অদ্রীশ বর্ধন

প্রশ্ন : দৈত্যদের গল্প জানো?
মা : জানি। লাল দৈত্য, সাদা দৈত্য আর কালো দৈত্য থাকে আকাশে…
প্রশ্ন : তবে যে সেদিন বলেছিলে, রূপকথায় সত্যি গল্প নেই?
মা : এই দৈত্যদের জন্ম হয় আকাশে—সূর্যর মত নক্ষত্রদের শেষের অবস্থায়—ব্ল্যাক হোল হয়ে যাওয়ার আগে।
প্রশ্ন : কীভাবে?
মা : সূর্যের কথা বলা যাক। সূর্য একটা নক্ষত্র। প্রতি সেকেণ্ডে ৬০০,০০০,০০০,০০০ কিলোগ্রাম হাইড্রোজেনকে ভেঙেচুরে ৫৯৫,৮০০,০০০,০০০ কিলোগ্রাম হিলিয়াম তৈরি করছে। হাইড্রোজেন যখন ফুরিয়ে যাবে, ভারি হিলিয়াম জমা হবে সূর্যের ঠিক মাঝখানে। গ্র্যাভিটেশনের টান আরও বাড়বে। মাঝখানটা আরও গরম, আরও ঘন হবে। উত্তাপ তেড়েফুঁড়ে বেরোতে চাইবে—বাড়তি উত্তাপের গলাধাক্কা খেয়ে সূর্যের বাইরের অংশ অনেক জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। বাইরের টেম্পারেচার কমে যাবে অনেকখানি জায়গা নিয়ে থাকার ফলে। এখন সূর্যের বাইরের দিকের তাপমাত্রা ৬০০০ ডিগ্রি সেণ্টিগ্রেড। তখন হবে ২৫০০। সূর্য তখন লালচে গোলা হয়ে থাকবে। নাম হবে, লাল দৈত্য।
প্রশ্ন : লাল দৈত্য সত্যি কি আছে আকাশে?
মা : Betelgeuse আর Antares তারা দুটোই লাল দৈত্য।
প্রশ্ন : কতখানি জায়গা নিয়ে ছড়িয়ে যাবে সূর্য?
মা : মঙ্গল আর শুক্র—এই দুটো গ্রহকে গিলে নেবে। পৃথিবীতে তখন থাকা যাবে না। তদ্দিনে অবশ্য মানুষ অন্য গ্রহে পালিয়ে যাবে, অথবা কৃত্রিম কলোনী বানিয়ে মহাশূন্যে ঘরসংসার করবে।
প্রশ্ন : যে দুটো লাল দৈত্যের নাম করলে, তাদের একজনও যদি সূর্যের জায়গা দখল করে?
মা : Antarcs এত বড় যে সূর্যের জায়গা নিলে সে বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গলকেও গিলে নেবে।
প্রশ্ন : লাল দৈত্য সূর্যের সব হাইড্রোজেন যখন ফুরিয়ে যাবে?
মা : তখন কাঁড়ি কাঁড়ি হিলিয়ামের ওপর গ্র্যাভিটেশনের প্রচণ্ড চাপে আস্তে আস্তে তা লোহা হয়ে যাবে। নিউক্লিয়র রিঅ্যাশন শিকেয় উঠবে, এনার্জি আর বে বাবে না। গ্র্যাভিটেশন টানছে ভেতরের দিকে—এনার্জি ছুটছে বাইরের দিকে…এই লেন্স আর থাকবে না। জোরদার হবে গ্র্যাভিটেশন। ফুলে-ফেঁপে ওঠা সূর্য অথবা লাল দৈত্য তখন গুটোতে শুরু করবে। গুটোতে গুটোতে ব্ল্যাক হোল হয়ে যাওয়ার আগে হবে সাদা দৈত্য আর কালো দৈত্য। বামন অবস্থায় পৌছে বাইরের টেম্পারেচার একই রেখে দিয়ে সাদা হয়ে যাবে সূর্য—হবে টিমটিমে বেঁটে সাদা দৈত্য। তারপর একদিন সে-ও ঠাণ্ডা হতে থাকবে—সাদা আভা আর থাকবে না—হয়ে যাবে কালো দৈত্য।
প্রশ্ন; আবার বলি, সত্যিই কি আছে সাদা দৈত্য?
মা : Sirius B আর Procyon B—এই দুটো নক্ষত্রই সাদা দৈত্য।
প্রশ্ন : সূর্যের কাছে ক’টা সাদা দৈত্য আছে?
মা : সূর্যের কাছে প্রায় ৩৫ আলোকবর্ষ জায়গা জুড়ে যে ৩০০টা তারা রয়েছে—তার মধ্যে ৮টাই সাদা দৈত্য।
প্রশ্ন : এই গ্যালাক্সিতে মোট ক’টা আছে?
মা : প্রায় চার বিলিয়ন। মোট নক্ষত্রদের ২ থেকে ৩ শতাংশই তো সাদা দৈত্য।
প্রশ্ন : এত সাদা দৈত্য কেন হল, মা?
মা : কয়লা ফুরিয়ে গেলেই যেমন উনুন নিভে যায়, পারমাণবিক জ্বালানি শেষ হয়ে গেলেও তেমনি সূর্য সাদা দৈত্য হয়ে যায়।
প্রশ্ন : সূর্য কবে নিভবে?
মা : সূর্যের জ্বালানি ফুরোতে কয়েক বিলিয়ন বছর লাগবে। এই গ্যালাক্সির ১৩৫ বিলিয়ন নক্ষত্র-র মাত্র চার বিলিয়ন তাদের জ্বালানির ভাঁড়ার শেষ করে দিয়ে সাদা দৈত্য হয়ে গেছে।
প্রশ্ন : আরও বেশি নয় কেন, মা?
মা : যে নক্ষত্র যত বড়, সে তত তাড়াতাড়ি লাল দৈত্য হওয়ার পর ধসে পড়ে। এটা তো ঠিক যে বড়রা সবসময়েই ব্যতিক্রমের মধ্যে পড়ে; ছোটদের মত গাদাগাদা দেখা যায় না, বা একই দলে পড়ে না। হাতিদের সংখ্যা কি মশাদের সংখ্যার সমান? বালিকণার চেয়ে পাহাড়ের সংখ্যা কি বেশি? গ্রহাণু বেশি না গ্রহ বেশি? বিশ্বসৃষ্টির সময়ে সবাই একভাবে তৈরি হয়নি—একই সময়েও হয়নি। নিশ্চয় নাবালক নইলে কোনকালে সাদা দৈত্য হয়ে যেত।
প্রশ্ন : Sirius B কি Sirius A নক্ষত্রর আগে তৈরি হয়েছিল?
মা : সুন্দর প্রশ্ন। একই সময়ে জন্মালেও, নিশ্চয় অতি পেল্লায় ছিল Sirius B—তাই গ্র্যাভিটেশনের টানে তাড়াতাড়ি জ্বালানি খতম করে দিয়ে সাদা দৈত্য হয়েছে, দোসর Sirius A এখনও গনগনে হয়ে রয়েছে। সাইজে সূর্যের ডবল, ডবল গরম, তিরিশ গুণ বেশি ঝকঝকে। সূর্যের জায়গায় বসলে Sirius A-র আঁচে পৃথিবীর সব সাগর শুকিয়ে যেত, পৃথিবী শ্মশান হয়ে যেত।
প্রশ্ন : তাহলে বলো, নক্ষত্রগুলো তৈরি হল কীভাবে?
মা : কসমিক এগ-এর বিস্ফোরণ থেকে।
প্রশ্ন : কসমিক এগ?
মা : কেউ বলেন আদিম পরমাণু, কেউ বলেন কসমিক ডিম। ব্রহ্মাণ্ড বললে ক্ষতি কী? প্রায় পনেরো বিলিয়ন বছর আগে নাকি এই ডিম ফেটে যায়। এই বিস্ফোরণকে বলা হয় ‘বিগ ব্যাং’। বিগ ব্যাং-এর পর থেকে ধুলো, গ্যাস ইত্যাদি গ্র্যাভিটেশনের টানে জমাট বাঁধতে বাঁধতে জন্ম দেয় গ্রহ-নক্ষত্রদের। বিস্ফোরণের রেশ এখনও চলছে। নক্ষত্রগুলো তাই ক্রমশ দূর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
প্রশ্ন : বিগ ব্যাং! গ্যালাক্সিগুলোও দূরে সরে যাচ্ছে?
মা : হ্যাঁ। একদিন নাকি গ্র্যাভিটেশনের টানের সীমারেখায় পৌছোলে আবার নিজে থেকেই গুটিয়ে আসতে থাকবে। ফিরে আসবে কসমিক এগ-এর মধ্যে। তারপর আবার তা ফাটবে। অনন্তকাল ধরে চলবে এই খেলা। ৮০ বিলিয়ন বছরে একবার করে গড়ে উঠবে আর ফেটে যাবে কসমিক এগ। এরই নাম Oscillating Universe। সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয়—সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয়। তারকার প্রসারণ আর বিস্ফোরণ, নোভা আর সুপারনোভা, নিউট্রন আর পালসার—এবং ব্ল্যাক হোল…সবই আসছে আর যাচ্ছে কসমিক এগ-এর সৃষ্টি, বিস্ফোরণ এবং সঙ্কোচনের লীলাখেলার মধ্যে।
প্রশ্ন : সাদা বা লাল দৈত্য হতে গেলে তাহলে কি বয়সটাই বড় ব্যাপার?
মা : মোক্ষম প্রশ্ন। বয়সটাই আসল কারণ না। কারও জ্বালানি আগে পোড়ে কারও পরে, নাকি কারও জ্বালানি কম থাকে কারও বেশি—এই সব হেঁয়ালির জবাব দিতে গিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একটা বর্ণালী শ্রেণীতে সাজালেন নক্ষত্রদের। ভাগ করা হল O,B,A, F,G,K আর M—এই ক’টা শ্রেণীতে। O শ্রেণীতে তারা-রা সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে ঝকঝকে, সবচেয়ে গরম, M শ্রেণীর তারা-রা সবচেয়ে ছোট, সবচেয়ে কম ঝকঝকে, সবচেয়ে কম গরম। প্রত্যেকটা শ্রেণীর মধ্যে রইল 0 থেকে 9 পর্যন্ত ভাগাভাগি। অর্থাৎ শূন্য থেকে নয় পর্যন্ত আরও দশটা শ্রেণী। আমাদের সূর্য পড়েছে G2 গ্রুপে। মানে, বয়স অনেক কম।
প্রশ্ন : এরা কি সবাই সমান?
মা : কী করে হবে? আমাদের এই গ্যালাক্সির চার ভাগের তিন ভাগ তারা M শ্রেণীতে অথাৎ ছোট তারা-দের দলে পড়ে। বড়রা তাহলে দলে হাল্কা। বড় হওয়ার ফলে তাদের ফুরিয়ে যাওয়ার ঝোঁকটা বেশি। সাদা দৈত্যরা তাই সংখ্যায় কম—বয়সটা এক্ষেত্রে মূল ব্যাপার নয়।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন