ললিত ভবন

দুলেন্দ্র ভৌমিক

সদ্য চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর ব্রিগেডিয়ার সৈকত সমাদ্দার ভাবছিলেন অবসরের দিনগুলো কোথায় কেমনভাবে কাটাবেন? চাকরিজীবনে দিন কেটেছে একেবারে ঘড়ির কাঁটা ধরে। একদিনের জন্যও অনিয়ম হয়নি। কখনও কখনও সীমান্তে গণ্ডগোল বাধলে তখন তো আলাদা ব্যাপার। উত্তেজনা, সীমান্ত রক্ষার তদারকি, ম্যাপ খুলে অধস্তনদের সঙ্গে আলোচনা, এইসব করতে করতেই অনেক বছর কেটে গিয়েছে। এই একঘেয়ে জীবন থেকে যখন মুক্তি মিলল, সৈকত সমাদ্দার ভাবলেন, এবার জীবনটা অন্যরকমভাবে কাটাবেন। কিন্তু সেই ‘অন্যরকমটা’ কেমন? সেই কথাটা ভাবতে ভাবতেই একদিন কাগজে একটা ছোট্ট বিজ্ঞাপন চোখে পড়ল। সেই বিজ্ঞাপনখানা দেখে তিনি স্ত্রীকে বললেন, ‘জানো, দক্ষিণ বারাসাতের একটা জায়গার নাম ‘নাইয়ারচক’। ওই নাইয়ারচকে একটা ভূতুড়ে বাড়ি বিক্রি আছে। কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছে। চলো, একবার গিয়ে বাড়িটা দেখে আসি। পছন্দ হলে কিনে নেব।'

সৈকত সমাদ্দারের স্ত্রী সুনন্দা বললেন, ‘বাড়ি দেখতে যাওয়ার আগে ভাল করে ভেবে নাও, যদি পছন্দ হয়ে যায় তবে কি সত্যিই কিনবে?’

সৈকত সমাদ্দার উত্তর দিলেন, 'কিনলে ক্ষতি কী?’

সুনন্দা চোখ বড় বড় করে স্বামীর দিকে তাকালেন। পরে বললেন, ‘ভূতদের সঙ্গে থাকতে পারবে?'

সৈকত সমাদ্দার বললেন, ‘ভূতটুত সব বাজে ব্যাপার। তা ছাড়া একটু ভেবে দেখলেই বুঝতে পারবে, ভূতের সঙ্গেই তো আমাদের দিন কাটছে। চেহারা বদলে গিয়েছে বলে চিনতে পারছি না। ওই বাড়িটি এক ধরনের হেরিটেজ বিল্ডিং। ওইসব বাড়িও এক অর্থে বিরল প্রজাতির মতো। কেউ কিনে ফেলার আগেই বাড়িটা আমি কিনে রাখতে চাই।' সুনন্দা বললেন, ‘তবে চলো, দেখে আসি।'

অন্য দশজন মহিলার মতো সুনন্দাদেবী আদৌ ভূতে ভীত নন। বরং তাঁর দীর্ঘদিনের শখ, বাঘ-সিংহ, গন্ডার, জলহস্তী ইত্যাদি প্রাণীদের দেখার জন্য যেমন বড় বড় শহরে পশুশালা আছে, তেমনই যদি প্রত্যেক শহরে একটা করে ‘ভূতশালা’ থাকত তবে টিকিট কেটে সেই ভূতদের চাক্ষুষ করে আসা যেত। ভূত নিয়ে নানা ধরনের বানানো গালগল্প শুনতে হত না। এবার নাইয়ারচকের ভূতওলা বাড়িতে গিয়ে যদি খানকয়েক সত্যিকারের ভূত দেখা যায়।

এক রবিবার সকালে একখানা কোয়ালিশ গাড়ি করে ওঁরা রওনা হলেন, সঙ্গে ড্রাইভার হনুমান সিংহ, ভাগনে নিতাই আর বাঘা। বাঘা কোনও সূত্রেই সৈকতবাবুর আত্মীয় নয়। কিন্তু ছেলেটি শক্তিধর এবং হরবোলা। যে কোনও পাখি অথবা জন্তু-জানোয়ারের ডাক ডাকতে পারে। লাদাখ থেকে ছেলেটিকে সৈকতবাবু এনেছিলেন। সেই থেকে এই বাড়িতেই আছে। ওর বাঘের ডাক শোনবার মতো। একেবারে নিখুঁত। এত নিখুঁত যে, একবার সুন্দরবনে সৈকতবাবুর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে এমন একখানা ব্যাঘ্রগর্জন গর্জে ছিল যে, উঁচু টঙের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পাহারাদার বন্দুকসমেত গড়িয়ে নীচে পড়ে গিয়ে ঝাড়া এক ঘণ্টা মাটিতে শুয়ে কেঁপেছিল। সৈকতবাবুর মতে, মানবদেহে এত দীর্ঘস্থায়ী কম্পন দেখা তো দূরের কথা, শোনাও যায়নি। ভাল বাঘের ডাক ডাকতে পারত বলে ওর ডাকনাম হয়ে গিয়েছিল ‘বাঘা’।

সকালে রওনা দিয়ে দুপুর নাগাদ সেই ভূতের বাড়িতে পৌঁছনো গেল। সাদা রঙের বিশাল বাড়ি। বাড়ি না বলে প্রাসাদ বলাই ভাল। কালো রঙের লোহার গেটের ওপর ছোট্ট একটা টিনের বোর্ডে সতর্কবাণী লেখা। যেমন অনেক বাড়িতে থাকে ‘কুকুর হইতে সাবধান’, তেমনই এই বাড়ির গেটে লেখা, ‘ভূত হইতে সাবধান।'

গেটের গায়ে একটা নাইলনের দড়ি ঝুলছে। সৈকতবাবু দড়ি ধরে টান দিতেই বাড়ির মধ্যে ঢং ঢং করে ঘণ্টাধ্বনি হল। তারপরেই দীর্ঘ চেহারার এক ভদ্রলোক দোতলার বারান্দায় এসে গেটের দিকে তাকালেন। সৈকতবাবু এবং তাঁর স্ত্রী, এমনকী গাড়ির ড্রাইভার হনুমান সিংহ, ভাগনে নিতাই আর বাঘা, সকলেই অবাক হয়ে ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ফরসা লোক জীবনে অনেক দেখেছেন, কিন্তু এমন চুনকাম করা ফরসা মানুষ কখনও দেখেননি। শখের নাটকে বিশেষ করে ‘মিশরকুমারী’ নাটকে মিশরের ফারাও রামেসিসের ঢোলা ওভারকোটের মতো একটা পোশাক।

বারান্দার ওপর থেকেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘কাকে চাই?’

সৈকতবাবু বললেন, ‘আমরা কাগজের বিজ্ঞাপন দেখে আসছি। এই বাড়িটা নাকি...।' দোতলার বারান্দায় দাঁড়ানো ভদ্রলোক বলে উঠলেন, ‘ব্যস, ব্যস, আর বলতে হবে না। আপনি খদ্দের সেটা বললেই মিটে যায়।’ এবার দোতলার একটা ঘরের দিকে তাকিয়ে হাঁক দিলেন, ‘হারু, যা বাবা, গেটটা খুলে দিয়ে আয়। খদ্দের এয়েছে।'

একটি অল্পবয়সি ছেলে এসে লোহার গেটটা খুলে দিতে দিতে বলল, ‘আমার সঙ্গে আসুন।'

দোতলায় উঠে এসে একটা ঘরের সামনে দাঁড়ালেন। হারু নামের ছেলেটি একটা ঘরের দরজা খুলে দিয়ে বলল, ‘বসুন। স্যার আসছেন।'

বেশ বড় সাইজের একটা ঘর। ঘরের আসবাবপত্র সবই সাবেকি আমলের। ঘরের মধ্যে শ্বেতপাথরের গোল টেবিল। টেবিল ঘিরে খানপাঁচেক চেয়ার। হারু যেতে যেতে দরজা থেকে ঘাড় ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কী পান করবেন? চা না শরবত?’

সৈকতবাবু বললেন, ‘চা।’

হারুর প্রশ্ন, ‘চিনি ও দুধ সহযোগে, নাকি...?’

হারু কথা শেষ করার আগেই সৈকতবাবু বললেন, ‘চিনি চলবে, কিন্তু দুধ চলবে না।'

হারু চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পাঁচ কাপ চা টেবিলে এসে গেল। এত তাড়াতাড়ি কে চা করল আর কেই-বা দিয়ে গেল, সেটা ঘরের মধ্যে উপস্থিত পাঁচজনের কেউই বুঝতে পারলেন না। সম্ভবত সেই কারণেই সকলে সকলের দিকে তাকালেন। শুধু সৈকতবাবুর ভাগনে নিতাই বলল, ‘মামা, এত তাড়াতাড়ি পাঁচ কাপ চা তো জংশন স্টেশনেও বানিয়ে দিতে পারে না!’

সৈকতবাবু চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, 'আমরা এখন কোথায় বসে আছি তা জানিস? স্থানমাহাত্ম্য বলে একটা কথা আছে, সেটা ভুলিস না।'

একটু পরেই আবার সেই চুনকাম করা দীর্ঘদেহী ভদ্রলোক এলেন। সকলের দিকে তাকিয়ে হাত জোড় করে নমস্কার করলেন। হারু ওই ভদ্রলোকের জন্য একখানা চেয়ার এনে পেতে দিল। ভদ্রলোক চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, ‘বাড়িটা যখন কেনার শখ হয়েছে, তখন ওপর-নিচ একটু ঘুরেটুরে দেখবেন না?’

সৈকতবাবু বললেন, ‘সেসব পরে হবে। আমি আপাতত বায়না করে যেতে চাই। যাতে অন্য কেউ এসে...'

ভদ্রলোক বললেন, 'আপনাদের বুঝি ভূত দেখবার শখ হয়েছে? হওয়াই স্বাভাবিক। ওরা সংখ্যায় অনেক, কিন্তু অনেক হলে কী হবে, ওদের যে দেখা যায় না! যা আছে অথচ দেখা যায় না তার প্রতিই মানুষের আকর্ষণ বেশি।'

সৈকতবাবু বললেন, ‘আমি কিন্তু বায়না করব বলে কিছু টাকা সঙ্গে নিয়ে এসেছি।'

ভদ্রলোক বললেন, ‘তা বেশ করেছেন। তবে না আনলেও চলত। মানুষের কথার নড়চড় হয়, কিন্তু ভূতদের কথার নড়চড় হওয়ার জো নেই। এতেই বোঝা গেল ভূতেদের সঙ্গে আপনার এই প্রথম কাজ-কারবার। তবু আমার পক্ষে যা জানানো প্রয়োজন, সেগুলো জানিয়ে রাখছি।'

সৈকতবাবু এবং অন্যরা আগ্রহ নিয়ে ভদ্রলোকের দিকে তাকালেন। ভদ্রলোক বললেন, ‘এই বাড়িটা তিনতলা। দোতলা আর তিনতলায় মোট আটখানা ঘর। কিন্তু একতলায় অর্থাৎ গ্রাউন্ডফ্লোরে যে পাঁচখানা ঘর আছে সে ঘরগুলো কিন্তু ব্যবহার করা যাবে না।'

সৈকতবাবু প্রশ্ন করলেন, ‘কেন? বাড়ি কিনলুম আমি, অথচ একতলার ঘর ব্যবহার করতে পারব না কেন?’

ভদ্রলোক বললেন, ‘কলকাতা থেকে এতটা পথ ঠেঙিয়ে এসে যখন ভূতুড়ে বাড়ি কিনতে চলেছেন, তখন কি একবারও ভাববেন না, গোটা বাড়ির সব ঘর আপনাদের দখলে চলে গেলে ওই বেচারাগুলো চোদ্দোপুরুষের আশ্রয় ছেড়ে যাবে কোথায়? হতে পারে ভূত, কিন্তু তাই বলে কি ওদের প্রতি সমাজের কোনও দায়িত্ব নেই। ভূত কি গাছে ফলে? মানুষ থেকেই তো ভূত। কে বলতে পারে ওদের মধ্যে আপনার পূর্বপুরুষদের কেউ নেই?’

সৈকতবাবু ভেবে দেখলেন, কথাটা অগ্রাহ্য করার মতো নয়। তা ছাড়া ভূতসম্প্রদায় খেপে গিয়ে বিদ্রোহ করে কিনা, কিংবা ভূত-আন্দোলন, পথ অবরোধ, অর্থাৎ যা যা মানুষ করে, ভূত যদি তাই করতে পারে এবং করতে থাকে, তবে তো ভয়ংকর ব্যাপার। পুলিশ, প্রশাসন আর আইন তো তাদের ধরবে না, উলটে তারা এসে ধরবে সৈকতবাবুকে। তবে এটাও তো ঠিক, ভূতুড়েবাড়িতে যদি ভূতই না থাকে তবে আর ভূতুড়েবাড়ি কিনে কী লাভ?

এইসব কথা ভাবতে ভাবতেই সৈকতবাবু ভদ্রলোকের দিকে চোখ ফেরালেন। একটু কেশে নিয়ে গলাটা পরিষ্কার করে সৈকতবাবু বললেন, 'আপনার কথার মধ্যে যুক্তি আছে। বেশ, নীচের ঘরগুলো ছেড়ে দেব। ভূতবাবুরা ওখানে থাকুন। এত কাছাকাছি থাকবে, কিন্তু কোনও অনিষ্ট করবে না তো?’

ভদ্রলোক একটু হেসে বললেন, ‘কোনও ভয় নেই। বাড়ি বিক্রি হলেও আমি তো পুরো টাকা শোধ না হওয়া পর্যন্ত চিলেকোঠাতেই থেকে যাব। তবে একটা কথা মনে রাখবেন, মানুষ ছাড়া মানুষের বড় রকমের অনিষ্ট কেউ করতে পারে না। ভূতের সাধ্য কী যে, পৃথিবীজুড়ে দু’-দুটো বিশ্বযুদ্ধ বাধায়?’

সৈকতবাবুর স্ত্রী বললেন, 'আপনি কতদিন ধরে এই বাড়িতে আছেন? আপনার পরিবারের...’

ভদ্রলোক মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘আমার পরিবারের কেউ নেই। অর্থাৎ কেউ বেঁচে নেই। সকলেই মারা গিয়েছে। এই বাড়িটা আমি তৈরি করেছিলাম। বাড়িটার নাম ‘ললিত ভবন’। আমার ছেলেরা নামটা রেখেছিল। ললিতমোহন রায় অনেককাল আগে গত হয়েছে, কিন্তু আমার ছেলেদের দেওয়া নামটা রয়ে গিয়েছে।'

সৈকতবাবু বড় বড় চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, 'আপনার ছেলেদের দেওয়া নাম মানে?’

সেই ভদ্রলোক বললেন, ‘মানে খুব সোজা। আমার নামই ললিতমোহন রায়। একাত্তর বছর পাঁচ মাস চোদ্দো দিনে আমি মারা যাই। মারা যাই কলকাতার বেনেটোলায়। তারপর ফিরে আসি এই ললিত ভবনে। এখানে যারা থাকে তারা কোনও-না-কোনও সূত্রে আমার আত্মীয়, স্নেহভাজন বা জ্ঞাতি। মানুষের মধ্যে একান্নবর্তী প্রথা ভেঙে গেলেও, আমাদের ভূতসমাজে কিন্তু সে প্রথা এখনও লুপ্ত হয়নি। আমরা মিলেমিশে ভালই আছি।'

সুনন্দাদেবী বললেন, ‘দেখুন, জীবনে অনেককিছু দেখেছি, অনেক দেশ, অনেক রকমের মানুষ, অনেক সুন্দর সুন্দর জিনিস, কিন্তু কখনও ভূত দেখিনি। তাই ভূত দেখবার বড্ড শখ।' ভদ্রলোক একটু আগে, যিনি নিজেই বললেন, একাত্তর বছর পাঁচ মাস চোদ্দো দিন আগে তিনি মারা গিয়েছেন, সেই ললিত ভূতমহাশয় বললেন, 'তা কেন হবে? মনে করে দেখুন, অনেক জিনিসই আপনি এবং আপনারা কখনও দেখেননি। অফিস টাইমে ফাঁকা বনগাঁ লোকাল, মন্দিরে মন্দিরে জাগ্রত ভগবান, এরকম বহু জিনিস আছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ দেখতে পায় না।'

সৈকতবাবু বললেন, ‘আমরা এখানে হয়তো সারাজীবন থাকব না। এখন গোড়ার দিকে কিছুদিন থাকব। তারপর কলকাতায় চলে যাব। হয়তো মাঝে মাঝে দু'-তিনদিনের জন্য আসা হবে।'

ললিতবাবু মাথা নেড়ে বললেন, ‘পারবেন না। কিছুতেই পারবেন না।' সৈকতবাবু প্রশ্ন করলেন, ‘কেন? পারব না কেন?’

ললিতবাবু বললেন, ‘ইনজেনারেল সব ভূতরাই খুব স্নেহপ্রবণ হয়। মানুষকে খুব ভালবাসে। অথচ নানা সময়ে নিতান্ত অকারণে ভূতদের নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা, তাদের কণ্ঠস্বরের বিকৃতি ঘটানো এবং লম্বা লিকলিকে হাত-পা কল্পনা করে তাদের চেহারাকে বিচিত্রদর্শন করার বদ মতলব তো মানুষের মাথা দিয়েই বেরিয়েছে। অথচ কত সুন্দর সুন্দর চেহারার ভূত আর ভূতিনি অর্থাৎ পেতনি বোনেরা আছে, সে খবর কি মানুষ রাখে?’

সৈকতবাবু বললেন, ‘তা হলে এখানে ভূতের সন্ধান পাব, কী বলেন?’ ললিতবাবু বললেন, ‘হায় রে মানুষ৷ এখনও সন্দেহ গেল না। এই যে আমি আপনার সামনে বসে আছি, এই আমিটা বর্তমানে কে এবং কী? দিন, বায়নার টাকা দিন।'

এবার যেন কুয়াশার মতো একটা পাতলা ভয় ওঁদের পাঁচজনের শরীরকে আস্তে আস্তে জড়িয়ে ধরেছে। সৈকতবাবু নিজের ব্যাগ থেকে টাকার বান্ডিলটা বের করে বললেন, ‘বায়নার জন্য দশ হাজার টাকা এনেছি। চলবে তো ললিতবাবু?’

ললিতবাবু ‘আঃ,’ বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘কতকাল পরে একজন মানুষের কণ্ঠে ‘ললিতবাবু’ সম্বোধনটা শুনলুম। প্রাণ-মন জুড়িয়ে গেল। দাঁড়ান, আমি অ্যাডভান্স নেওয়ার রসিদটা নিয়ে আসি।'

এক পলকে উধাও হয়ে গিয়ে একটু পরেই ফিরে এলেন। জামার পকেট থেকে এক টুকরো কাগজ বের করতে করতে বললেন, ‘এইসব রসিদ, সইসাবুদ, দলিল, আমাদের সমাজে চলে না। আমরা সব কাজ করি মুখের কথায়। কিন্তু মানুষের সঙ্গে এবার কারবার করতে নেমে সেই মানুষের নিয়ম অনুসারেই করতে হল। অথচ দেখুন, অত লেখাপড়া, দলিল-দস্তাবেজ সব থাকা সত্ত্বেও সম্পত্তি নিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে মামলা। মা-ছেলেতে মুখ দেখাদেখি বন্ধ। ছিঃ ছিঃ! এরা আবার মানুষ! যাকগে, টাকাটা দিন...'

ললিতবাবু এবার সৈকতবাবুর দিকে হাত বাড়ালেন। আগেই বলেছি মিশরের ফারাও রামেসিসের ঢোলা ওভারকোটের মতো একটা পোশাকে তাঁর সর্বাঙ্গ ঢাকা ছিল। পোশাকের বাইরে ছিল গলা, মুখ আর মাথার ওইটুকু অংশই দেখে মনে হয় চুনকাম করা। এবার ঢোলা পোশাকের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল মেদবর্জিত একটি কঙ্কাল হাত। সেই কঙ্কাল হাতের আঙুলে একটি হিরের আংটি জ্বলজ্বল করছে।

টাকা দিতে গিয়ে সৈকতবাবুর ভিতরটা থরথরিয়ে কেঁপে উঠল। যদিও ললিতবাবু ইতিপূর্বেই নিজে ঘোষণা করেছিলেন, তিনি একাত্তর বছর পাঁচ মাস চোদ্দো দিনে মারা গিয়েছেন। কিন্তু সেটা কত বছর আগে, সেই হিসেবের চেয়ে জরুরি তথ্য এবং অতি বাস্তব ঘটনা হল তিনি অর্থাৎ সৈকতবাবু এখন এই মুহূর্তে একটি জ্যান্ত ভূতের সামনে বসে। সেই জ্যান্ত ভূত তাঁর দিকে হাত বাড়িয়ে আছেন বাড়ি বিক্রির অ্যাডভান্স টাকার জন্য। সৈকতবাবু যেই টাকার বান্ডিলটা ওই মেদবর্জিত কঙ্কাল হাতের ওপর দিলেন ঠিক তখনই সম্ভবত বিষম ভয় পেয়ে হনুমান সিংহ একটা প্রচণ্ড লাফ দিয়ে প্রথমে ঘরের দরজায়, তারপরেই সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে একেবারে একতলার উঠোনে। সৈকতবাবু অনুমানে বুঝলেন, হনুমান নির্ঘাত সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে নেমেছে। কেননা, সিঁড়ি ভেঙে এত তাড়াতাড়ি নামা সম্ভব নয়।

সৈকতবাবু দোতলা থেকে ঝুঁকে পড়ে হনুমান সিংহকে দেখতে দেখতে বললেন, 'আমার ড্রাইভারটা মরে গেল নাকি?’

ললিতবাবু আশ্বাস দিয়ে বললেন, ‘ললিত ভবনে মরা মানুষরাই আসে। এখানে এসে কেউ মরে না। তা ছাড়া একতলায় আমাদের একটা প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র আছে। ওটা হালদার সামলান।'

সৈকতবাবু একটা ঢোক গিলে বললেন, ‘এখানে যদি মরা মানুষরাই আসে, তা হলে আমরা এলাম কেমন করে?’

ললিতবাবু বললেন, ‘মানুষের কাছে যেমন অতিথি আসে, আমাদের কাছেও তেমনই অতিথি আসে। এখানে এসে বসবাস করলে দেখবেন, ভূত সম্পর্কে অনেক ধারণা বদলে গিয়েছে। যেমন হালদারবাবু, সেই কবে থেকে মরব-মরব করছেন, কিন্তু মরণ আর হচ্ছে না। কেন জানেন?’

সৈকতবাবু বললেন, ‘কেন?’

ললিতবাবু উত্তর দিলেন, ‘এটা হল ভূত জোন। বাবা ভোলানাথের দৃষ্টি আছে এই বাড়ির ওপর। যমরাজের মৃত্যুদূতের সাধ্য নেই এখানে কারও গায়ে হাত দেয়। বাড়ির মেন গেট অতিক্রম করতে পারবে না। বাড়িতে ঢোকা তো দূরের কথা!’

কথা শেষ করেই ললিতবাবু বললেন, ‘কলকাতা থেকে বেরিয়েছেন নিশ্চয়ই সকাল সকাল। যেতেও তো অনেকটা সময় লাগবে। তাই বলি কী, ললিত ভবনে দ্বিপ্রাহরিক আহারটা সেরে গেলে হত না?’

সৈকতবাবুরা সকলেই সকলের দিকে তাকালেন। ভূতুড়েবাড়ি কেনা এক জিনিস, আর ভূতের বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজন করা একেবারে অন্য জিনিস। সৈকতবাবু দেখলেন তাঁর স্ত্রী চোখের ইশারায় তাঁকে ডাকছেন। ডাকছেন মানে, কাছে ডাকছেন। সৈকতবাবু গুটি গুটি পায়ে স্ত্রীর কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। সুনন্দা দেবী স্বামীর হাতে চিমটি কেটে তাঁর দৃষ্টি নিজের দিকে ফেরালেন। চোখের ইঙ্গিতে বারান্দায় নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘তোমার দৌলতে দেশ-বিদেশের কত রান্নাই তো খেয়েছি। কখনও ভূতের রান্না খাইনি। ওদের রেসিপিটা বড্ড জানতে ইচ্ছে করছে। মিসেস গুপ্তর সাপ্তাহিকে আমি তো ‘রান্নাঘর’ কলমটা লিখি। ওখানে যদি ভূতের রান্নার রেসিপি লিখতে পারি, তা হলে একেবারে ফাটাফাটি ব্যাপার হয়ে যাবে। তুমি দুপুরে ভূতদের সঙ্গে খেতে রাজি হয়ে যাও।'

সৈকতবাবু ভাবলেন, একটু দোনামোনা করে ললিতবাবুকে বললেন, ‘আপনার প্রস্তাব উপেক্ষা করতে পারলাম না। আমরা আপনার কথামতো দ্বিপ্রাহরিক আহারটা করেই যাব।'

ললিতবাবু খুশি হয়ে বললেন, ‘এই তো খাঁটি মানুষের কথা। ও রে হারু, আরও পাঁচখানা পাতা পাততে হবে। তবে হ্যাঁ, যে বেচারি গিমিকুমড়োর মতো সিঁড়ি দিয়ে উঠোনে গড়িয়ে পড়েছে, তার কারেন্ট কন্ডিশনটা কেমন, সেটা দেখে পাতা পাতার আয়োজন করো।'

এতক্ষণ পর সকলেই বুঝতে পারলেন, হারুও সম্ভবত মানুষ নয়। সৈকতবাবু নিজের মনেই নিজের ভাবনাটাকে সংশোধন করে নিয়ে মনে মনে বললেন, ‘সম্ভবত’ শব্দটা এক্ষেত্রে ব্যবহার করার কোনও সুযোগই নেই। হারু নির্ঘাত ভূত। মৃত্যুর আগে যে নাম থাকে, ভূত হওয়ার পর সেই নামেই ভূত রেজিস্ট্রারে ভূতদের নাম তোলা হয়।

হারু চলে গিয়েছিল, কিন্তু হঠাৎ ফিরে এল। ফিরে এসেই সে মানুষের মতো কাঁপতে লাগল। সৈকতবাবু লক্ষ করলেন, হারু কিছু একটা বলতে চাইছে, কিন্তু সে বলতে পারছে না। ভূতদের কি সেরিব্রাল হয়? ওটি হলেই তো কথা জড়িয়ে যায়। হারুভূতের হল কী?

ললিতবাবু এগিয়ে এসে কম্পনরত হারুকে জোরে একটা ঝাঁকুনি দিতেই হারুর হাড়ে

হাড়ে ধাক্কা লেগে ঠকাঠক শব্দ উঠল। আর তখনই হারু বলে উঠল, ‘স্যার, বউদি আসছেন।' ললিতবাবু অস্ফুটে আর্তনাদ করে বলে উঠলেন, 'কী সর্বনাশ! সে তো তালডাঙায় গিয়েছিল বোনপোর বাড়িতে। আজ তো আসার কথা নয়।'

হারুর সর্বাঙ্গ জুড়ে হাড়ে হাড়ে ঠোক্কর লেগে হাড়তরঙ্গ বেজে যাচ্ছিল। ওই শব্দ তরঙ্গের মধ্যেই হারু বলল, ‘আসার কথা নয়, কিন্তু এসে পড়েছেন। আমি এবার যাই।'

হারু এক দৌড়ে যেন পাখির মতো ফুড়ুৎ করে পালিয়ে গেল। অনুনয়ভরা কণ্ঠে ললিতবাবু বললেন, 'আমাকে একা ফেলে যাস না। একা পেলে আমাকে আর আস্ত রাখবে না।'

কৌতূহল চাপতে না পেরে সৈকতবাবু বললেন, ‘এত ভয় কার জন্যে? কে আপনাকে আস্ত রাখবে না?’

ললিতবাবুর কাতর কণ্ঠের উত্তর, ‘জগৎসংসারে মানুষ টু ভূত, বিড়ালছানা টু হস্তীশাবক সকলেই যাকে ভয় করে।'

সৈকতবাবুর প্রশ্ন, ‘কিন্তু তিনি কে?’

ললিতবাবুর ধুতির কোচা সামলে দৌড় দেওয়ার আগে উত্তর দিলেন, ‘প্রত্যেকের নিজের স্ত্রী। এই একটা ব্যাপারে ভূত আর মানুষে কোনও পার্থক্য নেই।'

সুনন্দাদেবী ভূতের রান্নার রেসিপিটা জানতে না পেরে বড়ই মনমরা হয়ে পড়েছিলেন। ললিতবাবু চিলেকোঠায় তরতর করে উঠে যাওয়ার আগে সুনন্দাদেবীকে বলে গেলেন, ‘সরি ম্যাডাম, পরে যখন আসবেন তখন অনেকরকম ভূত-রান্নার রেসিপি বলব। আজ হাতে সময় সংক্ষেপ। শুধু একটা স্পেশ্যাল ব্রেকফাস্টের কথা বলি, পান্তা ভাত, সঙ্গে মিষ্টি দই আর ভূতের গপ্পো লিখিয়েদের ডান হাতের কবজির কাবাব।’

আর কোনও কথা বলার সুযোগ কেউ পেল না। নিচ থেকে সিঁড়ি দিয়ে একটা দপাদপ আওয়াজ উঠে আসছে। সুনন্দাদেবী তাঁর স্বামীর দিকে কঠোর চোখে তাকিয়ে কড়া গলায় বললেন, ‘ওখানে দাঁড়িয়ে না থেকে থামের আড়ালে লুকোও।'

সুনন্দাদেবীর কঠিন গলার এই হুকুম অমান্য করার সাহস ব্রিগেডিয়ার সৈকত সমাদ্দারের ছিল না।

ভূত আর মানুষের এই একটা জায়গায় কী আশ্চর্য মিল!

.

আনন্দমেলা, মার্চ ২০০৭

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%