীতলায় আর বেশিক্ষণ থাকা যুক্তিযুক্ত মনে না করে, বেলতলার দিকে হাঁটতে লাগল অভয়। কিছুক্ষণ হাঁটার পর পিছন থেকে শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখল, একটা সাইকেলরিকশাভ্যান আসছে। অভয় রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে দু’ হাতে ইশারা করে ভ্যানগাড়িটাকে থামতে বলল। ভ্যানগাড়িটা দাঁড়াল। অভয় বলল, 'ভাই, আপনি বেলতলার দিকে যাবেন?'
ভ্যানওয়ালা জিজ্ঞেস করল, ‘কেন?’
অভয় বলল, ‘সকাল থেকে হাঁটছি। আর ভাই পেরে উঠছি না। এদিকে রাত বাড়ছে। রাস্তাও চিনতে পারছি না।'
ভ্যানওয়ালা বলল, ‘আমি বেলতলা ছাড়িয়ে যাব। রুদ্রপুর।'
অভয় যেন হাতে স্বর্গ পেল। একেই বলে ঈশ্বরের কৃপা। অভয় বলল, 'তবে তো বেশ ভাল। আমি তো আসলে রুদ্রপুরেই যাব।'
ভ্যানওয়ালা বলল, “তবে যে বললেন বেলতলা।’
অভয় বলল, ‘রুদ্রপুর পর্যন্ত যাওয়ার কথা বলতে সাহস পাইনি। আমি তো ভাবতেই পারিনি, এত রাতে রুদ্রপুর যাওয়ার কোনও লোক বা ভ্যান পাওয়া যাবে।'
ভ্যানওয়ালা আবার বলল, ‘রুদ্রপুরে কোথায় যাবেন?'
অভয় উত্তর দিল, ‘নাম বললে হয়তো চিনবেন। আমি যাব হরিপদ পাল, যিনি মূর্তি গড়েন, তাঁর কাছে।'
ভ্যানওয়ালা এবার বস্তা দিয়ে ভ্যানের পাটাতনটা ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, ‘কী আশ্চর্য, আমি তো হরিদার কাছেই কাজ করি। কালীতলার দাশরথি সাহার মানত করা ছিল। সন্ধের আগে হরিদার কাছ থেকে তারই অর্ডারি মাতৃমূর্তি ভ্যানে করে পৌঁছে দিয়ে, ব্যাকাদার অনুরোধে একপাল পাঁঠা নিয়ে এসে কলপঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে, দাশরথি সাহার কাছ থেকে পেমেন্ট নিয়ে কালীতলার বড়মন্দিরের চাতালে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলাম। নিন, নিন, উঠে পড়ুন। রুদ্রপুর অনেকটা পথ। আপনি কি কলকাতা থেকে আসছেন?’
অভয় বলল, ‘কলকাতাই বঢ়ে। তবে খাস কলকাতা নয়। কলকাতার লাগোয়া। ইছাপুর।' ভ্যান চালাতে চালাতে চালক বলল, ‘ওই হল। আজ পর্যন্ত কলকাতায় যাইনি। কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই, কোনও কিছুই দেখিনি। আসলে জন্মে অবধি যে নিজের মাকেই দ্যাখেনি, তার আবার অন্য কী দেখার আছে!’
ছেলেটার বলার মধ্যে বেদনার ছোঁয়া ছিল। ফুলের পাপড়ির গায়ে যেমন করে ফুলের রেণু লেগে থাকে, ঠিক তেমন করেই কথার মধ্যে, শব্দের মধ্যে বেদনাটুকু জড়িয়ে ছিল। অভয়ের মতো লবও বোধ হয় সেটা বুঝতে পারল। তারাভরা অন্ধকার আকাশ, রাস্তার দু’পাশে জমাট অন্ধকার। দূরে, একটা গাছের ঝোপের মাথায় একমুঠো জোনাকির জ্বলানেভা, তারই মধ্যে ভ্যান চলার আওয়াজ। দূর থেকে পাম্প চলার ক্ষীণ আওয়াজ, আর তিনজন নীরব যাত্রী।
তখন কত রাত, আসতে কত সময় লাগল, শরীর ও মনের ক্লান্তি, ক্ষুধা কোনও কিছুই অভয় আর লবকে স্পর্শ করল না। পৌঁছতে পারার আনন্দটাই যেন সব কিছুকে ঢেকে দিয়েছে। হরিপদ দামুদাদুর চিঠিটা পড়া শেষ করেই লবর দিকে তাকাল। লবও তাকিয়ে আছে হরিপদর দিকে। হরিপদ এগিয়ে এসে লবর মাথায় হাত রাখল। অভয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘একতাল নরম মাটি নিয়ে আমার কাজ। এই দু’টো হাত দিয়ে দেবতা গড়ি। আপনার ভাগনেও পারবে গড়তে। আজকের পৃথিবীতে গড়ার লোক কম। গড়ার সময়অসময় নেই। আমি তো গড়ার লোক চাই। ও আজ থেকে আমার কাছেই থাকবে। ওকে গড়ার দায়িত্ব আমার।'
লবকে হরিপদর কাছে দিয়ে তার পরদিন অভয় ফিরে এল। যাওয়ার সময় তো গিয়েছিল দামুদাদুর কথামতো, সেই নামের লিস্টি মিলিয়ে মিলিয়ে। তাই আসার সময় হরিপদকে অভয় বলল, ‘ভাগ্নেটা রইল আপনার কাছে। মাঝেমধ্যে দেখতে আসার ইচ্ছে হলে চলে...’
এটুকু বলার পরই হরিপদ বলল, ‘কোনও অসুবিধে নেই। চলে আসবেন।'
অভয় বলল, ‘চলে আসার ইচ্ছে তো থাকবেই। তবে যেভাবে এখানে আসতে হয়, মানে, আমায় আসতে হল, তাতে মরুভূমির উপর দিয়ে হেঁটে হিংলাজ কিংবা মানস সরোবর যাওয়া একই ব্যাপার।'
হরিপদ বলল, ‘আপনাকে এভাবে আসার বুদ্ধি কে দিয়েছে? নিশ্চয়ই দামুদাদু?’ অভয় বলল, ‘তা ছাড়া এমন লম্বা পদযাত্রার নির্দেশ আর কে দিতে পারেন?’
হরিপদ বলল, ‘যাওয়ার সময় ওভাবে যাওয়ার দরকার নেই। পাঁচ মিনিট হাঁটলেই রেলস্টেশন। সেখান থেকে রেলে করে সোজা শ্যায়ালদা চলে যাবেন। দামুদাদুর ব্যাপারটা ওই রকমই। আমি ইছাপুরে দাদুর কাছে গিয়েছিলাম কুমোরটুলি দেখব বলে। দাদুই দেখাতে নিয়ে যাবেন। তখন অল্প বয়স। রাস্তাঘাট কিছুই চিনতাম না। আমায় বলেছিলেন, শ্যায়ালদা থেকে লোকাল ট্রেনে দমদম। তারপর দমদম থেকে ব্যারাকপুর। সেখান থেকে আবার লোকাল ধরে ইছাপুর। শ্যায়ালদা থেকেই এক ট্রেনে দিব্যি যাওয়া যেত, তবু আমাকে এরকম খেপে খেপে ট্রেন বদলে যেতে বলেছিলেন। তখন তো বুঝিনি। ভেবেছিলাম এরকমটাই বোধ হয় হয়। তারপর ইছাপুর থেকে কুমোরটুলি যাওয়ার পথটিও বড় বিচিত্র ছিল।'
অভয় বলল, ‘কেমন বিচিত্র? আপনারা শিয়ালদহ হয়ে যাননি?
হরিপদ বলল, ‘তখন তো নতুন। তাই ভেবেছিলাম ওভাবেই বোধ হয় যেতে হয়। ইছাপুর থেকে ট্রেনে করে ব্যারাকপুর। ব্যারাকপুর স্টেশন থেকে বাসে করে গঙ্গার ঘাট। সেখান থেকে নৌকোয় গঙ্গা পেরিয়ে শ্রীরামপুর বলে একটা রেলস্টেশনে। শ্রীরামপুর থেকে ট্রেন ধরে হাওড়া এবং হাওড়া থেকে বাস ধরে কুমোরটুলি।'
অভয় বলল, ‘বাবা রে, বাবা! এত কাণ্ডের পর কুমোরটুলি দর্শন!’
হরিপদ যেন একটু দম নিয়ে বলল, ‘দামুদাদু বললেন, ‘ওভাবে তোকে না নিয়ে এলে তোর কি গঙ্গাদর্শন হত? হাওড়া স্টেশন, হাওড়া ব্রিজ, দোতলা বাস এসব দেখতে পেতিস? কুমোরটুলির পরেই তো তোকে দেখালাম, মহাশ্মশান নিমতলা। মরে গিয়ে পুড়তে আসে অনেকেই, কিন্তু জ্যান্ত অবস্থায় এই দর্শনীয় জায়গা দর্শন করতে আসে ক’জন? কত মহাপুরুষের দাহকার্য এখানে হয়েছে। একবার যখন এসেছিস, তখন এসব দেখে যা। এর পর দেখাব, ঠাকুর মদনমোহন, জোড়াসাঁকোয় রবীন্দ্রনাথের বাড়ি, আমহার্স্ট স্ট্রিটের দিকে বিদ্যাসাগরের বাড়ি, কালীঘাটের মাকালী, ওদিকেই কেওড়াতলা। এই সবই তো দেখার জিনিস।' আমি চিড়িয়াখানার কথা বলেছিলাম। দামুদাদু ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘ওখানে যা দেখার, যাদের দেখার, তারা প্রায় সকলে শহরে আর গ্রামে ছড়িয়েছিটিয়ে আছে। চোখ মেললেই দেখতে পাবি।”
হরিপদ একটু থামল। তারপর বলল, 'দামুদাদু নানারকম গপ্পো করেন। তার কোনটা কতটুকু সত্যি, তা জানি না। তবে শুনতে ভাল লাগে। আচ্ছা উনি যে বলেন, উনি নাকি রবীন্দ্রনাথের বাবার বন্ধু। ছেলেবেলায় উনিই রবীন্দ্রনাথকে গান শিখিয়েছেন। এসব কি সত্যি? তবে ওঁর বয়স কত?’
অভয় বলল, ‘আপনি এতেই অবাক হয়ে গেলেন? আমরা ওঁর মুখে শুনেছি, উনি বাংলার নবাব আলিবর্দি খানের বন্ধু ছিলেন। ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে আলিবর্দি মারা যান। আমাদের দাদু যদি তখনও বেঁচে থাকেন, তা হলে...’
অভয় উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘দাদুর কথা বলে শেষ করা যাবে না। ওই চেষ্টা না করে আমি বরং রওনা দিই।'
অভয় একবার লবর দিকে তাকাল, বলল, ‘মন দিয়ে কাজ শিখবি। কোনও চিন্তা নেই।' অভয় দেখল, লবর ঠোঁটের উপর অল্প একটু হাসি। যেন মিইয়ে পড়া রোদের মতো। কিন্তু চোখ দু’টি ছলছল করছে। অভয় ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এল। হরিপদর সঙ্গে সঙ্গে লবও হাত নাড়ছে। অভয়ের মনে পড়ল, জীবনে এই প্রথম লবকে অন্য কোথাও রেখে সে একা বাড়ি যাচ্ছে। দিদি বেঁচে থাকলে বোধ হয় এটা সম্ভব হত না। কিন্তু এতে তো লবর ভালই হবে। অভয়ের চোখও ঝাপসা হয়ে আসছিল। সে দ্রুত স্টেশনের দিকে পা বাড়াল।
ইছাপুরে ফিরেই অভয় প্রথমে নিজের বাড়িতে গেল না। দামুদাদুর বাড়িতে গিয়ে দেখল, দামুদাদুর উঠোনে অনেক ছেলেমেয়ের ভিড়। সকলে আবির খেলছে। দামুদাদুর মাথার পাকা চুলে লাল আবির। হঠাৎ এই হোলিখেলার কারণটা অভয় বুঝতে পারল না। আজকাল তো যখন-তখন আবির খেলা চলে। ভোটে জিতলে, খেলায় জিতলে, কোনও দুষ্ট প্রকৃতির মানুষকে পিটিয়ে মারলে কিংবা স্কুল-কলেজের ইউনিয়নে সাফল্য পেলে হোলি খেলা চলে। কৃষ্ণের দোল এখন ক্রমে ক্রমে গোলে হরিবোল হয়ে এরকমই বিস্তার লাভ করেছে যে, তার জন্য এখন আর কোনও উপলক্ষ দরকার হয় না। দামুদাদুর কাছ পর্যন্ত পৌঁছতেই কারা যেন অভয়কে রং মাখিয়ে তার চেহারাটাই অন্য রকম করে দিল। দামুদাদুর কাছে পৌঁছে অভয় কিছুটা উত্তেজিত স্বরে দাদুকে বলে উঠল, ‘এসব কী হচ্ছে দাদু? হঠাৎ করে রং খেলা হচ্ছে কেন?’
দাদু হেসে ফেলে বলে উঠলেন, ‘বুড়ো হয়েছি বলে তো বাতিল হয়ে যাইনি। যুগের সঙ্গে পা মিলিয়ে চলতে হবে। আমি আমার বাড়িতে কেত্তনের স্কুল খুলে দিলাম। জীবনমুখী কেত্তন এবং নাচ। সকলে এগোচ্ছে, ডিজাইন পালটাচ্ছে, আর কেত্তন পড়ে থাকবে সেই চৈতন্যদেবের আমলে! আমি একে একে সব জীবনমুখী নাম দিয়ে গানের জগতে...’
আমি বলে উঠলাম, ‘বিপ্লব আনবেন?’
দামুদাদুর উত্তর, ‘বিপ্লবটিপ্লব নয়। সংস্কৃতির নবজাগরণ। আপাতত কেত্তন ধরলুম, এর পর রামপ্রসাদী, নিধুবাবু, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুল। দেখতে থাক, কোথায় গিয়ে থামি। একটু ভেবে বল তো, কত কাল কাউকে আসনপিড়ি করে বসে মঞ্চে গান গাইতে শুনিসনি। কারণ, এখন বসাবসির যুগ অচল। হাতে একটা মাউথপিস নিয়ে উল্লম্ফন দিয়ে দিয়ে ধোঁয়া বেরনো স্টেজে গান গাওয়াটাই এখন স্টাইল। যুগের চাহিদা। গান আর শোনার নয় রে, দেখারও। আমি গানের শপিং মল খুলব।'
দামুদাদুর বারান্দার দিকে তাকিয়ে চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল। বারান্দায় খোল-করতাল ছাড়া আর সব রকম বাদ্যযন্ত্রই আছে। ঢাক, ঢোল, গিটার, বিউগ্ল, মাউথ অর্গান, কর্নেট, জাইলোফোন, আরও কত রকমের যন্ত্র। এর মধ্যে অনেক যন্ত্র অভয় সম্ভবত প্রথম দেখল। এগুলোর কোনটার কেমন আওয়াজ, তাও অভয় জানে না। অভয় মনে মনে শঙ্কিত হয়ে বলল, ‘আপনার কেত্তনের নবজাগরণ এখন শুরু হবে নাকি?
দামুদাদু বললেন, ‘আজ ভর্তির আবেদনপত্র নেওয়া হল। কেমন করে জীবনমুখী কেত্তন গাইতে হবে তার একটু খুচরো স্টাইল আজ শেখালাম। ওই যেমন একটা পপুলার গান আছে না, ‘শিং নেই তবু নাম তার সিংহ, ডিম নেই তবু অশ্বডিম্ব'। ঠিক ওই বিটে গাইতে হবে, ‘হরি নেই তবু হরিবোল, খোল নেই শুধু বোল। নিম ছাড়া নিমতলা। দই ছাড়া দইপট্টি’’ ,
অভয় দামুদাদুকে থামিয়ে দিয়ে বলল, 'আপনি কি বুড়ো বয়সে মারধোর খাবেন? এসব ছেড়ে যেমন ছিলেন, তেমন থাকুন।'
দামুদাদু ঘাবড়ালেন না। ঘাবড়ে যাওয়ার লোক উনি নন। অভয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘লোকের কথায় যদি নিজের কাজ বন্ধ করে দিয়ে ঘরে বসে থাকতে হয়, তা হলে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, নিধুবাবু এঁরা কোনও কাজ না করে, ঘরে বসেই দিন কাটাতেন। এই নিয়েই তো পুলিশকর্তা টেগার্টের সঙ্গে আমার ঝগড়া হয়েছিল। ব্যাটা আমায় জ্ঞান দিতে এসেছিল। বলেছিল, ‘স্বদেশিদের সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ করে নিজের বাড়িতে সুখে থাকুন। কেন পুলিশের কুনজরে পড়তে যাচ্ছেন?’ আমি টেগার্টকে বলেছিলাম, ‘এই যে মি. টেগার্ট। তোমায় বাহাত্তর ঘণ্টা সময় দিলাম। আমায় ধরে তোমার গারদে পোরো তো!’ কথাটা বলেই ছোঁ মেরে ওর কোমর থেকে পিস্তলটা তুলে নিয়ে বললাম, ‘এবার কী করবে?’’
অভয় বলল, ‘টেগার্টের কোমর থেকে পিস্তল ছিনতাই! ব্যাপারটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না?’
দামুদাদু বললেন, ‘বাড়াবাড়ি হবে কেন? তখন তো পুলিশদের কোমরের সঙ্গে পিস্তল আর বন্দুক শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার ব্যাপারটা চালু হয়নি। সেই আমার টেগার্টের সঙ্গে শেষ মুখোমুখি দেখা। বাহাত্তর ঘণ্টা তো দূরের কথা, বাহাত্তর বছরেও আমার টিকির সন্ধান পায়নি। অথচ প্রত্যেক পুজোয় ওকে আমি বিজয়ার গ্রিটিংস পাঠাতাম।'
অভয় কিছু একটা বলার জন্য দামুদাদুর দিকে তাকাতেই দামুদাদু বললেন, ‘ভাল কথা, তোকে যে কাজে হরিপদর কাছে পাঠিয়েছিলাম তার খবর কী?’
অভয় বলল, ‘আপনার পথনির্দেশমতো ঠিক পৌঁছে গিয়েছি। খুবই সহজ রাস্তা। ভাগ্গ্নে এখন হরিপদবাবুর জিম্মায়। আসার সময় হরিবাবুর নির্দেশমতো ট্রেনে করে সোজা শিয়ালদহ। তবে হরিপদ আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন...’
দামুদাদু কথা শেষ হওয়ার আগেই জিজ্ঞেস করলেন, 'কী জিজ্ঞেস করল?’
অভয় বলল, ‘এই জিজ্ঞেসটা আমাদের মধ্যেও আছে।'
দামুদাদু বললেন, ‘বলি জিজ্ঞেসটা কী?’
অভয় বলল, ‘আপনার বয়সটা কত? সেই আলিবর্দি থেকে এখন পর্যন্ত...
অভয়কে কথা শেষ করতে না দিয়ে দামুদাদু বলে উঠলেন, ‘এইটুকু জিজ্ঞেস! সস্তার তিন অবস্থার মতো মূর্খদেরও নানা দুরবস্থা। তোরা কেউ ফ্রান্সের জঁ থিরুরের নাম শুনেছিস? ভদ্রলোক তিন শতাব্দী বেঁচে ছিলেন। ১৬৮৪ খ্রিস্টাব্দে জন্মেছিলেন, আর মারা যান ১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে। আমি থিরুর চেয়ে একটু সিনিয়র। স্যার রোল্যান্ড ইংল্যান্ডে যখন প্রথম ডাকটিকিটের জন্ম দেন, সেই তারিখটা ছিল ১৮৪০ সালের ৬ জানুয়ারি। সেদিন কী ভীষণ ঠান্ডা ইংল্যান্ডে ! কাচের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি, বরফবৃষ্টি হচ্ছে। গাছের মাথা, ডালপালা সব ঢেকে গিয়েছে বরফে। তাই আর রোল্যান্ডের ওই অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত থাকতে পারিনি।'
অভয় আর কথা বাড়াল না। তার শরীর ক্লান্ত বলে বিশ্রাম চাইছিল। তাই সে কথা না বাড়িয়ে নিজের বাড়ির দিকে পা বাড়াল। বাড়িতে পা দিতেই লবর কথা মনে পড়ে গেল। ওর সেই ছলছল চোখ দু’টো। নিজের ঘরের বারান্দায় পা দিয়ে উঠোনের নিমগাছটার দিকে তাকাল। ওই গাছের নীচে বসেই লব নরম মাটি চটকে চটকে পুতুল গড়ত। ওর পুতুল গড়ার সরঞ্জামগুলো কিছু কিছু ছড়িয়ে আছে গাছের তলায়। অভয় কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে নিজের ঘরে ঢুকে গেল।
অভয়ের বউয়ের নাম মায়া। মায়া স্বামীকে দেখে বলল, ‘লবকে দিয়ে এলে?’ অভয় উত্তর না দিয়ে শুধু ঘাড় নেড়ে জানাল, 'হ্যাঁ।'
অভয় প্রথমে হাতঘড়িটা খুলে টেবিলের উপর রাখল। পরে জামাটা খুলতে খুলতে শুনল, মায়া বলছে, ‘মূর্তিগড়ার কাজ শেখার জন্য ধারেকাছে কাউকে পাওয়া গেল না? মূক ছেলেটাকে দিয়ে আসতে হল অত দূরে! আমরা ওর কথা বুঝতে পারতাম। অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নতুন লোক বুঝবে কেমন করে?’
অভয় মায়ার কথার মধ্যে অভিমান আর অভিযোগ দু’টোই টের পেল। কিন্তু সে কোনও কথা বলল না। মায়ার আবার ফিটের ব্যামো। বিয়ের আগে থেকেই ছিল। সকলে তখন বলেছিল, ‘মেয়ের বিয়ে দিয়ে দাও, তা হলেই ফিটের ব্যামো সেরে যাবে।' কিন্তু বললেই তো আর বিয়ে দিয়ে দেওয়া যায় না। তার জন্য অনেক রকম প্রস্তুতি দরকার। তা ছাড়া যে মেয়ে ঘনঘন ফিট হয়, তেমন পাত্রীর বিয়ের জন্য পাত্র পাওয়াও সহজ নয়। অনেকে অনেক রকম পরামর্শ দিচ্ছিল। তার মধ্যে একজন বলল, 'শুনলে বিশ্বাস করবেন না। আমি এমন একজন মানুষের নাম এবং সন্ধান জানি, যিনি আজ পর্যন্ত পঞ্চাশজন ফিটের ব্যামোর রোগী ও রোগিণীকে ভাল করেছেন।'
এই কথা শুনে মায়ার বাবা বলেছিলেন, ‘একেবারে গোল্ডেন জুবিলি।'
সেই ভদ্রলোক বলেছিলেন, 'শুধু ফিটের ব্যামো নয়, মানবদেহে যত রকমের ব্যামো আছে, সবই তিনি নিরাময় করতে পারেন।'
মায়ার বাবা বলেছিলেন, ‘তা, অত বড় ডাক্তার শহর ছেড়ে আছেন কোথায়?’ ভদ্রলোক বললেন, ‘বেগমপুরে। ডাক্তারদের অত্যাচার আর ষড়যন্ত্রে চলে এলেন, বাছুরডোবায়। সেখানেও হিংসুক ডাক্তাররা তাঁর পিছনে লাগলেন। ওই ডাক্তারদের ভয়, ইনি থাকলে তাঁদের রোজগার বন্ধ। কোনও জায়গায় ওই মানুষটাকে তিষ্ঠোতে দিল না।’
মায়ার বাবা প্রায় অসহায়ের ভঙ্গিতে বলেছিলেন, 'তাঁর হদিশই যদি না জানি, তা হলে কী লাভ?’
ওই ভদ্রলোক বললেন, 'আমি জানি। উনি বর্তমানে আছেন খ্যামাগুলিতে।' মায়ার বাবা বললেন, ‘খ্যামাশুলি! সেটা কোথায়?’
ভদ্রলোক বললেন, ‘খড়্গপুর লাইনে। খড়্গপুরের একটু আগে। অনুমতি পেলে নিয়ে আসতে পারি।'
মেয়ের আরোগ্য কামনায় সব বাবাই বেজায় অধীর হয়ে থাকেন। তাই তৎক্ষণাৎ অনুমতি মিলল। দিন তিনেক বাদে সেই ‘অসাধারণ’ ডাক্তার বা গুনিন, অথবা সিদ্ধপুরুষ এসে পৌঁছলেন। পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষ কবলিত এলাকায় অনাহার পীড়িতদের মধ্যে অতি সামান্য সংখ্যক যে ক’জন বাঙালি বেঁচে ছিলেন, ইনি বোধ হয় তাঁদেরই একজন। মুখখানা শুকনো কুলের মতো। সেই মুখের থুতনিটা কলমের নিবের কথা মনে করিয়ে দেয়। সেই থুতনিতে ঝুলছে কয়েকগুচ্ছ কেশ। ওটাই দাড়ি। মাথার টাকটি বড় বিচিত্র। এরকম টাক সাধারণত দেখা যায় না, তাই দুর্লভ। এই ভদ্রলোকের মাথার ঠিক মধ্যিখানে একখাবলা চুল। বাকি মাথায়, এমনকী, দু’কানের ধারে কোনও চুল নেই। পালিশ করা মার্বেল পাথরের মতো চকচকে টাক। এমনই চকচকে যে, তাতে বোধ হয় কেউ তার মুখের ছবিও দেখে নিতে পারে। ঠিক যেন আয়নার মতো। তিনি এলেন। চারদিকে তাকালেন। মাথার মধ্যিখানে ওই একখাবলা চুল দেখে মনে হচ্ছে, যেন নদীর মধ্যিখানে গজিয়ে ওঠা এক টুকরো কালো দ্বীপ। মায়াকে দেখে বিধান দিলেন, কালো গোরুকে যে কোনও তিন রাস্তার মোড়ে এনে, একজোড়া পাকা কাঁঠালিকলা আর আখের গুড় দিয়ে ছাতু মেখে তাই খাওয়াতে। এই খাবার দিতে হবে শুকনো শালপাতায়। খাওয়ার শেষে সেই শালপাতা তুলে ডাইনে-বাঁয়ে না তাকিয়ে এবং রাস্তায় না থেমে, না দাঁড়িয়ে, কারও সঙ্গে কথা না বলে, বাড়িতে এসে পুব দিকে মুখ করে শালপাতা পুড়িয়ে তার ছাই তুলে রাখতে হবে কাচের শিশিতে। প্রত্যেকদিন স্নান করে এসে শালপাতাপোড়া ছাই রোগিণীকে কপালে তিলক কেটে উত্তর দিকে মুখ করে আমার বানানো ওষুধ একটি করে গুড়ের বাতাসার সঙ্গে হবে। কিন্তু এই বাতাসা খাওয়ার আধঘণ্টার মধ্যে জল খাওয়া যাবে না। এটি করে যেতে হবে।'
বিয়ের আগের এসব কথা অভয় শুনেছে। ওই অসাধারণ ডাক্তার বা গুনিন যাই বলা হোক, তাঁর ওষুধ একেবারে ব্যর্থ হয়নি। কালো গোরু পাওয়া এবং তাকে খাওয়ানো নিয়ে কোনও অসুবিধে হয়নি। তবে অভয় জানে না, ওই কালো গোরুটি আসল, না সেটি কলপ করা। মানুষ কলপ করতে শিখেছে অনেক দিন আগে, কিন্তু পাঁঠা-গোরুরা কবে থেকে শুরু করল, তার হিসেব অভয় জানে না। এই ওষুধ প্রয়োগের ছ'মাসের মধ্যে মায়া একবারও ফিট হয়নি। ওই গুনিনের নামে ধন্য ধন্য পড়ে গিয়েছিল। গুনিনকে এর জন্য যে পারিশ্রমিক আর ওষুধের দাম বাবদ হাজার এক টাকা দিতে হয়েছিল, সেটাও সার্থক মনে হয়েছিল সকলের। তবে ওষুধের ক্রিয়া হ্রাস পেয়েছিল, নাকি কী হয়েছিল কে জানে! বিয়ের আসরে যজ্ঞবেদির আগুনে কুলো করে খই ঢালার সময়ই মায়া গোঁ গোঁ শব্দ করে অভয়কে নিয়ে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে, আর অভয়ের পায়ের ধাক্কায় বেচারি পুরোহিত, যিনি একটি ফ্যাক্টরির কর্মচারী আর পার্টটাইম পুরোহিত, তিনি বিয়ের আসরের নানাবিধ উপাচারের মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়ে এমন বিকট আর্তনাদ করে উঠলেন যে, নিমন্ত্রিতদের মধ্যে যাঁরা খেতে বসেছিলেন, তাঁরা খাওয়া ছেড়ে এঁটো হাতেই বিয়ের আসরে ছুটে এলেন। যাঁরা ছুটে এলেন, তাঁদের কারও হাতে আধখাওয়া ফিশফ্রাই, কেউ বা হাতে করে এনেছেন একখানা আস্ত লুচি।
কিন্তু এদিকে মূর্ছিত মায়ার মুখ থেকে ক্রমাগত গোঁ গোঁ আওয়াজ বেরোচ্ছে। বরকর্তা এবং বরযাত্রীরা হতভম্ব। কিন্তু এই রকম অবস্থায় কোনও বাঙালিই চুপ করে থাকে না, থাকতে পারে না। নানারকম পরামর্শ নানাদিক থেকে আসতে থাকে। কেউ বলছে, ‘চোখেমুখে জলের ঝাপটা দাও।’ কেউ বলছে, ‘মুখের মধ্যে দাঁতের ফাঁকে, কিছু না হোক একটা চামচে ঢুকিয়ে দাও। না হলে জিভের উপর দাঁত বসে যাবে।' বরযাত্রীদের মধ্যে কেউ একজন এগিয়ে এসে বললেন, ‘এ হচ্ছে স্রেফ মৃগীরোগ। কেউ পায়ের জুতো খুলে মেয়েটার নাকে সেই জুতোর ঘ্রাণ দিন। নতুন জুতো হলেই ভাল হয়। মেয়ের এমন ফিটের ব্যামো, যাকে মৃগী বলে, সেই কথাটা বিয়ের আগে চেপে গিয়েছিলেন কেন?’
অভয় ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। সারা মুখে মাটি, সিঁদুর, খই আরও কত কিছু লেগে আছে। ভাগ্যিস যজ্ঞের আগুনে মুখ থুবড়ে পড়েনি। ওই আগুন থেকে পাত্র-পাত্রী দু'জনেই বেঁচে গিয়েছিল বলে, সে যাত্রায় আর দু’জনের যুগ্ম মুখাগ্নি হয়নি।
কিন্তু এই সব কাণ্ডের জন্য বিয়ে বাতিল হয়নি। আসল বিয়েটা তো হয়েই গিয়েছিল। শুধু যজ্ঞের অনুষ্ঠানটা খানিক পরে আবার নতুন করে শুরু করতে হয়েছিল। খ্যামাশুলির যে গুনিন মায়াকে ওষুধ দিয়ে গিয়েছিলেন, সেই গুনিনকে আর পাওয়া যায়নি। কিন্তু অন্য কোনও চিকিৎসাতেও বিশেষ সুফল পাওয়া যাচ্ছিল না। অভয় একটা ব্যাপার লক্ষ করে দেখেছে যে, কোনও কারণে যদি মায়ার মন খুব খারাপ হয়ে যায়, স্বামীর সঙ্গে তর্ক হয়, কারও প্রতি রাগ হয়, তা হলেই চোখ বড় বড় করে পড়ে যায় এবং মুখে গোঁ গোঁ শব্দ করতে করতে মূর্ছা যায়। তখন অভয়ের একমাত্র কাজ হল, মায়ার দাঁতের পাটির মধ্যে একটা চামচ গুঁজে মূর্ছা ভাঙার অপেক্ষায় বসে থাকা। প্রথম প্রথম ফিট হয়ে পড়ে যাওয়ার আগে কিছু টের পেত না। এখন ফিট হওয়ার পূর্বলক্ষণ টের পায় বলেই উঠোনে, বারান্দায়, রান্নাঘরে গোঁ গোঁ করে পড়ে যায় না। যেই না টের পায় সে ফিট হবে, অমনই ঘরে গিয়ে বালিশে মাথা দিয়ে, বিছানায় শুয়ে পড়ে। দাঁতের মধ্যে নিজেই একটা চামচে ঢুকিয়ে দিতে ভোলে না।
অভয় মনে মনে যা আশঙ্কা করছিল, তাই হল। ভাগ্গ্নে লবর কথা বলতে বলতেই মায়া বিছানার উপর শুয়ে পড়ল এবং গোঁ গোঁ শব্দ করতে করতে যথারীতি মূর্ছা গেল।
অভয়ের যখন বিয়ে হয়, দামুদাদু তখন ইছাপুরে ছিলেন না। তার অনেক আগেই নাকি তিনি নানা কাজে পৃথিবীর নানা দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। দামুদাদুর ভাষায় ঘুরে বেড়ানো মানে নানা কাজে। দামুদাদু বলেন, 'নিজের বাড়িতে কি শুয়ে-বসে কাটানোর ভাগ্য করে জন্মেছি? ১৯৩৬ সালে আমি তখন আথেন্সের কাছাকাছি একটা শহরে। সেই সময় দিলু আমায় জরুরি একটা খবর পাঠাল। মনে রাখিস, সময়টা নাইনটিন থার্টি সিক্স। মোবাইল, ফ্যাক্স এত কিছু নেই। ভরসা শুধু টেলিফোন। আঠারোশো ছিয়াত্তরে গ্রাহাম বেল টেলিফোন বের করেছে।'
অভয় জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আপনি গ্রাহাম বেলকে চিনতেন?’
দামুদাদু হাসতে হাসতে বললেন, ‘গ্রাহাম টেলিফোন বের করে আমেরিকার ওয়াশিংটন থেকে আমাকেই প্রথম ফোন করে খবরটা জানিয়েছিল। আমিই প্রথম ভারতীয়, যে এই বিশ্বে প্রথম টেলিফোন কল অ্যাটেন্ড করেছি। যার-তার কল নয়, স্বয়ং গ্রাহাম বেলের। দিলু আমায় খবর পাঠাল টেলিফোনের মাধ্যমে। আমাকে যেতেই হল। গিয়ে দেখি দিলু একটা গান লিখেছে, সুরও করা হয়ে গিয়েছে, কিন্তু আমাকে না শুনিয়ে শান্তি পাচ্ছে না। আমি তখনই বলেছিলাম, এই গানটি ভবিষ্যতে সর্বাধিক গীত এবং প্রচারিত হবে। আজ দিলু বেঁচে থাকলে আমার ভবিষ্যদ্বাণী মিলিয়ে নিতে পারত।'
অভয় আর সেই সঙ্গে আরও দু’-একজন প্রশ্ন করেছিল, ‘গানটা কী? আর দিলুবাবুর পুরো নামটাই বা কী?’
দামুদাদু হামানদিস্তায় থেতো করা পান মুখে দিয়ে অভ্যেসবশে মাড়ি দিয়ে চিবোতে চিবোতে বললেন, ‘গানটা হল ‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউ...'। দিলুর লেখা। যার ভাল নাম দিলডার্ড প্যাটি হিল। আমার খুবই স্নেহভাজন। আমি আদর করে ডাকতাম, ‘দিলু’ বলে।’
'দামুদাদুর এসব কথায় আমরা কেন, কেউই কখনও প্রতিবাদ করত না। গোটা ইছাপুরে গল্পের, বলা বাহুল্য গালগল্পের সাম্রাজ্যে তিনি একাই সম্রাট ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে অঘটন ঘটে গেল। অভয়দের ভ্রাতৃসংঘ ক্লাবের সেক্রেটারি, পরিতোষের কাকা চাকরি করতেন দুর্গাপুরে। তিনি অবসর নিয়ে ফিরে এলেন সেই ইছাপুরেই। পরিতোষদের বাড়ির পাশেই বাড়ি করা ছিল। কিছু কাজ এবং সংস্কার বাকি ছিল। সেই কাজ করিয়ে নিতে মাসখানেক লাগল। তারপরই একদিন লরি বোঝাই করে মালপত্র নিয়ে চলে আসা। কয়েকদিন পর আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহপ্রবেশ। সেই গৃহপ্রবেশের দিন বিকেলে পরিতোষের কাকা সুবল দত্ত, আর দামুদাদুর সঙ্গে মুখোমুখি আলাপ ও পরিচয়। সে বড় দুর্লভ দিন। দামুদাদুর প্রশ্ন, ‘আপনি কি দুর্গাপুর স্টিলে ছিলেন?'
সুবল দত্ত মশাই একটু হেসে বললেন, ‘ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, দুর্গাপুর মানেই কিন্তু শুধু স্টিল নয়। এম এম এ সি বলে একটা কোম্পানির নাম জানেন?’
দামুদাদু ঘাবড়ানোর লোক নন। তিনি উত্তর দিলেন, 'নিশ্চয়ই জানি। একটা বড় ফ্যাক্টরির পাশাপাশি আরও কিছু ফ্যাক্টরি গড়ে তুলতে হয়।'
সুবল দত্ত বললেন, ‘এম এম এ সি হচ্ছে আমার ব্রেন চাইল্ড।'
দামুদাদু বললেন, ‘তাই বুঝি বছরের পর বছর লোকসানে...’
সুবল দত্ত দামুদাদুকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বললেন, ‘নিজের ঘরের ছেলেই বিগড়ে যাচ্ছে। আর এ তো হল ব্রেনচাইল্ড। ডা. রায় মারা যেতেই আমি দায়িত্ব ছেড়ে দিলাম। ব্যস, যা হওয়ার তাই হতে লাগল। আচ্ছা দামুবাবু, আপনি, মানে আপনার কর্মজীবন কোথায় ছিল?’
দামুদাদু এমনভাবে হাসলেন যেন কোনও নাবালক তাঁকে হাস্যকর কোনও প্রশ্ন করেছেন। দামুদাদু বললেন, ‘কর্মজীবন অবশ্যই একটা ছিল।'
সুবল দত্ত ফস করে প্রশ্ন করলেন, ‘কিন্তু কোথায়?'
দামুদাদু বললেন, ‘কোথায় নয় বলুন তো? দুর্গাপুর, মধুপুর অথবা বিষ্ণুপুর, কোনও পুরে গিয়ে, পুরো কর্মজীবন কাটানোর ইচ্ছে এবং সুযোগ আমার হয়নি। আফগানিস্তানের কাবুল থেকে কিউবার হাভানা। কিউবায় তো প্রায়ই যেতে হত। সেখানে তখন লড়াই চলছে। আমাকে তখন কিউবার দরকার। লোকের প্রয়োজনেই তো এই জীবন।'
সুবল দত্ত বললেন, ‘ঠিক বলেছেন। মানুষের সংগ্রামে যদি তাঁদের সঙ্গী হতে না পারি, তা হলে কীসের এই জীবন! আমি গোয়া মুক্তি আন্দোলনে ছিলাম। ত্রিদিবদা আমায় ভালবাসতেন। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে আমি তো ঢাকায়।'
দামুদাদু বললেন, ‘এত সব করে দুর্গাপুরে গিয়ে ঢুকলেন কেন?’
খুবই অসহায় ভঙ্গিতে সুবল দত্ত বললেন, ‘বিধানদার অনুরোধে। চিন-ভারত সংঘর্ষের সময় নেহরুজি আর কৃষ্ণমেননজি আমাকে এই ইছাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরির দায়িত্ব নিতে বলেছিলেন, কিন্তু নিইনি। অথচ বিধানবাবুর কথাটা ফেরাতে পারলাম না।'
অভয়, পরিতোষ এবং অন্যান্যরা পরস্পরের দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন পরম উপভোগ্য কিছু একটা শুনছে, নয় তো দুই ডাকসাইটে কবিয়ালের আসরে বসে কবিগানের লড়াই শুনছে। পরিতোষ অভয়ের কানের কাছে মুখ এনে বলল, ‘আমার এই কাকাও কিন্তু গপ্পো বলায় দামুদাদুর মতো। এইবার দ্যাখ, কাকুকে কেমন একটা প্রশ্ন করি।'
পরিতোষ নিতান্ত গোবেচারার মতো বলল, ‘কাকু, তুমি যেবার কাঞ্চনজঙ্ঘায় উঠেছিলে, তখন তোমার বয়স কত?’
সুবল দত্ত বললেন, ‘কত আর হবে। বছর কুড়ি।'
সঙ্গে সঙ্গে দামুদাদু বলে উঠলেন, 'বলেন কী সুবলবাবু। আমি তো আঠারো বছর বয়সে এভারেস্টের চূড়ায় বসে কমলালেবু খেয়েছি। তেনজিং-হিলারি ওঁরা তো গেলেন অনেক পরে। আর কাঞ্চনজঙ্ঘা? সান্দাকফু, ফালুট যে হপ্তায় হপ্তায় যায়, কাঞ্চনজঙ্ঘা তার কাছে এমন কী! ইনফ্যাক্ট, শিমুলতলার লাটুপাহাড়, বড়জোর বীরভূমের মামা-ভাগনে পাহাড় যেমন, এভারেস্ট এক সময় আমার কাছে তেমনই ছিল। মানেভঞ্জন থেকে সান্দাকফু অথবা ফালুট যাওয়া তখন আমার কাছে ছিল শিয়ালদহ থেকে মৌলালির মোড় পর্যন্ত যাওয়ার মতো ব্যাপার।'
পরিতোষের কাকা সুবল দত্ত দামুদাদুর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। পরে বললেন, ‘আপনার সান্নিধ্য বড়ই তৃপ্তিদায়ক। এবার থেকে আমাদের দু'জনের বেশ ভালই কাটবে। ছেলে-ছোকরারাও অনেক কিছু শিখতে পারবে। সব সম্পত্তি উত্তরাধিকারীকে দিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু জ্ঞান? সেটা কাকে দেব? এই যে আজকের ছেলেমেয়েরা হাউ হাউ করে যেসব খাবার খাচ্ছে—যেমন, চাউমিন, পিৎজা, এই রকম সব খাবার, এর কোনওটাই ভারতীয় খাবার নয়। শরীর-স্বাস্থ্যের পক্ষেও ভাল না। কোনও ইংরেজি মাধ্যমে পড়া কাউকে জিজ্ঞেস করুন, ভারতে প্রথম কোন ইংরেজ আসেন?’
দামুদাদু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, টমাস স্টিফেনসনের নাম আচ্ছা আচ্ছা লোকও জানে না। যদিও আমার মতে, এই জানাটা খুব জরুরি নয়।'
এই হল দামুদাদুর কেরামতি। উত্তরটি বলে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দিলেন যে, এটা এমন কোনও জ্ঞানের ব্যাপার নয়।
যখন দামুদাদু আর সুবল দত্তর যৌথ আলোচনা শেষ হল, তখন বাড়ি ফিরতে ফিরতে পরিতোষ বলল, ‘ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ম্যাচের চেয়ে বেশি উত্তেজনা এই দু’জনের কথায়। একজন কুড়ি বছর বয়সে কাঞ্চনজঙ্ঘায় বসে পা দোলাচ্ছে, আর-একজন আঠারো বছর বয়সে এভারেস্টের মাথায় বসে কমলালেবু খাচ্ছে।
হৃদযন্ত্র বন্ধ হওয়ার মতো কথা।' বাড়ি ফেরার পথে অভয়ের মনটা উদাস হয়ে যাচ্ছিল। ভাগ্নে লবর কথা মনে পড়লেই এরকম হয়। যারা কাছে থাকে, চোখের সামনে সামনে ঘোরে, তাদের এভাবে মনে পড়ে না। যখন কেউ দূরে চলে যায়, দেখতে চাইলেই দেখা যায় না, ডাক দিয়ে কাছে ডাকলেও সেই ডাক শুনতে পায় না, তাদের জন্যই মন কেমন করে। বুকের ভিতর দিয়ে হু হু করে একটা বাতাস বয়ে যায়। লবকে চোখের আড়াল করা পর্যন্ত অভয়ের মনের যা অবস্থা, তাতে তার যদি মৃগীরোগ থাকত, তা হলে সেও বোধ হয় মায়ার মতো গোঁ গোঁ করে ফিট হয়ে পড়ত। একই পরিবারে স্বামী-স্ত্রী দু'জনেই যদি মৃগীরোগী হয়, তা হলে বড়ই সমস্যা। ভাগ্যিস অভয়ের সেই রোগ নেই। কিন্তু হলেও অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। তাদের বংশে তার ঠাকুরদা ছিলেন নামজাদা পাগল। একেবারে আদালতস্বীকৃত পাগল। একবার এক পুরোহিতকে বলি দেওয়ার জন্য রামদা নিয়ে এমন তাড়া করেছিলেন, সে পুরোহিত রেললাইন দিয়ে প্রাণভয়ে পলতার দিকে ছুটেছিলেন। সেই ঘটনার জেরেই ঠাকুরদাকে আদালতে যেতে হয় এবং ঠাকুরদার পক্ষের উকিল ও ডাক্তারের কথায় আদালত অনুমোদিত সরকারি ডাক্তার পরীক্ষা করে জানিয়েছেন, উনি শতকরা একশো ভাগ পাগল। এই পাগলের অতীত ইতিহাস থেকে জানা যায়, ইনি রাঁচি ফেরত। রাঁচিতে দু’জন ডাক্তার এবং একজন ওয়ার্ডবয়ের মাথা ফাটানোর পর রাঁচিও এঁকে হাসপাতালে রাখতে ভরসা পায়নি। ওঁর যা কিছু চিকিৎসা বাড়িতেই চলছে। ওই পুরোহিতকে তাড়া করার পর, আর তেমন বড় রকমের কোনও ঘটনা তিনি ঘটাননি। শুধু এক প্রতিবেশীর শ্রাদ্ধে গিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, ‘সকলকে দেখছি, কিন্তু অমূল্যবাবুকে তো দেখছি না।'
প্রথমে কেউই এই কথার উত্তর না দিয়ে সকলে সকলের মুখের দিকে তাকাচ্ছিলেন। পরে একজন বলেছিলেন, ‘আজ্ঞে, আজ তো অমুল্যবাবুরই শ্রাদ্ধ। তিনি কেমন করে উপস্থিত থাকবেন!’
অভয়ের ঠাকুরদা বিষ্ণুপদ একটুও অবাক না হয়ে বলেছিলেন, 'আমি তো তাই বলছি, যার কাজ, যাকে নিয়ে এই আয়োজন, তিনি একবারও এসে আমাদের সঙ্গে দেখা করলেন না? হাতজোড় করে একটিবারও সকলের সামনে এলেন না। বড়ই পরিতাপের বিষয়।'
যাঁরা বসেছিলেন, তাঁদের সকলে না হলেও কেউ কেউ বিষ্ণুপদবাবুকে চিনতেন। যাঁরা চিনতেন না, তাঁরা তো অবাক! চেনাদের মধ্য থেকেই একজন বললেন, ‘যাঁর শ্রাদ্ধ তিনি যদি হাতজোড় করে আমাদের সামনে দাঁড়াতেন, তা হলে সেটা কি খুব সুখের হত?’
হয়তো আরও কথা বাড়ত, কিন্তু তখনই খাবার ডাক পড়ায় কথা বাড়ার আর সুযোগ রইল না।
সেসব দিনের কথা অভয়ের মাঝে মাঝে মনে পড়ে। তবুও সব ভাবনা ছাড়িয়ে আজ বারবার লবর কথা মনে পড়ছিল অভয়ের। হরিপদ হয়তো ভালই কাজ শেখাতে পারবে। কাজ শিখে লব কি সারাটা জীবন ওই রুদ্রপুরেই কাটাবে? ওখানে তো কাজের ভরসা একমাত্র কালীতলা। শুধু পালা-পার্বণে মূর্তিগড়া। একা একা সব কাজ হয় না। সঙ্গে সহকারী নিতে হয়। সকলকে দিয়ে-থুয়ে কী-ই বা থাকবে? অভয়ের মনের মধ্যে লবকে নিয়ে হঠাৎ চিন্তাটা বাড়তে থাকে। লব যদি আর দশটা সাধারণ ছেলের মতো হত, তা হলে বোধ হয় এত চিন্তা হত না। একটা বোবা ছেলের জন্য চিন্তাটা বেশি হবেই। অভয় ভাবতে ভাবতেই বাড়িতে এল। বারান্দায় উঠে রান্নাঘরের দিকে তাকাল। মায়া বঁটিতে কিছু একটা কাটছে। আকাশে এবং আশপাশে তখন বিকেলের তলানি। আকাশে একটু তিরতিরে আলো আছে বটে, তবে তাতে দিনের মতো তেজ নেই। অভয় ঘরে ঢুকে জামা খুলে আবার বারান্দায় এসে বলল, ‘ওগো, এক গেলাস খাবার জল দেবে?’
মায়া উত্তর দিল, ‘দাঁড়াও দিচ্ছি।'
মায়া যখন জল নিয়ে এল, তখন তার অন্য হাতের প্লেটে দু'খানা কালাকাঁদ। অভয় সেই মিষ্টি দু’টো দেখতে দেখতে বলল, ‘কী ব্যাপার? হঠাৎ মিষ্টি কেন?’
মায়া জবাব দিল, ‘একেবারে টাটকা জিনিস। লব খেতে ভালবাসে। তাই বেশি করে কিনে নিয়ে এলাম। কাল তো রবিবার। তোমার অফিস ছুটি। যাও না, একবার লবকে দেখে এসো।'
অভয়ও মনে মনে এই রকমই ভাবছিল। সে বলল, 'তুমিও চলো না আমার সঙ্গে। যাবে?’
মায়ার মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
কিন্তু এবার আর দামুদাদুর পথনির্দেশমতো গেল না। শিয়ালদহ থেকে স্টেশনে অনেক তাড়াতাড়ি পৌঁছে গেল। শুধু একটাই আপশোস অভয়ের, যাওয়ার সময় পুরনো রাস্তায় হাঁটাপথে গেল না বলে, হেলাবটতলা আর কালীতলা দেখাতে পারল না। ওই কালীতলার পাশেই তো পাঁঠাদের কলপখানা। এই জিনিস মায়া তার শ্বশুরবাড়ি কিংবা বাপেরবাড়ি কোনও দেশেই দ্যাখেনি। অথচ তার বিবাহিত জীবন যতই ঘটনাবহুল হোক না কেন, পাঁঠার কলপ করার কর্মশালা তার জীবনে প্রথম দেখা এই কালীতলাতেই।
বেলা থাকতে থাকতেই হরিপদ পালের কাছে পৌঁছে গেল অভয় আর মায়া। হরিপদ খুব যত্ন করে বসাল। লব এল একটু পরে। ওর দু’হাতে কাদামাটি। মামা-মামিকে দেখে হাসল। কথা বলতে পারে না, কিন্তু মনের মধ্যে কথা বলার ইচ্ছে বা আবেগ এলে ওর চোখ দু’টো বড় বড় হয়ে ওঠে। গলা দিয়ে ভাষাহীন শব্দে একটা গোঙানোর মতো বের হয়। অভয়ের কাছে সেটা বড় কষ্টের মুহূর্ত। লবর মুখ দেখে অভয়ের তাই মনে হচ্ছিল। ঠিক তখনই মায়া এসে লবকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে লাগল। মায়ার চোখে জল দেখে অভয় মনে মনে প্রমাদ গনল। এই রকম সময়েও মায়া ফিট হয়। মায়াকে নিয়ে কোনও একটা বিছানা পর্যন্ত যেতে পারলে, একরকম তবু রক্ষা হয়। কিন্তু সেটুকু অবকাশ কি আজ পাওয়া যাবে? অগ্রিম টের পেলে না হয় শুইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যাবে। অভয় বউয়ের কাছে এগিয়ে গিয়ে প্রায় কানের কাছে মুখ তুলে বলল, ‘কী গো, কিছু টের পাচ্ছ? বিছানায় গিয়ে বসবে?’
মায়া কোনও উত্তর দিল না। শুধু কড়া চোখে অভয়ের দিকে তাকাল। আর তাতেই অভয় আরও ঘাবড়ে গিয়ে ভাবল, একে স্নেহের আবেগ, তায় আবার স্বামীর প্রতি রাগ। অতএব, কিছু একটা অঘটন না ঘটে যায় না। যদিও মায়ার ফিট হয়ে যাওয়াটা মোটেও কোনও অঘটন নয়। বরং এখন স্বাভাবিক ঘটনার পর্যায়ে চলে গিয়েছে।
অভয় হরিপদর সঙ্গে ওর কর্মশালায় এল। বাড়ির পাশেই টালির চাল দেওয়া ছ্যাঁচাবাঁশের বেড়া। ঘরের মধ্যেই উঁচুতে একটা বাঁশের মাচা। ওখানে জনাদু'য়েক লোক রাতে শোয়। লবও কি ওখানে শোয়? হরিপদর কাছ থেকে শুনে নিশ্চিন্ত হল যে, না, লব রাতে থাকে হরিপদর বাড়িতে। হরিপদর পাকাবাড়ি। মাথার উপর পাকাছাদ। অভয় হরিপদর সঙ্গে নিজের ভাগ্গ্নের কাজকর্ম নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করল। সে জেনে নিতে চাইল, যে কাজ শিখতে তার ভাগ্নেকে পাঠিয়েছে, ভাগনে সেই কাজটা মন দিয়ে শিখছে কি না। ওর কোনও ভবিষ্যৎ আছে কি না। হরিপদ মিনিটখানেক চুপ করে রইল। একটা ছেলে নারকেলের মালা করে খানিক রং এনে হরিপদকে দেখিয়ে বলল, ‘দ্যাখো তো, আরও গাঢ় করব কি না?’
হরিপদ নারকেল-মালাটার দিকে তাকিয়ে বলল, “ঠিক আছে। লাগানোর আগে আমাকে ডাকিস।'
রঙের পাত্র হাতে ছেলেটা চলে যেতেই হরিপদ বলল, ‘শেখার ইচ্ছে আছে। খাটতে পারে, কিন্তু কথা বলতে পারে না বলে বুঝে উঠতে পারি না, ও কী চায়? ওর মনের মধ্যে কীসের যেন একটা আক্ষেপ। একটা হতাশা, কিছুটা বিরক্তি। ওর মনের এই কথাটা বুঝতে না পারলে ওকে ভালভাবে তৈরি করা একটা সমস্যা।'
অভয় এতক্ষণ তাকিয়ে ছিল হরিপদর দিকে। এবার বাড়ির দিকে তাকিয়ে লবকে খোঁজার চেষ্টা করল। তার মনে হল, আকারে-ইঙ্গিতে অথবা ইশারায় লবর মনের কথাটা জানতে হবে। কেন ওর মধ্যে হতাশা? কীসের আক্ষেপ? কিন্তু কীভাবে জানা যাবে? লব তো মূক, মুখ দিয়ে কোনও শব্দ উচ্চারণ করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে উপায় কী? এ ব্যাপারে দামুদাদু কি কিছু করতে পারেন? তিনি তো বলে বেড়ান, তিনি নাকি সকলের মুশকিল আসান। কতবার কত আন্তর্জাতিক সমস্যা থেকে নেহরু, ক্রুশ্চেভ, কেনেডিকে উপযুক্ত পরামর্শ দিয়ে বাঁচিয়েছেন। যদিও ওই সব ঘটনার কথা দামুদাদু ছাড়া আর কেউ জানে না। জানলেও বিশ্বাস করে না। অভয়ের মাথায় একটা বিষম চিন্তা ঢুকে গেল। ওই চিন্তা মাথায় নিয়েই বাড়ি ফিরে এল। বাড়ি এসে মায়া বলল, ‘ছেলেটার মনে শান্তি নেই। আমাকে কী একটা কথা বারবার বলতে চাইল, কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম না।'
অভয় বউয়ের কথাটা শুনল, কিন্তু কিছু বলল না। দিন দুই ভাবার পর একদিন দামুদাদুর বাড়িতে এল। বাড়ির উঠোনে তখন জীবনমুখী কেত্তনের মহড়া চলছে। একজন মোটামতো যুবক নামাবলির হাওয়াই শার্ট পরে ডুগডুগির মতো একটা যন্ত্র বাজাতে বাজাতে গাইছে, ‘ডিয়ার হরি, ও মাই ডার্লিং হরি অ্যান্ড কেষ্ট, এভরিবডি জানে নো পেনস, নো গেনস। অ্যান্ড সেই জন্য দম মারো দম। খাও রুটি, আলুর দম।'
অভয়ের মনে হল একখানা আধলা ইট তুলে মোটা ছেলেটার মাথায় মারে। কিন্তু এরা সকলে দামুদাদুর সংগীত বিদ্যালয়ের ছাত্র, তাই যত ইচ্ছেই হোক কিছু করা গেল না। খানিক অপেক্ষা করার পর দামুদাদু এলেন। অভয়কে দেখে বললেন, 'কী রে, কতক্ষণ? কী মনে করে?’
অভয় বলল, ‘আপনার জন্যই বসে আছি।'
দামুদাদু বললেন, ‘গিয়েছিলাম ওই সুবল দত্তর বাড়িতে। বেচারি চাকরি থেকে রিটায়ার করার পর কী করবে, তাই ভাবছিল। শেষে আমি বললাম, আজকের ছেলেমেয়েদের মধ্যে শক্তি আর ভক্তির বড় অভাব। তুমি সেই চর্চা শুরু করো। সকালে এক ঘণ্টা করে ভক্তিকথা শোনা, আর বিকেলে দু’ ঘণ্টা.কুস্তি, ক্যারাটে, লাঠিখেলা আর ছোরাখেলা। স্বদেশি করার সময় এসব করতাম।'
অভয় বলল, ‘এটা হচ্ছে বোমা আর বন্দুকের যুগ। লাঠি, ছুরি দিয়ে কিছু হবে না। ওই এক হিন্দি ছবিতেই দেখি, নায়করা কিলিয়ে কিলিয়ে ভিলেনকে কাঁঠাল পাকাচ্ছে।'
দামুদাদু বললেন, ‘তেমন লাঠিয়াল তো দেখিসনি। যারা লাঠি দিয়ে গুলি আটকে দিতে পারে! এই আমিই তো পুলিশের কত গুলি আমার লাঠি দিয়ে আটকে দিয়েছি। গোরা সাহেবরা তো তাজ্জব! আমায় বলত ‘ম্যান অফ দ্য স্টিক’।’
অভয় কিছু বলল না। কিন্তু একজন জীবনমুখী কেত্তন-শিক্ষার্থী বলল, ‘আপনার সেই লাঠিটা কোথায়? ওটা একটা মূল্যবান স্মারক।'
দামুদাদু বললেন, ‘কোনও ভাল জিনিস কি আর আমাদের দেশে আছে? ধৌলির যুদ্ধ, যাকে তোরা কলিঙ্গ যুদ্ধ বলিস, সম্রাট অশোকের সেই শেষ যুদ্ধ। কলিঙ্গ যুদ্ধের পর বিজয়ী অশোক যুদ্ধবিধ্বস্ত কলিঙ্গের অবস্থা দেখে এতই মর্মাহত হয়েছিলেন যে, তিনি যুদ্ধ করা ছেড়ে দিলেন। ধৌলিতে অস্ত্র ত্যাগ করে, বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করলেন। কিন্তু অশোকের সেই অস্ত্র কি ভারতে কোথাও রক্ষিত আছে? জানি না। ওটি বোধ হয় চলে গিয়েছে এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী মারফত জাপানে। আমার সেই লাঠিও এখন ব্রিটেনে। লর্ড মাউন্টব্যাটেন, ওঁকে আমি ‘মানু’ বলে ডাকতাম, সেই মানুর অনুরোধে লাঠিগাছা দিয়ে দিতে হল।'
অভয় বলল, ‘দামুদাদু, আমি একটা জরুরি বিষয়ে কথা বলতে এসেছি। আমার কথাটা যদি শোনেন!’
দামুদাদু প্রশ্ন করলেন, “বিষয়টা কী?’
অভয় বলল, ‘বিষয় আমার ভাগ্গ্নে লব। কিন্তু এককথায় তো বলা যাবে না। একটু সময় লাগবে।'
দামুদাদু বললেন, ‘একটু আগে ছোরাখেলা শিখিয়ে এলাম। সুবলটা বকে বেশি, সে তুলনায় কাজের অভিজ্ঞতা কম। এখন থেকে ওর শিক্ষাকেন্দ্রেও কিছুটা সময় দিতে হবে। চল, ঘরে গিয়ে চা খেতে খেতে তোর কথা শুনি। আয়, ঘরে আয়।'
দামুদাদু উঠে ঘরে গেলেন। তাঁর পিছন পিছন অভয়। উঠোনের অন্য প্রান্ত থেকে একটা গানের কলি ভেসে আসছে, ‘বল দাদা, দাঁড়াই কোথায়? টিকিট কেটেও সিট জোটে না/ রেশনকার্ডে চাল জোটে না/ সুইচ টিপেও আলো জ্বলে না/ জল নেই তবু জলকর/ মানুষ মারার আজব কল। বল হরি করি কী?'
অবিকল শ্যামাসংগীতের সুরে গেয়ে চলেছে। সুরটা নিয়েছে, ‘বল মা তারা, দাঁড়াই কোথায়’, এই শ্যামাসংগীত থেকে।
দামুদাদু মন দিয়ে অভয়ের মুখ থেকে লবর কথাগুলো শুনে একেবারে চুপ করে গেলেন। কথা না বলে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গিয়ে দামুদাদু যখন কিছু ভাবতে থাকেন, তখন তাঁর কপালে পরপর তিনটে ভাঁজ পড়ে। তার মানে, দামুদাদু খুব গভীরভাবে কিছু ভাবছেন। কিন্তু অভয় ভেবে পাচ্ছে না, দামুদাদুর এই ভাবনার শেষ কবে হবে? তিনি নিজেই একবার বলেছিলেন, ক্লাইভ মুর্শিদাবাদ আক্রমণ করার পর সিরাজকে বাঁচানোর জন্য তিনি কলকাতায় ভাবতে বসেছিলেন। কী করে পলাশির যুদ্ধ থামিয়ে সিজুকে আবার সিংহাসনে বসানো যায়। সিরাজকে উনি সিজু বলেই ডাকতেন। যেমন উত্তর কলকাতার দেববাড়িতে ক্লাইভকে ডেকেছিলেন ‘ডিয়ার কেলো।'
দামুদাদু ভেবে যখন পলাশি যুদ্ধের সমাধান সূত্র বের করলেন, তখন পলাশির যুদ্ধ জয় করে ক্লাইভ ফিরে গিয়েছেন কলকাতায়। লবর ব্যাপার ভাবতে গিয়ে যদি অতটা সময় লাগান, তা হলেই মুশকিল। অভয় যখন এই সব ভাবছে, তখন দামুদাদু হঠাৎ কেশে উঠে বললেন, ‘কোনও কথা বললে আগের মতো শুনতে পায় তো? রিঅ্যাক্ট করে তো?’
অভয় বলল, ‘হ্যাঁ। তা করে।'
দামুদাদু বললেন, ‘মূকরা সাধারণত বধিরও হয়। অর্থাৎ টু ওয়ে। কথা যেমন বলতে পারে না, তেমনই কারও কথা শুনতেও পায় না। তোর ভাগনে কিন্তু সেই রকম নয়। ওকে ঠিক জন্মমূক বলা যায় না।'
অভয় বলল, ‘না, তা ঠিক বলা যায় না। ওর বয়স যখন সবে চার অতিক্রম করেছে, তখনই ওর জীবনে এক ভয়ংকর ঘটনা ঘটে। আমার দিদির শ্বশুরবাড়ি ছিল মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জে। ওখানেই ঘটনাটা ঘটে। জিয়াগঞ্জের একটু ভিতরের দিকে।
দামুদাদু হাত বাড়িয়ে দেওয়ালের তাক থেকে ছোট্ট একটা হামানদিস্তা নামিয়ে এনে পান থেতো করতে লাগলেন। স্টিলের ছোট হামানদিস্তায় পান থেতো করার টুং-টাং আওয়াজ উঠছে। থেতো করা পানটুকু মুখে পুরে বললেন, ‘সব মানুষেরই একটা অতীত থাকে। তোর ভাগ্নের অতীতটা জানা আমার পক্ষে জরুরি। তুই বলে যা।'
অভয় বলতে আরম্ভ করল, ‘দু’ হাজার সালের ছাব্বিশে জানুয়ারি। সারাদিন ধরে চলেছে নানা উৎসব, ভোরে প্রভাতফেরি, ছোটদের দৌড় প্রতিযোগিতা। শীতের খাটো বেলা। দেখতে দেখতে দিন ফুরিয়ে এল। সন্ধ্যা নামল। গাছের পাতায় পাতায় জমতে শুরু করল কুয়াশা। সন্ধ্যা বাড়তে বাড়তে রাত হল। সেই নিশুতি রাতেই এল ভয়ংকর এক মুহূর্ত। ঘরের দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা পড়ল। লবর বাবা, মানে আমার জামাইবাবু মশারির ভিতর উঠে বসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে?’
‘দরজার বাইরে থেকে উত্তর এল, ‘আমরা পুলিশ। থানা থেকে আসছি।'
‘জামাইবাবু মশারির বাইরে এসে ঘরের দরজা খুলে দিলেন। দিদি ততক্ষণে বিছানার উপর উঠে বসেছেন। লব তখনও ঘুমিয়ে। সারাদিন নানারকম উৎসবে মেতে ছিল বলে, ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু দরজা খুলে দিতেই যারা হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকল, তারা কেউই পুলিশ নয়। কারও গায়েই পুলিশের পোশাক ছিল না। মাথায় বাঁদুরে ক্যাপ, পরনে কালো রঙের ফুলপ্যান্ট, আর হাতে নানারকম ধারালো অস্ত্র। কারও হাতে চপার, কারও হাতে ধারালো সোর্ড, শুধু একজনের হাতে একটা পিস্তল বা রিভলভার জাতীয় জিনিস। আসলে আমার জামাইবাবু পিস্তল আর রিভলভার এই অস্ত্রের নাম জানেন, কিন্তু কোনটা কেমন, তা জানেন না। ওরা ঘরে ঢুকেই একটান দিয়ে মশারি খুলে ফেলে ওই পিস্তল বা রিভলভার যা ছিল, সেটা আমার জামাইবাবুর কপালে ঠেকিয়ে বলে উঠেছিল, ‘আলমারির চাবি দিন।'
‘তারপরের ঘটনা শুধু লুটতরাজের ইতিহাস। লব জেগে উঠে এই সব দৃশ্য দেখে কেঁদে উঠতেই, একজন লোক ওর মুখের মধ্যে অনেকটা মশারি জোর করে গুঁজে দিচ্ছিল দেখে, জামাইবাবু ছেলেকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতেই, একটা লোক ওই সোর্ডের কোপে গলাটাকে আধখানা করে ঝুলিয়ে দিল। ঠিক তখনই দু'হাতে মুখ থেকে মশারি টেনে বের করতে করতে লব পাড়াকাঁপানো বিকট এক চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। দিদিও অজ্ঞান হয়ে খাট থেকে মেঝেতে পড়ে গিয়েছিলেন। লবর চিৎকারে প্রথমে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা বিষয়টা বুঝে ওঠার আগেই ডাকাতদল উধাও। পুলিশ নাকি অনেক চেষ্টা করেও এই ডাকাতি এবং খুনের কিনারা করতে পারেনি। লবকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার অনেক পরে জ্ঞান ফিরেছিল। জ্ঞান ফিরে এলেও ওর মুখে আজও কোনও কথা ফিরে আসেনি। এর পর ওরা জিয়াগঞ্জ ছেড়ে ইছাপুরে আমাদের কাছে চলে আসে। জামাইবাবুর হত্যাকাণ্ডের পর দিদি মোটে দু’ বছর বেঁচে ছিলেন। লব চার বছরে পিতৃহীন হল, আর ছ’ বছরে মাতৃহীন।'
অভয় থামতেই দামুদাদু বললেন, ‘এবার বোঝা গেল লবর মধ্যে কীসের আর্তি, কীসের হতাশা এবং বেদনা। সেই সঙ্গে নিশ্চিত একটা রাগও ক্রমাগত ফুঁসে চলেছে। তুই আমায় দু’ দিন সময় দে। তারপর তোকে নিয়ে যাব রুদ্রপুরে ওই হরিপদ পালের কাছে।'
অভয় দামুদাদুর কাছ থেকে ফিরে আসতে আসতে ভাবল, দু’ দিন সময় না হয় দেওয়া গেল। কিন্তু এতটা রাস্তা ঠেঙিয়ে রুদ্রপুরে হরিপদ পালের কাছে যাওয়া কেন? সে তো মূর্তি গড়ে। পটুয়া। ডাক্তার-বদ্যি তো নয়। কিন্তু দামুদাদুর মনের মধ্যে কী যে আছে, কোন দিক থেকে কী ফন্দি যে বের করবেন, সেটা জানার উপায় নেই। দামুদাদু যত বলেন ততখানি যে করেন না, কিংবা করতে পারেন না, সে কথা অভয়ও জানে। ফ্রান্সের জঁ থিরুরে নাকি তিন শতাব্দী বেঁচে ছিলেন। ওই ফরাসি ভদ্রলোকের নাম অভয় আগে কখনও শোনেনি। দামুদাদুই প্রথম শোনালেন। কিন্তু উনি গ্রাহাম বেলের বন্ধু, আলিবর্দির সঙ্গে বসে দাবা খেলতেন, এসব তো গালগল্পের চেয়ে বেশি। অভয় একটা চিন্তার মধ্যে দুলতে দুলতে নিজের বাড়িতে ফিরে এল।
দামুদাদু বসে থাকার লোক নন, উনি ইছাপুর থেকে কলকাতায় এসে একজন নামকরা সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে দেখা করতেই সেই ডাক্তারবাবু বলে উঠলেন, ‘আরে, আপনি সেই দ্য গ্রেট দামুকাকা না?’
দামুদাদু বললেন, ‘গ্রেট কি না জানি না। তবে বেঁচে আছি। আমি তোমার বাবার বিয়ের নিমন্ত্রণ খেয়েছি, তোমার অন্নপ্রাশন। তোমার মেয়ের মুখেভাতের নিমন্ত্রণ পেয়েছি, কিন্তু যাব কী করে? তখন তো আমি একটা মিটিং অ্যাটেন্ড করার জন্য বিদেশে রওনা হয়ে গিয়েছি।'
ডাক্তার বললেন, ‘আপনি কিন্তু কাকু একদম বদলাননি। একই রকম আছেন?’
দামুদাদু বললেন, ‘আমি কি গিরগিটি নাকি যে, ঘনঘন রং বদলাব? এই একই রকম থাকতে পারাটাই হচ্ছে মানুষের ব্যালান্স অফ ডিগনিটি। এখন সেই ডিগনিটি কোথায়? রাজা-জমিদাররা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। এখন নতুন যুগ। নতুন ভাবনা। ফলে ওঁদের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে ডিগনিটি, অ্যারিসটোক্র্যাট এই সব শব্দও হারিয়ে গিয়েছে। এখন সবই নিম্নমানের নয়তো মাঝারি মানের। যাক গে, সেসব নিয়ে আপশোস করে লাভ নেই। তোমার কাছে এসেছি একটা কাজ নিয়ে। ডাক্তারি পাশ করেছ শুনেছি, কিন্তু কেমন ডাক্তার হয়েছ, তা জানি না। বল পায়ে মাঠে নামলেই কি পেলে-মারাদোনা হওয়া যায়! তুমি কেমন ডাক্তার হয়েছ, এবার তার পরীক্ষা দিতে হবে।'
ডাক্তার মনে মনে শঙ্কিত হলেন। তাঁর দামুকাকা কখন যে কী করবেন, তা বলা তো দূরের কথা, অনুমান করাও কঠিন। তাই ভয়ে ভয়ে বললেন, ‘পেশেন্ট কোথায়? অসুখটা কী?’
দামুদাদু বললেন, ‘পেশেন্ট আনব আমি। পেমেন্ট করব আমি। রোগ ধরবে এবং সারাবে তুমি। এখন তুমি কেস হিস্ট্রিটা মন দিয়ে শোনো। এই সব রোগের ক্ষেত্রে কেস হিস্ট্রিটা জানা খুব জরুরি।'
ডাক্তার বললেন, ‘সে তো বটেই। আপনি হিস্ট্রিটা বলতে আরম্ভ করুন।'
দামুদাদু অভয়ের মুখ থেকে যেমন শুনেছিলেন তেমন করেই সব বলে গেলেন। গোটা কাহিনি শোনার পর ডাক্তার বললেন, ‘ছেলেটিকে একবার দেখা যায়? আমি নিজে ওর সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে চাই। ছেলেটা কোথায় থাকে? ইছাপুরে?’
দামুদাদু বললেন, ‘বললাম না, মূর্তি গড়ার কাজ শিখতে ওকে রুদ্রপুরে পাঠিয়েছি। তুমি সেখানে যাবে? খুব সোজা রাস্তা। বাবুঘাট থেকে বাস ধরে বাবুডাঙা। তারপর...’
ডাক্তার হাতের ইশারায় দামুদাদুকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ওই সব ডাঙাফাঙা ছাড়ুন। ওকে কলকাতায় আনা যায় কি? আমার চেম্বারে?’
দামুদাদু যেন ডাক্তারের কথায় অবাক হলেন। ভৎসনার সুরে বললেন, ‘তুই ডাক্তার না থানার দারোগা। রোগী তো আসামি নয় যে, তাকে সশরীরে হাজির হতে হবে। তুই ক্রিশ্চিয়ান ফ্রেডরিখ স্যামুয়েল হ্যানিম্যানের নাম শুনেছিস? আমি যাঁকে ‘স্যামুদা’ বলে ডাকতাম!'
ডাক্তারের চোখে কৌতুক ঝলসে উঠল। তিনি বললেন, ‘হ্যানিম্যান আপনার চেয়ে বয়সে বড় ছিলেন? আমার তো ধারণা, একমাত্র মহিষাসুর ছাড়া ত্রিভুবনে কেউ আপনার চেয়ে বড় ছিলেন না!’
দামুদাদু বললেন, ‘ওরে বোকা, বয়সের বড়টাই কি আসলে বড়? প্রজ্ঞার দিকটাও তো দেখতে হবে। আদালতে ছেলে জাজ হলে অ্যাডভোকেট বাবাকেও ‘মি লর্ড’, ‘মাননীয় বিচারপতি’ বলে সম্বোধন করতে হয়। তুই কি জানিস, ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নের সেনাদল রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে হেরে গিয়ে দেশে ফেরার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু নেপোলিয়নের বহু সৈন্য টাইফাস নামে একটা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছিল। কোনও চিকিৎসাতেই কাজ হচ্ছিল না। অবশেষে ডাক পড়ল স্যামুদার। ওই বিরাট সংখ্যক সৈন্যদলকে অল্পদিনেই সারিয়ে তুললেন। স্যামুদা অত দেখাদেখি করতেন না। তোদের হচ্ছে হাজার রকম টেস্ট। টেস্ট করতে করতেই রোগী কাহিল হয়ে পড়ে। দুঃখের কথা কী জানিস, স্যামুদার দুর্দিনেসুদিনে সঙ্গে ছিলাম। কিন্তু ওঁর মৃত্যুর দিনটিতে ওঁর কাছে থাকতে পারিনি। ১৮৪৩ সালের দোসরা জুলাই উনি যখন শেষরাতে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিচ্ছেন, তখন আমি ভারতের গ্রামে গ্রামে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার প্রচার চালাচ্ছি। আমাদের মতো দরিদ্র দেশে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার প্রচার এবং প্রসার হওয়া দরকার। পরবর্তীকালে আমাকে এই ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন গাঁধীজি এবং রবীন্দ্রনাথ।’
ডাক্তার নির্ঘাত মনে মনে বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু সেই বিরক্তি প্রকাশ করার উপায় নেই। তাই বলে উঠতে বাধ্য হলেন, ‘দামুকাকা, এই সব অতীত কাহিনি শুনে তো কোনও লাভ নেই। আপনি বরং রোগীকে দেখানোর বন্দোবস্ত করুন।'
দামুদাদু বললেন, ‘ওকে ওর কাজের মধ্যে দেখলেই ভাল হত না? চল না বাবা, তোর তো গাড়ি আছে। হুস করে ঘুরে আসি। তোর একটা আউটিংও হবে।'
শেষ পর্যন্ত অনেক কথার পর ডাক্তারকে রাজি করিয়ে, দিনক্ষণ সব পাকা করে দামুদাদু এসে পৌঁছলেন ইছাপুরে। অভয় দামুদাদুর ফেরার অপেক্ষাতেই ছিল। অভয় দেখল, দামুদাদু বারান্দার উপর উঠে পায়ের জুতো জোড়া খুলে যথাস্থানে গুছিয়ে রেখে, বাড়িতে পরার জুতোটা পায়ে দিলেন। পরে ঘরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওরে, কে আছিস? এক গ্লাস জল আর একটু থেতো করা পান দিয়ে যা।
অভয় এসে বলল, ‘আমি এনে দেব দামুদাদু?
দামুদাদু বললেন, ‘তুই কেন যাবি? বাড়িভর্তি লোক। সকলে কি পাণ্ডবদের মতো অজ্ঞাতবাসে গিয়েছে নাকি?’
দামুদাদুর কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর এক নাতনি একটা গেলাসে জল আর ছোট্ট রেকাবিতে থেতো করা পান নিয়ে এল। দামুদাদু জিজ্ঞেস করলেন, 'হ্যাঁ রে, কেত্তনের ক্লাস আজ হয়নি?’
নাতনি উত্তর দিল, ‘তোমার ছাত্রদের আজ আমিই ছুটি দিয়ে দিয়েছি। ওই ছোঁড়াগুলো
জীবনমুখী কেত্তনের নামে এমন গলা ছেড়ে হরিধ্বনি দেয়, যেন মনে হয় এটাই নিমতলা ঘাট।' দামুদাদু নাতনির কথার কোনও উত্তর না দিয়ে জলটুকু খেয়ে নিয়ে রেকাবি থেকে থেতো করা পান মুখে দিয়ে অভয়ের দিকে তাকালেন। অভয়ের দু’চোখে আগ্রহ। দামুদাদু বললেন, ‘তোর কাছে হরিপদর একটা ফোন নম্বর আছে না?’
অভয় বলল, ‘হ্যাঁ। হরিপদর মোবাইল নম্বরটা আছে।'
দামুদাদু বললেন, ‘হরিপদকে বলে রাখিস, আসছে রবিবার আমরা ওর কর্মশালায় যাব। আমাদের সঙ্গে যে একজন ডাক্তার যাবেন, সে কথাটা যেন হরিপদ কাউকে না বলে। বিশেষ করে তোর ভাগ্নে লবকে।'
অভয় বলল, ‘বাড়িতে ওর মামিমা, মানে আমার স্ত্রীকে কী বলব?’
দামুদাদু মাড়ি দিয়ে থেতো করা পান চিবোতে চিবোতে বললেন, ‘আপাতত না বলাই ভাল। এখনও কিছু কাজ বাকি আছে। সেগুলো গুছিয়ে নিতে হবে। তুই কাল অফিস থেকে বেরিয়ে একটু হেঁটে এসে গোষ্ঠদার সামনে দাঁড়াস। আমি সাড়ে পাঁচটার সময় গোষ্ঠদার কাছে পৌঁছে গিয়ে তোর জন্য অপেক্ষা করব।'
অভয় কিছু বুঝতে না পেরে বলল, ‘গোষ্ঠদা কে? তিনি কোথায় দাঁড়াবেন, আর তাঁকে চিনবই বা কেমন করে?’
দামুদাদু এবার খেপে গিয়ে বললেন, ‘তুই কোন দিন না জিজ্ঞেস করে বসিস, শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ে ঘোড়ায় চড়ে কে? একটা জাতি কতটা মূর্খ হলে এরকম প্রশ্ন করে। বল তো, মরকতকুঞ্জ কোথায়?’
উত্তর দিতে না পেরে অভয় চুপ করে বসে রইল। দামুদাদু বললেন, ‘গোষ্ঠদা, মানে বিখ্যাত ফুটবলার গোষ্ঠ পাল। ময়দানে তাঁর স্ট্যাচু আছে। মরকতকুঞ্জ হচ্ছে সেই জায়গাটির নাম, যেখানে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। বি টি রোডের পাশে।'
এই মুহূর্তে সব জেনে যে অভয়ের কী লাভ কে জানে। তবু সে মুখে কিছু না বলে চুপচাপ বসে রইল। বসে না থেকে তার উপায় নেই। একদা একটি ছেলে দামুদাদুর কাছে এসে বলেছিল, ‘আপনার বাড়ির সামনে যদি একটু জায়গা দেন, তা হলে একটা ছোটখাটো দোকান করি।'
দামুদাদুর প্রশ্ন, ‘কীসের দোকান?’
ছেলেটি উত্তর দিয়েছিল, ‘মিষ্টির দোকান।'
উত্তর শুনে দাদু প্রশ্ন করলেন, 'বলো তো, কত পাকে রসগোল্লা আর কত পাকে দানাদার? পান্তুয়া আর কালোজামে তফাত কী? পুরি, ডালপুরি, ভেলপুরি এই তিন পুরির তফাত কেমন এবং কতটা নিমকি বানাতে ক’টা প্যাঁচ লাগে? দরবেশ বানাতে ক্ষীর আবশ্যক কেন? তারপর চন্দ্রপুলি আর কাজুবরফি, সেইসঙ্গে...
‘ওরে বাবা রে, বাবা। আমি ঘর চাই না, চলি,’ এই কথাটুকু বলতে বলতে ছেলেটা সেই যে দৌড় দিয়েছিল, আর তাকে এই এলাকায় দেখা যায়নি। কিন্তু অভয়ের তো দৌড়ে পাড়া ছেড়ে পালানোর উপায় নেই। তাই তাকে বসে বসে সব শুনতে হবে। অসহ্য হলেও সহ্য করতে হবে।
অভয় ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করল, ‘আমরা কি ওখান থেকে কোথাও যাব?’
দামুদাদু বললেন, ‘তোর কি ধারণা, আমি তোকে নিয়ে ময়দানে হাডুডু খেলব? ওখান থেকে হাইকোর্ট। দরকার হলে উকিলের চেম্বারে। নামে উকিল, কিন্তু যখন সওয়াল করতে ওঠেন তখন আচ্ছা আচ্ছা ব্যারিস্টার ঘোল খেয়ে যান। হাইকোর্টের চেম্বারে না পেলে ওঁর বাড়িতে যেতে হবে।'
অভয় দু’হাত বাড়িয়ে হাঁটু দুটো ছুঁয়ে বলল, ‘দামুদাদু, কিছু একটা হবে তো?’
দামুদাদু বলে উঠলেন, ‘হবে মানে? হইয়ে ছাড়ব। তুই আর বাবা হাত বাড়াস না। ওই বোম্বাই স্টাইলে হাঁটু খাবলা দিয়ে ধরিস না।'
অভয় একটা কথা ভাবছিল। এবার বলে ফেলল, ‘দামুদাদু, লবকে কথা বলানোর জন্য ডাক্তার লাগবে, সেটা বুঝি। কিন্তু অ্যাডভোকেট লাগবে কেন?’
দামুদাদু হাসতে হাসতে বলে উঠলেন, ‘সবই যদি তুই বুঝবি, তা হলে এদেশে দামোদর নন্দীর জন্মানোর কোনও দরকারই হত না। আমি জিয়াগঞ্জে ডাকাতি আর খুনের মামলাটা রি-ওপেন করব।'
দিনপাঁচেক ধরে দামুদাদু কী যে করলেন, কোথায় কোথায় গেলেন, অভয় সেটা জানতেই পারল না। ইছাপুরের কণ্ঠাধারে এক ভদ্রলোক গাড়ি ভাড়া দেওয়ার ব্যাবসা করেন। তাঁরই কাছ থেকে একটা মারুতি ভ্যান ভাড়া করে প্রায় রোজই কলকাতার দিকে যাচ্ছেন। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা পেরিয়ে যাচ্ছে। দামুদাদুর সবই অদ্ভুত। গাড়িটি বেশ ভাল কিন্তু ড্রাইভারটি দেখবার মতো। এত রোগা এবং দুর্বল কাঠামোর কোনও পঞ্জাবিকে অভয় কখনও দ্যাখেনি। অথচ দামুদাদু বলেছেন, ‘এই পঞ্জাবি জওয়ান ইন্দিরা গাঁধীর আমলে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কী প্রবল যুদ্ধটাই না করেছে।’ করবেই তো। কারণ, ওই ছেলেটা যুদ্ধবিদ্যা শিখেছে দামুদাদুর কাছে। আর দামুদাদু যুদ্ধবিদ্যা রপ্ত করেছেন জর্জ ওয়াশিংটনের কাছে।
দামুদাদু বলেন, ‘মনে রাখিস, আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের নায়ক জর্জ-ই আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট। দেশটার নাম আমেরিকা কেন জানিস?’ অভয় কোনও উত্তর দিতে পারেনি।
দামুদাদু বলেছিলেন, ‘১৪৯৯ সাল নাগাদ এক ব্যাটা ইতালীয় নাবিক প্রথম দক্ষিণ আমেরিকায় যান। সাধুভাষায় ‘পদার্পণ’ করেন। সেই ইতালির নাবিকের নাম ছিল আমেরিগোভেসপুচি। তাঁর নাম থেকেই নাম হয়ে গেল আমেরিকা।'
দামুদাদুর মুখে এসব কথা যত শোনে, অভয় মনে মনে তত বিরক্ত হয়। তার মন জুড়ে এখন লব। কে একজন যেন অভয়কে বলেছে, ‘আকস্মিক আঘাত পেয়ে মনের মধ্যে ভয়ানক প্রতিক্রিয়া হলে মানুষ যেমন স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে যায়, তেমনই মূকও হয়ে যায়। লোকে বলে না, আমি তো ভয়ে মূক হয়ে গিয়েছিলাম। তাই লবকে কথা বলাতে দরকার আবার একটা কঠিন মানসিক আঘাত।' সেই কথাটা দামুদাদুকে বলতেই দামুদাদু দাবড়ে উঠে বলেছিলেন, ‘এটা কি সিনেমা? ট্রেন অ্যাকসিডেন্টে স্মৃতি গেল আবার মোটরের ধাক্কায় স্মৃতি ফিরে এল ! তখন আগের কথা সব ভুলে গেল। সিনেমা হচ্ছে ইচ্ছেপূরণের গল্প, কিন্তু বাস্তব জীবনটা তা নয়। বাস্তবে ওই রকম ইচ্ছেপূরণ হয় না। মানসিক আঘাত দেওয়ার নাম করে যদি তোর গলাটা ঘচাৎ করে কেটে ফেলি, তা হলেই যে লব কথা বলবে তার গ্যারান্টি কে দেবে? মাঝখান থেকে তোর গলাটাই যাবে, আর আমাকে জেলে নিয়ে গিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে পচিয়ে তারপর ফাঁসি দেবে। ওসব ভাবনা ছাড়। ব্যবস্থা যা করার, আমিই করছি। সবই কি তড়িঘড়ি হয় নাকি? মনে রাখিস, কাল রবিবার। আমরা বেরোব সকাল ন'টায়। যাওয়ার পথে ডাক্তারকে তুলে নিতে হবে।'
এতক্ষণে অভয়ের মনে একটু স্বস্তি ফিরে এল। যাক, লবর ব্যাপারটা তা হলে দাদুর মাথায় আছে। দেখা যাক আগামীকাল তিনি কী করেন। অভয় উঠে আসছিল, দামুদাদু ডেকে বললেন, ‘আগামীকাল সকালে উঠেই তোকে একটা জরুরি কাজ করতে হবে।' অভয় বলল, ‘কী কাজ?’
দামুদাদু বললেন, ‘তোর বাড়ির সামনেই তো বাজার। বাজারে ঢোকার মুখেই ফুটপাতের উপর নিতাই সাঁতরার পেপার স্টল। সেখান থেকে সবক'টা বাংলা দৈনিক সংবাদপত্র একখানা করে কিনে নিবি। ইংরেজিটা এখনই দরকার নেই। ভুল হয় না যেন!’
অভয় ভাবল, দামুদাদু বোধ হয় এতটা পথ কাগজগুলো পড়তে পড়তেই যাবেন। কিন্তু দামুদাদুর মারুতি ভ্যানে ওঠার পরও আসল কারণটা বুঝতে না পারলেও, লেকটাউন থেকে ডাক্তারবাবু গাড়িতে ওঠার পর অভয় কাগজ কেনার রহস্যটা জানতে পারল এবং জানতে পেরে বেজায় পুলকিত হল। লেকটাউনে ডাক্তারের দোতলা বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়াতেই দামুদাদু বললেন, ‘ড্রাইভারসাব, হর্ন মত বাজাও,’ তারপর অভয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ডাক্তারের বাড়ি তো? একতলায় চেম্বার। যদিও আজ চেম্বারে রোগী থাকার কথা নয়। কিন্তু বলা তো যায় না। একবার আমাদের ইছাপুরের গোবিন্দ গাঙ্গুলির মাটি বোঝাই লরি গিরীনডাক্তারের চেম্বারের সামনে আসামাত্র প্রচণ্ড শব্দে টায়ার ফেটে গেল, আর সেই শব্দে চেম্বারের মধ্যেই হরেন পালিতের ঠাকুরমা হার্টফেল করে মারা গেলেন। এবার লেগে গেল গন্ডগোল। নোয়াপাড়া থানার ওসি, পুলিশ, ব্যারাকপুরের এস ডি পি ও.সকলে ছুটে এলেন গন্ডগোল থামাতে। হরেন পালিত বলছে, ‘গোবিন্দ গাঙ্গুলি আমার ঠাকুরমাকে মেরেছে। ও একটা খুনি।'
গোবিন্দ গাঙ্গুলির বক্তব্য, 'হরেনদার ঠাকুরমা মারা গিয়েছেন ডাক্তারের চেম্বারে থাকাকালীন। অতএব, মৃত্যুর দায় গিরীন ডাক্তারের।'
পাড়ার ক্লাবের সম্পাদক সুজন বৈরাগী, যদিও তিনি ঘোরতর সংসারী, স্রেফ পদবিটা বৈরাগী বলে অনেকে ভুল করেন। তিনি বললেন, ‘লরির ড্রাইভার কোথায়?’
লরির ড্রাইভার কি আর থাকে! একগলা আক্ষেপ নিয়ে সুজন বললেন, ‘এই কি হার্টফেল করার টাইম! আর সাতদিন পরেই উনি একশো বছর অতিক্রম করতেন। আমরা ঠিক করে রেখেছিলাম পাড়া থেকে ওঁকে গণসংবর্ধনা দেব। কিন্তু কাকে দেব? এই দুর্ভাগা দেশ এমনই যে, একটা মাটি বোঝাই লরি এবং টায়ার একজন নারীর প্রাণ নিয়ে গেল। এরোপ্লেন, জাহাজ, নিদেনপক্ষে মেট্রো রেলও যদি কারও প্রাণহরণের কারণ হয়, তা হলে সেই শোকেও সান্ত্বনা থাকে। কিন্তু ইটবোঝাই গোরুর গাড়ির নীচে পড়ে মারা গেলে সেই মৃত্যুর কোনও সমাদর হয় না। পূজনীয়া ঠাকুরমার মৃত্যুও সেই বাঞ্ছিত সমাদর পেল না। তাই আগামীকাল এই ঘটনার প্রতিবাদে কালাদিবস এবং লরি অবরোধ কর্মসূচি নেওয়া হল।'
দামুদাদুর ডাকেই ডাক্তারবাবু নেমে এলেন। দামুদাদু বললেন, “তোমাকে আর ট্রাবল দিলাম না। কেননা, তোমার গাড়ি তো তুমি নিজেই চালাও। তাই আমিই গাড়ি নিয়ে এলাম। এই ড্রাইভার খুব ভাল। পাকা হাত। বলবীর এক সময় মিলিটারিতে ছিল।'
পিছনের সিটে দামুদাদু আর ডাক্তারবাবু। সামনে ড্রাইভারের পাশের আসনে অভয়। দামুদাদু আজ শুরুতেই ডাক্তারবাবুকে ‘তুমি’ সম্বোধন দিয়ে শুরু করেছেন। আশা করা যায় মধ্যমগ্রামের মোড় পেরনোর পরেই সম্বোধনটা ‘তুই’ হয়ে যাবে। অভয়ের ধারণা মিথ্যে হল না। মধ্যমগ্রামের মোড় পর্যন্ত যেতে হল না। বাগুইহাটি পেরনোর পরই দামুদাদু বললেন, ‘অশোক, আজকের কাগজগুলো দ্যাখ। সবক'টা বাংলা কাগজের তিনের পাতার ডান দিকের কলমের টপে একটা ডবল কলম বিজ্ঞাপন আছে। সবক'টা বাংলা কাগজেই বিজ্ঞাপনটা আছে, একই জায়গায়। নে, জোরে জোরে পড়। অভয়ও শুনুক।'
অশোকডাক্তার নিজে একবার মনে মনে পড়ে নিয়ে, এবার জোরে পড়তে লাগলেন, ‘মৃৎশিল্পের প্রতিযোগিতা। প্রতিবন্ধীদের জন্য মাটির মূর্তিগড়া, মাটি দিয়ে কোনও কল্পিত গ্রাম, কোনও ঘটনা, বিশেষ কোনও দৃশ্য বানাতে হবে। দেবদেবীর মূর্তি বানানো চলবে না। কিন্তু দুর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধ, রাম-রাবণের যুদ্ধ, এসব বানানো চলবে। বিস্তারিত বিবরণের জন্য, যোগাযোগ করতে হবে...'
এই পর্যন্ত পড়েই অশোকডাক্তার বললেন, 'আপনি আমার দু'টো চেম্বারের ঠিকানাও দিয়ে দিয়েছেন?’
দামুদাদু বললেন, ‘আমি যুবকল্যাণ কেন্দ্র, অকাদেমি, তথ্যকেন্দ্র এরকম অনেক জায়গার নাম দিয়েছি। এই মৃৎশিল্পের প্রদর্শনী জিয়াগঞ্জেও করব।'
অশোকডাক্তার বললেন, ‘আপনি যখন মুখে বলেছিলেন তখন এতটা বুঝিনি। এবার মনে হচ্ছে আপনি জিনিয়াস। আপনি একটা দারুণ ঘটনা ঘটাবেন। যদি এটা সফল হয়, তা হলে...'
দামুদাদু ডাক্তারকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এবার হচ্ছে সবচেয়ে বড় কাজ, ওই হরিপদকে ভাল করে বোঝানো। এই ঘটনার সাফল্য অনেকখানি নির্ভর করছে হরিপদর উপর।'
অশোকডাক্তার বললেন, ‘গোটা ব্যাপারটা করতে অনেক টাকাও লাগবে। যতই প্রতিবন্ধী হোক, টাকার ব্যাপারে কেউ বিশেষ হাত খুলবে না।'
দামুদাদু বললেন, ‘আমি এই দামোদর নন্দী আমাদের জাতভাইদের তোদের চেয়ে অনেক বেশি চিনি। এন জি ও সংস্থাকে ধরেছি। গোটাতিনেক মালটিন্যাশনাল কোম্পানি। ব্যস, আর কী চাই! আজকের বিজ্ঞাপনগুলোর খরচ দিয়েছে তিনখানা ব্যাংক। এবার হরিপদর ট্রেনিংটা আমরা ঠিকঠাক দিতে পারলেই কার্যসিদ্ধি।'
বিজ্ঞাপনটা শুনে অভয়ের ভাল লাগলেও, সে বুঝতে পারল না এই বিজ্ঞাপনে কীসের কার্যসিদ্ধি, কেমন কার্যসিদ্ধি হবে? তার মধ্যে নতুন করে একটা উৎকণ্ঠিত আগ্রহ জাগল। ইছাপুরে ফিরে এসে দামুদাদু বললেন, ‘ব্যস, এবার বাকি কাজটুকু ভালয় ভালয় ঘটলেই আমার চেষ্টা সার্থক।'
অভয়কে কথা বলতে বারণ করে দিয়েছিলেন, তাই দামুদাদুর নির্দেশমতো সে কোনও কথা বলছিল না। দামুদাদুর ফোনাফোনি এবং ব্যস্ততা দেখে অভয় টের পাচ্ছিল কিছু একটা হতে চলেছে, কিন্তু কী যে হতে চলেছে, তা অভয় বুঝতে পারছে না। ইতিমধ্যে দামুদাদুর কাছে আরও কয়েকজন কাবুলি ব্যায়াম শিক্ষার্থী জুটে গিয়েছেন। দামুদাদুর ভাষায়, ‘ভাল জিনিসের কদর আমার দেশ না বুঝলেও, সুদূর আফগানিস্তানে আমার খ্যাতি পৌঁছে গিয়েছে।’ কারণটা ঠিক জানে না, ব্যারাকপুর নিবাসী দু’জন কাবুলিওয়ালা ইদানীং দামুদাদুর সঙ্গে ঘুরছেন। দেখলে মনে হবে বডিগার্ড। বড় বড় লোক, মন্ত্রী, ব্যবসায়ী কত লোকেরই তো বডিগার্ড থাকে, কিন্তু কাবুলি বডিগার্ড অভয় কখনও দ্যাখেনি। দ্বিতীয় কাবুলিটিও বডিগার্ড, তবে প্রতিবন্ধী। ডান পায়ে কোনও গন্ডগোল থাকায় ডান বগলে ক্রাচ নিয়ে হাঁটেন। দামুদাদুর দৌলতে কত জিনিসই যে দেখা গেল! ক্ষীণতনু দুর্বল পঞ্জাবি যোদ্ধা, শীর্ষাসনরত কাবুলিওয়ালা, সালোয়ার-কামিজপরা মহিলা কবিরাজ এবং ধুতি পাঞ্জাবি পরা অ্যালোপ্যাথ ডাক্তার। কাবুলিওয়ালারা দামুদাদুকে নাকি কাবুলে একটি ব্রাঞ্চ খুলতে অনুরোধ করেছেন। কিন্তু ইছাপুর ছেড়ে কাবুলে যেতে রাজি হচ্ছেন না। দেশের টানটাই তাঁর কাছে বড় টান।
দামুদাদুর ডাক শুনে অভয় ঘরের ভিতর থেকে বারান্দায় এসে দুই বডিগার্ড-সহ দামুদাদুকে দেখে অবাক। অভয়ের স্ত্রী মায়ার চোখেও বিস্ময়। দামুদাদু এই অঞ্চলে বিশেষ কারও বাড়িতে যান না। তবে কোনও আপদ-বিপদের কথা শুনলে দামুদাদু যাবেনই। অথচ তাঁর বাড়িতে রাজ্যের লোকের আনাগোনা। অভয় খুব বিনীতভাবে বলল, ‘আপনি?’
দামুদাদুর হাতে অনেক হ্যান্ডবিলের মতো কাগজ, আর কাঁধে একটি ঝোলাব্যাগ। দামুদাদু অভয়ের প্রশ্ন শুনে বলে উঠলেন, ‘যেমনভাবে প্রশ্নটা করলি তাতে মনে হল তোর বাবা যেন চিতা থেকে উঠে এল তোর কাছে? আমার কি তোর বাড়িতে আসতে নেই?’
এবার হ্যান্ডবিলগুলো অভয়ের হাতে দিয়ে বললেন, ‘এগুলো বিলি কর। কলকাতার প্রেস ক্লাবে তিনদিনব্যাপী প্রতিবন্ধীদের মৃৎশিল্পের প্রদর্শনী। রোজই বিনে পয়সায় জলখাবারের ব্যবস্থা আছে। ওটি না থাকলে দর্শক কম জুটবে। তুই সকলকে বিলি করবি, আর যেতে অনুরোধ করবি।'
অভয় জিজ্ঞেস করল, ‘দামুদাদু, লবর তৈরি কোনও পুতুল থাকবে?’
দামুদাদু বললেন, ‘ওরে মূর্খ, সব কিছুই তো হচ্ছে লবর জন্য। এখন উদ্দেশ্যটা সফল হলেই আমার কাজ সার্থক।
উদ্দেশ্যটা কী, সেই কথাটাই ঠিকঠাক জানে না অভয়। নির্দিষ্ট দিনে কলকাতার ময়দানে প্রেস ক্লাবে এসে অভয় তো অবাক। সামনের লনে প্যান্ডেল তৈরি হয়েছে। প্যান্ডেলের ভিতরে নানারকমের মৃৎশিল্পের প্রদর্শনী। কেউ তৈরি করেছে ফসলহীন রিক্ত জমির পাশে বিপন্ন চাষি, কেউ গড়েছে বালি খুঁড়ে খুঁড়ে শুকনো নদীর বুক থেকে জল তোলার চিত্র, কারও হাতে তৈরি হয়েছে বিশাল বাড়ির নীচে ফুটপাতে মা আর একটি শিশুর রাত্রিযাপন। সবক’টা মৃৎশিল্পের নীচেই শিল্পীর নাম ও ঠিকানা। এঁদের কেউ থাকেন উত্তর চব্বিশ পরগনার আমডাঙা, কেউ বাঁকুড়া, কেউ কলকাতা। দু'পাশে সার দেওয়া মূর্তিতে অলৌকিক কোনও দৃশ্য নেই। ঠিক মাঝখানে রাখা আছে লবর তৈরি শিল্পকর্মটি। অভয় মূর্তির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল। একটা ছোট্ট ছেলের মুখে কাপড় গোঁজা, গোঁফওলা একজন অসুর সোর্ড নিয়ে শিবঠাকুরের গলা কাটছে। ওই গোঁফওলা পীতবর্ণের অসুরের পায়ের তলায় মূর্ছিতা দেবী দুর্গা। চালচিত্রের নকশায় পুলিশ, হতবাক জনতা, নিভন্ত চিতা, সাদা থানপরা নারীমূর্তি। চালচিত্রের বাকি অংশটা শুধু কালো রঙে রাঙানো। দামুদাদু এই সময় হঠাৎ বাঁশি বাজাতেই প্রদর্শনীর সব আলো নিভে গিয়ে শুধু লবর তৈরি মূর্তিটার উপর একটা নীলচে আলো ঘুরতে লাগল। সেই আলোয় হঠাৎ ঝলসে উঠল একটা তরোয়াল। তার পরেই একটা চিৎকার। সেই সঙ্গে এক মহিলা আর্তনাদ করে ওই নীলচে আলোর মধ্যেই মাটিতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ঠিক তখনই একটি বালকের কণ্ঠ কল্লোলিনী কলকাতার সব শব্দকে ডুবিয়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘বাবা...।'
আলো জ্বলে উঠল। দামুদাদু বলে উঠলেন, ‘পেরেছি। আমরা পেরেছি। উঠে এসো মায়া।’
মায়া তখনও মাটিতে পড়ে আছে। দামুদাদু লবর দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় কিছু বলতেই, লব এগিয়ে গিয়ে মায়াকে ডাকল, ‘মা, মাগো, দ্যাখো, আমি কথা বলতে পারছি। আমি তোমায় ডাকতে পারছি।'
মায়া চোখ তুলে লবর দিকে তাকাল। তার মুখভরা হাসি আর দুই চোখে জল। জল দামুদাদুর চোখেও।
আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী, ১৪১৪
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন