আকাশের আশ্চর্য আলো

অদ্রীশ বর্ধন

প্রশ্ন : মহাবিশ্ব থেকে এখনও কি পৃথিবীতে ভিনগ্রহীরা আসছে, মা?

মা : ভিনগ্রহী? ইংরাজিতে যাকে বলে Alien? গবেষণা চলছে পৃথিবী জুড়ে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর এই বিষয় নিয়ে। একদল বৈজ্ঞানিক কিন্তু উড়ন চাকির কল্পগল্পকে একদম পাত্তা দেননি। বলেছেন, পৃথিবীর আলো-কেই UFO মনে হয়।

প্রশ্ন : পৃথিবীর আলো-ই UFO? কী রকম আলো?

মা : যে-সব আলো থেকে বেরোয় না কোনো আওয়াজ। আকাশের আশ্চর্য আলো। নিঃশব্দে আর ভীষণ স্পিডে এই আলোরা আকাশপথে ছুটে যায় বলেই মাটির মানুষরা ধরে নিয়েছিল অন্য গ্রহের আকাশযান তারা, অর্থাৎ উড়ন চাকি বা UFO বছরের পর বছর দেখা দিয়ে আসছে বিশেষ বিশেষ এলাকায়। আশ্চর্য আলোর দিকে যাঁরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতেন, এঁদের মধ্যে ছিলেন আর্লিং স্ট্র্যাণ্ড নামে এক ভদ্রলোক। ইনি একদিন আলোর দিকে ছুঁড়ে দিলেন লেসার রশ্মি। সঙ্গে সঙ্গে দ্বিগুণ বেগে ফ্ল্যাশ দেখা দিয়েছিল উড়ন চাকিতে। অদ্ভুত আলো যেন লেসার রশ্মির মার খেয়েই উত্তেজিত হয়েছে। স্ট্র্যাণ্ড লেসার বন্ধ করে দিয়েছিলেন মিনিট কয়েক পরেই; সঙ্গে সঙ্গে আগের ছন্দে ফিরে এসেছিল উড়ুক্কু রহস্যের আলোর চমক।

প্রশ্ন : আর্লিং স্ট্র্যাণ্ড লেসার রশ্মি নিয়ে আশ্চর্য আলোর সঙ্গে লড়তে গেলেন কেন, মা?

মা : উনি যে প্রোজেক্ট হেসডালেন-এর লিডার। এটা একটা আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। সেন্ট্রাল নরওয়েতে হেসডালেন নামে একটা পাণ্ডববর্জিত উপত্যকা আছে। ১৯৮১ সাল থেকে সেখানকার আকাশে নিয়মিতভাবে দেখা দিয়ে চলেছে আলোর ছটা। প্রোজেক্ট হেসডালেন-এর উদ্দেশ্য আকাশ-রহস্যের ভেদ করা।

প্রশ্ন : হেসডালেন উপত্যকার আকাশে আলোর দল কি ছুটোছুটি করে উড়ন চাকিদের মত?

মা : হ্যাঁরে। নানা রঙের গোলকের আকার নিয়ে তারা হঠাৎ হাজির হয়ে যায় আকাশে—কোত্থেকে আসছে তা জানা যায় না। আচমকা আবির্ভূত হয়েই নিঃশব্দে টহল দিতে থাকে উপত্যকার মাথায়। কখনও-সখনও টহল মারবার আগে শূন্যপথে ঠায় ঝুলে থাকে আর দুলে দুলে ওঠে। তারপর আকাশ বেড়ানো শেষ হলেই আচমকা অদৃশ্য হয়ে যায় ঠিক যে ভাবে এসেছিল—সেইভাবে। এদের আবির্ভাব আর প্রস্থান দুটোই রীতিমত রহস্যজনক। এরকম প্রহেলিকাপুঞ্জ একটা-দুটো নয়—শয়ে শয়ে দেখা দিয়ে চলেছে হেসডালেন উপত্যকার আকাশে।

প্রশ্ন : খুবই রহস্যজনক আলো তো! বৈজ্ঞানিকরা কী ভাবছেন?

মা : তাঁদের বিশ্বাস, এ আলো নিছক দৃষ্টিবিভ্রম নয়—উড়ন চাকি অর্থাৎ UFO-রাই ঘন ঘন টহল দিচ্ছে উপত্যকার আকাশে। এদের খুঁটিয়ে দেখবার জন্য উত্তরের হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় ঠক্ ঠক্ করে কেঁপেও সেখানে নিয়ে গেছেন গাইগার কাউন্টার, সাইসমোগ্রাফ ইনফ্রারেড ভিউয়ার, লেসার থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। মডার্ন UFO রহস্যভেদীরা মাত্র পাঁচ সপ্তাহের মধ্যেই ১৯০ বার দেখেছেন টহলদার আকাশ-আলো—একশটারও বেশি ফটো তুলেছেন সেই সব আলোর। তাতেই তাঁদের বিশ্বাস হয়েছে স্রেফ আলো এরা নয়, রীতিমত উড়ন চাকি।

প্রশ্ন : বৈজ্ঞানিকরা যখন উড়ুক্কু আলোকে উড়ন চাকি বলছেন, তাহলে নিশ্চয় তার কারণ আছে?

মা : হেসডালেন আলোকের ধরন-ধারণ আচার-ব্যবহার দেখে মনে হয় না উড়োজাহাজ, স্যাটেলাইট বা নক্ষত্রদের আলো—মাটির ওপরকার গাড়ি থেকে অথবা দূরের খামারবাড়ি থেকে বিচ্ছুরিত আলোও নয়। কয়েকটা ক্ষেত্রে আলোদের শুধু চোখে দেখার পর রাডার দিয়ে যাচাই করে নেওয়া হয়েছে। সুতরাং তারা চোখের ভুল নয়। এ আলো যারা সৃষ্টি করছে, অবশ্যই তারা উড়ে যাচ্ছে আকাশে—সরকারি মহল তাদের কোনও খবর রাখে না—তাদের শনাক্ত করতেও পারছে না। সুতরাং তারা অবশ্যই এ যুগের বৃহত্তম বিস্ময়—UFO!

প্রশ্ন : স্ট্র্যাণ্ড সাহেব লেসার রশ্মি মেরে তাদের ভড়কে দিয়ে অঘটন ঘটাননি তো?

মা : নাটকীয় সংঘাত ঘটিয়েছেন ন’বার—সাড়া পেয়েছেন আটবার। ফলে উত্তপ্ত হয়েছে বৈজ্ঞানিকদের মস্তিষ্ক। তাঁরা এখন ভাবছেন, লেসারের মার খেয়ে সাড়া দেয় যখন, তখন কি ইনটেলিজেন্ট বলা যায় আশ্চর্য আলোদের? নাকি, কোনও ধীশক্তি, ভিনগ্রহী বা অন্য কিছু নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে এদের? প্রাকৃতিক কারণে আলোরা নেচে নেচে যাচ্ছে না তো? এখনো তাদের জুৎসই ব্যাখ্যা মেলেনি বলেই এত রহস্যজনক মনে হচ্ছে?

প্রশ্ন : ইনটেলিজেন্ট আলো? বৈজ্ঞানিকদের কলা দেখাতে পারছে না?

মা : তাও ঘটেছে বইকি। প্রোজেক্ট হেলেন-এর মূল সদস্য—লীফ হাভিক পাঁচবার লক্ষ্য করেছেন, আকাশের আলোরা যেন তাঁদের নজরে রেখেছে। যেই তাদের উপস্থিতি রেকর্ড করতে গেছেন, অমনি ফুস্ করে অদৃশ্য হয়ে গেছে। এ থেকেই তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস এসেছে—আশ্চর্য আলোদের বিলক্ষণ বুদ্ধিমত্তা আছে।

প্রশ্ন : একটু আগে বললে কেন পৃথিবীর আলোও UFO হতে পারে?

মা : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ব্রিটেনের হাজার হাজার ফ্লাইং সসারদের রিপোর্ট ঘাঁটাঘাটি করতে গিয়ে ব্রিটিশ গবেষক পল ডেভারক্স একটা নিশ্চিত ছক দেখতে পেয়েছিলেন তাদের আবির্ভাব আর তিরোধানের মধ্যে। UFO-দের বেশির ভাগই দেখা যায় সেই সব যেখানে ভূত্বকের দোষ রয়েছে অতিরিক্ত মাত্রায়—নানা রকম পাথুরে স্তরের মধ্যেকার ফাটাফুটো—ফলে মাটি কেঁপে ওঠে থর থর করে আর পাল্টে যায় পৃথিবীর ম্যাগনেটিক ফিল্ড। ডেভারক্স লক্ষ্য করলেন, বৃটেনে ঠিক এই সব জায়গাতেই রয়েছে সুপ্রাচীন মাটির তৈরি কারুকাজ আর পাথরের স্মৃতিসৌধ।

প্রশ্ন : ব্রিটেনের স্টোনহেঞ্জ নাকি এলিয়েনরা বানিয়েছে?

মা : ডোভারক্স নিজেও জানতেন এরকম বিশ্বাস অনেকের মাথাতেই শেকড় গেড়ে বসে আছে। পাথরের মনুমেন্ট বা স্মৃতিসৌধগুলো পৃথিবীর নানা জায়গায় নানা নামে পৃথিবীবাসীদের চক্ষু চড়কগাছ করে ছাড়ছে।

প্রশ্ন : ডেভারক্সের নিজের বিশ্বাস কী, মা?

মা : ওঁর ব্যাখ্যা এক্কেবারে দলছাড়া। মনুমেন্টগুলো তৈরি হয়েছিল কেন, এ-সম্বন্ধেও হাজির করেছেন খানকয়েক নতুন থিওরি। ১৯৭৫ সালে UFO পর্যবেক্ষণ শেষ করার সময়েও উনি কিন্তু মনের মত ব্যাখ্যা খুঁজে পাননি। ভূত্বকের দোষ যেখানে, উড়ন চাকিদেরও আবির্ভাব ঘটছে সেখানে—মাথার চুল খাড়া করে দেওয়ার মত এই যোগাযোগটা আবিষ্কার করার পরেও উনি ছিলেন রহস্যের আঁধারে। তখনও বিশ্বাস ছিল, সুপ্রাচীন স্মৃতিসৌধগুলোর পেছনে নিশ্চয় হাত আছে অপার্থিব শক্তিদের; অপার্থিব এই অর্থে যে তারা এসেছে পৃথিবীর বাইরে থেকে—মহাবিশ্বের অজানা অঞ্চল থেকে। ইতিমধ্যে অন্যান্য বৈজ্ঞানিকরাও আলাদা ভাবে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন—প্রতিটি গবেষণার বিষয়ই আলাদা—একটার সঙ্গে আর একটার মনে হয় কোনও সম্পর্ক নেই। ভূকম্পন আর বৈদ্যুতিক শক্তিরা হাতে হাত মিলিয়ে যে উড়ন চাকি ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে—এই ব্যাখ্যাটা হাজির করলেন দুজন মনোবিজ্ঞানী—মাইকেল পার্সিঞ্জার আর গিসলেনলাফ্রেনিয়ার। দুজনেই কানাডার লরেন্সিয়ান ইউনিভার্সিটিতি ছিলেন। ভূত্বক আর ভূমিকম্প সম্পর্কিত বিপর্যয়ের প্রতিক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করছিলেন ডক্টর ব্রায়ান ব্রাডি—ইনি ছিলেন ডেনভারে মার্কিন ব্যুরো অফ মাইনস-এ। পাথরের ভেঙে যাওয়া আর ফুটিফাটা হয়ে যাওয়া নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করতে গিয়ে ব্রাডি দেখলেন, পাথর যখন ভেঙে খান্ খান্ হয়ে যায়, তখন আলোর সুতীব্র বিকিরণ ঘটে। ল্যাবোরেটরির মধ্যে এই আলো ছুঁচের ডগার মত ছোট্ট হতে পারে, দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে যেতে পারে—কিন্তু ল্যাবোরেটরির বাইরে প্রকৃতির জগতে যখন পাথরে ফ্র্যাকচার ঘটে চলেছে, তখন এই সুতীব্র আলোর বিকিরণকেই বস্তুর মতন মনে হবে—মনে হবে আলোকময় একটা জিনিস কল্পনাতীত বেগে ছিটকে যাচ্ছে। এই ভাবেই ফাটল বরাবর আলোর বিকিরণ সৃষ্টি করে চলেছে পৃথিবী। পার্সিঞ্জার আর লাফ্রেনিয়ার এরপর ব্রাডির সঙ্গে দেখা করলেন। উড়ন চাকির ক্ষুদে সংস্করণ যে তৈরি করতে পেরেছেন—এ বিষয়ে তিলমাত্র সন্দেহ আর রইল না তিন বিজ্ঞান সাধকের মনের মধ্যে। এইসব তথ্যগুলোই জোড়াতালি দিয়ে ডেভারক্স সিদ্ধান্তে এলেন: উড়ন চাকিদের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তাহলে এটাই—মূলে রয়েছে পৃথিবী!

প্রশ্ন : পৃথিবীই সৃষ্টি করছে অপার্থিব উড়ন চাকি আর আকাশ আলো?

মা : বৈজ্ঞানিক তদন্ত তো তাই বলছে। ডেভারক্স আরও বলেছেন, উড়ন চাকিরা যেখানে ঝাঁকি দর্শন দিয়ে যায়, সেখানেই হামেশাই দেখা যায় জমিতে পোড়া দাগ পড়েছে, গুন গুন আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, মোটর গাড়ির বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা বিগড়েছে। এ সব হেঁয়ালির জবাব তো একটাই: মূলে রয়েছে UFO-র ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ধর্ম।

প্রশ্ন : বেশ, বেশ, ভূতাত্ত্বিক দোষের ফলে জন্মাচ্ছে ‘পার্থিব আলো’। সুপ্রাচীন স্মৃতিসৌধদের সঙ্গে তাদের কী সম্পর্ক?

মা : জবাবটা ডেভারক্স দিয়েছেন এইভাবে: নব প্রস্তর যুগের মানুষরা পার্থিব আলো দেখেছিল। ধরে নিয়েছিল সবই দেবতাদের লীলা। তাই যেখানে যেখানে আলো দেখা দিয়েছে সবচেয়ে বেশি, দেবালয় গড়েছে সেইসব জায়গায়। আলোগুলোর নানান চেহারা দেখেও প্রত্যক্ষদর্শীদের মনেপ্রাণে বিশ্বাস হয়ে গেছে—জ্যোতির্ময় দেবতা দর্শনই করেছে অনেক পুণ্য ছিল বলে!

প্রশ্ন : আলোর চেহারাগুলোকে কি পাল্টে নিজেদের মনের মত করে নিতে পারত সেকালের পুরুতঠাকুরেরা?

মা : ডেভারক্সের বিশ্বাসও তাই। প্রাগৈতিহাসিক পুরোহিতরা বোধহয় সেই কায়দা রপ্ত করেছিল—পৃথিবীর আলোর চেহারা ফিরিয়ে দিয়ে গড়ে নিত পুতুল দেবতাদের প্রতিমূর্তি। কীভাবে যে তা করত, তা ডেভারক্সের কল্পনার বাইরে। ডেভারক্সের অদ্ভুত এই ধারণা যদি সত্যিই হয়, তাহলে সেকালের ইউরোপে দেবতাদের টহল দেওয়া আর মর্ত্যের মানুষের সঙ্গে সরাসরি বাক্যালাপ করার একটা বৈজ্ঞানিক মানে খুঁজে পাওয়া যায়। উড়ন চাকিরাও যে পৃথিবীর বাইরে থেকে আসেনি—তাদের সৃষ্টি পৃথিবীরই আলো থেকে—বিচিত্র স্মৃতিসৌধগুলো যে মানুষেরই হাতে তৈরি—দেবলোকের ইঞ্জিনিয়ারদের হাতে নয়—সে রহস্যও পরিষ্কার হয়ে যায়। দেবতা, UFO আর সুপ্রাচীন স্মৃতিসৌধদের মধ্যে যাঁরা সম্পর্ক খুঁজে বেড়াচ্ছেন—ডেভারক্সের থিওরিগুলো তাঁদের মাথার পোকা নড়িয়ে ছেড়েছে এই কারণেই।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%