উদ্ভট আইডিয়া

অদ্রীশ বর্ধন

প্রশ্ন : সূর্য পৃথিবীকে ঘিরে পাক দিচ্ছে, এটা কি সত্যি?

মা : কলকাতার পথেঘাটে, বইমেলার গেটে এই উদ্ভট আইডিয়ার জনককে দেখা যাচ্ছে অনেকদিন ধরেই—রাস্তার ধারে জায়গা পেলেই তিনি লিখছেন তাঁর বদ্ধ বিশ্বাসকে—হ্যাণ্ডবিলও ছেপে বিলোচ্ছেন। তুই নিশ্চয় তাই দেখে ধোঁকায় পড়েছিস। এই ধরনের ডিগবাজি-খাওয়া হরেকরকম ধারণার অনেক প্রবক্তা বিদেশেও আছেন। তাঁদের কিম্ভুত বিশ্বাসগুলোর ব্যাপার শুনলে তোর মাথা ঘুরে যাবে। বল তো, শুক্রগ্রহ আসলে গ্রহ না ধূমকেতু?

প্রশ্ন : শুক্র তো গ্রহ, ধূমকেতু হতে যাবে কোন্ দুঃখে?

মা : কিন্তু এই কথাই যে ডক্টর ইমানুয়েল ভেলিকোভস্কি বলেছেন তাঁর ‘ওয়ার্ল্ডস্‌ ইন কলিসন্’ কেতাবে। বইটা ছেপেছিল বিখ্যাত প্রকাশক ম্যাকমিলান কোম্পানি। বৈজ্ঞানিকরা পাছে ম্যাকমিলানের সব বই কেনা বন্ধ করে দেন, এই ভয়ে সে-বই চালান হয়ে যায় অন্য প্রকাশকের কাছে। কিন্তু তাতে ভেলিকোভস্কি-র সমর্থকের অভাব হয়নি। পরে আরো দুটো বই লিখেছেন। তিনটে বইতেই বাইবেলের অদ্ভুত কাণ্ডকারখানার আশ্চর্য ব্যাখ্যা জুগিয়ে গেছেন তাঁর পিলে চমকানো থিওরি শুনিয়ে। দানব-গ্রহ বৃহস্পতি থেকে একটা টুকরো ছিটকে বেরিয়ে এসে ধূমকেতু হয়ে গেছিল। গোটা সৌরজগৎ জুড়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছে। সাময়িকভাবে মঙ্গলগ্রহ ছিটকে সরে এসেছিল পৃথিবীর কাছে। পৃথিবীর লাট্টু বনবনানি বন্ধ হয়ে গেছিল—ফলে, লোহিত সমুদ্র থেকে জল সরে গিয়ে শুকিয়ে গেছিল। ইজরায়েলের উদ্বাস্তুরা তাই হেঁটে পেরিয়ে গেছিল খটখটে সমুদ্র অঞ্চল। তারপরেই পৃথিবীজোড়া লণ্ডভণ্ড কাণ্ড ঘটতে থাকে। ধূমকেতু থেকে পেট্রল বৃষ্টি শুরু হয়—সেই পেট্রলেই চলছে আজকের মোটর। পৃথিবী আবার ঘুরপাক খেতে শুরু করে—লোহিত সমুদ্রে জল এসে যায়—ডুবে যায় মিশরীয়রা। এরপরেও বার কয়েক ফিরে এসে দুষ্টু ধূমকেতু গোটা পৃথিবীটাকে নাচিয়ে কুঁদিয়ে আগুন আর জলের প্রলয় সৃষ্টি করে নিজেই হয়ে যায় শুক্রগ্রহ।

প্রশ্ন : বিরাট গুলগল্প তো! ধূমকেতুর মধ্যে এত বস্তু কি থাকতে পারে?

মা : খাঁটি বৈজ্ঞানিকরা ঠিক তাই বলছেন। ধূমকেতু বলতে গেলে ফাঁকা-ই হয়। একটা হাতির পাশে একটা পিঁপড়ে যতখানি—মালমশলার দিক দিয়ে বিচার করলে পৃথিবীর পাশে একটা ধূমকেতুও তাই। ও রকম পিঁপড়ের গুঁতো অতীতেও পৃথিবী খেয়েছে ধূমকেতুদের আগমনে—তাকে টানা হ্যাঁচড়া করতে পারেনি কেউই।

প্রশ্ন : ইমানুয়েল ভেলিকোভস্কি কিসের বৈজ্ঞানিক?

মা : মনের ডাক্তার। পদার্থবিজ্ঞানী নন, জ্যোতির্বিজ্ঞানী নন, গণিতবিজ্ঞানীও নন। উনি কিন্তু ভবিষ্যৎবাণী করেছেন, শুক্ৰগ্ৰহ আবার ধূমকেতু হয়ে গিয়ে পৃথিবীর ঝুঁটি ধরে নাচাবে।

প্রশ্ন : নাচাক! পৃথিবীর মানুষকে এভাবে আর কে-কে নাচিয়েছে মা?

মা : চার্লস ডারউইনের পিণ্ডি চটকেছেন অনেক ব্যক্তি। তিনি নাকি বলেছেন, বাঁদরের বংশধর আমরা এই মানুষ। কক্ষনো তিনি তা বলেননি। উনি শুধু বলেছেন: মানুষ, নরবানর আর বাঁদর—এদের আগমন একই পূর্বপুরুষ থেকে। তার মানে এই নয় যে, বাদর আমাদের পূর্বপুরুষ। জন স্কোপস নামে এক শিক্ষক বিখ্যাত ‘বাঁদর-মামলা’ ঠুকে দিয়ে নাকের জলে চোখের জলে করেছিলেন ডারউইন সাহেবকে। মানুষকে ভগবান সৃষ্টি করেছে—বাঁদর তো করেনি। এখনও বিলেতে চলেছে ‘ইভোলিউশন প্রোটেস্ট মুভমেন্ট’—সাদা বাংলায়: ‘গোল্লায় যাক ডারউইন আন্দোলন’—যে আন্দোলনের মোদ্দা কথা: বাঁদর, নরবানর অথবা অন্য কোনো জন্তু মানুষের পূর্বপুরুষ—একথা ভাবতেও গা ঘিন ঘিন করে। মানুষ আর অন্য যে কোনো প্রাণীর মধ্যে যে বিরাট ব্যবধান—তা কোনোদিন ঘুচবে না। লক্ষ লক্ষ বছর আগেকার জীবাশ্ম দেখিয়ে কিস্সু প্রমাণ করা যায় না।

প্রশ্ন : মানুষ তাহলে এল কি ভাবে?

মা : টিকে থাকার লড়াইয়ে জিতে গিয়ে। পঞ্চাশ ফুট লম্বা টিরানোসরাসদের দাঁত ছিল ছ-ইঞ্চি লম্বা ধারালো ছোরার মত। মুখবিবর ছিল যে কোনো পলিটিসিয়ানের চাইতে বড়। কিন্তু ব্রেন ছিল এতই পুঁচকে যে পরিবেশ প্রতিকূলে যেতেই মানিয়ে নিতে না পেরে অক্কা পেল পটাপট করে—গাছে গাছে তখন লম্ফঝম্ফ করে বেড়াচ্ছিল ‘প্রাইমেট’ নামক স্তন্যপায়ী জীবরা—মানুষের বংশধর এরাই। ঘোড়ার পূর্বপুরুষ যেমন ইওহিপ্পাস, হাতিদেরও আবির্ভাব তেমনি সাত কোটি বছর আগেকার ছোট্ট এক স্তন্যপায়ী জীবদের নাতিপুতি থেকে। তবে হ্যাঁ, থিয়সফিস্টরা বলেছেন, মু আর লেমুরিয়া-রা ছিল মানুষের পূর্বপুরুষ।

প্রশ্ন : থিয়সফিস্ট?

মা : থিয়সফিস্ট মানে ব্রহ্মজ্ঞানী। মাদাম ব্লাভাটস্কি, কর্নেল অলকট, অ্যানি বেসান্ত নামী থিয়সফিস্ট। ব্ৰহ্মতত্ত্ব নিয়ে পরমজ্ঞানের আলোচনায় এঁরা মু আর লেমুরিয়া-দের টেনে এনেছেন—স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি এরা—যাদের শরীরের অর্ধেক ছিল রক্তমাংসের—বাকি অর্ধেক সূক্ষ্ম পদার্থ দিয়ে তৈরি। পরে তাদের কায়া পূর্ণ আকার ধারণ করে। এরা থাকত মু মহাদেশে। সে দেশ এখন তলিয়ে গেছে। তারা গ্র্যাভিটি-কে কলা দেখানোর বিদ্যে রপ্ত করেছিল—তাই পরমানন্দে পাখির মত উড়ে বেড়াতো। বেঙ্গল ল্যান্সার্সের কর্নেল জেমস চার্চইয়ার্ড আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, ঠিক এই প্রক্রিয়ায় নাকি যিশুখ্রিস্ট জলের ওপর দিয়ে স্বচ্ছন্দে হেঁটে যেতেন! পাতালের গ্যাসে আগুন ধরে যাওয়ায় প্রচণ্ড বিস্ফোরণে মু মহাদেশ রসাতলে যেতেই কিছু আদমী পালিয়ে যায় আটলান্টিসে। গড়ে ওঠে আটলান্টিসের মহাসভ্যতা—এর পরের কাহিনী ফেঁদেছেন বিখ্যাত গ্রীক দার্শনিক প্লেটো।

প্রশ্ন : প্লেটোও মনগড়া গল্প লিখেছেন?

মা : প্লেটো তো কিছুই নির্জলা সত্যি বলে জাহির করেননি। তিনি Kritias নামে একখানা বইতে দুজনের মধ্যে কথোপকথনের মাধ্যমে আটলান্টিস নামে একটা লম্বাটে মহাদ্বীপের মহাসভ্যতার বর্ণনা দিয়েছেন—কাহিনী শেষ করেছেন একটা সেনটেন্স আধখানা লিখে—ঠিক যেভাবে মডার্ন সিরিয়াল শেষ হয়। কিন্তু ইগনেটিয়াস ডোনেলি নামে এক তালেবর আমেরিকান কংগ্রেসম্যান নানারকম মালমশলা জোগাড় করে যখন লিখলেন—আটলান্টিস: অ্যান্টিডিলুভিয়ান ওয়ার্ল্ড—তখন হইচই পড়ে গেল পৃথিবীময়—কত হাজার বই যে লেখা হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। দু’হাজার বছরেও আটলান্টিসের রহস্যের কিনারা হয়নি।

প্রশ্ন : কোথায় সেই আটলান্টিস?

মা : কিছুটা জলের তলায়, কিছুটা শুক্রগ্রহে, কিছুটা গ্রহাণুদের মধ্যে। পৃথিবীর ফ্লাইং সসারগুলোও এই আটলান্টিসবাসীদের বানানো।

প্রশ্ন : বলছো কি মা?

মা : উদ্ভট তত্ত্ববিশ্বাসীরা যা বলছেন, তাই বললাম। মস্ত একটা ধূমকেতুর আবির্ভাবের পর জেগেছিল আটলান্টিস, তারপর কোত্থেকে চাঁদ এসে গেল পৃথিবীর চারধারে—আগে নাকি চাঁদ ছিল না পৃথিবীর—চাঁদের টানে লণ্ডভণ্ড কাণ্ড ঘটতেই তলিয়ে গেল আটলান্টিস। আর একটা উদ্ভট বিশ্বাসের সমর্থকরা বলেছেন, আটলান্টিসের বৈজ্ঞানিকদের বড় বাড় বেড়েছিল বলে প্রলয় ঘটে সেখানে। বিমানে চেপে একদল পালায় শুক্রগ্রহে—সেই বিমানই আজকের ফ্লাইং সসার—মাঝে মাঝে বেড়াতে আসে পৃথিবীতে। বাকি আটলান্টিসের কিছুটা টুকরো টুকরো হয়ে গিয়ে ঘুরতে থাকে সূর্যকে ঘিরে—আজকের গ্রহাণু তারা।

প্রশ্ন : আটলান্টিস বিশ্বাসীদের মাথা কি খারাপ?

মা : তা জানি না। তবে এদের পত্রিকা দ্য আটলান্টিয়ান-এ এমন কথাও বলা হয়েছে যে, ইউরেনাস গ্রহ ভাঙতে শুরু করেছে। ভাঙা টুকরোগুলো সৌরজগতে নেচে নেচে যখন বেড়াবে, অবর্ণনীয় প্রলয় সৃষ্টি করবে, পৃথিবীর অক্ষরেখা পাল্টে যাবে, নতুন ডাঙা জাগবে, বহু দেশ তলিয়ে যাবে। আর একটা সংখ্যায় লেখা হয়েছে, প্লুটো গ্রহে পিলে চমকানো সভ্যতা বিরাজ করছে এবং সেখানে পাতাল রেল আছে।

প্রশ্ন : পৃথিবী থেকে তিনশ কোটি মাইল দূরে পাতাল রেল?

মা : ডেসমণ্ড লেসলী তাঁর বিখ্যাত কেতাব ‘ফ্লাইং সসার্স হ্যাভ ল্যাণ্ডেড’-এ লিখেছেন আরও তাজ্জব কি বাৎ! আটলান্টিয়ান আর লেমুরিয়ানরা গ্র্যাভিটি আর ম্যাগনেটিজম-এর মধ্যে একটা নিগূঢ় সম্পর্ক বের করে ফেলেছিল। পৃথিবীর কোল্ড ম্যাগনেটিক ফোর্স-কে তারা জয় করে বসেছিল বলে হালকা তুলোর মত ভেসে থাকতে পারত যখন তখন।

প্রশ্ন : কোন্ড ম্যাগনেটিক ফোর্সটা কি জিনিস?

মা : ভগবান জানেন।

প্রশ্ন : প্লেটো কি ডাহা মিথ্যে লিখবেন?

মা : সেকালে ক্রীট নামে একটা দ্বীপ অগ্ন্যুৎপাতের ফলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ভূমধ্যসাগরের সেই দ্বীপসভ্যতা নিয়েই হয়তো কাহিনী রচনা করেছিলেন প্লেটো।

প্রশ্ন : দানিকেনের তত্ত্ব কি সত্যি?

মা : সবই অনুমিতি। বাইবেলের ইজকিয়েল চারজন মহাকাশচারীকে চারখানা অগ্নিময় চাকাওলা গাড়িতে চেপে মর্ত্যে অবতরণ করতে দেখেছিলেন। তাদের প্রত্যেকের মুখ চারটে, ডানা চারটে। দানিকেনের ধ্রুববিশ্বাস, এই চারজনই অন্য গ্রহের জীব। গুহার ভেতরে আদিম মানবের আঁকা হেলমেটধারীদের ছবি তিনি দেখিয়েছেন। কিন্তু পাথরের বুকে আদিম ছেনি দিয়ে ছবি আঁকতে গেলে সেটা কাগা-বগা আঁকা ছাড়া আর কি হতে পারে? এখন তার ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হচ্ছে মনের মত করে। পিরামিড নিয়েও কম হইচই হয়নি। সব মহাকাশচারীই নাকি গ্র্যাভিটি জয় করে বসে আছে এবং যাদুদণ্ড বুলিয়ে হিংটিংছট বললেই পেল্লায় পাথর শূন্যে ভেসে উঠে পিরামিড বানিয়ে ফেলেছে। একথা আগে বলেছিলেন দুজন—টেলর আর স্মিদ—দানিকেন বললেন, মহাকাশচারীরা পিরামিড বানিয়েছেন, ভেতরে ‘হিমঘুম’ ঘুমিয়ে থাকার জন্যে। দানিকেন এমন কথাও বলেছেন যে, অন্য গ্রহের মানুষ এ গ্রহে এসে উজবুক মেয়েদের রাক্ষসবিবাহ করে উন্নত মগজওলা মানুষ সৃষ্টি করে গেছে।

প্রশ্ন : তাহলে তো বলতে হয়, আমাদের পূর্বপুরুষ অন্য গ্রহের মানুষ?

মা : মঙ্গল, শুক্র, সিগনাস, অ্যালফা সেন্টরি—এই সব জায়গাতেই হয়তো আদিম মানবীদের শ্বশুরবাড়ি। ঈস্টার দ্বীপের অদ্ভুত দানব মূর্তিগুলোর খুশি খুশি মুখচ্ছবি নাকি ধরণীর বউ পাওয়ার জন্যেই। এমন কি স্বয়ং যিশুখ্রিস্টও নাকি শুক্রগ্রহের মানুষ—এমন বিশ্বাসও রয়েছে খাতাকলমে। প্যাট্রিক মুর তাঁর বই ‘ক্যান ইউ স্পিক ভেনুসিয়ান?’-এর ১৩০ পৃষ্ঠায় দিয়েছেন এই তথ্য: বাইবেল, বুক অফ ইজকিয়েল, Mars, Sector 6।

প্রশ্ন : দানিকেন নাকি আকাশ থেকে তোলা পৃথিবীর ছবি দেখিয়েছিলেন?

মা : হ্যাঁ। যোড়শ শতাব্দীতে আঁকা সেই ম্যাপ গ্লোবে সেঁটে দিলে মনে হয় ঠিক যেন মহাকাশ থেকে দেখে আঁকা হয়েছে। প্রাচীন এয়ারফিল্ডও দেখা গেছে যেখান থেকে নাকি আটলান্টিসের বিমানগুলো ওঠানামা করত যখন-তখন। এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে, জোনাথন সুইফট ‘গালিভার্স ট্রাভেল’-এ বলেছিলেন মঙ্গলের দুটো উপগ্রহ আছে—পরে দেখা গেছিল, সত্যিই তা আছে। তবে কি তিনি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন? মনে হয় না। শুক্রের কোনো উপগ্রহ নেই, পৃথিবীর মোটে একটা, বৃহস্পতির চারটে—মঙ্গলের তাহলে খান দুই না থাকলে কি চলে?

প্রশ্ন : সাইবেরিয়ায় ধূমকেতুর ধাক্কা নিয়ে কোনো উদ্ভট তত্ত্ব নেই?

মা : ধূমকেতু তত্ত্বটা বলেছিলেন রাশিয়ান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্লোরেন্সকি। এর পেছনে যুক্তি আছে। কিন্তু আরও দুটো বিচিত্র তত্ত্ব এনেছিলেন রাশিয়ারই তিন সায়ান্স-ফিকশন লেখক। যেমন, মস্ত একটা স্পেশ-শিপ অন্য গ্রহ থেকে এসে বিগড়ে গেছিল—অ্যাটমিক মোটর দুম্ করে ফেটে যেতেই নিশ্চিহ্ন হয় সাইবেরিয়ার পাইন-বন। দ্বিতীয়, ক্রাকাতোয়া-র অগ্ন্যুৎপাতের পর তিন বছর ধরে ধুলোর মেঘ পাক খেয়েছিল পৃথিবীকে ঘিরে। সিগনাস থেকে বৈজ্ঞানিকরা তাই দেখে সংকেত পাঠিয়েছিল এনার্জি-রশ্মি ছুঁড়ে। তাইতেই এই বিপত্তি!

প্রশ্ন : জ্যোতিষীদের কথা কি অবৈজ্ঞানিক?

মা : ১৯৭১ সালের মার্চে জেনারেল ইলেকশন ডেকে ইন্দিরা গান্ধী জিতে গেছিলেন জ্যোতিষীর কথায়। ১৯৩৯-এ যুদ্ধ লাগবে না—জ্যোতিষীর এই কথায় হিটলার বিলক্ষণ প্রভাবিত হয়েছিলেন—কিন্তু ঘটেছিল ঠিক উল্টো। প্রেসিডেন্ট কেনেডি-র গুপ্তহত্যা যে-জ্যোতিষী আগে বলেছিলেন, তিনিই বলেছিলেন, সাংঘাতিকভাবে মারা যাবেন প্রেসিডেন্ট দ্য গল, প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কো আর আবিসিনিয়ার সম্রাট—কিন্তু কোনো ভবিষ্যৎবাণীই মেলেনি। আকাশের নক্ষত্ররা ক্রমাগত সরে সরে যাচ্ছে—এ তথ্য তুই-ও জানিস। সুতরাং তুই যে-সময়ে জন্মালি, সেই সময়ে গ্রহ-নক্ষত্ররা কোথায় কিভাবে ছিল, তা জেনে তোর সমস্ত জীবনটার ওপর তাদের প্রভাব ছকে দেওয়া কি যায়? একটা ধোঁয়াটে ব্যাপার শুধু বলা যায়, কিন্তু তুই ল্যাটা হবি কিনা, কুমড়ো দেখলেই মুখ বেঁকাবি কিনা—এ সব তো বলা যাচ্ছে না। আকাশের তারাগুলো দেখলেও তো মনে হয় না অমুক-অমুক জন্তুর মত দেখতে। বৃষ-কে কি ষাঁড়ের মত মনে হয়? বৃষরাশির মানুষরা কি ষণ্ডামার্কা হয়? আমাকে কেউ যদি বিজ্ঞান দিয়ে বুঝিয়ে দেন, নেপচুন স্নায়ুতন্ত্রকে—বিশেষ করে থ্যালেমাস-কে, শনি চামড়া, দাঁত আর হাড়কে, বৃহস্পতি পিটুইটারি গ্ল্যাণ্ডকে, বুধ শ্বাসপ্রশ্বাসকে, ইউরেনাস রক্তসংবহনকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করে—তাহলেই আমি স্বস্তি পাবো। জ্যোতিষী আর জ্যোতির্বিদরা সেকাল থেকেই অনেক সাড়া ফেলেছেন—একালে ফ্রয়েডের শিষ্য মনোবিজ্ঞানী ইয়ুং নিজেও সারা জীবন চুটিয়ে জ্যোতিষ চর্চা করে গেছেন। বিলেতের এক বিখ্যাত জ্যোতিষী টিভি প্রোগ্রামে বলেছেন, ভবিষ্যতের জ্যোতিষীদের গ্রহ-নক্ষত্র নিয়ে তত মাথা ঘামাতে হবে না, মনোবিদ হলেই চলবে। ফলে, নতুন একটা পেশার উদ্ভট হতে পারে—যার নাম astropsychiatrist; বাংলায় জ্যোতির্মনোবিজ্ঞানী।

প্রশ্ন : তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে জ্যোতিষচর্চা করা ঠিক নয়?

মা : স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, যে সব কুসংস্কার হিন্দুদের অনেক ক্ষতি করেছে, তার মধ্যে একটা হল জ্যোতিষের খুঁটিনাটির প্রতি খুব বেশি মন দেওয়া। বুদ্ধ বলেছেন, যারা নক্ষত্রগণনা, এই রকম অন্য বিদ্যা বা মিথ্যা চালাকি দ্বারা জীবিকা অর্জন করে, তাদের সবসময়ে বর্জন করবে। জ্যোতিষবিদ্যায় বিশ্বাস সাধারণত দুর্বলচিত্তের লক্ষণ। মনের জোর কমিয়ে দেয়। আসলে অজানাকে জানতে চাওয়া মানুষের স্বভাব—সকৌতুক সেই কৌতুহল মিটলেই যথেষ্ট—সত্যিমিথ্যে যাই হোক না—রাশিচক্রকে মাথায় না রেখে কাজ করে যা—তোকে লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে। হুজুগে মাতিসনি।

প্রশ্ন : তবে যে শুনি পৃথিবীতে অমুক অমুক সময়ে প্রলয় ঘটবেই?

মা : হ্যাঁ, আবার নোয়ার নৌকো বানাতে হবে, নয়তো বেলুনে করে শূন্যে ভেসে থাকতে হবে—এই সব তো? এরকম ভবিষ্যৎবাণী তো আকছার শোনা যাচ্ছে। পৃথিবী শেষ হয়ে যাবে গ্রহদের সংঘাতে বা সম্মেলনে—এরকম ভবিষ্যৎবাণী শোনা গেছিল ১৫২৪-এ, ১৯১৯-এ, ১৯৬২-তে, ১৯৮৪-তে—কিস্সু হয়নি। আর একটা সাল আসছে—১৯৯৯-তে—দেখি কি হয়!

প্রশ্ন : শুধু কি জ্যোতিষী? বিজ্ঞান-জানা লোকেও তো এমন কথা বলছেন?

মা : তা তো বটেই। ডক্টর অ্যাডাম বারবার পেশায় গাইরোসকোপ ইঞ্জিনিয়ার। তাই উনি অঙ্ক কষে বলেছিলেন, পৃথিবী একটা বিরাট গাইরোস্কোপ—ঠিক সেইভাবেই টলছে। ঘুরুনির শেষের দিকে। একবার টলেছিল ৯০০০ বছর আগে—নোয়া বাঁচিয়েছিল সেবার—আবার আসন্ন সেই দিন। তাঁর বই ‘দ্য কামিং ডিস্যাস্টার ওয়ার্স দ্যান দ্য এইচ বম্ব’ চলে গেছে বড় বড় রাষ্ট্রনেতাদের কাছে—আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়ার জন্যে। পথেঘাটে যেন বন্দর তৈরি থাকে। নর্থ পোল আর সাউথ পোলের পাহাড়ের চুড়োয় যেন জেট লাগানো থাকে—জেট ছুঁড়ে টলানি রুখে দেওয়া হোক। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার মিঃ হিউ ব্রাউনের ঘুম ছুটে গেল দক্ষিণ মেরুতে বরফের ওজন বাড়ছে বলে—এখুনি খাল কেটে বরফ বের করে দেওয়া হোক—নইলে পৃথিবী টলবেই। গুজব-প্রসঙ্গটা রাষ্ট্রসংঘেও পৌঁছেছিল।

প্রশ্ন : ভূমিকম্প নিয়ে ভবিষ্যৎবাণী নেই?

মা : ইংল্যাণ্ডের পি. নরকট বলেছেন, পৃথিবী তো একটু চ্যাপ্টা, তাই তার ঘুরুনির সময় কমছে এক শতাব্দীতে এক সেকেণ্ডের হাজার ভাগেরও কম। ফলে, চাপ বাড়ছে পৃথিবীর পেটে। একদিন ফেটে যাবে দুম করে। তার আগেই সুমেরু আর কুমেরুতে ফ্লাই হুইল বসিয়ে তাদের ঘুরুনি দিয়ে ‘চেক’ করা হোক পৃথিবীর মন্দীভূত ঘুরুনি। অথবা, বড় বড় বাঁধ বেঁধে রুখে দেওয়া হোক সমুদ্রের জল। অথবা, চাঁদকে দু-টুকরো করে ঝুলিয়ে দেওয়া হোক পৃথিবীর দু-পাশে। সাহারা-দের সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন একজন গণিতবিদ আর ইঞ্জিনিয়ার—নাম তাঁর এ.পি. পেড্রিক।

প্রশ্ন : সাহারা-দের সমস্যা?

মা : সাহারা মরুভূমি, ডেথ ভ্যালি, অস্ট্রেলিয়ার ভেতরকার খাঁ-খাঁ অঞ্চলগুলোয় মেরু অঞ্চলের বরফ গলানো জল পাইপে করে এনে ফেলা হোক—পৃথিবীর বাড়তি মানুষের থাকার জায়গা ঠিক মিলে যাবে। পেড্রিক সাহেব অঙ্ক-টঙ্ক কষে নকশা পর্যন্ত বানিয়ে ফেলেছেন।

প্রশ্ন : এরকম বদ্ধ বিশ্বাসী আর কে-কে আছে মা?

মা : আঙুলে গুনে শেষ করা যাবে না। কিন্তু এদের নিয়ে হাসিঠাট্টা করতে গেলেও খটকা লাগে আগের যুগের কথা ভেবে। টেলিভিশন পাইওনিয়ার বেয়ার্ড যখন বলেছিলেন, বাতাসের মধ্যে দিয়ে তিনি ছবি পাঠাতে পারেন—লোকে তখন টিটকিরি দিয়েছিল; তাহলে যখন অক্সফোর্ডের জর্জ ডিলাওয়ার বললেন, চিন্তার ছবি বাতাসের মধ্যে দিয়ে পাঠাতে পারেন তিনি—তখন কি হেসে গড়িয়ে পড়া ঠিক হবে? কোপারনিকাস, ডালটন, জিওলকোভস্কি-র মতবাদ এককালে হাসির খোরাক হয়েছিল—তাহলে যদি এখন কিছু বদ্ধবিশ্বাসী বলে বেড়ায় যে পৃথিবী, গোল নয়—চ্যাপ্টা, পৃথিবী নিরেট নয়—ফোঁপরা, আকাশ ফাঁকা নয়—ভরাট, সূর্য গনগনে নয়—কনকনে—তাহলে হি-হি করে হাসা কি উচিত?

প্রশ্ন : পৃথিবী চ্যাপ্টা আর ফোঁপরা? আকাশ ভরাট? সূর্য কনকনে? কি বলছ মা?

মা : বিলেতের ‘ইন্টারন্যাশনাল ফ্ল্যাট আর্থ সোসাইটি’ বলছে এই সব কথা। বাসুকির ফণায় পৃথিবী—পুরাণের এই কথা শুনে যারা মুখ বেঁকিয়ে হেসেছে, তারাই এখন স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছে দেশের লোকের আজগুবি বিশ্বাস শুনে। দু-হাজর বছর আগে দক্ষ জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিতবিদ আর ভূগোলবিশেষজ্ঞ টলেমি মানতে চাননি পৃথিবী ঘুরছে লাট্টুর মতন—ঘুরলে ঝড়ের চোটে টেকা যাবে না—এখনও এই ধরনের বদ্ধবিশ্বাসীরা তুমুল চেঁচিয়ে চলেছে, এমন কি বৃটিশ টেলিভিশন প্রোগ্রামেও তাদের ডাকা হচ্ছে। ‘চ্যাপ্টা পৃথিবী তত্ত্বে’র আইজাক নিউটন বলা যায় স্যামুয়েল শেনটন-কে। পেশায় যদিও সাইনবোর্ড পেন্টার। সূর্য পৃথিবীকে পাক দিচ্ছে—এই ধারণা নিয়ে কলকাতার যে মানুষটা হন্যে হয়ে ঘুরছে—তার বিশ্বাস কি ‘দ্য সান গোজ রাউণ্ড’ বইটা থেকে এসেছে? এই বইয়ের লেখিকা মিস মার্গারেট এল. এস. মিসেন—নিবাস এডিনবরায়। পৃথিবীটা যে নিরেট গোলক নয়—একই কেন্দ্রকে ঘিরে পর পর পাচঁটা গোলকের সমন্বয় এবং প্রতিটি গোলকে মানুষ গিজ গিজ করছে—কুমেরু আর সুমেরুকে জুড়ে একটা সুড়ঙ্গ এই সব পাতাল-পৃথিবীদের ফুঁড়ে গেছে এবং অরোরা-র মেরুপ্রভা আসলে পাতাল-সূর্যের জ্যোতি—এই বিশ্বাস আমাদের পৌরাণিক গল্প-টল্পগুলোকেও ম্লান করে দিচ্ছে না? আকাশ নাকি নিরেট, পাতাল-সূর্যের প্রতিবিম্বকে সত্যি সূর্য মনে হয়, চাঁদও নেই—শুধু, পাতালের আলোর ঝিকিমিকি! নিরেট ছাদের কারিকুরিগুলোকে গ্রহনক্ষত্র মনে হয়। ছাদের ওপর আছে এন্তার নল—সেই জল ঝরে বৃষ্টির আকারে! আজব এই তত্ত্ব জাহির করছে যে সোসাইটি, তার নাম ‘সোসাইটি ফর জিওকসমিক্যাল রিসার্চ’। উদ্ভট ব্রহ্মাণ্ডের প্রবক্তা জন ব্রাডবুরি-কে নিয়ে টিভি প্রোগ্রাম হয়েছে, কেম্‌ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তার ইন্টারভিউ নিয়েছে। ভদ্রলোক কিন্তু পিলে চমকানো অঙ্ক কষে আর যন্ত্র বানিয়ে প্রমাণ করে চলেছে ব্রহ্মাণ্ড মোড়া রয়েছে শক্ত ধাতুর চাদরে!

প্রশ্ন : সূর্য কনকনে কে বলেছে?

মা : সাসেক্সের একজন পাদরী—পি. এইচ. ফ্রান্সিস—কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্কতে এম. এ.। তাঁর মতে, সূর্য থেকে এনার্জি এসে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ইলেকট্রিক এনার্জি হয়ে যাচ্ছে বলেই রোদ পাচ্ছি। আসলে সূর্য ঠাণ্ডা। তার পেছনকার ছায়া ইনফিনিটি তে প্রতিফলিত হয়ে নক্ষত্র-মায়া সৃষ্টি করছে। পৃথিবীর নিজস্ব শক্তি-চক্রের জন্যেই পৃথিবী গরম থাকছে। বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী স্যার উইলিয়ম হার্শেল—যিনি ইউরেনাস আবিষ্কার করেছিলে—তিনিও বিশ্বাস কবতেন, সূর্যের জঠর বেশ শীতল—বাইরেটা অবশ্য গরম। গড ফ্রায়েড বুরেন নামে এক জার্মান আর এক ধাপ এগিয়ে বলেছিল, সূর্যের ভেতরে গাছপালায় মোড়া সবুজ শ্যামল একটা গোলকও আছে; পাদরী ফ্রান্সিস তাই তো টেলিভিশন প্রোগ্রামেও তাল ঠুকে—বলেছেন সূর্য মোটেই গরম নয়। ‘দ্য টেম্পারেট সান’ নামে একটা বইও লিখেছেন। সুতরাং মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মত তত্ত্ব শুধু এদেশেই তৈরি হয় না—বিলেত আমেরিকার লোকেও কম যায় না। এমন লোকও বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় সেখানে আর জাহির করে সে নাকি অন্য তিনটে গ্রহের মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারে গড়গড়িয়ে।

প্রশ্ন : অন্য গ্রহের মানুষের ভাষা জানে এই পৃথিবীর মানুষ?

মা : বহু ভাষাবিদ্ এই ভদ্রলোকের নাম বার্নাড বায়রন, থাকেন ইংল্যাণ্ডের রমফোর্ডে। ইনি শুক্র, প্লুটো, আর ক্রুগার—এই তিনটে গ্রহের মানুষদের দেখতে কি রকম জানেন, ভাষাও জানেন।

প্রশ্ন : ক্রুগার নামে তো কোনো গ্রহ নেই সূর্যের?

মা : অনেক দূরে বামন-তারা ক্রুগার-60’র চারধারে ঘুরছে এই গ্রহ। বায়রন-এর কাছে ভাষাগুলো রশ্মি মারফত চলে আসে—আসলে তা টেলিপ্যাথি। শুক্রগ্রহের মানুষদের চোখ সুন্দর নীল, চুল সোনালী; প্লটোবাসীরা বড় পুঁচকে, হাত লম্বা, বুড়ো আঙুল আরও লম্বা, মাথাটা খাড়াই ডিমের মত; ক্রুগারবাসীদের একটা ফুসফুস বুকের ওপর দিকে—আর একটা শরীরের একদম তলায়; মঙ্গলগ্রহবাসীদের চোখ দুটো, আছে মাথার দু পাশে।

প্রশ্ন : এই সব গালগল্প লোকে বিশ্বাস করে?

মা : না করুক, মজা তো পায়। যেমন তুই পেলি। আরও যদি পেতে চাস, Patrick Moore-এর লেখা Can You Speak Venusian? বইটা কলকাতার বৃটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরি থেকে এনে পড়িস। যা কিছু তোকে বললাম—সব সেখানে আছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%