শব্দ

অদ্রীশ বর্ধন

প্রশ্ন : যে শব্দ শোনা যায় না, তা কি মানুষের ক্ষতি করে, মা?

মা : করে বইকি। এ শব্দকে বলা হয় আলট্রাসোনিক ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ—অর্থাৎ যা বিশ হাজার হার্জ-এর ওপরে—তা কানে শোনা না গেলেও কানের প্রচণ্ড ক্ষতি করে। কলকারখানায় এই শব্দের ব্যবহার বেড়েই চলেছে। চুপিসাড়ে শব্দদানব শ্রবণশক্তির বারোটা বাজিয়ে ছাড়ছে। পাওয়ারফুল আলট্রাসোনিকের আওতায় থাকলে তার ধাক্কা গিয়ে পড়ে ব্রেনের আর শিরদাঁড়ার স্নায়ুকোষগুলোয়—তখন বমি পায়, কানের মধ্যে জ্বলুনি আরম্ভ হয়। অথচ কেন যে এমন হচ্ছে, তা ধরা যায় না। আওয়াজ তো শোনা যাচ্ছে না। এই হল অতি-শব্দ দানবের দুশমনি।

প্রশ্ন : অতি-শব্দ দুশমনের পেছনে অতি-মিহি শব্দ দোস্ত লেলিয়ে দিলে হয় না?

মা : অতি-মিহি শব্দ দোস্ত নয়—সে আর এক দুশমন। এ শব্দের নাম ইনফ্রাসাউণ্ড ফ্রিকোয়েন্সি—অথাৎ যা বিশ হাজার হার্জের তলায় থাকে। বেঁটে দানবও বলতে পারিস। মানুষের ব্যালেন্সের সেন্স নষ্ট করে দেয়, ভয়ানক অবসাদ জাগায়, মেজাজ তিরিক্ষে করে দেয়, বমি পায়। বেঁটে শব্দদৈত্য, মানে এই ইনফ্রাসাউণ্ড, যখন সাত হার্জে এসে দাঁড়ায়, তখন তা মিলে যায় ব্রেনের আলফা তরঙ্গের সঙ্গে। ফলে, একমনে কিছু ভাবা যায় না, কাজ করা যায় না। অনেকক্ষণ ধরে তীব্র ইনফ্রাসাউণ্ডের আওতায় থাকলে ইন্টারন্যাল ব্লিডিংও হতে পারে। ‘নয়েজ কন্ট্রোল ইন ইনডাস্ট্রি’ বইটা পড়লে আরও জানতে পারবি।

প্রশ্ন : হার্জ কী, মা?

মা : এক সেকেণ্ডে একটা পয়েন্ট দিয়ে যতগুলো শব্দের ঢেউ বয়ে যায়, তাকে বলে সেই শব্দের ফ্রিকোয়েন্সি বা কম্পাঙ্ক। আর, এই ফ্রিকোয়েন্সির ঐকিক বা ইউনিটকে বলা হয় হার্জ—যা এক সেকেণ্ডে এক সাইল বা আবর্তনের সমান।

প্রশ্ন : শব্দের বেঁটে দৈত্য আর অতি দৈত্য ছাড়াও তো মেজ দৈত্য আছে?

মা : তাকেই বলা যাক ব্রহ্মদৈত্য—শব্দব্রহ্ম যখন দৈত্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন তাকে ব্রহ্মদৈত্যই বলা উচিত। শব্দ যখন চড়া হয়, অসহ্য হয়, শব্দ-যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়ায়—তখন তা Noise হয়ে যায়। নয়েজ-এর বাড়াবাড়ি ঘটলেই শরীর আর মন বিগড়োবেই।

প্রশ্ন : কতটা বাড়াবাড়ি?

মা : সেটা শোনবার আগে, ডেসিবেল কাকে বলে জানতে হবে। ডেসিবেল হল সাউণ্ড লেভেলের ইউনিট। শব্দ মাপবার স্কেল। সবচেয়ে কম যে শব্দ কানে ধরা পড়ে, তাকে ধরা হয় শূন্য ডেসিবেল। এই হিসেবে স্যাটার্ন বুস্টার রকেটের শব্দচাপ ২০০ ডেসিবেল, বুইং-৭০৭ যখন ফুল পাওয়ারে থাকে—তখন তার শব্দ চাপ ১৬০ ডেসিবেল, ৭৫ জন বাদকের অর্কেস্ট্রা ১৪০ ডেসিবেল, মোটর গাড়ি ৮০ থেকে ১০০ ডেসিবেল, সাধারণ কথাবার্তা ৬০ থেকে ৮০ ডেসিবেল, ফিসফিসানি ২০ থেকে ৪০ ডেসিবেল, নিউজপেপার প্রিন্টিং ঘরে ৮৫ ডেসিবেল। রোজ আট ঘণ্টা ধরে হপ্তায় পাঁচদিন হিসেবে ৩০ থেকে ৪০ বছর ৯০ ডেসিবেলের আওয়াজ শুনে গেলে মানুষ পাকাপাকি ভাবে কালা তো হবেই। ৮০ ডেসিবেল থেকে ৯০ ডেসিবেলের মধ্যে কানের ক্ষতি হতে পারে। তবে হ্যাঁ, ১৩৫ ডেসিবেলের ওপরে কান চাপা না দিয়ে কেউ যেন অনেকক্ষণ ধরে জগঝম্প কোলাহলের মধ্যে না থাকে। আর ১৫০-এর বেশি ডেসিবেলে কোনোভাবেই থাকা উচিত নয়। কানের পর্দা ফেটে যেতে পারে এমন ভাবে যে আর তা মেরামত করা যাবে না। কানের হাড় ভেঙে যেতে পারে অথবা নিজেদের জায়গা থেকে সরে যেতে পারে, এমন কি ভেঙে আর সরে গিয়ে ডিমের মত জানলা ফুটো করে ঢুকেও যেতে পারে।

প্রশ্ন : কি বলছো? কানের মধ্যে জানলা, পর্দা আর হাড়গোড়?

মা : শোনার যন্ত্রটা তিন ভাগে রয়েছে কানের মধ্যে: বাইরের কান, মাঝের কান, ভেতরের কান। শব্দের ঢেউকে গ্রহণ করে শব্দশক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপ দিচ্ছে প্রথম দুটো ভাগ; ভেতরের কান এই যান্ত্রিক শক্তিকে স্নায়ু উদ্দীপনার সিরিজ বানিয়ে ছাড়ছে। শব্দের ঢেউ কানের সরু নলে তো বেশি ঢুকতে পারে না—তাই কানের ছড়ানো পাতা বেশি করে শব্দের ঢেউ জড়ো করে কানের ফুটোয় ঢুকিয়ে দেয়—ঠিক যেন ফানেলের মধ্যে দিয়ে শব্দের স্রোত নামতে থাকে সরু পাইপের মধ্যে। এই পাইপের শেষে থাকে টিমপ্যানিক মেমব্রেন বা ইয়ার ড্রাম বা কানের পর্দা। শব্দস্রোত এই পদাকে থরথরিয়ে কাঁপিয়ে দেয়। পর্দার সঙ্গে লেগে রয়েছে ছোট ছোট তিনটে হাড়—এরা থাকে মাঝের কানের বাতাস ভর্তি চেম্বারে। প্রথম হাড়টা লেগে থাকে কানের পর্দার সঙ্গে—তৃতীয় হাড়টা লেগে থাকে একটা ঝিল্লী পর্দায়—যার কাজ মাঝের কান আর ভেতরের কানকে আলাদা করে রাখা। এই পদটাকেই বলা হয় ওভ্যাল উইনডো—ডিমের মত জানালা।

প্রশ্ন : হাড় দুটোকে চালাচ্ছে কে?

মা : দুটো পেশি। চড়া আওয়াজে এরা কুঁচকে যায়—হাড়গোড়ের কাজ কমিয়ে দেয়—ভেতরের কানে যাতে শব্দের ধাক্কা না পৌঁছোয়—তার খবরদারি করে।

প্রশ্ন : সর্দি হলেও তো কানে কম শুনি। সর্দির সঙ্গে শব্দের কি সম্পর্ক?

মা : কোনো সম্পর্ক নেই। মাঝের কান থেকে মুখগহ্বরের পেছন দিক পর্যন্ত একটা নল আছে—অথাৎ বাইরের জগতের সঙ্গে মাঝের কান যোগাযোগ রেখেছে এই নলের মধ্যে। কেন? না, আশপাশের বাতাসের চাপের সঙ্গে মাঝের কানের বাতাসের চাপকে এক লেভেলে রাখতে হয় বলে—নইলে কান তেমন ভাবে কাজ করে না। এই নল এমনিতে বন্ধ থাকে, কিন্তু কিছু গেলবার সময়ে খুলে যায় যাতে কানের পর্দার দুপাশের বাতাসের চাপ সমান অবস্থায় থাকে। যদি কোনো কারণে এই নল বুঁজে যায়, তখন কানের পর্দা খুশিমত কেঁপে কেঁপে উঠতে পারে না—তখনি কানে কম শোনা যায়। চাপের গরমিল খুব বেশি হলে কান টনটন করতে থাকে। মাথায় ঠাণ্ডা বসে গেলে, শ্লেষ্মায় ইউসট্যাচিয়ান টিউব বুঁজে যায়, এমন কি মাঝের কানেও শ্লেষ্মা ঢুকে পড়ে—তখন চাপ আর গরমিল কাটিয়ে উঠতে পারে না। হাড়গোড় ঠিকঠাক কাজ করে না—কানে কালা হয়ে থাকতে হয় সর্দি না সারা পর্যন্ত।

প্রশ্ন : ভেতরের কানে কি ঘটে?

মা : আগেই বলেছি স্নায়ুর উদ্দীপন ঘটে সেখানে। ভেতরের কান দু-পদ্ধতিতে কাজ করে; একটা যন্ত্র অর্ধ-বৃত্তের মত নলের মারফত ব্যালেন্স বজায় রাখে; আর একটা যন্ত্রের নাম Cochlea—শোনবার যন্ত্র। এই যন্ত্রটা শামুকের খোলার গড়নে প্যাঁচালো স্প্রিং-এর মতন—প্যাঁচ খুলে মেলে ধরলে লম্বায় ৩৫ মিলিমিটার, ব্যাস মোটে ৩ মিলিমিটার ঠিক সেইখানে যেখানে সে লেগে রয়েছে ডিম-জানালার সঙ্গে—যার অপর দিকে লেগে রয়েছে মধ্য-কানের শেষের হাড়। তরল পদার্থ বোঝাই Cochlea-র আর একদিক রয়েছে ঝিল্লী দিয়ে তৈরি ‘গোল জানলা’য়—যার ওপর রয়েছে প্রায় ৩০,০০০ অত্যন্ত অনুভূতিসচেতন চুলের কোষ। এরাই ‘গোল জানলা’র নড়াচড়ার তর্জমা করে রায় উদ্দীপক বানিয়ে পাঠিয়ে দেয় মস্তিষ্কের শ্রবণ কেন্দ্রে।

প্রশ্ন : মানুষের কানে এত জটিল কলকজা?

মা : এই কারণেই নানা রকমের আওয়াজের তফাত ধরতে পারে মানুষের কান। এই সূক্ষ্ম কলকজায় যাতে চোট না লাগে শব্দের উটকো উৎপাতে, সে ব্যবস্থাও রয়েছে যন্ত্রদের মধ্যে। দু-রকম পাহারার আয়োজন হয়েছে। ৯০ ডেসিবল আওয়াজে মধ্য-কানের হাড়গোড়ের সঙ্গে লাগাননা পেশি টাইট হয়ে গিয়ে যন্ত্রদের তাণ্ডব-নৃত্য রুখে দেয়। কিন্তু ১৪০ ডেসিবল আচমকা আওয়াজে হার মানে পুঁচকে পেশিরা—তখন মধ্য-কানের হাড় তিনটে সামনে পেছনে দোলন ভুলে গিয়ে ডাইনে বাঁয়ে দুলে চাপ কমিয়ে আনে।

প্রশ্ন : শুধু কি কলকারখানার আওয়াজেই কালা হতে হয়?

মা : মাথায় গাঁট্টা মারলে, অথবা কানের পাশে পটকা ফাটালেও পর্দা চৌচির হতে পারে, চুলের কোষে চোট লাগতে পারে, হাড় তিনটেকে উল্টোপাল্টা করে দিতে পারে। অসুখেও মধ্য-কানের স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যায়—স্নায়ু চুল-কোষগুলোকেও খেয়ে খেলতে পারে। কানে খোল জমলে, অথবা আজেবাজে জিনিস কানে ঢোকালে কানের ফুটো বুঁজে গিয়ে, অথবা কানের পর্দা ফেটে গিয়েও কালা হওয়া সম্ভব। এ ছাড়াও, কুইনাইন বা স্ট্রেপটোমাইসিনের মত কিছু ওষুধও ভেতরের কান পুড়িয়ে দিয়ে বধিরতা এনে দিতে পারে। সবশেষে জানবি, বয়েসের সঙ্গে সঙ্গে কানের জোর কমে। একে বলে প্রেসবাইকোসিস। ছেলেদের ক্ষেত্রে ৩০ আর মেয়েদের ক্ষেত্রে ৩৫ বছর থেকে তার শুরু।

প্রশ্ন : কেন? মেয়েরা পরে কালা হয় কেন?

মা : অত চেঁচাচ্ছিস কেন? এ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়ে গেছে। হতে পারে, ছেলেদের ঘরের বাইরের কাজকর্মে বেশি আওয়াজ শুনতে হয় বলেই হয়ত এমনটা হয়—নিছক বয়সকে দোষ দেওয়া যায় না। ২০-২২ বছর বয়েসে শূন্য ডেসিবেলের মৃদু আওয়াজ যারা শুনতে পায়, ৭০ বছর বয়েসে ৪০ ডেসিবেলের নিচের আওয়াজ আর তারা শুনতে পায় না।

প্রশ্ন : কিন্তু একজনের কাছে যা শব্দ-যন্ত্রণা, আর একজনের কাছে তো তা শব্দ-সুখ?

মা : ঠিক তাই। শব্দের ধরনের ওপর, আর ব্যক্তিবিশেষের মন, স্বাস্থ্য আর পরিবেশের ওপর নির্ভর করছে সেই শব্দ যন্ত্রণা বা সুখ। তোদের কাছে মাইকের গান আরামের, আমার কাছে আতঙ্ক। মাথা খারাপ করে ছাড়ে। কিন্তু শব্দ যখন সত্যি সত্যিই শরীর আর মনকে ড্যামেজ করে—তখন তো তা ক্ষতিকর নয়েজ বটেই। বিস্ফোরক বা কলকারখানার একটানা অনেকদিনের আওয়াজ ভেতরের কানের বারোটা বাজিয়ে ছাড়ে, চামড়ার বিদ্যুৎ পরিবাহিতায় পরিবর্তন আনে, ব্রেনের ইলেট্রিক্যাল অ্যাকটিভিটির হেরফের ঘটায়, হৃদঘাত আর শ্বাসপ্রশ্বাসের হার পালটে দেয়, গতি-সঞ্চালক প্রেরণাও আর সঠিক থাকে না। চড়া শব্দ যে জন্তু জানোয়ারদেরও ক্ষতি করে, সে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

প্রশ্ন : শব্দদৈত্যের খপ্পরে জন্তু জানোয়ার?

মা : যা বলিস। তাদের বেশ কয়েকটা অন্তঃস্রাবী গ্ল্যাণ্ডের সাইজ পাল্টে দেয়, রক্তের চাপে গরমিল আনে, রক্তবাহী নলগুলো সরু হয়ে যায়, চোখের তারা বেড়ে যায়। এগুলো মানুষের ক্ষেত্রে এখনো নথিভুক্ত হয়নি। তবে মেজাজ তিরিক্ষে হওয়া, বমি-বমি ভাব, অবসাদ, উদ্বেগ, ঘুম ছুটে যাওয়া, খিদে চলে যাওয়া—জন্তুদের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। অদৃশ্য উৎপাত রক্তমাংসের শরীরে গণ্ডগোল বাধাচ্ছে, মনকেও বিকল করবার উপক্রম করছে।

প্রশ্ন : কি যে বলো! মনের মধ্যে শব্দ ঢুকবে কী করে?

মা : ঘুম তো কেড়ে নেয়। তখন মেজাজ সপ্তমে উঠে যায়—মাথায় খুন চাপে—শব্দ-যন্ত্রণার কারক বস্তু বা ব্যক্তিকে বরদাস্ত করা যায় না। কথা জড়িয়ে যায় উৎকট আওয়াজকে চাপা দিতে গিয়ে—ফলে, দক্ষতা কমে যায়, বড্ড একা-একা লাগে নিজেকে, দুর্ঘটনা ঘটানোর প্রবণতা বেড়ে যায়। প্রচণ্ড আওয়াজের ফলে কলকব্জার ওয়ার্নিং বেল, ট্রাক বা গাড়ির হর্ন, তারস্বরে হুঁশিয়ারি কানে ঢোকে না। বহু পরীক্ষায় দেখা গেছে, নয়েজ বেশি হলে কাজের পরিমাণ আর নৈপুণ্য দুটোই কমে যায়। শব্দ-চাপ কমিয়ে আনলে কাজের ভুলও কমে যায়—সবসময়ে যদিও তা হয় না। কলকোলাহলে মেজাজ ক্ষিপ্ত হলে কাজে কামাইও বেড়ে যায়। মনের অবস্থা যে শোচনীয় হয় বিরক্তিকর আওয়াজে—তার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে বিস্তর।

প্রশ্ন : উল্টোটাও তো ঘটতে পারে। ফাঁকিবাজ আর অকাজের লোক শব্দের দোহাই দিয়ে পার পেয়ে যেতে পারে?

মা : তাদেরকে ধরবার জন্যে আছে অডিওমেট্রি বিজ্ঞান। যে-যন্ত্র দিয়ে মানুষের শ্রবণ ক্ষমতার লেভেল মাপা যায়, তাকে বলে অডিওমিটার। শব্দ ক্ষতি করার মত লেভেলে পৌঁছেছে কি না তা বোঝার জন্যে আছে সাউণ্ড লেভেলমিটার। সাউণ্ড প্রেসার লেভেল যখন ৮৫ ডেসিবেল, তখন তা একটানা ২৪ ঘণ্টার বেশি সহ্য করা ঠিক নয়। এইভাবে দেখা গেছে, পৌনে চার মিনিটের বেশি ১১১ ডেসিবেল সাউণ্ড প্রেসার লেভেল সহ্য করলে ক্ষতি হতে পারে।

প্রশ্ন : নয়েজ কন্ট্রোল করতে গেলে শব্দকে কোন লেভেলে বাঁধতে হবে, মা?

মা : ৫০ হার্জ থেকে ১০,০০০ হার্জ-এর মধ্যে। কানের জোর যার ভাল, সে মানুষ কিন্তু শুনতে পায় ২০ থেকে ২০,০০০ হার্জ ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ। এক কথায়, একেই বলে অডিও ফ্রিকোয়েন্সি। কলকাতা তার ধার ধারে না—তাই সে এখন বিশ্বের সবচেয়ে কোলাহলময় শহর। ৬ লক্ষ গাড়ির আওয়াজকে তো আর গলা টিপে মারা যাবে না। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, টিনাইটাস রোগটা এ শহরেও বেশ জেঁকে বসেছে।

প্রশ্ন : টিনাইটাস! সেটা কী?

মা : কানের রোগ। হতে পারে অনেকগুলো কারণে: কানে জীবাণু সংক্রমণ, অ্যানিমিয়া, কানে শোনার নার্ভের ওপর টিউমারের চেপে বসা, ভেতরের কানের কাছে ধমনির মধ্যে দিয়ে রক্তের হুশ্ করে ধেয়ে যাওয়া, কানের পর্দার ওপর একগাছি চুল এলিয়ে থাকা। ‘মাইসিন’ জাতীয় কিছু ড্রাগ রাতারাতি টিনাইটাস রোগ ডেকে আনতে পারে—সবচেয়ে বড় কারণটা অবশ্য নয়েজ—যেটা এই শহরে সবচেয়ে বেশি।

প্রশ্ন : টিনাইটাস কী ধরনের রোগ, মা?

মা : ভেতরের কানের চুল-কোষের কথা আগেই বলেছি—মাকড়শার জালের মত সূক্ষ্ম এই চুল-কোষ চিরুনির দাঁতের মত দাঁড়িয়ে থাকে—হেলে পড়ে কাঁপুনির ঠেলায়—ব্রেনকে পাঠিয়ে দেয় একটা ইলেকট্রিক সিগন্যাল—কীভাবে যে এই সংকেত সৃষ্টি করে, সেটা যদিও আজও এক রহস্য। ব্রেন সেই সংকেত থেকে শব্দের স্তর ঠিক করে নেয়। যদি বেশি চাপ পড়ে, চুল-কোষ ভেঙে যায়—পায়ে দলাইমলাই ঘাসের মত। তখন একটানা সাইরেন বা ট্রেনের বাঁশি বা সোঁ-সোঁ আওয়াজ শুনেই যেতে হয় জীবনভোর। দমাদম পটকা ফাটাস তো কালীপুজোয়—অনেকক্ষণ কানে আর কিছু শোনা যায় না। কান ভোঁ-ভোঁ করে। কেন? বেশ কয়েকটা চুল-কোষ গোড়াসমেত উপড়ে গেল বলে। বড় হলে টিনাইটাস রোগ দেখা দেবেই। এরকম ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। কানে তালা লেগে থাকা, কানের মধ্যে প্রায় ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুনতে পাওয়া—এ সব দেখা দিলেই ডাক্তার দেখানো দরকার।

প্রশ্ন : তবে যে বললে কানের মধ্যে পাহারাদার আছে জোর শব্দকে কমিয়ে দেওয়ার জন্যে?

মা : আছে। এক সেকেণ্ডের ০·০৬৩ ভাগের মধ্যে তারা কাজও শুরু করে দেয়। কিন্তু কাহিল হয়ে পড়ে এক মিনিটের মধ্যেই। শব্দ যদি বারবার হতে থাকে—বেড়েই চলে—পাহারাদার পেশি করবে কি?

প্রশ্ন : যারা কনসার্ট বাজায়, তাদের কানের ক্ষতি হয় না?

মা : জেট ইঞ্জিনের, আওয়াজ যা, রক কনসার্ট আর স্টিরিও হেডসেটের আওয়াজও তাই—১৩৫ ডেসিবেল। দু-মিনিটেই চুল-কোষদের ধ্বংস করে দিতে পারে। রাস্তাঘাটের নয়েজ ৯০ ডেসিবেল—বিকেলে পথে বেরোলে তাই মেজাজ সপ্তমে ওঠে।

প্রশ্ন : যারা বন্দুক চালায়?

মা : শটগানের আওয়াজ ১৫৬ ডেসিবেল—রক কনসার্টের ১০০ গুণ বেশি। কান ভোঁ-ভোঁ করা মানে বিপজ্জনক সঙ্কেত। একটা হিসেব মনে রাখিস, দশ ডেসিবেল বৃদ্ধি মানেই শব্দের তীব্রতা দশগুণ বেড়ে যাওয়া। সাইলেন্সরহীন মোটর সাইকেলের আওয়াজ ১০৫ ডেসিবেলের ধারেকাছে—এক ঘণ্টাতেই কানের দফারফা করে দিতে পারে অনেকের।

প্রশ্ন : ওয়াকম্যান? শুনবো না?

মা : কমিয়ে শুনবি। জোর আওয়াজের ধারেকাছে থাকবি না। একের পিঠে ২৪টা এক ওয়াটকে একের পিঠে ২৪টা শূন্য বসিয়ে ভাগ করলে যা দাঁড়ায়, ততটুকু শব্দশক্তিও অক্ষতকর্ণ শিশু শুনতে পায় মশা ডানা নাড়লেই। কিছু আফ্রিকান আদিবাসীর কান এত প্রখর যে ফুটবল মাঠের এদিকে ফিসফিস করলেও ওদিকে বসে শুনতে পায়। কিন্তু শহরের রাশি রাশি আওয়াজের জঞ্জাল আমাদের কানের সেই ক্ষমতা শেষ করে দিয়েছে এবং দিচ্ছে।

প্রশ্ন : সেকেণ্ডে ২০ থেকে ২০,০০০ ফ্রিকোয়েন্সির বাইরের স্বাভাবিক শব্দ কি তাহলে নেই পৃথিবীতে?

মা : আছে। সে সব শব্দের জন্যে আমাদের কান তৈরি হয়নি। বেড়াল, গিনিপিগ, ইঁদুর সেকেণ্ডে ৩০,০০০ আবর্তনের কম্পন-তরঙ্গ শুনতে পায়—বাদুড়ের ভেতরের কান শুনতে পায় ১০০,০০০ আবর্তনের কম্পাঙ্ক। কিন্তু সে তো নিঃশব্দ শব্দ। আর এক বিভীষিকা। কেন, তা আগেই বলেছি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%