দুলেন্দ্র ভৌমিক

ঘটনাটা টের পাওয়া গেল গোল্ডকাপ ফাইনালের বাহাত্তর ঘণ্টা আগে। কিন্তু সেই ভয়ংকর ঘটনার কথা বলবার আগে গোল্ডকাপের ইতিহাসটা বলা দরকার। গোল্ডকাপ ফাইনাল খেলার গুরুত্ব গত দশ-বারো বছর ধরে অলিম্পিক ফুটবলের ফাইনাল খেলার মতোই। শুধু কি গুরুত্ব, তার মর্যাদাও কম নয়! ইউরোপীয় কাপ ফুটবল আর বিশ্বকাপ ফুটবলের মধ্যে যতটা ফারাক, গোল্ডকাপ ফাইনাল আর অলিম্পিক ফাইনালের মর্যাদা আর গুরুত্বে তার চেয়েও কম ফারাক।
১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই ভারতের রাজা মহারাজারা এইরকম একটা ফুটবল কাপ প্রচলনের কথা ভাবছিলেন। ভারতে তখন ইংরেজ শাসনের অবসান হলেও বহু ব্রিটিশ সাহেব তখনও ভারতে আছেন। চন্দননগর তখনও ফরাসিদের দখলে। দেশীয় রাজা-মহারাজাদের এই ভাবনার কথা পৌঁছেছিল ভারতে বসবাসকারী তখনকার ব্রিটিশদের কাছে এবং চন্দননগরের ফরাসি শাসকদের কাছেও। দেশীয় রাজাদের তাঁরাও উৎসাহ দিয়েছিলেন। ফলে গোয়ালিয়র এবং কলকাতায় মিটিং করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, গোল্ডকাপের আয়োজন ভারতে হবে। অবশেষে '৫০ সালে গোল্ড কাপের প্রথম খেলা হয় কলকাতায়। তখন শুধু ভারতীয় দলগুলিই খেলায় অংশ নিতে পারত। বছর কয়েক পর এই সিদ্ধান্ত বদল হয়। তখন এশিয়ার সবকটি দেশই এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ পায়। তখন থেকেই ভারতের এই গোল্ডকাপ একটা আন্তর্জাতিক চেহারা এবং চরিত্র পেয়ে যায়। এখন তো এই প্রতিযোগিতা বিশ্বের সেরা সাতটি ফুটবল প্রতিযোগিতার মধ্যে বিবেচিত হয়। দেশ-বিদেশ থেকে বহু ফুটবলপ্রেমী, সাংবাদিক আর খেলোয়াড়রা এসে ভিড় করেন এই খেলা দেখতে।
এবারও আয়োজনের কোনও খামতি ছিল না। দু’বছর অন্তর অন্তর এই খেলা হয়। এ বছর খেলাটি হচ্ছে। ফাইনাল হবে কলকাতায়। ইতিমধ্যেই দেশি-বিদেশি সাংবাদিকরা কলকাতায় পৌঁছে গেছেন। এসে গেছেন বিদেশি টিভি কোম্পানির লোকেরা। দুটো সেমিফাইনাল খেলার একটা হয়েছে কেরলে, অন্যটি দিল্লিতে। কলকাতার ফাইনালে মুখোমুখি হবে কোরিয়া এবং জাপান। ভারত অবশ্য কোয়ার্টার ফাইনালেই হেরে গেছে কোরিয়ার কাছে। দুটি দলের একটি পৌঁছে গেছে আজ সকালে। অন্য দুটি এসে পৌঁছচ্ছে রাত্রে। কলকাতা শহর তখন নতুন করে সাজতে ব্যস্ত। এয়ারপোর্ট থেকে ভি আই পি মোড় তারপর বাইপাসের শুরু থেকে অনেকটা পথ নানাবর্ণের আলোয় ঝলমল করছে। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের স্টেডিয়াম এবং স্টেডিয়ামের বাইরে তখন রকমারি আলোকসজ্জার আয়োজন চলছে। এইসব ঘটনা ঘটছে ফাইনাল খেলা শুরু হওয়ার বাহাত্তর ঘণ্টা আগে। অর্থাৎ এসব হচ্ছে বাহাত্তর ঘণ্টা আগের চিত্র।
ঠিক এই সময় স্টেডিয়ামের গেট দিয়ে জিপগাড়ি করে স্টেডিয়ামে এলেন টি এন পিল্লাই। তাঁকে সবাই পিল্লাই বলেই জানেন এবং ডাকেন। সদা হাসিখুশি চুয়াল্লিশ বছরের পিল্লাই জিপগাড়ি থেকে নামলেন থমথমে মুখে। পিল্লাইয়ের এমন গম্ভীর, এমন বিষাদঘন মুখ তাঁর পরিচিত লোকেরা কখনও দেখেনি। পিল্লাই গাড়ি থেকে নেমে সামনের দিকে কয়েক পা এগিয়ে যেতেই মহারাষ্ট্রের সুনীল কার্লেকর আর পঞ্জাবের সুরিন্দর সিংহ এগিয়ে এসে বলল, ‘হ্যালো মি. পিল্লাই!'
পিল্লাই কখনও যা করেন না, আজ তাই করলেন। ওঁদের কারও কথার জবাব না দিয়ে এগিয়ে গেলেন স্টেডিয়ামের কনফারেন্স রুমের দিকে। ওখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মি. বোস কোথায়?’
মি. বোস অর্থাৎ অমরজিৎ বসু হচ্ছেন এবারের টুর্নামেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান। কলকাতা এবং ভারতের সবাই তাঁকে জানে নানু বোস নামে। ছোট বড় সকলের কাছেই তিনি নানুদা। প্রভূত বিত্তশালী ঘরের ছেলে। নিজের বড় ব্যাবসা। কিন্তু ফুটবল-অন্ত প্রাণ। পিল্লাইয়ের প্রশ্ন শুনে ঘরের মধ্যে বসা একজন বললেন, ‘নানুদা মাঠে আছেন।'
পিল্লাই আর কোনও কথা বললেন না। সোজা সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেলেন। স্টেডিয়ামের এইদিক দিয়ে খেলোয়াড় এবং অফিশিয়ালরা মাঠে যান। কয়েক ধাপ সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে হয় তারপর আবার কয়েক ধাপ সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠলেই মাঠে পৌঁছনো যায়। আন্ডারগ্রাউন্ড সিস্টেম। পিল্লাই ওই পথ দিয়েই মাঠে এলেন। মাঠের ফ্লাডলাইটগুলো তখনও জ্বলছে। ফলে গোটা মাঠ এবং স্টেডিয়াম তখন মধ্যদিনের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল। পিল্লাই দেখলেন, মাঠের মাঝখানে, ঠিক সেন্টার পজিশনে কয়েকজন পদস্থ পুলিশকর্তার সঙ্গে নানুদা দাঁড়িয়ে। পিল্লাই দ্রুত এগিয়ে গেলেন। নানু বোস পিল্লাইকে দেখে বললেন, ‘এসো, পিল্লাই। হোটেলের অ্যারেঞ্জমেন্টগুলো চেক করে নিয়েছ তো?’
পিল্লাই ঘাড় নাড়লেন। যার অর্থ, চেক করা হয়েছে।
নানু বোস বললেন, ‘দিল্লি থেকে ফ্যাক্স পেয়েছি। জাপানের টিম যে প্লেনে আসছে সেটা হয়তো একটু লেট করতে পারে। এয়ারপোর্টে বাসের ব্যবস্থা করা আছে। তুমি শুধু এয়ারপোর্টে ফোন করে সময়টা জেনে নাও।'
পিল্লাই থমথমে গলায় বললেন, ‘নানুদা, সব ব্যবস্থা করা আছে। আমি একটা জরুরি কথা বলতে ছুটে এসেছি।'
নানু বোস এবার ভাল করে পিল্লাইয়ের দিকে তাকালেন। গত কুড়ি বছর ধরে পিল্লাইকে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে চেনেন, আজকের এই মুখটা যেন সেই পিল্লাইয়ের নয়। তিনি একমুহূর্ত ভাবলেন। তারপর পুলিশ অফিসারদের বললেন, ‘এক্সকিউজ মি, আমি একটু আসছি।'
নানু বোস পিল্লাইয়ের কাছে এসে কিছু বলবার আগেই পিল্লাই মাঠের অন্যদিকে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ‘দাদা, এখানে নয়। একটু ফাঁকায় যেতে হবে।'
নানু বোস পিল্লাইয়ের পাশে পাশে হেঁটে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘পিল্লাই, কী হয়েছে? কোনও অফিশিয়াল প্রবলেম?’
পিল্লাই মুখে কোনও কথা বললেন না। শুধু মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলেন, অফিশিয়াল কোনও সমস্যা নয়।
অপেক্ষাকৃত নির্জন জায়গায় এসে পিল্লাই থামলেন। তারপর নানু বোসের মুখের দিকে তাকালেন। পিল্লাইয়ের দু’চোখে তখন গভীর উৎকণ্ঠা আর ভয়। পিল্লাইয়ের চোখের ভাষা বুঝতে পারলেন নানু বোস। নানু বোস জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে পিল্লাই?’
পিল্লাই উত্তর দিলেন, 'স্যার, সর্বনাশ হয়ে গেছে।'
চমকে উঠে নানু বোস বললেন, ‘সর্বনাশ! কীসের সর্বনাশ?’
পিল্লাই বললেন, ‘ব্যাংকের লকার থেকে গোল্ডকাপটা অন্যান্য বছরের মতো এবারও বার করে পালিশ করতে দেওয়া হয়েছিল রায় অ্যান্ড কোং-কে।'
নানু বোস বললেন, ‘হ্যাঁ। কলকাতায় পালিশের কাজ ওরাই করে। কী করেছে? পালিশ এখনও করেনি?’
পিল্লাই বললেন, ‘আমি আজ রায় কোম্পানিতে গিয়েছিলাম। গিয়ে শুনলাম।
নানু বোস অধৈর্য গলায় বললেন, ‘কী শুনলে?’
পিল্লাই বললেন, ‘কাপটা পাওয়া যাচ্ছে না।'
নানু রোস আর্তনাদের ভঙ্গিতে চিৎকার করে উঠে বললেন, ‘হোয়াট! পাওয়া যাচ্ছে না মানে? সওয়া ফুট উঁচু একটা কাপ তো জেমস ক্লিপ বা আলপিন নয়।'
পিল্লাই বললেন, ‘গতকাল দুপুরে আমরা কাপটা কোম্পানিতে দিয়েছি। আজ থেকে পালিশ শুরু হওয়ার কথা। ফাইনালের দিন মানে পরশু সকালে আমাদের নিয়ে আসার কথা।’
নানু বোস বললেন, ‘রাইট! সেইরকমই কথা হয়েছে। তুমি গিয়ে কী দেখলে?’
পিল্লাই বললেন, ‘অফিসঘরে মি. রায় মাথায় হাত দিয়ে বসে। তিনি বললেন, আজ বেলা সাড়ে বারোটা থেকে একটা অর্থাৎ টিফিন পিরিয়ডে কাপটা খোয়া গেছে।'
নানু বোস চিৎকার করতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন। কান্নাজড়ানো গলায় বললেন, ‘ইমপসিবল! কাপ খোয়া যেতে পারে না।'
পিল্লাই বললেন, ‘কিন্তু গেছে।' নানু বোসের মতো শক্ত মানুষও এবার থপ করে মাঠের ওপর বসে পড়লেন। হতাশ গলায় বললেন, ‘এখন কী হবে পিল্লাই ? আর মাত্র বাহাত্তর ঘণ্টা বাকি খেলা শুরু হতে। কিন্তু কাপটাই যদি মাঠে না থাকে..., না, আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না।'
পিল্লাই হাঁটুমুড়ে উবু হয়ে বসলেন নানু বোসের সামনে। বললেন, ‘কথাটা রায় কোম্পানির লোক ছাড়া আমি আর আপনি জানি। এবার বলুন কী হবে?’
নানু বোস উঠে দাঁড়ালেন। পিল্লাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কথা আর কাউকে জানতে দেবেন না। কোনওভাবে যদি সংবাদপত্র খবরটা পেয়ে যায় তা হলে কালকেই চার কলাম হেডিং করবে। কমিটির সবাইকে জানাবার দরকার নেই। কারণ, আমাদের কোনওভাবে অপদস্থ করতে পারলে মনে মনে সুখী হবে এমন কমিটি মেম্বারের সংখ্যা খুব নগণ্য নয়।'
পিল্লাই অসহায় ভঙ্গিতে বললেন, ‘এখন কী করব?’
নানু বোস হাতের পাইপটা ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, 'আগে রায় কোম্পানিতে চলুন। সেখান থেকে যাব স্পোর্টস মিনিস্টারের কাছে। তারপর সি এমের কাছেও যেতে হতে পারে।'
পিল্লাই বললেন, ‘পুলিশকে কিছু জানাবেন না?’
নানু বোস বললেন, ‘এখন নয়। জানাতে তো হবেই। সেটা জানাবেন সি এম। চলো আমরা রায় কোম্পানিতে যাই।'
পিল্লাইকে সঙ্গে নিয়ে নানু বোস মাঠের বাইরে এলেন। গাড়িতে ওঠার আগে সাংবাদিক, অফিসের কিছু লোক নানা প্রশ্ন নিয়ে এল। নানু বোস বললেন, ‘এখন কিছুই বলব না। সব তো আগেই বলেছি। এখন আমাদের কাজগুলো করতে দিন।'
সাংবাদিকদের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে অফিসের লোকদের বললেন, 'আপনারা থাকুন। আমি ফিরে আসছি।'
গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে বললেন, ‘চলো।'
বাইপাসে এসে ড্রাইভার জানতে চাইল, ‘কোথায়?’
নানু বোস বললেন, ‘রায় কোম্পানি। পার্ক স্ট্রিট যাব।’
ওঁরা দু’জনে যখন পার্ক স্ট্রিটে রায় কোম্পানিতে পৌঁছলেন কলকাতার বুকে তখন বিকেলের ছায়া নামছে। একতলা থেকে, কাঠের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে হয়। রায় কোম্পানির মালিক শশধর তখন নিজের চেয়ারে স্থির হয়ে বসে। দেখে মনে হয় শরীরে যেন কোনও জোর নেই। দরজার মুখে পিল্লাই আর নানু বোসকে দেখে শশধর রায় কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন। দু'হাতে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে বললেন, 'নানুদা আত্মহত্যা করা ছাড়া আমার আর পথ নেই।'
নানু বোস বললেন, ‘তুমি আত্মহত্যা করলে যদি কাপটা পাওয়া যায় তাহলে এখনই তোমাকে আত্মহত্যা করতে বলতুম। এবার খুলে বলো তো কী ঘটেছে।' শশধরবাবু বেল বাজালেন। একজন মধ্যবয়স্ক লোক এল। শশধরবাবু বললেন, ‘গোবিন্দকে ডাকো।'
একটু পরে গোবিন্দ এল। চোখ দুটো একটু কটা। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি হবে। গোবিন্দ এসে দাঁড়াতেই শশধরবাবু বললেন, ‘এই গোবিন্দই কাপটা পালিশ করছিল। গোবিন্দ, বাবুদের সব বল।'
গোবিন্দ দু’জনের দিকে, অর্থাৎ পিল্লাই আর নানু বোসের দিকে তাকাল। ওর দু’চোখে ভয়ের ছায়া কাঁপছে। গোবিন্দ একটা ঢোক গিলে বলল, ‘সার! আমিই আজ সকাল থেকে পালিশে হাত লাগিয়েছিলাম।'
নানু বোস কঠোর গলায় বললেন, ‘তোমার হাতের বাইরে কাপটা গেল কীভাবে?’ গোবিন্দর বোধহয় গলা শুকিয়ে আসছিল। আবার একটা ঢোক গিলে বলল, ‘সাড়ে বারোটা থেকে একটা পর্যন্ত আমাদের টিফিন। আজ সাড়ে বারোটার একটু আগে লোডশেডিং হয়। আমরা সবাই ওইসময়ই কাজ বন্ধ করে টিফিনে চলে যাই।' ’
নানু বোস প্রশ্ন করলেন, ‘তখন ক’টা বাজে?
শশধরবাবু বললেন, ‘তা তখন বোধহয় সওয়া বারোটা।’
নানু বোস গোবিন্দর দিকে তাকালেন। জিজ্ঞেস করলেন, “টিফিন করতে তোমরা কোথায় যাও?'
গোবিন্দ উত্তর দিল, 'নীচে।'
নানু বোস আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘নীচে নেমে যাওয়ার সময় কাপটা কোথায় রেখে গিয়েছিলে?'
গোবিন্দ উত্তর দেয়, ‘আজ্ঞে, একটা টেবিলের ওপর।'
পিল্লাই প্রশ্ন করলেন, ‘এই দরজা ছাড়া তোমাদের ঘরে ঢোকার অন্য কোনও দরজা আছে?’
গোবিন্দ বলল, ‘বাথরুমে যাওয়ার একটা দরজা আছে। কিন্তু সেটা ভেতর থেকে বন্ধ থাকে।'
নানু বোস ধমক দেওয়ার মতো করে বললেন, ‘বন্ধ থাকে, কিন্তু আজ ছিল কি?’ গোবিন্দ বলল, ‘ছিল সার।'
নানু বোস ঘরের মধ্যে অস্থিরভাবে হাঁটতে হাঁটতে আবার চেয়ারে বসে পড়ে বললেন, ‘তারপর কী হল?’
গোবিন্দ বলল, ‘একটার একটু পরে বাতি এল।'
পিল্লাই জিজ্ঞেস করলেন, ‘তখন ক'টা বাজে?’
শশধরবাবু উত্তর দিলেন। বললেন, ‘একটা দশ।'
এবার গোবিন্দ বলতে লাগল, ‘আলো আসার পর ঘরে এসে দেখি কাপটা টেবিলের ওপর নেই। তারপর থেকে খোঁজাখুঁজি। এরই মধ্যে পিল্লাইসাহেব পালিশ দেখতে এলেন।'
গোবিন্দ মাথা নিচু করে রইল। নানু বোস শশধরবাবুর ফোনটা টেনে নিয়ে ফোন করলেন। চাপা গলায় বললেন, ‘স্পোর্টস মিনিস্টারকে দিন। আমি নানু বোস কথা বলছি।' ফোন কানে চেপে নানু বোস অপেক্ষা করতে লাগলেন। পাখার তলায় বসেও তিনি ঘেমে যাচ্ছেন। একটু পরে নানু বোস বললেন, 'দাদা, নানু বলছি। আপনি কতক্ষণ আছেন? আমি এখনই আসছি। সাংঘাতিক ব্যাপার হয়ে গেছে। হ্যাঁ, এখনই রওনা দিচ্ছি।' ফোনটা নামিয়ে রেখে নানু বোস শশধরবাবুর দিকে তাকালেন।
আদেশের গলায় বললেন, 'আমি মিনিস্টারের কাছে যাচ্ছি। আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত আপনি এবং আপনার সব স্টাফ যেন এখানেই থাকে।'
নানু বোস আর এক মুহূর্ত দেরি না করে পিল্লাইকে সঙ্গে নিয়ে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে এলেন। মন্ত্রীমহাশয় তখন তাঁর ঘরে বসে কাজ করছেন। তাঁর টেবিলের সামনে জনাদুয়েক লোক বসে। নানু বোসকে দেখে মন্ত্রী বললেন, ‘এই তো টিকিটের আসল লোক এসে গেছে। এনারে বলেন, ইনিই গোছা গোছা টিকিট দিতে পারবেন। আমার কাছে টিকিট কোথায়?’
মন্ত্রীর সামনে বসা লোকজনেরা সবাই ঘাড় ফিরিয়ে নানু বোসকে দেখল। ওদের মধ্যে একজন বলল, ‘নানুদা, কোন একটা কাগজে বেরিয়েছে টিকিট কালোবাজারিদের হাতে চলে গেছে।'
এসব কথায় মন দেওয়ার মতো উৎসাহ এখন নেই নানু বোসের। তিনি শুধু বললেন, ‘যা খুশি বেরোক।'
তারপর মন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দাদা, একটু কথা ছিল। যদি...’
‘যদি’ শব্দটা বলে নানু বোস অ্যান্টি চেম্বারের দিকে তাকালেন। মন্ত্রীদের ঘরে আলাদা কথা বলার জন্য ঘরের মধ্যেই একটা ঘর থাকে। মন্ত্রী নিজের চেয়ার থেকে উঠে সেই অ্যান্টি চেম্বারে এলেন। সঙ্গে নানু বোস আর পিল্লাই। ঘরের মধ্যে একটা ইজিচেয়ার, খান দুই চেয়ার আর একটা গোল টেবিল। মন্ত্রী ঘরে ঢুকে যাওয়ার পর নানু বোস নিজেই দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে চাপা গলায় বললেন, ‘দাদা, সর্বনাশ হয়ে গেছে।'
মন্ত্রী আরামকেদারায় বসতে যাচ্ছিলেন। তিনি না বসে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। গভীর দৃষ্টিতে নানু বোসের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী হয়েছে?’
নানু বোস গলাটা আরও নামিয়ে এনে বললেন, ‘গোল্ড কাপটা খোয়া গেছে।' মন্ত্রীমশাই আঁতকে উঠে বললেন, ‘এ কী বলছেন? খোয়া গেছে মানে?’
নানু বোস রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে নিলেন। রুমালটা পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে বললেন, ‘আজই বেলা সওয়া বারোটা থেকে একটা দশ এই সময়ের মধ্যে রায় কোম্পানির ঘর থেকেই কাপটা উধাও।'
মন্ত্রীমশাই আরামকেদারার ওপর বসে পড়লেন। পরক্ষণেই উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, ‘কথাটা বেশি জানাজানি হয়নি তো!’
নানু বোস বললেন, ‘এখনও হয়নি। কিন্তু কতক্ষণ গোপন রাখব। বাহাত্তর ঘণ্টা পরে ফাইনাল শুরু হবে। তার আগেই কাপ নিয়ে মাঠে পৌঁছতে হবে। এখন কী করব? হাতে তো সময়ও নেই।'
মন্ত্রীমশাই নাকে একটিপ নস্যি নিলেন। রুমাল দিয়ে নাক মুছে নিয়ে বললেন, ‘এটা কোনও সাধারণ চোরের কাজ নয়। এই গোল্ডকাপের ছবিটা ভারতের এবং এশিয়ার প্রায় সব কাগজে এতবার ছাপা হয়েছে, টিভিতে এত দেখানো হয়েছে যে, সবাই এটা চেনে। এটা কোথাও বিক্রি করা মুশকিল। তা ছাড়া নামে গোল্ডকাপ হলেও ওই কাপে তো সোনা অতি সামান্যই।'
নানু বোস বললেন, ‘শুধু গোল ছোট্ট বলটা সোনার। মাত্র তিন ভরি। কিন্তু...'
মন্ত্রীমশাই বললেন, ‘কিন্তু কাপটার মূল্য অনেক। মাত্র তিন ভরি সোনার জন্য এতবড় রিস্ক কেউ নেবে না। ওর মূল্য-মর্যাদা চোরেরা বুঝবে না।'
নানু বোস অধীর কণ্ঠে বললেন, ‘এখন কী হবে? আমার মাথায় তো কিছুই আসছে না। কাপটা উদ্ধার না হলে দেশের মাথাকাটা যাবে। কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে আমাকে সুইসাইড করতে হবে।'
মন্ত্রী বললেন, ‘তাতে তো সমস্যার সমাধান হবে না।'
নানু বোস বললেন, ‘জাপানি ডিজাইনারকে দিয়ে ওই সময় কাপটা তৈরি করতে খরচ হয়েছিল পঁচিশ হাজার টাকা। আমি নিজের থেকে পঁচিশ লক্ষ টাকা দিতে রাজি আছি যদি কেউ কাপটা উদ্ধার করে দিতে পারে।'
মন্ত্রী বললেন, ‘উদ্ধার করতে হবে বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে। সময় থাকলে খোঁজার সুযোগ ছিল। আমাদের হাতে তো সময়ও নেই।'
এবার মন্ত্রীমশাইও তাঁর মাথার ঘাম মুছলেন। টাকের ওপর তখনও বিন্দু বিন্দু ঘাম। তিনি একবার ঘড়ি দেখলেন। তারপর বললেন, 'আপনি আমার গাড়িতে আসুন। একবার রায় কোম্পানিতে যাওয়া যাক। পিল্লাই সাহেব আপনার গাড়িতে আমাদের পেছন পেছন আসুন।'
মন্ত্রীমশাই ঘর থেকে বার হওয়ার আগে নানু বোসের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘দোকান খোলা থাকবে তো?’
নানু বোস বললেন, ‘হ্যাঁ, থাকবে। আমি সবাইকে থাকতে বলে এসেছি।' মন্ত্রী বললেন, ‘তাহলে আর দেরি না করে বেরিয়ে পড়া যাক।'
তিনজনে লিফট দিয়ে নীচে নেমে এলেন। রায় কোম্পানির সবার সঙ্গে মন্ত্রী কথা বললেন। যে ঘরে পালিশ হচ্ছিল সেই ঘরটাও দেখলেন। আধঘণ্টা থেকে বেরিয়ে আসার সময় মন্ত্রী শশধরবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এই কাপ খোয়া যাওয়ার গুরুত্বটা নিশ্চয়ই আপনি বুঝতে পারছেন। '
শশধরবাবু অপরাধীর মতো মাথা নাড়লেন। ভয় আর আতঙ্ক শশধরবাবুকে যেন বোকা বানিয়ে দিয়েছে। মন্ত্রী বললেন, 'আপনি এবং আপনার কোনও স্টাফ আমাদের নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত দোকান ছেড়ে যাবেন না। আর কাপ খোয়া যাওয়ার ব্যাপারটা গোপন রাখবেন।'
মন্ত্রী এবার স্টাফদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আপনারাও গোপন রাখবেন। যার মুখ থেকে কথা বেরোবে পুলিশ তাকেই লক-আপে পুরে দেবে। খুব সাবধানে কথাবার্তা বলবেন।'
তিনজন যখন ঘর থেকে দরজার দিকে পা বাড়াতে যাচ্ছেন তখন শশধরবাবু বললেন, ‘নানুদা, আপনারা এখান থেকে যাওয়ার মিনিট কুড়ি পরে একটা ফোন এসেছিল।' নানু বোস ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘কার ফোন?’
শশধরবাবু বললেন, ‘নাম বলেননি। শুধু জানতে চাইলেন কাপটার পালিশ ঠিকমতো চলছে তো?’
নানু বোসের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। তিনি প্রশ্ন করলেন, 'আপনি কী বললেন?’ শশধরবাবু বললেন, 'বললাম, পালিশ চলছে।'
মন্ত্রী বললেন, ‘এটাই বলে যাবেন। আমরা আবার আসব।'
তিনজনে যখন গাড়িতে উঠছেন তখন পার্ক স্ট্রিটের আলোগুলো জ্বলে উঠল। তিনজনেই দেখলেন, ‘আলোর অক্ষরে ফুটে উঠেছে, গোল্ডকাপ ফাইনাল। ওয়েলকাম ফুটবল লাভার ইন ক্যালকাটা।’
নানু বোসের বুকের ভেতরটা তখন অন্ধকার হয়ে গেছে।
স্পোর্টস মিনিস্টারকে নিয়ে নানু বোস আবার স্টেডিয়ামে ফিরে এলেন। স্টেডিয়ামের বাইরের ও ভেতরের আলোগুলো তখন সব জ্বেলে দেওয়া হয়েছে। নানু বোস আলোগুলোর দিকে একবারও তাকালেন না। মন্ত্রীমশাই গাড়ি থেকে নামতেই একঝাঁক লোক এগিয়ে এসে মন্ত্রীকে ঘিরে ধরল। তাদের মধ্যে থেকে একজন বিনীত ভঙ্গিতে বলল, ‘স্যার, আলো কেমন দেখছেন?’
মন্ত্রী একবার চোখ ঘুরিয়ে দেখে বললেন, ‘বেশ ভালই তো হয়েছে।'
অন্য সময় হলে ওখানে দাঁড়িয়েই কিছুক্ষণ কথা বলতেন। কিন্তু আজ মিনিটখানেকের বেশি দাঁড়ালেন না। নানু বোসকে সঙ্গে নিয়ে সোজা নিজের ঘরে গেলেন। পেছন পেছন কিছু লোক আসছিল। সবাই মন্ত্রীর চেনাশোনা। তিনি দরজা পর্যন্ত এসে দাঁড়ালেন। দরজার গায়ে হাত রেখে পেছন ফিরে অন্যদের দিকে তাকালেন। তারপর একটু হেসে বললেন, ‘আপনাদের সঙ্গে একটু পরে কথা বলছি। এখন নানুদার সঙ্গে একটা মিটিং সেরে নিই। আসেন নানুদা।’
মন্ত্রী নানুদাকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। ঘরের মধ্যে দুটি যুবক ছেলে বসে ছিল। তারা উঠে দাঁড়াতেই মন্ত্রীমশাই বললেন, “তোমরা বাইরের দরজায় থাকো। কাউকে আসতে দিয়ো না এখন।'
নানু বোস বললেন, ‘পিল্লাই আসবে তো।’
মন্ত্রী ছেলে দুটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘পিল্লাইকে চেনো তো?’
ওরা উত্তর দেওয়ার আগেই পিল্লাই এসে গেলেন। এবার দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে মন্ত্রীমশাই বসলেন তাঁর চেয়ারে। সামনের চেয়ারগুলোর মধ্যে দুটি চেয়ারে পাশাপাশি বসলেন নানু বোস আর পিল্লাই।
মন্ত্রী কথা শুরু করলেন এইভাবে: ‘নানুদা, ব্যাপারটা এমন সিরিয়াস পর্যায়ে গেছে যে, সি এম-কে জানাতেই হবে। ফাইনাল খেলার উদ্বোধন তো উনিই করবেন। কাপটাও তুলে দেবেন উনি। তা ছাড়া উনি তো কমিটির প্রধান উপদেষ্টা।’
নানু বোস বললেন, ‘ওঁর সাহায্য তো দরকার। আপনি যোগাযোগ করার চেষ্টা করুন।'
মন্ত্রী ঘরে ঢুকে চশমাটা টেবিলের ওপর খুলে রেখেছিলেন। এবার চশমাটা চোখে লাগিয়ে একবার নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকালেন। তারপর ফোনের ডায়াল ঘুরিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। প্রায় চল্লিশ সেকেন্ড পর মন্ত্রী বললেন, 'আমি স্টেডিয়াম থেকে বিভাস চৌধুরী কথা বলছি। জরুরি দরকার। স্যারকে একটু পাওয়া যাবে?’
আবার একটু অপেক্ষা করার পর মন্ত্রী বললেন, 'স্যার, আমি বিভাস। টুর্নামেন্ট নিয়ে ভয়ংকর একটা ব্যাপার হয়েছে। হ্যাঁ, সেই গোল্ডকাপটা খোয়া গেছে। ওই রায় কোম্পানি, যেখানে পালিশ করতে দেওয়া হয়েছিল। সেটাই বোঝা যাচ্ছে না। আর আটষট্টি ঘণ্টা পর ফাইনাল। খুব গোপনে রাখতে হয়েছে ব্যাপারটা। হ্যাঁ, বলুন। আচ্ছা, হ্যাঁ, ঠিক আছে। আমি ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সব অ্যারেঞ্জ করে আপনার কাছে যাচ্ছি। ঠিক আছে।'
মন্ত্রী ফোনটা রেখে দিলেন। তারপর নানু বোসের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘আমাদের সি পি সাহেব কি মাঠে আছেন?’
নানু বোস বললেন, ‘থাকার তো কথা। সি এম কী বললেন?’
মন্ত্রী একটু নস্যি নিলেন। রুমাল দিয়ে নাকটা মুছে নিয়ে বললেন, ‘সি পি আর আই জি-কে নিয়ে ওঁর বাড়িতে যেতে। বাড়িতে যাওয়ার আগে ঘটনাটা যেন জানানো না হয়।'
নানু বোস দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। পিল্লাই চুপ করে বসে রইলেন। তিনি টের পাচ্ছেন, তাঁর শরীর এই ঠান্ডা ঘরে বসেও ঘেমে যাচ্ছে। একবার চোখ তুলে মন্ত্রীর মুখের দিকে তাকালেন। মন্ত্রীর চোখ দুটো বোজা। কপালের ভাঁজগুলো স্পষ্ট। ভ্রূ দুটো কেঁাঁচকানো। এর অৰ্থ, চোখ দুটো বুজে তিনি ভাবছেন।
নানু বোসকে মাঠ পর্যন্ত যেতে হল না। সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামবার সময় দেখলেন, সি পি সাহেব আরও কয়েকজনের সঙ্গে ওপরে উঠে আসছেন। নানু বোসকে দেখে সি পি সাহেব ঠাট্টার সুরে বললেন, ‘কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন মশাই! ‘একটু আসছি’ বলে সেই যে গেলেন আর পাত্তা নেই। ইভনিং নিউজ পেপারে কী বেরিয়েছে দেখেছেন?’
নানু বোস চমকে উঠে বললেন, ‘কী?’
সি পি বললেন, 'টুর্নামেন্ট কমিটি আর পুলিশের যোগসাজশে নাকি বহু টিকিট চোরাকারবারি মানে ব্ল্যাকারদের হাতে চলে গেছে।'
নানু বোস বললেন, ‘ফাইনালের দিন পর্যন্ত এগুলো চলবে। এসব না থাকলে কলকাতার বিকেলগুলো গরম হবে কেমন করে?’
সি পি’র সঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসতে আসতে নানু বোস বললেন, ‘বিভাসদা, মানে স্পোর্টস মিনিস্টার আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন।'
সি পি বললেন, ‘ওঁর আসার খবরটা পেয়েছি। আমি ওঁর ঘরেই যাচ্ছি।' নানু বোস বললেন, ‘আসুন।'
দু’জনে মন্ত্রীর ঘরে ঢোকার পর মন্ত্রী বললেন, ‘আমাদের একটু সি এমের বাড়িতে যেতে হবে।'
সি পি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাকেও?’
মন্ত্রী বললেন, ‘হ্যা। আই জি সাহেবকে খবর দেওয়া হয়েছে। উনিও সোজা পৌঁছে যাবেন।'
সি পি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী ব্যাপার বলুন তো?’
মন্ত্রী বললেন, ‘বোধহয় ফাইনালের দিন সবদিকের সিকিউরিটি নিয়ে উনি হয়তো আমাদের কিছু বলতে চান। আমরা এখান থেকে ওঁর বাড়িতে যাচ্ছি সেই কথাটা এখানকার কাউকে বলার দরকার নেই।'
সি পি বললেন, ‘ঠিক আছে।'
মন্ত্রী বললেন, ‘তাহলে উঠে পড়া যাক।'
সবাই উঠে দাঁড়ালেন।
মন্ত্রী উত্তর দিলেন, ‘অবশ্যই যাবেন।'
নানু বোস বললেন, “পিল্লাই কি আমাদের সঙ্গে যাবে?’
ঘর থেকে বেরিয়ে চারজন বাইরে এলেন। বাইরে তখন সবাই চা খেতে ব্যস্ত। কমিটির একজন মেম্বার বলে উঠলেন, ‘চা খাবেন নাকি?’
মন্ত্রী হাত নেড়ে বারণ করলেন। নানু বোস হাতের ইশারায় করম থাপা আর রাম মিত্রকে ডাকলেন। দু’জনে পাশাপাশি বসে ছিলেন। দু’জন কাছে আসতেই নানু বোস বললেন, ‘মিত্তির, আজ রাতে দু’দলকে ডিনারে ডাকা হয়েছে। ডিনারটা দিচ্ছেন একটা বড় কোম্পানি।'
মিত্তির বললেন, ‘জানি। টায়ার কোম্পানি। এম জি আর।'
নানু বোস বললেন, ‘তুমি, থাপা, সুরেন্দ্র সিং, ইউসুফ, খোকা চাটুজ্যে আর অবনীদা হোটেলে চলে যেয়ো।'
রাম মিত্র জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনারা?’
নানু বোস বললেন, ‘আমরা একটু পরে জয়েন করব।'
রাম মিত্তির বললেন, ‘কাল দুপুরে তো সি এম লাঞ্চ দিচ্ছেন?’ ।'
নানু বোস বললেন, 'হ্যাঁ।'
করম থাপা বললেন, ‘আপনি কি চলে যাচ্ছেন?'
নানু বোস বললেন, ‘আমি আবার স্টেডিয়ামে ফিরেও আসতে পারি। তোমরা আমার জন্য অপেক্ষা কোরো না। ক্যালকাটা ট্রাভেলসকে কাল আটটা এ সি লাক্সারি বাস দিতে বলা হয়েছে।'
থাপা বললেন, ‘আজ চারটে চেয়েছিলেন, চারটে দিয়েছে। একটা স্ট্যান্ডবাই রাখা আছে।'
নানু বোস বললেন, ‘কাল দুটো লাগবে, দুটো স্ট্যান্ডবাই থাকবে। ফাইনালের দিন ষোলোটা দেবে। বারোটা থেকে তেরোটা লাগবে বাকিগুলো স্ট্যান্ডবাই। ফাইনালের দিন গাড়ি ক’টা বলেছ?’
করম থাপা উত্তর দিলেন, ‘পঞ্চাশটা।’
নানু বোস বললেন, “ঠিক আছে। আমি
আসছি।'
নানু বোস মন্ত্রীর গাড়িতে উঠলেন। সি পি’র গাড়িতে উঠলেন পিল্লাই।
সি এম-এর মিটিং রুমে ততক্ষণে এসে পৌঁছে গেছেন আই জি, চিফ সেক্রেটারি এবং হোম সেক্রেটারি।
কথা শুরু করলেন স্পোর্টস মিনিস্টার। তারপর সি এম-এর প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে নানু বোস, পরে পিল্লাই সব ঘটনা বললেন। অর্থাৎ যতটুকু ঘটনা তাঁরা জানেন। সব শোনার পর সি এম, আই জি আর সি পি-র দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, 'আপনাদের কী মনে হয়?’
আই জি তাকালেন সি পি-র দিকে। সি পি বললেন, 'আমার ধারণা, এটা সাধারণ চোরের করছে।'
কাজ নয়। এর পেছনে অন্য উদ্দেশ্য কাজ।'
সি এম বললেন, ‘কীরকম উদ্দেশ্য?’
সি পি উত্তর দিলেন, 'আমাদের এতদিনের টুর্নামেন্টকে কলঙ্কিত করা। আমাদের অপদস্থ করা।'
সি এম বললেন, ‘সেসব যারা করতে চাইছে তারা তো করবেই। কিন্তু ফাইনালের আগে কাপটা কেমনভাবে উদ্ধার করা যায় সেটার বিষয়ে কিছু ভাবছেন? সময় তো খুবই কম।'
স্পোর্টস মিনিস্টার বললেন, 'সময় কম এবং ব্যাপারটা করতে হবে এমনভাবে, যাতে কোনওভাবেই যেন সংবাদপত্র বা অন্য মিডিয়া জানতে না পারে।'
সি এম বললেন, ‘কাগজওয়ালারা জানতে পারলে তো সব দায় আমার ঘাড়েই চাপাবে। ওরা এমন লেখা-টেখা লিখবে যাতে মনে হবে আমার রাজত্বে চোর-ডাকাতদের ‘প্রমোট’ করা হচ্ছে। অন্য রাজনৈতিক দলেরা এটাকে একটা পলিটিক্যাল ইসু করে ফেলবে।'
সি পি বললেন, ‘আমাদের যা কিছু করার সেটা গোপনে করতে হবে।'
আই জি বললেন, ‘খুব কঠিন কাজ। পুলিশের বহু লোককে আজ থেকেই কাজে নামতে হবে। কথাটা ওঁদের দিক থেকেও লিক হতে পারে, আবার তাঁদের দিক থেকেও লিক হতে পারে যাঁদের কাছে পুলিশ যাবে।'
নানু বোস বললেন, ‘তা হলে আমাদের কী করণীয়? আমরা কী করব? আর তো হাতে সময় নেই।'
সি পি বললেন, ‘আপনি বলুন। ওইসব শোনাটোনার জন্যই তো আপনাদের ডাকা হয়েছে।'
সি পি বললেন, ‘এই কাজের দায়িত্বটা যদি আমরা অন্য কাউকে দিই তাহলে ব্যাপারটা গোপন থাকার সম্ভাবনা বেশি।'
আই জি প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কাকে দিতে চান? তেমন বিশ্বস্ত কে আছে?’
সি পি বললেন, ‘ক্যাটস আই-এর সব্যসাচী রায়কে। ওঁরা তো আমাদের হয়ে অনেক কাজ আগেও করেছেন।'
আই জি বললেন, ‘গুড আইডিয়া।’
তারপর সি এম-এর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কী বলেন?’
সি এম উত্তর দিলেন, ‘এসব ব্যাপার তো আপনারাই ভাল বুঝবেন। ওই আই-টাই কীসব বললেন, সে ব্যাপারে আমি তো খুব একটা ওয়াকিবহাল নই।'
এতক্ষণ পর হোম সেক্রেটারি এবং চিফ সেক্রেটারি দু’জনেই বললেন, ‘যদি আপনারা ভাল মনে করেন তা হলে আজই যোগাযোগ করুন। সময় কিন্তু অল্প। ওই সব্যসাচীবাবু তো আর ভগবান নন। তাঁকেও তো কিছুটা সময় দিতে হবে।'
আই জি বললেন, ‘নিশ্চয়ই।'
সি পি বললেন, ‘আমরা আজই ওঁর কাছে যাচ্ছি। উনি সাদার্ন অ্যাভেনিউয়ে থাকেন।' সি.এম বললেন, ‘তবে তাই করুন।'
সবাই নমস্কার করে উঠে পড়লেন। বাইরে এসে গাড়িতে ওঠার সময় সি পি বললেন, ‘নানুবাবু আর পিল্লাইকে আমার সঙ্গে যেতে হবে।'
স্পোর্টস মিনিস্টারের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনি কি যাবেন?'
মন্ত্রী বললেন, 'আপনারা যান। কী হল সেটা ফোনে জানাবেন।'
নানু বোস আর পিল্লাইকে সঙ্গে নিয়ে সি পি সাহেব আর আই জি-র গাড়ি সাদার্ন অ্যাভেনিউয়ের দিকে রওনা দিল। বাইপাসের দু'ধারে তখনও অপরূপ আলোকমালা জ্বলছে।
সব্যসাচী রায়ের চেহারাটা চোখে পড়ার মতো। ছ'ফুটের মতো লম্বা মেদহীন চেহারা। চোখ দুটো উজ্জ্বল, তবে একটু ভেতরে ঢোকানো। নাকটা বেশ খাড়া বলে চোখ দুটোকে বোধহয় ওইরকমই মনে হয়। মাথার চুল ছোট ছোট। দাড়ি কামানো গাল দুটো মসৃণ নয় ব্রণ বা ওইজাতীয় কিছু হওয়ার ফলে গালে অসংখ্য দাগ। অনেক মানুষের এমন অমসৃণ গাল থাকে। সব্যসাচী রায়কে, দেখতে সুন্দর বলা যাবে না, কিন্তু সুপুরুষ বলা যাবে নিশ্চয়ই। তিনি একটা আরামকেদারায় শুয়ে শুয়ে বোধ হয় কিছু পড়ছিলেন। দরজার সামনে সি পি-র গলা পেতেই উঠে বসে দরজার দিকে তাকালেন। সবাইকে দেখতে দেখতে উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, ‘কী সৌভাগ্য, আজ একযোগে আপনারা!’
সি পি ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, ‘খুব জরুরি ব্যাপারে এসেছি। আপনার সাহায্য দরকার।' সব্যসাচী বললেন, ‘আপনার সাহায্য করার জন্যই তো বসে আছি। হাতে বড় ধরনের কোনও কাজই নেই। দেশে কি ক্রাইম কমে গেল নাকি!’
ঘরের মধ্যে অনেক চেয়ার। সবাই চেয়ারগুলোতে বসলেন। সি পি নানু বোস আর পিল্লাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘খুব বিপদ।’ সব্যসাচী বললেন, ‘বিপদটা কেমন?’
একটু সময় নিলেন সি পি। সবার মুখের দিকে একবার তাকালেন, তারপর খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দরজাটা বন্ধ করা যাবে।'
সব্যসাচী চেয়ার থেকে উঠলেন না। টেবিল থেকে রিমোট কন্ট্রোল নিয়ে বোতাম টিপলেন। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ হয়ে গেল। ওইরকমই দেখতে আরও একটা জিনিস টেবিল থেকে তুলে নিয়ে বললেন, 'আপনারা চারজন আমার বাড়ির দরজা অতিক্রম করেছেন ছ'টা ছেচল্লিশ মিনিটে।
সি পি বললেন, ‘আপনার কম্পিউটার এসব বলে দিতে পারে। কিন্তু কেন এসেছি সেটা তো বলতে পারে না।'
সব্যসাচী বললেন, ‘মানুষের মন বড় বিচিত্র। কম্পিউটারের সাধ্য কি তার নাগাল পায়!’ নানু বোস ভেতরে ভেতরে অধৈর্য হয়ে পড়ছিলেন। তিনি একবার আই জি আর একবার সি পি-র দিকে তাকালেন। এই তাকানোর অর্থ সি পি বুঝতে পারলেন। সি পি চেয়ারটা একটু টেনে বললেন, ‘এবার বিপদের কথাটা শুনুন।'
সব্যসাচী বললেন, ‘বলুন।'
সি পি, নানু বোস এবং পিল্লাইয়ের মুখ থেকে সব ঘটনা শোনার পর সব্যসাচী বললেন, ‘এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার। দেশের মান-ইজ্জত তো ধুলোয় লুটিয়ে যাবে।'
নানু বোস বললেন, ‘আমরা যাঁরা এই টুর্নামেন্ট কমিটিতে আছি আমাদের কি আর মুখ দেখাবার উপায় থাকবে! কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে আমাকে তো সুইসাইড করতে হবে।' সব্যসাচী বললেন, ‘আপনি সুইসাইড করলে আপনি হয়তো বাঁচবেন কিন্তু দেশের মান-ইজ্জত তো বাঁচবে না।'
সব্যসাচী রায় একটু চুপ করে বসে রইলেন। টেবিলের ওপর একটা গোল পেপারওয়েট ছিল, সব্যসাচী একহাতে সেটাকে নাড়াতে নাড়াতে বললেন, ‘রায় কোম্পানিটা কতদিনের দোকান?’
নানু বোস বললেন, ‘রায় কোম্পানির বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে।'
সব্যসাচী বললেন, ‘এই ধরনের কাপ তো কুয়ালালামপুরে থাকার কথা। ওখান থেকেই পালিশ-টালিশ হয়ে আসে।'
নানু বোস বললেন, ‘যেহেতু গোল্ডকাপের হেড অফিস কলকাতা এবং গোড়া থেকেই এটা কলকাতায় থাকছে, তাই আমরা কলকাতাতেই রাখি। যে বছর যেখানে ফাইনাল হয় সেখানে কাপটা কলকাতা থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।'
সব্যসাচী রায় উঠে দাঁড়ালেন। ঘরের মধ্যে একটু পায়চারি করে নিয়ে সি পি-র দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘একটা কাজ কি আপনাদের পক্ষে করা সম্ভব?’ সি পি প্রশ্ন করলেন, ‘কী কাজ?’
সব্যসাচী বললেন, ‘গোল্ডকাপের ছবি দেওয়া কালার পোস্টার আছে?’ সি পি উত্তর দেওয়ার আগে পিল্লাই বললেন, ‘আছে।'
সব্যসাচী বললেন, ‘কত আছে?’
পিল্লাই বললেন, ‘আমরা হাজার দুই ছাপিয়েছিলাম। এখন হাতে হয়তো তিন-চারশো আছে আর আছে কিছু কার স্টিকার।'
সব্যসাচী বললেন, ‘পোস্টারগুলোর সাইজ কত?’
পিল্লাই বললেন, ‘চব্বিশ বাই কুড়ি।'
সব্যসাচী বললেন, ‘এই পোস্টার যে প্রেসে ছেপেছেন তাঁদের কাছে নিশ্চয়ই প্লেট রয়ে গেছে।'
নানু বোস বললেন, 'নিশ্চয়ই।’
সব্যসাচী বললেন, ‘এখান থেকে প্রেসে ফোন করুন। প্লেট রেডি থাকলে অফসেটে আরও হাজার পাঁচেক ছেপে দিতে দেরি হবে না। এখনই ছাপা শুরু করুক। আর আজ রাত থেকেই কলকাতা এবং তার আশপাশে এগুলো মারতে শুরু করে দিন। শহর এবং শহরতলির সবক'টা সোনার দোকানে গোল্ডকাপের পোস্টার যেন লাগানো হয়। এক-দেড়শো ছেলেকে এই কাজে লাগিয়ে দিন।'
সি পি জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার কি মনে হয়?’
সব্যসাচী বললেন, ‘আপাতত কিছুই মনে হচ্ছে না। এখনই যে কাজগুলো করতে চাইছি সেটা প্রিকশন হিসেবে। আসল কাজে নামার আগে এগুলো দরকার। আরও দুটো কাজ আপনাদের করতে হবে।'
নানু বোস বললেন, ‘বলুন কী করতে হবে। আমরা সবরকম কাজ করার জন্য তৈরি আছি।'
সব্যসাচী রায় বললেন, 'আপনাদের কমিটি মেম্বারদের নামের তালিকা, ঠিকানা এবং টেলিফোন নম্বর চাই। আর একটা কাজ হচ্ছে—' কথাটা শেষ না করেই সব্যসাচী রায় থামলেন। টেবিলে একটা লেখার প্যাড ছিল। সেই প্যাডে সব্যসাচী রায় কিছু নোট করে রেখেছিলেন। সেইদিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কাপটা খোয়া গেছে যে সময়টায় তার কতক্ষণ পর স্পোর্টস মিনিস্টারকে নিয়ে আপনারা রায় কোম্পানিতে যান?’
নানু বোস বললেন, ‘প্রায় সাড়ে চারটে নাগাদ আমরা রাইটার্স থেকে রওনা দিয়ে রায় কোম্পানিতে আসি। ওখান থেকে যখন বেরিয়ে স্টেডিয়ামের দিকে যাচ্ছি তখন সন্ধে হয়েছে।' সব্যসাচী রায় মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘ক্রীড়ামন্ত্রী মহাশয়কে নিয়ে এখন একবার ওখানে যাওয়া সম্ভব?'
নানু বোস বললেন, ‘তা হয়তো সম্ভব। কিন্তু...’
সি পি সাহেবও বললেন, ‘কিন্তু তাতে লাভ কী?
সব্যসাচী বললেন, 'আমি আগামীকালের প্রত্যেকটা মরনিং ডেইলিতে একটা খবর চাইছি।'
সব্যসাচী বললেন, ‘আজ রাত্রে স্পোর্টস মিনিস্টার নিজে গিয়ে কাপের পালিশ দেখে এসেছেন। অর্থাৎ রায় কোম্পানিতে যে কাপের কাজ চলছে সেটা আমি জানাতে চাই।' নানু বোস বললেন, ‘কাকে জানাতে চান?’
সব্যসাচী বললেন, ‘নিশ্চয়ই পাবলিককে নয়।'
আই জি এবং সি পি দু’জনেই দু’জনের দিকে তাকালেন। সব্যসাচী বললেন, ‘আশা করি, আমার উদ্দেশ্যটা আপনারা দু'জন ধরতে পেরেছেন।' নানু বোস এবং পিল্লাই দু’জনেই সি পি আর আই জি-র মুখের দিকে তাকালেন। সি পি বললেন, 'আপনার উদ্দেশ্যটা ভাল।'
সব্যসাচী বললেন, ‘এই ব্যবস্থাগুলো করে ফেলুন। আর আমি একবার রায় কোম্পানিতে যেতে চাই।'
সি পি বললেন, “আমাদেরও কি যেতে হবে
সব্যসাচী বলেন, ‘দরকার নেই। আমি নানুবাবুকে।’
নিয়ে চলে যাচ্ছি। পিল্লাইবাবু, আপনি প্রেসে চলে যান। পোস্টার মারার লোক জোগাড় হবে তো?’
সি পি আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বললেন, ‘সেসব ব্যবস্থা হয়ে যাবে'?’
সব্যসাচী বললেন, ‘কিন্তু মন্ত্রীমশাই আর একবার রায় কোম্পানিতে পালিশ দেখতে যাবেন তো?’
সি পি বললেন, ‘পরিস্থিতিটা বুঝিয়ে বলে অনুরোধ করলে নিশ্চয়ই যাবেন।' সব্যসাচী এবার চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, 'তাহলে আপনারা সেই ব্যবস্থাগুলো
করতে থাকুন। আমি নানু বোসকে নিয়ে একটু পরে রায় কোম্পানিতে যাব।'
পিল্লাইকে সঙ্গে নিয়ে সি পি এবং আই জি উঠে পড়লেন। সব্যসাচী নিজের হাতঘড়িটা একবার দেখলেন। তারপর মোবাইল ফোনে নাম্বার লাগিয়ে কানে দিয়ে বললেন, ‘ছোটাই, কী করছিস? একবার চলে আয়। এলেই সব শুনতে পাবি।’
ফোনটা বন্ধ করে সব্যসাচী উঠে দাঁড়ালেন। নানু বোসকে বললেন, ‘একটু অপেক্ষা করুন। আমি ড্রেসটা চেঞ্জ করে আসি।'
নানু বোসকে বসিয়ে রেখে সব্যসাচী অন্য ঘরে চলে গেলেন। মিনিট দশেক সময় গেল। তার মধ্যেই সব্যসাচী চলে এলেন এই ঘরে। ঘরের মধ্যে একা একা দশ মিনিট বসে থাকার অভিজ্ঞতাটা নানু বোসের কাছে একেবারে অন্যরকম। প্রতিটা মিনিট যেন তাঁর কাছে এক-একটা ঘণ্টা মনে হচ্ছে। সময় যত এগিয়ে যাচ্ছে, ফাইনাল খেলার কিক অফের বাঁশি বাজার সময় ততই এগিয়ে আসছে। বাহাত্তর ঘণ্টা আগে খবরটা জানা গেছে, কিন্তু জানার পর থেকে যে সময়গুলো গেছে তার মধ্যে কাপ উদ্ধারের কোনও সম্ভাবনাই দেখা যায়নি। যোগাযোগ করা, তদ্বির করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তদ্বির করা মানে কাপটা পেয়ে যাওয়া নয়। নানু বোসের শরীর থেকে থেকে ঘেমে যাচ্ছিল। কখনও মনে হচ্ছিল তাঁর শরীরে আর শক্তি নেই। কাপটা যদি শেষপর্যন্ত না-ই পাওয়া যায় তা হলে বিকল্প ব্যবস্থা কী হতে পারে সেই ভাবনাটাও মাথায় আসছে। যথেচ্ছ টাকা দিলেও এই সময়ের মধ্যে ওইরকম ডিজাইনের একটা গোল্ডকাপ কারও পক্ষেই তৈরি করে দেওয়া সম্ভব নয়। নানু বোস মাথায় হাত দিয়ে বসে ছিলেন। সব্যসাচী ঘরে ঢুকেই বললেন, ‘এখনই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন ! এখন পর্যন্ত তো তদন্ত শুরুই হয়নি।
নানু বোস জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার কী মনে হয়?’
সব্যসাচী রায় পালটা প্রশ্ন করলেন, 'কী ব্যাপারে?’
নানু বোস বললেন, ‘কাপটা কি উদ্ধার করা সম্ভব হবে?
সব্যসাচী রায় উত্তর দিলেন, 'কাজে না নামলে সেটা বোঝা যাবে না। আসলে হয় কী জানেন, গল্প, উপন্যাস, নাটক আর সিনেমা এইসব পড়ে আর দেখে সাধারণ মানুষদের ধারণা হয়েছে গোয়েন্দারা সব পারেন। তাঁদের অসাধ্য বলে কিছু নেই। বাস্তব কিন্তু তা বলে না। বাস্তবে এমন অনেক ঘটনা আছে, যেখানে একবার নয়, একাধিকবার আমাদের হারতে হয়েছে। রহস্য সমাধানে ব্যর্থ হতে হয়েছে।'
নানু বোসের গলা এবং বুক শুকিয়ে গেল। অসহায়ভাবে সব্যসাচী রায়ের দিকে চোখ তুলে বললেন, ‘আমাদের গোল্ড কাপের বেলায় কি তেমনটাই আশঙ্কা করছেন?’ সব্যসাচী রায় নিজের ড্রয়ার থেকে পাইপটা বের করলেন। টোবাকোর কৌটোটা নানু
বোসের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, 'আপনি কি এই ব্র্যান্ড ব্যবহার করেন?’
নানু বোস ঘাড় নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘হ্যাঁ। কিন্তু কেমন করে জানলেন?’
সব্যসাচী পাইপে টোবাকো ভরতে ভরতে বললেন, ‘এই জানার মধ্যে কোনও বাহাদুরি নেই। আপনার বুকপকেটে পাইপ রয়েছে। হয়তো টোবাকোও সঙ্গে আছে, অথবা নেই। নিজে পাইপ ধরাতে গিয়ে ভদ্রতাবশে আপনাকে জিজ্ঞেস করলাম। গোয়েন্দাদের সব কথাই কিন্তু উদ্দেশ্যমূলক নয়।'
কথা শেষ করে সব্যসাচী পাইপটা ধরিয়ে নিয়ে নানু বোসের দিকে তাকালেন। তারপর নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাতে যাওয়ার আগেই ঘরের কোনও জায়গা থেকে ক্রিং ক্রিং শব্দ হল। শব্দটা বেশ মৃদু এবং মিহি। সব্যসাচী টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে কিছু একটা দেখে নিয়েই বললেন, ‘ছোটাই এসে গেছে।'
নানু বোস জিজ্ঞেস করলেন, ‘ছোটাই কে?’
সব্যসাচী উত্তর দেওয়ার আগে রিমোট কন্ট্রোলের বোতাম টিপে দরজা খুলে দিলেন। নানু বোস নাম শুনে ভেবেছিলেন ছোটাই বোধ হয় ছোটখাটো একটি ছেলে। কিন্তু ঘরে যিনি ঢুকলেন, তিনি কোনওমতেই পাঁচ ফুটের বেশি লম্বা নন। তদুপরি চেহারাটা প্রায় গোলাকৃতি। অনায়াসেই একে মোটা বলা যেতে পারে। নানু বোস তার দিকে তাকাতেই সব্যসাচী বললেন, ‘এর নাম ছোটাই। আমার এক নম্বর সহকারী।'
নানু বোস মনে মনে হতাশ হয়ে পড়লেন। একজন দক্ষ গোয়েন্দার এমন স্থূলকায় এবং ভুঁড়িওয়ালা সহকারী। তাও আবার এক নম্বর সহকারী। তিনি ফ্যালফ্যাল করে ছোটাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সব্যসাচী বললেন, 'ইনি হচ্ছেন নানু বোস। নাম শুনেছিস?’
ছোটাই বলল, ‘উনি তো আমাদের স্পোর্টস ওয়ার্ল্ডে বিখ্যাত লোক।'
সব্যসাচী বললেন, ‘একটা জটিল ব্যাপার নিয়ে উনি এসেছেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে সেই জটিল সমস্যাটা মেটাতে না পারলে আমাদের দেশের মুখে চুনকালি পড়বে।' ছোটাই জিজ্ঞেস করল, ‘সমস্যাটা কী?’
সব্যসাচী জবাব দিলেন, ‘হাতে সময় কম। গাড়িতে যেতে যেতে বলব। তোর সঙ্গে কি বাইক আছে?’
ছোটাই বলল, ‘হ্যা।’
সব্যসাচী এক মুহূর্ত ভাবলেন। তারপর নানু বোসের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি বাইক চালাতে পারেন?’
নানু বোস উত্তর দিলেন, ‘পারি, কিন্তু অনেকদিন চালাইনি। আজকের এই মানসিক অবস্থায় বোধহয় চালাতে পারব না।'
সব্যসাচী বললেন, ‘দরকার নেই। চলুন বেরিয়ে পড়ি।'
নীচে এসে দরোয়ানকে সব্যসাচী বললেন, 'আমি একটা নিমন্ত্রণে যাচ্ছি। রামেশ্বর কোথায়?’
দরোয়ান বলল,-“অফিসঘরে। ডেকে দেব?’
সব্যসাচী বললেন, ‘ডাকো। বলো আমি ডাকছি।'
দরোয়ান চলে যাওয়ার পর সব্যসাচী নানু বোসের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘নীচের তিনখানা ঘর নিয়ে আমার ক্যাটস আই-এর অফিস। এ ছাড়াও দুটো ঘর আছে। আমি থাকি দোতলায়। এটা আমার পৈতৃক বাড়ি।'
কথা শেষ হওয়ার আগেই একটি ছেলে এসে সামনে দাঁড়াল। ছেলেটির স্বাস্থ্য বেশ ভাল। সব্যসাচী ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘রামেশ্বর, তুমি ছোটাইবাবুর বাইকটা নিয়ে আমাদের ফলো করো। আমরা যাব...’ কথা শেষ না করেই সব্যসাচী নানু বোসের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘কোথায় যেন যাব?’
নানু বোস বললেন, ‘পার্ক স্ট্রিট। রায় কোম্পানির বাড়িটা হচ্ছে...’ সব্যসাচী বললেন, ‘আর বলতে হবে না।'
রামেশ্বরকে আর কিছু বললেন না। শুধু একটা ইশারা করে নানু বোসের গাড়িতে গিয়ে বসলেন।
নানু বোস অনেকটা পথ পর্যন্ত বাইকটাকে পেছন পেছন দেখলেন। তারপর আর দেখতে পেলেন না। তবে কি রামেশ্বর পিছিয়ে পড়ল না কি অন্য রাস্তায় চলে গেল! সব্যসাচী রায় গাড়িতে যেতে যেতে ছোটাইকে সব ঘটনা নিজে বললেন। নানু বোস বারবার পেছন ফিরে দেখছিলেন বলে সব্যসাচী বললেন, ‘পেছনে কী দেখছেন? রামেশ্বরকে? ভয় নেই, ও আমাদের আগে পৌঁছে যাবে। ওকে সেরকমই বলা আছে। ওখানে গিয়ে রামেশ্বরকে দেখলেও না চেনার ভান করে দোকানে ঢুকে যাবেন। আমরা কিন্তু কেউই রামেশ্বরকে চিনি না, রামেশ্বরও চেনে না। কথাটা মনে রাখবেন।'
নানু বোস ঘাড় নাড়লেন। পার্ক স্ট্রিট তখন আলোয় ঝলমল করছে। তেমনই ঝলমল করে জ্বলছে গোল্ডকাপের হোর্ডিংটা। যেটা একটা ইলেকট্রিক কোম্পানি স্পনসর করেছে। গোটাটাই নানা সাইজের বাল্ব আর টিউব দিয়ে তৈরি। রায় কোম্পানির সামনে গাড়ি থেকে নেমে সব্যসাচী প্রথমেই ওই আলোর হোর্ডিংটার দিকে তাকালেন। প্রশ্ন করলেন, ‘এরকম হোর্ডিং কলকাতায় ক’টা দেওয়া হয়েছে?’
নানু বোস বললেন, ‘মোট আটটা।’
সব্যসাচী বললেন, ‘ঠিক আছে।'
ছোটাই কিন্তু সঙ্গে গেল না। ছোটাই গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে চিকলেট চিবুতে আরম্ভ করল। সব্যসাচী আর নানু বোস ওপরে উঠলেন। এ সময় রায় কোম্পানি খোলা থাকে না। কিন্তু আজ তো বন্ধ করার উপায় নেই। নানু বোস, স্পোর্টস মিনিস্টার এবং পুলিশের নির্দেশ ছিল টুর্নামেন্ট কমিটির পক্ষ থেকে নানু বোস না বলা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকবে। কোনও স্টাফ যেতে পারবে না। অতএব সবাই ছিলেন।
সব্যসাচী রায় অফিসঘরে ঢুকে ঘরের চারপাশে তাকালেন। মাথার ছাদ, ঘরের দেওয়াল এবং আলমারি আর টেবিল-চেয়ারের ওপর চোখ বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘কতদিন আগের বাড়ি। অথচ এখনও কেমন মজবুত। বাড়িটার বয়স কত হবে রায়বাবু?’
রায় উত্তর দিলেন, ‘আমাদের দোকান তো পঞ্চাশ পেরিয়ে একান্ন চলছে। বাড়িটার বয়স বোধ হয় ষাট-বাষট্টি হবে।'
সব্যসাচী বললেন, ‘হ্যাঁ, তা হবে। আপনার বয়স কত রায়বাবু?’
রায়বাবু বললেন, ‘আমার এখন পঁয়ষট্টি। বি কম পাশ করে ব্যাংকে কিছুদিন চাকরি করেছিলুম। বাবার তাড়নায় ব্যবসা দেখতে আরম্ভ করি চব্বিশ বছর বয়স থেকে। প্রায় একচল্লিশ বছর এই দোকানে আছি। এমন ঘটনা কখনও হয়নি।'
সব্যসাচী বললেন, ‘তাই তো হয় রায়বাবু। দুর্ঘটনা হঠাৎ করেই ঘটে। চলুন তো, আপনার পালিশঘরটা দেখি।'
রায়বাবুর সঙ্গে নানু বোস আর সব্যসাচী পালিশঘরে এলেন। কর্মচারীরা ওই ঘরেই অলসভাবে বসে আছে। সবার মুখ-চোখেই ভয়ের ছাপ। দেখে মনে হবে যেন লকআপে রাখা হয়েছে। ওঁদের তিনজনকে দেখে সবাই উঠে দাঁড়াল। সব্যসাচী একে একে সবার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। এমনভাবে দাঁড়ালেন যেন উচ্চতা মাপছেন। তারপর একে একে সবার নাম জিজ্ঞেস করলেন। কতদিন কাজ করছে, কোথায় থাকে, বাড়িতে কে কে আছে এইরকম কয়েকটা প্রশ্ন করার পর গোবিন্দকে বললেন, 'তুমি তো আজ থেকে পালিশ শুরু করেছ, তাই না?’
গোবিন্দ উত্তর দিল, 'আজ্ঞে, হ্যাঁ।'
সব্যসাচী প্রশ্ন করলেন, ‘আজ কতক্ষণ পালিশ করেছ?'

গোবিন্দ উত্তর দিল, ‘কাজ শুরু হয় এগারোটা থেকে। বারোটার পর মানে টিফিনের একটু আগে লোডশেডিং হয়। আমাদের টিফিন সাড়ে বারোটা থেকে একটা। সাড়ে বারোটার আগে আলো চলে যায় বলে আমরা তখনই টিফিনে চলে যাই। ফিরে আসি আলো আসার পর। মানে...’
সব্যসাচী বললেন, ‘সেসব তো আগেই শুনেছি।'
কথাটা বলে ঘরের চারদিকে আরও একবার তাকালেন। ঘরের বাঁ দিকে আলমারির পাশে কিছু জিনিসপত্র পড়ে ছিল। সব্যসাচী সেদিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন, ‘এগুলো কী?’
রায়বাবু বললেন, ‘ওই কিছু খালি ব্যাগ। বিভিন্ন পার্টি জিনিস নিয়ে আসে তো! কেউ ব্যাগটা ফেরত নেয়, কেউ-বা নেয় না।’
সব্যসাচী গিয়ে ব্যাগগুলো তুলে তুলে দেখতে লাগলেন। দেখা শেষ করে বললেন, ‘এইরকম ব্যাগ ক’টা আছে?’
রায়বাবু বললেন, ‘হিসেব তো মনে নেই। তবে খানপাঁচেক হবে।'
সব্যসাচী গোবিন্দকে প্রশ্ন করলেন, ‘কাপটার ওজন কত হতে পারে? তোমার তো এ ব্যাপারে অভিজ্ঞতা আছে। তুমি বলতে পারবে?’
গোবিন্দ বলে, ‘কেন পারব না! কাপটার ওজন নীচের কাঠসুদ্ধু চার কিলো তিনশো গ্রাম।' সব্যসাচী জিজ্ঞেস করলেন, ‘এত নিখুঁত মাপ তুমি কেমন করে জানলে?'
গোবিন্দ বলল, ‘কেন জানব না! কাপ যখন দেওয়া হয় তখন সেই কাপের সব জিনিস বলা থাকে। যেমন হাইট, ওজন, কী কাঠ দেওয়া আছে, সিলভারটা কত, গোল্ড কত। তাই আমি সব জানি।'
সব্যসাচী রায় এবার একটু হাসলেন। ঘরের কোণ থেকে একটা ব্যাগ টেনে নিয়ে বললেন, ‘গোবিন্দ, এই ব্যাগের মধ্যে কি কাপটা যেতে পারে?’
গোবিন্দ ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ, যেতে পারে।
সব্যসাচী বললেন, ‘রায়বাবু, আপনার চারটে ব্যাগ এখানে আছে। কোনওটারই হাতল নেই। পঞ্চম ব্যাগটার বোধহয় হাতল ছিল, সেটাই মিসিং।'
রায়বাবু বললেন, ‘তাই নাকি?’
সব্যসাচী বললেন, ‘অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটা আমার নিছক ধারণা। ধারণামাত্রেই সত্য হয় না।'
এবার পাইপটা ধরালেন সব্যসাচী রায়। রায়বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘চলুন, আপনার অফিসঘরে যাই।'
অফিসঘরে এসে সব্যসাচী বললেন, 'আপনার সবক'জন স্টাফের নাম-ঠিকানা আমাকে লিখে দিন।'
রায়বাবু বললেন, ‘এখনই লিখে দিচ্ছি।'
রায়বাবু তাঁর খাতা খুলে নাম টুকতে লাগলেন। সব্যসাচী হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, ‘আজ কি আপনার সব স্টাফ হাজির ছিলেন?'
রায়বাবু বললেন, ‘হ্যাঁ।'
সব্যসাচী আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেউ কি হাফ ছুটি নিয়েছে?’
রায়বাবু বললেন, ‘হ্যাঁ, একজন। শরীর খারাপ বলে টিফিনেই চলে গেছে।'
সব্যসাচী বললেন, ‘তার নাম-ঠিকানাটাও দিন। তলায় আন্ডারলাইন করে দেবেন ওর নামটা।’
রায়বাবু সব কাজ শেষ করে কাগজটা সব্যসাচীর হাতে দিয়ে বললেন, ‘এই নিন।’ সব্যসাচী কাগজটা নিয়ে দেখতে দেখতে বললেন, ‘আপনার নাম-ঠিকানাটা তো দিলেন না! যদি অডটাইমে আপনাকে দরকার হয়!'
রায়বাবু বললেন, ‘হ্যাঁ, এখনই দিচ্ছি।'
সব্যসাচী রায় নানু বোসের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'চলুন, চলা যাক।'
নানু বোস আর সব্যসাচী রায় আবার ফিরে এলেন সব্যসাচীর বাড়িতে। নীচে নেমে নানু বোস ছোটাই এবং রামেশ্বর কাউকে দেখতে পেলেন না। গাড়িতে আসতে আসতে নানু বোস জিজ্ঞেস করলেন, ‘ছোটাইবাবু আর রামেশ্বর কোথায়?’
পাইপে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সব্যসাচী বাইরের দিকে তাকিয়ে অনেকটা নির্বিকার ভঙ্গিতে এবং অলস গলায় বললেন, ‘ওরা ওদের কাজ সেরে চলে আসবে।' নানু বোস কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর আবার প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার কী মনে হয় মি. রায়?
সব্যসাচী বাইরের দিকে অলস দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। সেইভাবেই বললেন, ‘কী ব্যাপারে?’
মনে মনে বিরক্ত বোধ করলেন নানু বোস। লোকটা কি পাগল নাকি, তাঁর সঙ্গে ঠাট্টা করছে। এ সময় ওই কাপটা ছাড়া আর কোন ব্যাপারেই বা নানু বোস প্রশ্ন করবেন। মনের বিরক্তি চেপে রেখে নানু বোস বললেন, ‘ওই গোল্ড কাপটার ব্যাপারে। আপনি কি কিছু অনুমান করতে পারছেন?'
সব্যসাচী রায় হতাশ গলায় বললেন, ‘এখন পর্যন্ত কোনও ক্লু পেলাম না। একটা কিছু ক্লু পেলে তো গাতে পারছি না।'
নানু বোস বললেন, 'আমাদের হাতে তো আর সময়ও নেই।'
সব্যসাচী বললেন, ‘সেটাই তো সমস্যা। হাতে সময় থাকলে এত ভাবনা হত না।’ সাদার্ন অ্যাভেনিউ আসার আগেই সব্যসাচী বললেন, ‘নানুবাবু, আমাকে এখানেই ছেড়ে দিন। এখানে এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার আছে।'
গাড়িটা দাঁড়াতেই সব্যসাচী রায় দরজা খুলে নেমে গেলেন। নেমে যাওয়ার সময় নানু বোস বললেন, ‘আমি আবার কখন যোগাযোগ করব?’
সব্যসাচী বাইরে থেকে গাড়ির দরজাটা ঠেলে দিয়ে বললেন, 'আপনাকে যোগাযোগ করতে হবে না। আমিই দরকার হলে যোগাযোগ করব।'
কথা শেষ করেই সব্যসাচী রায় হাত নাড়তে নাড়তে ফুটপাথ পেরিয়ে গেলেন। একবুক হতাশা নিয়ে গাড়ির মধ্যে নানু বোস বসে রইলেন। ড্রাইভার জিজ্ঞেস করল, 'স্যার, কোনদিকে যাব? স্টেডিয়ামে কি?’
নানু বোস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘না। হোটেলে চলো। পার্টি নির্ঘাত এতক্ষণে শুরু হয়ে গেছে।'
গাড়ি হোটেলের দিকে চলতে লাগল। গাড়ির মধ্যে নানু বোস চোখ বুজে বসে। একটু পরে চোখ খুলে ড্রাইভারের দিকে তাকালেন। ড্রাইভারের নাম দশরথ। গত কুড়ি বছর ধরে দশরথ নানু বোসের গাড়ি চালাচ্ছে। সে তার সাহেবের মেজাজ-মরজি বোঝে। নানু বোসও দশরথকে বিলক্ষণ চেনেন। তবুও বললেন, ‘দশরথ গাড়ির মধ্যে গোল্ড কাপ নিয়ে যত কথা হল সেটা যেন কেউ না জানে। সাদার্ন অ্যাভেনিউ আসার খবরটাও কাউকে বলবে না। আমার এই গাড়িটা সবার চেনা। আগামীকাল থেকে অন্য গাড়িতে যাতায়াত করব।'
দশরথ মাথা নেড়ে বলল, ‘ঠিক আছে সার।'
গাড়িটা আস্তে আস্তে হোটেলের গেট দিয়ে ঢুকল। গাড়ি থামবার সঙ্গে সঙ্গে হোটেলের দরোয়ান এগিয়ে এসে দরজা খুলে দিয়ে সেলাম করল। অন্যদিন হলে নানু বোস তার হাতে একটা দশটাকার নোট বখশিশ হিসেবে গুঁজে দিতেন। আজ আর সেসব খেয়ালে এল না। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে বলরুমের দিকে যেতেই অমিত পোদ্দারের সঙ্গে দেখা। টুর্নামেন্ট কমিটিতে অমিত পোদ্দার আছেন একটা বড় ক্লাবের কর্মকর্তা হিসেবে, সেই ক্লাবের প্রতিনিধি হিসেবে। অমিত নানু বোসকে দেখে এগিয়ে এসে বললেন, ‘কী ব্যাপার নানুদা! তোমার এত দেরি কেন? সবাই তোমার কথা জিজ্ঞেস করছে।'
নানু বোস এই পোদ্দারকে একদম পছন্দ করেন না। টাকার জোরে ক্লাবের কর্মকর্তা হয়েছেন। গত কয়েক বছর ধরে পোদ্দার গোল্ডকাপ কমিটির চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ বছর তো বহু টাকা খরচ করেছিলেন নানু বোসকে ভোটে হারিয়ে চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য। শেষপর্যন্ত ভোটে জিততে পারেননি। এই পোদ্দারকে নানু বোসের এখন সন্দেহজনক মনে হল। সব্যসাচী রায়কে পোদ্দারের নামটা কি তাঁর বলে দেওয়া উচিত? নানু বোস অপদস্থ হলে পোদ্দারই সবচেয়ে বেশি খুশি হবেন। মনে মনে এই কথাগুলো ভাবতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড লাগল। নানু বোস পোদ্দারের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘একটা কাজে আটকে পড়েছিলাম।'
পোদ্দার একটু এগিয়ে এসে চাপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, 'নানুদা, এনি প্রবলেম?’
নানু বোসের বুকের ভেতরটা ছ্যাত করে উঠল। প্রবলেমের কথাটা পোদ্দার কেন বলছে? ও কি জানতে পেরেছে? কেউ কি ওকে বলেছে? নানু বোস গভীর দৃষ্টিতে পোদ্দারের দিকে তাকালেন। কিছু বলতে যাওয়ার আগেই সুরেন্দ্র আর খোকা চাটুজ্যে নানু বোসকে দেখতে পেয়ে বলল, ‘কখন এলেন নানুদা? ভেতরে সবাই আপনার খোঁজ করছেন।'
ওঁদের সঙ্গে নিয়ে নানু বোস বলরুমে এলেন। বলরুমে তখন দেদার লোক। নানু বোসকে দেখে কেউ কেউ চেঁচিয়ে বলে উঠল, ‘নানুদা এসে গেছেন?’ কেউ কেউ বললেন, ‘এত দেরি কেন মশাই?’ কেউ কেউ আবার মুখে কিছু না বলে হাত নাড়লেন। নানু বোস গিয়ে দাঁড়ালেন স্পোর্টস মিনিস্টারের পাশে। মিনিস্টার নানু বোসকে নিয়ে একটু সরে এলেন। ঘরের মধ্যে সবাই সবার সঙ্গে কথা বলতে ব্যস্ত। কেউ কাউকে বিশদভাবে লক্ষ করছে না। মন্ত্রী নানু বোসকে গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘খবর কী?’
নানু বোস উত্তর দিলেন, ‘এখনও কোনও ক্লু পাওয়া যায়নি।'
মন্ত্রী বললেন, ‘পাওয়ার কোনও চান্স আছে কি? ব্লু পাক বা না পাক, কাপটা পাওয়া নিয়ে কথা।'
নানু বোস বললেন, ‘এখনও সেই অন্ধকারেই আছি। আজকের দিনটা তো প্রায় জলেই গেল বলা যায়! কালকের দিনটা হাতে। পরশুই তো ফাইনাল।
মন্ত্রী গম্ভীর হয়ে গেলেন। কিন্তু এত বড় পার্টিতে বেশিক্ষণ তো গম্ভীর হয়ে থাকার উপায় নেই। অতএব, নানা লোকের প্রশ্নে তাঁকে হাসতেও হচ্ছে, কথাও বলতে হচ্ছে। নানু বোস আর মন্ত্রীর চারপাশে অনেক লোক জমতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে খোকা চাটুজ্যে, এসে নানু বোসকে ডেকে নিল। ভিড়ের বাইরে এসে বলল, ‘নানুদা, ওই লোকটা কে বলুন তো? ও তো আমাদের কমিটির কেউ নয়?’
নানু বোস বললেন, ‘কোন লোকটা?’
খোকা চাটুজ্যে এবার ফুলপ্যান্ট আর সাদা রঙের হাওয়াই শার্টপরা একটা লোককে দেখাল। তার পাশে মোটামতন একজন। নানু বোস একটু এগিয়ে গেলেন। ফিরে এসে বললেন, ‘আমি ঠিক চিনতে পারলাম না। তবে এম জি আর-এর লোক হতে পারে। মানে যাঁরা আজকের ডিনারটা দিচ্ছেন।'
নানু বোস খোকা চাটুজ্যের কাছ থেকে সরে এলেন। এই পার্টিতে তাঁর মন নেই। যার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়তে যাচ্ছে তার কি এখন পার্টি, লোকদেখানো দেঁতো হাসি আর খাবার ভাল লাগে! মন্ত্রীমশাই ডিনার খেলেন না। একটা ঠান্ডা খেয়েছিলেন। এবার চলে যাওয়ার সময় সবাইকে নমস্কার করে চলে গেলেন। তার একটু পরে নানু বোসও বলরুম থেকে বেরিয়ে এলেন। গ্রাউন্ড ফ্লোরে নেমে নিজের গাড়ির নাম্বারটা বলতে যাওয়ার আগেই রিসেপশন কাউন্টার থেকে একটি সুদর্শন যুবক ছুটতে ছুটতে এসে বললেন, ‘মি. বাসু, আপনার একটা আর্জেন্ট কল আছে।'
নানু বোস রিসেপশনে এলেন। একজন যুবতী লাল রঙের একটা ফোন দেখিয়ে বলল, ‘ওইটাতে কথা বলুন।'
নানু বোস ফোনটা তুললেন! ‘হ্যালো।’ বলার পরেই ওদিক থেকে বলা হল, 'নানুবাবু, আপনি এই হোটেলের তিনশো তিন নম্বর ঘরে চলে আসুন। একা আসবেন। কাউকে কিছু জানাবেন না।' ফোনটা ওদিক থেকে রেখে দেওয়া হল। কে ফোন করল সেটা জানার আগেই ফোন রেখে দেওয়া হয়েছিল। নানু বোস একবার ভাবলেন, তিনশো তিন নম্বরে একবার ফোন করে জেনে নেবেন কে ফোন করেছিল। কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হল, তার চাইতে তিনশো তিন নম্বরে যাওয়াই ভাল। তিনি চারদিকে তাকালেন। তারপর রিসেপশন পেরিয়ে সোজা গিয়ে দাঁড়ালেন লিফটের সামনে। একটু অপেক্ষা করার পরই ওপর থেকে লিফট নেমে এল। লিফটের ভেতর থেকে দু’জন বিদেশি মহিলা আর একজন পুরুষ নামলেন। নানু বোস লিফটে উঠে বোতাম টিপলেন। লিফট ওপরে উঠতে লাগল।
রায় কোম্পানিতে তখন অন্য দৃশ্য। পুলিশের নির্দেশ যখন এল, তখন রাত্রি ন'টা। ন'টার পর রায়বাবু কর্মচারীদের বললেন, ‘এবার তোমরা বাড়ি যাও। কাল দশটায় সবাই এসো। যে কেলেঙ্কারিতে ফেঁসেছি তাতে না আমাদের সবাইকে হাজতে যেতে হয়! এ-ক’দিন কেউ কামাই কোরো না। যে কামাই করবে পুলিশ তাকেই সন্দেহ করবে।'
কাজের লোকেরা যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল। তখনই একটা ফোন এল। ফোন বাজলেই চমকে উঠছেন রায়বাবু। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা ধরে রায়বাবু বললেন, 'হ্যালো! রায় অ্যান্ড কোং? হ্যাঁ, কথা বলছি। আচ্ছা, কখন আসবে? সে কী! আমার অফিস তো খোলে দশটার একটু আগে। আমার সঙ্গে আসবে। ঠিক আছে।'
রায়বাবু ফোনটা রেখে দিলেন। রেখে দিয়ে সবার মুখের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘কাল যেন কেউ দেরি কোরো না।'
সবাই চলে যাওয়ার পর প্রধান দরজায় তিনটে তালা লাগিয়ে কোলাপসিবল গেট টেনে তাতে দুটো তালা ঝোলালেন। ওপর থেকে নীচে নেমে এসে নিজের ফিয়াট গাড়িটাতে উঠতে গিয়ে দেখলেন তাঁর গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে সব্যসাচী রায় দাঁড়িয়ে আছেন। একটা টুথপিক দিয়ে দাঁত খোঁচাচ্ছেন। রায়বাবু তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনি? এখানে কেন? ওপরে আসতে পারতেন!’
সব্যসাচী টুথপিকটা দাঁতে চেপে নিয়ে রায়বাবুর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। তারপর টুথপিকটা ফেলে দিয়ে বললেন, ‘বাইরের ওয়েদারটা কী চমৎকার দেখছেন। তাই বাইরে দাঁড়িয়ে আছি।'
রায়বাবু শশব্যস্ত হয়ে বললেন, 'আমার সঙ্গে কি কোনও দরকার আছে?’
সব্যসাচী বললেন, ‘তেমন কোনও দরকার নেই। আমি আপনার সঙ্গে আপনার বাড়িতে যাব। আপনার বাড়ি তো তালতলায়, তাই না?’
শশধর রায় অর্থাৎ রায়বাবু বিষম ঘাবড়ে গেলেন। একটা ঢোক গিলে বললেন, ‘চলুন।' সব্যসাচী রায় বললেন, ‘আপনার গাড়ি কে চালায়?’
রায়বাবু বললেন, 'আজ্ঞে, আমি।'
সব্যসাচী বললেন, ‘চলুন তাহলে।'
সব্যসাচী রায়ের জন্য পেছনের দরজাটা খুলে দিতেই সব্যসাচী বললেন, ‘আমি আপনার পাশে বসব।'
রায়বাবু কোনও কথা বললেন না। গাড়ি স্টার্ট দিলেন। একটু পথ আসার পর রায়বাবু বললেন, 'স্যার, কোনও হদিশ হল?’
সব্যসাচী বললেন, ‘কীসের?’
রায়বাবু বললেন, ‘ওই কাপটার। আপনাদের তো অনেক নলেজ। কিছু কি আন্দাজ করতে পারলেন?'
সব্যসাচী রায় পাইপটা ধরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘বাংলায় একটা প্রবাদ আছে সেটা জানেন কি?’
রায়বাবু বললেন, ‘কতরকম প্রবাদই তো আছে। আপনি কোনটার কথা বলছেন?’ সব্যসাচী পাইপে একটা টান দিয়ে বললেন, ‘বাঘে ছুঁলে আঠারো। কিন্তু পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা, আর আমরা, মানে গোয়েন্দারা ছুঁলে বাহাত্তর ঘা। বাহাত্তর ঘা হলে কোনও ডাক্তার বাঁচাতে পারে না।'
শশধর রায় ভীত গলায় বললেন, 'স্যার, এসব কথা আমাকে কেন বলছেন! আমি তো আপনাদের সঙ্গে যথাসাধ্য সহযোগিতা করছি। এমন একটা ঘটনার জন্য আমারও কি কম খারাপ লাগছে? দেশের মাথাটা হেঁট হয়ে যাবে।'
সব্যসাচী রায় প্রথমে বললেন, 'আপনি গাড়িটা ঠিক করে চালান। মনে হচ্ছে আপনার হাত কাঁপছে। না পারলে বলুন, আমি চালাচ্ছি।'
শশধর রায় বললেন, 'না না, ঠিক আছে স্যার।'
এবার সব্যসাচী রায় বললেন, 'আপনি ঠিকই সহযোগিতা করছেন। আপনাকে নিয়ে সমস্যা নেই। কিন্তু...’
শশধর রায় উৎকণ্ঠিতভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “কিন্তু?’
সব্যসাচী রায় সেই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললেন, ‘তালতলা তো এসে গেল। আপনার বাড়িটা আর কতদূর?
শশধর রায় বললেন, ‘এবার বাঁয়ে ঘুরব। তিনটে বাড়ি ছাড়ার পরই আমার বাড়ি।' সব্যসাচী বললেন, ‘বাড়িটা তো আপনার বাবার তৈরি?’
শশধর রায় বললেন, হ্যাঁ। বাবার আমলে একতলা ছিল। আমার আমলে...’
সব্যসাচী রায় বললেন, ‘দোতলা হয়েছে। আপনার ছেলের আমলে নিশ্চয়ই তিনতলা হবে।'
শশধর রায় নিজের বাড়ির সামনে এসে গাড়িতে হর্ন দিলেন। হর্ন শুনেই বাইরের বাতিটা জ্বলে উঠল৷ সব্যসাচী দেখলেন, বাড়ির গেটটা বেশ বড়। গাড়িটা বোধহয় এই গেট দিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে যায়। ষোলো-সতেরো বছরের একটি ছেলে এসে গেটটা খুলে দিল। গেটের পাল্লা দুটো টেনে দু’দিকে সরিয়ে দিল। শশধর রায় গাড়িটা ভেতরে ঢুকিয়ে দিলেন। গাড়ি থেকে নামবার সময় সব্যসাচী বললেন, ‘বাড়িতে সবার কাছে আমার পরিচয় দেবেন আপনার পুরনো বন্ধু। আজই দিল্লি থেকে এসেছি। আপনি আমাকে জোর করে এখানে এনেছেন।'
শশধর রায় বললেন, ‘ঠিক আছে। তাই হবে।'
এবার শশধর রায়ের পেছন পেছন সব্যসাচী রায়ও সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে উঠতে শুনলেন, দোতলার কোনও একটা ঘর থেকে বিদেশি মিউজিকের সুর ভেসে যাচ্ছে। র্যাপ জাতীয় কোনও গান। সব্যসাচী বললেন, ‘একতলায় কে থাকেন?’
শশধর রায় বললেন, 'আমার এক বিধবা দিদি আর তার মেয়ে। অন্য ঘরে কাজের লোকেরা শোয়। আর একটা ঘর ফাঁকা পড়ে আছে।'
সব্যসাচী বললেন, ‘আর দোতলায়?’
শশধর বললেন, ‘একটাতে আমি আর আমার স্ত্রী। অন্যটাতে ছোট ছেলে। আর-একটা বড় ছেলের। সে তো অফিসের কাজে এখন হলদিয়ায় আছে। মাসে পনেরো-বিশদিন ও বাইরেই থাকে।'
সব্যসাচী রায় এবার শশধরবাবুর পেছন পেছন দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। বারান্দার দু’পাশে তাকিয়ে বললেন, ‘ছোট ছেলে কী করে?’
শশধর রায় উত্তর দেওয়ার আগেই ঘর থেকে একজন মধ্যবয়স্কা মহিলা বেরিয়ে এসে বললেন, ‘কী গো, আজ এত দেরি?’
স্বামীর পাশে অপরিচিত এক ভদ্রলোককে দেখে মাথায় ঘোমটা টেনে মুখটা অন্যদিকে ফেরালেন। শশধরবাবু বললেন, 'তোমায় ফোন করে তো বললুম, আজ ওই কাপের পালিশ দেখতে মন্ত্রী আসছেন। কত ভি আই পি আসছেন। আজ তো দেরি হবেই। আর শোনো, ইনি হচ্ছেন...’ এইটুকু বলেই শশধর রায় সব্যসাচীর দিকে তাকালেন। সব্যসাচী শশধরবাবুর স্ত্রীকে হাতজোড় করে নমস্কার করে বললেন, 'আমার নাম দেবাংশু রায়। শশধরদা আমার দাদার মতো। আমি দিল্লিতে থাকি। এই গোল্ডকাপের জন্য আজই কলকাতায় এসেছি। এসেই শশধরদা’র কাছে গিয়েছিলাম। উনি আমায় টেনে আনলেন। আমার জিনিসপত্র সব হোটেলে পড়ে আছে। কলকাতায় যখন থাকতাম, তখন তো শশধরদার রায় কোম্পানিতেই আমাদের আড্ডা জমত। সেইসব দিনের কথা আপনার মনে আছে রায়দা?’
কথাটা বলেই সব্যসাচী শশধর রায়কে একটা কনুইয়ের খোঁচা দিলেন। সেই খোঁচা খেয়ে শশধর রায় বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, সব মনে আছে। কেন মনে থাকবে না? তাই তো আপনাকে ধরে নিয়ে এলাম।'
রায়গিন্নি আতিথেয়তার কোনও ত্রুটি করলেন না। সব্যসাচী রায় হাতমুখ ধুয়ে এসে ঘরের সোফায় বসে বললেন, ‘রায়বাবু, আমি কিন্তু রাত্রেই চলে যেতে চাইব। আপনি আর আপনার স্ত্রী জোর করে আজকের রাত আমাকে এ বাড়িতে রেখে দেবেন।'
রায়বাবুর মুখ আরও পাংশু হয়ে গেল। সেই মুখেই বললেন, ‘বেশ, তাই করব। আজ রাতে আপনাকে এখানেই রেখে দেব। জানি না, আমার অদৃষ্টে ক’টা ঘা আছে। আঠারো, না বাহাত্তর?’
সব্যসাচী চাপা গলায় বললেন, ‘রায়দা, বাহাত্তরের ডবল হচ্ছে একশো চুয়াল্লিশ। মানে হানড্রেড ফরটি ফোর।'
রায়বাবু ঢোক গিলে বললেন, ‘তা জানি।’
রাত্রে খাবার টেবিলে তিনজন বসল। শশধর রায়, সব্যসাচী রায় এবং শশধরবাবুর ছোট ছেলে কৌশিক। কৌশিকের বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশের মতো। গায়ের রং ফরসা। গালে সুন্দর করে ছাঁটা চাপদাড়ি। শশধরবাবুই কথায় কথায় বললেন, ‘বি. কম পাশ করে চাকরির চেষ্টা করছে অথচ পৈতৃক ব্যাবসাটা দেখার ব্যাপারে কোনও উৎসাহ নেই।' সব্যসাচী ছেলেটির দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘ফাইনাল খেলা দেখতে যাচ্ছ তো?’
কৌশিক উত্তর দেওয়ার আগেই শশধর রায় বললেন, 'এই শোন, তোর টিকিট আমি পেয়ে গেছি। ভি আই পি ব্লকের টিকিট।
কৌশিক ভাতের থালাটা নিজের দিকে টেনে নিতে নিতে বলল, ‘কটা পেয়েছ?’ শশধর রায় বললেন, ‘তোর জন্য দুটো পেয়েছি। আর আমার জন্য একটা।'
কৌশিক বলল, ‘বাবা, এবার কিন্তু আমি তোমার কাছে চারটে চেয়েছিলাম। তোমার ওই নানু বোস বগলে একগাদা টিকিট নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার নিজের লোককে বিলোবার জন্য। অথচ আমরা পাচ্ছি না।'
শশধর রায় ভাত মাখতে মাখতে বললেন, ‘টিকিটের এত আকাল, তার মধ্যে তুই কেন চারটে চাইছিস! এটা দাতব্য করা হচ্ছে না!’
কৌশিক গলায় একটু তাচ্ছিল্যের সুর এনে বলল, ‘তোমার টিকিট তোমার কাছেই রেখে দাও। আমার পকেটে আজই চারটে ভি আই পি ব্লকের টিকিট এসে গেছে। আগামীকাল ফেনসিংয়ের ধারে চেয়ারে বসার দুটো টিকিট পেয়ে যাব।'
শশধর রায় ভাতের গ্রাস মুখে তুলতে গিয়ে থামলেন। ছেলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘এত টিকিট তোকে কে দিল?’
কৌশিক বাবার দিকে তাকিয়ে গর্বের ভঙ্গিতে বলল, ‘আমারও তো সোর্স থাকতে পারে। সেই সোর্সটা তোমার চেয়ে কিছু কম নয়।'
শশধর রায় বললেন, ‘সোর্সটা কে?’
কৌশিক উত্তর দিল, ‘সেটা জেনে তোমার কী লাভ? আমি নামটা বলি আর অমনই তুমি গিয়ে নানু বোসকে রিপোর্ট করো। এসব ঝামেলায় আমি নেই।'
এতক্ষণ নিঃশব্দে সব্যসাচী বাপ-ছেলের কথা শুনে যাচ্ছিলেন। এবার রায়গিন্নির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বৌঠান, আপনার লাউচিংড়িটা দারুণ হয়েছে। দিল্লিতে এরকম পাই না।' রায়গিন্নি সলজ্জ হেসে বললেন, ‘আপনার দাদার কাণ্ডটা দেখুন! একটিবার ফোন করে বলতে পারত। এরকম সাদামাটা খাবার কোনও অতিথিকে দেওয়া যায়?’
সব্যসাচী বললেন, 'আমাকে একদম অতিথি ভাববেন না। অতিথি ভাবলে আত্মীয়তা হয় না। দূর সম্পর্কে আমরা আত্মীয় সেটা জানেন কি? রায়দা সেটা বলেছেন?’
কথা শেষ করেই সব্যসাচী টেবিলের তলায় হাত ঢুকিয়ে শশধর রায়কে একটা খোঁচা দিলেন। দম-দেওয়া কলের পুতুলের মতো শশধর রায় খোঁচা খেয়েই বলতে লাগলেন, হ্যাঁ, এটা তোমাকে বলা হয়নি। উনি আমাদের জ্ঞাতি। দেখা-সাক্ষাৎ বড় একটা হয় না তো, তাই...'
শশধর কথা শেষ না করেই সব্যসাচীর দিকে তাকালেন। সব্যসাচী বললেন, ‘এটা আমারই দোষ। এই যে কৌশিক, ও তো সম্পর্কে আমার ভাইপো। কিন্তু আমরা কেউ কাউকে চিনি না।’
কৌশিক বলল, ‘সত্যিই চিনি না। আপনি যে সম্পর্কে আমার আঙ্কল হন, সেটা আজই প্রথম জানলাম।'
সব্যসাচী রায় এবার কৌশিকের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার কোনটা ভাল লাগে? ফুটবল, না ক্রিকেট??
কৌশিক বলল, ‘দুটোই।'
সব্যসাচী বললেন, ‘এবার তো ওয়েস্ট ইন্ডিজ ভারতে আসছে সিরিজ খেলতে। প্রথম ম্যাচ দিল্লিতে। তুমি দেখবে?’
কৌশিক বলল, ‘দিল্লিতে কী করে যাব? ওরা কলকাতায় এলে দেখব।'
সব্যসাচী বললেন, ‘বোকা ছেলে! আমি তো ওঁদের পাঁচটা টেস্ট আর পাঁচটা ওয়ান ডে দেখব। দেখতেই হবে। তোমার কোনও ভাবনা নেই। আমি দিল্লি থেকে তোমাকে প্লেনের টিকিট পাঠিয়ে দেব। এয়ারপোর্টে আমি থাকব তোমার জন্য। এবার সবক'টা ম্যাচ তুমি আমার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে দেখবে। রাজি?’
কৌশিক একবার মায়ের দিকে তাকাল। তারপরই বলল, ‘আমি রাজি।'
সব্যসাচী রায় বললেন, ‘গোল্ডকাপেও তুমি আমার সঙ্গে যাবে। খেলোয়াড়দের ড্রেসিংরুমে আমি তোমাকে নিয়ে যাব। রাজি আছ?’
কৌশিক সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, ‘রাজি আছি।'
খাওয়া শেষ করে ওঠার পর সব্যসাচী বললেন, ‘রায়দা, এত রাতে আর হোটেলে ফিরব না। আজকের রাতটা যদি এখানেই থাকি তাহলে কি...’
রায়বাবু উত্তর দেওয়ার আগে কৌশিক বলল, ‘আঙ্কল আপনি এখানেই থেকে যান।' সব্যসাচী একবার শশধর রায়ের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘কৌশিক, আমি
আর তুমি এক ঘরে থাকব। আমার আবার নতুন জায়গায় একলা ঘরে ঘুম হয় না।'
কৌশিক বলল, ‘তাই ভাল। আমরা এক ঘরে থাকব। আঙ্কল, আপনি কি কখনও লারাকে মিট করেছেন?’
সব্যসাচী বললেন, ‘চাকরিটা তো সাংবাদিকতার। অতএব মিট তো অনেকবারই করতে হয়েছে। চলো, ঘরে গিয়ে এসব গল্প করা যাবে।
সব্যসাচী কৌশিকদের ঘরে যাওয়ার আগে শশধরের দিকে একবার তাকালেন। একটু হাসলেন। তারপর ‘গুড নাইট’ বলে চলে গেলেন কৌশিকের ঘরে।
শশধর রায় খানিকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেন। তারপর আস্তে আস্তে চলে গেলেন নিজের ঘরের দিকে।
গির্জার ঘণ্টা থেকে বোঝা গেল এখন রাত বারোটা।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নানু বোস দেখলেন রাত্রি বারোটা বাজে। তার মানে একটা দিন চলে গেল। কাল সকাল থেকে আবার একটা দিন শুরু হবে এবং আস্তে আস্তে শেষ হবে। তারপরের দিন বেলা তিনটেয় খেলা শুরু। বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে অনেক ঘণ্টা খরচ হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত কাপ পাওয়া তো দূরের কথা, পাওয়ার ক্ষীণতম আশাও দেখা যায়নি। সব্যসাচী রায়ের কথামতো আজ যে ব্যবস্থা করা হয়েছে তার বিবরণ কালকের কাগজেই বেরিয়ে যাবে। ক্রীড়ামন্ত্রী কাপের পালিশ দেখে সন্তোষপ্রকাশ করেছেন। সময়ের হিসেবে এই ঘটনা যখন ঘটছে তার অনেক আগেই কাপটা খোয়া গেছে। এটা হয়তো সব্যসাচী রায়ের কোনও কৌশল। কাপটা পাওয়া গেলে এই কৌশল খুবই তারিফ পাবে। কিন্তু না পাওয়া গেলে এই কৌশলটাও তখন অন্য চেহারা নেবে। প্রশ্ন উঠবে, কাপ খোয়া যাওয়ার এত ঘণ্টা পরে ক্রীড়ামন্ত্রী কেমনভাবে কাপের পালিশ দেখলেন!
নানু বোসের মাথার মধ্যে দপদপ করতে লাগল। তিনি বিছানার ওপর উঠে বসলেন। ঘরের মধ্যে এসি মেশিন চলার শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। হাতের কাছে টেলিফোন। বালিশের পাশে সেলুলার। কিন্তু এ-সময় কাকে ফোনে পাবেন? তাঁর মতো কেউ কি জেগে আছে? হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর থেকে পাইপটা টেনে নিলেন। কৌটো থেকে টোবাকো নিয়ে পাইপে ভরবার আগেই তাঁর বালিশের পাশে রাখা সেলুলারটা বেজে উঠল। নানু বোস টোবাকো আর পাইপ রেখে দিয়ে ফোনটা ধরলেন। ওপাশ থেকে সব্যসাচী রায়ের গলা পাওয়া গেল। নানু বোস বললেন, ‘কোনও সুখবর আছে?’
সব্যসাচী রায় জবাব দিলেন, ‘না, মশাই। কিস্যু নেই। কোনও সূত্র এখনও পাচ্ছি না।'
নানু বোসের গলা থেকে একটা হতাশব্যঞ্জক অস্ফুট শব্দ বের হল। সব্যসাচী বললেন, ‘আপনি রাত জাগবেন না। শুয়ে পড়ুন। কাল সকাল ছ'টায় আপনাকে একটু ময়দানে আসতে হবে।'
নানু বোস বললেন, ‘ময়দানে কোথায় ?
সব্যসাচী উত্তর দিলেন, ‘প্রেস ক্লাবটা চেনেন তো! সেই ক্লাবের গেটের সামনে আমি থাকব। এখন আর রাত জেগে শরীর খারাপ করবেন না। শুয়ে পড়ুন।'
সব্যসাচী রায়ের কথা শেষ হতেই নানু বোস টেলিফোনটা আবার বালিশের পাশে রাখলেন। আগামীকাল সকাল ছ'টায় প্রেস ক্লাবের গেটে তাঁকে দাঁড়াতে বলার কোনও কারণ নানু বোস খুঁজে পেলেন না। তবুও মনে মনে এই ভেবে একটু সান্ত্বনা পেলেন যে, হয়তো কাল সকালেই আশাব্যঞ্জক কোনও খবর পাওয়া যাবে।
ওদিকে সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে শশধর রায় শুনলেন সব্যসাচীবাবু অনেক ভোরে বেরিয়ে গেছেন। যাওয়ার আগে শুধু কাজের লোকটিকে বলে গেছেন, ‘আমি ন'টার সময় রায় কোম্পানিতে যাব। শশধরবাবু যেন আজ ন'টায় যান।’ তারও একটু পরে শশধরবাবুর স্ত্রী এসে বললেন, ‘ছোটখোকাকে কি কোথাও পাঠিয়েছ?’
শশধর বললেন, ‘না। আমি তো কোথাও পাঠাইনি। দ্যাখো কোনও রকে বসে আড্ডা মারছে।'
অন্যদিনের চাইতে তাড়াতাড়ি দোকানে এলেন শশধরবাবু। ওপরে উঠে দেখলেন, দোকানের বন্ধ দরজার সামনে সব্যসাচী রায় দাঁড়িয়ে। শশধরবাবু নিজের ঘড়িটা দেখতে দেখতে বললেন, ‘আমি দেরি করে ফেলিনি তো?’
সব্যসাচী রায় মাথা নাড়লেন। মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলেন, দেরি হয়নি।
শশধর রায় যখন দোকানের তালা খুলছেন তখন সব্যসাচী বললেন, ‘আজ সব কাগজে খবর বেরিয়ে গেছে যে গতকাল সন্ধ্যার পর মন্ত্রীমশাই এসে কাপের পালিশ দেখে গেছেন।'
শশধর রায় চাবি দিয়ে তালা খুলছিলেন। তাঁর হাতটা থেমে গেল। পেছন ফিরে সব্যসাচী রায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এইরকম খবর বেরিয়েছে নাকি? সব কাগজে বেরিয়েছে?'
সব্যসাচী রায় বললেন, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ।'
শশধর রায় বললেন, ‘খবরটা তো সত্যি নয়।'
সব্যসাচী এবার একটু কঠিন গলায় বললেন, ‘সেটা আপনার কাছে। কিন্তু অন্যদের কাছে নয়। আজ আপনার টেলিফোনের পাশে আমার একজন লোক বসবে। কর্মচারীদের বলবেন, লোকটির নাম বিমল বসাক। আজ থেকে রায় কোম্পানিতে কাজ করবে। আপনার টেলিফোনের সঙ্গে একটা প্যারালাল লাইন আছে তো?’
শশধর বললেন, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ।'
সব্যসাচী বললেন, ‘সকাল থেকে দোকান বন্ধ হওয়া পর্যন্ত ফোন এলে আপনার সঙ্গে বিমলও ধরবে। বিমল কথা বলবে না। শুধু শুনবে। কথা বলবেন আপনি।
শশধর রায় ভীত চোখে সব্যসাচীবাবুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'স্যার, আপনার সন্দেহ কি আমার দিকে?’
সব্যসাচী রায় উত্তর দিলেন, ‘গোয়েন্দাদের স্বভাব ভাল নয়। নিজেকে ছাড়া আর সবাইকে তারা সন্দেহ করে।'
শশধর রায় বললেন, ‘এতদিন ধরে কাপটা পালিশ করছি। কখনও কোনও গণ্ডগোল হয়নি। কপাল মন্দ না হলে...
ফোনটা বেজে উঠতেই সব্যসাচী বললেন, ‘এটা আপনার ফোন নয়। আমার। আপনার ফোন আসবে সাড়ে ন'টার পর। এখনও সাড়ে ন'টা বাজেনি।
সব্যসাচী ফোনটা ধরে বললেন, ‘এসে গেছিস। ওপরে চলে আয়।' ফোন নামিয়ে রেখে সব্যসাচী বললেন, ‘আপনার নতুন কর্মচারী বিমল বসাক আসছে।'
শশধর রায় পাখাটা চালিয়ে দিয়ে চেয়ারে বসলেন। একটু পরে ছোটাই এল। ছোটাইকে দেখে সব্যসাচী বলে উঠলেন, ‘আয় বিমল। ইনি হচ্ছেন শশধর রায়। রায় কোম্পানির মালিক। ওঁকে সব বলা আছে। তুই কাজে লেগে যা।'
ছোটাই প্রশ্ন করল, ‘তুমি!'
সব্যসাচী উত্তর দিলেন, ‘একটু কাজে বেরোব।'
কথাটা শেষ করেই সব্যসাচী শশধরবাবুর দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘চলি।'
নীচে নেমে দেখলেন তাঁর গাড়ির পেছনেও কে যেন গোল্ডকাপের স্টিকার লাগিয়ে দিয়ে গেছে। গোটা শহরের দেওয়াল জুড়ে গোল্ডকাপের রঙিন পোস্টার। সব্যসাচী যেমনটি চেয়েছিলেন, তেমনই হয়েছে। সব্যসাচী গাড়ি নিয়ে ময়দানে এলেন। প্রেস ক্লাবের গেটে সব্যসাচীর জন্য নানু বোসের অপেক্ষা করার কথা। আজ সকাল ছ'টায় সেইরকমই কথা হয়েছে। সব্যসাচী দেখলেন, পাইপ দাঁতে চেপে নানু বোস বসে আছেন। তাঁর পাশে সি পি সাহেব। সি পি সাহেব প্রশ্ন করলেন, ‘এনি প্রোগ্রেস?’
সব্যসাচী ঠোঁট উলটে জবাব দিলেন, ‘নাথিং।'
সি পি সাহেব বললেন, 'আমি নিজে সি এমের কাছে আপনার নাম প্রস্তাব করেছি। আমার মানটা বাঁচান। আপনি ফেল করলে আমাদের পুলিশ মহলে আমাকে নিয়ে সমালোচনা শুরু হবে।'
সব্যসাচী বললেন, ‘আপনাদের দু'জনের কাছ থেকে দুটো হেল্প চাই। নানুবাবু, আপনি ওটা চেক করেছেন? সকালে যেটা বললাম।'
নানু বোস বললেন, ‘হ্যাঁ। ও এখন মেডিক্যাল লিভে আছে।'
সব্যসাচী এবার সি পি-র দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘জনার্দন চক্রবর্তী বলে এক ভদ্রলোক কালীঘাটে থাকেন। বছর সাতেক আগে মন্দির থেকে গয়না চুরির দায়ে দু’বছর জেল খেটেছিলেন। ভদ্রলোক এখন কালীঘাটে থাকেন না। খিদিরপুরে থাকেন। ওঁর পুরনো ফাইলটা লালবাজারে গেলে দেখা যাবে।'
সি পি বললেন, ‘আমার সঙ্গে লালবাজারে চলুন। আমি চেষ্টা করছি।'
সব্যসাচী বললেন, ‘একমাত্র নানুবাবু আর আপনি ছাড়া আর কেউ ফাইনাল খেলা শুরুর আগে রায় কোম্পানিতে কাপ দেখতে যেতে পারবেন না। এটা আপনাদের নাম করে আমি শশধরবাবুকে বলে এসেছি।'
সি পি বললেন, ‘তদন্তের ব্যাপারে আপনি যা ভাল বুঝবেন তাই করবেন। এ ব্যাপারে আমাদের কিছু বলার নেই।'
সব্যসাচী বললেন, ‘নানুবাবু, আপনি এবার আপনার কাজে যান। দরকার হলে মোবাইলে কথা বলব। আমি সি পি সাহেবের সঙ্গে লালবাজারে যাচ্ছি।'
সব্যসাচী নিজের গাড়ির ড্রাইভারকে বললেন, 'তুমি লালবাজারে চলে এসো। আমি সি পি সাহেবের গাড়িতে যাচ্ছি।'
সি পি সাহেবের গাড়িতে উঠতে উঠতে সব্যসাচী বললেন, 'হলদিয়া থেকে একটা খবর আনিয়ে দিতে পারবেন?
সি পি জিজ্ঞেস করলেন, 'কী খবর?’
সব্যসাচী রায় বললেন, ‘ওটা আপনার ঘরে গিয়ে বলব।'
গাড়িটা লালবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেল।
নানু বোস নিজের বাড়ি ঘুরে চলে এলেন যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে। স্টেডিয়ামের কনফারেন্স রুমের দিকে এগিয়ে যেতেই কেউ একজন বললেন, 'নানুদা, স্পোর্টস মিনিস্টার আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।'
নানু বোস জিজ্ঞেস করলেন, ‘উনি কোথায়?’
উত্তর এল, 'উনি নিজের ঘরে।
নানু বোস আর কোনওদিকে না তাকিয়ে দ্রুত মন্ত্রীর ঘরে ঢুকে গেলেন। মন্ত্রীর ঘরে তখন তিন-চারজন লোক বসে। মন্ত্রী নানু বোসকে দেখেই বললেন, 'আপনারা এখন একটু বাইরে যান। আমি নানুদার সঙ্গে কয়েকটা কাজের কথা বলি।'
চেয়ারে বসে থাকা লোকগুলো উঠে দাঁড়াল। আস্তে আস্তে ঘর থেকে বাইরে চলে গেল। মন্ত্রী বললেন, ‘দরজা বন্ধ করে দিন।'
দরজা বন্ধ করে দিয়ে নানু বোস বসলেন মন্ত্রীর মুখোমুখি। মন্ত্রীমশাই জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোনও খবর আছে?'
নানু বোস হতাশ গলায় বললেন, ‘এখনও কোনও খবর নেই। শেষপর্যন্ত কী হবে তা জানি না।' মন্ত্রী বললেন, ‘আমিও কিছু বুঝতে পারছি না। আগামীকাল ফাইনাল। কালই তো কাপটা দরকার।'
নানু বোস বললেন, ‘দরকার তা জানি। কিন্তু কাপটা বোধহয় হাজির করা যাবে না। রেপ্লিকাটাই হাজির করতে হবে। আর এটাই যদি হয় তাহলে সবকিছু ছেড়ে আমাকে ভারতের বাইরে চলে যেতে হবে।'
মন্ত্রী নস্যি নিলেন। রুমাল দিয়ে নাক মুছে নিয়ে বললেন, 'আমার বিশ্বাস, ফাইনালের আগেই কাপটা উদ্ধার হবে।'
নানু বোস বললেন, ‘এটা আপনার বিশ্বাস। কিন্তু এটাই যে ঘটবে তার কোনও গ্যারান্টি নেই।'
মন্ত্রী কোনও কথা বললেন না। কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল নীরবে। হঠাৎ নানু বোসের মোবাইল টেলিফোনটা বেজে উঠল। নানু বোস কথা বললেন। ফোনের ওদিকে সব্যসাচী রায়। নানু বোস বললেন, ‘বলুন, কী ব্যাপার?
ওদিক থেকে সব্যসাচী বললেন, ‘বেলেঘাটায় শ্রীমা ইন্ডাস্ট্রিজ, যারা নানা ধরনের ব্যাগ বানায়, তাদের টেলিফোন নাম্বারটা দিচ্ছি। আপনি ওদের ডেকে পাঠান। হাজার কয়েক ব্যাগের অর্ডার দিন।'
নানু বোস বিরক্ত গলায় বললেন, 'হাজার কয়েক ব্যাগ দিয়ে আমার কী হবে? আপনি আসল কাজটা কতদূর করলেন?’
সব্যসাচী উত্তর দিলেন, ‘এখনও কিছুই হয়নি। আপনি ফোন নাম্বারটা নিন। ব্যাগের অর্ডারটা প্লেস করুন।'
অসহিষ্ণু গলায় নানু বোস বললেন, ‘ব্যাগ নিয়ে আমি কী করব?’
সব্যসাচী উত্তর দিলেন, ‘আপনাকে কিছু করতে হবে না। ওটা আমার দরকার। যা বলছি তাই করুন।'
সব্যসাচী রায় লাইনটা কেটে দিলেন। নানু বোসের মুখ থেকে সব ঘটনা শোনার পর মন্ত্রীমশাই বললেন, ‘উনি যা বলছেন তাই করুন।'
নানু বোস বাধ্য হয়ে সব্যসাচীর দেওয়া নম্বরে ফোন করলেন। ফোন করতে যাওয়ার আগে মন্ত্রী বললেন, ‘ওঁদের কাউকে ব্যাগের স্যাম্পেল নিয়ে এখানে আসতে বলুন।'
নানু বোস ফোনের ডায়াল ঘোরাতে ঘোরাতে বিরক্ত গলায় বললেন, ‘ব্যাগ-ফ্যাগ দিয়ে যে কী হবে কে জানে! কাপের বদলে তো গাদা গাদা ব্যাগ হাজির করলে হবে না!’
ফোন করে সব্যসাচী রায়ের নির্দেশমতো কথাগুলো বললেন নানু বোস। সেইসঙ্গে ব্যাগের স্যাম্পেল নিয়ে কাউকে স্টেডিয়ামে আসতে বললেন। নানু বোস বুঝতে পারছিলেন এসব কাজের কোনও মূল্য নেই। শুধু সময়টা চলে যাচ্ছে। যত সময় যাচ্ছে ততই ফাইনাল খেলার সময়টা এগিয়ে আসছে আর নানু বোসের ভেতরে উত্তেজনা বাড়ছে। এই উত্তেজনার মধ্যে কোনও আনন্দ নেই। শুধু আতঙ্ক আর দুর্নামের ভয়। নানু বোস মন্ত্রীর সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন। দু’জনে মাঠে এলেন। চমৎকার করে গ্যালারির চেয়ারগুলো সাজানো হয়েছে। দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। কিন্তু আজ আর এই অনুভূতিগুলো কাজ করছে না। বাইরের কোনও আনন্দই নানু বোসকে আজ আর স্পর্শ করতে পারছে না। তাঁর মনে হচ্ছিল গোটা গ্যালারি-ভর্তি দর্শক শুধু তাঁর দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে তাকিয়ে আছে। হয়তো এখনই এই বিশাল জনস্রোত তাঁর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে। নানু বোসের বুকের ভেতরটা অন্ধকার হয়ে গেল। মাঠের মধ্যে কিছু লোক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। গ্যালারিতে তখনও কিছু কাজ হচ্ছিল। সেখানেও কিছু লোক। নানু বোস মন্ত্রীর সঙ্গে মাঠের বাইরে এলেন। মন্ত্রী এখান থেকে সোজা মহাকরণে যাবেন। তিনি চলে যাওয়ার পর নানু বোসও নিজের গাড়িতে গিয়ে বসলেন। কেউ একজন এসে নানু বোসকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘নানুদা, কোথায় যাচ্ছেন?’
নানু বোস উত্তর দিলেন, ‘বাড়িতে।'
যিনি কথা বলছিলেন তিনিই আবার বললেন, ‘আজ লাঞ্চে কখন আসবেন? সি এম তো দুপুরে দু’দলকে লাঞ্চ দিচ্ছেন।'
গাড়ির মধ্যে ঢুকে যেতে যেতে নানু বোস বললেন, ‘জানি। ঠিক সময়ে পৌঁছে যাব।'
বাইপাস দিয়ে গাড়ি করে আসতে আসতে নানু বোসের হঠাৎ মনে হল, একবার রায় কোম্পানি ঘুরে যাওয়া যাক। হয়তো সব্যসাচীবাবু ওখানে থাকতে পারেন। না থাকলে যদি কোনও খবর মেলে!
রায় কোম্পানির ঘরে ঢুকতেই শশধর রায় উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘এটা কেমন ব্যাপার হল নানুদা?’
নানু বোস প্রশ্ন করলেন, ‘কী ব্যাপার?’ প্রশ্নটা করেই নানু বোস ছোটাইয়ের দিকে তাকালেন। ছোটাই চোখ দিয়ে ছোট্ট একটা ইশারা করল।
শশধর রায় বললেন, ‘আমার সবকটা কর্মচারীকে রায়বাবুর লোক সকাল সাতটায় বাড়ি থেকে তুলে সাড়ে ন'টায় এখানে এনেছে। কারও স্নান হয়নি, খাওয়া হয়নি, এমনকী সকালের বাথরুমও হয়নি।'
নানু বোস আরও একবার ছোটাইয়ের দিকে তাকালেন। শশধরবাবু সেটা লক্ষ করে বললেন ‘নতুন লোক। আজ থেকে কাজ করছে।'
ছোটাই হাত তুলে নমস্কার করে বলল, 'আমার নাম বিমল বসাক।'
নানু বোস এবার ছোটাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বিমলবাবু, আপনার সঙ্গে আমার একটু কথা আছে। দয়া করে একটু বাইরে আসবেন?’
ছোটাই বাইরের বারান্দায় এল। নানু বোস চাপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘কাজ কিছু এগোল?’ ছোটাই চিকলেট চিবুতে চিবুতে উত্তর দিল, ‘কাজ চলছে। মনে হচ্ছে ভালই এগোচ্ছি। আমার গুরুর ওপর ভরসা রাখুন।'
নানু বোস বললেন, ‘আগামীকাল তিনটেতে খেলা। কাপটা তো তার আগে দরকার।' ছোটাই বলল, ‘আমরা হিসেব করছি কী জানেন?’
নানু বোস বললেন, ‘কী?’
ছোটাই উত্তর দিল, ‘আর ক’ঘণ্টা সময় আমাদের হাতে আছে। কাপটা যদি কলকাতার বাইরে পাচার হয়ে গিয়ে থাকে তা হলে তো সময়মতো কাপ হাজির করা যাবে না।'
নানু বোসের শরীর কেঁপে উঠল। কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনাদের কী মনে হচ্ছে কাপটা কলকাতার বাইরে চলে গেছে?’
ছোটাই বলল, ‘যদি গিয়ে থাকে? যেতেও তো পারে! চোর কখনও চুরির জিনিস আমাদের নাকের ডগায় রাখবে না। আর এটা তো অন্য ধরনের চুরি।'
নানু বোস নীচে নেমে এসে গাড়িতে বসলেন। যে সমস্ত কাজ করার ছিল তা একে একে নানু বোস করে যেতে লাগলেন। রাত্রে স্টেডিয়ামে এসে দেখলেন আলোয় ঝলমল করছে স্টেডিয়াম। কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় তোরণ তৈরি হয়ে গেছে। ফুটবল-জ্বরে আক্রান্ত কলকাতা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে কালকের ফাইনাল খেলার জন্য। পিল্লাই শুধু একবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘নানুদা, কোনও খবর পাওয়া গেল?’
নানু বোস হতাশভাবে মাথা নাড়লেন। নিজের বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে উঠতে নানু বোস দেখলেন আরও একটা দিন শেষ হয়ে গেল। আজকের রাতটুকু শেষ হলেই আগামীকাল। মানে গোল্ডকাপের ফাইনালের দিন। নানু বোস নিজের ঘরের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাঁর চলবার শক্তিও ফুরিয়ে আসছে।
নানু বোস ফাইনালের দিন স্টেডিয়ামে পৌঁছলেন বেলা একটা নাগাদ। কারও সঙ্গে কথা না বলে সোজা মন্ত্রীমশাইয়ের ঘরে এলেন। আগে থেকে বলা ছিল বলে মন্ত্রী তাঁর ঘরে সিপি সাহেব আর পিল্লাই ছাড়া কাউকে রাখেননি। নানু বোসকে দেখে সবাই তাকাল। সবার মুখই ‘কোনও গম্ভীর এবং থমথমে। নানু বোস সি পি সাহেবের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, খবর পেয়েছেন কি?’
সি পি বললেন, ‘না। সি এম আজ কাপটার খোঁজ নিচ্ছিলেন। আমি তো কোনও জবাবই দিতে পারলাম না।'
মন্ত্রী বললেন, ‘কাপটা মাঠে হাজির করতে না পারলে...’
তিনি কথাটা শেষ করলেন না। চুপ করে বসে রইলেন। আর খানিকক্ষণ পরেই গেট খুলে দেওয়া হবে। হাজার হাজার দর্শক ঢুকবে স্টেডিয়ামে। যে দুটো হোটেলে খেলোয়াড়রা আছেন তাঁদের আনবার জন্য লাক্সারি বাস চলে গেছে। একটু পরেই দু'দলের খেলোয়াড় এবং কর্মকর্তারা এসে পড়বেন। অঘটনটা না ঘটলে রায় কোম্পানি থেকে গোল্ডকাপটা এই সময় এখানে এসে যাওয়ার কথা।
মন্ত্রী বললেন, ‘আমাদের কিন্তু এবার একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে।'
নানু বোস বললেন, ‘কী সিদ্ধান্ত?’
মন্ত্রী বললেন, ‘কাপটা আমরা আর পাচ্ছি না। অন্তত আজ পাচ্ছি না, এটা ধরে নিয়েই এবার আমাদের কর্মপদ্ধতি ঠিক করতে হবে।'
সি পি বললেন, ‘কী ঠিক করবেন! গতকালের কাগজে বেরিয়ে গেছে আপনি নিজে কাপের পালিশ দেখে এসেছেন। প্রেস কনফারেন্সে নানুবাবু থেকে সবাই অনেক রকম কথা বলেছেন।এখন কৈফিয়ত কী বলা যেতে পারে? কোনও কথাই তো নেই।'
মন্ত্রী বললেন, ‘সবদিক দিয়েই কেলেঙ্কারি হয়ে গেছে। আরও বড় কেলেঙ্কারিটা ঘটবে কয়েক ঘণ্টা পর। এই শহরের মাথায়, প্রশাসন ও টুর্নামেন্ট কমিটির ঘাড়ে যে কলঙ্ক চাপবে সেটা দু’-দশ বছরেও মুছবে না।'
নানু বোস আর পিল্লাই কিছু বলার আগেই টেলিফোনে সি পির কাছে খবর এল, খেলোয়াড়দের বাস স্টেডিয়ামের গেটে পৌঁছে গেছে। সি পি বললেন, ‘ঘটনা যাই হোক, খেলোয়াড় আর কর্মকর্তাদের তো রিসিভ করতে হবে। চলুন সামনে যাই। ওঁদের গাড়ি এসে গেছে।'
ওঁরা চারজন ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়ালেন। স্টেডিয়ামের প্রধান ফটক দিয়ে বাসটা মন্থর গতিতে ঢুকছে। লাল পাড় গরদের শাড়ি পরে মেয়েরা লাইন করে দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্যেকের হাতে ফুলের মালা। বাসটা আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে। যত এগিয়ে আসছে ততই হৃৎপিণ্ডের ওঠানামা দ্রুত হয়ে উঠছে চারজনের। নানু বোস গলগল করে ঘামছিলেন। বাসটা এসে দাঁড়িয়েছে। দরজা খুলে এক এক করে সবাই নামছেন। ওঁরা চারজন আরও একটু এগিয়ে গেলেন। নমস্কার বিনিময়, করমর্দন এগুলো হতে লাগল। মেয়েরা সবাইকে মালা পরিয়ে দিলেন। আরও মিনিট দশেক পর অন্য দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে দ্বিতীয় বাসটা এসে গেল। একইভাবে তাঁদেরও মালা পরিয়ে দেওয়া হল। খেলোয়াড় আর কর্মকর্তারা তাঁদের নির্দিষ্ট ঘরে চলে গেলেন।
শুকনো মুখে নানু বোস তাকালেন মন্ত্রীর দিকে। চারজনের কেউই কোনও কথা বললেন না। কথা বলার উদ্যমটাই হারিয়ে ফেলেছেন সবাই। খোকা চাটুজ্যে এসে নানু বোসকে বলল, ‘নানুদা, বিজয়দা’র খবর শুনেছেন? বিজয়দার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।' নানু বোস বললেন, ‘সে কী? কালও তো আমরা একসঙ্গে অনেকক্ষণ ছিলাম। কখন হল?'
খোকা চাটুজ্যে বলল, ‘আজ ভোরে। মিনিট কুড়ি আগে ওঁর এক ভায়রা ফোন করে খবরটা দিলেন।'
মন্ত্রী বললেন, ‘আপনারা বাড়িতে ফোন করেছিলেন?’
খোকা চাটুজ্যে উত্তর দিল, ‘করেছিলাম। বাড়িতে কেউ নেই। কাজের মেয়েটা বলল, সবাই হাসপাতালে গেছে।'
নানু বোস বললেন, 'এখন তো আমাদের কারও পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়।'
পিল্লাই বললেন, ‘বিজয়দা তো খুব শান্ত স্বভাবের মানুষ।'
নানু বোস কিছু বলবার আগেই একটা মোটর সাইকেল স্টেডিয়ামের গেট দিয়ে ঢুকে সোজা নানু বোসের সামনে এসে দাঁড়াল। নানু বোস দেখলেন, মোটর সাইকেলের ওপর ছোটাই বসে। ছোটাইকে এ সময় এখানে দেখে সি পি সাহেব, নানু বোস আর পিল্লাই তিনজনেই অবাক হলেন। তাঁদের মধ্যে একটা আশা জেগে উঠল। ছোটাই বাইক থেকে নামতে নামতে বলল, ‘যা টাইট সিকিউরিটি, বাইক নিয়ে এখানে ঢুকতে জান কয়লা হয়ে গেল।'
সি পি জিজ্ঞেস করলেন, ‘সব্যসাচীবাবু কোথায়?
ছোটাই বলল, “ঠিক জানি না। বোধহয় কিছু খোঁজাখুঁজি করছে।'
নানু বোস একবার মন্ত্রীমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আপনার ঘরে একটু বসতে হবে।'
মন্ত্রী বললেন, ‘চলুন।'
ঘরে আসার পর ছোটাই বলল, ‘শুনেছেন তো; আপনাদের কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান বিজয় বর্মনের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে?’
সি পি বললেন, ‘শুনেছি। কিন্তু আপনি কোখেকে শুনলেন।'
ছোটাই ব্লল, আমাকে মি. রায়, মানে আমার বস তো ফোন করে তাই বললেন।' ?'
‘বিজয়দা কোন নার্সিংহোমে আছেননানু বোস বললেন,
ছোটাই বলল, ‘তা তো জানি না। তবে চিন্তার কিছু নেই। ছোট্ট অ্যাটাক। সেরে যাবেন। শুধু ফাইনাল খেলাটাই দেখতে পাবেন না। এই যা।'
ছোটাইয়ের দিক থেকে সবাই চোখ সরিয়ে নিয়ে পরস্পরের দিকে তাকালেন। শুধু সি পি প্রশ্ন করলেন, ‘ফাইনাল খেলাটা কি বিজয়বাবু একটুও দেখতে পাবেন না?’
ছোটাই বলল, ‘বোধহয়, না। সেটা যদি রিস্ক হয়ে যায়?’
ছোটাইয়ের এসব কথায় নানু বোস কোনও উৎসাহ পাচ্ছিলেন না। আজকের ফাইনাল খেলাটা তাঁর জীবনে যে গভীর অভিশাপ বয়ে আনছে সেটা তিনি টের পেয়ে গেছেন। কাপ পাওয়ার আর যে কোনও চান্সই নেই সেটা বুঝতে পেরে নানু বোস বললেন, ‘বিভাসদা, বলুন কী করব? কাপ তো পাওয়া গেল না!’
মন্ত্রী বললেন, ‘আমার মনে হয় এখন এটা বলে দেওয়া ভাল। খেলা শুরুর আগে সিএম এসে পড়বেন। ওঁর সঙ্গে কথা বলে না হয় ওঁকে দিয়েই বলাবার চেষ্টা করব। সেটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে। এখন তো আর সময় নেই। বলতেই হবে। নিন্দা, গালমন্দ যা পাওয়ার সেগুলো পেতেই হবে। হয়তো এই টুর্নামেন্টের ফাইনালটা আর কখনও কলকাতায় করা যাবে না।'
নানু বোস দু’হাতে মুখ ঢেকে মাথা নিচু করে বসে রইলেন। পিল্লাই নানু বোসের পিঠে হাত রেখে বললেন, ‘নানুদা, বি স্টেডি। আর ভেবে লাভ নেই। আমাদের ফেস করতে হবে।'
পকেট থেকে চিকলেট মুখে দিয়ে চিবোতে চিবোতে ছোটাই বলল, ‘আপনারা ওই কাপটার জন্য ভাবছেন তো! এখনই এত ভাববার দরকার নেই। খেলা শুরু করতে বল লাগে, কাপ নয়। খেলাটা শুরু হয়ে যাক।
সি পি প্রশ্ন করলেন, ‘তারপর?’
ছোটাই উত্তর দিল, ‘তার পরের কথাটা বলতে পারছি না। দেখা যাক কী হয়!’
ছোটাইয়ের কথা শুনে হাড়পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে নানু বোসের। তিনি একবার কঠোর চোখে ছোটাইয়ের দিকে তাকালেন। ছোটাইয়ের ভাবলেশহীন মুখ দেখে বোঝবার উপায় নেই যে, কত বড় একটা দায়িত্ব ওদের দেওয়া হয়েছিল আর ওরা সেটা পালন করতে পারল না। সেজন্য কোনও অনুতাপের চিহ্ন নেই ছোটাইয়ের চোখে-মুখে। সি পি-র কাছে ঘন ঘন নানা খবর আসছিল। সে সবই খেলার মাঠ ও মাঠের বাইরের খবর। নর্থ চব্বিশ পরগনার এস পি এসে বলে গেলেন, স্টেডিয়াম ফুল হয়ে গেছে। দশ হাজার গ্যাস বেলুন মাঠ থেকে ছাড়া হবে, সে ব্যবস্থাও পাকা হয়ে গেছে। নানু বোস জানেন, আর একটু পর সি এম এসে পড়বেন। তখনই তাঁকে মাঠে ঢুকতে হবে। তারপরই খেলা শুরু হবে। ঘড়ির কাঁটা বিকল হলে থেমে থাকতে পারে। কিন্তু সময় কখনও থেমে থাকে না। অতএব, সময় তার নিয়মমতো এগিয়ে যেতে লাগল। সি এম এলেন। মাঠ থেকে নানা রঙের বেলুন ছাড়া হল। স্টেডিয়ামের মাথার ওপরের আকাশটা বেলুনে বেলুনে ছেয়ে গেল। বেলুনগুলো আরও ওপরে উঠে ভেসে যেতে লাগল দক্ষিণের দিকে। সি এম খেলার উদ্বোধন করলেন। দু’দলের খেলোয়াড়রা তৈরি। সেন্টারে বল বসানো। রেফারি খেলা শুরুর বাঁশি বাজানোর জন্য নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে। এই সময় খোকা চাটুজ্যে আর রাম মিত্র এসে নানু বোসকে জিজ্ঞেস করল, ‘কাপটা কি এসে গেছে? কাকে আনতে পাঠিয়েছেন?’
নানু বোস মন্ত্রীর দিকে তাকালেন। মন্ত্রীমশাই বললেন, ‘প্রতিবার কে নিয়ে আসেন?’ খোকা চাটুজ্যে উত্তর দিল, ‘প্রতিবার তো বিজয়দা নিজে নিয়ে আসেন। এবার তো বিজয়দা অসুস্থ।'
মন্ত্রী বললেন, ‘কেউ একজন নিশ্চয়ই গেছে।'
রেফারির বাঁশি বেজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল খেলা। নানু বোসের দু’চোখ ছলছল করে উঠল। রুমালে চোখ মুছে নিয়ে বললেন, ‘বিভাসদা, কাপটা যদি খেলার শেষেও হাজির হয় তাতেও মান বাঁচে! সে সম্ভাবনা নেই। মাত্র নব্বই মিনিট সময় হাতে।
নব্বই মিনিট পর আর আমি কাউকে মুখ দেখাতে পারব না। দেশের মাথায় কলঙ্ক চাপবে। দেশের লোক আমাদের ক্ষমা করবে না।'
গোটা স্টেডিয়াম জুড়ে তখন চিৎকার, হাততালি আর টান টান উত্তেজনা। নানু বোস এরই মধ্যে মাঠ ছেড়ে বাইরে এলেন। মন্ত্রীমশাইয়ের ঘরের সামনে পুলিশ। এখানে-ওখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পুলিশরা রয়েছে। কেউ কেউ টিভিতে খেলা দেখছে। কারও হাতে বুঝি একটা ট্রানজিস্টার ছিল। ধারাভাষ্যকার বলছেন, ‘গোল্ডকাপটা প্রত্যেক বছরের মতো এ বছর মাঠে হাজির নেই। মনে হয় ওটা বিরতির পর মাঠে আনা হবে। খেলার ফলাফল এখনও গোলশূন্য।'
নানু বোস আবার মাঠে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে লাগলেন। কয়েক ধাপ নামার পর তাঁর হাতের মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। নানু বোস দাঁড়িয়ে পড়লেন। ফোনটা কানে দিয়ে বললেন, ‘কে?’
ওদিক থেকে সব্যসাচী রায় বললেন, ‘নানুবাবু, খেলা তো বেশ জমে উঠেছে।' নানু বোস প্রায় ধমক দেওয়ার মতো করে বললেন, ‘ধ্যাত, মশাই। আপনি বুঝতে পারছেন এই খেলা শেষ হওয়ার পর আমার অবস্থা কী হবে? আপনি এখন কোথায়?’ দেখছি
সব্যসাচী রায় বললেন, ‘গঙ্গার ওপর বসে টিভিতে খেলা ।'
নানু বোস বললেন, 'আপনি খেলা দেখছেন আর আমি মাঠ ছেড়ে এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করছি।'
সব্যসাচী রায় বললেন, ‘শুনেছেন তো আপনার পরম শুভার্থী বিজয় বর্মনের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। আমি তাকে নেচারোপ্যাথি করাচ্ছি। গঙ্গার হাওয়া গেলাচ্ছি। ঠিক আছে, পরে কথা হবে। ডোন্ট ওরি!
সব্যসাচী রায় ফোন রেখে দিলেন। নানু বোস এসে মন্ত্রীমশাই আর সি পি সাহেবকে কথাটা বললেন। সি পি সাহেব বললেন, ‘স্টিল আই হোপ, কাপটা মাঠে আসবে। এখন উদ্ধার করতে যতটুকু সময়।'
নানু বোস আবেগতাড়িত গলায় বললেন, ‘আপনি বলছেন কাপটা আসবে?’ মন্ত্রী বললেন, ‘আমারও বিশ্বাস, কাপটা আসবে।'
নানু বোস চোখ বুজে ঠাকুরকে মনে মনে ডাকলেন। চোখ খোলার পর থেকেই শুরু হল আবার উৎকণ্ঠিত প্রতীক্ষা। কখন আসবে? কাপটা নিয়ে সব্যসাচী কখন মাঠে ঢুকবেন?
প্রতীক্ষা করতে করতে হাফটাইম হল। খোকা চাটুজ্যের সঙ্গে এবার অবনী সাহাও এসে বললেন, ‘এই নানু, কাপটা আনতে কাকে পাঠিয়েছ? ওটা আসবে কখন?’
নানু বোস সি পি সাহেবের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলেন, ‘আসছে। এসে পড়বে।' অবনী সাহা বললেন, ‘আমার কিন্তু ভাল ঠেকছে না। প্রতিবার তো দুটোর মধ্যে কাপ মাঠে এসে যায়। অন্তত কলকাতায় যতবার ফাইনাল হয়েছে। এবার দেরি হচ্ছে কেন?’
নানু বোসের হয়ে ছোটাই বলল, ‘প্রতিবার তো বিজয়বাবু কাপ নিয়ে আসেন। এবারও ওঁরই আনার কথা। কিন্তু ওঁর তো হার্ট অ্যাটাক হল। আমরা জানতে পারলাম অনেক পরে। তারপর তো লোক পাঠানো হল।'
আবার খেলা শুরু হয়ে গেল। হাতে মাত্র পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময়। খেলাটা ড্র হলে একস্ট্রা টাইম। তাতে অবশ্য কিছুটা সময় পাওয়া যাবে। নানু বোস মনে মনে তাই চাইছিলেন। কিন্তু নানু বোস চাইলেই তো হবে না! হাফ টাইমের পর খেলা শুরু করে পনেরো মিনিটের মাথায় কোরিয়া গোল করল। চমৎকার গোল। কিন্তু নানু বোস, মন্ত্রী, পিল্লাই আর সি পি সাহেব গোলের চমৎকারিত্ব দেখলেন না। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের ঘড়ির দিকে চোখ রেখে মনে মনে ভাবলেন আর মাত্র তিরিশ মিনিট সময়। মাঠের মধ্যে তখন দু’দলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে। ঘড়ির কাঁটা ক্রমশ সরে যাচ্ছে। আরও দশ মিনিট সময় গেল। এখন মাত্র কুড়ি মিনিট সময় বাকি। স্টেডিয়ামের মাথার ওপরে একটা হেলিকপ্টার উড়ে এল। স্টেডিয়ামের ওপরে বার দুই চক্কর দিয়ে সেটা দমদমের এয়ারপোর্টের দিকে উড়ে চলে গেল। সি পি ঘড়ি দেখলেন। সঙ্গে সঙ্গে নানু বোসও। আর মাত্র পনেরো মিনিট সময় বাকি। কোরিয়া খেলাটাকে নিজেদের আয়ত্তে রেখেছে। গোল খাওয়ার সুযোগ কম। যদিও নানু বোস এক্সট্রা টাইমের জন্য খেলাটা ড্র হোক এটাই মনে মনে চাইছিলেন। সি পি সাহেবকে আস্তে করে বললেন, ‘আর মাত্র বারো মিনিট বাকি। এখনও...’
খেলা শেষ হওয়ার দশ মিনিট আগে নানু বোসের মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। নানু বোস ফোনে বললেন, ‘কে?’
ওদিক থেকে সব্যসাচী বললেন, ‘খালি খেলা দেখলেই হবে। চলে আসুন।' নানু বোস বললেন, ‘কোথায়?’
সব্যসাচী রায় বললেন, 'মন্ত্রীর ঘরের সামনে।'
নানু বোসের মধ্যে এবার অন্য ধরনের উত্তেজনা। তিনি মন্ত্রী আর সি পি-কে বললেন। ওঁরা তিনজন দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। ওঁদের সঙ্গে পিল্লাইও এলেন। নানু বোস দেখলেন, ছোটাইয়ের চেয়ারটা খালি। ছোটাই যে কখন উঠে গেছে সেটা কেউ টের পাননি। মন্ত্রীর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে সব্যসাচী রায় পাইপ টানছিলেন। ওঁদের দেখে একটু হাসলেন। তারপর নানু বোসকে বললেন, ‘সেই কখন থেকে বিজয়দা কাপটা নিয়ে অসুস্থ শরীরে বসে আছেন।'
এবার ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, ‘বিজয়দা অবশ্য আসতে চাননি। আমিই বললাম, ‘তাই কি কখনও হয় বিজয়বাবু! কলকাতার ফাইনাল খেলায় আপনিই বরাবর কাপটা নিয়ে যান। এবারও আপনাকে নিয়ে যেতে হবে।”
নানু বোস বললেন, ‘কাপটা কোথায়?’
সব্যসাচী রায় বিজয় বর্মনকে প্রশ্ন করলেন, ‘বিজয়দা, কাপটা কোথায়? এঁদের দেখান।' বিজয় বর্মন একটা বড় পলিথিনের ব্যাগ দেখালেন। সেটা টেবিলের পাশে রাখা। সেই ব্যাগের মধ্যে একটা বাক্স। ওই বাক্সটার মধ্যে গোল্ডকাপটা রাখা।
সি পি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আর দু’মিনিট বাকি। কাপ নিয়ে মাঠে চলুন।’ ওঁরা দরজা দিয়ে যাওয়ার সময় সব্যসাচী বললেন, 'আমি এই ঠান্ডা ঘরে থাকি। অসুস্থ বিজয়দাকে একা রেখে যাওয়া উচিত নয়।'
এই ধরনের একটা ঘটনা ঘটলে তারপর খুব স্বাভাবিকভাবেই সবাই জানতে চাইবে কেমন করে কাপটা উদ্ধার হল এবং বিজয় বর্মন কেনই বা কাপটা নিয়েছিলেন আর কেমন করেই বা রায় কোম্পানি থেকে কাপটা সরিয়েছিলেন। এইসব কথা জানবার জন্যই নানু বোস সেই রাত্রেই তাঁর বাড়িতে একটা পার্টি দিলেন। পার্টিতে লোক বেশি না। সব্যসাচী, ছোটাই, রামেশ্বর, মন্ত্রী, সি পি আর পিল্লাই।
সব্যসাচী পাইপটা ধরিয়ে বললেন, ‘বেচারা বিজয়বাবুকে বললে পারতেন।' নানু বোস বললেন, ‘আমি ইচ্ছে করেই বলিনি।'
সব্যসাচী বললেন, ‘আমি কিন্তু মাঠ থেকে বিজয়দাকে নিয়ে গিয়ে সত্যি সত্যি নার্সিংহোমে দিয়েছি। সেটা কোনও চিকিৎসার জন্য নয়। বাড়িতে গেলে বেচারি সুইসাইড করতে পারে ভেবে নার্সিংহোমে দিলাম। পাহারার ব্যবস্থাও করেছি।'
মন্ত্রী বললেন, ‘ব্যাপারটা কী হয়েছিল বলুন তো।'
সব্যসাচী রায় বললেন, ‘সেই পুরাতন ব্যাধি। যার নাম ঈর্ষা। খেলাধুলোর জগতে বিজয়দা অনেকদিন আছেন। নানুবাবুকে উনিই এনেছিলেন। কিন্তু সংগঠন দক্ষতায় নানুবাবু যখন অনেক ওপরে উঠে গেলেন আর এই গোল্ডকাপের ব্যাপারে যখন নানুদার নাম ভারত ছাড়িয়ে বিদেশেও চলে গেল তখন থেকেই বিজয়দা একটা ইগো, কমপ্লেক্স যাই বলুন তাতে ভুগতে লাগলেন। নিজের ছেলে বাপের কাছ থেকে আলাদা হয়ে ব্যাবসা শুরু করল। নানুদা সেই ছেলেকে সাহায্য করায় সে উন্নতি করতে লাগল।'
নানু বোস বললেন, ‘আমি সাহায্য করেছিলাম বিজয়দার ছেলে বলেই।'
সব্যসাচী বললেন, ‘সেটা বিজয়বাবুর পছন্দ ছিল না। বছর সাতেক আগে একটা তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে বিজয়বাবু নানুদার বিরুদ্ধে মামলা করেন।'
নানু বোস বললেন, ‘মামলার ব্যাপারটা বিভাসদা জানেন। সরকার আমার কাছ থেকে চারটে লঞ্চ কেনে। বিজয়দার কাছ থেকে দুটো। বিজয়দার লঞ্চ তৈরি করার কোনও কারখানা ছিল না। ওটা আমার। সরকারকে যে দুটো লঞ্চ বেচা হয়েছিল সেটা ডিফেকটিভ। উনি আমার কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করেন। কিন্তু যে দুটো আমাদের তৈরি সেই দুটো উনি অন্যদের বিক্রি করেছেন।'
সব্যসাচী রায় বললেন, ‘যাই হোক, এইসব ব্যাপার নিয়ে নানুদার ওপর একটা রাগ বিজয়দার ছিল। উনি গোল্ডকাপের চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য অনেক টাকা খরচ করেছেন, কিন্তু হতে পারেননি। তাই নানু বোসকে সারা ভারতের কাছে অপদস্থ করা, শুধু নানু বোস নয়, কমিটিতে নানুপন্থী সবাইকে হটিয়ে দেওয়ার জন্য কাপ লোপাট করার বুদ্ধিটা উনি নিয়েছিলেন। আমার প্রথমেই ধারণা হয়েছিল, এই কাপ কমিটির কোনও লোক ছাড়া আর কেউ সরাবে না। স্বাভাবিক ভাবেই আমাকে দেখতে হল রায় কোম্পানিতে কমিটির কোন কোন লোকের অবাধ যাতায়াত। সব ক’জন কমিটি মেম্বারের নাম-ঠিকানা তো নানুবাবুর কাছ থেকে সেইজন্যই নিয়েছিলাম। তারপরই মনে হয়েছিল, এতে রায় কোম্পানির কোনও লোকের ভূমিকা থাকলেও থাকতে পারে। শশধরবাবু সব কথাই ঠিক বলেছিলেন। কিন্তু ক্রস চেক করতে গিয়ে ধরা পড়ল কাপটি যেদিন খোয়া যায় সেদিন লোডশেডিংয়ের একটু আগে শশধরবাবুর ছোট ছেলে কৌশিক এসেছিল এবং লোডশেডিং থাকতে থাকতেই চলে যায়। শশধরবাবু এই কথাটা বলতে ভুলে গিয়েছিলেন। তাই তাঁর ছেলে কৌশিককে দেখতে আমি একটা ছুতো করে শশধরবাবুর বাড়িতে যাই। রাত্রে থাকি। কৌশিকের কাছে পরিচয় দিই আমি দিল্লির স্পোর্টস জার্নালিস্ট। কৌশিকের কথায় বুঝি ওর কাছে ভি আই পি ব্লকের চারটে টিকিট আছে। আপনারা যেখানে বসে খেলা দেখেন সেখানকার দুটো টিকিটও ও পাবে। আমার তখনই স্ট্রাইক করে। ভোরবেলা আমি মিথ্যে কথা বলে ওকে নিয়ে বাইরে আসি। ওকে আমার অফিসে নিয়ে এসে প্রথমেই জিজ্ঞেস করি, ‘টিকিটগুলো কে দিয়েছে? কাল রাত্রে তোমার টিকিটগুলো দেখেই বুঝেছি এগুলো জাল। আমি জার্নালিস্ট নই। পুলিশের লোক। তোমাকে লক আপে যেতে হবে।' আমি জানতাম, এই কথার পর কৌশিক ভয় পাবেই। সত্যি ভয় পেল। আমাকে বলল, ‘বিজয় বর্মন টিকিটগুলো বিনে পয়সায় দিয়েছে। তবে চারটে নয়, দশটা।' আমি বললাম, ‘কেন দিয়েছে?’ দু’-চারবার ভয় দেখাতেই বলে দিল, ‘আমাকে একটা কাজ করে দিতে হয়েছে।' আমি বললাম, ‘কী কাজ?’ কৌশিক বলল, ‘শুধু আধ ঘণ্টার জন্য কাপটা বাইরে এনে আমাকে দেবে। লোডশেডিং ছিল বলে সবার চোখ বাঁচিয়ে ব্যাগে করে কাপটা নিয়ে নীচে আসি। আমার বাবা তখন বাথরুমে।' নীচে এসে কৌশিক দেখে একটা মারুতি গাড়িতে ওর দাদা শৌভিক বসে।'
নানু বোস আঁতকে উঠে বলেন, ‘শৌভিক! ও তো আমার অফিসে কাজ করে। শশধরবাবুর অনুরোধেই চাকরি দিয়েছিলাম। কাজকর্মের দিক থেকে মোটেও ভাল না।'
সব্যসাচী বললেন, ‘জানি। বিজয়বাবু নিজের অফিসে শৌভিককে চাকরি করে দেওয়ার লোভ দেখিয়েছে। একই টোপ দিয়েছে কৌশিককেও। ওরা কিন্তু জানত কমিটির নির্দেশেই কাপটা গোপনে বাইরে আনতে হবে। কৌশিক কাপটা দেয় শৌভিককে। শৌভিক কাপটা পৌঁছে দেয় বিজয়বাবুকে। বিজয়বাবুর ইচ্ছে ছিল লঞ্চে করে কাপটা পৌঁছে দেবে হলদিয়াতে। তাই শৌভিক নানুবাবুর অফিস থেকে মেডিক্যাল লিভ নিয়ে হলদিয়া চলে যায় বাসে করে। বাড়ির লোক অবশ্য জানে অফিসের কাজেই গেছে। আমার জেরার মুখে কৌশিকের কাছ থেকে তথ্যগুলো জানার পরই আমি আপনাকে শৌভিক সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম। এর কিছুটা খবর যেমন কৌশিকের মুখ থেকে বের করি তেমনই বাকি খবরটার জন্য রামেশ্বরকে হলদিয়া পাঠাই। এ ব্যাপারে সি পি আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। বিজয়বাবু চেয়েছিলেন তাঁর যে লঞ্চটা হলদিয়া যাচ্ছে তাতে করে কাপটা হলদিয়াতে পাঠাবেন। উনি তো যাবেন না। ওঁকে তো মাঠে থাকতে হবে। কাপটা কার হেফাজতে যাবে? তখনই জনার্দন চক্রবর্তীর নামটা জানতে পারি। ওদিকে শৌভিক তখন হলঙ্গিয়া পুলিশের নজরবন্দি। জনার্দনকে বাড়ি থেকে ধরে তার মুখ থেকে খবর বার করে তাকে আমার অফিসে আটকে রাখি। তবুও বিজয় বর্মন বলে কথা! আরও একটু শিওর হওয়া দরকার। কাপ খোওয়া যাওয়ার পরও মন্ত্রী কাপের পালিশ দেখেছেন বলে খবরটা আমি এইজন্যই করতে বলেছিলাম যে যিনি কাপটা নিয়েছেন বা যার আছে কাপ আছে সে এই খবরে বিভ্রান্ত হবে। একমাত্র সে-ই রায় কোম্পানিতে ফোন করে কাপ সম্পর্কে জানতে চাইবে। আমি ছোটাইকে শশধরবাবুর প্যারালাল লাইনে বসালাম। আমার অনুমান মিলে গেল। সকাল পৌনে দশটায় কাপ সম্পর্কে খোঁজ নিতে প্রথম ফোন এল বিজয় বর্মনের। তিনি কাপটা দেখতে চাইলেন। ছোটাইকে আমার সব বলা ছিল। ছোটাইয়ের ইঙ্গিত পেয়ে শশধরবাবু বললেন, ‘আপনিই তো কাপটা প্রতিবার নিয়ে যান। তা আসুন না। এসে দেখে যান।'
‘ছোটাইয়ের টেলিফোন পেয়ে আমি নীচে অপেক্ষা করতে থাকি। বিজয়বাবু ওপরে যান। পেছন পেছন আমিও যাই। উনি কাপটা দেখতে চান। আমি তখন ওঁর পিঠে পিস্তলটা ঠেকিয়ে বলি, ‘আমার সঙ্গে আসুন। কাপটা আমি দেখাব।’ আর তো উপায় নেই। স্বীকার করতে হল। আমি বললাম, ‘কেউ জানবে না। আপনার কোনও বিপদ হবে না।’ কাপটা রাখা ছিল লঞ্চে। ওখান থেকে ফোন করে ওঁর স্ত্রী আর মেয়েকে লঞ্চে নিয়ে আসি। হার্ট অ্যাটাকের মিথ্যে খবরটা আমিই রটাই। এবার লঞ্চ থেকে কাপ নিয়ে স্টেডিয়ামে। এতক্ষণে ওঁর বউ আর মেয়ের বাড়ি চলে যাওয়ার কথা। একবার ফোন করবেন নাকি?
নানু বোস সব্যসাচী রায়কে জড়িয়ে ধরে বললেন, 'আপনার ফিসটা কত?’
সব্যসাচী রায় বললেন, ‘নানুবাবু, এই কাপটা উদ্ধার না হলে শুধু আপনার মাথা কাটা যেত না, আমাদেরও যেত। মাথা আর সম্মান দুটোই বেঁচেছে এর চেয়ে বড় ফিস আর কী হতে পারে! পুলিশ-গোয়েন্দারাও দেশকে সে। ভালবাসার কোনও দাম হয় না নানুদা।
সি পি বললেন, 'আমার মুখটা রেখেছেন। এবার বিষ্ণুমূর্তি চুরির কেসটা আমরা আপনাকেই দেব।'
সব্যসাচী চামচে দিয়ে স্যুপ তুলতে তুলতে বললেন; ‘পারব তো?’
সবাই সব্যসাচীর কথা শুনে হেসে উঠলেন। মন্ত্রী বললেন, ‘ভাল করে খেলাটাই দেখতে পারিনি। আজ সাড়ে দশটায় আবার দেখাবে। যেটা রেকর্ড করা আছে। নানুদা, টিভিটা খোলেন।'
.
আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী, ১৪০৩
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন