আশু-বিশু

দুলেন্দ্র ভৌমিক

আজ আশু-বিশুর মন বেজায় খারাপ। হঠাৎ করে খারাপ হওয়ার ব্যাপার কিছু নয়। বেশ কিছুদিন থেকেই মনখারাপ যাচ্ছে। দেশে কোথাও গণ্ডগোল হচ্ছে কিংবা মহামারী লেগেছে, এসব ব্যাপার নিয়ে ওদের মনখারাপ হয় না। বিশু আশুর চেয়ে বয়সে একটু ছোট। কোনও ব্যাপার বেশিক্ষণ ধরে ভাবতে পারার মতো ধৈর্য বিশুর নেই। কিন্তু বিশু জানে, আশুর আছে। তাই বাদামের খোলা ছাড়াতে ছাড়াতে বিশু বলে, ‘হ্যাঁ গো আশুদা, কিছু ভাবছ? এভাবে কদ্দিন চলবে?’

সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয় না আশু। ঠোঙা থেকে বাদাম তুলতে তুলতে বলে, ‘মন্দা বুঝিস, মন্দা? লোকে বলে না ব্যাবসাপত্তর মন্দা যাচ্ছে, বাজার মন্দা, ঠিক তেমনই আমাদের কাজ-কারবার এখন মন্দা যাচ্ছে।'

বিশু বোঝবার চেষ্টা করবার ভান করে। খুব চিন্তিতভাবে বলে, ‘মন্দাটা আসে কোত্থেকে বল দিনি?’

বাদাম চিবোতে চিবোতে আশু উত্তর দেয়, ‘কপাল থেকে। কপাল মন্দ তো সবই মন্দা। হরিশ্চন্দ্রের গল্প জানিস তো! পোড়া শোলমাছ নদীতে ধুতে গিয়েই পোড়ামাছ জ্যান্ত হয়ে নদীতে তলিয়ে গেল।'

বিশু আশুর দিকে পিটপিট করে একটু তাকিয়ে থেকে বলল, 'হরিশ্চন্দ্র! সেটা আবার কে? কোথায় থাকে??

আশু উত্তর দিল, ‘পুরাকালের মস্তবড় রাজা। তুই ব্যাটা কিছুই লেখাপড়া করিসনি। তোকে সব বেত্তান্ত খোলসা করে না বললে বুঝতে পারিস না। দিন দিন বুদ্ধিটাও ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। এত বাদাম আনলি, অথচ সঙ্গে এট্টু বিট নুন আনলি না।'

এবার বিশু ফোঁস করে উঠে বলে, ‘তুমি কি ভেবেছ পয়সা দিয়ে বাদাম কিনেছি যে বিট নুন চাইব।'

আশু জিজ্ঞেস করে, তবে আনলি কোত্থেকে?’

বিশু বাদাম ভাঙতে ভাঙতে উত্তর দেয়, ‘চৌরাস্তার মোড়ে রথের মেলা বসেছে। সবাই রথ দেখতে ব্যস্ত। আমি সেই ফাঁকে এক ঠোঙা বাদাম পকেটে পুরে দিলুম। দোকানদারও রথ দেখতে ব্যস্ত। এরপর কি বিট নুন চাওয়া যায়!'

আশু মৃদু ভর্ৎসনা করার ভঙ্গিতে বলল, ‘তোর এই ছিঁচকে স্বভাবটা ছাড় তো। আমরা চোর হতে পারি তাই বলে বাদাম, নুন, কলা এইসব চুরি করব। আমাদের একটা প্রেস্টিজ নেই।'

বিশু একবার আশুর দিকে তাকিয়ে মুখ সরিয়ে নিতে নিতে বলে, ‘খুব তো প্রেস্টিজ দেখাচ্ছ অথচ আমার আনা বাদামের বেশির ভাগটাই তুমি খেয়েছ।'

আশু একটু হাসল। তারপর বিশুর দিকে তাকিয়ে বলল, 'তুই তো খাওয়ার আগেই পকেটে বাদাম পুরে রেখেছিস।'

বিশু বলল, ‘সে তো মোটে দুটো। আর কেন রেখেছি জানো?’

আশু মুখে কোনও প্রশ্ন করে না, শুধু চোখের ভঙ্গি করে জানতে চায়, কেন?

বিশু বলে, ‘জীবনে যতবার বাদাম খেয়েছি প্রতিবারই শেষ বাদামটা আমার ভাগ্যে পচা পড়েছে। মুখের স্বাদটাই বিশ্রী হয়ে যায়। রাস্তা থেকে কেনা ঝালমুড়ির মতো। একেবারে শেষটুকু খাওয়ার সময় মুখে এমন একটা লঙ্কার কুচি পড়বে যে ঝালে মুখ জ্বলে যাবে।'

আশু মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, 'ঝালমুড়ির বেলায় আমারও কয়েকবার ওইরকম হয়েছে।' কথা শেষ করে আশু কয়েক মুহূর্ত চুপ করে বসে রইল। তারপর একেবারে অন্যরকম গলায় বিশুকে জিজ্ঞেস করল, ‘হ্যাঁ রে, রথের মেলা খুব জমেছে তাই না?’

বিশু এবার পকেট থেকে বাদাম বের করে একটা আশুর দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল, ‘এটা কি আবার জিজ্ঞেস করার মতো একটা কথা হল। মেলা ফি বছরই ভাল জমে। এ বছরও জমেছে।'

আশু কোনও উত্তর দিল না। বিশু দেখল, আশু যেন খুব দূরের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবছে। চোখের দৃষ্টি কেমন যেন অন্যরকম। বিশু ইচ্ছে করেই একটু কাশল। আশুর মধ্যে কোনও পরিবর্তন দেখা গেল না। আশুর যে কেন মাঝেমধ্যে এরকম হয় বিশু সেটা জানে না। কিন্তু দু’জন চেনা মানুষ, মানিকজোড়ের মতো যারা বন্ধু, তারা দু’জন কি মুখোমুখি চুপ মেরে বসে থাকতে পারে। বিশু হাত বাড়িয়ে আশুর গায়ে একটা খোঁচা দিতে যাচ্ছিল তখনই সেই অন্যরকম গলায় আশু বলে উঠল, 'জানিস, রথের মেলা এলে আমার মাকে খুব মনে পড়ে। আবার খুব বেশি করে মনে পড়ে পুজোর সময়। এত বছর পার হয়ে গেল, অথচ মাকে কিছুতেই ভুলতে পারলুম না।'

বিশু এবার গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল। সামনেই একটা দোমড়ানো টিনের কৌটো পড়ে ছিল। পা দিয়ে সেটাকে জোরে শট করে বলল, ‘এসব বালাই আমার নেই। জন্মাবার পর নর্দমার ধারে পড়েছিলুম। ওখানে শুয়ে শুয়েই নাকি বৃষ্টি ভিজছিলুম। কান্না শুনে রিকশাওলা তুলে নিয়ে যায়।'

আশুও উঠে দাঁড়ায়। বিশুর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘জানি। সব তো তোর মুখেই শুনেছি। এখন চল, দস্তিদারবাবুর কাছে যাই। কাজকর্মের কী ব্যবস্থা আছে দেখি।'

বিশু আশুর পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলে, ‘বাবুকে এবার বল তো, রেগুলার একটা কাজকম্ম দিতে। এই যে হপ্তা হপ্তা বসে থাকা, এ আর সহ্য হয় না। আমরা তো অনেকরকম কাজ জানি।'

আশু বলল, ‘অনেকদিন থেকে আমিও এইরকম ভাবছি। এবার কথাটা বলতেই হবে।' বিশু একটু অসহিষ্ণু গলায় বলল, ‘এবার এবার করে অনেকবারই কিন্তু বলা হয়নি। আজ কিন্তু বলতেই হবে।' .

আশু বলল, ‘আর তো না বলে উপায় নেই। চল, কথাটা আজ পেড়েই ফেলা যাক।' দোহাটার মাঠে বসে যেমন যেমন ভেবেছিল, কলকাতার খিদিরপুরে এসে দস্তিদারবাবুর সামনে তত সহজে কথাটা বলা গেল না। রাজীব দস্তিদারের চেহারাটা নিপাট ভালমানুষের মতো। দেখতে তেমনই মনে হয়। কিন্তু এই ভালমানুষের আড়ালে একটা কালো মানুষ যে আছে সেটা আশু-বিশুর চাইতে কেউ ভাল জানে না। এমনকী, এখানকার পুলিশও না। আশু-বিশুকে দেখে দস্তিদার বলল, ‘এই যে মানিকজোড় ! আসতে এত দেরি হল কেন?’

আশু উত্তর দেওয়ার আগেই বিশু ফস করে বলে উঠল, 'আজ রথ না। পথে পথে রথ বেরিয়েছে, মেলা বসেছে। আসতে তো দেরি হবেই।'

আশু বলল, ‘কাজের কথা বলুন স্যার! হাতে কাজকর্ম একদম নেই। টাকায় টান পড়েছে।'

দস্তিদার বলল, ‘পেটেও তো টান পড়েছে।'

আশু বলল, ‘টাকায় টান পড়লেই পেটে টান পড়ে— এ তো সোজা কথা।’

দস্তিদার নিজের পাইপ ধরিয়ে নিয়ে বলল, ‘তোমাদের যে এতদিন বসিয়ে রেখেছি তার একটা কারণ আছে। কারণটা তোমরা না জানলেও আমি জানি।'

বিশু প্রশ্ন করল, ‘যদি জানেন তাহলে আমাদের জানিয়ে দিন। আমরাও বুঝতে পারব।' দস্তিদার পাইপে টান দিয়ে বলল, ‘গাড়ি চুরির ব্যাপারে তোমরা তো বেশ রপ্ত হয়ে উঠেছিলে। হপ্তায় একটা করে গাড়িও তুলেছিলে। কিন্তু...’

বিশু প্রশ্ন করল, ‘কিন্তু বলার কী হল? ভালই তো তুলছিলাম দস্তিদার বলল, ‘মাথায় গোবর পোরা তাই ‘কিন্তু’ বলার কারণটা বুঝতে পারলে না। শেষে যে 'মারুতি ভ্যানটা সল্টলেকের একটা বাড়ির সামনে থেকে তুললে সেই গাড়িটা কার জানো? একজন মন্ত্রীর ভায়রার। ফলে তোলপাড় হতে আরম্ভ হল। পুলিশ আরও সতর্ক হয়ে গেল। তাই তোমাদের বাঁচাতে কিছুদিন চুপচাপ বসে থাকতে হল। এরকম বোকামি কোরো না।'

আশু আর বিশু পরস্পরের দিকে একবার তাকাল। তারপর আশু বলল, ‘গাড়ির গায়ে তো কিছু লেখা থাকে না। গাছের তলায় অন্ধকারে গাড়ি দাঁড়িয়ে। চারপাশে কেউ নেই। বাইরে বৃষ্টি। গাড়ি দেখেছি, সঙ্গে সঙ্গে আমাদের হাতের কৌশলে দরজা খুলে গাড়ি চালিয়ে সোজা আপনার গ্যারাজে। আধঘণ্টার মধ্যেই গাড়ির চেহারা বদলে দিয়েছে আপনার মিস্ত্রিরা।’

বিশু বলল, ‘ঠিক তাই। আমরা কী করে বুঝব, কোন গাড়ি মন্ত্রীর ভায়রার কিংবা শ্বশুরের।'

দস্তিদার পাইপে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, ‘সে আর তোমরা কী বুঝবে। আপাতত কিছুদিন গাড়ি চুরির ব্যাপারটা বন্ধ রাখতে হবে। এত গাড়ি চুরি হচ্ছে বলে পুলিশ চোর ধরার জন্য আলাদা স্কোয়াড করেছে।

বিশু বলল, ‘তাহলে অটো চুরি করি কিংবা ঘোড়ার গাড়ি। আমি হলপ করে বলতে পারি, কোনও মন্ত্রীর ভায়রা বা শ্বশুরের অটো কিংবা ঘোড়ার গাড়ি নেই। ওটাই সেফ!’

দস্তিদার একটা ধমক দিয়ে বলল, “ওসব নিয়ে আমি কী করব। ওইজন্যেই বলি, তোমাদের মাথায় গোবর পোরা।'

আশু বলল, ‘শুধু শুধু আমাদের মাথার দোষ দিয়ে লাভ নেই। আপনার মতো পাকা মাথা হলে নিজে হাতে চুরি করতে হত না। লোক রেখে চুরি করাতাম।'

বিশু বলল, ‘রেলগাড়ি তো চুরি করতে পারব না। তাও পারি যদি লাইন বসিয়ে দেন।' দস্তিদার পাইপ মুখ থেকে নামিয়ে আবার ধমক দিয়ে বলল, ‘ইয়ারকি কোরো না। তোমাদের লাইনটা একটু চেঞ্জ করতে হবে।'

আশু প্রশ্ন করল, ‘কীরকম?’

দস্তিদার বলল, ‘আপাতত গাড়ি চুরি বন্ধ। অন্য একটা প্ল্যান মাথায় এসেছে। প্ল্যানটা আমি সাজাচ্ছি। সাজানো হয়ে গেলে তোমাদের বুঝিয়ে দেব। এই কাজটায় রিস্ক আছে আবার প্রচুর টাকাও আছে।'

বিশু বলল, ‘স্যার, আপনার প্ল্যান সাজাতে সাজাতে আমরা দু'জন তো খাটে উঠে ঘাটে চলে যাব।'

দস্তিদার আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল, 'না না খুব দেরি হবে না। বড়জোর দিন দশেক। অনেক খোঁজখবর নিতে হবে তো।'

বিশু এবার আশুর দিকে তাকাল। ওর বাঁদিকে পাশের চেয়ারেই আশু বসে। বাঁ হাত দিয়ে আশুকে একটা খোঁচা মেরে বলল, 'আমাদের স্যারকে সেই কথাটা বল না। যেটা আজকে বলব বলে আমরা আলোচনা করলুম।'

আশু বলল, “হ্যাঁ স্যার, আমাদের একটা কথা আছে। এটাকে আবেদনও বলতে পারেন।' নিভে যাওয়া পাইপটাকে আবার জ্বালাতে যাচ্ছিল দস্তিদার। নিচু করা মুখ;থেকে কেবল চোখ দুটি ঈষৎ ওপরে তুলে বলল, ‘কী কথা?

আশু’ বলল, ‘আমাদের রেগুলার রোজগারের কিছু একটা ব্যবস্থা হয় না। আমরা তো গ্যারাজের সব কাজই জানি। আমরা না হয় আপনার গ্যারাজেই কাজ করব। মাসমাইনে দেবেন।'

দস্তিদার এবার রাগত গলায় বলল, ‘আমার অন্য কাজগুলো কে করবে? গ্যারাজের মিস্ত্রি পাওয়া কঠিন নয়। একটা গেলে দুটো আসবে। কিন্তু অন্য কাজ তো সবাইকে দিয়ে হবে না।'

আশু এবার বিশুর দিকে তাকাল। বিশু ভেতরে ভেতরে বেশ উত্তেজিত। সে বলল, ‘তাহলে আমাদের একটা হপ্তা সিস্টেম করুন। হাত খালি থাকলে সব গোলমাল হয়ে যায়।' দস্তিদার গোটাচারেক দেশলাই কাঠি খরচ করে পাইপটা ধরিয়ে নিয়ে বলল, 'টাকা

রোজগার করা কঠিন কিন্তু খরচ করা সহজ। তোমরা বুঝেসুঝে খরচ করো।'

আশু অভিমানের গলায় বলল, ‘সেই কবে এক হাজার টাকা দিয়েছিলেন। সে টাকা কি এখনও ঘরে বসে ডিম পাড়ছে।'

আশুর এই কথাটা বিশুর খুব পছন্দ হল। বিশু বলল, ‘স্যার, বেশিদিন কাজ ছাড়া বসে থাকলে ডিফল্টার হয়ে যাব।'

দস্তিদার জিজ্ঞেস করল, 'কী হয়ে যাবে?’

বিশু বলল, ‘ওই যে বেশি স্কুলকামাই করলে ছাত্ররা যা হয়। আমরা কাজ করতে না পারলে কাজ ভুলে যাব। প্র্যাকটিস চাই তো।'

দস্তিদার কড়া গলায় বলল, ‘বলেইছি তো, এখন তিন-চার মাস গাড়ি চুরি বন্ধ রাখতে হবে। পুলিশ গাড়ির ওপর খুব নজর রাখছে।'

বিশু বলল, ‘আমাদের দোহাটার পথের ধারে দেদার গোরুর গাড়ি পড়ে থাকে। আপাতত ওই না হয় কয়েকখানা নিয়ে আসি। গাড়ির চাকা বেচে পয়সা, আবার বদল বেচেও পয়সা।'

রাজীব দস্তিদার এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে আশু-বিশুও। বিরক্ত মুখে রাজীব দস্তিদার বলল, ‘এখন ঠাট্টা ইয়ারকি করার সময় নয়। মনে রেখো, সামনে বড় কাজ আসছে। বিগ অপারেশন।'

বিশু বলল, ‘কার অসুখ করল? কীসের অপারেশন হবে?’

আশু-বিশুর হাতে একটা চিমটি কেটে ওকে থামাল। আশু বলল, ‘আমরা তৈরি আছি স্যার। কিন্তু কিছু টাকাকড়ি দরকার। আজ পেলে ভাল হয়।'

দস্তিদার এক মিনিট ভাবল। তারপর ডানদিকের ড্রয়ার খুলে কিছু টাকা বার করে টেবিলের ওপর রেখে বলল, ‘পুরো দু’ হাজার আছে। একমাসের মধ্যে আর টাকা চাইতে পারবে না।

আশু টাকাগুলো নিয়ে পকেটে রাখছিল। বিশু বলল, 'স্যার, জ্ঞান হওয়া অবধি শুনে আসছি মরা হাতি লাখ টাকা। কিন্তু জ্যান্ত হাতির দামটা কেউ বলে না। জ্যান্ত হাতির দাম কত হতে পারে?

দস্তিদার বিশুর চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘কেন, তুমি কি হাতি কিনবে নাকি?? বিশু বেশ বোকা বোকা মুখ করে বলল, 'আমি কোত্থেকে কিনব! আমাদের দোহাটাতে একমাস ধরে বিরাট রথের মেলা হয়। সেখানে একটা সার্কাসের দল এসেছে। তিনটে হাতি এসেছে। দুটো হাতি ফুটবল খেলা দেখায়, তৃতীয়টা নাকি রেফারি। হাতির ফুটবল, তাও দু’জনে, ওখানে তো ফাউল, অফসাইড এসব নেই। তাই রেফারিরও দরকার নেই। ওই তিন নম্বর হাতিটাকে ছিনতাই করে আপনার গ্যারাজে ঢুকিয়ে দিলে অনেক টাকা পাওয়া যাবে। শুধু হাতিটা আনব কীসে তার একটা ব্যবস্থা দরকার।'

দস্তিদার বিশুর চোখের দিকে তীক্ষ্ণভাবে তাকাল। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বলল, ‘এগুলো কি তুমি,সত্যি মন থেকে বলো না কি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করো।'

বিশু জিভ কেটে দু’ কানে হাত দিয়ে বলল, “ছিঃ ছিঃ স্যার। আপনার সঙ্গে ঠাট্টা। এতবড় বুকের পাটা আমার আছে! তবে কিনা আপনি সারাদিন নানা প্ল্যান করেন, আমি ভাবলাম, আমরাও দু’–একটা প্ল্যান আপনাকে দিই। যদি আপনার মনে ধরে।'

দস্তিদার বলল, ‘আমাকে প্ল্যান দিতে হবে না। আমার প্ল্যান মতো তোমরা কাজ করবে।

দু’দিন অন্তর যোগাযোগ করবে। কিন্তু এখানে নয়, গ্যারাজে। এখন আসতে পারো।' আসতে পারো বলার পর দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। তাই আশু বিশু বেরিয়ে রাস্তায় এল।

বাইরে তখন সন্ধে বেড়ে গিয়ে রাত ঘন হচ্ছে। কিছুটা পথ হেঁটে আসার পর ওরা বুঝল কাছেই কোথাও রথের মেলা বসেছে। পাঁপড় ভাজার টাটকা গন্ধ আসছে। একটা গলির মধ্যে কয়েকটা বাচ্চা ছেলে ছোট্ট একটা রথ টানছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মধ্যে দু’-একজন কাঁসি বাজাচ্ছে। আশু হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে দৃশ্যটা যেন দু’চোখ দিয়ে গিলতে লাগল। ছোটদের খেলনা রথটা বড় রাস্তা পর্যন্ত এলই না। বড় রাস্তার মুখে এসেই আবার ঘুরে গিয়ে গলি দিয়ে চলতে আরম্ভ করল।

বিশুও ছোটদের খেলনা রথটা দেখল কিন্তু আশুর মতো অমন করে নয়। তার নাকে পাঁপড় ভাজার গন্ধ লাগছে। বিশু বলল, ‘আশুদা, পাঁপড় ভাজা খাবে? রথের দিন সব মানুষই খায়।'

আশু অস্ফুটে বলল, ‘আমরা কি আর মানুষ আছি?

বিশু বলল, ‘কেন নেই? দিব্যি মানুষ আছি। সব মানুষ একরকম হয় না। মানুষ তো কাক নয় যে, সবাই দেখতে একরকম হবে। কাকেরা সব একরকম।'

আশু বলে, ‘আমাদের চোখে একইরকম, কিন্তু ওদের মায়েদের চোখে তো একরকম নয়।' বিশু কিছুটা ক্ষোভ আর অনেকটা বেপরোয়া গলায় বলে ওঠে, 'আমার মা-বাবা কিচ্ছু নেই। জন্মাবার পর নর্দমার ধারে পড়ে ছিলুম। যে তুলে নিয়ে গিয়েছিল সেই রিকশাওলা বাপের মুখটা মনে আছে। তার বউ, যাকে মা বলতুম তার মুখটা ভুলিনি। বয়স বেড়ে যাওয়ার পর রিকশাওলা বাপ আর রিকশা টানতে পারত না, ঘরে বসে কাশর্ত। বেদম কাশি। কাশির সঙ্গে ছিটে ছিটে রক্ত। আমার তখন দশ বছর বয়স। ক্লাস থ্রি-তে পড়ি। পরীক্ষার টাকা দিতে পারিনি, স্কুলের বেতন বাকি। বসে পরীক্ষা দেওয়া হল না। তুই বল না, ওই বয়সে আমি রিকশা চালাতে পারি। তাই রিকশাটা বেচে দিলাম। ওই ঝরঝরে রিকশা কেউ কিনতেই চায় না। সামান্য টাকা পাওয়া গেল। ওতে ক’দিন চলে।'

বিশু থেমে গেল। শেষের দিকে ওর গলার স্বর ভারী হয়ে গেল। আশু টের পেল, একটা গোপন অভিমান কান্না হয়ে বিশুর গলা বুজিয়ে দিতে চাইছে। আশু পরিবেশটাকে হালকা করার জন্য বলল, ‘চল পাঁপড় ভাজা খাই’

দু’জনে রাস্তার দু'ধার জুড়ে বসা মেলার মধ্যে ঢুকে গেল। নানারকম দোকান। খাবার দোকানের মতো কাঠের বেলুন-চাকি, বেতের মোড়া, স্টিলের বাসন, রকমারি পুতুল, কাপ-ডিশ, ঘর সাজানোর নানা টুকিটাকি আর তারই পাশে নানা ধরনের ফুলের আর ফলের গাছের চারা বিক্রির দোকান। দোকানের কাঠের বেঞ্চিতে বসে পাঁপড় ভাজা আর জিলিপি খেতে খেতে বিশু বলল, ‘আশুদা, একটা গাছের চারা কিনবে?’

আশু বলল, ‘কী হবে কিনে? আমরা কি অন্য দশজনের মতো সংসারী লোক। দোহাটার ওইটুকু বাড়িতে থাকি। কে দেখবে ওইসব গাছগাছালি!’

বিশু বলল, ‘তবু তো ওটা তোমার পৈতৃক ভিটে। ওর একটা ইজ্জত আছে তো। যতটুকু দেখবার আমাদের দিদিমা দেখবে।'

গাছের দোকানে আশুকে প্রায় জোর করেই নিয়ে এল বিশু। বিশু বলল, ‘ফুলগাছ কিনব। তোমার কী পছন্দ?

আশু উত্তর দেয়, ‘তুই তো টেনে আনলি। তোর পছন্দটা আগে শুনি।' বিশু বলল, ‘বকুল ফুল আমার পছন্দ। তোমার?’

আশু বলল, ‘আমার সব ফুলই ভাল লাগে। তবে আজ যদি পাই তাহলে শিউলি ফুলের গাছ কিনব। গাছে ফুল ফুটলেই কেমন যেন পুজোর গন্ধ ছোটে। সে বড় আনন্দের গন্ধ।' বিশু বলল, “চল। কপাল ভাল থাকলে পছন্দের গাছ পাবই। রথের দিন, তাই ‘জয় জগন্নাথ’ বলে খুঁজতে আরম্ভ করি।'

দু’জনে ফুলের গাছ নিয়ে দোহাটার বাড়িতে ঢুকল রাত্তিরবেলা। আকাশে মেঘ জমে আছে। গাছগাছালির পাতা নড়ছে না। চারপাশে একটা গুমোট ভাব। ফুলের গাছ দুটো বারান্দায় পাতা তক্তাপোশের ওপর রেখে বিশু হাঁক দিল, ‘ও দিদা, ঘুমিয়ে পড়লে নাকি!’

ঘরের ভেতর থেকে খ্যানখ্যানে গলায় উত্তর এল, ‘তোদের জন্যি কি ঘুমোবার উপায় আছে।'

বিশু ডাকল, ‘বাইরে এসো। দেখো কী এনেছি।'

আশু ততক্ষণে বারান্দায় উঠে গিয়ে সুইচ টিপে বারান্দার আলো জ্বেলে দিয়েছে। ঘরের দরজা খুলে দিদা বেরিয়ে এলেন। সত্তর ছুঁই-ছুঁই বয়স তবুও শরীরটা মনে হয় বয়সের তুলনায় শক্ত আছে। বারান্দায় এসে বললেন, ‘কী এনেছিস?’

বিশু গাছ-দুটো দেখিয়ে বলল, ‘দেখো, দুটো ফুলগাছের চারা। একটা বকুল গাছের, অন্যটা শিউলির।'

দিদা হা-হুতাশের গলায় বলে ওঠেন, ‘আঃ মরণ! আমি ভাবলাম, কী-না-কী মণ্ডা-মেঠাই এনেচিস। একজোড়া ফুলগাছ দিয়ে রাত্তিরবেলা কী করব।'

আশু গায়ের জামা খুলে গামছা দিয়ে গলা আর ঘাড়ের ঘাম মুছতে মুছতে বলল, ‘এটা বাড়ির উঠোনে পুঁতে দাও। তুমি দেখো ভাল গাছ হবে। গাছভর্তি ফুল এলে দেখবে কেমন মিঠে গন্ধ ছাড়ে।'

দিদা এবার মুখ ঝামটা দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে ওঠেন, 'কবে সীতেহরণ হবে, তবে রাম রাজা হবে। ওই গাছে ফুল ফোটা পর্যন্ত আমি বেঁচে থাকব ভেবেছিস।'

আশু বলে, 'আমরা তোমাকে মরতে দিলে তবে তো মরবে। নো মরণ-ফরন।'

আশু-বিশুর মুখে এসব কথা শুনতে দিদার ভালই লাগে। বুকের মধ্যে কোথায় যেন একটু টান লাগে। সে বড় সুখের টান। তাঁর কেবলই মনে হয় ঘোলা জলের মধ্যে যেন সবুজ ভাদা আস্তে আস্তে মাথাচাড়া দিয়ে জেগে উঠছে। দিদার মধ্যে তিরতির করে একটা আহ্লাদ মেশানো আবেগ কাঁপতে থাকে। দিদা আহ্লাদের গলাতেই বলে, ‘তোদের কেমন আক্কেল র‍্যা! আজ রথের দিন দিদার জন্যে হাতে করে এট্টু কিছু আনলি না। নিদেনপক্ষে দুটো ফুলুরিও তো আনতে পারতি।'

আশু-বিশু দু’জনেই একসঙ্গে জিভ কাটে। বিশু বলে, ‘বড্ড ভুল হয়ে গেছে। এখন কী হবে আশুদা।'

আশু দড়ির ওপর থেকে গেঞ্জিটা টেনে নিয়ে গায়ে দিতে দিতে বলে, ‘কুছ পরোয়া নেই। ঘরের ভেতর থেকে সাইকেলটা বের কর। বাজারে গেলে অনেক কিছু পাব। চৌরাস্তা পর্যন্ত যেতে পারলে তো কথাই নেই। রথের মেলা হচ্ছে।'

দিদা আঁতকে উঠে বলে, ‘দেখো কাণ্ড, বাজার তো অনেকদূর। যেতে আসতে বিস্তর সময়।'

বিশু সাইকেলটা ঘরের ভেতর থেকে টেনে বের করতে করতে বলে, ‘কোনও চিন্তা নেই। এটা হচ্ছে আমাদের উড়োজাহাজ। যাব আর আসব।'

দিদা বলেন, ‘তোরা দু’জনে না গিয়ে একজন গেলেই তো পারিস। সব কাজ কি দু’জনে করতে হবে?’

দিদার গলায় মৃদু ভর্ৎসনা। সাইকেলের সিটে একটা থাপ্পড় মেরে যাত্রাদলের সখীর মতো বিশু গেয়ে ওঠে, ‘বুঝলে দিদা, আমাদের মরণ-বাঁচন, নাচন-কেঁাদন সবই তো একসঙ্গে। আমরা চলব সাথে, খেলব সাথে, খাবার খাব হাতে হাতে। পটল তুলে চিতেয় উঠে জ্বলবও একসাথে।'

গান গাইতে গাইতেই আশুকে পেছনে বসিয়ে বিশু সাইকেল চালিয়ে উধাও হয়ে যায়। জমে আসা অন্ধকার উঠোনের দিকে তাকিয়ে দিদার চোখ ছলছল করে ওঠে। ভেজা চোখের পাতায় অতীতের ছেঁড়া ছেঁড়া ছবিগুলো চোখের মধ্যে ভাসতে ভাসতে দিব্যি জোড়া লেগে যায়। সে কবে কোনকালে বিয়ে হয়েছিল আজ আর মনে পড়ে না। ছিটেফোঁটা যা ছিল অদৃষ্টে তাও রইল না। রেলে হকারি করতে গিয়ে পা পিছলে একেবারে চাকার তলায় পড়ে গিয়ে দেহখানা দু’ টুকরো হয়ে গেল। মাথাটা এমনভাবে থেঁতলে গিয়েছিল যে, মানুষটারে আর চেনাই যায় না। লাইনের এপাশে-ওপাশে ছড়িয়ে ছিল নানা রঙের লজেন্স। রোজগারের সামগ্রী বড় অবহেলায় পড়ে আছে চারদিকে।

নতুন জায়গায় কোনও চেনাশোনা লোক নেই। উপদেশ দিতে লোক আসে। কিন্তু লোকের বাড়িতে একটা কাজ কেউ জুটিয়ে দিতে পারে না। অনাহারে, অর্ধাহারে আর অবহেলায় দিন কাটছিল। রাস্তায় বসে শাকপাতা বিক্রি করে দু’বেলা পেটের ভাত জোটে না। শেষে বাধ্য হয়ে ভিক্ষের পথ ধরতে হয়েছিল। পথটা চিনিয়েছিল একজন। সেও তারই মতো। সকালে শাকপাতা বিক্রি করত আর সন্ধ্যার পর শ্যামসুন্দরের মন্দিরের কাছে গিয়ে ভিক্ষে করত। এই ভিক্ষে করতে গিয়ে আশু-বিশুর সঙ্গে পরিচয়। সেদিনটা ছিল রাসপূর্ণিমা। মন্দিরে ভক্তদের বেজায় ভিড়। এরই মধ্যে রটে গেল কোনও এক বড়লোকের বেটির কানের দুল হারিয়েছে। হইহই কাণ্ড। সবাই মিলে ঘিরে ধরল ভিখিরিদের। মন্দিরে ভিড় সামলাতে পুলিশ ছিল। সেই পুলিশও লাঠি হাতে এসে গেছে জনাকয়েক ভিখিরিকে জেরা করতে। কেউ কেউ চিৎকার করে বলছে, ‘এসব ওদেরই কাজ। গত রবিবারও এমন কাণ্ড হয়েছে। রোজ তো পাঁচ-সাত জোড়া করে জুতো চুরি হচ্ছে।'

এই ভিখিরির দলে সেই অপেক্ষাকৃত নতুন। অতএব, সবার সন্দেহের দৃষ্টি তার দিকে। পুলিশ এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কী নাম?’

ভীত গলায় উত্তর এল, ‘হেমাঙ্গিনী।’

ভিড়ের মধ্য থেকে একজন টিপ্পনি কাটল। ‘বাবা, নামের তো বেশ বাহার আছে। তা জিনিসটা কোথায় লুকিয়েছিস?'

সেদিনের হেমাঙ্গিনী যত বলে, ‘আমি কিচ্ছু জানি না বাবু। পায়ে ধরে বলছি কিচ্ছু জানি না।'

পুলিশ তত রেগে গিয়ে পিঠে আর পায়ে লাঠি চালাতে থাকে। লাঠির আঘাতের চাইতেও বড় আঘাতটা তখন বুকে লাগছে। হাতের সামান্য কয়েকটা পয়সা লাঠির ঘায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। হেমাঙ্গিনীর মনে হচ্ছে পয়সা নয়, যেন নানারঙের কয়েকটা লজেন্স তার সামনে পড়ে। তাঁর দেহ-মন যেন টুকরো টুকরো হয়ে মাটিতে খসে পড়ছে। লাঠির আঘাত তাঁকে শরীরে কষ্ট দিলেও লোকের বিদ্রুপ তাঁর মনটাকে পুড়িয়ে দিচ্ছিল। হেমাঙ্গিনী আর সইতে পারলেন না। জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে।

জ্ঞান হওয়ার পর হেমাঙ্গিনী দেখেছিলেন আশু তাঁর মাথাটা কোলে নিয়ে বসে। বিশু তাঁর চোখে-মুখে জলের ছিটে দিচ্ছে। চারপাশে জনাকয়েক লোক। অনেকক্ষণ পরে সব শুনে আশু বলেছিল, ‘ভালই হল। আমাদের কেউ নেই, তোমারও কেউ নেই। তুমি আমাদের সঙ্গে আমাদের বাড়িতে চলো।'

দিদা ডাকটা বিশুই ডেকেছিল প্রথমে। বলেছিল, ‘আশুদা দিদাকে নিয়ে যেতে হলে একটা রিকশা চাই। আমি রিকশা ডেকে আনছি।'

রিকশা করে স্টেশনে তারপর ট্রেন থেকে নেমে আবার রিকশায় চেপে সেই কতদিন আগে দোহাটায় আসা। বাড়িটার চারপাশে বুনো জঙ্গল। পেছনদিকে মস্তবড় খাল। খালের ওপারে পরপর দুটো ইটভাটা। এদিকটা বড় নির্জন আর ফাঁকা ফাঁকা। মাইলখানেকের আগে এদিকে কোনও বাড়ি ছিল না। এখন তবু দু’-চারখানা টালির ঘর হয়েছে। খালপারের জমিতে নাকি সরকারি ফ্যাক্টরি হবে। সেই সুবাদে এদিকের জমির দাম হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু আশুর ভিটের চারপাশে কোনও পরিবর্তন এখনও হয়নি। কোমর অবধি বুনো জঙ্গলের মধ্যে পায়েচলা পথ। সেই পথের শেষে পোড়ো বাড়ির মতো একখানা টালির ঘর। বাইরে থেকে বোঝা দায় যে, এখানে কোনও মানুষ বাস করে।

তবুও এই ছেলে দুটোই দিদার বড় আশ্রয়। ওরা সকালবেলা রুটি খেয়ে কাজে বেরিয়ে যায়। ফেরার কোনও ঠিক-ঠিকানা নেই। কখনও সন্ধের পর ফিরল তো পরপর দু’দিন ফিরে এল মাঝরাত্তিরে। মাঝেমধ্যে তো ফেরেই না। দিদা রেগে গিয়ে বলেন, ‘কী এমন রাজকাজ করিস যে, ফিরতে মাঝরাত্তির হয়। কোনও কোনও দিন তো রাতে ঘরেই ফিরিস না। এই জঙ্গলের ভূতুড়ে বাড়িতে থাকতে আমার বুঝি ভয় করে না!’

বকাবকি করলেও আশু কিংবা বিশু কেউই কোনও উত্তর দেয় না। রাগও করে না। কেবল মিটিমিটি হাসে আর দু'জন দু'জনের দিকে তাকিয়ে চোখে চোখে কথা কয়। ওরা দু’জনেই দিদার কাছে বড় ভাল ছেলে, তবুও দিদা সবসময় ওদের বুঝতে পারে না। এক-একদিন জিজ্ঞেস করেন, হ্যাঁ রে, তোদের কাজটা কী? আপিসে গিয়ে কী করতে হয় তোদের?’

বিশু চোখের ইশারায় আশুকে খুঁচিয়ে দিয়ে বলে, ‘আশুদা, দিদাকে এবার আমাদের কাজের বেত্তান্ত বল।'

আশু একটু চুপ করে থেকে উত্তর দেয়, ‘গ্যারাজ বোঝো? গ্যারাজ?’

দিদা একটু অবাক গলায় জিজ্ঞেস করেন, ‘সেটা আবার কী জিনিস?’

আশু বুঝিয়ে বলার মতো করে বলে, ‘মানুষের রোগ হলে মানুষ যেমন হাসপাতালে যায় রোগ সারাতে, ঠিক তেমনই গাড়ির কোনও গণ্ডগোল হলে তাকে সারাবার জন্য গ্যারাজে নিয়ে যেতে হয়।'

দিদা চোখ কপালে তুলে জানতে চান, ‘ও রে বাবা, গাড়িরও আবার হাসপাতাল আছে?’ বিশু বলে, ‘আছে বই কী!’

ওরা যেদিন সন্ধের পর পর ফিরে আসে সেইসব দিনে বারান্দায় বসে বিশু গান গায় আর আশু মাটির হাঁড়ি বাজিয়ে তাল দেয়। বড় মিষ্টি গলা বিশুর। কতরকমের গান জানে ছেলেটা। ওদের কথা ভাবতে ভাবতেই এক-একদিন রাত্রে ঘুমিয়ে পড়ে দিদা। অনেক রাত্রে এসে

দরজায় টোকা দেয় দু’জনে। ফিসফিস করে বলে, ‘দিদা, দিদা জেগে আছ?’

আজও খাবার কিনে ঘণ্টাখানেক বাদে ওরা ফিরে এল। বারান্দায় পা দিয়ে বিশু বলল, ‘দিদা, আজ আর তোমাকে কষ্ট করে উনুন ধরিয়ে রান্না করতে হবে না। আমরা দোকান থেকে খাবার কিনে এনেছি। তুমি খালি থালায় বেড়ে দেবে।'

এইভাবেই দিদাকে নিয়ে আশু-বিশুর দিন কেটে যায়। গোড়ার দিকে খুব খাবার কষ্ট ছিল। বছর কয়েক হল খাবার কষ্টটা গেছে। দিদা ভাবে গ্যারাজের কাজে তাহলে মাইনেপত্তর ভালই পায়। দিদাকে ইচ্ছে করেই আশু-বিশু জানায়নি। কিন্তু এমন জিনিস কি বেশিদিন গোপন থাকে। দিদার কাছেও গোপন রইল না। রথযাত্রার দিনবিশেক পরেই ব্যাপারটা ঘটল। ব্যাপারটা কেমনভাবে ঘটল সেটাই এখন বলি।

উলটোরথের দিন গ্যারাজে গিয়ে শুনল, স্যার ডাকছেন। স্যার মানে রাজীব দস্তিদার। গ্যারাজের দোতলায় ঠান্ডা মেশিন বসানো ঘর। আশু-বিশু ঘরে ঢুকতেই রাজীব দস্তিদার ড্রয়ার থেকে রোল করা একটা কাগজ বের করে টেবিলের ওপর মেলে ধরল। বাড়ি তৈরির নকশা যেমন রোল করে গোটানো থাকে এই কাগজটাও সেইরকম। রাজীব বলল, ‘এই নকশাটা ভাল করে বুঝে নাও। এটা রাহুল সিংহের বাড়ি। বাস রাস্তা থেকে এই রাস্তা ধরে দু’ মিনিট হাঁটলেই বাড়ির গেট। সবাই রাহুল সিংহকে সিনহা সাহেব বলে ডাকে। বিরাট ব্যাবসা। টাকাকড়ি ভালই আছে। তার ছেলের নাম অয়ন। ছ’ বছরের ছেলে। নিজেদের গাড়িতে স্কুলে যায়। ছুটির পর ড্রাইভার গিয়ে নিয়ে আসে। এই দেখো গাড়িটার ছবি। গাড়ির নাম্বারও এখানে দেওয়া আছে।'

বিশু বলল, ‘গাড়িটা স্কুলের সামনে থেকে তুলে আনতে হবে তো?’

দস্তিদার গলায় চাপা গর্জন করে বলে, ‘আবার বলে গাড়ি। বলেছি না গাড়ি তোলা আপাতত বন্ধ।'

আশু প্রশ্ন করে, ‘তবে কী তুলব?’

দস্তিদার উত্তর দেয়, ‘গাড়ি নয়, ছেলেটাকে তুলবে।'

বিশু ফস করে বলে ওঠে, ‘ধ্যাত, আপনি ঠাট্টা করছেন। ছেলে তুলে কী হবে। আমরা কি ছেলেধরা নাকি। আমরা গাড়িচোর, ছেলেচোর নই।'

দস্তিদার বলল, ‘এইজন্যই তো তোমাদের রথের দিন দু’ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়েছিলাম। কাজটা করে দিতে পারলে তোমরা দু'জনে কত পারে জানো?’

আশু বলে, ‘কত?’

দস্তিদার বলে, ‘আরও পঁচিশ হাজার টাকা। এত টাকা একসঙ্গে কখনও দেখেছ?’ আশু উত্তর দেয়, ‘তা দেখিনি ঠিকই। কিন্তু এ বড় ঝামেলার কাজ।'

বিশু চট করে গাড়ির দরজা খুলে ফেলে গাড়িতে স্টার্ট দেয়। বলে, ‘স্টিয়ারিং যার হাতে তার ইচ্ছেমতোই গাড়ি চলে। গাড়ি তো কথা বলে না। কিন্তু ছেলেটা তো চিৎকার করে লোক ডাকবে। ওর মুখ সেলাই করতে পারব না।'

দস্তিদার এবার নিজের পাইপ ধরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পাইপ ধরিয়ে নিয়ে বলল, 'সব ব্যবস্থা করা আছে। কাল থেকে গ্যারাজের পেছনে তোমাদের ট্রেনিং শুরু হবে। স্কুল আপাতত বন্ধ। তবুও স্কুলের সামনে একটু ঘোরাঘুরি করে জায়গাটা চিনে নিতে হবে। স্কুল থেকে কোন রাস্তা কোথায় গেছে, কোন গলি কোথায় গিয়ে মিশেছে তার একটা ম্যাপ তৈরি আছে। তবুও সরেজমিনে গিয়ে একবার দেখতে হবে। মনে রেখো কাল সকাল দশটা থেকে তোমাদের ট্রেনিং শুরু হবে।'

বিশু বলল, ‘স্যার, আমার দুটো কথা আছে।'

দস্তিদার পাইপের ধোঁয়া ছেড়ে বলল, 'কী' কথা?’

বিশু বলল, ‘চুরি করা গাড়ির ভোল বদলে বিক্রি হয়, নয়তো ভেতরের যন্ত্রপাতি বেচা যায়। কিন্তু ছেলেটাকে নিয়ে কী করবেন? দু'নম্বর কথা, ট্রেনিং পিরিয়ডে যাতায়াতের জন্য কিছু টাকা পাওয়া যাবে কি?’

দস্তিদার পাইপের ধোঁয়া ছেড়ে বলল, 'ছেলেটাকে কোনও গোপন জায়গায় আটকে রেখে ছেলের বাবার কাছে মুক্তিপণ চাওয়া হবে। ছেলের জন্য সিনহা সাহেব সেই টাকাটা দেবেন। তোমার দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব হল, ট্রেনিং পিরিয়ডে তোমরা দু'জনে রোজ পঞ্চাশ টাকা করে যাতায়াতের খরচ পাবে।'

আশু বলল, ‘মোটে পঞ্চাশ।

দস্তিদার রাগের গলায় বলল, 'তবে কি হাজার ভাবছ? ওই ঢের।'

আশু বলল, ‘আমাদের পেমেন্ট কবে হবে?’

দস্তিদার উত্তর দিল, ‘মুক্তিপণের টাকা পাওয়ার পর।'

বিশু নিজেই একটু ভেবে নিয়ে বলল, 'স্যার, ওই কচি ছেলেটার চাইতে ওর ধেড়ে বাপটাকেই যদি তুলে আনি তাহলে তো মুক্তিপণের অঙ্কটা অনেক বেশি হবে।' দস্তিদার বলল, ‘তা হবে না। সিনহা সাহেবকে তোলা খুব কঠিন।'

বিশু বলল, ‘ছেলের চাইতে বাপকে তোলা সহজ। বড়লোকেরা খুব ভোরে হাঁটতে বের হয়। ওই হাঁটাহাঁটি করতে গিয়েই তো আজকাল অনেকে লোপাট হচ্ছে। শুধু বলে দিন, কোন পার্কে সিন্‌হা সাহেব হাঁটেন। অপারেশনটা ভোরবেলাতেই হয়ে যাবে।'

আশু বলল, ‘না রে বিশু, অয়নকে তুলে এনে মুক্তিপণ চাইতে হবে তার বাবার কাছে। কিন্তু বাবাকে তুলে আনলে স্যার কার কাছে মুক্তিপণ চাইবে। সিনহা সাহেবের বাবা কি বেঁচে আছেন?’

দস্তিদার বলল, ‘না।'

আশু বলল, ‘তবেই বোঝো! মরা বাবা কি টাকা দিতে আসবে। আর এলেও সেই টাকা হাত পেতে কে নেবে। ও তো ভূতের টাকা।’

বিশু বলল, ‘তাহলে ছেলেকেই তুলতে হবে?

দস্তিদার বলল, ‘হ্যাঁ, আমার ওই ছেলেকেই চাই।'

বিশু কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, 'তাহলে তাই হবে। আমাদের কাছে বাপ-ব্যাটা দুই-ই সমান। টাটা সুমো না তুলে মারুতি কার তুলছি। তাহলে ট্রেনিং চালু হচ্ছে কবে থেকে?’ দস্তিদার উত্তর দিল, ‘কাল থেকে।'

আশু-বিশু দু’জনেই একটু উসখুস করতে করতে বলল, ‘স্যার, একটা কচি ছেলেকে তুলতে বড্ড খারাপ লাগবে। অন্য কিছু তোলা যায় না। এই যেমন ধরুন গোডাউন থেকে ফ্রিজ, গোয়াল থেকে গোরু, বেকারি থেকে পাউরুটি, টায়ারের দোকান থেকে টায়ার...’

দস্তিদার ধমকের সুরে বলল, 'রাবিশ! ওসব জিনিস দিয়ে কী হবে। একাজে একবার-দু’বার সাকসেসফুল হলে দেখবে দেদার টাকা। তখন এই কাজটার নেশা ধরে যাবে।'

বিশু বলল, “কিন্তু মাঝপথে ধরা পড়লে গণধোলাইয়ে সোজা মর্গে যেতে হবে।' দস্তিদার বলল, ‘সেইজন্যই তো প্ল্যানমাফিক কাজ করতে হবে। খুব সতর্ক থাকতে হবে।'

আশু বলল, ‘স্যার ট্রেনিং পিরিয়ডে টাকাটা আর একটু বাড়ালে ট্রেনিংটা ভাল জমত।' দস্তিদার বলল, ‘সবসময় এত টাকা টাকা কোরো না। দেখছ না দেশের অবস্থা। নিজেকে একটু মানিয়ে নিতে শেখো।'

আশু-বিশু উঠতে উঠতে বলল, ‘দেশের অবস্থা বেজায় সঙ্গীন। কিন্তু যে ধান্দায় জুড়ে আছি তাতে দেশকে নিয়ে ভাবব কখন।'

দস্তিদার উঠে দাঁড়াল। ওদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বুঝতেই পারছ, ব্যাপারটা গোপন। কাক-পক্ষীও টের পায় না যেন।

তারপরই চোখের ভাষা কঠোর করে বলল, ‘কেউ জানতে পারলে সেটা তোমাদের পক্ষে খুব ক্ষতিকর হবে। মৃত্যুও অস্বাভাবিক নয়।'

আশু নির্বিকারভাবে বলল, ‘সেটাই বরং স্বাভাবিক। এসব আমাদের জানা আছে স্যার।' আশু-বিশু বেরিয়ে এল। কলকাতার রাস্তায় তখন বৃষ্টি নেমেছে। মুষলধারার বৃষ্টিতে সামনের দিকগুলো ধোঁয়া ধোঁয়া। বিশু বলল, ‘আশুদা, যাবে কেমন করে? ট্রেন যদি বৃষ্টিতে বন্ধ হয়ে যায়।'

আশু একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘একটা কিছু পেলে উঠে পড়ব। স্টেশনে গিয়ে দেখা যাবে ট্রেন আছে কি নেই।'

প্রবল বৃষ্টির মধ্যেই দু’জনে দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে ওদিকের ফুটপাথে গিয়ে বাসের জন্য দাঁড়াল।

পাঁচদিনের ট্রেনিং শেষ হওয়ার পর আশু-বিশু গেল স্কুলের সামনে। স্কুলের পোশাক পরা নানা বয়সি ছেলেদের দেখল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। অয়নের যে ছবি স্যার দিয়েছিল, তেমন চেহারার কোনও ছেলেকে গত দু'দিনে দেখতে পায়নি আশু-বিশুরা। তালতলার একটা গ্যারাজের ঠিকানা দেওয়া ছিল। ওটা দস্তিদারের বেনামের গ্যারাজ। চুরি করা গাড়ি এক-দু’বার এখানেও আনা হয়েছে। স্যার বলেছিল, কোনও দরকারে ওখান থেকে ফোন করতে পারো। আশু-বিশু ফোন করতে গেল। ফোন করবার আগে আশু বলল, ‘আমি নয়, তুই কথা বল।'

বিশু ফোন ধরে বলল, 'স্যার, বিশু স্পিকিং।'

ওদিক থেকে দস্তিদারের কণ্ঠ বলল, ‘খবর বলো।'

বিশু গলা খাটো করে বলল, ‘মেনি মেনি প্রবলেম স্যার। বিস্তর ঝামেলা অ্যান্ড ফ্যাচাং রানিং।'

আশু পাশ থেকে বলল, ‘বাংলায় বল না। তোর ইংরেজি স্যার বুঝতে পারবে না।' কিন্তু বিশুর বদ্ধমূল ধারণা, ফোন ধরে হ্যালো বলার পরই ইংরেজি বলতে হয়। এই ইংরেজি বলতে গিয়ে বিশু অনেক সমস্যা তৈরি করেছে। গাড়ি চুরির টাকা পাওয়ার পর পার্ক স্ট্রিটের একটা রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে উর্দি পরা বেয়ারাকে অর্ডার দিয়েছিল, টু প্লেট ইয়ং পাঁঠাকারি সঙ্গে মেনি মেনি হ্যান্ড রোটি অ্যান্ড...’ বেয়ারা অবাক চোখে জানতে চেয়েছিল ‘অ্যান্ড?’ বিশু নির্বিকারভাবে বলে গিয়েছিল, ‘অ্যান্ড চ্যাংড়ি হট বড়া।’ বেয়ারা ঢোক গিলে বলেছিল, 'স্যার উই হ্যাভ নো চ্যাংড়ি। আই কান্ট আন্ডারস্ট্যান্ড...।’ সঙ্গে সঙ্গে আশু বলেছিল, ‘প্রণ পকোড়া হবে?’ বেয়ারা বলেছিল, ‘হবে স্যার।' বেয়ারা চলে যেতেই বিশু বলেছিল ‘প্রণটা কী জিনিস? গাড়ির হর্ন জানি। প্রণ কী?’ আশু উত্তর দিয়েছিল, ‘চিংড়ি। তুই চিংড়ি বললেও ওরা বুঝত। চ্যাংড়ি বললে কী বুঝবে?’ বিশুর তখন অদ্ভুত যুক্তি। রাগের গলায় বলেছিল, ‘কেন বুঝবে না। কলকাতা যদি ক্যালকাটা হতে পারে, চিংড়ি তাহলে চ্যাংড়ি হবে না কেন।'

আশু জানে এসব নিয়ে বিশুর সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই। কিন্তু স্যারকে কী বলতে কী বলে ফেলবে সেই কারণে ওকে সতর্ক করে দিল। কিন্তু হাতে টেলিফোন থাকলে বিশু ইংরেজি বলবেই। তাকে থামায় কার সাধ্য।

বিশুর কথা শুনে দস্তিদার বলল, ‘হোয়াট ফ্যাচাং? পরিষ্কার করে বলো। মেক ইট ক্লিয়ার।'

বিশু বলতে লাগল, ‘হঠাৎ উই নো, ফোর পিস অয়ন হিয়ার। থ্রি পিস স্টুডেন্ট ওয়ান পিস শিক্ষক। উই কিডন্যাপ অল অয়ন নাকি পার্টিকুলার অয়ন। বাট...’

ওদিক থেকে দস্তিদারের গর্জন, 'তুমি ফোনটা আশুকে দাও।'

বিশু বলল, ‘থ্যাংক ইউ স্যার। টেলিফোন গো টু আশুদা। আশুদা ফোন নাও। আমাদের স্যার ইংরেজিতে বড্ড কাঁচা।’

ফোন নিয়ে আশু বলল, 'স্যার, যে ছবিটা আমাদের কাছে আছে সেই ছেলে দু’দিন ধরে দেখতে পাচ্ছি না। আমরা কী করব?’

দস্তিদার বলল, ‘তোমরা চলে এসো। আমি খবর দিচ্ছি।'

আশু ফোন ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘বিশু, স্যার ডেকেছেন।'

বিশু বলল, ‘স্যারের এই মেনি মেনি ডাকাডাকিতে আমাদের ট্রান্সপোর্ট খরচ বেড়ে যাচ্ছে।'

ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে ওরা স্যারের কাছে পৌঁছে গেল। স্যার অর্থাৎ দস্তিদার বলল, ‘আমি আমার সোর্স থেকে খবর নিয়েছি। ছেলেটি আগামীকাল স্কুলে আসছে। এ দু’দিন শরীর খারাপ ছিল বলে আসতে পারেনি। কাল ওকে তুলে নেবে।'

পরদিন যথাসময়ে ওরা গেল। ছবির সেই অয়ন এল একটা মারুতি গাড়ি করে। ড্রাইভার দরজা খুলে দিতেই ছেলেটি নেমে স্কুলের গেট দিয়ে ঢুকে গেল। আশু-বিশুর নাকের নীচে মোটা গোঁফ লাগানো। পরনে খাকি পোশাক। ঠিক হোমগার্ডদের মতো। ছেলেটা চলে যেতেই লাঠি হাতে আশু-বিশু গাড়ির সামনে এল। আশু বলল, ‘গাড়ি এদিকে পার্ক করবেন না।

ড্রাইভার বলল, ‘আমি একটু এগিয়ে পার্ক করছি।'

আশু বলল, ‘ডানদিকের গলিতে পার্ক করুন। রাস্তা দিয়ে মিনিস্টার যাবেন। রাস্তা ফাঁকা রাখতে হবে।'

ড্রাইভার আশু-বিশুর দিকে একবার দেখে নিয়ে বলল, ‘গলিতে পার্ক করার জায়গা আছে?’

বিশু বলল, ‘ছোট গাড়ি তো হয়ে যাবে। চলুন আমরা ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। মিনিস্টার যাবেন বলে আজ আমাদের স্পেশ্যাল ডিউটি’

আশু-বিশুর কথামতো গাড়িটা একটা ছোট গলির মধ্যে এসে দাঁড়াল। ওরা দু'জনেই জানে, এই গলি গিয়ে অপেক্ষাকৃত বড় রাস্তায় পড়েছে। সেই রাস্তা দিয়ে একটু গেলেই ডাইনে-বাঁয়ে বড় রাস্তা। গাড়ি ঘোরাবার কোনও দরকার হবে না। ড্রাইভার গাড়ি দাঁড় করিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে দিয়ে বললেন, ‘রোজ তো আমি বড় খোকাবাবুকে নামিয়ে দিয়ে বাড়ি চলে যাই। ছুটির আগে নিতে আসি। আজ শনিবার, তাই থেকে যাচ্ছি। আর দু’ ঘণ্টা পরেই ছুটি হবে।'

আশু বলল, ‘এখানেই থাকুন। অসুবিধে হলে আমাদের বলবেন। আমরা কাছেই আছি।' আশু-বিশু গলির মোড়ে এসে দাঁড়াল। বিশু ফিসফিস করে বলল, ‘কী দিয়ে যে গোঁফটা আটকেছে, নাকের ভেতর সুড়সুড় করছে। টেনে খুলে ফেলব।'

আশু বলল, ‘তাহলে তো কেলেঙ্কারি। গাড়ির নম্বর, ছেলে সবই ঠিক আছে। এখন গোঁফ খুলে ড্রাইভারের কাছে গেলে লোকটা কী ভাববে?’

বিশু বলল, ‘কিছু ভাববার আগেই বলব, গোঁফটা কামিয়ে এলাম দাদা। নাকে বড্ড সুড়সুড়ি দিচ্ছিল।'

আশু বলল, ‘তাহলে ধরা পড়ে যাব। এখন নজর রাখ আমাদের হজমিওলা কখন আসে। ওই হজমিগুলি ড্রাইভারকে দুটো খাওয়াতে হবে। তাহলে দেড়-দু’ ঘণ্টার জন্য ঘুমিয়ে থাকবে। ছেলেটাকে একটা খাওয়াতে বলেছে।'

সময় যেন আর কাটতে চায় না। আশুর হাতে একটা ঘড়ি। আশু সময় দেখে। ওদের দু’জনেরই মনে হচ্ছে সময় যেন আজ আর এগোচ্ছে না। হঠাৎ বিশু কনুইয়ের গুঁতো দিয়ে আশুকে বলল, ‘আশুদা, স্কুল গেটে পুলিশের জিপ এসে থামল। মনে হচ্ছে খবর ক্যাচ করে ফেলেছে।'

আশু স্কুল গেটের দিকে একবার তাকাল। দৃষ্টিটা সরিয়ে নিতে নিতে বলল, ‘চল গলির ভেতরে যাই। ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পাচ্ছি না।'

ওরা আস্তে আস্তে গলির ভেতরে ঢুকে গাড়িটার কাছে এল। ড্রাইভার হাতে খৈনি ডলতে ডলতে বলল, ‘কোনও মিনিস্টার যাবেন?'

বিশু কিছু বলতে যাচ্ছিল। আশু ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল, 'আমরা মশাই সামান্য হোমগার্ড। রাজা-মহারাজাদের খবর কেমন করে রাখব। অর্ডার হয়েছে, অতএব ডিউটি দিচ্ছি।' ড্রাইভার খৈনি মুখে পুরে বলল, ‘কখন আসবেন?’

আশু উত্তর দিল, ‘আসার সময় তো হয়ে গেছে। প্লেন যদি লেট থাকে তাহলে দেরি হবে। দিল্লি থেকে আসছেন তো?’

বিশু ফস করে বলে উঠল, ‘জ্যাম-জট হলেও প্লেন দেরি করতে পারে। আজকাল প্রায়ই হচ্ছে।'

ড্রাইভার একটু অবাক চোখে বিশুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘প্লেন তো আকাশ দিয়ে আসবে। সেখানে জ্যাম-জট...’

বিশু বুঝল, বড্ড ভুল হয়ে গেছে। আশুর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল, তার দুই চোখে তীব্র ভর্ৎসনা। কিন্তু কথাটা বলে ফেলে আর ফেরাবার উপায় নেই, অতএব বিশু বলল, ‘আমাদের এতদিন তাই ধারণা ছিল। কিন্তু পুরনো ধারণা নিয়ে এখন কি চলে! এখন তো ডিসেম্বর মাসে শ্রাবণ মাসের মতো বর্ষা হয়। আপনিই বলুন না, কলকাতায় গত দশ বছরে কত গাড়ি বেড়েছে। সরকার হকার তুলে রাস্তা বড় করেছে। বাইপাস করেছে। কিন্তু আকাশের তো কিছুই হয়নি। একটা বাইপাসও হয়নি। অথচ কত প্লেন বেড়েছে, সরকারি, বেসরকারি, দেশি-বিদেশি হাজারও প্লেন। কিন্তু রাস্তা বেড়েছে কি? কিংবা আকাশটা।'

ড্রাইভার ধন্দে পড়ে যায়। মাথা নাড়তে নাড়তে বলে, “ঠিকই তো বলেছেন। কিন্তু ওখানে রাস্তা বাড়াবার দায়িত্ব কার?’

বিশু বলল, ‘সেটাই তো মুশকিল। ওটা মর্ত্যের মানুষদের না কি দেবতাদের? ইউরোপের না কি এশিয়ার, এই নিয়েই তো তর্ক চলছে। ঠিক আমাদের বালি ব্রিজের মতো। লরি উলটে গেলে ওই জায়গাটা কোন থানার এক্তিয়ারে, সেটা ঠিক করতে করতেই বেলা শেষ।'

ড্রাইভার বলল, ‘ভারী অদ্ভুত ব্যাপার তো। এসব কথা তো আগে শুনিনি।'

বিশু মুচকি হেসে বলল, ‘কেন, সবক’টা ইংরেজি কাগজে বেরিয়েছে। আমি তো টেলিগ্রাফে পড়েছি। টিভির ইংরেজি খবরেও বলেছে। আপনি ইংরেজি পত্রিকা পড়েন?’ ড্রাইভার অপরাধীর মতো বলল, ‘নো, আমি ইংরেজি পড়তে পারি না।' বিশু বলল, ‘ওটাই তো ভুল। ইংরেজি পড়তে শিখুন। ইংরেজি ইজ ভেরি ভেরি সোজা।

ইউ রেগুলার হ্যাবিটিং ইংরেজি। ইউ সি ইউ ভেরি ভেরি নো এভরিথিং'

আশু ইতিমধ্যেই বারদুয়েক খোঁচা দিয়েছে বিশুকে। কিন্তু বিশুকে দমানো যাচ্ছে না। ড্রাইভার যে মনে মনে বিশুকে ইংরেজি পণ্ডিত ভাবতে আরম্ভ করেছে সেটা আশুও টের পাচ্ছে। কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি করলে বিপদ ঘটতে পারে এই আশঙ্কায় আশু বলল, ‘স্কুল গেটে স্পেশ্যাল পুলিশ এসে গেছে। মনে হয় মিনিস্টার এসে যাচ্ছেন।'

ওদের সঙ্গে ড্রাইভারও গলির মুখে এসে দেখল স্কুল গেটের সামনে একটা পুলিশ জিপ দাঁড়িয়ে। বিশু বলল, ‘গো ব্যাক। ব্যাকফুটে গিয়ে সিটে বসুন।'

আশু বলল, ‘স্কুল ছুটির ঘণ্টা পড়লে নিজে গিয়ে ছেলেকে নিয়ে আসবেন। গাড়ি এখন মেন গেটে যাবে না। ওকে এনে এখানে গাড়িতে তুলবেন।'

ড্রাইভার অনুগতের মতো বলল, “ঠিক আছে, স্যার।' ড্রাইভারের মাথায় তখনও ঘুরছে আকাশে জ্যাম-জট হলে ট্র্যাফিক পুলিশ কোথায় কেমনভাবে দাঁড়িয়ে ডিউটি করবে।

বেলা দেড়টা নাগাদ স্কুল ছুটি হল। আশু নিজের ঘড়িতে দেখল, তার ঘড়ি স্কুলের ঘড়ির চেয়ে পাঁচ মিনিট এগিয়ে চলছে। এটা অবশ্য ইচ্ছে করেই রাখা হয়েছে। বিশু নিজের ভেতরের অস্থিরতা এবং উত্তেজনাকে যথাসাধ্য দমন করে ড্রাইভারকে বলল, ‘যান, ছেলেকে নিয়ে এসে গাড়িতে তুলুন। গাড়ি মেন গেটে লাগানো যাবে না।'

ড্রাইভারের মাথায় তখনও বোধকরি আকাশে ট্র্যাফিক জ্যামের ব্যাপারটা ঘুরছিল। বিশুর সঙ্গে স্কুল গেটের দিকে আসতে আসতে বলল, ‘আকাশে তো প্লেন ছাড়া কিছু চলে না তাই না?’

বিশুর ভেতর তখন উত্তেজনা টগবগ করছে। সে বলল, 'ওসব কথা পরে একদিন হবে। দেখছেন না, চাঁদের জমির দখল নিয়ে কেমন হুটোপাটি চলছে। হয়তো মামলা-মোকদ্দমাও হতে পারে।'

ড্রাইভারকে ভীষণ চিন্তিত দেখাল। সে বলল, 'আচ্ছা হোমগার্ড দাদা, চাঁদের মামলা-মোকদ্দমা কোথায় হয়? আলিপুরে, না কি চাঁদিপুরে?’

বিশু তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলল, ‘দূর মশাই, চাঁদের মামলা কি পৃথিবীতে হবে? এইজন্যই বলেছিলাম, ইংরেজি কাগজ পড়ুন৷ ইউ হ্যাবিটিং ইংরেজি। চাঁদের মামলা হবে মঙ্গল কোর্টে।

তার চোখ-মুখ দেখে মনে হয় জীবনে এতবড় পণ্ডিতের মুখোমুখি সে কখনও হয়নি। বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করে, ‘মঙ্গল কোর্টটা কোথায়?’ বিশু উত্তর দেয়, ‘আপনি কী ভাবছেন ওটা ব্যাঙ্কশাল কোর্টের কাছে? মশাই ওটা হল, মঙ্গল গ্রহে।'

ড্রাইভারের বিস্ময় যেন বাড়তে থাকে।

ড্রাইভারের চোখ বিস্ফারিত হয়। অবাক গলায় জানতে চায়, ‘মঙ্গল গ্রহে কি কোর্ট-কাছারি আছে?'

বিশু জোর গলায় বলে, ‘আলবাত আছে। গ্রহ-নক্ষত্রের সব মামলা-মোকদ্দমা ওই মঙ্গল গ্রহের মঙ্গল কোর্টেই হয়। সেখানে দেদার কোর্ট-কাছারি।'

ড্রাইভার শ্রদ্ধামিশ্রিত চোখে বিশুর দিকে তাকায় আর মনে মনে ভাবে, এই জগৎ সংসারে এখনও কত কিছু জানতে বাকি। ভাগ্যিস এই হোমগার্ডের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তাই এত কিছু জানা গেল।

স্কুল গেট দিয়ে হুড়হুড় করে ছেলেরা বেরিয়ে আসছে। স্কুল গেটের সামনে এখন অনেক গাড়ি। ড্রাইভার বলল, ‘হোমগার্ড দাদা, সব গাড়ি তো মেন রাস্তায়; তবে কেন আমি গলিতে ঢুকলাম।'

বিশু বলল, ‘মন্ত্রী আর পুলিশ অফিসারদের ছেলেদের নিতে যে গাড়িগুলো এসেছে সেগুলো ছাড়া বাকি সব গাড়ি কেস খাবে।'

ড্রাইভার বলল, ‘কেস খাবে?’

বিশু জবাব দিল, ‘খাবে কি, খেয়ে বসে আছে। তাড়াতাড়ি চলুন। আপনার ছেলে কোথায়?’

ড্রাইভার ছেলেদের দিকে দেখতে দেখতে বলল, ‘এসে যাবে।'

মিনিট দেড়েক পরে গেটের বাইরে অয়ন এল। সে বোধহয় ড্রাইভারকেই চোখ দিয়ে খুঁজছিল। ড্রাইভার দেখতে পেয়ে তাকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকল।

বিশুর মধ্যে উত্তেজনাটা লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে। বিশু অয়নের মুখের দিকে তাকাল। টানা টানা দুটি চোখ। মুখটা সরল। এমন সরল যে, তাতে কখনও বোধহয় পাপ স্পর্শ করতে সাহস পাবে না। অথচ আশ্চর্য, রসুনের গায়ে যেমন পাতলা খোসা থাকে তেমনই সূক্ষ্ম একটার আবরণ অয়নের মুখে। বড়লোকের ছেলেদের আবার বেদনা-টেদনা থাকে নাকি? অয়ন কাছে আসতে বিশু দেখল, টানা টানা বড় চোখের মণিটা কালো এবং উজ্জ্বল। যেন সন্ধ্যার শুকতারার মতো। কিন্তু এখন তো এসব দেখার সময় নয়। হজমিওলা এসে গেলে সেই বিশেষ হজমি ড্রাইভার আর অয়নকে খাওয়াতে হবে। ওটা অবশ্য আশুদার কাজ।

অয়ন ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করল, ‘আঙ্কেল, গাড়ি কোথায়?’

ড্রাইভার উত্তর দিল, ‘গাড়ি সামনের গলিতে রেখেছি। একটু হেঁটে আসতে হবে।' অয়ন কোনও আপত্তি করল না। শুধু হেঁটে যেতে যেতে বলল, ‘আজ গলিতে রেখেছ কেন?’

ড্রাইভার অয়নের হাত ধরে হেঁটে যেতে যেতে বলল, ‘আজ দিল্লি থেকে মিনিস্টার আসছে। তাই রাস্তায় কোনও গাড়ি দাঁড়াতে দিচ্ছে না।'

অয়ন পেছন ফিরে অন্য গাড়িগুলোকে দেখল। ওইসব গাড়িতে দরজা খুলে তার বন্ধুরা উঠছে। স্কুলবাসটাও গেটের মুখে দাঁড়িয়ে। অয়ন প্রশ্ন করল, ‘তবে ওরা কেন রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে?'

বিশু ফস করে বলে ফেলল, 'আজ সবাই কেস খাবে।'

‘কেস খাবে’ ব্যাপারটা অয়ন বুঝতে পারল না। পারল না বলেই একবার বিশুর দিকে তাকিয়ে পরক্ষণে নিজের ড্রাইভারের দিকে তাকাল।

গলির মুখে পা দিয়ে ড্রাইভার বলল, ‘সেসব তোমায় পরে বলব।'

গাড়ির কাছে এসে অয়ন দাঁড়িয়ে পড়ল। তার সামনে আশু আর একজন হজমিওলা। আশু হাতে কয়েকটা হজমি বড়ি নিয়ে বলল, ‘বাঃ, বেশ খেতে তো! নিন ড্রাইভার সাব, আপনিও দুটো খান।'

ড্রাইভার হাত পেতে হজমি বড়ি নিয়ে মুখে দিতেই বিশু নিশ্চিন্ত হল। আশু এবার স্নেহের ভঙ্গি করে অয়নকে বলল, ‘খোকাবাবু, তুমিও একটা খাও।'

অয়ন হাত বাড়িয়ে আবদারের গলায় বলল, 'না, আমিও দুটো খাব।'

বিশু আঁতকে উঠে বলে ফেলল, ‘কী সর্বনাশ, দুটো খাবে কেন? ছোটদের একটা করে খেতে হয়।'

অয়ন বায়না করার ভঙ্গিতে বলল, ‘রোজ বিকেলে আমাদের বাড়ির সামনে ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে যে হজমিদাদু আসে, আমি তার কাছ থেকে পাঁচ-ছ'টা খাই।'

আশু-বিশু দু’জনেই মনে মনে প্রমাদ গনল। দু'জনে দ্রুত দৃষ্টি বিনিময় করে নিয়ে হজমিওলার দিকে তাকাল। সে ততক্ষণে বড় রাস্তার দিকে হাঁটতে আরম্ভ করে দিয়েছে। বিশু বলল, ‘খোকাবাবু, এ যে সে হজমি নয়। দস্তিদারের হজমি। তার কারখানার জিনিস। বেশি খেলে নাড়িভুড়ি হজম হয়ে যায়। তুমি এখন একটা খাও। ভাল লাগলে আবার খাবে।'

ড্রাইভার দরজা খুলে দিয়েছে। অয়নের হাতে একটা হজমির বড়ি। সেটা মুখে দিয়ে অয়ন গিয়ে বসেছে পেছনের সিটে। পাশে তার স্কুলব্যাগ। আশু মনে মনে ভাবল, এইবারই আসল পরীক্ষা। ড্রাইভার তার সিটে বসেছে। ঘুম পাচ্ছে কিনা সেটা এখনও বোঝা যাচ্ছে না। ‘স্যার’ বলেছিলেন বড়দের ক্ষেত্রে দু’ মিনিট পর থেকে অ্যাকশন শুরু হবে। ছোটদের বেলায় মাত্র এক মিনিট। কিন্তু এখন কত মিনিট হল? আশু একবার ঘড়ি দেখল। গাড়িটা এখনই হুশ করে চলে যাবে আর চলে গেলেই সর্বনাশ। অতএব, কোনও একটা ছুতোয় গাড়িটাকে আরও একটু আটকে রাখতে হবে।

বেশি ভাববার সময় নেই আশুর হাতে। তাই কোনও ভনিতা না করেই আশু বলল, ‘ড্রাইভার সাব, আপনি কোনদিকে যাবেন?'

ড্রাইভার উত্তর দিল, ‘খোকাবাবুকে নিয়ে ঘর যাব।'

আশু সব জানে। তবু যেন কিছুই জানে না সেইভাবে বলল, ‘ঘর কোনদিকে?’ ড্রাইভার উত্তর দিল, ‘সল্টলেকে!’

আশু যেন খুবই চিন্তিত এমন ভাব করে বলল, ‘শিয়ালদা-বেলেঘাটা হয়ে তো যেতে পারবেন না। ওদিক দিয়ে মিনিস্টার আসছেন। আপনি কি পার্ক সার্কাস বাইপাস দিয়ে যাবেন?’

ড্রাইভার বলল, ‘তাই যেতে হবে।'

আশু বলল, ‘তাহলে একটু উপকার করুন। আমাদের পার্ক সার্কাসে নামিয়ে দেবেন?’ ড্রাইভার বলল, ‘আপনাদের স্পেশ্যাল ডিউটি।’

বিশু বলে উঠল, ‘হয়ে গেছে।'

ড্রাইভার আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু বলতে পারল না। আশুর মনে হল, হজমির অ্যাকশন শুরু হতে আরম্ভ করেছে। তাই ড্রাইভারকে কিছু বলতে না দিয়ে বলল, ‘দুটো পর্যন্ত আমাদের ডিউটি। এবার অন্য লোক এসে যাবে।'

কথা বলেই আশু ড্রাইভারের পাশের দরজাটা খুলে ফেলে বিশুকে চোখের ইশারায় পেছনে বসতে বলে নিজে ড্রাইভারের পাশে বসে বলল, ‘সোজা গিয়ে ডাইনে বেঁকবেন। তারপর কিছুটা গিয়ে বাঁয়ে।'

ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট করল। সোজা গিয়ে ডাইনে বেঁকতে গিয়েই বিপদ ঘটতে যাচ্ছিল। আশু বুঝল, ড্রাইভার আর গাড়ি চালাবার অবস্থায় নেই। আশু প্রায় জোর করেই নিজে গাড়িটা থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘কী হয়েছে? ঘুমিয়ে পড়ছেন কেন? শরীর খারাপ লাগছে?’

ড্রাইভার ভাল করে কথা বলতে পারল না। ঘুমন্ত মানুষ যেভাবে কথা বলে ঠিক সেইভাবে বলল, ‘মাথাটা বড্ড ঘুরছে। ঘুম ঘুম পাচ্ছে। স্টিয়ারিং কন্ট্রোল করতে পারছি না।'

আশু পেছনের সিটের দিকে তাকাল। অয়ন সিটের ওপর কাত হয়ে ঘুমোচ্ছে। ওর মাথাটা বিশু কোলে তুলে নিল। আশু গাড়ি থেকে নেমে এসে ড্রাইভারকে ধাক্কা দিয়ে বলল, ‘ওই পাশের সিটে গিয়ে বসুন।'

ড্রাইভার কোনওরকমে কেতরে কেতরে পাশের সিটে গিয়ে হেলান দিয়ে বসল। আশু ড্রাইভারের সিটে বসে গাড়ি চালাতে লাগল। পার্ক সার্কাসের কাছে আসার পর দেখা গেল ড্রাইভার আর অয়ন দু’জনেই ঘুমিয়ে কাদা। বিশু অয়নের পিঠে মৃদু চাপড় দিয়ে মিহি সুরে গাইতে লাগল। ‘খোকা ঘুমোল পাড়া জুড়োল দস্তিদার এল দেশে। ক্ষ্যামতাওলারা সব কেড়েছে, রেশন তুলব কিসে?’

আশু সামনে থেকে বলল, ‘তোর খোকা ঘুমিয়েছে?’

বিশু বলল, ‘ঘুমিয়ে কাদা। তোর ধেড়েটা?’

আশু উত্তর দিল, ‘অঘোরে ঘুমোচ্ছে। এবার গাড়ি নিয়ে সোজা গ্যারাজে।'

কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওরা গ্যারাজে এল পেছনের রাস্তা দিয়ে। দস্তিদার রেগে উঠে বলল, ‘ছেলেটাকে নিয়ে এখানে এলে কেন?’

বিশুও সঙ্গে সঙ্গে রেগে গিয়ে জবাব দিল, ‘তবে কোথায় যাব? চিড়িয়াখানায়? আপনার আঁকা প্ল্যান তো তাই ছিল।'

দস্তিদার বলল, ‘আগের প্ল্যানটা একটু বদলাতে হয়েছে। ছেলেটাকে কলকাতার বাইরে এক জায়গায় রাখার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে আপাতত কিছুদিন রাখা যাবে না।' আশু প্রশ্ন করল, ‘তাহলে কোথায় রাখবেন?’

দস্তিদার বলল, ‘শুনেছি তোমাদের দোহাটার বাড়িটা খুব নির্জন। জঙ্গলের মধ্যে। আপাতত কয়েকদিন ওখানেই রাখো।'

বিশু ক্ষোভের গলায় বলল, ‘এরকম তো কথা ছিল না। আমরা প্ল্যানমাফিক কাজ করে দিয়েছি। চুরি ছিনতাইয়ের জিনিস জমা দেওয়া আমাদের কাজ, আর জমা রাখা আপনার কাজ।'

দস্তিদারকে এইসময় খুব বিচলিত দেখাল। দস্তিদার বলল, ‘সব কাজের একটা প্ল্যান থাকে, কিন্তু সবসময় সব কাজ প্ল্যান মতো হয় না। গোসাবার সেই ডেরাটা আপাতত নিরাপদ নয়। আজ সকালে দুটো দলের মধ্যে সংঘর্ষ হয়ে দু’জন মারা গেছে। ওখানে এখন বিস্তর পুলিশ। পুলিশ চৌকি বসেছে।'

আশু বলল, ‘তাহলে এখন কী হবে?’

দস্তিদার কিছু বলার আগেই বিশু বলে উঠল, ‘কী আর হবে। চলো গাড়ি চালিয়ে ঘরের ছেলেকে ঘরে ফিরিয়ে দিয়ে আসি। বাড়ি তো চিনি। ওখানে গিয়ে ছেলেটাকে ফেরত দিয়ে বলব, আপনাদের ছেলে কিডন্যাপ করেছিলাম। কিন্তু লুকিয়ে রাখার জায়গা নেই বলে ফেরত দিয়ে গেলাম। গোসাবার গণ্ডগোল থামলে আবার নিয়ে যাব।'

দস্তিদার জ্বলন্ত চোখে বিশুর দিকে তাকাল। বিশু বুঝতে পেরেও গ্রাহ্য করল না। দস্তিদার পাইপটা শব্দ করে টেবিলের ওপর রেখে দিয়ে বলল, ‘বিশু, আমার অবস্থা বুঝতে পারলে এরকম বেয়াদপি করার সাহস তোমার হত না। ছেলেটাকে তোমরা তুলে এনেছ, আমি নই। পুলিশ ধরলে তোমাদের ধরবে।'

বিশুও উত্তেজিত। সেও উত্তেজিত গলাতেই বলল, ‘আপনি কি ভয় দেখাচ্ছেন? জেলে যাওয়ার অনেক অভিজ্ঞতা আছে। ওতে আমরা ভয় পাই না। কিন্তু আপনার তো নেই।'

দস্তিদারও উত্তেজিত গলায় বলল, ‘এই কয়েক বছর ধরে যে জেলের ভাত খাচ্ছ না সেটা কিন্তু আমার দয়ায়।'

পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে দেখে আশু বলল, 'স্যার, এখন তর্ক করার সময় নেই। ড্রাইভারের ঘুম ভেঙে গেলে আমাদের বিপদ হবে।'

কথা শেষ করেই আশু নিজের হাতঘড়ি দেখল। সঙ্গে সঙ্গে দস্তিদারও। ঘরের মধ্যে একবার পায়চারি করে নিয়ে বলল, ‘এই কথাটা বিশুকে বোঝাও। আমার প্ল্যানটা শোনাও। অন্য একটা গাড়ি আর ড্রাইভার দিচ্ছি, ছেলেটাকে তোমাদের কাছে, মানে দোহাটার বাড়িতে কয়েকদিন রেখে দাও। পরে আমি ওকে সরিয়ে আনব।'

আশু প্রশ্ন করল, ‘এই গাড়ি আর ড্রাইভারের কী হবে?’

দস্তিদার উত্তর দিল, ‘ওটাকে নিয়ে গিয়ে পার্ক স্ট্রিটের কোনও রেস্তরাঁর কাছাকাছি রেখে আমাদের ড্রাইভার চলে আসবে। জ্ঞান ফিরলে নিজেই চলে যেতে পারবে।'

আশু বলল, ‘ছেলেটার খাওয়া-দাওয়ার একটা খরচ আছে তো। বড়লোকের ছেলে। খাবার খরচও বেশি। এতসব দোহাটায় আমরা কী করে জোটাব?’

দস্তিদার বলল, ‘রোজ রোজ তো মুরগি-মটন খাওয়াতে হবে না। ওই দুধ, কলা, ফল, একটু মাছ, মাঝেমধ্যে মাংস।'

বিশু এবার ক্ষোভের গলাতেই বলল, ‘এবার তো আর চুপ করে থাকা যায় না। খাওয়ার যা ফিরিস্তি দিলেন তাতে কিছুটা বাদ গেল না। মনে রাখবেন সিনহা সাহেব মুক্তিপণ দিয়ে ড্যামেজ ছেলে নেবে না। তার ফুড প্র্যাকটিস চালু রাখতে হবে।'

দস্তিদার বলল, ‘হবে, হবে, তার ব্যবস্থাও হবে। আজ দু’ হাজার টাকা দিচ্ছি। ফুরিয়ে গেলে আবার দেব। এই মোবাইল ফোনটা আশু রাখো। যে কোনও জায়গা থেকে যোগাযোগ করতে পারবে। এটা অপারেট করতে জানো তো?’ '

আশু বলল, ‘জানি।

দস্তিদার ঘড়ি দেখে নিয়ে বলল, 'তাহলে দেরি কোরো না। ছেলেটাকে নিয়ে দোহাটায় চলে যাও। ড্রাইভার আর ওর গাড়ির ব্যবস্থা আমি দেখছি।'

আশু-বিশু পেছনের সিঁড়ি দিয়ে বাইরে এল। অয়ন তখনও ঘুমিয়ে। বিশু ওকে কোলে করে অন্য গাড়িতে তুলে নিল। স্কুল ব্যাগটা আশুর হাতে। গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আগে রতনকে আশু বলল, ‘খাবার দোকান দেখে দাঁড় করাস। ছেলেটার জন্য খাবার কিনতে হবে।'

বিশু বলল, ‘কী কিনবি? মুড়ি-চানাচুর তো চলবে না। বড়লোকের খোকারা সারাদিন কী খায় গো আশুদা?’

আশু একটু চুপ করে থেকে জবাব দিল, ‘জানি না। বড়লোকের ঘরে তো জন্মাইনি।'

মেওয়া রোদের কলকাতা ছাড়িয়ে ধূসর এবং বিষণ্ন দোহাটায় যখন গাড়ি পৌঁছল তখনও দোহাটার জঙ্গলে অন্ধকার গাঢ় হয়নি। অয়নের মুখ আর চোখ বাঁধা। জ্ঞান ফিরলেও তার শব্দ করার উপায় নেই। দোহাটার বাড়িতে ঢোকার জন্য ঘন অন্ধকারের প্রয়োজন। ওরা তারই জন্য গাড়িতে বসে অপেক্ষা করতে লাগল।

জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পায়ে-চলা পথ। ওই পথে সাইকেল কিংবা একটা স্কুটার যেতে পারে, মারুতি যেতে পারল না। অগত্যা অয়নকে কাঁধে করেই নিয়ে আসতে হল বাড়িতে। চোখ-মুখ বাঁধা। জ্ঞান ফিরেছে কিনা তা বোঝা যাচ্ছে না। বাড়ির চারপাশে ছমছমে অন্ধকার। কাছাকাছি কোনও ডোবার ধার থেকে একটা ব্যাং ডেকে যাচ্ছিল। আশু ইচ্ছে করেই বারান্দার বাতি জ্বালল না। দরজায় টোকা দিয়েই নিচু গলায় ডাকল, ‘দিদা, ও দিদা।’

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। দিদা দরজা খুলে দিতেই প্রথমে বিশু, তার পেছন পেছন আশু ঘরে ঢুকে এল। দিদা অবাক চোখে দু’জনের দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ আবার কী নিয়ে এলি।'

আশু ততক্ষণে দরজা দিতে ব্যস্ত। বিশু অয়নকে চৌকির ওপর শুইয়ে দিয়ে বলল, ‘দেখতে পুঁচকে হলে কী হবে! ওজন নেহাত কম নয়।'

দিদার বিস্ময় বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু আশু-বিশু কেউই দিদার দিকে তাকিয়ে নেই। দু'জনের চোখ অয়নের দিকে। বিশু বলল, ‘চোখ-মুখের বাঁধনটা এখন খুলে দেব?'

আশু নিচু হয়ে বসে অয়নের জুতোর ফিতে খুলে দিতে দিতে বলল, ‘এখন খুলে দে। এখান থেকে পালাতে পারবে না। তা ছাড়া আমরা তো আছি।'

দিদার ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। এগিয়ে এসে দু’জনকে দু’ হাতে সরিয়ে দিয়ে ছেলেটার মুখের দিকে তাকালেন। তারপর মুখ তুলে আশু আর বিশুকে বললেন, ‘এসব কী হচ্ছে। এই ছেলেটা কে? ওকে এমন করে মুখ-চোখ বেঁধে আনলি কেন? বেত্তান্তটা কী?

আশু উত্তর দিল, ‘সব বলছি। তোমাকে তো বলতেই হবে। তার আগে ওই ব্যাগটা খোলো। ওতে অনেক জিনিস আছে। অয়নকে এখন দুধ বা হরলিক্স খাওয়াতে হবে। তুমি চটপট তার ব্যবস্থা করে ফেলো।’

দিদার চোখ-মুখে ঘোর বিস্ময় আর বিস্তর জিজ্ঞাসা। দিদা এসে ব্যাগ খুললেন। ব্যাগের মধ্যে নানারকম জিনিস। দেখে মনে হচ্ছে অনেক টাকার কেনাকাটা করেছে। দিদা কোনও কথা না বলে স্টোভ ধরাতে লাগলেন। তাঁর মাথার মধ্যে নানা প্রশ্ন কিলবিল করছে। আশু-বিশুর আচরণটা অন্যদিনের চাইতে আজ একটু আলাদা মনে হচ্ছে তাঁর।

চোখ-মুখের বাঁধন খুলে দেওয়ার পর অয়ন শূন্য দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকাল। দৃষ্টিতে বিস্ময় আছে কিন্তু কোনও অভিযোগ নেই। তবুও আশু-বিশুর দু'জনেরই খুব খারাপ লাগছে। গভীর একটা অপরাধবোধ বুকের মধ্যে থেকে উঠে এসে গলা বুজিয়ে দিতে চাইছে। এর আগে কোনও কিছু চুরি করার পর তাদের এমন হয়নি। ওরা দু’জনেই কুণ্ঠিত চোখে অয়নের দিকে তাকাল। অয়ন অদ্ভুতভাবে ওদের দিকে তাকিয়ে। স্টোভটা ধরে যাওয়ার পর শোঁ শোঁ করে একটা শব্দ ঘরের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। অয়ন দুর্বল গলায় বলল, ‘ওটা কীসের শব্দ?

আশু উত্তর দিল, ‘তোমার জন্য স্টোভ জ্বালিয়ে দিদা হরলিক্স করছে। ওটা স্টোভের শব্দ।' বিশু নরম গলায় বলল, 'ভাই অয়ন, তোমার কোনও কষ্ট হচ্ছে না তো? খিদে পেয়েছে?’ অয়ন ঘরের চারপাশে চোখ বোলাতে বোলাতে বলল, ‘আমাকে এখানে কে নিয়ে এল? তোমরা?’

বিশু আস্তে করে অয়নের পাশে বসে বলল, ‘হ্যাঁ, আমরাই তো নিয়ে এলাম।' অয়ন আবার ওদের দু'জনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এখানে নিয়ে এলে কেন? এটা তো আমাদের বাড়ি নয়। ড্রাইভার আঙ্কেল কোথায়?’

অয়নের অন্যপাশে বসতে বসতে আশু বলল, ‘তোমাকে সব খুলে বলব। তুমি হরলিক্স খাও। খিদে পেলে পেটভরে খেয়ে নাও। তারপর ধীরেসুস্থে বলব কী ঘটেছিল।'

অয়ন অবাক গলায় জানতে চায়, ‘কী ঘটেছিল?’

বিশু অয়নের পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলে, ‘অত তাড়াহুড়ো করতে নেই। আমরা তোমার বন্ধু।'

দিদা একটা কাচের গ্লাসে হরলিক্স নিয়ে এলেন। অয়নের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘কী মিষ্টি চেহারা তোমার। খেয়ে দেখো তো বাবা, ঠিক করে বানাতে পেরেছি কি না।'

অয়ন হাত বাড়িয়ে গ্লাসটা নিল। আশু বলল, ‘এই হচ্ছে আমাদের দিদা। আজ থেকে তোমারও দিদা।’

অয়ন গ্লাসে চুমুক দেওয়ার আগে দিদার মুখের দিকে তাকাল। একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ‘জানো, আমার কোনও দিদা নেই।

দিদা ফোকলা গালে হেসে ফেলে বললেন, ‘সেইজন্যই আজ থেকে আমি তোমার দিদা’ গ্লাসটা হাতে নিয়ে অয়ন বসে আছে। চুমুক দিচ্ছে না। বিশু বলল, ‘অয়ন ভাই, খেয়ে নাও।'

অয়ন যেন বিশুর কথা শুনতেই পায়নি। মানুষ নিজের ভাবনায় নিজের মধ্যে ডুবে থাকলে যেমন আত্মগতভাবে কথা বলে, অয়ন ঠিক সেইভাবেই বলল, ‘জানো, আমার মা-ও নেই। আমার তিন বছর বয়সে মারা গেছে। সেই থেকে আমি একা।’

আশু-বিশু দু'জনেই চমকাল, পরস্পরের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে আশু বলল, ‘তোমাদের বাড়িতে তবে উনি কে? ফরসা মতন দেখতে, চোখে কালো চশমা পরে নিজে গাড়ি চালান, তোমার বাবার সঙ্গে মাঝেমধ্যে.......

আশুকে কথা শেষ করতে না দিয়ে অয়ন বলল, 'ও তো আমার সৎ মা। আমি ছোটমা বলে ডাকি। ছোটমা আমায় একদম ভালবাসে না। কিন্তু বাবা খুব ভালবাসে। মা বাড়িতে না থাকলে আমার ঘরে এসে আমাকে আদর করে। কত কিছু দেয়।'

আশু-বিশু এবার গোলমালে পড়ে যায়। অয়ন যে সিনহা সাহেবের আগের পক্ষের স্ত্রীর সন্তান সেটা কি দস্তিদার স্যার জানে? ওরা দু’জনেই মনে মনে ভেবে সুখ যে, নিশ্চয়ই জানেন। স্যার অত কাঁচা লোক নয়।

অয়ন এক চুমুকে কিছুটা হরলিক্স খেয়ে গ্লাসটা হাতে ধরে দিদার মুখের দিকে তাকাল।

দিদা বলল, ‘হরলিক্সটা ঠিকমতো বানাতে পেরেছি তো? তোমার ছোট মা'র মতো হয়েছে?' অয়ন ফিক করে একটু হেসে ফেলে বলল, 'তুমি কিছু জানো না দিদা। আমার ছোটমা একদম রান্না করতে পারে না। কিছু বানায় না। ওসব কাজ করার জন্য অন্য লোক আছে। সায়ন তাই বলে...’

আশু হঠাৎ করে প্রশ্ন করে, ‘সায়ন কে?’

অয়ন উত্তর দেয়, ‘আমার ভাই। ছোট মা'র ছেলে। আমার ভাই খুব ভাল। আমরা তো একই স্কুলে পড়ি।'

বিশু বলে ফেলে, ‘আজ তো তুমি একাই স্কুলে এসেছিলে। তোমার ভাই সায়ন তো আসেনি।'

অয়ন জবাব দেয়, ‘আসবে কেমন করে! সায়ন তো ওর মা'র সঙ্গে পুনে গেছে। ওখানে ওর বড়মামা থাকে। বড়মামার মেয়ের বিয়ে।

এবার দিদা বলেন, ‘ওমা, এ কেমনধারা কথা। নিজের ছেলেকে নিয়ে বিয়ে খেতে গেল আর সতীনের কচি ছেলেটাকে বাড়িতে ফেলে গেল। তোমার বাবা কিছু বললে না?’

অয়ন বলল, ‘বাবা মা’কে কিছু বলে না। বাবা তো কাজে মুম্বই গেছে। ওখান থেকে বিয়ের দিন সোজা পুনে চলে যাবে।'

দিদা বলেন, ‘এ আবার কী বিচার! ওইটুকু ছেলেকে বাড়িতে একা ফেলে কেউ যায়? হলেই বা সত্মা, তবু মা তো!’

অয়ন যেন দিদার মস্তবড় একটা ভুল শুধরে দিচ্ছে এমন ভঙ্গিতে বলল, ‘না গো দিদা, একা ফেলে যায়নি। বাড়িতে সরলা মাসি আছে, ঝর্নাদি আছে। মানদা পিসি, ঝন্টু কাকা, গোপাল আর সিংজি

দিদা বলল, ‘এরা সব কারা? তোমার জ্ঞাতি-কুটুম?’

আশু উত্তর দিল, ‘মনে হচ্ছে এরা সব বাড়ির কাজের লোক। বড়লোকদের বাড়িতে অনেক কাজের লোক থাকে। তাই তো অয়ন?’

অয়ন মাথা নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ। কিন্তু ওরা খুব ভাল। সরলা মাসি আমায় খুব ভালবাসে।' বিশু জেরা করার ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল, ‘আর অন্যরা?’

অয়ন উত্তর দিল, ‘ওরাও ভাল। তবে সরলা মাসির মতো কেউ না। কেবল মানদা পিসি একটু অন্যরকম। খালি ছোটমা’র সঙ্গে ফিসফিস করে কথা বলে। আমার সম্পর্কে নালিশ করে। আমাকে মিছিমিছি ছোটমা'র কাছে বকা খাওয়ায়।'

বিশু বলল, ‘ওসব নিয়ে আর ভাবতে হবে না। আমরা সব ঠিক করে দেব।'

অয়ন বলল, ‘তোমরা পারবে না। আমার ছোটমা’র খুউব রাগ। বাবাও ছোটমাকে রেগে যেতে দেখলে ভয় পায়। রেগে গেলে ছোটমা হাতের কাছে যা পাবে ছুড়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ভেঙে ফেলবে।'

বিশু বলল, ‘তোমার উগ্রপন্থী মা’কে আমরা টাইট করে দেব। আজ থেকে তুমি আমাদের লোক। আমাদের ছোটভাই। ইয়োর কষ্ট মানে আওয়ার কষ্ট। আন্ডারস্ট্যান্ড।' আশু বিশুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বিশু, একটু বারান্দায় আয়।'

দু’জনে বারান্দায় এল। আকাশ ভরে আছে মেঘে। থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বাড়ির সামনে একচিলতে উঠোন। উঠোনের ওদিকে জঙ্গল। আশু উঠোনে নেমে এল। সঙ্গে সঙ্গে বিশুও।

বিশু বলল, ‘কী বলবি?

আশু জবাব দিল, ‘এখান থেকে স্যারকে একটা ফোন করি।'

আশু স্যারের দেওয়া মোবাইল থেকে ফোন করল। একটু পরে স্যারের গলা পাওয়া গেল। স্যার বলল, ‘কে আশু? সব ঠিক আছে তো? ছেলেটাকে পাহারায় রাখবে।'

আশু বলল, ‘অয়ন, মানে যাকে আমরা এনেছি সে সিনহা সাহেবের ছেলে ঠিকই, কিন্তু আগের পক্ষের। এখনকার স্ত্রী অত্যন্ত বদমেজাজি। সিনহা সাহেব নিজেও স্ত্রীকে ভয় করেন। এ অবস্থায়…......

ওদিক থেকে দস্তিদার বলল, 'ওসব নিয়ে ভাবতে হবে না। সিনহা সাহেবের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এই মা-মরা ছেলেটি। ওর জন্য মুক্তিপণ দিতে কার্পণ্য করবে না।'

আশু বলল, ‘কিন্তু উনি তো এখন মুম্বই। ওখান থেকে যাবেন পুনে.......

এবারও কথা শেষ করতে না দিয়ে দস্তিদার বলল, 'চারদিন পর সিনহা সাহেব ফিরবেন। সেইরকমই কথা। কিন্তু, আমি মুম্বইয়ের যে হোটেলে উনি উঠেছেন সেই হোটেলে আজ রাতেই ফোন করে সব জানিয়ে দেব। অতএব, কাল সকালের ফ্লাইটেই উনি কলকাতা চলে আসবেন। তোমরা সাবধানে থেকো।'

দু’জনে ঘরের দিকে ফিরে আসছিল। হঠাৎ বিশু দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, ‘আশুদা, তুমি বললে পারতে, ছেলেটা নানারকম জিনিস খাওয়ার জন্য বায়না করছে। সব বায়না মেটাতে গেলে আপনি যা দিয়েছেন সেটা ফুড়ুত করে শেষ হয়ে যাবে। কাল বিশুকে পাঠাব, ওর হাতে আরও কিছু দিয়ে দেবেন।'

আশু বারান্দায় পা দিয়ে গলা খাটো করে বলল, ‘আরও দু’দিন দেখি। টান পড়লে তো বলতেই হবে। আমরা প্রায়ই যা খাই, কিংবা ওর বয়েসে যা খেয়েছি তা তো অয়নকে খাওয়াতে পারব না। উপোসও রাখতে পারব না।'

বিশু বলল, ‘নো হাংরি ব্যাপার। ওকে পেট ফুল করে খাওয়াতে হবে।'

দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকতেই দূরে কোথাও শব্দ করে বাজ পড়ল।

বাজ পড়ার আগে, মুহূর্তের জন্য একটা নীলচে আলো চারপাশ আলোকিত করেই মিলিয়ে গেল। বাজ পড়ার মিনিটখানেক বাদেই কারেন্ট চলে গিয়ে ঘরটা বিলকুল অন্ধকার। দিদা বলল, ‘ওরে বিশু, কারেন্ট চলে গেল যে। এখন অন্ধকারে হ্যারিকেন কোথায় খুঁজব।

বিশু হাতড়ে হাতড়ে টর্চ বের করে জ্বেলে দিল। অয়ন বলল, ‘তোমাদের বুঝি জেনারেটর নেই। আমাদের ওখানে খুব কম পাওয়ার কাট হয়। হলেই সিংজি জেনারেটর চালিয়ে দেয়।'

আশু-বিশু কোনও কথা না বলে টর্চের আলোয় হ্যারিকেন আর মোম খুঁজতে লাগল।

অপেক্ষা করে করে দু'দিন চলে গেল। বিশুকে দোহাটার বাড়িতে রেখে আশু এল দস্তিদারের অফিসে। দস্তিদার গম্ভীর মুখে বসে। আশু চেয়ারে বসল না। দাঁড়িয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হল? দুটো দিন তো পার হয়ে গেল। সিনহা সাহেব কী বলছেন?’

দস্তিদার আক্ষেপের গলায় বলল, 'আমাদের টাইমিংটা গণ্ডগোল হয়ে গেছে। সিনহা

সাহেবকে রাত্রে হোটেলে ফোন করে জানলাম উনি বেলা বারোটায় চেক আউট করেছেন।' আশু প্রায় আর্তনাদের গলায় বলে উঠল, ‘তার মানে! এখনও কোনও যোগাযোগ হয়নি?’

দস্তিদার মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ‘না।’

আশু বলল, ‘সকালেই হোটেলে ফোন করা উচিত ছিল।'

দস্তিদারের গলায় আক্ষেপ এবং ক্রোধ স্পষ্ট হয়ে উঠল। সেইভাবেই বলল, ‘ছেলেটা তো আমাদের হাতে এল তিনটে নাগাদ। নিরাপদ ডেরায় নিয়ে তুমি ফোন করলে রাত আটটায়। ছেলে হাতে আসার আগে বাবাকে ফোন করা যায়?'

আশু বলল, ‘এখন কী হবে? সিনহা সাহেবকে না জানালে তো মুক্তিপণ পাওয়া যাবে না। উনি এখন কোথায়? পুনের বিয়েবাড়িতে?’

দস্তিদার মাথা নেড়ে বলল, 'না। সেখানেও যাননি।'

আশু বলে, ‘তবে কি ওঁকেও কেউ কিডন্যাপ করল!’

দস্তিদার বলল, ‘খবর নিয়ে জেনেছি উনি সম্ভবত জরুরি কাজে কানাডায় গেছেন। আমার কাছে তো কানাডার কোনও নম্বর নেই। ওঁর স্ত্রীও জানেন না।'

আশু এবার চেয়ারে বসতে বসতে বলল, 'আপনার নেটওয়ার্ক গাড়ির ব্যাপারে যত ভাল, মানুষের ব্যাপারে ততটাই খারাপ। এখন এই ছেলেকে নিয়ে কী করব? তার ওপর আবার ছেলেটার জ্বর এসেছে।'

দস্তিদার বলল, ‘জ্বর এল কেমন করে?

আশু উত্তর দিল, ‘কেমন করে এল তা আমরা কী জানি।'

দস্তিদার বলল, ‘লোকাল থানায় ড্রাইভার একটা ডায়েরি করেছে। সিনহা সাহেবের সলিসিটর ব্যাপারটা দেখছেন। মনে হয় সলিসিটরের মাধ্যমে খবরটা ঠিক কানাডায় পৌঁছে যাবে।'

আশু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, 'কবে পৌঁছবে সেটা ভগবানই জানেন। ওর সত্মাকে খবরটা দেওয়া হয়েছে?'

দস্তিদার পাইপটা হাতের তালুতে ঠুকতে ঠুকতে বলল, 'মনে হয় সলিসিটর কানাডার ঠিকানা জানেন। খবর পেলেই সিনহা সাহেব চলে আসবেন।'

আশু জিজ্ঞেস করল, ‘খবর পেলে পুনে থেকে সত্মা কি চলে আসবেন না?’

দস্তিদার উত্তর দিল, 'মিসেস সিনহাকে আমি ব্যাপারটায় আগেই জড়াতে চাইছি না। খবর মি. সিনহার কাছেই আগে পৌঁছনো দরকার।'

আশু বলল, ‘পুনের টেলিফোন নাম্বারটা জানেন? আমাকে দিন, আমি একটা ব্যবস্থা করছি।'

দস্তিদার টেলিফোন নাম্বারটা দিয়ে বলল, ‘খবরটা পৌঁছে দাও। এর বেশি কিছু বোলো না। ওর রিঅ্যাকশনটা টেলিফোনেই বুঝতে পারবে। পুনের কোড নাম্বার জানো তো? লিখে নাও, জিরো টু ওয়ান টু। বাড়ির নাম্বার এই কাগজ থেকে লেখো।

ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় বিশুর কথাটা মনে পড়ল। আশু ঘুরে দাঁড়াল। দস্তিদার প্রশ্ন করল, ‘কী হল? কিছু বলবে?’

আশু উত্তর দিল, ‘ছেলেটার জন্য ওষুধ কিনতে হবে। যা দিয়েছিলেন তা তো শেষ হওয়ার মুখে।'

দস্তিদার পাঁচশো টাকা আশুর হাতে দিয়ে বলল, ‘দুমদাম খরচ কোরো না। বুঝে সুঝে চলবে। অসুখের বাড়াবাড়ি হলে হুট করে ডাক্তার দেখাতে বাইরে নিয়ে যাবে না।'

আশু কোনও কথা না বলে অনেক রাত্রে দোহাটায় ফিরে এল। অন্ধকার বারান্দায় পা দিয়েই শুনল ভেতর থেকে মৃদু গলায় বিশু গান গাইছে, ‘কেঁদে কেঁদে জনম গেল/চোখের জলে নদী হল/ তবু মা তোর দেখা পেলাম না/ কেন মা তোর এত ছলনা।'

আশু কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে দরজায় টুকটুক শব্দ করে ডাকল, ‘দিদা, ও দিদা।' দরজা খুলে দিল বিশু। বিশুর মুখের দিকে তাকিয়ে আশুর কপাল কুঁচকে উঠল। এক পা এগিয়ে এসে জানতে চাইল, 'কী হয়েছে রে বিশু?’

বিশু একবার তক্তপোশের দিকে তাকাল। অয়ন ওখানে একটা চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। ঘুমিয়েছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। আশুকে চোখের ইশারায় বারান্দায় নিয়ে এসে বলল, ‘আশুদা, কেস খুব খারাপ।'

আশু চমকে উঠে বলল, ‘খারাপ মানে? কেউ কি জানতে পেরে গেছে?’

বিশু মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ‘জানাজানির কথা বলছি না। অয়নের কথা বলছি। ওর জ্বরটা খুব খারাপ ধরনের। সন্ধের পর কাশতে গিয়ে গলা দিয়ে রক্ত বেরোল। অথচ কোনও ডাক্তার ডাকতে পারছি না।'

বিশুকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে। বিশুর মতো আশুর মধ্যেও চিন্তা আর উদ্বেগ ছড়াতে লাগল। বারান্দায় পায়চারি করতে করতে বলল, 'আমাদের কপালে যা আছে তাই হবে। কিন্তু ওই কচি ছেলেটাকে বিনা চিকিৎসায় রাখতে পারব না।'

বিশু সায় দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘আমারও সেই কথা। কিন্তু কোন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব?’

আশু হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। কয়েক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে বলল, 'আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে।'

বিশু অন্ধকারেই আশুর চোখের দিকে তাকাল। বারান্দার অন্ধকার এখন চোখে সয়ে এসেছে। বিশু জিজ্ঞেস করল, 'কী আইডিয়া?’

আশু বলল, ‘বড়লোকদের বাড়িতে বাঁধা ডাক্তার থাকে। সিনহা সাহেবেরও আছে। অয়নের জন্য থাকা উচিত। কাল সকালে অয়নের কাছ থেকে জেনে নিয়ে আমরা একজন কেউ চলে যাব ডাক্তারের চেম্বারে।'

বিশু মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ‘আইডিয়াটা ভাল। রাত্তিরে যেন অসুখটা না বাড়ে।' ঘরে এসে দস্তিদারের সঙ্গে যা যা কথা হয়েছে তা সবই বিশুকে বলল আশু। বিশু সব শুনে বলে ফেলল, ‘আমার গোড়াতেই মনে হয়েছিল এই কেসটা নিয়ে আমাদের লাট খেতে হবে।'

সকালের দিকে আবার কাশি উঠল অয়নের। কাশির শব্দে ঘুম ভাঙল আশু-বিশুর। তাকিয়ে দেখে তক্তাপোশের ওপর বসে কাশছে অয়ন, আর দিদা তাকে দু’ হাতে জড়িয়ে ধরে আছেন। দিদার ঠোঁট কাঁপছে। বিড়বিড় করে ঠাকুরকে ডাকতে ডাকতে বলে যাচ্ছেন, ‘ঠাকুর দয়া করো! ছেলেটাকে কষ্ট দিয়ো না ঠাকুর, দয়া করো।’

আশু-বিশু দু’জনেই উঠে দাঁড়িয়েছে। ওদের জেগে উঠতে দেখে দিদা আকুল কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘আশু-বিশু, তোরা বসে থাকিস না। কিছু একটা কর। ছেলেটার কষ্ট আর দেখতে পারছি না।'

গত রাত্রের আইডিয়াটা বিশুর মনে এসে গেল। অয়নের কাশি থামলে ওরা দু'জনেরই অয়নের পাশে বসে মাথায় আর পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে ডাকল, ‘অয়ন! অয়নভাই!’

ক্লান্ত চোখে অয়ন তাকাল। পাণ্ডুর মুখেও বড় মিষ্টি একটু হাসি। যেন দিনের প্রথম আলো গাছের সবুজ পাতায় দিনের প্রথম স্পর্শ রেখেছে। আশু বলল, ‘অয়নভাই, তোমাকে একটা কথা আমাদের বলা দরকার। আমরা তোমাকে এখানে কেন এনেছি সেটা কি তুমি জানো?’

অয়ন মাথা নাড়ল। মাথা নেড়েই বুঝিয়ে দিল, সে কিছু জানে না। বিশু বলল, ‘আমরা ব্যাডম্যান। মানে খারাপ লোক। তোমাকে ধরে এনে আটকে রেখেছি তোমার বাবার কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করব বলে। আমরা জানি, বাড়ির জন্য তোমার মন খুব কাঁদছে।'

অয়ন বলল, ‘মোটেও না। আমার এখানে দিব্যি ভাল লাগছে। দিদা আমায় কত ভালবাসে। কতরকমের গল্প শোনায়।

আমাদের বাড়িতে আমার জন্য এত ভালবাসা নেই।' আশু বলল, ‘তবুও ওটা তোমার নিজের বাড়ি। এটা তো তা নয়। আমরা হচ্ছি মন্দলোক। ছেলেধরা।'

অয়ন আবার হাসল। ঠোঁটের ওপর হাসিটাকে রেখে বলল, ‘জানি, তোমরা আমাকে ভয় দেখাচ্ছ। আমি মোটেও ভয় পাচ্ছি না। কেন পাব? আমি যে তোমাদের সবাইকে ভালবাসি। তোমরাও কত ভালবাসো। কেউ যদি কাউকে ভালবাসে তাহলে কি তার ক্ষতি করতে পারে?’

বুকে আগুনের ছ্যাঁকা লাগলে ভেতরটা যেমন জ্বলে ওঠে, আশু-বিশুর ভেতরটাও তেমনই জ্বলতে লাগল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে যখন চোখ তুলল তখন দেখল তাদের দিদা তাদেরই দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে আছে। চোখ নামিয়ে নিয়ে আশু অয়নকে বলল, ‘এরকম অসুখ তোমার আগে কখনও হয়েছে?'

অয়ন বলল, ‘এটাই তো আমার অসুখ।’

বিশু প্রশ্ন করল, ‘তোমার অসুখ হলে কোন ডাক্তার দেখেন?’

অয়ন উত্তর দিল, ‘রায় আঙ্কেল। সুনীলকুমার রায়। সল্টলেকে থাকেন।'

আশু একটু ভেবে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ডাক্তারবাবুর বাড়ির টেলিফোন নাম্বার জানো?’ অয়ন ঘাড় নেড়ে বলল, ‘জানি। কিন্তু জেনে কী হবে? এখানে তো তোমাদের ফোন নেই।'

শোয়ার আগে বালিশের পাশে মোবাইলটা লুকিয়ে রেখেছিল আশু। এবার সেটা বের করে এনে বলল, ‘তুমি নিজে এটা থেকে ফোন করো। বলবে বাড়ি থেকে করছ। আমাদের নামটাম বোলো না।'

মোবাইলটা হাতে নিয়ে বোতাম টিপতে টিপতে অয়ন বলল, ‘জানি৷’ বিশু আশুকে উদ্দেশ করে বলল, ‘এত সকালে ঘুমিয়ে নেই তো?'

অয়ন বলল, ‘ডাক্তার আঙ্কেল অনেক ভোরে ওঠেন। পার্কে হাঁটেন। তারপর বাড়ি ফিরে কাগজ পড়েন। সকাল আটটায় নিজের বাড়িতে দু’ ঘণ্টা রোগী দেখেন। তারপর হাসপাতালে যান।'

বিশু বলল, ‘ডাক্তারদের হেভি খাটতে হয় তাই না আশুদা।’

আশু কথা বলবার আগেই অয়ন ফোনে কথা বলতে আরম্ভ করল। ‘ডাক্তার আঙ্কেল, আমি অয়ন বলছি। আমাদের বাড়িতে তো কেউ নেই, সবাই পুনে গেছে। আমার আবার আগের মতো শরীর খারাপ। জ্বর, কাশি আর একটু রক্ত। আমি গোপালদাকে তোমার কাছে পাঠাচ্ছি। ওষুধ দিয়ে দিও। না না, এখন আমার দরকার নেই। দরকার হলে আমি আবার ফোন করব। হ্যাঁ, গোপাল ও আমাদের বাড়িতে কাজ করে।'

অয়ন মোবাইলটা বন্ধ করে আশু-বিশুর দিকে তাকাল। বিশু বলল, ‘গোপালকে পাঠাতে হবে তো তোমাদের বাড়িতে যেতে হবে। ব্যাস, তাহলেই ধরা পড়ে যাব।'

অয়ন বলল, ‘বিশুদা তুমি কিচ্ছু বোঝো না। তোমরা কেউ যাবে গোপাল হয়ে। ডাক্তার আঙ্কেল গোপালদাকে চেনে না।'

বিশু অয়নের দিকে তাকিয়ে তারিফ করার ভঙ্গিতে বলল, 'ইয়োর হেড ভেরি ভেরি ক্লিয়ার। তাহলে আশুদা, আমি সাইকেল করে চলে যাচ্ছি।'

অয়ন বিছানায় শুয়ে পড়তে পড়তে বলল, ‘যাওয়ার আগে ঠিকানাটা নিয়ে যেতে ভুলো না।

এতক্ষণ পর দিদা বলল, ‘সব ভাল করে জেনে আসবি। দিন-রাতের পথ্য, মাথা ধোয়ানো, গা মোছা এগুলো করা যাবে কি না। ওষুধ কেমন করে কখন কখন খাওয়াতে হবে।'

আশু বলল, ‘যাওয়ার আগে পকেট থেকে টাকা নিয়ে যাস।'

আশু উঠে এসে বসল অয়নের মাথার কাছে। অয়নের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তার নিজের ছেলেবেলার কথা মনে পড়ল। অসুখ হলে তার মা ঠিক এইভাবেই তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ছড়া কাটতেন। কতরকমের ছড়া। আজ আর তার একটাও মনে নেই।

ডাক্তারের কাছ থেকে বিশু ফিরে এল ঘণ্টাতিনেক বাদে। হাতের পলিব্যাগে কয়েকটা ওষুধ। দিদাকে ডেকে বলল, ‘ভাত, দুধ, মাছ, সব খেতে পারবে। ওষুধগুলো তুমি বুঝে নাও।'

দিদা ওষুধ বুঝে নিতে নিতে বলল, ‘ব্যামোটা কী তা কিছু বললে?

বিশু বলল, ‘ইংরেজি অসুখ। তুমি বুঝবে না।’

বিশু বাইরে এল। পেছন পেছন আশুও। আশু জিজ্ঞেস করল, ‘অসুখটার নাম কী?’ বিশু উত্তর দিল, ‘সে বড় কঠিন নাম। নামটা মনে করতে পারছি না।' আশু বলল, ‘যক্ষ্মা!’

বিশু মাথা নেড়ে বলল, ‘বাংলা নাম নয়। ইংরেজি নাম। ইংরেজিতে বললেন।' আশুর বিশুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুই মনে করবার চেষ্টা কর। তোর স্মরণশক্তি তো ভাল।'

বিশু বলল, ‘বাংলায় বললে স্মরণ থাকত। ইংরেজি বলেই তো গণ্ডগোল করে দিয়েছে।' আশু বলল, ‘শোন, আমি যেসব রোগের ইংরেজি নাম জানি তার একটা একটা করে বলে

যাচ্ছি। মিলে গেলে মাথা নাড়বি।’

আশু একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘থাইসিস?’

বিশু উত্তর দিল, ‘নো।’

আশু আবার বলল, ‘জন্ডিস?’

বিশু এবারও বলল, ‘নো।'

আশু বলল, ‘টাইফয়েড?’

বিশু মাথা নেড়ে বলল, ‘নো।’

আশু হতাশ হয়ে বলে ফেলল, 'আমার আর স্টক নেই। থাকলেও মনে আসছে না। আচ্ছা নিউমোনিয়া হতে পারে কি?’

বিশু বলল, ‘ধ্যাত, এ তো আলিবাবার গল্পের চিচিং ফাঁক হয়ে যাচ্ছে।'

আশু বলল, ‘এই রোগটা তো অয়নের নতুন নয়। ও নিশ্চয়ই জানে। ওকেই জিজ্ঞেস করি।'

বিশু বলল, ‘করে দেখতে পারিস, কিন্তু হলপ করে বলতে পারি এতবড় রোগের নাম আমি জীবনে শুনিনি।

অগত্যা আবার ঘরে এল। অয়নকে তখন দিদা দুধ আর বিস্কুট খাওয়াচ্ছে। খাওয়া শেষ হওয়ার পর বিশু বলল, ‘অয়নভাই কোনও চিন্তা নেই। এবার তুমি ভাল হয়ে যাবে। তোমার এই অসুখটার নাম তুমি জানো?’

অয়ন মাথা নেড়ে বলল, ‘জানি। অসুখটার নাম এট্রিয়াল সেপটাল ডিফেক্ট।' দিদা আঁতকে উঠে বললেন, ‘ও রে বাবা! এত খটমট নাম।'

বিশু আশুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী বলেছিলাম! এটা মনে রাখা সহজ কাজ?’ অয়ন বলল, ‘মনে রাখার জন্য সংক্ষেপে সোজা একটা নাম আছে।'

বিশু বলল, ‘সোজা নামটা বাতলাও তো।'

অয়ন বলল, ‘এটা মনে রাখা খুব সহজ। নামটা হল এ এস ডি।’

আশুর সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল পুনেতে একটা ফোন করা উচিত। পুনের এস টি ডি কোডটা এবং নাম্বার তার লেখা আছে। কথাটা বলবার জন্য বিশুকে বাইরে ডাকল আশু।

বিশু বলল, ‘দেরি করে কাজ নেই। সাইকেল করে কিছুটা গেলেই বাইরে ফোন করার বুথ আছে। আসল কথা কী জানো আশুদা, অয়ন রোগটার নাম জানে কিন্তু রোগটা কেমন তা জানে না।'

আশু বিশুর সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছিল। হেঁটে যেতে যেতেই বলল, ‘তুই জানিস?' বিশু বলল, ‘আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে সব জেনেছি। বুকের মধ্যে হার্ট থাকে না,

সেই হার্টে অয়নের ফুটো। যত সময় যাবে ফুটোটা বাড়তে থাকবে।'

আশু চলতে চলতে থেমে গেল। এমন রোগ মানুষের হয় এটা আশুরও জানা ছিল না। আশু বলল, ‘তাহলে কী হবে? অয়নটা মরে যাবে?’

বিশু এক পা এগিয়ে এসে আশুর দিকে তাকাল। দোহাটার জংলা পথে সকালের আলো বেড়ে গেছে। অল্প অল্প হাওয়ায় সেই জংলা গাছগুলো মাথা দোলাচ্ছে। তারই মাথায় মাথায় উড়ে বেড়াচ্ছে কয়েকটা রঙিন ফড়িং। বিশু আস্তে আস্তে আশুর কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘ডাক্তার বলেছে ভেলোরে কিংবা বিদেশে নিয়ে গিয়ে অপারেশন করতে।'

আশু অবিশ্বাসের ঢঙে মাথা নাড়তে নাড়তে বলে উঠল, ‘অসম্ভব। হার্টের ফুটো কেমন করে সেলাই করবে। হার্ট ব্যাপারটা বুঝিস?’

বিশু উত্তর দিল, ‘আমিও তোমার মতো ডাক্তারকে বলেছিলাম, 'স্যার, জামা কাপড় রিফু হয় জানি। বুকের ভেতরে হার্ট, সেটা কেমন করে সেলাই হবে?”

আশু জানতে চাইল, ‘ডাক্তার স্যার কী বললেন?’

বিশু বলল, ‘একটা ধমক দিয়ে বললেন, অপারেশন করতে হবে। হাজার হাজার ছেলেমেয়ের অপারেশন হচ্ছে। ভালও হয়ে যাচ্ছে। তবে এর জন্য লাখ দেড়-দু’ লাখ খরচ আছে। অয়নের বাবা তো সব জানে।'

পায়ে হাঁটা পথ পেরিয়ে এসে দু’জনে সাইকেলে উঠল। বাজারে ঢোকার মুখে একটা এস টি ডি বুথ। বিশু বলল, ‘পুনের নাম্বারটা দে।’

আশু বিশু কাগজে লেখা নম্বরটা নিয়ে দেখতে দেখতে বলল, ‘কোথায় কী বলতে হয় সেটা আমি জানি। তুমি পাহারা দাও। এই খোপে কাউকে ঢুকতে দিয়ো না।'

প্রশ্ন করল, ‘তুই ফোন করবি? কিন্তু দেখ ইংরেজি বলিস না।’

বিশু টেলিফোন করার পর ফোনটা বাজতে লাগল। বারতিনেক বাজবার পর একজন বলল, ‘হ্যালো ! কিসকো মাংতা?’

বিশুর উত্তর, ‘মিসেস সিনহা কো? বহুত জরুরি হ্যায়। হাম উনকো রিস্তেদার। তুরন্ত ফোন দিজিয়ে। আই মিন, জলদি।'

একটু পরে টেলিফোনে রাশভারী মহিলার গলা পেয়ে বিশু বলল, ‘কৌন! মিসেস সিনহা?’

ওদিক থেকে উত্তর এল, ইয়েস, মলি সিনহা স্পিকিং।'

এবার বিশু বলে উঠল, ‘মলিমাসি, মাই নেম সামথিং। বাট মেনি মেনি বিপদ।'

ওদিক থেকে ক্রুদ্ধ জিজ্ঞাসা এল, ‘হুজ স্পিকিং?

বিশু বলল, ‘মাসিমা, আমাদের চিনবেন আমরা ফ্যাসাদে পড়ে গেছি। আপনার বর, মানে সিনহা সাহেব তো কানাডা না লন্ডন কোথায় যেন গেছেন। ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে না বলে আমাদের স্যার মুক্তিপণের টাকাটাও চাইতে পারছে না। এদিকে অয়নের শরীর খারাপ। হার্টের ফুটো বাড়ছে। একটা কিছু ব্যবস্থা করুন।'

না। আপনাদের ছেলে অয়নকে কিডন্যাপ করে

ওদিক থেকে মলি সিনহার উত্তেজিত গলা, 'আমাদের বাড়ির ছেলেকে কিডন্যাপ করে আমাকে মাসি বলা হচ্ছে। যদি ভাল চাও এখনই ছেলেকে বাড়িতে দিয়ে এসো।'

বিশু বলল, ‘এ কী বলছেন মাসিমা। কিছু টাকা অন্তত দিন। তা ছাড়া অয়ন অসুস্থ। ওর অপারেশন দরকার। আমরা এখন কোথায় যাব?’

ওদিক থেকে মলিদেবী গর্জন করে উঠে বললেন, ‘গো টু হেল।’

বিশু বলল, ‘মাসিমা, ওটা আপনার নতুন ঠিকানা? কোথায়? কলকাতা না পুনে? ফ্ল্যাট নাম্বার আর রাস্তার নাম বলুন।'

মলিদেবী ‘রাবিশ’ বলে ফোন রেখে দিলেন।

বিশু তাজ্জব বনে গেল। মনে মনে ভাবল, আরে বাবা সৎ হোক আর অসৎ হোক মা তো! ছেলের এত বড় বিপদে এমন করল!

সব শুনে আশু বলল, 'আমি মোবাইলে ফোন করে স্যারকে জানিয়েছি। স্যার বলল, কোনওরকমে টিকিয়ে রাখতে। দু’-দশদিনে মরবে না। কিন্তু টাকা না পেয়ে ছাড়া চলবে না।'

বিশু যেন আর কিছু ভাবতে পারছে না। একটু অসহায়ভাবে আকাশের দিকে তাকাল। আকাশে দুটো ঘুড়ির প্যাঁচ চলছে। বিশু সেদিকে তাকিয়ে বলল, ‘আশুদা, তোমার একটা ভাই ছিল না?’

আশু একবার বিশুর দিকে তাকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিতে নিতে বলল, ‘ছিল, কিন্তু আজ আর নেই। থাকলেই বা কী হত! আমাদের মতোই হত।'

বিশু আর একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে ঘুড়ি দুটোকে দেখতে দেখতে বলল, ‘জানো আশুদা, আমার প্রায়ই সেই রিকশাওলা বাবার কথা মনে হয়। রাস্তার ধার থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে বড় করেছিল। কিন্তু গলায় রক্ত তুলে আমার সেই বাবা যেদিন মারা গেল সেদিন আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেঁদেছি। কিন্তু কিছু করতে পারিনি। মাকে উপোস করতে মরতে দেব না বলে চুরি করতে শুরু করেছিলাম। তবুও মা রইল না।'

আশু মন্ত্র পায়ে এগিয়ে যাচ্ছিল রাস্তার দিকে। শরৎ এখনও আসেনি, তবুও আকাশের রং নীল হতে শুরু করে দিয়েছে। মেঘগুলো শিমুল তুলোর মতো। বাজারের পাশে ছোট্ট একটা চায়ের দোকানে আশু বসল। দোকানের পাশেই লম্বা একটা শিশুগাছ। সেই গাছের গায়ে টিনের ছোট ছোট বিজ্ঞাপন পেরেক দিয়ে আটকানো। আশু সেই বিজ্ঞাপনগুলো দেখতে লাগল। কোনওটাতে লেখা, ‘পাতকুয়ার মিস্ত্রি চাই? যোগাযোগ করুন'। তারপরেই ঠিকানা। অন্যটাতে লেখা, ‘উইপোকা মারার ওষুধ’। আর একটাতে ‘স্বপ্নপ্রদত্ত অর্শের ওষুধ’। ঠিক তারই নীচে একটা বিজ্ঞাপনের দিকে আশুর চোখ আটকে গেল। ‘সর্বব্যাধি নিরাময়। মূল্য মাত্র পঁচিশ টাকা। যোগাযোগ, তন্ত্রসাধক বোমকালী ব্যোমকেশ। গো-হাটা পশ্চিম, শ্মশানকালী মন্দিরের বিপরীতে।

বিশু চায়ের অর্ডার দিয়েছিল। আশু চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, গোহাটার শ্মশানটা এখান থেকে কদ্দূর?’

চায়ের দোকানদার গ্লাসে চামচে দিয়ে চিনি নাড়তে নাড়তে উত্তর দিল, ‘এখান থেকে তা প্রায় সাত-আট কিলোমিটার হবে।'

বিশু চা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল, ‘ও আশুদা, শ্মশানের ঠিকানা নিয়ে কী হবে? আমাদের ওখানে যেতে এখনও ঢের দেরি।'

আশু আঙুল দিয়ে বিশুকে বিজ্ঞাপনটা দেখাল। আশু জানে, বিশু ওই বাংলা লেখাটা ঠিক পড়তে পারবে।

বিশু ফিসফিস করে বলল, ‘গুল দিচ্ছে না তো।'

আশু বলল, ‘চল না, একবার গিয়েই দেখা যাক। মোটে তো সাত-আট কিলোমিটার। বিশু বেঞ্চি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'চল, ঘুরেই আসা যাক।'

ব্যোমকেশবাবার আশ্রম থেকে ওষুধ নিয়ে ওরা ফিরে এল ভরদুপুরে। দু'জনকে বারান্দায় দেখেই দিদা বলে উঠলেন, ‘তোদের আক্কেল কেমনধারা রে! ছেলেটার অমন কঠিন ব্যামো তাকে রেখে তোরা সাতসকালে কোথায় চরতে গিয়েছিলি? ছেলেটার গলা দিয়ে আবার রক্ত বেরুল। সকালে যতটুকু খেয়েছিল সবই উগরে দিল। তোরা ওর দাদা! চোখ বুজে সব দেখছিস।'

ওরা কোনও কথা বলল না। ব্যোমকেশবাবার ওষুধ খাইয়ে দিয়ে ভাবল, দেখা যাক কী হয়!

প্রকৃতির নিয়মে কোনও ছেদ নেই। দিন ফুরোয়, রাত আসে। রাত চলে গিয়ে আবার নতুন একটা দিন। এইভাবে আরও কয়েকটা দিন চলে যাওয়ার পর আশু স্যারকে বলল, ‘স্যার ছেলেটার চিকিৎসা দরকার।'

স্যার বলেন, ‘এই চিকিৎসার জন্য কত টাকা লাগবে তা জানো?’

বিশুই উত্তর দেয়, ‘জানি। দেড় থেকে দু’ লাখ টাকা।’

স্যার তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, ‘এত টাকা কে দেবে? তোমরা?’ আশু বলে, ‘স্যার আমরা কোথায় পাব? টাকাটা আপনি দিন, মুক্তিপণের সঙ্গে সেই টাকাটা যোগ করে দেবেন।'

স্যার তীব্র ভর্ৎসনার সুরে বলে, ‘তার মানে আমার জেলে যাওয়ার ব্যবস্থাটা পাকা করতে চাইছ। টাকার মর্ম বোঝো? ছেলেটার জন্য অত দরদ দেখাতে হবে না।'

বিশু জিজ্ঞেস করে, ‘ছেলেটা যদি মরে যায়?’

স্যার পাইপে টান দিয়ে বলে, ‘মরে গেলে আমার ইনভেস্টমেন্ট জলে গেল। আমার এবং ছেলেটার, দু’জনের ভাগ্যই খারাপ। মরা ছেলে ঘরে রাখা যাবে না। তোমাদের দোহাটার খালে ফেলে দিয়ো।

আশু উঠে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে বিশুও। ক্রোধে; অপমানে ওদের দু'জনের মুখ থমথমে। বুকের মধ্যে একটা রাগ ফোঁস ফোঁস করে গর্জন করছে।

স্যার বলল, ‘একটু অপেক্ষা করো। অন্য একটা কাজ আছে।'

আশু জিজ্ঞেস করল, 'কী কাজ?’

স্যার বলল, ‘ছেলেটার কেসটা তো কানাডায় গিয়ে আটকে গেল। ওর বাবা খবর না পেলে কিছুই হওয়ার নয়। ভরসা ছিল। সলিসিটর ভদ্রলোক। উনিও গতকাল সেরিব্রাল হয়ে হাসপাতালে। একেবারে কোমা স্টেজ। জ্ঞান নেই।'

বিশু জানতে চাইল, ‘তাহলে আমরা কী করব?

স্যার বলল, ‘অন্য কাজ দিচ্ছি। ওয়াটগঞ্জের বাদশাকে চেনো তো?’

আশু বলল, ‘চিনি।’

স্যার উঠে দাঁড়াল। ঘরের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে বলল, ‘আজ রাত ঠিক ন'টায় বাদশার দোকানে যাবে। বাদশা তোমাদের হাতে একটা ব্যাগ দেবে। ব্যাগটা নিয়ে সোজা আমার বাড়িতে আসবে।'

বিশু জিজ্ঞেস করল, ‘ব্যাগটায় কী আছে?’

স্যার উত্তর দিল, ‘তা তো জানার দরকার নেই।'

বিশু বলল, ‘দরকার আছে স্যার। যদি ব্যাগের মধ্যে বেড়ালছানা থাকে, তাহলে একরকম করে ব্যাগ আনতে হবে। যদি সোনা বা ওই ধরনের কিছু থাকে, তাহলে অন্যরকম। আর টাকা থাকলে সেটা আনার কায়দা অন্য হবে।'

স্যার জানে আশু-বিশু তার বিশ্বস্ত লোক। তাই বলল, ‘ধরো যদি টাকা থাকে?’

বিশু এবার আশুর দিকে তাকাল। আশু বলল, “বিশু ঠিকই বলেছে। সব জিনিস একভাবে আনা যায় না। বাদশা যে ব্যাগে টাকা দেবে সেই ব্যাগ পথে আসতে আসতেই বদলাতে হবে। প্রথমে হেঁটে আসব, তারপর ট্যাক্সি। আপনার বাড়ির সামনে নামব বাস থেকে।'

স্যার যেন খুশি হল। পাইপে টান দিয়ে বলল, “ঠিক আছে। তোমরা এখনই বেরিয়ে পড়ো।' স্যার মাত্র দুশো টাকা ওদের দিয়ে বলল, ‘অনেক টাকা তোমাদের দেওয়া আছে। সব বোধহয় ফালতু হয়ে গেল। তবু এটা রাখো।'

আশু টাকাটা নিয়ে উঠে পড়ল।

বাদশার দোকান থেকে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে ওরা অটোতে উঠল। বাদশা বলেছিল, ‘আশু, স্যারকে বলিস, এতে এক লাখ আছে। বাকি জিনিসপত্র পরশু আসার কথা। জিনিসটা আমার ডেরায় আসবে ভোর চারটেতে। ওই রুটির গাড়িতে। জিনিস পেলে বাকি দেড় লাখ সেদিন এসে নিয়ে যাস।'

অটো থেকে নেমে ট্যাক্সি নিল। ইতিমধ্যে ব্যাগ বদলানো হয়ে গেছে। নীল ব্যাগ থেকে টাকাটা এসেছে সাদা রঙের ব্যাগে। ব্যাগের ওপর ভারতবর্ষের ম্যাপ। তার তলায় স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের সেই বহুল পরিচিত স্মারকচিহ্ন। যা বাসের পেছনেও দেখা যায়। ট্যাক্সি থেকে নেমে ওরা বাসের জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। বাস থেকে নেমে স্যারের বাড়ির দিকে যেতে গিয়ে থমকে গেল। বড় রাস্তা থেকে একটা রাস্তা ভেতরে গেছে। সে রাস্তার ডানদিকে স্যারের বাড়ি। বাঁদিকে অর্থাৎ স্যারের বাড়ির উলটোদিকে একটা ডেকরেটরের দোকান। বড় রাস্তা থেকে হেঁটে গেলে স্যারের বাড়ি বড়জোর দু’ মিনিট। কিন্তু ভেতরে ঢোকার যে রাস্তা, সেই রাস্তার মুখে একটা পুলিশ জিপ। আশু বিশুকে বলল, ‘সাবধান। দেখেশুনে যেতে হবে।'

স্যারের বাড়ির সামনে কী অবস্থা, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। আশু-বিশু রাস্তার উলটোদিকের ফুটপাথে গিয়ে দাঁড়াল। ফুটপাথে একটা লোক লিট্টি বিক্রি করছিল। আশু বলল, ‘শুধু শুধু দাঁড়িয়ে থাকলে পুলিশ সন্দেহ করবে। আমরা বরং লিট্টি খাই।'

লিট্টি তো চাইলেই পাওয়া যায় না। ওটা গরম গরম খেতে হলে নতুন করে বানানোর জন্য একটু অপেক্ষা করতে হয়। ওদের তো এখন অপেক্ষা করারই দরকার।

ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করার পর বিশু বলল, ‘আশুদা, এরপর তো লাস্ট ট্রেনও চলে যাবে।'

আশু বলল, ‘কী করব, তাই ভাবছি।'

বিশু বলল, ‘দোহাটায় চল। ওখান থেকে স্যারকে ফোন করব।'

আশু যেন ভয় পেল। ভয়ের গলাতেই বলল, ‘এত রাত্রে এত টাকা নিয়ে দোহাটায় যাব?’

বিশু তাচ্ছিল্যের ভঙ্গি করে বলল, ‘এর চেয়েও বেশি টাকার জিনিস আমাদের ঘরে। এখন তো অয়নের দাম দশ লাখ। তা ছাড়া ভাবছ কেন আশুদা, শিয়ালদা থেকে শাক-পাতা বাজার করে ব্যাগে নিয়ে নেব। কেউ বুঝতেই পারবে না। তা ছাড়া আমরা তো খালি হাতে বেরোই না। সঙ্গে তো যন্তর আছে।'

আশু একটু ভেবে বলল, ‘তবে তাই চল। ফিরে গিয়ে ফোন করব।'

ওরা শিয়ালদহে এসে স্যারকে ফোন করল। ফোনটা ধরতে একটু সময় নিল। খানিক পর স্যার ফোন ধরে বলল, ‘কে?’

আশু চাপা গলায় নিজেদের নাম বলতেই স্যার বিব্রত গলায় বলে উঠল, ‘এখন আমি ব্যস্ত আছি। কাল কথা হবে।'

আশু বুঝে গেল স্যারের এখন কথা বলার অসুবিধে আছে। অতএব, ওরা সোজা দোহাটায় চলে এল। অয়ন এখানে আসার পর বারান্দার বাতি জ্বালানো হয় না। অন্ধকারের মধ্যে বোঝাই যায় না যে, ওখানে একটা বাড়ি আছে। দরজায় টোকা দিয়ে অন্যদিনের মতো বিশু ডাকল, ‘দিদা, ও দিদা, দরজা খোলো। আমরা এসে গেছি।'

দরজা খুলে দিয়েই দিদা মুখিয়ে উঠে বললেন, ‘তোরা কি মানুষ? কচি ছেলেটাকে মেরে ফেলতে চাস? এখানে এভাবে রাখলে ও নির্ঘাত মরে যাবে।'

বিশু আর আশু দু’জনেই অয়নের দিকে তাকাল। বিশু বলল, ‘ডাক্তারবাবুকে ফোন কর।' আশু ডাক্তারবাবুকে ফোন করে সব বলতেই ডাক্তারবাবু বললেন, ‘আমি তো বলেই দিয়েছি, অপারেশন ছাড়া আর কোনও পথ নেই। ভেলোরে ডাক্তার নটরাজন আমার বন্ধু। আমি ওঁকে দিয়েই অপারেশনটা করাতে চাই।'

আশু বলল, ‘কিন্তু স্যার, আমাদের বাবু তো কানাডায়। কবে ফিরবে তা তো জানি না।' ডাক্তারবাবু বিরক্ত গলায় বললেন, 'তাহলে আর কী হবে। কষ্ট পেয়ে ছেলেটা মরুক। আমি তো মি. সিনহাকে নভেম্বরে অপারেশন করাতে বলেছিলাম। কিন্তু পেশেন্ট তো ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। এখনই অপারেশন দরকার।'

আশু এক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে বলল, 'স্যার, আপনি ভেলোরে কথা বলুন। টাকা জোগাড় করে দেব।'

ফোনটা বন্ধ করার পর বিশু বলল, 'টাকাটা জোগাড় করব কেমন করে?’

আশু ঘুমন্ত অয়নের দিকে তাকাল। রোগক্লিষ্ট পাণ্ডুর মুখে কষ্টের চিহ্নটা এখন বড় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আশু বিশুর কাঁধে হাত রেখে মুখটা কানের কাছে এনে ফিসফিস করে বলল, ‘কালই ডাক্তারবাবুকে গিয়ে আমরা এক লাখ টাকা দিয়ে আসব। টাকাটা তো আমাদের কাছেই আছে। তুই কী বলিস?’

বিশু উত্তর দিল, ‘আর নো বলাবলি। পাপের ধন পুণ্যে যাক। অয়ন বাঁচুক। তারপর স্যারের সঙ্গে আমরা বুঝে নেব।'

আশু বলল, ‘এরপরেও আরও লাখ দেড়েক দিতে হবে।'

বিশু বেপরোয়া ভঙ্গিতে বলল, 'দুটো জেন তুললেই হয়ে যাবে। মিশ্রজিকে সরাসরি বেচে দেব।'

পরদিন খুব ভোরে দু'জনেই ডাক্তারবাবুর বাড়িতে গিয়ে হাজির। টাকাগুলো ডাক্তারবাবুকে দিয়ে আশু বলল, ‘স্যার অয়নকে নিয়ে আপনি ভেলোরে চলে যান। বাকি টাকা আমি দু’দিন পরে নিয়ে যাচ্ছি।'

ডাক্তারবাবু একটু ভেবে বললেন, ‘এই টাকাটা তোমাদের কে দিল?’

আশু আগে থেকেই এসব ভেবে রেখেছিল। অতএব, এক মুহূর্ত সময় না নিয়ে বলল, ‘অয়নের বড় মামা। উনি তো পক্ষাঘাতে শয্যাশায়ী, তাই সব শুনে টাকাটা আমাদের হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন।'

ডাক্তারবাবু টাকার বান্ডিলটা ড্রয়ারে রেখে চাবি দিতে দিতে বললেন, ‘ভালই করেছ। নটরাজনের সঙ্গে গতরাত্রে ফোনে আমার কথা হয়েছে। ওর সিডনি যাওয়ার আগেই অপারেশনটা করাতে হবে। অয়নের সঙ্গে বাড়ির লোক কেউ যাবে না?’

বিশু উত্তর দিল, ‘শুধু দিদা যাবে। আপনারা যাওয়ার পর টাকা নিয়ে আমরা পৌঁছে যাব।' ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসার পরই আশুর পকেটে রাখা মোবাইলটা বেজে উঠল। আশু মোবাইলটা কানে তোলবার আগে বলল, 'নিশ্চয়ই আমাদের দস্তিদার স্যার।' বিশু বলল, ‘রং নাম্বার বলে কাটিয়ে দে।'

আশু ‘হ্যালো’ বলতেই দস্তিদার বলল, ‘কাল রাতে একটু অসুবিধে ছিল। পুলিশের একজন বড়কর্তা আমার সঙ্গে বসে। সে আবার তোমাদের চেনে। তোমরা টাকা নিয়ে এখনই রওনা দাও।'

আশু এবার মোবাইলটা অফ করে রাখল। সাইকেলের পেছনে বসতে বসতে বলল, ‘অয়নকে ভেলোরে পাঠাবার আগে স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করব না।' বিশু বলল, ‘যদি বাড়িতে লোক পাঠায়?

আশু বলল, ‘বাড়িটা ছেড়ে অন্য জায়গায় গিয়ে থাকব। সঙ্গে দিদা আর অয়নও যাবে। এখনই সব ব্যবস্থা করে ফেলতে হবে। সারাজীবন অন্যায় করে কাটালাম, এবার একটু ন্যায় করতে ইচ্ছে হচ্ছে।'

সেই রাত্রেই বিড়লা তারামণ্ডলের কাছ থেকে একটা গাড়ি তুলে ওরা চলে গেল। মিশ্রজির গ্যারাজে। মিশ্রজি গাড়িটা দেখতে দেখতে খুশি হয়ে বললেন, ‘চমৎকার হাত তোমাদের। এ একেবারে নতুন। সিটের ঢাকনা খোলেনি। তোমরা দস্তিদারকে ছেড়ে আমার হয়ে কাজ করো।'

বিশু বলল, ‘ওসব পরে ভাবা যাবে। আগে টাকা দিন।'

গাড়িটা দেখতে দেখতে মিশ্রজি বললেন, ‘এসব নতুন-পুরনোতে দামের খুব একটা তফাত হয় না।'

আশু বলল, “নিশ্চয়ই হয়।'

মিশ্রজি বললেন, ‘চল্লিশ নাও।'

বিশু মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, 'আমাদের হাতে সময় নেই। অন্তত পঞ্চাশ না দিলে গাড়ি নিয়ে চললুম।'

শেষ পর্যন্ত পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা নিয়ে ওরা হাওড়ার পিলখানা বস্তিতে চলে এল।

কয়েকদিনের জন্য এখানেই গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে। আর তো মোটে দু'টো দিন। তারপরেই অয়ন আর দিদাকে নিয়ে ডাক্তারবাবু ভেলোরে চলে যাবেন।

হাওড়া স্টেশনে ওদের গাড়িতে তুলে দিয়ে আশু-বিশু দাঁড়িয়ে ছিল জানলার সামনে। অয়ন দু’ হাত দিয়ে দু’জনের হাত ধরে রেখেছে। ভেজা ভেজা গলায় বলেছে, ‘দাদা, তোমরা কবে আসবে? তোমরা না এলে আমি ভাল হব কী করে? সত্যি, আসবে তো!’

দু’জনেরই গলা বুজে আসছে কান্নায়। কেউ কথা বলতে পারছে না। কেবল মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে, আসব, নিশ্চয়ই আসব।

ট্রেন ছেড়ে দেওয়া পর্যন্ত ওরা দাড়িয়ে রইল। জানলা দিয়ে অয়ন হাত নাড়ছে। এক সময় ওর ছোট্ট হাতটা ছোট হতে হতে মিলিয়ে গেল। বিশু হাত দিয়ে চোখের জল মুছছে। আশু নিজের চোখটা মুছে নিয়ে বলল, ‘বিশু, চল এবার ফেরা যাক।'

কিন্তু ওদের কোথাও ভাল লাগছে না। দিদা নেই, অয়ন নেই। ঘরে ফেরার কোনও টানই ওরা অনুভব করছে না। মাত্র কয়েকদিনে অয়ন বড় বেশি আপন হয়ে উঠেছিল। আশুর কেবলই তার ভাইটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। ওইরকম বয়সেই তো সে চলে গেল। বিশু বলল, ‘আরও তো টাকা লাগবে?’

আশু মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ‘সিনহা সাহেবের বাড়িতে গিয়ে চিঠি দিয়ে আসব। তাতে সব কথা জানানো থাকবে। সিনহা সাহেব ফিরে এলে যেন ছেলের হদিশ পান।'

সকালবেলা সিনহা সাহেবের দরোয়ানের হাতে চিঠিটা দিতে গিয়ে শুনল সাহেব আজ রাত্রে ফিরে আসছেন। দরোয়ান চিঠিটা নিয়ে পকেটে রাখল। ওরা দু'জনে শিয়ালদা স্টেশন চত্বরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে একটা পুলিশ জিপ সাঁ করে ছুটে এসে ওদের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। পালাবার কোনও উপায় নেই দেখে ওরা দাঁড়িয়ে রইল। পুলিশ জিপে ওঠার সময় আশু-বিশু দু’জনেই লক্ষ করল সাদা একটা অ্যামবাসাডর দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির নম্বরটা দু’জনেরই খুব পরিচিত। কিন্তু গাড়িতে কি দস্তিদার আছে?

বাবার সঙ্গে দোহাটার বাড়িতে এসে অয়ন বলল, ‘এই বাড়িতে আমার দুই দাদা থাকত। কিন্তু ওরা আমায় দেখতে গেল না কেন?’

সিনহা সাহেব সমস্ত ব্যাপারটাই ততদিনে জেনে গিয়েছেন। তাই বললেন, ‘ওরা এখন এখানে থাকে না। যদি ফিরে আসে, অবশ্যই আসবে, তাহলে তোমাকে দেখতে তোমার বাড়িতে যাবে। ওই বাড়িতে তো দিদা আছে।'

অয়ন উঠোনটার দিকে তাকাল। শিউলি আর বকুলের গাছটা বেশ বড় হয়েছে। ফুল ধরতে এখনও বাকি। উঠোনের পাশে আগাছার জঙ্গল থেকে মাথা তুলে দোল খাচ্ছে কয়েকটা কাশফুলের গাছ।

সিনহা বললেন, ‘এবার বাড়ি চলো।'

অয়ন বলল, ‘আমাকে একটা জিনিস দেখাতে নিয়ে যাবে?’ সিনহা বললেন, ‘কী?’

অয়ন উত্তর দিল, ‘জেলখানা।’

সিনহা সাহেব চমকে উঠে ছেলের দিকে তাকালেন। অয়ন শিউলি আর বকুলগাছ দুটোকে দেখতে দেখতে বলল, ‘বাপি, আমি সব জানি। দিদা আমায় বলেছে।' সিনহা সাহেব কথা বলতে পারলেন না। একটা গ্লানি তাঁকে ভেতরে ভেতরে কষ্ট দিতে লাগল।

.

আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী, ১৪০৬

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%