দুলেন্দ্র ভৌমিক

চোখের পাতায় রোদের তাপ এসে পড়তেই শরীরের সমস্ত অবসাদ ঠেলে দিয়ে চোখের পাতা দুটো আস্তে আস্তে খুলে এল রামের। এতক্ষণ চোখের পাতা দুটো যেন আটকে ছিল, রোদের তাপ সইতে না পেরে আস্তে আস্তে এখন এবার খুলে গেল। চোখ খুলেই সে অবাক হয়ে গেল। সম্পূর্ণ অচেনা একটা জায়গা তার সামনে। উঠে বসতে গিয়ে রাম টের পেল গোটা শরীর জুড়ে এখনও দগদগ করছে একটা জ্বালা, মাথার পেছনটা বেশ ভারী এবং টনটনে একটা ব্যথা। রাম আস্তে আস্তে উঠে বসল। এ কোথায় এসেছে সে? কেমন করে এসেছে? এই ভেজা বালির চরে কতক্ষণ ধরে চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল এবং কেন? রাম তার মাথাটা, যেটার মধ্যে একটা ব্যথা এখনও টনটন করছে, সেই মাথাটা আস্তে আস্তে ঘুরিয়ে চারপাশটা দেখতে দেখতে প্রথমে সে ভয়ানক অবাক হল, তারপর আস্তে আস্তে তার মধ্যে ডানা মেলতে লাগল একটা ভয়। তার সামনে মস্ত বড় একটা নদী, যার ওপার দেখা যায় না। অনেক চেষ্টা করে চোখের দৃষ্টি খুব প্রখর করে তাকালেও মনে হয় অনেক দূরে কালো স্লেটে জলন্যাকড়া বোলাবার পর যেমন দেখায় তেমনই একটা রং শুধু দেখা যাচ্ছে। ওটা জলের রং নাকি কোনও দেশ তা বোঝা যায় না।
রাম দেখল, নদীর এপারে জলের ধার ঘেঁষে উঁচু ডাঙার দিকে অনেকটা পর্যন্ত বালির চর। উঁচু ডাঙার ওপরে ঘন সবুজ জঙ্গল। রাম ভয়ে ভয়ে উঠে দাঁড়াল। সে টের পাচ্ছে শরীরের ক্লান্তি আর ভয় দুইয়ে মিলে তাকে অবশ করে ফেলছে। রাম অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থেকে চারপাশে তাকাল। সে এই মুহূর্তে মনে মনে একজন মানুষকে খুঁজছিল, অন্তত একজন মানুষ, যার কাছ থেকে সে জেনে নিতে পারে সে কোথায় এসেছে এবং কেমন করে ফিরে যাবে। রাম নরম বালির ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে পা ফেলে উঁচু ডাঙার দিকে কয়েক পা হাঁটল। এদিকে ছাড়া আর কোনওদিকেই বা সে হাঁটতে পারে। পিছনে তো মস্ত বড় নদী। নদীর বুকে একটা নৌকো অথবা ডিঙি পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। সামনের জঙ্গলটা কত বড় অথবা ওই জঙ্গলের মধ্যেই কোথাও মানুষের বাড়ি-ঘর আছে কি না সে-সম্পর্কে তার কোনও ধারণাই নেই।
রোদের তাপ দেখে রাম বুঝতে পারল এখন সকাল। বেলা বেশি বাড়েনি। সময় বোঝবার জন্য ওর ঘড়ির দরকার হয় না। ওদের বাড়িতে কোনও ঘড়ি কোনও কালেও ছিল না। ওর মা আকাশের দিকে তাকিয়ে সময়ের হদিশ পেয়ে যান। মা-র কথাটা মনে আসতেই রামের বুকের মধ্যে অন্য ধরনের কষ্ট হতে লাগল। এতক্ষণ সে শরীরের নানা জায়গায় যন্ত্রণা টের পাচ্ছিল, সেইসব যন্ত্রণার সঙ্গে এই কষ্টের কোনও মিল নেই। রামের চোখ জ্বালা করতে লাগল। সে কয়েক মুহূর্তের জন্য দাঁড়িয়ে পড়ে নিজেকে সামলাল। তারপর চোখ খুলে সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল, সবুজ জঙ্গলের মাথার ওপর দিয়ে একঝাঁক টিয়া উড়ে যাচ্ছে। নদীর বুক থেকে উঠে আসা হাওয়ায় সবুজ বনের মাথায় মাথায়, পাতায় পাতায় যেন ঠোকাঠুকি লাগছে। রাম আরও কিছুটা হেঁটে এসে উঁচু পাড়ের কাছে দাঁড়াল। তার মনে হল বর্ষায় অথবা বন্যায় নদীটা এই পর্যন্ত নির্ঘাত এসে পাড় ভাঙে। তা না হলে এই জায়গাটা এমন এবড়ো খেবড়ো থাকত না। হয়তো জঙ্গলটা আরও এগিয়ে ছিল। নদীর ছোবল খেতে খেতে ক্রমশ পিছু হটছে। তাদের গ্রামের পাশ দিয়েও একটা নদী বয়ে গেছে। প্রতি বর্ষায় সেও তাদের গ্রামের সীমানায় ছোবল মেরে মেরে এগিয়ে আসে। নদীর ধারে যাদের বাস তারা একটু একটু করে পিছোয়। এক সময় এমন হয়, যে নিজের ভিটেটুকু যায় নদীর পেটে, তখন ভিটে ছেড়ে ভিখারি হয়ে লোকের দোরে দোরে ঘুরে আশ্রয় ভিক্ষে করতে হয়। হোগলাপাতা দিয়ে বনবিবির মাঠের পাশে যেমন তেমন একটা আশ্রয় বানাতে পারলেই যেন নিশ্চিন্তি। সেও বড় কঠিন আশ্রয়। ওদিকে ছিল প্রতি বর্ষায় নদীর ছোবল আর এদিকে ফি-হপ্তায় দত্তবাবুদের ছোবল। বনবিবি-মাঠের চারদিকে চারজন মালিক। হোগলা ঘরের জন্য ফি-হপ্তায় টাকা দিতে হয় নয়তো বাবুদের বাড়িতে বেগার খাটা। টাকায় না পারো গায়ে খেটে শোধ করো।
শরীরের যন্ত্রণার সঙ্গে সঙ্গে তার সবকিছু আস্তে আস্তে মনে পড়ে যেতে থাকে। বনবিবির মাঠের ওপর দিয়ে বাঘের তাড়া খাওয়া হরিণছানার মতো সে দৌড়ে ছিল হাটের দিকে। কিন্তু মাঠ পেরোবার আগেই উলটো দিক থেকে আচমকা ছুটে এসেছিল আর একটা দল। তারপর...
একটা শব্দে চমকে উঠে রাম পেছন দিকে তাকাল। নরম বালির ওপর তার পায়ের ছাপগুলো তখনও জেগে আছে। শব্দটা এসেছে ওদিক থেকেই। রাম এদিক ওদিক তাকাতেই দেখতে পেল ঠিক জলের ধার ঘেঁষে কী যেন একটা পড়ে আছে। দূর থেকে ভাল বোঝা যাচ্ছে না জিনিসটাকে। জিনিসটার কিছু অংশ জলে, কিছুটা জলের বাইরে। জলের ধাক্কা লেগে জিনিসটা দুলছে। তারই ওপর লম্বা ঠোঁটওলা ছাই ছাই রঙের একটা বড়সড় পাখি বসে আছে। খানিক বিরতি দিয়ে খক খক্ক করে ডেকে উঠছে। এমন পাখি আর এরকম পাখির ডাক রাম আগে কখনও দেখেওনি, শোনেওনি। ভয় ধরিয়ে দেওয়ার মতো চেহারা এবং গলার আওয়াজ।
রাম কয়েক পা এগিয়ে এসে জিনিসটাকে ভাল করে দেখবার চেষ্টা করল। ওই বিচ্ছিরি চেহারার পাখিটার জন্য বেশি দূর এগোতে সাহস পেল না। খানিকটা দূর থেকে দেখে মনে হল কলাগাছের ভেলা। বেশ মজবুত করে তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এটা এখানে কে তৈরি করবে? গ্রামে বন্যার সময় ভেলায় করে এদিক ওদিক যেতে হয়। কিন্তু এত বড় নদী, মনে হয় বেশ গভীর, সেটা কি কেউ ভেলা করে পার হতে পারে নাকি?
নদীর কাছে এসে পড়ায় রাম টের পেল নদীতে এখন ভাটা। সে চোখ খুলে নদীকে যেখানে দেখেছিল মনে হচ্ছে তার থেকে একটু একটু করে সরে যাচ্ছে। নদীর কাছাকাছি যেতেই বিদঘুটে পাখিটা লাল চোখ তুলে রামকে একবার দেখে নিয়ে খক খক্ক আওয়াজ তুলে জঙ্গলের দিকে উড়ে গেল। আবার নদীর ধার থেকে জঙ্গলের কাছে এসে পড়ল রাম। সে যে এখন কী করবে, কোথায় যাবে, কোথায় গেলে মানুষের দেখা মিলবে এসব প্রশ্নের কোনও সমাধান খুঁজে পাচ্ছিল না। উঁচু পাড়ের ওপর উঠতে উঠতে তার মনে হল, নদীতে অথবা এমন নির্জন নদীর পাড়ে মানুষের দেখা মেলা ভার। তার চাইতে জঙ্গলের মধ্যে গেলে কোনও বসতি অথবা কাঠুরিয়ার সন্ধান হয়তো পাওয়া যাবে। যেহেতু এদিকে নদী, এদিকে বসতির সম্ভাবনা নেই, হয়তো জঙ্গলের ওপারে মানুষের বাস আছে এমনটা ভেবে রাম জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে লাগল। তাদের গ্রামের পশ্চিম দিকেও এমনই একটা বড়সড় জঙ্গল আছে। সেই জঙ্গল পেরোলেই মহেশপুরের খাল আর খালের ওপারেই মহেশপুর। ওই জঙ্গলে সকালে-দুপুরে অনেকে কাঠ কাটতে যায়। কেউ কেউ যায় পাতা কুড়োতে। রাম কয়েকবার সেই জঙ্গলে গিয়েছিল, কিন্তু সেখানে মানুষের পায়ে-চলা একটা পথ ছিল। এই জঙ্গলে তেমন কিছু নেই। নদীর পাড় থেকে যেমনটা মনে হয়েছিল খানিকটা ভেতরে আসার পর মনে হচ্ছে জঙ্গলটা ক্রমশ গভীর হচ্ছে। দিনের আলো ক্রমশ কমে আসছে। ওপরে তাকালে আকাশটাকে ভাল ভাবে দেখা যায় না। গাছের ডালে আর পাতায় দৃষ্টি আটকে যায়।
জঙ্গলের মধ্যে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে রাম ভাবল আবার নদীর দিকেই ফিরে যাবে কি না। যদি কখনও কোনও নৌকো বা ডিঙির দেখা পায়। এই অচেনা জঙ্গলে দিন ফুরোনোর অনেক আগেই অন্ধকার নামবে। তখন অন্ধকারে পথ চিনে চলা খুব কঠিন। রাম ভাববার জন্য দাঁড়িয়ে পড়েছিল। মাত্র কয়েক মুহূর্ত সে দাঁড়িয়ে ছিল, হয়তো আরও একটু দাঁড়াত, কিন্তু তার আগেই তার কানের পাশে লতা-পাতা আর হাওয়ার কম্পনের মধ্যে সে হিস হিস একটা শব্দ শুনে ঘুরে দাঁড়াল। সে দেখল তার আধ হাত দূরে একটা গাছের ডাল থেকে মুখ বাড়িয়ে দিয়ে নেমে আসছে মোটাসোটা দেখতে একটা ভয়ংকর চেহারার সাপ। দূরত্বটা এমনই যে গাছের ডাল থেকে গলাটা একটু বাড়ালেই সাপটা রামের মাথাটা অনায়াসে পেয়ে যাবে। ঘাড় ঘুরিয়ে দৃশ্যটা দেখার সঙ্গে সঙ্গে রাম এক লাফে যেই খানিকটা সামনের দিকে সরে গেল ঠিক তখনই গাছের ডাল থেকে একই রকম তৎপরতার সঙ্গে সাপটাও প্রায় লাফ দিয়ে নীচে পড়ল। এখন দূরত্ব মাত্র হাত তিনেকের। ভাববার সময় ছিল না। রাম দৌড়তে আরম্ভ করল। শরীরের যে ক্লান্তি তাকে হাঁটবার মতো যথেষ্ট শক্তি দিচ্ছিল না এখন মৃত্যুভয় তাকে এমন মরিয়া করে তুলল যে, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সে ছুটতে আরম্ভ করল। ছুটতে ছুটতে যখনই তার মনে হচ্ছিল পেছনে পাতার ওপর দিয়ে কারও আসার শব্দ শোনা যাচ্ছে তখনই সে আরও জোরে ছুটতে লাগল। ছুটতে ছুটতে এক সময় তার মনে হল নিশ্বাস ফুরিয়ে আসছে। বুকের ভেতরটা বুঝি চৌচির হয়ে এখনই ফেটে যাবে। সোজা কোনও রাস্তা অথবা মাঠ হলে ছোটাটা সহজ হয়। এই জঙ্গলে সেই কাজটা মোটেও সহজ নয়। গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে, লতায় পা জড়িয়ে মাঝে-মধ্যেই তার বিপদ বেড়ে যাচ্ছিল, শক্তিক্ষয় হচ্ছিল। যেহেতু পেছনে মৃত্যু, তাই সে থামতে পারেনি। ছুটতে ছুটতে যখন সত্যিই তার মনে হল তার বুকটা ফেটে যাচ্ছে ঠিক তখনই সে আছড়ে পড়ল বুনো লতার একটা ঝোপের ওপর। সেখান থেকে ওঠবার চেষ্টা সে করেছিল, কেননা, পড়ে যাবার মুহূর্তেও ওই ভয়ংকর সাপের হিস হিস শব্দটা তার কানে বাজছিল। কিন্তু উঠতে পারল না। মাথা তোলবার আগেই কে যেন তাকে আটকে দিল। জ্ঞান হারাবার আগে সে শুধু দেখতে পেল ওই সাপটার মতোই ভয়ংকর চেহারার একজন লোক তার লোমশ হাতের বিশাল থাবা দিয়ে তার মুখটা বন্ধ করে দিল। মুখ থেকে চিৎকার তো দূরের কথা একটা শব্দও আর বেরোতে পারল না। থাবাটা এমনই, যেন এই মুহূর্তে সে রামের গোটা মুখটাকেই মুড়মুড় করে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে।
এর পরেই রামের দেহ শিথিল হয়ে আসে। সে জ্ঞান হারায়।
ঠিক কতক্ষণ সেটা মনে নেই। হতে পারে কয়েক ঘণ্টা অথবা কয়েকটা দিন। রাম আস্তে আস্তে জ্ঞান ফিরে পেল। চোখ মেলে তাকাবার আগের মুহূর্তগুলো বড় মধুর। ভয়-ভাবনাহীন একটা জগতে সে যেন ঘুরে বেড়াচ্ছিল। নদীর নীল জলে ছোট ছোট ডানা মেলে খেলে বেড়াচ্ছে সোনালি মাছের দল। নদীর পাড় থেকে মাথা নামিয়ে দিয়েছে কদমগাছের সার। যেন সারবদ্ধ গাছেরা চুমুক দিয়ে নদীর বুক থেকে জল খেতে চাইছে। আরশিতে যেমন মুখের ছায়া পড়ে, তেমনই নীল জলে ছায়া পড়েছে গাছেদের। দূরে সাদা কাশবনের মাথায় দোল দিয়ে বয়ে যাচ্ছে হাওয়া। এইমাত্র একঝাঁক শালিখ দল বেঁধে উড়ে এসে নামল ধানের খেতে। মাটি থেকে খুঁটে খুঁটে খেতে লাগল খাবার। মাঠের ওপারে ঘন সবুজ রঙের পাহাড়ের মাথায় শেষবেলার আলো— আলোর রং যেন পাকা বাতাবি লেবুর মতো। সেই আলো মেখে সবুজ পাহাড়টাকে দূর থেকে এমন দেখাচ্ছে ঠিক যেন বনদুর্গার মাথার মুকুট।
রাম নিজের মনে নদীর পাড় দিয়ে ছুটতে ছুটতে পাহাড়টার কাছে পৌঁছে গেল। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে কত রকমের কোঠাবাড়ি। সবক'টা বাড়ি থেকে ভরসন্ধ্যায় ভেসে আসছে গরম ভাতের গন্ধ। বাতাসের স্পর্শ যেন মায়ের আঁচলের হাওয়ার মতো। মায়ের মুখে যে দেশের গল্প শুনেছিল এটা কি তা হলে সেই দেশ? যে দেশে কারও ভাতের কষ্ট নেই, কারও ঘরের অভাব নেই। যেখানে বন্যায় আশ্রয় ভেসে যায় না, খরায় খাবার জল আনতে এক ক্রোশ দূরে যেতে হয় না, যেখানে সবাই সবাইকে ভালবাসে। ছোট জাত বলে কেউ কাউকে দূর দূর ছাই ছাই করে না। যে দেশের রাজা পাহাড়ের গুহা থেকে বেরিয়ে এসে বটগাছের তলায় আসনপিড়ি হয়ে বসে সবার সঙ্গে একই রকম খাবার খায়। যে দেশের রাজকন্যা রোজ বিকেলে মাঠ থেকে অন্যদের মতো খেতের কাজ সেরে এসে গেরিমাটি দিয়ে গা মেজে নদীতে সাধারণ ঘরের মেয়েদের সঙ্গে সাঁতার কেটে কেটে স্নান করে। তারপর সন্ধেবেলা ঘরে লম্ফ জ্বালিয়ে বসে মা-র সঙ্গে কচুপাতার অম্বল আর গুগলির ঝোল রাঁধতে বসে। পাহাড়ের মাথা থেকে চাঁদের আলো এসে তার চিবুকে লাগে। মাথার খোঁপায় জোনাকি বসে জ্বলতে থাকে। নাকের নাকছাবিতে লম্ফর আলো লেগে হিরের মতো চকচক করে ওঠে।
রাম মনে মনে ভাবে নির্ঘাত এটা সেই দেশ। যে দেশের রাজা নিজের জন্য এক মুষ্টি রেখে নয় মুষ্টি বিলিয়ে দেন অন্যদের। যে দেশের রানিকে তার পোষা ময়নাগুলো এসে খবর দেয়, ‘রানিমা, উড়ে উড়ে দেখে এলাম, রাজ্যে কেউ আর অভুক্ত নেই।' এই খবর পেয়ে রানিমা খেতে বসেন পাথরের থালায়। গল্পে শোনা এই দেশটাকে কতদিন দেখবার ইচ্ছে ছিল রামের। ভাবতে অবাক লাগে আজ সেই দেশে এসে পৌঁছে গেছে। এখানে কোনও মানুষের অনাদর নেই। এখানে বৃক্ষ, লতা, নদী, বনের পাখি, মাঠের শস্য এবং দূরের ওই সবুজ পাহাড় সবাইয়ের জন্যই রয়েছে ভালবাসা। গ্রামের সবচেয়ে বুড়ো যে মানুষটা, যাকে সবাই বলে গ্রামের মাথা, যাকে রাজাও ভক্তি করে সে আসলে এই গ্রামের বুড়ো কারিগর। এখন শরীরে জোর নেই বলে দোকানের বারান্দায় বসে শালপাতার ঠোঙা বানায়। সে বলে, এই যে নদী, বৃক্ষ, লতা, পাহাড়, রোদ, বৃষ্টি, চাঁদের আলো আর বাতাস এরা কেউ ফ্যালনা নয়। সবাই রয়েছে মানুষের জন্য আর মানুষ রয়েছে সবার জন্য। এখানে টাকার চাইতে প্রাণ আর হিরে-মুক্তোর চাইতে ভালবাসার দাম বেশি।
বুড়োটার কত বয়স বোঝা যায় না। মা শুধু গল্পটাই বলেছিলেন, বুড়ো লোকটার বয়স বলেননি। তিন কুড়ি নাকি পাঁচ কুড়ি বয়স হবে লোকটার। গোটা গালে সাদা মেঘের মতো সাদা দাড়ি। মাথার চুলও বিলকুল তাই। রামকে দেখে বুড়োটা হাসল। শালপাতার ঠোঙা বানাতে বানাতে বলল, 'তুমি তো বাপু এ-রাজ্যের লোক নও। তোমার চোখে-মুখে অনাহার আর অনাদরের ছাপ। এমন মুখ এ-রাজ্যে নেই। তুমি কোত্থেকে এসেছ?’
রাম উত্তর দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই সব মুছে গেল। ঠকঠক শব্দে সে চোখ মেলে তাকাল। প্রথমে চোখের ভেতর থেকে স্বপ্নটা উধাও হয়ে গেল, তারপর আস্তে আস্তে চোখ খুলে দেখল তার মুখের কাছে ঝুঁকে আছে আর একটা মুখ। মুখটা এত কাছে যে, তাকাতে কষ্ট হয়। একবার তাকিয়েই সে চোখ বন্ধ করে রাখল। তার মনে হল কেউ তার কপালে হাত রেখেছে। বোধহয় সেই লোকটা যে তার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়েছিল। ঘুম ভেঙে গেলে অথবা জ্ঞান ফিরে এলে বোধহয় বেশিক্ষণ চোখ বন্ধ করে রাখা যায় না। রামও বেশিক্ষণ চোখ বন্ধ করে রাখতে পারল না। এবার দেখল সেই লোকটা গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকেই দেখছে। চোখে চোখ পড়তেই লোকটা হাসল।
রামের কাছে এই জায়গাটাও অচেনা। সে কেমন করে, কীভাবে এখানে এসে পড়ল সেটা বুঝে উঠতে পারল না। মনে মনে বার দুই চেষ্টা করে বুঝল তার কিছুই ঠিব-ঠাক মনে পড়ছে না। সে উঠে বসতে যাচ্ছিল। লোকটা হাতের ইশারায় তাকে উঠতে নিষেধ করল। লোকটার চেহারা, আকৃতি, হাত তুলে নিষেধ করার ভঙ্গিটা এমনই যে, রাম তৎক্ষণাৎ আবার শুয়ে পড়ল।
লোকটা তার মাথার কাছে এসে বলল, ‘শুয়ে থাকো। তোমার সারা গায়ে আঘাত। আমি না বললে উঠবে না।
রামের একবার মনে হল জিজ্ঞেস করে, 'তুমি কে?’
কিন্তু তার সাহসে কুলোল না। সে আবার চোখ বুজল। খানিক বাদে চোখ খুলে দেখল তার সামনে কেউ নেই। সেই লোকটা বোধহয় অন্য কোথাও গেছে। শরীরের কষ্ট উপেক্ষা করে রাম বিছানার ওপর উঠে বসে দরজার দিকে তাকাল এবং তাকিয়েই ভেতরে ভেতরে চমকে উঠল। এই ঘর থেকে বাইরে যাবার একটিমাত্র দরজা আর সেই দরজার সামনে বিশাল চেহারার একটা মানুষ দাঁড়িয়ে স্থির চোখে তাকেই দেখছে। লোকটার তাকানোটা এমনই যে, ওতেই যেন বুকের রক্ত হিম হয়ে আসে। রাম উঠে বসায় লোকটা কিছু বলল না। শুধু দেখতে লাগল। রাম দেখল জমি মাপবার জন্য সদর থেকে লোকেরা যখন গ্রামে আসে তখন ত্রিপল দিয়ে যেমন ঘর বানায় এই ঘরটার চেহারা খানিকটা তাই। ঘরে কোনও জানালা নেই। শুধু অনেক ওপরে দুটো গোল গোল ফুটো৷ সেই ফুটো দিয়ে এখন অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না।
রাম নিজের বিছানার দিকে তাকাল। দড়ির খাটিয়ার ওপর নরম কিছু পেতে বিছানা করা হয়েছে। এরকম নরম বিছানায় সে আগে কখনও শোয়নি। বাড়িতে ঘরের মধ্যে একটা বাঁশের মাচা আছে। তার ওপর বস্তা পেতে রাম শোয়। আগে বাবা আর রাম দু’জনে শুত। মা চাটাই পেতে মাটিতে। বাবা মারা যাওয়ার পর রাম প্রথম প্রথম মেঝেতে চাটাইয়ের ওপর মা’র সঙ্গে শুত। কিছুদিন হল সে একা একা ওপরে মাচায় শুচ্ছে। রাম লক্ষ করল ঘরের মধ্যে নানা মাপের কাঠের বাক্স সাজানো রয়েছে। একটা খুঁটির সঙ্গে বড় সাইজের একটা হ্যারিকেন ঝোলানো। অন্য আর একটা খুঁটির গায়ে দুটো বন্দুক। একটা কাঠের বাক্সের ওপর জলের কুঁজো, কুঁজোর মুখটা একটা এনামেলের গ্লাস উলটো করে রেখে ঢাকা দেওয়া। এগুলো ছাড়া আর তেমন কিছু ঘরের মধ্যে নেই।
রাম বুঝে উঠতে পারছিল না সে ঠিক কোন জায়গায় এসেছে। এ জায়গাটা জঙ্গলের ভিতরে না বাইরে সেটুকুও বোঝা যাচ্ছে না। নদীর পাড়ে বালির ওপর সে পড়ে ছিল এবং আশ্রয়ের জন্যে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একসময় একটা ভয়ানক সাপ তাকে তাড়া করে। সে দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে থাকে। তারপর যে কী ঘটেছিল সেটা তার মনে পড়ল না। সে কি ছুটতে ছুটতে এখানে এসে অজ্ঞান হয়ে গেছে, নাকি কেউ তাকে ধরে এনেছে।
হঠাৎ দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনে রাম তাকাল। সে দেখল, যে লোকটা দরজায় দাঁড়িয়ে স্থির চোখে তাকে দেখছিল, সেই লোকটাই দরজার বাইরে গিয়ে বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিচ্ছে। লোকটার মতলবটা রাম বুঝতে পারল না। গালে সাদা-পাকা দাড়িওলা যে লোকটাকে চোখ খুলেই রাম দেখতে পেয়েছিল, যে তাকে হাতের ইশারায় উঠতে নিষেধ করেছিল এবং বলেছিল, ‘তোমার সারা গায়ে আঘাত। আমি না বললে উঠবে না,’— সেই লোকটা কোথায় চলে গেল? এখানে এরকম কতজন লোক আছে এবং তাকে কি জঙ্গল থেকে তারা ধরে এনেছে? রামকে ধরে এনে তাদের কী লাভ?
দড়ির খাটিয়া থেকে পা নামিয়ে রাম ঘরের মধ্যে দাঁড়াল। শরীরের নানা জায়গা থেকে যন্ত্রণা টের পাওয়া যাচ্ছে। গলাটা শুকিয়ে এসেছে। কুঁজো থেকে জল গড়িয়ে খাবার জন্যে পা বাড়াতেই দরজা খোলার শব্দ শোনা গেল। রাম ফিরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল। এখানকার লোকগুলোর মতিগতি বোঝা যাচ্ছে না। এখনই ওদের কথার অবাধ্য হওয়ার দরকার নেই। জঙ্গলের চাইতে এই আশ্রয়টা অনেক ভাল। এখানে শোবার জন্য নরম বিছানা আছে, খাবার জল আছে, হয়তো খাবার ব্যবস্থাও আছে। সবচেয়ে বড় কথা, দেখতে ভাল হোক, খারাপ হোক জনা-দুই মানুষ তো আছে। এখানে আচমকা কোনও ভয়ংকর সাপ তাকে পিছু তাড়া করবে না।
হঠাৎ করে রামের মনে হল এরা সেই লোক নয় তো যারা ঠাকুরের সামনে মানুষকে বলি দেয়। মা-র কাছে তেমন গল্পও রামের শোনা আছে। গাঁয়ের হিরুকাকা একবার বনবিবির মাঠে বসে চাঁদনি রাতে সেইসব লোকের গল্প বলেছিল। কাপালিতলার জঙ্গলে নাকি আগে এমনধারা লোকেরা থাকত। মাথায় মস্ত জটা, গলায় ঝুলত মোটা মোটা মালা। পরনের কাপড় থাকত টকটকে লাল রঙের। কপালে লাল ফোঁটা। হাতে খাঁড়া নিয়ে খড়ম পায়ে দিয়ে জঙ্গলের মধ্যে ঘুরে বেড়াত। কাউকে পেলে আর রক্ষে নেই। তাকে স্নান-টান করিয়ে তার গলাটা গুঁজে দিত হাড়িকাঠে। তারপর হাতের খাঁড়া ওপরে তুলে এক হুংকার দিয়ে নামিয়ে আনত নীচে। ব্যস, মুণ্ডু আর শরীর আলাদা হয়ে যেত। দত্তদের ঠাকুরদালানে যেমনভাবে পাঁঠা বলি দেয় ঠিক সেইভাবেই নাকি মানুষ বলি দিত ওরা।
কথাটা মনে আসতেই তার মধ্যে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসার মতো শরীর কাঁপিয়ে ভয় বাড়তে লাগল।
দরজা খুলে প্রথমে সেই দাড়িওলা লোকটা এল। চোখ খুলে এই ঘরে যাকে প্রথম দেখেছিল রাম। রাম ভালভাবে লক্ষ করে দেখল লোকটার দাড়ি আছে বটে কিন্তু মাথায় কোনও জটা নেই। পরনে লাল কাপড়ও নেই। একেবারে বাবুদের মতো প্যান্ট আর শার্ট পরা। চোখে আবার চশমা। হিরুকাকার মুখে যে ক’জন কাপালিকের গল্প শুনেছে তাতে কোনও কাপালিকের চোখে চশমার কথা শোনেনি। দাড়িওলা লোকটার পিছনে পিছনে এল সেই লোকটা, যে এতক্ষণ স্থির চোখে তাকে পাহারা দিচ্ছিল বা দেখে যাচ্ছিল। আশ্চর্য, সেই লোকটার মুখটা চ্যাপটা, নাকটা চাপা, গায়ের রং তামাটে, শরীরটা বেশ পালোয়ানের মতো হলেও তার মাথাতেও কোনও জটা নেই, পরনে নেই 'লাল কাপড়, কপালে নেই সিঁদুরের ফোঁটা। তবে এরা কারা?
ওরা দু'জনেই রামের কাছে এগিয়ে এল। মুখচ্যাপটা লোকটাকে ইশারা করতেই সে একটা কাচের বাটি রামের দিকে এগিয়ে দিল। দাড়িওলা লোকটা বলল, ‘চুমুক দিয়ে খেয়ে নাও।'
অবাধ্য হওয়ার সাহস ছিল না। সে বাটিটা মুখের কাছে নিয়ে চুমুক দিল। ভাতের ফ্যানের মতো একটা জিনিস, একটু গরম আর নোনতা। প্রথম চুমুক দেওয়ার পর সে টের পেল তার খুব খিদে পেয়েছিল। জিনিসটা খেতে যে খুব স্বাদের তা নয়, ভাতের ফ্যানের চাইতে বেশি স্বাদের নয়। জিনিসটা খেতে খেতে সে ভাবল, এরাও বোধহয় তার মায়ের মতো ভাতের ফ্যানটা ফেলে দেয় না। ওটা খেয়েও একবেলার খিদে মেটে। ফ্যান যখন আছে, ভাতও নির্ঘাত পাওয়া যাবে। তার বড্ড ভাত খেতে ইচ্ছে করছিল। গোটাতিনেক চুমুক দিয়ে বাটিটা সে শেষ করে চ্যাপটামুখো লোকটির হাতে ফিরিয়ে দিয়ে ভাবল, হয়তো খাইয়ে-দাইয়ে পরে কোনওএক সময় তাকে হাড়িকাঠে ফেলে বলি দেওয়া হবে। হিরুকাকা বলেছিল বটে, বলি দেওয়া হয় প্রতি অমাবস্যায়। হয়তো অমাবস্যা পর্যন্ত তাকে বাঁচিয়ে রাখা হবে। সময় এলেই লাল কাপড়, জটা, মালা, সিঁদুরের ফোঁটা এসব দেখা যাবে, আর দেখা যাবে বলি দেওয়ার খাঁড়াটাকে।
বাটিটা ফেরত নিয়ে লোকটা দরজার দিকে সরে গেল। দাড়িওলা লোকটা বলল, ‘তোমার গায়ে জ্বর আছে। রাত্রে তোমাকে রুটি খেতে দেওয়া হবে। ইনজেকশন দেওয়া আছে। এবার ওষুধ খেতে হবে।'
কথা শেষ করেই লোকটা দরজায় দাঁড়ানো চ্যাপটামুখো লোকটাকে দেখিয়ে বলল, ‘ওর নাম তামাং। কিছু দরকার হলে ওকে বলবে। ঘর থেকে বাইরে যাবার চেষ্টা কোরো না, তাতে তোমার বিপদ হবে। আর বিনা দরকারে তামাং-এর সঙ্গে কথা বলবে না।
কথা বলে লোকটা দরজা পেরিয়ে চলে গেল। দরজা বন্ধ করে তামাং বোধহয় লোকটার পেছন পেছন গেল। একটু পরেই ফিরে এসে বসল দরজার সামনে একটা কাঠের বাক্সের ওপর। দরজাটা এবার ভেতর থেকে বন্ধ করা। তামাং বসবার আগে খুঁটিতে ঝোলানো দুটো বন্দুকের মধ্যে থেকে একটা বন্দুক নামিয়ে নিয়ে দরজার পাশে, একেবারে তার হাতের নাগালের মধ্যে রাখল।
রাম ভেবে পাচ্ছে না তার মতন ষোলো বছরের একটা ছেলেকে ওই পালোয়ান চেহারার লোকটা পাহারা দেওয়ার জন্য বন্দুক নিচ্ছে কেন? তামাং যদি গায়ের জোরে একটা চড় কষায় তা হলেই তো রাম মাথা ঘুরে দশ হাত দূরে ছিটকে পড়বে। অমাবস্যা এলে বলিই যদি দেবে তবে এখন আর নাকের ডগায় বন্দুক নাচাচ্ছে কেন? রাম ঠিক জানে না, যারা বলি দেয় তাদের কাছে বন্দুক থাকে কি না।
তামাং নামের লোকটা পাথরের মতো স্থির বসে। আগে যেমন শুধু তার দিকেই তাকিয়েছিল এখন অবশ্য তেমন নয়। এখন সে অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। বাইরে থেকে নাম-না-জানা পাখির ডাক বারদুয়েক শুনতে পেয়েছে এর আগে। এবার বাইরে থেকে খরখর খরখর করে একটা শব্দ উঠল। যেন শব্দটা হামাগুড়ি দিয়ে তাদের দরজার দিকে এগোচ্ছে। রাম দেখল তামাং ঝুপ করে হাত বাড়িয়ে বন্দুকটা তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখ দরজার ওপর। মিনিটখানেক দাঁড়িয়ে থেকে তামাং সরে এল সেই খুঁটিটার কাছে, যার সঙ্গে একটা বড় সাইজের হ্যারিকেন ঝোলানো ছিল। তামাং এসে তার আলোটা বাড়িয়ে দিয়ে আবার গিয়ে বন্দুক হাতে দরজার সামনে দাঁড়াল।
শব্দটা থেমে গিয়েছিল। আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে নিশ্চিন্ত হবার পর তামাং বসল। বসার পরে পরেই গোটা ঘরটা কাঁপতে লাগল। খুঁটির গায়ে ঝোলানো হ্যারিকেনটা পর্যন্ত দুলে উঠল। বোশেখ মাসে ঝড় এলে তাদের দরমা দেওয়া ঘরগুলো যেমন কাঁপতে থাকে এও ঠিক তেমনই কাপন। ভয় পেয়ে রাম বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল। সে দেখল তামাং দরজার গায়ে পিঠ লাগিয়ে বন্দুকটা উঁচুতে তুলে মুখে অদ্ভুত রকমের একটা শব্দ করে যাচ্ছে। ঘরের বাইরে থেকে টিন বাজানোর শব্দ শোনা যেতে লাগল।
বিষম ভয় পেয়ে রাম কাঁপতে কাঁপতে মেঝের ওপর বসে পড়ল।
একদিন, দু’দিন অথবা তিনদিন, ঠিক কতদিন পরে রাম ঘরের বাইরে এল সেটা সে বুঝতে পারল না। নিজের ইচ্ছায় তামাং নামক লোকটার পাহারাকে ফাঁকি দিয়ে বাইরে আসার সাধ্য তার ছিল না। এখানে আসার পর অথবা তাকে আনার পর থেকে নিজের ইচ্ছায় সে কিছুই করেনি। তাকে যখন খেতে দেওয়া হয়েছে খেয়েছে, তেষ্টা পেলে কুঁজো থেকে জল গড়িয়ে নিয়েছে এবং ঘুম পেলে ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধুমাত্র একটা ঘরে, হতে পারে ঘরটা যথেষ্ট বড় তবুও এভাবে ঘরবন্দি হয়ে থাকার অভ্যেস তার নেই। যে রাত্রে হাতি এসেছিল শুধুমাত্র সেই রাতেই তামাং-এর গলার আওয়াজ শুনতে পেয়েছে রাম। তা ছাড়া লোকটার মুখে কোনও কথা নেই। ও কখন খায়, কখন ঘুমোয়, কখন কথা বলে কিছুই বুঝতে পারে না রাম। শুধু থেকে থেকে স্থির দৃষ্টিতে রামকে দেখে। রাতে হাতি আসার ব্যাপারটা তামাং বলেনি। বলবে কী করে, ও তো কথাই বলে না। কথাটা বলেছে সেই দাড়িওলা লোকটি।
আজ দরজা খুলে দিয়ে তামাং তাকে ইশারায় ডেকেছে। রাম এগিয়ে গিয়ে খোলা দরজার সামনে দাঁড়িয়েছে। তামাং-এর ইশারায় দরজা পেরিয়ে বাইরে আসবার পর দরজায় তালা লাগিয়েছে তামাং। তারপর তার পিছু পিছু কয়েক পা হেঁটে এসেছে এখানে। বাইরে বেরিয়ে তার খুব ভাল লাগছিল। বাইরে বেরোতেই সে বুঝতে পেরেছে জায়গাটা জঙ্গলের বাইরে নয়, জঙ্গলের ভিতরে। বাইরে তখন রোদের আলো ঝলমল করছে। গাছের পাতায় পাতায় রোদের চকচকে আলো। অল্প হাওয়ায় গোটা জঙ্গলের মাথাটা যেন পাঁচ কুড়ি পেরিয়ে যাওয়া বুড়োর মতো থিরথির করে কাঁপছে। রাম শরীরে এবং মনে বেশ আরামবোধ করল। নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখল আঘাতের চিহ্নগুলো শুকিয়ে এসেছে। মাথার পেছনটা আগে যেমন টনটন করত এখন আর তেমন করে না। সবচেয়ে ভাল লাগল বাইরে বেরোতে পেরেছে বলে। এমন টলটলে রোদের আলোয় গভীর জঙ্গলকে যে এত সুন্দর দেখায় সেটা সে আগে জানত না। জগতে কত রকমের যে পাখির ডাক আছে সেটাও সে কখনও জানতে পারত না, যদি এই জঙ্গলে তাকে থাকতে না হত। সকালের পাখিগুলোর ডাক একরকম, দুপুরের পাখিগুলো আবার অন্যরকম করে ডাকে। সবচেয়ে বিশ্রী ডাকে মাঝরাতের পাখিগুলো। বুকের মধ্যে ধড়ফড় করে ওঠে। রোজ সকালে শিস দিয়ে একটা পাখি ডাকত। যেন বাঁশের বাঁশির মতো আওয়াজ। অথচ ওটা কোকিল নয়। কোকিলের ডাক রাম চেনে। অনেক পাখিই সে চেনে। কিন্তু সকালের পাখিটার ডাক সে কখনও তার গ্রামে শোনেনি। ধান কেটে নেওয়ার পর বিলকান্দার মাঠে অনেক পাখি নানা জায়গা থেকে উড়ে উড়ে আসত। পৌষ-মাঘে বৃষ্টি হলে সেই জলের ওপর ঝাঁক বেঁধে এসে নামত নানা জাতের পাখি। ওই জলেই গজিয়ে উঠত নানারকম গাছ। মহেশপুরের খাল থেকে হড়হড় করে জল এসে ঢুকত বিলকান্দার মাঠে। সেইসব গাছে, পানায় পাখিদের খাবার থাকত। আর জলের নীচে থাকত ছোট ছোট ফলি মাছ, ট্যাংরা আর শোল। ভাতের টোপ দিয়ে বঁড়শি ফেললেই টপাটপ গিলতে আসত মাছগুলো। শীতকালে সদর থেকে আসতেন বাবুরা, পাখি মারা বন্দুক পিঠে ঝুলিয়ে বিলকান্দার মাঠে পাখি শিকার করতে। ছিদামের কাছ থেকে নৌকো ভাড়া করে চলে যেতেন বিলকান্দার জলে। জল তো বেশি নয়, বড়জোর একগলা। বাবুরা ডেকে ডেকে রামদের মতো ছেলেদের নৌকোয় তুলে নিত। কারণটা রাম জানত। ছররাগুলি খেয়ে যে পাখিটা জলে পড়বে সেটাকে জলে নেমে কুড়িয়ে আনার জন্যই রামদের ডাকতে হত। মাঘ মাসে বিলের জল যেন বরফের চাইতেও ঠান্ডা। একটা পাখি তুলে আনলে চার আনা। রোজগার খারাপ হত না, কিন্তু পাখি মারা ব্যাপারটা তার ভাল লাগত না। ছাই ছাই রঙের কাদম্বরী পাখি যার ঠোঁটটা টকটকে লাল সে তো বাবুদের কোনও বাড়া ভাতে ছাই দেয়নি, তবে কেন বন্দুক দিয়ে তাকে মারা।

মরা পাখিগুলোকে দেখে বড় কষ্ট হত রামের। বাবুরা যতবার বন্দুক তুলে নিশানা ঠিক করতেন রাম মনে মনে ঠাকুরকে ডাকত, নিশানা যেন ফসকে যায়। কিন্তু জলের ওপর বসা পাখির ঝাঁকে ছররা চালালে একটা না হয় দুটোর গায়ে লাগতই। সেই মরা পাখিগুলো হিমশীতল জলে নেমে, কখনও হেঁটে, কখনও সাঁতরে আনতে যেতে হত রামকে। ব্যাপারটা একেবারেই পছন্দ হত না। কিন্তু হাট থেকে চাল, তেল আর নুন কেনবার জন্য পয়সাটাও তো দরকার। খেতে কাজ করে তার মা যখন রোজগার করে তখন একরকম, কিন্তু মাঘ মাসে খেতের কাজ জোটে না। তখন বড় কষ্ট হয় রামেদের। ঘরে বসে খেজুর পাতার চাটাই বোনে তার মা। একটা বুনতে হপ্তা কাবার। হাটে সেই চাটাই বেচতে যেতে হয় রামকে।
চারদিকের গাছগাছালি দেখতে দেখতে আর এইসব কথা ভাবতে ভাবতে রাম তামাং-এর পিছন পিছন হাঁটছিল। তামাং এসে দাঁড়াল একটা পোড়ো বাড়ির সামনে। বাড়িটা দেখতে ঠিক ভূতুড়ে বাড়ির মতো। এমন গভীর জঙ্গলে কে বাড়ি বানাতে যাবে। তবে কি এই জঙ্গলের কোনও রাজা ছিল? এটা কি সেই রাজার বাড়ি? নাকি দাড়িওলা লোকটা অনেককাল থেকেই জঙ্গলের মধ্যে এই বাড়িটা বানিয়ে বাস করছে? রামের কাছে গোটা ব্যাপারটাই খুব গোলমেলে মনে হতে লাগল। হিরুকাকা একবার দোলের দিন করিমগঞ্জের হাটে যাত্রা দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল রামকে। যাবার সময় দূরে একটা ভাঙা বাড়ি দেখিয়ে বলেছিল, ‘জানিস ওটা কী?’
রাম কখনও এদিকে আসেনি। সে বাড়িটার দিকে দেখতে দেখতে বলেছিল, ‘না।' হিরুকাকা বলেছিল, ‘ওটাকে বলে গড়ের জঙ্গল। অনেক আগে ওখানে রাজাদের গড় ছিল।'
রাম জিজ্ঞেস করেছিল, ‘গড় কী?’
হিরুকাকা বলেছিল, ‘গড় হচ্ছে গিয়ে রাজাদের কেল্লা। মানে ধরো কিনা, এমন একটা বাড়ি যেখানে রাজার সৈন্যরা থাকে। অন্য রাজার সৈন্যরা যাতে হঠাৎ করে যুদ্ধ বাধলে এই গড় দখল করতে না পারে সেজন্য গড়ের চারপাশে গর্ত করা থাকে। যাতে চটপট কেউ ডিঙোতে না পারে তাকে বলে গড়খাই।'
রাম হিরুকাকার মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক গলায় জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তুমি এত কথা কেমন করে জানতে পারো?’
হিরুকাকা উত্তর দিয়েছিল; ‘কিছুদিন লেখাপড়া করেছিলুম। কপালে নেই তাই হল না। এখনও বইটই পেলে পড়ি।'
সরল গলায় রাম বলে, ‘তুমি পড়লে বেশ হত। তোমার কাছ থেকে সব জেনে নিতে পারতুম।'
হিরুকাকা প্রশ্ন করে, ‘ইস্কুল ছাড়লি কেন?’
রাম বলে, ‘বা রে, আমি যে অস্পৃশ্য। আমাকে বেশিদূর পড়তে নেই। গাঁয়ের পাঠশালায় তো পড়েছিলুম। পাশ করার পর বড় ইস্কুলে ভরতি হতে গিয়ে গোল বাধল না।'
তা সেই তাকে গড়ের জঙ্গলের গল্প বলেছিল। রাজা মরে যাবার পর সেই গড়ে আর কেউ থাকত না। জঙ্গলে আর আগাছায় গড়ের চেহারাটা এমন হয়ে গেল যে, দিনের বেলাতেও কেউ তার ধারেকাছে যেত না। তখন নাকি একটা রাক্ষস এসে বাড়িটার দখল নিয়েছিল। ঠিক একটা না, গোটাকয়েক মানুষখেকো রাক্ষস।
রাম ভয় পেয়ে হিরুকাকার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘রাক্ষসগুলো কেমন দেখতে গো?'
হিরুকাকা জবাবে বলেছিল, “ঠিক মানুষের মতো। ঠাকুরদার কাছে গল্প শুনেছি, টকটকে ফরসা রং রোদ লাগলে একেবারে লাল হয়ে যেত। বাড়িটা সারিয়ে নিয়ে ওরা ওখানে থাকত আর নানা ফন্দি করে মানুষজনকে ধরে নিয়ে গিয়ে খেয়ে ফেলত। কখনও চুষে চুষে রক্ত খেত, কখনও-বা বন্দুক দিয়ে মেরে তারপর পুড়িয়ে মাংস খেত। অনেক অত্যাচার সইবার পর গাঁয়ের সব চাষি দল বেঁধে রাক্ষসগুলোকে ঘিরে ধরে। তারপর ওরা গড় ছেড়ে পালিয়ে যায়। ওখানে নাকি অনেক কঙ্কাল পড়ে আছে। সেই ভয়ে কেউ ওখানে যায় না।'
রাম এখন তামাং-এর পিছন থেকে এই বাড়িটাকে দেখতে দেখতে হিরুকাকার দেখানো গড়টার কথা ভাবল। যদিও ঠিক একইরকম দেখতে নয়, তবুও এটাকে দেখে ভয় হয়। এখানেও কি মানুষের রক্ত চুষে খাবার ব্যবস্থা আছে? নাকি তাকে বন্দুক দিয়ে মেরে পরে পুড়িয়ে খাবে। তাকে নিয়ে যে ঠিক কী করা হবে সেটা বুঝে উঠতে না পেরে রাম ঘামতে আরম্ভ করল। বাইরে বেরিয়ে যে আরামটুকু পেয়েছিল এখন সেটা মুছে গেছে। তামাং তাকে একটা ঘরে নিয়ে এল। বড় অদ্ভুত ঘর। ঘরের মধ্যে ছোট-বড় নানারকম জালের বাক্স। আর সেই বাক্সে রয়েছে খরগোশ, সাদা ইঁদুর আর ইঁদুর ও খরগোশের চেহারা মেশানো আরও নানারকম জন্তু। একটা লোক তাদের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে জালের বাক্সে খাবার দিচ্ছে।
তামাং সেই ঘর ছাড়িয়ে অন্য একটা ঘরে এল। ঘরের মধ্যে নানা মাপের কাচের শিশি, বোতল আর বয়াম। মস্ত বড় একটা টেবিলের ওপর নানারকম জিনিস ছড়ানো। সেই টেবিলের একদিকে দাড়িওলা লোকটি বসে। চশমাটা চোখ থেকে তুলে মাথার ওপর ঠেলে দেওয়া। দরজায় দাঁড়িয়ে তামাং কোনও কথা বলল না, শুধু হাতে তালি দিয়ে শব্দ করল।
দাড়িওলা লোকটি চোখ ফিরিয়ে ওদের দেখল। তামাংকে হাত দিয়ে ইশারা করতেই তামাং চলে গেল। লোকটি উঠে এসে আস্তে আস্তে দরজা বন্ধ করল। তারপর চশমাটা চোখে পরে খুব ধীরে ধীরে তার দিকে এগোতে লাগল। রাম এমনটাই আশঙ্কা করেছিল। হাড়িকাঠে ফেলে বলি না দিলেও তাকে মারবার অনেকরকম পথ এখানে খোলা আছে। কিন্তু এরা তাকে মারবার জন্য এত মরিয়া হয়ে উঠেছে কেন? সে তো এদের কোনও ক্ষতি করেনি। জীবনে কখনও দেখেওনি পর্যন্ত। রামের বুকের মধ্যে যে ভয় আর কষ্টটা বেড়ে যাচ্ছিল এখন তাকে ছাপিয়ে তার মধ্যে প্রবল একটা অভিমান জেগে উঠল আর সেই অভিমান থেকেই এক ধরনের জেদ। তার মনে হল, মরবার আগে সে মরিয়া হয়ে জানতে চাইবে সে কেন মরছে? কেন তাকে মারা হচ্ছে?
সে জানে তার ভয়ংকর জেদই তাকে বারবার বিপদে ফেলেছে। কিন্তু সে তো ছিল তার গ্রামের ব্যাপার। ওই লোকগুলো ছিল বিশ্রী রকমের খারাপ। ওরা কেন তার ওপর খেপেছিল সেটা রাম জানে।
কিন্তু এখানকার এরা কেন খেপল?
দাড়িওলা লোকটা এসে দাঁড়াল তার সামনে। নিজে একটা বেতের চেয়ারে বসে হাতের ইঙ্গিতে রামকেও সামনের চেয়ারটায় বসতে বলল। রাম বসল। রামের গোটা শরীরটা বার-দুই ভাল করে দেখে নিয়ে দাড়িওলা লোকটা প্রশ্ন করল, “তোমার নাম?’
রাম উত্তর দিল, ‘রাম, রামচন্দ্র ওঁরাও।'
‘কোথায় থাকতে? মানে তুমি কোথাকার লোক?’
‘আমার গ্রামের নাম হরিশপুর।'
‘সেটা কোথায়?’
‘আজ্ঞে সদর হচ্ছে গিয়ে নবীনগর। ওই আপনার বিলকান্দা ছাড়িয়ে মহেশপুরের দিকে এলে পয়লা পড়বে হরিশপুর, তারপরে...’
‘মহেশপুর।'
লোকটা উঠে দাঁড়াল। ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে বার-দুই কেবল বলল, ‘মহেশপুর ! মহেশপুর!’
হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এই জঙ্গলে এলে কী করে?’
লোকটার চোখ-মুখ দেখে অনুমান করা যায় না লোকটার মনে দয়া আছে কি নেই। রাম একটু ভেবে বলল, ‘ঠিক জানি না। হয়তো নদীর জলে ভেসে এসেছি।'
রাম উত্তর দেবার আগে লোকটার দিকে তাকাল।
লোকটা অবাক হওয়ার মতো ভঙ্গি করে বলল, ‘তার মানে? কী করে ভেসে এলে?’ রামের গলা বড় দুঃখে বুজে আসছিল। সে বলল, ‘সে-কথা একটা বেত্তান্ত। গোড়া থেকে কইতে হবে।'
লোকটা চেয়ারে বসতে বসতে বলল, ‘শোনাও তোমার বৃত্তান্ত। আমার জানা দরকার।' দাড়িওলা লোকটা রামের কথা শোনবার জন্য সামনের চেয়ারটায় বসল। তার একজোড়া চোখের কৌতূহল-মেশানো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রামের দিকে। রাম মহা ফাঁপরে পড়ে গেল। তার বুকের মধ্যে অনেক কথা জমা হয়ে আছে, অনেক দুঃখ, লাঞ্ছনা আর অভিমান। কিন্তু কেউ কোনওদিন এভাবে তার সামনে বসে সেসব কথা শুনতে চায়নি। এখন বলতে গিয়ে তার সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। সে বুঝতে পারছিল না তার সেই বেত্তান্ত সে কোথা থেকে কেমন ভাবে শুরু করবে। সে মাথা নিচু করে ভেবে যাচ্ছিল।
দাড়িওলা লোকটা তাড়া দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘কী হল বলো?’ রাম আস্তে আস্তে মুখ তুলে লোকটার দিকে তাকাল।

“আমার নাম রামচন্দ্র ওঁরাও। বাবার নাম দশরথ ওঁরাও। আমরা অত্যন্ত গরিব বলে গাঁয়ে আমাদের কোনও ইজ্জত নেই। আমাদের ভিটে ছিল নদীর ধারে। বছর বছর ভিটের মাটি যেত নদীর পেটে। এমন হতে হতে একদিন গোটা ভিটেটাই নদী গিলে নিল। সেই থেকে আমরা ভিটেছাড়া। এসে উঠলাম বনবিবির মাঠে। হোগলার ঘর বানিয়ে কয়েকদিন থাকবার পরেই দত্তবাবুর লোক এসে বলল, ‘এ জমি বেআইনি দখল করেছ। হপ্তায় হপ্তায় টাকা দিতে হবে।' তা আমরা কইলাম, ‘এই মাঠ তো দেবতার সম্পত্তি গো। তিনি না তাড়ালে তুমি তাড়াবে কেন?’
“দত্তবাবুরা কইলেন, ‘দেবতা কি তোদের দলিল করে দিয়েছে। হপ্তায় হপ্তায় টাকা না দিলে বাঁশপেটা করে তুলে দেব।' পরানের ভয় বড় ভয়। তাই রাজি হয়ে গেলুম আমরা। মাঘের শেষে নদীর পাড়ে চড়া পড়ল। গাছ গজাল। পঞ্চায়েতে কথা হল, নদীতে যাদের ভিটে গেছে এই চড়ায় তারা ঘর তুলতে পারে। কিন্তু ঘর তুলতে গিয়ে দেখতে পেলুম চর গেছে বাবুদের দখলে। টাকা নিয়ে জমি বিলি হচ্ছে। আমার বাবা ছিল জেদি আর একগুঁয়ে। ওঁরাওদের হয়ে সে রুখে দাঁড়াল। তদ্দিনে বাপের মাথায় রক্ত চড়েছে। সে বুঝে গেছে নদী যেমন ভিটে গিলেছে তেমনই একফালি ধানের জমি দেনার দায়ে গিলে বসে আছে চৌধুরীবাবুরা। কিচ্ছুটি করবার নেই। বাপ রুখে দাঁড়াতেই বাবুরা থমকে গেলেন। পুলিশের কাছে বললেন, ‘লোকটা ডাকাত। গাঁয়ে দাঙ্গা লাগাতে চায়।’ পুলিশ এসে বাপরে বেঁধে নিয়ে গেল। সাতদিন পরে চৌধুরীবাবুর মেজো ছেলে তাঁরে খালাস করে নিয়ে এসে বললে, ‘মিথ্যে গোল করিসনি দশরথ। যেখানে আছিস সেখানেই থাক। তোদের আবার ভিটে দিয়ে কী হবে রে।'
“কিন্তু আমার বাপের জেদ বড় কঠিন। সে বলল, ‘চড়ার জমি আমাদের। ওখানে দখল নিতে গেলে রক্তারক্তি হয়ে যাবে। ও তোমার থানা-পুলিশ আমি ডরাই না। আমরা চল্লিশ ঘর বসতি, রক্ত থাকতে ওই চরের জমির দখল ছাড়ব না।'
“এই ঘটনার দু’দিন পরে ভরসন্ধেবেলা খবর এল বাপেরে আমার সাপে কেটেছে। চড়ার জঙ্গলের ধারে দাঁইড়ে ছিলেন, হঠাৎ একটা সাপ বেরিয়ে দংশন করেছে। চৌধুরীবাবুর মেজো ছেলে সাইকেল করে বাপরে নিয়ে এল। পায়ে একটা বাঁধন ছিল বটে, কিন্তু বাপের আমার জ্ঞান ছিল না। ওঝা-বদ্যি কিছু এল না। দত্তবাবুরা একজন ডাক্তার এনে দেখালেন। ডাক্তার দেখে-টেখে বললেন, দশরথ মরে গেছে। বিষ নাকি ব্রহ্মতালুতে গিয়ে উঠেছে।
“মাঝরাত্তিরে কলাগাছের ভেলায় করে বাপরে ওরা নদীতে ভাসায়ে দিল। সাপেকাটা মড়ারে তো পুড়তে নাই; তাই মা-মনসার নামে ভাসায়ে দিতে হল। আমার জোয়ান বাপটা সেই কবে এক চোত মাসের মাঝরাত্তিরে অন্ধকার নদীতে চিরদিনের তরে ভেসে গেল। নদীর পাড়ে মাটিতে আছাড়ি-পিছাড়ি খেতে খেতে মা কাঁদতে লাগল। আমার শরীর তখন পাথর হয়ে গিয়েছে। চক্ষে কাঁদবার মতো জলও আর নাই।
“মাস-দুই পরে ওই চড়ার দখল নিল বাবুরা। ওঁরাওদের কথা কইবার সব জোর ভেসে গেছে বাপ চলে যাওয়ার পর। সেই সময় একদিন হিরুকাকা আমারে বলল, ‘তোর বাপটারে সাপে কাটে নাই। ওরে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলেছে বাবুরা।’ সত্যি-মিথ্যে জানি না। কিন্তু কথাটা বুকে গেঁথে গেল। মা’রে বললাম। মা, আকাশের দিকে চোখ রেখে বলল, ‘কী জানি কী হয়েছিল। ভগবান তো আর গরিবেরে দেখে না। ”
রাম একনাগাড়ে অনেকক্ষণ কথা বলে থামল। থেমে দাড়িওলা লোকটার দিকে তাকাল। লোকটা বাঁ হাতটা দাড়িতে বোলাতে বোলাতে বলল, ‘এসব ঘটনার সঙ্গে তোমার নদীতে ভেসে আসার সম্পর্ক কোথায়?’
রাম মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, “আছে। অতি নিকট সম্পর্ক আছে। বাপের মতো আমারও জেদ ছিল। বাবুদের দেখলে আমি সইতে পারতুম না। কেবল মনে হত ওরা আমার বাপটারে খুন করেছে। গাঁয়ে আমার বয়সি বাবুদের যত ছেলে ছিল তার মধ্যে আমার গায়েই জোর ছিল বেশি। ওরা তিনজনে মিলেও আমার সঙ্গে পারত না। বাবুদের ছেলে বলে আমি ওদের আলাদা খাতির করতুম না। একবার নদীতে নাইতে গিয়ে ওরা আমার পেছনে লাগল। ফন্দি করল তিনজনে মিলে মারবে। মারামারি লাগতেই আমি তিনবাবুর তিন ব্যাটারে কাদার মধ্যে ঠেসে ধরলাম। একটার তো মাথা ফেটে রক্ত বেরুল। সেটা ছিল মোড়লের ব্যাটা। ব্যস, বিচার বসল, আমারে গ্রাম ছাড়তে হবে। মা বাবুদের পায়ে ধরে কাঁদতে লাগল। শেষে রফা হল, মাপ করতে পারে তবে আমারে দত্তবাবুদের গোলায় বেগার খেটে দিতে হবে তিন হপ্তা। মা বলল, বাবুদের পায়ে ধরে ক্ষমা ভিক্ষে কর। তাই করতে হল আমারে। দত্তবাবুদের গোলায় কাজ করতে হত অনেক। মজুরি মিলত না। সবটাই বেগার। দোষ করেছি বলে তার শাস্তি। একদিন মোড়লের ছেলে এসে তার বাপরে বললে, ‘রামেরে বেঁধে রাখো'। সত্যি সত্যি আমারে বেঁধে ফেলা হল বলাফল গাছের সঙ্গে। মোড়লের ব্যাটা বললে, ‘সেদিন আমারে মেরেছিলি না। এইবার মজা দ্যাখ।' ছেলেটা চ্যালাকাঠ দিয়ে আমারে মারতে লাগল। আর বাপটা দাওয়ায় বসে ফুড়ুত ফুড়ুত করে হুঁকো খায় আর বলে, ‘ছেলের আমার বাঘের তেজ।'
“আমি বললাম, ‘পঞ্চায়েত আমার নালিশ শুনে বিচার করুক।'
“আমি মোড়লের ব্যাটারে মেরেছি বলে পঞ্চায়েত আমায় শাস্তি দিল। এবার মোড়লের ব্যাটা যে আমারে মারল তার বিচার হবে না কেন? বাবুরা বললে, ‘দশরথের ব্যাটা আবার বিচার চায়। মোড়লের বিরুদ্ধে বলবার তুই কে?’
“বাড়ি এসে বললাম, আর আমি বেগার খাটতে যাব না। বেত্তান্ত শুনে কাঁদতে কাঁদতে মা গেল বাবুদের বাড়ি। বাবু তো কথাই কইল না। ছেলেটা মারে শাসায়ে বলল, ‘তোরেও অমনি করে পেটাব।' মা বলার পরও আর কাজে যাইনি। বাগে বাগে ছিলাম, ছেলেডারে বাড়ির বাইরে পেলে একবার টের পাইয়ে দেব।
“তখন সন্ধ্যা ঘন হয়েছে। নদীর দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস বইছে। আমি বনবিবির মাঠের মধ্যিখানে একা বসে আছি। আমারে ঘিরে মাঠের মধ্যে অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। ঘরে মা নাই। মা গেছে হিরুকাকার ওখানে। ধানসিদ্ধ করার কাজ জুটেছে। কাজ মিটিয়ে ঘরে ফিরতে রাত হয়। আমি একা একা মাঠে বসে। ঘুরতে ঘুরতে নদীর ধারে এলাম। নদীর বুকে গভীর হয়ে অন্ধকার জমে আছে। পাড়ে দু’-চারটে ডিঙি নৌকা। তাতে মিটমিট করে লণ্ঠন জ্বলছে। মাঝনদী থেকে একটা বাঁশির আওয়াজ অন্ধকারে সাঁতরে সাঁতরে পারে আসছিল। নদীর পারে বসে সেই বাঁশি শুনলাম। ঘরে ফিরে আসবার সময় মনে হল, ভগবান তো সবার। সবাইরে নাকি তিনিই তৈরি করেছেন। তবে আমরা ছোট কেন? আচ্ছা, দেবতার জাত কী? তেনাদেরও কি বামুন-কায়েত আছে? দেবতাদের মধ্যেও কি ছোট-বড় আছে? হঠাৎ মনে হল, কথাটা ঠাকুরকে শুধোলে কেমন হয়? ঠাকুর তো কয় না, কেবল শোনে। আমার কথাটা ঠাকুররে শুনিয়ে আসি না কেন? একবার কানে ঢুকলে একটা প্রতিকার হলেও হতে পারে। গাঁয়ের বাবুরা তো আমাদের কথা কানে নেয় না।
“আমি ভাবতে ভাবতে মন্দিরের কাছে এলাম। কাল থেকে এই মন্দিরে ফলাহারী মায়ের পুজো হবে। সেসব দূর থেকে দেখতে হয় আমাদের। আমাদের মন্দিরের চাতালে ওঠবার অধিকার নেই। এখন এই রাত্তিরে আমারে কেউ বাধা দেবার নেই। চাতালে উঠে মা’কে দিব্যি দেখা যাবে। পূজারি ব্রাহ্মণ ভেতরের ঘরে ঘুমিয়ে আছে। সে তো আমাকে দেখতেই পাবে না। আমি চাতালে উঠে এলুম। মন্দিরের বন্ধ দরজার কাছে গিয়ে দরজার ছোট ফুটোটা দিয়ে ভেতরে তাকালুম মা’কে দেখব বলে। ওই ফুটো দিয়ে মায়ের মুখ দেখা যায়। আমি ফুটোতে চোখ লাগাতেই আমার শরীর কেঁপে উঠল। ভেতরে দুটো লোক মায়ের গায়ের গয়না খুলছে। আমি কিছু বলতে যাবার আগেই পেছন থেকে কে একজন আমার কাঁধ খামচে ধরল। আমি এক ঝটকায় তারে সরিয়ে দিয়ে দৌড় মারলুম বনবিবির মাঠের দিকে।
“কিন্তু মাঠে পা দিয়েই দেখলুম উলটো দিক থেকে আমার দিকে লোক ছুটে আসছে। আমি অন্যদিকে দৌড়তে লাগলুম। ‘চোর, চোর’, বলতে বলতে ওরাও ছুটল আমার পিছন পিছন। নদীর কাছে এসে ওরা ধরে ফেলল। দত্তবাবু বললেন, ‘ঠাকুরের গয়না চুরি করতে গিয়েছিল? ছেলেটা অতি পাপী৷’
“চৌধুরীমশাই বললেন, ‘এ ছেলেকে গ্রামে রাখা যায় না। বল ঠাকুরের গয়না কোথায়? মাতৃমূর্তির গায়ে হাত। ওই হাত তোর কেটে ফেলব।'
“এরপর শুরু হল এলোপাথাড়ি মার। শরীরের কোনও জায়গা ওরা বাদ রাখেনি। তারপর আমার আর কিছু মনে নেই। এখন মনে হচ্ছে আমাকে এত মার মেরেছিল যে, ওরা বুঝি ভেবেছিল আমি মরে গেছি। তাই ভেলা করে নদীর জলে আমাকে ভাসিয়ে দিয়েছে। ভাসতে ভাসতে এসে উঠেছি এখানে।”
দাড়িওয়ালা লোকটা লম্বা নিশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। ঘরের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘তুমি কখনও মহেশপুর গেছ? তোমাদের পাশের গ্রামে?’
রাম বলল, ‘মাত্র একবার গেছি। চড়কের মেলা দেখতে।'
দাড়িওয়ালা লোকটা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে ছিল। সেইভাবে দাঁড়িয়েই জিজ্ঞেস করল, ‘কতদিন আগে?’
রাম একটু ভেবে নিয়ে উত্তর দিল, ‘তা হবে গিয়ে বছর-দুই।’
লোকটা বলল, ‘সেই চড়কের মাঠের গায়ে সেনদের রাজবাড়িটা দেখেছ?’
রাম বলল, ‘ভিতরে যাইনি। বাইরে থেকে দেখেছি।'
লোকটা ঘরের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে বলল, ‘আজ থেকে ষাট বছর আগে ওই বাড়িটার কোনও একটা ঘরে আমি জন্মেছিলুম। আর আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে চিরদিনের জন্য ওই বাড়িটা ছেড়ে চলে এসেছি।'
রামের গায়ে এবার কাঁটা দিয়ে উঠল। সে শুনেছিল বটে মহেশপুরের সেনবাবুদের এক ছেলে সন্ন্যাসী হয়ে চলে গেছে। তবে কি এই দাড়িওয়ালা লোকটা সেই সন্ন্যাসী? নাকি সন্ন্যাসী থেকে কাপালিক, নাকি তার থেকেও ভয়ংকর কিছু? এই জঙ্গলে লোকটা পড়ে থেকে কী করছে? কোনও মতলব ছাড়া একটা লোক নিজের অমন বাড়ি, সম্পত্তি সব ছেড়ে এই জঙ্গলে থাকতে যাবে কেন?
রাম ভয়-পাওয়ার চোখে লোকটার দিকে তাকাল। লোকটার মুখ এখন গম্ভীর আর থমথমে। লোকটা যে এখন কী ভাবছে সেটা বোঝার উপায় নেই। তার ভয় দ্রুত বেড়ে যেতে লাগল।
কিছুটা সময় কাটল নিঃশব্দে। এমন নিঃশব্দে যে, গাছের পাতায় হাওয়ার ফিসফিসানি শব্দ ছাড়া ঘরের মধ্যে আর কোনও শব্দ শোনা গেল না।
লোকটা ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে এক সময় হঠাৎ থেমে গিয়েছিল। দরজার দিকে মুখ রেখে কিছুটা উদাস ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিল। এবার ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘তোমার নিজের গ্রামে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে না?’
রাম সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, ‘খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু কেমন করে ফিরব?’
লোকটা বলল, ‘তুমি ভাসতে ভাসতে যেখানে এসে পৌঁছেছ সেখান থেকে গাঁয়ে ফিরে যাওয়ার সোজা কোনও পথ নেই। তবুও চেষ্টা করলে তুমি নিশ্চয়ই ফিরতে পারো, কিন্তু ফিরে গিয়ে কী করবে?’
রাম বলে উঠল, ‘মা’র কাছে যাব।'
লোকটা এবার শব্দ করে হাসল। অদ্ভুত রকমের হাসি। যেন হাসবার জন্যই হাসছে। হাসি থামিয়ে বলল, ‘এবার ওদের ভুল বোঝার ফলে প্রাণে বেঁচে গেছ, এরপর আর প্রাণে বাঁচবে না। তোমাকে ওরা মারবে, মেরে ফেলবেই।'
গলায় অভিমান নিয়ে রাম জিজ্ঞেস করল, ‘কেন আমাকে মারবে? আমি ওদের কী ক্ষতি করেছি?’
লোকটা বলল, ‘ক্ষতি যদি না-ই করবে তা হলে তোমাকে মেরে জলে ফেলে দিল কেন? যারা ডাকাত তারা লোকের বাড়ি ডাকাতি করতে গিয়ে মানুষ খুন করে কেন? গাঁয়ে ফিরতে চাও ফিরে যেতে পারো কিন্তু ফিরলে ওরা তোমাকে ঠিক খুন করবে।'
রাম ভেবে দেখল, লোকটা খুব বাজে কথা বলছে না। সে ফিরে গেলে বাবুরা খুশি হবে না। রাম যদি বলে দেয় তাকে মেরে ভেলায় করে জলে ভাসিয়ে দিয়েছিল তা হলে বাবুরা তাকে নির্ঘাত খুন করে ফেলবে। কোনও পাপী লোকই চায় না তার পাপের কথা জানাজানি হোক। কিন্তু গাঁয়ে না ফিরে এই জঙ্গলে সে কী করবে? এই লোকটা কতদিন তাকে খাওয়াবে আর কেনই-বা খাওয়াবে। তা ছাড়া এই দাড়িওলা লোকটা আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা এখানে এই জঙ্গলের মধ্যে যে কী করে সেটাও রাম বুঝতে পারে না। গাঁয়ের বাবুরা খুবই খারাপ সন্দেহ নেই, কিন্তু এই লোকটা যে কতটা ভাল অথবা কতক্ষণ ভাল থাকবে সে কথা কে বলতে পারে।
রাম অসহায় চোখে লোকটার দিকে তাকাল। লোকটা তারই দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে। এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন লোকটা হাটে ছাগল কিনতে এসে ভালভাবে দেখে নিচ্ছে জিনিসটা ঠিক আছে কি না। এই দাড়িওলা লোকটাকে নিয়ে মাঝে মাঝে বিষম ভয় লাগে রামের। রাম চোখ নামিয়ে নিতেই লোকটা বলল, ‘এই জায়গাটা তোমার কেমন লাগে?’
রাম বলে ফেলল, ‘ঠিক বুঝতে পারি না। কখনও এত জঙ্গলে তো থাকিনি’
লোকটা বলল, ‘এই জঙ্গলে অনেক হিংস্র জন্তু আছে। যেমন ধরো বাঘ, ভালুক, সাপ, বনবেড়াল। তবুও এই জঙ্গলটা তোমাদের হরিশপুর গ্রামের চাইতে খারাপ নয়। ওখানে জঙ্গল না থাকলেও জঙ্গলের স্বভাব নিয়ে কিছু জানোয়ার রয়ে গেছে। ওরা তোমাকে বুঝতে দেবে না, অথচ সময় পেলেই ঘাড় মটকাবে। সেই গ্রামে তোমার কীসের টান?’
রাম ছলছল গলায় উত্তর দিল, ‘মায়ের টান। ওই গ্রামে আমার মা আছে। তারও তো বিপদ হতে পারে।'
লোকটা বলল, ‘তোমার মা’র নতুন কিছু বিপদ হবে না। মা তো প্রতিবাদ করতে শেখেননি, রুখে দাঁড়াতে জানেন না, তাই তাঁর কোনও বিপদ নেই। তোমার বাবা রুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তুমি প্রতিবাদ করেছিলে সে কারণে বিপদ তোমাদের ঘাড়ে এসেই থাবা বসাল।'
রাম মনে মনে স্বীকার করল, লোকটা দিব্যি বোঝাতে পারে। যখন যে কথাটা বলে, মনে হয় যেন সেটাই ঠিক। কিন্তু তার নিজের মুশকিল হচ্ছে, সে বুঝতে পারছে না সে কী করবে? গাঁয়ে ফিরে যাবে, না এখানে থেকে যাবে? এখানে কতদিন থাকতে দেবে এরা? যদি চিরজীবন দেয় তা হলে মা’কে এখানে নিয়ে আসতে দেবে?
রাম মনে মনে এইসব কথা ভাবছিল। লোকটা তার কাঁধের ওপর হাত রেখে অদ্ভুত গলায় বলে উঠল, ‘তোমার ইচ্ছে করে না, ওই দুষ্ট লোকগুলোকে শায়েস্তা করতে? তোমার মনে হয় না যারা তোমাদের ওপর অত্যাচার করেছে, মানুষ বলে কোনওদিন মনে করেনি, কথায় কথায় মার দিয়েছে, তোমার মতো একটা বাচ্চা ছেলেকে মেরে জলে ভাসিয়ে দিয়েছে, সেই শয়তানগুলোর সমস্তরকম শয়তানির বদলা নিতে?’
রামের শরীরের রক্ত তেতে উঠল। খণ্ড খণ্ড কয়েকটা ছবি চোখের সামনে ভেসে আসছে। বলাফল গাছের তলায় তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে চ্যালাকাঠ দিয়ে মারছে মোড়লের ছেলে বিশু। তার মা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন বাবুদের পায়ের ওপর, পা সরিয়ে নিয়ে গাল দিচ্ছে মোড়লের ছেলেটা। ভেলায় ভেসে যাচ্ছে বাপের শরীর। অন্ধকার নদীর পাড়ে চারদিক থেকে তাকে ঘিরে ধরেছে বাবুদের লোকেরা। সবাই বলছে, ঠাকুরের গয়না চুরি করছিল রাম।'
রাম মুখ তুলে বলল, ‘ইচ্ছে করে, বড্ড ইচ্ছে করে। কিন্তু ওদের ক্ষমতার সঙ্গে পেরে উঠব না। ওদের লোক আছে, হাতিয়ার আছে, থানার বাবুরা আছে। আমার তো কিচ্ছুটি নেই। মা বলে, ‘গরিবরা কাঁদতে জানে আর নিজের কপালরে দুষতে জানে। বড়লোকদের সঙ্গে লড়াই করতে পারে না। সে বিদ্যে তাদের জানা নেই।’’
লোকটা রামের কাঁধের ওপর চাপ দিয়ে বলল, ‘সেই বিদ্যেটা যদি আমি শিখিয়ে দিই, তা হলে পারবে ওই অন্যায়-অত্যাচারের বদলা নিতে?’
রাম ভেতরে ভেতরে উত্তেজিত হয়ে উঠল। সে বলল, ‘পারব। নিশ্চয়ই পারব।' লোকটা রামের কাঁধের ওপর থেকে হাত তুলে নিয়ে বলল, 'বদলা মানে কিন্তু খুন-জখম নয়। তোমাকে বদলা নিতে হবে অন্যভাবে।
রাম প্রশ্ন করল, ‘সেটা কীরকম?’
লোকটা উত্তর দিল, ‘সময় এলে তোমাকে সব বলে দেব। এখন কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। আমার কথার অবাধ্য হওয়া চলবে না।'
রাম মনে মনে বলল, ‘অবাধ্য হতে চাইলেই কি এখানে অবাধ্য হওয়া যায়। তোমার লোকেরা আমাকে নজরে আটকে রেখেছে। এই গভীর জঙ্গলে অন্য কোথাও যাওয়ার কোনও উপায়ও নেই।'
লোকটা দরজার সামনে গিয়ে দরজাটা খুলল। খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে হাতে তালি বাজাতেই তামাং এসে হাজির হল। তামাংকে ইশারায় লোকটা কিছু একটা বলতেই তামাং চলে গেল। লোকটা দরজা বন্ধ না করে খোলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকল। দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিটা দেখে মনে হচ্ছে লোকটা যেন কারও অপেক্ষা করছে। একটু পরে খোলা দরজার সামনে এসে দাঁড়াল দৈত্যের মতো বিশাল চেহারার একটা লোক। লোকটা রামের দিকে একবার তাকাতেই তার বুকের রক্ত মোচড় দিয়ে উঠল। তার মনে পড়ে গেল, জঙ্গলের মধ্যে তার মুখ চেপে ধরার সময় সে এই লোকটাকেই দেখেছিল। খুবই সামান্য সময়ের জন্য দেখা, তবু তার ভুল হবার নয়।
দাড়িওলা লোকটা ওই দৈত্যটাকেও ইশারায় কীসব বোঝাতে লাগল। রামের মনে হল, তার কিছু দরকার নেই, শুধু এই দৈত্যটাকে নিয়ে একবার গাঁয়ে গেলেই কেল্লা মাত হয়ে যাবে। যে কোনও লোকের ঘাড় মটকাবার জন্য তার হাত দুটোই যথেষ্ট। বুকের রক্ত হিম করা চেহারা। জঙ্গলের জানোয়াররাও বুঝি লোকটাকে ভয় করে।
লোকটা চলে যেতেই দাড়িওলা লোকটা ঘরের মধ্যে এল। রাম বলল, ‘এইমাত্র যে এসেছিল তার নাম কী?’
দাড়িওলা লোকটা বলল, ‘ওকে সংগ্রহ করেছি কেনিয়ার জঙ্গল থেকে। প্রায় বনমানুষ ছিল। এখন অবশ্য মানুষ হয়েছে। ওর নাম রেখেছি টাইগার। টাইগার মানে জানো?’ রাম বলল, ‘জানি। বাঘকে ইংরেজিতে বলে টাইগার।'
দাড়িওলা লোকটা বলল, ‘ওর গায়ে এবং মনে বাঘের বল। এই বাড়ির বারান্দায় বসে রাত্রে বাড়িটা পাহারা দেয় যাতে কোনও জন্তু-জানোয়ার না আসতে পারে।'
রাম বলল, ‘টাইগারকে আমার যেন মনে হচ্ছে আগে দেখেছি।'
দাড়িওলা লোকটা বলল, ‘দেখবে বইকী। ওই তো তোমাকে আমার কাছে নিয়ে এসেছিল। ওর ওপর দায়িত্ব দেওয়া আছে জন্তু-জানোয়ারের মতো কোনও মানুষ যেন এই বাড়ির মধ্যে না আসে। মানুষ যাতে এই বাড়িটার সন্ধান না পায় সেটা দেখা টাইগারের কাজ। তাই দিনের বেলা গেরিলাদের মতো জঙ্গলে লুকিয়ে লুকিয়ে পাহারা দেয়।'
লোকটার কথা শুনতে শুনতে রাম অবাক হয়ে যাচ্ছিল। সে বলল, 'আমার আগে কোনও মানুষ কি এসেছিল?’
দাড়িওলা লোকটা গম্ভীর হয়ে গেল। একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘একবার না, দু’বার। কিন্তু তারা তোমার মতো নদীতে ভেসে পথ ভুলে সাপের তাড়া খেতে খেতে জঙ্গলে আসেনি। তারা এসেছিল নদীতে নৌকো ভাসিয়ে আমাকে উৎখাত করতে বা খুন করে বাড়িটার দখল নিতে। কিন্তু টাইগারের জন্য পারেনি।'
রাম বলল, ‘তারা কারা? ডাকাত?’
দাড়িওলা লোকটা হাসতে হাসতে বলল, ‘ডাকাত নয়, ডাকাতের চাইতে অনেক বেশি ভয়ংকর তারা। এরকম ব্যাপার ঘটতে পারে ভেবেই অনেক খরচ করে, অনেক পরিশ্রম করে কেনিয়া থেকে টাইগারকে নিয়ে এসেছি। ও তো জঙ্গলের লোক। মাটিতে কান পেতে বলে দিতে পারে বাঘ আসছে না হাতি আসছে। পঞ্চাশ গজ দূর থেকে ও মানুষের গন্ধ পেয়ে যায়। এরকম লোক পাওয়া খুব ভাগ্যের ব্যাপার।'
রাম একটু উসখুস করতে করতে বলল, ‘তামাং আর টাইগার ছাড়া আর কোনও লোক নেই?’
লোকটা বলল, ‘আমি আছি। আর আছে দুটো বুনো কুকুর। ওবাও অনেক কাজে লাগে। ওদের দু’জনের নাম ষণ্ড আর অমর্ক।'
রাম বলল, ‘কুকুরের এমন কঠিন নাম কখনও শুনিনি। আমাদের গাঁয়ে কুকুরের নামগুলো খুব সোজা। যেমন, ভেলু, লালু, তুতু, পেরি, এইরকম।'
লোকটা হাসতে হাসতে বলল, 'নামটা কঠিন বটে, তবে নতুন। ওই দুটো নামের মানে জানো? ষণ্ড আর অমৰ্ক ছিল দুই ভাই। একসঙ্গে বলা হত ষণ্ডামার্ক। দৈত্যদের গুরু শুক্রাচার্যের অতি খারাপ এবং পাজি দুটি ছেলে। কিন্তু গায়ে খুব জোর ছিল। ওরা অবশ্য তেমন খারাপ নয়, কিন্তু গায়ে প্রচণ্ড জোর। তাই ওই খটোমটো নাম দুটো দিয়ে দিলাম।'
রাম একটু সাহস পেয়ে বলল, ‘সবার নামই তো জানা গেল। কিন্তু আপনার কি কোনও নাম নেই?’
দাড়িওলা লোকটা হাসতে হাসতে বলল, ‘একটা নাম আগে ছিল। সেই নামটা ইচ্ছে করেই ভুলে গেছি। এখন আমার নাম সুদর্শন বর্মা। আগে সবাই জানত সুদৰ্শন সেনবৰ্মা বলে। ‘সেন’ শব্দটা মহেশপুর ছাড়বার পর থেকেই মুছে ফেলেছি।'
রাম সুদর্শন বর্মার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল, ‘মহেশপুর ছাড়লেন কেন?’
উদাস গলায় সুদর্শন বর্মা বলল, ‘সেটাও একটা ইতিহাস। খানিকটা তোমারই মতো। তোমার শত্রু হচ্ছে গাঁয়ের সুবিধাভোগী বড়লোকরা, আর আমার শত্রু হল আমার স্বার্থপর আত্মীয়রা। সেসব কথা তোমাকে সময়মতো বলব।'
কথা শেষ করেই সুদর্শন বর্মা হাতে তালি বাজালেন। তামাং এসে দরজায় দাঁড়াল। তামাংকে ইশারায় বুঝিয়ে দেওয়া হল রামকে নিয়ে যাও। ইশারা বুঝতে পেরে রাম উঠে দাঁড়িয়ে যাবার জন্য তৈরি হল। যাবার আগে মুখ তুলে সুদর্শনকে বলল, ‘আমাকে সেই বিদ্যেটা কবে শেখাবেন?’
সুদর্শন মুচকি হেসে উত্তর দিল, ‘সময় হলেই শিখিয়ে দেব। কিন্তু তার আগে তোমাকে অনেক কিছু শিখতে হবে। কাল থেকে টাইগার সেসব শেখাতে শুরু করবে।'
কথা শেষ করে সুদর্শন ফিরে গেল সেই লম্বা টেবিলটার ওপারে। চশমাটা চোখে পরে ব্যস্ত হয়ে পড়ল নিজের কাজে। রাম তামাংয়ের পেছন পেছন আবার সেই বাড়িটাতে ফিরে এসে বলল, ‘তোমার নাম তামাং?
তামাং কোনও উত্তর দিল না। রাম সাহস করে তামাংয়ের গায়ে আলতো করে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার নাম তামাং? তুমি কি বরাবর এই জঙ্গলে আছ?’
তামাং মুখ ঘুরিয়ে রামকে দেখে সামান্য হাসল, তারপরেই মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বেজায় গম্ভীর হয়ে গেল। কিন্তু প্রশ্নের উত্তর দিল না।
রাম ভেবে পেল না, তামাং কেন এরকম করল। সে তো কোনও খারাপ কথা বলেনি? তবে কি তামাং তার ভাষা বুঝতে পারছে না? কিন্তু সুদর্শন বর্মাও তো তামাং বা টাইগারের সঙ্গে কোনও কথা বলেনি। শুধু ইশারায় যা বলবার তা বুঝিয়ে দিয়েছে। রামের কাছে এই জঙ্গলের মতো সুদর্শন বর্মার কাণ্ডকারখানাও গভীর রহস্যময় মনে হচ্ছে। লোকটার আসল উদ্দেশ্যটা কী?
সুদর্শন বর্মার আসল উদ্দেশ্যটা টের পাওয়া গেল অনেকদিন পরে। দিনের হিসেবে ধরতে গেলে প্রায় সাত-আট মাস পরে। রামের মনে আছে সে যখন গ্রাম থেকে তাড়া খেয়ে নদীর পারে আসে এবং তাকে মেরে অজ্ঞান করে যখন ভাসিয়ে দেওয়া হয় তখন ছিল বোশেখ মাস। আর এখন এই জঙ্গলে কনকনে ঠান্ডা। তার মানে শীত এসে গেছে। সকালবেলা নদীর দিকটা কুয়াশায় অন্ধকার হয়ে থাকে। গাছের পাতা থেকে টুপটাপ করে ঝরে পড়ে কুয়াশার জমা জল। ঘাসের মাথাগুলো ভিজে থাকে। ভোরবেলা দেখা যায় ছেঁড়া ছেঁড়া ফালি ন্যাকড়ার মতো গাছের মাথায় কুয়াশা ঝুলে আছে। এই কয়েকটা মাস সুদর্শন বর্মা তাকে সকাল-বিকেল ছেড়ে দিত টাইগারের হাতে। টাইগার তাকে কুস্তি, ঘুসি চালানো, গাছে ওঠা, গাছ থেকে লাফিয়ে অন্য গাছে যাওয়া, নদীতে সাঁতার কাটা এরকম নানা জিনিস শিখিয়েছে। প্রথম প্রথম জঙ্গলকে তার ভয় করত, এখন সেই ভয় কেটে গেছে। জঙ্গলকে এখন ভয় করে না, বরং মনে হয় এই জঙ্গলের বুকে অনেক শান্তি। বড় বড় গাছগুলো যেন মায়ের মতো পাতার আঁচল ছড়িয়ে মাটি আর মানুষকে ছায়া দিচ্ছে। এই গাছগুলো রামের বড় প্রিয়।
কিন্তু আশ্চর্য, টাইগার যখন তাকে বোঝাত তখনও একটাও কথা বলত না। কথা যা বলবার সেটা বলে দিত সুদর্শন বর্মা। কয়েক মাস পর সুদর্শন বর্মাও সব সময় থাকত না। টাইগারের ইশারা ততদিনে বুঝে নিতে শিখে গেছে রাম। শিখতে গিয়ে কষ্ট কম হয়নি। হাত-পা ছড়ে গেছে, মাথাটা ফেটেছে। সুদর্শন বর্মা চিকিৎসা করে সারিয়ে দিয়েছে। সেরে ‘গেলেই আবার শিখতে হয়েছে।
সুদর্শন বর্মা তাকে যে বিদ্যেটা শেখাতে চেয়েছিল সেটা কি তা হলে এইসব? রাম একদিন জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি যে বিদ্যেটা আমাকে শেখাবেন বলেছিলেন সেটা এইসব?’
সুদর্শন মুখ না তুলেই বলল, ‘কোন সব?’
রাম বলল, ‘টাইগার আমাকে যা শেখাচ্ছে।'
এবার মুখ তুলল। রামের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে বলল, ‘না, এগুলো তোমার কাজে লাগবে। কিন্তু আসল বিদ্যা এটা নয়। আসল বিদ্যা শেখাব আমি। তার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।'
রাম বলল, ‘আপনি জানেন, দত্তবাবু আর চৌধুরীবাবুদের বাড়িতে বন্দুক আছে? ওরা যদি দূর থেকে বন্দুক চালায় তা হলে ঘুসোঘুসি আর কুস্তি শিখে ওদের জব্দ করা যাবে কি?’ সুদর্শন হাসতে হাসতে মাথা নাড়ল। চোখের চশমা খুলে ঠেলে দিল মাথার ওপর। তারপর বলল, ‘বন্দুক কেন, মেশিনগান অথবা স্টেনগানেও তোমার কিছু করতে পারবে না, তেমন বিদ্যাই তোমাকে শেখাব।'
সবসময় একটা রহস্যের মধ্যে রামকে রেখে দিত সুদর্শন। কোনও কথা পরিষ্কার করে বলত না। মাঝে মধ্যে ডেকে নিয়ে গিয়ে কেবল গাঁয়ের কথা জিজ্ঞেস করত। রামের বুকের মধ্যে যে আক্রোশ লুকিয়ে আছে, সুদর্শন থেকে থেকে সেটাকে খুঁচিয়ে দিত। যেসব কথা সে প্রায় ভুলে যেতে বসেছে সেসব কথাও টেনে টেনে বার করে মনে করিয়ে দিত সুদর্শন। চাপা অথচ ছুরির ফলার মতো ধারালো গলায় সুদর্শন বলত, ‘একটি কথাও ভুললে চলবে না রাম। তোমাদের ওপর যত অন্যায় আর অত্যাচার হয়েছে তার প্রতিকার তোমাকেই করতে হবে। সবসময় বুকের মধ্যে একটা মশাল জ্বেলে রাখবে।'
কথাগুলো কাঁধে হাত রেখে এমন করে সুদর্শন বর্মা বলত রামের বুকের মধ্যে তখন তোলপাড় হত, তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠত। দাঁতে দাঁত পিষতে পিষতে জিজ্ঞেস করত, ‘সেটা কবে হবে?’
সুদর্শন বলত, ‘সময় এলেই হবে।'
মাঝে মাঝে উত্তেজনায় ফেটে পড়ে অধৈর্য গলায় রাম বলত, ‘সময় কি এখনও আসেনি?’
সুদর্শন রামের মাথায় হাত রেখে বলত, ‘রাবণকে বধ করবার জন্য রামচন্দ্রের মতো অত বড় বীরকেও অনেকদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। বনবাসটা ছিল তাঁর ব্রত। নিজেকে তৈরি করে নেবার শিক্ষাক্ষেত্র। তোমাকেও আরও তৈরি হতে হবে। গায়ে যত বল আসবে মাথা তত ঠান্ডা রাখতে হবে, বিবেচনা আর বুদ্ধিকে ধীরে ধীরে শাণিত করতে হবে। তোমার এই বনবাসটাও হচ্ছে শিক্ষাক্ষেত্র। এবার তোমাকে কিছুটা লেখাপড়াও শিখতে হবে। মনে রাখবে শিক্ষার চাইতে বড় বল আর কিছুতেই নেই। শিক্ষা তোমার দৃষ্টিকে খুলে দেবে।'
দিনের বেলা টাইগার আর অনেকখানি বদলে দিল। সে নিজেই এখন বুঝতে পারে তার মনের মধ্যে পরিবর্তন এসেছে। জঙ্গলের বুকে তখন শীতের কামড় আলগা হয়ে আসছে। ভোরবেলা ছাড়া কনকনে ঠান্ডা আর বিশেষ টের পাওয়া যায় না। পড়ন্ত বেলায় হঠাৎ হঠাৎ এক-একদিন দক্ষিণ দিক থেকে অন্যরকম বাতাস আসে। গাছেদের ডালে ডালে ছোট ছোট নতুন পাতার কুঁড়ি সবে গজাচ্ছে। ঠিক সেইরকম একটা সকালে তামাং এসে ইশারায় রামকে ডেকে নিয়ে গেল সুদর্শন বর্মার কাছে। সুদর্শন বৰ্মা নিঃশব্দে তার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ‘যে বিদ্যাটা তোমাকে শেখাব বলে কথা দিয়েছিলাম এবং যার জন্য এত দিন ধরে তোমার পিছনে এত সময়, এতরকম শিক্ষা-টিক্ষা সব দেওয়া হল এবার তার চরম মুহূর্ত উপস্থিত। এই বিদ্যা শিখবার জন্য তোমাকে তৈরি হতে হবে।'
সন্ধ্যার পর সুদর্শন দুইয়ে মিলে কয়েক মাসের মধ্যে তাকে
সুদর্শন বর্মার কথার মধ্যে এমন একটা ব্যাপার ছিল যে, রামের বুকের ভিতর রক্ত ছলাত করে উঠে তার সারা শরীরে একটা উত্তেজনা ছড়িয়ে যেতে লাগল। সে বলল, 'আমি তৈরি।' সুদর্শন রামের মুখের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ‘তৈরি হবার আগে আমার সব কথা মন দিয়ে শুনে নাও। তারপর বলো তুমি তৈরি কিনা। জিনিসটা তুমি যত সহজ ভাবছ তত সহজ কিন্তু নয়।'
রাম কৌতূহলী চোখে সুদর্শন বর্মার দিকে তাকাল। সুদর্শন বর্মা বলতে শুরু করল, ‘আত্মীয়স্বজনদের লোভ আর স্বার্থবুদ্ধির শিকার হয়েছি আমি। মহেশপুরের জমিদার বংশে আমার জন্ম। আমার বাবা যখন মারা যান তখন আমার বয়স মাত্র চোদ্দো বছর। বাবার মৃত্যুর পরেই সম্পত্তি থেকে আমাদের উৎখাত করার চক্রান্ত শুরু হয়। আমার যখন ষোলো বছর বয়স তখন বিষ খাইয়ে মেরে ফেলা হয় আমার মা’কে। আমাদের উকিল একদিন আড়ালে ডেকে চুপি চুপি আমায় বললেন, এবার তোমার পালা। তোমাকেও খুন করা হবে। তুমি পালাও। ওই বয়সে আমি কোথায় পালিয়ে যাব। আমি বুঝতে পারছি সবাই আমাকে চোখে চোখে পাহারা দিচ্ছে। আমাদের উকিলবাবু, বুড়ো কাজের লোক শিবপ্রসাদ আর দরোয়ান রামাদিন এঁরা তিনজনে আমাকে আগলে রাখতেন। তবুও এরই মধ্যে এক দেওয়ালির রাত্রে আমাকে খুনের চেষ্টা করা হয়েছিল। আমার খাটের নীচে লুকিয়ে থেকে আমাকে পাহারা দিত শিবপ্রসাদ। শিবপ্রসাদ তাকে চিনে ফেলে। এর ঠিক সাতদিন পরে আমাদের বাড়িতে ডাকাত আসে। ডাকাতের গুলিতে আর কেউ নয়, ওই শিবপ্রসাদ খুন হয়ে যায়। আমি জানি ডাকাতরা এসেছিল এ-বাড়িতে ডাকাতি করতে নয়, শিবপ্রসাদকে খুন করতে। আমি অসহায় হয়ে পড়ি। বুঝতে পারি আমার চারপাশে মাকড়শার জালের মধ্যে ষড়যন্ত্রের জাল বোনা চলছে। দরোয়ান রামাদিন ভাল লাঠিয়াল হলেও সে একা আমাকে কতদিন বাঁচাবে। তবুও অনেকদিন পাহারা দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু রামাদিনও যখন অদ্ভুতভাবে খুন হল তখন বুঝতে পারলাম আমার দিন এগিয়ে এসেছে। ওরা থাকতে আমি মারা গেলে ওরা হয়তো পুলিশের কাছে অন্যরকম সাক্ষী দিত। তাই ওদের সরিয়ে ফেলার দরকার ছিল। এবার তো আমাকে খুন করার কোনও বাধা রইল না। আমি মনে মনে ভাবলাম, শুধু আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিল বলে দু’-দুটো নিরীহ মানুষ খুন হয়ে গেল। মনে বড় ঘৃণা এল। রামাদিন মারা যাবার দু'দিন পরেই আমি বাড়ি ছেড়ে চলে আসি। ওই দুটি নিরীহ মানুষের মৃত্যুর কথা এখনও মনে আছে। এরপর নানা জায়গায় ঘুরে অনেক কষ্টে পড়াশোনা শেষ করি। আমি বিজ্ঞানের ছাত্র। বৃত্তি পেয়ে গবেষণা করি। বিদেশে যাই। নানা দেশের নানা বৈজ্ঞানিকের সঙ্গে কাজ করি। অভিজ্ঞতা বাড়তে থাকে। পৃথিবীর একেকটা দেশ একেক রকম। কিন্তু সব দেশেই একটা জিনিস আছে, তা হল দুর্বল মানুষের ওপর সবল মানুষদের অন্যায় অত্যাচার। এই দুর্বলতা শুধুমাত্র শরীরের দুর্বলতা নয়। পৃথিবীর সব দেশেই তো কিছু অসহায় মানুষ থাকে। সেই মানুষগুলোকে সব জায়গাতেই মার খেতে হয়। যেমন তোমাকে খেতে হয়েছে হরিশপুরে তেমনটাই একটু অন্যরকম করে ঘটে পৃথিবীর সব দেশে। এইভাবে নানা জায়গায় নানা দেশের লোকের সঙ্গে কাজ করতে করতে জাপানের রাজধানী টোকিও শহর থেকে একশো পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে একটা ন্যাড়া পাহাড়ের নীচে এক বৈজ্ঞানিকের আস্তানায় গিয়ে পৌঁছই। আমাকে সেখানে পাঠিয়েছিলেন একজন পাদ্রি। তিনি চার্চের ধর্মযাজক। তিনি আমাকে স্নেহ করতেন। রোম নগর থেকে তাঁর চিঠি নিয়ে আমি জাপানে আসি। তিনি এক অদ্ভুত মানুষ। জীবনে যত কিছু রোজগার করেছেন তার সমস্তটাই খরচ করে এক অদ্ভুত গবেষণায় মেতেছেন। ওই বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিকের নাম সটকু...। তিনি কী নিয়ে গবেষণায় মেতেছিলেন জানো?
রূপকথার গল্প শোনার মতো করে রাম এতক্ষণ শুনে যাচ্ছিল। সুদর্শন বর্মার প্রশ্নটা প্রথমে বুঝতেই পারল না। তাকে দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করার পর সে বলল, 'না।'
সুদর্শন বর্মা বলল, ‘তিনি এমন একটা কেমিক্যাল পোশাক তৈরি করতে চাইছিলেন, যেটা কোনও মানুষ একবার গায়ে পরলে পৃথিবীর কেউ তাকে দেখতে পাবে না, অথচ তিনি সবাইকে দেখতে পাবেন। এমন পোশাক তিনি কেন আবিষ্কার করতে চাইছিলেন সেটা শুনলে তোমার কষ্ট হবে।'
রাম জিজ্ঞেস করল, ‘কেন চাইছিলেন?’
সুদর্শন বর্মা বলল, ‘১৯৪৫ সালে ৬ আর ৯ অগস্ট কী ঘটেছিল জানো?’
রাম একটু ভেবে উত্তর দিল, ‘মনে পড়ছে না।
সুদর্শন বর্মা বলল, ‘তোমাকে সেই গল্প আমি বলেছি। মনে পড়া উচিত ছিল। ওইদিন জাপানের হিরোশিমা আর নাগাসাকি শহরে অ্যাটম বোমা ফাটানো হয়। শহর দুটো ধ্বংস হয়ে যায়। হাজার হাজার নিরীহ মানুষ মারা যায়। অসংখ্য মানুষ চিরজন্মের জন্য বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ে। সভ্যতার ইতিহাসে সেটা একটা মস্ত বড় কলঙ্ক। সটকু তখন যুবক। তিনি পড়াশোনার জন্য ছিলেন টোকিও শহরে। তাঁর বাবা, মা, ভাই, বোন, এমনকী যে মেয়েটির সঙ্গে তাঁর বিয়ের কথা ঠিক হয়েছিল, তাঁদের পরিবারের সকলে মারা যান। তাঁদের মৃতদেহগুলির চিহ্নমাত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। রাগে-দুঃখে আর বুকভরা বেদনায় তিনি পাথরের মতো চুপ করেছিলেন একনাগাড়ে সাত দিন। পরে একসময় তাঁর মনে হয়েছিল আর বেঁচে থেকে কী লাভ? কাদের জন্য বাঁচব? কে আমার আপনজন? তিনি আত্মহত্যা করতে গিয়ে ফিরে আসেন। হঠাৎ তাঁর মনে হয়, এদেশের বহু লোকই তো তাঁর মতো স্বজনহারা। এখন তো এদের পাশে তাঁরই দাঁড়ানো উচিত। এরাই তো এখন তাঁর স্বজন। সটকু আস্তে আস্তে মনোবল ফিরে পান। বিজ্ঞানের পড়া শেষ করে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন। নানা ধরনের কাজ করতে করতে তাঁর মাথায় আসে এইরকম একটা পোশাক আবিষ্কার করার কথা। তিনি ভেবেছিলেন, যদি এইরকম পোশাক তিনি বানাতে পারেন, তা হলে সেই পোশাক গায়ে চাপিয়ে তিনি হানা দেবেন, পৃথিবীর বড় বড় দেশগুলোর আণবিক অস্ত্রশালায়। যেখানে মানুষকে ধ্বংস করার জন্য সাংঘাতিক সব মারণাস্ত্র তৈরি হয়ে আছে। সেই অস্ত্রগুলো আর অস্ত্র তৈরির কারখানাগুলো নিজে ধ্বংস করে দেবেন, যাতে আর কখনও কোনও যুদ্ধে পৃথিবীতে হিরোশিমা-নাগাসাকির মতো ঘটনা না ঘটে।'
রাম কৌতূহলী চোখে সুদর্শন বর্মার মুখের দিকে তাকিয়েছিল। সুদর্শন কথা থামাতেই সে জিজ্ঞেস করল, ‘পোশাকটা তৈরি হয়েছিল?’
সুদর্শন বলল, “হতে পারেনি। বারো আনা কাজ এগিয়ে যাবার পর এক মধ্যরাতে বিকট চিৎকার শুনে আমি তাঁর ঘরের দিকে ছুটে যাই। ভিতর থেকে দরজা বন্ধ ছিল। অনেক চেষ্টায় সেই দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে দেখি নিজের খাটে রক্তাক্ত হয়ে লুটিয়ে আছেন সটকু। তাঁর সাদা দাড়ি বেয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। তাঁর প্রিয় গবেষণাগারটি লণ্ডভণ্ড। আমি গিয়ে ডাকতেই তিনি অতিকষ্টে চোখ তুলে তাকালেন। কানের পাশে ভোজালি ঢোকানো হয়েছে। পিঠে এবং পেটেও হিংস্র আক্রমণের রক্তাক্ত চিহ্ন। মিনিট পাঁচেক বেঁচে ছিলেন। তারই মধ্যে ঘড়ঘড়ে গলায় বলে উঠলেন, 'আমি চলে যাচ্ছি। কাজটা করে যেতে পারলাম না। মানুষের মঙ্গলের জন্যেই তো সর্বস্ব দিয়ে কাজটায় নেমেছিলাম, অথচ সেই মানুষের হাতেই মরতে হল। ওরা হয়তো ভাড়াটে গুণ্ডা। ওরা বুঝতে পারল না। তুমি তো আমার সঙ্গে ছিলে। ফরমুলাটা মোটামুটি লেখা আছে। তবে এটাই চূড়ান্ত নয়। অদলবদল করতে হবে। এটা সম্পূর্ণ করার দায়িত্ব তোমাকে দিলাম। মানুষের নামে শপথ করো তুমি কাজটা করবে।'
“আমি শপথ করতেই সটকু বললেন, ‘বসবার ঘরে আলমারির মধ্যে একটা চিনেমাটির প্যাগোডা আছে। ওর ভিতরটা ফাঁপা। নীচে একটা ফুটো পাবে। সেখানে আঙুল ঢুকিয়ে বার-দুই ঘোরালে ওটা খুলে যায়। ওরই মধ্যে ফরমুলাটা রাখা আছে। ওর ভিত্তিতে তুমি কাজ করে যাও।'
“এরপর আর কথা বলতে পারলেন না সটকু। ঠোঁট কাঁপতে লাগল। চোখের কোল গড়িয়ে জল নেমে এল। মুখের কাছে কান নিয়ে গিয়ে শুনলাম, উনি বলছেন, ‘সায়োনারা, সায়োনারা, মানে, বিদায়, বিদায়। ""
কথা শেষ করে সুদর্শন বর্মা মাথা নিচু করে বসে রইল। তার সারা মুখে গভীর বিষাদ। যেন বৃদ্ধ সটকুর মৃত্যুদৃশ্যটা এখনও তার চোখে ভাসছে। বাতাসে মর্মরিত হচ্ছে বৃদ্ধের শেষ কথা, সায়োনারা, সায়োনারা। রাম সেই জাপানি বৃদ্ধকে কখনও দেখেনি। কিন্তু সুদর্শন বর্মার মুখে তাঁর কথা শুনে মনে হল, সেই লোকটার শেষ কথাটা যেন তিরের ফলার মতো তার বুকেও বিঁধে আছে।
অনেকক্ষণ পর সুদর্শন বর্মা মুখ তুলল, আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে বলল, ‘অনেক চেষ্টায় সেই ফরমুলা নিয়ে কাজ করতে করতে আমি এখন এমন জায়গায় এসে পৌঁছেছি যাতে মনে হচ্ছে সেই পোশাকটা আমি এবার আবিষ্কার করতে পেরেছি।'
রাম আনন্দে আর উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠে বলল, ‘পেরেছেন? সত্যিই পেরেছেন?’ সুদর্শন বর্মার মধ্যে কোনও উত্তেজনা নেই। সে স্থির গলায় বলল, ‘বারো আনা নিশ্চয়ই পেরেছি। ষোলো আনা পেরেছি কি না সেটা জানতে হলে তোমার সাহায্য চাই।'
অবাক গলায় রাম প্রশ্ন করল, ‘আমার?’
সুদর্শন বলল, “হ্যাঁ, তোমার। আমি গিনিপিগ আর ইঁদুরের মধ্যে পরীক্ষা করেছি। সে পরীক্ষা সফল। কিন্তু ওদের রক্তের তাপ আর মানুষের রক্তের তাপের মধ্যে তফাত আছে। ওদের ক্ষেত্রে যেটা সফল মানুষের ক্ষেত্রে সেটা কতখানি সফল তা জানতে না পারলে এই পোশাক আবিষ্কারের কোনও মূল্য নেই। সেজন্য একজন মানুষ চাই। তুমি হবে সেই মানুষ।'
রাম এরকমটা ভাবেনি। সে একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলল, ‘কেন, তামাং বা টাইগারকে দিয়ে হয় না?’
সুদর্শন মুচকি হেসে বলল, ‘ওদের দিয়ে হলে তোমার সাহায্য আমার দরকার হত না। তোমার পিছনে এত সময় আর শিক্ষাও খরচ করতুম না। ওরা দু'জনেই বোবা। পোশাক পরার পর শরীরে কেমন অনুভূতি হয়, কী অসুবিধা হয়, চোখের দৃষ্টি ঠিক থাকে কি না, কানে ঠিকঠিক শোনা যায় কি না, এসব কথা ওরা বোঝাতে পারবে না। অথচ এগুলো আমার জানা দরকার। আমি নিজেও পোশাকটা পরে দেখতে পারতাম, কিন্তু কেন দেখিনি জানো?’
রাম মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল, সে জানে না।
সুদর্শন বর্মা বলল, ‘এটা এখনও পরীক্ষার স্তরে আছে। কেমিক্যালের এই পোশাক প্রথম পরাবার পর দুটো গিনিপিগ পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। তখন আবার গবেষণা করে, কেমিক্যালের মাত্রা হেরফের করে যে পোশাক তৈরি করি তাতে আর কোনও গণ্ডগোল হয়নি। মানুষের ক্ষেত্রে কেমিক্যালের মাত্রার পরিমাণ অন্যরকম। যদি এমন হয় যে, পোশাকটা পরার পরেই আমি পুড়ে যাই অথবা অন্ধ হয়ে যাই তা হলে গবেষণাটা এখানেই শেষ হয়ে যাবে। সে কারণে অন্য লোক চাই।'
রাম ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আমিও কি পুড়ে যেতে পারি?’
সুদর্শন বর্মা বলল, ‘আমার হিসেবে ভুল হলে তেমনও ঘটতে পারে। তখন আবার নতুন করে কাজ আরম্ভ করতে হবে।'
রাম চুপ করে রইল। সুদর্শন বর্মা রামের মনের অবস্থাটা বুঝতে পেরে বলল, ‘আমি তোমাকে জোর করব না। তুমি ভেবে দেখো এত বড় একটা জিনিস আবিষ্কার হতে যাচ্ছে। যদি তুমি মারা যাও তা হলে সেটা খুব দুঃখের হবে ঠিকই, কিন্তু সেইসঙ্গে বুঝতে পারব এইভাবে চলবে না, অন্যভাবে তৈরি করার সুযোগ পাব। জিনিস তৈরি হয়ে গেলে পৃথিবীটা আরও সুন্দর হয়ে উঠবে। হয়তো সেই সুন্দর পৃথিবীতে তুমি, আমি আর সটকু থাকব না, কিন্তু আরও অনেক মানুষ তো থাকবে। তা ছাড়া তুমি যেভাবে বেঁচে আছ এটাকে বেঁচে থাকা বলে? নিজের গ্রামে গেলে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে মৃত্যু। সেই কদর্য মৃত্যুর চাইতে এখানে মরা ঢের ভাল। অবশ্য এখানে তুমি মরবেই তেমন কোনও কথা নেই। তবু তুমি জানো না বলেই তোমাকে আশঙ্কার কথাটাও জানিয়ে রাখলাম। এখন তুমি কী করবে, রাজি হবে না নিজের গ্রামে ফিরে গিয়ে লাঞ্ছনা ভোগ করবে সেটা তোমার ওপর নির্ভর করছে। তোমাকে সাত দিন সময় দিলাম। সাতদিন পর ভাল করে ভেবে তোমার মতামত জানিও।'
কথা শেষ করেই সুদর্শন বর্মা হাতে তালি বাজিয়ে তামাংকে ডাকল। তামাং এসে দরজায় দাঁড়াতেই সুদর্শন বলল, ‘এবার তুমি তোমার ঘরে যেতে পারো। সাত দিন পরে তোমার মতামত চাই।'
রাত্রিবেলা অন্ধকার বিছানায় শুয়ে রাম ভাবতে লাগল। তার মনের একদিকে ভয় আর অন্যদিকে কৌতূহল। ভয়টা শুধু পুড়ে মরবার। যদি সুদর্শন বর্মার তৈরি পোশাকে কেমিক্যালের কোনও গণ্ডগোল হয়ে যায় তা হলে সে পুড়ে মরবে। তার মৃত্যুর খবর হয়তো তার গ্রামে, এমনকী, তার মা'র কাছেও পৌঁছবে না। রামের হঠাৎ মনে হল, সে যে বেঁচে আছে সেটাই তো অবাক কাণ্ড ! নদীর জলে ভেলায় করে ভেসে আসতে আসতে সে মরেও যেতে পারত কিংবা কুমিরের পেটে চলে গিয়ে অনেক আগেই তার মৃত্যু হতে পারত। অথবা জঙ্গলের মধ্যে ওই ভয়ংকর সাপটার ছোবল খেয়ে, না হয় জঙ্গলের কোনও জন্তুর মুখের সামনে পড়ে এতদিনে তার মরে যাওয়াটাই তো ছিল স্বাভাবিক। যারা তাকে বেদম পিটিয়ে ভেলায় ভাসিয়ে দিয়েছে তারা নিশ্চয়ই জানে রাম নামে ওঁরাওদের ছেলেটা আর বেঁচে নেই। তার মা নিশ্চয়ই এতদিনে তার আশা ত্যাগ করেছেন। সুদর্শন বর্মা তার জীবন বাঁচিয়েছে, এখন যদি তার কাজে মরতে হয় তা হলে এমন আর কী ক্ষতি হবে। কিন্তু যদি ওই পোশাকের ফরমুলায় কোনও ভুল না থাকে, যদি সুদর্শন বর্মার হিসেব ঠিক হয় তা হলে? তা হলে সে অদ্ভুতভাবে বেঁচে গিয়ে গ্রামে পৌঁছতে পারবে। কেউ তাকে দেখবে না, কিন্তু সে সবাইকে দিব্যি দেখতে পাবে, অনেক কথা সে জানতে পারবে। হয়তো অনেক রহস্যের দরজা তার সামনে খুলে যাবে। তার বাবা কি সত্যিই মরেছিল না মেরে ফেলা হয়েছিল, মন্দিরের ভিতরে ঢুকে কে ঠাকুরের গয়না চুরি করছিল, সুদর্শন বর্মার মা’কে কে বিষ খাইয়েছিল?
রাম ভিতরে ভিতরে চঞ্চল হয়ে উঠল। অন্ধকার বিছানায় উঠে বসে সে টের পেল পাশের চৌকিতে নাক ডাকিয়ে তামাং ঘুমোচ্ছে। ওপরের ঘুলঘুলি দিয়ে রাতের আকাশ থেকে জ্যোৎস্নার ম্লান আলো আসছে। বাইরের জঙ্গলে শনশন শব্দে বয়ে যাচ্ছে হাওয়া।
রাম বিছানা থেকে নীচে নেমে এসে টেবিলের ওপর রাখা হ্যারিকেনটার কাছে গেল। সেটা নিভে গেছে। অথচ রাত্রিবেলা এটা জ্বালিয়ে রাখার কথা। রামের বিছানাতেও একটা টর্চ আছে। টর্চ জ্বেলে সে প্রথমে দেশলাই দিয়ে নিভে যাওয়া হ্যারিকেনটা ধরাল।
ঘরের মধ্যে আলো জ্বালানোর শব্দে তামাং-এর ঘুম ভেঙে গেল। বিছানার পাশেই বন্দুক রাখা থাকে। বন্দুক হাতে করে উঠে বসতেই রাম তামাং-এর দিকে তাকাল। রাম দেখল, এই প্রথম তামাং হাসল। লজ্জা পাওয়ার মতো হাসি।
কুঁজো থেকে জল গড়িয়ে খেল রাম। তারপর বিছানায় শুতে শুতে ভাবল, শুধু ভাববার জন্য সাতটা দিন বড্ড বেশি সময়। তার বুকের মধ্যে উত্তেজনাটা এমনই যেন পারলে এখনই সুদর্শন বর্মার কাছে ছুটে যায়।
সাত দিন সময় নিল না রাম। একদিন পরেই সে সুদর্শন বর্মাকে গিয়ে জানাল, ওই পোশাকটা পরবার জন্য সে তৈরি।
সুদর্শন বর্মা ওর মুখের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ‘তার মানে তুমি মরবার জন্যও তৈরি?’
রাম চুপ করে থেকে ভাবতে লাগল। কাল সারা রাত সে মনে মনে অনেক কথা গুছিয়ে রেখেছিল কিন্তু সময়মতো সেসব কথা সে গুছিয়ে বলতে পারছে না।
রামকে চুপ করে থাকতে দেখে সুদর্শন বর্মা বলল, 'আমি তোমার ওপর জোর করছি না। এত তাড়াতাড়ি মতামত না দিলেও চলবে। বিপদের দিকটা ভাল করে ভেবে দেখো।'
সুদর্শন বর্মার দিকে না তাকিয়ে নিচু গলায় রাম বলল, ‘মরণের চাইতে বেশি বিপদ আর কী হতে পারে। গাঁয়ের লোকের কাছে তো আমি মরেই গেছি।' সুদর্শন বর্মা বলল, ‘তবু তুমি কেন আমার জন্যে মরবে?’
রাম বলল, ‘কেউ একজন মরতে না চাইলে আপনার পোশাকটা তৈরি হবে কেমন করে। সবার ভাল করতে গিয়ে মরণ হলে সে মরণে নাকি পুণ্য হয়। ঠাকুরের পায়ে আশ্রয় মেলে।'
সুদর্শন বর্মা অবাক চোখে রামের দিকে তাকাল। রামের দৃষ্টি তার মুখের দিকে। নিষ্পাপ সরল সেই দৃষ্টিতে যেন সকালবেলার আলো জেগে আছে। সুদর্শন আস্তে আস্তে রামের কাছে এগিয়ে এসে তার মাথায় হাত রাখল। শান্ত গলায় বলল, ‘ঠাকুরের পায়ে আশ্রয় মেলে কি না সে কথা বলতে পারব না। যাঁরা মানুষের কল্যাণে জীবনদান করেন মানুষের ইতিহাসে তাঁরা অমর হয়ে থাকেন। এই গবেষণার ফল যদি সটকুর ধারণামতো পৃথিবীতে অখণ্ড শান্তি আনে, তবে তুমি হবে সেই শান্তিপর্বের অমর শহিদ। সেই নতুন পৃথিবী তোমাকে মনে রাখবে। অযোধ্যার রামচন্দ্রের চাইতে হরিশপুরের রামচন্দ্র ওঁরাওয়ের খ্যাতি আর সম্মান কিছুমাত্র কম হবে না।'
রামের সম্মতি পাওয়ার পর সুদর্শন বর্মা নতুন উৎসাহে কাজে লেগে গেল। শুরু হয়ে গেল রামের শরীর নিয়ে নানা পরীক্ষা। থার্মোমিটার দিয়ে তার গায়ের তাপ মাপা হতে লাগল তিন ঘণ্টা অন্তর অন্তর। মাথার চুল ছেঁটে ছোট ছোট করে দেওয়া হল। হাত-পায়ের নখ কাটা হল নিপুণ করে। খাওয়ার ব্যাপারেও এল নানা বাছ-বিচার। শরীরের দু’জায়গা থেকে রক্ত নিয়ে সুদর্শন বর্মা পরীক্ষা করল। রাম ভেবেছিল, পোশাকটা বোধহয় তৈরিই আছে, বাক্স থেকে বার করে দিলেই সে গায়ে চড়াবে। কিন্তু পোশাক পরবার আগে এত কাণ্ড করতে হবে সেটা সে ভাবেনি।
দিন দশেক কেটে গেল এইসব করতে করতে। ঠিক বারো দিনের মাথায় তার ডাক পড়ল সুদর্শন বর্মার ঘরে। যে ঘরে সে এর আগে অনেকবার এসেছে এবার সেই ঘরটা পেরিয়ে তাকে আসতে হল অন্য ঘরে। এই ঘরে এত দিনের মধ্যে সে একবারও আসেনি। ঘরটার চেহারা বড় বিচিত্র। নানারকমের যন্ত্রপাতি, কাচের নল, বোতল, হরেকরকম তার, ড্রাম আর শিশি। যেন রূপকথার দৈত্যদের আস্তানা। ঘরের দেওয়ালে একটা ফোটো টাঙানো ছিল। সুদর্শন বর্মা সেই ফোটোর দিকে দেখিয়ে রামকে বলল, ‘উনিই মি. সটকু। ওঁর স্বপ্ন আর সাধনা আজ তোমার মধ্যে দিয়ে বোধহয় সার্থক হতে চলেছে। সেই সঙ্গে আমার এত দিনের একক লড়াই।'
রামকে একটা নিচু টেবিলের ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়ে সুদর্শন বর্মা বলল, ‘কয়েকটা কথা ভালভাবে জেনে নাও। পোশাকটা কেমন করে পরবে সেটা আগে দ্যাখো।
কথাটা বলেই সুদর্শন বর্মা হাত বাড়িয়ে বড় টেবিলের ওপর থেকে একটা পোশাক নিয়ে বলল, ‘এটা সেই কেমিক্যাল পোশাক নয়। এটা ওই পোশাকটার মতন করে তৈরি। এটা দিয়ে পোশাকটা কেমন করে পরতে হবে সেটা শিখে নিতে হবে।'
রামকে যখন পোশাক পরা শেখাচ্ছিল সুদর্শন বর্মা তখন রাম লক্ষ করল দরজার পাশে টাইগার আর তামাং বিষণ্ণ চোখে ওরই দিকে তাকিয়ে আছে। ওরা কি পোশাকটার ব্যাপার কিছু জানে?
সব পোশাকের যেমন দুটো অংশ থাকে, একটা পরবার আর একটা গায়ে দেবার এটা তেমন নয়। একটাই পোশাক যাতে পায়ের পাতা থেকে মাথা পর্যন্ত ঢাকা। মাথার দিকটা এমন যেন একটা টুপি লাগানো। পোশাকটা গায়ের সঙ্গে এঁটুলি পোকার মতো লেগে সেঁটে থাকে। পোশাকটা সুদর্শন বর্মার নির্দেশমতো নিজে নিজেই পরে ফেলল রাম। পায়ের পাতা থেকে মাথা পর্যন্ত ঢেকে গেল। মাথার দিকটা নিজেই ঠিক করে দিল সুদৰ্শন বৰ্মা। চোখ-মুখ ঢেকে যাওয়ায় রাম কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। সে শুধু বলল, “কিছু দেখতে পাচ্ছি না যে।'
সুদর্শন বর্মা বলল, ‘এটা তো আসল নয়, নকল। আসলটাতে দেখতে পাবে, কথাও ভালভাবে বলতে পাবে। শুধু মনে রাখবে মাথার দিকটা টেনে বসাবে। যেন টুপির মতো বসে যায়।'
নকল পোশাকটা খানিক পরেই খুলে ফেলা হল। এবার চাবি দিয়ে আলমারি খুলে তার ভিতর থেকে খুব যত্নের সঙ্গে বার করে আনা হল আসল পোশাকটাকে। রামের মুখের সামনে পোশাকটা এনে সুদর্শন বলল, ‘তোমার মাপেই করানো। এই একটা পোশাকের পিছনে আমার খরচ হয়েছে প্রায় এক লক্ষ টাকা।’
রাম অবাক চোখে আর খুব সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে পোশাকটাকে দেখল। বড় অদ্ভুত রং। দেওয়ালির দিন বাবুদের বাড়িতে ছেলেরা ফুলঝুরি জ্বালায়। জ্বালাবার আগে ফুলঝুরিটার রং যেমন থাকে, মানে রুপোলি রুপোলি, ঠিক তেমনই রং এই লাখ টাকার পোশাকটার।
পোশাকটা হাতে নিয়ে সুদর্শন বর্মা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ঘরের পরিবেশটা আস্তে আস্তে ভারী এবং থমথমে হয়ে এল। দরজায় দাঁড়ানো টাইগার এবং তামাং দু’জনেই বড় বড় চোখে রামের দিকে তাকিয়ে। সুদর্শন বর্মার মুখটা অতিরিক্ত গম্ভীর। গলার স্বর থমথমে। পোশাকটা রামের হাতে দেওয়ার আগে বলল, ‘গায়ে দেবার পর কোনও কষ্ট হলে চিৎকার করে বলবে। আমি যদি বলি তা হলেই পোশাকটা খুলে ফেলবে। খুলে ফেলার সোজা পথ হচ্ছে পোশাকটার কোমরের কাছে একটা চেন আছে। ওটা টানলেই নীচের অংশটা খুলে যাবে। তখন যেভাবে গেঞ্জি বা পুরোহাতা সোয়েটার খোলে ওইভাবে মাথার ওপর দিয়ে ওপরের অংশটা আগে টেনে খুলে ফেলবে। পোশাকটার বুকের ওপর তিনটে বোতাম আছে। তিনটের তিনরকম কাজ। পোশাক পরার পর আমি তোমাকে দেখতে পাব না, কিন্তু তুমি পাবে। আমি শুধু তোমার কথা শুনতে পাব। তোমার অসুবিধা কী হচ্ছে সেটা জানালে আমি যখন যে বোতামটা টিপতে বলব তুমি সেটা সঙ্গে সঙ্গে টিপবে। নাও, এবার তোমার কাজ শুরু করো।'
কথা শেষ করেই সুদর্শন পোশাকটা রামের হাতে দিয়ে সরে দাঁড়াল। রাম টের পেল দেখতে যেমনই হোক, পোশাকটা বেশ ভারী।
সুদর্শন বর্মা বলল, ‘আগে পায়ের দিক থেকে পরতে শুরু করো।'
নকল পোশাকটা যেমনভাবে পরেছিল ঠিক সেই কায়দায় রাম এই আসল পোশাকটাও পরে ফেলল। মুখ ঢেকে গিয়ে মাথার ওপর যখন টুপির মতো পোশাকটা বসে গেল ঠিক তখনই সুদর্শন বৰ্মা চিৎকার করে বলল, ‘লাল বোতামটা টিপে দাও।'
রাম লাল বোতামটা টিপে দিল। এই পোশাক পরা এবং বোতাম টেপার ফলে কী ধরনের ঘটনা ঘটল, সেটা রাম বুঝতে পারল না। তার কেবল মনে হতে লাগল শরীরটা আস্তে আস্তে গরম হয়ে উঠছে। পোশাকটার ভিতর থেকে নীলচে রঙের ধোঁয়া বেরোচ্ছে। তার থেকে হাত দশেক দূরে সুদর্শন বর্মা দাঁড়িয়ে। বন্ধ দরজার কোণে টাইগার আর তামাং।
সুদর্শন বর্মা দু’ হাত ওপরে তুলে চিৎকার করল, ‘তুমি আমাদের দেখতে পাচ্ছ?’ রাম উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ।'
সুদর্শন বর্মা উত্তেজনায় আর আনন্দে হঠাৎ দেওয়ালে ঝোলানো বন্দুকটা হাতে তুলে নিয়ে প্রশ্ন করল, ‘রাম, আমার হাতে এটা কী?’
রাম উত্তর দিল, ‘বন্দুক।’
এইমাত্র দেওয়াল থেকে খুলে হাতে নিলেন সুদর্শন বৰ্মা একটা বাচ্চা ছেলের মতো বন্দুক হাতে নিয়ে ঘরের মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতে চিৎকার করে উঠল, ‘ইউরেকা, ইউরেকা! মি. সটকু, তোমার স্বপ্ন সফল করতে পেরেছি।'
ঘরটা ততক্ষণে ধোঁয়ায় ছেয়ে যাচ্ছে। সুদর্শন বর্মা হঠাৎ চিৎকার করে বলল, ‘রাম, তোমার কোনও কষ্ট হচ্ছে?'
রাম উত্তর দিল, ‘শরীরটা যেন পুড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে জ্বলন্ত কয়লার উনুনের ওপর দাঁড়িয়ে আছি।'
সুদর্শন বর্মা বলল, ‘মাঝখানের নীল বোতামটা টিপে দাও।'

খুচ করে বোতাম টেপার ছোট্ট একটা আওয়াজ হল। সুদর্শন বর্মা আবার কিছু জিজ্ঞেস করল আগেই রাম চিৎকার করে উঠে বলল, 'আমার শরীর কাঁপছে। দাঁড়াতে পারছি না। আমি পড়ে যাচ্ছি...’
সুদর্শন বর্মা লক্ষ করল ঘরের একটা খুঁটি কাঁপছে। একটু পরে টেবিলটা। তার মানে রাম যেসব জিনিস আঁকড়ে ধরছে সেগুলোই কেঁপে কেঁপে উঠছে। সুদৰ্শন বর্মা নির্দেশ দিল, ‘কোমরের পোশাকটা খুলে ফেলো।’
কয়েক মিনিটের মধ্যে রামের চেহারাটা আবার দেখা গেল। সুদর্শন বর্মা খুব সন্তর্পণে পোশাকটা তুলে নিয়ে টেবিলে রাখল। তারপর রামের দিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখল আগুনের তাপে ঝলসে গেছে রামের শরীর। সুদর্শন রামকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বলল, ‘ভয় নেই। তুমি বেঁচে গেছ। আমি তোমার চিকিৎসা করছি।'
রাম বিছানায় শুয়ে চোখ বুজিয়ে ফেলল। তার শরীর ঘিরে এমন একটা যন্ত্রণা তখন দাপাদাপি করছে যাতে তার চোখ খুলতে, এমনকী কথা বলতেও খুব কষ্ট হচ্ছিল।
সুদর্শন বর্মা রামকে চিকিৎসা করতে করতে জিজ্ঞেস করল, ‘রাম, তোমার কষ্ট হচ্ছে জানি, তবুও এখনই তোমার মুখ থেকে কিছু কথা আমার জানা দরকার। সুস্থ হবার পর হয়তো কিছু কিছু কথা তুমি ভুলেও যেতে পারো। আমি টেপরেকর্ডার খুলে রেখেছি। কষ্ট করে হলেও বলো, পোশাক পরার পর তোমার কেমন মনে হল!'
চোখ খুলে রাম অতিকষ্টে সুদর্শন বর্মার দিকে তাকাল। সুদর্শন বর্মার চোখ দুটির ভাষা সে বুঝতে পারছে। ওই চোখ দুটি তাকে নিঃশব্দে তাগাদা দিয়ে বলছে, ‘রাম বলো, বলে যাও তোমার অভিজ্ঞতার কাহিনি।’
রাম মনে মনে ভাবল, সুদর্শন বর্মার কাছে ওই পোশাক আবিষ্কার ছাড়া আর কোনও কাজের কোনও মূল্য নেই। এমনকী, সে যদি মরেও যায় তা হলেও বুঝি সুদর্শনের কিছু যায় আসে না। সে গলায় অভিমান ফুটিয়ে বলল, ‘আমি যদি মরে যাই সেজন্যই বুঝি আমার কথা ওই যন্ত্রে ধরে রাখতে চাইছেন?’
সুদর্শন বর্মা বলল, ‘তোমার অনুমান মিথ্যা নয়। যদিও তোমার মরে যাবার কোনও আশঙ্কা নেই। মনে রেখো আগের চাইতে এখনকার রামের গুরুত্ব আমার কাছে অনেক বেশি।
রাম একটু চুপ করে থেকে বুক ভরে নিশ্বাস টানল। ধীরে ধীরে সেই নিশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বলল, ‘পোশাকটা পরার পর সবকিছু ধোঁয়া ধোঁয়া লাগছিল। আপনার কথামতো যেইমাত্র লাল বোতামটা টিপলাম ঠিক তখন থেকেই ধোঁয়া ধোঁয়া ভাবটা কেটে গেল, কিন্তু শরীরটা গরম হতে লাগল। আমি আপনাদের সব দেখতে পাচ্ছিলাম। এমনকী, মাথার ওপর হাত তুলে আপনার নাচও। তখন আমার শরীরটা জ্বলে যাচ্ছে। যেন পোশাকটা থেকে আগুনের হলকা বেরোতে লেগেছে। কিন্তু যেইমাত্র নীল বোতামটা টিপলাম, তখন জ্বালা একটু কমলেও শরীরটা ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। যেন পোশাকটা আমায় কেবলই ঝাঁকি দিচ্ছে। সে এক দারুণ কষ্ট। তারপর পোশাকটা খুলে ফেলতেই সেই ঝাঁকুনিটা কমল।'
টেপরেকর্ডারটা বন্ধ করে সুদর্শন বর্মা উঠে দাঁড়াল। কপালে হাত ঘষতে ঘষতে ঘরের মধ্যে অস্থিরভাবে খানিকক্ষণ পায়চারি করে সুদর্শন বর্মা গিয়ে বসল তার কাজের টেবিলে। যেন একটা কঠিন অঙ্ক মেলাবার চেষ্টায় অধীর সুদর্শন বর্মা আবার গিয়ে পড়ার টেবিলে বসে পড়ল।
হরিশপুর গ্রামের বটতলায় এক সাধু এসেছে। দিব্যি লম্বা-চওড়া দেখতে, পরনে লাল রঙের আলখাল্লার মতো পোশাক। মাথায় জটা, কপালে রক্তবর্ণের ফোঁটা আর জটার মধ্যে গোঁজা ধুতরো ফুল। কেউ বলে, সাক্ষাৎ শিব, কেউ-বা বলে কাশী থেকে কাশ্মীর যাবার পথে হরিশপুরে এসেছেন। পুবপাড়ার গোপাল গড়ুই নাকি বাবাকে হাতে-পায়ে ধরে গ্রামে এনেছেন। দু'-তিন দিনের মধ্যে গোটা গ্রামে কথাটা এমন করে রটে গেল যে, সবাই দল বেঁধে ছুটল সাধুকে দেখতে।
সাধু চোখ বুজে বসে থাকে, এক-একজন করে তার সামনে এসে দাঁড়ায়। বেদির সামনে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে। কিন্তু যেই মাটি থেকে মাথা তোলে অমনি সাধু চোখ খুলেই তার নাম-ধাম বলে দেয়। যে যা জিজ্ঞেস করে তার উত্তরে সাধু শুধু বলে, ‘যেমন কর্ম করবি তেমন ফল পাবি।’ সাধু সবাইকে সব বলে না, কিন্তু যাদের যা বলেছে সব ঠিক ঠিক বলেছে। ছেলের জন্য রামের মা গিয়ে পড়েছিল সাধুর কাছে। সাধু চোখ না খুলেই বলল, ‘তুই এসেছিস তোর একটা মাত্র ছেলে রামের খোঁজ করতে, তাই না?’
ভক্তি, বিশ্বাস আর আবেগে রামের মা ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে বলল, ‘ছেলেডা আমার মরে গেছে না বেঁচে আছে তাই জানতে।'
সাধু চোখ বুজেই উত্তর দেয়, ‘তোর রাম বেঁচে আছে। ভাল আছে। রাবণ বধ করে গাঁয়ে ফিরবে।'
রামের মায়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ার ধারে দাঁড়ানো শ'খানেক দর্শনার্থীরা সে-কথা শুনে কেঁপে ওঠে। সাধু বলে, ‘তোর কোনও ভয় নেই। তোর ছেলে তোর কাছে ফিরে আসবে। তোর ছেলেকে ভেলা করে জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সে মরেনি, বেঁচে আছে।'
সেই সাধুই একদিন হোম-যজ্ঞ করে বলল, ‘গাঁয়ের মানুষ সাবধানে থেকো। আগামী অমাবস্যা থেকে এই গ্রামে ভূতরাজের আবির্ভাব ঘটবে। ভূতরাজ হচ্ছে দুনিয়ার সমস্ত ভূতেদের রাজা। ওঝা-বদ্যিতে তাকে তাড়ানো যাবে না। যারা পাপ করেছ, অন্যায় করেছ তারা সাবধান। যারা মানুষের কোনও ক্ষতি করোনি তারা নির্ভয়ে থাকতে পারো।'
এমন সাধুর কথা ফ্যালনা হতে পারে না। অতএব, গোটা হরিশপুর ভয়ে আর উত্তেজনায় কাঁপতে লাগল। হাটে-বাজারে, নদীর ঘাটে, মাঠে, মন্দিরে, স্কুলে, বাবুদের বৈঠকখানায় সর্বত্র একই আলোচনা। অমাবস্যা আসতে কত দেরি? কী ঘটবে গ্রামে? ভূতরাজ কার মাথা নেবেন সবার আগে?
পঞ্চায়েত ডাকা হল। চৌধুরীবাবুরা বললেন, ‘এযুগে ওসব কথায় কান দিয়ো না। তবে সবাই একটু সামলে সুমলে থেকো।'
দত্তবাবুরা ফতোয়া দিলেন, ‘সাধুটাকে গ্রাম থেকে হটাও। ওই ব্যাটাই বুঝি এসব করাচ্ছে।'
গাঁয়ের অন্য লোকেরা একযোগে বলল, ‘সাধু তো কোনও অন্যায় করেনি। তারে হটিয়ে পাপ করতে যাব কেন। সে শুধু সাবধান করে দিয়েছে।'
অনেক তর্ক আর এলোমেলো কথার পর ঠিক হল, গ্রামের মঙ্গলের জন্য অমাবস্যার দিনই বিঘ্ননাশের পুজো হবে। অমাবস্যা লাগার আগেই পুজো শেষ করে দিতে হবে। কিন্তু সে পুজো কে করবে?
দত্তবাবু বললেন, ‘আমি বীরপাড়া থেকে এমন লোক এনে দেব, সে ভূত-প্রেত অপদেবতাদের নখের আঙুলে নাচায়। তাকে দিয়ে গ্রামবন্ধন করাব।'
দত্তবাবুর প্রস্তাবে সবাই সায় দিল। কেবল নগেন মণ্ডল বলল, ‘তা ওই সাধুকেই যদি পিতিকারের উপায় বার করে দিতে বলি তা হলে কেমন হয়?’
বাবুরা বললেন, ‘ও ব্যাটা নাকি গ্রামবন্ধন করতে জানে না।'
বীরপাড়া থেকে পুরোহিত এসে গেলেন সাতসকালে। বেশ দশাসই চেহারা। দেখলে প্রথমে ভয়, তারপর ভয়ের জন্য ভক্তির উদয় হয়। নৌকো থেকে নেমে গ্রামে পা দিয়েই বললেন, ‘এই তোদের গ্রাম। দক্ষিণে নদী, উত্তরে জঙ্গল, পুব দিকে শস্যক্ষেত্র আর পশ্চিমে লোকালয়। তা তোদের শ্মশান আর কবরস্থান কোথায়? ওখান থেকে একমুঠো মাটি আনতে হবে।'
পুজোর আয়োজন হয়েছিল কালীমন্দিরের পিছনের মাঠে। সেখানে এসে চারদিকে তাকিয়ে বাঁ হাত গালে দিয়ে আঙুলগুলো নাড়তে নাড়তে গাল বাজিয়ে বিকট আওয়াজ করলেন, তারপর ‘ব্যোম ব্যোম ভোলানাথ’ বলে বারতিনেক বুক কাঁপানো আওয়াজ ছেড়ে বসলেন পুজোতে।
পুরো তিন ঘণ্টা পুজো করে তিনি দক্ষিণার পাত্রের দিকে তাকালেন। সেইদিকে ক্ষণকাল তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘কই দত্তবাবু, চৌধুরীবাবুরা কোথায়?’
ওঁরা করজোড়ে এগিয়ে এসে বললেন, 'আজ্ঞে, আপনার পেছনে।'
পুরোহিত বললেন, ‘পিছনে থাকলে চলবে না। সামনে এসে দক্ষিণাপাত্রের দিকে দেখুন।
এ দিয়ে তো মশা তাড়ানো যায় না মশাই, অথচ আপনারা বলছেন গ্রামবন্ধন করবেন, ছিঃ!' ওঁরা বললেন, ‘ওটা গাঁয়ের মানুষরা দিয়েছে। আসল দক্ষিণা তো আমাদের পকেটে।' পুরোহিত বেশ তেতো গলায় বললেন, ‘তা হলে এবার পকেট থেকে বার করে ব্রাহ্মণের হস্তে সমর্পণ করুন।'
দত্তবাবু আর চৌধুরীবাবুদের পকেট থেকে দক্ষিণার নামে যে টাকা বেরোল সেটা দেখে পুরোহিত বেশ খুশি হলেন। আশীর্বাদের ভঙ্গি করে বললেন, ‘প্রীত হলেম। দীর্ঘজীবী হও। এবার দানসামগ্রীটা দেখি। যা চর্মচক্ষে দেখা যাচ্ছে তাই, নাকি এর বাইরেও কিছু আছে?’
চৌধুরীবাবু বললেন, ‘এটা তো গ্রামের ব্যাপার তাই সবার কাছ থেকেই কিছু কিছু নিয়ে দানসামগ্রীর ব্যবস্থা হয়েছে। আমরা যে ক’ঘর গ্রামের মাথা, তাদের উদ্যোগে আরও কিছু বাড়তি ব্যবস্থা রয়েছে আপনার জন্য।'
পুরোহিতমশাই তাঁর বিশাল শরীর কাঁপিয়ে তারস্বরে হাসলেন। তারপর গ্রামবন্ধন সেরে পুজোর কাজ শেষ করে সদর্পে এসে বসলেন চৌকির ওপর। পা জোড়া নাচাতে নাচাতে বললেন, ‘অমাবস্যা লাগতে এখনও ছত্রিশ মিনিট বাকি। এমনভাবে গাঁয়ের চারপাশ বেঁধে দিয়েছি যে ভূতের বাপের চোদ্দোপুরুষের ক্ষমতা নেই গাঁয়ে পা রাখে। আমার নাম রামহরি চক্কোত্তি।'
চক্রবর্তীমশায়ের কথা শেষ হবার পর কার্তিক ছুটে এসে বলল, ‘বটতলার সাধু বলেছেন, বাইরে থেকে যতই গাঁ বাঁধুক, ভূতরাজকে ঠেকাতে পারবে না। পাপ রয়েছে গাঁয়ের ভিতরে, তাদের পাপই ভূতরাজরে টেনে আনতেছে।'
পুজোর সময় যারা হাজির ছিল তারা সবাই পুরোহিতমশায়ের দিকে কাতর চোখে তাকাল। পুরোহিতমশাই চারপাশটা দেখে নিয়ে কার্তিককে দেখিয়ে বললেন, ‘এ ছোকরাটা কে? এর কথায় তোরা ভয় পাচ্ছিস? ওই বটতলার সাধুকে আমি গ্রামছাড়া করে দিতে পারি জানিস? এখান থেকে বসে মন্ত্র ছাড়লে দশ ক্রোশ পর্যন্ত সেই মন্ত্রের তেজ চলবে। আমি নিজে হাতে গ্রামবন্ধন করেছি, ভগবানও আমার অনুমতি ছাড়া ডিঙোতে পারবে না। তোরা নিশ্চিন্তে ঘরে গিয়ে ঘুমো।'
কথা শেষ করে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে সবার দিকে একবার তাকিয়ে পুরোহিতমশাই সিগারেট ধরালেন। ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘এমন বাণ আমার হাতে আছে যা ছাড়লে কাটা পাঁঠার মতো দাপাতে দাপাতে তোদের সাধু এসে পড়বে আমার পায়ের কাছে।'
পুরোহিতমশাই পা নাচাতে নাচাতে কার্তিকের দিকে তাকালেন। ঠিক তখনই একতাল পচা গোবর এসে পড়ল পুরোহিতের চকচকে টাকের ওপর।
সবাই তো অবাক! পুরোহিত মাথায় হাত দিয়ে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে বললেন, ‘এই অপকর্মটা কে করলে? কোন অর্বাচীনের এমন স্পর্ধা?’
চক্রবর্তীমশাই লাফ দিয়ে চৌকি থেকে নীচে নামলেন। পৈতেতে আঙুল জড়িয়ে বললেন, ‘রক্ষা নেই। ধ্বংস অনিবার্য।'
পৈতে হাতে বীরদর্পে হুংকার দিয়ে দাঁড়াতেই হঠাৎ তাঁর কাছা খুলে গেল। চক্কোত্তিমশাই বিশাল শরীর কাঁপিয়ে বলতে লাগলেন, ‘কে? কে আমাকে কাতুকুতু দিচ্ছে? কে তুই?’
চক্রবর্তীর পিছন থেকে আওয়াজ এল, ‘ভূতরাজ। তোর বন্ধন ভেঙে তোর কাছেই চলে এলাম। গাঁয়ের মানুষ ঠকাবার ব্যাবসা বন্ধ কর। নইলে...'
চক্রবর্তীমশাই লাফাতে লাগলেন। চিৎকার করে বলতে লাগলেন, ‘কে, কোন নরাধম গায়ে বিছুটি দিচ্ছে? কে তুই?’
আবার সেই কণ্ঠস্বর বলল, 'সত্যি কথা বললে তোকে ছেড়ে দেব। বল তোকে কে এনেছে আর কী শিখিয়ে এনেছে?’
সত্যি সত্যি একগুচ্ছ বিছুটি পাতা শূন্যে ভেসে এসে পুরোহিতের গায়ে লাগছে। দেখলে মনে হবে কেউ যেন হাতে করে লাগিয়ে দিচ্ছে। অথচ কে দিচ্ছে সেটা দেখা যাচ্ছে না।
চক্রবর্তী-পুরোহিত হঠাৎ ভ্যা করে কেঁদে ফেলে বললেন, ‘দত্তবাবু এনেছে। বলেছে গ্রাম বেঁধে দিতে।'
সেই কণ্ঠস্বর জিজ্ঞেস করল, ‘আর?’
একটু থেমে সারা শরীর চুলকোতে চুলকোতে সবার দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললেন, 'আর বলেছে, বনবিবির মাঠের ওপর থেকে বসতিগুলোকে তুলে দিতে হবে। ওখানে দেবীর দৃষ্টি রয়েছে। না উঠলে সবাই নির্বংশ হবে।'
সেই কণ্ঠস্বর শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘এ-কথা কি সত্যি?’
পুরোহিত প্রায় কেঁদে ফেলার জোগাড়। হাতজোড় করে বললেন, ‘সত্যি নয়। আমাকে শিখিয়ে দিয়েছে।'
দত্তবাবু আর চৌধুরীবাবুরা একসঙ্গে বলে উঠলেন, ‘ভয় পেয়ে পুরুতমশায়ের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। যা মনে আসছে বানিয়ে বানিয়ে বলে যাচ্ছে। চলো হে বাড়ি যাই।'
এরকম একটা ঘটনার কথা গ্রামে ছড়াতে বেশি সময় লাগল না। সবাই মেনে নিল, ভূতরাজ এসে গেছেন। এবার পাপীদের আর রক্ষা নেই। কিন্তু কে পাপী আর কে পাপী নয় সেসব হিসাবের চাইতে বড় হয়ে উঠল ভয়। গোটা গ্রাম জুড়ে থমথম করতে লাগল একটা দমবন্ধ করা ভয়। এমন একটা ব্যাপার যে ঘটতে পারে সেটা গ্রামের লোকেরা চোখে দেখেছিল বলে ষোলোআনা বিশ্বাস করেছে। কিন্তু যারা দেখেনি তারা লোকের মুখে মুখে বারবার শুনে শুনে আরও বেশি ঘাবড়ে গেল। দত্তবাবু, চৌধুরীবাবু আর ভট্টাচার্যপাড়ার দুর্গাপদ ভট্টাচার্য দফায় দফায় ঘরে দরজা বন্ধ করে মিটিং করতে লাগলেন। দত্তবাবুর তো আহার-নিদ্রা প্রায় নেই বললেই চলে।
কিন্তু সময় তো থেমে থাকে না। সময় এগোতে থাকে আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একের পর এক আসতে থাকে ভূতরাজের নানা কাণ্ড-কারখানার রোমহর্ষক বিবরণ। দুপুরবেলা পরিতৃপ্তির সঙ্গে আহার করে চৌধুরীমশাই শুয়েছেন বেতের আরামকেদারায়। ছোট্ট জলচৌকির ওপর পা তুলে দিয়েছেন, যেমন তিনি রোজ দেন। একটা ছেলে আদুল গায়ে চৌধুরীমশাইয়ের পা টিপছিল। সেই সময় পড়ি-মরি করে ছুটে এল বরদাকান্ত। বরদা চৌধুরীমশাইয়ের বিষয়-আশয়, হিসেবপত্র, এসব দেখাশোনা করে। বাবুর সামনে ভ্যা করে কেঁদে ফেলে বলল, ‘সব্বোনাশ হয়ে গেছে কর্তাবাবু! ভূতরাজের দৃষ্টি পড়েছে আমার ওপর।'
চৌধুরীমশাই কেঁপে উঠে বললেন, ‘সে কী। কী হয়েছে?'
বরদাকান্ত বলল, ‘বনবিবির মাঠের ওই পাড়া থেকে সুদের তাগাদা করে ফিরছি। আপনার কথামতো বলে এলাম, তিনদিনের মধ্যে টাকা না দিলে ভিটে ছাড়তে হবে। সবাই কাঁদতে লাগল। আমি যেই না পাড়া থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমেছি অমনি আমার হাতের ছাতাটা কে যেন হাত থেকে আচমকা টেনে নিল। তাকিয়ে দেখি ছাতাটা শূন্যে ঝুলছে। ভয় পেয়ে দৌড়তে যাব, তখন আমার ছাতার হাতল দিয়ে আমারই গলা টেনে ধরে ভূতরাজ বলল, আসলের চাইতে দশগুণ সুদ নিয়েও তোর কর্তাবাবুর খিদে মেটে না। এবার তোর বাবুকে যমের বাড়ি যেতে হবে।'
চৌধুরীবাবু বললেন, ‘তারপর? তুমি কী কইলে?’
বরদাকান্ত বলল, ‘কইবার আর উপায় ছিল না। আমার ছাতা দিয়ে আমার পিঠেই মোক্ষম কয়েক ঘা বসিয়ে দিয়ে বলল, ফের যদি তাগাদা করতে এপাড়ায় আসিস তা হলে তোকে শ্যাওড়া গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখব।'
চৌধুরীমশাই কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ‘তার মানে?’
বরদাকান্ত বগলের খাতা চৌধুরীবাবুর পায়ের কাছে নামিয়ে রেখে বলল, ‘মানে-টানে জানি না। এই রইল ঝোলা, চলল ভোলা।'
বরদাকান্ত আর একমুহূর্ত দাঁড়িয়ে না থেকে প্রায় এক দৌড়ে চৌধুরীবাড়ির সীমানা ডিঙিয়ে গেল।
দিনতিনেকের মধ্যে হরিশপুর গ্রামের নানা জায়গায় নানারকম ঘটনা ঘটতে লাগল। দীনবন্ধু সাঁতরা রোজ সকালে তার মুদিখানার দোকানে বসে গোটাদশেক পুরি, মোহনভোগ আর বিষ্টু ময়রার দোকানের গরম জিলিপি দিয়ে জলখাবার খায়। দোকানে কাজ করে যে ছেলে দুটো তারা জুলজুল করে রোজ সেই দৃশ্য দেখে। ওদের জন্য বরাদ্দ আছে এক ছটাক মুড়ি একটুকরো ভেলিগুড়। একবার নবীন মুড়ির সঙ্গে দুটো বাতাসা নিয়েছিল বলে দীনবন্ধু তাকে নুনের বস্তার ওপর শুইয়ে জুতো পেটা করেছিল। তা সেদিনও দীনবন্ধু এনামেলের থালার ওপর গরম গরম পুরি আর মোহনভোগ নিয়ে বসেছে। বিষ্টু ময়রার দোকানের ছেলেটা এসে শালপাতার ঠোঙায় জিলিপিটা সবে রেখেছে। হঠাৎ জিলিপর ঠোঙাটা উধাও! দিব্যি দেখা যাচ্ছে সেটা তারই সামনে শূন্যে ঝুলছে। দীনবন্ধুর গলা শুকিয়ে এল। সে শুধু অস্ফুটে বলল, ‘আমার জিলিপি!’
হঠাৎ দীনবন্ধুর সামনে থেকে কে যেন তুলে নিল গরম পুরি আর মোহনভোগ দিয়ে সাজানো থালাটা। ঢোক গিলে কাতরকণ্ঠে দীনবন্ধু বলল, ‘রাম! রাম! রাম!'
হঠাৎ শূন্য থেকে তার সামনে এসে পড়ল এক ছটাক মুড়ি আর একটুকরো ভেলিগুড়। হাওয়ার মধ্যে থেকে গর্জন শোনা গেল, ‘দীনবন্ধু, আজ তুমি গুড় আর মুড়ি খাও। এটা খাবে তোমার দোকানের কর্মচারী দুটো। যারা খাটে খাদ্য তাদের দরকার।'
দোকানের ছেলে দুটোর নাম নবীন আর সুদামা। ওরা তো ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে। গরম পুরি, মোহনভোগ আর জিলিপির ঠোঙা ওদের সামনে। হাওয়ার ভেতর থেকে গর্জন উঠল, দীনবন্ধু, ওদের খেতে বলো।'
দীনবন্ধু ঢোক গিলে ছলছল চোখে করুণ গলায় বলল, ‘খা, খা, তোরা খা, আমার পুরি, মোহনভোগ আর জিলিপি ভাল করে খা। আমি আজ খাব না।'
হাওয়ার মধ্যে আবার গর্জন শুনতেই দীনবন্ধু বলল, 'না, না, আমিও খাব, মুড়ি আর ভেলিগুড়।'
নবীন আর সুদামা দু'জনেই টের পেল কে যেন তাদের পিঠে হাত বুলিয়ে বলে যাচ্ছে, ‘তোদের ভয় নেই। তোরা খা।'
অভয় পেয়ে ওরা পুরি আর মোহনভোগ খাচ্ছে আর সেটা দেখতে দেখতে দীনবন্ধু ভেলিগুড়ের টুকরোয় কামড় দিয়ে মনে মনে বলছে, ‘ঘোর কলি শুরু হয়ে গেছে। মালিক খাচ্ছে গুড়-মুড়ি আর আমারই দশ টাকার চাকররা খাচ্ছে মোহনভোগ!’
গুড়-মুড়ি খেতে খেতেই দীনবন্ধু ‘আঁক’ করে উঠল। মনে হল কেউ যেন তার ঘাড়ের মধ্যে একটা রদ্দা বসিয়ে দিয়েছে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখবার সাহস হল না। কিন্তু পেছন থেকে হুকুম এল, ‘এখন থেকে রোজ সকালে তুই যা খাবি ওদেরও তাই খেতে দিবি। একদিন ভুল হলে...'
ভূতরাজের কথা শেষ হল না। কিন্তু দীনবন্ধু আবার আগের মতো আঁক করে কাতরে উঠল।
গাঁয়ের মোড়ল দত্তবাবুর বাড়িতেও একটা বিশ্রী ব্যাপার ঘটে গেল। দত্তবাবুর ছেলে গরদের পাঞ্জাবি পরে, গলায় সোনার চেন ঝুলিয়ে যাচ্ছিল জ্যাঠার বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে। গেটের বাইরে রিকশ দাঁড়িয়ে। মোড়লের ছেলে যেইমাত্র বারান্দা থেকে উঠোনে নেমে এসেছে অমনি উঠোনের কোণে ডাঁই করে রাখা চ্যালাকাঠের ভেতর থেকে একটা চ্যালাকাঠ উঠে এসে ছেলেটার গায়ে এলোপাথাড়ি মারতে লাগল। ছেলেটা তো ‘ওরে বাবা রে, মা রে, মেরে ফেললে রে’, বলে চিৎকার জুড়ে দিল। চিৎকার শুনে বাড়ির থেকে সবাই ছুটে এসে দৃশ্যটা দেখে ভয়ে আর আতঙ্কে পাথর হয়ে গেল। মোড়লের বউ বলল, ‘ওগো বন্দুক আনো।'
মোড়ল চিৎকার করে বললেন, ‘বন্দুক এনে মারব কাকে? তোমাকে?’
মোড়লের ছেলে পরিত্রাহি চিৎকার করে বলছে, ‘বাবা গো, বাঁচাও গো, ও বাবা গো।' মারের চোটে ছেলেটা হুমড়ি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল সদর দরজার সামনে। আর কী আশ্চর্য, তখনই সদর দরজা দিয়ে একগাদা মশারি আর চাদর কেচে নিয়ে বাড়ির ভিতর ঢুকছে রামের মা বরখা। মোড়লের ছেলেটা পড়ল গিয়ে তারই পায়ের সামনে। শূন্যে চ্যালাকাঠটা স্থির হয়ে রইল, তারপর কেউ ছুড়ে ফেললে যেমন হয় তেমন ভাবেই চ্যালাকাঠটা উড়ে গিয়ে পড়ল উঠোনের কোণে।
এই ঘটনার পর আর স্থির থাকা যায় না। দত্তবাবু পঞ্চায়েত ডাকলেন। গ্রামের লোকেরা তো ভয়েই জড়সড়, কেউ কোনও কথা কইল না। যা বলবার একনাগাড়ে বলে গেলেন দত্তবাবু আর চৌধুরীবাবু। স্থির হল পুলিশ, বিডিও আর মহকুমাশাসককে গ্রামে ডাকা হবে। এই অত্যাচারের প্রতিকার ওঁদেরই করে দিতে হবে। এভাবে তো থাকা যায় না।
চৌধুরীমশাই গিলে করা পাঞ্জাবির হাতাটা একটু গুটিয়ে নিয়ে বললেন, 'আমার মনে হচ্ছে বটতলার ওই সাধুটার কোনও কারসাজি আছে। ভূতরাজকে ওই বোধহয় পথ দেখিয়ে এনেছে।'
দত্তবাবু মাথা নাড়লেন। তার সঙ্গে সায় দিল দীনবন্ধু সাঁতরা, আর ভট্টাচার্যপাড়ার দুর্গাপদ ভট্টাচার্য।
বনবিবিপাড়ার সুবল আর ওদের ভিতর থেকে একজন শুধু বলল, ‘ওই সাধুরে নিয়ে টানাটানি করে লাভ হবে না। তার চেয়ে সবাই গিয়ে তার পায়েই মাথা রাখি।'
চৌধুরীমশাই হুংকার দিয়ে বললেন, ‘রাখতে হয় রাখগে যা। আমি অত সহজে ওকে ছাড়ব না। কোনও মতলবে ওই সাধু এই গাঁয়ে এল? আমাকে খোঁজখবর নিতে হবে। গ্রামের স্বার্থে, দশের কল্যাণে সাধুকে যদি তাড়াতে হয় তা হলে তাড়াব।'
অতি সাধারণ লোক যারা এসেছিল তারা মনে মনে প্রমাদ গুনল, কিন্তু বাবুদের মুখের ওপর কিছু বলবার আর সাহস পেল না।
সভা শেষ হবার পর দত্তবাবু, চৌধুরীবাবু আর ভট্টাচার্যবাবুদের দলটা গিয়ে বসল চৌধুরীবাবুর বৈঠকখানায়। দরজা-জানলা বন্ধ করে ওঁরা আলোচনা শুরু করলেন। আলোচ্য বিষয় একটাই, সাধুটাকে শায়েস্তা করতে হবে। গাঁয়ের যাঁরা মাথা তাঁদেরও কোনওরকম পাত্তা দেয় না ওই সাধু। অতি সাধারণ লোকের দেওয়া খাবার খায় অথচ বাবুদের দেওয়া জিনিসপত্র ফেরত পাঠায়। এসব মন্তর-টন্তর ওই সাধুটাই দিচ্ছে। নানা আলোচনার পর ঠিক হল, দুর্গা ভট্টাচার্য কেরোসিনের টিন নিয়ে মাঝরাত্তিরে যাবে বটতলায়। চৌধুরী আর দত্তদের লোক থাকবে আড়ালে। সাধুর আখড়ায় আগুন ধরিয়ে দিলে সাধু যেই বেরিয়ে আসবে অমনি দত্তবাবু আর চৌধুরীবাবুর লোকেরা লাঠি চালাবে সাধুর মাথায়। দুই লাঠিতেই সাধুর ভবলীলা সাঙ্গ হবে।
নদীর পাড়ে তখন থিকথিক করছে অন্ধকার। জঙ্গলের ঝোপে একদঙ্গল জোনাকি জমাট বেঁধে আছে। নদীর দিক থেকে কোনও শব্দ নেই। গোটা গ্রাম অঘোরে ঘুমোচ্ছে। দুর্গা ভট্টাচার্য এসে দাঁড়ালেন বটগাছের পেছনে। তাঁর হাতে কেরোসিনের টিন। দু’জন লাঠিয়াল মাথায় গামছা বেঁধে তৈরি। দুর্গাবাবু পা টিপে টিপে এগোলেন। ভালভাবে বুঝে নিলেন সাধু ঘুমোচ্ছে কি না। কেরোসিনের টিনটা ব্যাগ থেকে বার করে মাটিতে রাখলেন। সাধুর বেড়ার ঘরে কান পাতলেন। বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঘরের অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। কোনও শব্দ নেই। হঠাৎ তাঁর মনে হল তাঁর গায়ে ওপর থেকে কী একটা তরল পদার্থ পড়ল। গন্ধটা কেরোসিনের। হাত বাড়িয়ে নিজের টিনটাকে খুঁজে পেলেন না। নিচু হয়ে খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে বিপদ বাড়ল। গোটা মাথায় গলগল করে কেউ যেন কেরোসিন ঢেলে দিল। ভয় পেয়ে উঠতে যাবেন, ঠিক তখনই এক ধাক্কায় চিৎপাত করে তাঁকে ফেলে দিল। কেউ বুঝি তাঁর বুকে পা দিয়ে দাঁড়াল। চাপা গর্জন করে কে যেন বলল, ‘এবার যদি তোকে পোড়াই তা হলে কে তোকে বাঁচাবে? দত্তবাবু না চৌধুরীবাবু।'
দুর্গা ভট্টাচার্য ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেলে বললেন, ‘বড় অন্যায় হয়ে গেছে বাবা। এ যাত্রা জীবন দান করলে আর জীবনে এমন করব না।'
মনে হল বুকের ওপর থেকে পা দুটো নেমে গেল। দুর্গা ভট্টাচার্য ভাল করে নিশ্বাস নেবার চেষ্টা করলেন। ততক্ষণে অন্ধকার বটতলার ওদিক থেকে দুই লেঠেলের হাউ হাউ কান্না ভেসে আসছে। দুর্গা ভট্টাচার্য বুঝলেন, এবার লেঠেলদের পালা। আমার মানে মানে পালিয়ে যাওয়াই ভাল।
দুর্গাপদ প্রথমে উঠে দাঁড়ালেন। কপালে হাত ঠেকিয়ে বার-দুই প্রণাম করে খুব সন্তর্পণে এক পা দু’পা করে কয়েক পা এগিয়ে এসেই ভোঁ-দৌড় মারলেন নিজের বাড়ির দিকে। বাড়িতে আসার পর টের পেলেন পরনের কাপড়, যেটি দু'ভাঁজ করে পরেছিলেন সেটি কাদায় আর জলে অন্যরকম চেহারা নিয়েছে। তাঁর নিজের শরীর থেকে কেরোসিনের বিকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। গভীর আক্ষেপের সঙ্গে তাঁর মনে হল, এই দুর্দিনের বাজারে নিজের তেল নিজের গায়েই ঢালতে হল।
দুর্গাপদর দুর্গতির খবর পেয়ে বাবুমহলে ভয় আর ভাবনা বেড়ে গেল। সকলে মোটামুটি নিশ্চিত যে, এই ভূতরাজের পেছনে সাধুর কোনও কারসাজি আছে। অথচ, সে ব্যাপারটা প্রমাণ করার কোনও উপায় নেই। টাকা-পয়সা, ভাল ভাল খাবার, ভাল বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা, নানারকম লোভ আর খোশামোদ করেও সাধুকে বাগে আনতে পারছে না বাবুরা।
অথচ ওই সাধুর আশকারা পেয়ে গাঁয়ের কিছু লোকজন দিনদিন অন্যরকম হয়ে উঠছে। গাঁয়ের হাভাতে হাঘরে লোকেদের সঙ্গে ওঠা-বসা করে ধীরেন মণ্ডল। তেমনই একজন হিরুভাই কারও কারও হিরুকাকা। সে ব্যাটা আগ বাড়িয়ে সদরে গিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটসাহেবকে নাকি কীসব বলে এসেছে। আগে হলে ওর মাথা ভেঙে দেওয়া যেত, কিন্তু এখন ভূতরাজের জন্য কিছু করার উপায় নেই। ওটার যেন সহস্র চোখ। ভূতরাজ সব ব্যাপারেই বড্ড বেশি নাক গলাচ্ছে। ভাব দেখে মনে হয় যেন ভোটে নামবে। ভূতেরা কি ভোটেও নামে নাকি? ভূতুড়ে ভোট আছে জানি, তাই বলে ভূত কি ক্যানডিডেট হতে পারে?
সেদিন কাজের পর সবাইকে এক কিলো করে গম দেওয়া হচ্ছিল পঞ্চায়েত অফিস থেকে। নিখুঁতভাবে অত লোককে মেপে মেপে দেওয়া যায় না। একটা বাটি এমন তৈরি করা হয়েছে যাতে পৌনে এক কিলোর মতো গম ধরে। সেই বাটি করেই দেওয়া হয়, হয়ে আসছে এত দিন। এ নিয়ে কেউ কোনও কথা বলেনি। সেদিন খোদ দত্তবাবুর সামনে অঘটনটা ঘটল। যেই বাটি থেকে ওদের আঁচলে অথবা গামছায় গম ঢেলে দেওয়া হচ্ছে ঠিক তখনই কোত্থেকে আর-একটা বাটি শূন্যে এসে উদয় হচ্ছে এবং তার থেকেও ঝুরঝুর করে গম পড়ছে ওদের আঁচলে আর গামছায়। দত্তবাবু হায় হায় করে উঠতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু উঠতে পারলেন না। কেউ যেন তাঁকে জোর করে বসিয়ে দিল। দত্তবাবু পরিষ্কার শুনলেন, তাঁর কানের কাছে কেউ যেন বলল, ‘অনেকদিন সরকারি গম আর চাল চুরি করে নিজের বাড়িতে জমিয়েছ। এবার থেকে এসব করলে মাথা ফাটিয়ে নদীর জলে ভাসিয়ে দেব। চুপচাপ বসে থাকো।'
কথা শেষ করেই কেউ যেন প্রাণভরে তাঁর দুই কান বেশ কড়াভাবে মলে দিল।
দত্তবাবু মনে মনে কুপিত হয়ে ভাবলেন, হলই-বা ভূতের রাজা ভূতরাজ, কিন্তু এটা কি ঠিক ভূতুড়ে আচরণ। ভূত তো সবাইকে ভয় দেখায়, রেগে গেলে ঘাড় মটকায়, না হয় কারও ওপর ভর করে। কিন্তু এমন প্রথাবিরোধী, শাস্ত্রবিরোধী ভূতের কথা ইতিপূর্বে তো শুনিনি। এ আবার কেমনধারা ভূত!
দত্তবাবু তাঁর নিজের চেয়ারে গুটিশুটি মেরে বসে রইলেন। কান দুটো বেজায় জ্বালা করছে। কিন্তু তার থেকেও বেশি জ্বালা ধরাচ্ছে সামনের ওই দৃশ্যটা। প্রতিটি আঁচলে আর গামছায় বাড়তি প্রায় হাফ কিলো করে গম শূন্য থেকে ঝরে পড়ছে। ফাউ পেয়ে গরিব লোকগুলো ‘জয় ভূতরাজ বাবা, জয় হোক তোমার’ বলে সমস্বরে জয়ধ্বনি দিচ্ছে। আর ওদের জয়ধ্বনিতে গোটা শরীর জ্বলে যাচ্ছে দত্তবাবুর। মনে মনে ভাবছেন, এ এমন একটা শত্রু এসে জুটেছে যাকে দেখা যায় না, মারা যায় না, এমনকী, যার বিরুদ্ধে থানা-পুলিশও করা চলে না। ভূত-প্রেতরা যে কবে থেকে সরকারি চাল-গমের ওপর খবরদারি করতে আরম্ভ করেছে কে জানে। এ-দৃশ্য চোখে দেখা যায় না বলে দত্তবাবু চোখ বুজে রইলেন আর মনে মনে ভাবতে লাগলেন, ডি এম, এস ডি ও আর পুলিশ সুপাররা কি এই ভূতরাজকে শায়েস্তা করতে পারবেন?
চৌধুরীবাবুদের উঠোনে শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। তার নীচে গদি-আঁটা তিনখানা চেয়ার। টেবিলের ওপর ফুলদানি। সকাল থেকে কাতারে কাতারে লোক এসে জমেছে উঠোনে। কেউ কেউ উঠেছে ছাদে। উঠোন ছাপিয়ে লোকের ঢল গড়িয়ে গেছে বাইরে। পশ্চিমের বেড়া খুলে দেওয়া হয়েছে। ওদিকে পাঁচিলের ওপর ছেলে-ছোকরারা বসে। খবর রটে গেছে, আজ নাকি ভূতরাজের বিচার হবে। ভূতরাজকে তো দেখা যায় না, অতএব তার বিচার মানে তাকে কেমন করে গ্রাম থেকে তাড়ানো যায় তারই ব্যবস্থা হবে।
গাঁয়ের সকলের মনে এই খবরে সুখ নেই। গাঁয়ের দিনমজুরেরা ভাবে ভূত হোক আর দানব-দত্যি যাই হোক না কেন, সে তো তাদের ভাল ছাড়া ক্ষতি করেনি। কোনওদিন পথে-ঘাটে একা পেয়ে ভয় অবধি দেখায়নি। বরং আড়াল থেকে সে তাদের অনেক উপকার করেছে। তাকে তাড়ালে বাবুদের তেজ আবার আগের মতো বেড়ে যাবে। কিন্তু এসব কথা কি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে বলা যায়? সেও তো বাবুদের লোক। বাবুদের মধ্যে ভেতরে ভেতরে খুব ভাব। আর যত অভাব তাদের পোড়াকপালে।
সূর্য যখন হরিশপুর গ্রামের তালুতে তখন সকলকে অবাক করে সদর দরজা দিয়ে শামিয়ানার দিকে এগিয়ে এল সেই বটতলার সাধু। সাধুবাবাকে দেখে সবাই পথ ছেড়ে রাস্তা করে দিল। দত্তবাবু একটা চেয়ার এগিয়ে দিলেন। সাধুবাবা তাতে বসলেন না। দত্তবাবুর দিকে তাকিয়ে শুধু হাসলেন। তিনি গিয়ে বসলেন অন্যান্যদের মধ্যে। দেখবার মতো চেহারা বটে। রোদের তাপে গায়ের রং যেন ফেটে বেরোচ্ছে। বড় বড় টানা চোখ, খাড়া নাক, দীর্ঘ এবং মজবুত শরীরের গঠন। কারও সঙ্গে কোনও কথা কইলেন না, শুধু সবার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন।
দত্তবাবু ফিসফিস করে চৌধুরীবাবুর কানে কানে বললেন, ‘ওকে কে আসতে বলেছে? ওর তো এখানে কোনও কাজ নেই।'
চৌধুরীবাবু বললেন, ‘তা নেই, তবে এসেই যখন পড়েছে তখন তাড়ানো ঠিক হবে না। গরিবলোকগুলো সব ওর পক্ষে। দরকার হলে ডি এম আর পুলিশ সুপারকে বলব, এই সাধু আসার পর থেকেই ঝামেলা শুরু।'
ঠিক এই সময় দীনবন্ধু সাঁতরা এসে ফিসফিস করে বলল, ‘আমিই নেমন্তন্ন করে এসেছিলাম। এক ঢিলে দুই পাখি হত্যা হবে। সম্মান দেখিয়ে নেমন্তন্ন করা হল, আর অতিথিদের সামনে বলা হবে এটাই নষ্টের গোড়া। পুলিশের জেরা আর পিটুনি খেয়ে ওর সাধুগিরি বেরিয়ে যাবে।'
দত্তবাবু চৌধুরীবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ডি এম আর পুলিশ সুপারকে ভেজানো আছে তো?’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে চৌধুরী বললেন, ‘একদম ভেজাতে পারিনি। দুটোই একেবারে ছোকরা। আদর্শ-টাদর্শ মেনে চলে। এস ডি ও পর্যন্ত ভিজল না। দিনকাল বড় খারাপ হে। সরকারের লোক যদি ঘুষ নেওয়া বন্ধ করে তা হলে তো আমাদের বেঁচে থাকা কঠিন। সমাজের শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে যাবে। আমাতে আর ওপাড়ার নিতাইয়ের মধ্যে কোনও তফাত থাকবে না।'
দত্তবাবু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, তখন মোটরগাড়ির আওয়াজ শোনা গেল, সেইসঙ্গে জনতার কলরব, ‘এসে গেছেন, এসে গেছেন।'
ফুলের মালা নিয়ে যাবার কথা চৌধুরীবাবুর। আর-একটা মালা নেবেন দত্তবাবু আর এস ডি ও সাহেবের মালাটি নেওয়ার কথা ছিল দুর্গাবাবুর। কিন্তু সারা গায়ে কেরোসিন ঢেলে দেবার পর থেকে তিনি গা ঢাকা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাই কথা ছিল, দুটো মালাই নেবেন চৌধুরীবাবু।
কিন্তু গাড়ির আওয়াজ পেয়ে তাড়াতাড়ি প্রথম মালাটি নিয়েছেন। দত্তবাবুও একটি তুলেছেন। তৃতীয় মালাটি তুলতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে গেল। বলা নেই কওয়া নেই দীনবন্ধু সাঁতরা খপ করে তৃতীয় মালাটি খাবলা দিয়ে ধরেছে আর তখনই ওই একই মালা ধরে টান মেরেছেন চৌধুরীমশাই। গুলিসুতোয় গাঁথা মালা, এত টানাটানি সইতে না পেরে ঝপাত করে ছিঁড়ে গিয়ে ফুলগুলো ঝুরঝুর করে পড়ে গেল। রাগে কাঁপতে কাঁপতে চৌধুরীমশাই দীনবন্ধুকে বললেন, ‘দূর হও এখান থেকে। সব জিনিসে খাবলা বসাবার অভ্যাস। এটা কি তোমার রেশন দোকান, না মুদিখানা?’
অগত্যা আর-একটা মালা নিয়ে ওঁরা ছুটলেন অতিথিবরণ করতে। বকুলতলার মাঠে গাড়ি এসে থামল। অতিথিবরণ হয়ে গেল। তাঁদের সসম্মানে এনে বসানো হল শামিয়ানার নীচে গদি আঁটা চেয়ারে। সেখানে আবার একবার মাল্যদান।
চৌধুরীমশাই অতিথিদের অনে সম্মানসূচক সম্বোধন করে বললেন, 'আমরা বিপন্ন! আমাদের গ্রামে এখন ভূতরাজ নামে এক ভূতের কদর্য কাণ্ড-কারখানা চলছে। অন্যায়, অত্যাচার, ভীতি প্রদর্শন নানা ব্যাপার ঘটে চলেছে। প্রত্যেকটি মানুষ আজ ভীত, সন্ত্রস্ত এবং .বিপন্ন। কী ধরনের অমানবিক ব্যাপার ঘটছে তার বিবরণ আমি শ্রদ্ধেয় জেলাশাসককে লিখিতভাবে জানিয়েছি। ওই বিবরণপত্র জমা দেওয়ার পরও নানা ঘটনা ঘটেছে। যাঁদের ওপর সেসব ঘটনা ঘটেছে তাঁরাই নিজমুখে বলবেন। আমি প্রথমে আহ্বান করছি নকুলচন্দ্র গড়গড়িকে। নকুলবাবু পঞ্চায়েতের একজন নিষ্ঠাবান সদস্য এবং জনপ্রতিনিধি। তাঁর ওপর কী ঘটেছে সেটা আপনারা শুনুন।'
নকুল গড়গড়ি এসে দাঁড়ালেন। প্রথমে রুমাল দিয়ে মুখ মুছে একটু কেশে নিয়ে গলা পরিষ্কার করলেন। তারপর বলতে লাগলেন, ‘মাননীয় সভাপতি, প্রধান অতিথি, বিশিষ্ট অতিথি এবং উপস্থিত বন্ধুগণ! আজ ঘোর দুর্দিন। ঘরে এবং বাইরে কোথাও নিরাপত্তা নেই। আমি সেদিন ইস্কুল থেকে পড়িয়ে বাড়ি এসে গরম দুধে এট্টু আমসত্ত্ব আর মর্তমান কলা চটকে চিঁড়ে দিয়ে খাচ্ছি। আমি রোজই এইরকম এট্টু খাই। সেই একটা ভিখেরির ছেলে দরজা খোলা পেয়ে ‘মা কিছু খেতে দেবে গো’ বলতে বলতে বারান্দার সামনে চলে এল। আপনারাই বলুন এটা কি ভিক্ষে চাইবার সময়? যখন তখন কেন খিদে পাবে? খিদের ওপর ছেলে-ছোকরাদের কনট্রোল না থাকলে আমার খুব রাগ হয়। আমি ধমক দিলুম। তবু ছোকরা নাকিসুরে ভিক্ষে চাইতে লাগল। আমি তখন বাঁ হাতে একটা মাটির ঢেলা নিয়ে ছেলেটার দিকে ছুড়লুম। ওকে তাড়ানোই আমার উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু ঢেলাটা গিয়ে লাগল ছেলেটার গায়ে। ঠিক এই সময় ভূতরাজ আমার গালে সাংঘাতিক একটি চপেটাঘাত করে আমার দুধের বাটিটা কেড়ে নিল। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলুম আমার দুধ, আমার আমসত্ত্ব আর কলা, তাতে দুশো গ্রামের মতো সরু চিঁড়ে, গোটাটা ঢেলে দেওয়া হল ওই ভিখেরি ছোকরার কলাইকরা বাটিতে। এখন বলুন এর প্রতিকার কী? আমার ওপর ভূতরাজের আদেশ, রোজ ইস্কুল থেকে ফিরে আমি যা খাই, ওই ভিখেরি ছেলেটাকেও তাই খাওয়াতে হবে।'
জেলাশাসক হাসি চাপবার জন্য রুমাল দিয়ে মুখ ঢেকেছিলেন। এবার রুমাল সরিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কি তাই খাওয়াচ্ছেন?’
নকুল গড়গড়ি উত্তর দিলেন, ‘ওটা সম্ভব নয় সার। তাই স্কুল থেকে ফিরে আমি স্রেফ শুধু মুড়ি খাচ্ছি। ওই আইটেমটা নিয়ে গেছি রাত্রে।'
পুলিশ সুপার বললেন, ‘ভূতরাজটা কে? কোথায় থাকে?’
দত্তবাবু বললেন, ‘সেটাই তো হয়েছে মুশকিল। তাকে দেখা যায় না। কেউ তাকে দেখেনি।' জেলাশাসক বললেন, 'তা হলে আমরা কীভাবে আপনাদের সাহায্য করতে পারি। এটা যদি ভূতের কাণ্ড হয় তা হলে আমরা তো মশাই ভূত ধরতে পারি না? আপনারা ধরে দিন।' চৌধুরীবাবু বিমর্ষ গলায় বললেন, ‘তা হলে তো এতদিনে আমরা ধরেই ফেলতাম। যাকে দেখা যায় না তাকে ধরব কেমন করে?
জেলাশাসক হঠাৎ সামনের দিকে তাকিয়ে সাধুকে দেখতে পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে নমস্কার করলেন। তারপর অনুরোধের ভঙ্গিতে বললেন, 'আপনি এখানে আসুন। আপনার সাহায্য আমাদের দরকার হতে পারে।'
দত্তবাবু একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ইনিও খুব রহস্যময়। ইনি কোত্থেকে হঠাৎ গ্রামে
উদয় হয়ে বললেন ভূতরাজ আসছেন। ব্যস, তারপর থেকেই ভূতের তাণ্ডব শুরু হয়ে গেল।' সাধু উঠে গিয়ে জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারের মধ্যিখানে বসলেন। চাপা স্বরে ইংরেজিতে কিছু কথা বলার পর তিনি থামলেন। জেলাশাসক বললেন, ‘আমি এই মান্যবর সাধুজিকে অনুরোধ করছি কোনও একটা প্রতিকার বার করবার জন্য। উনি যা বলবেন সেটা আপনাদের মানতে হবে।'
জেলাশাসকের অনুরোধে সাধু উঠে দাঁড়ালেন। গম্ভীর গলায় বললেন, ‘এই গ্রামে অনেক গুপ্ত পাপ ঘটেছে। সেই পাপের স্বীকারোক্তি যতক্ষণ না হচ্ছে ততক্ষণ ভূতরাজের হাত থেকে রক্ষা নেই। আমি যাকে ডাকব, তাকে সবার সামনে দাঁড়িয়ে আমার প্রশ্নের সত্য জবাব দিতে হবে। মনে রাখবেন ভূতরাজ এখানে হয়তো উপস্থিত আছে। মিথ্যা বলামাত্র ভূতরাজ তার মুখে গোবর লেপে দেবে।'
সাধু জেলাশাসকের দিকে তাকালেন। জেলাশাসক বললেন, ‘এই প্রস্তাবে কারও আপত্তি আছে?’
বিশাল জনতা গর্জন করে বলে উঠল, ‘না, না, না।'
জেলাশাসক সাধুজিকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘আপনি যাকে খুশি ডাকতে পারেন?’ সাধুজি প্রথমেই ডাকলেন, ‘শ্রীজগৎবল্লভ দত্ত মহাশয়।
দত্তবাবু কাঁপতে কাঁপতে সামনে এলেন। সাধুজি বললেন, 'আপনার পাপের তালিকা অতি দীর্ঘ। তবে সেসব ব্যাপারে আমি যাব না। আমি যা জানতে চাইব তাই বলবেন। মিথ্যা বললে কিন্তু ধরা পড়ে যাবেন। বলুন তো দশরথ ওঁরাও কেমন করে মারা গেল?’
দত্তবাবু ঢোক গিললেন। একটু সময় নিয়ে বলতে আরম্ভ করলেন, ‘চরের জঙ্গল থেকে সাপ বেরিয়ে... অ্যা—- ওরে বাপ রে!’
দত্তবাবুর পেটে মোক্ষম একটা খোঁচা মেরেছে কেউ। নির্ঘাত ভূতরাজ। জেলাশাসক ধমকের সুরে বললেন, ‘ও কী, অ্যা করে থেমে গেলেন কেন? সাপ বেরিয়ে কী করল? দশরথকে কামড়াল?’
এবার পেটে নয়, গলার কাছে একটা খোঁচা টের পেলেন দত্তবাবু। সাপের কামড় বলবার আগেই হয়তো তাঁর মুখে গোবর লেপে দেওয়া হবে। তিনি জেলাশাসকের কাছ থেকে দ্বিতীয়বার তাড়া খেয়ে বললেন, 'না সার, সাপ-টাপ মিছে কথা। কেউ বার হয়নি। ওই চৌধুরীর পরামর্শে ওকে ডেকে নিয়ে লস্যির শরবত খাইয়েছিলুম। আমরাও খাচ্ছিলুম। কেবল দশরথের গেলাসে বিষ মেশানো ছিল। সাপে কাটার কথাটা আমরা রটিয়েছিলুম।'
সাধু প্রশ্ন করলেন, ‘শরবত বানিয়ে তাতে বিষ মিশিয়েছিল কে?’
কাঁপতে কাঁপতে দত্তবাবু বললেন, ‘আজ্ঞে আমি। তবে সবই চৌধুরীর পরামর্শে।' সাধু প্রশ্ন করলেন, দশরথের ছেলে রাম কোথায়? সে গ্রাম থেকে কেন উধাও হল? সত্যি জবাব দেবেন?’
দত্তবাবু উত্তর দিলেন, ‘আর মিথ্যে বলে লাভ নেই। একটা খুন তো কবুল করেছি, দ্বিতীয়টাও করছি। ওকে আমরা মেরেছিলাম। এত মেরেছিলাম যে, ছেলেটা মরে গেল। তাই রাত্রিবেলা ভেলা করে নদীর জোয়ারে ভাসিয়ে দিয়েছিলুম। যাতে অনেকদূরে গিয়ে ওর লাশ বেপাত্তা হয়।'
সাধু আবার প্রশ্ন করলেন, 'আমার ঘরে আগুন দিয়ে আমাকে মেরে ফেলবার পরিকল্পনার মধ্যে আপনি ছিলেন?’
দত্তবাবু বললেন, ‘ভূতরাজ বাঁচিয়েছেন বলে তৃতীয় খুনের দায়ে পড়িনি। আমি স্বীকার করছি ওই পরিকল্পনার মধ্যে আমি ছিলাম।'
সাধুজি জেলাশাসকের দিকে তাকালেন, জেলাশাসক পুলিশ সুপারের দিকে। সাধুজি বললেন, ‘এঁকে আর কিছু জিজ্ঞাস্য নেই।'
পুলিশ সুপার বললেন, “কিন্তু আমার কিছু করণীয় আছে।'
তিনি ইঙ্গিত করতেই একজন পুলিশ এসে দত্তবাবুর পাশে দাঁড়ালেন।
সাধুজি গম্ভীর গলায় ডাকলেন, ‘শ্রীনন্দগোপাল চৌধুরী।
চৌধুরীমশাই যে কাঁপছেন সেটা দূর থেকেও লোকেরা টের পেল। সাধুজি প্রশ্ন করলেন, ‘দশরথ-হত্যা আর রামকে মেরে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আপনিও ছিলেন?’
উত্তর দেবার আগে চৌধুরীমশাই বিলক্ষণ বুঝতে পারলেন ভূতরাজ তাঁর পশ্চাতে। তার তীক্ষ্ণ খোঁচা টের পাওয়া যাচ্ছে। মিথ্যে বলার উপায় নেই আর দত্তটা সে সুযোগও রাখেনি। অতএব, তিনি ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ।'
সাধুজি প্রশ্ন করলেন, ‘মিথ্যে দেনার দায়ে, অনেকের অশিক্ষার সুযোগ নিয়ে সুদের হিসাবে কারচুপি করে কত কৃষকের জমি ঠকিয়ে নিজের নামে করেছেন?
চৌধুরীর মনে হল এর সঠিক হিসাবটাও নিশ্চয়ই ভূতরাজ জানে। এক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র কারচুপি চলবে না। তাই কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, ‘মাত্র পঁচাত্তর জনের।'
সাধুজি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ঠাকুরের গয়না চুরির অভিযোগে রামকে আপনারা মেরেছেন। গোটা গ্রামে রটিয়েছেন ঠাকুরের গয়না চুরি করে রাম পালিয়ে গেছে। কিন্তু ঠাকুরের পঞ্চাশ ভরি গয়না কে চুরি করেছে?’
কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে রইলেন চৌধুরী। কিন্তু থাকবার কি উপায় আছে। পেছনে ক্রমাগত খোঁচা মারছে ভূতরাজ। থেকে থেকে কান মলে দিচ্ছে। চৌধুরী মাথা নিচু করে রেখেই বললেন, ‘আমি, আমি করেছি।'
সাধুজি বললেন, ‘সে গয়না কোথায়?’
চৌধুরী ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়ে বললেন, 'আমার শোবার ঘরের মেঝের নীচে রাখা আছে।'
সাধুজি বললেন, ‘এবার আপনাকে শেষ প্রশ্ন। নদীর চড়ায় গরিবগুরবোরা, অর্থাৎ যাদের ভিটে গেছে নদীতে, তারা যখন হোগলা দিয়ে ঘর বানাল সেই ঘরে মাঝরাত্রিতে আগুন লাগে। তাতে দুটো বাচ্চা আর একজন বৃদ্ধা মারা যায়। সেই আগুন কে লাগিয়েছিল?’
চৌধুরীমশাই চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘এত কাজ কি আমি একা করেছি নাকি! আমার সঙ্গে দত্ত ছিল, দুর্গাপদ ছিল আর দিনু সাঁতরাও ছিল।'
জেলাশাসক সাধুজির মুখের দিকে তাকালেন। সাধুজি বললেন, ‘আর কাউকে ডাকবার নেই।'
এস ডি ও টেপটা বন্ধ করলেন। জেলাশাসক বললেন, ‘এই ঘটনাগুলোর ডায়েরি আছে, দত্তবাবু, চৌধুরীবাবুরাই করিয়েছেন, কিন্তু আসামি ধরা পড়েনি। দশরথ খুন, রাম নামক কিশোরকে হত্যার চেষ্টা, সাধুর আশ্রয়ে অগ্নিসংযোগের ষড়যন্ত্র ইত্যাদি নানা কুকর্মের নায়কদের আজ হাতেনাতে ধরা গেল। সিপাইজি...’
জেলাশাসক আর পুলিশ সুপারের ইশারা পেয়েই সিপাইরা এসে দত্তবাবু, চৌধুরীবাবু, দুর্গাপদ আর দীনবন্ধু সাঁতরাকে হাতে হাতকড়ি পরিয়ে দিল। চারটে বয়স্ক লোক হাতে হাতকড়া পরে পরস্পরের সঙ্গে ঝগড়া করতে করতে কাঁদতে লাগল।
সন্ধ্যার একটু আগে নদীর ঘাটে এসে দাঁড়ালেন সাধু। হাওয়ায় তাঁর দাড়ি উড়ছে। তাঁর চোখ নদীর দিকে নয়, মহেশপুরের দিকে। একটু পরে নদীর ঘাটে এসে ভিড়ল একটা নৌকো। নৌকোর ওপর টাইগার আর তামাং দাঁড়িয়ে। সাধু আস্তে আস্তে তাঁর মাথার জটা খুলে ফেললেন। নকল দাড়িটুকু খুলে নেওয়ার পর সুদর্শন বর্মার চেহারাটা চেনা গেল।
ঘাটের দিকে নেমে যেতে যেতে সুদর্শন বর্মা গ্রামের দিকে তাকাল, হাতের ঘড়িতে সময় দেখল। রামের এতক্ষণে এসে যাওয়ার কথা। রাম কি তবে মত বদলে ফেলেছে? কাল রাতে রামকে বলেছিল, ‘দেখলে তো, বিনা রক্তপাতে কেমন করে বদলা নেওয়া হল। অথচ আইনকে অশ্রদ্ধা করা হয়নি।'
রাম প্রশ্ন করেছিল, ‘এবার কী করব?’
সুদর্শন বর্মা উত্তর দিয়েছিল, ‘আর একটা ছোট্ট কাজ আছে মহেশপুরে। বিষয়সম্পত্তি আমি চাই না। ওটা দিয়ে দেব গ্রামের লোকেদের। কিন্তু যারা বিষ খাইয়ে মাকে মেরেছে, আমার জন্য যে দু’জন নিরীহ লোকের প্রাণ গেছে তাদের শাস্তি দিয়ে ফিরে আসব। আমি ডি এম-কে সব জানিয়ে রেখেছি।'
রাম জানতে চেয়েছিল, ‘তারপর?’
সুদর্শন বর্মা বলেছিল, ‘তারপরই তো আসল কাজ। তোমার গ্রামে আর কতখানি অন্যায় দেখেছ। সারা পৃথিবী জুড়ে এর থেকে বেশি অন্যায় হচ্ছে। খাবারে, ওষুধে ভেজাল মেশাচ্ছে। মানুষের সভ্যতাকে ধ্বংস করার জন্যে তৈরি হয়ে চলেছে ভয়ানক সব অস্ত্র। মি. সটকুর স্বপ্ন এবার সার্থক করতে হবে। এবার তুমি একা নও, তোমার মতো আরও কয়েকজনকে বাছতে হবে। বানাতে হবে আরও কয়েকটা পোশাক। তুমি মা'র কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় বলবে, মা, জগতে তোমার মতো আরও দুঃখী মা আছে। কিন্তু তাদের ঘরে রাম নেই। আমি তোমার মতো হাজার হাজার মায়ের কান্না থামাতে যাচ্ছি। তুমি আশীর্বাদ করো, যাতে আমাদের এই সংকল্প সার্থক হয়। আজ না পারি আগামীকাল এই পৃথিবীকে আরও নির্মল, আরও সুন্দর করে তুলব।'
কিন্তু কোথায় রাম? নৌকো ছাড়ার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। সটকুর স্বপ্ন আর তাঁর সংগ্রামের কথা কি রাম মনে রাখেনি। নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন কি রাম দেখে না? এতদিন ধরে তাকে যে বোঝানো হল, তা কি ব্যর্থ হয়ে গেল?
বিষণ্ণ মনে, পরাজিত ভঙ্গিতে সুদর্শন বর্মা ঘাটের দিকে এগিয়ে গেল। নৌকোতে পা রাখবার আগে দেখল টাইগার আর তামাং তার আদেশের অপেক্ষায়। রাম ফিরে আসবে না এটা তার কখনও মনে হয়নি। অথচ সত্যিই রাম ফিরে এল না। সুদর্শন নৌকোতে উঠে পড়ে পারের দিকে তাকাল এবং দেখতে পেল বৈশাখের খ্যাপা হাওয়ার বেগে নদীর পাড় দিয়ে ছুটে আসছে রাম। তার পেছনে তার মা। ঢালু পাড় থেকে উঠে আসছে শুধু রাম আর তার মা নয়, আরও অনেকে।
ততক্ষণে নৌকো চলতে শুরু করেছে। কিন্তু চলা থামাতে হল। রাম লাফ দিয়ে পড়ল জলে, তারপর নৌকোয়। নদীর পাড়ে তখন হাজার হাজার জনতা হাত তুলে ছলছল চোখে রাম আর সাধুজিকে দেখছে।
রাম হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ‘মা বারণ করেনি। মা বলেছে, তোকে সাধুজির পায়ে নিবেদন করলাম। তুই ভূতরাজ হয়ে গাঁয়েগঞ্জের আসল ভূতদের তাড়া।'
সুদর্শন বর্মা জিজ্ঞেস করল, ‘আমাদের লক্ষ্য কী?’
রাম উত্তর দিল, ‘মি. সটকুর স্বপ্ন পূর্ণ করা।'
নৌকো চলতে শুরু করল। নদী-পারের জনতার চেহারা আস্তে আস্তে অস্পষ্ট হয়ে একসময় অন্ধকারে ঢেকে গেল। মাথার ওপরে তখন চাঁদ উঠেছে। নদীর জলে আর ঢেউয়ে তারই কাঁপা কাঁপা ছায়া ভেসে চলেছে নৌকোর সঙ্গে সঙ্গে।
আনন্দমেলা, পূজাবার্ষিকী ১৩৯৬
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন