দুলেন্দ্র ভৌমিক

গদাইকে চেনে না এমন মানুষ রাধানগরে নেই। এই চেনাচেনির ব্যাপারটা গদাইয়ের ক্ষেত্রে দু’রকম। কেউ কেউ তাকে চাক্ষুষ চেনে, কেউ কেউ চেনে স্রেফ নামে। গদাইয়ের ভাল নাম গদাধর ঘোষ। ছেলেবেলায় গদাইয়ের নাম জিজ্ঞেস করলে গদাই বলত, ‘শ্রীমান গদাধর ঘোষ এবং গদাই।’ ডাকনামটাও আসল নামের সঙ্গে গদাধর জুড়ে দিত। তবে রাধানগরের লোকজনরা গদাধর না বলে গদাই বলতেই বেশি অভ্যস্ত ছিল। গদাই হরেকরকম কাজ জানত। নিতান্ত দায়ে পড়ে এইসব তাকে জানতে হয়েছে। গদাইয়ের বাবা যখন মারা যান তখন গদাইয়ের বয়স মোটে দশ বছর। তিন ভাইয়ের মধ্যে গদাই ছিল সবার ছোট আর গদাইয়ের নীচে ছিল এক বোন। সেই বোনের নাম বুড়ি। ভাল নাম পূর্ণিমা, ডাকনাম বুড়ি। ওকেও পূর্ণিমা নামে কেউ বিশেষ ডাকত না, সবাই ডাকত বুড়ি বলে। গদাইয়ের বড়দা বিয়ে-থা করে কিছুদিন এই বাড়িতে ছিল। বড়জোর বছরখানেক। তারপর মগরার দিকে কোথায় যেন চাকরি জুটিয়ে চলে গেছে। গদাই লোকমুখে শুনেছে ওর বড়দা নাকি বালির খাদে কাজ করে আর শ্বশুরবাড়িতে থাকে। রাধানগরে আসেই না। আগে বছরে একটা চিঠি দিত, এখন তাও দেয় না। মেজো ভাই নিত্যানন্দ অর্থাৎ নিতাই হঠাৎ দিনকয়েকের জন্য বেপাত্তা হয়ে গিয়েছিল কিন্তু ওই দিনকয়েক পরে নিতাই ফিরে এল একেবারে অন্য বেশে। ন্যাড়া মাথা, গায়ে গেরুয়া পোশাক, হাতে লাঠি। নিতাইকে দেখে তার মা প্রথমে অবাক, তারপর ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, ‘তোর এই হাল কে করল বাবা। আমি থাকতেই মাথা
কামালি?’
নিতাই ডান হাত তুলে আশীর্বাদ করার ভঙ্গিতে নিজের মাকে বলল, ‘বৎসে, আমি এখন আর কারও সন্তান নই। আমি সন্ন্যাসী। হিমালয় আমাকে ডাকছে।'
মা তো ছেলের এইসব কথা শুনে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। তাতে আশপাশের বাড়ির লোক ছুটে এল। নিতাইকে ওই পোশাকে দেখে কেউ কেউ প্রণাম করে, কেউ-বা অবাক হয়, কেউ-বা গায়ে ধাক্কা দিয়ে বলে, ‘হ্যাঁ রে নিতাই, তুই কবে থেকে সন্ন্যাস নিলি, দিন দশেক আগেও তো তোকে বেলডাঙার মোড়ে আলুর চপ খেতে দেখলুম। সঙ্গে মুড়িও খাচ্ছিলি।'
নিতাই বলে, ‘শাস্ত্রে সন্ন্যাসীর আলুর চপ আর মুড়ি খাওয়া নিষেধ নয়। ওইদিনই ছিল আমার গৃহী-জীবনের শেষদিন। এখন পুরোপুরি সন্ন্যাসী। আমার নাম আর নিতাই নয়। রাধানগরের নিতাইয়ের মৃত্যু হয়েছে। এখন আমার নাম বাবা ১১০ অমৃতানন্দ।'
নিতাইয়ের মা আঁচলে চোখের জল মুছে কাতরভাবে জিজ্ঞেস করল, ‘তুই কি আর আসবি না? তোকে চিঠিপত্র দিলে কোন ঠিকানায় দেব?’
নিতাই মিষ্টি করে হাসল। তারপর হাসি হাসি মুখেই বলল, ‘বৎসে, এ বড় কঠিন আবেদন। হিমালয়ের আহ্বানে ছুটে চলেছি। কখন কোথায় কোন শৃঙ্গে বিরাজ করব তা তো জানি না। তোমার ডাকপিয়ন তো চিঠি পৌঁছে দেওয়ার জন্য হিমালয়ের শৃঙ্গে উঠবে না। অতএব, চিন্তা কোরো না। আমি যোগবলে সবই জানতে পারব।'
এরপর গদাইয়ের দিকে তাকিয়ে তার মাথায় হাত রেখে নিতাই বলে উঠল, ‘বালক, ভয় কোরো না। জগতের কল্যাণের জন্য নিজেকে সমর্পণ করতে শেখো। জয় মা ভবানী।' ওং-ট্রং হিং এইরকম সব কঠিন কঠিন শব্দ আওড়াতে আওড়াতে নিতাই চলে গেল। পাড়ার অনেকেই তার পিছু পিছু গেল। গদাই আর তার বোন বুড়িও অনেকটা পথ ছুটতে ছুটতে গিয়েছিল। কিন্তু ট্রেনে উঠে পড়ার পর আর ছুটতে পারল না। বাড়ি ফিরে আসতে আসতে বুড়ি জিজ্ঞেস করেছিল, ‘ছোড়দা, মেজদা কি আর কখনও ফিরবে না?’
বাঁ হাতে চোখের জল মুছে গদাই উত্তর দিয়েছিল, ‘জানি না।’
অতএব, সংসারের দায়-দায়িত্ব ওই পনেরো বছর বয়স থেকেই গদাইয়ের কাঁধে চাপল এবং লেখাপড়াও বন্ধ হল। পনেরো বছরের গদাইয়ের মাথায় তখন কেবল একটা চিন্তা বোলতার মতো ঘুরতে শুরু করল, মা আর বুড়িকে নিয়ে তাদের যে সংসার সেটা কেমন করে চলবে? বুড়িরও কি পড়াশোনা বন্ধ হবে? সবাই কি না খেয়ে মরবে? এইরকম চিন্তা থেকেই তার মধ্যে জেদ এল। গদাই মাকে খুব ভালবাসত। মা যেদিন গদাইয়ের পিঠে হাত রেখে বলল, ‘আমার ভাবনা কী, তুই তো আছিস।' সেদিন থেকে গদাইয়ের জেদটা প্রবল হয়ে উঠল।
কিন্তু জেদ প্রবল হলেই তো হাতের নাগালে রোজগারের ব্যবস্থা এসে যায় না। মাঝদুপুরে গোটা রাধানগর যখন ঝিম ধরে থাকে, বাঁশবনের দিক থেকে শনশন হাওয়া বয়, গঞ্জের খালে টালি আর ইট বোঝাই নৌকোগুলো ধীরে ধীরে এগুতে থাকে তখন গদাই উদভ্রান্তের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে থাকে। এমন একটা কাজের কথা সে ভাবতে থাকে, যে কাজটা সে করতে পারবে এবং জোটাতে পারবে। কিন্তু তেমন কাজ এ গাঁয়ে কোথায়? কেউ কেউ গদাইকে ডেকে বলে, ‘হ্যাঁরে গদাই, তোর মা আর বোনটাকে তো লোকের বাড়িতে কাজে লাগিয়ে দিতে পারিস। রান্নার কাজ করলে খাওয়া আর মাইনে পাবে। এদিকে তো বাড়িতে কাজের লোকের অভাব।'
গদাই এসব শোনে আর দাঁত চেপে সহ্য করে। কিন্তু একদিন গদাই আর সহ্য করতে পারল না। ঝড়ের বেগে নিজের বাড়িতে ছুটতে ছুটতে এসে ডাকল, ‘মা, ও মা?’ মা বেরিয়ে এসে বলল, 'কী হয়েছে? অমন গলা ছেড়ে ডাকছিস কেন?’
গদাই বলল, ‘তুমি নাকি দাসবাবুদের বাড়িতে রান্নার কাজ নিয়েছ?'
মা বলল, ‘এখনও পাকা কথা বলিনি। তবে নিলে ক্ষতি কী? কিছুটা তো সুরাহা হবে।' গদাই মায়ের হাতটা টেনে নিয়ে নিজের মাথায় রেখে বলল, ‘না, তুমি নেবে না। আমার মাথায় হাত রেখে বলো তুমি নেবে না। আমি বেঁচে থাকতে তুমি যাবে রোজগার করতে!’ এরপর আর মা কী করবে! তার চোখে জল এলেও প্রাণে বড় তৃপ্তি এল। এমন তৃপ্তি আগে কখনও আসেনি।
এই ঘটনার দিন সাতেকের মধ্যে গদাই দুটো কাজ জুটিয়ে ফেলল। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে চলে যেত কেষ্টদার বাড়িতে। সেখান থেকে সাইকেল নিয়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরের স্টেশনে। স্টেশন থেকে কাগজ নিয়ে লোকের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া। দশটা-সাড়ে দশটার মধ্যে কাজ শেষ। তারপর বাড়ি এসে স্নান-খাওয়া শেষ করে আবার স্টেশনে। সেখান থেকে বড় একটা ব্যাগ নিয়ে গদাই উঠে পড়ত ট্রেনে। ওই ব্যাগে থাকত দাঁতের মাজন। একটা শিশি বিক্রি করলে তিরিশ পয়সা তার নিজের থাকত। অতএব, যত বেশি বোতল বিক্রি হবে তত তিরিশ পয়সা আসবে তার পকেটে। এই কাজটাও জুটেছিল কেষ্টদার দৌলতে। গদাই এমনিতে খুব ভাল কথা বলতে পারত। এই বিদ্যাটা ট্রেনে হকারি করার ক্ষেত্রে খুব কাজে দিয়েছিল তার। দুটোতে মিলে মোটামুটি রোজগার বেড়ে যাচ্ছিল গদাইয়ের।
কেউ কেউ বিশ্বাস করত এসবের মূলে গদাই নয়, গদাইয়ের সন্ন্যাসী দাদার আশীর্বাদ রয়েছে। যাওয়ার সময় গদাইয়ের মাথায় হাত রেখে যে মন্ত্রটা বলেছিল, সেটাই হল আসল। গদাই এসব কথা শুনত কিন্তু কিছু বলত না। তার মনে হত, এরকম হলেও হতে পারে। মন্ত্রের তো অনেকরকম জোর আছে। বছরখানেকের মধ্যেই ট্রেনের হকারদের মধ্যে গদাই বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠল। এখন দাঁতের মাজনের সঙ্গে আরও নানারকম জিনিসও সে বিক্রি করে। দু’-একটা জিনিস নিজেও তৈরি করে। এমন এমন জিনিস সে মাঝেমধ্যে বিক্রি করে, যা ট্রেনে তার আগে কেউ বিক্রি করেনি। শুধু করেনি নয়, করবার কথাও ভাবেনি। যেমন, বর্ষাকালে ট্রেনে সে বিক্রি করত ‘কুকিং কেক'। পুরনো খবরের কাগজে মোড়া একটা প্যাকেট। প্যাকেটের মধ্যে ছ’খানা করে ছোট সাইজের ঘুঁটে। যাঁরা ঘুঁটে দিয়ে উনুন ধরান, বর্ষাকালে তাঁদের সমস্যা হয়। ঘুঁটে পাওয়া খুব মুশকিল হয়। গদাই বর্ষা নামবার আগে বস্তা কয়েক ঘুঁটে শস্তায় কিনে নিত। তারপর কাগজে প্যাকেট করে ‘কুকিং কেক’ নাম দিয়ে ট্রেনে বেচত। ট্রেনে উঠে বলতে শুরু করত এইভাবে, ‘মাননীয় ভদ্রমহোদয় এবং আমার মা-বোনেরা, আপনারা সারাদিনের পর ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। সবাই বাড়ি ফেরে শান্তির জন্য। কিন্তু সেই শান্তি কি এই বাজারে সবসময় পাবেন? অশান্তি শুরু হয় ছোট ছোট ঘটনা থেকে। মনে করুন, আপনি এই বর্ষায় ভালমন্দ বাজার করে ঘরে ফিরছেন। ভাবছেন একটু জমিয়ে খাবেন। কিন্তু আপনি কি জানেন আপনার বাড়িতে কোন সমস্যা তৈরি আছে? বর্ষাকালে সবচেয়ে বড় সমস্যা আমার, আপনার ঘরে। না, না, আমি কোনও রোগব্যাধির কথা বলছি না। বর্ষার সেরা উপহার ছাতা নয়। ছাতাতে মাথা বাঁচে, ক্ষুধা মেটে না। বর্ষার সেরা উপহার এই কুকিং কেক। এক প্যাকেটের দাম দু’ টাকা। প্যাকেট এখানে খুলবেন না, খুলতে দেবেন বউদিকে। দেখবেন তাঁর মুখ খুশিতে কেমন ঝলমলিয়ে ওঠে। বর্ষাকালে এই জিনিসটি সবসময় মেলে না। আর এটি না হলে খাবেন কী? উনুন জ্বললে তবে তো রান্না, আর রান্না হলে তবে গরম গরম খাওয়া। কুকিং কেক ছাড়া উনুন ধরাবেন কেমন করে?’
প্রথম প্রথম লোকে হাসাহাসি করলেও পরে দেখা গেল প্যাকেট করা ঘুঁটের চাহিদা ট্রেনে যেমন, তেমনই গদাইয়ের বাড়িতেও। গদাই বলে যেত, 'বুড়ি, এখন ঘুঁটে শুকোতে চার-পাঁচদিন লেগে যাচ্ছে। সবাই ঘুঁটের খোঁজে আসবে। তুই এখন থেকে আড়াই টাকা করে নিবি।’ পাড়ায় যারা ঘুঁটে বেচত তারা ভাবত, কেন আর পিঠে বস্তা নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরি, তার চাইতে বস্তাসুদ্ধু গদাইকে বেচে দিলেই তো ভাল হয়! অতএব, রাধানগরে প্রায় এক বছরের মধ্যেই গদাই ঘুঁটের ব্যাবসাটা নিজের ‘মনোপলি’ করে ফেলল। রাধানগরে কোনও বিয়ে, অন্নপ্রাশন, উপনয়ন বা শ্রাদ্ধে দশদিন আগে গদাইয়ের কাছে ঘুঁটের অর্ডার দিতে হত। সেইসঙ্গে অ্যাডভান্স। সবাই ভাবত কয়েক টাকা বেশি যাবে যাক, কিন্তু গদাইয়ের ‘কুকিং কেক’ ঠিক সময়ে পৌঁছে যাবে। গদাইয়ের কুকিং কেক কোয়ালিটির দিক থেকে ভাল। কোয়ালিটির ব্যাপারটা গদাই-ই সকলের মধ্যে প্রচার করেছে। গদাই বলেছে, ‘এমনি সাধারণ রান্নাবান্নায় গোবরের ঘুঁটেতেই কাজ চলে যায়। কিন্তু উৎসব-অনুষ্ঠানে স্রেফ গোবরের ঘুঁটেতে কাজ হয় না। ওই ঘুঁটের দম কম। ওখানে মিশেল দরকার। চা যেমন দু’রকম নিয়ে ঠিকভাবে মেশাতে হয়, ভাল ঘুঁটেও তাই। গোরু আর মোষ দুইয়ের মিশ্রণে অতি উৎকৃষ্ট কুকিং কেক তৈরি হয়। তাই আমার রেটটা একটু বেশি। কোয়ালিটি বুঝে দাম চাই।'
রাধানগরের সব বাড়িতেই তখন ঘুঁটের ব্যবহার হত। কিন্তু ঘুঁটেতে যে পাইল দিতে হয়, তাতে মিশ্রণ দরকার, এতসব তথ্য কেউ কোনওদিন শোনেনি, শোনবার আগ্রহও দেখায়নি। কিন্তু গদাইয়ের কথা শুনে সবাই মনে মনে বলে, ‘হতেও পারে। ছেলেটা তো ঘুঁটে নিয়ে গবেষণা করে। ওর ওই প্যাকেট করা কুকিং কেক নাকি বাক্সে প্যাক করে কলকাতার অনেক বাড়িতে যায়। গেল হপ্তায় নাকি আন্দামানের জাহাজে করে চোদ্দো হাজার কুকিং কেক ওখানে পাঠিয়েছে। গদাইয়ের এলেম আছে!'
অন্য একজন বলে, ‘এলেম কি এমনি এমনি আসছে? হিমালয়ের চূড়া থেকে ওর দাদা একশো দশ নাকি দুশো দশ অমৃতানন্দ এসব যোগবলে পাঠাচ্ছেন। গেল মাসে আমার ভায়রা দার্জিলিং বেড়াতে গিয়েছিল। আমি তাকে বলেছিলুম, ‘দেখো হে দার্জিলিং যখন যাচ্ছ তখন নিশ্চয়ই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে টাইগার হিলে যাবে। যদি যাও তা হলে একটা ছোট্ট রিকোয়েস্ট আছে।’ ভায়রা বললে, ‘কী রিকোয়েস্ট?’ আমি বললুম, ‘একটু নজর খাড়া করে কাঞ্চনজঙ্ঘার সাতটা পিক একটু দেখো। আমাদের রাধানগরের একটি ছেলে সন্ন্যাসী নিয়ে হিমালয়ে গেছে। গ্রীষ্মকালটা কাঞ্চনজঙ্ঘাতেই থাকবে বলে শুনেছি। যদি দেখতে পাও একটু চেঁচিয়ে বোলো, রাধানগরের সবাই ভাল আছে। আমি শ্যাম নন্দী তোমার খোঁজ করতে পাঠিয়েছি, এটাও কায়দা করে বলে দিয়ো। তা সেই ভায়রা ফিরে এসে বলল, ‘কী বলব নন্দীদা, একেবারে উঁচু পিকে একজন বসে আছেন। চেহারাটা স্পষ্ট নয়, তবে মানুষের আকৃতি। আমি চেঁচিয়ে আপনার কথাটা বলতে গিয়েছিলুম, পারলুম না। চিৎকার করছি দেখে এক সাহেব আমার মুখে মাঙ্কি ক্যাপটা এমনভাবে টেনে দিল যে, মুখটাই বন্ধ হয়ে গেল।' আমি বললুম, ‘ওতেই হবে। উনি তোমাকে ঠিক চিনে নিয়েছেন।’ তা এসব ব্যাপার তো একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়।'
গদাইয়ের ব্যাবসা বাড়ে আর রাধানগরে গদাইকে নিয়ে আলোচনাও বাড়ে। ইতিমধ্যে গদাই কাগজ দেওয়ার একটা লাইন কিনে ফেলল। লাইন কেনা ব্যাপারটা হল, রাধানগরে যে এজেন্ট মানে যার নামে কলকাতা থেকে কাগজ আসে, সে সেই কাগজগুলো তার হকারদের দিয়ে বিলি করে। রাধানগরে অনেক অঞ্চল, অনেক লোক। এর মধ্যে একটা অঞ্চলের নাম বাদামতলা। বাদামতলায় হয়তো আটশো বাড়ি আছে। তার তিনশো বাড়িতে কাগজ নেয়। এজেন্টের কাছে এটার নাম হল বাদামতলা লাইন। বাদামতলা লাইনটা কেষ্ট মিত্তির বিক্রি করে দিল গদাইকে। নগদ পয়সায় সেটা কিনে নিতেই গদাই হয়ে গেল কেষ্ট মিত্তিরের সাব এজেন্ট। বাদামতলায় সাইকেল করে যারা কাগজ দিত তারা তখন গদাইয়ের কর্মচারী। এতে রোজগার বেড়ে গেল গদাইয়ের। একটু একটু করে ধাপে মাত্র তিন বছরের মধ্যে গদাই তার অবস্থা অনেকটা ফিরিয়ে ফেলল। কিন্তু এর জন্য তার পরিশ্রম কিছুমাত্র কমেনি। সকালে ঘুম থেকে উঠে স্টেশনে যাওয়া, কাগজ নিয়ে হকারদের মধ্যে বিলি করা এবং নিজে কাগজ আর কুকিং কেক নিয়ে ভোরবেলা বাড়ি বাড়ি যাওয়ার অভ্যাসটি আগের মতোই বজায় রেখেছে।
রাধানগরের কেউ কেউ মনে করে গদাই খুব টাকা কামাচ্ছে। কিন্তু গদাই জানে সকলকে দিয়েথুয়ে তার হাতে যা আসে তাতে দু’ বেলার খাওয়া-পরা কোনওমতে হয়ে যায়। বোনের পড়ার খরচ, সংসারের অন্যান্য দায় মেটাতে গিয়ে তার হাতে সঞ্চয় বিশেষ কিছু থাকে না। গদাই ভাবে তার মা জীবনে সুখভোগ করার সুযোগ পায়নি। বাবা সামান্য চাকরি করত। মাসের কুড়ি তারিখের পর থেকেই অন্নচিন্তা প্রবল হয়ে উঠত। তাই সে চায়, অন্য আর দশজন বাবুদের বাড়িতে তাদের মায়েরা যেমন থাকে, তার মা-ও তেমনই থাকুক। কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে গদাই মাকে তেমনভাবেই রাখে, রাখতে চায়। এতেই গদাইয়ের সুখ, এতেই গদাইয়ের আনন্দ। এই আনন্দের অনুভূতি গদাই কাউকে বোঝাতে পারে না, বোঝাতে চায় না। সকালবেলা সাইকেল চালাতে চালাতে যখন তার পায়ে ব্যথা বাড়তে থাকে কিংবা চলন্ত ট্রেনের এক কামরা থেকে অন্য কামরায় ঝুলে ঝুলে যেতে থাকে তখন সে শুধু তার মায়ের মুখটা মনে করে। আশ্চর্য, ওই মুখ তাকে শক্তি দেয়, সাহস জোগায়। শরীরের সব ক্লান্তি আস্তে আস্তে শুষে নেয়। একদিন একটা ঘটনা ঘটল। সেই ঘটনার পর থেকে তার বিশ্বাসটা আরও বেড়ে গেছে। সেটা ছিল মার্চ মাসের গোড়ার দিক। ফাল্গুনের বাতাস বিকেলের দিকে গায়ে এসে লুটিয়ে পড়ে। ভোরবেলা রাধানগরের গাছে গাছে কোকিল ডাকে। গঞ্জের খালে জল কমে আসছে। টালির নৌকোগুলি জোয়ারের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে। রাধানগর থেকে জুঁই ফুল ঝুড়ি বোঝাই হয়ে কলকাতায় যায়। এইরকমই একটা সময়ে দোলের আগে গদাই ট্রেনে উঠল ভ্যানিশিং রং বিক্রি করতে। কোম্পানি থেকে কেনা জিনিস। পিচকিরি করে গায়ে লাল, হলুদ, সবুজ অথবা বেগুনি রং দিয়ে যাও, রঙটা জামার ওপর চেপে বসবে। এবার জামাটা যত শুকোতে থাকবে ততই রঙটা উবে যাবে। মাত্র পনেরো মিনিটের মধ্যে সাদা জামা আবার সেই আগের মতো সাদা হয়ে যাবে। গদাই তো সেই রং নিয়ে উঠল ট্রেনে। অনেকক্ষণ লেকচার দিল। ট্রেনটা যাচ্ছিল রাধানগর থেকে হাওড়ায়। মাঝ স্টেশন থেকে উঠল একজন যুবক, সঙ্গে দু’জন যুবতি। গদাই অনুমানে বুঝল স্বামী-স্ত্রী আর শ্যালিকা। যুবকটি সাদা পাঞ্জাবি আর ধুতি পরেছে। গদাই তাদের সামনে গিয়ে ভ্যানিশিং রঙের মাহাত্ম্য বোঝাতে লাগল। মেয়েটি বলল, ‘জামাইবাবু, এক প্যাকেট কিনুন।'
জামাইবাবু খরচের ভয়ে আর কথা কয় না। কিন্তু শ্যালিকা তো নাছোড়বান্দা। একটু পরে যুবকটি বলল, “ঠিক ঠিক ভ্যানিশ হবে তো? তা না হলে তোমাকে ভ্যানিশ করে দেব।'
গদাই আকৰ্ণবিস্তৃত হাসি বলতে যেমন বোঝায় সেইরকম হাসি হেসে বলল, ‘মাত্র দশ থেকে পনেরো মিনিট সময় দেবেন স্যার। তার মধ্যেই রং ভ্যানিশ। ভ্যানিশ করার এমন কায়দা স্বয়ং পি সি সরকারও পারতেন না। যদি সংশয় থাকে তবে পরীক্ষা প্রার্থনীয়।’
সঙ্গে সঙ্গে শ্যালিকাটি বলে উঠল, ‘দিন তো জামাইবাবুর গায়ে। সাদা পাঞ্জাবিতে ভাল ফুটবে। দেখি কেমন ভ্যানিশ হয়!’
গদাই সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগ থেকে রঙের পিচকিরি আর গোলা রং বের করল। ওটা ছিল স্যাম্পেল ফাইল। পিচকিরি থেকে রং বের করতেই সাদা পাঞ্জাবি লাল হয়ে গেল। গদাই পিচকিরি হাতে নিয়ে বলল, ‘মাত্র দুটো স্টেশন যেতে দিন। দেখবেন রঙের খেলা।’ ট্রেনের যাত্রীদের মধ্যে আরও দু’-একজন ইচ্ছে প্রকাশ করতেই গদাই তাদেরও রং দিয়ে দিল। এবার পটাপট প্যাকেট বিক্রি হতে শুরু করল। যাঁরা কিনলেন তাঁরা ভাবলেন, রং যদি না-ই ভ্যানিশ হবে, তা হলে হকার লোকভরতি কামরায় সেটা পরীক্ষা করে দেখাবে কেন? অতএব, নিশ্চিন্তে কেনা যায়। অনেকেই কিনে নিল। কিন্তু এদিকে দুটো স্টেশন পেরিয়ে গিয়ে জামা শুকিয়ে গেল অথচ রং ভ্যানিশ হওয়ার লক্ষণ নেই। ব্যাপারটা গদাই প্রথমে বুঝল। এবার স্যাম্পেল ফাইলটা দেখতে গিয়ে সে চমকে উঠল। সে ভুল করে মহাজনের কাছ থেকে যে স্যাম্পেল ফাইলটা এনেছে, সেটা আদৌ ভ্যানিশিং রং নয়, ওটা এমনি রং। ওই প্যাকেটের গায়ে লেখা, ‘এই রং ফেভিকলের মতো। একবার লাগলে সহজে ওঠে না।’ অথচ দুটো প্যাকেট দেখতে একইরকম। সে ভুল করে অন্যটা নিয়ে এসেছে। অতএব, এই রং, যা যাত্রীদের গায়ে দেওয়া হয়েছে সেটা দুটো স্টেশন তো দূরের কথা, বাড়িতে গেলেও উঠবে না। চলন্ত ট্রেনে পালাবার উপায় নেই। দুটোর জায়গায় তিনটে স্টেশন পেরিয়ে এখন চতুর্থ স্টেশন আসছে। যাদের গায়ে রং তারা বলতে শুরু করেছে, ‘কী হল, দশ মিনিটের জায়গায় পঁচিশ মিনিট হতে চলল। রং ভ্যানিশ হল কই?’
গদাই জানে, নার্ভাস হলে চলবে না। তাই বলল, ‘ঘাবড়াবেন না। আমি তো আছি। সামনের স্টেশনটা থেকে গাড়ি ছাড়ার পরই রং উধাও। আমি ওইদিকে বিক্রি করছি, রং উধাও হলেও আপনারা জোরে জোরে হাততালি দেবেন। আমি আপনাদের পাশেই আছি।' গদাই কামরার অন্যদিকে এল। এদিক ওদিক তাকিয়ে দরজা দিয়ে দু’পাশে তাকাল। ট্রেনটা হু হু গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। গদাই দরজার হ্যান্ডেল ধরে পাশের কামরার জানলার শিক ধরল। ওই জানলার শিক ধরে পাশের দরজা ধরতে পারলেই অন্য কামরায় চলে যাওয়া যাবে। কিন্তু দরজায় হাওয়া খাওয়ার জন্য ঠাসাঠাসি লোক। কাঁধে বড় ব্যাগ। তবুও ডান হাতটা বাড়াল। দূরে সামনের স্টেশনের ডিসট্যান্ট সিগন্যাল পোস্ট দেখা যাচ্ছে। হাত ঠিকমতো পৌঁছচ্ছে না, শুধু দু’ আঙুলে একটা অবলম্বন খুঁজে পেল। ঠিক তখনই গাড়ির ছাতের ওপর থেকে গড়িয়ে পড়তে লাগল বড় বড় চালের বস্তা। একটা বস্তা পড়ল গদাইয়ের হাতের ওপর। চলন্ত ট্রেন থেকে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে গদাই পড়ে যাচ্ছে নীচে। গদাই শুধু নিজের মায়ের মুখটা মনে করে বলে উঠল, ‘মা, চলে যাচ্ছি।’ গদাই পড়ল লাইনের পাশে। হাওয়া টানছে গদাইকে। গদাই নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে লাইনের পাশে। ট্রেনের চাকার শব্দ। লোকজনের আর্ত চিৎকার আর তার মধ্যেই জ্ঞান হারাল গদাই।

গদাইয়ের যখন জ্ঞান ফিরল, তখন সে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে। প্রথমে কিছু মনে পড়ল না। একটু পরে আস্তে আস্তে সব কথা তার মনে পড়তে লাগল। ডাক্তারবাবু এসে বললেন, “তুমি যে বেঁচে গেছ এটাই খুব আশ্চর্যের ব্যাপার! এরকমভাবে কাউকে বাঁচতে শুনিনি। তোমার বাঁ হাতটা ভেঙেছে আর শরীরের দু'-তিন জায়গায় চোট। এসব কিছুই না। অন্তত মৃত্যুর তুলনায়।'
গদাই দু’দিন পর হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে এল। বাড়িতে আরও কয়েকদিন থেকে শরীর সারিয়ে যেদিন কাজে বের হবে সেইদিনই বিপত্তি ঘটল। মা সামনে এসে দাঁড়াল। বলল, ‘গদাই, আমি বেঁচে থাকতে তুই ট্রেনে ট্রেনে জিনিস বেচার কাজ করতে পারবি না। এ যাত্রা ঠাকুর বাঁচিয়েছেন। এরপর কী হবে?’
গদাই উত্তর দেয়, ‘আমার ঠাকুর তো তুমি। তুমিই বাঁচিয়েছ। হাতটা খসে গিয়ে যখন নীচে পড়ে যাচ্ছি তখন তোমাকেই ডেকেছিলাম।'
মা বললেন, ‘ওসব কথা থাক। দু’বেলার জায়গায় একবেলা খাব। তবু তোকে খোয়াতে পারব না। তুই চলে গেলে আমরা কী নিয়ে বাঁচব! তোকে আজ কথা দিতে হবে, তুই আর ট্রেনে কাজ করবি না।'
সেদিন থেকে ট্রেনের হকারি বন্ধ করে দিল গদাই। বেচবার জিনিস স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে আর লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বেচে। মাকে অগ্রাহ্য করতে পারে না গদাই। কিন্তু এতে বিক্রি আগের মতো হয় না। সংসারে টান পড়ে। বাজারে জিনিসপত্রের দাম যেমনভাবে খেপে খেপে বেড়ে যায়, গদাইয়ের রোজগার তেমনভাবে বাড়ে না। গদাই রোজগার বাড়াবার জন্য কেবলই ভাবতে থাকে।
একদিন কেষ্টদা গদাইকে বলল, ‘তুই কত বছর থেকে সাইকেল চালাচ্ছিস?'
গদাই একটু ভেবে নিয়ে উত্তর দিল, ‘সে ধরো, প্রায় দশ বছর বয়স থেকে। তখন সিটে
বসলে প্যাডেল অব্দি পা যেত না। তাই সিটে না বসে হাফ প্যাডেল করে চালাতাম।' কেষ্টদা বলল, ‘সে ঠিক আছে। ছেলেবেলায় সবাই তাই করে। তুই একনাগাড়ে কতক্ষণ সাইকেল চালাতে পারিস?’
গদাই ভাবতে ভাবতে বলল, ‘কখনও তো হিসেব করে দেখিনি! তবে একনাগাড়ে আট থেকে দশ মাইল দিব্যি চালাতে পারব।'
এবার কেষ্টদা ভাবতে লাগল। বেতের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বার-দুই পায়চারি করে বলল, ‘এখনও দিনসাতেক সময় আছে। দুই একনাগাড়ে সাইকেল চালানো প্র্যাকটিস কর। রাধানগরের খেলার মাঠেই আরম্ভ কর।'
গদাই তো কেষ্টদার কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, ‘প্র্যাকটিস না হয় করব। কিন্তু তাতে কী হবে?’
কেষ্টদা বলল, ‘চণ্ডীতলায় অবিরাম সাইকেল চালানো প্রতিযোগিতা হবে। প্রথম পুরস্কার এক হাজার টাকা। তুই লেগে যা। প্রাইজ পাস বা না পাস একটা অভিজ্ঞতা তো হবে। আর যদি পেয়ে যাস...’
কেষ্টদার কথা শেষ হওয়ার আগেই গদাই বলে উঠল, ‘আমার খুব কাজে লাগবে। বুড়ির বই কেনার টাকা এখনও জোগাড় হয়নি।'
কেষ্টদা বলল, ‘তুই প্র্যাকটিস শুরু কর। চণ্ডীতলার মাঠে গোল হয়ে অবিরাম সাইকেল চালাতে হবে। প্র্যাকটিসের সময়ও তুই সেইভাবেই প্র্যাকটিস করবি। একসঙ্গে লম্বা রান দিতে হবে না। দেখিসনি, চড়কের মেলায় এরকম সাইকেল চালানোর খেলা দেখানো হয়। চালকের গায়ে সেফটিপিন দিয়ে পাঁচ টাকা দশ টাকার নোট লাগানো থাকে। ওগুলো হল দর্শকদের বকশিস। ওরা সাইকেল চালাতে চালাতেই খায়। জামা-প্যান্ট বদলায়। দেখিসনি কোনওদিন?’
গদাইয়ের মনে পড়ল, এরকম একটা ব্যাপার সে একবার দেখেছিল চড়কের মেলায়। বাঁশ দিয়ে অনেকটা জায়গা ঘেরা। ঠিক মধ্যিখানে লাল, হলুদ আর সবুজ কাগজে মোড়া একটা বাঁশ। তার দু'পাশে দুটো ছোট টেবিল। ওই টেবিলের ওপর জলের গ্লাস, রুমাল এবং আরও কীসব রাখা আছে। যে সাইকেল চালাচ্ছিল, সে সাইকেল চালাতে চালাতেই, কখনও-বা সিটের ওপর এক হাত আর অন্য হাতটা হ্যান্ডেলের মাঝখানে রেখে ওপরে পা দুটো তুলে শীর্ষাসন করার ভঙ্গিতে ওই রঙিন কাগজে মোড়া বাঁশটা দু’পাক ঘুরেছিল। যারা দেখছিল, তাদের সে কী আনন্দ আর হাততালি! বাঁশের বেড়ার ধারে দাঁড়িয়ে দু’ হাতে তালি বাজাতে বাজাতে বুড়িও বলেছিল, 'দাদা, তুই ওইরকম পারিস?’
গদাই জানে, বুড়ির কাছে তার দাদা মস্ত একটা মানুষ। সে বোধহয় সব পারে। বুড়ির খারাপ লাগবে জেনেও গদাই বলেছিল, ‘না। আমি শুধু চালাতে পারি। এতসব কায়দা দেখাতে পারি না। এগুলো শিখতে হয়। সার্কাসের লোকেরা এসব পারে।'
আজ বাড়ি ফেরার পথে বুড়ির কথা মনে পড়ল। রাত্রে খেতে বসে কথাটা বলতেই মা বললেন, ‘তুই পারবি?
বুড়ি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘ছোড়দা ঠিক পারবে। দেখে নিয়ো ছোড়দাই ফার্স্ট হবে।'
মা আর কোনও কথা বলল না। কিন্তু বুড়ির যেন খবরটা শোনার পর থেকেই উৎসাহ বেড়ে গেছে। সে কেবলই কথা বলে যাচ্ছে। অসম্ভব, অবিশ্বাস্য সব কথা! গদাই কিন্তু তখন অন্য কথা ভাবছিল। রাধানগরে গ্যাস এসে গেছে। গদাইয়ের কুকিং কেক আর আগের মতো বিকোয় না। স্রেফ বাদামতলার লাইনটা কেনা ছিল বলে, কোনওরকমে ডাল-ভাতের ব্যবস্থা হচ্ছে। দাঁতের মাজন, অম্লনাশক ইত্যাদি বিক্রি করার এত লোক যে, কেউ আর গদাইয়ের কাছ থেকে বিশেষ কেনে না। কেষ্টদা বলেছে, এই অবিরাম সাইকেল চালনাটাও একটা পেশা। পাড়ায় পাড়ায় এসব দেখাতে পারলে ভাল রোজগার। বেলডাঙার ছিদাম পাড়ুই নাকি নানা মেলায় এসব খেলা দেখায়। বেশ ভাল রোজগার করে। ওর খেলা দেখেই ওকে জনতা সার্কাসে নিয়ে গেছে হাজার টাকা মাইনে দিয়ে। তা ছাড়া খোরাকি তো আছেই। কিন্তু গদাই সার্কাসে যেতে চায় না। সার্কাসে গেলে কেবলই এক জায়গা থেকে আর-এক জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হবে। তা হলে মা আর বুড়িকে কে দেখবে? ওদের সঙ্গে নিয়ে তো ঘোরা সম্ভব নয়! তাই রাধানগরে থেকেই সে কিছু করতে চায়। অবিরাম সাইকেল চালনার ব্যাপারটা তার মনে ধরেছে। এই প্রথমবার যদি ফার্স্ট হতে পারে, তা হলে এটাকেই রোজগারের একটা পথ করে নেওয়ার কথা ভাবতে লাগল গদাই।
প্র্যাকটিসের সময় সকালবেলা বুড়িও এসে দাঁড়াত রাধানগরের মাঠে। কিছুক্ষণ ছোড়দার সঙ্গে সঙ্গে ছুটত। তারপর দাঁড়িয়ে পড়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বলত, 'আর পারছি না রে। হাঁফ ধরে গেছে।’ গদাই সাইকেলের গতি কমিয়ে বুড়ির কাছে আসত। ওর মাথায় টোকা মেরে চলে যেতে যেতে বলত, ‘বুড়ি রোদ উঠছে, ছায়ায় গিয়ে বোস।'
বুড়ি তার ছোড়দাকে দেখতে দেখতে গাছের নীচে গিয়ে দাঁড়াত। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে স্বপ্ন দেখত। চণ্ডীতলার মাঠে লোক ভেঙে পড়েছে। সবাই আস্তে আস্তে সাইকেল থেকে নেমে গেছে, শুধু থেকে গেছে তার ছোড়দা। চারদিকে কানে তালা ধরানোর মতো হাততালি। তারই মধ্যে দিয়ে গলায় মালা পরে প্রাইজ আর টাকা হাতে এগিয়ে আসছে ছোড়দা। বুড়ির শরীরে আনন্দ আর আবেগের বান ডেকে যেতে থাকে। শিশুগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে সে অস্ফুটে ডেকে ওঠে, ‘ছোড়দা!’
চণ্ডীতলার মাঠে মোট এগারোজন প্রতিযোগী ছিল। তার মধ্যে কলকাতার তিনজন, ব্যান্ডেলের দু’জন, নৈহাটি আর শ্যামনগরের একজন করে। বাকি চারজনের তিনজন এসেছে শ্রীরামপুর, বালি আর সোনারপুর থেকে। রাধানগর আর চণ্ডীতলা দুটো জায়গা মিলিয়ে শুধু একজন, তার নাম গদাধর ঘোষ। অর্থাৎ গদাই-ই একমাত্র স্থানীয় ছেলে। সুতরাং গদাইয়ের সমর্থকই মাঠের চারপাশে বেশি। সাইকেলে ওঠবার আগে গদাই প্রথমে কেষ্টদাকে, তারপর বুড়িকে দেখল। এবার পুজোয় কলকাতার হরি-সা মার্কেট থেকে গদাই যে সালোয়ার-কামিজটা বুড়িকে কিনে এনে দিয়েছিল বুড়ি কিন্তু আজ সেটা পরে আসেনি। বুড়ি পরেছে একটা হালকা গোলাপি রঙের শাড়ি। এটা ভাইফোঁটাতে দিনু সাহার দোকান থেকে গদাই ধারে কিনেছিল। বুড়ির খুব শাড়ি পরার শখ তো, তাই শাড়ি কিনেছিল। বুড়ির দিকে তাকাতেই বুড়ি হাত তুলে নাড়তে লাগল। একটু পরেই ব্যান্ডবাদ্যের সঙ্গে শুরু হল সাইকেল-চালনা। মাঠের চারপাশে তুমুল হাততালি। গদাই সাইকেল চালাতে শুরু করল।
প্রথম ঘণ্টাটা ঠিক ছিল। এগারোজন প্রতিযোগীর মধ্যে কেউ বসে যায়নি। কিন্তু দ্বিতীয় ঘণ্টায় পৌঁছবার আগেই গদাই টের পেল তার মাথা ঘুরছে। লম্বা রাস্তায় যদি চালাতে হত তাহলে এমনটা হত না। বৃত্তাকারে ঘোরার ব্যাপারটা সে প্র্যাকটিস করেছে মাত্র সাতদিন। তাও ঘণ্টাখানেকের বেশি করার সময় ছিল না। রোজগারের জন্য অন্য কাজগুলো ফেলে রাখবে কার ভরসায়! কিন্তু এখন, এখানে পৌনে দু’ ঘণ্টার মাথায় এসে সে বুঝল, পায়ে জোর থাকলেও মাথা ঠিক নেই। মাথা ঘুরছে, বমি বমি ভাবটা গলার কাছে উঠে আসছে। কেষ্টদা বলেছিলেন, ‘হালকা খাবার খেয়ে সাইকেলে উঠবি।' কিন্তু সেই হালকা খাবার, মানে দু’ পিস পাউরুটি, একখানা সেদ্ধ ডিম আর একটা কলা, যা কেষ্টদাই এনে দিয়েছিলেন, সেটাও মনে হচ্ছে পেট থেকে উঠে আসছে।
গদাই অসহায় চোখে কেষ্টদার দিকে তাকাল। কেষ্টদা রুমাল নাড়ছেন। গদাই বুড়িকে দেখল, বুড়ি তার স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে। বুড়ি ও তার বন্ধুরা দু’ হাত তুলে ‘ছোড়দা, ছোড়দা’ বলে চিৎকার করে উঠল। গদাই এবার মাকে মনে করল। মায়ের মুখটা। মায়ের মুখটা চোখের পাতায় ভেসে ওঠার আগেই গদাই হড়হড় করে বমি করতে আরম্ভ করল। শামিয়ানার ভিতর থেকে ভলান্টিয়াররা ছুটে এলেন। গদাই কিন্তু তখনও প্যাডেল চালিয়ে যাচ্ছে। শরীর নুয়ে পড়েছে হ্যান্ডেলের ওপর। ভলান্টিয়াররা গদাইকে নামিয়ে নিয়ে এল। এগারোজন প্রতিযোগীর মধ্যে গদাই-ই প্রথম প্রতিযোগী, যে মাঠ ছাড়ল। সঙ্গে সঙ্গে এটা মাইকে ঘোষণা হয়ে গেল। সেই ঘোষণাটা একঝাঁক তিরের মতো এসে গদাইয়ের বুকে বিঁধল। গদাই ঘাসের মধ্যে মুখ ডুবিয়ে কেঁদে উঠল।
মা বলল, ‘তোর কোনও দরকার ছিল ওইসব খেলায় নাম দেওয়ার? মিছিমিছি নিজের শরীরটাকে কষ্ট দিলি!’
গদাই জানে, কেষ্টদার চেয়েও বেশি আহত হয়েছে বুড়ি। তার ছোড়দা যে হেরে যেতে পারে, সেটা সে কখনও ভাবেনি। বাড়ি ফিরে বুড়ি এ ব্যাপারে কোনও কথা বলেনি। গদাই বারান্দার ঘরে শোয়। ঘরের মধ্যে বুড়ি আর মা। গদাই নিজের ঘরে অনেকক্ষণ জেগে ছিল, কিন্তু একসময় পারল না। সকালে ঘুম থেকে উঠে বুড়ির কাছে গেল। বুড়ি তখনও শুয়ে। বুড়ির মাথায় হাত রাখতেই বুড়ি চোখ মেলে তাকাল। গদাই বলল, ‘জানি, তোর খুব কষ্ট হয়েছে। তোর বন্ধুদের কাছে তুই...’
গদাই থেমে গেল। বুড়ি দাদার হাত দুটো জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। গদাই বলল, ‘আমিও হেরে গেছি। জিততে চাইলেই জেতা যায় না। কেষ্টদা’র কথাই ঠিক, সাধনা, সাধনা চাই। আমার তো তা নেই। ঝোঁকের মাথায়, শুধু হাজার টাকার লোভে...’
গদাইয়ের গলা বুজে এল। বুড়ির হাত থেকে হাত ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলল, ‘কিন্তু বুড়ি, তুই দেখিস চিরদিন আমি হারব না। একদিন আমি জিতবই। আমাকে জিততেই হবে। তোদের জন্যই জিততে হবে।'
গদাই বাইরে এসে চোখের জল মুছল। বারান্দার এক কোণে সাইকেলটা। ওটা নিয়ে স্টেশনে যেতে হবে কাগজ আনতে। অতএব, গদাই সাইকেলে উঠে বসল। একটু পরেই বুঝল গতকাল এতক্ষণ একনাগাড়ে সাইকেল চালাবার পর আজ আর পায়ে বল নেই। শিরায় টান ধরছে। গদাই ভাবল, বড় কোনও জয়ের কথা ভাবি না, আমার কাছে জয় মানে মা আর বোনকে খুশি করা। স্টেশনে পৌঁছে কাগজ নেওয়া, বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া। আমাকে থামলে চলবে না। দুরন্ত জেদে গদাই সাইকেল চালাতে চালাতে স্টেশনে পৌঁছে গিয়ে দেখল ট্রেন তখনও আসেনি।
কেষ্টদা অনেকদিন পর আজ স্টেশনে এসেছেন। গদাইকে দেখে বললেন, ‘তোর শরীর ভাল তো?’ গদাই উত্তর না দিয়ে হাসল।
কেষ্টদা নিজের বাঁ হাতের কবজিতে বাঁধা ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এই হল ফ্যাসাদ। আমাদের কাগজ আসে লোকাল ট্রেনে। সেটা প্রায়ই লেট করে। জংশনের জিনিসপত্র আসে মেল ট্রেনে। সেটা আমাদের ঢের আগে পৌঁছে যায়। ওখানকার রমেন পাত্র প্ল্যান করেছে জংশন থেকে জিনিসপত্র নিয়ে ম্যাটাডোরে রাধানগরে পৌঁছবে। মানে আমাদের অন্ন মারবে। কলকাতার অফিসে গিয়ে সুবীর মিত্তিরের সঙ্গে কথা কয়েছে। আমিও যাব কন্ট্রোলারের কাছে।'
গদাই শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘জংশন এখান থেকে কত কিলোমিটার?’
কেষ্টদা সিগারেট খেতে খেতে উত্তর দেয়, ‘প্রায় দশ কিলোমিটার। ওরা কাগজ পায় সওয়া পাঁচটায়। আমরা পাই এক ঘণ্টা বাদে, সওয়া ছ'টায়। জিনিসপত্র ম্যাটাডোরে রাধানগরে ওরা ছ'টার আগেই পৌঁছে দিতে পারবে। আর আমরা জিনিসপত্র বিলি করে লাইনে বেরোতে বেরোতে সাড়ে ছ'টা থেকে পৌনে সাতটা হয়ে যায়।'
গদাই বলল, ‘চণ্ডীতলার ভেতর দিয়ে যদি বাঘমারির খাল ব্রিজ পেরিয়ে যাই, তাহলে কত কিলোমিটার হবে?’
কেষ্টদা একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘তাতে প্রায় দু’ কিলোমিটার রাস্তা কমে যাবে। আর খাল পেরিয়ে রাস্তা ছেড়ে যদি বাঘমারির মাঠ দিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে আরও কিছুটা কমবে
।' গদাই মনে মনে একটু হিসেব করে নিয়ে বলল, ‘জংশনের থেকেই কাগজ নেওয়ার ব্যবস্থা করো। আমি তোমাকেও ছ'টার আগে কাগজ পৌঁছে দেব। এটা আমার চ্যালেঞ্জ। চণ্ডীতলার মাঠে হেরেছি, তাই বলে সারাজীবন হারব না।'
কেষ্ট মিত্তির অবাক চোখে গদাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। দূর থেকে ট্রেনের শব্দ শোনা যায়। ট্রেনটা আসছে।
দু’দিন পর কলকাতার কাগজের অফিসে যাওয়ার আগে কেষ্টদা গদাইকে জিজ্ঞেস করল, ‘ভাল করে ভেবে বল। অত কাগজ তোকে একা আনতে হবে জংশন স্টেশন থেকে। এর মধ্যে বর্ষাকাল আছে। তোর শরীরের ভাল-মন্দ আছে। আমার কোনও লোক কিন্তু এই কাজটা করবার সাহস পাবে না।'
গদাই বলল, ‘কেষ্টদা, এটা পেট-ভাতের চ্যালেঞ্জ। তার মানে বেঁচে থাকার চ্যালেঞ্জ। এখানে আমি হারব না।'
কেষ্টদা বলল, ‘দেখি কথা বলে! তোর ভরসাতেই কথা বলতে যাচ্ছি।'
এক হপ্তা-দু’ হপ্তা করে প্রায় মাস ফুরোতে চলল। কেষ্টদা গদাইকে কিছুই বলল না। গদাই ভাবল, তাহলে বোধহয় জংশনে তাদের জিনিস অফিস থেকে পৌঁছে দিতে চাইছে না। বোধহয় কোনও নিয়মে আটকাচ্ছে। গদাই যখন এমনটাই ধরে নিয়েছে ঠিক তখনই কেষ্টদা প্ল্যাটফর্মে এসে গদাইয়ের সামনে দাঁড়াল। গদাই তখন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বসে অম্লনাশক বিক্রি করছিল। কেষ্টদাকে দেখে গদাই এক-পা এগিয়ে এল। কেষ্টদা বলল, ‘গদাই, ফাইনাল হয়ে গেছে। কাল সকাল থেকে আমাদের কাগজের বাণ্ডিল নামবে জংশনে। জংশনে ফার্স্ট মেল এসে দাঁড়ায় পাঁচটা পনেরোতে। এবার বল তুই ক'টায় রাধানগর বাজারের মোড়ে পৌঁছতে পারবি? পাত্র লাইনে বের হয় ছ'টায়। আমরা কখন বেরোতে পারব?
গদাই কেষ্টদার মুখের দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল, ‘আমি ছ'টার মধ্যে পৌঁছে দেব?’
কেষ্টদা অবিশ্বাসের চোখে বলল, ‘তুই যা বলছিস সেটা ভেবে বল।'
গদাই বলল, ‘ভেবেই বলছি। আমি দুপুরের দিকে দু’দিন গিয়ে দেখেছি। যাতায়াতে মোট চোদ্দো কিলোমিটার পড়ে। যাওয়াটা কোনও ব্যাপার না। আসাটাই আসল। সাত কিলোমিটার চল্লিশ মিনিটে আমি আসতে পারি।'
কেষ্টদার সংশয় যায় না। সে বলে, 'সাইকেলের সামনে-পেছনে অত জিনিস থাকবে কিন্তু। ফাঁকা সাইকেল হলে ভাবনা ছিল না!’
গদাই এবার হেসে বলল, ‘কাজে নামবার আগে অনেক চিন্তা হয় ঠিকই, কিন্তু নেমে পড়লে তো একটাই চিন্তা। আর সেই চিন্তাটা হল কাজটা করতে হবে।'
কেষ্টদা বলল, “ঠিক আছে, তোর ওপর ছেড়ে দিলাম। ডুবলে তোর জন্যই ডুবব। আর এটা তো তোর চ্যালেঞ্জ। দেখি এবার তুই জিতিস কি না।'
জংশন স্টেশনটাতে রমেন পাত্র আর তার লোকদেরই আধিপত্য বেশি। গদাইকে ওরাও চেনে। গদাইকে দেখে সকলে হেসে উঠে বলল, ‘কেষ্টর চ্যালা। সাইকেল করে কাগজ নিয়ে যাবে জংশন থেকে রাধানগরে। তোদের কি মাথা খারাপ?’
রমেন পাত্র বাঁ হাতে চায়ের গ্লাস নিয়ে এগিয়ে এসে বলল, 'অ্যাই গদাই, এদিকে আয়। তোর কেষ্টদার আসল মতলবটা কী বল তো? জংশন থেকে কাগজ নেওয়ার বুদ্ধিটা ওর মাথায় এল কেন? আমি ভাবলাম, মোটরভ্যান-ফ্যান কিনেছে। ওমা, এ যে একখানা সাইকেল। এতে ওর লাভ কী? নিশ্চয়ই অন্য মতলব আছে। মতলবটা কী, সেটা তুই জানিস?’
গদাই উত্তর দিল, ‘মতলব কিছু নেই। এই বুদ্ধিটা কেষ্টদার নয়। আমিই মাথায় ঢুকিয়েছি।'
রমেন পাত্র ভ্রূ কুঁচকে বলল, ‘কেন? এতে তোদের কী লাভ হবে?
গদাই ঠান্ডা গলায় বলল, ‘দেখো রমেনদা, এটা পেট-ভাতের লড়াই। তোমরা আগে কাগজ পাও। ঘরে ঘরে আগে পৌঁছে দিতে পারো, আমরা পরে পাই, তাই পরে পৌঁছয়। তুমি তো বাদামতলা, চণ্ডীতলা আর মহেশপুরে নিজে ঢোকবার প্ল্যান করেছিলে। খদ্দেরদের দিয়ে চিঠি লিখিয়ে সেই চিঠি কলকাতার অফিসেও পৌঁছে দিয়েছিলে যাতে অফিস রাধানগরটাও...'
রমেন পাত্র ফুঁসে উঠে বলল, ‘এসব কথা বুঝি তোর কেষ্টদা তোকে শিখিয়েছে?' গদাই বলে, ‘ঝগড়া-বিবাদে কাজ কি রমেনদা! তুমিও পেটের জন্য লড়ছ, আমরাও লড়ছি।'
রমেন পাত্র রাগের গলায় বলল, 'তাই বলে অপবাদ দেবে? অফিসের নিয়ম তোর কেষ্টাদা জানে। আমি চাইলেই ওর এজেন্সি কেড়ে নিতে পারি? ইচ্ছে করলেই ওর এলাকায় ঢুকতে পারি?’
তর্কটা হয়তো আরও চলত। কিন্তু ট্রেনটা এসে পড়ায় থেমে গেল। গদাই নিজের কাগজগুলো নামিয়ে নিয়ে সাইকেলে দড়ি দিয়ে বাঁধছিল। রমেন পাত্রর লোকেরা তখনও প্ল্যাটফর্মে বসে লাইনের হিসেব দেখে দেখে হকারদের কাগজ দেওয়া সবে শুরু করেছে। সাইকেলে ওঠবার আগে গদাই বলল, ‘রমেনদা, যাচ্ছি।'
রমেন বলল, ‘সাবধানে যাস। অনেকটা পথ। এ সময়ে বড় রাস্তায় খুব লরি চলে। রাতজাগা ড্রাইভারদের চোখে এখনই ঝিমুনি আসার টাইম। কেষ্টর সঙ্গে আমি পরে কথা বলব।'
হাত নেড়ে গদাই সাইকেলে উঠে পড়ে। কিছু কাগজ নিয়েছে পেছনের কেরিয়ারে বেঁধে, কিছু নিয়েছে সামনের হ্যান্ডেলে, যাতে সাইকেলের পেছনটা বেশি ভারী না হয়। গদাই সাইকেলে উঠে প্যাডেলে পা দিয়েই মনে মনে বলল, ‘মা, আজ প্রথম দিন। আমি যেন রাধানগরের বাজারের মোড়ে ঠিক সময়ে পৌঁছতে পারি।'
এত সকালে রাস্তা ফাঁকাই থাকে। বড় রাস্তা দিয়ে কিছুটা আসার পর শর্টকাট রাস্তায় নামতেই আর কোনও গাড়ি নজরে এল না। কেবল জনা-দুই লোককে দেখল তারই মতো সাইকেল নিয়ে দুধ আনতে যাচ্ছে। গদাই সাইকেল চালায় আর ঘড়ি দেখে। বাঘমারির ব্রিজ পেরুবার সময় সে ঘড়ি দেখে মনে মনে হেসে উঠল। কেষ্টদা অকারণে ভয় পাচ্ছিলেন। গদাই যখন রাধানগরের কাছাকাছি, তখনও বাজারের কোনও দোকান খোলেনি। মোড়ের মাথায় দুটো চায়ের দোকান খুলেছে। গদাই বাজারের মোড়ে এসে দাঁড়াতেই চায়ের দোকানের ভেতর থেকে ঘড়ি দেখতে দেখতে কেষ্টদা বেরিয়ে এল। তার মুখে হাসি। গদাই হাঁফাচ্ছিল। ঘামে ভিজে তার জমা সপসপ করছে, তবুও সে হাসল।
গদাই বলল, ‘কেষ্টদা, আমি পেরেছি তো?’
কেষ্টদা বলল, ‘পেরেছিস। এবং আগে এসে গেছিস। কিন্তু এটা রোজ পারতে হবে। রোজ, এভরি ডে। শীত, বর্ষা, ঝড় সবসময়, সব ঋতুতে। এটাই কিন্তু তোর চ্যালেঞ্জ।' রুমালে মুখ মুছতে মুছতে গদাই শুধু মাথা নাড়ল।
এই পরিশ্রমের জন্য গদাইয়ের রোজগার অবশ্য কিছু বাড়ল, কিন্তু পরিশ্রমটা নিতান্ত কম নয়। এরপর দুপুর থেকে রাত্রি পর্যন্ত প্ল্যাটফর্মে বসে চোঙা ফুঁকে ফুঁকে দাঁতের মাজন আর অম্লনাশক বিক্রি করার পরিশ্রমটাও বড় কম নয়! কোক কয়লা আর গ্যাস এই দুইয়ে মিলে তার কুকিং কেকের ব্যাবসা লাটে তুলে দিয়েছে। যা কিছু রোজগার তার বেশিরভাগটাই আসে কাগজ বিক্রি থেকে। রাত্রে বিছানায় শুতে যাওয়ার আগে সে শুধু মা আর বুড়িকে বলে, ‘সাড়ে তিনটেতে ডেকে দিয়ো।’ প্রথম প্রথম ডাকতে হত। কিন্তু দিন পনেরো যাওয়ার পর ওরা ডাকবার আগেই গদাইয়ের ঘুম ভাঙে। মাসখানেক যাওয়ার পর ব্যাপারটা আস্তে আস্তে সহজ হয়ে এল গদাইয়ের কাছে। কিন্তু নিয়তির থেকে বড় বাধা তো কেউ নেই। সেই নিয়তিই একদিন পথ আটকে দিল গদাইয়ের। সেদিনের কাগজটা ছিল কেষ্টদার ভাষা একেবারে হট। দুশো কপি বেশি চাওয়া হয়েছিল কিন্তু অফিস একশো পঁচিশটার বেশি দেয়নি। এই একশো পঁচিশটা কাগজই কেষ্টদার কাছে লাভের অঙ্ক অনেকটা বাড়িয়ে দেবে। এগুলো বেশি দামে নগদ বিক্রি হবে। কাগজ-প্রতি অনেক লাভ। জংশনে গিয়ে দেখল রমেন পাত্র বেজায় উত্তেজিত। সে তিনশো কাগজ বেশি চেয়েছিল, তাকে মাত্র দেড়শো বেশি দিয়েছে। অথচ সেইদিনের কাগজেই আছে বাজার গরম করা খবর। রমেনের এক কর্মচারী গদাইকে হুঁশিয়ার করার ভঙ্গিতে বলল, ‘গদাই, আজকের কাগজ নিয়ে কাড়াকাড়ি হবে। তুই কিন্তু আমাদের চৌহদ্দির মধ্যে তোদের প্যাকেট খুলবি না। খুললেই অফিসে কমপ্লেন যাবে।'
গদাই এইসব নিয়ম জানে। সে কথা বাড়াল না। সাইকেলে কাগজের বান্ডিল তুলে চট করে ঢেকে দিল। একা একা এতটা পথ কাগজ নিয়ে যেতে হলে, বিশেষ করে এইসব দিনে, যে দিনগুলিতে কাগজ নিয়ে কাড়াকাড়ি হয়, তখন কাগজ ঢেকে নিয়ে যাওয়াই নিরাপদ। নইলে মাঝপথে সাইকেল থামিয়ে কাগজ লুট করে নেয় কিছু পাবলিক। সেজন্য গদাই আগেভাগে কাগজ ঢেকে নিল। সাইকেলে চড়ে বসবার আগে যথারীতি রমেন পাত্রকে ‘রমেনদা, যাচ্ছি’ বলে গদাই সাইকেল চালাতে আরম্ভ করল। সে জানে, রাধানগরের বাজারের মোড়ে কেষ্টদা দলবল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তারই জন্য। কাগজ কেনার জন্য লোকেরা আর-একটু পরেই এসে জড়ো হবে বাজারের মোড়ে। তেঘরিয়ার ভেতর দিয়ে আসবার সময় একটা চায়ের দোকানের সামনে থেকে দু’জন লোক চেঁচিয়ে উঠে বলল, ‘কাগজ আছে নাকি?'
গদাই সাইকেলের গতি একটুও না কমিয়ে শুধু হাত নেড়ে জানিয়ে দিল, ‘নেই।’ গদাই জানে এখানে দাঁড়ালেই বিপদ। কাগজের প্যাকেট ধরে টানাটানি আরম্ভ করে দেবে। বাঘমারির ব্রিজটা পেরোলেই সে নিশ্চিন্ত। কিন্তু বাঘমারির ব্রিজ এখনও অনেকদূর। তেঘরিয়ার স্কুলমাঠটা পেরিয়ে আসার দু’দিকে ফসলের খেত আর থেকে থেকে বাঁশবাগান। জায়গাটা শান্ত এবং আশ্চর্য নির্জন। মধ্যদুপুরেও একটা ছমছমে নির্জনতা জেগে থাকে। কেষ্টদার ভাষায় ‘ভূতুড়ে নির্জনতা’। এখন গদাই সেই ভূতুড়ে নির্জনতার মধ্য দিয়ে সাইকেল চালিয়ে বাঘমারির ব্রিজের দিকে আসতে চাইছিল। এদিকের রাস্তা সাইকেল চালাবার পক্ষে মোটেও ভাল নয়। কোনও একসময় রাস্তার পিচঢালা হয়েছিল কিন্তু বর্ষা আর গোরুর গাড়ি চলার ফলে রাস্তা জায়গায় জায়গায় বিশ্রীভাবে ভেঙে গেছে। এখানে জোরে সাইকেল চালানো যায় না। গর্তে পড়লেই লাফিয়ে ওঠে। তবুও এই পথেই তো প্রায় মাসখানেক হল সে সাইকেল চালাচ্ছে। কোনওদিন কোনও অঘটন হয়নি, কিন্তু আজ হয়ে গেল। সাইকেলটা ছোট্ট একটা গর্তে পড়ে সামান্য লাফিয়ে ওঠার পরই গদাই যখন শক্ত হাতে সাইকেল এবং নিজের ভারসাম্য সামলে নিতে ব্যস্ত, তখনই একটা শব্দ হল এবং গদাই বুঝল তার পেছনের চাকার টায়ারটি ফাটল। গদাই সাইকেল থেকে নেমে পেছনের চাকাটার দিকে হতাশ আর করুণ দৃষ্টিতে তাকাল। এখনও অনেকটা পথ বাকি, অথচ তার কিচ্ছু করার উপায় নেই। এপথে বাস চলে না। মোটরগাড়ি করেও তেমন কেউ যাতায়াত করে না যে হাতে-পায়ে ধরে তার গাড়িতে কিছুটা এগিয়ে যাবে। গদাই অসহায়ভাবে রাস্তার দু'পাশে তাকাতে লাগল। বাঁশবাগানের মাথায় সকালের রোদের আভাস জাগতে আরম্ভ করেছে। ফসলের মাঠেও আস্তে আস্তে দিন জেগে উঠছে। গদাইয়ের কান্না পেতে লাগল। গদাই মনে মনে বলল, ‘মা, আমি আবার হেরে যাচ্ছি। আজকের এমন একটা দিনেও আমাকে হারতে হচ্ছে!'
গদাই দু’ হাতে সাইকেলটা টানতে টানতে একটা উঁচু ঢিবির কাছে এল। ঢিবির ওপর উঠে দাঁড়িয়ে রাস্তার দু’দিকে তাকাল। ছাড়া ছাড়া কয়েকজন মানুষ, একপাল গোরু আর গুটিকয় কুকুর ছাড়া রাস্তায় আর কাউকে দেখতে পেল না গদাই। কিন্তু এদিকে সময় চলে যাচ্ছে, অথচ সে এগোতে পারছে না। সময়ের কাঁধে হাত রেখে ছুটে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ এখনও মিথ্যে হয়ে যাচ্ছে। তার সামনে দিয়ে, তাকে পেছনে ফেলে সময় এগিয়ে যাচ্ছে তরতর করে। গদাই বিকল সাইকেলটা হাতে নিয়ে এগোতে লাগল। একটা চায়ের দোকানের উনুনে আঁচ পড়ছে। অর্ধেকটা ঝাঁপ সবে খুলে দোকানের সামনেটা ঝাঁটা দিয়ে ঝাঁট দিচ্ছে এক প্রৌঢ় দোকানদার। গদাই এসে দোকানদারের সামনে দাঁড়াল। দোকানদার, মানে সেই প্রৌঢ় লোকটি একবার গদাইকে দেখে নিয়ে বলল, 'চা হতে দেরি আছে। এখনও আঁচ ওঠেনি।'
গদাই তার সমস্যাটা প্রৌঢ় লোকটিকে বলতেই লোকটি বলে উঠল, ‘এতে আমি কী করব? এখানে সাইকেল সারানোর দোকান নেই। মাইলখানেক গেলে বাজারে একটা দোকান আছে, তাও সেটা ন'টার আগে খুলবে না।'
গদাইয়ের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। তার মনে হল, ‘এবারও সে হেরে যাচ্ছে। একবার হেরেছে চণ্ডীতলার মাঠে নিজের অযোগ্যতায়, এবার হারছে ভাগ্যের কাছে।’ কেষ্টদার মুখটা তার মনে পড়ল। সে চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে পড়ে মনে মনে হিসেব করতে লাগল, ‘এখনও প্রায় চার কিলোমিটার পথ। এতটা পথ একা কাগজ নিয়ে...'
গদাইয়ের ভাবনাটা থেমে গেল। তেঘরিয়া সদকুলের দিক থেকে একঝাঁক ছেলে হাফপ্যান্ট আর ফুলহাতা গেঞ্জি পরে ছুটতে ছুটতে আসছে। বড় রাস্তায় সকালের দিকে এরকম দৃশ্য দেখা যায়। চণ্ডীতলা ক্লাবের ছেলেরাও সকালে দৌড়োয়। আজ দেরি হয়েছে বলে তেঘরিয়ার ছেলেদের দৌড় সে দেখতে পেল।
গদাই দেখল ছেলেরা দৌড়তে দৌড়তে তার সামনে এল এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দোকান ছাড়িয়ে এগিয়ে গেল। বড়জোর মিনিট দুই হবে, তার মধ্যেই সামনের মোড়ে গিয়ে বাঁদিকে বাঁক নিয়ে চোখের আড়ালে চলে গেল।
গদাই দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল, ‘ওরা কতদূর পর্যন্ত দৌড়য়?’
দোকানদার চায়ের একটা বড় কেটলিতে জল ঢালতে ঢালতে বলল, ‘কত আর? দেড় থেকে দু’ কিলোমিটার হবে। তেঘরিয়ার স্কুল মাঠ থেকে কুলতলার হাই স্কুল পর্যন্ত। হ্যাঁ, তা প্রায় দু’ কিলোমিটার হবেই।'
গদাই জিজ্ঞেস করল, ‘বেশ জোরে দৌড়য় তো!’
দোকানদার বলল, ‘এতে আর বাহাদুরি কী আছে! ঝাড়া হাত-পায়ে স্রেফ দৌড়ে যাওয়া। একটু পরে দেখবেন আমার ভাইকে, চল্লিশের কাছাকাছি বয়স। মাথায় আনাজের ঝুড়ি নিয়ে ওদের থেকেও বেশি জোরে দৌড়ে যাবে মহেশতলায় কয়ালদের আড়তে। হরি কয়াল এখানকার মহাজন। সেখানে আনাজ পৌঁছে দেবে। সেই আনাজ টেম্পো করে যাবে জংশনে। দেরি হলে সেদিনের রোজগার গেল।'
কথা বলতে বলতেই দোকানের পেছন থেকে আনাজের ঝুড়ি মাথায় একটা জোয়ান চেহারার লোক এসে দোকানদারকে বলল, ‘দাদা, আমি বাড়ির বাজার করে ফিরব। থলেটা ঝুড়ির দড়িতে বেঁধে দাও।'
গদাই গভীর দৃষ্টিতে লোকটিকে দেখতে লাগল। দু’ ভাই মিলে আনাজের ঝুড়িটা নামাল বেঞ্চের ওপর। গদাই অনুমানে বুঝল, তার কাগজের প্যাকেটের যা ওজন, এই ঝুড়ির মধ্যে যা জিনিসপত্র আছে তার ওজন কোনওমতেই কম হবে না। হয়তো বেশি হবে। চল্লিশ বছরের একজন পুরুষ যদি রোজ এই ওজন নিয়ে আড়াই কিলোমিটার ছুটতে পারে, তা হলে তার মতো বাইশ বছরের এক যুবক কেন একদিনের জন্য চার কিলোমিটার ছুটতে পারবে না?
আনাজের ঝুড়ির পাশ থেকে গদাই উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘দাদা, আমার সাইকেলটা আপনার দোকানে রেখে যাচ্ছি। বিকেলে এসে নিয়ে যাব।'
দোকানদার বলল, ‘আপনার কাগজ?
গদাই বলল, ‘আমিও ওঁর মতো মাথায় নিয়ে ছুটব। একটু দেরি হবে, তবুও পৌঁছে তো যাব!’
দোকানদারের ছোটভাই হেসে ফেলে বলল, ‘পারবেন না। মাথায় মোট নিয়ে ছোটার অভ্যাস না থাকলে পারবেন না। মুখ থুবড়ে পড়ে যাবেন। তার চাইতে পিঠে বেঁধে নিন। আমার তো বিশ বছরের অভ্যাস।'
দোকানদার আর তার ভাই মিলে কাগজের প্যাকেটগুলো বড় একটা ব্যাগে ঢুকিয়ে ব্যাগটা গদাইয়ের পিঠে বেঁধে দিল। বাঁধতে বাঁধতে ছোটভাই বলল, ‘পাহাড়ের মানুষরা এইভাবে পিঠে মোট নিয়েই নাকি পাহাড়ে ওঠা নামা করে। সাঁওতাল মায়েরাও সন্তানদের পিঠে বেঁধে নেয় এইভাবেই। তবে ছোটবার সময় মাথা এবং ঘাড় সোজা রাখবেন। ও দুটি যত নীচে নামাবেন পিঠের বোঝা তত বেশি ভারী মনে হবে।'
গদাইয়ের পিঠে কাগজের বান্ডিল বাঁধা হওয়ার পরই ছোটভাই বলল, ‘দাদা, এটা ধর, মাথায় চাপিয়ে নিই।' প্রথমে মাথায় ভাঁজ করে গামছা দিল, তারপর ঝুড়িটা, তার নীচেও আবার কাপড়ের বিড়া লাগানো, সেটা মাথায় নিয়ে বলল, 'চলেন, দৌড় শুরু করি। এ হল পেটের দৌড়।'
লোকটা ছুটতে লাগল। তার পাশে পাশে গদাই। যেতে যেতে লোকটা বলল, ‘পায়ের দৌড়েই যখন যাবেন, তখন আপনাকে আরও একটা রাস্তা বাতলাই। মহেশতলার ব্রিজ তক না গিয়ে কুলতলা বাজারের ডাইনে যে কাঁচা রাস্তা, ওই ধরে দৌড় দিলে গিয়ে থামবেন বাঘমারির খালে। সেখানে পাকা ব্রিজ নেই। বাঁশের সাঁকো। ব্যস, ওই সাঁকো পেরোলেই চণ্ডীতলার বড়বাগান। বাগানের মধ্যি দিয়ে গেলেই চণ্ডীতলা। সেখান থেকে রাধানগর তো পোয়া মাইলের একটু বেশি। রাস্তাখান চিনতে পারবেন তো?’
গদাই মাথা নেড়ে বলল, 'হ্যাঁ।'
গদাই সাইকেলে আসা-যাওয়ার সংক্ষিপ্ত পথটা জানত। পায়ে হাঁটার ব্যাপারটা সে কখনও ভাবেনি বলে এই রাস্তাটার কথা তার মনেই আসেনি। এবার তার মধ্যে নতুন করে উৎসাহ দেখা দিল। তার দু’ চোখের সামনে ভেসে উঠল বাঘমারির খাল আর একটা জোড়াবাঁশের সাঁকো। কুলতলা বাজারের কাছাকাছি এসে ছোটভাই বলল, ‘এইবার আপনি ডাইনে ঘোরেন। আমি যাব বাঁয়ে। মাথা-ঘাড় সোজা রাখবেন। বিকালে দোকানে দেখা হবে।'
লোকটা বাঁদিকের কাঁচা রাস্তা ধরল। গদাই ডানদিকের কাঁচা রাস্তা। গদাই মনে মনে বলল, ‘ডাইনে-বাঁয়ে দু’দিকে ভিন্ন বয়সের দু’জন লোক ছুটছে পেটের তাগিদে। শুধু পেট নয়, জীবনের তাগিদও বটে! একজনের মাথায় আনাজ, অন্যজনের পিঠে খবর। দুটোই মানুষের খাদ্য। একটা পেটের, অন্যটা মনের। দুটোই সাতসকালে মানুষের নাগালে পৌঁছে দিতে হয়। লড়াইটা হচ্ছে পৌঁছে দেওয়ার। ছুটতে ছুটতে হাঁফ ধরে যাচ্ছে গদাইয়ের। মনে হচ্ছে আর-একটু পরেই তার হৃৎপিণ্ডটাও ওই সাইকেলের টায়ারের মতো শব্দ করে ফেটে যাবে। গদাই ভয় পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। রোদের তাপ বাড়ছে। অল্প একটু হাওয়া গায়ে লাগতেই তার মনে হল, কাঁচা রাস্তার পাশে যে ঘাস বিছানো জমি, ওখানে শুয়ে পড়তে পারলেই বোধহয় সে বেঁচে যাবে। তার শরীর আর কষ্ট সইতে পারছে না। শরীর শিথিল হয়ে আসছিল। হঠাৎ আনাজের ঝুড়ি মাথায় ওই চল্লিশ বছরের লোকটির কথা মনে পড়ল। মাথায় ঝুড়ি নিয়ে সে কিন্তু এখনও দৌড়ে যাচ্ছে, নির্ঘাত তার মতো থেমে যায়নি। শরীরের কষ্টকে উপেক্ষা করতে না পারলে কেউ কি তার ঠিকানায় পৌঁছতে পারে?
গদাই রুমালে মুখের ঘাম মুছে দৌড় শুরু করার আগে বলল, ‘মা, আমি তোমার কাছে যাচ্ছি। তুমি আমায় হাত বাড়িয়ে ডাকো, ডাকতে থাকো।'
গদাই আবার দৌড়তে শুরু করল। একটু পরেই টের পেল কাঁচা রাস্তাটা সামনের দিকে ঢালু হয়ে গেছে। তার মানে আসছে, বাঘমারির খাল আসছে। পাহাড়ের ঢালু পথে পিঠে সন্তান বেঁধে মায়েরা যেভাবে নামে, গদাইও তেমনভাবে নামতে লাগল। তার পিঠেও যেন সন্তান বাঁধা। সামনেই খাল। লম্বা লম্বা দুটো বাঁশ খালের ওপর। তার ওপর দিয়ে দৌড়নো যাবে না। সাবধানে পেরোতে হবে খালটা। গদাই বাঁশের সাঁকোর ওপর উঠে সাবধানে এগোতে লাগল। এখন আর ঘড়ি দেখার সময় নেই। ঘড়ির কাঁটা তাকে পেছনে রেখেছে। যেহেতু এখন দৌড়তে হচ্ছে না, তাই কিছুটা বিশ্রাম মিলছে। এর পরেই তাকে ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে দৌড়তে হবে। যতটা দেরি হয়ে গেছে তার চাইতে বেশি দেরি করা চলবে না। তাই খাল পেরিয়ে এসেই গদাই এক মুহূর্ত দাঁড়াল এবং পরক্ষণেই শরীরের সব শক্তি আর উদ্যম নিংড়ে দিয়ে দৌড় শুরু করল। যদিও সে বুঝল তার পায়ে শক্তি নেই, মাথার মধ্যেটা ফাঁকা। বুকে কষ্ট বাড়ছে। চণ্ডীতলার মাঠের কথা মনে পড়ল। তবুও সে থামতে চাইল না।
রাধানগর বাজারের মোড়ে তখন কেষ্টদা ঘনঘন ঘড়ি দেখছে আর নিজের দলের ছেলেদের দিকে তাকাচ্ছে। ইতিমধ্যে কাগজ কেনার জন্য বাজারের মোড়ে লোক জমতে শুরু করেছে। একদল মানুষ আছেন যাঁদের বাড়িতে কেষ্টদার লোক রোজ সকালে কাগজ পৌঁছে দেয় এবং মাসের শেষে টাকা নেয়। তাঁরা হলেন বাঁধা খদ্দের। আর-একদল আছেন যাঁরা বাজার করতে এসে রোজ নগদ পয়সায় কাগজ কেনেন। নগদ পয়সার লোকেদের মধ্যে কেউ কেউ বাজারের মোড়ে এসে কেষ্ট মিত্তিরকে জিজ্ঞেস করতে থাকেন, ‘কি হে কেষ্ট, তোমার কাগজ কই? আজ তো দিল্লির ক্যাবিনেট ওলটপালটের খবর। তার ওপর আবার রাজ্য বাজেট। আর আজই তোমার কাগজ লেট?’
কেষ্ট মিত্তির লোকজনকে বোঝান, 'আমাদের লেট নয়। ট্রেন লেট করছে। পেয়ে যাবেন, একটু পরেই পেয়ে যাবেন। বাজার করতে থাকুন।'
রাধানগর বাজারের মোড়ে এখনও কাগজ পৌঁছয়নি এই সংবাদটা স্কুলে যাওয়ার পথেই বুড়ি জেনে গেল। বুড়িদের মর্নিং স্কুল। নিজের সেকশনের মাত্র কয়েকদিন হল বুড়ি মনিটর হয়েছে। তাই বুড়ি সবার আগে স্কুলে পৌঁছয়। বুড়ির বুকটা কেঁপে উঠল। তার মনে হল, ‘দাদার কিছু হয়নি তো? কোনও অ্যাকসিডেন্ট কিংবা অতটা পথ সাইকেল করে আসতে আসতে...’
চণ্ডীতলা মাঠের ছবিটা বুড়ির মনের মধ্যে হঠাৎ ভেসে এল। ছোড়দা বমি করে ফেলছে। শরীর এলিয়ে পড়ছে সাইকেলের রডের ওপর। সবাই ছুটে যাচ্ছে তার ছোড়দাকে আনবার জন্য।
চলতে চলতে বুড়ির পা আটকে গেল। সে তার বান্ধবীকে বলল, ‘রাখী, তুই এগিয়ে যা। ছোড়দার জন্য আমার মন কেমন করছে। নিশ্চয়ই খারাপ কিছু ঘটেছে। আমি রাধানগর বাজারের মোড়ে যাচ্ছি।' বুড়ি ফিরে এল রাধানগর বাজারের মোড়ে। কথা না বললেও বুঝতে পারল, কেষ্টদা ভেতরে ভেতরে ছটফট করছে। বুড়িকে দেখে এগিয়ে এসে চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘আজ সকালে কখন বেরিয়েছে?’
বুড়ি বলল, ‘রোজ যেমন সময়ে যায়।'
কেষ্ট মিত্তির সরে গেল। বুড়ি এগিয়ে গিয়ে কেষ্টদার হাত ধরে বলল, ‘কেষ্টদা, দাদার কিছু হয়নি তো?’
কেষ্ট মিত্তির উত্তর দিল না। একটা ছেলেকে ডেকে বলল, ‘পল্টু সরকার তোর বন্ধু না?’ ছেলেটা বলল, ‘হ্যাঁ, চেনাশোনা আছে।'
কেষ্টদা বলল, ‘পল্টুর একটা বাইক আছে তো। ওটা কিছুক্ষণের জন্য পাওয়া যাবে?’ ছেলেটা বলল, ‘ওর বাইক গ্যারাজে। পরশুদিন অ্যাকসিডেন্ট করেছিল তো। পুলিশ কেস হয়ে গেছে।'
কেষ্ট মিত্তির সরে এল। বুড়ির দিকে একবার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিয়ে ভাবল, তা হলে কি বুড়ির আশঙ্কাই সত্যি? গদাইয়ের কি কিছু হল? যদি তেমন কিছু হয় সে দায়টা তার নিজের। কেন সে গদাইকে এই কঠিন কাজের দায়িত্ব দিয়েছিল, সেটা তখন কেউ বিবেচনা করে দেখবে না। চিরজীবন তাকে অপরাধী হয়ে থাকতে হবে।
কেষ্ট মিত্তিরের মুখ থমথমে হয়ে গেল। বুড়ি এসে তার হাত ধরেছে। সে এখন আর সত্যিই বুড়ির দিকে তাকাতে পারছে না। বুড়ি ছলছল গলায় বলছে, ‘কেষ্টদা, ওই ছোড়দা ছাড়া আমাদের কেউ নেই। আমাদের কে দেখবে?’
কেষ্ট মিত্তির উত্তর দিতে পারল না। তার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। সামনের কোনও কিছুই সে আর স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু ওই অবস্থাতেই কে যেন চিৎকার করে উঠে বলল, ‘গদাই আসছে, গদাই।'
দু’ হাতে চোখের জল মুছে কেষ্ট মিত্তির সামনের দিকে তাকাল। গদাই ছুটতে ছুটতে আসছে। কিন্তু গদাই ছুটছে কেন? ওর কী হয়েছে?
কেষ্ট মিত্তির সামনের দিকে দৌড় দিলেন। তাঁর পেছনে ছুটছে বিশজন ছেলে, যারা গদাইয়ের মতো রোজ ভোরে বাড়ি বাড়ি কাগজ পৌঁছে দেয়। সকলের পেছনে ছুটছে বুড়ি। আনন্দ, আতঙ্ক আর অজানা ভয় একসঙ্গে মিশে গেলে বোধহয় মানুষের কণ্ঠস্বর বদলে দেয়। বুড়িও সেইরকম কণ্ঠে চিৎকার করে ডেকে উঠল, ‘ছোড়দা-আ-আ...।'
যাঁরা দাঁড়িয়ে ছিলেন আশপাশে ছড়িয়েছিটিয়ে, তাঁরাও এই ডাকে চমকে উঠে ছুটতে লাগলেন গদাইয়ের দিকে। গদাই ছুটে এসে কেষ্টদাকে জড়িয়ে ধরে রাস্তার ওপর বসে পড়তে পড়তে বলল, ‘আজ লেট করে ফেললাম কেষ্টদা, আজ লেট হয়ে গেল।'
সেদিন রাধানগরের ঘরে ঘরে সবচেয়ে বড় খবর হয়ে গেল স্বয়ং গদাই।
সন্ধ্যার পর কেষ্ট মিত্তির এল গদাইয়ের বাড়িতে। গদাই খাতা, কলম আর বই নিয়ে কীসব যেন করছিল। কেষ্ট মিত্তির বলল, 'কী করছিস?'
গদাই লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘জানো, ওই সরকারদা, উনি আমায় বলেছেন প্রাইভেটে নাকি স্কুলে পরীক্ষা দিয়ে পাশ করা যায়। আমি তো মাধ্যমিক পাশ করিনি। ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছিলুম।'
কেষ্টদা বলল, ‘তুই পড়তে চাস?’
গদাই বাচ্চা ছেলের মতো হেসে ফেলে বলল, ‘খুব ইচ্ছে করে। তাই বুড়ির বইগুলো দেখছিলুম। কিন্তু আমার সময় কোথায় বলো?’
কেষ্টদা বলল, ‘সময় বার করে নিতে হবে। শোন, একটা জিনিস বুঝেছি, একখানা নড়বড়ে সাইকেল ভরসা করে জীবনের সব যুদ্ধ জেতা যায় না। আমি একটা মোটর সাইকেল কিনছি। এবার থেকে ওতে করেই কাগজ আনব। তুই আর আমি দু’জনে যাব জংশনে।'
গদাই অবাক গলায় বলল, ‘তুমিও যাবে?’
কেষ্টদা বলল, ‘আমি যাব মোটর সাইকেলে, তুই যাবি সাইকেলে। তোর জন্য আমি নতুন সাইকেল কিনব।
গদাই অবাক হল। বুড়ি আহত চোখে কেষ্টদার দিকে তাকিয়ে ভাবল, সাইকেল চালানোতে অনেক কষ্ট। কেষ্টদা কেন সেই কষ্টটা দাদাকে দিতে চাইছে? দাদা তো মোটর সাইকেলও চালাতে পারে। তাতে শরীরের কষ্ট কম।
গদাই বলল, ‘কেন আবার সাইকেল কিনবে? আমি তো মোটর সাইকেল করেই কাগজ এনে দিতে পারি।'
কেষ্টদা বললেন, ‘না, তোকে সাইকেলই চালাতে হবে।'
গদাই দমে গেল। মনে মনে দুঃখ পেলেও কিছু বলল না। অনেকক্ষণ মাথা নিচু করে থেকে বলল, ‘তুমিই তো অন্নদাতা। তুমি যা বলবে তাই করব।'
কেষ্টদা বলল, ‘শুধু একটা কথা বিশ্বাস করিস, আমি তোর খারাপ কখনও চাইব না। আমার জীবনেও অনেক স্বপ্ন ছিল, বাসনা ছিল, কিন্তু হয়নি। একসময় আমি ভাল ক্রিকেট খেলতাম। খেলায় জিততাম, কিন্তু সিলেকশন কমিটির মধ্যে যে দলাদলি আর ঘোরপ্যাঁচ, তাতে জিততে পারিনি। ভাল খেলেও বাংলা দলে কখনও চান্স পাইনি। রাধানগরের ছেলে, ধরাধরি করার লোক ছিল না। আমার হয়ে কে বলবে? আমি তো সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। তাদের হয়ে বলার লোক আজও নেই। আমার বাবা স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। আজকের দিনে এটা বলবার মতো কোনও পরিচয় নয়। কিন্তু একদিন ছিল। সেই দিনটা আজ আমরা হারিয়ে ফেলেছি। এখন আমি স্রেফ একজন কাগজের হকার। দেরিতে কাগজ পেলে যারা আমাকে বকাবকি করে তাদের অনেকেই আমার বাবার ছাত্র। টাইফয়েডে অনেকদিন ভুগে শরীরটা গেল। লেখাপড়ায় ভাল করতে পারিনি। কলেজে পড়ার সময় বাবা মারা গেলেন। তারপর থেকেই...’
. কেষ্টদা বলল, ‘বুড়িদের স্কুলে আমিও পড়েছি, গদাইও পড়েছে। মেয়েদের জন্য সকালবেলা, ছেলেদের জন্য দুপুরবেলা। স্কুলের জমিটা আমাদের। বাবা স্কুলের জন্য দিয়ে দিয়েছিলেন। একসময় মনে হত খুব মহৎ কাজ করেছেন আমার বাবা। কিন্তু এখন মনে হয় মহৎ কাজ নয়, চরম বোকামি করেছিলেন। স্কুলে বাবার একটা ছবি পর্যন্ত নেই। ওই জমিটা এখন থাকলে আমি রাধানগরের বড়লোকদের একজন হতে পারতাম।'
কেষ্টদা চুপ করে বসে রইলেন। কেউ কোনও কথা বলছে না। কেষ্টদা দু’হাতে মুখ ঢেকে চুপ করে বসে আছে। কিছুক্ষণ পর মুখ তুলে বলল, ‘তোরা আমাকে ভুল বুঝিস না। সাইকেল চালানো থেকে তোর ছুটি নেই। আরও কয়েক মাস চালাতে হবে। তারপর...’ গদাই জিজ্ঞেস করল, 'তারপর?’
কেষ্ট মিত্তির উত্তর দিল, ‘তারপর তোর ট্রেনিং। আমি তোর মধ্যে দিয়ে জিততে চাই। তোর জেতা মানে শুধু গদাধর ঘোষ নামে একটা ছেলের জয় নয়। তোর জেতা খানে অবলম্বনহীন, অসহায় এবং নির্যাতিত মানুষের জয়। তোর মধ্যে দিয়েই আমি সেই ছেলেমেয়েদের বুকে স্বপ্ন তৈরি করতে চাই, যারা স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছে। সেজন্য তোকে দানবের মতো খাটতে হবে।'
গদাই আর বুড়ি কোনও ব্যাপারটাই ঠিকমতো বুঝতে না পেরে অবাক চোখে কেষ্টদার দিকে তাকিয়ে রইল। কেষ্টদা আস্তে আস্তে চোখ তুলল। বুড়ি আর গদাইকে দেখল। কিন্তু কেউ কোনও কথা বলল না। শান্ত হয়ে আসা রাধানগরের বুকে তখন ট্রেনের একটা হুইসল ক্ষীণভাবে সকলের কানে এল। ওরা জানে দুরন্ত গতির কোনও মেল ট্রেন তখন রাধানগর স্টেশন পেরিয়ে যাচ্ছে।
বিজ্ঞাপনটা কাগজে গদাইও দেখেছিল কিন্তু তার কিছু মনে হয়নি। বিজ্ঞাপনটা ভুলে যেতেও সময় লাগেনি। কিন্তু সেদিনই বিকেলবেলা রাধানগর স্টেশনে গিয়ে কেষ্টদা দাঁড়াল গদাইয়ের সামনে। গদাই তখন চোঙা মুখে বলে যাচ্ছে, ‘পেট শান্ত তো জগৎ শান্ত। পেটের গন্ডগোল থাকলে আপনার কোনও কিছুতেই শান্তি নেই। অম্বল, চোঁয়া ঢেকুর, পেট ফাঁপা, ইত্যাদি অসুখ থেকেই ভবিষ্যতে আপনার বড়রকমের অসুখ হতে পারে। যার জন্য হাজার হাজার টাকা খরচ করেও আপনি সম্পূর্ণ নিরাময় হতে পারবেন না। সেজন্যই ঘরে একটা করে অম্লনাশক ফাইল রাখুন। এটি যদি কোনও বড় কোম্পানির কাছ থেকে কিনতেন, তা হলে দশ টাকায় কিনতে হত। কিন্তু আমার কাছ থেকে পাবেন মাত্র দু’ টাকায়। কারণ, বিজ্ঞাপনের খরচ নেই, বড় কোম্পানির বড় বড় ব্যাপার নেই। রেডিয়োতে, টিভিতে প্রচারের জন্য আমাদের খরচ করতে হয় না। যদি হত, তাহলে এই ফাইলের দামও দশ থেকে বারো টাকা হত। আপনারা কী চান? নিরাময়ের জন্য প্রকৃত ওষুধ, না কি নামকরা কোম্পানির নাম। নামকরা কোম্পানি গিলে খেলেই কি অসুখ সারবে? বড় কোম্পানির ওষুধ আর আমার কোম্পানির ওষুধ একই কোয়ালিটি। তাহলে কেন বেশি দামে আপনি বড় কোম্পানির ওষুধ কিনবেন? আপনারা শিক্ষিত লোক। আপনারা তো বোকা নন। কেন তাহলে বোকামি করবেন?’
কেষ্ট মিত্তির দেখল পরপর চার-পাঁচটা অম্লনাশক বিক্রি হল। কেষ্ট মিত্তির মনে মনে হিসেব করে দেখল, পাঁচটা অম্লনাশক বিক্রি থেকে বোতল প্রতি পঁচাত্তর পয়সা, মানে তিন টাকা পঁচাত্তর পয়সা, মানে তিন টাকা পঁচাত্তর পয়সা এখনই রোজগার হয়ে গেল।
লেকচার থামিয়ে গদাই কেষ্টদার দিকে তাকাল। কেষ্ট মিত্তির বলল, ‘তোর সঙ্গে কথা আছে।'
গদাই বলল, ‘কী কথা?’
কেষ্ট মিত্তির বলল, ‘কাল থেকে বাইকে করে গোপালকে সঙ্গে নিয়ে আমি যাব জংশনে কাগজ আনতে।'
গদাই আহত গলায় বলল, ‘আমি?’
কেষ্ট মিত্তির বলল, ‘তোর তখন অন্য কাজ। কলকাতা থেকে কালই একজন লোক আসবে। তোকে তার সঙ্গে থাকতে হবে।'
গদাই অবাক চোখে তাকাল। তারপর বলল, ‘আমি সঙ্গে থেকে কী করব?’
কেষ্ট মিত্তির বলল, ‘সে তোকে সকালে আর দুপুরে ট্রেনিং দেবে।'
গদাই আরও অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কীসের ট্রেনিং?’
কেষ্ট মিত্তির বলল, ‘সাইকেলের। আসছে জানুয়ারির বাইশ তারিখে তোকে কম্পিটিশনে নামতে হবে। কলকাতা থেকে রাধানগর পৌরসভা, মানে বাহান্ন কিলোমিটার সাইকেল রেসে তোকে প্রথম হতে হবে। একটা সাইকেল কোম্পানি এটার আয়োজক। ওরাই পুরস্কার দেবে। এখানে যে প্রথম হবে কোম্পানি তাকেই অল ইন্ডিয়া কম্পিটিশনে এই রিজিয়ন থেকে পাঠাবে। প্রত্যেক স্টেট থেকে একজন করে। কিন্তু তার আগে তোকে বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ান হতে হবে। কাল থেকে তোর ট্রেনিং শুরু হবে। তার মানে তুই ট্রেনিংয়ের সুযোগ পাবি তিন মাস এগারো দিন।'
গদাই বলল, ‘কেষ্টদা, কম্পিটিশনে আমার খুব ভয়। যদি আমি না পারি?’
কেষ্টদা বলল, ‘তোকে পারতেই হবে। জংশন থেকে সাইকেলে করে জিনিস আনা, আমার বাইকের সঙ্গে তোকে সাইকেলে আসতে বলা, এগুলোর পেছনে আমার একটা উদ্দেশ্য ছিল। তুই সেটা নষ্ট করে দিতে পারবি না। তুই জেগে ওঠ। মনে কর, তোর সাইকেলের সামনে থাকবে তোর মা আর বুড়ি।'
গদাই চমকে উঠল। কেষ্টদার সঙ্গে বাড়িতে এল। মা গদাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘ভয় নেই গদাই। আমি থাকব তোর সাইকেলের সামনে। বুড়িও থাকবে।'
বুড়ি বলল, ‘দাদা আমি থাকব তোমার রডের ওপর। খুব ছোটবেলায় তুমি আমাকে তোমার সাইকেলের সামনের রডে চাপিয়ে কত দূরে দূরে বেড়াতে নিয়ে যেতে। মনে করো সেদিনও তাই হবে।'
গদাই সবার মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ বুজে ফেলল। তারপর অস্ফুটে বলল, ‘বেশ, তাই হবে। আমি চেষ্টা করব।'
কলকাতার ট্রেনার বলল, ‘এই সাইকেলে হবে না। রেসিং সাইকেল চাই।'
গদাই বলল, ‘স্যার, এতে করেই আমি প্রায় সতেরো থেকে আঠারো কিলোমিটার রোজ যাতায়াত করি।'
ট্রেনার বলল, ‘আমি জানি। কিন্তু ওতে কম্পিটিশন জেতা যায় না। তার জন্য অন্য টেকনিক দরকার। সেজন্যই তো কেষ্টবাবু আমাকে এখানে এনেছেন।'
ট্রেনার মানে গুরু। গুরুকে অমান্য করা যায় না। কিন্তু রেসিং সাইকেল কোথায় পাবে গদাই? গদাই কথাটা বলবার জন্য তার ট্রেনার আদিত্য ঘোষালের দিকে তাকাল। আদিত্য বলল, ‘সাইকেলের ভাবনা তোমায় ভাবতে হবে না। তুমি এই সাইকেলেই আজ প্র্যাকটিস করো।'
গদাই জানে সাইকেল চালাতে পায়ের শক্তি আর দম লাগে। এতে আর বিশেষ কোনও ট্রেনিং লাগে কি? কিন্তু পরপর কয়েকদিন প্র্যাকটিস করার পর সে বুঝে গেল এতে অনেক অনেক ব্যাপার আছে, যা তার জানাই ছিল না। সাইকেলে ওঠবার আগে রোজ সকালে খালি হাতে কিছুক্ষণ ব্যায়াম করতে হয়। পায়ের ব্যায়াম, পেশি সঞ্চালনের ব্যায়াম, এরকম আরও অনেক কিছু। দিন দশেক নিজের সাইকেলে প্র্যাকটিস করার পর একদিন বিকেলে লাল রঙের রেসিং সাইকেল নিয়ে মাঠে এল কেষ্ট মিত্তির আর রমেন পাত্র। রমেন পাত্রকে দেখে গদাই অবাক!
কেষ্টদা বলল, ‘আমি আর রমেন মিলে এটা তোর জন্য কিনলাম। তুই কিন্তু মান রাখিস।' গদাই দু’জনের মুখের দিকে তাকাল। রমেন পাত্র গদাইয়ের পিঠে হাত রেখে বলল, 'তুই হচ্ছিস আমাদের প্রতিনিধি। আমরা যারা রোজ সকালে কাগজ নিয়ে বাড়ি বাড়ি ছুটি, তুই তাদের লোক। তোর মধ্যে দিয়ে আমরা জিতব। তুই আমাদের সবাইকে জিতিয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা নিয়ে সাইকেলে উঠবি।’
গদাই অবাক চোখে দু’জনকে দেখতে লাগল, তার মুখ দিয়ে কোনও কথা বের হল না। সকালে দু’ ঘণ্টা ট্রেনিংয়ের পর বাদামতলা লাইনে বেরোতে খুব কষ্ট হয় গদাইয়ের। কিন্তু না বেরুলে তার সংসারের চাকা তো বন্ধ হয়ে যাবে। যদিও আদিত্যদা ট্রেনিংয়ের পর টানা বিশ্রাম নিতে বলেছেন, কিন্তু তার জীবনে বিশ্রাম কোথায়?
একদিন বাদামতলার রাস্তায় বাইক নিয়ে গদাইয়ের পথ আটকে দাঁড়াল কেষ্ট মিত্তির। চড়া গলায় ডাকল, ‘গদাই, সাইকেল থেকে নেমে আয়।'
গদাই নেমে এল। কেষ্টদা বলল, ‘তোর ট্রেনার তোকে ট্রেনিংয়ের পর লাইনে বের হতে বারণ করেছিল?’
গদাই উত্তর দিল না। কেষ্টদা গর্জন করে উঠে বলল, ‘যা জিজ্ঞেস করছি তার উত্তর দে।” গদাই অপরাধীর মতো মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, 'হ্যাঁ।'
বাইক থেকে নেমে এসে গদাইয়ের গালে সজোরে একটা চড় মেরে কেষ্টদা বলল, ‘তবে কেন লাইনে বেরোলি? আমি তো তোকে সন্ধের পর প্ল্যাটফর্মে বসতে বারণ করিনি। তুই কেন আমাদের এত লোকের স্বপ্ন মিথ্যে করে দিবি! তুই কি ভাবিস আমি তোর সংসারের কথা জানি না, না কি ভাবিনি!’
গদাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ থেকে জলের ফোঁটা পড়তে লাগল রাস্তার ধুলোয়। কেষ্টদা নিজের হাতটা অস্থিরভাবে একবার মুঠো করছে, একবার খুলছে। বাইকের পেছন থেকে জগাকে নামিয়ে দিয়ে কেষ্টদা বলল, ‘সাইকেল ওকে দে। তোর কাজ জগা করে দেবে। তুই আমার বাইকের পেছনে আয়।'
কেষ্টদা গদাইকে বাইকের পেছনে চাপিয়ে নিজের বাড়িতে এল। দোতলার সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বলল, ‘আয়, ঘরে আয়।'
ঘরের মধ্যে তখন কেষ্টদার ছেলে পাপু বসে বসে খেলা করছিল। কেষ্টদা পাপুর দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘তুই পাপুকে জানিস। আমার ছেলে। পোলিওতে ভোগে। ওর বয়সের ছেলেরা যখন ছোটে, দৌড়োয়, পাপু তখন জানলা দিয়ে দেখে। চিকিৎসার ত্রুটি করিনি, তবুও পাপুকে এখনও সারিয়ে তুলতে পারিনি।'
কেষ্টদা থামলেন। তাঁর ভেতরে যে উত্তেজনা আছে সেটা কথা বলার ধরন দেখেই বোঝা যায়। কিন্তু এসব কথা কেন বলছে কেষ্টদা? গদাই মনে মনে ভাবল, ‘এসব কথা তো তার জানা।’ কিন্তু মুখে কিছু বলল না। কিন্তু পরক্ষণেই গদাইয়ের মনের কথাটা কেষ্টদা মুখে বলে ফেললেন, ‘এসব কথা কেন বলছি জানিস? ওই দেখ, পাপুর খেলনা বলতে এখন কেবল কয়েকটা খেলনা-সাইকেল। সকাল-বিকেল যে খেলাটা ও খেলে, তাতে ওর গদাইকাকু কেবলই জিতে যায়। গদাই, ওই অসহায় ছেলেটাও তোর মধ্যে দিয়ে বাঁচতে চায়। উঠে দাঁড়াতে চায়। আমরাও চাই। জংশনের রমেন পাত্র থেকে রাধানগরের কেষ্ট মিত্তির, বেকারি ভ্যান-টানা মাধব সবাই চায় তোর মধ্যে দিয়ে জীবনে একবার জয়ের স্বাদ পেতে। রাধানগর আর জংশনের সব লাইনের ছেলেরাই আমাদের টাকা দিয়েছে ওই রেসিং সাইকেলটা কেনার জন্য। খেটে খাওয়া লোকের ভালবাসা আর স্বপ্নকে তুই মিথ্যা করে দিবি?’
গদাই আর থাকতে পারল না। দু’হাতে কেষ্টদার পা জড়িয়ে ধরে ভেজা গলায় বলে উঠল, ‘আমি লড়ব কেষ্টদা। আমি সবার জন্য লড়ব। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও।'
কেষ্টদা গদাইকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতেই বলল, ‘তোকে একটা চড় মেরেছি কিন্তু সেটা দ্বিগুণ হয়ে আমারই বুকে লেগেছে। তোকে আমরা আর হারতে দেব না। সব ক’জন কাগজের হকার, ট্রেনের হকার সবাই তোর সঙ্গে আছে। তুই একা নোস, সবার হয়ে তুই এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা কর। বাইশে জানুয়ারির আগে পর্যন্ত আমি তোর সংসার দেখব। আমার একমুঠো জুটলে তোর মা আর বুড়িরও জুটবে।'
গদাই বাড়িতে ফিরে এল। তার সামনে এখন কঠিন চ্যালেঞ্জ। সে কখনও এইরকম ব প্রতিযোগিতায় নামেনি। তার সঙ্গে যারা নামবে তারা সকলে মোটামুটি পেশাদার। তাদের অভিজ্ঞতা অনেক। এই ক’দিন ট্রেনিংয়ের পর সে বুঝেছে অভিজ্ঞতার একটা দাম আছে। সে একদিন আদিত্য ঘোষালকে বলল, 'স্যর, ধারে কাছে এরকম কোনও কম্পিটিশন হলে একদিন দেখা যায় না?’
আদিত্য ঘোষাল বলল, “নিশ্চয়ই দেখা যায়। দেখি ধারে কাছে কোথাও হচ্ছে কি না!’ গদাই রাত্রে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। বুড়ি তার স্কুলের পড়া তৈরি করতে থাকে। সে চোখ বুজে সেসব শুনতে শুনতে কখনও কখনও জিজ্ঞেস করে, ‘বুড়ি, ভারতে ক’টা স্টেট, মানে রাজ্য?
বুড়ি উত্তর দেয়, ‘পঁচিশটা। আমি বলে যাচ্ছি তুই গোন, অন্ধ্রপ্রদেশ, অরুণাচলপ্রদেশ, অসম, বিহার, গোয়া, গুজরাত, হরিয়ানা, হিমাচলপ্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর, কর্নাটক, কেরালা, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, ওড়িশা, পঞ্জাব, রাজস্থান, সিকিম, তামিলনাড়ু, ত্রিপুরা, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ। এ ছাড়া আছে কেন্দ্রশাসিত আরও সাতটা রাজ্য।’ বুড়ি জানে না, বুঝতে পারে না, কিন্তু গদাই মনে মনে আরও একটা পরীক্ষার জন্য নিজেকে তৈরি করতে চায়। হঠাৎ পড়া থামিয়ে বুড়ি বলে, ‘জানিস দাদা, আজকে আমাদের বাংলার দিদিমণি জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'তোমার দাদা নাকি সাইকেল রেসে নাম দিচ্ছে?’
গদাই জিজ্ঞেস করে, ‘কেমন করে জানলেন? তুই বলেছিস?’
বুড়ি বলে, ‘আমি বলিনি। কেষ্টদার মুখে শুনেছেন।'
গদাই বলে, ‘কেষ্টদা এমনভাবে রটিয়ে বেড়াচ্ছে, যেন আমি বাজি জিতে গেছি। এরপর যদি উলটোটা হয়, তা হলে আর পাড়ায় মুখ দেখানো যাবে না।'
বুড়ি অভিযোগ করার সুরে বলে, ‘তোর কিন্তু ছোড়দা, আগে এসব ছিল না। তুই চিরকাল বলতিস, কাজে নামার আগে ভয় করলে চলে না। নেমে পড়ে লড়াই করে কাজটা উদ্ধার করতে হয়।'
গদাই মনে মনে বলল, ‘হ্যাঁ, সেইরকম ভাবতাম। আজও ভাবি। কিন্তু সবাই মিলে যা করছে তাতে ভয় হয়।'
গদাই চুপ করে আছে দেখে বুড়ি জিজ্ঞেস করে, ‘ছোড়দা, কিছু ভাবছিস?’ গদাই বলে. ‘না।’
বুড়ি বলে, ‘জানিস, আমি আর আমার বন্ধু রাখী দু’জনে মিলে একটা বাজি ধরেছি।' গদাই নিস্পৃহ গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘কার সঙ্গে? কী নিয়ে বাজি?’
বুড়ি বলে, ‘আমাদের বন্ধু মিতালির সঙ্গে আর বাজিটা তোকে নিয়ে। মিতালি বলেছে এটা স্টেট কম্পিটিশন। অনেক অর্গানাইজেশন তাদের ছেলেদের পাঠাবে। তোর দাদা তো যাবে স্রেফ রাধানগর স্পোর্টস ক্লাবের ব্যানারে। কেউ চেনেই না! এসব কম্পিটিশনে কম্পিটিটার কোত্থেকে আসছে, পেছনে কারা আছে এসব খুব জরুরি। বড় বড় অর্গানাইজেশনের লোকেরা জিপগাড়ি নিয়ে পাশে পাশে থাকবে। অনেকরকম ব্যাপার ঘটে। ওর দাদা নাকি বলেছে, এখানেও নানাভাবে ফাউল হয়, জুয়াচুরি হয়। ওর দাদাকেও নাকি ব্যাডমিন্টনে এইভাবেই হারানো হয়েছিল।'
গদাইয়ের কাছে ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য লাগল। সকলেই সাইকেল চালিয়ে কলকাতার রেড রোড থেকে রাধানগর পৌরসভা পর্যন্ত আসবে। যে আগে আসবে সেই ফার্স্ট হবে। এতে আবার ফাউল কী, জুয়াচুরিটাই বা হবে কেমন করে? ফুটবল খেলায় ফাউল হয়। অফসাইড থেকে গোল, কিন্তু রেফারি অফসাইড দিলেন না, এটা জুয়াচুরি হতে পারে। সাইকেল রেসে এসব কেমন করে হবে?’
কিন্তু বুড়ির কথাটা যে মিথ্যে নয়, সেটা আদিত্য ঘোষালকে জিজ্ঞেস করতেই টের পাওয়া গেল। গদাই বলল, ‘তাহলে? আমার ক্ষেত্রেও যদি এরকম হয়?’
আদিত্য বলল, ‘আমাদের তৈরি থাকতে হবে। আমি স্টার্টিং পয়েন্ট থেকে জিপে থাকব। ফাইনাল পয়েন্টে আগে পৌঁছব। তা ছাড়া একটা সুবিধে হচ্ছে, রেসটা রাধানগর থেকে শুরু হয়ে রেড রোড যাচ্ছে না। ওটা রেড রোড থেকে শুরু হয়ে রাধানগরে আসছে। রাধানগরের একজনই কম্পিটিটার, সে হচ্ছ তুমি। ইচ্ছাকৃত অন্যায় হলে রাধানগর খেপে উঠবে। রেড রোড থেকে রাধানগর আসছে কেন জানো?’ বলাই বলল, ‘না।’
আদিত্য বলল, ‘দুটো কারণে। ওই বাইশে জানুয়ারি বেলা একটায় ব্রিগেডে হেলিকপটার থেকে নামবেন প্রধানমন্ত্রী এবং কয়েকটা জরুরি মিটিং সেরে বেলা চারটের সময় আবার হেলিকপটারে উঠবেন। সেজন্য বেলা দশটার পর ওই অঞ্চলে কোনও কিছু করার পারমিশন নেই। রেড রোড থেকে তোমরা স্টার্ট করবে সকাল ছ'টায়। তারপর ওদিকের পার্ট শেষ। দ্বিতীয় কারণ হল, এই পাইওনিয়ার সাইকেল কোম্পানি, যাঁরা এটির উদ্যোক্তা তাঁরা রাধানগরেই একটি সাইকেল ফ্যাক্টরি তৈরি করবেন। সেজন্য রাধানগরটাকেই এঁরা নির্বাচন করেছেন।'
গদাই মনে মনে বিচলিত বোধ করল। এসব কথায় তো তার দুর্ভাবনা যাবে না। আর ব্যাপারটা বোধহয় ট্রেনারকে সে বোঝাতে পারছে না। তাই সন্ধেবেলা সে গেল মনা দত্তের চায়ের দোকানে। এই সময়টাতে কেষ্টদাকে এখানেই পাওয়া যায়। গদাই গিয়ে দেখল, কেষ্টদার সঙ্গে রমেন পাত্রও আছে। গদাইকে দেখে দু’জনেই বলল, ‘আর মাত্র কুড়ি দিন।’
গদাই তার উদ্বেগের কথা জানাল। কেষ্টদা গম্ভীর হয়ে গেল। রমেন পাত্র বলল, ‘কী বললি, জোচ্চুরি হবে? আমার আঠারোজন, কেষ্টর এগারোজন, কত হল?’
গদাই হিসেব করে বলল, ‘ঊনত্রিশ।’
রমেন পাত্র বলল, “ঊনত্রিশজন লাঠি হাতে মিউনিসিপ্যালিটির সামনে থাকবে। রাধানগর স্টেশনের বিশজন হকার। জোচ্চুরি বের করে দেব। আমাদের ইজ্জত নেই? আমাদের ছেলে যদি হেরে যায় যাবে, কিন্তু জোচ্চুরি করে হারালে অনর্থ বাধাব। কলকাতার টাই-পরা বিচারকদের টাই খুলে চণ্ডীতলার বাঁশবনে ছেড়ে দেব।'
কেষ্ট মিত্তির বলল, ‘রমেন, মাথা গরম করে এটা হবে না। বিভিন্ন পয়েন্টে আমাদের লোক রাখতে হবে। গদাইয়ের ট্রেনারের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলা দরকার।'
এরই মধ্যে চা তৈরি করতে করতে মনা দত্ত ফস করে বলে উঠল, ‘আইচ্ছা আমাগো গদাই যদি এক্কেবারে ফাস্ট হয়, তাইলে কি তোমাগো কাগজে গদাইয়ের ছবি ছাপা হব। কত লোকের তো হয়। গুণ্ডা, বদমাশের পর্যন্ত ছবি ছাপা হয়, তাইলে গদাইয়ের ক্যান হইব না?’
রমেন পাত্র লাফিয়ে উঠে বলল, ‘ঠিক। ফার্স্ট হলে গদাইয়ের ছবি ছাপতে হবে। এটা সংবাদপত্র বিক্রেতাদের দাবি। আমরা কি ফেলনা নাকি! চল, কালই গিয়ে সুবীর মিত্তিরের সঙ্গে কথা বলব।'
কেষ্ট মিত্তির বলল, ‘সে তো আবার স্পোর্টস এডিটর না হয় নিউজ এডিটর দেখাবে।' রমেন বলল, ‘দেখাক, আমরা দেখব না। আমরা অত এডিটর চিনি না। আমরা চিনি ওই সুবীর মিত্তির, জয়ন্ত ঘোষ, আরভিন আর সেনগুপ্ত সাহেবকে। কেষ্ট, তুই আমার ওপর ছাড়, আমি আরও পাঁচ-সাতজন এজেন্টের সই নিয়ে যাব। আমাদের লাইনের ছেলে কম্পিটিশনে নামছে। সবাই আমাদের সঙ্গে আছে। মালদায় আমার ভায়রা এজেন্ট। সবাই বলব।'
রমেন পাত্রর কথা যত শোনে, গদাইয়ের বুকের মধ্যে উত্তেজনা তত বাড়ে। এরা কি ধরেই নিয়েছে গদাই ফার্স্ট হচ্ছে? যদি না হয় তাহলে এদের দুঃখ সে কোন মূল্যে পুষিয়ে দেবে? গদাইয়ের মাথা ঝিমঝিম করে। সে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে, ‘আমি বাড়ি যাই।'
এর পরের দিনই সকালে মাঠে গিয়ে গদাই তার ট্রেনারের মুখে শুনল, ব্যারাকপুর গাঁধীঘাট থেকে শ্যামনগর খেলার মাঠ পর্যন্ত একটা সাইকেল রেসের প্রতিযোগিতা হচ্ছে। আয়োজন করছেন স্থানীয় দুটি ক্লাব। কলকাতার নামকরা অনেকেই অংশ নেবে।
গদাই বলল, ‘আমি কি দেখতে পাব?’
আদিত্য ঘোষাল বলল, ‘আমরা দু’জনেই যাব। এটা দেখে রাখা তোমার পক্ষে জরুরি।' সেদিনটা ছিল রবিবার। খুব ভোরে গদাই আর আদিত্য রওনা দিল ব্যারাকপুরের দিকে। আদিত্য সেখানে পৌঁছে দু’-একজনের সঙ্গে কথা বলার পর গদাইকে ডেকে বলল, ‘গদাই, চল আমরা জিপে করে রেসটা দেখি।'
গদাই একটু ভেবে নিয়ে বলল, 'স্যার, একটা সাইকেল পেলে আমি সাইকেল করে ওদের সঙ্গে যেতে যেতে রেসটা দেখতাম। তাতে বুঝতাম ওরা কত স্পিডে স্টার্ট করে এবং কততে ফিনিশ করে।'
আদিত্য প্রথমে অবাক হল। তারপর মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে বলল, ‘এই ক্লাবের সেক্রেটারি আমার বন্ধু। আমি ব্যবস্থা করছি।'
দশ মিনিটের মধ্যেই একটা রেসিং সাইকেল নিয়ে এল আদিত্য। বলল, ‘আমি পারমিশন নিয়ে এসেছি। ওরা স্টার্ট করার পাঁচ মিনিট পরে তোমাকে স্টার্ট করতে হবে। তুমি নেমে পড়ো। আমি জিপে আছি। তোমাকে যেতে হবে অন্য ট্র্যাক দিয়ে।'
শ্যামনগর খেলার মাঠে যখন প্রথম প্রতিযোগী লাল রঙের দড়িটা ছুঁয়ে ফেলল, গদাই তখন মাত্রই একশো গজ দূরে। সে ইচ্ছে করলেই আস্তে দড়ি ছুঁতে পারত। কিন্তু তার পক্ষে সেটা বেআইনি হয়ে যাবে। তাই সে একশো গজ দূরেই দাঁড়িয়ে পড়ল। ঠিক একশো গজ আগেই কালো রাস্তার ওপর সাদা চুন দিয়ে একটা দাগ টানা আছে। ওই দাগটাই বুঝিয়ে দেবে আর মাত্র একশো গজ। এই একশো গজ অতিক্রম করতে বালি আর আহিরিটোলা থেকে আসা দু’জনের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হল। কিন্তু তিরিশ গজ যখন বাকি, তখনই, বালির ছেলেটাকে পিছিয়ে দিল তার নিয়তি। সাইকেলের স্পোকের সঙ্গে একটা শুকনো পাতা জড়িয়ে গিয়ে তার গতি কমিয়ে দিল। খরখর আওয়াজ উঠল আর তখনই আহিরিটোলার ছেলেটা তিরবেগে এগিয়ে গিয়ে দড়ি ছিঁড়ে ওপারে গিয়ে থামল।
একশো গজ দূর থেকে একটি লড়াকু ছেলের এই করুণ ব্যর্থতা দেখে গদাইয়ের চোখেও জল এসে গেল। আদিত্য ঘোষাল জিপ থেকে নেমে এগিয়ে এল গদাইয়ের কাছে। গদাইয়ের সাইকেলে হাত রেখে বলল, ‘একেই বলে লাক। আড়াই কিলোমিটার বাকি থাকতে ওরা দু'জন গায়ে গায়ে এগোচ্ছিল। এক কিলোমিটার থাকতে দু’জনেই গতি বাড়াল। শেষ পর্যন্ত কী হত বলা যায় না! কিন্তু রাস্তা থেকে উড়ে আসা একটা শালপাতার ঠোঙা ছেলেটাকে জিততে দিল না। বালির ওই ছেলেটিকে আমি জানি। বরুণ বসি। বরুণ দু’ হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে চলেছে।'
গদাইয়ের মনটা বিষণ্ণ হয়ে গেল। সে তাকিয়ে দেখল, সাইকেল হাতে আরও প্রতিযোগী এবং কর্মকর্তারা শামিয়ানার নীচে ভিড় করে আছে। ফার্স্ট এডের বক্স নিয়ে, জলের বোতল আর টাওয়েল কাঁধে ভলান্টিয়াররা ছোটাছুটি করছে। ওই ভিড়ের মধ্যে বরুণকে দেখতে পেল না গদাই। তার মনে হচ্ছিল, সে একবার গিয়ে বরুণের পাশে বসে। তার গায়ের ঘাম মুছিয়ে দিয়ে বলে, ‘এটাকে হারা বলে না। লড়াইয়ের ক্ষেত্রে তুমি হারোনি। তোমার ভাগ্য তোমাকে আর এগোতে দেয়নি।'
কিন্তু বলা হল না। সব ইচ্ছার কথা প্রকাশ করা যায় না। বাড়ি ফিরে আসতে আসতে গদাই একটা চরম সত্য বুঝে গেল। লক্ষ্যমাত্রার দড়িটা না ছোঁয়া পর্যন্ত জয় কখনও হাতের মুঠোয় আসে না। মাত্র তিরিশ গজ পথও তোমার জয়কে থামিয়ে দিতে পারে, যেমন দিল বালির বরুণ বসিকে। তিরিশ গজ দূর থেকে ফিনিশিং পয়েন্টের লাল ফিতেটা বরুণ নিশ্চয়ই দেখতে পাচ্ছিল। কিন্তু তখনও বেচারি জানত না ওখানে তার আগে পৌঁছে যাবে অন্যজন। সাইকেলের স্পোক থেকে শালপাতার ঠোঙাটা সাইকেলের সিটে ওঠবার আগেই আরও একজন ঝড়ের গতিতে তাকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাবে। এরপর আর শরীরে উদ্যম থাকে না । বরুণ তাই দু’হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলেছিল। করে
সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরেই শুনল, আজও বিকেলে বুড়ির জ্বর এসেছে। আজ দু’দিন হল জ্বর হচ্ছে। কখনও হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে, কখনও-বা ঘাম দিয়ে জ্বর নেমে আসছে একশোতে। ওষুধ খেলেই জ্বর কমতে থাকে। কিন্তু ঘণ্টা দুই পর থেকেই আবার বাড়তে বাড়তে একশো তিন-সাড়ে তিন পর্যন্ত উঠে যায়। গদাই বাড়িতে না বসে ডাক্তারবাবুর কাছে গেল।
বুড়ির জ্বরটা কমছে না দেখে কেষ্টদা বলল, ‘গদাই, বুড়িকে নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। তুই তোর কাজ করে যা। রমেন আজ জংশন থেকে বড় ডাক্তার নিয়ে আসবে। তুই প্র্যাকটিসে যা।'
কেষ্টদা, রমেনদা, এমনকী তার ট্রেনার আদিত্য ঘোষালও বুঝতে পারে না, এখন এ অবস্থায় সে কীভাবে প্র্যাকটিসে মন দেবে! তার মন পড়ে আছে বুড়ির কাছে। আদিত্য একটা ছড়ি হাতে ছুটতে ছুটতে তার পিঠে মারে আর চিৎকার করে উঠে বলে, ‘পা থেকে প্যাডেল ফসকাচ্ছে কেন? তোমার পায়ে ওজন বেঁধে দিয়েছি, কিন্তু আজ পা স্লো হয়ে যাচ্ছে। স্পিড বাড়াও।'
আদিত্য এবার মোটর সাইকেলে চেপে গর্জন করে উঠে হুকুম দেয়, ‘আমার সঙ্গে চালাও। দু’ কিলোমিটার পর্যন্ত এক স্পিডে যাবে। আমি যেমন যেমন বাড়াব, তুমিও তেমন বাড়াবে। রেডি। ওয়ান, টু, থ্রি, কাম আপ...।'
গদাইয়ের মনে হয় বুড়ি বোধহয় তাকে ডাকছে। তার কানে ‘ছোড়দা’ ডাকটা যেন ভেসে আসতে থাকে। বাঘমারির খাল পর্যন্ত এসে সে থেমে যায়। আদিত্য বাইক থেকে নেমে এসে বলে, ‘এটা কী হল? তুমি কি আমার সঙ্গে অসভ্যতা করছ? আর মাত্র পাঁচদিন বাকি।' গদাই দু’ হাত জোড় করে আদিত্যকে বলল, 'স্যার, বুড়ির জন্য মন কেমন করছে। আজকে ছেড়ে দিন।'
আদিত্য ঘড়ি দেখল। এখান থেকে গদাইয়ের বাড়ি সওয়া দু’ কিলোমিটার তো হবেই। আদিত্য বাইক ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, ‘আয়, আমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে আয়। দেখি বুড়িকে তুই কতটা ভালবাসিস? যদি আমাকে বিট করতে পারিস তবে বুঝব তোর কথা সত্যি৷’
আদিত্য বাইকে স্টার্ট দিল। আদিত্য জানে সাইকেল নিয়ে বাইকের গতিকে বিট করা যায় না। গত বছর বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ান হয়েছিল বেহালার সুজিত দত্ত। শেষ দু’ কিলোমিটারে সুজিতের স্পিডটা তার মনে আছে। তাই দু’ কিলোমিটার আগে থাকতেই আদিত্য বাইকে সেই স্পিড তুলল। গদাই একটু আগেও তার গায়ের কাছাকাছি ছিল। কিন্তু এবার গদাই পিছিয়ে পড়তে লাগল। আদিত্য হাত নেড়ে চিৎকার করে ডাকল, ‘গদাই, বুড়ি ডাকছে। ছোড়দা ছোড়দা বলছে।'
আদিত্য এমনটাই আশা করেছিল। মাথা নিচু করে শরীরটাকে প্রায় সাইকেলের ওপর শুইয়ে দেওয়ার ভঙ্গি করে সে বাইকের পিছু ধাওয়া করছে। দূরত্ব কমে আসছে। এক হাত নাগালের মধ্যে গদাই এসে যাওয়ার পর আদিত্য বাইকের স্পিড বাড়াল। সুজিত দত্ত যে স্পিডে শেষ এক কিলোমিটার চালিয়েছিল, এখন তার বাইকের স্পিডটা তার চাইতে কিছু বেশি। স্পিড বাড়াবার আগে আদিত্য শুধু একবার মাত্র চিৎকার করে ডেকেছিল গদাইকে। কিন্তু একটু পরেই সে দেখল তার পাশ দিয়ে ঝড় তুলে গদাই তাকে ছাড়িয়ে নিজের বাড়ি যাওয়ার গলির মুখটায় পৌঁছে যাচ্ছে। আদিত্য দু’ চোখে খুশি নিয়ে গদাইকে দেখতে দেখতে বাইকের স্পিড কমিয়ে আনল।
বুড়ির জ্বর নিয়ে কেষ্টদার মতো রমেন পাত্র আর রাধানগর লাইনের ট্রেনের হকাররাও চিন্তায় পড়ল। কেষ্টদা বিষাদের গলায় বলল, ‘এরকম বাড়াবাড়ি অবস্থা হলে গদাইকে কম্পিটিশনে নামানো মুশকিল হবে। জোর করে নামালেও রেজাল্ট কী হবে জানি না!’ আদিত্য বলল, ‘কেষ্ট, আমার কিন্তু মনে হচ্ছে বুড়ির অসুখটা আমরা, অন্তত এই বাইশে
জানুয়ারি প্লাস পয়েন্ট হিসেবে কাজে লাগাতে পারি।'
‘দু’ চোখে বিস্ময় নিয়ে কেষ্ট মিত্তির বলল, ‘এটা আবার কেমন কথা?
আদিত্য কেষ্টকে শান্ত হওয়ার ভঙ্গি করল দু’ হাত তুলে। তারপর বলল, ‘গদাইকে ট্রেনিং দিতে গিয়ে একটা ব্যাপার বুঝেছি। ওর মধ্যে শক্তি কতটা, দিতে পারার ক্ষমতা কতখানি এবং নিজের সেই ক্ষমতাকে কখন কোন পরিস্থিতিতে কেমনভাবে বাড়াতে হয়, কেমন করে কাজে লাগাতে হয়, সে ব্যাপারে ওর কোনও সম্যক ধারণা নেই, প্রফেশনাল ট্রেনিং নেই। ওকে তার জন্য উসকে দিতে হয়, খেপিয়ে দিয়ে জেদি করে তুলতে হয়। কাল যেভাবে ও আমাকে বিট করেছে সেটা বেঙ্গলের চ্যাম্পিয়ান সুজিত দত্তের চাইতে বেশি স্পিড। এই স্পিডটা ওর মধ্যে আনতে হলে ওর দুর্বল জায়গাটাতে ‘হ্যামার’ করতে হবে। জীবনে দুটি জায়গাতে ও দুর্বল। এক হল মা, অন্য হল ছোটবোন বুড়ি। সাইকেলে ওঠবার আগে এমন একটা কিছু যদি করা যায় যাতে গদাই কালকের মতো তেতে উঠতে পারে। সেন্টিমেন্ট আর আবেগের চাইতে বড় ডোপ আর কিছু নেই। আমি সেইরকম একটা ডোপ ওকে দিতে চাই। বুড়ির অসুখটাকে তাই আমি একদিনের জন্য কাজে লাগাবার কথা ভাবছি।'
কেষ্ট মিত্তির বলল, ‘কিন্তু সেটা কেমন করে হবে?’ আদিত্য বলল, ‘সেটাই ভেবে বার করতে হবে। তোমরা ভাবো, আমিও ভাবছি।' কেষ্ট মিত্তির বলল, 'আর ভাবতে পারছি না। সবদিক থেকে এত টেনশন হচ্ছে! যা কপালে আছে তাই হবে। আমাদের তো পাথরচাপা কপাল।'
সন্ধ্যার আগেই বুড়ির রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে এল গদাই। রিপোর্টটা কেষ্টদার হাতে
দিয়ে বলল, ‘ডাক্তারবাবু আমায় কিছু বললেন না। তোমাকে আজই দেখা করতে বলেছেন।' কেষ্ট মিত্তির একবার আদিত্য ঘোষালের দিকে তাকাল। আদিত্য রক্তের রিপোর্টটা নিয়ে দেখতে দেখতে বলল, ‘চল একবার ঘুরে আসি।'
বাইকে ওঠবার আগে কেষ্ট মিত্তির বলল, ‘গদাই, তুই বাড়ি যা। কাল সকালে তোর তো আবার ট্রেনিং আছে!’
গদাইকে কোনও কথা বলবার অবকাশ না দিয়ে ওরা দু’জনেই বাইক চালিয়ে চলে এল ডাক্তারের কাছে। ডাক্তারের দিকে রিপোর্টটা বাড়িয়ে দিয়ে কেষ্ট বলল, ‘আমায় দেখা করতে বলেছেন?’
ডাক্তারবাবু রিপোর্টটি হাতে নিয়ে বললেন, ‘ওটা আমি দেখেছি। গদাইকে ইচ্ছে করেই কিছু বলিনি। গোটা রাধানগর জানে গদাই আর চারদিন পর একটা কম্পিটিশনে নামছে। আমি ওর মনোবল ভাঙতে চাই না।'
কেষ্ট মিত্তির বলল, ‘কী আছে রক্তের রিপোর্টে?'
ডাক্তারবাবু রক্তের রিপোর্টটা টেবিলে চাপা দিয়ে রেখে চোখের চশমা খুলতে খুলতে বললেন, ‘বুড়ির রক্তে যা পাওয়া গেছে তার নাম প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপ্যারাম। তার মানে এটাও ম্যালেরিয়া, তবে এটা থেকেই ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া হয়। সেটা খুব মারাত্মক। এই রাধানগরে তার চিকিৎসা হওয়া মুশকিল শুধু এই কারণে যে, এই রোগে যেসব ওষুধ জরুরি সেগুলি পাওয়া যায় না। আমি মিউনিসিপ্যালিটির হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে দেখেছি ভাগ্যক্রমে কিছু কুইনিন সালফেট ট্যাবলেট সেখানে আছে। তোমরা কালই বুড়িকে ওখানে ভর্তি করে দাও। ওই ট্যাবলেট দিয়ে দেখি কাজ হয় কিনা। না হলে...'
কেষ্ট আর্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘না হলে কী হবে?’
ডাক্তারবাবু রক্তের রিপোর্টটা নাড়াচাড়া করতে করতে বললেন, ‘ট্যাবলেটে কাজ না হলে ওকে ইঞ্জেকশন দিতে হবে। কিন্তু ওই ইঞ্জেকশন মানে কুইনিন হাইড্রোক্লোরাইড এখানে কোথাও পাবে না। পাবে শুধুমাত্র কলকাতায়। তাও মোটে সাত-আটটা দোকানে। ট্যাবলেটে অ্যাকশন না হলে ওই ইঞ্জেকশন লাগবেই।'
কেষ্ট মিত্তির বলল, ‘আপনি ভাববেন না। সব ব্যবস্থা আমি করে দিচ্ছি। আপনি শুধু বুড়িকে বাঁচিয়ে তুলুন, আর এই কথাটা গদাই যেন না জানে।'
ডাক্তারবাবু মাথা নেড়ে বললেন, ‘গদাই জানবে না।'
গদাই কম্পিটিশনে নামবার দু'দিন আগে বুড়ি ভর্তি হল মিউনিসিপ্যালিটির হাসপাতালে। হাসপাতালের বিছানার পাশে বসে বুড়ির মাথায় হাত রেখে গদাই ডাকল, ‘বুড়ি৷’
বুড়ি চোখ খুলে তার ছোড়দাকে দেখল। গদাইয়ের পেছনে ডাক্তারবাবু। তিনি বুড়িকে বললেন, 'বলো তো বুড়ি, তোমার দাদার সাইকেল রেস কবে?’
বুড়ি একটু ভেবে বলল, ‘বাইশে জানুয়ারি। আজ তো কুড়ি, তাই না? তার মানে মাঝে একটা দিন।’
গদাই বুড়ির চোখের কোণ থেকে জল মুছিয়ে দিয়ে বলল, ‘কাঁদিস না বুড়ি। তোর চোখে জল দেখলে আমার শরীরের শক্তি ফুরিয়ে যায়।'
বুড়ি ছোড়দার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল, ‘তুই জিতলেই আমি সেরে উঠব, দেখিস। কেষ্টদা বলেছে, প্রাইজটা এনে গদাই সবার আগে তোর হাতে দেবে। ওটা একবার বুকে চেপে ধরতে পারলেই আমার জ্বর পালিয়ে যাবে।'
গদাই ভেজা ভেজা গলায় জানতে চাইল, 'কে বলেছে এসব কথা? কেষ্টদা?’
পেছন থেকে ডাক্তারবাবু বললেন, ‘না, আমি। এরকম ঘটনা পৃথিবীতে অনেক ঘটেছে। অপার আনন্দ রোগকেও কখনও কখনও হারিয়ে দেয়।'
বুড়ি বলল, ‘ছোড়দা, প্রাইজটা নিয়ে তুই সবার আগে আমার কাছে আসবি তো? মা-ও সেদিন আমার কাছে থাকবে।'
গদাই কথা বলতে পারছে না। তার গলার কাছে একটা কষ্টের পিও যেন আটকে থেকে তাকে বোবা করে দিয়েছে। সে শুধু ঘাড় নাড়ল। তার চোখ ভিজে আসছে দুরন্ত কান্নায়। সে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে থেকে আস্তে আস্তে উঠে গেল।
একুশে জানুয়ারি রাত্রেই গদাই আর তার ট্রেনার আদিত্যকে কলকাতায় চলে যেতে হবে।
সকাল পাঁচটার মধ্যে হাজির হতে হবে রেড রোডে। কথা ছিল কেষ্টদাও যাবে। কিন্তু কেষ্টদা বলল, ‘তুই ভাবিস না। আমি বুড়ির জন্য থেকে গেলাম। সরকারদার জিপগাড়ি নিয়ে ভোরেই রওনা হব। তোর বউদি কাল সকাল থেকে বুড়ির কাছে থাকবে।'
গদাই জিজ্ঞেস করল, ‘কিন্তু পাপু? ওকে কে দেখবে?’
কেষ্টদা বলল, ‘আমার দিদিকে এনেছি। দিদি থাকবে বাড়িতে। তোদের সঙ্গে রাত্রে রমেন দেখা করবে।'
আদিত্য ঘোষাল গদাইকে নিয়ে দুপুরের পরেই এসে উঠল তালতলায়, তার এক বন্ধুর বাড়িতে। আসবার সময় ট্রেনের ভেন্ডারদের জন্য যে কামরা থাকে তাতে করে সাইকেলটা নিয়ে এল। স্টেশনের জনাকয়েক হকারও এল গদাইয়ের সঙ্গে ‘গদাই জিন্দাবাদ’ করতে করতে। ট্রেনের হকার-বন্ধুরা ইতিমধ্যেই গদাইকে নিয়ে ছড়া বেঁধেছে, ‘আমরা হকারের দল।/গদাই আমাদের সম্বল।/গদাইয়ের সাইকেল চলছে।/মেহনতি জনতা জাগছে।'
আদিত্য ঘোষাল তালতলায় এসেই বলল, 'চল, তোর সাইকেলটা কার্ত্তিক মোদকের দোকানে দিয়ে চেক করিয়ে নিই।'
কার্ত্তিক মোদক একেবারে শুকনো বাঁশের মতো খটখটে চেহারার লোক। আদিত্যকে দেখেই বলল, ‘অ্যাই যে গুরু, পেন্নাম হই।'
আদিত্য সাইকেলটা এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘এই ছেলেটা আমার ছাত্র। কাল বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ানশিপের...'
কার্ত্তিক মোদক হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘ব্যস, ব্যস, আর বলতে হবে না। তালতলা আর ট্যাংরার দুটো ছেলে সাইকেল চেক করাতে দিয়ে গেছে। ওরাও কাল নামবে।'
আদিত্য বলল, ‘এই গদাই হচ্ছে রাধানগর গাঁয়ের ছেলে। খুব গরিব। ওকে জিততেই হবে। তুমি ভাল করে চেক করে দিয়ো।'
কার্ত্তিক মোদক গদাইয়ের দিকে একবার দেখে নিয়ে বলল, ‘এখন তো সবাই ধর্মতলার শিবে গাঙ্গুলির কাছে যায় কম্পিটিশনের সাইকেল চেক করাতে। ওই শিবেটা আবার কী সব কমিটি-ফমিটিতে আছে। ব্যাটা কাজ শিখল আমার কাছে আর আমাকেই বলে কিনা, তুমি সাইকেল রেসের কিছু বোঝো? যুগ বদলে গেছে। আমি বলি, যুগ বদলেছে বলে কি সাইকেলের চাকা হ্যান্ডেলের মাথায় উঠেছে, না আগের জায়গাতেই আছে। যদি তাই থাকে তবে আমার পাঁচশো গজের মধ্যে তুই ঘেঁষতে পারবি না। ব্যাটা আবার রেস-ক্টেস হলে নিজের দোকানের নামে ফ্রি টুপি বিলোয়। আমি বলি, আমাকে টুপি দিয়ে কাজ পেতে হয় না। আপসে কাজ আসে।'
আদিত্য-বলল, ‘কাল কখন আসব?’
কার্ত্তিক মোদক বলল, 'আমি তো দোকানেই শুয়ে থাকি। আসা-আসির কিছু নেই। তোমার সময়মতো এসে দরজায় ঘা মারবে, আমি উঠে যাব।'
তারপর একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে গদাইয়ের সাইকেলটা দেখতে দেখতে বলল, ‘এটাকে এখনই চেক করে রাখছি। চাকার হাওয়া আমার বুদ্ধিমতো দেব তো?’
আদিত্য বলল, ‘নিশ্চয়ই। আমি তো তোমাকেই গুরু মানি।'
এবার কার্ত্তিক মোদক গদাইয়ের দিকে এগিয়ে এসে বলল, ‘দেখ বাবা, এসব রেস-টেস অনেক দেখেছি। চুয়াল্লিশ ছাড়িয়ে পঁয়তাল্লিশে পা রাখছি। আমার বাবা সারাজীবন এই দোকান চালিয়েছে। আমারও তা প্রায় চব্বিশ বছর হয়ে গেল সাইকেল ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে। কম্পিটিশনের ক্যারেক্টার আমি জানি। তোমার গুরু তোমাকে কী বলেছে জানি না। ওখানে গিয়ে নিজের জিনিস মানে নিজের সাইকেল নিজের কাছে রাখবে। একদম হাতছাড়া করবে না। নিজের বাপ বললেও না। কে কখন ব্রেক নষ্ট করে দেবে, কে টায়ারে পিন ফুটিয়ে রাখবে তা জানতেও পারবে না। তা ছাড়া দলবাজি, ক্লাব পলিটিক্স এসব তো আছেই। এতেই তো বাঙালির স্পোর্টসের সাড়ে সব্বোনাশ হয়ে গেল।'
কার্ত্তিক মোদকের দোকান থেকে ওরা দু'জনে তালতলায় বন্ধুর বাড়িতে ফিরে এল বিকেল চারটে নাগাদ। এখানে এসে গদাইয়ের অন্যরকম অভিজ্ঞতা হল। ওরা ফিরে আসতেই একজন বৃদ্ধামতো মহিলা মাথায় ঘোমটা টেনে দিতে দিতে আদিত্যকে বললেন, ‘তোমরা আবার ফিরে এলে কেন? বউমা বলল, তোমরা নাকি রাত্রে থাকবে?’
আদিত্য বলল, ‘আজ্ঞে, হ্যাঁ মাসিমা। আজ রাতটা থাকব। টেলিফোনে জয়ন্তর সঙ্গে সেইরকম কথা হয়েছে।'
সেই মাসিমা বললেন, ‘জয়ন্ত কে? এই বাড়ি তো আমার। এখনও তো নিকে-পড়ে ছেলেকে দিইনি। আমার আজ্ঞা ছাড়া তোমরা কার ভরসায় থাকতে এলে? তোমাদের এখানে থাকা হবে না। এটা কি ধর্মশালা?’
আদিত্য আদৌ বিচলিত হল না। সে বলল, 'আমি তো জয়ন্তর বাড়িতে থাকতে আসিনি। আমি এসেছি আমার মাসিমার বাড়িতে। ছেলে মায়ের কাছে আসবে, এতে আরার আজ্ঞা লাগবে কেন?’
মাসিমা গদাইকে দেখতে দেখতে বললেন, 'এ ছেলেটি কে? এটাকে কোত্থেকে জোটালে?’
আদিত্য গদাইকে ইশারা করল প্রণাম করতে। ইশারা বুঝে গদাই ঢিপ করে একটা প্রণাম করল। আর তাই দেখে মাসিমা বললেন, ‘প্রণামে চিঁড়ে ভিজবে না বাছা। তুমি প্রণাম করলে আমি আশীর্বাদ করলুম। এবার নিজের পথ দেখো। অজানা-অচেনা ছেলেকে রাত্তিরে বাড়িতে থাকতে দেব না। এই তো সেদিন, দুটো জোয়ান ছেলে টেলিফোনের লোক সেজে বাড়ির মধ্যে ঢুকে বাড়ির মালিক, আমারই মতো বয়স, তাকে হাত-পা বেঁধে সর্বস্ব লুটে নিয়ে গেল। এন্টালিতে এটা ঘটল। আর এ তো রাতের বেলা। না বাপু এই ছেলেকে বিদেয় করো। তুমি থাকতে চাও থাকো, কিন্তু এই ছোঁড়াকে রাখব না। এন্টালিতে দিনে যা ঘটল তা কি তালতলায় রাতে ঘটতে পারে না? নিশ্চয়ই পারে।'
গদাই এখানে একেবারে নতুন। সে তার সার আদিত্যর দিকে তাকায়। আদিত্য ইশারায় তাকে চুপ করে থাকতে বলে। জয়ন্তর স্ত্রী এসে বলে, ‘মা, এই ছেলেটার কথা আমি আর আপনার ছেলে আপনাকে বলেছিলাম। ওর নাম গদাই। মানে গদাধর। ও কাল সাইকেল রেসে নামছে।'
মাসি খেঁকিয়ে উঠে বললেন, 'তোমার ওই মাইকেল রেস-ফেস বুঝি না। রেস-খেলা-ছেলেরা কি ভাল হয়? ওকে এখনই তাড়াও।'
গদাই বুঝল এই মাসি কানেও কম শোনেন। গদাই বলল, ‘মাইকেল নয়, সাইকেল।' এবার আঁতকে উঠে মাসি বললেন, 'আমি বুঝেছি, এবার বউমা তোমরা বোঝো। সাইকেল নিয়ে এসেছে। যাতে জিনিসপত্র ওই সাইকেলে চাপিয়ে চম্পট দিতে পারে। দেখো বাপু, তুমি এখনই বিদেয় হও। একদণ্ডও তোমাকে রাখা যায় না।'
ঠিক সেই সময় জয়ন্ত এসে পড়ল। ওর স্ত্রী অর্থাৎ মঞ্জু বলল, ‘তুমি এবার তোমার মাকে সামলাও। ছেলেটা কাল সকালে কম্পিটিশনে নামবে আর আজ রাতেই তাকে তাড়িয়ে দিচ্ছে।'
জয়ন্ত বলল, ‘মাকে তো জানো। প্রথম প্রথম সব ব্যাপারে এরকমই করে। আমি দেখছি।' মঞ্জু বলল, ‘আর কী দেখবে! আদিত্যর কাছে লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে।'
জয়ন্ত বলল, ‘আদিত্য আমার মাকে বিলক্ষণ চেনে। ওকে নিয়ে ভাবনা নেই।' মঞ্জু বলল, ‘কিন্তু ওই ছেলেটা কী ভাবছে বলো তো!’
জয়ন্ত বলল,‘সে আমি ম্যানেজ করে নেব।'
জয়ন্ত তার মাকে ডেকে নিয়ে গেল। কী বলল, কী বোঝাল, সেসব কথা গদাই জানে না। গদাই শুধু বলল, ‘স্যার, আমি তো আপনার বাড়িতেও থাকতে পারতাম!'
আদিত্য বলল, ‘আমার বাড়ি বাঁশদ্রোণীতে। ওখান থেকে কখন রওনা দিতে হত জানো? তা ছাড়া এই বাড়িটা আমার কাছে পয়া এবং এখান থেকে রেড রোড কাছে।'
গদাই বলল, ‘কিন্তু উনি তো আমাকে রাখতে চাইছেন না। তার চেয়ে বরং কার্ত্তিক মোদকের দোকানে শোওয়ার ব্যবস্থা করুন।'
আদিত্য বলল, ‘তুমি ঘাবড়াচ্ছ কেন? আমি তো আছি।'
গদাই বলল, ‘রমেনদা বলেছিল, কলকাতায় থাকার জায়গা না পেলে প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিটে কাগজের অফিসের রিসেপশন কাউন্টারে তোকে শোওয়ার ব্যবস্থা করে দেব। রাত জাগতে আমার কষ্ট হয় না। কিন্তু কাল তো...’
গদাইয়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই পাশের ঘর থেকে মাসিমা ‘গদাই, গদাই’ বলতে বলতে ঘরে এসে বললেন, ‘শোন, তোর কথা আমার ছেলে আর বউমা বলেছিল বটে ! কিন্তু সাইকেল-ফাইকেল বলেনি। তুই বাছা কিছু মনে করিস না। আমার তো সব কথা স্মরণে থাকে না। তবে হ্যাঁ রে ছেলে, তোর বাড়িতে কে আছে?’
গদাই বলল, ‘আমার মা আর আমার ছোট বোন বুড়ি। জানেন মাসিমা, আমার ছোট বোনের খুব অসুখ। হাসপাতালে আছে। শুধু ওর জন্যই এই কম্পিটিশনে নামছি। মা আর ওই বোনই হল আমার সব।'
মাসিমা চোখ পিটপিট করে গদাইকে দেখতে দেখতে বললেন, ‘রাত্তির সাড়ে আটটা বাজবে তুই ঘুমিয়ে পড়বি। আমার স্বামী, মানে জয়ন্তর বাবা, সাঁতার কেটে বিস্তর প্রাইজ পেয়েছে। সাঁতারের আগের দিন ন'টার মধ্যে শুয়ে পড়ত। তোকেও শুতে হবে। এই বাড়ি থেকে যারা কম্পিটিশনে গেছে তারা কেউ খালি হাতে ফেরেনি। তুই যদি ফিরিস তাহলে তুই কিন্তু আমার হাতে বেদম মার খাবি। তালতলার মল্লিকবাড়ির বদনাম করতে পারবি না।”
গদাই অবাক চোখে মাসিমার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অস্ফুটে বলে উঠল, ‘মা, তুমি কি সবজায়গায় আছ?’
আদিত্য গদাইকে একটা চেয়ারে বসতে বলে নিজে বসল গদাইয়ের মুখোমুখি। জয়ন্ত বসল গদাইয়ের পাশে। আদিত্য বলল, ‘আজ রাত্রে তোর খাবার হল ভাত, আলুসেদ্ধ আর গ্রিন স্যালাড। কার্বোহাইড্রেট এখন তোর শরীরে দরকার। আর ইলেকটোরাল জল, মধু এবং গ্লুকন ডি মিশিয়ে আমি বোতলে জল তৈরি করে রাখব। রাত্রে তেষ্টা পেলে ওটা খাবি। কোনও কারণে ঘুম ভাঙলে ওই জল খাবি। সে তোর তেষ্টা পাক আর না পাক। সাইকেলে ওঠার চার ঘণ্টা আগে কলা, ডিম সেদ্ধ এসব খেতে হবে। সাইকেল রানে যেতে হলে একটা কথা মাথায় রাখবি। কথাটা হল ‘ইট বিফোর ইউ আর হাংরি অ্যান্ড ড্রিঙ্ক বিফোর ইউ আর থাস্টি।'
গদাই তার সারের কথা মন দিয়ে শুনছিল। জয়ন্ত এবার গদাইয়ের, পাশ থেকে বলল, ‘রাত্রে ভাল ঘুম আর সকালে পরিষ্কার করে বাথরুমের কাজটা হয়ে গেলেই জানবে তুমি লড়াইয়ের জন্য শরীরকে বারো আনা তৈরি করে ফেলেছ।'
ঠিক এই সময় ঘরে এলেন মাসিমা আর জয়ন্তদার স্ত্রী। তিনজনকে চা দেওয়া শেষ হতেই মাসিমা বললেন, ‘শোন বাছা গদাই, কাল সকালে আমি তোর গলায় মা বিপত্তারিণীর সুতো বেঁধে দেব। জয়ন্তর বাবা বলত সাঁতারেও নাকি খুব ল্যাং-মারামারি ছিল। সে তো হচ্ছে গিয়ে জলে। ডাঙাতেও কিন্তু এসব হয়। ওদিকে চোখ খুলে রেখো। এই অনামুখো দেশে কাজ করার চেয়ে কাজ ভণ্ডুল করার লোক বেশি। কেবল দলাদলি আর হরেকরকম আইনের ছলাকলা। ইচ্ছে করে খ্যাংরা দিয়ে’
জয়ন্তর ঘরের টেলিফোনটা বেজে উঠল। জয়ন্ত টেলিফোন কানে নিয়েই বলল, ‘আছে।' তারপর টেলিফোনটা আদিত্যকে দেখিয়ে বলল, ‘তোর ফোন।’
আদিত্য উঠে গিয়ে টেলিফোন ধরল। গদাই বুঝতে পারল না তার সার কার সঙ্গে কথা বলছেন। টেলিফোন নামিয়ে রেখে আদিত্য বলল, ‘গদাই, আমি একটু বেরুচ্ছি। ফিরতে দেরি হলে তুমি কিন্তু খেয়ে নেবে এবং আটটার মধ্যে শুয়ে পড়বে। তোমাকে তিনটের সময় আবার খেতে হবে। তার মানে উঠতে হবে তিনটের আগে।'
গদাই জিজ্ঞেস করল, 'স্যার, কে ফোন করেছিল?’
আদিত্য উত্তর দিল, ‘রমেন পাত্র।'
গদাই চমকে উঠে প্রশ্ন করল, ‘রমেনদা, কিন্তু কোত্থেকে?’
আদিত্য বলল, ‘কাগজের অফিস থেকে। বলল জরুরি। দেখে আসি কী ব্যাপার।' আদিত্য চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে কাপটা শেষ করতে করতে গদাইয়ের দিকে একবার তাকাল, তারপর সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নেমে গেল।
তালতলায় রাস্তায় তখন ধোঁয়া আর কুয়াশা-ঘেরা মলিন সন্ধ্যা নামছে। সেজন্য রাস্তার পাশে যে ঘরটা এঁরা দিয়েছেন সেই ঘরেই আজ সে আর তার স্যার আদিত্য ঘোষাল রাত্রে শোবেন। এখন সে ঘরে একা। তার মন উড়ে উড়ে যাচ্ছে হাসপাতালে বুড়ির খাটের কাছে। খাটের ধারে সারা মুখে উদ্বেগ নিয়ে বসে আছেন তার মা। হয়তো কেষ্টদাও আছে। সে জানে মা আর বুড়ি ভাবছে তার কথা। ভাবছেন কলকাতায় কার বাড়িতে কেমন আশ্রয় পেল গদাই। হঠাৎ গদাইয়ের মনে হল, সে যদি ফার্স্ট হয় তাহলে সেই প্রাইজে হাত ছোঁয়ালেই কি বুড়ির অসুখ উধাও হবে? প্রবল আনন্দ কি মানুষের শরীরের রোগকে হার মানিয়ে দিতে পারে? কিন্তু যদি কালকের রেসে তার প্রতি কোনও অন্যায় হয়? সে যদি কোনও দলাদলির শিকার হয়ে পড়ে? গদাই বিচলিত বোধ করল।
আস্তে আস্তে বিছানার ওপর বসল। রাস্তার দিকের খোলা জানলা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস আসছে। জানলাটা ভেজিয়ে দেওয়ার জন্য জানলার কাছে যেতেই সে দেখল সামনের ফুটপাথে একটা লোক হাতে জিপসি বাজনা নিয়ে বাজাচ্ছে। লোকটার সামনে জনাকয়েক লোক দাঁড়িয়ে। লোকটার বগলে একখানা ক্রাচ। গদাই জানলার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। জানলা দিয়ে লোকটাকে দিব্যি দেখা যাচ্ছে। যদিও সন্ধ্যার মলিন অন্ধকারে তার গোটা চেহারাটা ততখানি স্পষ্ট নয়। মিনিট দেড়েক বাজাবার পর লোকটা গান ধরল। গদাই দেখল উলটোদিকের বাড়ির জানলা এবং বারান্দা থেকেও অনেকে গান শুনছে। লোকটা গাইছে, ‘কাঁদিস নে সোনা, কাঁদিস নে সোনা, ভারতবর্ষে জন্ম নেবে না/পেলে-মারাদোনা, প্লাতিনি আর বুরোচাগা জিকো-ট্রিগানা/কাঁদিসনে সোনা/ যে দেশেতে সব কিছুতে রয়েছে ভেজাল/ আর আছে পলিটিক্সের বেড়াজাল/ যেখানে নেই লজ্জা-ঘৃণা/সেখানেতে জন্ম নেবে না পেলে-মারাদোনা প্লাতিনি, বুরোচাগা জিকো-ট্রিগানা।'
গান শুরু হতেই লোকটার চারপাশে ভিড় বাড়তে লাগল। গদাই পলকহারা চোখে ওই ভিড়ের মধ্যে লোকটাকে দেখতে লাগল। গান শেষ হওয়ার পর দেখল, মাসিমা তার পেছনে দাঁড়িয়ে। মাসিমা বললেন, 'ওই কানাই গান শুরু করলে আমিও জানলায় এসেই দাঁড়াই এই গানটা নব বলে।'
গদাই বলল, ‘আমাদের ভারতবর্ষে একসময় তো অনেক বড় বড় লোক জন্মেছিল।'
মাসিমা বললেন, ‘জন্মেছিল, কিন্তু এখন আর জন্মায় না। এখনকার ছেলেগুলো সার দেওয়া সবজির মতন। দেখতে চকচকে, কিন্তু ভেতরে শাঁস নেই। বুকের আগুন জ্বলে ওঠে না। বারো পেরোলেই চোখে চশমা। মেয়েগুলো তো শরীরে অসুখের ডিপো বানিয়ে রেখেছে। বউমার তো হপ্তায় তিন দিন অম্বল, মাথাব্যথা, না হলে সর্দিকাশি। আর জয়ন্ত, এখনও তিরিশ পেরোল না, অথচ থেকে থেকে কোমর ব্যথা, দাঁতে যন্ত্রণা এসব লেগে আছে। আর ওর বাবা পঞ্চাশ বছর বয়সেও হেদোয় গিয়ে জুনিয়ার ছেলেদের সঙ্গে একঘণ্টা সাঁতার কাটতেন। তিন-চারতলা পায়ে হেঁটে তরতরিয়ে উঠে যেতেন। ওই ইলেকট্রিকের খাঁচায় চেপে উঠতে হত না। এ সবই হচ্ছে ভেজালের জন্যে। তোমার বুকের মধ্যে কি আগুন আছে? তাকে সময়মতো জ্বালাতে পারো? যদি পারো তাহলে কাজ হবে। নইলে লবডঙ্কা।'
মাসিমা যেমন এসেছিলেন, তেমনভাবেই আবার চলে গেলেন। গদাই একা ঘরে বসে বসে ভাবতে লাগল, ‘রমেনদা হঠাৎ কেন ফোন করল?’
সাতটার আগেই আদিত্য ফিরে এল। গদাই জিজ্ঞেস করল, ‘রমেনদা কী বলল?’ আদিত্য বলল, ‘তেমন কিছু নয়। ওরা মেল ট্রেনে কাগজ পাঠিয়ে দিয়ে একটা ম্যাটাডোরে করে রেড রোডে আসবে। হয়তো ওরাও যাবে আমাদের সঙ্গে।'
আদিত্য খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথাগুলো বলতে বলতে গায়ের কোটটা খুলে হ্যাঙারে রাখল। তারপর গদাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, 'আমি ময়দানের টেন্ট থেকেও ঘুরে এলাম। কাল ছ'টার বদলে সাতটায় রেস শুরু হবে। আজও সকাল ছ'টায় নাকি দারুণ কুয়াশা ছিল। তার মানে আমাদের পৌঁছতে হবে পাঁচটায় নয়, ছ'টায়।'
গদাই কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে বলল, ‘বুড়ির খবর কিছু জানতে পারলে?
আদিত্য অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে জামা খুলছিল। ওই অবস্থাতেই বলল, ‘না। আমার একদম খেয়াল ছিল না।'
গদাই বিছানার ওপর বসে পড়ল। তার মন ছুটে যাচ্ছে মিউনিসিপ্যালিটির হাসপাতালে। ওখানে বুড়ি আছে। বুড়ির শিয়রে জেগে আছেন তার মা। অথচ সে এখন কলকাতায়। আর মায়ের কাছ থেকে অনেক দূরে।
আটটা বাজবার আগেই মাসিমা এসে দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকলেন, ‘এই বাছা গদাই, তুমি খেতে এসো। আদিত্য, তুমিও এসো। সবাই একসঙ্গে খেয়ে নাও। সবাই আটটার মধ্যে মশারির ভেতর ঢুকে পড়ো।'
আদিত্য বলল, ‘গদাই তুমি নীচে নামো। আমি পাজামাটা গলিয়ে নিয়ে নামছি।'
গদাই নেমে গেল। আদিত্য দরজাটা বন্ধ করে রাধানগরে ডাক্তারবাবুর কাছে ফোন করল। ফোনে ডাক্তারবাবুকে পেতেই আদিত্য বলল, ‘ডাক্তারবাবু, আমি আদিত্য ঘোষাল কলকাতা থেকে বলছি। কেষ্ট মিত্র কি আপনার কাছে বসে আছে?’
ডাক্তারবাবু বললেন, ‘কেষ্ট তোমার ফোনের জন্য বসে আছে। এই নাও কেষ্টর সঙ্গে কথা বলো।'
আদিত্য বলল, “কেষ্ট, রমেন পাত্র তার লোকের হাত দিয়ে চারটে কুইনিন হাইড্রোক্লোরাইড ইঞ্জেকশন পাঠিয়ে দিয়েছে বুড়ির জন্য?’
কেষ্ট বলল, ‘সে তো পেয়ে গেছি। জরুরি বলে আমি পাঁচটা কিনতে বলেছিলাম।'
‘আদিত্য বলল, ‘পাঁচটাই কিনেছে। একটা আমার কাছে আছে। ওটা আমার তুরুপের তাস। ওটাকে কাজে লাগাব। আর একটা কথা, ডাক্তারবাবুকে রাজি করিয়ে ভোর সাড়ে তিনটে থেকে চারটের মধ্যে বুড়িকে দিয়ে একটা ফোন করাতে হবে এখানে। হয় বুড়ি নয়তো গদাইয়ের মা।
কেষ্ট বলল, ‘আমি ডাক্তারবাবুকে রাজি করাবার চেষ্টা করব।' আরও দু’–একটা কথার পর ফোন ছেড়ে দিল আদিত্য।
রাধানগরের কাশবনের মধ্যে দিয়ে বুড়ি ছুটতে ছুটতে আসছে। কাশবন আন্দোলিত করে বুড়ি ডাকছে, ‘ছোড়দা, ছোড়দা-আ-আ—।'
ছোড়দা তখন সাইকেলের ওপর। সাইকেলটা মেঘের মধ্যে দিয়ে ভাসতে ভাসতে ওপরে উঠে যাচ্ছে। বুড়ি ডাকছে, ‘ছোড়দা-আ-আ- ’ সাইকেলটা নামছে। আস্তে আস্তে নেমে এল মাটিতে। ছোড়দা হাত তুলে ডাকছে। বুড়ি দৌড়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। সে আবার চিৎকার করে ওঠবার আগেই ঘুমটা ভেঙে গেল বুড়ির। বুড়ি কয়েক মিনিট চুপ করে থেকে ডাকল, ‘মা!’
মা মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘এই তো আমি।'
বুড়ি বলল, ‘ছোড়দাকে স্বপ্ন দেখলাম। এখন ক’টা বাজে?’
মা ঘড়ি দেখে বললেন, ‘তিনটে বাজতে কুড়ি মিনিট বাকি।'
বুড়ি বলল, ‘মা, ছোড়দাকে কে ডেকে দেবে? ওকে তো তিনটেতে উঠতে হবে।' মা বলল, ‘সে ব্যবস্থা নিশ্চয়ই আছে। তা ছাড়া গদাই তো বাড়িতে থাকতেও তিনটের মধ্যে জেগে যেত। তুই ঘুমো।’
মা বুড়ির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। কিন্তু আজ এখন আর বুড়ির ঘুম আসছে না। তার চোখ জুড়ে কেবলই তার ছোড়দা আর একখানা লাল রঙের রেসিং সাইকেল। তাকে কি কেউ একটিবার রাধানগর মিউনিসিপ্যালিটির কাছে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে এসে প্রতিযোগিতা শেষ হবে। সে দেখতে চায় পঞ্চাশ কিলোমিটার পথ সাইকেল- দৌড়ে সকলকে পেছনে ফেলে তার ছোড়দা কেমন করে এসে দাঁড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে বুড়ির মনে পড়ে চণ্ডীতলা মাঠের সেই দৃশ্যটা। তার ছোড়দা হড়হড় করে বমি করতে করতে সাইকেলের ওপর লুটিয়ে পড়ছে। কালও কি তেমন কিছু ঘটবে? বুড়ি অস্থির হয়ে ওঠে। সে ঘামতে থাকে। একসময় চিৎকার করে ডেকে ফেলে, যেমন ডেকে ফেলেছিল চণ্ডীতলার মাঠে, ‘ছোড়দা—।'
তালতলার ঘরে উঠে বসে গদাই। তার পরিষ্কার মনে হয়েছে আর কেউ নয়, ‘ছোড়দা’ বলে বুড়িই তাকে ডেকে উঠেছে। এই জগতে আর কেউ তাকে ‘ছোড়দা’ বলে ডাকে না। কিন্তু বুড়ি এখানে আসবে কেমন করে! রাত্রে শোওয়ার আগে বুড়ির কথা ভাবছিল বলেই কি এমনটা হল! গদাই ঘড়ি দেখল। তিনটে বাজতে এখন দশ মিনিট বাকি। আদিত্যদার তৈরি জল বোতল থেকে কিছুটা খেয়ে গদাই আবার বিছানায় শুয়ে পড়ল। সে জানে তাকে তিনটের সময় উঠতে হবে। রাধানগরেও এই সময়েই তার ঘুম ভাঙে। গদাই শুয়ে শুয়ে কুড়ি মিনিট পার করল। বিছানা ছেড়ে ওঠবার আগেই দরজায় ধাক্কা পড়ল।
গদাই দরজা খুলে দেখল, গায়ে চাদর জড়িয়ে মাসিমা দাঁড়িয়ে। তিনি বললেন, ‘বাছা, তিনটে বাজে। তোর ট্রেনারকে ডেকে তোল।'
গদাই আবার জল খেল। একটু পরে চা। বাথরুম থেকে ঘুরে আসার পর আদিত্য বলল, ‘সব ঠিক আছে!’
গদাই ঘাড় নাড়ল। আদিত্য বলল, ‘তুমি তৈরি হতে থাকো। জয়ন্ত ভ্যান ডাকতে গেছে। ভ্যানে সাইকেল নিয়ে আমরা যাব।'
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল। আদিত্য লাফ দিয়ে গিয়ে ফোনটা ধরল। দু’-একটা কথার পরেই বলল, ‘গদাই, তোমার ফোন।'
গদাই তো অবাক! এ সময় তালতলাতে কে তাকে ফোন করবে? গদাই ফোন ধরল।
ফোনে বুড়ির গলা। কণ্ঠে সেই ডাক, ‘ছোড়দা, আমি বুড়ি। ফোন করে তোর ঘুম ভাঙাতে চেয়েছিলাম। আজ ছ'টায়-তো রেস।'
গদাই বলল, ‘ছ’টায় নয়। শুরু হবে সাতটায়। তুই কেমন আছিস?’
বুড়ি বলল, ‘ভাল আছি। আমার জন্য ভাবিস না। আমরা তোকে নিয়ে ভাবছি। তুই এখানে পৌঁছেই হাসপাতালে চলে আসবি। নে, মার সঙ্গে কথা বল।'
গদাই বলল, ‘মা, আমি যত তাড়াতাড়ি পারি রেস শেষ করে তোমাদের কাছে যাব।' মা বললেন, ‘তুই তাড়াতাড়ি আয় বাবা। ঠাকুর তোকে পবনদেবের গতি দান করুন। আমরা তোর পথ চেয়ে।'
গদাই-কথা বলতে পারল না। টেলিফোনটা নামিয়ে রাখার পরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ফোনটার দিকে।
বেরোবার মুখেই গদাই দেখল শাড়ি বদলে মাসিমা তার সামনে এগিয়ে এলেন বিপত্তারিণীর সুতো গলায় বেঁধে দিতে। তারপর বললেন, ‘ভ্যানে করে আমিও যাব রেড রোডে।'
জয়ন্ত বলল, ‘তুমি আবার কেন?’
মাসিমা ধমক দিয়ে উঠে বললেন, ‘তুই ফুট কাটিস না। দুধের ছেলেটা যাচ্ছে। ওর সঙ্গে মার যাওয়া দরকার। মায়েদের আশীর্বাদ ভগবানের তুল্য। তোরা আয়, আমি নীচে নামছি।'
কার্ত্তিক মোদক সাইকেল দেওয়ার সময় বলল, ‘সাবধানে যাবে। তোমার ট্রেনার কী বলেছে জানি না, কিন্তু এই রেসে কত রকমের জোচ্চুরি হয় তার একটু স্যাম্পেল দিয়ে রাখি। ওই যারা কর্মী-কর্তা গোছের, তাদের প্রত্যেকের নিজের নিজের ক্লাব আছে। কেউ নিরপেক্ষ নয়। ওদের লোক মোটরবাইক নিয়ে যায়। বেশি এগোলেই বাইক দিয়ে অবস্ট্রাকশন করবে, নয়তো ছোট্ট করে টোকা মেরে ট্র্যাকের বাইরে ছিটকে দেবে। লাস্টে যে থাকে, সে করে কী জানো, লরির পেছন ধরে নেয়। হাওয়া লাগছে না, অতএব দিব্যি লরির পেছনে অনেকটা এগিয়ে গিয়ে নিজেকে কভার করে ফেলে। এক-একটা ক্লাব থেকে হয়তো তিনজন নাম দিল। তার মধ্যে একজন হয়তো জেতার মতো ছেলে। বাকি দুটোর কাজ হচ্ছে অন্যদের ল্যাং মারা। মানে যেতে যেতে গায়ে পড়ে যাওয়া। বাইক নিয়ে পেছন থেকে পুশ করার কথা তো আগেই বললাম। এগুলো মাথায় রেখে এগোবে। আর একটা কথা, টায়ার পাংচার যখন-তখন হতে পারে। সেটা বদলাতে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ সেকেন্ড লাগা উচিত। এই সময়টা তোমাকে মেক-আপ দিতে হবে। পঞ্চাশ কিলোমিটারের মধ্যে শেষ দশ কিলোমিটার হচ্ছে লড়াই। তারপর পাঁচ এবং শেষ এক কিলোমিটার জান কবুল করা রেস। ভয় পেলে চলবে না। এবার মায়ের নাম করে বেরিয়ে পড়ো।'
আদিত্য বলল, ‘তোমারও তো যাওয়ার কথা। তুমি যাবে না?’
কাৰ্ত্তিক মোদক বলল, ‘তোমাদের সাতটা বলেছে তো, দেখবে আটটার আগে ফাইনাল স্টার্ট হতেই পারবে না। বড়জোর সাড়ে সাতটা। আমি যাব। গেলে দেখা হবে।'
রেড রোড-এ এক বিচিত্র দৃশ্য! গদাই এরকম আয়োজন কখনও দেখেনি। সাইকেল পরীক্ষার পর নম্বর এবং কার্ড নিয়ে স্টার্ট করতে করতে সাড়ে সাতটা হয়ে গেল। এই আধ ঘণ্টা দেরি হল একজন মাননীয় মন্ত্রীর জন্য। তিনিই স্টার্টের সিগন্যালটা দেবেন। তিনি এলেন সওয়া সাতটায়। তারপর কফি খেলেন, একাধিক লোকের সঙ্গে করমর্দন হল, ছবি তোলা হল, একটু ভাষণ দিলেন। এইসব করতে করতেই সাড়ে সাতটা বেজে গেল। তারপর তিনি পতাকা নাড়লেন, গুলি ফাটানোর আওয়াজ হল এবং মাইকে বাজনা বেজে উঠল। গদাই যখন সাইকেলে উঠতে যাচ্ছে তখন আদিত্য দৌড়ে এসে বলল, ‘তোর ব্যাগে এই ইঞ্জেকশনটা রাখ। এটার নাম ‘কুইনিন হাইড্রোক্লোরাইড’। এটা না হলে বুড়ি সেরে উঠবে না। কলকাতার অনেক দোকান খুঁজে এটা পেয়েছি। তুই তো রেসে সকলের আগে পৌঁছবি। তোর যা স্পিড আছে তাতে তোর লাগা উচিত এক ঘণ্টা পনেরো থেকে ষোলো মিনিট। মানে তোর ‘রিচিং টাইম’ হচ্ছে আটটা পঁয়তাল্লিশ মিনিট থেকে ছেচল্লিশ মিনিট। কিন্তু জেতার জন্য নয়, বুড়ির জীবনের জন্য তোকে পৌঁছতে হবে আটটা পঁয়ত্রিশ মিনিটের মধ্যে। দেরি হলে এই ইঞ্জেকশনটা...’
আদিত্য থেমে গেল। থমথমে মুখে গদাই আদিত্যকে দেখল। স্টার্ট করার সময় পা দুটো প্যাডেলে আটকে থাকে। এটা গদাই জানে। আটকানোর পদ্ধতিটাও তার জানা। সে স্টার্ট করল।
প্রথম এক কিলোমিটারের মধ্যে তাকে ছাড়িয়ে এগিয়ে গেছে তিনজন। পরের ব্যাচে আর দু’জনের সঙ্গে সমানভাবে যাচ্ছে গদাই। সে জানে, সার তাকে বলেছে, এইসব রেসে দু’-তিনজন ফল্স রানার থাকে। তারা প্রথমে এগিয়ে যায়। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে দম ফুরিয়ে এমন হাল হয় যে, শেষ পাঁচ কিলোমিটারের আগেই সে ফুরিয়ে যায়। এটাও এক ধরনের কায়দা। একই ক্লাবের দু’জন প্রতিযোগীর একজন, যে ফিনিশ করতে পারবে না, সে প্রথম দশ-বারো কিলোমিটার এই কায়দাটা করে অন্যদের টায়ার্ড করার জন্য। অতএব, গদাই সেই ফাঁদে পা দিল না। সে জানে শেষ পাঁচ কিলোমিটারটাই আসল।
প্রথম পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত গদাই চতুর্থ এবং পঞ্চমের মতো জায়গায়। সে ঘাবড়াল না। দশ কিলোমিটার শেষ করার পর গদাই একবার পেছনে তাকাল। পেছনে একঝাঁক সাইকেল আসছে। তার এক হাত সামনে বালির বরুণ বসি। তার পাশাপাশি যাচ্ছে বেহালার সুজিত নাগ। সুজিতই সকলের ফেভারিট। তারপর বরুণ। গদাইয়ের তেমন কোনও পরিচিত নেই। গোড়ার দিকে তার প্রতি কেউ নজর রাখেনি। কিন্তু তিরিশ কিলোমিটার ছাড়িয়ে আসার পর সে বুঝতে পারল, এবার কেউ কেউ তাকে নজর করছে। একটা মোটরবাইক এগিয়ে গিয়ে তার সামনে সামনে যাচ্ছে। গদাই ডানপাশে সরবার চেষ্টা করতেই পাশের সাইকেল থেকে ছেলেটা গালাগালি করল। গদাই বুঝতে পারছে সুজিত আর কসবার ছেলেটা তাকে বিট করে এগিয়ে যাচ্ছে। মোটর সাইকেলটা কিছুতেই গদাইকে এগোতে দিচ্ছে না।
গদাই দু’পাশে তাকাল। তখনই দেখল তার বাঁ পাশের রাস্তা দিয়ে একটা ছোট লরি এগোচ্ছে। লরির গায়ে লাল রঙের ফেস্টুন, তাতে লেখা: ‘সংবাদপত্র বিক্রেতা সমিতি'। লরির মাথা থেকে রমেন পাত্র আর অন্যান্যরা চিৎকার করছে ‘বাইকসুদ্ধু রাধানগরে পুঁতে রাখব। ব্যাটা রাস্তা ছাড়।'
ওই লরির পেছনেই আসছে ম্যাটাডোর। সেখানে ফেস্টুনে ‘রেলওয়ে হকার্স অ্যাসোসিয়েশন'। হকার বন্ধুরা চ্যাঁচাচ্ছে, ‘গদাই, বাইকওলার পিঠে থুতু দে।'
লরি আর ম্যাটাডোরের অত মানুষের প্রবল চিৎকারে বাইকটা বাঁদিকে সরে যেতে-না-যেতে গদাই তীব্রগতিতে তাকে অতিক্রম করে এল। লরি আর ম্যাটাডোর থেকে কাঁসর-ঘণ্টা বেজে উঠল। ওরা কোরাসে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘গদাইয়ের সাইকেল চলছে, মেহনতি জনতা জাগছে।/আমরা হকারের দল, গদাই আমাদের সম্বল।'
চল্লিশ কিলোমিটার শেষ করার সময় গদাই আছে চতুর্থ জায়গায়। সুজিত নাগ আর বরুণ বসি সকলের আগে এবং পাশাপাশি। গদাইয়ের পাঁচ হাত আগে আরও একজন। ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের এই গোয়ানিজ ছেলেটিকে সবাই ডাকে ‘ব্ল্যাক হর্স’ বলে। আদিত্য যে জিপে ম্যানেজ করে বসেছিল সেই জিপেই বিচারকদের দলটা ছিল। জিপের মধ্যে বসে মোনা নন্দী বলল, ‘ওই যে ব্ল্যাক হর্স, ওই কিন্তু শেষ পাঁচ কিলোমিটারে বাজি মারবে। বরুণ আর সুজিত নিজেদের মধ্যে রেস করতে গিয়ে দম ফুরিয়ে ফেলছে।'
পাইওনিয়ার সাইকেল কোম্পানির অমৃক সিং বলল, ‘ব্ল্যাক হর্সের পেছনে ওই ছেলেটা কে?’
আদিত্য বলল, ‘রাধানগরের ছেলে। নাম গদাই ঘোষ। মানে গদাধর ঘোষ।'
কথাটা শেষ করেই আদিত্য গদাইয়ের দিকে তাকাল। গদাইয়ের পেছনে আবার একটা
বাইক। বাইকটা গদাইয়ের পাশে। আদিত্য বলল, ‘এটা নোট করুন। ওই বাইকটা সুজিতের ক্লাবের। গদাইকে বাধা দেওয়ার জন্য আসছে।'
বিচারকরা বললেন, ‘আদিত্য, একটু বুঝে কথা বলো। তোমার গদাই কোনও তালেবর নয়। ও যে এতদূর এসেছে, এটাই যথেষ্ট! ওকে কেন বাধা দেবে?’
আদিত্য বলল, ‘মোনাদা, যদি কিছু ফাউল গেম হয়, তা হলে তার পরবর্তী দায়িত্ব আপনাদের। সংবাদপত্র আর রেল হকাররা মিলে রাধানগরে তাণ্ডব শুরু করবে।' মোনা নন্দী বলল, ‘তুমি হুমকি দিচ্ছ? তুমি কী চাও?’
আদিত্য বলল, ‘আমি চাই ফেয়ার গেম। আমি নিজে স্পোর্টসম্যান। আপনি নন। আপনি সোনার দোকানদার। আপনি স্পোর্টসের কিছু বোঝেন না। এখনই বাইকটাকে চলে যেতে বলুন। আমি জানি, ও গদাইকে পেছন থেকে পুশ করে ছিটকে ফেলে দেবে।'
মোনা নন্দী বলল, ‘তুমি তো বিশ্বজান্তা। ওই বাইকের লোকটা হচ্ছে, ‘অফিশিয়াল অবজারভার'।'
আদিত্য বলল, ‘প্লিজ মোনাদা, মাইকে ওকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিন। ওর মতলব আমি বুঝতে পারছি। এতে অনর্থ হয়ে যাবে।'
আদিত্য কথাটা শেষ করার আগেই গদাই ট্র্যাকের বাইরে ছিটকে পড়ল। মোটরবাইকটা গদাইকে পেছনে ফেলে হুশ করে চলে গেল। আদিত্য ঝাঁপিয়ে গিয়ে মাইকটা হাতে নিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু মোনা নন্দী মাইকটা কেড়ে নিয়ে বলল, ‘এটা মোটেই ভাল না। তোমার কিছু বলার নেই।'
আদিত্য বলল, ‘জিপ থামান। আপনার চালাকি আমি জানি। এরপরই মেডিক্যাল ভ্যানে গদাইকে তুলে দেবেন। আমি নেমে যাচ্ছি।'
জিপের গতি কমতেই আদিত্য লাফ দিয়ে জিপ থেকে নামল। ছুটতে ছুটতে গদাইয়ের কাছে এসে বলল, ‘গদাই এখনও সময় আছে। ওঠ, উঠে দাঁড়া। তোর সঙ্গে বুড়ির ইঞ্জেকশন বুড়িকে বাঁচাতে হবে। বুড়ি তোকে ডাকছে। ওঠ, উঠে দাঁড়া।’
গদাই চোখ মেলে তার স্যারকে দেখল। আস্তে করে বলল, 'ইঞ্জেকশনের কথাটা মনেই ছিল না!’
আদিত্য বলল, ‘বুড়ি কষ্ট পাচ্ছে। তোর একমাত্র বোন বুড়ি। সে ডাকছে ছোড়দা বলে।' ঠিক তখনই আকাশ, বাতাস এবং চারপাশের প্রকৃতি তোলপাড় করে একটা ডাক উঠল, ‘ছোড়দা-আ-আ-আ।'
গদাই অস্ফুটে বলল, ‘বুড়ি, আমি আসছি। তোর ইঞ্জেকশন আমার কাছে। আমি তোকে বাঁচিয়ে তুলবই। প্রাইজ চাই না, আমি তোকে বাঁচাতে চাই।'
গদাই সাইকেলে উঠল। আদিত্য বলল, ‘যত তাড়াতাড়ি পারিস বুড়ির কাছে যা। এই ইঞ্জেকশনটা আটটা পঁয়ত্রিশ মিনিটের মধ্যে ডাক্তারের হাতে পৌঁছনো দরকার। ডাক্তারবাবু তোর জন্য অপেক্ষা করছেন।'
গদাই স্টার্ট করল। লরি আর ম্যাটাডোর থেকে চিৎকার উঠল, ‘গদাই লড়ে যা। এই বাইকওলাকে রাধানগরে গিয়ে পালিশ করব। তুই লড়ে যা। আর মাত্র দশ কিলোমিটার।
গদাই তখন কুড়িজনের পেছনে। এখন আর তার চোখে জেতার স্বপ্ন নেই। তার চোখে একটা হাসপাতাল। সেই হাসপাতালের বিছানায় বুড়ি, মাথার কাছে তার মা। ডাক্তারবাবু ঘড়ি দেখছেন আর অপেক্ষা করছেন একটা ইঞ্জেকশনের জন্য। এখন গদাইয়ের কাছে কিলোমিটারের হিসেবটা কোনও মূল্য পাচ্ছে না। তার মগজে একটা সময় ঘুরছে। সেটা হল, আটটা পঁয়ত্রিশ মিনিট। গদাই শুধু ‘বুড়ি’ এই শব্দটা উচ্চারণ করল, তারপর বলল, ‘আমি আসছি।'
আদিত্য গিয়ে উঠল রমেন পাত্রর লরিতে। আদিত্য বলল, ‘আপনারা খালি চিৎকার করে যান। থেকে থেকে বলুন, গদাই, বুড়ি তোকে তাড়াতাড়ি আসতে বলেছে। তোর মা দাঁড়িয়ে আছে তোর জন্য।'
শেষ দশ কিলোমিটার বিশজনের পেছনে থেকে গদাই তার শেষ লড়াই শুরু করল। পাঁচ কিলোমিটার আগে গদাইয়ের সামনে মাত্র তিনজন। সুজিত, বরুন আর ওই ব্ল্যাক হর্স। লরির মাথা থেকে চিৎকার করে আদিত্য বলল, ‘গদাই, বুড়ি আর তোর মা তোকে ডাকছে। তুই কি বুড়িকে বাঁচাতে চাস না?’
গদাই একবার ঘাড় ফেরাল। তারপর কয়েক সেকেন্ড যাওয়ার পর ওর ঘাড়ে যেন একটা দানব ভর করল। আদিত্য বুঝল মসৃণ রাস্তা পেয়ে গদাই এখন প্রায় পঞ্চান্ন কিলোমিটার বেগে ছুটে যাচ্ছে। সুজিত, বরুণ এবং ওই ব্ল্যাক হর্স এই গতির সঙ্গে পেরে উঠবে না। সাধারণত এইসব রেসে শেষ এক কিলোমিটার অথবা দু’ কিলোমিটার এই গতিতে যায়। কিন্তু গদাই পাঁচ কিলোমিটার আগে থেকেই যে স্পিডটা তুলল সেটা শেষ পর্যন্ত রাখতে পারবে কী? আদিত্য মনে মনে চিন্তিত হল। শেষ এক কিলোমিটার আগে গদাই সুজিত নাগকে পেরিয়ে এল। এবার লড়াইটা বরুণ আর গদাইয়ের মধ্যে। সামনের রাস্তা মাত্র এক কিলোমিটার। বরুণ একবার পেছনে তাকাল। লরির মাথা থেকে রমেন পাত্ররা চিৎকার করে উঠল। আদিত্য দেখল গদাই বরুণকে খুব সহজে অতিক্রম করে এসেই হঠাৎ স্পিডটা বাড়িয়ে দিল। গদাইয়ের লক্ষ্য এখন আটটা পঁয়ত্রিশ। লরি আর ম্যাটাডোর থেকে চিৎকার উঠছে, ‘গদাই, গদাই, গদাই।'

কিন্তু ওদের সকলকে পেছনে ফেলে ফিনিশিং পয়েন্টের দড়ি ছিড়ে গদাই গিয়ে যখন সাইকেল দাঁড় করাল, তখন তার ঘড়িতে আটটা সাঁইত্রিশ। গদাই ইঞ্জেকশনটা বের করে বলল, ‘আমি আসছি।'
কিছুটা আসার পর ডাক্তারবাবু বললেন, ‘গদাই, ওটা আমাকে দাও। তুমি প্রাইজটা নিয়ে বুড়ির কাছে এসো। সেটা এই ইঞ্জেকশনের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হবে। উই আর ওয়েটিং ফর ইউ। তুমি এসো।'
গদাইকে ঘিরে তখন জনতার উল্লাস। কেউ তার ঘাম মুছিয়ে দেয়। কেউ হেলমেট খুলতে চায়। মাইকে তখন গদাধর ঘোষের নাম ঘোষণা করা হচ্ছে। গদাই চারপাশে তাকিয়ে কেষ্টদা আর আদিত্য স্যার-কে খোঁজে। কিন্তু এই ভিড়ের মধ্যে তাদেরকে দেখতে পায় না। শহরের গণ্যমান্যরা তখন গদাইকে ঘিরে। গদাইকে স্টেজে তুলতে চায়। গদাই অবুঝ বালকের মতো বলে, ‘কেষ্টদা, রমেনদা আর আদিত্য স্যার না এলে আমি স্টেজে যাব না। অতএব, মাইকে ঘোষণা হয়। ওরা আসে। ওদের চোখে জল। গদাইয়ের চোখ দিয়েও জল গড়াচ্ছে। গদাই বলে, ‘কেষ্টদা, এই ইঞ্জেকশনে বুড়ি সেরে উঠবে তো?’
কেষ্টদা মাথা নাড়ে। রমেন পাত্র বলে, ‘গোটা ভারত চষে ওষুধ আনব। তুই আমাদের মান বাড়িয়ে দিয়েছিস। আমরা সংবাদ ফেরি করি, কিন্তু আমরা কখনও সংবাদ হতে পারিনি। আমরা মরে গেলেও সংবাদপত্রে এক লাইন বেরোয় না। কিন্তু অনেক বদমাইশ লোকের খবর ছাপা হয়, আর সেটা আমরা বিলি করি। আজ তো তুই আমাদের সংবাদ।'
পরের দিনের সংবাদপত্রে গদাইয়ের ছবি ছাপা হল। সঙ্গে সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন। আর সেই কাগজ নিয়ে সাতসকালে বাদামতলার ঘরে ঘরে যথারীতি হাজির হল স্বয়ং গদাধর ঘোষ।
.
আনন্দমেলা, পূজাবার্ষিকী, ১৪০২
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন