শিউলি

দুলেন্দ্র ভৌমিক

বনমালী ঘাটা এবং নবকুমার আটা দু'জনেই দু'জনের বন্ধু। কিন্তু দু’জনেরই বেজায় মন খারাপ। এতই মনখারাপ যে কুমিরখালি গ্রামের অতি জাগ্রত দেবতা রক্ষাকালীর কাছে পরপর তিন দিন হত্যে দিয়েও কোনও সুরাহা হয়নি। যতরকম কালীমূর্তি আছে সব মূর্তির কাছেই দফায় দফায় প্রার্থনা জানিয়েও এখন পর্যন্ত কোনও ফল হয়নি। কুমিরখালি গ্রামের এক তান্ত্রিক বলেছিলেন, ‘ওরে বনমালী আর নবকুমার, তোরা দু'জনে তো এক গোত্রের। একজন ঘাটা অপরজন আটা।

আটা ঘেঁটেই তো রুটি অর্থাৎ খাদ্য হয়। দেবতার কাছে আর্জি জানালে, তুই কি ভাবিস সঙ্গে সঙ্গে তা পাশ হয়ে যাবে। এই মর্ত্যধামেই দেখ না, রাইটার্সের এক ঘর থেকে আর-এক ঘর, বড়জোর কয়েক পা, একখানা ফাইল যেতে দেড় মাস লেগে যায়। আর স্বর্গের দূরত্ব কি বি বা দি বাগ থেকে শিয়ালদা স্টেশন! আমাদের কুমিরখালি গ্রাম থেকে শিবতলা পর্যন্ত! পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব নাকি দু’কোটি ঊনচল্লিশ হাজার মাইল। কে যে কবে মেপে ছিল তা জানি না। পৃথিবী টু মুন এখনও কোনও কুরিয়ার সার্ভিস চালু হয়নি। স্বর্গ চাঁদেরও উপরে। অত দূরে তোদের অ্যাপীল গিয়ে পৌঁছবে ঊর্ধ্বমুখী হাওয়ার সাহায্যে। হাওয়া উলটোপালটা করলে তোদের প্রার্থনা চাঁদে ঠোক্কর খেয়ে ঝরঝরিয়ে পৃথিবীরই কোনও অংশে ফিরে আসবে।'

এতক্ষণ পর বনমালী ঘাটা বলল, ‘পৃথিবীর কোন অংশে ফিরে আসবে?

নবকুমার আটা প্রশ্ন করল, ‘এই কুমিরখালিতে আসার কি কোনও চান্স আছে?’

একদা তান্ত্রিক, বর্তমানে চায়ের দোকানদার কপিল চক্রবর্তী বললেন, ‘বাপু হে, ভূগোল পড়োনি। পৃথিবীর তিনভাগ জল আর একভাগ স্থল। ওই একভাগ স্থলের কে যে হবেন অধিপতি, কে যে করবেন কর্তৃত্ব, তাই নিয়ে সেই পুরাকাল থেকে এখন পর্যন্ত চলে আসছে মারামারি, কাটাকাটি নানারকমের ফন্দি আঁটা।'

বনমালী আর নবকুমার দু’জনেই দু’জনের দিকে ব্যাজার মুখে তাকাল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। দু'জনেই মনে মনে ভাবছিল কপিল চক্রবর্তী কেমনধারা তন্ত্রসাধক? তিনি নাকি এক ঘোর অমাবস্যার রাতে কুমিরখালির শ্মশান থেকে ডিরেক্ট শ্মশানকালী মা’র আদেশ পেয়েছেন, ‘বাবা কপিল, আমার আদেশ, তুমি তন্ত্রসাধক হও। তন্ত্রের মধ্যেই তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে। এই শ্মশানই হবে তোমার সাধনভূমি।'

কী আর করা যায়। মাতৃ আজ্ঞা তো পালন করতে হবে। একা একা ভয় করত বলে, সামনে কাঠের আগুন জ্বালিয়ে বসে নানারকম চিৎকার করতে থাকেন। প্রবলভাবে গান্ বাজাতেন। চিৎকার এমনভাবে করতেন, যেন কঠিন কোনও তন্ত্র-মন্ত্র বলছেন। যেমন, হঠাৎ ‘ব্যোম মা কালী’ বলে বিকট চিৎকার করে উঠে বলতেন, ‘কোনও বডিং ন আসন্তি। একলা ভয় বর্ধিতং। নম কালী করালবদনী। শ্মশাননচ গতি হইলম। ব্যোম কালী।’ কখনও বা উদাত্ত কণ্ঠে গান ধরতেন, শ্মশানে জাগিছে শ্যামা।' কিংবা ‘নেচে নেচে আয় শ্যামা আমি যে তোর সঙ্গে যাব।'

গালে দাড়ি, হাতে লোহার ত্রিশূল, কপালে রক্তচন্দনের ফোঁটা এবং সারা গায়ে ছাই মাখা। মানিয়েছিল ভাল। কিন্তু কে যে তাঁর নামে থানায় রিপোর্ট করল তা কপিলবাবু আজও জানেন না। একদিন থানার দারোগাবাবু তিনজন কনস্টেবলসমেত এসে শ্মশানকালীর মন্দিরের সামনে থেকে কপিলবাবুকে ধরে নিয়ে গেল। থানায় নিয়ে গিয়ে কপিলবাবুর কী হয়েছিল তা একমাত্র কপিলবাবু ছাড়া আর কেউ জানে না। কিন্তু তিনদিন পর যখন ফিরে এলেন, কুমিরখালির লোকেরা দেখল, কপিল চক্রবর্তীর দাড়ি নিখুঁতভাবে কামানো। গোঁফও নেই। রক্তবসন, লাল ফোঁটা উধাও। পরে আছেন কালো রঙের ফুলপ্যান্ট আর হাওয়াই শার্ট। সবার জিজ্ঞাসার উত্তরে কপিল চক্রবর্তী বললেন, ‘কে দারোগা? কে পুলিশ? যা হওয়ার তা শ্মশানকালী মা’র নির্দেশেই হয়েছে। আমার তন্ত্রসাধনার কোর্স পূর্ণ হওয়ার পর মা শ্মশানকালী আমার কেসটা পাঠালেন রক্ষাকালী মা’র দপ্তরে। তিনি তো জগৎকে রক্ষা করেন। একা আর পেরে উঠছেন না। তাই শুধু কুমিরখালি আর পাশের গ্রাম হরিখালি এই দু’টি গ্রাম দেখভালের দায়িত্ব আমায় নিতে বলেছেন। তাই ভাবছি দুটো গ্রামের সীমানা বরাবর একটা চায়ের দোকান করব। চায়ের দোকানটা আসল কথা নয়। আসল কথা মিটিং প্লেস।'

কপিলবাবুর কথা কেউ বিশ্বাস করল, কেউ বা করল না। সেই থেকে তাঁর চায়ের দোকান রমরমিয়ে চলছে। কিন্তু কপিলবাবুর এই বৃত্তান্ত জেনে তো বনমালী আর নবকুমারের কোনও লাভ নেই। তাই তারা যেমন বিমর্ষ হয়ে বসেছিল তেমনভাবেই বসে রইল। কপিলবাবু দু’গেলাসে চা নিয়ে ওদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘চা খা। চা খেয়ে মনে বল আন। আর আমাকে সব খুলে বল।'

ওরা দু'জনেই চায়ে চুমুক দিল। পরে নবকুমার আটা বলল, ‘একটা বিশ্রী ঘটনা ঘটে যাওয়ার জন্য আমাদের দল গত বছর বিরাট লস খেয়েছে। এ বছর এখন পর্যন্ত কোনও বায়না তো দূরের কথা, কেউ আমাদের দলের নাম পর্যন্ত মুখে আনছে না।'

কপিলবাবু বললেন, ‘বিশ্ৰী ঘটনাটা কেমন? কতখানি বিশ্ৰী?’

এবার নবকুমার বনমালী ঘাটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঘাটাদা, তুমি বলো।'

বনমালী বলতে শুরু করল, 'আমাদের নিজস্ব পেশাদার যাত্রাদল আছে। কাছে-দূরে যেখান থেকেই বায়না আসে আমরা যাত্রাপালা করতে যাই। গত বছর গিয়েছি দক্ষিণ বারাসতে নাইয়ারচকে। প্যান্ডেল ভরতি। পালার নাম ‘সীতেহরণ’’

কপিলবাবু সংশোধন করে দিয়ে বললেন, ‘সীতেহরণ নয়, সীতাহরণ। বল, তারপর কী হল?'

বনমালী বলল, ‘রাবণ এসে তো নির্বিঘ্নে সীতাকে হরণ করে নিয়ে যাচ্ছে। এই সময় জটায়ু যুদ্ধে পরাজিত হচ্ছে দেখে আসরের চারদিক থেকে, ‘জটায়ুদা, তুমি একা নও। আমরা আছি। রাবণের পিণ্ডি চটকে দেব। নাইয়ারচকে নারীহরণ। কোথায় ব্যাটা রাম?’ বাল্মীকিদাদু তো আগেই বলেছিলেন সোনার হরিণের পিছন দৌড়ে মরলে, সেই ফাঁকে ব্যাটা রাবণ এসে তোর বউকে নিয়ে কেটে পড়বে। কলকাতায় ভরদুপুরে ফ্ল্যাটবাড়িতে ডাকাতি হচ্ছে, আর এটা তো জঙ্গল। আমি রাবণের অভিনয় করছিলাম, আমায় আসরে ফেলে পেটাল।'

নবকুমার আটা বলল, ‘একদল লোক আমায় ধরল গ্রিনরুমে। এমন করল যেন বারোয়ারি উৎসবে আটা মাখছে।’ দু’টো লোক সীতাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘তোমার কোথাও লাগেনি তো সীতামা?’ ভয় পেয়ে সীতা ওদের হাত ছাড়িয়ে দৌড় দিতেই সীতার পরনের শাড়ি চলে গেল ওদের হাতে, সীতার অঙ্গে আর নেই। আছে হাফ-প্যান্ট। সীতা চরিত্রে অভিনয় করছিল রাখহরি গুছাইত। সে ‘ওরে বাবা গো, আমাকে বাঁচাও,’ বলতে বলতে পিছনের মাঠ দিয়ে দৌড়চ্ছে। হাফ-প্যান্ট পরে একজন দৌড়চ্ছে অথচ তার পিঠে লম্বমান বেণী। ব্যস, শুরু হয়ে গেল ধুন্ধুমার কাণ্ড। একদল মাঠ দিয়ে দৌড়চ্ছে, কয়েকজন হনুমানের লেজে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে, আর সেই লেজের আগুন থেকে হনুমান গ্রিনরুমে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। গোটা আসরে আগুন জ্বলছে। যে যেভাবে পারল দৌড়ে প্রাণ বাঁচাবার জন্য নানা দিকে দৌড়তে লাগল। একেবারে লণ্ডভণ্ড অবস্থা। পুলিশ এল, দমকল এল। আমরা সবাই তখন আসর থেকে অনেক দূরে। তবে কে যে কোথায় তা জানি না। দিন তিনেক লাগল সবাই আবার একত্র হতে। গত বছর এক পয়সা কামাতে পারিনি। এ বছর এখন পর্যন্ত কোনও বায়না নেই। কী যে করি!’

কপিলবাবু মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘সমস্যা বা ঘটনা যাই বল তা রীতিমতো বিশ্রী। তোদের এত বদনাম হয়ে গিয়েছে, সহজে কেউ বায়না করবে না। সেই দোষ খণ্ডন করার জন্য প্রথমে দলের নাম বদলে ফ্যাল। দলের নাম দে এই পবিত্র গ্রামের নামে ‘কুমির অপেরা।’ আর জানবি, যে কোনও বিনোদন ব্যাবসার মলাটই হল ললাট। তোদের ক্ষেত্রে হচ্ছে যাত্রাপালার নাম। পালার নামটি যদি আকর্ষক হয় তবে জানবি পালা আসরে যাওয়ার আগেই হিট।'

নবকুমার আটা বলল, ‘আপনি যেমন দলের নাম ভেবেছেন, তেমন করে কি কোনও পালার নাম ভেবেছেন? যা শুনলেই দর্শক চমকে উঠবে।'

কপিলবাবু বললেন, ‘শুধু চমকে উঠবে না। দর্শকের বাবা পর্যন্ত চমকাতে থাকবে। লাগাতার ভূমিকম্পের মতো থেকে থেকেই চমকাবে। প্রথম পালাটার নাম দে ‘বউ পাগল, স্বামী ছাগল।' দ্বিতীয়টার নাম দে ‘মা দাসী, বউ বিলাসী’, দু’টোই অ্যাকশনধর্মী সামাজিক পালা। বাজার কাঁপিয়ে দেবে। মা রক্ষাকালীর নাম করে ঝাঁপিয়ে পড়।'

নবকুমার আর বনমালী দু’জনে দু’জনের দিকে তাকাল। তারপর উঠে আসার পর রাস্তায় বনমালী বলল, ‘নাম দু’টো বেড়ে হয়েছে। পাবলিক খাবে বলে মনে হচ্ছে। তোমার কী মত?’

নবকুমার উত্তর দিল, ‘আমারও তাই মত। তবে স্ত্রী চরিত্রে এখন আর ব্যাটাছেলে চলবে না। দলে মহিলাশিল্পী চাই। গঙ্গাপদকে মিস গঙ্গা, বিলাস দত্তকে মিস মায়া বলে চালাবার যুগ এখন আর নেই। এখন সত্যিকারের মিস চাই।'

দু’জনে বাড়িতে এসে নতুন দল গড়ার বিষয়ে ভাবতে লাগল। দলের নাম যেহেতু কুমির অপেরা, তাই পোস্টারে একটা কুমিরের ছবিও রাখা হল। লোকের মনে হল এই পালায় বোধহয় কুমিরও আছে। কুমির নিয়ে এত কৌতূহল, এত জিজ্ঞাসা যে, ঘাটা আর বন্ধু আটার মনে হল, সত্যি একটা কুমির রাখলে মন্দ হয় না। কিন্তু কপিলবাবুর কড়া হুকুম, ‘কোনও জন্তু-জানোয়ার পালায় রাখলে হবে না। তাতে কখন কি বিপদ হয় কে জানে?’

অতএব, নবকুমার ও বনমালীর ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও পালায় কুমির রাখা গেল না। রোজই পালার মহড়া চলছে। দলের নতুন নাম এবং পালার নাম শুনে বায়না করার লোকও যাতায়াত শুরু করেছে। সবাই জানতে চায় ‘বউ পাগল, স্বামী ছাগল’ পালায় গান ক'খানা, ফাইট আছে কি না। অন্য পালা সম্পর্কেও ব্যাপক খোঁজখবর চলছে। দিব্যি চলছিল, হঠাৎ একদিন বাঁশপোতা গ্রামে যাত্রা করতে গিয়ে মহাগোল বাধল। যাত্রার মাঝামাঝি সময় মা দাসী, বউ বিলাসী’ পালার নায়ক খুব টেম্পোর মাথায় বউকে বলছে, ‘তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী হতে পার কিন্তু মা তোমার চেয়েও বড়। মা স্বর্গের মতো। আমি আজ চলে যাচ্ছি কিন্তু একদিন ফিরে আসব। সেদিন আমি এত ধনরত্ন এনে মায়ের পায়ে অঞ্জলি দেব যে, তোমার ট্যারা বাবার চোখ সোজা হয়ে যাবে। মা মা গো, চললাম। তোমার দাসীগিরি ঘুচিয়ে আমি আমার বউকে দাসী করব। তোমার চরণদাসী, হাঃ হাঃ হাঃ!' এই অট্টহাস্য দিয়ে নায়ক নবকুমার পড়ল উলটো দিকে। দু'জনেই মূর্ছিত। দু’জনকে ধরাধরি করে গ্রিনরুমে নিয়ে যাওয়া হল।

তবে দু'জনের কেউই বিশেষ বিচলিত হল না। কেননা, যাত্রার আসরে এমন ঘটনা কখনও-সখনও ঘটে যায়। দশাননের নিজের মাথাটি ছাড়া বাকি ন’খানা মাথাই পিচবোর্ডের। মাথা লাগাবার সময় ড্রেসার বারবার বলে দিয়েছিলেন, ‘বনমালীবাবু, ঘাড়ের মুভমেন্ট যত কম পারেন তাই করবেন।' কিন্তু আসরে গিয়ে ঘাটার আর সেসব কথা মনে ছিল না। সে বীরদর্পে ‘আমি লঙ্কেশ্বর রাবণ। আমারে সম্মুখ সমরে দ্বন্দ্বে আহ্বান করে তুচ্ছ এক বনবাসী ভিখারি। বড়ই হাসি পায়।’ এবার নিজের বুকে বিরাট চাপড় মেরে অট্টহাস্য করে উঠতেই ন’খানা পিচবোর্ডের মাথা প্রথমে পিঠের দিকে ঝুলে পড়ল, তারপর খুলে পড়ল আসরে। আসরে হাসির রোল ওঠার আগেই বনমালী ঘাটা বলে উঠল, ‘দশাননের কিবা প্রয়োজন? রামের সাথে লড়িবার তরে এক আননই কাফি হ্যায়।' আসরে তখন হাসির জায়গায় হাততালি পড়তে লাগল।

কপিলবাবুর পরামর্শ অনুযায়ী এবারের বাজারে কুমির অপেরার বেশ নামযশ হল। টাকাও রোজগার হল বেশ ভাল। তাই যাত্রার হ্যান্ডবিলে এবং দৃশ্যসূচি ছাপার কাগজে লিখতেই হল, ‘প্রধান উপদেষ্টা শ্রীকপিল চক্রবর্তী, প্রাক্তন তান্ত্রিক।

কপিল চক্রবর্তী বলেই দিয়েছিলেন, যাত্রার আসরে অভিনয় চলাকালীন অনেক রকমের ঘটনা ঘটে যায়। তাতে ঘাবড়ালে চলে না। বরং তাকে ম্যানেজ করতে পারলেই কাজের কাজ হয়। থিয়েটারে সুবিধে হচ্ছে ড্রপ সিন ফেলে দিয়ে ম্যানেজ করা যায়! যাত্রার আসরে ড্রপ সিন কোথায়? একবার ঘোড়াডাঙায় ভীম শূন্যে গদা ঘুরিয়ে আস্ফালন করতে গিয়ে গদা হাত থেকে ছুটে গিয়ে পড়বি তো পড় বি ডি ও সাহেবের মাথায় গিয়ে পড়ল। বি ডি ও সাহেবের ছিল মাথাজোড়া টাক। সেই টাকে গিয়ে গদাখানা পড়তেই ‘কোন ব্যাটা গদা মারল ! অ্যারেস্ট হিম, অ্যারেস্ট হিম। ওরে বাবা রে, মাথাটা গেল রে। পুলিশ যাত্রা বন্ধ করে দাও। গদাধারীকে অ্যারেস্ট করো। উফ্ বাবাগো।'

উনি বলছেন আর টাকে হাত বোলাচ্ছেন। পুলিশ এসে গদাধারী ভীমের খোঁজ করতে লাগল। এই কাণ্ডের পর ভীম আর ত্রিসীমানায় থাকে? সেই থেকে ভীম ঘোড়াডাঙা ছাড়া। কে নাকি দেখেছে অক্ষয় বারুই অর্থাৎ ভীম নাকি চন্দননগরে অটো চালাচ্ছে। কপিল চক্রবর্তীর কথায় বনমালী ও নবকুমার দু’জনেই ভরসা পেল।

আসলে যাত্রা বা থিয়েটার করা হল একটা নেশা। বনমালী ঘাটা আর নবকুমার আটার কাছে এই যাত্রা করাটাও সেইরকম নেশা। ওদের জমিজমা অনেক ছিল। কিন্তু তার কিছু কিছু বিক্রি করতে করতে এখন আর আগের মতো অত জমিজমা নেই। সব টাকাই গিয়েছে যাত্রাদলের পিছনে। দল গড়তে তো গোড়ার দিকে টাকা লাগে। তবু মন্দের ভাল এবার দু’টো পালাই মোটামুটি হিট। দলেও পরিবর্তন হয়েছে। স্ত্রী চরিত্রে আর ছেলেদের পরচুল লাগিয়ে অভিনয় করতে হয় না। মেয়েদের চরিত্রে মেয়েরাই অভিনয় করে। এই খরচটা বেড়েছে। কুমির অপেরার নামডাক বাড়তেই দিকে দিকে বনমালী আর নবকুমারের নাম ছড়িয়ে পড়ল। কাছের এবং দূরের আত্মীয়স্বজন যাঁরা ছিলেন এবং ততদিন যাঁরা কোনও খোঁজখবর রাখতেন না, বাড়িতে আসা তো দূরের কথা, কস্মিনকালে একখানা চিঠি দিয়েও খোঁজ নিতেন না, এবার তাঁদের যোগাযোগ বেড়ে গেল। প্রথমে এলেন বনমালীর সেই জ্যাঠা। নাম দীনবন্ধু ঘাটা। বনমালীর বাবা অনাথবন্ধু ঘাটা মারা যাওয়ার পর বনমালী হাঁসখালিতে গিয়েছিল জ্যাঠাকে খবর দিতে। জ্যাঠার আছে একখানা গম ভাঙানোর কল, চালের দোকান আর বন্ধকী কারবার। রোজগারপাতি বেশ ভাল। বনমালীর মুখে নিজের ছোট ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ শুনে তিনি প্রথমেই বনমালীর দিকে আঙুল তুলে বলেছিলে, ‘দুঃসংবাদ শোনালে। তবে পৃথিবীতে কেউই অমর নয়। আমার কাছে পরামর্শ চাও তা পাবে। কিন্তু টাকা পয়সা চেও না। ওসব আমি দিতে পারব না।'

বনমালীও ছেড়ে দেওয়ার লোক নয়। সে বলেছিল, 'আপনার পরামর্শ আপনার কাছে রাখুন। টাকা-পয়সার জন্য আসিনি। শুধু বলতে এসেছি, আমার বাবার মৃত্যুতে আপনি কোনও অশৌচ পালন করবেন না। তাতে বাবার আত্মা শান্তি পাবে না।'

এরপর বনমালী আর দাঁড়ায়নি। সেই জ্যাঠা, অর্থাৎ দীনবন্ধু ঘাটা বাড়ির উঠোনে পা দিয়েই বললেন, ‘কই রে বনমালী। কেমন আছিস? কতকাল যে তোকে দেখিনি। অনাথের মৃত্যুতে এত ভেঙে পড়েছিলাম যে, কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেই ইচ্ছে হত না।'

বনমালী ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে জ্যাঠাকে দেখে বলল, ‘ভেঙে পড়েছিলেন, তা আজ এগারো বছর পর সেই ভাঙা জোড়া লাগল কেমন করে?’

দীনবন্ধু বললেন, ‘সে কথা আর বলিসনে বাবা। আছি তো, কিছুদিন পরে এক সময় ধীরে সুস্থে বলা যাবে।'

বনমালী মনে মনে প্রমাদ গনল। একটু তাড়া ছিল বলে তখনই সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। কপিল চক্রবর্তীর চায়ের দোকানে গিয়ে দেখল, নবকুমার ব্যাজার মুখে বসে আছে। কপিল চক্রবর্তী দোকানে নেই। কপিলদার সহকারী বাবলু নামের ছেলেটা দোকান চালাচ্ছে। বনমালীকে দেখে বাবলু বলল, ‘দাদা দোকানে নেই।'

বনমালী বলল, ‘নেই, সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু গিয়েছে কোথায়?’ বাবলু উত্তর দিল, ‘তা জানি না। কিছু বলে যায়নি।'

বনমালী এবার নবকুমারের পাশে বসতে যাওয়ার আগে নবকুমার বলল, ‘আমাকেও নামতার মতো একই কথা বলে যেতে হচ্ছে।'

বনমালী বলল, ‘তোর কী হয়েছে? মুখটা অমন করে বসে আছিস কেন?’

নবকুমার বলল, ‘আর বলিস না ভাই। কোথা থেকে আমার এক পিসি ভোরবেলায় এসে হাজির। আমার বাবার কোনও বোন ছিল একথা বাবা-মা দু’জনের কারও মুখেই কখনও শুনিনি। দূর সম্পর্কের বোনও ছিলেন না। থাকলে জানতে পারতাম। পাড়াতুতো হলেও হতে পারে। জীবনে যাঁকে দেখিনি, নাম শুনিনি, সেই পিসি আমার বাড়িতে গ্যাঁট হয়ে বসে আমার বউয়ের উপর হুকুম চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন কী যে করি।'

বনমালী বলল, ‘তোর অচেনা পিসি আর আমার চেনা জ্যাঠামশাই। সেই জন্যেই তো কপিলদার কাছে আসা।'

নবকুমার বলল, ‘আমার বউ পরিষ্কার বলে দিয়েছে তিন দিনের মধ্যে পিসিকে বিদেয় করো, নইলে আমি বাপের বাড়ি চলে যাব। বাপের বাড়ি মানে সেই গোবরডাঙা।’

বনমালী বলল, ‘তোকে তবু বাহাত্তর ঘণ্টা সময় দিয়েছে। আমার তো মোটে আটচল্লিশ ঘণ্টা।'

দোকানের খদ্দেরদের বাবলু চা করে দিচ্ছিল। বাবলুর হাতে দু’বার চা খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর কপিলদা এলেন। ওদের দু'জনকে দেখে বললেন, 'কী ব্যাপার? মানিকজোড় যে হাজির।'

বনমালী বলল, ‘ভীষণ সমস্যা।'

কপিলদা বললেন, ‘সমস্যা ছাড়া তো দেখা পাওয়া যায় না তোদের। সমস্যার কথা পরে শুনব। এবার আমার কথা শোন। দারুণ একটা প্ল্যান মাথায় এসেছে। গন্ডগোল না করে ঠিকঠাক মতো করতে পারলে মোটা টাকা কামাই হবে।'

নবকুমার বলল, ‘প্ল্যানটা কী? আমাদের কী করতে হবে?’

কপিলবাবু বললেন, ‘এত খোলামেলা জায়গায় সেসব কথা আলোচনা করা ঠিক হবে না। আজ রাতে আমার বাড়িতে আসবি। আমার সাধনকক্ষে বসে সব আলোচনা করব।'

বনমালী বলল, ‘পুলিশের মার খেয়ে আপনার তন্ত্রসাধনা তো কবেই ঘুচে গিয়েছে। এখন আর সাধনকক্ষের দরকার কীসের জন্য?'

কপিলবাবু বললেন, ‘ওরে বোকা, কলেজে পড়ার পাট মিটে গেলে কলেজ থেকে পাওয়া বি এ ডিগ্রি কি লুপ্ত হয়ে যায়? তন্ত্র বিশেষ কারণে আমাকে ছেড়েছে, আমি কিন্তু তন্ত্র ছাড়িনি। তন্ত্র ছাড়া কি মুখের কথা। কেউ বাইরে তান্ত্রিক, কেউ অন্তরে। আমি অন্তরে এখনও তন্ত্রসাধক। সেই সাধনার জোরে আমি এখনও কুমিরখালি গ্রামে প্রবল ভূমিকম্প করতে পারি। জঙ্গলের জন্তু-জানোয়ার, কীট-পতঙ্গাদিকে কুমিরখালি ছাড়া করতে পারি। আমি...' কথা শেষ হওয়ার আগেই বনমালী আর নবকুমার দু'জনেই একসঙ্গে ডাইভ দিয়ে কপিলবাবুর পায়ের উপর পড়ে বলল, ‘জঙ্গলের জন্তু-জানোয়ার, কীট-পতঙ্গ, তাদের প্রয়োজন আছে। অত কিছু করার দরকার নেই। আপনি শুধু আমার জ্যাঠা দীনবন্ধু ঘাটা আর নবকুমারের অচেনা ভূতুড়ে পিসির হাত থেকে রক্ষা করুন। দোহাই কপিলদা। একটা বিহিত করুন।'

কপিল চক্রবর্তী দু’জনের দিকে তাকিয়ে প্রথমে হাসলেন, পরে কাশলেন, তারপর কাশতে কাশতে বললেন, ‘নো চিন্তা। ডু ফুর্তি। মুশকিল আসান আমার হাতে।'

বনমালী অত্যন্ত কাতর কণ্ঠে বলল, ‘যা করবার তাড়াতাড়ি করুন। আটচল্লিশ ঘণ্টা মাত্র সময়। তার মধ্যে বিহিত না হলে আমাকে গৃহত্যাগ করতে হবে।'

নবকুমার বলল, ‘আমার সময় বাহাত্তর ঘণ্টা হলেও কোনও বিশ্বাস নেই। পিসির অত্যাচারে বাহাত্তর ঘণ্টা সময়সীমার আগেই হয়তো আমার স্ত্রী বাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে যাবে। তাই যদি হয় তা হলে কুমির অপেরার কী হবে? একেবারে পথে বসে যাব।'

কপিল চক্রবর্তী হাত তুলে অভয় দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, ‘অত চিন্তা করার কিছু নেই। তোদের যাত্রাদলের মেকআপম্যান গৌরাঙ্গ নন্দী আর ড্রেসারকে নিয়ে আজ সন্ধের দিকে আমার বাড়িতে আয়।' এইটুকু বলেই থেমে গিয়ে বললেন, 'না, না, দরকার নেই। ও জিনিস আমার আছে।'

বনমালী বলল, ‘কী জিনিস কপিলদা?’

কপিলবাবু বললেন, ‘ও কিছু নয়। সব জিনিস আগে থেকে জানতে নেই। তোরা সন্ধের আগে চলে আসিস।'

ওরা দু’জনে চায়ের দোকান থেকে উঠল। কিন্তু মনে শান্তি নেই। কেননা, কপিলদাদার উপর ভরসা করা ছাড়া উপায় নেই। অথচ তিনি যে কোনও ভোজবাজি দেখিয়ে সমস্যার সমাধান করে দেবেন এতখানি ভরসাও করতে পারছে না। দু'জনের কেউই বাড়ি গেল না। দুপুরবেলা বনমালীর জ্যাঠা হুকুম দিয়ে রেখেছেন, 'বনমালী, বিকেলবেলা খানকয়েক কড়াইশুঁটির গরম কচুরি আর খান দু'য়েক রসমাধুরী কিনে খাওয়াস তো। তোদের এখানকার রসমাধুরীর বেশ নামডাক আছে শুনলাম।'

বনমালী মনে মনে ভাবল, ‘কুমিরখালির রসমাধুরীর সুনাম তার জ্যাঠার কানে কবে পৌঁছল? সে নিজেই তো জানে না।'

ওদিকে নবকুমারের অচেনা পিসির ফরমাশ, ‘ওরে নবু, কতকাল ছানার পায়েস খাই না। তোর বউ তো এসব করতে পারে না। বাপের বাড়িতে এসব শিক্ষা পায়নি। এখন তো দোকানেই কিনতে পাওয়া যায়। আসার সময় কিনে আনিস।'

চেনা জ্যাঠা আর অচেনা পিসির বায়নার হাত থেকে বাঁচতে কেউই আর সহসা বাড়ির দিকে পা বাড়াল না। খানিক এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে সন্ধে হওয়ার মুখে মুখে কপিল চক্রবর্তীর বাড়িতে এল। সঙ্গে তাদের কুমির অপেরার মেকআপম্যান গৌরাঙ্গ নন্দী আর ড্রেসার জয়ন্ত মণ্ডল। কপিল চক্রবর্তীকে দেখে মনে হল, তিনি যেন ওদের অপেক্ষাতেই বসে ছিলেন। বনমালী আর নবকুমারকে চোখের ইঙ্গিতে বসতে বলে মেকআপম্যান আর ড্রেসারের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় বনমালীকে প্রশ্ন করলেন, ‘এরা কারা?’

বনমালী বলল, ‘এর নাম গৌরাঙ্গ নন্দী, কুমির অপেরার মেকআপম্যান, আর ইনি জয়ন্ত মণ্ডল, ড্রেসার।'

কপিল চক্রবর্তী দু’জনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এখানে নয়। আমার সাধনকক্ষে আয়।' কপিলবাবুর পিছন পিছন ওরা চারজন সাধনকক্ষে এসে চারজনেই বিষম চমকে উঠল। একটি বেদিতে সিঁদুরমাখা একটি ত্রিশূল, রক্তমাখা একটি খাঁড়া, খান কয়েক নরমুণ্ড। সেই নরমুণ্ডগুলোর মাথায় প্রদীপ জ্বলছে। একটি বড় সাইজের নরমুণ্ডের দু’টি বড় বড় চোখের শূন্য কোটরে জ্বলছে লাল রঙের মোটা মোমবাতি। মোমবাতির লাল রং গলে গলে এমনভাবে গাল বেয়ে নামছে যেন নরমুণ্ডের দু’গাল বেয়ে রক্তের ধারা বইছে। গোটা ঘর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। অন্ধকার আকাশে বিদ্যুৎচমকের মতো অন্ধকার ঘরে থেকে থেকে নানা বর্ণের আলো জ্বলছে। কপিল চক্রবর্তী অদ্ভুত গলায় বললেন, ‘আসনে বসে পড়। তরাইয়ের জঙ্গলের মধ্যে যে ময়াল সাপটি আমাকে ঘিরে থাকত সেই ময়ালটি একদিন মারা যায়। তার নরম চামড়া দিয়ে এই আসন তৈরি। বসে পড়।'

কুমির অপেরার মেকআপম্যান এবং ড্রেসার কপিলবাবুর ভয়ে সবে বসতে যাচ্ছিল, যেই না ময়াল সাপের কথা শুনল তৎক্ষণাৎ দু’জনেই আর্তনাদ করে লাফিয়ে উঠে বনমালী ও নবকুমারকে জড়িয়ে ধরে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠল, ‘ঘাটাদা, আটাদা আমাদের বাড়ি পাঠিয়ে দিন। জলতেষ্টা পাচ্ছে। বাড়ি যাব। কী হবে আমাদের?’

কপিলবাবু হতাশ গলায় বলে উঠলেন, ‘এ তোরা কেমন লোক নিয়ে এলি? আমার সাধনকক্ষে ঢুকেই মূর্ছা যাওয়ার জোগাড়। এই গ্রামে কি সাহসী যুবকের আকাল পড়ল? আমার তো শুধু সাহসী হলে চলবে না। সেই সঙ্গে অন্য গুণও চাই। কিন্তু...’

কপিলবাবু থামলেন। বনমালী বলল, “কিন্তু বলে থামলেন কেন? আমার হাতে তো মোটে আটচল্লিশ ঘণ্টা সময়। সময় যাচ্ছে আর আমার প্রেশার বাড়ছে।'

কপিলবাবু বললেন, ‘ধাক্কা দিয়ে দ্যাখ, এখনও জ্যান্ত আছে কিনা।' নবকুমার বলল, ‘আমাদের কী হবে?’

কপিলবাবু দু’জনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সমস্যার সমাধান অবশ্যই হবে। তবে সময় বড্ড কম। সময় একটু বাড়াতে হবে। বউমাদের আরও একটু ধৈর্য ধরতে বল। তা ছাড়া এসব কাজে তড়িঘড়ি করা ঠিক হবে না।'

বনমালী আর নবকুমার ভেবেই পেল না ‘এসব কাজ’ মানে কী কাজ? কী করতে চাইছেন কপিলদা?

সেদিন রাত করে বাড়ি ফিরে দু’জনেই বউকে জিজ্ঞেস করল, ‘উনি ঘুমিয়ে পড়েছেন তো?’

বনমালীর বউ বলল, ‘বার তিনেক তোমার খোঁজ করে রাগে গজগজ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছেন।' একই প্রশ্নের উত্তরে নবকুমারের বউ বলল, ‘ছানার পায়েসের সঙ্গে এখন রাবড়ি যোগ হয়েছে।'

নবকুমার বলল, ‘এখন কী ঘুমিয়েছেন?’

নবকুমারের বউ উত্তর দেওয়ার আগেই পাশের ঘর থেকে পিসির গলার আওয়াজ এল, ‘নব এলি? রসমাধুরী এনেছিস তো? আগামীকাল মনে করে হাফ কিলো রাবড়ি আনিস তো।’

নবকুমার কোনও কথা না বলে নিজের বাড়িতে, নিজের ঘরেই চোরের মতো ঢুকে পড়ল।

বউদের ধৈর্য ধরতে বলা হল। ইতিমধ্যেই নবকুমার আর বনমালীর সময়সীমা পার হয়ে গেল। কপিলদার শেখানো কথা, ‘যে সয় সেই রয়। অতএব ধৈর্যের কোনও বিকল্প নেই।' কড়াইশুঁটির কচুরি আর রসমাধুরী কেনা নিত্যই চলছে। নবকুমারের পিসি ছানার পায়েস ছেড়ে রাবড়ির দিকে সেই যে ঝুঁকেছেন তার থেকে আর নিস্তার নেই। এই বয়সে এত মিষ্টি খাচ্ছেন অথচ কোনওরকমে ডায়াবেটিস-এর লক্ষণ নেই।

মনে মনে অস্থির হলেও বনমালী আর নবকুমার কিছুই বলতে পারছে না। কপিলদা যে কী করছেন এবং আদৌ কিছু করছেন কি না সে কথা জিজ্ঞেস করার সাহস নেই। কোথা থেকে দু’টো ছেলে জোগাড় হয়েছে। কপিলদাই জোগাড় করেছেন। কপিলদার ভাষায় ‘সত্যিকারের সাহসী ছেলে। এমন ছেলেই তো খুঁজছিলাম।'

নবকুমার প্রশ্ন করল, ‘কোথায় পেলেন?'

কপিলদা বললেন, ‘ওরে এ জিনিস কি পথে-ঘাটে থাকে রে? এদের খুঁজে নিতে হয়। শ্মশানকালীর মন্দিরে দু’-চারবার দেখা হয়েছে। শেষ দেখা থানার লক আপে। মায়ের ইচ্ছে, আমার কাছে পাঠালেন। ওদের কাজে পাঠাবার আগে কিছু প্রশিক্ষণ দরকার। একেবারে তৈরি ছেলে। ভরদুপুরে সদরে রাস্তার উপরে ব্যাংকে ছোট্ট একটা অপারেশন চালিয়ে এক হাত্তায় দেড় লাখ লুটে নিল। এবার দ্যাখ কেমন খেল দেখায়।'

এই বলেই কপিলদা দু’জনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোর চেনা জ্যাঠা আর অচেনা পিসির হার্টের কন্ডিশন কেমন? বেশ স্ট্রং তো?’

নবকুমার উত্তর দিল, ‘তা জানি না। কিন্তু আমাদের দু'জনের হার্টের অবস্থা খুব সন্তোষজনক নয়। যে কোনও মুহূর্তে বিশ্রী একটা কিছু ঘটে যেতে পারে।'

বনমালী বলল, ‘আগামীকাল আবার রথতলার বাজারে আমাদের পালার বায়না আছে।' কপিলদা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোন পালা?

নবকুমার উত্তর দিল, ‘প্রথম পালাটা। যার নাম ‘বউ পাগল, স্বামী ছাগল’’

কপিলদা বললেন, ‘নামটা তো আমারই দেওয়া। যাত্রা শেষ করে তোদের ফিরে আসতে আসতে মনে হয় রাত বারোটা কি সাড়ে বারোটা হবে। ঠিক মধ্যরাতেই তোদের দরকার হবে। আয়, আমার সাধনকক্ষে আয়, তোদেরও একটু ট্রেনিং দরকার।'

দু’জনেই পরস্পরের দিকে তাকিয়ে সাধনকক্ষের দিকে পা বাড়াল।

কপিল চক্রবর্তীর সাধনকক্ষের সঙ্গে বনমালী আর নবকুমারের আগেই বারকয়েক পরিচয় হয়েছে। এবার গিয়ে দেখল, একটা দেওয়ালে খানকয়েক বিচিত্র জামা ঝুলছে। কালো রঙের ঢোলা হাতা জামা। জামার বুকে সাদা সাদা দাগ টানা। দেখলে মনে হবে বুকের হাড়, অর্থাৎ বুকের পাঁজরা। কয়েকটা নরমুণ্ডের কঙ্কালের মুখোশ। এত জিনিস দিয়ে কী হবে নবকুমার মনে মনে ভাবল, আমার পিসি না হয় অচেনা। কিন্তু বনমালীর জ্যাঠা তো অচেনা নন। অনাথবন্ধু ঘাটার আপন দাদা দীনবন্ধু ঘাটা। যদি তাঁর কিছু হয় তা হলে বড়ই খারাপ ব্যাপার হবে। কিন্তু, ভাবনাটা এই কিন্তুতে এসে থেমে গেল। নবকুমার কপিলদার দিকে তাকাল। কিন্তু তাঁর মুখ দেখে বোঝা দায়, তিনি কী ভাবছেন।

কপিলদা, ‘জয় মা কালী, কলকাত্তাওয়ালি,’ বলে দু'জনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোরা পালা শেষ করে যে যার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াবি আমার শেষ নির্দেশের আশায়। তারপর সেই নির্দেশমতো কাজ করতে হবে।'

বনমালী আর নবকুমার চলে গেল। আজকের পালার পয়লা দৃশ্যেই বনমালীকে দরকার। অতএব, দেরি হলে চলবে না। রথতলা বাজারের দর্শক খুশি হলে আসরে কালীপটকা ছোড়ে। আর খারাপ লাগলে উড়নতুবড়ি ছোড়ে। দর্শকদের এই স্বভাবের জন্য রথতলা বাজারে কেউ প্যান্ডেল করতে চায় না। প্রতি বছর প্যান্ডেল করার জন্য নতুন নতুন ডেকরেটার্স আসে। পর পর দু’বছর প্যান্ডেল করেছে এমন লোক কেউ নেই।

কপিলদা কী করতে চাইছেন এবং শেষ পর্যন্ত কী করবেন সেটা ভাবতে ভাবতে ‘বউ পাগল, স্বামী ছাগল’ পালার অভিনয় শুরু হল। বউয়ের হাতে লাঞ্ছিতা মায়ের কান্না শুনে, ছেলে বলবে, ‘মা তোমার চোখে জল কেন? আমার বউয়ের জন্য? আমার বউ পাগল।' তখন মা’র প্রশ্ন, ‘কিন্তু তুই কী? তুই কি আমার ছাগল ছেলে?’

এই সময় দু’হাতে দিয়ে কান চাপা দিয়ে নবকুমার বলবে, ‘না মা, না। আমি ছাগল নই। আমি তোমারই ছেলে। অচিরেই প্রতিকার করব।'

কিন্তু বলবার সময় নবকুমার বলে উঠল, ‘পিসি, তুমি না গেলে আমিও পাগল হব। বউ আমাকে পেটাবে। কপিলদার সাধ্য কি বউয়ের ভাইদের হাত থেকে আমাকে রক্ষা করেন! তুমি কেটে পড়ে আমাকে বাঁচাও।'

মায়ের চরিত্রে যিনি ছিলেন, যাত্রার পোস্টারে যাঁকে বলা হত লাবণ্যময়ী মিস প্রতিমা, তিনি এমন রেগে গেলেন যে, পরনের শাড়িটা একটু উঁচু করে তুলে ধরে ক্রোধে চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘তুই ছাগল, বংশের কুলাঙ্গার। এ মাসে মাইনে না বাড়ালে...

বিপদ বুঝে বাজনদাররা এত জোরে মিউজিক বাজাতে শুরু করল যে, আর কোনও কথা শোনা গেল না।

কোনও রকমে অবস্থা সামাল দিয়ে যাত্রা শেষ হল। বনমালী আর নবকুমার যাত্রা শেষ করেই নিজেদের বাড়ির দিকে ছুটল। এখনও জানে না, তাদের জন্য কপিলদার কী নির্দেশ অপেক্ষা করছে। দু’জনে রাস্তার মোড়ে এসে দু’দিকে গেল। নবকুমার নিজের বাড়ির সদর দরজার সামনে এসে দেখল, সদর দরজা খোলা। তার বউ বারান্দার এক কোণে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর বারান্দার উপর ধপধপ করে পায়চারি করছেন তার পিসিমা। হাতে একটা আঁশবটি। উঠোন জুড়ে থইথই করছে ঘন অন্ধকার। ঠিক এইরকম সময় একজোড়া কঙ্কাল নাচতে নাচতে দরজা দিয়ে উঠোনের মধ্যে এল। অন্ধকারে ভয় পাওয়ার মতো ব্যাপার। কপিলদার নির্দেশমতো বলল, ‘ও পিসি, এঁরা কারা?’

অন্ধকারেই একটি কঙ্কাল বলে উঠল, “চিনতে পারছিস না। আমি তোর পিসেমশাই। তোর পিসি ক্ষ্যান্তমণিকে নিতে এসেছি। তোর পিসিকে বঁটি ফেলে তৈরি হতে বল। আমি এখন যমরাজের দপ্তরে কাজ করি। অফিস বড় কড়া। ঠিকমতো কাজ না করলেই ভি আর এস দিয়ে দেবে। তা হলে অনন্তকাল ধরে আরশোলা ধরতে হবে। আরশোলাই তো আদি প্রাণী। আর কী করতে হবে জানো?’

পিসি কাঁপা কাঁপা গলায় প্রশ্ন করলেন, 'কী করতে হবে?’

সেই কঙ্কাল উত্তর দিল, ‘শামুকের দাঁত গুনতে হবে। বেঁচে থাকতে কি জানতাম ১৪,১৭৫টি দাঁত ১৩৫টি পাটিতে সাজানো থাকে!’

পিসির প্রশ্ন, ‘স্বর্গেও কি শামুক, আরশোলা আছে?'

কঙ্কাল উত্তর দিল, ‘তুমি স্বর্গে যাচ্ছ এমনটা ভাবলে কেমন করে? আগে নরকে যাও, ভাল কাজকর্ম করো। নিজেকে স্বর্গের উপযুক্ত তৈরি করতে পারলেই স্বর্গে যাওয়ার পাসপোর্ট ও ভিসা দুই-ই পাবে। স্বর্গে বিভিন্ন লোকের জন্য বিভিন্ন রকমের আবাসন আছে। স্বর্গেও তো ফ্ল্যাট-কালচার শুরু হয়ে গিয়েছে। খানকয়েক প্রোমোটার কাজও শুরু করেছে। তবে প্ল্যান পাশ করার দপ্তরের প্রধান হচ্ছেন শ্রী শ্রী বিশ্বকর্মাজি। বহুত কড়া লোক।'

পিসি বললেন, ‘ওগো, তুমি যদি আমার স্বামী হও তা হলে তুমিই বলে দাও আমি তো এখনও বেঁচে। আমি কী করে স্বর্গে বা নরকে যাব?’

কঙ্কাল উত্তর দিল, ‘তোমার মৃত্যু এখানে হবে না। তুমি অবিলম্বে কুমিরখালি ছেড়ে তোমার স্বামীর ভিটে, অর্থাৎ কইখালিতে যাও। সেটাই তোমার মৃত্যুর উপযুক্ত জায়গা। আমি কইখালিতে অপেক্ষা করব।'

কথা শেষ হতেই এত জোরে ব্যোমকালী বলে কেউ একজন হুংকার ছাড়ল যে, ঘরের দরজা-জানলা পর্যন্ত কেঁপে উঠল। পিসিমা বললেন, ‘এত রাতে যাব কী করে? আজকের রাতটা কাটতে দাও। কাল সকালে উঠেই চলে যাব কথা দিচ্ছি।'

একজোড়া নরকঙ্কাল তাতা থই তাতা থই করে ঘর জুড়ে নাচতে নাচতে বেরিয়ে গেল। নবকুমার সাময়িক স্বস্তি পেল পেল বটে কিন্তু সত্যিকারের স্বস্তি তার কপালে নেই। নবকুমারের বউ তো এত কাণ্ডের কথা জানত না। সে ওই কঙ্কালের নৃত্য দেখে, ‘ওগো কী হবে গো?’ বলে মূর্ছা গেল। একটু সময়ের জন্য জ্ঞান ফেরে আবার পরক্ষণেই ‘কী হবে গো’ বলে মূর্ছা যায়। এত ঘন ঘন মূর্ছা গেলে যদি আর জ্ঞান না ফেরে তা হলে কী হবে। এই সময় বাড়ি ছেড়ে কপিলদার সন্ধানে যাওয়ার উপায় নেই। বনমালীর বাড়িতে কী ঘটছে তাই বা কে জানে? নবকুমারের মনে হল, তার বউয়ের আত্মাটা যেন ছোট্ট চড়ুইপাখির ছানার মতো। মূর্ছা যেতে যেতে হঠাৎ কখন যে ফুড়ুৎ করে উড়ে যাবে কে বলতে পারে? নবকুমার কাতর চোখে পিসির দিকে তাকাল। আধসের করে রাবড়ির চেয়েও তার বউয়ের জীবনটা তার কাছে বেশি মূল্যবান। রাবড়ি, ছানার পায়েস, বেলের মোরব্বা খাইয়েও যদি বউকে সারিয়ে তোলা যায় তা হলেই মঙ্গল।

পিসি স্থির দৃষ্টিতে নবকুমারের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এ অবস্থায় বউমাকে ফেলে কাল সাতসকালে কেমন করে যাই? তোর পিসে এতদিন কইখালিতে অপেক্ষা করতে পারল আর এখন দুটো দিন পারছে না। পৃথিবীর সব জায়গায় এক্সটেনশন আছে অথচ নরকে নেই? এ কেমন ধারা ব্যবস্থা!’

নবকুমার বলল, ‘তবুও পিসেমশাইকে আর দেরি করানো যাবে না। আত্মা কুপিত হলে মহা সর্বনাশ হতে পারে। তুমি ভোরবেলাতেই কইখালিতে চলে যাও।'

গোটা রাত বসে বসেই কাটিয়ে দিল নবকুমার। বউ তো মূর্ছা এবং মূর্ছা-ভঙ্গ এইদুই অবস্থার মধ্যে দিয়ে রাত কাটিয়ে দিল। পিসি এবং বউ যখন উঠে বসলেন তখন নবকুমার ঘুমোতে গেল। পিসির যাওয়া না যাওয়া নিয়ে নবকুমারের কোনও ভাবনা নেই। একটু বেলার দিকে কপিলদার চায়ের দোকানের ছেলেটা এসে নবকুমারের ঘুম ভাঙাল। নবকুমারের হাতে লম্বা একটা কাগজ দিয়ে বলল, ‘এই নিন। এই কাগজে হিসেব আছে।' নবকুমার প্রশ্ন করল, 'কীসের হিসেব?’

চায়ের দোকানের ছেলেটা বলল, ‘কঙ্কাল নাচানো, অচেনা পিসি, চেনা জ্যাঠা, এঁদের হাত থেকে মুক্ত হওয়া, আমাদের কপিলদার নানা জিনিস ও উপকরণ ক্রয়, ডামি কঙ্কালের ভাড়া, এইসব কাজের চার্জ। এই হিসেবে ভ্যাট ধরা হয়নি। তাই পাকা রসিদ হবে না। ভ্যাট চার্জ করলে টাকা আরও বেড়ে যাবে। বিকেলের দিকে পেমেন্ট দেবেন। চেকে নয় ক্যাশ-এ!’ ছেলেটি চলে গেল।

নবকুমার কিছু বলার আগেই ছেলেটি চলে গেল। নবকুমার হিসেবের কাগজখানার দিকে তাকিয়ে দেখে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। বিকেলের দিকে নবকুমার কপিলদার চায়ের দোকানে এসে দেখল, বনমালী বেঞ্চিতে বসে, আর তার জ্যাঠা দীনবন্ধু ঘাটা দোকানের মধ্যে বসে ঘুগনি খাচ্ছেন।

নবকুমার চোখের ইশারায় জানতে চাইল, ‘ব্যাপারটা কী?’

বনমালী দোকানের বেঞ্চি থেকে উঠে ইশারায় নবকুমারকে ডেকে নিয়ে দোকানের পিছনে গেল। সেখানে গিয়ে বলল, 'আমার জ্যাঠা সাংঘাতিক লোক। অন্ধকার ঘরে আগে থেকে একজোড়া কঙ্কাল ঢুকিয়ে রেখেছিলাম। ওরা সন্ধে হওয়ার আগে জ্যাঠার ঘরের তক্তাপোশের তলায় লুকিয়ে যারা ঢুকেছিল তারা তক্তাপোশের তলায় অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ল। এদিকে রাত বারোটায় কপিলদা বাঁশি বাজাতে লাগলেন। ঘন ঘন বাঁশির শব্দে পাড়ার লোক জেগে গেল। কিন্তু তক্তাপোশের তলায় যে দু’জন সন্ধে থেকে সেঁধিয়েছিল তাদের ঘুম আর ভাঙল না। তদুপরি তাদের দু'জনের নাক ডাকার যুগলবন্দিতে জ্যাঠার ঘুম গেল ভেঙে। নাক ডাকার এমন সওয়াল-জবাব দীনবন্ধু কখনও শোনেননি। একজন ডাকছে ঘোঁ-অ-অৎ, অন্যজন জবাব দিচ্ছে কিঁ-উ-উৎ। দীনবন্ধু ঘাটা ভয় পেয়ে তক্তাপোশের উপর, ঠিক মধ্যিখানে বসে ডাকতে লাগলেন, ‘বনমালী ওরে বনমালী রে, রক্ষা কর। তক্তাপোশের তলায় কে ঢুকেছে? বন্দুক আন, রামদাখানা বের কর, আর কিছু না পারিস লোহার রড আন।'

এবার ওদের ঘুম ভাঙল। ঘুম ভাঙতেই মনে পড়ল, কেন ওরা এসেছিল। কিন্তু বাঁশি বাজল না কেন? এই সময় দরজায় ধাক্কা পড়তেই দীনবন্ধু উচ্চস্বরে বলে উঠলেন, ‘তুম কোন হ্যায়! মধ্যরাতমে কিউ দরওয়াজা ধাক্কা মারতা হ্যায়?'

ওরা হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে দরজা খুলে দিতেই কপিলদা দেখলেন কঙ্কালমূৰ্তি দুটো বলছে, ‘বাঁশি বাজালেন না কেন?’

সমস্ত ব্যাপারটা লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে দেখে কপিলদা একজনের গালে সপাটে চড় মেরে বললেন, ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়ং, হস্তিনাপুরং দীনবন্ধুং শ্রাদ্ধাদি বিঘ্নকালে নরকও গমনও অ্যান্ড আরশোলা ভক্ষণম। তফাত যাওয়ং।'

তারপর তক্তাপোশের উপর দাঁড়ানো থেকে বসে পড়লেন এবং অন্যরা চলে গেল। নবকুমার জিজ্ঞেস করল, ‘আমার পিসি তো বেলা দশটা নাগাদ কেটে গিয়েছেন। কিন্তু তোর জ্যাঠা?’

বনমালী উত্তর দিল, “হাঁসখালি যাবেন বলে তো সুটকেস নিয়ে বেরিয়েছেন। কপিলদার দোকানে ব্রেকফাস্ট সেরে নিচ্ছেন। তিনটে ডিমসেদ্ধ, হাফ পাউন্ড পাউরুটির পর এখন ঘুগনি চলছে। এটা তিন নম্বর প্লেট। এর পর চা খেয়ে হয়তো যাত্রা করবেন। গাড়ি ভাড়াও নেওয়া হয়ে গিয়েছে এবং শীত পড়লে আবার আসবেন তাও জানিয়ে দিয়েছেন।'

বনমালী আর নবকুমারের জীবনে এই কয়েকটা দিন যেন ঝড় বয়ে গেল। এমন দুর্লভ স্মৃতি সহজে ভোলবার নয়। তবে এই ক’দিনের জ্যাঠামশাই এবং আননোন পিসিমা দু’জনকে নিজ নিজ গৃহে ফেরত পাঠানো বাবদ বনমালীর কাছে কপিলদার বিল এল, তিনশো সাতাশ টাকা চল্লিশ পয়সা, আর নবকুমারের কাছে এল, তিনশো বাহান্ন টাকা আশি পয়সা। যাওয়ার আগে বনমালীর জ্যাঠা কপিলদার দোকানে মোট তেতাল্লিশ টাকা দশ পয়সার খেয়েছেন। সেই হিসেব আলাদাভাবে কপিলদা দিয়েছেন। যদিও এই সব হিসেব বা খরচপত্রের ব্যাপারে বনমালী ও নবকুমার গায়েই মাখল না। ওরা যে শেষ পর্যন্ত বিদেয় হয়ে গৃহে শান্তি ফিরিয়ে এনেছেন এতেই খুশি। বড্ড জ্বালাচ্ছিলেন।

কোনও এক মহাপুরুষ নাকি বলেছিলেন, ‘কোনও মানুষের জীবনই আগাগোড়া সুখের নয়। সমস্যা, সংকট, এগুলো ছাড়া জীবন সম্পূর্ণ নয়। এক অর্থে এরাই জীবনের কাঁটা এবং অলংকার। ঠিক গোলাপের মতো। ‘ফাল্গুন মাসের শেষ দিক। যাত্রার মরশুম প্রায় শেষ হয়ে আসছে। নতুন পালার কথা বনমালী আর নবকুমারের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। সেদিন ছিল শনিবার। দল গিয়েছে মোমিনপুরে যাত্রা করতে। যাত্রা শেষ হতে হতে রাত বারোটা বেজে গেল। দলের বাসে করে সবাই রওনা দিল। নবকুমার আর বনমালী উঠল ওদের জন্য ভাড়া করা মোটর গাড়িতে। আজ কোন পক্ষ তা মনে নেই। নির্ঘাত কৃষ্ণপক্ষ। অন্ধকার আকাশে অজস্র তারা, চাঁদ প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। দু'পাশে শূন্য মাঠের মধ্যে দিয়ে কালো পিচের রাস্তা। গাড়ির বাইরে কোনও কিছুই দেখা যাচ্ছে না। রাস্তার পাশে বড় বড় গাছ। গাছের গুঁড়িগুলোতে সাদা রং লাগানো। মোটরগাড়ির হেডলাইটের আলো কালো রাস্তার উপর পড়ে রাস্তা আর সামনের দু'দিকের দৃশ্যগুলোর ভগ্নাংশ যেন চমকে চমকে উঠছে। অতি দ্রুত একটি শিয়াল ছুটে রাস্তা পার হয়ে গেল। হেডলাইটের আলো ছাড়িয়ে শিয়ালটা জঙ্গলের দিকে ছুটে গেল। দূরে কোনও মাঠ থেকে ডিপ টিউবওয়েল চলার শব্দ আসছে।

গাড়িটা এবার গতি কমাল। কারণ, সামনের রাস্তাটা খারাপ। সাবধানে চালাতে হবে। গাড়িটা একটু যেতেই ছোট্ট একটা খালের ব্রিজ পার হওয়ার আগেই একটা বাচ্চার কান্না নবকুমারের কানে এল। নবকুমার মুখ ঘুরিয়ে বনমালীকে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই বনমালী বলল, ‘কে কাঁদে রে?’

গাড়িখানা ব্রিজ পেরিয়ে আসার পর বাচ্চার কান্না যেন আরও স্পষ্ট হল। গাড়ির পিছনের সিটে বনমালী আর নবকুমার। ড্রাইভার গাড়ির গতি আরও কমিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘গাড়ি থামাব? দেখবেন কে কাঁদছে?’

বনমালী বলল, ‘দেখতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু এটা কোনও দুষ্টু লোকের কারসাজি নয়তো?

সঙ্গে তো একগাদা টাকা রয়েছে। যদি আমাদের এই গাড়ি আর টাকা সমেত ছিনতাই করে।' নবকুমার বলল, ‘যা দিনকাল পড়েছে তা হওয়া এমন কিছু বিচিত্র নয়। ওই কান্নার আওয়াজ যদি কচি বাচ্চার হয় তবে কিন্তু আজ রাতের মধ্যেই বাচ্চাটাকে শিয়াল-কুকুরে খাবে। শিয়াল-কুকুরে খাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে হলে এখনই আমাদের কিছু করা দরকার।'

গাড়িখানা থেমেই ছিল। হাতে টর্চ নিয়ে প্রথমে বনমালী এবং পরে নবকুমার নামল। কান্নার শব্দটা ব্রিজের নীচ থেকে আসছে। বালিঢাকা একটা শীর্ণ খাল। সেই বালির মধ্যে কোথাও কোথাও একটু জল। বড়জোর পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ভেজে। বর্ষাকালে এই খালের দাপট দেখার মতো। টর্চ জ্বেলে একটুখানি নামতেই দেখা গেল ধবধবে সাদা তোয়ালে জড়ানো কী একটা বস্তু। অন্ধকারের মধ্যেই দু'জনে দু'জনের দিকে তাকাল। চাপা গলায় বনমালী ডাকল, ‘নব।'

নবকুমার উত্তর দিল, 'বল।'

দু’জনে আরও কিছুটা পথ নীচে নেমে গিয়ে দেখল, ধবধবে তোয়ালে দিয়ে জড়ানো পুতুলের মতো একটা শিশু কাঁদছে। দেখে মনে হচ্ছে শিশুটি সদ্যোজাত। নবকুমার মনে মনে বলল, ‘কোন পাষণ্ড এই কাজটি করেছে? এত বড় পাপের পরও পৃথিবীর আকাশে তারা ফুটেছে। বাইরে শেষ ফাল্গুনের বাতাস বইছে। এখনও কেন পৃথিবীর আকাশ ভেঙে পড়ছে না। যদিও নবকুমার জানে, এসব প্রলাপ চিন্তার কোনও অর্থই হয় না। গোল পৃথিবী ঘুরতে ঘুরতে সেই আদিম, সেই বর্বর, সেই শৃঙ্খলহীন সমাজের কাছেই পৃথিবী ফিরে যাচ্ছে। এদিক-ওদিক বনমালী টর্চের আলো ফেলল। কাউকে দেখা গেল না। এবার নবকুমার খুব সাবধানে তোয়ালেসমেত শিশুটিকে তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে গাড়ির কাছে ফিরে এল। বনমালী, নবকুমার এবং গাড়ির ড্রাইভার তিনজনের কেউই দেরি করল না।

শুধু বনমালী বলল, ‘মোমিনপুর থানায় একটা খবর দিয়ে গেলে বোধহয় ভাল হত।' ড্রাইভার গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘এত রাতে আর থানা-পুলিশ করে ঝামেলা বাড়াবেন না। সোজা কুমিরখালিতে চলুন। যা ব্যবস্থা ওখানে গিয়ে হবে।'

নবকুমার ড্রাইভারের কথায় সমর্থন জানাল। ওরা কুমিরখালির বাজারের কাছে এসে থামল। বনমালী বলল, ‘থামলে কেন?’

ড্রাইভার উত্তর দিল, ‘এবার তো দু’জন দু’দিকে। শিশুটি কার কাছে থাকবে?’ এই প্রশ্নটা এতক্ষণ কারও মাথায় আসেনি। তাই শুনে দু’জনেই দু'জনের দিকে তাকাল।

শেষ পর্যন্ত ঠিক হল এত রাতে কারও বাড়িতেই আর যাওয়ার দরকার নেই। যা ভাবনা তা সকালবেলা ভাবা যাবে। এখন যাত্রাদলের গদিঘরে অর্থাৎ অফিসে রাতটা কাটিয়ে দেওয়া যাক। কিন্তু সব রাতেরই তো শেষ হয়। শেষের সেই সময়টাই তো ভয়ংকর। ঘুম ভাঙার পর কিন্তু কারওরই মনে নেই ছোট শিশুটির কথা। কিন্তু হঠাৎ করে কেঁদে উঠতেই দু’জনের সব কথা মনে পড়ে গেল। মনে পড়ে যাওয়া মানে সেই গতরাতের অমীমাংসিত সমস্যা নিয়ে আবার ভিতরে ভিতরে চাপা উত্তেজনা। কিন্তু কী করা যাবে? সমস্যা এলে তাকে ফেস করতে হবে। কপিলদা এই সময়ে নেই। তিনি নাকি আধুনিক তন্ত্রবিদ্যা শেখাতে শিয়াখালা গিয়েছেন। সে কি এখানে! কুমিরখালি থেকে অনেক দূরে। কবে ফিরবেন তা কেউ জানে না। যখন নিজে ঘোর তান্ত্রিক ছিলেন এবং শ্মশানে বসে তন্ত্রসাধনা করতেন, তখন নাকি তিনি মড়া নাচাতে পারতেন। কপিলদার মন্ত্রের চোটে এবং মাহাত্ম্যে মরা মানুষ নাকি চিতার উপরে উঠে নাচত। মরা নাচত কি না জানি না, তবে তান্ত্রিক কপিল চক্রবর্তীকে ধরে নিয়ে গিয়ে পুলিশ এমন করেছিল যে, তিনি বিস্তর নেচেছিলেন। প্রকাশ্যে তন্ত্রসাধনার সেই শেষ। তান্ত্রিকের পোশাক বদলে ফেললেও মনে মনে তন্ত্রসাধক। পুলিশের সঙ্গে কোনও বিরোধ নেই। বরং পুলিশের সঙ্গে তাঁর বনিবনা বেশ ভাল।

এই সময় গাড়ির ড্রাইভার এসে দু’জনের দিকে তাকাল। পরে বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনারা কিছু ভাবলেন? বাচ্চাটার তো গতরাত থেকে এখনও পর্যন্ত কিছু খাওয়া হয়নি। ওকে কি না খাইয়ে মেরে ফেলবেন?’

বনমালী আর নবকুমার দু’জনেই অসহায়ভাবে বলে উঠল, ‘এতটুকু বাচ্চাকে কেমন করে খাওয়ায় তা তো জানি না।'

ড্রাইভার মনে মনে কিছু ভাবল। পরে বলল, ‘দিন তো বাচ্চাটাকে। আমি বাড়ি নিয়ে গিয়ে একটু কিছু খাওয়াবার চেষ্টা করে দেখি।'

ড্রাইভার তোয়ালে দিয়ে ভাল করে বাচ্চাটাকে জড়িয়ে নেওয়ার আগে হঠাৎ থেমে গিয়ে তোয়ালেটার দিকে দেখতে লাগল। বনমালী আর নবকুমার দু'জনেই ড্রাইভারের দিকে অবাক দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হল? কী দেখছিস?’

তোয়ালেখানা ভাঁজ করে ড্রাইভার নিজের কাছে রাখতে রাখতে বলল, ‘এই তোয়ালেখানায় লন্ড্রির মার্ক আছে। এই মার্ক দেখে লন্ড্রি খুঁজে পাওয়া যাবে, আর লন্ড্রি খুঁজে পেলেই তোয়ালের মালিককে ধরা যাবে।'

বনমালী বলল, ‘তোর বুদ্ধিটা ভাল। তবে এসব গোয়েন্দাগিরি করব কখন? আমাদের কে মানবে?’

নবকুমার বলল, ‘তোর আইডিয়া ভাল। কিন্তু এসব কাজ করতে গেলে শেষ পর্যন্ত না আমরা ফেঁসে যাই! তার চাইতে চল, কুমিরখালি থানায় যাই। থানায় আমাদের একটু চেনাশোনা আছে।

ড্রাইভার বলল, ‘তাই ভাল। তার আগে বাচ্চাটাকে কিছু খাইয়ে আনি। আমার বউ সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কাজ করে। ওই নিশ্চয়ই সব জানে।'

বনমালী আর নবকুমার দু’জনেই একসঙ্গে মাথা নেড়ে বলল, ‘তাড়াতাড়ি যা। তুই বাচ্চা নিয়ে ফিরে এলে থানায় যাব। সঙ্গে তোয়ালেখানা আনিস কিন্তু।'

এইবার ড্রাইভারের জন্য প্রতীক্ষা আর বসে বসে সম্ভব-অসম্ভব ভাবনা। ভাবনার মধ্যে ডুবে থাকলে কতটা সময় যায়, কেমন করে যায়, তা বোঝা যায় না। কিছুক্ষণ পর ড্রাইভার বাচ্চাটিকে নিয়ে ফিরে এল। এবার অন্য রঙের একটা তোয়ালে জড়ানো। সাদা তোয়ালে, যা বাচ্চাটার গায়ে ছিল, সেটি যত্ন করে ড্রাইভার নিজের কাছে রেখেছে।

ওরা কেউ-ই দেরি করার পক্ষপাতী ছিল না। থানায় সোজা বড়বাবুর ঘরের সামনে গিয়ে বলল, ‘ভিতরে আসব স্যার?’

থানার বড়বাবু বনমালী আর নবকুমারকে চিনতেন। তিনি বললেন, ‘এসো! কী ব্যাপার?’ ওরা দু’জনে সব ঘটনা বলার পর বড়বাবু বললেন, ‘বাচ্চাটা কোথায়?

ড্রাইভারকে ডাকা হল। বাচ্চাটাকে তোয়ালে সরিয়ে দেখলেন, পরে বললেন, ‘এ তো কন্যাসন্তান। এই সব বর্বরতা চলছে? কন্যাসন্তান জন্মালেই তাকে ফেলে দেওয়া হচ্ছে? এখন কী হবে?

নবকুমার তখন ড্রাইভারের কাছ থেকে সাদা তোয়ালেখানা নিয়ে ড্রাইভার যেমন বলেছিল তেমন করে বলল এবং লন্ড্রির ছাপটা দেখাল। বড়বাবু ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বাঃ! তোমার তো বেশ বুদ্ধি।'

ড্রাইভার বলল, ‘আমার কিছু নয় স্যার। একটা হিন্দি সিনেমায় দেখেছিলাম। তাই বললাম।'

বড়বাবু বললেন, ‘অনেকেই তো অনেক কিছু দেখে। কিন্তু সময় মতো মনে রাখে ক’জন? আমি মোমিনপুর থানায় একটা ফোন করে দেখি।'

বড়বাবু মোমিনপুর থানায় ফোন করে বিষয়টা জানালেন। পরে লন্ড্রির ছাপের কথা বলতেই মোমিনপুর থানা থেকে যা বলা হল তাতে কুমিরখালির বড়বাবুকে বেশ খুশি খুশি দেখাল। ফোনের পর্ব শেষ হওয়ার পর বড়বাবু বললেন, ‘মেয়েটাকে দিনকয়েক তোমাদের হেপাজতে রাখতে পারবে? নইলে আমি রাখতে পারি। আমি মানে আমার মেয়ে। বেচারি খুব দুঃখী। ওর এমন একটা ব্যাপার যে, জীবনে মা হতে পারবে না। ওর শখ ছিল ওর মেয়ে হবে। কোনও বড় ডাক্তার দেখাতে কসুর করিনি। ওর স্বামী আর আমি কলকাতায় গিয়ে ডা. কুণ্ডুকে পর্যন্ত দেখিয়েছি। উনি যখন সম্ভাবনা নেই বলেছেন, তখন আমরা আশা ছেড়ে দিয়েছি। ওর কাছে এই বাচ্চা মেয়েটা ভালই থাকবে।'

বনমালী আর নবকুমার দু'জন দু'জনের দিকে তাকাল। আর দেখল ড্রাইভারকে। বাচ্চা এখন বড়বাবুর টেবিলের উপর। বড়বাবু বাচ্চাটির দিকে তাকিয়ে আছেন।

একটু পরে বনমালী নিজের মুখটা নবকুমারের কাছে এনে বলল, 'স্যারের কথাটা কিন্তু ভাল। আমাদের সংসারে ওকে দেখভাল করার মতো লোকের অভাব। তার চাইতে স্যারের...’

নবকুমার বলল, ‘একটি মাতৃহৃদয়ের বেদনা দূর হবে।'

কথাটা শেষ করেই নবকুমার আর বনমালী দু’জনেই ড্রাইভারের দিকে তাকাল। ড্রাইভারের চোখজোড়া ছলছল করছে। সে বলল, ‘বউয়ের রাতে ডিউটি থাকে। আমি যাত্রার গাড়ি নিয়ে এদিক ওদিক যাই। আমরা ওকে দেখভাল করতে পারব না। তার চেয়ে ও থাকুক ওর মায়ের কাছে। যে বস্তু স্যারের মেয়ে দিতে পারবে। আমরা কেউ তা দিতে পারব না।'

চলে আসার সময় বড়বাবু বললেন, ‘ওই তোয়ালেটা দিয়ে যাও। ওটা তদন্তের কাজে লাগবে। কিন্তু আমি ভাবছি ওর প্রকৃত বাবা-মা’কে যদি খুঁজে পাওয়া যায় তা হলে তো মেয়েটিকে ফেরত দিতে হবে। সেটাই আইন।'

বনমালী বলল, ‘যারা সদ্যোজাত শিশুকে খালপাড়ে ফেলে দিতে পারে, মা হওয়ার কোনও অধিকার যেমন ওই মহিলার নেই, তেমনই ওই পরিবারের কারও কোনও অধিকার নেই। মেয়ে আমাদের বোনের। আর এটাই ওর একমাত্র পরিচয় জানবেন স্যার।'

চলে আসার সময় ড্রাইভার বলল, ‘বড় অদ্ভুত ব্যাপার। চিনি না জানি না, নামগোত্রহীন একটি শিশুকন্যাকে কুড়িয়ে পেয়ে কয়েক ঘণ্টা তার সঙ্গে ছিলাম। তাকে রাখা দায়। অথচ তাকে ছেড়ে আসতেও কষ্ট হচ্ছে।'

নবকুমার বলল, ‘তবু সান্ত্বনা কী বল তো, মেয়েটা স্যারের মেয়ের কাছে মায়ের আদরে থাকবে। স্যারের জামাই কুমিরখালি কোর্টের উকিল। পয়সাকড়ির অভাব নেই।'

দু’দিনের মধ্যেই জোর তদন্ত শুরু হয়ে গেল। রোজ রাতেই বড়বাবুর মেয়ে একবার করে বাবাকে জিজ্ঞেস করে, ‘কোনও সন্ধান পেলে?’

বড়বাবু মাথা নেড়ে জানান, 'না, কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি।'

মেয়ে বলে, ‘আমার মন বলছে, সন্ধান পাওয়া যাবে না।

বড়বাবুও মনে মনে তাই চান। কিন্তু মুখে বলেন না। বড়বাবুর স্ত্রী বলেন, ‘যার ব্যামো তার হুঁশ নেই, পাড়াপড়শির ঘুম নেই। অমন মেয়েদের কোলে ভগবান কেন যে সন্তান দেন।'

বড়বাবুর মেয়ের জামাই উকিল অবনী মুখার্জি বলেন, ‘বাবা, যদি উপযুক্ত প্রমাণ পেয়ে এবং পরিস্থিতির বিচার করে এই কুড়িয়ে পাওয়া মেয়েটিকে আসল মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতেই হয় তা হলে সেটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হয় ততই মঙ্গল।'

বড়বাবু তাঁর জামাইকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন? একথা বলছ কেন?’

অবনী উত্তর দিলেন, ‘দিনকে দিন ওই বাচ্চা মেয়েটির সঙ্গে আপনার মেয়ে কনকের ইনভলভমেন্ট যেভাবে বাড়ছে তাতে বেশি দেরি হয়ে গেলে ওই মেয়েটির চাইতে কনকের অসুবিধে অনেক বেশি হবে। হয়তো মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে নিজেই মানসিক রোগী হয়ে পড়বে।'

বড়বাবু একটু ভাবতে ভাবতে জামাইয়ের মুখের দিকে তাকালেন। পরে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে নিতে অস্ফুটে বললেন, 'আমি জানি তেমন আশঙ্কা আছে। শ্রীকৃষ্ণ তো দেবকী মায়ের কাছে মানুষ হননি। জন্মের রাত থেকেই তিনি জেনেছেন, তাঁর মা যশোদা।'

অবনী গা থেকে কালো কোটটা খুলে ফেলেছিলেন। এবার গলার টাইটা খুলতে খুলতে বললেন, ‘ওসব ঠাকুর-দেবতার গল্প। ওই দেব-কাহিনিতে ভারতের আধুনিক আইন থানা, পুলিশ কিছু নেই। দেবতাদের ইচ্ছেতেই সব সমাধান হয়। কিন্তু আমরা কেউ সেই পুরাণ যুগের মানুষ নই। কেউ দেবতা নই।'

জামাইয়ের যুক্তিটা বড়বাবু মানলেন। কিন্তু আবেগ যেখানে মানুষকে চালিত করে সেখানে এই যুক্তি মানতে মন চায় না। বড়বাবু চুপ করে রইলেন। জামাই ঘর থেকে আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেলেন। থানা থেকে ফোন এসেছে। বড়বাবু বেরিয়ে যাওয়ার সময় মেয়ের ঘরে একবার উঁকি দিয়ে দেখলেন, তাঁর মেয়ে কনক নতুন একটা জামা পরিয়ে মেয়েটাকে পিঠ চাপড়ে চাপড়ে ঘুম পাড়াবার চেষ্টা করছে। বড়বাবুর মনে হল, আজই কয়েকটা ছড়ার বই কিনে নিয়ে আসবেন।

কিন্তু ছড়ার বই কিনতে গিয়ে বড়বাবু যেন সহসা আবিষ্কার করলেন অধিকাংশ ছড়াই খোকাদের নিয়ে। তুলনায় খুকুরা যেন ব্রাত্য। ‘খোকা ঘুমোল’, কিংবা ‘খোকন খোকন করে মায়’, ‘খোকা গেছে মাছ ধরতে’ এইরকম অজস্র ছড়ায় কেবল খোকাদের আধিপত্য। লক্ষ্মীর পাঁচালি থেকে সবরকম পাঁচালিতেই কেবল পুত্রদের বন্দনা। এইরকম আবহাওয়ায় কন্যাসন্তানদের অবাঞ্ছিত মনে করাটাই স্বাভাবিক। এসব কথা নতুন কিছু নয়, তবুও আজ যেন বড়বাবুর মাথার মধ্যে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। থানায় এসে মোমিনপুর থানার দারোগাবাবুকে বললেন, 'মি. সামন্ত, আমি কুমিরখালি থানার বড়বাবু বলছি। এস পি সাহেবের সঙ্গে আমার কথা হয়ে গিয়েছে। ডি এমও জানেন। আমি আগামীকাল সকালে আপনার থানায় যাচ্ছি। আপনাকে আমার দরকার হবে। আপনি আর আমি থাকব। আমার সঙ্গে দু’জন বা তিনজন থাকবেন, কিন্তু তাঁরা কেউ পুলিশ নন। আমাদের কোনও ফোর্সের দরকার নেই।'

টেলিফোনের ওদিক থেকে বোধহয় মোমিনপুরের দারোগাবাবু কিছু জিজ্ঞেস করতেই কুমিরখালি থানার বড়বাবু বলে উঠলেন, ‘না, না, লাঞ্চের কোনও ব্যবস্থা রাখতে হবে না। বাকি কথা ওখানে গিয়ে হবে। আই নিড ইওর হেল্প।'

বাড়ি যাওয়ার পর মেয়ে কনক এসে সামনে দাঁড়াল। চোখ তুলে বাবার দিকে তাকাল। বড়বাবুর কাছে সে বড় কঠিন মুহূর্ত। এতদিন তাঁর চোখের দিকে তাকাতে বড় বড় ক্রিমিনালরা সাহস পেত না। আজ নিজের মেয়ের নিঃশব্দ বোবা দৃষ্টির দিকে তাকাতে তাঁর বুক কাঁপছে। কনক এক পা এগিয়ে এল বাবার দিকে। এখন আর নীরেন ব্যানার্জি কুমিরখালি থানার বড়বাবু নন। তিনি যেন একটি মেয়ের বাবা। মেয়েটির নাম কনক।

নীরেন ব্যানার্জি বললেন, ‘কিছু বলবি?’

কনক বলল, ‘তুমি কি আমার মেয়ের আসল মা'র সন্ধান করতে মোমিনপুর যাচ্ছ? তোমার ড্রাইভার কি ভুল শুনেছে?’

নীরেন ব্যানার্জির ভিতর থেকে দারোগা কথা কইল, ‘খুঁজে পাওয়া না পাওয়া পরের ব্যাপার। আমাকে তো আমার ডিউটিটুকু করতে হবে মা।’ মেয়ের চোখে জল। সেই জলের দিকে তাকিয়ে বড়বাবুর কর্তব্যের পোশাকে ঢাকা এক বিপন্ন বাবা যেন আর্তস্বরে বললেন, ‘সত্যি কাউকে খুঁজে না পেলে আমি তো তোর চেয়েও বেশি খুশি হব মা।’

মেয়ে চলে যেতে যেতে বলল, ‘ওকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ো না বাবা। আমি যে ওকে ছাড়া বাঁচার কথা ভাবতে পারি না।

মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কনক চলে যেতেই বড়বাবুর স্ত্রী বন্দনা ঘরে এসে বললেন, ‘মেয়েটাকে না কাঁদালেই কি চলছিল না?’

বড়বাবু বললেন, ‘আমাকে আমার কর্তব্যটুকু তো করতে দেবে। আমি তো হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না।

বন্দনা বললেন, ‘কত তোমাদের মুরোদ বোঝা গিয়েছে। কত লোক হারিয়ে যায়, কত ছেলেমেয়ে চুরি হয় তার ক’টাকে ধরতে পার? জেলখানা থেকে পালিয়ে যায়, তবেই বোঝো কেমন তোমাদের মুরোদ!’

নীরেন ব্যানার্জি অর্থাৎ বড়বাবু কোনও কথার জবাব দিলেন না। বাঁ হাতের আঙুল দিয়ে জামার বোতাম খুলতে খুলতে নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন। বড়বাবু ঘরে এসে চেয়ারে বসতে বসতে মনে মনে বললেন, কনক বা বন্দনার কাছে বিষয়টা নিতান্তই আবেগের। সন্তানহীনা এক নারীর তীব্র মাতৃত্বের দিকটাই ওরা দেখছে। কিন্তু আমি মনে মনে যা-ই চাই না কেন, দেশের প্রচলিত আইনকে আমি ভুলে যাব কেমন করে? আইনের কাছে আবেগের কোনও মূল্য নেই। কিন্তু এই সহজ সত্যটা ওরা কেউ বুঝবে না। বোঝবার জায়গায় ওরা নেই।

জুতো খুলে, জামা খুলতে যাওয়ার আগে ঘরে এলেন জামাই অবনী। শ্বশুরমশাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে অবনী বললেন, ‘আপনি কাল সকালে মোমিনপুর যাচ্ছেন?’ বড়বাবু বললেন, ‘হ্যাঁ। তোমায় কে বলল?’

অবনী উত্তর দিলেন, ‘মা।'

বড়বাবু বললেন, ‘ও বন্দনা।’

অবনী বললেন, ‘আমি আপনার মনের অবস্থা বুঝি। শুধু একটা প্রস্তাব দিতে এসেছিলাম। যদি শোনেন।'

বড়বাবু বললেন, ‘বলো। তোমার প্রস্তাবটাও শুনে রাখি।'

অবনী বললেন, 'আমাদের বিশ্বাস ওই বাচ্চা মেয়েটির প্রকৃত মায়ের কোনও সন্ধান পাওয়া যাবে না। যদি তাই হয় তা হলে পরিত্যক্ত শিশুকে থানার দারোগার অনুমতিক্রমে আমরা আইনত গ্রহণ করতে পারি। তাতে কোনও বাধা নেই।'

বড়বাবু জামাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আইনটা আমি জানি। কিন্তু এই কাজটা কোনও সাধারণ নাগরিক করছে না, করছেন একজন দারোগা। পুলিশ মেয়েটিকে কুড়িয়ে পায়নি, পেয়েছে কুমিরখালির দু’জন লোক। অতএব, সবদিক থেকে আইন রক্ষা করে আইন মোতাবেক কাজটা করতে চাই। আর শোনো, ওই মেয়েটির একটা নাম ঠিক করো। যাতে ডাকতে সুবিধে হয়।'

অবনী বললেন, ‘কনক তো একটা নাম ঠিক করে সেই নামেই ডাকে।'

বড়বাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী নাম?’

অবনী বললেন, ‘শরতের শোভা শিউলি। ওই ফুলের গন্ধের মধ্যেই আগমনির বার্তা। পুজোর পদধ্বনি।'

আগেই খবর দেওয়া ছিল। অতএব, সাতসকালেই বনমালী, নবকুমার আর ড্রাইভার এসে হাজির। কিন্তু ওদের সঙ্গে রোদচশমা চোখে আর-একজন কে? বড়বাবু একটু এগিয়ে আসতেই ওই আর একজন লম্বা একটা স্যালুট ঠুকে বলল, 'স্যার, কপিল চক্রবর্তী।’

কপিল চক্রবর্তীর দাড়ি কামানো। গলায় কয়েকটি রুদ্রাক্ষ দিয়ে তৈরি মালা। বড়বাবু পা থেকে মাথা পর্যন্ত কপিল চক্রবর্তীকে বারদুয়েক দেখে নিয়ে বললেন, ‘আমাদের সঙ্গে আপনার গিয়ে কাজ নেই। আপনি বাসে করে মোমিনপুর ব্রিজের কাছে বসে থাকুন। আমরা আসবার সময় আপনাকে নিয়ে আসব।'

কপিলবাবু বললেন, ‘শুধু শুধু বসে থাকব?’

বড়বাবু উত্তরে বললেন, ‘শুধু বসে থাকবেন কেন? ব্রিজের দু'টো দিক আছে। যে দিক কুমিরখালির দিকে সেই দিকে লক্ষ রাখবেন। কোনও মানুষ ব্রিজটাকে কীভাবে দেখছে। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবেন, ব্রিজটাকে ভেঙে চওড়া করা হবে। তাই দেখতে এসেছি।'

কপিল চক্রবর্তী বললেন, ‘ওসব নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। আমরা হচ্ছি সেই ভারতীয়, যারা আসল গব্য ঘৃতকে বিদায় দিয়ে গাছগাছড়ার ভিতর থেকে টেনে ঘি বার করছি। ধানের খোসা, সেই তুষ থেকে হোয়াইট অয়েল। আমরাই পারি আমড়াকে আম বানাতে। আপনারা আসুন। আমি একটু লেটে যাচ্ছি।'

মোমিনপুরে এসে অনেকটা সময় গেল কিন্তু আসল কাজের কাজ কিছু হল না। হওয়ার সম্ভাবনাও দেখা গেল না। মোমিনপুর থানার বড়বাবু মি. সামন্ত বললেন, ‘মিথ্যে অত খোঁজাখুঁজির কী দরকার? যারা ফেলে দিয়ে গিয়েছে তারা কি ফেরত নেওয়ার জন্য ব্যস্ত হবে? কখনওই নয়। হয়তো নেবে না আর নিলেও গোপনে বিক্রি করে দেবে। ছেলে বিশেষ করে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পাচারের একটা চক্র এই মোমিনপুরে তৈরি হয়েছে। এই চক্রের পিছনে অনেক বাঘা বাঘা লোক জড়িত বলে কিছুতেই কিছু করতে পারছি না।'

নীরেন ব্যানার্জি বললেন, ‘খুঁজে না পেলে অগত্যা নিজের কাছেই রাখব। কাজটা আইন মেনে করতে চাই বলেই এত খোঁজাখুঁজি। হাসপাতাল থেকে ডেডবডি চুরি হওয়ার ঘটনার কথা খবরের কাগজে পড়েছি। ক্রাইম নানাভাবে বেড়ে যাচ্ছে।'

সামন্তবাবু বললেন, ‘এটাও বিশ্বায়নের ফল কিনা কে জানে? ক্রাইমের বিবর্তন।'

দুই থানার দুই বড়বাবু যখন মুখোমুখি বসে চা খেতে খেতে এইসব প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করছিলেন তখনই একটা লোক ঘরে মি. সামন্তকে বলল, ‘স্যার, কথা আছে।'

সামন্তবাবু প্রশ্ন করলেন, ‘কী ব্যাপার?’

লোকটি উত্তর দিল, ‘ওই শিশুকন্যাটির ব্যাপারে।

নীরেন ব্যানার্জির বুক কেঁপে উঠল। মুহূর্তে তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল কনকের মুখ। শিউলির মুখ। চায়ের কাপে চুমুক দিতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু পারলেন না। ওই লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মেয়েটির বাবা-মা’র সন্ধান মিলেছে?’

লোকটি উত্তর দেওয়ার আগে মোমিনপুর থানার বড়বাবুর দিকে তাকাল। বড়বাবু সামন্ত বললেন, ‘উনি কুমিরখালি থানার বড়বাবু। মেয়েটির খোঁজ নিতেই উনি আমার কাছে এসেছেন।' লোকটি বলল, ‘না, মেয়েটির বাপ-মায়ের খোঁজ মেলেনি। তবে ওই তোয়ালেখানা যে লন্ড্রিতে কাচতে দিয়েছিল তার সন্ধান মিলেছে।'

সামন্তবাবু প্রশ্ন করলেন, ‘কোথায় লন্ড্রি?’

লোকটি উত্তর দিল, ‘দক্ষিণডাঙা। শীতলপুরের পাশে। যেখানে কাচকল তৈরি হয়েছে।' সামন্তবাবু এবার নীরেন ব্যানার্জির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এখান থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে। বছর দুয়েক হল ওখানে একটা গ্লাস ফ্যাক্টরি হয়েছে। সেই সূত্রে দক্ষিণডাঙায় গড়ে উঠেছে নতুন উপনিবেশ। উচ্চবিত্তদের বাসই বেশি। তাই আধুনিক লন্ড্রি, বিউটি পার্লার, সিনেমা হল, ফুড প্লাজা, রং-বেরঙের দোকান সবই আছে। লন্ড্রিটা ওখানকার। এবার গিয়ে জানতে হবে কোন লোক এসে কাচতে দিয়েছিল। তার সঙ্গে শিশুটির সম্পর্ক থাকা খুবই স্বাভাবিক। চলুন, যাওয়া যাক।'

মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই সবাই তৈরি হয়ে গেল। নীরেন ব্যানার্জি নিজে টের পাচ্ছেন তাঁর ভিতরটা, তাঁর সমগ্র অস্তিত্ব দু'ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে। একদিকে তিনি সরকারি পোশাকপরা কুমিরখালি থানার বড়বাবু, অন্যদিকে তিনি কনক নামে এক সন্তানহীনা মেয়ের বাবা। যে মেয়ের চোখের প্রতিটি ফোঁটা যেন এক-একটা তীক্ষ্ণ তিরের মতো তাঁর হৃৎপিণ্ডে এসে ঢুকে যাচ্ছে।

সেই লন্ড্রিতে এসে দেখলেন বেশ বড় ধরনের লন্ড্রি। একসঙ্গে দু’জন পুলিশ অফিসারকে দেখে দোকানদার ঘাবড়ে গেল। দোকানের মালিক তোয়ালেটা ভাল করে দেখে বলল, 'এটা আমার দোকান থেকেই কাচা। আমি ক্যাশমেমোর বইটা দেখে বলছি।'

নীরেন ব্যানার্জি বললেন, ‘খুব পুরনো ক্যাশমেমো দেখার দরকার নেই। দিন দশেকের মধ্যেই দেখুন।'

দোকানদার দেখতে দেখতে বলল, ‘হ্যাঁ, পেয়েছি। এস গুপ্ত নামে এক ভদ্রলোক। যতদূর চেহারাটা মনে পড়ছে, তিনি কিন্তু দক্ষিণডাঙার লোক নন। ওই একবারই দেখেছি। না, না ভুল হল। দু’বার দেখেছি। একবার যেদিন এটা কাচতে দিয়ে গেলেন, আর একবার যেদিন দোকান থেকে নিয়ে গেলেন। দু’বারই এসেছিলেন সন্ধে হওয়ার মুখে মুখে। আমি এর বাইরে আর কিছু জানি না।'

কিন্তু গ্লাস ফ্যাক্টরির থেকে আরম্ভ করে দক্ষিণডাঙার এবং শীতলপুরের বহু জায়গায় খোঁজ করেও এস গুপ্ত নামে কাউকে পাওয়া গেল না। ‘এস’ এমন একটা অক্ষর যা দিয়ে অনেক নাম হয়। গুপ্ত পদবির যে দশজনকে পাওয়া গেল তারা হয় নাবালক নয়তো বৃদ্ধ মানুষ। এতক্ষণ পর নবকুমার বলল, 'স্যার, আমার মনে হচ্ছে লোকটা আসল নাম লন্ড্রিতে বলেনি। আমরা মিথ্যে একটা নামের পিছনে সময় নষ্ট করছি।'

নীরেন ব্যানার্জি বললেন, ‘আমারও তাই ধারণা। আপনার কী মনে হয় মি. সামন্ত?’ সামন্তবাবু উত্তর দেওয়ার আগে বললেন, ‘দাঁড়ান, এক মিনিট।

কথা বলেই এক জুনিয়র অফিসারের নাম ধরে ডাকলেন, ‘ঘোষালবাবু! একটু এদিকে আসুন তো।'

একজন সুদর্শন যুবক সামন্তবাবুর সামনে এসে বললেন, ‘আমায় ডেকেছেন স্যার?’

সামন্তবাবু বললেন, ‘অনিল, তোমার কি মনে পড়ছে, এই বছর মার্চের গোড়ার দিকে শীতলপুরে একটা পারিবারিক সংঘর্ষে দুই পরিবারের বেশ কয়েকজন মারা যায়। তখন কাগজে-কলমে বিস্তর হইচই হলেও পরে এটাকে রাজনৈতিক সংঘর্ষ বলে ধামাচাপা দেওয়া হয়। তুমি ওই ফাইলটা নিয়ে এসো তো।'

অনিল নামের সেই যুবকটি সঙ্গে সঙ্গে ভিতরে গিয়ে একটা ফাইল নিয়ে চলে এল। সামন্তবাবু সেই ফাইল দেখতে দেখতে বললেন, ‘মি. ব্যানার্জি, এস গুপ্ত শুধু কোনও পুরুষের নাম হতে হবে তা কেন? মহিলার নামও হতে পারে। যেমন সুধা গুপ্ত।'

নীরেন ব্যানার্জি ভাবলেন, মেয়েটির মায়ের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। তাঁর বুকের ভিতর ধকধক করতে শুরু করল। তবুও তিনি বললেন, বলতে হল, ‘অবশ্যই হতে পারে। তবে কি মেয়েটির মা’র নাম সুধা গুপ্ত।'

সামন্তবাবু বললেন, ‘সেকথা এখনই বলা যাচ্ছে না। আরও দুটো দিন সময় লাগবে। একটু সময় দিন আমাকে।'

এক্ষেত্রে দুই থানার দুই বড়বাবুর মনের অবস্থা দু’রকম। সেই গোড়ায় যখন সামন্তবাবু বলেছিলেন, ‘বৃথা চেষ্টা। আপনি ফিরে যান। রাস্তার শিশুটি যখন একটা মায়ের কোল পেয়েছে তখন ওকে কোলছাড়া করবেন না।'

তখনই ফিরে গেলে বোধহয় ভাল হত। এখন মেয়েটির আসল পরিচয় উদ্ধারের উজ্জ্বল সম্ভাবনায় সামন্তবাবুর মুখে সাফল্যের ছোঁয়া আর নীরেন ব্যানার্জির বুক জুড়ে থমকে থাকা একটা বেদনার নিঃশব্দ যন্ত্রণা। যত সহজে সামন্তবাবু দু’দিন সময় চাইলেন তত সহজে তিনি বাবা হয়ে মেয়ের কাছে দু’দিন সময় চাইতে পারবেন না। তিনি কেমন করে বাড়ি ফিরবেন? বন্দনা আর কনকের দিকে কেমন করে তাকাবেন?

সামন্তবাবু বললেন, ‘সারাদিনে তো কিছু খাওয়া হল না। এবার কিছু খাবার বলি?’ নীরেন ব্যানার্জি বললেন, ‘আজ থাক। এই অবেলায় আর কিছু খাব না। আমি দু’দিন পরে আবার আসব।'

সামন্তবাবু বললেন, ‘আশা করি তার মধ্যেই ফয়সালা হয়ে যাবে।'

নীরেন ব্যানার্জি শুধু মাথাটা নাড়লেন। গাড়িতে এসে বসার পর নবকুমার বললেন, 'স্যার, একটা কথা কইব?

নীরেন ব্যানার্জি বললেন, ‘বলো।’

নবকুমার বলল, ‘বাড়িতে তো সবাই জিজ্ঞেস করবে কী হল? তখন আপনি বলবেন, ‘কোনও হদিশই পাওয়া যায়নি। যাবে না জানতাম। তবু মোমিনপুর থানার ওসি কর্তব্যের খাতিরে দু’দিন সময় চেয়েছে।’ এতে মিথ্যেও বলা হল না অথচ দিদির দুঃখটাও কম হল।' বনমালী বলল, ‘ওর সত্যিকারের মাকে যদি পাওয়াই যায় তা হলে সেই মায়ের বিরুদ্ধে

মামলা করব। কেন সে ওইটুকু শিশুকে খালপাড়ে রেখে গিয়েছে।'

বড়বাবু বললেন, ‘মামলা করা যায়, কিন্তু মামলা করে মাতৃত্বের অধিকার হরণ করা যায় না।'

মহাভারতে কর্ণ নিজে যেতে চাননি, তাই মা কুন্তীর আহ্বানে সাড়া দেননি। কিন্তু নিজে যেতে চাইলে দুর্যোধন, অধিরথ, পালিকা রাধা কেউই কিন্তু আটকাতে পারতেন না।

ড্রাইভার বসেছিল পুলিশ-ড্রাইভারের পাশে। সেই ড্রাইভার বলল, ‘দিব্যি চলছিল, মাঝখান থেকে সুধা গুপ্ত ঢুকে পড়ে কেসটা গুলিয়ে দিল।'

তারপর সবাই চুপ করে গেল। হঠাৎ বনমালী বলল, ‘ড্রাইভারভাই, সামনেই মোমিনপুর ব্রিজ। কপিলদার ওখানে দাঁড়িয়ে থাকার কথা।’

গাড়ি মোমিনপুর ব্রিজে উঠতেই বনমালী বলল, 'স্যার, এই ব্রিজের নীচেই একটা পিচবোর্ডের ভাঙা বাক্সের মধ্যে শিউলিকে পেয়েছি। খুব কাঁদছিল। ব্রিজের ওপ্রান্তে তখন কপিলদা একহাতে রুমাল নাড়ছেন আর চ্যাঁচাচ্ছেন, 'স্যার, আই এম হিয়ার, আই এম হিয়ার।

কপিলদা গাড়িতে উঠেই বড়বাবুকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘কিছু সন্ধান পেলেন স্যার?’ বড়বাবু সংক্ষেপে বললেন, ‘না, এখনও কিছু সন্ধান পাইনি। মোমিনপুরের ওসি নিজে তদন্ত করছেন।'

কপিলবাবু বললেন, ‘আমার আবার পুলিশি তদন্তে ভরসা কম।'

বড়বাবু বললেন, ‘আপনি চুপ করে থাকলে আমি খুশি হব।'

কপিলদা বললেন, ‘বেশ, এই আমি চুপ করলাম। আপনার হুকুম ছাড়া মুখ খুলব না।' থানায় ফিরে আসতে রাত হয়ে গেল। থানায় এসে চেয়ারে বসতে না বসতেই স্ত্রী

বন্দনার ফোন এল, ‘কোনও সন্ধান মিলল?’

নীরেন ব্যানার্জি বললেন, ‘কোনও সন্ধান মেলেনি।'

বন্দনা বলল, ‘জানতাম মিলবে না। আর খোঁজাখুঁজির দরকার নেই।'

নীরেন ব্যানার্জি বললেন, 'তুমি তো তেত্রিশ কোটি দেবতাকে মানো। এই মেয়েটির বেলায় জানতে হবে না, কোন জাত, কী ধর্ম?

বন্দনা রাগের গলায় বলল, ‘এটা ঠাট্টার সময় নয়। তুমি যাওয়ার পর থেকে মেয়েটা কেবল কেঁদে যাচ্ছে। একদানা খাবার মুখে তোলেনি। অমন জাতপাতের কাঁথায় আগুন। এত যে দেব-দেবী কার কী জাত বলতে পার? মহাদেব, সরস্বতী, লক্ষ্মী, দুর্গা, মাকালী এঁদের কারও পদবি কি তুমি জানো? শিউলিও তেমন এক মানবী। ওকে জাত দিয়ে বিচার কোরো না।'

বন্দনা ফোনটা ছাড়বার আগে বললেন, 'কনক তোমার সঙ্গে কথা বলবে।' ফোনসুদ্ধ নীরেন ব্যানার্জির হাতটা কাঁপছিল। হ্যালো, বলবার আগেই কনক বলল, ‘বাবা, তুমি বাড়িতে এসো। তোমার মুখ থেকে সব শুনব।'

নীরেন ব্যানার্জি উত্তর দেওয়ার আগেই তাঁর অফিসের খোলা দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন তাঁর জামাই অবনী। তাঁর চোখেও প্রশ্ন। নীরেন ব্যানার্জির মনে হচ্ছে এক বিচিত্র রণক্ষেত্রে তিনি একা এবং নিরস্ত্র। তাঁর চারদিক থেকে বর্শার ফলার মতো প্রশ্নগুলো এসে তাঁকে বিঁধছে। তিনি রক্তাক্ত হলেও চিৎকার করে উঠতে পারছেন না। তিনি ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়লেন। যেন সব কেমন অন্ধকার হয়ে গেল। শুধু শুনলেন দূর থেকে কেউ যেন বলছে, ‘বাবা, আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে? কী হয়েছে আপনার? হাবিলদার, তাড়াতাড়ি একজন ডাক্তার ডাকুন।'

হঠাৎ থানার মধ্যে একটা ব্যস্ততা ছড়িয়ে পড়ল। ডাক্তার এলেন। প্রেশার মাপলেন। একখানা কাগজের উপর ফরফর করে কিছু লিখতে লিখতে বললেন, ‘প্রেশার খুব হাই। এই দুটো ট্যাবলেট আজই খাইয়ে দিন। আগামীকালই একটা ই সি জি করিয়ে নেবেন। কমপ্লিট রেস্ট। কোনও উত্তেজনার মধ্যে যেন না থাকেন।'

কথা ছিল দু’দিনের মধ্যে কুমিরখালি থানার বড়বাবু নীরেন ব্যানার্জি মোমিনপুর থানায় যাবেন। শরীর আগের চেয়েও ভাল থাকলেও বাড়ির সবাই এবং থানার প্রত্যেকের অনুরোধে তাঁর আর মোমিনপুরে যাওয়া হল না। থানায় বসে ভাবতে ভাবতে তাঁর মনে হল, তিনি যে অসুস্থতার কারণে যেতে পারছেন না এই খবরটা মোমিনপুর থানায় তাঁর পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া উচিত। সেই সঙ্গে মেয়েটির ব্যাপারে তদন্ত কিছু এগোল কি না সেটাও জেনে নেওয়া। ওই শিশুকন্যার সমস্যাটা তাঁর বুকে একটা পাথরের মতো চেপে বসে আছে।

নীরেন ব্যানার্জি ফোন করলেন। বার দুই রিং হওয়ার পর কেউ একজন ফোন ধরতেই নীরেন ব্যানার্জি নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, ‘বড়বাবু, মি. সামন্ত আছেন?’

ওদিক থেকে উত্তর এল, 'স্যার, আমি অনিল বারুই কথা বলছি। থানার সেকেন্ড অফিসার। আমাদের স্যার তো আপনার ওখানেই যাবেন বলে রওনা হয়ে গিয়েছেন। সঙ্গে একজন মহিলা।'

নীরেন ব্যানার্জির বুকের মধ্যে আবার ধক করে উঠল। নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘ওই কুড়িয়ে পাওয়া মেয়েটি সম্বন্ধে কোনও...’

ওদিক থেকে অনিল উত্তর দিল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ। ওইসব ব্যাপারেই তো গিয়েছেন।'

নীরেন ব্যানার্জি একটু ভাবলেন। পরক্ষণেই, ‘ঠিক আছে,’ বলে ফোনটা রেখে দিলেন। আর কোনও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নেই। শিউলির মা'কে পাওয়া গিয়েছে। এবার আর ওকে নিজেদের কাছে রাখার কোনও যুক্তি নেই। পুলিশ হিসেবে ওই মহিলাকে হয়রানি করা যেতে পারে, তীব্র ভর্ৎসনা করা চলতে পারে কিন্তু তার অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করা যাবে না। শিশুকন্যাটি কীভাবে ওই খালের নীচে এল তাও অবশ্য জানতে হবে। আইন তার পক্ষে কতটা কান দেবে, আদৌ দেবে কি না সেকথা স্পষ্ট করে তাঁর জানা নেই।

এই কথাটা বাড়িতে কি এখনই জানিয়ে রাখা দরকার? নীরেন ব্যানার্জির মনে হল, আকস্মিক শোনার চেয়ে আগে থেকে জানা থাকলে সহ্য করাটা অপেক্ষাকৃত সহজ হবে। তিনি চেয়ার থেকে উঠতে গিয়ে বসে পড়লেন। বাড়িতে কারও মুখের দিকে তাকাবার শক্তি তাঁর নেই। নীরেন ব্যানার্জি বাড়িতে ফোন করলেন। ফোনটা ধরল তাঁর মেয়ে কনক। তিনি বললেন, ‘তোর মা কোথায়?’

কনক উত্তর দিল, ‘পুজো করছে।'

নীরেনবাবু বললেন, ‘পুজো হয়ে গেলে আমায় একটা ফোন করতে বলিস। তোর মেয়ে কী করছে?’

শেষের দিকে গলাটা ধরে এল নীরেনবাবুর। কনক উত্তর দিল, ‘ঘুমোচ্ছে। এই একটু পরে ঘুম থেকে উঠে শুয়ে শুয়ে দাপাদাপি শুরু করবে।'

মেয়ের সম্পর্কে আরও কয়েকটা কথা বলে কনক হঠাৎ বলে উঠল, ‘বোধহয় ঘুম ভেঙেছে। আমি ফোন ছাড়ছি বাবা।'

কনক ফোন ছাড়তেই নীরেনবাবুর মনে হল, তিনি যেন হঠাৎ করে নিজের মধ্যেই নিজে একা হয়ে গেলেন। থানার কাজেও মন বসাতে পারছেন না। যদিও দুপুরের আগে মোমিনপুর থেকে এখানে পৌঁছনো সম্ভব নয়। তবুও তিনি থানার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে দেখছেন। আবার নিজের টেবিলের কাছে ফিরে আসছেন। এবার এসে শুনলেন, ফোনটা বাজছে। তিনি গিয়ে ফোনটা ধরতেই ওদিক থেকে বন্দনার কণ্ঠস্বর শুনলেন। বন্দনা প্রশ্ন করল, ‘ফোন করতে বলেছ কেন?’

নীরেনবাবু উত্তর দেওয়ার আগে পালটা প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার ধারেকাছে কনক নেই তো?’

বন্দনা উত্তর দিলেন, ‘না, নেই। কিন্তু কেন?’

নীরেনবাবু বললেন, ‘যা বলছি সেটা আমি বলতে চাইনি। কিন্তু বলতে হচ্ছে। মোমিনপুরের দারোগাবাবু মি. সামন্ত আমার থানায় আসছেন। সঙ্গে একজন মহিলা। আমার অনুমান সেই মহিলাই শিউলির প্রকৃত মা।'

‘সে কী!’ বন্দনার গলা থেকে একটা চাপা আর্তনাদ বেরোল।

নীরেনবাবু ফোন রেখে দিলেন। ভাবলেন, বন্দনাকে বলে দিলে হত সে যেন কনককে কিছু না বলে। নিজেই মনে মনে বললেন, ‘অত বোকা বন্দনা নয়। এসব ব্যাপারে মেয়েরা, বিশেষ করে মায়েরা বেশি বুদ্ধিমতী হয়।'

কথায় বলে প্রতীক্ষার প্রহর খুব দীর্ঘ হয়। নীরেনবাবু বারেবারে ঘড়ি দেখছেন আর মনে মনে ভাবছেন, না এখনও সময় হয়নি। আর দু’টি নারীর মনের মধ্যে দু’রকম দ্বন্দ্ব শুরু হবে। দু’জনেই মা। একজন হারানো শিশুকে ফিরে পাওয়ার আশায় ছুটে আসছে, আর-একজন শিশুটিকে ঘটনাচক্রে পেয়ে গিয়ে বুক দিয়ে আগলে রাখছে। থানার দারোগা হিসেবে তাঁকে নিরপেক্ষ থাকতেই হবে। দু’বার বাড়ি থেকে তাগাদা এসেছে খেয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু নীরেনবাবু যাননি। তিনি জানেন, এবার বন্দনার ফোন আসবে, তারপর কনক। কিন্তু থানা ছেড়ে এখন আর তাঁর কোথাও যাওয়া চলে না। থানার বাইরে ঝকঝকে রোদ। থেকে থেকে দমকা বাতাসে গাছের শুকনো পাতা, ধুলো আর ছেঁড়া-ফাটা শালপাতা উড়ে যাচ্ছে। ঘড়ির কাঁটা এখন সময়ের কাছাকাছি। কত দেরি করবেন সামন্ত? থানার বারান্দা থেকে নিজের ঘরের দিকে হেঁটে যেতে যেতে শুনলেন, তাঁর টেলিফোনটা বাজছে। তিনি ফোনটা ধরতে যাওয়ার আগেই তাঁর থানার আঙিনায় একটা গাড়ি ঢুকল। ফোনটা না ধরে এগিয়ে এলেন বারান্দায়। পিছনের দরজা থেকে সামন্তবাবু নামলেন। তাঁর হাতে একটা ফাইল। এবার নামলেন একজন মহিলা। কিন্তু মহিলা তো বিধবা। বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। সামন্তসাহেবের পিছন পিছন সেই মহিলাও বারান্দায় উঠে এল। নীরেন ব্যানার্জি সামন্তবাবুকে বললেন, ‘আসুন, আসুন।'

নীরেনবাবু ওই মহিলার দিকে তাকাতেই সামন্তবাবু বললেন, ‘ইনিই আসল লোক।' নীরেনবাবু মহিলার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। এবার দৃষ্টি সরিয়ে সামন্তবাবুকে বললেন, ‘সুধা গুপ্ত?’

এবার ওই মহিলা বলল, ‘আজ্ঞে না। আমার নাম সুধা গুপ্ত নয়। ওটি আমার বড়মা, আমার মালকিনের নাম। আমার নাম রাধা দাস।

নীরেনবাবু সামন্তবাবুর দিকে তাকালেন। সামন্তবাবু বললেন, ‘ওঁর মুখ থেকেই সব শুনুন।'

নীরেনবাবু মহিলার দিকে তাকালেন। ভাল করে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার ডান হাতের কনুইয়ের কাছে ব্যান্ডেজ কেন?’

রাধা উত্তর দিল, ‘গুলি লেগেছিল। আমি আপনার কাছে যা যা বলব সবই আমার জীবনে ঘটেছিল।'

নীরেন ব্যানার্জি বললেন, ‘বেশ বলুন।'

রাধা একবার শাড়ির আঁচলে মুখ মুছে বলতে শুরু করল, ‘গুপ্ত পরিবার বেশ বড় পরিবার এবং ধনী পরিবার। ওঁদের আদি নিবাস মুর্শিদাবাদে। তখন থেকেই নাকি ওঁদের বাড়বাড়ন্ত অবস্থা। ওঁরা মানে বর্গী হাঙ্গামার সময় দক্ষিণডাঙায় চলে আসেন। টাকার অভাব ছিল না, তাই দক্ষিণডাঙায় বিস্তর জমি কেনেন। তার পাশে শীতলপুর। সেখানকার জমি কেনেন। কাচকল তৈরি করেন। আরও নানারকম ব্যাবসাপত্তর। অর্থই অনর্থের মূল। বড়বাবু মানে এস গুপ্ত, যাঁর পুরো নাম সুধাংশু গুপ্ত। তিনি পক্ষাঘাতে পঙ্গু হওয়ার আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলেন। পক্ষাঘাতে পঙ্গু হওয়ার পর কলকাতার বাড়িতে বসে তিনি উইল করে যান তাঁর সমস্ত সম্পত্তি মৃত্যুর পর পাবে— একমাত্র নাতি কুমারজিৎ। তখন কুমারজিতের বয়স দশ বছর। কুমারজিৎ পাবে এক অংশ, বাকি অংশ পাবে আমার ছোট মেয়ে কুসুমের ঘরে যদি কোনও কন্যাসন্তান জন্মায়। অন্যরা মাসিক দু’ হাজার টাকা করে মাসোহারা পাবে এবং দক্ষিণডাঙা ও শীতলপুরে আমাদের বাড়িতে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা তাদের জন্য থাকবে।

এই বাড়িতে রাধা ও তার স্বামী বিনা ভাড়ায় অন্য শরিকদের মতো থাকতে পারবে। খেতে পারবে। মুর্শিদাবাদের সমস্ত বিষয় সম্পত্তি আমি আগেই দানপত্র করে একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে দিয়েছি। আট মার্চ সকালে উইলটি উকিলবাবু পড়ে শোনান এবং উইল নিয়ে চলে যান। সেইদিন দুপুরেই হঠাৎ করে বড়বাবু মারা যান। সন্ধ্যার আগেই কাদের ষড়যন্ত্র কে জানে, শুরু হয় গণ্ডগোল। এক কোপে বড়বাবুর একমাত্র নাতি কুমারজিতের গলা কেটে ফেলা হয়। গুলি করে মারা হয় কুমারজিতের বাবা ও মাকে। তারপর সারা বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আগের দিন অর্থাৎ সাত মার্চ কুসুমদিদির একটি মেয়ে হয়। গোটা ঘরবাড়ি আগুনে জ্বলছে। কুসুমদিদি আমায় বলে, 'আমার বাঁচার আশা নেই। তুই মেয়েটাকে বাঁচা।’ আমি একটা সাদা তোয়ালেয় মেয়েটাকে জড়িয়ে এনে আমার স্বামীর হাতে দিয়ে বলি, তুমি যেভাবে পার এই মেয়েটাকে বাঁচাও। আমার স্বামী আমার হাত থেকে তোয়ালে জড়ানো শিশুটিকে নিতে নিতে বলেছিল, আমি যদি বাঁচি, তবে এই মেয়েও বাঁচবে। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। তিনি নিজেই বাঁচলেন না। মেয়েটিকে নিয়ে সম্ভবত দূরে কোথাও পালাতে চেয়েছিলেন। কংসের অনুচরের মতো সব জায়গায় ওরা ছড়িয়ে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত কোথাও মেয়েটিকে রাখতে পেরেছিলেন কিনা জানি না। জানবার কোনও উপায়ও নেই। চার দিন পর আমার স্বামীর দেহ পাওয়া গিয়েছিল মোমিনপুরের এক বাঁশবাগানে।'

নীরেন ব্যানার্জি বললেন, ‘মেয়েটির আসল মা অর্থাৎ কুসুমদেবী কি...

নীরেনবাবুর কথা শেষ হওয়ার আগেই রাধা বলল, ‘না, ছোট দিদিমণি আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছে। বড়বাবুর পরিবারে কেউ বেঁচে নেই। জ্ঞাতিদের মধ্যে কেউ কেউ ওই দিনই মরেছেন আর কেউ কেউ জেলে আছেন। কিন্তু কুসুমদিদির মেয়েটির কোনও খবর নেই। মনে হয় সেও বেঁচে নেই।'

নীরেন ব্যানার্জি সামন্তবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘থ্যাংক গড! কে বলে ভগবান নেই? রাধাদেবী, আপনি কি সেই মেয়েটিকে দেখতে চান। দেখতে পেলে চিনতে পারবেন?’ রাধা বলল, ‘অবশ্যই পারব। ওই মেয়ের নাভির নীচে ছোট্ট একটু জডুল। জন্ম থেকেই।'

নীরেন ব্যানার্জি বললেন, ‘আসুন আমার সঙ্গে। সামন্তবাবু, প্লিজ কাম।'

দরজা খোলবার আগে বন্দনা স্বামীকে বললেন, 'আমার মেয়ের কোল খালি করতে এসেছ।'

নীরেন ব্যানার্জি বললেন, ‘প্রশ্নটা রাধাদেবীকে করো।’

রাধা বলল, ‘না, কোল পূর্ণ করতে এসেছি।'

ঘরে ঢুকে সবাই দেখল, কনক চাদরে ঢাকা ঘুমন্ত মেয়েটিকে পক্ষী-মা যেমন তার ছানাকে আগলে রাখে তেমন করেই আগলে রেখেছে। রাধা ইঙ্গিত করতেই নীরেনবাবু শিউলির গায়ের চাদরটা সরাতেই সবাই দেখল নাভির নীচে ছোট্ট একটা জডুল।'

কনক আর বন্দনার চোখে একটা আশঙ্কা তির তির করে কাঁপছে।

রাধা সারা মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘যাক, আমি আর আমার স্বামী কথা রাখতে পেরেছি। এই মেয়ে আজ থেকে আপনাদের। কেউ কখনও দাবি করতে পারবে না।'

নীরেন ব্যানার্জি এগিয়ে এসে বললেন, ‘রাধাদেবী, ওর মায়ের অভাব মিটেছে। এবার যে আমাকে একটি ভিক্ষে দিতে হবে। আমার যে একজন ধাই-মা চাই। আপনি ছাড়া কাউকে দিয়ে সে অভাব পূর্ণ হওয়ার কথা নয়।'

রাধা শিউলির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওকে দেখার পর আমিই কি ছেড়ে যেতে পারতাম। আপনারা যত তাড়াতাড়ি পারেন সেই উকিলবাবুর সঙ্গে দেখা করুন। তাঁর ঠিকানা আমার কাছে আছে।'

নীরেন ব্যানার্জির মুখে হাসি ফুটল। তিনি হুকুম দেওয়ার মতো করে বললেন, ‘এক্ষুনি হাবিলদার পাঠিয়ে বনমালী ঘাটা অ্যান্ড নবকুমার আটাকে ধরে নিয়ে এসো। ওরাই তো আসল লোক।'

.

আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী, ১৪১৫

অধ্যায় ৩২ / ৩২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%