দুলেন্দ্র ভৌমিক

আমার বড়মামা সম্প্রতি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। স্বেচ্ছাঅবসর নয়, চাকরির পুরো মেয়াদ পূর্ণ করে বাড়িতে এলেন। বড়মামা আমাদের খুবই ভালবাসেন এবং আমরাও ততোধিক ভালবাসার চেষ্টা করি, কিন্তু পেরে উঠি না। এই না পেরে ওঠার অক্ষমতা আমাদের সব ভাইবোনের কম-বেশি আছে। মামার বাড়ি আমাদের কাছে বেজায় সুখের জায়গা, শুধু তক্কে তক্কে থাকতে হয় কখন বড়মামা, মেজমামা অথবা ছোটমামা এসে যান। ছোটমামা চাকরিসূত্রে আপাতত টাটায় এবং মেজমামা সপ্তাহে একবার করে আসেন, একরাত থেকে পরের দিনই দুর্গাপুরে চলে যান। মেজমামাকে উপলক্ষ করে বড়মামা বলেন, ‘আর দুর্গাপুরে গিয়ে কী করবি? শিল্পনগরীর শিল্পটাই তো ডকে উঠে গেছে। কোনদিন গিয়ে দেখবি, অফিসের গেটে তালা।’
মেজমামা খুব শান্ত প্রকৃতির লোক। কোনও কথারই চটজলদি জবাব দেন না। বড়মামার দিকে শান্ত চোখে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে জবাব দিয়েছিলেন, ‘দাদা, তোর প্রশ্নের উত্তরটা কাল দেব। আজ একটু ভেবে নিই।'
আমরা জানি, আমাদের মেজমামা এই রকমই। মেজমামার এইরকম স্বভাব নিয়ে অনেকেই একদা ঠাট্টা রসিকতা করত, তবে ইদানীং আর কেউ করে না। মেজমামার শ্বশুরমশাইয়ের নাম কানাইবাবু। কানাইলাল চক্রবর্তী। তিনি বিয়ের পর জামাইকে আহ্লাদ করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তোমাদের আদি দেশ তো ছিল খুলনায়, তাই না?’
মেজ়মামা শান্ত গলায় উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আজ রাতটা একটু ভেবে নিই। কাল বলব।' মেজমামার শ্বশুরমশাই খুব একটা অবাক হননি। কারণ, বিয়ের কথা যখন পাকা হচ্ছে তখন উনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তোমার অফিস তো দুর্গাপুরে। তুমি কত সালে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছ?’
মেজমামা প্রথমে একটু হাসলেন। পরে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘বিয়ের ঝামেলা কেটে যাক, তারপর ভেবে বলব।'
তাই মেজমামাকে শ্বশুরবাড়িতে কেউ বিশেষ প্রশ্ন করতেন না। প্রশ্ন করলেও সেই দিনই তার জবাব আশা করতেন না। মেজমামার শ্বশুরমশাই তাঁর নিজের আত্মীয়দের কাছে বলতেন, ‘আমার জামাইয়ের কথা বলার ব্যাপারটা একেবারে অন্যরকম। আজ প্রশ্ন করলে সম্ভবত আগামীকাল উত্তর পাব। রেশন দোকানের ডিউস্লিপের মতো।'
আমরা মনে মনে মেজমামিমার কথা ভাবতাম। মেজমামিমাও কি সব প্রশ্নের জবাব একদিন পর পান?
মেজমামিমা আমাদের ভুল শুধরে দিয়ে বলেছিলেন, ‘একদিন পর নয়, আমার বেলায় এক সপ্তাহ পর। শনিবার রাত্রে আসার পর জানতে চাইলে সেই শনিবার জানা যাবে না। জানতে হবে তার পরের শনিবার। সত্যি বলতে কি, তখন আর মনে করিয়ে দিতে হয় না। ঘরে ঢুকে জুতোর ফিতে খুলতে খুলতে বলে উঠবে, ‘মায়া, গত শনিবার তুমি জানতে চেয়েছিলে না, দুর্গাপুরে গরম পড়েছে কিনা। হ্যাঁ গো, বেজায় গরম। এরপর যে কী হবে কে জানে!’’
বড়মামার এসব ঝামেলা নেই। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে তিনি চটজলদি জবাব দেবেন। শুধু জবাবই দেবেন না, জবাবের এত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ আরম্ভ করবেন যে, প্রশ্নকর্তা পালাবার পথ খুঁজতে থাকবেন। বড়মামাকে যাঁরা বিলক্ষণ জানেন, তাঁরা কখনও বড়মামাকে কোনও প্রশ্ন করেন না। আত্মীয়স্বজন, বাড়ির লোক কিংবা নিকট প্রতিবেশী তাঁরা কেউই বড়মামার সঙ্গে বিশেষ কথা বলেন না। কিন্তু বড়মামা এমনিতে চমৎকার মানুষ, মনের দিক থেকে উদার, পরোপকারী এবং অনেক বিষয় জানেন। তবুও সবাই তাঁকে এড়িয়ে চলেন। এমনকী আমরাও। একবার আমাদের এক পরিচিত ভদ্রলোক বড়মামার কাছে এসেছিলেন। ওই ভদ্রলোক একটা বেসরকারি চিট ফান্ডের এজেন্ট। তাঁদের কোম্পানিতে টাকা রাখলে ভবিষ্যৎ জীবনে কত সুবিধে হবে এইসব কথা প্রায়ই আমাদের এসে বোঝাতেন। আমরা তো সেই ভদ্রলোকের জ্বালায় তিতিবিরক্ত। বড়মামার ছেলে সন্তু আমায় বলল, ‘এই এজেন্ট ভদ্রলোককে বাবার কাছে পাঠিয়ে দে, ভবিষ্যৎ ঝরঝরে করে দেবে।'
আমরা সত্যি সত্যি সেই ভদ্রলোককে বড়মামার কাছে পাঠালাম। রবিবারের প্রসন্ন সকাল। একতলার সিমেন্টের বারান্দায় খরখরে রোদ। বড়মামা বারান্দার টেবিলে বসে সকালের জলখাবার লুচি আর বেগুনভাজা সবে শেষ করে চায়ের কাপে চুমুক দিতে যাচ্ছেন, ঠিক তখন ওই এজেন্ট ভদ্রলোক এসে উপস্থিত।

বড়মামা চায়ের কাপে চুমুক না দিয়ে সোজা ভদ্রলোকের দিকে তাকালেন। বড়মামার দুই চোখে বিরক্তিভরা জিজ্ঞাসা। বড়মামা প্রশ্ন করার আগে এজেন্ট ভদ্রলোক বললেন, 'আজ্ঞে আপনার কাছে এলাম।'
বড়মামা এবার চায়ে চুমুক না দিয়ে হাঁক দিলেন, ‘পটলা, অ্যাই পটলা।'
তেমনই চটপট বলতে পারে। পটলা এসে দাঁড়াতেই বড়মামা হুকুম করলেন, ‘এঁর জন্য এককাপ চা।’ এই পর্যন্ত বলেই এজেন্টের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘লুচি সম্ভবত নেই। শুধু চা-ই খেতে হবে।'
বাড়ির সব কাজেই পটলা হাজির। কাজও যেমন চটপট করে, মিথ্যে কথাও।
পটলা চলে যেতেই এজেন্ট ভদ্রলোক বললেন, ‘আজ্ঞে স্যার, আমার নাম কৃষ্ণজীবন দাশ। আমাদের চিট ফান্ডের নাম...’
বড়মামা তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, 'আপনাদের চিট ফান্ডের সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক? তবে সম্পর্ক থাকবে না-ই বা কেন? কিন্তু থাকবেই বা কেন? এই থাকার মধ্যে কার লাভ বেশি? আমার না আপনাদের? তবে এটা ঠিকই যে শুধু লাভ-লোকসানের হিসেব দিয়েই তো দুনিয়া চলে না। কিন্তু তাই বা বলি কী করে। লাভ-লোকসান তো শুধু ব্যাবসা-বাণিজ্যের অঙ্গ না, সে তো সমাজ, জীবন, রাজনীতি, অর্থনীতি সবেরই অঙ্গ। লাভ-লোকসান বাদ দিয়ে কি জীবন চলে? আবার চলবে না-ই বা কেন? রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা বন্ধের আন্দোলন করলেন, তাতে তাঁর কী লাভ? বিদ্যাসাগর মহাশয় বিধবা বিবাহ চালু করলেন, তার জন্য সরকারের কাছে দরবার করে আইন বানালেন, তাতে বিদ্যাসাগরের কী লাভ? নদের নিমাই পথে পথে নামকীর্তন করে প্রেম বিলোতেন, তাতে কি তাঁর টু পাইস আমদানি হত? কোনও লাভ নেই। অতএব লাভ-লোকসানের হিসেবই একমাত্র হিসেব নয়। তা ছাড়া, এই আপনার, আপনার কোম্পানির লোকেরা, দিন-রাত নিঃশব্দে আমাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে যাচ্ছেন, ওদিকে দেশের নেতা-নেত্রীরা ভোটের আগে সশব্দে মাইকে বা নিজের অমায়িক ভঙ্গিতে আমাদের এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবে ভেবে গলদঘর্ম হচ্ছেন। আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার বাবাও এত ভাবেননি। কিন্তু আপনি আর আপনার কোম্পানি ভাবছেন। অথচ যাঁর ভাবার কথা ছিল, অর্থাৎ আমার বাবা, তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করতে পারেননি বলেই আপনাদের আগমন। আচ্ছা, ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় সেটা কেমন জিনিস? সঞ্চয় ভবিষ্যতের জন্য, যে ভবিষ্যৎ অজানা, অজ্ঞাত। সেই অজানা-অজ্ঞাত জীবনের জন্য সঞ্চয় কেন? সঞ্চয় নয়ই বা কেন? সেই আগামী দিনগুলিতে সুখে থাকবার জন্য সঞ্চয় আবশ্যক। খুবই জরুরি। কিন্তু কখন যে কী ঘটবে সে কথা কেউ বলতে পারে? আপনার কোম্পানি পারে? সম্রাট শাহজাহান কোনও চিট ফান্ডে টাকা রাখেননি। তিনি জানতেন গোটা ভারতবর্ষই তাঁর নিজস্ব ফান্ড। যথার্থ অর্থেই বাপ-ঠাকুরদার সম্পত্তি। কিন্তু কী হল? কত টাকা খরচ করে, কত বছর ধরে অমন যে তাজমহল তৈরি হল তা কোন কাজে লাগল? ছেলেদের মধ্যে ঝগড়া, শাহজাহান নিজে অসুস্থ তারপর দীর্ঘকাল আগ্রার দুর্গে বন্দি জীবন কাটিয়ে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে অশেষ যন্ত্রণা ভোগ করে মারা যান। তাই বলছি...
আমরা আড়াল থেকে সেই এজেন্ট কৃষ্ণজীবনবাবুকে দেখতে লাগলাম। খুবই বিপন্ন অবস্থা। হয়তো এখনই কৃষ্ণনাম শোনাতে হবে। মাথার টাকে বৃষ্টির ফোঁটার মতো ঘাম জমেছে। বড়মামা দম নেওয়ার জন্য একটু থামতেই কৃষ্ণজীবনবাবু কাতর গলায় বলে উঠলেন, ‘স্যার, আজ আমি আসি।'
কৃষ্ণজীবনবাবু মুখের কথাটাকে তৎক্ষণাৎ জন্টি রোডসের ক্যাচ লোফার মতো লুফে নিয়ে বড়মামা বললেন, 'আপনার আসা-যাওয়ার জন্য আমার অনুমতির প্রয়োজন নেই। তবে একেবারেই যে নেই তাই বা বলি কেমন করে? যাওয়ার সময় বলে যাওয়া যেমন ভদ্রতা, তেমনই আসার সময় বলে-কয়ে আসাটাও ভদ্রতা। প্রথমটা পালন করেননি বলে, দ্বিতীয়টা যে করবেন না তেমন ছোটলোক আপনি নিশ্চয়ই নন। অবশ্য ঘন ঘন বলা-কওয়া করা বা অনুমতি নিলেই যে খুব বড় মাপের ভদ্রলোক হয়, তা কিন্তু নয়। তবে বলে কয়ে আসাটাই ভাল। অবশ্য সব সময় ভাল না-ও হতে পারে। বলে কয়ে যদি বাড়িতে ডাকাত আসে তা হলে কি বলে-কয়ে এসেছে বলে সেই ডাকাত আসাটা ভাল?’
বড়মামা তখনও কথার পর কথা সাজিয়ে চলেছেন। নিজেই প্রশ্ন তুলছেন আবার নিজেই উত্তর দিচ্ছেন। কৃষ্ণজীবনবাবুর আর সহ্য হল না। তিনি একলাফে বারান্দা থেকে সিঁড়িতে নামলেন এবং সেখান থেকে ‘চলি’ বলে আর-একটা ছোট্ট লাফে শানবাঁধানো উঠোনে। বড়মামা বললেন, ‘আপনার চিট ফান্ড?’
কৃষ্ণজীবনবাবু দ্রুত সদর দরজা পেরোতে পেরোতে বললেন, ‘ফান্ডের কাঁথায় আগুন। আপনি বাঁচলে...।' যেতে যেতে কী যে বলে গেলেন তা আর শোনা গেল না।
আমরা শুনেছি। আমার দাদুর আমলে এই বাড়িতে বিস্তর লোকজন আসত। রবিবার সকালে বসত আড্ডার আসর। এ ছাড়া ছুটিছাটা, দোল, পয়লা বৈশাখ এরকম আরও কতসব উপলক্ষ। সেসব যে আস্তে আস্তে উঠে গেছে সেটা কি আমার মামাদের জন্য? আমার বড়মামিমা এবং মেজমামিমাও তাই বলেন। বড়মামিমা বলেন, 'এমন পাগলদের বাড়িতে কে আসবে? বাইরে থেকে কিচ্ছুটি বোঝবার উপায় নেই। কিন্তু বাড়িতে ঢুকে দু’দণ্ড কথা কইলেই বোঝা যায় কোথায় এসে পড়েছে।'
বড়মামিমার রাগ হওয়া স্বাভাবিক। বড়মামাকে নিয়ে কতরকম কাণ্ড যে তাঁকে সামাল দিতে হয়েছে, তার আর সীমা-সংখ্যা নেই। বড়মামিমার বোনঝির বিয়ে। এ বাড়ির সবার নিমন্ত্রণ। কিন্তু বাড়ি তালা দিয়ে সবার তো যাওয়ার উপায় নেই। তাই বড়মামা, বড়মামি আর মেজমামি গেছেন। সঙ্গে বড়মামার বড় ছেলে সন্তু। সন্তু তখন মাধ্যমিক দিয়েছে। বিয়ের দিন বড়মামার হাঁকডাকে সবাই তটস্থ। পাত্রপক্ষ এসে গেছে। বিয়ে চলছে। ছেলের বাবা আর বড়মামা পাশাপাশি বসে গল্প জুড়েছেন। বড়মামি বললেন, ‘তখনই বুঝেছি কিছু একটা গণ্ডগোল হবে। কারণ আমার বোনঝির শ্বশুরমশাই কোনও কথা বলার সুযোগই পাচ্ছেন না, তোদের বড়মামা, হাত নেড়ে, আঙুল নাচিয়ে একাই বলে যাচ্ছে। বিপদ সামাল দেওয়ার জন্য আমি গিয়ে তোর বড়মামার পিছনে দাঁড়ালাম। তোর মামা তখন কী বলছে জানিস?’
আমরা বললাম, ‘কী বলছিলেন?’
বড়মামি বললেন, ‘তোর মামা বলছে, বিবাহ একটি পবিত্র অনুষ্ঠান। কিন্তু তাকে অপবিত্র করে তোলে কারা জানেন, আপনার মতো ছেলের বাপরা। ছেলের বিয়ের জন্য আগেই মেয়ের বাপের কাছে ফর্দ পাঠায়। বলে এটা চাই, ওটা চাই। পাত্র যদি হাঘরের বেটা হয় তা হলে তার বিয়ে করা কেন?’
ছেলের বাবা বলে উঠলেন, 'আমি কিন্তু কোনও দাবিদাওয়া করিনি।'
বড়মামা বলে উঠলেন, ‘করিনি মানে? করার কথা মনে আনাই তো পাপ। তবে হ্যাঁ, পাপ-পুণ্য, ভদ্রতা-অভদ্রতা, শিক্ষা-অশিক্ষা এইসব ব্যাপার আছে। প্রথম দিনের পরিচয়ে বোঝা যায় না, আপনার মধ্যে এসব আছে কি নেই। তবে এসব জিনিস থাকবে কেন? আবার থাকবে না-ই বা কেন? আফটার অল এই যুগের মানুষ। চট করে তো বদলাতে পারবেন না। আর কেনই বা বদলাতে পারবেন না। এই বদল তো সৎ অর্থে। তবে আপনাকে যে সৎ হতেই হবে তার কোনও মানে নেই। আবার সৎ থাকবেনই না বা কেন?’
বড়মামি পিছন থেকে দু'-তিনবার ধাক্কা দিয়েও বড়মামাকে থামাতে পারেননি। বিয়ের কাজ মিটে যাওয়ার পর বরযাত্রীরা যখন রওনা হয়ে যাচ্ছেন, তখন বড়মামার চোখ বাঁচিয়ে সেই ছেলের বাপ ভদ্রলোক বড়মামিকে বলেছিলেন, 'আপনার স্বামী ভদ্রলোকটি...'
এই পর্যন্ত বলার পরই বড়মামি হাত জোড় করে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে বলেছিলেন, 'আপনি ওঁর কথায় কিছু মনে করবেন না। আসলে...'
বড়মামিকে থামিয়ে দিয়ে সেই ছেলের বাপ বলেছিলেন, ‘মনে করবার কোনও স্কোপই নেই। আমার দাদা লুম্বিনীর ডাক্তার। প্রথম অবস্থায় চিকিৎসা হলে ভাল হয়ে যাবে। দেরি করবেন না, বউভাত মিটে যাওয়ার পরই লুম্বিনীতে নিয়ে আসুন। আমি দাদাকে বলে রাখব।' বড়মামি বললেন, ‘তখন লজ্জায় আমার মনে হচ্ছিল ধরণী দ্বিধা হও অথবা আমাকেই বদ্ধ পাগল করে দাও।'
সত্যি বলতে কি, ছোটমামাকে নিয়ে এসব কোনও ঝামেলা নেই। ছোটমামা বিয়ে-থা করেননি। ঈশ্বরভক্ত মানুষ। মাঝে মাঝে তন্ত্রচর্চা করেন আর তন্ত্রমতে হাত দেখেন। একবার তাঁর অফিসের বসকে হাত দেখে বলে দিয়েছিলেন, 'আপনি গাধা গোত্রের মানুষ। আপনার সর্বাঙ্গে শনি। তদুপরি অতিকায় মন্দলোক।'
ছোটমামার বস এসব শুনে আদৌ প্রীত হননি। হওয়ার কথাও নয়। ফলে তিন বছর কোনও প্রমোশন হয়নি ছোটমামার। সেই ‘গাধা গোত্রের বস’টি অন্যত্র চলে যেতেই এলেন জনৈক রাঘবন। ছোটমামা রাঘবনের পয়সায় ঘটা করে যজ্ঞ করলেন। অধিক রাত্রি পর্যন্ত নিজে জাগলেন এবং সস্ত্রীক রাঘবনকেও জাগিয়ে রাখলেন। সূর্য ওঠার পর ‘ব্যোম কালী’ বলে হুংকার ছেড়ে ছোটমামা ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, ‘বেটা তোর ভাগ্য খুলে দিলাম। এবার মন লাগিয়ে কাম-কাজ কর।
অফিসের বস হোক আর যেই হোক, যজ্ঞের আসনে বসে ছোটমামা সবাইকে তুই বলে সম্বোধন করেন। এটাই নাকি নিয়ম। হয়তো তাই হবে। হাতে কমণ্ডলু আর চিমটে, মাথায় জটা, গায়ে গমকলের মেঝেতে পড়ে থাকা আটার মতো ফ্যাকফ্যাকে কীসব মাখা খানকয়েক সাধুকে গঙ্গাসাগর ফেরত এই বাড়িতে আসতে দেখেছি। ওঁরা সবাইকে ‘ব্যাটা’ বলে সম্বোধন করেন এবং তুই-তোকারি করেন। মুম্বই থেকে আমার ছোটকাকার মেয়ে জেনি এসেছিল কলকাতায় বেড়াতে। ও মডেল হতে চায়। তাই খুব বেছে বেছে খায়। সেদিন ওর পরনে ছিল জিনসের প্যান্ট গায়ে ঢোলা গেঞ্জি, মাথার চুল আমার চেয়েও ছোট করে কাটা। গঙ্গাসাগর ফেরত সাধু জেনিকে দেখে বলেছিলেন, ‘ইধার আ যা বেটা।’
জেনির আত্মসম্মানে খুব লেগেছিল। সে রাগের গলায় জবাব দিয়েছিল, ‘আমি বেটা নই, সেন্টপার্সেন্ট বেটি, বি কেয়ারফুল।'
জেনিকে বেটা বলে সেই সাধু বেচারি খুব ভুল করেননি। আমার ঠাকুমা নিমতলায় গিয়ে চুল্লিতে ঢোকার দু'দিন আগে পর্যন্তও জেনিকে ‘ছেনি’ বলে ডাকতেন আর আক্ষেপ করে বলতেন, ‘তোরা কি মেয়েটার আর নাম পেলি না? শেষে ছেনি, হাতুড়ি ওই সব লাইনে গেলি।'
গঙ্গাসাগরের সেই সাধুদের দেখে বুঝেছি, সব বয়সের লোকদের তুই-তোকারি করার অভ্যাসটা ওঁদের সাধু হওয়ার একটা লক্ষণ। আমাদের ছোটমামাকে দেখে সেই ধারণাটা আরও গাঢ় হয়েছে। ছোটমামার তান্ত্রিক সাধনায় অনেকেই নাকি উপকৃত হয়েছে। তাঁর তান্ত্রিক প্রেসক্রিপশনেই রাঘবন দু’বছরের মধ্যে এগজিকিউটিভ থেকে ম্যানেজার। বড়মামি এবং মেজমামি দু'জনেরই খুব ইচ্ছে হয়েছিল, তাঁদের সাধের তান্ত্রিক দেওরকে দিয়ে বাড়িতে একটা হোম-যজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। গোড়ার দিকে বড়মামা কোনও পাত্তা দেননি। মেজমামা যথারীতি ভেবে বলব, বলে দুর্গাপুরে চলে গেছেন। হপ্তায় হপ্তায় আসেন বটে, কিন্তু ভেবে ওঠার সময় পান না। অবশেষে অনেক কাঠ এবং বিস্তর খড় পুড়িয়ে বড়মামার সম্মতি আদায় হল। অমাবস্যা এবং শনিবার ছাড়া তান্ত্রিক মতে হোম-যজ্ঞ হবে না বলে ছোটমামা জানিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু অমাবস্যা আর শনিবার দুটো এক সে চট কে পাওয়া গেল না বলে বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করতে হল। টাটা থেকে ছোটমামা এলেন। যেমন ছুটিছাটায় আসেন তেমনই পোশাক। কিন্তু হোম-যজ্ঞের দিন দারুণ ব্যাপার। ঘরের দরজা দু’ঘণ্টা বন্ধ! দরজা বন্ধ ঘরে ছোটমামা যে কী করছেন তা আমরা কেউ জানি না। জানলার পাল্লাও নিপুণভাবে বন্ধ, তদুপরি জানলায় ভারী পরদা। আমার মামিরা বিষম চিন্তায় পড়ে গেলেন। কিন্তু আমাদের ছাড়া আর কাউকেই সেই দুশ্চিন্তার কথা বলতে পারছেন না। বড়মামিকে আমি বললাম, ‘বড়মামাকে বলো না?’
বড়মামি নিজের কপাল চাপড়ে বললেন, ‘তোদের মামাগুলো যে কেমন তা কি তোরা আজও বুঝলি না? তোর বড়মামাকে জিজ্ঞেস করলে, সে সাত কাণ্ড রামায়ণ খুলে বসবে। নিজেই প্রশ্ন করবে আবার নিজেই জবাব দেবে। একই সঙ্গে ভালও বলবে আবার খারাপও বলবে। ধ্যমজনকে আজ জিজ্ঞেস করলে উত্তর পাব এক হপ্তা বাদে। এই তো আমাদের সংসারের চিত্র।'
আমরা সবাই খুব উদ্বেগ নিয়ে ছোটমামার ঘরের দিকে তাকালাম। দরজা তেমনই বন্ধ। আমরা দরজায় কান পেতে ঘরের ভিতরের শব্দ শোনার চেষ্টা করলাম। না, কোনও শব্দ নেই। অন্ধকার রাতে নদীর পাড়ে যেমন নৈঃশব্দ্য থাকে, মনে হল ছোটমামার ঘরেও তেমনই ভয়ংকর নৈঃশব্দ্য থমথম করছে। বড়মামার ছেলে সন্তু আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এ যে দেখছি মোল্লার চকের দইয়ের মতো নৈঃশব্দ্য জমাট বেঁধে আছে। আয়, দরজায় ধাক্কা দিই।'
দরজায় ধাক্কা দেওয়া উচিত হবে কিনা চিন্তা করতে করতে দরজা খুলে গেল। সেই সঙ্গে চকোলেট বোমা ফাটার মতো পিলে চমকানো হুংকার, ‘ব্যোম কালী!’
আমরা চমকে উঠেছিলাম। আমাদের দিকে তাকিয়ে ছোটমামা বলে উঠলেন, ‘এই তোরা কে? তোরাই কি সেই কিষ্কিন্ধার শাখামৃগ?’
এরপর দুই মামির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এই, তোরা কারা?’
আমরা নিশ্চিত হলাম, আমাদের ছোটমামা এখন মামা থেকে তান্ত্রিকে উত্তীর্ণ হয়েছেন। আমাদের তো তুই-তোকারি করেই থাকেন। সেটাই স্বাভাবিক। আমরা কেউ কেউ তাঁর ভাগ্নে, কেউ কেউ ভাইপো। কিন্তু দুই মামি, অর্থাৎ ছোটমামা যখন তাঁর দুই বউদিকে তুই-তোকারি করতে লাগলেন তখন আর তাঁর তান্ত্রিকতায় কোনও সন্দেহ রইল না। ছোটমামাকে দেখে এখন সত্যিকারের তান্ত্রিক মনে হচ্ছে। যেন এইমাত্র গঙ্গাসাগর অথবা কুম্ভমেলা থেকে সোজা এখানে এলেন। গলায় মোটা মোটা হরীতকী, রং-বেরঙের পাথর বা কাচের মালা, কপালে লাল ফোঁটা, পরনে রক্তবস্ত্র, পিঠের উপর ঝুলছে মেজমামির চুলের বেণীর মতো লম্বা জটা, আবার মাথায় যাত্রাদলের সন্ন্যাসী বা ছদ্মবেশী রাবণের মতো জটা। হাতে চিমটে, একটা ঈষৎ তোবড়ানো কমণ্ডলু এবং সারা গায়ে ঘুঁটের ছাইয়ের মতো কী সব মাখা। সন্তু ফিস ফিস করে বলল, ‘ছোটকাকা এতসব কস্টিউম কি টাটা থেকে ভাড়া করে নিয়ে এসেছে, নাকি পাকাপাকিভাবে কিনে নিয়েছে?’
সন্তুর একথার জবাব আমার জানা ছিল না। ছোটমামা ধীরে ধীরে হলঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। ওই ঘরেই যজ্ঞের আয়োজন। হোমযজ্ঞ কেমন হত এবং তাতে এই পরিবারে কী সুফল ফলত তা জানি না। কিন্তু যজ্ঞে বসার সময় ছোটমামা ‘ব্যোম ব্যোম’ করে যেই বিকট আওয়াজ তুললেন, অমনই বড়মামা মেজমামাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘ব্রজ, এরকম আওয়াজ ছাড়লে তো শব্দদূষণের দায়ে পড়ব। নেত্য যা আওয়াজ ছাড়ল তা তো পঁয়ষট্টি নয়, হাজার ডেসিবেল ছাড়িয়ে গেল।'
আমি বললাম, ‘এরপর যজ্ঞ শুরু হলে ধোঁয়াও হবে প্রচুর।'
বড়মামা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘একই সঙ্গে শব্দদূষণ এবং বায়ুদূষণ। জামিন অযোগ্য অপরাধ। তুই নেত্যকে কিছু বল।'
মেজমামা বললেন, ‘আজ ভাবি, কাল বলব।'
বড়মামা আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হোম-যজ্ঞে ধোঁয়া তো হবেই। ধোঁয়াহীন যজ্ঞ কি সম্ভব? কেনই বা অসম্ভব? দুনিয়ার কত জিনিসই তো সম্ভব, তবে ধোঁয়াহীন যজ্ঞই বা সম্ভব নয় কেন? দেবভক্তি, সে তন্ত্রমতে বা বৈষ্ণবমতে বা শাক্তমতে যে মতেই হোক, তার সঙ্গে ধোঁয়ার কী সম্পর্ক? অবশ্য সম্পর্ক থাকবে না-ই বা কেন? শিবহীন যজ্ঞ করে দক্ষ তো দক্ষযজ্ঞ বাধিয়েছিলেন। ধোঁয়াহীন যজ্ঞের এফেক্ট কি সেই রকম ম্যাসাকার কিছু? কম্পিউটারে যজ্ঞ সম্ভব?’
বড়মামা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু বলা হল না। ছোটমামা ঘাড় ঘুরিয়ে বড়মামার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বেটা, এতনা বাত মত কর। চুপচাপ মেরা পিছে বইঠ যা।’
বড়মামা এতই অবাক হলেন যে, ছোটমামার দিকে তাকিয়ে মিনিটখানেক কথা বলতে পারলেন না। তারপর যা ঘটল, সেটা দেওয়ালির রাতে তুবড়ি ফাটার মতো। প্রথমে জ্বলতে চায় না। খোঁচাখুঁচি করে আগুন দিতে দিতে হঠাৎ সশব্দে জ্বলে উঠে দুম করে ফেটে যায়। বড়মামারও তাই হল। কিছুক্ষণ বড় বড় চোখে ছোটমামার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ উঠে পড়লেন। ঘরের আলমারির পিছনে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনলেন একটা হকি স্টিক। আমার বড়মামা নাকি একদা খুব ভাল হকি খেলতেন। কিন্তু সেই ‘একদা’টা যে কবে সেটা আমার দিদিমাও মরার আগে বলে যেতে পারেননি। আমরা তো বড় হয়ে অবধি বড়মামাকে কথার পিঠে কথা সাজিয়ে কথার খেলাই খেলতে দেখেছি, অন্য কোনও খেলায় তাঁকে দেখিনি। কিন্তু হলঘরের আলমারির পিছনে বেশ শক্তপোক্ত এই হকি স্টিকটা অনেকদিন থেকেই রয়েছে। সন্তু আমায় বলত, ওটা খেলবার জন্য নয়, সকালে আর বিকেলে পার্কের পাশের রাস্তা দিয়ে বাবা তো শরীর রক্ষার জন্য হাঁটাহাঁটি করেন এবং হাঁটাহাঁটির সময়ে যে বিচিত্র পোশাক তিনি পরেন তাতে পথে চরে বেড়ানো বেওয়ারিশ কুকুরের দল বাবার পিছন পিছন ঘেউ ঘেউ করতে করতে সঙ্গী হয়। একবার নিম্নবর্ণের পথপালিত একটি বাচ্চা কুকুর বাবাকে কামড়ে দিয়েছিল। তারপর থেকেই হাঁটাহাঁটির সময় হকি স্টিক তাঁর সঙ্গী। আসলে ওটা কুকুর তাড়াবার যষ্টিবিশেষ। মামার আক্ষেপ, জীবনে একবার এমনই একটা কুকুর কামড়াল যার কোনও সোশ্যাল স্ট্যাটাস নেই। পথের কুকুর, প্রেডিগ্রি মোটেও ভাল না। একটা অ্যালসেশিয়ান, বুলডগ বা ডোবারম্যান কামড়ালেও এত দুঃখ হত না।
ছোটমামা যত জোরে ‘ব্যোম কালী কালী’ বলে হুংকার ছেড়েছিলেন তার চেয়ে দ্বিগুণ জোরে বড়মামা হুংকার দিলেন, ‘অ্যাই নেত্য, তোর মাথা ফাটিয়ে মুড়োঘণ্ট খাব, তোর সাধুগিরি আমি আজই ঘুচিয়ে দেব।'
বড়মামা দু’হাতে হকি স্টিক তুলে দাঁড়িয়েছেন, ভঙ্গিটা এমনই যেন চণ্ডীতলার কালী মন্দিরে পাঁঠাবলি দেওয়ার জন্য সিঁদুরমাখা খাঁড়া তোলা হয়েছে। হোম শুরুর আগেই মামার চোখে তীব্র হোমাগ্নি। দক্ষযজ্ঞের মতো একটা ব্যাপার ঘটে যাবে এই আশঙ্কায় বড়মামি উঠে এসে মামাকে থামাতে চেষ্টা করছেন। মেজমামি মেজমামাকে কাতর কণ্ঠে অনুরোধ করে যাচ্ছেন, ‘ওগো, দাদাকে থামাও। মাথা ফাটাফাটি হবে যে। দাদা বলছেন, নিত্য ঠাকুরপোর মাথা ফাটিয়ে মুড়োঘণ্ট খাবেন। তুমি কিছু একটা করো।’
মেজমামা নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, ‘ব্যাপারটা দেখি, তারপর ভাবি, তারপর ফিরে এসে আসছে শনিবার...
মেজমামিমা ধৈর্য রাখতে পারলেন না। খেপে গিয়ে বলে উঠলেন, ‘এত কাল তো শুধু ভেবেই গেলে। এবার না ভেবে একটা কাজ করে দেখাও তো।'
এত কাণ্ডের মধ্যে ছোটমামা কিন্তু তাঁর সেই তোবড়ানো কমণ্ডলুটা নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। কমণ্ডলু থেকে হাতের খাবলায় কিছু জল নিয়ে বড়মামার গায়ে ছিটিয়ে দিয়ে স্নেহের কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘বেটা নন্দ, শান্ত হো যা। গুসসা বড়ি খারাপ চিজ হ্যায়।' তারপরেই বড়মামিমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বেটি, তু তেরা পতিকো শান্ত কর। অভি পূজাপাঠ কা ক্রিয়া করম শুরু হোগা।'
বড়মামা আরও রেগে গিয়ে বললেন, ‘দেখলে, নেত্যটার কাণ্ড দেখলে! সমানে তুই-তোকারি করে যাচ্ছে। মাথা নয়, আমি ওর শিরশ্ছেদ করব। তোমার বঁটি কোথায়? বঁটি?’ বড়মামি বললেন, ‘মাছের দোকানদাররা এখন আঁশ ছাড়িয়ে মাছ কেটে দেয়। এখন আর কারও হেঁশেলেই আঁশবঁটি নেই।'
বড়মামা হুংকার দিয়ে বললেন, ‘তরকারি কাটার বঁটিই দাও। ওকে আমি পটেটো চিপসের মতো কুচি কুচি করে কাটব।'
ততক্ষণে বড়মামা হকি স্টিক ছেড়ে তরকারি কাটার বঁটির খোঁজ করছেন। ইতিমধ্যে ঘরের কোণে রাখা ফোনটা বেজে উঠতেই সন্তু গিয়ে ফোনটা ধরে বলল, ‘বাবা, তোমার ফোন। বড়মাসি জানতে চাইছে, হোম-যজ্ঞ কখন শুরু হবে? ওঁরা বাগুইআটি থেকে অটো করে রওনা দিচ্ছেন।'
বড়মামা ফোনের দিকে যেতে যেতে বললেন, ‘তোর বড়মাসির বাড়িতে কোনও ধারালো অস্ত্র আছে? যা দিয়ে নেত্যর শিরশ্ছেদ করা যায়?’
কেউই বড়মামার কথার উত্তর দিলেন না। বড়মামা ফোনটা ধরে বললেন, ‘দিদি, চটপট চলে আসুন। অটো না নিয়ে ট্যাক্সিতে আসুন। আসার সময় একটা ধারালো অস্ত্র, নিদেনপক্ষে একটা আঁশবঁটি হলেও সঙ্গে নিয়ে আসুন। আজকের হোম-যজ্ঞে ওটা দরকার।'
ফোনটা রেখে দিয়ে বড়মামা হলঘরের বারান্দায় পায়চারি করতে করতে বললেন, ‘দিদি বঁটি নিয়ে এলেই নেত্যর গলা কেটে যজ্ঞের আগুনে দেব। কিন্তু আগুনেই বা দেব কেন? গোটা বডি দাহ না করে শুধু মুণ্ডু দাহ করার কোনও প্রথা কি আছে? নাই বা থাকুক। নতুন প্রথা আমিই চালু করব। কিন্তু ভ্রাতৃহত্যার দায় কি বর্তাবে না? কিন্তু কেনই বা বর্তাবে? আমি তো রাজ্য লোভে ঔরঙ্গজেব কিংবা সম্রাট অশোকের মতো ভ্রাতৃহত্যা করছি না। পারিবারিক শিষ্টাচার, গুরুজনদের প্রতি মিনিমাম রেসপেক্ট না থাকলে ম্যাক্সিমাম শাস্তি তাকে পেতেই হবে। পারিবারিক শিষ্টাচার এবং গুরুজনদের রেসপেক্টের ব্যাপারে নো কমপ্রোমাইজ।'
ঘরের মধ্যে ছোটমামা তখন সশব্দে পূজা-পাঠ শুরু করেছেন। হিং, রিং, ব্রিং এই রকমের নানা ধরনের শব্দ উচ্চারণ করছেন আর ঘরের চারদিকে জল ছেটাচ্ছেন। এইসময় মেজমামার মেয়ে বিনু গিয়ে বড়মামাকে বলল, ‘জেঠু, জেঠু, ছোটকাকার হাতে একটা কলকে। ওই যে মহাদেবের মূর্তির হাতে থাকে, সেইরকম। ছোটকাকা ওটা ধরাচ্ছে।'
নিভে আসা আগুনে ঘি ঢাললে যেমন হয়, বড়মামা তেমনভাবেই জ্বলে উঠে বললেন, ‘নেত্য অবশেষে গাঁজাখোর হল। কোথায় কলকে? কোথায় সেই গাঁজা?’
হুংকার করতে করতে বড়মামা ঘরে এলেন। এসেই ছোটভাইকে সরাসরি জিজ্ঞাসা, ‘নেত্য খুব বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। কোথায় তোর গাঁজার কলকে?’
ছোটমামা মৃদু হেসে একেবারে হিমালয়ের সন্ন্যাসী বা তারাপীঠের শ্মশানে বসা তান্ত্রিক সাধুদের মতো বললেন, ‘বেটা নন্দ, শান্ত হো যা, পূজা-পাঠ কা বাদ মেরা প্রসাদ সবকোইকো মিলেগা, তুঝকো ভি মিলেগা।'
ছোটমামা কী ভেবে কী বললেন, আর বড়মামা কী ভেবে নিলেন, জানি না। বড়মামা উত্তেজিত হয়ে ছোটমামার জটার বেণী ধরে তুমুল আক্রোশে একটা টান দিতেই বেণীসহ জটা খসে পড়ল। ছোটমামার মাথায় ছোট ছোট খাড়া খাড়া চুল। মাথার জটা এখন বড়মামার হাতে। এতক্ষণ ছোটমামাকে যেমন দেখছিলাম জটাহীন হওয়াতে তাঁকে অন্যরকম দেখতে লাগল। পরনে বাঘছালের মতো পোশাক, সারা গায়ে ছাই মাখা, কপালে লাল ফোঁটা, হাতে চিমটে। এর সঙ্গে জটা তো মানানসই, কিন্তু জটা চলে গেলে এই পোশাকটা কেমন যেন আলুনি খাবারের মতো। ছোটমামা বড়মামি, মেজমামিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যেই গৃহে তন্ত্র সাধনায় এত বিঘ্ন এবং যেখানে তান্ত্রিকের জটা হরণ করেন গৃহস্বামী, যে স্থানে তান্ত্রিক নির্যাতিত, সেখানে, সেই গৃহে পূজা, হোম-যজ্ঞ নিষিদ্ধ। গোটা তান্ত্রিক সমাজ এই গৃহকে পরিত্যাগ করবে। দুনিয়ার তান্ত্রিক এক হও। স্বৈরাচারী নন্দদুলাল দূর হটো।’ ,
ছোটমামা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। বড়মামা বললেন, ‘ও কি ভোটের মিছিল লিড করছে! দুনিয়ার কোনও সাধু-সন্ন্যাসী বা তান্ত্রিকদের এইরকম শ্লোগান দিতে শুনিনি।'
এই সময়ই বাড়ির সামনে ট্যাক্সি থামার আওয়াজ হল এবং একটু পরেই বড়মামির দিদি আর জামাইবাবু এলেন। জামাইবাবুর হাতে বেজায় জং-ধরা একটা ভোজালি গোছের যন্ত্র। ওটা বড়মামার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘হোম-যজ্ঞের অনুষ্ঠানে এসব জিনিস কোন কাজে লাগবে?’
বড়মামা যন্ত্রটার দিকে একবার দেখে নিয়ে বললেন, 'আপনার এই জিনিস কোনও কাজেই লাগবে না। এই জং-ধরা জিনিস দিয়ে কাউকে কাটা যাবে না, কিন্তু গায়ে ঘষে দিলেই টিটেনাস হয়ে মারা পড়বে।'
বড়মামিমার দিদির নাম মনীষা। তিনি বড়মামিকে উদ্দেশ করে বললেন, 'হ্যাঁ রে ছায়া, আসার সময় তোদের বাড়ি থেকে বাঘছাল পরা একজনকে বেরিয়ে যেতে দেখলাম। উনি কে?’
বড়মামি বড়মামার দিকে তাকালেন। পরে বললেন, ‘ভাইটার একটা খোঁজ করবে তো? এই অমাবস্যার রাতে ছেলেটা গেল কোথায়?’
মেজমামি বললেন, ‘জটা খোলার পর ঠাকুরপোকে যেমন দেখতে হয়েছে তাতে নাইট গার্ড, পুলিশ এবং কুকুর তিনদিক থেকেই বিপদের আশঙ্কা।'
বড়মামাকে এবার একটু চিন্তিত দেখাল।
বড়মামা এবং মেজমামা দু’জনের কারওরই খুব একটা গরজ ছিল না। কিন্তু দুই মামিমা আর সেইসঙ্গে বড়মামিমার দিদি-জামাইবাবুর তাড়নায় দুই মামা বেরিয়ে পড়লেন ভ্রাতৃসন্ধানে। সাজগোজ করে বেরোতে আধঘণ্টার বেশি সময় চলে গেল। বড়মামার একখানা পুরনো ফিয়েট গাড়ি আছে। অধিকাংশ দিনেই গ্যারাজে পড়ে থাকে। এই গাড়িটা জনৈক ব্যবসায়ী বন্ধুর কাছ থেকে কেনার পর বড়মামি কখনও পয়লা চোটে গাড়িটাকে চলতে দেখেননি। এবারেও তাই হল। অনেক রকম আওয়াজ করে গাড়িটা রাস্তা দিয়ে চলতে আরম্ভ করার পর বড়মামি দু'হাত কপালে ঠেকিয়ে বলে উঠলেন, 'দুগ্গা-দুগ্গা। সবাই যেন গাড়িসহ ফিরে আসে।
বড়মামির জামাইবাবু বললেন, ‘সে আবার কেমন কথা! গাড়ি যখন গেল তখন তো গাড়ি নিয়েই ফিরবে।'
বড়মামি বললেন, ‘না দাদা, এই সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়িটা কেনার দু'মাস পর থেকেই গাড়ি নিয়ে আর সব সময় ফেরা সম্ভব হয় না। বিকল হয়ে মাঝপথে পড়ে থাকে। আমরা ট্যাক্সি করে ফিরে আসি।'
বড়মামির জামাইবাবু বললেন, ‘কিন্তু গাড়িটা থাকে কোথায়?’
এবার মেজমামি বললেন, ‘ফোন করে বাড়ি থেকে পটলাকে নিয়ে যাই। তারপর লোক দিয়ে ঠেলেঠুলে কোনও গ্যারাজে, পেট্রল পাম্পে না হয় কারও বাড়ির সামনে গাড়ি রেখে চলে আসি। সেই গাড়িতে পটলা ঘুমিয়ে থাকে।'
জামাইবাবুর বড় বড় চোখ আরও বড় হয়ে গেল। ওদিকে তখন অন্য দৃশ্য। গাড়ি বাইপাসে পড়ার আগেই বড়মামা মেজমামাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ব্রজ, কোন দিকে খুঁজতে যাব বল তো? কোথায় গেলে এক চান্সে পাওয়া যাবে?’
মেজমামা বসেছিলেন বড়মামার পাশে। বড়মামার হাতে স্টিয়ারিং। চোখ সামনের দিকে। মেজমামা বড়মামার দিকে একবার দেখে নিয়ে বললেন, ‘আজকের রাতটা একটু ভাবি। কাল দুপুর নাগাদ বলতে পারব।'
বড়মামা শুধু বিরক্তিভরা কণ্ঠে ‘হুঁ’ বলে থেমে গেলেন। এই সময় পিছন থেকে একটা পুলিশের জিপগাড়ি বড়মামার গাড়িটাকে ওভারটেক করে যেতেই বড়মামা বললেন, ‘চল, আগে পুলিশ স্টেশনে গিয়ে একটা ডায়েরি করি। কিন্তু কোনও পুলিশ স্টেশনে যাওয়া উচিত? নেত্য উধাও হল আমার বাড়ি থেকে, তার মানে সল্টলেকের থানাতেই ডায়েরি করা উচিত। ওখান থেকেই ফোন করে মিসিং স্কোয়াডে জানানো যাবে। তুই কী বলিস ব্রজ?’
মেজমামা সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে জবাব দিলেন, ‘একটু ভেবে দেখি।'
বড়মামা এবার আর হুঁ বলে থামলেন না। ধমক দেওয়ার গলায় বললেন, 'তোর ভাবাভাবিটা এবার একটু কমা।’
বড়মামা গাড়ি নিয়ে সল্টলেকের একটা থানায় এলেন। গাড়ি থেকে নামার আগে বড়মামার মোবাইল বেজে উঠল। বড়মামা ফোনের দিকে তাকিয়ে নম্বরটা দেখতে দেখতে বললেন, ‘মনে হচ্ছে নতুন ক্লায়েন্ট’
ফোন কানে দিয়ে বললেন, ‘ইয়েস নন্দদুলাল স্পিকিং। কী হয়েছে? সাইকেল চুরি হয়েছে? এসব কেস তো পেটি কেস, এসব থানায় গিয়ে বলুন। আমি এরকম কেস নিই না। আরে না না, আরে দূর মশাই, আমার ডাকাবুকো ছোটভাই নেত্য উধাও। তাকেই খুঁজে পাচ্ছি না তো আপনার সাইকেল খুঁজব কখন?’
বড়মামা মোবাইলের সুইচ টিপে লাইনটা কেটে দিলেন। থানার বড়বাবু বড়মামাকে চিনতেন, দেখেই বললেন, ‘আসুন মি. চক্রবর্তী। বলুন কী খবর?’
বড়মামা বসতে বসতে বললেন, ‘খবর তেমন ভাল নয়। তবে ভাল নয় কথাটা বলি কেমন করে! আমার কাছে যা ভাল নয়, সেটা হয়তো আপনার কাছে ভাল। আমার অনিদ্রারোগ আমার কাছে ভাল নয়, কিন্তু আমার ব্লকের নাইটগার্ডদের কাছে ভাল। কারণ তারা ভাবে চক্রবর্তীবাবু জেগে আছেন, অতএব এখন আমাদের পাহারা না দিলেও চলবে। ঠিক তেমনই...’
বড়বাবু বললেন, ‘স্যার, যদি সংক্ষেপে বলেন তা হলে বাধিত হব। কারণ, আমাকে এখনই একবার রাউন্ডে বেরোতে হবে কিনা!’
বড়মামা হাতের মোবাইলটা বড়বাবুর টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বললেন, ‘আপনারা এই যে ঘন ঘন রাউন্ড মারেন, তাতে পেট্রোল পাম্পের বিক্রি বাড়া ছাড়া আর কারও লাভ হয় কি? অবশ্য জগতের লাভ-লোকসান দেখার দায় তো আপনার নয়। কিন্তু তাই বলে কোনও লাভ-লোকসানের দায় নেবেন না তাই বা কেমন করে হয়! আবার এটাও ঠিক, কেমন করেই বা হবে না।'
বড়বাবু এবার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'আমাকে এখন উঠতে হবে। আপনার বক্তব্য...' বড়মামা বললেন, 'আমার বক্তব্য যে আপনাকে শুনতেই হবে তেমন কোনও বাধ্যবাধকতা আপনার নেই। কিন্তু বাধ্যবাধকতা থাকবে না-ই বা কেন? আমাদের বক্তব্য শোনা এবং তার প্রতিকারের চেষ্টা করা আপনার কর্তব্য। সত্যি বলতে কী, সব কর্তব্যই সব সময় পালন করা সম্ভব নয়। তবে সম্ভব-অসম্ভবের ব্যাপারটা ইচ্ছানির্ভর। সেই ইচ্ছা হচ্ছে এক ধরনের বিবেকবোধ তাড়িত গুণ। তবে বিবেক থাকলেই যে বিবেকবোধ এবং তাড়না থাকবে তার কোনও মানে নেই। কেননা...’
বড়বাবু অসহায়ের মতো বড়মামার দিকে তাকালেন, তারপর দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। এবার ঘরে এলেন বড়বাবুর সহকারী। বড়মামা সেই রোগা লিকলিকে লোকটাকে দেখতে দেখতে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি?’
লোকটি উত্তর দিল, ‘আমার নাম ভীমচন্দ্র পাণ্ডে। বড়বাবু আমাকে পাঠালেন, আপনার বক্তব্য শোনার জন্য।'
বড়মামা ভীমচন্দ্রের পা থেকে মাথা পর্যন্ত আবার দেখে নিয়ে বললেন, ‘বিশ্বাস হচ্ছে না, একেবারেই বিশ্বাস হচ্ছে না।'
ভীমচন্দ্র বললেন, ‘কী বিশ্বাস হচ্ছে না?’
বড়মামা বললেন, 'আপনার নাম। এত রোগা, লিকলিকে ভীম আমি আজ পর্যন্ত দেখিনি।'
এবার ভীমচন্দ্র একটু হাসল। পরে বলল, ‘আপনার কোম্পানি কেমন চলছে?’
বড়মামা বললেন, ‘সেসব পরে হবে। আমার ছোটভাই নেত্য, ভাল নাম হচ্ছে নিত্যগোপাল চক্রবর্তী, সে বাড়ি থেকে উধাও। পরনে বাঘছাল, মাথায় খাড়া খাড়া চুল, গায়ে ছাই মাখা, কপালে লাল ফেঁাঁটা, হাতে সম্ভবত চিমটে এবং কমণ্ডলু। গলায় নানারকম মালা।'
ভীমচন্দ্র অবাক চোখে বড়মামার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বলল, ‘আপনার ভাইয়ের এরকম পোশাক কেন? এমন দশা কে করল? গলায় কীসের মালা?’
বড়মামা উত্তর দিলেন, ‘কারও দরকার হয়নি। আমার ভাই একাই নিজের এই দশা করেছে। গলায় নানারকম মালা। নরমুণ্ডের মালা বা করোটির মালাও হতে পারে।'
ভীমচন্দ্র অন্য একটা চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়তে পড়তে বলল, ‘এ তো যেমনতেমন দশা নয়। রীতিমতো দুর্দশা। এই পোশাকের কোনও লোককে তো কিডন্যাপও করবে না। উনি, মানে আপনার ভাই গেলেন কোথায়?’
বড়মামা বিরক্ত হয়ে উত্তর দিলেন, ‘সেটা জানা থাকলে তো সোজা সেখানেই যেতুম। আপনার কাছে আসতুম না। আপনি দয়া করে আমার ডায়েরিটা নিন। তবে এতে আপনার দয়া কেন? ডায়েরি নেওয়াই তো আপনাদের কাজ। তবে কাজ বলেই যে সবসময় কেবল ডায়েরি লিখতে হবে এমন কোনও কথা নেই। কিন্তু কথা থাকবে না-ই বা কেন?’
ভীমচন্দ্র ডায়েরিবুক বের করে বলল, ‘বলুন আমি ডায়েরি লিখছি।'
বড়মামার জন্য অনেকক্ষণ সময় লাগল ডায়েরি লিখতে। ডায়েরি লিখে বড়বাবুর ঘর থেকে বেরোবার সময় বড়মামা বললেন, ‘একটু সাহায্য চাই। দু’জন সেপাইকে আমার সঙ্গে দিন।'
ভীমচন্দ্র বলল, ‘কেন? ওরা কোথায় যাবে?’
বড়মামা উত্তর দিলেন, ‘বেশি দূরে নয়। আমার গাড়িটাকে একটু ঠেলে দেবে। গাড়িটা ভাল কিন্তু কিঞ্চিৎ অলস প্রকৃতির। কিছুটা পথ এসে একবার দাঁড়িয়ে গেলে আর চালু হতে চায় না। তখন পিছন থেকে ঠেলতে হয়।'
দুই মামা গাড়ি করে বাড়ি ফিরে এসে দেখলেন ছোটমামা তখনও ফেরেননি। বড়মামির দিদি-জামাইবাবু চলে গেছেন। যাওয়ার সময় জং-ধরা অস্ত্রটা আর সঙ্গে নিয়ে যাননি। যজ্ঞবেদির পাশে ওই অস্ত্রটি পড়ে আছে। এখানে বড়মামার কোম্পানি সম্পর্কে কিছু বলা দরকার। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার অনেক আগে থেকেই লালবাজারের পুলিশ মহলে বড়মামার বেশ চেনা-জানা ছিল। অবসর নেওয়ার আগে বড়মামির নামে একটা ব্যাবসা শুরু করেছিলেন। পুলিশের হাতে যে লাঠি থাকে, বড়মামার কোম্পানি সেই লাঠি সাপ্লাই দিত। কিন্তু ব্যাবসা বেশিদিন চলেনি। তারপর ‘থার্ড আই’ নাম দিয়ে শুরু করলেন প্রাইভেট ডিটেকটিভের কোম্পানি। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার আগে এই থার্ড আই একটামাত্র কেস পেয়েছিল। তা হচ্ছে রাজারহাটের কাছাকাছি কোনও পোলট্রি ফার্ম থেকে তেরোটা মুরগি চুরি হয়েছিল। বড়মামার লোক সেই ফার্মে তদন্ত করতে গিয়ে বহুবার ডাবল ডিমের ওমলেট খেয়েছে কিন্তু একটা মুরগিরও সন্ধান দিতে পারেনি। এরপর থেকে হাঁস, মুরগি, পাঁঠা, খাসি এসব কেস নেওয়া বন্ধ। কারণ ওগুলো নেওয়ার পরেই তো কেটে খেয়ে ফেলে। খেয়ে ফেললে সেই জিনিস কেমন করে উদ্ধার হবে! অবসর নেওয়ার পর তালতলায় একটা ঘর ভাড়া নিয়ে বড়মামা থার্ড আইকে চাঙ্গা করে যাচ্ছেন। কিন্তু কোনও কেস আসছে না। একই সঙ্গে শুরু করেছেন ছেলেদের পাঞ্জাবি, গেঞ্জি, মেয়েদের ব্লাউজ, জিনসের প্যান্ট আর শাড়ির ব্যাবসা। মামার ভাষায় পোশাক শিল্পে বিপ্লব। একেবারে খাঁটি স্বদেশি বিপ্লব। মামার এই স্বদেশি বিপ্লব হল, গেঞ্জি, জামা, ব্লাউজ, প্যান্টে আর পাঞ্জাবিতে থাকবে শুধু দেশের ভাষা, দেশের নাম। কোনও গেঞ্জি বা প্যান্টে নিউ ইয়র্ক, হলিউড, সানফ্রান্সিসকো ইত্যাদি বিদেশি নাম থাকবে না। সেখানে লেখা থাকবে, ‘চমকে দেবে চমকাইতলা’, ‘চল যাই কেওড়াতলা’, ‘রাজভাতখাওয়া’, ‘বাছুরডোবা’, ‘কুমিরমারি’, ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয় কেন?’ ‘আঁতেলদের সুমতি দাও’, ‘লেঙ্গি মারা মহাপাপ'। গোড়ার দিকে এইসব চমৎকার বাক্যবিন্যাসের পাঞ্জাবি এবং শাড়ির বেশ কদর হয়েছিল। এখন অবশ্য ততটা কদর নেই। কিন্তু বড়মামার থার্ড আই অর্থাৎ শখের গোয়েন্দাগিরি ব্যাবসা এখনও জমেনি। যদিও বড়মামার নিষ্ঠার কোনও ত্রুটি নেই। বিদেশি বা হিন্দি ছবিতে শখের গোয়েন্দাদের যেমন পোশাক থাকে, অর্থাৎ লম্বা ওভারকোট, মাথায় টুপি, পকেটে ছোট টর্চ আর গুলি ছাড়া ফাঁকা রিভলভার। ওই পোশাকে সেজে বড়মামা নিজেই নিজের হলঘরে অনেকবার একা একা মহড়া দিয়েছেন এবং যথারীতি ঘরের সমস্ত জিনিস তছনছ করেছেন, আর সেইজন্য বড়মামির সঙ্গে ঝগড়া বেধেছে। ঝগড়ার সময় বড়মামা প্রায়ই বলতেন, ‘সাধনা করার কোনও পরিবেশ এই বাড়িতে নেই। থার্ড আই দাঁড়িয়ে গেলে দিল্লি, মুম্বই থেকে আমার ডাক আসবে।' কিন্তু সত্যি বলতে কী, ওই রাজারহাট আর সোদপুর ছাড়া আর কোনও জায়গা থেকে ডাক আসেনি। রাজারহাটে মুরগি চুরি, সোদপুরে এক বস্তা চাল চুরি। ব্যস, এর বাইরে আর কোনও ডাক নেই।
দুই মামা হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকতেই মামিরা বলে উঠলেন, ‘খোঁজ পেলে? পুলিশকে বলেছ?’
বড়মামা ইশারায় দেখালেন, এক গ্লাস জল আনতে। বড়মামি জল আনতে ফ্রিজের দিকে
গেলেন। মেজমামি এগিয়ে এসে মেজমামাকে বললেন, ‘কীগো, কোনও সন্ধান পেলে?’ মেজমামা উত্তর দিলেন, ‘আগে ভাবতে দাও। পরে বলব। এখন যা বলার তা দাদা বলবে।'
বড়মামির হাত থেকে জল নিয়ে বড়মামা জলটা খেলেন। ‘আঃ’ বলে তৃপ্তিসূচক একটা শব্দ করে গ্লাসটা বড়মামির হাতে ফিরিয়ে দিতেই বড়মামি আগের প্রশ্নটাই আবার করলেন। বড়মামা বললেন, 'মানুষ হঠাৎ হঠাৎ গৃহত্যাগ করে কেন? গৃহ যদি ত্যাগের জন্যই হয় তবে গৃহ নির্মাণের প্রয়োজন কেন? গৃহ হলেই যে তা ত্যাগ করা যাবে না এমন কোনও বিধান নেই। সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগ করেছিলেন, নদের নিমাই করেছিলেন। তবে গৃহত্যাগ করলেই সে কিন্তু বুদ্ধদেব বা নিমাই হয়ে যায় না। যদি তাই না হয়, তা হলে ফালতু গৃহত্যাগ করা কেন? আমাদের নেত্য কি এমনই কেউকেটা হয়ে ফিরবে, নাকি রাস্তায় কুকুরের কামড় খেয়ে ইঞ্জেকশন নিতে বাড়ি ফিরে আসবে? এখন দেখতে হবে, নেত্যর পক্ষে...’
বড়মামি আর ধৈর্য ধরতে পারলেন না। বিষম রাগে, ‘ধেত্তেরি তোমার কথা’ এই পর্যন্ত বলে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন। মেজমামিও গেলেন। আমরা কয়েকজন ঘরের এধারে-ওধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছি। দুই মামা মুখোমুখি বসে। ছোটমামার জন্য আমাদের খুব ভাবনা হচ্ছিল। বড়মামার ছেলে সন্তু বলল, ‘পুলিশে ডায়েরি করেছ? ওঁরা কিছু বললেন?’
বড়মামা গম্ভীর চোখে সন্তুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওরা কী জানে যে বলবে? তবে একদম কিছু জানে না তা নয়। ওরা রুটিনমাফিক কাজ করে। ওদের তো থার্ড আই নেই। ওই রুটিনে এই কেস ধরা পড়বে না। এই কেসটা হচ্ছে সেলফ কিডন্যাপ। তার মানে, নেত্য নিজেকেই নিজে কিডন্যাপ করেছে। বড় জটিল কেস। কেসটা আমাকেই নিতে হবে। নিজের মায়ের পেটের ভাই, অন্য কারও হাতে দিয়ে আমি ভরসা পাচ্ছি না। ভাইয়ের কেসটা আমিই টেকওভার করলাম।'
বড়মামিমা ঝড়ের গতিতে ঘরে ঢুকে বললেন, ‘তোমাদের কাউকে দরকার নেই। কাল সকালে আমি যাব থানায়।
বড়মামা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন, ‘থানা কী করবে? ওদের ভরসা করছ তুমি?’ বড়মামিমা বললেন, ‘মুরগি চোর ধরার মুরোদ নেই, সে খুঁজে আনবে ভাইকে। তোমার ওপর আমার তিলমাত্র ভরসা নেই।'
বড়মামা উঠে দাঁড়ালেন। পিছনে দুটো হাত দিয়ে পায়চারি করতে করতে বললেন, ‘জেনারেশন গ্যাপ। এখন স্বামী-স্ত্রীতেও জেনারেশন গ্যাপ হচ্ছে। তোমরা খেতে যাও। আমি আমার স্টাডিরুমে বসে কেসটা স্টাডি করি। এতদিনে একটা ভাল কাজ পাওয়া গেছে। নেত্যটা নিজে নিজেই কিডন্যাপ হয়ে গিয়ে আমার পসারটা বোধহয় জমিয়ে দিয়ে গেল। হ্যাটস অফ নেত্য। জীবিত না পেলে মৃতই তোকে খুঁজে আনব। নো ছাড়ান-ছোড়ন।'
বড়মামি প্রবল একটা মুখঝামটা দিয়ে প্রবলতর গতিতে ঘরের বাইরে চলে গেলেন।
দু’দিন কেটে যাওয়ার পরও ছোটমামার কোনও খবর পাওয়া গেল না। পুলিশ জানাল, তারা সম্ভাব্য সমস্ত জায়গায় খোঁজ করে বাঘছাল পরা কোনও অপহৃত যুবকের সন্ধান পায়নি। তবে তদন্ত চলছে। এদিকে আমরা সমস্ত আত্মীয়স্বজনকে খবর দিয়েছি। তাঁদের কেউ কেউ আমাদের সমব্যথী হওয়ার জন্য বাক্স গুছিয়ে এই বাড়িতে চলে এসেছেন। যাঁরা আসতে পারেননি তাঁরা টেলিফোনে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং রোজই একবার করে ফোন করেন। ছোটমামার অফিসে এবং মেসেও খবর দেওয়া হয়েছে। সেই মেস থেকে ছোটমামার দুই বন্ধু এসে গেছেন। এই শহরে এসে কোথায় আর থাকবেন, অতএব, আমাদের সমব্যথী হয়ে তাঁরা আপাতত দু'দিন ধরে আমাদের বাড়িতে। বড়মামার অভ্যেস ছিল কোনও কিছু গভীরভাবে ভাবতে হলে, চোখ খুলে ভাবতে পারতেন না। চোখ বুজে ভাবতেন। এই চোখ বোজা নিয়ে একদিন একটা বিশ্রী কাণ্ড ঘটে যাওয়াতে যে অশান্তি হয়েছিল তারপর থেকে বড়মামা আর চোখ বুজে কিছু ভাবেন না। মেজমামার দুর্গাপুরে ফিরে যাওয়া হয়নি। ফলে আরও ছুটি চেয়ে অফিসে ফ্যাক্স পাঠানো হয়েছে। মেজমামা দুঃখ করে বলেন, ‘ভাইটার জন্য যে একটু ভাবব তার উপায় নেই। বাড়ি ভর্তি এত লোক আর এত শোরগোল হলে ভাবা যায়!’ তাই মেজমামা রোজ বিকেলে ভাবার জন্য দু'টাকার টিকিট কেটে বনবিতানে গিয়ে জলার ধারে বসে ভাবেন।
বড়মামি একদিন আমাকে সঙ্গে নিয়ে থানায় গেলেন। দেওরের বিষয়ে খোঁজ নিতেই জনৈক অফিসার বললেন, ‘ম্যাডাম, কলকাতা এবং আমাদের জেলা শহরের সর্বত্র খবর নিয়েছি। আসলে কী জানেন, আমাদের পুলিশ রেকর্ডে আজ পর্যন্ত কোনও জটাহীন এবং বাঘছাল পরিহিত তান্ত্রিক অপহরণের কেস নেই। সেই কারণে...’
বড়মামিমা বললেন, ‘এটা কেমন যুক্তি হল! কেস নেই বলে আপনারা গালে হাত দিয়ে বসে থাকবেন? কেস হতে কতক্ষণ? হয়তো এই রাজ্যে এটাই প্রথম তান্ত্রিক অপহরণ। আপনারা গুরুত্ব দিচ্ছেন না কেন?’
বাড়িতে ফিরে এসে দেখলেন বসার ঘরে হাতে একটা মোটা ডাণ্ডা নিয়ে বড়মামা পায়চারি করছেন। তাঁর সামনে বসে আছে পটলা, বড়মামির দিদি, জামাইবাবু আর একটি ষোলো-সতেরো বছরের ফুটফুটে ছেলে। বড়মামি আমার দিকে তাকালেন। চোখের ভাষায় বোঝাতে চাইলেন, ব্যাপারটা কী? আমিও ঠোঁট উলটে নিঃশব্দে বুঝিয়ে দিলাম, জানি না। বড়মামা ঘরের মধ্যে পায়চারি করছেন আর থেকে থেকে সামনের টেবিলটার উপর হাতের ওই ডাণ্ডাটা দিয়ে ঠকাস করে মারছেন। থাকতে না পেরে বড়মামিমা বলে উঠলেন, ‘বাড়ির মধ্যে এসব কী হচ্ছে? টেবিলটা যে ভেঙে যাবে!’
বড়মামা ঠোঁটে আঙুল রেখে নিষেধের ভঙ্গিতে বললেন, ‘ইনভেস্টিগেশন বোঝো? এখানে তাই চলছে।'
বড়মামিমাকে দেখে তাঁর দিদি যেন অনন্ত অন্ধকারে আলো দেখলেন, তেমনভাবেই আকুল কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘দ্যাখ তো ছায়া, নিত্যর খোঁজ নিতে এসে কী বিপদে পড়েছি। দু'ঘণ্টা ধরে পটলাকে জেরা করছে আর ধমকাচ্ছে। এরপর যদি তোর জামাইবাবুকেও পটলার মতো ধমকাধমকি করে তবে তো এ বাড়িতে আমাদের আসাই বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের বাবার কথা মনে আছে তো?’
বড়মামা তখন পটলাকে প্রশ্ন করছেন, ‘মাস্টার পটলা, নেত্যগোপাল যখন বাড়ি ছেড়ে চলে যায়, তখন রাত কটা?’
পটলা উত্তর দিল, ‘রাত এগারোটা নাগাদ।'
বড়মামার প্রশ্ন, ‘কী করে জানলে? তোমার হাতে ঘড়ি ছিল?’
পটলার চটজলদি উত্তর, ‘সব ঘড়িতে কি একরকম সময় থাকে? আপনার হাতঘড়ি, ঘরের দেওয়াল ঘড়ি, বড়মা'র হাতঘড়ি সব আলাদা সময়। আমার ঘড়িতে তখন 'ওই এগারোটাই হবে।'
বড়মামা আবার প্রশ্ন করেন, 'তোমার কী ঘড়ি?
পটলা উত্তর দেয়, ‘আন্দাজ ঘড়ি।'
বড়মামিমা এবার এগিয়ে এসে বললেন, ‘এসব কী নাটুকেপনা হচ্ছে। যা ঘটবার তা তো তোমার সামনেই ঘটেছে। এত সব প্রশ্ন কেন?
বড়মামি এবার ষোলো-সতেরো বছরের ওই ফুটফুটে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এই ছেলেটি কে? কোন বাড়ির ছেলে?’
বড়মামা কাঁধ ঝাঁকিয়ে গর্বের সঙ্গে উত্তর দিলেন, ‘ওর ডাকনাম বিচ্ছু। ভাল নাম বিদ্যুৎ বর্মন। আজ থেকে ও আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট।'
বড়মামি চোখ কপালে তুললেন, ‘ওইটুকু ছেলে তোমার অ্যাসিস্ট্যান্ট?’
বড়মামা বললেন, ‘কিছুই তো খবর রাখো না। বড় বড় গোয়েন্দাদের ছোট ছোট ছেলেরাই সহকারী হয়। এবার আমিও ছোটখাটো একটা ছেলেকে সহকারী নিলাম। দেখবে দিব্যি জাতে উঠে গেছি।'
বড়মামি বললেন, ‘কী মুশকিল! ছেলেটার পড়াশোনা নেই? স্কুলে যাওয়া নেই? তোমার সঙ্গে ওই হিজিবিজি করলেই হবে?’
বড়মামা খর দৃষ্টিতে বড়মামির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মূর্খ, অন্যান্য খুদে ছেলেরাও গোয়েন্দাগিরি করে এবং ওই ফাঁকে পড়াশোনাও করে। হয়তো স্কুলেটুলেও যায়। ওসব নিয়ে ভেবো না।”
বড়মামিমা বসার ঘর ছেড়ে নিজের ঘরে এলেন। নিজের ঘরে ঢোকার মুখে দেখলেন, দিব্যি সেজেগুজে মেজমায়া ভাববার জন্য বনবিতানে যাচ্ছেন। বড়মামিমা বলে উঠলেন, ‘রোজ যে দু'টাকার টিকিট কেটে বনবিতানে ভাবতে যাও তা সেই ভাবনা থেকে কোনও সমাধান বেরোল?'
মেজমামা নরম গলায় বললেন, 'আমার কাজ ভেবে যাওয়া, দাদার কাজ সমাধান বের করা, তোমাদের কাজ টেনশন করা, নেত্যর কাজ হারিয়ে যাওয়া। সবাই সবার কাজ করে যাচ্ছে বউদি। কারও কাজে গাফিলতি নেই।'
মেজমামা কথা শেষ করেই টিকিট কেটে ভাবতে চলে গেলেন। বড়মামি অস্ফুটে বললেন, ‘কত জন্মের পাপ থাকলে এই বাড়ির বউ হতে হয়!'
রাত্রে খাবার টেবিলে বসে সন্তু তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল, ‘ছোটকাকার অন্তর্ধান রহস্যর কোনও কিনারা হল?’
বড়মামা রুটির টুকরো মুখে তুলতে গিয়ে থেমে গেলেন। সবার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বললেন, ‘ওয়েল! হাউস যদি আমার কাছে জানতে চায়, তা হলে এইটুকু বলতে পারি যে, জোরকদমে তদন্ত চলছে। অনেক ব্লু হাতে এসেছে। কিন্তু তদন্তের স্বার্থে এর বেশি কিছু বলা যাবে না। বলা উচিতও হবে না।'
মেজমামি বললেন, ‘এই একই কথা তো প্রথমদিন থেকেই শুনছি। ঠাকুরপো বাড়ি আসবে কবে?’
বড়মামা রুটি মুখে দিলেন। একটু চিবিয়ে নিয়ে বললেন, ‘বললাম তো, তদন্তের স্বার্থে এরচেয়ে বেশি বলা যাবে না। তবে হ্যাঁ, একটা কথা, এই অপহরণ কিন্তু কোনও সাধারণ অথবা বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয়। আন্তর্জাতিক অপহরণ চক্র এবং জঙ্গি সংগঠনগুলোর মদত আছে।'
বড়মামি নিজের বাটি থেকে তরকারি তুলতে তুলতে বললেন, ‘রোজকার কাগজে যা যা লেখা হয় তাই মুখস্থ বলে যাচ্ছে। ছোট ঠাকুরপো যদি নিজে থেকে এই বাড়িতে ফিরে না আসে তা হলে তাকে আর আমাদের খুঁজে বের করার সাধ্য নেই। এক দাদা রোজ বিকেলে বনবিতানে গিয়ে ভাবতে বসে, আর-এক দাদা হম্বিতম্বি করে বাড়ি মাথায় করে।'
. বড়মামা সবাইকে সতর্ক করে দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, ‘ব্যাপারটাকে মোটেও লঘু করে দেখো না। অপহরণকারীদের দুষ্টচক্রে আমি যেভাবে আঘাত হানছি তাতে করে কিন্তু আগামী এক-দু’দিনের মধ্যেই এই বাড়ির আরও কেউ একজন অপহৃত হতে পারে। সেইজন্য সবাই সতর্ক থাকবে।'
বড়মামি জলের গ্লাসে চুমুক দেওয়ার আগে বললেন, ‘ওরা যে কেন তোমাকে একটিবার অপহরণ করে না কে জানে!’
সন্তু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘খুব কঠিন কাজ। বাবার অফিস ইউনিয়নের ব্যাপারটা মনে নেই? ইউনিয়নের তো কেঁদে মা ছেড়ে বাঁচি অবস্থা।'
বড়মামা মৃদু হেসে বললেন, ‘আইন নিয়ে পড়লে বড় ব্যারিস্টার হতে পারতাম। বিলেত চমকে দিয়ে গোটা ভারতকে চমকাতাম।'
রাত্রে শুতে যাওয়ার আগে আমি, সন্তু আর ভুবন ছাদে যাই। খানিকক্ষণ ছাদে কাটিয়ে শুতে আসি। ভুবন আমার মাসতুতো বোন, ওরা গড়িয়াতে থাকে। মামা হারানোর খবরে ওরা এই বাড়িতে এসেছে। ভুবন সন্তুকে বলল, ‘সন্তুদা, বড়মামার অফিসের ইউনিয়নে কী হয়েছিল?’
ঘটনাটা বলার আগে সন্তু হেসে নিল। ভুবন জানে না, কিন্তু ওই ঘটনাটা আমরা জানি। আমরা তখন ছোট। স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়ি। কীসব দাবিদাওয়া নিয়ে বড়মামাদের অফিসে ইউনিয়ন জোর আন্দোলন করছিল। সেইসঙ্গে লাগাতার বন্ধের হুমকি। এক দিনের একটা ধর্মঘটও হয়ে গেল। সেই এক দিনের ধর্মঘটের আগে অফিসের বড়কর্তা কয়েকজন সিনিয়ার স্টাফকে ডেকে পাঠালেন আলোচনার জন্য। তাঁদের মধ্যে বড়মামাও ছিলেন। অফিসের আইন বিভাগের অফিসার বড়কর্তাকে বললেন, ‘নন্দদুলাল চক্রবর্তীকে ডাকুন। ওঁকেই দায়িত্ব দিন কোম্পানির হয়ে ইউনিয়নের সঙ্গে কথা বলার জন্য।'
এইসর আলোচনা আর আয়োজন করতে করতেই একদিনের প্রস্তাবিত ধর্মঘটটা আরম্ভ হল। ধর্মঘটে যা হয় তাই হতে আরম্ভ করল। অফিসের গেটে ধর্মঘটীদের জমায়েত, শ্লোগান, কাউকে অফিসে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না এবং যোগদানেচ্ছু কর্মচারীরা ঢুকতে না পেরে অফিসের সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এরই মধ্যে অফিসের পুলকারে চড়ে এলেন বড়মামা। সঙ্গে দুজন অফিসকর্মী। গাড়ি থেকে নামতেই কেউ একজন এসে বলল, ‘নন্দদা, অফিসে কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না।'
বড়মামা বললেন, ‘তাই তো হওয়া উচিত।'
বড়মামা গটগট করে অফিসগেটের দিকে এগিয়ে গেলেন। ইউনিয়নের একজন সেক্রেটারি গোছের নেতা এসে বললেন, ‘অফিসে যাবেন না। ধর্মঘট চলছে।
বড়মামা এক-পা এগিয়ে গিয়ে বললেন, ‘ধর্মঘট, হ্যাঁ, সে তো চলবেই। ধর্মঘট না হলে আবার ইউনিয়ন কীসের? পুজোর মঙ্গলঘট, ইউনিয়নের ধর্মঘট। ধর্মঘট আপনারা করছেন করুন। আমি তো আপনাদের সদস্য নই। ধর্মঘটের পক্ষে আমি সায়ও দিইনি। তবে আমার সায় না থাকলে কী ধর্মঘট হবে না? নিশ্চয়ই হবে। হাজারবার হবে।'
ইউনিয়নের নেতাকে ঘিরে আরও জনাদশেক লোক, সবাই বড়মামার দিকে তাকিয়ে। তাঁরা বোঝার চেষ্টা করছেন চক্রবর্তীবাবু কোন পক্ষের হয়ে কথা বলছেন। সেই নেতা বললেন, ‘আসলে ধর্মঘট হল শ্রমিক-কর্মচারীদের গণতান্ত্রিক অধিকার।'
বড়মামা বললেন, ‘আলবাত! তবে গণতন্ত্র তো কারও বাপের খেতের মুলো নয় যে ইচ্ছে করে টান মেরে তুলে নেওয়া যায়। মুলো নয়ই বা কেন? মূল থেকেই তো অন্যায়ের মূলোচ্ছেদ সম্ভব। গণতন্ত্রে ধর্মঘট করার অধিকার আছে। আবার এই গণতন্ত্রের বলেই ধর্মঘটে কিন্তু শামিল না হওয়ারও অধিকার আছে। কাজ না করার অধিকার এবং কাজ করার অধিকার। কিন্তু আপনারা যদি আমাকে অফিসে ঢুকতে না দেন সেটা নিশ্চয়ই আপনাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। আবার অফিসে ঢোকা এবং অফিসে গিয়ে কাজ করা সেটা আমার কাজের অধিকার। সেটাও গণতন্ত্র। এখন দেখতে হবে গণতন্ত্র ব্যাপারটা কেমন। দশচক্রে ভগবান ভূত, তবে কি অনুপযুক্ত হাতে পড়ে গণতন্ত্রও বিকৃততন্ত্র হচ্ছে? তা কেন হবে!
আপনাদের মতো বিবেচক এবং উদার লোকদের হাতেই গণতন্ত্র শোভা পায়। সবসময় শোভা পায় তাই বা বলি কী করে। জাপানের হিরোশিমায় এবং নাগাসাকিতে যাঁরা বোমা ফেলেছিল, কিংবা...
ইউনিয়নের নেতা রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বললেন, 'আপনারা যা খুশি করুন। নন্দবাবুর সঙ্গে থাকলে গেটমিটিংটাই হবে না। যান, আপনি একা গিয়ে অফিস করুন।'
বড়মামা অফিসে ঢুকে গেলেন। গেটের ভিতরে ঢুকে বললেন, ‘যাঁরা যাঁরা আসতে চান চলে আসুন। গণতন্ত্রে সবার সমান অধিকার। ইউনিয়ন তাই আমাকে বলল। ইউনিয়ন জিন্দাবাদ।'
জনাদশেক লোক ঢুকে গেল বটে কিন্তু বাকিরা সাহস পেল না। এবার অফিস থেকে যখন প্রস্তাব দেওয়া হল যে, অফিসের হয়ে শ্রীযুক্ত নন্দদুলাল চক্রবর্তী কথা বলবেন, তখন ইউনিয়ন জানিয়ে দিল, লাগাতার ধর্মঘট তারা পিছিয়ে দিতে প্রস্তুত, দু’–একটি দাবিদাওয়া ছাড়তেও রাজি, কিন্তু নন্দবাবুর সঙ্গে কোনও আলোচনা নয়। 'নন্দবাবুর সঙ্গে কথার পাল্লায় পড়ে ইউনিয়নের একাধিক সক্রিয় সদস্য একাধিকবার হাওড়া এবং শিয়ালদহ থেকে রাতের শেষ ট্রেন মিস করে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে রাত কাটাতে বাধ্য হয়েছে।
ওইসব ঘটনার পর বড়মামাকে দেখলেই ইউনিয়নের কর্তারা দ্রুত ফুটপাথ বদল করতেন। আমরা একটু পরে ছাদ থেকে নেমে এলাম। সন্তু আর আমি একই ঘরে শুই। আমাদের ঘরের পাশ দিয়েই ছাদে যাওয়ার সিঁড়ি উঠে গেছে। বড়মামা বাড়িটা তিনতলা করবেন বলে দোতলার ছাদে শিক বের করা ছিল। বস্তাখানেক বালি আর কিলোতিনেক পাথরকুচি ছাদের এক কোণে দীর্ঘদিন পড়েছিল। তিনতলা আর করা হয়নি। সম্ভবত তিনতলার ব্যাপারটা এবাড়ির সবাই ভুলে গেছেন। এমনকী আমাদের বড়মামাও। দোতলার টানা বারান্দায় পর পর আরও দুটি ঘর। একটিতে বড়মামা থাকেন আর অন্যটিতে মেজমামা। নীচের ঘরে মাসি আর ভুবন। একতলার সিঁড়ির কাছে পটলা আর রান্নার লোকের থাকার ব্যবস্থা। একতলার আরও দুটি ঘরের একটি ছোটমামার। আপাতত সমব্যথী আত্মীয়দের দ্বারা ওই দুটি ঘরই ভর্তি। বাড়িটার পিছনে বেঁটে বেঁটে জঙ্গলে ভরা খানিকটা জমি। যিনি কিনেছিলেন, তিনি এখনও পর্যন্ত বাড়ি করতে পারেননি। ফলে ওই জংলা জমিটা একটা অলিখিত আঁস্তাকুড়ে পরিণত হয়েছে। জানলার পরদা টানতে গিয়ে প্রথমে আমিই ব্যাপারটা লক্ষ করলাম। সন্তুকে বললাম, ‘জানলার কাছে আয়, একটা জিনিস দেখাব।'
সন্তু তৎক্ষণাৎ জানলার সামনে এল। আমার মতো সন্তুও দেখল, একটা টর্চের আলো জংলা জমিটার উপর দিয়ে ঘুরে ঘুরে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, কেউ যেন থেকে থেকে টর্চ জ্বেলে কিছু খুঁজছে। সন্তু বলল, ‘ব্যাপারটা অদ্ভুত। আগে তো কখনও এমন জিনিস দেখিনি। আমাদের এখন কী করা উচিত?’
আমি বললাম, ‘বড়দের কাউকে বলা দরকার। নয়তো আমি, তুই আর পটলা গিয়ে ব্যাপারটা দেখি।'
সন্তু হঠাৎ আঙুলে তুড়ি বাজিয়ে বলে উঠল, ‘ভয় কী, আমাদের পাশের ঘরেই তো শার্লক হোমস আছেন। চল, তাঁকে গিয়ে ব্যাপারটা আগে জানাই।'
আমি বললাম, ‘চল।'
‘আমরা ঘর থেকে বেরিয়ে গুটিগুটি পায়ে বড়মামার ঘরের দিকে গেলাম। রন্ধ দরজার গায়ে কান পাততেই ঘরের ভিতর থেকে খটাখট আওয়াজ হচ্ছে টের পেলাম। আমি সন্তুর দিকে তাকালাম। সন্তু আমার দিকে তাকিয়ে ইশারায় বলল, দরজায় ধাক্কা দিতে।
ছোট ছোট শব্দ করে তিনবার দরজায় ধাক্কা দিলাম। পরে ‘মামা' বলে ডাকতেই ভিতর থেকে মামার গম্ভীর গলা ভেসে এল, ‘ডোর ইজ ওপেন। প্লিজ কাম ইন।'
জংলা জমিতে আলোর রহস্যটা নাকি মামার তদন্তেরই অঙ্গ। অন্য কারও অপহরণ ঠেকাতে রাত বারোটার পর একজোড়া টর্চ দিয়ে পটলাকে মামাই নাকি পাঠিয়েছেন। মামার ধারণা, দুষ্টচক্রের জঙ্গিরা ওই জংলা জমিতেই আশ্রয় নেবে। তাই পটলাকে ওয়াচ করতে পাঠানো।
সন্তু বলল, ‘কিন্তু পটলার যদি কোনও বিপদ হয়? পরের ছেলের ক্ষতি হলে কে সামলাবে?’
বড়মামা বললেন, ‘আমার ঘরের পিছনের জানলাও খোলা। থেকে থেকে আমিও ওয়াচ করছি। গোলমাল দেখলেই ফায়ার করব।'
সন্তু বলল, ‘তুমি গুলি চালাতে জানো?’
বড়মামা একটু হেসে বললেন, ‘এতে এত জানাজানির কী আছে! এ তো মানুষ মারা বন্দুক নয়। পাখি মারা। মানুষের গায়ে লাগলে মরবে না ঠিকই, তবে আহত হওয়ার চান্স আছে। তবে এতসব তথ্য তো ওই জঙ্গিদের জানার কথা নয়। ওরা তো সত্যিকারের বন্দুক, সত্যিকারের গুলি, এসব ভেবেই পালাবে, নয়তো হার্টফেল করবে। কাউকে মারা আমার গোয়েন্দাগিরির লক্ষ্য নয়। আমি অহিংস মতে শত্রুর মোকাবিলা করতে চাই।'
আমি বললাম, ‘এত রাত্রে তুমি টাইপ মেশিন চালিয়ে কী টাইপ করছ?’
বড়মামা বেশ গর্বের সঙ্গে বললেন, 'আমি তো তোদের সিনেমার গোয়েন্দা নই যে, চিত্রনাট্যে যেমন লিখবে তেমনভাবেই গোয়েন্দাকে চলতে হবে। কাজটা ইন্টারেস্টিং, চ্যালেঞ্জিং তবে রিস্কও প্রচুর। এর জন্য সাহসের প্রয়োজন। ভারতে অনেক রকম সাধু সংগঠন আছে। হোমযজ্ঞ করা তান্ত্রিকও অনেক। দশটা তান্ত্রিক সংগঠনের ঠিকানা জোগাড় করেছি। সেইসব সংগঠনকে চিঠি লিখছি। কুরিয়ারে চিঠি পাঠাব।'
সন্তু বলল, ‘তুমি কি পাঠানো শুরু করে দিয়েছ?'
বড়মামা সন্তুকে ভৎসনা করার ভঙ্গিতে বললেন, ‘এতই সোজা কাজ ভাবিস? এ কি তোর বিজয়ার চিঠি পাঠানো? তোর ছোটকাকাকে দেখে বুঝলি না, তান্ত্রিক কস্টিউম পরার পর মাতৃভাষা আর মোটেই বলছে না। কেবল রাষ্ট্রভাষা বলছে। তাই আমার এই ইংরেজি চিঠিগুলো জনৈক হিন্দির অধ্যাপককে দিয়ে হিন্দিতে অনুবাদ করাতে হবে। তারপর তো পাঠাব।'
আমি বললাম, ‘কিন্তু ঘরের মধ্যে এই রকম খটাখট আওয়াজ হলে বড়মামিমা তো ঘুমোতে পারবে না।'
বড়মামা জবাব দেওয়ার আগেই খাটের উপর আমাদের দিকে পাশ ফিরে বড়মামিমা বললেন, ‘না রে, আমার কোনও অসুবিধে হচ্ছে না। বরং তোর বড়মামা ঘুমোলে মনে হয় একজোড়া মোটরসাইকেল ঘরের মধ্যে পাক খাচ্ছে। সে তুলনায় টাইপ রাইটারের আওয়াজ অনেক ভাল। মনে হচ্ছে একটা কচি ছাগলছানা ঘরের মেঝেতে পা ঠুকে ঠুকে লাফাচ্ছে।'
আমি বললাম, ‘ছোটমামা আদৌ ফিরবে কি? নাকি অপহরণকারীরা মেরে ফেলেছে?’
বড়মামা বললেন, ‘না না, মেরে ফেলে সেই লাশ পোড়ানো, ক্রিয়াকর্মের ব্যবস্থা করা এত সব ঝামেলায় ওরা যাবে না। কিন্তু ভাবার কথা হল, অপহরণ যদি করেই থাকে তবে এত দিনেও মুক্তিপণ চেয়ে কোনও ফোন করল না কেন? ফোন তো চালু আছে। মুক্তিপণ যে চাইতেই হবে তার কোনও মানে নেই। তাই যদি হবে তা হলে অপহরণ করা কেন? বিনা স্বার্থে কেউ কি অপহরণ করে? তবে স্বার্থ তো অনেক রকম হয়। এক্ষেত্রে কোন ধরনের স্বার্থ কাজ করছে সেটাই ভেবে দেখতে হবে। শুধু শুধু ভাববই বা কেন? ভাবার আগে কাজ। কিন্তু আগে ভাবনা না আগে কাজ? ওই যে কথায় বলে, ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না। তবে কি এই প্রবাদ বাক্য মিথ্যা? আমার মেজভাই ব্রজ তো ভেবে কাজ করতে চায়। কিন্তু ছেলেটা ভাবতে-ভাবতেই বুড়ো হয়ে যাবে, কাজ আর করতে পারবে না। কিন্তু ভাবনা ছাড়া...’
এবার বড়মামিমা হাতের ইশারায় আমাদের যেতে বলে আবার পাশ ফিরে শুয়ে পড়লেন। আমরা নিজেদের ঘরে ফিরে এলাম। আমাদের বাড়িতে সবাই সর্বক্ষণ ছোটমামাকে নিয়ে আলোচনা করছে, ফোনে আত্মীয়-বন্ধুরা খবর নিচ্ছে, কিন্তু ছোটমামার কোনও সন্ধানই জানা যাচ্ছে না। মামিমারা ইতিমধ্যেই নানারকম মানত করে বসে আছেন। টুকটাক পুজো দেওয়াও চলছে। কিন্তু আসল কাজ কিছুই হচ্ছে না। দু’দিন কেটে গিয়ে তিনটে দিনও কেটে গেল। ছোটমামার কোনও খবরই পাওয়া গেল না। এরই মধ্যে একদিন বড়মামা দোতলার বারান্দায় তাঁর সাধের হারমোনিয়ম নিয়ে বসলেন। যদিও এটা কোনও নতুন ঘটনা নয়, বড়মামা মাঝে মধ্যেই হারমোনিয়ম নিয়ে গান গাইতে বসেন। বড়মামা বিলম্বিত লয়ে গান। বিয়ের বাসরে নতুন জামাইয়ের বিলম্বিত লয়টা এতটাই বিলম্বিত হয়ে গিয়েছিল যে, মামা যখন গান শেষ করে চোখ খুললেন, তখন ভোর হয়ে গেছে। বাসর ঘরে আর কেউ নেই। মামাকে হারমোনিয়ম নিয়ে বসতে দেখে বড়মামিমা আতঙ্কিত কণ্ঠে বললেন, ‘আবার তুমি গান গাইছ?’
বড়মামা বললেন, ‘ডোন্ট ওয়ারি, আমি তো সেই ঘটনার পর থেকে আর চোখ বুজে গান গাই না। গাইবার সময় আমার চোখ খোলা থাকে।'
বড়মামিমা বললেন, ‘মনে থাকে যেন!’
চোখ বুজে গান গাওয়ার অভ্যেস বড়মামাকে ছাড়তে হয়েছিল বড় দুঃখে। কিছুদিন তো অভিমান করে গানই গাননি। পরে অবশ্য অভিমান কমে গিয়েছিল। ঘটনাটা ঘটেছিল কোনও এক নভেম্বরের সন্ধ্যায়। বড়মামা বারান্দায় শতরঞ্জি পেতে হারমোনিয়ম নিয়ে গান গাইছেন। সেই বিলম্বিত লয়। হারমোনিয়মের রিডে আঙুল চাপবার পরই বড়মামা অভ্যেসবশে চোখ বুজে ফেলেছেন। চোখ খুলে উনি গান গাইতে পারেন না। মামার কথায়, ‘চোখ বুজে গান গাইতে গাইতে গানটা আমি মুদ্রিত নেত্রে ভিজুয়ালাইজ করি। তা না হলে আবার গান হয় নাকি?’ অতএব মামা যথারীতি চোখ বুজে বিলম্বিত লয় গেয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় বড়মামিমা প্লেটে করে একটা গরম ফিশ ফ্রাই নিয়ে এসে হারমোনিয়মের পাশে রেখে বললেন, ‘ফিশ ফ্রাই রেখে গেলাম। এক ফাঁকে খেয়ে নিয়ে আবার গাইতে থাকো।'
বড়মামা আড় চোখে সেই ফিশ ফ্রাইটা একবার দেখে নিয়ে মনে মনে ভাবলেন, ফ্রাইটা একটু ঠাণ্ডা হোক, তা ছাড়া এখনই গান থামিয়ে হামলে পড়ে ফিশ ফ্রাই খাওয়া প্রকৃত সংগীতসাধকের কাজ নয়। আগে সংগীত পরে ফ্রাই। বড়মামা চোখ বুজে আবার গান গাইতে আরম্ভ করলেন। ছুটির দিন। বড়মামার শ্বশুরমশাই জামাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। তিনি একখানা ফিশ ফ্রাই হাতে করে একতলার বারান্দা থেকে জামাইয়ের গান শুনতে দোতলার বারান্দায় উঠে এলেন। ইতিমধ্যে জনৈক হুলো বেড়াল গন্ধে গন্ধে উপরে বারান্দায় এসে মামার ফিশ ফ্রাইটা দাঁতে কামড়ে সোজা ছাদের দিকে চলে গেল। এমনি নিঃশব্দে ব্যাপারটা ঘটল যে, বড়মামা কিচ্ছুটি টের পেলেন না। গান শেষ করে ফিশ ফ্রাই খাবার জন্য চোখ খুলে দেখেন তাঁর সামনে শ্বশুর এবং তাঁর হাতে একটি ফ্রাই এবং বড়মামার নিজের প্লেটটি ফাঁকা। বড়মামা শ্বশুরমশাইয়ের দিকে তাকালেন। শ্বশুর ভাবলেন, জামাই বোধ হয় জানতে চাইছে, ‘আপনি কখন এলেন?’ তাই তিনি বললেন, ‘এই একটু আগে এলাম।'
বড়মামা ভিতরের ক্ষোভ চেপে বললেন, 'আমার ফিশ ফ্রাইটা তুললেন কখন?’
শ্বশুরমশাই আকাশ থেকে পড়লেন। অবাক গলায় বললেন, 'তোমার ফিশ ফ্রাই! কী বলছ তুমি? এটা তো আমার মেয়ে আমাকে খেতে দিল। খেতে খেতে উপরে তোমার কাছে
আসব বলে প্লেট আর নিইনি। ফ্রাইটাই হাতে করে উপরে এলাম তোমার গান শুনব বলে।' বড়মামা বললেন, ‘আপনার মেয়ে, অর্থাৎ আমার বউ আমাকে এই প্লেটে একটা ফিশ ফ্রাই দিয়ে গিয়েছিল। সেটা গেল কোথায়? আপনি বই দ্বিতীয় ব্যক্তি তো আর কেউ আসেনি।'
শ্বশুরমশাই রাগে অপমানে ফুঁসতে ফুঁসতে বললেন, ‘নন্দ, তুমি কী বলতে চাইছ পরিষ্কার করে বলো।'
বড়মামা বললেন, ‘আপনি আমার চোখ বুজে থাকার সুযোগে আমার ফিশ ফ্রাইটি বেমালুম আত্মসাৎ করেছেন এমন কথা বলছি না। তবে বলব না-ই বা কেন? আমার শূন্য প্লেটে আর আপনার হাতে অর্ধভুক্ত ফ্রাইটি কি একথাই প্রমাণ করে না যে, ওটি আমারই প্লেট থেকে তোলা? গুরুজন মানুষ, একখানা সামান্য ফিশফ্রাইয়ের জন্য তো আপনাকে ফ্রাই-চোর বলা যায় না। তবে আপনার মেয়ের সংসার। খেতে ইচ্ছে হলে আরও ফ্রাই আপনার জন্য পাঠিয়ে দিত। মাঝখান থেকে এই সংগীতসাধকের ফ্রাইটা ধরে টানলেন কেন?’
বড়মামার শ্বশুরমশাই রাগে কাঁপতে কাঁপতে নীচে নেমে এলেন। নিজের জামাইয়ের কীর্তির কথা সবাইকে জানিয়ে শ্বশুরমশাই সেই যে এই বাড়ি থেকে বেরোলেন, মরার আগে পর্যন্ত আর এই বাড়িতে আসেননি। এই ঘটনার পর অনেকদিন বড়মামা গান করেননি। হারমোনিয়ম নিয়ে বসলেই বড়মামি হুকুম করতেন, ‘চোখ খুলে গাইবে। মনে আছে তো সেই কেলেঙ্কারির কথা!’
বড়মামা ঘাড় নেড়ে বড়মামিমাকে আশ্বস্ত করে গাইতে বসলেন। দোতলার বারান্দায় নয়, একতলার বসার ঘরে বড়মামা গাইতে শুরু করলেন। বাড়িতে তখন দুই মামি আর আমি। সন্তু আর ভুবন গেছে বাজারের দিকে। নীচের ঘরে বড়মামা একা। মেজমামা টিকিট কেটে প্রতিদিনের মতো আজও বনবিতানে ভাবতে গেছেন, এখনও ফেরেননি। আমি বাড়ির সদর গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছি। সবেমাত্র সন্ধ্যা হয়েছে। হঠাৎ বন্ধুটি আমায় বলল, ‘হ্যাঁ রে, তোদের বাড়িতে পুলিশ ঢুকছে কেন?’
আমি দ্রুত ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম, কথাটা সত্যি। বাড়ির সামনে একটা পুলিশের জিপগাড়ি। সেই গাড়ি থেকে নেমে একজন পুলিশ অফিসার আমাদের বাড়িতে ঢুকছেন এবং তাঁর পিছু পিছু যাচ্ছেন পাজামা আর হাওয়াই শার্ট পরা একজন লোক। আমি আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে বাড়িতে ঢুকে গেলাম। বসার ঘরে বড়মামা বিলম্বিত লয় গেয়ে যাচ্ছেন, দরজার সামনে পুলিশ অফিসার আর সেই লোকটি। আমাকে দেখে পুলিশ অফিসার বললেন, 'উনি থামবেন কখন?’
আমি উত্তর দিলাম, ‘না থামালে উনি থামেন না। উনি নিজে নিজে কখন থামেন তা কেউ বলতে পারে না। আপনি ডাকুন না।
পুলিশ ভদ্রলোক ঘরের মধ্যে টাঙানো একটা পোস্টারের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বললেন, ‘এর পরও থামাতে বলছেন।'

বড়মামার ঘরের ওই পোস্টারটা অনেকদিনের। ওতে লেখা ‘গানের সময় চুপ করে থাকবেন। সুরের সভায় অসুরদের স্থান নেই। গানে বিঘ্ন ঘটালে কাউকে ছেড়ে দেব না, সাবধান।' আমি গিয়ে বড়মামাকে ডেকে তাঁর সংগীতসাধনায় বিঘ্ন ঘটালাম। বড়মামা পুলিশ অফিসারের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আরে গঙ্গাপদবাবু, কী খবর?
পুলিশ অফিসার বললেন, ‘স্যার, গঙ্গাপদবাবুর খবর বলতে পারব না। উনি আমার স্বর্গত পিতৃদেব। তাঁর খবর কেমন করে রাখব? আমার নাম হরিপদ। আপনার নামে থানায় একটি অভিযোগ জমা পড়েছে।'
বড়মামা উঠে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, 'কীসের অভিযোগ?’
পুলিশ অফিসার বললেন, চুরির।'
ততক্ষণে দুই মামি নীচে নেমে এসেছেন। পটলা এবং জনাতিনেক প্রতিবেশীও জুটেছে। বড়মামি আর্তনাদের সুরে বলে উঠলেন, ‘চুরি! ওগো তুমি কী চুরি করেছ গো?’
বড়মামা পুলিশ অফিসারের দিকে তাকিয়ে বললেন, ওয়েল, অভিযোগ চুরির। কিন্তু কী চুরি করেছি? চুরি যাওয়া বস্তুটি কী?’
পুলিশ অফিসার বললেন, ‘লম্বমান বেণীসহ একটি জটা। ইনি কলকাতার চিৎপুরে থাকেন। অপেরা পার্টিকে সাজপোশাক, চুল, জটা, বেণী, খোঁপা সবই ভাড়া দেন।'
পুলিশ অফিসার লোকটির দিকে তাকাতেই লোকটি বলল, 'আমার নাম করুণাঘন শিকদার। ‘সাজ-সজ্জা’ নামে অপেরা পার্টির পোশাক ভাড়া দেওয়ার দোকানে কাজ করি। আমাদের পুরনো খদ্দের নিত্যগোপালবাবু। গত অমাবস্যার রাতে আপনি, মানে নন্দদুলালবাবু তাঁর জটা অপহরণ করেছেন। নিত্যগোপালবাবু আমাদের কাছে আপনার নামে লিখিত অভিযোগ করেছেন এবং সেই অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা থানাকে জানাতে বাধ্য হয়েছি। কী করব বলুন? এই সিজনে চিৎপুর পাড়ায় দশ জোড়া জটার অর্ডার।'
বড়মামা বললেন, ‘আপনার জটা আপনি পাবেন। কিন্তু জটাধারী নেত্যটা কোথায়? আগে তাকে চাই।'
পুলিশ অফিসার বললেন, ‘তিনি তো আমার জিপের পিছনেই বসে আছেন।' বড়মামি বলে উঠলেন, ‘ওমা, সে কী কথা! ও না নেমে গাড়িতেই বসে রইল কেন?’ সাজসজ্জা-র লোকটা বলল, ‘নেত্যবাবুর অভিমান এখনও যায়নি। যে গৃহ উনি ত্যাগ করেছেন সেই গৃহে স্বেচ্ছায় আসতে পারেন না। তাঁকে আবাহন করে আনতে হবে।'
দুইমামি আর আমরা জিপগাড়ির পিছনে গুটিসুটি হয়ে ছোটমামাকে বসে থাকতে
দেখলাম। বড়মামা বললেন, ‘নেত্য, আগে নেমে আয় তবে জটা পাবি৷’ মামিরা বললেন, ‘ঠাকুরপো, নেমে এসো।'
ছোটমামা বললেন, ‘নামব বললেই কি নামা যায় নাকি? আমি তো সাধারণ মানুষ নই। অমাবস্যায় গৃহত্যাগ করেছিলাম অতএব অমাবস্যা না হলে গৃহে প্রবেশ করি কেমন করে?’ বড়মামি বললেন, 'তবে উপায়?’
পটলা বলল, ‘আমি উপায় করে দিচ্ছি। মেন সুইচ অফ করে দিলেই তো অমাবস্যা।' কিন্তু পটলাকে কিছুই করতে হল না। বিদ্যুৎ পর্ষদের করুণায় সারা পাড়া জুড়ে অমাবস্যা নেমে এল।
করুণাঘন জটা নিয়ে ফেরত যাওয়ার পর বড়মামা বললেন, ‘এবার বুঝলি তো, আমি সিনেমার গোয়েন্দা নই। টাইমলি নেত্যর জটা টেনে নিয়েছিলাম বলেই তো নেত্য জটাজালে বাড়ি ফিরে এল। আমার গোয়েন্দাগিরির স্টাইল আলাদা। তবে আলাদাই বা কেন? কেনই বা নয়?’
বড়মামা ফাঁকা ঘরে একাই কথা বলে যেতে লাগলেন।
.
আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী, ১৪১১
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন