দুলেন্দ্র ভৌমিক

মুড়াগাছা গ্রামের রামহরি সাহাকে চেনে না এমন লোক মুড়াগাছাতে তো নেইই, এমনকী, আশপাশের গ্রামেও তেমন লোক খুঁজে পাওয়া শক্ত। চোখে না দেখলেও নাম শুনেছে। অথচ রামহরি এম এল এ, এম পি নন, নামকরা ডাক্তার, অভিনেতা, খেলোয়াড় বা গাইয়ে-বাজিয়ে নন। তবুও মুড়াগাছা বাদ দিলে তার ডাইনে-বাঁয়ে মুগবেড়িয়া, আর সুখবেড়িয়া নামের যে দুটি গ্রাম রয়েছে, সে-গ্রামের প্রায় সবাই রামহরি সাহাকে চাক্ষুষ চেনে, না হয় নামে চেনে। রামহরি এম এল এ বা এম পি নন, ডাক্তার, অভিনেতা বা খেলোয়াড়ও নন, সেকথা ঠিক, কিন্তু গাইয়ে-বাজিয়ে নন একথাটা আগে বলে বোধহয় ভুল করেছি। রামহরি এটা জানতে পারলে খুশি হবেন না। রামহরি প্রতি সকালে আর সন্ধ্যায় খোল বাজান এবং হরিকীর্তন করেন। সেই হিসাবে তাঁকে গাইয়ে না বলে উপায় নেই।
মুড়াগাছা খুবই সাদামাঠা সাধারণ একটা গ্রাম। গ্রামের প্রান্তে ইছামতী নদী। বাংলাদেশের আর দশটা গ্রামের মতো এই গ্রামেও রথতলা, ষষ্ঠীতলা, পঞ্চাননতলা, শিবতলা এইরকম সব নামের জায়গা আছে। এই মুড়াগাছায় রামহরিবাবুরা কতদিন থেকে বাস করছেন, নিয়েও নানা তর্ক হয়ে গেছে। রামহরি নিজে আমাদের কাছে গল্প করেছেন, তাঁর পূর্বপুরুষ নাকি পলাশির কাছে কোনও গ্রামে থাকতেন। একদিন ভর দুপুরবেলা সেই পূর্বপুরুষ, তখন তার বয়স বড়জোর বারো কি চোদ্দো, রাস্তায় দাঁড়িয়ে ইট মেরে আলিবর্দি খাঁর বাগান থেকে কাঁচামিঠে আম পাড়ছিল। একেবারে অব্যর্থ টিপ। এক ঢিলে বোঁটা ছিঁড়ে একটা করে কাঁচামিঠে আম টুপ করে খসে পড়ছিল নীচে। একবার বহরমপুর থেকে মুর্শিদাবাদে যাচ্ছিলেন আলিবর্দি খাঁ সাহেব, ভায়া পলাশির আমবাগান। তাঁর নজরে পড়ল দৃশ্যটা। পাইক-বরকন্দাজরা গিয়ে পাকড়াও করে আনল রামহরি সাহার সেই পূর্বপুরুষকে। বেচারা তো ভয়ে মরে। বৃদ্ধ আলিবর্দি খাঁ সুমামাখা চোখে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার নাম কী?
ছেলেটি ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল, ‘আজ্ঞে, হুজুর, আমার নাম হরিচরণ সাহা।'
আলিবর্দি খাঁ বলে উঠলেন, ‘বাহা, বাহা, নামটি তো বেশ খাসা। তা তুমি ইট দিয়ে আম পাড়তে পারো?’
হরিচরণ ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল, ‘তা হুজুর, একটু-আধটু পারি।'
নবাবের মেজাজ বোঝা ভার। নবাব হরিচরণকে বাগানের কাছে নিয়ে এসে হুকুম করলেন, ‘পাখর লে আও।'
সঙ্গে সঙ্গে নানা সাইজের ইটের টুকরো এল। নবাবসাহেব বললেন, ‘যেটা দেখাব সেটা পাড়তে হবে। কিন্তু হুঁশিয়ার, আমের গায়ে যেন পাথরের চোট না লাগে। শুধু বোঁটায় মারতে হবে।'
নবাবসাহেব একটা করে আম দেখান আর হরিচরণ তাক করে ঠিক তার বোঁটায় মারে। এইভাবে সাত-সাতটা আম মাটিতে পড়ার পর নবাবসাহেব পরীক্ষা করে দেখলেন, একটি আমের শরীরেও ইটের দাগ পড়েনি। তারপর হরিচরণের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে হো হো করে হেসে উঠে হাঁক দিলেন, ‘সিপাহসালার।’
ডাক শোনার সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া ছুটল মুর্শিদাবাদের দিকে। নবাবসাহেব ঘোড়া থেকে নেমে শতরঞ্চ বিছিয়ে আমবাগানে বসলেন। খানদশেক গোলাপখাস আম খাওয়ার পর ঘোড়া ছুটিয়ে চলে এলেন মিরজাফর। নবাবকে কুর্নিশ করে দাঁড়াতেই নবাবসাহেব বললেন, ‘এই ছেলেটার হাতের আন্দাজ বড় অদ্ভুত। একে এখনই সেনাদলে ঢুকিয়ে দাও। ট্রেনিং পেলে ছেলেটা মস্ত বড় যোদ্ধা হবে।'
রামহরির গল্প অনুযায়ী তাঁর পূর্বপুরুষ সেই প্রবাদপ্রতিম পুরুষ হরিচরণ নাকি মস্ত যোদ্ধা হয়েছিলেন। তাঁর হাতেই নাকি সিরাজের অসিযুদ্ধের আসল হাতেখড়ি। এরপরে যখন বর্গির আক্রমণ শুরু হয়, তখন বৃদ্ধ নবাব নাকি বর্গিদের রুখতে হরিচরণদের মুড়াগাছাতে পাঠিয়ে দেন— সেইসঙ্গে গোটা মুড়াগাছা গ্রামটাই দিয়ে দেন হরিচরণকে। কিন্তু সিরাজের অকালমৃত্যুর পর হরিচরণের পক্ষে কোনও উপযুক্ত সাক্ষী না থাকায় ক্লাইভসাহেব মুড়াগাছাটা কেড়ে নেন। তখন প্রাঞ্জল ভাষায় ক্লাইভের সঙ্গে নাকি অনেকের তর্ক-বিতর্ক হয়েছিল। তবে হরিচরণ ‘ইস্টুপিড’ আর ‘ভেরি গুড’ ছাড়া আর কোনও ইংরেজি শব্দ জানতেন না বলে তর্কের মধ্যে মোট চোদ্দোবার ইস্টুপিড আর একুশবার ভেরি গুড বলেছিলেন। সম্ভবত সেই কারণেই লালমুখো ক্লাইভ একেবারে বিনা বাধায় মুড়াগাছাটা পেয়ে গেলেন।
সম্পত্তি কেড়ে নেওয়ার পর হরিচরণ খুব মুষড়ে পড়েন। সেই সময় নাকি তিনি স্বপ্নাদেশ পান। বৈকুণ্ঠের শ্রীনারায়ণ তাঁকে ডেকে বলেন, ‘ওরে হরে, বিষয়ের মায়া ছাড়। মর্ত্যধামে আমার নাম প্রচার কর। হরিনামই তোর বিষয় আর আশয়। আর সবই তুচ্ছ, স্রেফ মায়া। বিষয়ের ক্লেদ শরীর থেকে ঝেড়ে ফেলে গলায় তুলে নে খোল। প্রাণভরে বল হরিবোল।' এরপর থেকেই হরিচরণ একেবারে পুরোপুরি হরিভক্ত হয়ে গেলেন। তাঁরই নির্দেশ অনুসারে বংশের সবার সঙ্গে তাই আজও ‘হরি’ শব্দটা জড়িয়ে আছে। হরি শব্দ বাদ দিয়ে এই বংশের কারও নাম রাখার উপায় নেই।
রামহরি সাহার এই গল্প গ্রামের ছেলেবুড়ো সবাই জানে। কেউ এ-নিয়ে কখনও কোনও প্রশ্ন তোলেনি। কিন্তু গোল বাধালেন হাই স্কুলের ইতিহাসের মাস্টারমশাই। তিনি একদিন উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘আলিবর্দি খাঁ ভরদুপুরে পলাশির বাগানে বসে গোলাপখাস আম খেয়েছেন এর কোনও ঐতিহাসিক সত্যতা নেই। বর্গি-আক্রমণ কখনওই মুড়াগাছার দিক থেকে হয়নি ফলে সেই আক্রমণ ঠেকাবার জন্য প্রয়াত হরিচরণকে মুড়াগাছাতে পাঠানোর কোনও প্রয়োজন নেই। তা ছাড়া দশখানা গোলাপখাস আম খেতে আলিবর্দি খাঁর যে সময় লাগবার কথা, সেই সময়ের মধ্যে কখনওই মুর্শিদাবাদ থেকে মিরজাফর পলাশিতে এসে পৌঁছতে পারেন না। তা ছাড়া লর্ড ক্লাইভ যে সমস্ত সম্পত্তি...’
হাই স্কুলের ইতিহাসের মাস্টারমশাই গোপাল সামন্ত যখন উত্তেজিত হয়ে এসব কথা বলছিলেন, তখন রামহরিবাবু সেখানে দাঁড়িয়ে। তিনি কিছুটা শোনার পর আর থাকতে না পেরে গোপালবাবুকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘খামোখা বিদ্যে ফলাবেন না। আমি তো আগেই বলেছি, উপযুক্ত সাক্ষীর অভাবে গোটা মুড়াগাছা বেহাত হয়ে গেল। আজ যদি আলিবর্দিবাবু, মিরজাফর, সিরাজ, নিদেনপক্ষে ক্লাইভও থাকতেন তা হলে ওঁরাই আপনাকে বলে দিতেন কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে। আর গোলাপখাস আমের কথা বলছেন? নবাব বাগানের আসল গোলাপখাস খাওয়া তো দূরের কথা, চোখে দেখেছেন কখনও? তুলো দিয়ে মুড়ে রাখতে হয়। ওই আমের আঁটি চুষতে হয় বিশ মিনিট ধরে। তা দশটা আমের আঁটি চুষতেই তো দুশো মিনিট। সেইসঙ্গে রয়েছে আম, একটু কথাবার্তা। সাকুল্যে দাঁড়াল তা হলে কমপক্ষে চারশো মিনিট। তার মানে ছ’ ঘণ্টা চল্লিশ মিনিট। মিরজাফরের ঘোড়া কি মুর্শিদাবাদ থেকে পলাশিতে ছ’ ঘণ্টা চল্লিশ মিনিটেও আসতে পারে না? এটা কি আপনার সরকারি বাস না বনগাঁ লোকাল?’
গোপালবাবু হকচকিয়ে গিয়ে বলে ফেললেন, ‘বেগবান অশ্বের এতটা সময়ই বা লাগবে কেন?’
রামহরি সাহা ভেংচি কাটার মতো করে উত্তর দিলেন, ‘কেন লাগবে না। মিরজাফর তো ঘোড়ায় চেপে বসে ছিলেন না। যখন খবর গেল তখন তিনি বাথরুমে। ওই অবস্থায় তো আসতে পারেন না। তৈরি হয়ে সেনাপতির বেরুতে একটু সময় তো লাগবেই।'
গোপালবাবু একটু রেগে গেলেন। বললেন, ‘এসব কথা কোন ইতিহাসে লেখা আছে?
কোথায় পেয়েছেন এসব তথ্য? ইতিহাস নিয়ে চালাকি করবেন না।’ এবার রামহরিবাবুও ফোঁস করে উঠে বললেন, ‘আপনিও আমার পূর্বপুরুষদের নিয়ে চালাকি করবেন না। সবকথা কি বইতে লেখা থাকে?’
গোপালবাবু তর্কের ঝোঁকে বলে ফেললেন, ‘আলবত থাকে।'
রামহরি বললেন, ‘আলবত থাকে?’
গোপালবাবু আবারও বললেন, ‘থাকে। থাকতে বাধ্য।'
গোলমালও রামহরিবাবু এবার কাঁধের গামছা কোমরে বেঁধে বললেন, ‘তাই যদি থাকে তবে বলুন তো ছেলেবেলায় সিরাজের কবে হাম হয়েছিল? আমের দেশের লোক, পেটে নিশ্চয় হয়ে থাকবে। কবে, কোন সালে আলিবর্দির কঠিন পেটের অসুখ হয়েছিল? ভাস্কর পণ্ডিতের ন’ কাকিমার নাম কী? লুৎফার সঙ্গে সিরাজের বিয়েতে কী মেনু হয়েছিল? আলিবর্দির পিসেমশাই কে? শাজাহানের ব্লাডপ্রেসার কত ছিল? সম্রাট অশোকের মুখেভাতে কে মুখে ভাত দিয়েছিলেন? মামা, না ঠাকুরদা, না কি জ্যাঠা? চাণক্য কি কখনও ছোটবেলায় আলুভাতে ভাত খেয়েছিলেন? তখন পোস্ত ক’ টাকা সের? কাটা পোনার দর কত ছিল?
রামহরির তখন উগ্রমূর্তি। অন্যদিকে ইতিহাসের মাস্টারমশাই গোপালবাবু হতভম্ব। এ ধরনের ঐতিহাসিক সংকটে তিনি কখনও পড়েননি। তিনি' গলা নিচু করে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই রামহরি বলে উঠলেন, ‘এর একটাও যদি ঠিক উত্তর দিতে পারেন তা হলে গামছা কাঁধে নিয়ে দণ্ডি কাটতে কাটতে আমি মুড়াগাছা ছেড়ে চলে যাব।'
গোপালবাবু বলে উঠলেন, '‘আহা, যাবেন কেন। আর যদি যান তা হলে অত কষ্ট করে যাওয়ার দরকার কী! দিব্যি বাসে করেই তো যেতে পারেন।'
শেষ পর্যন্ত গোপালবাবুকেই রণে ভঙ্গ দিতে হয়েছিল। বলতে হয়েছিল, ‘না মশাই আপনার এই ধরনের ঐতিহাসিক প্রশ্নের জবাব দেওয়া আমার সাধ্যের বাইরে।'
রামহরি মুড়াগাছা গ্রামের খুবই জনপ্রিয় মানুষ সন্দেহ নেই, কিন্তু কয়েকটি বিষয়ে সবাই তাঁকে এড়িয়ে চলে। তাঁর পূর্বপুরুষদের যে কাহিনি তিনি স্বয়ং চালু করেছেন সে-বিষয়ে কোনও সন্দেহ প্রকাশ করলে কিংবা কটু মন্তব্য করলে তিনি রেগে যাবেন। কেউ যদি মুড়াগাছা গ্রামকে অন্য কোনও গ্রামের সঙ্গে তুলনা করে ছোট করতে চায় বা মুড়াগাছার কৃতিত্ব খর্ব করতে চেষ্টা করে তা হলেও তিনি বিষম রেগে যান। এ ছাড়া রয়েছে হরিনাম। এ-ব্যাপারে কোনও বিরূপ মন্তব্য তিনি সহ্য করতে পারেন না। আর রেগে গেলে তিনি যাচ্ছেতাই কাণ্ড করেন। একবার পঞ্চাননতলার ধরণী ধর মশাই রামহরিবাবুকে হরিকীর্তন নিয়ে কী একটা বলতেই তিনি লাফ দিয়ে তাঁর দোকানের মাচা থেকে নেমে এসে প্রথমে বিকট গলায় চিৎকার করতে আরম্ভ করলেন, তারপর নিজের দোকান থেকে এক দোয়াত কালি এনে চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘শোনো, শোনো, মুড়াগাছার নাগরিকবৃন্দ। হরিনামের অপবাদ সহ্য করতে না পেরে আমি আত্মঘাতী হলাম। এই পাপবাক্য শোনার চাইতে আত্মঘাতী হওয়া ঢের পুণ্যের। আমার দোকানে বিষ বিক্রি হয় না। তাই এক দোয়াত কালি খেয়ে আমি প্রাণত্যাগ করলাম।'
এই বলে এক দোয়াত কালি খেতে শুরু করেছিলেন। বিমূঢ় ধরণী ধর প্রায় ধস্তাধস্তি করে সেই কালির দোয়াতটি তাঁর হাত থেকে উদ্ধার করেন। কিছুটা কালি অবশ্য রামহরি খেয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু বেশিরভাগ কালি ধস্তাধস্তির সময় উলটে পড়েছিল ধরণী ধরের সারা মুখে। রামহরিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর ডাক্তারবাবু ধরণীবাবুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কালি খেল তো রামহরি, তা আপনার সারা মুখে এত কালি লাগল কেমন করে?’
হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই রামহরি চিৎকার করতে লাগলেন, ‘সুইসাইড কেস। থানায় খবর দাও। আত্মহত্যার কারণ জানাতে হবে।'
ধরণীবাবু রামহরির পায়ের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে মিনতি করতে লাগলেন, ‘দোহাই আপনার। থানা-পুলিশ করবেন না। আর কস্মিনকালেও আপনার কেত্তন নিয়ে কিছু বলব না।'
পিতার পরিচয়েই পুত্রের পরিচয়। অতএব রামহরির ছেলেদের কথা বলবার আগে রামহরির বৃত্তান্তটা একটু বিস্তারিত করে বলতে হল। মুড়াগাছার বিখ্যাত কবিরাজ জীবনবল্লভ আচার্য মহাশয়ের দুটি বিষয়ে খুব নামডাক। এক, কবিরাজি চিকিৎসা। দুই, পাড়ার সমস্ত নবজাতক-জাতিকার নামকরণ। শেষোক্ত কাজটা তিনি নিজেই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। পাড়ায় কেউ জন্মালে তিনি নিজে গিয়ে তার নামকরণ করে আসেন। আর এ-ব্যাপারে কোবরেজমশাইয়ের ওপর রামহরির গভীর আস্থা। রামহরির প্রথম ছেলের নাম রাখা হয়েছিল ভজহরি। কয়েক বছর পর যখন আবার ছেলে হল, তখন কোবরেজমশাই নাম রাখলেন থাকোহরি। সমস্যা দেখা দিল তৃতীয় ছেলের বেলায়। রামহরি ছেলে হতেই ছুটলেন কোবরেজমশাইয়ের কাছে। তখন সবেমাত্র সকাল হয়েছে। বারান্দায় বসে কোবরেজমশাই পাঁচন তৈরি করছিলেন। রামহরিকে দেখে চশমার ভেতর দিয়ে তাকালেন। বজ্রগম্ভীর গলায় বললেন, ‘কী সংবাদ?’
রামহরি বললেন, ‘আজ্ঞে, এটিও ছেলে।’
কোবরেজমশাই বললেন, ‘সুসংবাদ। তবে নামকরণে বিস্তর সমস্যা দেখা দেবে। তোমার এই ছেলেকে হরি-ছাড়া হতে হবে।'
রামহরি হাত নেড়ে বলে উঠলেন, ‘দয়া করে ওটি করবেন না। হরি ছাড়া কোনও নাম আমাদের বংশে চলবে না।'
কোবরেজমশাই বিরক্ত গলায় বললেন, 'চলবে না তো বুঝলুম, কিন্তু এত হরি পাব কোথায়? তোমাদের অতি বৃহৎ বংশে হরি তো নেহাত কম নেই। হরিচরণ দিয়ে শুরু। এই হরিনামের মিছিল কোথায় গিয়ে শেষ হবে কে জানে।'
রামহরি কাতর কণ্ঠে বললেন, ‘উপায় আপনাকেই করতে হবে। এ-ব্যাপারে আর কার কাছে যাব।'
কোবরেজমশাই হাঁক দিয়ে বললেন, ‘বিল্টে, অ্যাই বিল্টে।'
কাজের ছেলেটা কাছে আসতেই তিনি বললেন, ‘এই পাঁচনটা নিয়ে যা। নিশ্চিন্দের ছালগুলো নিয়ে আয়। হামানদিস্তায় থেঁতো করতে হবে।'
বিল্টে একটু পরেই হামানদিস্তা দিয়ে গেল। কোবরেজমশাইয়ের সামনে কাঁধে গামছা নিয়ে রামহরি বসে। হামানদিস্তায় নিশ্চিন্দে গাছের ছাল থেঁতো করতে করতে কোবরেজমশাই জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার বড় ছেলের নাম কী দিয়েছিলুম যেন?’
রামহরি উত্তর দিল, ‘আজ্ঞে, ভজহরি।'
কোবরেজমশাই বললেন, ‘হুঁ, তার পরেরটির?’
রামহরি উত্তর দিল, ‘আজ্ঞে, থাকোহরি?
কোবরেজমশাই বললেন, ‘রাখহরি নামটা কি ফ্রি আছে?’
রামহরি বললেন, ‘আজ্ঞে, ওটা তো আমার বড় ভাইপোকে দিয়েছেন।'
কোবরেজমশাই হামানদিস্তায় ঘা মারতে মারতে ভাবতে লাগলেন। একটু পরে বললেন,
‘তোমার দাদার নাম তো প্রাণহরি, তাই না??
রামহরি বললেন, ‘আজ্ঞে, আপনি ঠিকই বলেছেন।'
আবার হামানদিস্তায় ঘা পড়তে লাগল।'খানিক বাদে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের প্রথা অনুপাতে হরিকে তো অগ্রে রাখা যাবে না। নামের শেষে হরি রাখতে হবে তাই তো?’
রামহরি বিগলিত ভঙ্গিতে বললেন, 'আজ্ঞে, হরি তো বিশ্বময়। সংসারময়। তবে কিনা শেষে হরি দিলে বাপ-ঠাকুরদার নামের সঙ্গে ছন্দটা মেলে। আমি রামহরি, দাদা প্রাণহরি, ছেলেরা সবাই ভজহরি, রাখহরি, থাকোহরি। আমার বাবা ছিলেন জীবনহরি। তৃতীয়টির নামের শেষে যদি হরি রাখেন তবে বড় কৃতাৰ্থ হই।'
কোবরেজমশাই স্বগতোক্তির ভঙ্গিতে বললেন, 'হরি হে, এবার আমায় বাঁচাও।'
কোবরেজমশাইয়ের সামনে গামছা কাঁধে অনেকক্ষণ বসে রইলেন রামহরি। বেলা বাড়তে লাগল। গায়ে তেল মেখে এবার স্নানে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন জীবনবল্লভ আচার্য। গায়ে তেল মাখতে মাখতে একবার রামহরির দিকে তাকালেন। মুচকি হাসলেন। রামহরি বুঝলেন এইবার কোবরেজমশাই নাম খুঁজে পেয়েছেন। বসা অবস্থাতেই একটু এগিয়ে এসে শুধোলেন, 'মনে পড়েছে?’
কোবরেজমশাই নাকে তেল দেওয়া শেষ করে বললেন, ‘একটা নাম মনে এসেছে, তবে এটা চলবে কিনা বলতে পারি না।'
রামহরি কৃতার্থ হওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, ‘বলেন কী! আপনার মনে যে নাম এসেছে সেটা আবার অচল হবে কেমন করে। এই নিন কাগজ। লিখে দিন।'
কোবরেজমশাই গামছায় তেলহাত মুছে নিয়ে বললেন, ‘অগ্রে নয়, শেষে হরি রাখতে হবে তো। তাই নাম দিলুম বলহরি।'
ছেলের নামকরণ শুনে আঁতকে উঠলেন রামহরি। মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ ভাবলেন। কোবরেজমশাই তো নামকরণ করে দিয়ে পুকুরে গেলেন স্নান করতে। রামহরি নিজের বাড়ি থেকে যখন ঘুরে আবার কোবরেজমশাইয়ের কাছে ফিরে এলেন তখন তিনি সবেমাত্র দুপুরের খাওয়া শেষ করে দিবানিদ্রার আয়োজন করছেন। কোবরেজমশাইয়ের শিয়রের কাছে একটি জানলা। সেই জানলা দিয়ে রামহরি মুখ বাড়ালেন। কাতর গলায় ডাকলেন, ‘কোবরেজমশাই।’
কোবরেজমশাই রামহরিকে দেখলেন। ছোট্ট একটা ঢেকুর তুলে বললেন, ‘আবার কী চাই?’ রামহরি বললেন, ‘আজ্ঞে, ওই নামটার বিষয়ে যদি কিঞ্চিৎ বিবেচনা করেন।'
কোবরেজমশাই বললেন, ‘নাম তো একটা দিয়ে দিলুম। একেবারে বাপ-দাদার সঙ্গে মেলানো নাম।'
রামহরি বিনীত ভঙ্গিতে বললেন, ‘তা একটা দিয়েছেন বটে। কিন্তু বাড়ির সবাই ওই নাম শুনে তো কেঁপে উঠছে।'
কোবরেজমশাই একটু অবাক হওয়ার ভান করে বললেন, ‘কেন, কেঁপে উঠছে কেন? হরি নামে তো কারও কেঁপে ওঠার কথা নয়।'
রামহরি বললেন, ‘আজ্ঞে, নামটার গায়ে বড্ড শ্মশানযাত্রীর গন্ধ। রাতবিরেতে ছেলেকে যদি গলা ছেড়ে ডাকি ‘বলহরি, বলহরি’ তা হলে তো পাড়াপড়শিরা খাটে কাঁধ দেওয়ার জন্যে গামছা নিয়ে ছুটে আসবে। বিভ্রাট বেঁধে যাবে কোবরেজমশাই।'
কোবরেজমশাই মুখে একটুকরো হরীতকী ফেলে বললেন, ‘বিভ্রাট হওয়া অসম্ভব নয়। একটু শ্মশান-শ্মশান গন্ধ আছে বই কি।'
রামহরি জানলার শিক ধরে প্রায় ঝুলে পড়ার মতো ভঙ্গি করে বললেন, ‘তাহলে ওটা বদলে অন্য একটা কিছু ভাবুন।
মুখে হরীতকীর টুকরো নিয়ে চোখ বুজে চুষতে চুষতে হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘পেয়ে গেছি। ছোটটার নাম রাখো থরহরি। শ্রীমান থরহরি সাহা। রামহরি, বড় ছেলে ভজহরি, তস্য ভ্রাতা থাকোহরি এবং তস্য কনিষ্ঠ ভ্রাতা থরহরি। একেবারে হরির লাগাতার নামকীর্তন।'
রামহরি ওই নাম নিয়েই খুশি হলেন এবং ক্রমে ক্রমে নামটাও চালু হয়ে গেল মুড়াগাছা গ্রামে। থরহরি যে ভবিষ্যতে কেমন দাঁড়াবে তার কিঞ্চিৎ নমুনা শিশুকাল থেকেই সে দিতে আরম্ভ করেছিল। কিন্তু শৈশব পেরিয়ে মধ্য-কৈশোরে এসে থরহরি মুড়াগাছার কাছে সত্যিই থরহরি কম্পমান হয়ে উঠল। এবার সেই থরহরির মুখোমুখি হওয়া যাক।
মুড়াগাছা প্রাইমারি বিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্র হিসাবে থরহরির নাম ছিল। যে কোনও বিষয় একবার শুনলে বা পড়লে সেটা দিব্যি মনে রাখতে পারত। আর ছেলেটার জানবার কৌতূহল ছিল অফুরান। খোল কেমন করে তৈরি হয় এবং তার মধ্যে কী এমন বস্তু থাকে যাতে অত সুন্দর বাজনা বেরোয় সেটা জানতে সে একদিন বাপের খোলটাকেই আছড়ে ভেঙে দিয়েছিল। বৃত্তি পরীক্ষার সময় ‘একটি অগ্নিকাণ্ডের বর্ণনা দাও’ শীর্ষক রচনা লেখবার জন্য বাবার খড়ের গাদায় আগুন ধরিয়ে দিয়ে নিরাপদ দূরত্বে বসে থরহরি আগুন দেখছিল আর রচনা লিখে যাচ্ছিল। যেহেতু লেখাপড়ায় ছেলেটার মাথা ভাল, তাই রামহরি ছেলের এসব কাণ্ডে মনে মনে বিরক্ত হলেও মুখে কিছু বলতেন না। কিন্তু যেদিন রামহরির পোষ্য এবং অতি আদরের গোরুগুলিকে নিয়ে থরহরি বিদ্যাচর্চা করতে লাগল সেদিন আর তিনি রাগ সামলাতে পারলেন না। ঘটনাটা ঘটেছিল যখন থরহরি ক্লাস সেভেনে পড়ে। বাড়ির রাখাল রোজই গোরু নিয়ে মাঠে যায় আর বিকেলবেলা ফিরে আসে। থরহরি একদিন রাখালকে হটিয়ে দিয়ে নিজেই গোরু নিয়ে মাঠে গেল। তার মনে হল গোরুগুলো রোজই এক রাস্তা দিয়ে যায় আবার সেই রাস্তা দিয়েই ফিরে আসে। এতে গাঁয়ের পথঘাট ভাল করে চেনা হয় না। গোরুদের পথ চেনাবার জন্য নিয়ে গেল অনেক দূরে এবং সব ক'টার গলায় নামঠিকানা লিখে নিজে চলে গেল ফুটবল খেলতে। সন্ধ্যা পেরিয়ে যাওয়ার পরও গোরু ফিরল না দেখে রামহরি তাঁর দলবল নিয়ে গোরু খুঁজতে বেরোলেন। গোরুগুলো পাওয়া গেল বলে, তবে অনেক ঝামেলা করে। কয়েকটাকে পাওয়া গেল সুখবেড়িয়ার খোঁয়াড়ে, দুটো মুগবেড়িয়ার জঙ্গলে আর একটাকে গোহাটার কা একজনের বাড়িতে। সব ক'টা গোরুকে নিয়ে রামহরি বাড়ি ফিরলেন রাত্রি এগারোটা নাগাদ। রাগে তাঁর শরীর জ্বলছে। ছেলেকে উচিত শিক্ষা না দিতে পারলে তাঁর গায়ের জ্বালা জুড়োবে না। তিনি গোরুগুলোকে গোয়ালে ঢুকিয়ে ওদের খেতে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। তারপর গেলেন দুধ দুইতে। সন্ধ্যাবেলার দুধ তো নেওয়াই হয়নি। কিন্তু দুধ কোথায়? যে দুটি গোরু মুগবেড়িয়ার জঙ্গলে ছিল কেবল সেই দুটির বাঁট থেকেই দুধ পাওয়া গেল। বাকিগুলোর দুধ বোধহয় আগেই কেউ নিয়ে নিয়েছে। রামহরি রেগেই ছিলেন। এবার সেই আগুনে ঘৃতাহুতি হল। তিনি গর্জন করে ডাকলেন, ‘থরহরি, ব্যাটা থরহরি কোথায়?’
থরহরির মা চিৎকার শুনে ঘরের বাইরে এলেন। অবাক দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সে কী ! তুমি ছোট খোকার খোঁজ করছ কেন? ছেলেটা তো খেয়েদেয়ে ঘুমোচ্ছে।'
রামহরি বেজায় রেগে ছিলেন। রাগের গলাতেই বললেন, ‘ওর ঘুম আমি দেখাচ্ছি। আমার পোষ্য গোরু, বিষ্ণুর বাহন, তাঁকে নিয়ে ওর ছেলেখেলা। কাল সকালে বাড়ি বাড়ি যে দুধ দিতে হবে সে দুধ পাব কোথায়?’
রামহরির স্ত্রী এবং তাঁর দাদা প্রাণহরি কোনওক্রমে রামহরিকে শান্ত করে খেতে পাঠালেন। সকালবেলা ছেলেকে এসব কথা বলতেই থরহরি বলল, ‘আমি ভেবেছিলুম ওরা পথ চিনে চলে আসতে পারবে। এতদিনেও যদি গাঁয়ের পথঘাট চিনতে না পারে তা হলে ওদের পুষে কী লাভ? হয় ওদের জন্য একজন গাইড রাখো, না হয় বিক্রি করে দাও।'
রামহরি রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ‘ওরা তোর চাইতে উপকারী। তুই তো একটা আস্ত পাঁঠা।’
থরহরি নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, ‘পাঁঠা তো বাবা আস্তই হয়। আধখানা পাঁঠা কি তুমি দেখেছ? মাংস হতে পারে, কিন্তু পাঁঠা আধখানা হবে কী করে?’
বাবার সামনে কথাগুলো বলে চলে যাওয়ার পর থরহরির মনে হল, জগতে পাঁঠা এবং গোরুর মধ্যে কে বেশি উপকারী? পাঁঠা তো মানুষের বাসনা নিবৃত্তির জন্য নিজেকে সমর্পণ করে। বারোয়ারি কালীতলায় তো পুজোর সময় পাঁঠাকেই বলি দেওয়া হয়। এই গুরুতর চিন্তাটা দু’-তিনদিন ধরে থরহরিকে বড্ড জ্বালাতন করে চলল। তারপর থাকতে না পেরে একদিন অঙ্কের স্যার ভূদেববাবুকে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, জগতে পাঁঠা এবং গোরুর মধ্যে কোনটা বেশি উপকারী?
অঙ্কের স্যার তখন ছাত্রদের আয়তক্ষেত্র বোঝাচ্ছিলেন। হঠাৎ থরহরির প্রশ্ন শুনে তিনি বললেন, ‘কী বললি?'
থরহরি আবার প্রশ্নটার পুনরাবৃত্তি করতেই ভূদেববাবু বললেন, ‘এদিকে আয়। এদিকে আয় চট করে।'
থরহরির পরনের প্যান্টটা একটু বেশি ঢোলা। মাঝে মাঝেই কোমর থেকে নীচে নেমে আসে। তাই যখনই বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ায় তখনই দু’ হাত দিয়ে প্যান্টটা ওপরে টেনে তুলতে হয়। ওটা এখন থরহরির মুদ্রাদোষে দাঁড়িয়ে গেছে। অঙ্কের স্যারের ডাক পেয়ে থরহরি উঠে দাঁড়াল এবং প্যান্টটা ওপরের দিকে টেনে তুলতে তুলতে এগিয়ে এল অঙ্কস্যারের সামনে।
ভূদেববাবু বাঁ হাতে থরহরির ঘাড়টা ধরে গর্জন করে উঠলেন, ‘যা, বেরিয়ে যা আমার ক্লাস থেকে। তোর মতো বাঁদর যেন ক্লাসে না থাকে।'
থরহরি দরজা দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে তৎক্ষণাৎ ফিরে এসে দরজার মুখে দাঁড়িয়ে ডাকল, ‘স্যার।'
ভূদেববাবু তখনও রেগে আছেন। হাতের ডাস্টার তুলে বললেন, ‘অ্যাই বাঁদর, আমার চোখের সামনে থেকে সরে যা।'
থরহরি খুব বিনীত ভঙ্গিতে বলল, ‘যাচ্ছি স্যার! কিন্তু একটা কথা বড্ড জানতে ইচ্ছে হচ্ছে। বাবা বললেন পাঁঠা, আপনি বললেন বাঁদর। তা গোরু, পাঁঠা আর বাঁদরের মধ্যে কে বেশি ভাল?’
থরহরির প্রশ্ন শুনে ভূদেববাবু কয়েক সেকেন্ড স্থির চোখে তাকিয়ে থেকে গর্জন করে উঠে বললেন, ‘তুই বাঁদর না, শুয়োর।'
থরহরি বলল, ‘স্যার, আপনি লেখাপড়া জানা মানুষ। কিন্তু আপনার কথার কোনও ঠিক নেই। যা বলবেন তা ভেবে বললেই হয়। ঘন ঘন কথা পালটানো কি ভাল।'
ভূদেববাবুর চোখ লাল হয়ে উঠেছে। গোটা ক্লাস নিস্তব্ধ। তিনি রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ‘ঘন ঘন কথা পালটাই মানে? আমি মিথ্যেবাদী। কী বলতে চাস তুই?’
থরহরি বলল, ‘এক মিনিট আগে সবার সামনে বললেন আমি বাঁদর। ঠিক এক মিনিটেই আপনি মত বদলে বললেন, আমি শুয়োর। একসঙ্গে তো বাঁদর আর শুয়োর হওয়া যায় না। তাই ভেবে যে কোনও একটা বলুন।'
থরহরির কথা শুনে ক্লাসসুদ্ধু সবাই শব্দ করে হেসে উঠতেই ভূদেববাবু আরও রেগে গেলেন। রেগে গিয়ে হাতের ডাস্টারটা ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে ছুড়ে দিয়ে ক্লাস ছেড়ে বেরিয়ে সোজা চলে গেলেন হেডস্যারের ঘরে। টিফিনের সময় থরহরির ডাক পড়ল হেডস্যারের ঘরে। থরহরি নিজের প্যান্ট টেনে ওপরে তুলতে তুলতে হেডস্যারের ঘরের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। পণ্ডিতমশাই হেডস্যারের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে থরহরিকে দেখে বলে উঠলেন, ‘যা, স্যারের কাছে যা। বেয়াদপি করার মজা টের পাবি। তুই একটা রামছাগল।'
হেডস্যারের সামনে ভূদেববাবু এবং আরও দু’জন স্যার বসে। হেডস্যার থরহরিকে দেখেই বললেন, ‘এই, তুই ভূদেববাবুর মুখে মুখে তর্ক করেছিস কেন? কেন ওঁকে অপমান করেছিস?'
থরহরি হাতজোড় করে করুণ স্বরে বলল, 'স্যার, আমি মোটেও ওঁকে অপমান করিনি। আমি শুধু ওঁকে বলেছি, স্যার যা বলবেন তা ভেবে বলুন। মিনিটে মিনিটে কথা পালটানো কি ভাল?’
হেডস্যার টেবিলের ওপর একটা চাঁটি মেরে বললেন, ‘স্যারকে কি একথা বলতে পারো? উনি কি ঘন ঘন কথা পালটানোর মানুষ!
থরহরি আগের মতোই করুণ স্বরে বলল, ‘ক্লাসের সবাইকে ডাকুন। ওরা তো দল বেঁধে মিথ্যে বলবে না। আমি স্যারের সামনেই বলছি, উনি প্রথমে আমাকে বললেন, বাঁদর। মিনিট পার হতে-না-হতেই বললেন শুয়োর। এটা কি কথা পালটানো নয়? একটা প্রাণী কি একই সঙ্গে বাঁদর আর শুয়োর হতে পারে? আর যদি হতেই পারে তা হলে একটা সরল অঙ্কের দুটো উত্তর হলে নম্বর কাটা যাবে কেন?’
হেডস্যার চোখ তুলে থরহরির দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘বকাবকির সময় ওরকম হয়। তুই একটা গাধা, তাই বুঝতে পারিসনি।'
থরহরি যেন বিষম সমস্যায় পড়েছে তেমন ভাব করে কাতর কণ্ঠে বলল, ‘স্যার, আপনারা পণ্ডিত লোক, আমার পূজনীয়। আপনারা কেউ একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারছেন না। অঙ্কের স্যার বললেন, আমি বাঁদর, পরে শুধরে নিয়ে বললেন শুয়োর। আপনার ঘরে আসবার আগে পণ্ডিতমশাই বললেন, রামছাগল, আপনি বললেন গাধা। কারও সঙ্গেই তো কারও কথা মিলছে না। আপনাকে যদি পাঁচজনে পাঁচ নামে ডাকে তা হলে আপনার কেমন লাগবে? আপনারা বসে যে কোনও একটা নাম ঠিক করুন। একসঙ্গে অতগুলো প্রাণী কি কারও পক্ষে হওয়া সম্ভব?’
হেডস্যার চোখ বড় বড় করে থরহরির কথা শুনছিলেন। এবার চোখের চশমা খুলে টেবিলে রেখে বাঁ হাতটা টেবিলের তলায় ঢুকিয়ে লম্বা একটি বেত বার করে এনে বললেন, ‘ঘুরে দাঁড়া। পিঠে পাঁচ ঘা বেত দিলে তোর পাকামো ঘুচবে।'

থরহরি হেডস্যারের কথামতো ঘুরে দাঁড়াতে যাচ্ছিল, তখনই অঙ্কের স্যার ভূদেববাবুকে বললেন, ‘পাঁচ নয় স্যার, দশ ঘা মারুন।'
সেই সময় ঘরে ঢুকছিলেন পণ্ডিতমশাই। তিনি বললেন, ‘বেতাবেতির দরকার কী! তার চাইতে আপনার ঘরের সামনে ছুটি পর্যন্ত নিল ডাউন করে রাখুন। স্কুলের বেবাক ছাত্র দেখুক।'
হেডস্যারের কথামতো ঘুরে দাঁড়াতে গিয়েও থরহরি শেষ পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়াল না। আগের মতোই হেডস্যারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে খুব চিন্তিত ভঙ্গিতে বলে উঠল, ‘দেখলেন তো, এখানেও কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। একেক স্যারের একেক মত। আপনি বললেন পাঁচ ঘা, অঙ্কের স্যার বললেন দশ ঘা, আবার পণ্ডিতস্যার হুকুম দিচ্ছেন নিল ডাউন। দোষ যদি করেই থাকি তবে একটা দোষের জন্য এতরকম শাস্তি হবে কেন? একই সঙ্গে তো প্রাণদণ্ড আর কারাদণ্ড হতে পারে না। আপনারা ভেবে ঠিক করুন কী করবেন। পাঁচ ঘা, না দশ ঘা, না কি নিল ডাউন’
হেডস্যার বেতটা টেবিলের ওপর রেখে ঘণ্টি বাজালেন। দফতরি সুবল আসতেই বললেন, ‘প্রথমে এক গ্লাস ঠান্ডা জল দে, তারপর এই হস্তিমূর্খটাকে আমার সামনে থেকে চলে গিয়ে ক্লাসে যেতে বল।'
থরহরি এবার অভিমানজড়ানো গলায় বলল, 'আমি তো সাধ করে আসিনি, আপনিই ডেকে পাঠিয়েছেন।'
থরহরি চলে যেতে যেতে পণ্ডিতস্যারকে বলল, ‘স্যার, হস্তিমূর্খ মানে কী?
পণ্ডিতস্যার থরহরির পিঠে একটা হালকা থাপ্পড় মেরে বললেন, ‘তাও জানো না। হাতির মতো মূর্খ। একেবারেই মূর্খ।
থরহরি অবাক গলায় বলল, ‘হাতি আবার কবে স্কুলে গিয়ে শিক্ষিত হয়েছে? পৃথিবীর কোনও হাতি কস্মিনকালেও মাধ্যমিক পাশ করেনি। ওঁরা বংশানুক্রমে অশিক্ষিত’
হেডস্যার এবার থরহরির পরিবর্তে পণ্ডিতমশাইকে বললেন, ‘গোপেনবাবু ওকে আর বকাবেন না, যেতে দিন।'
হেডস্যারের বারান্দা থেকে লাফ দিয়ে নীচে নেমে থরহরি দফতরি সুবলকেই দুঃখের সঙ্গে বলল, ‘দেখলে তো সুবলদা, হেডস্যার নিজেই কথা পালটান। প্রথমে গাধা বলে পরে বললেন হস্তিমূৰ্খ। কেউই এখন পর্যন্ত আমার সম্পর্কে একটা স্থির সিদ্ধান্ত নিতে পারল না। বড়দের মন এত চঞ্চল হলে চলে?'
মোটামুটি এইভাবেই গোটা স্কুলের সবাইকে সন্ত্রস্ত করে থরহরি মাধ্যমিক পাশ করে গেল। দশ ক্লাস পর্যন্ত ছোটখাটো ঘটনা কিছু ঘটালেও বড়রকমের উৎপাত সে একবার বই দ্বিতীয়বার করেনি। সেই উৎপাতের ঘটনাটা ঘটেছিল মাধ্যমিকের টেস্ট পরীক্ষার পর। পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার পর পড়ার চাপ কিছুটা কমতেই থরহরি যথারীতি তার স্বভাব অনুযায়ী মাঠে, বাগানে আর বিষ্ণুপদদের বাঁশবাগানে খেলে বেড়াতে লাগল। ছেলেটা রাতদিন খেলে বেড়াচ্ছে দেখে ছেলেকে ডেকে রামহরি একদিন বললেন, ‘এত টো টো করে ঘুরে বেড়াস কেন? এট্টু পড়াশোনাও তো করতে পারিস?’
থরহরি বলল, ‘টেস্টে যদি না উতরোই তা হলে তো আর পরীক্ষার তাড়া নেই। ফালতু কেন আগে থেকে পড়তে যাব।'
রামহরি ভেবে দেখলেন কথাটা খুব খারাপ বলেনি। তাই গলাটা নরম করে রামহরি বললেন, ‘দুপুরের দিকে তো এট্টু দোকানেও বসতে পারিস। সন্ধেবেলা বাপ-জ্যাঠার সঙ্গে বসে কেত্তন করলেও তো মনটা ভাল থাকে।'
এখানে বলে রাখা দরকার যে, রামহরি সাহার একটি বিচিত্র দোকান ছিল। সে দোকানে কী পাওয়া যায় তার দীর্ঘ ফর্দ দেওয়ার চাইতে কী পাওয়া যায় না সেটা বলাই বোধহয় সহজ। মুদি-মশলা, চাল, স্টেশনারি দ্রব্যাদির সঙ্গে আলু, পেঁয়াজ, ডিম, কোক কয়লা, ঘুঁটে, উনুন, পাটকাঠি, মাটির বাসন, কলাপাতা, এমনকী মরবার পর ঘাটে নিয়ে যাওয়ার খাটিয়া পর্যন্ত। শবযাত্রায় যা যা লাগে তার সবই রামহরির দোকানে পাওয়া যায়। রামহরি ভেবেচিন্তেই এসব জিনিস দোকানে রেখেছে। ঘাটে নেওয়ার খাটিয়া মুড়াগাছা গ্রামে একমাত্র রামহরি সাহা ছাড়া আর কারও দোকানে পাওয়া যায় না। ওটি আনতে হলে মুগবেড়িয়া পেরিয়ে যেতে হবে গোবিন্দপুরের বড়বাজারে। সেখানে না পেলে এবার ছুটতে হবে আরও দু’ কিলোমিটার দূরের স্টেশনবাজারে। ফলে শুধু মুড়াগাছা নয়, মুগবেড়িয়া এবং সুখবেড়িয়া গ্রামের কেউ মরলেও রামহরি ঠিক জানতে পারেন। খাটিয়া বেচতে বেচতে রামহরি বলেন, ‘তা আপনাদের কেত্তন পাটি লাগবে না? আমার তো পুরো দল আছে। যদি বলেন তবে তৈরি হয়ে নিই।'
খাটিয়ার সঙ্গে কেত্তনের বায়নাও বেশ জুটে যায়। এই উপরি পাওনার লোভটুকু রামহরি ছাড়তে পারেন না। ছেলেকে অনুরোধ করতেই থরহরি বলল, ‘আগে ভেবে দেখি, পরে তোমায় বলব।'
দিন তিনেক পরে থরহরি এসে বসল বাবার দোকানে। রামহরি তো ছেলের সুবুদ্ধি দেখে বেজায় খুশি। দু’দিন দোকানে বসবার পর ছোট্ট একটা ঘটনা ঘটাল থরহরি। রামহরি সেদিন তাঁর দলবল নিয়ে কীর্তন গাইতে গেছেন পঞ্চাননতলায়। বেশিদূর নয়, নিজের বাড়ি থেকে দেড় কি দু’ কিলোমিটার হবে। দোকানের গদিতে বসেছে থরহরি, সঙ্গে দু'জন কর্মচারী। একজনের নাম কানাই, অন্যজন বলাই। দু'জন দু’ জায়গার লোক, কিন্তু নামে মিল থাকলেও স্বভাবে একেবারে বিপরীত। কানাই এসে ফিসফিস করে থরহরিকে বলল, ‘আজ্ঞে ছোটবাবু, আপনি তো নতুন, তাই বলছি বলাইয়ের দিকে এট্টুখানি নজর রাখবেন।'
থরহরি বলল, ‘কেন?’
কানাই আগের মতোই ফিসফিস করে বলল, ‘ব্যাটা একটা রাক্ষস। কাজ করে আর ভেলিগুড়ের ড্যালা সটকায়।'
থরহরি সোজা হয়ে বসে বলল, ‘সটকায় মানে? চুরি করে?’
কানাই বলল, ‘চুরি করে বাড়ি নিয়ে যায় তা বলছি না। ও তো গুড়খাদক। ড্যালা ড্যালা গুড় খেয়ে নেয়। রোজ প্রায় হাফ কিলো গুড় খায়।'
থরহরি গম্ভীর হয়ে গেল। একটু পরে বলাই এসে বলল, ‘ছোটকত্তা, একখান কথা ছ্যাল।'
থরহরি বলল, ‘বল।'
বলাই গলার স্বর খাটো করে বলল, ‘কানাইটার দিকে নজর রাখবেন। ব্যাটার মুখে সবই রোচে। কাঁচা পাঁপড় থেকে বস্তার মুগডাল পর্যন্ত সব চিবিয়ে চিবিয়ে খায়। ওর গায়ে বনমানুষের মতো গন্ধ।
থরহরি আরও গম্ভীর হয়ে গিয়ে দু'জনের দিকেই নজর রাখতে লাগল। একটু পরেই তার মনে হল, তিনটে কাজ একসঙ্গে করা যায় না। দুটো সেয়ানা লোকের দিকে নজর রাখা এবং দোকানদারি করা খুব সহজ কম্ম নয়। অথচ দোকানদারি না করলে টাকা আসবে না। অতএব সে ভেবেচিন্তে একটা নোটিশ লিখে দোকানে টাঙাল। নোটিশে লেখা, ‘বেলা এক ঘটিকা হইতে দুই ঘটিকা পর্যন্ত টিফিন। সেইহেতু উক্ত সময়ে বিকিকিনি বন্ধ’।
এক ঘণ্টা ছুটির খবর পেয়ে কানাই-বলাই আহ্লাদে আটখানা। কিন্তু তখনও তারা জানত না তাদের কপালে কী ঘটতে চলেছে।
টিফিন শুরু হতেই থরহরি দু’জনকে ডেকে বলল, ‘তোরা বোস, তোদের খাবার আনছি।' একটু পরে দুটো শালপাতার ঠোঙা নিয়ে থরহরি হাজির হল। একটাতে শুধু আধ কিলো ভেলিগুড় অন্যটাতে আধ কিলো মুগডাল। দুটো দু’জনকে দিয়ে থরহরি বলল, ‘নে, তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেল।'
নিজেদের টিফিন দেখে কানাই-বলাই পরস্পরের দিকে করুণ চোখে তাকাল। শুধু বলাই বলল, 'চুকলি কাটার মজা দেখলি তো! আমার কী, আমি এক কিলো ভেলি সাবড়ে দেব। তুই ব্যাটা কেমন কাঁচা মুগ সাবড়াস সেটা দেখব।'
না খেয়ে যেহেতু উপায় ছিল না, তাই অগত্যা দু'জনেই টিফিন খেয়ে ফেলল বটে, কিন্তু দোকান চালুর পর কানাই আর বেশিক্ষণ কাজ করতে পারল না। প্রথমে শুরু হল পেটে যন্ত্রণা, পরে বমি। তারপরেই চোখ উলটে নুনের বস্তার ওপর শুয়ে দাপাতে লাগল। থরহরি একটা সাইকেল-রিকশাভ্যান ডেকে কানাইকে পাঠিয়ে দিল কোবরেজমশাইয়ের কাছে। ওদিকে একসঙ্গে হাফ কিলো ভেলিগুড় খেয়ে গা গোলাতে আরম্ভ করেছে বলাইয়ের। শরীরের অস্বস্তি অনেকক্ষণ চেপে রেখেছিল, কিন্তু যখন পারল না তখন এসে থরহরির কাছে ছুটি চাইল। থরহরি কিছুতেই ছুটি দেবে না, আবার ছুটি না নিলে বলাইয়েরও চলছে না। তার গা গোলাচ্ছে। গা বমি-বমি ভাব শুরু হয়ে গেছে। ছুটি না পেয়ে বলাই মনে মনে বিষম চটে গেল। রেগে গেলে আবার বলাইয়ের খিদে বেড়ে যায়। তাই প্রথমে সে দেড়খানা কাঁচা পাঁপড় খেল। তারপর একমুঠো চানাচুর। বলাইয়ের মনে হল শরীরটা সুস্থ হচ্ছে। অতএব, উৎসাহ পেয়ে সে এক খাবলা বাসমতি চাল চিবিয়ে ফেলল। বলাইয়ের মনে হল এই খাওয়াখাওয়ির ব্যাপারটা কেউই লক্ষ করেনি। কিন্তু থরহরি তো গোড়া থেকেই নজর রেখেছিল। কানাই চলে যেতে শুধু একজনের ওপরই নজর রাখতে হচ্ছে, আর থরহরির পক্ষে সেটা অনেক বেশি সুবিধাজনক।
দোকানে সন্ধ্যাবাতি দেওয়ার পর থরহরি ডাকল, ‘বলাই।’
বলাই সামনে এসে দাঁড়াল। থরহরি বলল, ‘খাবলে খাবলে যত জিনিস খেলি সেটা হজম হবে তো? যদি না হয় তার জন্য ওষুধ দিচ্ছি। যত পারিস খাবি, কিন্তু সব শেষে এই ওষুধটা খেয়ে নিলেই দেখবি পেট ‘পোসকার’ হয়ে গেছে। নে হাঁ কর।'
বলাই হাঁ করল। থরহরি কাগজের ঠোঙা থেকে বলাইয়ের মুখে ওষুধ ঢেলে দিয়ে বলল, ‘আর ভয় নেই। সব পোসকার হয়ে যাবে।'
অদ্ভুত স্বাদের ওষুধটা গলা দিয়ে নামতে চাইছিল না। থরহরি জোর করে জল ঢেলে সেটা নামিয়ে দিতেই বলাই বলল, ‘বুক-পেট জ্বলে যাচ্ছে গো! এটা কী ওষুধ?’
থরহরি খুব শান্ত গলায় উত্তর দিল, ‘কাপড়কাচা সোডা আর পল্টন সাবান। তোর পেট পোসকার হয়ে যাবে। যদি রাস্তায় আছড়ে আছড়ে নিজেকে কম্বলের মতো এট্টু কাচতে পারিস তা হলে তো কথাই নেই।'
রামহরি সাহার, ‘হরিভাণ্ডার’ নামক বিচিত্র দোকানে কানাই-বলাইকে এরপর আর দেখা যায়নি। কানাই কোবরেজমশাইয়ের ওষুধে সেরেছিল, কিন্তু বলাইকে যেতে হয়েছিল সদর হাসপাতালে। কিন্তু সুস্থ হয়ে কেউই আর হরিভাণ্ডার-এ ফিরে আসেনি। বলাবাহুল্য, এই ঘটনার পর রামহরিও আর কখনও থরহরিকে দোকানে বসবার কথা উচ্চারণ করা তো দূরে থাক, বসাবার চিন্তাও মাথায় আনেনি।
দোকানে বসার দায় থেকে অব্যাহতি পেয়ে থরহরি পরমানন্দে আবার ঘুরে বেড়াতে লাগল। শুধু যে ঘুরে ঘুরে বেড়াত তা নয়, মাধ্যমিকের ফলাফল প্রকাশের আগে ছাত্রদের জন্য সে একটা বই লিখে ফেলল। চিলেকোঠার ছাদে বসে শুরু হল বই লেখা। ছেলে বই লিখছে শুনে রামহরি মনে মনে এত খুশি হল যে, দু'দিনের মধ্যেই সে গোটা গ্রামে খবরটা রটিয়ে দিল। পাড়ার লোকজন থরহরিকে দেখলেই জিজ্ঞেস করতেন, ‘ওহে থরহরি, তুমি নাকি বই লিখছ?’
থরহরি বিনয়ের সঙ্গে জবাব দিত, ‘আজ্ঞে, চেষ্টা করছি।'
এরপরেই প্রশ্ন হত, ‘তা কী নিয়ে লিখছ? নাটক-নভেল, না কি পুরাণাদি নিয়ে কিছু? তোমার লেখ্য বিষয়টা কী?
থরহরি জবাব দিত, ‘আজ্ঞে, আমি এমন কিছু লেখবার চেষ্টা করছি, যা জানা থাকলে আর কিছু জানার দরকার হয় না। ওইটুকু জানলেই বাকি জীবনটা মুড়াগাছায় কাটিয়ে দেওয়া যাবে। আমার বইয়ের নাম ‘বাহুল্যবর্জিত জ্ঞানভাণ্ডার’।'
শুধু রামহরি নয়, গোটা গ্রামের প্রায় সকলেই এই বাহুল্যবর্জিত জ্ঞানভাণ্ডার সম্পর্কে বেজায় কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। থরহরির স্কুলের শিক্ষক এবং হেডমাস্টারমশাইয়ের কাছেও খবরটা পৌঁছল। এদিন রামহরির দোকানে সওদা করতে এসে হেডস্যার জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাদের থরহরি, মানে আপনার ছোট ছেলে নাকি এখন বইটই লিখছে?’
রামহরি মনে মনে পুলকিত হলেন। জবাব দেওয়ার আগে আঙুল তুলে দোকানের বাঁশে টাঙানো একটা জিনিসের দিকে নির্দেশ করলেন। হেডস্যার দেখলেন এক খণ্ড মোটা পিজবোর্ডের ওপর রং-পেনসিল দিয়ে লেখা, ‘শ্রীমান থরহরি সাহা প্রণীত ‘বাহুল্যবর্জিত জ্ঞানভাণ্ডার’ শীঘ্রই প্রকাশিত হইবে। নির্জন চিলেকোঠায় রচনাকার্য চলিতেছে। অগ্রিম দুই টাকা দিয়া নাম লিখাইয়া যান।'
হেডস্যার গোপনে একটা ঢোক গিলে বললেন, ‘তা অগ্রিম টাকা কেউ দিচ্ছে?’
রামহরি উত্তর দিলেন, 'বলেন কী স্যার! পঞ্চান্নজন অগ্রিম টাকা দিয়ে গেছেন। জ্ঞানের পিপাসা তো দারুণ পিপাসা। তা ছাড়া...'
রামহরি দম নেওয়ার জন্য একটু থামতেই হেডস্যার বললেন, ‘তা ছাড়া কী?’
রামহরি এবার বিনীত কণ্ঠে বললেন, ‘তা ছাড়া ধরুন, যাঁরা মাসকাবারি জিনিস নেন, গোটা মাস ধরে ধারে মাল নিচ্ছেন তাঁরা তো মুখ ফুটে চাইলে আর ফেরাতে পারবেন না। এই করে বই ছাপানোর খরচটা উঠে এলেই আমি খুশি। আপনি শুধু স্যার ছাপাতে দেওয়ার আগে একবার চোখ বুলিয়ে দেবেন। সব ঠিকই থাকবে, শুধু একবার চোখ দিয়ে চাখিয়ে নেওয়া আর কি!’
হেডস্যার আর কোনও কথা বললেন না। যে গতিতে দোকানে এসেছিলেন তার চাইতেও দ্রুতগতিতে তিনি বাড়িমুখো হাঁটা দিলেন। থরহরির বাহুল্যবর্জিত জ্ঞানভাণ্ডার রচনা যতই অগ্রসর হতে লাগল স্কুলের শিক্ষকদের কৌতূহল এবং আশঙ্কা ততই বাড়তে লাগল। একসময় রামহরি নিজেও শঙ্কিত বোধ করতে লাগলেন। শ্রীমান থরহরি বিশেষ কিছুই করেনি, কেবল দুই বালতি জল এনে এক বালতি নুনের বস্তায় আর এক বালতি চিনির বস্তায় ঢেলে দিয়ে দেখতে লাগল নুন এবং চিনির মধ্যে কে আগে গলে যায়। এই কাজটি না করে থরহরির উপায় ছিল না। কেননা, বাহুল্যবর্জিত জ্ঞানভাণ্ডার রচনার জন্য এই পরীক্ষাটি নাকি অত্যাবশ্যক। থরহরির প্রথম পরীক্ষায় রামহরির লোকসান যা দাঁড়িয়েছিল সেটা কেত্তনের দর বাড়িয়েও পোষাতে পারেননি। দ্বিতীয় পরীক্ষাটি আর-একটু চড়া ধাঁচের হওয়ায় রামহরি শঙ্কিত হয়ে উঠলেন এবং বললেন, ‘বাবা থরহরি, তোর বাহুল্যবর্জিত জ্ঞানভাণ্ডার রচনার আগেই আমার হরিভাণ্ডার লাটে উঠবে এবং আমিও ঘাটে যেতে বাধ্য হব। অত লিখে দরকার নেই। জ্ঞানের কথা যত সংক্ষেপে হবে ততই লোকের মনে ধরবে। যদ্দূর লিখেছিস তাই ঢের। আর বেশি লিখে আমায় সর্বস্বান্ত করিস না।’
থরহরি যেন অবাক হয়ে গেল। বলল, ‘কেন, কী এমন করেছি!’
রামহরি গলার গামছা দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল, ‘এমন আর কী করবে, হাঁদা প্যালারামের মতো আমার বারোটা দুগ্ধবতী গাভীকে রাত্তিরে গাদা গাদা তেঁতুল খাইয়ে দিলে যাতে সকালে দুধের বদলে দই পাওয়া যায়। দই-দুধ তো খুবই পেলুম, এখন বদ্যি এনে গোরুগুলোর ব্যামো সারাতে হচ্ছে। এটা কি বাপের মাথায় বজ্রাঘাত নয় !’
থরহরি বলল, ‘ওঃ, এই কথা! হাঁদা প্যালারাম সত্যিই হাঁদা ছিল কি না, ওর থিয়োরিটা কতখানি ভুল সেটা যাচাই করে দেখতে হবে না? পরীক্ষার জন্য কত কিছু করতে হয়। তুমি এটুকু করতে পারছ না?’
রামহরি এবার ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “তোমার বিদ্যেচর্চা আমার বংশ লোপাট করে দেবে। বিষ খেলে মানুষ কেমন করে মরে এটা যাচাই করার শখ যদি তোমার কখনও হয় তা হলে তো বুড়ো বাপকে দিয়েই পরীক্ষাটা করবে। তাতে তুমি পিতৃহারা হবে আর আমি তোমার বিদ্যেচর্চার ফসল হয়ে খাটিয়া চেপে ঘাটে যাব। তাই বলছি ওসব পরীক্ষা-টরিক্ষা বন্ধ করো, নইলে তোমাকে চ্যালাকাঠ দিয়ে পিটিয়ে চিলেকোঠায় আটকে রাখব এই বলে দিলুম। এ আমার খোলপেটানো হাত। একটি চড় গালে বসালে ষোলোখানা দাঁত উড়ে গিয়ে সুখবেড়িয়ার জঙ্গলে পড়বে, আর খুঁজে পাবে না।'
থরহরি এবার রেগে গেল। রেগে গিয়ে বলল, ‘বাবা, তুমি হচ্ছ কলিযুগের হিরণ্যকশিপু।' রামহরি প্রশ্ন করলেন, ‘আর তুমি?’
থরহরি উত্তর দিল, ‘আমি হচ্ছি পেহ্লাদ।’
তখন মে মাসের মাঝামাঝি। সারা দুপুর গুমোট গরমের পর সন্ধ্যার মুখে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। মিনিট দশেক একনাগাড়ে বৃষ্টি হয়ে যাওয়ার পর সবেমাত্র থেমেছে। গাছের পাতা থেকে তখনও জল ঝরা থামেনি। এ অঞ্চলে ঘন ঘন বাতি চলে যাওয়ার রেওয়াজ আছে। বৃষ্টির আগে দু’-একবার দমকা বাতাস উঠতেই বাতি চলে গিয়েছিল। এখনও বাতি না আসায় চারপাশটা বিশ্রী রকমের অন্ধকার। হেডস্যার হ্যারিকেনের আলোটা একটু বাড়িয়ে দিয়ে জানলাটা খুললেন। তাঁর মনে হল অন্ধকার উঠোনে কীসের যেন শব্দ হচ্ছে। দশ মিনিটের বৃষ্টিতেই কঁাচা উঠোনে জল দাঁড়িয়ে গেছে। কেউ যেন সেই জল ভেঙে হাঁটছে। তিনি হ্যারিকেনটা জানলার কাছে তুলে হাঁক দিলেন, ‘কে?’
অন্ধকার উঠোন থেকে উত্তর এল, 'আজ্ঞে, আমরা।'
হেডস্যার গলা চিনতে না পেরে বললেন, 'আমরা মানে কারা? নাম কী?’ এবার উত্তর এল, ‘আজ্ঞে, স্যার, আমি রামহরি, তস্য পুত্র শ্রীমান থরহরি।'
হেডস্যার দরজা খুলে বারান্দায় এলেন। তিনি দেখলেন, পিতা-পুত্র দু’জনেই ছাতা মাথায় তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে। তিনি বললেন, 'কী ব্যাপার, এখন এখানে!’
রামহরি বিগলিত হয়ে বললেন, ‘এখনই তো আসবার সময় হল স্যার। বৃষ্টি নামবার বাইশ মিনিট আগে, আর আলো চলে যাওয়ার সাত মিনিট পরে শ্রীমান থরহরির বাহুল্যবর্জিত জ্ঞানভাণ্ডার রচনা সমাপ্ত হল। সঙ্গে সঙ্গে আপনার কাছে নিয়ে এলুম চোখ বোলাবার জন্য। একেবারে ভিয়েন থেকে নামানো। এখনও কালির গন্ধ বেরুচ্ছে।'
থরহরি গম্ভীর গলায় প্রতিবাদের ভঙ্গিতে বলল, ‘আমি ডট পেনে লিখি। ওতে কালির গন্ধ থাকবে না।”
হেডস্যার থরহরির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোর জ্ঞানভাণ্ডারে কী কী বিষয় আছে?’
থরহরি বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিল, ‘নানা বিষয় নানাভাবে রাখতে চেয়েছিলুম। কিন্তু কাজটা খুব গুছিয়ে করতে পারলুম না। বাবার উৎপীড়ন আমার কাজে নানা বিঘ্ন ঘটাতে আরম্ভ করল। তাই সংক্ষেপে সারতে হল। ভাবছি এই পুস্তকের দ্বিতীয় খণ্ডে আরও বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।'
রামহরি ছেলের হাত থেকে ‘বাহুল্যবর্জিত জ্ঞানভাণ্ডার’ পুস্তকের পাণ্ডুলিপি নিয়ে হেডস্যারের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘স্যার, এট্টু চোখ দিয়ে চেখে দেখবেন। থরহরি বলছিল, বইটা পড়ে আপনি একটা ভূমিকা-টুমিকা যদি লিখে দেন তা হলে খুব বাধিত হই।’
হেডস্যার আর কথা বাড়ালেন না। পাণ্ডুলিপিটা হাতে নিয়ে বললেন, ‘আগে তো পড়ে দেখি।'
থরহরির বাহুল্যবর্জিত জ্ঞানভাণ্ডার নিয়ে এতরকমের আলোচনা তিনি শুনেছেন যে, তাঁর নিজেরও কৌতূহল ছিল লেখাটা পড়বার। হ্যারিকেনে নতুন করে তেল ভরে তিনি তখনই বসে গেলেন থরহরির লেখা পড়তে।
পরদিন দুপুরে খবর এল হেডস্যার গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভরতি হয়েছেন। মাঝে মাঝে জ্ঞান ফিরলেই তিনি ফ্যালফ্যাল করে চারদিকে তাকাচ্ছেন আর থরহরির জ্ঞানভাণ্ডার বলতে বলতে আবার মূর্ছা যাচ্ছেন। হেডস্যারের মেয়ে ঝিমলি আর মিষ্টি বলছে বাবা ওই থরহরির বই পড়তে পড়তেই বার দুই ‘বাবাগো, মাগো, কী সাংঘাতিক’ বলতে বলতে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যান। সকালের দিকে আবার সুস্থ হয়ে উঠে দুধ-পাঁউরুটি খেয়ে টেবিলের কাগজপত্র গোছাতে গোছাতে যেই না থরহরির পাণ্ডুলিপির দিকে নজর পড়ে তখনই আবার ‘বাবাগো’ বলে সেই যে জ্ঞান হারান, সেই জ্ঞান ফেরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর। হেডস্যারের জ্ঞান হারানো এবং হঠাৎ অসুস্থ হওয়ার সঙ্গে থরহরির প্রণীত বাহুল্যবর্জিত জ্ঞানভাণ্ডার নামক পাণ্ডুলিপির কোনও সম্পর্ক আছে কিনা সেকথা আমরা জানি না। কিন্তু হেডস্যারের আকস্মিক হৃদপীড়ার সুবাদে থরহরির পাণ্ডুলিপিটি সম্পর্কে সকলেই অতিশয় কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। ইতিহাসের শিক্ষক পাণ্ডুলিপি পড়ার পর এক মাসের ছুটির দরখাস্ত জমা দিয়ে নিজের আদি গ্রাম দহিজুড়িতে চলে গেলেন। অঙ্কের স্যার অতুলবাবু সবটা পড়তে পারেননি, পড়লে কী হত জানি না, শুধু অঙ্কের বিষয়টুকু পড়ে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, পরে পণ্ডিতমশাইকে বললেন, ‘গোহত্যায় যদি প্রায়শ্চিত্ত করতে হয় তবে মানুষকে গোরু বানানোর জন্যও তো শিক্ষকের প্রায়শ্চিত্ত করা আবশ্যক। আমি থরহরির অঙ্কের মাস্টার হিসাবে প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই।'
এরপর থরহরির পাণ্ডুলিপিটি মুড়াগাছার আরও অনেকের হাতে হাতে ঘুরল। একসময় গণদাবি উঠল, ‘পাণ্ডুলিপি পড়ে সবাইকে শোনাবার ব্যবস্থা করা হোক। তেমন যুগান্তকারী কিছু থাকলে পঞ্চায়েতের খরচে এটি ছাপানোর ব্যবস্থা হওয়া উচিত। গণদাবি তো অগ্রাহ্য করা যায় না। অতএব, অঞ্চলপ্রধান ডেকে পাঠালেন থরহরিকে। দিন ঠিক হল। ‘গ্রামে গ্রামে রটি গেল সেই বার্তা’র মতো রটিয়ে দেওয়া হল শ্রীমান থরহরি সাহা রচিত এবং বহুপ্রত্যাশিত বাহুল্যবর্জিত জ্ঞানভাণ্ডার গ্রন্থটির পাণ্ডুলিপি স্বয়ং থরহরি নিজকণ্ঠে পাঠ করে শোনাবেন। জ্ঞান অর্জনে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকতে পারেন।'
রথতলার কাছে বারোয়ারি পুজোর ঠাকুরদালানে পাণ্ডুলিপি পাঠের আয়োজন করা হল।
ছেলেরা মাইক ভাড়া করল, সেই সঙ্গে জেনারেটরও। রীতিমতো একটা উৎসব। ছেলে-ছোকরা এবং বড়রা মিলিয়ে প্রায় শ'পাঁচেক লোক। লোকজনের ভিড় দেখে দাশু মণ্ডল বারোয়ারিতলায় তেলেভাজার দোকান দিয়ে ফেলল। দাশুর দেখাদেখি পান-বিড়ি, ফুচকা আর চাকা লাগানো ভ্রাম্যমাণ রোল-কর্নার, যার আগে নাম ছিল টারজান রোল সেন্টার, সেও রাতারাতি নাম বদলে ‘থরহরি রোল সেন্টার' নাম দিয়ে বারোয়ারিতলায় এসে রোল বানাতে লাগল। থরহরিকে রিকশা করে নিয়ে এলেন অঞ্চলপ্রধান নগেন বিষ্ণু থরহরি যেন ভি আই পি। সবার চোখ তার দিকে। থরহরি আজ বেজায় গম্ভীর। ঠাকুরদালানের চারপাশ থেকে থরহরিকে দেখামাত্র ছেলেরা আওয়াজ দিল, ‘অ্যাই থরহরি, থরহরি...'
দু’-একজন বয়স্ক লোক বললেন, ‘এইটুকুন ছেলে এমন বই লিখেছে যে, হেডমাস্টারের মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে। রামহরির পুত্রভাগ্য ভাল বলতে হবে। হরি সত্যিই ওকে কৃপা করেছে। বংশপরম্পরায় হরিনাম বিলিয়ে আসছে, তার ফল পাবে না? এইবার সেই ফল ফলেছে।'
অঞ্চলপ্রধান নগেন বিষ্ণুমশাই মাউথপিসটা মুখের সামনে নিয়ে বার-দুই ফুঁ দিয়ে পরীক্ষা করলেন। তারপর কেশে গলা পরিষ্কার করে বললেন, 'হ্যালো, হ্যালো, সবাই শুনতে পাচ্ছেন তো।'
চারপাশ থেকে বিকট চিৎকার উঠল, ‘পাচ্ছি, পাচ্ছি, পাচ্ছি।'
নগেন বিষ্ণুমশাই বলতে লাগলেন, ‘প্রিয় পল্লীবাসীগণ! আমি জানি এবং আপনারাও জানেন আজ আমরা কেন এখানে সমবেত হয়েছি। এ ধরনের সমাবেশ এই মুড়াগাছা গ্রামে এই প্রথম। সমাবেশ নানা সময়ে, নানা কারণে বিস্তর হয়েছে। কিন্তু আজকে যে কারণে সমাবেশ সেটা একেবারেই অভূতপূর্ব। আমি আমার এতখানি বয়সে এই মুড়াগাছা গ্রামে তো বটেই, এই বঙ্গের কোথাও ঠিক এই জাতীয় কারণে কোনও সমাবেশ হতে শুনিনি। আজকের অনুষ্ঠানের সভাপতি, মুড়াগাছার প্রবীণ মানুষ আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় জীবনবল্লভ আচার্য অর্থাৎ আমাদের কোবরেজমশাই, তিনিও হয়তো শোনেননি।'
নগেন বিষ্ণুর কথা শেষ হওয়ার আগেই হরীতকী চুষতে চুষতে কোবরেজমশাই উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, ‘শুধু আমি কেন, আমার স্বর্গত পিতৃদেব প্রাণবল্লভ আচার্য এবং ঊর্ধ্বতন চতুর্দশ পুরুষের কেউই এমন সমাবেশের কথা শোনেননি। সেদিক থেকে এটি একেবারেই নতুন। আমার আক্ষেপ, এমন একটা সমাবেশে কলকাতা থেকে বেতার এবং টিভিওলাদের এখানে আসা উচিত ছিল। আজ আমি গর্বিত যে, শ্রীমান থরহরির নামকরণ আমিই করেছি। আমার অনুরোধ, অকারণ বাক্যব্যয়ে সময়হরণ না করে পাণ্ডুলিপিটি পড়া আরম্ভ হোক।'
আবার জনতার চিৎকার উঠল, ‘পড়া আরম্ভ হোক, পড়া আরম্ভ হোক।'
নগেন বিষ্ণুমশাই দুই হাত ওপরে তুলে জনতাকে শান্ত করার ভঙ্গিতে বললেন, ‘শান্ত হোন, শান্ত হোন। পাণ্ডুলিপিটি পড়ার আগে একটি কথা বলা আবশ্যক। এই পাণ্ডুলিপি মুড়াগাছা গ্রামের যে কয়েকজন ইতিমধ্যে পড়েছেন। তাঁরা আজ আর আমাদের মধ্যে নেই।'
কথাটা বলেই জিভ কেটে ফেললেন নগেন বিষ্ণু। তৎক্ষণাৎ শুধরে নিয়ে বললেন, ‘মাফ করবেন, আমাদের মধ্যে নেই মানে, আজকে এখানে উপস্থিত নেই। একমাত্র আমি যে একবার পাণ্ডুলিপি পড়ার পর দ্বিতীয়বার সেটি শোনার জন্য এখানে উপস্থিত হওয়ার সাহস দেখাতে পেরেছি। আসলে আমি জনতার সেবক। জনতার দাবিকে অগ্রাহ্য করার অধিকার নেই বলেই এই সমাবেশ ডাকতে হয়েছে। যেহেতু আজ বিদ্যুতের অবস্থা বাড়ন্ত এবং জেনারেটরে পেট্রলের সঞ্চয় সামান্য সেই কারণে দেড়শো পাতার পাণ্ডুলিপিটি সম্পূর্ণ পাঠ না করে আজ কেবলমাত্র অংশবিশেষ পাঠ করার প্রস্তাব রাখছি। যদি সেটি আপনারা সইতে পারেন তা হলে অন্য কোনওদিন আবার পাণ্ডুলিপি পাঠের ব্যবস্থা করা যাবে। নমস্কার। এইবার শ্রীমান থরহরি পাণ্ডুলিপি পাঠ করবে।'
ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে কে ঢং করে একটা ঘণ্টা বাজিয়ে দিল— ঠিক যেমনটা বাজানো হয় যাত্রাপালা আরম্ভ হওয়ার আগে।
শ্রীমান থরহরি উঠে দাঁড়াল। মাউথপিসটা একটু নামিয়ে দেওয়া হল। থরহরি প্রথমেই বলল, ‘এটি কোনও মামুলি নাটক-নভেল বা ভূতের গপ্পো নয়। এটি জ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ। ছাত্রজীবনে আমাদের এমন কিছু শিখতে হয় বা শেখানো হয়, যা অধিকাংশ সময়েই আমাদের কোনও কাজে আসে না। নিজে লেখাপড়া করতে গিয়ে নানা বিষয়ে নানা অসংগতি, মানে এলেবেলে জিনিস লক্ষ করেছি। সেই কারণে আমি এই বাহুল্যবর্জিত জ্ঞানভাণ্ডার রচনায় হাত দিই। সমস্ত জটিলতা এবং ঝামেলার ব্যাপারগুলো বাদ নিয়ে খুব সংক্ষেপে জ্ঞান বিতরণের চেষ্টা এখানে রয়েছে। আপনাদের অনুমতি দিয়ে এবং অঞ্চলপ্রধানের নির্দেশ অনুসারে আমি আজ কেবল বিভিন্ন বিষয়ের কিছু স্যাম্পেল আপনাদের শোনাব। যদি ভাল লাগে তা হলে মুড়াগাছার হরিভাণ্ডারে অগ্রিম দু’ টাকা দিয়ে বই কেনার জন্য সভ্য হয়ে যাবেন, এই অনুরোধ।'
এই বক্তৃতা ছেলে-ছোকরাদের ভাল লাগার কথা নয়। তাই ছেলেরা চিৎকার করে বলতে লাগল, 'স্যাম্পেল দাও, স্যাম্পেল।'
কোবরেজমশাই বললেন, 'বাবা থরহরি, ফ্রি স্যাম্পেল দিতে শুরু করো।'
পাণ্ডুলিপির খাতা খুলে থরহরি প্রথমে বলল, ‘প্রথমে ইংরেজি স্যাম্পেল দিচ্ছি। সাহেবরা নিজেদের খুশিমতো এক-এক জিনিসের এমন এক-একটা নাম করে গেছেন যার সঙ্গে মূল জিনিসটার কোনও সম্পর্ক নেই। যেগুলো পারেননি, সেগুলি বাদ দিয়ে গেছেন। আমি সেই ফাঁকগুলি পূর্ণ করছি এবং বস্তুর সঙ্গে সম্পর্ক রেখে জিনিসের নতুন ইংরেজি নাম করছি। যেমন ‘বেগুন’কে ইংরেজিতে বলা হচ্ছে ‘ব্ৰিঞ্জল'। কিন্তু সেটা কোন বেগুন? মুড়াগাছা গ্রামেই তো তিন-চার রকমের বেগুন আছে। কুলি বেগুনকে তা হলে আমরা কোন নামে চিনব? যেহেতু ঢ্যাঁড়সের ইংরেজি ‘লেডিস ফিঙ্গার’ তাই কুলি বেগুনের নাম দেওয়া হল ‘জেন্টস ফিঙ্গার’। কাঁঠাল যদি জ্যাকফ্রুট হয় তা হলে এঁচোড়কে কেন ‘গ্রিন জ্যাক’ বলব। এঁচোড়ের নাম হবে ইয়ং জ্যাকফ্রুট’। ‘কলা’কে ইংরেজিতে বলা হচ্ছে ‘ব্যানানা’ অথবা ‘প্লানটেন’ কিন্তু কাঁচকলাকে বলা হয় 'গ্রিন প্ল্যানটেন’। তা হলে সিঙ্গাপুরি কলাকে কী বলা হবে? আমার বইতে কলা মানে ব্যানানা, কাঁচকলা মানে, ‘ইনফ্যান্ট ব্যানানা’।
‘আন্ট’ বললে সাহেবরা একই সঙ্গে কাকিমা, মাসিমা, পিসিমা সবাইকে বোঝেন। আমাদের তা বুঝলে চলবে কেন। পিতৃকুল আর মাতৃকুল এক করে দিলে চলবে না। তা ছাড়া রাঙাপিসিকে কী বলব?ন’ কাকিমাকে কোন নামে ডাকব? তাই আমার বইতে কাকিমা হচ্ছেন ‘লিটল মাদার', জেঠিমা ‘বিগ মাদার’, ঠাকুমা ‘ওল্ড মাদার’। ন’ কাকিমাকে বলতে হবে ‘এক্সেস মাদার’। আবার মাসিদের বলতে হবে ‘সিস্টার মাম্মি’, পিসিকে স্রেফ ‘আন্ট’ বললেই চলবে। শুধু রাঙাপিসিকে বলতে হবে ‘রেড আন্ট’। ‘আমড়া’কে কেন ইংরেজিতে ‘হগপ্ল্যাম’ বলা হবে? সাহেবরা কি আমড়া চেনে? মুড়াগাছা হচ্ছে আমড়ার দেশ। আমড়াকে ইংরেজিতে বলতে হবে ‘বিগ প্ল্যাম’। অর্থাৎ প্ল্যাম মানে কুল আর কুল হচ্ছে টক। আমড়াও টক। সাইজে বড় বলে ‘বিগ’ শব্দটা বসাতে হবে। ডি এ টি ই ‘ডেট’ মানে তারিখ আবার ‘ডেট’ মানে খেজুর। এতে বিভ্রান্তি হয়। তাই খেজুরের ইংরেজি আজ থেকে হল ‘অ্যারেবিয়ান ফ্রুটস’। এবার ইংরেজি থেকে আর দু’-চারটি স্যাম্পেল দেব। জবাফুলকে বলা হয় ‘চায়না রোজ’। জবা আবার চিনদেশে কবে আদর পাচ্ছে? কালীপুজোর এক নম্বর ফুল জবা, এটার সঙ্গে চায়নার সম্পর্ক কোথায়? জবার নাম দিয়েছি ‘মাদার রোজ’। যে কারণে শুঁটকি মাছ ‘ড্রাই ফিশ। সেই একই কারণে ‘আমসত্ত্ব’র ইংরেজি ‘ড্রাই ম্যাঙ্গো’। তোপসে মাছকে বলা হয় ‘ম্যাঙ্গো ফিশ'। আমিষ-নিরামিষ এতে একাকার হয়ে যাচ্ছে। ম্যাঙ্গো অর্থাৎ আমের সঙ্গে তোপসে মাছের সম্পর্ক কোথায়? আজ থেকে তোপসে মাছকে ইংরেজিতে বলা হবে ‘টপলেস ফিশ’, কইমাছকে ‘ড্যানসিং ফিশ’, ল্যাটাকে ‘স্লিপারি ফিশ’, শিং-মাগুরকে ‘ডিসকো ফিশ এবং গলদাকে ‘আনটাচেবল ফিশ'। যেহেতু অত দামের গলদা কেনা তো দূরের কথা, ছোঁয়ারও সাধ্য নেই, তাই আনটাচেবল ফিশ বলা হচ্ছে।'
থরহরি ইংরেজি স্যাম্পেল বিতরণ করে যেই মাত্র থামল, অমনই কোবরেজমশাই তড়াক করে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'আমায় মাফ করবেন। আমার বড্ড পেট কামড়াচ্ছে। আমি বাড়ি চললুম।'
পঁচাশি বছরের কোবরেজমশাই পঁচিশ বছরের যুবকের মতো লাফ দিয়ে মঞ্চ থেকে নামলেন আর নেমেই বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। সভাপতি সবেগে প্রস্থান করছেন দেখে পেছন থেকে কেউ কেউ ডাকলেন, ‘কোবরেজমশাই, ও কোবরেজমশাই...।'
কোবরেজমশাই মনে মনে বললেন, 'আগে থরহরির ইংরেজিটা হজম করি। যদি করতে পারি তবে পরে কোনও একদিন আসব।'
বারোয়ারিতলায় থরহরি সেদিন ইংরেজির সঙ্গে ইতিহাস আর অঙ্কের কিছু স্যাম্পেলও দিয়েছিল। বয়স্কদের অনেকেই সেদিন বুঝেছিলেন, থরহরি নামটা কোবরেজমশাই ভেবেচিন্তেই দিয়েছেন। এ-নাম ছাড়া অন্য নামে এ-ছেলেকে ভাবাই যায় না। কিন্তু অল্পবয়েসি ছেলে-ছোকরারা শুধু স্যাম্পেল শুনেই থরহরির ভক্ত হয়ে গেল। ক্লাস ফাইভ থেকে নাইন পর্যন্ত ক্লাসের ছাত্ররা এসে ভিড় করল হরিভাণ্ডারে, থরহরির বইয়ের অগ্রিম সভ্য হওয়ার জন্য। বয়স্কদের মধ্যে কেবল মধু কয়াল, যে ইদানীং পোলট্রির ব্যবসা করে বড়লোক হয়ে গেছে, সেই কেবল বলল, ‘থরহরিকে নিয়ে ঠাট্টা-রসিকতা করার আগে ভেবে দেখুন, ছেলেটা কিন্তু কিছু কিছু জিনিস যা বলেছে সেটা ভেবে দেখবার মতো।'
চণ্ডীমণ্ডপে রোজই তাস আর দাবার আসর বসে। তারা সবাই বয়স্ক লোক। সকলেই মধু কয়ালের কথায় প্রতিবাদ করে উঠে বলল, ‘ও বই পড়লে মুড়াগাছার একটা ছেলেও আর মানুষ হবে না। ছেলেটাকে রাঁচির পাগলা গারদে পাঠিয়ে দাও।'
মধু কয়াল বলল, ‘আপনারা ভেবে দেখুন, থরহরি ইতিহাসের যে স্যাম্পেল দিয়েছে, সেটা কিন্তু হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। থরহরি তার স্যাম্পেলে বলেছে, রাজা হর্ষবর্ধনের রাজ্যসীমা কতদূর ছিল সে বিষয়ে ঐতিহাসিকরাই যেখানে একমত নন, তখন নাবালক ছাত্রকে হর্ষবর্ধনের রাজ্যসীমা জিজ্ঞাসা করা অনুচিত। সেক্ষেত্রে ছাত্রের উত্তর হওয়া উচিত, হর্ষবর্ধনের রাজ্যসীমা এখনও অমীমাংসিত। কিংবা ধরুন, জাহাঙ্গিরের চরিত্র বর্ণনা প্রসঙ্গে থরহরি বলেছে, তিনি কেমন ছিলেন, পত্নী নূরজাহানের হাতের পুতুল ছিলেন কি ছিলেন না এ ব্যাপারে দুই ঐতিহাসিক মান্যবর ঈশ্বরীপ্রসাদ ও মান্যবর বেণীপ্রসাদ সর্বদাই দুই মত পোষণ করিয়াছেন। ছাত্ররা কাহার পক্ষ লইবে? অতএব, ছাত্রদের লেখা উচিত, বয়স্ক লোকের পারিবারিক ব্যাপারে এবং দাম্পত্যজীবনে ছাত্রদের নাক গলানো গর্হিত অপরাধ। তাঁহারা যেমন ছিলেন তেমনই ছিলেন। এতদিন পরে পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটিয়া লাভ নাই।'
মধু কয়াল ছাড়া অন্যরা তাস খেলা বন্ধ করে এতক্ষণ মধুবাবুর কথা শুনছিল। তাদের মধ্য থেকে একজন বলল, ‘এসব লিখলে কি ছেলেরা একজামিনে পাশ করতে পারবে? থরহরির সঙ্গে আপনাকেও রাঁচি পাঠানো উচিত।'
মধু কয়াল তর্ক করার ভঙ্গিতে বলল, ‘কেন, থরহরি যে বলেছে কার্জনের বঙ্গ বিভাগকে আন্দোলন করিয়া থামানো গিয়াছিল। কার্জন অতিশয় নিন্দনীয়। কিন্তু পরে সেই বঙ্গ তো বিভাগ হইল। তাহা থামানো গেল না। অতএব, কর্তারা যাহা করিবেন, তাহা নিজেদের স্বার্থে করিবেন। উহা লইয়া ছাত্রদের মাথা ঘামাইবার প্রয়োজন নাই। ছাত্ররা লিখিবে, বিদেশি সাহেব যাহা করিতে পারেন নাই, স্বদেশি সাহেবরা তাহা করিয়াছেন। উহারা সকলেই বয়স্ক এবং মানী লোক। বড় এবং মানী লোকের সমালোচনা ছোটদের সাজে না। বড় হইয়া ইহার উত্তর লিখিব। মাননীয় পরীক্ষক যদি ততদিন বাঁচিয়া থাকেন তাহা হইলে কুরিয়র সার্ভিসে উত্তর আপনার বাড়িতে পাঠাইয়া দিব। এ কথাগুলো কি পাগলের মতো বলেছে?’
চণ্ডীমণ্ডপের কেউই মধু কয়ালকে সমর্থন করল না। বরং পঞ্চাননতলার গুরুপদ ঠাট্টা করে বলল, ‘আপনার সাধ হলে আপনি থরহরিকে পুষ্যি নিন। নইলে ওর থুতনিতে আখের গুড় মাখিয়ে চুমু খান।'
মধু কয়াল মনে মনে চটে গেলেও মুখে কিছু বলল না। বুঝল একা এতগুলো লোকের সঙ্গে পারবে না। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে গুরুপদ গুছাইত বলল, ‘ওই থরহরির অঙ্কের স্যাম্পেল মনে আছে? ও ছোকরা বলল, তেলমাখানো বাঁশের ওপর একটি বাঁদর ওঠানামা করার যে অঙ্ক আছে ওটার উত্তর হবে, বাঁদরের বাঁদরামোতে আমাদের জড়াবেন না। বেআক্কেলে লোকেরা বাঁশে তেল লাগাচ্ছে বলেই বাজারে তেলের দাম নামছে না। আবার অনুপাতের অঙ্কে ওই ছোঁড়া বলল, প্রশ্নে আছে, একটি হাসপাতালের মেঝে পরিষ্কার করার জন্য ১৭ লিটার জলে ১ লিটার ৩ ডেসিলিটার ফিনাইল মেশানো হয়েছে। জল ও ফিনাইলের পরিমাণের অনুপাত নির্ণয় করো। এর উত্তরে আপনার থরহরি তার জ্ঞানভাণ্ডারে কী লিখেছে জানেন?
দু’–একজন জিজ্ঞেস করল, ‘কী লিখেছে?’
‘থরহরি লিখেছে, ‘যা একবার মেশানো হয়ে গেছে সেটা নিয়ে আর জল ঘোলা করার দরকার নেই। ওসব করতে গেলে হয়তো হাসপাতালের মেঝেটাই পরিষ্কার হবে না।'
‘কিংবা, ধরুন, থরহরির অঙ্কের স্যাম্পেলের আরও দুটি অঙ্কের কথা। ও বলছে, বইতে প্রশ্ন আছে যদি ১২ কিলো ডালের দাম ৪৮ টাকা হয়, তবে ৩০ কিলো ডালের দাম কত হবে? থরহরির বইতে উত্তর লিখেছে, ঘোর মিথ্যা কথা। ৪৮ টাকায় ১২ কিলো ডাল কোনও দোকানে পাওয়া যায় না। অঙ্ক সত্যনির্ভর। যা এদেশে নেই তার উত্তর হবে কোত্থেকে? অতএব লিখতে হবে, আগে চার টাকা কিলোয় এক কিলো অড়হর অথবা বিউলি কিনে আনুন, তারপর উত্তর লিখব। আর একটা প্রশ্নে আছে, একটি বাল্ব তৈরির কারখানায় ৩৬৫ দিনে ১৪৬০০টি বাল্ব তৈরি হবে?
‘শ্রীমান থরহরি লিখল, ‘কারখানাটি বেআইনি এবং শ্রমিক আইনে ওই মালিকের সাজা হওয়া উচিত। এই বঙ্গে কোনও কারখানাই ৩৬৫ দিন খোলা থাকে না। ছুটি, বাংলা বন্ধ এগুলো কোথায় গেল? অবিলম্বে লেবার কমিশন থেকে কারখানায় নোটিশ পাঠানো উচিত। বেআইনি কারখানার উৎপাদনের হিসাব রাখার কোনও প্রয়োজন নেই।'
‘কিন্তু এসব উত্তর লিখলে কি পরীক্ষায় পাশ করা যাবে?’
মধু কয়াল চুপ করে থাকতে বাধ্য হল। অন্যরা হাসাহাসি করতে করতে তাস খেলায় আগের মতো মেতে উঠল। খেলা যখন বেশ জমে উঠেছে, তখন গলা বাড়িয়ে চায়ের জন্য দোকানের ছোকরাটাকে বার-দুই ডাকা হল। কিন্তু ছোকরাটা এল অনেক পরে। এনামেলের থালার ওপর খানসাতেক কাপ। দেরি করার জন্য একদফা ধমক খেয়ে যখন ফিরে যাচ্ছে তখন গুরুপদ ডাকল, ‘অ্যাই, গোমুখ্যু কোথাকার! ঠান্ডা চা এনেছিস কেন? মেরে মাথার চাঁদি ফাটিয়ে দেব।'
চায়ের দোকানের ছেলেটা অভিমান জড়ানো গলায় বলল, ‘মারতে চান মারুন, কিন্তু মুখ বলবেন না। আমি মুখ্যু নই।”
গুরুপদ বলে উঠল, ‘না, তুমি তো বিদ্যেসাগর। এই তুই কী জানিস রে?’
ছেলেটা দু’পা পেছনে হটে বলল, ‘আমি যা জানি তা আপনি জানেন? বলুন তো কোন বাড়ি ভাড়া দেওয়া যায় না?’
সবাই সবার মুখের দিকে তাকাল। ষষ্ঠীতলার বনমালী বলল, ‘কোন বাড়ি’
ছেলেটা গড়গড় করে বলে গেল, ‘বেরুবাড়ি, বাড়াবাড়ি, যমের বাড়ি আর জুতোর বাড়ি।'
বারোয়ারিতলার সবাই যেন বিষম খেল। ওদের ঘোর কাটতে না কাটতেই ছেলেটা আবার প্রশ্ন করল, ‘কোন বরের সঙ্গে বরযাত্রী যেতে পারে না তা জানেন?’
বারোয়ারিতলার কেউ উত্তর দেওয়ার আগেই ছেলেটা আগের মতোই বলে গেল, ‘সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর আর ডিসেম্বর।'
চায়ের কাপে চুমুক দেওয়া বন্ধ করে সবাই ছেলেটার দিকে তাকিয়ে। ছেলেটা উৎসাহ পেয়ে বলল, ‘বলুন তো, কতরকমের তানি আছে আর এর মধ্যে কোন তানি বিখ্যাত?’ কে একজন শুধু বলল, ‘সেটা আবার কী জিনিস?’
ছেলেটা কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে মাথা দোলাতে দোলাতে বলল, ‘গুলতানি, রফতানি, মস্তানি, কিন্তু বিখ্যাত হচ্ছেন সাবাতানি।'
এবার গুরুপদ বলল, ‘তোর স্টকে আর কী কী আছে বাবা?’
ছেলেটা এবার মিটিমিটি হাসতে হাসতে বলল, ‘কতরকমের রো আছে বলতে পারেন? সবাই ঘাড় নেড়ে জানাল, কেউ বলতে পারবে না। ছেলেটা বলল, ‘তবে শুনুন, কলেজ রো, বিডন রো, মিশন রো কিন্তু সবার সেরা ম্যাকেনরো।'
গুরুপদ জিজ্ঞেস করল, ‘এর পর?’
ছেলেটা এঁটো কাপ কুড়িয়ে নিতে নিতে বলল, ‘এ তো হল গিয়ে স্যাম্পেল। আরও জানতে হলে হরিভাণ্ডারে গিয়ে দু' টাকা অগ্রিম দিয়ে থরহরিদার বাহুল্যবর্জিত জ্ঞানভাণ্ডার-এর জন্য বায়না করুন।'
ছেলেটা চলে যাওয়ার পর সবাই যখন চুপ মেরে বসে আছে তখন মধু কয়াল গলাটা ঝেড়ে নিয়ে বলল, ‘এবার থরহরির থুতনিতে মাখাবার জন্য আপনারাও আখের গুড়ের সন্ধান করুন। মধু কয়াল খুব মিথ্যে বলেনি। ছেলেটা জিনিয়াস।'
থরহরি সত্যিই জিনিয়াস কি না তা জানি না, কিন্তু সেদিন বারোয়ারিতলায় জ্ঞানভাণ্ডারের স্যাম্পেল বিতরণ করার পর থেকে ছেলে-ছোকরাদের কাছে থরহরি রীতিমতো হিরো হয়ে গেল। ওর লেখা বা সংগ্রহ করা ছড়াগুলো স্কুলে, মাঠে, বারোয়ারিতলায় সর্বত্রই ছেলেদের মুখে মুখে ফিরতে লাগল। পণ্ডিতমশাই ক্লাস সেভেনের ক্লাস নিতে এসে শুনলেন ক্লাসের একদল ছেলে সুর করে বলছে, ‘দেদার রোজগার করেও কে থাকে বেকার?’ আর-একদল চিৎকার করে উত্তর দিচ্ছে, ‘জার্মানির বরিস বেকার। পণ্ডিতমশাই কস্মিনকালেও বরিস বেকারের নাম শোনেননি। তিনি গর্জন করে জানতে চান, ‘হেইডা আবার ক্যাডা? কোন পোলাডা?’
বারোয়ারিতলার মাঠে গাদি খেলতে খেলতে ছেলেরা ছড়া কাটে, ‘ডানস, মিউজিক, অ্যাকশন, সব মিলে মাইকেল জ্যাকসন।'
গুরুপদ সকালবেলা বারান্দায় বসে দাড়ি কাটছিল। বারান্দার ওপর একটা পুরনো তক্তপোশ। তার ওপর বসে তার দুই ছেলে পড়া তৈরি করছে। হঠাৎ পড়া থামিয়ে বড় ছেলেটা বলে উঠল, ‘এই জ্বলে এই নেভে তার নাম জোনাকি। এই আছে এই নেই তার নাম জানো কী?’
ছোট ছেলেটা বলল, ‘বাবা তুমি জানো?’
গুরুপদ ভেবেছিল, এটা বুঝি বইয়ের কোনও পড়া। তাই সে বলল, ‘বইখানা তো সামনেই রয়েছে দেখে নে না।'
ছোট ছেলেটি এবার হাসতে হাসতে বলল, ‘বাবা জানে না। তার নাম হল বিদ্যুৎ। থরহরিদার বইতে আছে।'
গুরুপদ গম্ভীর হয়ে গেল। প্রথমে ছেলেদের দিকে একটু কড়া দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর আয়নার মধ্যে দিয়ে নিজের মুখটা দেখতে দেখতে ভাবল, ‘থরহরি ছোঁড়াটার এলেম আছে, তো।'
থরহরি যে সত্যিই এলেমদার ছেলে তার আরও প্রমাণ পাওয়া গেল কয়েকদিন পরে। তবে সে ঘটনাটা ছিল খুব সাংঘাতিক। গোটা মুড়াগাছা তো বটেই, মুগবেড়িয়া এবং সুখবেড়িয়া পেরিয়ে থরহরির সেই কীর্তিকাহিনি পৌঁছে গিয়েছিল মহকুমা সদরেও সেটা ছিল জুন মাসের দোসরা। আকাশে চাপ চাপ মেঘ, অথচ ছিটেফোঁটা বৃষ্টির দেখা নেই। গাছগাছালির পাতায় পর্যন্ত হাওয়ার কোনও চিহ্ন নেই। গুমোট গরমে প্রাণ যেন আইঢাই করছে। রামহরি পাতকুয়োর জলে গা ধুয়ে এসে দোকানে বসে হাতপাখা দিয়ে হাওয়া খাচ্ছেন আর থেকে থেকে কাঁধের গামছা দিয়ে গলার ঘাম মুছছেন। সন্ধ্যা তখন হব হব করছে। রামহরি বসে ছিলেন দোকানের রকে। কর্মচারীরা ভেতরে কাজ করছে। হঠাৎ একটা ছেলে সাইকেল করে এসে আচমকা দোকানের রকের সামনে দাঁড়াল। সাইকেল থেকে নামেনি, শুধু একটা পা দিয়ে মাটি ছুঁয়েছে। রামহরি ছেলেটার দিকে ভাল করে দেখবার আগেই ছেলেটা একটা সাদা এনভেলাপ রামহরির কোলের ওপর ছুড়ে দিয়ে পাঁই পাঁই করে সাইকেল চালিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। রামহরি ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে নিজের কোলের ওপর থেকে এনভেলাপটা তুলে নিয়ে দেখলেন। পরে দোকানের ভিতরে এসে ওই এনভেলাপটা খুলে ভেতরের চিঠিখানা, যেটি তাঁরই উদ্দেশে লেখা, সেটি পড়ে রামহরির বুকের মধ্যে কাঁপন শুরু হল। এমন অবিশ্বাস্য ব্যাপার কি এখনও ঘটে নাকি! এ তো নাটক-নভেলে ঘটে থাকে, বার-দুই এমন ঘটনার কথা খবরের কাগজে পড়েছেন ঠিকই কিন্তু সেটা যে, এই মুড়াগাছাতে তাঁর জীবনেই ঘটবে, এমন তো কখনও ভাবেননি। তাঁর প্রথমে মনে হল চিৎকার করে কান্না জুড়ে দেন। কিন্তু সেটা করবার সাহসও তাঁর হল না। এমনিতেই ঘামছিলেন, এবার যেন ঘেমে নেয়ে উঠলেন। চিঠিখানা হাতে নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে নিজের ঘরে এসে খাটের ওপর আছড়ে পড়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন, ‘হরি হে, এ কী ঘটালে!’
প্রথমে খবরটা শুনলেন থরহরির মা। শোনার পরই তিনি হিক্কা তুলে কাঁদতে আরম্ভ করলেন। রামহরি চাপাস্বরে ধমক দিয়ে বললেন, ‘শব্দ করে কেঁদো না। লোক জানাজানি হলে প্রাণও যাবে।'
থরহরির দুই দাদা ভজহরি এবং থাকোহরিও ঘাবড়ে গিয়ে পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠল। থরহরি নানা জায়গা ঘুরে বাড়ি ফিরে এল রাত্রি ন'টা নাগাদ। খেলার মাঠে শ্রীমান থরহরি রচিত, নির্দেশিত এবং অভিনীত ‘রাবণবধ’ পালার অভিনয় হবে বলে এই ক’দিন থরহরি বেজায় ব্যস্ত। আজই ছিল পোশাক বায়না করার দিন। থরহরি বাড়ি ফিরে এসে দেখল ঘরের দরজা-জানলা বন্ধ করে সবাই চুপ করে বসে। তার দুই দাদা দেয়ালের কোণে জড়াজড়ি করে বসে কাঁদছে। মা’র চোখ কেঁদে কেঁদে ফুলে গেছে। থরহরি ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে? এত কাঁদাকাটা কেন?’
রামহরি প্রথমে বালিশের তলা থেকে চিঠিটা বের করে থরহরির হাতে দিতে দিতে বললেন, ‘সাইকেলে করে এসে একটা ছোঁড়া এই চিঠিটা ছুড়ে দিয়ে গেল।'
থরহরি চিঠি খুলে পড়তে আরম্ভ করল। চিঠিতে লেখা আছে, ‘৫ জুন রাত্রি ১টায় আমরা আসব আপনার বাড়িতে। বাইরে থেকে তিনটি টোকা দিলেই বুঝবেন আমরা এসে গেছি। আমাদের জন্য তিরিশ হাজার টাকা রেডি রাখবেন। টাকা না পেলে প্রাণ যাবে। যদি পুলিশ বা প্রতিবেশীকে জানান তাহলে আপনার গোটা বংশ লোপ করে দেব। দোকান আর বাড়িতে আগুন ধরাব। পুলিশ ক’দিন আগলে রাখবে। প্রাণের মায়া থাকলে তিরিশ হাজার টাকা রেডি রাখবেন। ইতি, ডাকাত সর্দার পল্টন।'
চিঠিটা পড়ে থরহরিও গম্ভীর হয়ে গেল। রামহরি কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, 'হ্যাঁ রে, তুই পল্টনকে চিনিস?
থরহরি বলল, ‘ডাকাতকে চিনব কোত্থেকে? তবে নাম শুনেছি। গেল মাসে ওরাই নাকি বাঁশবেড়িয়ার ব্যাংক ডাকাতি করে দু’ লাখ টাকা নিয়েছে।'
থরহরির মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘মাত্র এই ক'টা দিনেই অতগুলো টাকা ওদের ফুরিয়ে গেল? দু’ লাখ থাকতে আবার তিরিশ হাজার চাইছে কেন রে?’
রামহরি বললেন, ‘এখন কী করবি? থানায় যাবি, নাকি পঞ্চায়েতকে বলবি? বললে পরে তো আবার বংশ লোপাট করে দেবে। তাহলে কী করব?’
থরহরি বলল, ‘এখন কিছু করতে হবে না। ব্যাপারটা আগে ভেবে দেখি।'
রামহরি বললেন, ‘বেশি ভাবাভাবির সময় নেই। আজ দু’ তারিখ গেল। কাল তিন, পরশু চার, আর তরশুতেই পল্টন এসে যাবে।'
থরহরি চিঠিটা নিজের পকেটে রাখতে রাখতে বলল, ‘এসব ব্যাপারে না ভেবে কিছু বলা যায় না, করাও যায় না। এখন খেয়েদেয়ে চুপচাপ শুয়ে থাকো।'
সেরাত্রে কেউই ঘুমোতে পারল না। থরহরি সকালবেলা বেরোবার আগে বলে গেল, ‘কথাটা কাউকে বোলো না। আমি ভেবে দেখছি। তুমি কেবল তিরিশ হাজার টাকা জোগাড় করে রেখো।'
রামহরি নিজের কপাল চাপড়ে বলল, 'আজ তিরিশ দিলে পরের মাসে এসে পঞ্চাশ চাইবে। তিরিশ হাজার জোগাড় করলে তোকে আর ভাবতে বলে লাভ কী!’ থরহরি শুধু বলল, ‘যা বলছি তাই করো।’
থরহরি কী ভাবছে কে জানে, কিন্তু সময় তো থেমে থাকছে না। তিন তারিখটাও চলে গেল। চার তারিখ সকালে রামহরি বলল, ‘ওরে থরহরি, আসছে কাল তো তেনারা আসবেন। তোর ভাবাভাবি শেষ হল?’
থরহরি কথার কোনও জবাব না দিয়ে চলে গেল। রামহরির তো খিদে-তেষ্টা গেছেই, এখন যেন মনে হচ্ছে পল্টন আসা পর্যন্ত তিনি হয়তো বেঁচেও থাকবেন না। বুকের মধ্যে এমন ওঠাপড়া করছে যাতে মনে হয় যে কোনও সময় তিনি মারা যেতে পারেন।
সেইদিন থরহরি ফিরল রাত্রি দশটা নাগাদ। রামহরি কিছু বলবার আগেই থরহরি নিজের ঠোঁটের ওপর আঙুল তুলে চুপ করে থাকার ভঙ্গি করল। গোটা বাড়ি ক’দিন থেকে এমনিতেই চুপ মেরে গেছে। এখন থরহরির ইঙ্গিতে সবাই এমনভাবে চুপ করল, যেন নিজেদের নিশ্বাসের শব্দ নিজেরাই শুনতে পাচ্ছে।
থরহরি প্রথমে দরজাটা ভাল করে বন্ধ করল। জানলা তো সেই দোসরা জুনের সন্ধ্যা থেকেই বন্ধ। ওটা দিনেও কেউ খোলে না। থরহরি বলল, 'আমি যা যা বলব, সেইমতো কাজ করতে হবে। একটু এদিক-ওদিক হলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। তিরিশ হাজার টাকাকে দু'টাকা, পাঁচ টাকা, দশ টাকা আর অল্প কিছু একশো টাকায় ভাঙিয়ে রাখো। যেন টাকার পুঁটলিটা দেখতে বেশ বড় হয় আর গুনতে সময় লাগে। টাকাগুলো প্লাস্টিক কাগজে মুড়ে দড়ি দিয়ে বাঁধবে। তারপর কাপড় দিয়ে জড়াবে। তারপর টিনের বাক্সে রেখে তালা দেবে। আর সেই বাক্সটা রাখবে কাঠের বাক্সে। তাতে দেবে দুটো তালা। যাদে এতসব খোলাখুলি করতে একটু সময় লাগে। এবার যখন বন্ধ দরজায় গদাম করে একটি লাথির আওয়াজ পাবে তখন দরজাটা খুলে দেবে। পল্টন এলে দরজা খুলে দিয়ে কী করতে হবে সেটা গভীর রাত্রে তোমায় শিখিয়ে দেব।'
৫ জুন সন্ধ্যা থেকেই থরহরি উধাও। আর দুপুর থেকেই রামহরির বুকের কাপন বেড়ে যেতে লাগল। থরহরির ওপর আর কতটা ভরসা করা যায়। এটা তো আর বাহুল্যবর্জিত জ্ঞানভাণ্ডার লেখা নয় যে, চিলেকোঠায় বসে লিখলেই ল্যাঠা চুকে গেল। এটা হচ্ছে ডাকাতির ব্যাপার। তিরিশ হাজার তো যাবেই, সেইসঙ্গে একটা-দুটো প্রাণও যে যাবে না, সেকথা কে বলতে পারে।
সন্ধ্যার পর থেকে রামহরি কাঁপতে আরম্ভ করলেন। রাত্রি দশটা পেরোবার পর সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারছেন না রামহরি। দু’ পায়ের মালাইচাকিতে ঠোকাঠুকি লেগে যাচ্ছে। বার-দুই হরিকে ডাকবার চেষ্টা করলেন, কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোল না। থরহরি যা শিখিয়ে দিয়ে গেছে সেটা মনে মনে ঝালিয়ে নিলেন বটে, কিন্তু তাতে স্বস্তি পেলেন না। রাত্রি এগারোটা নাগাদ রামহরির স্ত্রী ভয়ে আর উত্তেজনায় বমি করতে আরম্ভ করলেন। ভজহরি আর থাকোহরির অবস্থাটা খুবই শোচনীয়। দু’ ভাই দু’জনকে জাপটে ধরে সারা গায়ে নাইলনের মশারি জড়িয়ে বসে কাঁপছে। রামহরি তো ক্রমাগত কেঁপেই চলেছেন। যেন ছ্যাকরা গাড়িতে বসে কোথাও যাচ্ছেন। একবার তাঁর মনে হল, পল্টন এসে দরজায় তিন টোকা দেওয়ার আগেই হয়তো তাঁর শরীরের হাড়গুলো কাঁপতে কাঁপতে খসে যাবে। এত কাঁপাকাঁপিতে কি হাড়ের জয়েন্ট ঠিক থাকে, না থাকতে পারে!
ঠিক বারোটা বাজতেই ভজহরি আর থাকোহরি একসঙ্গে গলা মিলিয়ে ডুকরে উঠল, ‘আমাদের কী হবে গো বাবা!’
রামহরি ধমকে উঠে বললেন, ‘তোদের বাবার কী হবে তা জানিস! জুতিয়ে পিঠের ছাল তুলে দেব। পল্টনটা যদি সন্ধেবেলা আসত তা হলে যা হওয়ার এতক্ষণে হয়ে যেত। আর তো সহ্য হয় না।'
ভজহরি আর থাকোহরিও বলে উঠল, ‘আমাদেরও হয় না বাবা।'
রামহরি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আর চল্লিশ মিনিট বাইশ সেকেন্ড।'
রামহরির ঘড়িতে যখন একটা বেজে দু’ মিনিট তখন বন্ধ দরজার গায়ে তিনটে টোকা পড়ল। টোকার শব্দ শুনেই ভজহরি আর থাকোহরি পরস্পরকে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে ধরল। রামহরি কাঁপতে কাঁপতে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন। হাতে ভোজালি নিয়ে তিনজন মাঝারি চেহারার ছোকরা ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
রামহরি কৃতার্থ হওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, ‘সন্ধে থেকে বসে আছি। তা তোমরা মিনিট দুয়েক দেরি করলে কেন? বাড়ি চিনতে অসুবিধে হয়নি তো?’
ওদের তিনজনের মধ্যে থেকে একজন বলল, ‘বাজে কথা রাখুন। আগে টাকাটা আনুন। তিরিশ হাজার টাকা, মনে আছে তো?’
রামহরি বললেন, ‘কেন মনে থাকবে না বাবা। কুড়িয়ে-কাঁচিয়ে তিরিশ জোগাড় করে রেখেছি। তা তোমাদের মধ্যে পল্টন কে গো?’
থুতনির কাছে অল্প দাড়িওলা একটি ছেলে বলল, ‘আমিই পল্টন।'
রামহরি পল্টনকে বললেন, ‘বেঁচে থাকো বাবা। বাঙালির ছেলে চোর-ছ্যাঁচোড় হয়, তুমি যে ডাকাত হতে পেরেছ এটা বাঙালির বড় গৌরব। সিনেমা-যাত্রায় সব ডাকাতই দেখি সিং-মার্কা। গব্বর সিং, মাধো সিং, রাম সিং, লখন সিং, মাখন সিং। তুমিই শুধু সিং-ছাড়া। শ্রীহরি তোমাকে দীর্ঘায়ু করুন।'
পল্টন বলল, ‘আমি সিং নই, শিকদার। পল্টন শিকদার। এবার টাকাটা বার করুন।' রামহরি বললেন, ‘টাকা তো গুনে-গেঁথে তোমাদের তরেই রেখে দিয়েছি। বুড়োমানুষ তো, এবার তোমরা এট্টু গুনে নাও। আর আমার হয়ে একটু উপকার করো।'
পল্টন বলল, ‘কীসের উপকার?’
রামহরি বললেন, ‘তোমাদের চিঠি পাই দোসরা জুন সন্ধের মুখে। বাড়ি এসে দেখি ওইদিন ঠিক ওই সময়েই বাড়িতে হুজ্জোত সিং বলে চম্বলের ডাকাত একখানা চিঠি দিয়ে পঞ্চাশ হাজার টাকা চেয়েছে। তারও আজ সোয়া একটায় আসবার কথা। এখন বাবা পল্টন, তিরিশের বেশি আমার নেই। সেটা আমি বাঙালি ডাকাতকে দিতে চাই। ওরা এলে তুমি যদি ওদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে ফেরত পাঠাতে পারো কিংবা ভাল কথায় না গেলে...’
ঠিক তখনই দরজায় গদাম করে লাথি মারার আওয়াজ হল। রামহরি বললেন, ‘ওই, হুজ্জোত সিং-ও এসে গেল।'
রামহরি দরজার কাছেই ছিলেন। পট করে দরজা খুলে দিতেই বিশাল চেহারার সাতজন দাড়ি-গোঁফওলা ডাকাত চাদর গায়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। ঘরে ঢুকেই গায়ের চাদরের তলা থেকে নানা ধরনের পিস্তল বার করে দাঁড়িয়ে গেল। সবচেয়ে লম্বা চেহারার ডাকাতটা বলল, ‘আমার নাম হুজ্জোত সিং। পঞ্চাশ হাজার টাকা বার করো। এরা কারা?
রামহরি বললেন, ‘আজ্ঞে, মি. হুজ্জোতজি, এরাও ডাকাত হ্যায়। বাঙালি ডাকাত। ভেরি ইয়ং অ্যান্ড প্রমিসিং। ওরা তিরিশ মাংতা। আপনি পঞ্চাশ মাংতা। লেকিন আমার কাছে কুড়িয়ে অ্যান্ড কাঁচিয়ে ওনলি তিরিশ হ্যায়। এখন ক্যায়া হোগা সেইটা শিকদার অ্যান্ড সিং বইঠকে-বইঠকে ফয়সালা করে ফেলুন।'
পল্টনের দল স্রেফ ভোজালি হাতে এসেছে। পিস্তলধারী সাতজন চম্বলের ডাকাতকে দেখে ওরা ঘাবড়ে গেল। হুজ্জোত সিং এগিয়ে এসে পল্টনের কাঁধে একটা থাপ্পড় মেরে বলল, ‘অব তেরা ক্যায়া হোগা পল্টন? হাম সাত হ্যায়, মেরা পাস পিস্তল অউর বম ভি হ্যায়। তেরা পাস ক্যায়া হ্যা? কিতনা আদমি হ্যায়?’
পল্টন উত্তর দেওয়ার আগে হুজ্জোত সিং বলল, ‘হামি বাংলা জানি। দ্যাখ পল্টন, ডাকাতি কোনও শখের ব্যাপার নয়। কুড়ি-তিরিশ ডাকাতি করে তোরা ডাকাতের ইজ্জত নষ্ট করছিস। আমাদের দুনিয়াজোড়া ডাকাতির ব্যাবসা। পাকিস্তানে আমাদের নিজেদের ব্যাংক আছে, তার নাম ডাকাত-ব্যাংক। পশ্চিমবাংলায় আমাদের কিছু ছেলে দরকার। তোরা খাওয়া-পরা, থাকা, সিকিউরিটি সব পাবি আর পাবি মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে মাইনে। এইসব ছোটখাটো ধান্দা ছেড়ে আমার দলে ভিড়ে যা। নইলে আমরাই তোদের খুন করে ফেলব। পশ্চিমবাংলায় এখন আমাদের ব্রাঞ্চ খুলছি। তোদের তো থাকতে দেব না। ভেবে দেখ কী করবি!’
পল্টনদের তিনজনের মাথার কাছে তখন পিস্তল ধরা। ওদের একজন হুমড়ি খেয়ে হুজ্জোত সিংয়ের পায়ের ওপর পড়ে বলল, ‘হুজ্জোতদা, আমি আপনার দলে জয়েন করব। হুজ্জোতদা যুগ যুগ জিয়ো।’
হুজ্জোত সিং এবার পল্টনের থুতনির দাড়িতে নিজের হাতের পিস্তলটা আলতোভাবে বুলিয়ে নিয়ে বলল, ‘ক্যায়া রে পল্টন, ক্যায়া শোচ রাহা হ্যায়। জলদি তেরা ফয়সালা শুনা। মেরে পাস ওয়ক্ত জাদা নেহি। মেরা দুসরা ইউনিট আভি দু’ লাখ রুপেয়া লুটকে ইধার আ যায়েগা। তু চাহে তো তুঝকো দো জেলা কা সর্দার বানা দুংগা।’
পল্টনের দ্বিতীয় সঙ্গীটি হাতের ভোজালি ফেলে দিয়ে বলে উঠল, ‘হুজ্জোতদা, হাম আপকে সাথ হ্যায়।'
হুজ্জোত সিং এবার তাকাল পল্টনের দিকে। পল্টন ছলছল চোখে বলল, ‘বড়া ভাই, মাফ কিজিয়ে। হাম আপকা সেবক হ্যায়।'
হুজ্জোত সিং বলল, ‘তো বাত পাক্কা হ্যায়। কালিয়া সিং অউর গড়বড় সিং দোস্ত লোগকো পূজা কা লাড্ডু খিলাও।'
সঙ্গে সঙ্গে হুজ্জোত সিংয়ের দু’জন শাগরেদ তাদের ঝোলার ভেতর থেকে প্লাস্টিকের প্যাকেট বার করে ওদের দুটো করে লাড্ডু খাইয়ে দিল।
পল্টনদের যখন ঘুম ভাঙল, তখন তারা বীরপুর থানার লকআপে। ব্যাপারটা তখনও তারা বুঝে উঠতে পারেনি। বুঝল একটু পরে। হুজ্জোত সিংয়ের তৈরি লাড্ডুতে ছিল ঘুমের ওষুধ। লাড্ডু খেয়েই ওরা ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুমন্ত ডাকাতদের পাঁজাকোলা করে পুলিশ এসে শুইয়ে দিয়েছে লকআপে।
থরহরি মণ্ডলপাড়ার খাটাল থেকে যাদের ডাকাত সাজিয়ে হাতে যাত্রার পিস্তল দিয়ে নিয়ে এসেছিল ব্যাংক-ডাকাত ধরে দেওয়ার জন্য, তারা সবাই পুরস্কার পেল। থরহরিকে পুরস্কার দিলেন স্বয়ং জেলাশাসক। নিজে থরহরিকে নিয়ে এলেন গাড়ি করে তার বাবা, থরহরির গৌরবে গৌরবান্বিত রামহরিকে অভিনন্দন জানানোর জন্য।

থরহরি আর জেলাশাসক সুবীর মিত্র এসে দেখলেন রামহরি ঘুমোচ্ছেন। তাঁর বিশাল নাসিকাগর্জনে ঘরের দরজা-জানলা পর্যন্ত কাঁপছে। থরহরি বলল, ‘বলতে গেলে সেই দোসরা জুন রাত থেকে তো ঘুম নেই। তাই………’
জেলাশাসক বললেন, “ঠিক আছে। আমি বিকেলে মুগবেড়িয়াতে আসব। তখন ঘুরে যাব।'
বিকেলে এসেও শুনলেন রামহরি ঘুমোচ্ছেন। দরজার বাইরে থেকে তাঁর নাকের ডাক সকালে যেমন শুনেছিলেন তেমনই শোনা যাচ্ছে।
সুবীরবাবু বললেন, ‘এত ঘুম একসঙ্গে কেউ ঘুমোতে পারে!’
থরহরির মা লম্বা ঘোমটার ভেতর থেকে বললেন, ‘আজ্ঞে হুজুর, থরহরির বাবা সেদিন রাত্রে মনের আনন্দে হুজ্জোত সিংয়ের আনা লাড্ডুর প্যাকেট থেকে চারখানা লাড্ডু খেয়ে সেই যে নাক ডেকে ঘুমোতে লাগলেন আর উঠলেন না।'
হতাশ হয়ে জেলাশাসক ফিরে গেলেন। রামহরি এখনও নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছেন বলে ছেলের কীর্তিতে তাঁর প্রতিক্রিয়াটা জানা গেল না, এই যা আফসোস।
আনন্দমেলা, পূজাবার্ষিকী ১৩৯৮
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন