হিরে

অদ্রীশ বর্ধন

প্রশ্ন : হিরে তো শুধু কার্বন দিয়ে তৈরি মা, তবে এত দামি কেন?

মা : হিরে খুঁজতে খরচ, খনি থেকে তুলতে খরচ, দেশের সরকারকে টাকা দিতে খরচ, জহুরিদের হাত বদল হতে হতে মুনাফা জোগাতেও খরচ। যে জিনিসের গুণ অনেক, মেলে কম—তার দাম তো বেড়েই চলে।

প্রশ্ন : হিরে তো শুধু বড়লোকদের জন্যে, তাই না মা?

মা : একশ বছর আগে তাই ছিল। এখন হিরে দিয়ে শুধু জড়োয়া গয়না নয়, কারখানার যন্ত্রও তৈরি হচ্ছে। আফ্রিকায় আর রাশিয়ায় বিশাল হিরের খনি আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকে হিরে এখন আর সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নয়।

প্রশ্ন : হিরে নাকি খুব শক্ত?

মা : প্রকৃতির তৈরি সমস্ত জিনিসের মধ্যে হিরে সব চাইতে শক্ত, সব চাইতে খাঁটি।

প্রশ্ন : তাহলে আমাকে হিরের টুকরো বলো কেন? আমি কি শক্ত?

মা : তুই বড় জেদি বলে। গ্রীক আর ল্যাটিন শব্দ adamas মানে খুব কঠিন জিনিস। তা থেকে এল প্রাচীন শব্দ adamant। ইংরেজিতে এই শব্দটাকেই ধার করে মানে করা হয়েছে অত্যন্ত কঠিন বস্তু, হিরে, চুম্বক পাথর, একগুঁয়ে। এদের মধ্যে শেষের মানেটাই বেশি চালু। adamantine মানে পাথরের মত শক্ত, হৈরিক, ইচ্ছাশক্তিতে বা চরিত্রে অত্যন্ত শক্তিশালী। হিরেকে প্রথমে বলা হয়েছিল adamas, তারপর adamant, সবশেষে diamond। মাঝে diamant শব্দটা এসেছিল প্রাচীন ফরাসিতে, ইংরেজিতে এসেছিল dyamaund আর adamaund পনেরো শতকের গোড়ায়, কবিরা বলতেন diamaund। ষোল শতকের মাঝখান থেকে diamond বানানটা চালু হয়ে যায়। মনে রাখিস, গ্রীক adamao মানে ‘আমি পোষ মানাই’, ‘মাথা হেঁট করাই’।

প্রশ্ন : এতই শক্ত হিরে? পিটিয়ে ছাতু করা যায় না?

মা : ইম্পাতকেও ফুটো করে দিতে পারে। স্যার উইলিয়াম ক্রুক্‌স্‌ ডাইস-এর ফাঁকে হিরে রেখে দু-পাশ থেকে ভয়ানক চাপ দিয়ে হিরের এই আশ্চর্য ক্ষমতা হাতেনাতে দেখিয়েছেন। চেপেচুপে হিরে-কে তেড়াবেঁকা করা যায় না—যেমন তোকে করা যায় না—কিন্তু হাতুড়ির একঘায়ে হিরে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়।

প্রশ্ন : তাহলে নিশ্চয় অ্যাসিড, অ্যালকালি, আগুন দিয়েও হিরে-কে জব্দ করা যায়?

মা : সব চাইতে কড়া অ্যাসিড আর অ্যালকালিতে ডুবিয়ে রাখলেও হিরে হিরে-ই থাকবে—যেমন তুই। কিন্তু আগুনে পুড়ে যাবে—কার্বন দিয়ে তৈরি বলে। হিরে তখন কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস হয়ে উড়ে যাবে।

প্রশ্ন : কাঁচ আর হিরে দুটোই যদি হাতুড়ির ঘায়ে গুঁড়িয়ে যায়, তা হলে হিরে যাচাই করব কী করে?

মা : হিরে যাচাই-এর অন্য পথ আছে। তার জন্যে জহুরি আছে। তবে সেকালে বোকা হিরে সংগ্রাহকদের এইভাবে ঠকানো হত। খনিমজুর হয়তো নিয়ে এল একগাদা হিরে, ধূর্ত জহুরি একটা হিরে ধাঁই করে গুঁড়িয়ে দিয়ে বলত—‘দেখলে তো, বিলকুল কাঁচ।’ হতাশ মজুর সব ‘কাঁচ’ ফেলে দিয়ে চলে যেত। জহুরিদের চালাকি ধরতে না পেরে মজুররা নিজেরাই কত ভালো হিরে কৃস্ট্যাল এইভাবে যাচাই করতে গিয়ে গুঁড়িয়ে ফেলেছে।

প্রশ্ন : হিরে তা হলে হিরে কাটে কী করে?

মা : জহুরি জানে, হিরের একটা ‘নরম’ দিক আছে। হিরে দিয়ে সেদিকে টানলেই হিরে কাটা যায়। এই কায়দাটা হিরে-কাটিয়েদের কাছে গুপ্ত-বিদ্যে হিসেবে থেকে গিয়েছিল কয়েক-শ বছর।

প্রশ্ন : বেশির ভাগ ঐতিহাসিক হিরে নাকি ভারতের হিরে?

মা : ঠিক জেনেছিস। একটা সময় ছিল যখন ভারতবর্ষের রাজা-মহারাজা-বাদশারা পেল্লায় হিরে ধারণ করে জাহির করত তাদের সামাজিক মর্যাদা। তাই আজও বেশির ভাগ ঐতিহাসিক-হিরে এই ভারতবর্ষেরই হিরে। প্রতিটি হিরেই ঘটনাবহুল—কয়েক ক্ষেত্রে রক্তাক্ত ইতিহাসের স্বাক্ষর। ফরাসি জহুরি জাঁ ব্যাপতিস্তে ট্যাভারনিয়ার প্রাচ্যদেশে বার ছয়েক টহল দিয়ে গিয়ে বেশ কয়েকটা ইতিহাসবিখ্যাত হিরে পাচার করেছেন ইউরোপে।

প্রশ্ন : সবচেয়ে বেশি ইতিহাসবিখ্যাত তা হলে কোন্ হিরে?

মা : কোহিনূর। মানে, আলোর পাহাড়। মালব রাজাদের দখলে ছিল ১৩০৪ পর্যন্ত। মোগল সম্রাটরা বিখ্যাত ময়ূর সিংহাসনের ময়ূরের একটা চোখ বানিয়েছিলেন কোহিনূর দিয়ে। আর একটা চোখ হয়েছিল আকবর শাহ্ হিরে দিয়ে। পারস্যের শাহ্ ভারতবর্ষ আক্রমণ করে কোহিনূর নিয়ে যান সঙ্গে করে। পরে তা ফিরে আসে পাঞ্জাব কেশরী মহারাজ রণজিৎ সিংহের হাতে, সামরিক সাহায্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বলে—কিন্তু তা দেননি। কোহিনূর তিনিও রাখতে পারেননি—যুদ্ধে ক্ষতিপূরণ বাবদ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি সেই হিরে নিয়ে গিয়ে ভেট দেয় মহারানী ভিক্টোরিয়াকে। নেপোলিয়ান বোনাপার্ট নিজেও এই ভারতবর্ষেরই একটা প্রকাণ্ড হিরে গেঁথে রেখেছিলেন নিজের তরবারিতে।

প্রশ্ন : সেকী! নেপোলিয়ানও ইণ্ডিয়ান ডায়মণ্ড লুঠ করেছিলেন?

মা : লুঠ করতে যাবেন কেন? বড় বড় যে-সব হিরে পাচার হয়েছিল ভারতবর্ষ থেকে, তাদের শেষের দলে ছিল রিজেন্ট হিরে। ভারতবর্ষে পাওয়া গিয়েছিল ১৭০১ সালে। ওজন ৪১০ ক্যারাট। ইংল্যান্ডে গিয়ে তার নাম হল ‘পিট’ হিরে। ফ্রান্সের রিজেন্ট পরিবার তাকে কিনে নিয়ে নতুন নাম দিল ‘রিজেন্ট’। মেরি অ্যান্তোনিয়েতের বড় প্রিয় ছিল এই হিরে। ফরাসী বিপ্লবে চুরি হয়ে যায়—১৫ মাস পরে তাকে পাওয়া যায় প্যারিসের একটা বাড়ির চিলেকোঠার ঘরে বরগার মধ্যে। তারপর অনেক হাত ঘুরে পৌঁছয় নেপোলিয়ন বোনাপার্টের হাতে—উনি তখন ফ্রান্সের সম্রাট।

প্রশ্ন : হিরে নাকি অনেক ট্র্যাজেডি ঘটায়?

মা : ‘হোপ’ ডায়মণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমনি অনেক ট্র্যাজেডি। ট্যাভারনিয়ার ইউরোপে নিয়ে গিয়েছিলেন এই হিরে। তখন তার নাম ছিল ব্লু ডায়মন্ড। ফরাসী বিপ্লবের সময়ে উধাও হয়ে যায়—আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। হোপ ডায়মণ্ড নাকি তারই অংশ—যার দখলে গেছে, তার কপালেই সর্বনাশ লিখেছে। আসলে, হিরে-ই সম্ভবত একমাত্র ঘনীভূত বস্তু-সম্পদ যার বিনিময়ে বড় বড় চাওয়া-পাওয়ার আলাপ-আলোচনা চলতে পারে। তাই সমাজের অনেক উত্থান-পতন এবং সাম্প্রতিক বিশ্বযুদ্ধে হিরের ভূমিকা রয়ে গেছে।

প্রশ্ন : হিরের ব্যবসায় তাহলে ভারতবর্ষই এগিয়ে ছিল অতীতে?

মা : তা তো বটেই। নিদেনপক্ষে খ্রিস্টপূর্ব চার শতক থেকে হিরের বাণিজ্য চলেছে ভারতবর্ষে। তার ওপর খাজনা চাপানো হয়েছে, বাইরে রপ্তানি করা হয়েছে মেসোপটেমিয়া, সিরিয়া, ইজরায়েল, মিশর, সিংহল, আরবদেশে।

প্রশ্ন : হিরের ব্যবসা কারা করত, মা?

মা : পুব এশিয়া আর রোম সাম্রাজ্যে—আবার মধ্যযুগে ইউরোপে আর পুব এশিয়ায় হিরের একচেটিয়া বাণিজ্য চালিয়েছে আরব আর পারসিকরা—ভারতবর্ষে আসার সমুদ্রপথ আবিষ্কারের আগে পর্যন্ত। ভারতবর্ষের দামি আর ভালো হিরেগুলো নিজেদের কাছে রেখে ছোট ছোট কম দামের হিরে বেচত অন্য দেশে। হিরে উপত্যকার কিংবদন্তী রচনা করেছিল হিরের এই জাত ব্যবসায়ীরাই।

প্রশ্ন : হিরের উপত্যকা?

মা : রোম দেশের প্লিনির লেখায় জানা যায়, হিরে মেলে হিরের উপত্যকায়। খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০-এ ভারতবর্ষে এসে নাকি হিরের উপত্যকার সন্ধান পেয়েছিলেন আলেকজাণ্ডার। সাপেরা পাহারা দেয় সেখানে। শুধু চোখে-চোখে হিরে-লোভীদের মেরে ফেলে ভয়ঙ্কর সাপের দল। আলেকজাণ্ডারের ঘোড়েল সৈন্যরা নাকি আয়না ধরেছিল সেই সাপেদের সামনে। নিজেদের চাহনিতেই অক্কা পেয়েছিল সর্পকুল। লুঠ হয়ে গিয়েছিল হিরে উপত্যকা। তারপর ভেড়ার মাংস ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিল গর্তের মধ্যে। চর্বিতে আটকে গিয়েছিল হিরে। লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল শকুনিদের। হিরে আটকানো মাংস তুলে নিয়ে শকুনিরা নিজেদের আস্তানায় পৌঁছতেই আলেকজাণ্ডারের সেনাদল সেখানে হানা দিয়ে উদ্ধার করেছিল বিস্তর হিরে। কন্সটানটিয়া-র বিশপ এই কাহিনী লেখেন প্রথমে—মার্কোপোলো তার পুনরাবৃত্তি করেন। একই কাহিনী ঢুকে গেছে সিন্ধবাদ নাবিকের অ্যাডভেঞ্চারে। আসলে, গোলকুণ্ডার হিরে ব্যবসায়ীরা ইচ্ছে করেই রটিয়েছিল হিরে উপত্যকার কাহিনী—যাতে আশেপাশের নদীখাতের হিরের আসল উৎস সন্ধানীদের কাছে অজানা থেকে যায়। হিরে নাকি জ্যান্ত পাথর, এমন রটনাও তো হয়েছে একসময়ে।

প্রশ্ন : জ্যান্ত হিরে! বংশবৃদ্ধিও করে নাকি?

মা : উদ্ভট এই ধারণাও ছিল সাহেবদের মধ্যে। বিশ্বাসটা ভারতবর্ষ থেকেই ছড়িয়েছিল সেদেশে। হিরের নাকি জাদুকরি এবং আধ্যাত্মিক ক্ষমতা আছে। হিরে নাকি অসুখ সারায়, সর্বনাশ রোধ করে, বদ প্রেতাত্মা তাড়ায়। পকেটে হিরে রাখলে মানুষের ভাগ্যকে সেইভাবেই গড়ে নেওয়া যায়। মানুষের শরীরে ব্রহ্মাণ্ডের আদল রয়েছে—এই বিশ্বাস থেকেই এসেছে আর একটা বিশ্বাস—ভালো কর্মফল অনুসারে জীবাত্মা পরমাত্মায় বিলীন হয়—খারাপ কর্মফল থাকলে জন্মান্তর ঘটে পশু, গাছ, খনিজের মধ্যে—যতক্ষণ না পরিশুদ্ধ হয়ে পরমাত্মায় বিলীন হচ্ছে। সুতরাং রত্নদের প্রাণ তো থাকবেই। প্রাচীন ভারতবর্ষ থেকে এই ধারণাই চলে গিয়েছিল প্রাচ্যদেশ, মিশর, গ্রীস হয়ে ইউরোপের অ্যালকেমিস্টদের কাছে। গ্রীক দার্শনিক প্লেটো মনে করতেন, রত্নদের মধ্যে অন্য নক্ষত্রের আত্মা থাকে বলেই তারা জীবন্ত। সোনার বিশুদ্ধ রূপ নাকি হিরে। অ্যারিস্টটলের শিষ্য থিওফ্রেসটাস দামি পাথরদের দু-ভাগে ভাগ করেছিলেন—স্ত্রী আর পুরুষ। এ থেকেই দানা বাঁধলো আর একটা কিম্ভুত বিশ্বাস—হিরেদের ছেলেপুলেও হয়। ১৫৬৬-তে লেখা De Gemme Tigur গ্রন্থে এরকম দু-খানা হিরের সন্ধান দেওয়া হয়েছে। সতেরো শতকের একটা খবরে জানা গেল, বোর্নিও আর ইণ্ডিয়ার দুটো শূন্য হিরের খনিতে নতুন করে হিরে আবির্ভূত হয়েছে। ওই সতেরো শতকেই জোহানেস বুস্টা মানটিয়াস নামে এক ভদ্রলোক জানালেন, দুটো হিরে বিয়ে করে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সংসার করছে।

প্রশ্ন : তাজ্জব কথা বলছ, মা! হিরে যদি জ্যান্ত হয়, তা হলে তার মৃত্যুও তো হবে?

মা : ঠিক এই কথাই বলেছিলেন রেনেসাঁ যুগের জেরোম কার্ডান। জন্মেছিলেন ১৫০১ সালে। দামি পাথরের প্রাণ তো আছেই, তাদের অসুখ হয়, বয়স বাড়ে, মৃত্যুও হয়। ১৮৭৬ সালেও ভারতবর্ষে শোনা গেছে, হিরের মধ্যেও আছে বর্ণাশ্রম। রঙ অনুসারে তারা ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র—এই চার বর্ণে বিভক্ত। ওষুধ হিসেবে হিরের ক্ষমতা নিয়েও কি কম ভ্রান্ত বিশ্বাস ছিল দেশে বিদেশে।

প্রশ্ন : হিরের ওষুধ?

মা : হিরে নাকি বিষের ক্ষমতা নাশ করে। বিষের সান্নিধ্যে রাখলে খাঁটি হিরে কালচে মেরে যায়—বিষকে নিজের গায়ে টেনে নেয় বলে—ভেতরে ঢুকতে পারে না। গোটা হিরে গিলে ফেললে কিন্তু তা মারাত্মক বিষ হয়ে দাঁড়ায়। হিরে শুঁকলে, অথবা তাকে গায়ে ঠেকিয়ে রাখলে, অথবা তাকে মুখে পুরে রাখলে রোগ-টোগ পাঁই পাঁই করে পালায়। হিন্দুদের বিশ্বাস ছিল অশুদ্ধ হিরে বিষাক্ত—জনডিস, কুষ্ঠ, প্লুরিসি রোগ ডেকে আনে—মানুষকে খোঁড়া করে দেয়; নানা রঙের হীরক-চূর্ণ খেলে নাকি মানুষের শক্তি, সৌন্দর্য, এনার্জি, সুখ, সাহস বেড়ে যায়—দীর্ঘ জীবন পায়। সবই ভুল। হিরের গুঁড়ো খাইয়ে মানুষ মারার ঘটনা অনেক আছে।

প্রশ্ন : হিরে খাইয়ে মানুষ খুন?

মা : শোনা যায়, সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডরিক-কে হিরের গুঁড়ো খাইয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল। তুরস্কের সুলতান বাজাজেত-এর গুণধর পুত্র খাবারে হীরক-চূর্ণ মিশিয়ে কবরে পাঠিয়েছিল পিতৃদেবকে। ১৫৩২ সালে পোপ অষ্টম ক্লিরেন্ট-কে তাঁর চিকিৎসকরা দামি পাথরের গুঁড়ো খাইয়েছিল ব্যাধি নিরাময়ের জন্যে। হিরের গুঁড়োও ছিল তার মধ্যে। চোদ্দ চামচ পর্যন্ত খেতে পেরেছিলেন, তারপর পা দিলেন স্বর্গের পথে। ফ্রান্সের দ্বিতীয় হেনরীর দজ্জাল রানী ক্যাথরিনের বিখ্যাত রসায়ন poudre de succession নাকি হিরের গুঁড়ো ছাড়া কিছুই নয়—সেঁকো বিষও নাকি ছিল তার মধ্যে। হিরে যে বিষাক্ত, এই সত্যটা ছড়ানো হয়েছিল আরও একটা উদ্দেশ্যে—খনি থেকে মজুররা হিরে গিলে ফেলে বাড়ি ফিরে তার পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেনি প্রাণের ভয়ে। বিষাক্ত হিরেই কিন্তু তার ম্যাজিক শক্তির জন্যে ঘরে ঘরে প্রণম্য হয়েছে হাজার হাজার বছর ধরে।

প্রশ্ন : হিরের মধ্যে ম্যাজিক?

মা : সতেরো শতকে জ্যোতিষীরা হিরেকে সূর্যের সঙ্গে তুলনা করেছে। হিরে নাকি মুখে পুরে রাখলে দাঁত খসে পড়ে গোড়াশুদ্ধ। হিরে পাগলদের ভাল করে, ভূতপ্রেত তাড়ায়। দুঃস্বপ্ন কাটায়। হিরে পরে যুদ্ধে নামলে ভয় চলে যায়, সাহস শতগুণ বাড়ে, যুদ্ধে জয়লাভ ঘটে। হিরে তন্ত্রমন্ত্রের কুপ্রভাব আটকে দেয়, মামলা জিতিয়ে দেয়। কিন্তু দু-পক্ষই হিরে ধারণ করলে কী ঘটবে, তা আর বলা হয়নি। বাড়ির কোণে বা বাগানের গাছে হিরে ছুঁইয়ে দিলে নাকি বজ্র, ঝড় থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। হিরের মধ্যে নাকি চৌম্বক ক্ষমতাও আছে। আসলে, হিরেকে ঘষলেই তার মধ্যে স্থির বিদ্যুৎ এসে যায়—কুচো কাগজ আর হাল্কা জিনিস টেনে নেয়; সহজ এই এক্সপেরিমেন্টটা কেউ কখনো করেনি। ম্যাজিক কথাটার এমনিই মাহাত্ম্য।

প্রশ্ন : এইজন্যেই রত্নদের রানী হয়ে বসেছে হিরে?

মা : চিরকাল এই গৌরব তার ছিল না। পারসিকরা মুক্তোর আদর করত বেশি তার জেল্লার জন্যে—কাটাই-ছাঁটাই হওয়ার পর হিরে উঠে আসে সবার মাথায়—তার আগে ছিল সতেরো নম্বর রত্ন—হিরের চেয়ে দামি ছিল চুনি আর পান্না।

প্রশ্ন : সেভেনটিন্‌থ্‌ থেকে ফার্স্ট বয় হয়ে গেল হিরে?

মা : গুণের কদর কি রাতারাতি হয় রে? রত্নদের কদর হয় তিনটে কারণে: তারা সুন্দর, টেকসই, দুষ্প্রাপ্য। এই তিন ব্যাপরেই হিরে সবাইকে টেক্কা মেরেছে। হিরেই একমাত্র কালারলেস আর স্বচ্ছ রত্ন—অথচ তার মধ্যে যেন আগুন আছে, তার জেল্লা তুলনাবিহীন বলেই তাকে adamantine বলে ডাকা হয়। হিরের মত টেকসই কোনও রত্নই নেই—মুক্তো তো বেশ নরম। ফি বছরে প্রায় সাতটন হিরে উঠছে খনি থেকে—তবুও তা চাহিদার তুলনায় কম। পৃথিবীর সব খনিতে হিরে একদিন ফুরোবেই—তখন হয়তো সাপ্লাই আসবে অন্য গ্রহ থেকে—আরও চড়া দামে। ফার্স্ট বয়-ই থেকে যাবে হিরে। মানুষের হাতে গড়া হিরেও তো পাল্লা দিতে পারছে না প্রকৃতির হিরের সঙ্গে।

প্রশ্ন : মানুষের তৈরি হিরে?

মা : সিনথেটিক ডায়মণ্ড-কারখানায় তৈরি। প্রথম তৈরি হয় আমেরিকার জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানিতে—১৯৭০ সালে। এখন করছে ইউরোপের সুমিটোমো ইলেকট্রিক। এদের তৈরি হিরেতে প্রতি দশ লক্ষ ভাগের একশ ভাগ হচ্ছে নাইট্রোজেন—তাই তা হলদেটে। ওটাকে একভাগে নামিয়ে আনতে পারলে স্বচ্ছ বা নীলচে হিরে তৈরি সম্ভব হবে। কিন্তু কোম্পানি চায় না স্বচ্ছ হিরের উৎপাদন তার প্রয়োজন কেবল জুয়েলারিতে বলে। হলদেটে টিফানি আর ক্যানারি হিরের চাহিদা কলকারখানা আর মিলিটারিতে। তবে হ্যাঁ, নাইট্রোজেন-ফ্রি সিনথেটিক ডায়মণ্ড ক্ষুদে সার্কিট আর ব্যাটারিতে বসিয়ে রুগীর দেহে লাগানো যাবে—কেন না, বিকিরণ রেকর্ড করবার ক্ষমতা সিনথেটিক ডায়মণ্ডের আছে—ন্যাচারাল ডায়মণ্ডেরও আছে—কিন্তু যাদের সে ক্ষমতা আছে, তাদের বেছে বের করাটা মুশকিল।

প্রশ্ন : পেল্লায় সাইজের সিনথেটিক ডায়মণ্ড তৈরি করা যায়?

মা : জাপানের ডায়মণ্ড প্রেস-এর সাইজ হাইটে আড়াই মিটার, ডায়ামিটারে দু-মিটার। বাড়ির সমান প্রেস বানালে আধমিটার লম্বা কি তারও বড় সাইজের সিনথেটিক ডায়মণ্ড তৈরি সম্ভব—কিন্তু সে কথা কেউ ভাবছে না।

প্রশ্ন : সিনথেটিক ডায়মণ্ড তাহলে কত বড়?

মা : চার বছর আগে Guinness Book of Records’য়ে ঠাঁই পেয়েছিল যেটি, তার ওজন ছিল চার ক্যারাট—বৃহত্তম সিনথেটিক হিরে। গত বছরে তাকে টেক্কা মেরেছে দশ ক্যারাট ওজনের একটা সিনথেটিক হিরে। এরপর সাউথ আফ্রিকান মাইনিং গ্রুপ বানিয়েছে এগারো ক্যারাট সিনথেটিক। আমেরিকার জেনারেল ইলেট্রিক কোম্পানি জানিয়েছে, ক্যারাট সাইজের দিক থেকে তাদের তৈরি সিনথেটিক ডায়মণ্ড মাইক্রোচিপ ডিজাইনের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দেবে—লেজারে নয়া উদ্ভাবন ঘটাবে।

প্রশ্ন : প্রকৃতির তৈরি হিরের দর কি তাহলে পড়ছে?

মা : দর, আদর, কদর—কোনোটাই কমেনি। যদিও আসল আর নকল হিরের কার্বনের গঠন একই রকম। পার্থক্য ধরাও মুশকিল। তবুও কারখানার হিরে প্রকৃতির হিরেকে কোণঠাসা করতে পারেনি, পারবেও না। কারণ, আসল একটাই—নকল অনেকগুলো।

প্রশ্ন : হিরের অনেক নকল?

মা : সিনথেটিক তাকেই বলব যখন তা একই বস্তু দিয়ে তৈরি হয়। কার্বন দিয়ে হলে তা সিনথেটিক হিরে। কিন্তু যখন হাই-ডেনসিটি কাঁচ দিয়ে হচ্ছে, তখন তা নকল হিরে। স্ট্রনসিয়াম টাইটানেট বা ফ্যাবুলাইট আসল হিরের তুলনায় বেশি ঝকঝকে, কিন্তু অনেক নরম; Yurium aluminate, সংক্ষেপে Y. A. G. শক্ত বটে, নকল হিসেবে উত্তম, কিন্তু আসল হিরের আগুন তার মধ্যে ততটা নেই; তবে জারকোনিয়াম অক্সাইড দিয়ে তৈরি নকল হিরে চোখে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে সবচেয়ে বেশি। Lithium niobate-এর হুবহু যমজ প্রকৃতির মধ্যে নেই—সুতরাং প্রকৃত সিনথেটিক কেউই নয়।

প্রশ্ন : হিরের আস্তানাটা কোথায়, মা?

মা : বোমদেশে এক মস্ত পণ্ডিত ছিলেন প্রথম শতাব্দীতে। নাম তাঁর প্লিনি। মারা যান ৭৯ খ্রিস্টাব্দে। জ্ঞানবিজ্ঞানের বিশ্বকোষ ধরনের সঙ্কলন করেছিলেন ৩৭টা গ্রন্থে। অনেকদিন ধরেই এঁর দেওয়া অনেক উদ্ভট তথ্যকে বৈজ্ঞানিক ঘটনা বলে মনে করা হয়েছিল। এঁর ভাইপোর নামও প্লিনি। আমি কিন্তু কাকা প্রিনির কথা বলছি। ইনিই বলেছিলেন, হিরে থাকে সোনার সঙ্গে। কিন্তু এখন জানা গেছে, সোনার সঙ্গেই হিরে পাওয়া যায় ঠিকই, তবে তা লক্ষ লক্ষ বছরের ঝড়বৃষ্টি আর জমির নাচুনি কুঁদুনির ফলে গায়ে গা লাগিয়ে উঠে আসে বলে হিরের আসল উৎস যেখানে, সেখানে সে সোনার সঙ্গে থাকে না। কিংবদন্তী যাই বলুক, যতদূর জানা গেছে, হিরের সবকটা আগেকার উৎস ছিল মরা অথবা ভরা নদীর খাতে। দু-হাজার কি তারও বেশি বছর ধরে ভারতবর্ষই ছিল হিরে পাওয়ার জায়গা। ষোল শতাব্দীতে প্রথম হিরে তোলা হয় বোর্নিওতে। ১৭২৫ সালে ব্রেজিলে সোনার খনি অঞ্চলেই পাওয়া গিয়েছিল হিরের খনি। ১৮৬৬-তে যখন তা ফুরিয়ে এসেছে, ঠিক তখনই আশ্চর্যভাবে আবিষ্কৃত হল দক্ষিণ আফ্রিকার হিরের খনি। ১৯৫৪-তে পাওয়া গেল রাশিয়ার মেরু অঞ্চল Yakutia-তে বড় বড় হিরের খনি। এখন তা দক্ষিণ আফ্রিকার খনিদের সমান হয়ে যাচ্ছে। মজাটা কি জানিস, যতবার নতুন নতুন জায়গায় হিরে পাওয়া গেছে, ততবারই গুজব ছড়ানো হয়েছে—ঝুটো! সাচ্চা হিরে ওটা নয়।

প্রশ্ন : আজ পর্যন্ত কত হিরে উঠেছে মাটির তলা থেকে?

মা : প্রায় দু-শ টন। হাজার হাজার বছরের চেষ্টায়। খুব বেশি? মোটেই না। খড়ের গাদায় ছুঁচ খুঁজে পাওয়ার মেহনত কম হিরে খোঁজার চেয়ে। এখন হিরের উৎপাদন বছরে প্রায় ১২ টন। প্রায় এক পঞ্চমাংশ রত্ন হিসেবে যায়, বাকিটা সিনথেটিক ডায়মণ্ড—ইন্ড্রাস্ট্রিতে লেগে যায়। তোর আংটিতে আছে আধ ক্যারাট হিরে—মানে ১০০ মিলিগ্রাম।

প্রশ্ন : খনি থেকে হিরে তোলে কীভাবে?

মা : হিরের গায়ে চটচটে ‘গ্রীজ’ লেগে থাকে, জল পিছলে যায়। তাই গ্রীজ-এর ওপর খনির বালি-পাথর-মাটি ফেলে দিলে হিরে আটকে থাকে গ্রীজে—জল ঢেলে দিলেই হিরে ছাড়া স-ব বেরিয়ে যায়।’ আংটির হিরেকে মাঝেমধ্যে পালিশ করতে হয়, এইজন্যেই---গায়ের আঠা পেছনে লেগে থাকে, পালিশ না করলে ওপরের ঝকঝকানিও থাকে না।

প্রশ্ন : হিরের ঝকমকানি বাড়ানোর জন্য বাদ দিতে হয় কতখানি?

মা : মোটামুটি হিসেবে, দু-ক্যারাট ওজনের হিরেকে কাটছাঁট করলে পাওয়া যায় এক ক্যারাট হিরে। হিরে যদি দোষের হয়, তাহলে কাটলে আরও ছোট হয়ে যায় এক ক্যারাটের এক পঞ্চমাংশ, কি আরও ছোট।

প্রশ্ন : হিরের মূল উৎস কোথায়, তা কিন্তু বললে না, মা?

মা : মূল উৎস পৃথিবীর গহন গভীরে। সেখান থেকেই নানাভাবে সরে এসে জমা হয়েছে যেখানে-যেখানে, ‘হিরের খনি’ বলা হচ্ছে তাদেরকেই। প্রথম দিকের সব কটা ‘হিরের খনি’ ছিল ভরা অথবা মরা নদীর তীরে অথবা খাতে, পাললিক নুড়ির মধ্যে। নদীর স্রোত শুধু হিরে নয়, অন্যান্য ভারি আর শক্ত কৃস্ট্যালও টেনে এনে জমিয়ে রেখেছে এই সব জায়গায়। ভরা নদীর কাছে এই সব পাললিক শিলার নাম দেওয়া হয়েছিল River digging; মরুভূমির বালির তলায় পাওয়া গিয়েছিল কিছু পাললিক নুড়ি—হাজার হাজার বছর আগে নদী বয়ে গিয়েছিল সেখানে—এখন তা বালি দিয়ে ভরাট। এদেরকে বলা হয় dry digging; গত শতাব্দীর শেষার্ধে দেখা গেল, আফ্রিকায় কয়েকটা dry digging রয়েছে বিশেষ ধরনের পাথর দিয়ে গড়া বিশাল স্তম্ভের চুড়োয়—হিরে ধরা পড়েছে সেই থামের মধ্যে। বিশেষ এই dry diggingগুলোর নতুন নাম দেওয়া হল—pipe অথবা pipe mine—নাম শুনেই বুঝেছিস, নলের আকারে এ খনি থাকে মাটির তলায়।

প্রশ্ন : ইণ্ডিয়ায় ‘পাইপ মাইন’ নেই?

মা : আছে। উত্তর ভারতের পান্না অঞ্চলে। তিনটে পাইপের একটায় কাজ চলছে বাণিজ্যিক পরিবেশে।

প্রশ্ন : নদীর তীরে আর খাতে যদি হিরে থাকে, তাহলে কলকাতার ধারেকাছে নেই কেন?

মা : কলকাতার পশ্চিমে নদীর কাছে হিরে পাওয়া গিয়েছিল বইকি। তবে পৃথিবীবিখ্যাত হিরেগুলোর বেশির ভাগই এসেছে দক্ষিণ ভারতের কোলার থেকে।

প্রশ্ন : কোলারে তো সোনার খনি আছে, মা?

মা : সোনার সঙ্গেই প্রথম হিরে উঠেছিল ভারতবর্ষে। এই কোলারেই ১৫৬০ সালে হঠাৎ ২৫ ক্যারাট ওজনের হিরে পাওয়া যেতেই খনির সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। ফরাসি জহুরী ট্যাভারনিয়ার সে জায়গায় গিয়েছিলেন। কৃষ্ণা নদীর দক্ষিণ তীরে ষাট হাজার স্ত্রী-পুরুষ বাচ্চাদের কাজ করতে দেখেছিলেন। এখানেই পাওয়া গিয়েছিল কোহিনূর, রিজেন্ট, গ্রেট মোগল ট্যাভারনিয়ার ব্লু এবং আরও অনেক ইতিহাসবিখ্যাত হিরে। টলেমি-র লেখা থেকে জানা যায় ইণ্ডিয়ায় আছে নাকি হিরের নদী। তখনকার ভারতবর্ষে নদীর জলে বয়ে আসা বালি আর নুড়ির মধ্যেই পাওয়া যেত হিরে।

প্রশ্ন : ভারত, ব্রেজিল, রাশিয়া ছাড়া আর কোথাও হিরে পাওয়া যায় না?

মা : দক্ষিণ আমেরিকার গুয়ানা আর ভেনিজুয়েলা, বোর্নিও আর ইন্দোনেশিয়া অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস্, কেপটাউন, কিমবারলি, কানাডার সেন্ট লরেন্স নদী এলাকা, চিনদেশের কয়েক জায়গায় হিরে অল্প-সল্প পাওয়া যায় বৈকি।

প্রশ্ন : মাটির তলায় হিরে কীভাবে জন্মায়, মা?

মা : পৃথিবীর ভেতরে গলিত ম্যাগনা-র মধ্যে কৃস্টালের রূপ নিয়েছে কার্বন। দীর্ঘ সময় ধরে—জন্ম নিয়েছে হিরে। অন্যান্য খনিজও নিশ্চয় দানা বেঁধেছে একই সঙ্গে। তারপর গ্যাসের বিস্ফোরক চাপের ঠেলায় উঠে এসে ঠাঁই নিয়েছে ভূত্বকের খাঁজে আর পাইপে। ঠেলার চোটে উঠতে-উঠতে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটেছে ম্যাগমা-র—সঙ্গে করে টেনে এনেছে অন্যান্য পাথর আর খনিজ। জন্ম নিয়েছে কিমবারলাইট পাথরের। প্রথমে মনে করা হয়েছিল, কিমবারলাইট পাথর নিশ্চয় গলিত লাভার জমাট রূপ। চেরা গাজরের মত ক্রমশ সরু হয়ে নেমে যাওয়া কিমবারলাইট-পাইপগুলোও নিশ্চয় মরা আগ্নেয়গিরির শেকড়। ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত Eric Brunton-এর লেখা Diamonds বইটা পড়ে জানলাম, এ ধারণা এখন আর ঠিক নয়। হিরে জন্মালে কী করে, তা ঠিক করে বলা যাচ্ছে না—লিখেছেন ব্রানটন সাহেব। অন্যান্য রত্নের মত নিশ্চয় পৃথিবীর গহন গভীরেই জন্মেছে হিরে; যে ম্যাগমা-র মধ্যে তার জন্ম, সেই ম্যাগমা-র উৎপত্তি ১২০ মাইলেরও বেশি নিচে বলেই মনে হচ্ছে—কিন্তু খুব সম্ভব হিরেরা নিজেরা উৎসের মধ্যে গড়ে ওঠেনি।

প্রশ্ন : হিরের উৎপত্তি নিয়ে অনেক তত্ত্ব রয়েছে মনে হচ্ছে?

মা : কিমবারলাইট পাথর হিরেকে নিয়ে আসছে পৃথিবীর ওপর দিকে। সুতরাং কিমবারলাইট-এর বিশ্লেষণের ওপর হিরের উৎপত্তি-রহস্য নির্ভর করে অনেকটা। একজন পৃথ্বী-বৈজ্ঞানিক কিমবারলাইট-এর নাম দিয়েছে ‘জানলা’—যে জানলা দিয়ে পৃথিবীর ওপর দিকের ম্যান্টল সম্পর্কে অনেক তথ্য জানা যায়। এই ম্যান্টলের বেশ কিছু খনিজ নমুনা থাকে কিমবারলাইট পাথরে—থাকে হিরের মধ্যেও; খুব একটা ছোট ম্যাগমা-র কণিকাও দেখা গেছে হিরের মধ্যে। সুতরাং বলা যায়, একই উৎস থেকে আবিভাব এদের। আসবার পথে অনুকূল চাপ আর তাপের পরিবেশে ভূত্বক থেকে প্রায় ৯৫ মাইল কি তারও বেশি নিচে বোধহয় হিরের দানা বাঁধা শুরু হয়েছিল। হিরে তৈরির জায়গা থেকে পাইপে আসা পর্যন্ত ব্যবধানের বৃত্তান্ত জানা যায়নি। কিছু বৈজ্ঞানিক বলেন, হিরের কৃস্ট্যাল আগে তৈরি হয়েছিল। আর একদল বলেন তার বিপরীত।

প্রশ্ন : কী কী উপাদান হিরেকে দানা বাঁধতে সাহায্য করেছে?

মা : খুব সম্ভব এমন একটা জলীয় বস্তু হিরে গঠনে বড় ভূমিকা নিয়েছে যার মধ্যে আছে জল, কার্বন ডাই অক্সাইড, আয়রন সালফাইড, নিকেল, কপার, কোবাল্ট। কিন্তু কীভাবে, তা সংশয়াচ্ছন্ন। কিছু কর্মী মনে করেন, অধিকাংশ সিনথেটিক ডায়মণ্ডের মত, গ্রাফাইট থেকে সরাসরি কঠিন অবস্থায় রূপান্তর ঘটেছে। আর একদল বলেন, একটা কার্বনময় তরল পদার্থ অথবা গ্যাসই প্রকৃত উৎস। একটা থিওরি বলছে, ভূত্বকে জলীয় পদার্থের সঞ্চয়ের মধ্যে হিরের বীজ তৈরি শুরু হয় এবং বড় হতে থাকে। তার ওপর কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে কার্বন জমতে শুরু করে। এই কার্বন মিথেন গ্যাস থেকেও আসতে পারে—কিছু সিনথেটিক ডায়মণ্ড পরীক্ষামূলকভাবে তৈরি হয়েছে এইভাবে। এই গ্যাসগুলোই আবার চাপ মেরে কিমবারলাইটকে তুলে দিয়েছে ওপরের দিকে।

প্রশ্ন : হিরে-ধারক পাথর কিমবারলাইট তাহলে লাভা নয়?

মা : না। লাভা ঠিকরে আসে ১০০০ থেকে ১২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়—যে টেম্পারেচারে যে-কোনও হিরেই উবে যাবে। কিছু কিমবারলাইট-এর মধ্যে পাওয়া গেছে কাঠ আর কয়লার টুকরো, এমনকি মানুষের হাড়—নিশ্চয় ভূত্বক থেকে মাইলখানেক নিচে তা ছিল। কাজেই লাভারূপে কিমবারলাইট ভূপৃষ্ঠে আসেনি। এবং কিমবারলাইট-এর মধ্যেও হিরের জন্ম হয়নি।

প্রশ্ন : মিথেন তো জলার গ্যাস। তা থেকে হিরে হয়?

মা : সিনথেটিক ডায়মণ্ড নিয়ে যে-সব রাশিয়ান গবেষক কাজ করছেন, তাঁদের বিশ্বাস, হিরের মাতৃস্থানীয় বস্তু হল মিথেন—কার্বন ডাই অক্সাইড, মানে, Co সহজেই ভেঙে গিয়ে কার্বনকে ছেড়ে দিয়েছে। তারপর সঠিক চাপ আর তাপে হিরে দানা বেঁধেছে। গ্রাফাইট থেকে হিরের উৎপত্তি থিওরিকে এঁরা খারিজ করেছেন। সংক্ষেপে, কার্বন থেকে কার্বনের কৃস্ট্যাল তৈরি হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে পৃথিবীর peridotite ম্যান্টলের মধ্যে জমে থাকা গলিত ম্যাগমা-র বিপুল আধারে বিশেষ কয়েকটা অনুকূল জায়গায়। গ্যাসের চাপে ওপরে উঠে এসে plastic বা semi-plastic অবস্থায় খাঁজে-খোঁদলে ঢুকে পড়ে নিরেট হতে শুরু করে। ওপরে আসবার সময়ে ম্যাগমা-র রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে এবং আরও অনেক পাথর আর খনিজ টেনে নিয়ে কিমবারলাইট পাথর হয়ে যায়।

প্রশ্ন : হিরের খনিদের বয়স কত?

মা : ৬০ মিলিয়ন থেকে ২৬০০ মিলিয়ন বছর।

প্রশ্ন : মোট কটা হিরে পৃথিবীবিখ্যাত হতে পেরেছে?

মা : প্রায় ৬৪টা। মানে, ৬৪টা রোমাঞ্চকর ইতিহাস।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%