দাদুর দাঁত

দুলেন্দ্র ভৌমিক

আমার মাতামহ দেবেন্দ্রপ্রতাপ গুহনিয়োগী ছিলেন রীতিমতো জাঁদরেল লোক। আমি জন্মাবার পর থেকে আমার দাদুর নানারকম কীর্তিকাহিনির গল্প শুনে আসছি। ইংরেজ আমলে তিনি ‘রায়বাহাদুর’ উপাধি পেয়েছিলেন। কেন পেয়েছিলেন, সেটা নিয়েও তিন-চাররকম গল্প আমাদের মাতুল বংশে চালু ছিল। দাদুর চেহারাটি ছিল দেখবার মতো। মাথায় পর্যাপ্ত সাদা চুল। মোটা ফ্রেমের চশমার নীচে বড় বড় চোখ, গায়ের রং সাহেবদের মতো টকটকে ফরসা, নাকের নীচে পুরু গোঁফ আর আঁটোসাঁটো শরীরের বাঁধুনি। এখন সত্তর পেরিয়ে গেছেন, কিন্তু দেখলে মনে হবে যেন সবেমাত্র পঞ্চাশ পেরিয়ে এলেন। বয়স বাড়লেও শরীরকে তেমন ক্ষয় হতে দেননি দাদু। শুধু একটাই গণ্ডগোল, তা হল তাঁর দাঁত। শরীর-স্বাস্থ্য ধরে রাখলেও দাঁতটাকে ধরে রাখতে পারেননি। ষাটের কোঠায় পা দেবার পরেই তাঁর দাঁতে নানারকম সংকট দেখা দিতে থাকে। অবশেষে দাঁতের ব্যথা সইতে না পেরে তিনি তাঁর সব দাঁত তুলে ফেলে বাঁধানো দাঁত ব্যবহার করতে আরম্ভ করেন। টেরিটি বাজারের এক চিনা মহিলার দোকান থেকে তিনি যেদিন দাঁত বাঁধিয়ে ফেরেন, সেদিন আসবার সময় চাঁদনিচক থেকে একখানা আয়নাও কিনে আনেন।

আমরা তখন বড়মামার কঠোর শাসনে আসন্ন পরীক্ষার পড়া তৈরিতে ব্যস্ত। দাদুর কঠোর নির্দেশেই রোজ সন্ধেবেলা বড়মামা আমাদের পড়াতে বসাতেন। সে এক দেখবার মতো ব্যাপার। বড়মামা হাত নেড়ে নেড়ে এমনভাবে গ্রামার পড়াতেন, যেন হিন্দি ছবিতে মিউজিক কনডাক্ট করছেন। দিদিমা সন্ধেবেলা আহ্নিকে বসে মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে ছুটে আসতেন পড়ার ঘরে। বড়মামাকে উদ্দেশ করে বলতেন, ‘হ্যাঁ রে বিরু, পড়বে ওরা, তা তুই অত হাত-পা নেড়ে গলা ছেড়ে চেঁচাচ্ছিস কেন? এটা কি যাত্রা হচ্ছে নাকি?

দিদিমার কথায় বড়মামা কান দিতেন না। তিনি বলতেন, ‘প্রকৃত শিক্ষাব্রতীকে সংযমী হতে হয়। সব কথায় কান দিতে নেই।'

অতএব তিনি কোনওদিকে কান না দিয়ে গ্রামার কোথা থেকে এল, কেন এল, আসাতে কী হল ইত্যাদি বিষয় যখন হাত নেড়ে বোঝাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই দরজায় এসে দাঁড়ালেন দাদু। দরজায় দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে সবার দিকে একবার দেখে নিয়ে হঠাৎ দাঁত বার করে হাসতে লাগলেন। দাদুর এই আচরণের কোনও মানে তখনও আমাদের কাছে ধরা পড়ল না। আমরা একটু ঘাবড়ে গেলাম। দাদু হঠাৎ যেমন হেসেছিলেন, তেমনই হঠাৎ আবার হাসি থামিয়ে গম্ভীর হয়ে গেলেন। ব্যাপারটা এমন হল যে, দাদু যেন দরজায় দাঁড়িয়ে আমাদের মুখ ভেংচালেন। দাদুর মতো লোকের পক্ষে এমন কাণ্ড তো অবিশ্বাস্য! আমি মনে মনে ভয় পেয়ে গেলাম। গোপাল বলে আমার এক সহপাঠী ছিল। তার দাদুর মাথা খারাপ হয়ে যাওয়াতে তাঁকে কয়েকদিন আগে চিকিৎসার জন্য রাঁচি পাঠানো হয়েছে। গোড়ার দিকে তিনিও লোক দেখলেই ভেংচি কাটতেন। পরে যখন মানুষজনকে কামড়াতে আরম্ভ করলেন, তখনই তাঁকে রাঁচি পাঠিয়ে দেওয়া হল। তবে কি আমার দাদুরও রাঁচি যাওয়ার পূর্বলক্ষণ দেখা যাচ্ছে! আমার বুকের মধ্যে হায় হায় করে উঠল।

দাদু গম্ভীর হয়ে আছেন। এবার গম্ভীর গলাতেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘এনিথিং ফাউন্ড রং?’ আমরা পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলাম। আমরা শুনেছি শিক্ষিত বাঙালি পাগল হলে কেবলই ইংরেজি বলতে থাকে। দাদু বোধহয় পাগলই হয়ে যাচ্ছেন। আমি কিছু একটা বলতে হবে বলে বললাম, 'দাদু, কখন এলে?’

দাদু গম্ভীর গলায় বললেন, ‘লুক অ্যাট মি অ্যান্ড সে, এনিথিং অ্যাবনর্মাল ইন মাই ফেস? ইফ এনি, প্লিজ টেল মি!’

দাদু আরও জটিল অবস্থার সৃষ্টি করলেন। পাগলের প্রাথমিক স্তরে তো মুখে কোনও চিহ্ন থাকে না। যা কিছু থাকবার, সেটা বোধহয় থাকে মগজের মধ্যে। সেই মগজ তো চোখে দেখা যায় না। অতএব, আমরা চুপ করে রইলাম।

দাদু এবার ঘরের ভেতরে এলেন। ঠোঁটের ওপর ক্ষীণ হাসি ফুটল। তিনি বললেন, ‘কান্ট ইউ ফলো মি? হতচ্ছাড়া বাঁদর, আমার দাঁতগুলো যে সব বাঁধানো, সেটা কি বোঝা যাচ্ছে?’ কথাটা বলেই তিনি মুখের মধ্যে আঙুল দিয়ে দু’পাটি দাঁত খুলে নিলেন।

আমরা যখন সবাই বললাম, ‘না, একদম বোঝা যাচ্ছে না, একেবারে সত্যিকারের দাঁত মনে হচ্ছে, তখন দাদু খুশি হয়ে তাঁর বাঁধানো দাঁতের চৈনিক কারিগরির বিশেষত্ব বোঝাতে লাগলেন। গ্রামার শেখা মাথায় উঠল। আমরা দাঁতবিষয়ক আলোচনায় মেতে উঠলাম। দাদু বললেন, ‘কলকাতার সাতাশটা দোকান ঘেঁটে এই দোকানটা আমি বার করেছি। পৃথিবীতে এরাই হচ্ছে সেরা। আড়াইশো বছরের পুরনো দোকান। ওরা কলকাতার তিনজন ব্রিটিশ লাটসাহেবের দাঁত বাঁধিয়ে দিয়েছে। ওরা সবার দাঁত বাঁধায় না। আমি রায়বাহাদুর শুনে ওরা আমার কেসটা নিল। এই যে দাঁত একবার সেট হল, এটা আমার চিতা পর্যন্ত যাবে। একেবারে লিখিত গ্যারান্টি।

দাঁতবিষয়ক ব্যাপারটা যদি এখানেই মিটে যেত তা হলে কোনও সমস্যা হত না। কিন্তু আমার দাদু ছিলেন ভিন্ন জাতের মানুষ। কোনও একটা ব্যাপার যদি একবার তাঁর মাথায় ঢুকত, তা হলে সেই বিষয়টা সক্কলের মাথাতে না ঢোকানো পর্যন্ত তাঁর শান্তি ছিল না। ফলে, তাঁর দাঁতের বিশেষত্ব তিনি যেমন আমাদের বাড়ির সবাইকে বোঝাতে লাগলেন, তেমনই বোঝাতে লাগলেন প্রতিবেশীদেরও। আমার ছোটমাসির বর, অর্থাৎ ছোটমেসো ছিলেন স্বভাবে এবং পোশাকে একেবারে সাহেব। দাদু যেদিন তাঁর ছোটজামাইকে খাবার টেবিলে দাঁত খুলে দাঁতের কারিগরি বোঝাতে লাগলেন, সেদিন রীতিমতো অশান্তি ঘটে গেল। ছোটমেসো খাবার টেবিল থেকে উঠে গেলেন। ঘরে এসে ছোটমাসিকে বললেন, ‘আমি চললাম।'

ছোটমাসি তো অবাক! দু’দিন থাকবেন বলে এসেছেন। আধবেলা না যেতেই চলে যাবার কথা উঠছে কেন। তিনি চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করলেন, 'চললাম মানে! আমাদের তো দু’দিন থাকবার কথা।'

ছোটমেসো গলার টাই বাঁধতে বাঁধতে বললেন, ‘তোমার বাবা যদি কথায় কথায় মুখের দাঁত খুলে ফেলেন, তা হলে আর এক মুহূর্তও থাকব না। ইতিমধ্যে দু’বার দাঁত খুলেছেন। বিশ্রী অভ্যাস।'

সত্যিই ছোটমেসোকে ধরে রাখা গেল না। জামাই রাগ করে চলে গেছে শুনে দিদিমা ‘হায়-হায়’ করতে করতে দাদুর সামনে এসে ফেটে পড়লেন। দাদুকে দোষারোপ করে বললেন, 'তুমি ওকে দাঁত দেখিয়েছ, তাতেই জামাই বাবাজীবন চলে গেছে।'

দাদু যেন হতভম্ব হয়ে গেলেন। চোখ কপালে তুলে বললেন, 'লাঠি দেখালে কিংবা কুকুর লেলিয়ে দিলে মানুষ পালায়। বাঁধানো দাঁত দেখে জামাই পালাল কেন?’

দিদিমা তখন রাগে জ্বলছেন। মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন, ‘তোমার বাঁধানো দাঁতটা কি কাঞ্চনজঙ্ঘা নাকি মিশরের পিরামিড যে, লোক এলেই দেখাতে হবে! নিজের দাঁত নিজের মুখে না রেখে হরদম এত বাইরে আনা কেন। তোমার এই জামাই-তাড়ানো দাঁত আমি একদিন হামানদিস্তা দিয়ে গুঁড়ো করে দেব।'

দাদু বিচলিত হলেন না। চোখের চশমা খুলে খাপে ঢোকাতে ঢোকাতে বললেন, ‘সে-জামাইয়ের এ-বাড়িতে আসবার দরকার নেই।'

ছোটখাটো অশান্তি প্রায়ই ঘটে যেত, তবুও দাদুকে বদলানো যায়নি। দাদু বাষট্টি বছর বয়সে দাঁত বাঁধিয়েছিলেন। পুরো একটা বছর আমাদের আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীকে দাদু আতঙ্কগ্রস্ত করে রেখেছিলেন। এমনকী, দাদুর দাঁতের দৌলতেই বারোয়ারি পুজোর চাঁদা আদায়কারীরা এই বাড়িটাকে সভয়ে ছাড় দিয়েছিল। কারণ প্রথম চাঁদা আদায়কারীর দলটিকে তিনি দাঁত আর বাঁধানো দাঁতের তফাত, গুণাগুণ, চৈনিক দন্তবিশেষজ্ঞের বিশেষত্ব, নিজের দাঁতের মহিমা ইত্যাদি বিষয়ে এত দীর্ঘক্ষণ ধরে হাতে কলমে বুঝিয়েছিলেন যে, তারা পাঁচ টাকা চাঁদা আদায়ের পরিবর্তে বাড়ি ছেড়ে দ্রুত প্রস্থান করাটাই অধিক শ্রেয় মনে করেছিল।

শুধু যে বাড়ির ছোটজামাই আর চাঁদা আদায়কারীরা পালিয়ে বেঁচেছিল, তাই নয়। আমার মামাতো বোন মিনুর গানের মাস্টার ধীরেনবাবুও একদিন পত্রযোগে বড়মামাকে জানালেন, ‘মাননীয় বিরুবাবু, আপনাদের গৃহে যাইয়া গত দেড় বৎসরের অধিককাল আমি আপনার কন্যাকে সংগীত বিষয়ে শিক্ষাদান করিতেছিলাম। এযাবৎকাল এই শিক্ষাদানে কোনওরূপ বিঘ্ন ঘটে নাই। শুধুমাত্র শীতকালে মশকের উৎপাত ছাড়া আর কোনও অভিযোগ ছিল না। আমি যখন স্বকণ্ঠে আপনার কন্যাকে সরগম শিক্ষা দিতাম তখন প্রতি শীত ঋতুতেই গড়ে দুই-তিনটি করিয়া মশক আমার উন্মুক্ত মুখগহ্বরে অবলীলায় প্রবেশ করিত, কিন্তু আর বাহির হইতে পারিত না। মশক ভক্ষণ করিয়াও গত দেড় বৎসর নিষ্ঠা সহকারে সংগীতশিক্ষা দান করিয়া আসিয়াছি। কিন্তু এইবার সত্যিই আমি অপারগ। আপনার শ্রদ্ধেয় পিতাঠাকুর সম্প্রতি যে নতুন দন্তপাটি পরিধান করিয়াছেন, তাহা দেখিতে অতীব সুন্দর সন্দেহ নাই, কিন্তু সেই দন্তই আমার সংগীতশিক্ষার আসরে প্রবল অন্তরায় হইয়া উঠিয়াছে। ওই দন্ত যদি আমাকে দংশন করিত, তাহা হইলেও এতখানি বিচলিত হইয়া এই পত্র লিখিতাম না। রায়বাহাদুর মহাশয় দন্তের মহিমা কীর্তন করিতে করিতে দন্তপাটি খুলিয়া লইয়া দেখাইতেন। কাহারও খোলা দাঁত দর্শন করা খুব নয়নসুখকর ব্যাপার বলিয়া আদৌ মনে হয় না। তবুও দেখিতাম। কিন্তু যেদিন রায়বাহাদুর মহাশয় তাঁহার দন্তপাটি খুলিয়া আমার গানের খাতার উপর রাখিলেন এবং আমার স্বরলিপির সেই পবিত্র পৃষ্ঠা আপনার পিতাঠাকুরের দন্তপাটির স্পর্শে সিক্ত হইয়া উঠিল, তখনই বুঝিলাম আমার সংগীতসাধনায় এবার মোক্ষম কামড় পড়িয়াছে। আমার আশঙ্কা হইল, এমনও দিন ভবিষ্যতে আসিতে পারে, যেদিন হয়তো আপনার পিতাঠাকুর তাঁহার অতিপ্রিয় দন্তপাটি-জোড়া আমার ললাটে স্থাপন করিবেন। তাই মনে মনে প্রমাদ গনিলাম এবং আপনার কন্যাকে সংগীত শিখাইবার চাকরি হইতে অবসর লইলাম। অতঃপর, কোথাও, কোনও গৃহে সংগীত শিখাইবার দায়িত্ব লইবার আগে আগেই দেখিয়া লইব, উক্ত গৃহে কাহারও দন্তপাটি নকল কি না।’

গানের মাস্টারমশাই চলে যাওয়াতেও বাড়িতে কম অশান্তি হল না। মিনু তো কেঁদেকেটে অন্নজল ত্যাগ করল। অগত্যা দাদুকেই কাগজে বিজ্ঞাপন দিতে হল গানের মাস্টারের জন্য। বক্স নাম্বারে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল। বিস্তর চিঠি এল। চিঠিগুলো বাছতে দেওয়া হল আমার বাবাকে। বাবা কালেভদ্রে এ-বাড়িতে আসতেন। তাঁর ছিল বাইরে বাইরে ঘোরার চাকরি। তিনি বেছে বেছে পাঁচজনকে ডাকলেন। ইন্টারভিউ নেওয়া হচ্ছিল ছোটমাসির বাড়িতে। যোধপুর পার্কের সেই বাড়িতে সেদিন দাদুও উপস্থিত। দাদু উপস্থিত বলেই ছোটমেসো বাড়িতে নেই। ইন্টারভিউ দিতে প্রথমেই এলেন সেই ধীরেনবাবু। তিনি সবেমাত্র বসেছেন। সংগীত বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে একটি রাগাশ্রয়ী গান গাইতে যাবেন, কেবল সা-রে-গা পর্যন্ত আওয়াজ তুলেছেন, ঠিক তখনই ঘরে ঢুকলেন দাদু।

ধীরেনবাবু ‘গা’তেই থেমে রইলেন এক মুহূর্ত। তারপর বাঘ দেখে হরিণছানার যেমন অবস্থা হয়, তেমন অবস্থায় তিনি তাড়াতাড়ি গানের খাতাটি তুলে নিয়ে ‘ও, আপনি!’ শুধু এই বাক্যটুকু উচ্চারণ করে এক লাফে দরজা পেরিয়ে গেলেন। আমরা পেছন থেকে ‘ধীরেনবাবু, ও ধীরেনবাবু’ বলে কাতরকণ্ঠে ডাকাডাকি করতে লাগলাম, কিন্তু ধীরেনবাবু একটিবারও পেছন ফিরে তাকালেন না।

বছরখানেক পর অবশ্য দাঁত নিয়ে দাদুর বাড়াবাড়িটা রুমে এল। মাঝেমধ্যে প্রসঙ্গটা তুলতেন, কিন্তু সেটা তেমন মারাত্মক কিছু নয়।

বাষট্টি থেকে সত্তর, এই আট বছরে দাঁত নিয়ে প্রথম বছর যা ঘটেছে তা বাদ দিলে আর বড় রকমের কোনও ঘটনা তিনি ঘটাননি। তবে সুযোগ পেলে দাঁতের গল্পটা তিনি করে যাচ্ছেন। শুধু গত বছর বাড়িতে কালীপুজোর সময় পুরোহিতের সঙ্গে যখন দাঁত নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন পুরোহিতমশাই বলেছিলেন, 'আমার দাঁতও বাঁধানো। সেটাও বেশ চমৎকার।'

পুরোহিতের দাঁতের চাইতে আমার দাদুর দাঁত যে আরও চমৎকার এবং সে-দাঁতের সঙ্গে যে জগতের আর কোনও দাঁতের তুলনাই চলতে পারে না, সেটা বোঝাবার জন্য তিনি যথারীতি নিজের দাঁত খুলে ফেলেছিলেন এবং খোলা দাঁত হাতে নিয়ে প্রায় চ্যালেঞ্জ করার ভঙ্গিতে বলেছিলেন, ‘খুলুন, খুলুন দেখি আপনার দাঁত। কার সঙ্গে কার তুলনা করছেন সেটা আপনাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি।'

পুরোহিতমশাই বিব্রত। দাদু ততক্ষণে আরেক পাটি দাঁত খুলে ফেলছেন। ঠিক সেই সময় ঢাকের আওয়াজ ছাপিয়ে পুরোহিতের কাতর আর্তনাদ ভেসে এল, ‘এইডা কী করলেন, আরে মশাই, এইডা কী করলেন। পূজা পণ্ড করলেন, সব্বোনাশ কইরা ছাড়লেন।'

আমরা হুড়োহুড়ি করে দৌড়ে গিয়ে দেখলাম, দাদু উত্তেজনার বশে ভুলক্রমে তাঁর একপাটি দাঁত পুরোহিতমশাইয়ের জলপূর্ণ কোষার মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছেন। আর এই ঘটনা দেখে উত্তেজিত পুরোহিতমশাই তাঁর আসনের ওপর লাফাচ্ছেন আর বলছেন, ‘অনাচার হইয়া গেছে, অনাচার হইয়া গেছে।'

দিদিমার কানে খবরটা যাবার আগেই নতুন কোষাকুষি আনিয়ে পুজোর ব্যবস্থা করতে হল। গত বছরের এই ঘটনাটুকু বাদ দিলে আর তেমন কিছু ঘটেনি। দাঁত নিয়ে গুরুতর ঘটনাটা ঘটল মাত্র কয়েকদিন আগে।

দাদু রোজ বিকেলে গিলে-করা পাঞ্জাবি, তাঁতের চওড়া পাড় ধুতি আর নিউকাট জুতো পরে বেড়াতে যান। কোনও পার্কে-টার্কে তাঁর যাওয়ার অভ্যাস নেই। তা ছাড়া ধারেকাছে তেমন ভাল পার্কও নেই। তাই দাদু চলে যেতেন রেলস্টেশনে। প্ল্যাটফর্মের ওপর একটু বেড়াতেন, তারপর কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠতেন ওভারব্রিজে। ওভারব্রিজের মাঝখানে দাঁড়ালে গায়ে খুব হাওয়া লাগে। আমি দাদুর সঙ্গে বার-দুই ওভারব্রিজে উঠে দেখেছি দাদুর একটি বিচিত্র অভ্যাস আছে। লাইন দিয়ে কোনও মালগাড়ি গেলে তিনি দু'হাতে ব্রিজের রেলিং চেপে ধরে ঝুঁকে পড়ার ভঙ্গিতে নীচে তাকাতেন এবং মালগাড়ির বগি গুনতেন। আমি সঙ্গে থাকলে আমাকেও গুনতে বলতেন। কিন্তু আশ্চর্য, আমাদের দু'জনের গণনা কখনওই একরকম হত না। আমি যদি বলতাম, ছাপ্পান্ন, দাদুর তা হলে হত সাতান্ন, না হয় পঞ্চান্ন।

. সেদিন বিকেলে আমি আর দাদু ওভারব্রিজে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাওয়া খাচ্ছি। রোজ এসময় একটা মালগাড়ি যায়। মালগাড়ির যাওয়া নিয়ে আমার কোনও চিন্তা ছিল না। বরং না এলেই আমি খুশি হই। কিন্তু আমাকে খুশি করবার জন্য তো মালগাড়ি বাতিল হতে পারে না। অতএব, কিঞ্চিৎ বিলম্বে এলেও শেষ পর্যন্ত মালগাড়িটা এসে গেল। দাদু যথারীতি রেলিংয়ের ওপর ঝুঁকে মুখ নীচের দিকে নামিয়ে বগি গুনতে আরম্ভ করলেন। দাদুর পাশে দাঁড়িয়ে আমাকেও তা-ই করতে হল।

দাদু আরম্ভ করলেন, ‘ওয়ান, টু, থ্রি, ফোর...’

আমি অবশ্য গুনছিলাম না। দাদুরটা শুনেই বলে দিতে পারব বলে আমি শুধু গোনার ভান করে যাচ্ছিলাম।

দাদু ততক্ষণে গুনে চলেছেন, ‘থারটি ফাইভ, থারটি সিক্স,

আমিও দাদুকে শুনিয়ে একবার বললাম, ‘ফরটি ওয়ান’

থারটি সেভেন...’

দাদু বলে যাচ্ছেন, ‘ফরটি টু, ফরটি থ্রি, ফরটি ফোর, ফরটি ফাইভ, ফরটি সিক্স... হ্যাঁচ্চো! ফরটি সেভে – ..

সেভেনটা আর উচ্চারণ করতে পারলেন না, তার আগেই প্রায় আর্তনাদ করার ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, ‘সব্বোনাশ হয়ে গেছে রে।'

আমি বললাম, ‘কী হল?'

দাদু বিমর্ষভাবে ঠোঁট ফাঁক করে দেখালেন। আমি দেখলাম, দাদুর ওপরের পাটির দাঁত উধাও। আমি অবাক গলায় জিজ্ঞেস করলাম, ‘দাদু, তোমার দাঁত কোথায়?’

ব্রিজের নীচ দিয়ে তখনও মালগাড়িটা চলে যাচ্ছে। দাদু আঙুল দিয়ে সেই চলমান গাড়িটা দেখিয়ে বললেন, ‘ওরই কোনও খোলা বগিতে পড়ে গেছে।'

আমার বিস্ময়ের ঘোর তখনও কাটেনি। আমি বললাম, 'সে কী! ওখানে গেল কেমন করে?’

দাদু বললেন, ‘নিচু হয়ে গুনতে গুনতে হঠাৎ হাঁচি এসে গেল। হাঁচি দেবার সময় দাঁত খুলে নীচের একটা খোলা বগিতে পড়ল।'

আমি বললাম, ‘এখন কী হবে?’

দাদু একটু চিন্তা করে বললেন, ‘ফরটি সিক্স-এর সময় হাঁচিটা আসে।’ দাঁত ওই ফরটি সিক্স নাম্বার বগিতেই পড়েছে। চল তো একবার স্টেশনমাস্টারের কাছে যাই।'

স্টেশনমাস্টার দাদুর বিশেষ পরিচিত। দাদুকে দেখে বেশ খাতির করলেন। দাদু বললেন, ‘এই মালগাড়িটাকে একটু থামানো যায়?’

স্টেশনমাস্টার অবাক হলেন। এরকম অনুরোধ বোধহয় তাঁর চাকরি-জীবনে তিনি কখনও শোনেননি। তিনি বললেন, ‘কেন, কী হয়েছে?’

দাদু চেয়ারে বসে পড়ে হতাশ গলায় বললেন, ‘সর্বনাশ হয়েছে। ওভারব্রিজের ওপর থেকে হাঁচি দিতে গিয়ে ওপরের পাটির দাঁত খুলে পড়ে গেছে মালগাড়ির বগিতে। ওটা আমাকে এনে দিতে হবে।'

স্টেশনমাস্টার চেয়ার ছেড়ে তড়াক করে লাফিয়ে উঠলেন। বললেন, ‘কী পড়েছে? দাঁত? আপনার দাঁত মালগাড়ির বগিতে? সেটা কী করে সম্ভব?’

দাদু টেবিলে চড় মেরে বললেন, ‘আলবত সম্ভব। হাঁচির ঝটকায় দাঁতটা খুলে গেছে। ওটা উদ্ধার করে দিতে হবে।'

স্টেশনমাস্টার চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, ‘নিয়ম নেই। যদি কোনও মূল্যবান জিনিস হত, মানে যাকে বলে ভ্যালুয়েবল আর্টিকল, ধরুন আপনার অ্যাটাচিকেস, কোনও স্যুটকেস, ট্রাঙ্ক— না–না, তাও বা চলমান গুডস ট্রেনে কেমন করে যাবে!’

দাদু এবার খেপে গেলেন। বললেন, 'তোমাদের কেমন আইন হে, দাঁতের চাইতে অ্যাটাচিকেস হচ্ছে ভ্যালুয়েবল আর্টিকল! দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বুঝতে পারছ না। এটা তো হিউম্যান প্রপার্টি এটার জন্যে কেন মালগাড়ি দাঁড় করানো হবে না!’

দাদুর গর্জনে এবং পীড়াপীড়িতে স্টেশনমাস্টার ফোন করলেন কল্যাণী স্টেশনে। গোটা বৃত্তান্ত শোনার পর ওদিক থেকে কী উত্তর এল, সেটা শোনা গেল না বটে, কিন্তু স্টেশনমাস্টারের মুখ দেখে বোঝা গেল, খুব মধুর কোনও উত্তর আসেনি। টেলিফোন নামিয়ে রেখে স্টেশনমাস্টার বললেন, 'আমি দুঃখিত। আমি আপনার দাঁত উদ্ধার করতে অক্ষম।'

দাদু বললেন, ‘আমি জানতাম তোমার দ্বারা হবে না। আমি বাড়ি গিয়ে আজই তোমাদের কমার্শিয়াল সুপারিনটেনডেন্টকে চিঠি লিখে কমপ্লেন করছি। দাঁত আমার চাই-ই চাই। তুমি খালি গাড়ির নম্বরটা বলো।'

বাড়ি ফিরে দাদু শুরু করলেন চিঠি লেখা। বলাই বাহুল্য, সেই চিঠির কোনও জবাব এল না। দাদু গেলেন ভীষণ চটে। এবার লিখলেন রেলের জেনারেল ম্যানেজারকে। ম্যানেজার দাদুকে কী উত্তর দিয়েছিলেন জানি না। অনুমানে বুঝতে পারি আশাপ্রদ তেমন কিছু নয়। দাদুও থামবার পাত্র নন। তিনি প্রশ্ন করলেন, প্রপার্টি হিসেবে রেল কেন আমার দাঁতকে গণ্য করবে না। ভারতীয় রেল যদি দাঁতের মর্ম না বোঝে, তা হলে এর চাইতে পরিতাপের বিষয় আর নেই।

দাঁত খোয়া যাবার পর দাদুর সারাদিনের কাজ হল কেবল চিঠি লেখা। পুরনো একটা টাইপরাইটার মেশিন পর্যন্ত কিনে ফেললেন। দাঁত উদ্ধারের জন্য দাদুর তৎপরতা এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছল যে, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-বন্ধু সবাই একবার দাদুকে দেখে যেতে লাগলেন এবং একই প্রশ্ন করতে লাগলেন, ‘দাঁত পেলেন?’

দাদুর ঘরে তখন চিঠিপত্র রাখবার জন্য গোটাদশেক ফাইল এসে গেছে। রেলমন্ত্রকের নানা দপ্তরে তিনি চিঠি দিয়েছেন। এমনকী, রেলমন্ত্রীকেও। প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতিকেও চিঠি দেবার কথা ভেবেছেন। যদি তাতে কোনও ফল না হয়, তা হলে রেলের বিরুদ্ধে মামলা করা যায় কি না তাই নিয়ে যখন ভাবছেন, তখন একদিন সকালে স্টেশনমাস্টার শালপাতার ঠোঙায় করে দাদুর দাঁত নিয়ে এসে হাজির হলেন। আমরা সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়লাম দাদুর দাঁত দেখবার জন্যে। দাদু অন্য পাটির সঙ্গে মেলালেন। আমাদের সবার মতামত নিলেন। অবশেষে চোখ পিটপিট করতে করতে বললেন, ‘দাঁতটা ঠিক চেনা মনে হচ্ছে না। একটু অন্যরকম লাগছে।'

স্টেশনমাস্টার সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘লাগবেই তো। দাঁতটা কত কিলোমিটার ট্রেন জার্নি করে এল, সেটা ভেবে দেখেছেন? ওটা এল মোগলসরাই থেকে। ধকল গেছে তো।' দাদুর সন্দেহ তবু গেল না। দাঁতটা সরিয়ে রেখে বললেন, ‘তবু শিয়োর হবার জন্য কিছুটা সময় লাগবে।”

স্টেশনমাস্টার সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘তা লাগুক। ভাল করে দেখে শুনে তবে মুখে ঢোকাবেন। আপনি বরং এই কাগজটায় সই করে জানিয়ে দিন যে, আপনার প্রপার্টি আপনি পেয়েছেন।'

দাদু খানিক ভেবে নিয়ে কাগজটায় সই করে দিলেন। দাদুর মনে কিছুটা দ্বিধা ছিল, কিন্তু আমরা সবাই জোর দিয়ে বলাতে উনি রাজি হয়ে গেলেন।

স্টেশনমাস্টার সই-করা কাগজটা খুব যত্ন করে পকেটে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। যাবার আগে আমাকে ইশারায় ডেকে বাইরে এসে বললেন, ‘আপনার দাদু আমাকে পাগল করে ছেড়েছেন। রেলের বড়কর্তারা জানিয়েছেন, যা হোক একটা ব্যবস্থা করে পাগলকে শান্ত করুন। উনি নাকি আমরণ অনশনের হুমকি দিয়েছেন রেলমন্ত্রীকে। ভেবেছিলাম, একজোড়া দাঁত কিনে দেব। কিন্তু কিনতে হল না। ভগবান জুটিয়ে দিয়েছেন।'

আমি চমকে উঠে বললুম, ‘জুটিয়ে দিয়েছেন মানে?’

স্টেশনমাস্টার চাপা গলায় বললেন, 'আমার শ্বশুরমশাই রাত্রে গেলাসে দাঁত ভিজিয়ে ঘুমোতে যান। এবার বেড়াতে এসে দাঁত ভিজিয়েছেন এবং সকালে ঘুম থেকে উঠে ফার্স্ট লালগোলা ধরে বহরমপুর চলে গেছেন। ভেজা দাঁত আর গেলাস থেকে তোলবার কথা মনে ছিল না। ট্রেন এসে গেছে বলে তাড়াহুড়ো করে লালগোলা ধরতে ছুটেছেন। শ্বশুর অন্তত তাঁর দাঁতের জন্য জামাইয়ের নামে রেলমন্ত্রকে চিঠি লিখবেন না। তাই শ্বশুরের দাঁতটা আপনার দাদুকে দিয়ে আমি বাঁচলাম, আমার চাকরি বাঁচল, আমার চোদ্দোপুরুষ বাঁচল।'

কথা শেষ করেই স্টেশনমাস্টার যেন মুক্তির আনন্দে ভাসতে ভাসতে ছুটে চলে গেলেন তাঁর স্টেশনের দিকে।

.

আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী, ১৩৯৩

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%