অদ্রীশ বর্ধন

প্রশ্ন : মাগো, মরুযুদ্ধ ঝটপট শেষ হয় না কেন?
মা : কারণ, মরুযুদ্ধে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগে। হুটপাট সিদ্ধান্ত মরুভূমির যুদ্ধে চলে না। আগে থেকে তৈরি পরিকল্পনা দিয়েও যুদ্ধ চালানো যায় না। অতীতের যুদ্ধগুলো থেকেই অনেক শেখবার আছে।
প্রশ্ন : বালির ওপর লড়াইয়ের কায়দা কি অন্যরকম হয়?
মা : রুক্ষ, ধূসর, ন্যাড়া, নিষ্প্রাণ মরুভূমিকে অনন্ত মহাশূন্যের সঙ্গে তুলনা করা যায়। এ বড় ভয়ানক জায়গা। নিউ টেস্টামেন্টের শেষ গ্রন্থ Revelation-এ দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন জাতির মধ্যে বিরাট যুদ্ধের প্রস্তুতিপর্ব হিসেবে বিশাল ইউফ্রেটিস নদীকেও শুকিয়ে দিয়েছিলেন ষষ্ঠ পরী। ব্যাবিলন থেকে আরম্ভ করে অতীতের অনেক বড় শহর ছিল এই ইউফ্রেটিসের পাড়ে। ২১০০ মাইল লম্বা এই নদীর বেশ কিছুটা বয়ে গেছে ইরাকের মধ্যে দিয়ে। মরুভূমির শুকনো বালি যুদ্ধ করার উৎসাহ নিভিয়ে দেয়—শত্রুর পেছনে ধাওয়া করার ইচ্ছে আর থাকে না। যে ধুধু বালির তেপান্তরে না আছে সভ্যতার চিহ্ন, না আছে লুকোনোর জায়গা। দাবার ছক যেরকম সাদা কালো খুপরি ঘরের একঘেয়ে লড়াইক্ষেত্র—মরুভূমিও তাই। ছকে বাঁধা রণকৌশল এখানে চলে না।
প্রশ্ন : বাইবেলের সেই যুদ্ধের পর আর কি যুদ্ধ হয়নি ইরাকের মরুভূমিতে?
মা : অনেক হয়েছে। বুকের পাটা যাদের আছে, তারাই করাল মরুভূমির বুকে সামরিক ক্ষমতা জাহির করেছে—যেমনটা চলেছে উপসাগরীয় যুদ্ধে। সাতের শতকে এই বালির সমুদ্রেই যুদ্ধ জিতে আরবরা গড়ে তুলেছিল তাদের সাম্রাজ্য। বিশেষ করে, ৬৩৬ কি ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে ইরাকের দক্ষিণ পশ্চিমে আজকের আল-কাদিশিয়া শহরের কাছে, বেদুইনদের ঘিরে ধরে প্রায় খতম করে এনেছিল পারস্যের বিরাট সৈন্যবাহিনী। কিন্তু আচমকা রেগে টং হয়ে গিয়েছিল ক্রূর মরুভূমি। ঝড় উঠেছিল বিনা নোটিশে। বালির ঝাপটায় প্রায় অন্ধ হয়ে গেছিল দুর্ধর্ষ সৈন্যরা—সেই ফাঁকে আরব সৈন্য তাদেরই পাশ দিয়ে শত্রুব্যূহের একদম ঘাঁটিতে ঢুকে পড়ে খতম করে দেয় পারস্য সেনানায়ককে। এই হল মরুযুদ্ধ। আগে থেকে কিছু বলা যায় না। নেপোলিয়ন পর্যন্ত মিশরের মরুভূমিতে হেদিয়ে গেছিলেন—নীল নদের পাশে সৈন্য মোতায়েন রেখেও ১৭৯৮ সালে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
প্রশ্ন : নেপোলিয়নও ব্যর্থ হয়েছিলেন মরুযুদ্ধে?
মা : নেপোলিয়নের মতলব ছিল ভারত আক্রমণ করা। কিন্তু মিশরের মরুভূমিতেই শেষ হয়ে যায় তাঁর সেই স্বপ্ন। বিলেত আমেরিকার বড় বড় যোদ্ধারা খুব বেশি লড়াই দেখাতে যাননি এই মরুভূমিতে। নেপোলিয়নের স্বপ্নভঙ্গের ১৪০ বছর পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে উত্তর আফ্রিকায় প্রথমে ইউরোপিয়ানরা, পরে আমেরিকানরা বড় মাপের মরু লড়াইয়ে নেমেছিল। কিন্তু পশ্চিম মিশরের এল আলামেইনের যুদ্ধে যে রকম নাটক আর সঙ্কট দেখা গেছিল—সেরকমটা দেখা যায়নি আর কোনও যুদ্ধেই। এই যুদ্ধেই পৃথিবী বিখ্যাত হয়ে গেছিলেন দুই সেনাধ্যক্ষ—জার্মানির আরউইন রোমেল আর বৃটেনের বার্নার্ড মন্টগোমারি। খেল দেখিয়েছিলেন বটে মরুশিয়াল।
প্রশ্ন : মরুশিয়াল! যুদ্ধ লড়েছিল?
মা : ফিল্ড মার্শাল রোমেল এই খেতাব অর্জন করেছিলেন—মরুযুদ্ধে অসাধারণ উপস্থিত বুদ্ধি আর চমকপ্রদ ধূর্ততা দেখিয়ে। ১৯৪১ সালে হিটলার তাঁকে পাঠিয়েছিলেন ইটালিয়ানদের পাশে দাঁড়ানোর জন্যে, ব্রিটিশদের উত্তর আফ্রিকা থেকে তাড়ানোর জন্যে। গোহারান হারছিল ইটালিয়ানরা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কাছে। মহাধূর্ত রোমেল এই যুদ্ধেই ‘মরু শৃগাল’ খেতাব পেয়েছিল অদ্ভুত রণকৌশল মাথা খাটিয়ে বের করে। ‘যখন যেমন তখন তেমন’ নীতি নিয়েছিলেন—তৈরি প্ল্যান ছুঁড়ে ফেলে দিতেন প্রয়োজন মনে করলেই। মাসের পর মাস যুদ্ধ চলেছে—রোমেলের সাঙ্গপাঙ্গরা হতভম্ব হয়ে গেছে তাঁর আশ্চর্য প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব দেখে। ব্রিটিশ সৈন্যদল মাত্র দু-মাসে ১,৩০,০০০ ইটালিয়ানদের বন্দী করে তাদের প্রায় হারিয়ে এনেছিল। কিন্তু ১৯৪২-এর জুলাই মাসে জার্মানরা অদ্ভুত কায়দায় অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার ঘটিয়ে ব্রিটিশদের খেদিয়ে নিয়ে যায় লিবিয়ান মরুভূমির ওপর দিয়ে মিশরের ভেতরে। এল-আলামেইন ঘাঁটি ছাড়া ইংরেজদের হাতে তখন আর কিছুই ছিল না। এবং তখনই আসরে নামলেন এক ছিটগ্রস্ত সেনাধ্যক্ষ।
প্রশ্ন : ছিটিয়াল সেনাপতি?
মা : লেফটেন্যান্ট জেনারেল বার্নার্ড মন্টগোমারি ডিসিপ্লিনের এমনই অন্ধভক্ত ছিলেন যে লোকে তাঁকে বলত eccentric disciplinarian। নাৎসীদের হাতে কোণঠাসা হয়ে গিয়ে কিন্তু এঁকেই পাঠালেন উইন্সটন চার্চিল—ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী। বৃটিশ সোলজাররা তাঁকে ‘মন্টি’ বলে ডাকতো। মন্টি-ই ঝটপটে নতুন করে গড়ে তুললেন সৈন্যদের ভাঙা মনোবল। ইনিও উপস্থিত বুদ্ধির জোরেই লড়াই চালিয়েছিলেন—চাচিলের হুকুমের তোয়াক্কা রাখেননি—১৯৪২-এর আক্রমণে পাল্টা আক্রমণ চালাননি। উনি জেনে গেছিলেন, রোমেলের সৈন্যদের রসদ আসছে অনেক লম্বা পথে—জার্মান হাই কম্যাণ্ডের সমর্থনও তেমন বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। তাই ‘মন্টি’ নতুন ট্রেনিং দিলেন নিজের সৈন্যদের—অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদের পাহাড় জমিয়ে ফেললেন। অক্টোবরের ২৩ তারিখে তৈরি হলেন পাল্টা আক্রমণের জন্যে।
প্রশ্ন : মরু-শিয়াল কি তা জানতেন না?
মা : উনি তখন তৈরি ছিলেন না। পেটের অসুখের চিকিৎসার জন্যে আকাশপথে গেছিলেন ইউরোপে—যুদ্ধের ভার দিয়ে গেছিলেন ডেপুটির হাতে। এদিকে মিত্রশক্তির সৈন্য আর ট্যাঙ্কের সংখ্যা বেড়ে গেছে অক্ষশক্তির সৈন্য আর ট্যাঙ্কের চেয়ে। জার্মানদের রসদ যে পথে আসছে, তা তছনছ করে দিচ্ছে ব্রিটিশদের প্লেন আর যুদ্ধজাহাজ। তার চাইতেও বড় কথা, কূটবুদ্ধি ব্রিটিশরা জার্মানদের ভেতরে এনে দিয়েছিল একটা ভুল বিশ্বাস—মিত্রপক্ষ নাকি হানা দেবে দক্ষিণ দিক থেকে। ফুটফুটে জ্যোৎস্নার রাতে বৃটিশ বাহিনী বোমাবর্ষণ শুরু করেছিল ৯০০ কামান থেকে। দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড বেধে গেছিল তখুনি। হট্টগোলে হতভম্ব হয়ে গিয়ে হার্ট অ্যাটাকে মারা যান ডেপুটি সেনাধ্যক্ষ। হিটলার হুকুম দিলেন মরু-শৃগাল যেন এখুনি ফিরে গিয়ে আমৃত্যু লড়াই চালিয়ে যান। কিন্তু পনেরো আনা ট্যাঙ্ক খুইয়ে মরু-শৃগালকেও ল্যাজ গুটিয়ে পালিয়ে আসতে হল ৪ নভেম্বরে। আনন্দে ফেটে পড়ে বলেছিলেন চার্চিল—‘এল-আলামেইনের আগে কখনো যুদ্ধে জিতিনি—এল-আলামেইনের পরে কখনো যুদ্ধে হারিনি।’
প্রশ্ন : কিন্তু মা, উপসাগরীয় মরুযুদ্ধে অন্যরকমের অস্ত্রশস্ত্র দেখা গেছে না?
মা : ভড়কে দেওয়ার মতো হাতিয়ার দেখিয়ে দিয়েছে দুই পক্ষই। ঠিক যেন হাজার হাজার বছর আগেকার রামায়ণ মহাভারতের অস্ত্রশস্ত্রগুলো নতুন করে ফিরে এসেছে।
প্রশ্ন : কি যে বলো! বিংশ শতাব্দীতে রামায়ণ মহাভারতের অস্ত্র?
মা : হুবহু সেইগুলোই কি হচ্ছে! কিন্তু পৌরাণিক হাতিয়ারগুলোকেও তো আর কাল্পনিক মনে হচ্ছে না। যেমন ধর না, ব্রহ্মশির অস্ত্র। মানে, ব্ৰহ্মতেজপূর্ণ অস্ত্র। দ্রোণ তাঁর ছেলে অশ্বত্থামাকে দিয়েছিলেন এই অস্ত্র। অর্জুনও পেয়েছিলেন এই একই অস্ত্র। দ্রোণ কিন্তু তাঁর ছেলেকে বলে দিয়েছিলেন, খুব বিপন্ন হলেও খবরদার এই অস্ত্র প্রয়োগ করতে যাবে না। অশ্বত্থামা কিন্তু অর্জুন, ভীম আর যুধিষ্ঠিরকে রথে চেপে তেড়ে আসতে দেখেই প্রাণের ভয়ে ছুঁড়েছিলেন ব্রহ্মশির অস্ত্র। সঙ্গে সঙ্গে কালান্তক যমের মতো আগুন ঠিকরে গেছিল। অর্জুনও ব্রহ্মশির ছুঁড়ে অস্ত্রে অস্ত্রে কাটাকুটি করতে গেলেন। তাঁরও অস্ত্র জ্বলে উঠল প্রলয়ের আগুনের মত। এ যেন ঠিক স্কাড মিসাইলকে ঘায়েল করার জন্যে ছোঁড়া হচ্ছে প্যাট্রিয়ট মিসাইল। বুনো ওলের বাঘা তেঁতুল!
প্রশ্ন : সত্যি মা! খ্যাপা ক্ষেপণাস্ত্রদের সার্কাস হয়ে গেল যেন। সেকালে কি এরা ছিল?
মা : সত্যিমিথ্যে জানি না, তবে প্রাস নামে একটা ক্ষেপণাস্ত্রের কথা আছে পুরাণে। সাত হাত লম্বা বাঁশ জাতীয় ডাণ্ডার মাথায় লোহার তীক্ষ ফলক, মূলে সূক্ষ্ম আর তীক্ষ্ণ লোহার শলাকা, ফলকের নিচে আর মূলে সিল্কের স্তবক ঝুলত থোকা থোকা। এ ছাড়াও আগুন ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্রও ছিল বইকি। সায়েন্স-ফিকশন বলেই মনে হয়েছে। এখন তো দেখছি সায়েন্স ফিকশন সত্যি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। হাতে করে ছোঁড়ার মত রোবট ক্ষেপণাস্ত্রও এসে গেছে উপসাগরীয় যুদ্ধে।
প্রশ্ন : রোবট ক্ষেপণাস্ত্র?
মা : রোবটদের তো ভয়ডর নেই, ক্লান্তি কি জিনিস তাও জানে না, কাজেই রোবট সোলজারদের আবির্ভাব তো ঘটবেই মরুযুদ্ধে—অতীতের শিক্ষা থেকেই বোধহয় রোবট যোদ্ধাদের বানানো হয়েছে ভবিষ্যতের লড়াইয়ের জন্যে। রক্তমাংসের মানুষকে মরুভূমি হেদিয়ে দিতে পারবে—রোবটদের হবে কচু। যেমন RPV অথাৎ Remotely Piloted Vehicles, সবচেয়ে নিরীহটাকে দেখলে আঁতকে উঠতে হবে না। ওজনে মাত্র প্রায় পাঁচ কিলোগ্রাম। পিঠের ঝোলায় বয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। ডানা ছড়িয়ে যায় ২·৭ গজ পর্যন্ত। স্রেফ হাতে রেখে উড়িয়ে দেওয়া যায় ক্ষুদে ক্ষেপণাস্ত্রকে। তারপরেই তাকে গাইড করে রেডিও। একটানা উড়ে যায় কয়েক ঘন্টা। তখন কিন্তু সে উড়ুক্কু গোয়েন্দা। শত্রুরা কে কোথায় কীভাবে ঘাঁটি গেড়ে হাতিয়ার সাজিয়ে বসে আছে, সমস্ত কিছুর ছবি পাঠিয়ে যায় মানুষ-মালিকদের কাছে।
প্রশ্ন : তাজ্জব রোবট তো! শত্রুপক্ষ টের পায় না?
মা : না। উড়ুক্কু রোবটের ইলেকট্রিক মোটর চলে নিঃশব্দে। আকারেও এত ক্ষুদে যে চোখে ধুলো দিয়ে উড়ে যায় অনায়াসে—তাই তাকে মাটিতে পেড়া ফেলাও যায় না। এদিকে কম্যাণ্ডার সাহেব মাইল কয়েক দূরে টিভি স্ক্রীনের সামনে বসে তোফ আরামে দেখে যাচ্ছেন পর্বতমালার ওদিককার দৃশ্য। আগে হলে, সৈন্য পাঠিয়ে খবর আনতে হত—তারা হয়তো জানেও মরতো—কিন্তু এখন সে সবের কোনো ঝুঁকি নেই। আজব এই রোবট স্পাইকে বানিয়েছে আমেরিকার রোবোটিক টেকনোলজিস কোম্পানি। খামোকা যাতে কোনো পক্ষেই মানুষ মারা না যায়—তাই এত আয়োজন। রোমেল যে-যুদ্ধে হেরে পিটটান দিয়েছিলেন, সেই যুদ্ধে মারা গেছিল ৩২,০০০ জার্মান সৈন্য, ১৩,৫০০ মিত্রপক্ষের সৈন্য। এখন কিন্তু রোবটরা এসে চুলচেরা ছবি আর সঠিক খবর পাঠিয়ে রোধ করছে এলোপাতাড়ি গোলাবর্ষণ আর অহেতুক নরহত্যা।
প্রশ্ন : জয় হোক রোবটদের! এয়ার ফোর্সকে তাহলে এখন পিঠে ঝুলিয়ে রাখা যায়?
মা : ঠিক তাই। খরচ পড়ে মাত্র চল্লিশ হাজার ডলার। পাইলট সমেত একটা বড় উড়োজাহাজের পেছনে খরচ পড়ে দু কোটি ডলার।
প্রশ্ন : সবচেয়ে ভাল হত যদি রোবট উড়িয়ে সবাইকে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া যেত। তাই না, মা?
মা : তাহলে তো রামায়ণের জিম্ভকাস্ত্র তৈরি করতে হয়।
প্রশ্ন : জিম্ভকাস্ত্র কী মা?
মা : যে অস্ত্র নিক্ষেপ করলে হাই তুলতে তুলতে শত্রুরা ঘুমিয়ে পড়ে।
প্রশ্ন : মিসাইলের মাথায় ঘুমের ওষুধ পাঠিয়ে দিলেই তো হয়?
মা : তোর ব্রেনটা সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। তোরা দুজনেই মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে পড়িসনি। তিনি হুমকি ছেড়েছিলেন, মরণ ঘুমের কেমিক্যাল আর বিষ গ্যাস পাঠাবেন মিসাইলের মাথায়। ট্র্যানইলাইজার পাঠালেও তো হয়—স্নায়ু শীতল হয়ে যুদ্ধের নেশা কেটে যাবে।
প্রশ্ন : তাহলে তো কেউ হারবে না?
মা : হারজিতের কথা এখন রাখ—অস্ত্রশস্ত্রের ওই ইঁদুর দৌড়ের খবর-টবর রাখ। উপসাগরের সেই যুদ্ধে পাঁচ লক্ষরও বেশি আমেরিকান সৈন্য আর ৩১টা দেশের সৈন্যরা সৌদি আরবকে আগলাতে আর কুয়েতকে ইরাকের খপ্পরমুক্ত করতে যে সব অস্ত্রশস্ত্র…তার সব বলতে গেলে একটা মহাভারত হয়ে যাবে। শুধু আমেরিকান বাহিনীই এনেছিল অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির সাত রকমের হেলিকপ্টার যা দিয়ে জমিন্-যোদ্ধাদের খুব কাছ থেকে মদত দেওয়া যাবে। চার রকমের সাঁজোয়া গাড়ি, ছ’রকমের আকাশ প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা, পাঁচ রকমের কামান ব্যবস্থা, তিন রকমের ট্যাঙ্ক-বিধ্বংসী ব্যবস্থা।
প্রশ্ন : ইরাকের হাতিয়ারের ভাঁড়ারে কী ছিল?
মা : হাই-টেক অস্ত্রশস্ত্র, মিলিটারি টেকনোলজি ইদানীংকালে যা কিছু বানিয়েছে—তার সবই।
প্রশ্ন : ইরাক বানিয়েছিল এত আধুনিক হাতিয়ার?
মা : এটাই আসল প্রশ্ন! এত বড় বড় অস্ত্র ইরাক একা বানায়নি, অনেকদিন ধরে তাকে দেওয়া হয়েছে। জমির ওপর থেকে জমির লক্ষ্যবস্তুতে ছুঁড়ে দেওয়ার জন্যে। রয়েছে সোভিয়েত স্কাড মিসাইল, রয়েছে মিগ ফাইটার বিমান। একা সোভিয়েত নয়, চিন, ব্রিটেন, চেকোস্লোভাকিয়া, ফ্রান্স, ব্রেজিল, আমেরিকা, স্পেন—এরাও শক্ত করেছে সাদ্দাম হোসেনের যুদ্ধের হাত। বেশি করেছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হয়েছে সাদ্দামের অত্যাধুনিক কামানগুলো। আরও ভয়ঙ্কর আমেরিকার আকাশ গোলা। ইরাকের পনেরো ফুট পুরু কংক্রিট ফুটো করে পাতাল ঘরও উড়িয়ে দিয়েছে। তাহলে তো এবার বালির তলায় পাতাল ঘরেও নিস্তার নেই সৈন্যবাহিনীর।
প্রশ্ন : আচ্ছা মা, রামায়ণ-মহাভারতের যুদ্ধে সত্যিই কি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল?
মা : হয়েছিল বলেই মনে করেন কিছু পণ্ডিত। পৌরাণিক অস্ত্রগুলোকে মোট ছ-ভাগে ভাগ করা যায়। ১) যন্ত্রমুক্ত—যা কিনা ক্ষেপণাস্ত্র, ইঞ্জিন দিয়ে ছোঁড়া হত; ২) হস্তমুক্ত—যা কিনা গ্রেনেডজাতীয় হাতিয়ার, হাতে করে ছোঁড়া হত; ৩) মুক্তামুক্ত—ত্রিশূল,বর্শা ইত্যাদি; ৪) বজ্র ও বিদ্যুৎ অস্ত্র—Themesteos যাদেরকে কামান বলে মনে করেন; ৫) তোমর, ভিন্দিপাল, কৃপাণ, ক্ষেপণি, নারাচ, রিষ্টি, ইত্যাদি; ৬) শতঘ্নী আর নালিক—ঐতিহাসিক লসেন এদেরকে কামান বলে মনে করেন।
প্রশ্ন : বাল্মীকি যুগের প্রধান অস্ত্র কী ছিল?
মা : বাণ। ‘বাণ’ শব্দ দিয়ে কিন্তু নানারকম যন্ত্রকেও বোঝাতো। প্রত্যেকটা যন্ত্রকে গড়া হত কীভাবে, তাদের দেখতে ছিল কী রকম—সবই লেখা আছে রামায়ণে। বিশেষ-বিশেষ শক্তি থাকত এক-একটা অস্ত্রে—তাই তাদের বলা হত দৈবাস্ত্র। এক-একজন দেবতার নাম জুড়ে দেওয়া হত এক-একটা অস্ত্রে। যেমন, ঐন্দ্র, ব্রাহ্ম, পাশুপত, ব্রহ্মশক্তি, ইত্যাদি অস্ত্রগুলোকে দিয়েছিলেন বিশ্বামিত্র, বশিষ্ঠ, জমদগ্নি, অগস্ত্য, ভরদ্বাজ, প্রভৃতি ঋষিরা। এসব অস্ত্রের ব্যবহার ভালভাবে জানতেন শুধু এঁরাই। রামচন্দ্রকে অস্ত্র ব্যবহারের সঠিক শিক্ষাও দিয়েছিলেন এঁরা।
প্রশ্ন : বিশেষ শক্তির বাণ?
মা : কোনও বাণ ছিল আগুনের মত, কোনওটা সূর্যের সমান, কোনওটা বিদ্যুত আর উল্কার মত, কোনওটা ধোঁয়া রঙের। শুনে কি নিরীহ বাণ অথবা যন্ত্র মনে হচ্ছে?
প্রশ্ন : যন্ত্রের শক্তি বলেই তো মনে হচ্ছে। আগ্নেয় অস্ত্রগুলো ছিল কী রকম?
মা : এদের ভেতর থেকে ঠিকরে যেত আগুনে-গোলা আর আগুন-ছিটকানো তাল-তাল ধোঁয়া। ইঞ্জিনের শক্তির কথা আগেই বলেছি। কামান ছাড়া আর কিছু মনে হয় কি?
প্রশ্ন : সবই তো মনে করে নিতে হচ্ছে! আর কী কী অস্ত্র ছিল?
মা : বায়ব্য অস্ত্র—যা দিয়ে বাতাসের গতি বাড়িয়ে দেওয়া যেত। ‘বাণ’ নিক্ষেপ করে বাতাসের গতি বাড়িয়ে দেওয়া মানে ঝড় তৈরি করা। আচমকা এক জায়গায় প্রচণ্ড বিস্ফোরণের পর সে-জায়গায় বাতাস গরম আর হাল্কা হয়ে ওপরে উঠে যায়, চারদিক থেকে ঝড়ের বেগে বাতাস ধেয়ে আসে। কি প্রচণ্ড শক্তি সেই অস্ত্রের মধ্যে থাকলে এমন ঝড় তোলা যায়? আরও আছে, আরও আছে। ‘পর্জন্য’ অস্ত্র দিয়ে মেঘবৃষ্টি আর জল আকর্ষণ করা যেত। সোজা কথায়, ‘বাণ’ মেরে আকাশ ভরিয়ে দেওয়া হত ঘন মেঘে, তারপর হুড় হুড় করে জল নামানো হত সেই মেঘ থেকে। আধুনিক রণকৌশলে এ-ধরনের বৈজ্ঞানিক অস্ত্র অবাক কিছু নয়—কিন্তু বাল্মীকিমশায় এ-রকম যুদ্ধাস্ত্র না দেখে লিখলেন কী করে?
প্রশ্ন : কল্পবিজ্ঞান লিখতেও তো পারেন?
মা : যা মনে করিস। ‘সম্মোহন’ অস্ত্রের হুমকি কিন্তু ইরাকে শোনা গেছে। রামায়ণী যুদ্ধে ছিল এই অস্ত্র।
প্রশ্ন : ‘সম্মোহন’ অস্ত্র?
মা : ক্ষেপণাস্ত্রের মাথায় ঘুমপাড়ানি ওষুধ পাঠানোর কথা বলছিলি একটু আগে। খুব সম্ভব ইরাক শেষ ঘুমপাড়ানি বোমার ট্রায়াল দিয়েছে ইরানের সঙ্গে লড়বার সময়ে। বসরার উত্তরে ইরানি সৈন্যরা শেষ ঘুম ঘুমিয়ে পড়েছিল সারা শরীরে কোনও আঘাতের চিহ্ন না নিয়ে। নিশ্চয় অজানা কোনও জীবাণুর আক্রমণে। এই জীবাণু বোমাই নাকি ইরাকের হাতে তুরুপের তাস হয়ে উঠেছিল। আর এক যুদ্ধবাজরা হুমকি দিচ্ছেন এমন অস্ত্রের যা সেই অঞ্চলের সমস্ত অক্সিজেন টেনে নেবে—এমনকি ফুসফুসের ভেতর থেকেও। তার মানেই তো প্রথমে শ্বাসকষ্ট, তারপর মৃত্যু! রামায়ণী যুদ্ধেও ‘সম্মোহন’ অস্ত্র দিয়ে শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি করা হয়েছে। কী ছিল সেই অস্ত্রে? বিষ গ্যাস না জীবাণু?
প্রশ্ন : রকেটের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে কামানের গোলা?
মা : মাটির ওপর লড়াইতে ট্যাঙ্ক আর কামানের দরকার আছে। আমেরিকার আব্রামস ট্যাঙ্ক এদিক দিয়ে অজেয় বললেই চলে। পারমাণবিক, রাসায়নিক, জীবাণুযুদ্ধেও টিকে থেকে লড়ে যাবে—দুর্বলতা শুধু একটা জায়গায়; ৪৫ মাইল অন্তর তার ‘দেখভাল’ না করলেই নয়। ইরাক কামানের দিক দিয়ে কিন্তু টেক্কা মেরেছে আমেরিকাকে—বিশাল কামান হাউৎজার-ই আছে ১০০টা—যা থেকে রাসায়নিক শেল-ও ফেলা যাবে ৩১ মাইল দূরে। এত বড় কামান আমেরিকার নেই। তবে পাল্লা দিতে পারে রকেট আর কপারহেড ছুঁড়ে—হাউৎজারের গোলা শূন্যে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ইলেট্রকনিক সঙ্কেত এসে গেলেই। আমেরিকা ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারে এগিয়ে থাকলেও ইরাক এগিয়ে ছিল জীবাণু-যুদ্ধের ব্যাপারে।
প্রশ্ন : জীবাণু-বোমা নাকি? পরমাণু বোমার চেয়েও সাংঘাতিক?
মা : অনেক…অনেক মারাত্মক। এরকম বোমা নাকি আগে কখনও ব্যবহার করা হয়নি বলে সবাই ভয়ে সিঁটিয়ে গেছিল। কিন্তু হয়তো ইরাক ট্রায়াল দিয়েছে জীবাণু-বোমার—ইরানের সঙ্গে লড়বার সময়ে। বসরার উত্তরে ইরানি সৈন্যরা শেষ ঘুম ঘুমিয়ে পড়েছিল সারা শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন না নিয়ে। নিশ্চয় অজানা কোনো জীবাণুর আক্রমণে।
প্রশ্ন : অজানা জীবাণু বলছো কেন?
মা : এক্কেবারে অজানাই বা বলি কী করে? আফ্রিকার ৎসেৎসি (tsetse) মাছির কামড়ে ট্রিপানোসোম প্রোটোজোয়া শরীরে ঢুকে শেষ ঘুম এনে দেয়। বোটুলিজম রোগে জীবাণু যে টক্সিন বানায়, তা নার্ভের প্যারালিসিস ঘটায়। অনেক যন্ত্রণার পর আসে মৃত। জৈব অস্ত্র বানাতে গিয়ে আরও সাংঘাতিক কোন জীবাণু মানুষেরই হাতে তৈরি হয়ে যায়নি তো? বিশেষজ্ঞদের ধারণা, কালান্তক ‘এডস’ রোগের ভাইরাস মানুষেরই তৈরি। এক্সপেরিমেন্টের সময়ে ল্যাবোরেটরি থেকে সটকান দিয়ে গোটা পৃথিবীকে জ্বালিয়ে মারছে। মানুষের পরম শত্রু গুটিবসন্তের ভাইরাসকে কড়া পাহারায় গোপনে রেখে দেওয়া হয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর আমেরিকায়। সাদ্দাম হোসেন মিসাইলের মাথায় কালান্তক জীবাণু যদি পাঠাত, তাহলে সেই অস্ত্র বুমেরাং হয়ে যেতে পারত।
প্রশ্ন : ব্যুমেরাং হবে জীবাণু বোমা?
মা : জীবাণু কি পোষা কুকুর যে মালিকের হুকুম মতো চলবে? তাকে ছেড়ে দিলে শত্রুসৈন্য সাবাড় করে সাদ্দামের দেশও তো ছারখার করে ছাড়তে পারে—যদি না অল্পায়ু, হয় সেই জীবাণুরা।
প্রশ্ন : আচ্ছা মা, সাদ্দাম হোসেন এত যোগাড়যন্ত্র করলেন কী করে?
মা : যাদের সঙ্গে লড়লেন, তারাই অনেক দিন ধরে দামি-দামি জোরালো হাতিয়ার সাপ্লাই করে এত ডেঞ্জারাস করে তুলেছেন সাদ্দামকে। এ ছাড়াও পৃথিবীবিখ্যাত আমেরিকান এক্সপার্টকেও সাদ্দাম কাজে লাগিয়েছেন স্রেফ টাকার জোরে।
প্রশ্ন : আমেরিকান এক্সপার্টকে কিনে নিয়েছিলেন সাদ্দাম হোসেন?
মা : নাম তাঁর জেরাল্ড বুল। দু-যুগ ধরে ইরাক তার শক্তিশালী যুদ্ধযন্ত্র তৈরি করেছে। ১৯৭০ সালে আনিয়েছে স্কাড-B মিসাইল। তার ক্ষমতা বাড়িয়ে নিয়ে বানিয়েছে আল-হুসেন আর আল আব্বাস মিসাইল। দূর পাল্লায় আঘাত হানবার জন্যে। দুটোই প্রচলিত আর রাসায়নিক যুদ্ধাস্ত্র মাথায় বয়ে নিয়ে যেতে পারে। রাসায়নিক আর জৈব অস্ত্রের এই যে সম্ভার সৃষ্টি—সেই সঙ্গে পারমাণবিক যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি—তার গল্পের শুরু ১৯৭৪ সালে—যদিও গল্পটা আজও সঠিকভাবে বলা হয়নি। এ খবর বেরোয় নামী ব্রিটিশ দৈনিক পত্রিকা ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’-এ।
প্রশ্ন : গল্পটা বলবে তো?
মা : ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৭ সালের মধ্যে পারমাণবিক, রাসায়নিক, জৈব আর সেই সম্পর্কিত বিজ্ঞানের চার হাজারেরও বেশি বৈজ্ঞানিকদের কাজে লাগায় ইরাক। ১৯৮০ সালে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হতেই ইরাকের তখনকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী সাদ্দাম হোসেন প্রাইভেট প্লেন পাঠিয়ে জেনেভা থেকে বাগদাদে নিয়ে আসেন জেরাল্ড বুল-কে—পৃথিবীবিখ্যাত কামান বিশেষজ্ঞ—যাঁর সারা জীবনের অবসেশন ছিল এমন একটা ‘সুপারগান’ বা অতিকায় হাউজার কামান বানাবেন—যা স্যাটেলাইটকে সটাসট উঠিয়ে দেবে মহাশূন্যে অথবা হাজার হাজার মাইল দূরের শত্রু এলাকায় দমাদম নিক্ষেপ করবে কামানের গোলা। বুল সাহেবের এই আকাশ কুসুম স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে বটে, কিন্তু দশ-দশটা বছর ইরাকের গোলামি করে বানিয়ে দিয়েছেন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী থানকয়েক কামান।
প্রশ্ন : জেরাল্ড বুল! জন্মস্থান?
মা : কানাডা। ছিলেন অ্যাসট্রো-ফিজিসিস্ট, হয়ে গেলেন আর্টিলারি এক্সপার্ট। গবেষণা চুক্তি ছিল মার্কিন সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে, কাজ করেছেন খোদ আমেরিকান পেন্টাগনেও, বিশাল বিশাল কামান সাপ্লাই করেছেন অনেক দেশে—বিশালতমগুলো বানিয়েছেন ইরাকের জন্যে—১৯৯০-র ২২ মার্চ মৃত্যুর আগে পর্যন্ত—যে মৃত্যু নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়—কিন্তু থাক সেই রটনা। এর তৈরি GC-45 হাউৎজার কামান দেগে পরমাণু বোমা, রাসায়নিক বোমা পর্যন্ত ফেলা যায় ২৫ মাইল দূরে। সেই সব গোলার ওজন বিলেত আমেরিকার সেরা কামানের গোলার ডবল।
প্রশ্ন : সর্বনাশ! মিসাইল-ও বানিয়েছিলেন কি বুলসাহেব?
মা : স্কাড মিসাইলের রেঞ্জ বাড়িয়ে দিয়েছেন। এ ছাড়াও বানিয়ে দিয়েছেন আল-ফাও আর মজনুন নামে দুটো অত্যুন্নত কামান। শুধু আল-ফাও থেকেই মিনিটে চারটে ১০৯ কেজি ওজনের শেল ছোঁড়া যায় ৩৫ মাইল দূরে ফেলার জন্যে। দুটো কামানই ঘণ্টায় ৭২-৮৮ কিলোমিটার স্পিডে ধেয়ে যেতে পারে রাস্তা বেয়ে।
প্রশ্ন : নল-বানর সত্যিই কি রোবট?
মা : রামায়ণ মহাভারতের অদ্ভুত অবিশ্বাস্য যন্ত্রের মত হাতিয়ারদের নিয়ে লেখা খান পঞ্চাশেক বইয়ের নাম আমি জানি। আরও আছে। নিরঞ্জন সিংহ তাঁর একখানা বইতে থ হয়ে যাওয়ার মত একটা প্রশ্ন রেখেছেন: হনুমান কি টেলিস্কোপিক রকেট?
প্রশ্ন : হনুমান? টেলিস্কোপিক রকেট? মানে?
মা : দানিকেনও মহাভারতের দিব্যাস্ত্রগুলোর প্রসঙ্গে বলেছিলেন, মহাভারত বাইবেলের চাইতেও বেশি Comprehensive —আধুনিক জ্ঞানের আলোয় এই মহাগ্রন্থ পাঠ করলে আখেরে কাজ দেবে। ১৯৭৫ সালের অগাস্টে কলকাতার জাদুঘরে দানিকেনের সামনে স্বনামধন্য বৈজ্ঞানিক ডক্টর অসীমা চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, তিনি বিশ্বাস করেন প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রের নানারকম ঘটনাগুলোর পেছনে বাস্তব বিজ্ঞানের হাত আছে। রামায়ণ মহাভারত, বেদ-বেদান্ত, ইত্যাদি ভারতীয় শাস্ত্রের অলৌকিক ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়া যায় বলে তিনি মনে করেন। যাই হোক, নল-বানর আসলে রোবট ছিল কিনা খতিয়ে দেখা যাক; রামায়ণের আদিকাণ্ডের ১৭ সর্গে ব্রহ্মা দেবতাদের ফরমাস করলেন, এমন সহায় বানাতে হবে রাম বেচারার জন্যে, যে সমস্ত হাতিয়ারদের দাপট তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবে। উনি নাকি নিজেও জাম্ববান তৈরি করে ফেলেছেন এই মতলবেই। দাপুটে রাবণকে খতম করতে হলে রামের হাতে দিতে হবে আরও দাপুটে সহায়। ব্রহ্মার গ্রীন সিগন্যাল পেয়েই অমনি ইন্দ্র তৈরি করে ফেললেন বালীকে, সূর্য করলেন সুগ্রীবকে, বৃহস্পতি করলেন তারাকে, কুবের করলেন গন্ধমাদনকে, বিশ্বকর্মা করলেন নলকে, অগ্নি বানালেন নীলকে, অশ্বিনীকুমারদ্বয় মৈন্দ্য আর দ্বিবিদকে, বরুণ সুষেণকে, পর্জ্জন্য শরভকে, বায়ু হনুমানকে। এদের সবার চেহারা করা হল বানরের মত—কেন না বানরদের সঙ্গে মিশে থাকতে হবে তো! অথচ সবাই মহাভয়ঙ্কর রোবট! এদের পাণ্ডা হল হনুমান!
প্রশ্ন : মাগো, এ যে মহাভয়ঙ্কর কল্পবিজ্ঞান?
মা : শুনে যা না! বিষ্ণুর বাহন গড়ুর আসলে একটা কলের পাখি—অর্থাৎ মহাকাশযান: রামের বাহন হনুমানকেও তৈরি করা হল সেইভাবে। সব রোবটকেই প্রোগ্রামিং করা থাকে—অথাৎ যে-রোবটের যে নির্দেশ-লিপি, সে তা মেনে চলবে। বিশেষ এই রোবটদের ক্ষমতা তখনই দেখা যায় যখন স্তব-টব করে তাদের প্রোগ্রামিং চালু করে দেওয়া হয়। তখন হনুমান লাফ মারেন শুধু পাহাড়ের ডগা থেকে এবং তখন যা কাণ্ড ঘটে, তা একালের রকেটের ‘ব্লাস্ট অফ’ দেখে দেখে সবাই জেনে গেছে। নল তো ক্ষুদে বিশ্বকর্মা। তার প্রোগ্রামিং চালু হয়ে যেতেই সে সাগরের ওপর সেতু তৈরি করে দিল পাকা ইঞ্জিনিয়ারের মতই। সুগ্রীব পুরো অঞ্চলে জরিপ করেছিলেন আকাশপথে—যুদ্ধের আগে এখন যা করা হয়—তাই সুগ্রীবের কাছে বসুন্ধরাকে গোষ্পদের মতই মনে হয়েছিল—মাটিতে হেঁটে জরিপ করলে পৃথিবীকে কক্ষনো অমন মনে হয় না।
প্রশ্ন : স্কাড তো এখন হিরো। কাদের আবিষ্কার মা?
মা : সোভিয়েত ইউনিয়নের। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা-র যুদ্ধ প্রযুক্তি পর্বে স্কাড জাতীয় লড়াকু মিসাইলদের মাঝামাঝি পাল্লায় ফেলা হয়েছে। অথাৎ, দূর পাল্লার মিসাইল এরা নয়। তবে গাড়িতে চাপিয়ে পদাতিক সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে দেশদেশান্তরে নিয়ে যাওয়া যায়। জঙ্গলে এমনভাবে লুকিয়ে রাখা যায় যে এরোপ্লেন বা স্যাটেলাইট থেকে খর নজর হেনেও তাদের দেখা যায় না। স্কাড হয় দুরকমের। স্কাড-A সাইজে ছোট। খোলা গাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। স্কাড-B সাইজে বড়। পুরোপুরি ঢাকা গাড়িতে চাপিয়ে দেশদেশান্তরে পাঠানো যায়। গাড়ির পেছন দিকে উৎক্ষেপক মঞ্চে টিউবের মধ্যে শোয়ানো থাকে—টিউব খাড়া করে নিয়ে ছোঁড়া হয় স্কাড-কে। এদেরই যম প্যাট্রিয়ট অ্যান্টি-এয়ারক্র্যাফ্ট মিসাইল। এক একটা উৎক্ষেপকে থাকে তাড়াতাড়ি ছোঁড়ার মত চারটে মিসাইল—যাদের দৌড় ১৫০ কিলোমিটার তো বটেই—আরও দূরে যেতে পারে। শত্রুপক্ষ ইলেকট্রনিক্স পাল্টা ব্যবস্থা হেনেও প্যাট্রিয়টকে রুখতে পারে না। চারটে মিসাইল ছোঁড়া হয়ে গেলেই আধ ঘন্টাও লাগে না আরও চারটেকে খাড়া করে নিতে। সঙ্কেত-সংবাদে যেই জানা যায়, শত্রুর বিমান বা মিসাইল, ধেয়ে আসছে এবং রয়েছে এখনও ৩০ মাইল দূরে—আকাশে উঠে পড়ে প্যাট্রিয়ট—ধেয়ে যায় উড়ুক্কু টার্গেটের দিকে। টার্গেটে হিট না করেও গায়ের কাছে ফেটে যায় যাতে রাশি রাশি টুকরো ছিঁটকে গিয়ে জখম করে দেয় শত্রুবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্রকে।
প্রশ্ন : লেসার রশ্মি দিয়ে টার্গেট হিট করার ব্যবস্থা অন্য অস্ত্রে নেই?
মা : আমেরিকান হেলিকপ্টার আর আর্টিলারি-তে আছে বইকি। অ্যাপাচি হেলিকপ্টার অমাবস্যার রাতেও উড়ে গিয়ে লড়ে যেতে পারে ঘণ্টায় ১৫০ মাইল স্পিডে। পাইলট থাকে দুজন। তাদের হেলমেটের মধ্যে খবর পাঠায় অ্যাপাচি-র নাকে বসানো ইনফ্রা-রেড চাহনি—হেলমেটের সামনের কাঁচের পদায় ফুটে ওঠে খবরের পর খবর। পাইলট টার্গেট হিসেব করে নিয়ে—নিজের চোখে টার্গেটটি না দেখেই—বোতাম টিপে পাঠিয়ে দেয় লেসার-গাইডেড হেল-ফায়ার অর্থাৎ ‘নরকের আগুন’ মিসাইলকে। অ্যাপাচি তার নিজের লেসার রশ্মি ফেলে রাখতে পারে টার্গেটের ওপর—মিসাইল এগিয়ে যায় সেই পথ ধরে; অথবা অন্য কোনও লেসারের পথেও আঠার মত লেগে থাকে হেল-ফায়ার। সোজা কথায়, পাইলট চোখ বুজিয়ে বসে থাকলেও ‘নরকের আগুন’ লক্ষ্যবস্তুতে আছড়ে পড়ে নরক সৃষ্টি করবেই। পর-পর ১৬টা ‘নরকের আগুন’ কে পাঠিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা থাকে একটা অ্যাপাচি-র। আমেরিকার গোলন্দাজ বাহিনীতেও রয়েছে লেসার নিয়ন্ত্রিত ‘কপারহেড’ শেল—যা নির্ভুল নিশানায় ট্যাঙ্ক-কে ফুটিগটা করে ছাড়বেই। রাতে লড়বার জন্যে নাইট-ভিশন চশমাও পরে থাকে সৈন্যরা।
প্রশ্ন : রামায়ণী ‘আগ্নেয়’ অস্ত্রকে আধুনিক কামান মনে করছ কেন, মা?
মা : রামায়ণেই বলা হয়েছে, এই অস্ত্রদের ভেতর ফোঁপরা থাকত। কামানের নলের ভেতর ঠিক তাই থাকে। ‘নালীক’ নামেও একটা অস্ত্র ছিল রামায়ণী যুদ্ধে; এটাও একরকম বাণ। ভেতরে ছিল ছেঁদা—তার মধ্যে থেকে তেড়েমেড়ে বেরিয়ে যেত আগুনে-ছাই আর লোহার গোলা। আধুনিক বন্দুক অথবা কামান ছাড়া আর কী হতে পারে?
প্রশ্ন : উল্কা-র মত দেখতে যে অস্ত্রটা, তার কাজ কী ছিল?
মা : এ থেকে আগুন ছোঁড়া হত—দূরের জিনিসে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হত। আধুনিক মর্টার বা Flame thrower কিন্তু ঠিক এই কাজই করে। বাল্মীকি তাকে বাণ বলেছেন। ‘কণপ’ নামেও একটা অস্ত্র ব্যবহার করেছে যুদ্ধপাগল সৈন্যরা। আগুনের গোলা থাকত তার মধ্যে। আগুনের শক্তিতে ছোট-ছোট গুলি তারা-র মতো চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যেত। অথাৎ ঝাঁকে-ঝাঁকে অগ্নিবর্ষণ হত এবং তা চারিদিকে ফেটে ছড়িয়ে যেত। মনে হচ্ছে যেন একটাই গোলা এতগুলো গুলিকে বয়ে নিয়ে গিয়ে ফাটিয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে শত্রুপক্ষের মাথার ওপর। আধুনিক যুদ্ধে ঝাঁকে ঝাঁকে রকেট আকাশের একটা বিন্দু থেকে চারদিকে ধেয়ে যায় ঠিক এইভাবেই। মহাভারতের যুদ্ধেও ‘কণপ’ অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে। ‘কুলিশ’ অস্ত্রটারও ব্যবহার হয়েছে রামায়ণ আর মহাভারতের যুদ্ধে—যার চেহারা ছিল আকাশের বজ্রের মত।
প্রশ্ন : কুলিশ? আকাশের বাজ?
মা : ইন্দ্রের অস্ত্র। বজ্রের মত অস্ত্র। সে তো ভয়ানক শক্তিতে ঠাসা অস্ত্র। হাই ভোল্টেজ ইলেকট্রিসিটি নাকি? বৈদ্যুতিক অস্ত্র? মৎস্যপুরাণ বলছে, দেবতাদের ইঞ্জিনীয়ার রবিকে ভ্রমিযন্ত্রে ভ্রমণ করিয়ে তাঁর তেজ আলাদা করে দিয়েছিলেন। সূর্যের সেই ভয়ঙ্কর তেজ থেকে অষ্টবজ্র তৈরি করেছিলেন—বিষ্ণুর চক্র, রুদ্রের ত্রিশূল, ইন্দ্রের কুলিশ, ব্রহ্মার অক্ষ, বরুণের পাশ, যমের দণ্ড, কার্তিকের শক্তি আর কালীর খড়গ। এর মধ্যে বুক কাঁপানো হাতিয়ার হল চক্র, শূল আর কুলিশ। তিনটের পেছনেই রয়েছে সূর্যের শক্তি। কী সেই শক্তি? সৌরশক্তি না লেসার রশ্মিজাতীয় কোনও শক্তি?
প্রশ্ন : পারমাণবিক অস্ত্র নয় তো?
মা : সঠিক বলা মুশকিল। ব্রহ্মাস্ত্র আদৌ পরমাণু বোমা কি না, তা কেউ জানে না। সৌর অস্ত্র বলতে কি বোঝানো হয়েছে? সূর্যশক্তিকে সংহত করে ধ্বংসলীলা চালানো অস্ত্র? এদের নামের মধ্যেই রয়েছে বিস্তর রহস্য। ঠিক যেমন রহস্য রয়েছে ‘শতঘ্নী’ অস্ত্রটার মধ্যে।
প্রশ্ন : ‘শতঘ্নী’? মানে, যে অস্ত্র একই সঙ্গে শত সহস্র মানুষ খতম করতে পারে?
মা : ঠিক বলেছিস। রামায়ণ আর মহাভারত—এই দুটো যুদ্ধেই শতয়ী অস্ত্র দেদার ব্যবহার করা হয়েছে। আগ্নেয় ওষধির বলে লোহার কাঁটা-ছাওয়া বিরাট পাথর ছুঁড়ে দেওয়া হত। দুর্গের তোরণে আর প্রাকারেও থাকত শতয়ী। ঐতিহাসিক লসেন মনে করেন, শতঘ্নী এক ধরনের কামান। এ ব্যাপারে দ্বিমতও আছে। আসলে কি জানিস, মহাভারত বা রামায়ণের অস্ত্রশস্ত্রগুলোর লম্ফঝম্পর বর্ণনা শুনলে স্পষ্ট বোঝা না গেলেও মনের চোখে প্রলয়সৃষ্টির যন্ত্রদের আভাস পাই, তাদের সঙ্গে এ যুগের বিকট অস্ত্রগুলোর প্রচণ্ড মিল আছে। যত অনুমান আর কল্পনার শুরু সেইখান থেকেই। যেমন, ‘তুলাগুড়’ বলে একটা অস্ত্র ছিল, তার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এইভাবে: ভাণ্ডগোলক, নালবন্দুক(?), যন্ত্রযুক্ত, বায়ুস্ফোট, সনির্ঘাত, মহামেঘম্বন। জিনিসটা দেখতে কী রকম, তা কিন্তু বোঝা গেল না। ধ্বনিময় শব্দগুলো থেকে আন্দাজ করা যায়, এমনই একটা যন্ত্র যার হাঁকডাক প্রচণ্ড, যা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আচমকা বাতাস সরিয়ে দিয়ে মেঘগর্জন সৃষ্টি করতে পারে এবং নিজেই আঘাত হানতে পারে। ভাঁড়ের মত গোলা যদি এমন কাজ করে, তাহলে কি তা হ্যাণ্ড গ্রেনেড? কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অজস্র অস্ত্র আর যুদ্ধের জন্য অনেক উপকরণের ব্যবহার হয়েছে। মরুযুদ্ধের সৈন্যরা মরুঝড়ে প্রায় অন্ধ হয়ে যায় চোখে গরম বালি ঢুকে গেলে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ঠিক তাই করা হয়েছে—শত্রুর শরীরে গরম বালি ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে। জ্যান্ত সাপভর্তি কলসি, গরম গুড়, গলানো মোম, গরম তেল—সবই ছোঁড়া হত শত্রুকে টিপ করে।
প্রশ্ন : দিব্যাস্ত্রগুলো লোপ পেয়ে গেল কেন, মা?
মা : অসামান্য ক্ষমতার জন্যেই নিশ্চয় এই অস্ত্রগুলোকে দিব্য নাম দেওয়া হয়েছিল। দিব্যাস্ত্রের সৃষ্টি আর প্রয়োগপ্রণালী ছিল অত্যন্ত গোপনীয়। শস্ত্রবিদ্যাবিশারদ গুরুপরম্পরায় এই সব অস্ত্রের সৃষ্টি আর সংহরণবিধি জানতে হত। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে ভীষ্ম, দ্রোণ, অর্জুন প্রমুখ দু-চারজন জানতেন দিব্যাস্ত্রদের কায়দাকানুন। অশ্বত্থামা দিব্যাস্ত্র প্রয়োগ করতে জানতেন, কিন্তু শেষটুকু ম্যানেজ করতে পারতেন না। অর্থাৎ এমনই সফিসটিকেটেড ওয়েপন যা আনাড়ির হাতে ছাড়া হত না। এ যুগেও তো মহাভয়ঙ্কর অস্ত্রগুলোকে গোপনেই রাখা হচ্ছে। জেরাল্ড বুল গুপ্তঘাতকের হাতে মারা না গেলে না জানি আরও কত ‘দিব্যাস্ত্র’ দেখা যেত এই মহাযুদ্ধে। সে কালের দিব্যাস্ত্রগুলোও হারিয়ে গেছে উপযুক্ত উত্তরসূরীর হাতে তুলে না দেওয়ার জন্যে—এটা আমার অনুমান।
প্রশ্ন : দিব্যাস্ত্র কি এতই অমোঘ ছিল?
মা : দিব্যাস্ত্রগুলো ছিল তুরুপের তাস। একবার তা দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে প্রতিপক্ষকে পাল্টা দিব্যাস্ত্র ছাড়তেই হত। যেমন, আগ্নেয়াস্ত্রর পাল্টা বরুণাস্ত্র। জল নিভিয়ে দেবে আগুনকে। বায়বাস্ত্রের পাল্টা গুহ্যাকাস্ত্র। গুহ্যাকাস্ত্রটা কি, তা জানা গেল না। খুবই গুহ্য অস্ত্র নিঃসন্দেহে—প্রলয় ঝড়কেও যে টাইট দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত গুহ্য-ই রয়ে গেল আশ্চর্য সেই অস্ত্র। এছাড়াও ছিল পরমাস্ত্র নামে এক অদ্ভুত অস্ত্র।
প্রশ্ন : অদ্ভুত অস্ত্র পরমাস্ত্র? দিব্যাস্ত্রের চেয়েও বড় নাকি?
মা : এই পরমাস্ত্রের নাম ‘ত্বাষ্ট্র’। দিব্যাস্ত্র হলেও হতে পারে। রণক্ষেত্রে অর্জুন এই অস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন। ‘ত্বাষ্ট্র’ যে নিক্ষেপ করে, তার প্রতিবিম্ব গিয়ে পড়ে প্রতিপক্ষের ওপর। সকলেই তখন সকলের মধ্যে নিক্ষেপ্তার আকৃতি দেখতে পায়। অর্থাৎ শত্রুসৈন্যরা প্রত্যেকেই প্রত্যেককে অস্ত্র-নিক্ষেপ্তা মনে করে। ফলে, প্রত্যেকেই প্রত্যেককে খতম করতে থাকে। অর্জুন এই অস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন। কুরুসৈন্যরা আশেপাশে শুধু অর্জুনকেই দেখতে পেয়েছিল—নিজেদের মধ্যেই কাটাকুটি করে শেষ হয়ে যায়। মনে তো হয়, এই পরমা আসলে একরকম মায়া। অথবা, দৃষ্টিবিভ্রম সৃষ্টির বিষ গ্যাস।
প্রশ্ন : মায়া দিয়ে যুদ্ধ? অলৌকিক যুদ্ধ নাকি?
মা : হ্যাঁ। মায়াযুদ্ধ যেন ইন্দ্রজালের মত। বাস্তবিকই কোনও অস্ত্র নেই অথচ তার প্রয়োগ অসংখ্য। ম্যাজিকের ফলে সব সত্যি বলেই মনে হয়। রাক্ষস আর অসুররা মায়াযুদ্ধে অথাৎ ম্যাজিকযুদ্ধে ছিলেন অতিশয় নিপুণ। ঘটোৎকচের মায়াযুদ্ধে বিব্রত হয়ে গেছিলেন কর্ণের মত মহাবীরও। তিতিবিরক্ত হয়ে ইন্দ্রর কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে ‘একবীরহন্ত্রী’ শক্তি প্রয়োগ করেছিলেন ঘটোৎকচের দিকে। জলযুদ্ধের কথাও আছে মহাভারতে।
প্রশ্ন : মহাভারতে জলযুদ্ধ?
মা : নাম তাঁদের নিবাতকবচ। অত্যন্ত ভাল জলযোদ্ধা। সমুদ্রের মাঝে দুর্গ তৈরি করে থাকতেন সেখানে।
প্রশ্ন : সমুদ্রের মাঝে দুর্গ? ভাসমান নাকি?
মা : আজকালকার যুদ্ধজাহাজগুলোই তো এক-একটা ভাসমান দুর্গ। সেকালের ভাসমান দুর্গেও থাকত শতঘ্নী যন্ত্র আর বড় বড় মারণযন্ত্র। ডাঙার দুর্গেও থাকত। ফুটো দিয়ে আগুনের গুলি ছোঁড়া হত শত্রুদের দিকে। কামান বন্দুক বলেই তো মনে হয়।
প্রশ্ন : শস্ত্রবিদ্যায় গুরুপরম্পরার জন্যেই কি এই সব যন্ত্র লোপ পেয়েছে?
মা : হতে পারে। অর্জুন আগ্নেয়াস্ত্র পেয়েছিলেন দ্রোণাচার্যের কাছ থেকে, দ্রোণাচার্য পেয়েছিলেন অগ্নিবেশ্যর কাছ থেকে, অগ্নিবেশ্য পেয়েছিলেন ভরদ্বাজের কাছ থেকে, ভরদ্বাজ পেয়েছিলেন বৃহস্পতির কাছ থেকে। অর্থাৎ গুরু দিয়েছেন শিষ্যকে—অর্জুন কি দেননি কাউকে?
প্রশ্ন : প্রথম কে বানিয়েছিলেন আগ্নেয়াস্ত্র?
মা : বিশ্বকর্মা। দেবশিল্পী। দেবতাদের বিমান-নির্মাতা। বৈদিক ত্বষ্টা দেবতার কর্মশক্তি আত্মসাৎ করেছিলেন বলে এঁর আর এক নাম ত্বষ্টা। অথাৎ দেবতাদের গুহ্যবিদ্যাও ইনি জানতেন। রামের জন্যে সেতুবন্ধ তৈরির সময়ে ইনিই তো নল-বানরকে সৃষ্টি করেছিলেন। একজন যন্ত্র-বিশেষজ্ঞ যখন সৃষ্টি করেন, তখন তিনি যন্ত্রই সৃষ্টি করেন। নল কি তাহলে একটা যন্ত্র? রোবট?
প্রশ্ন : দানবদের ইঞ্জিনীয়ার তাহলে কে ছিলেন?
মা : ময়দানব। মায়াবী দানব। অদ্ভুত ক্ষমতা যাঁর থাকে, তাঁকে তো মায়াবী বলেই মনে হয় জামাই রাবণকে ইনিই দিয়েছিলেন এক অমোঘ শক্তি—যার নাম শক্তিশেল—যে শক্তির চোট খেয়ে লক্ষ্মণ চোখ কপালে তুলে অজ্ঞান হয়ে গেছিলেন। শেষকালে এই মহাশক্তিধরকে খতম করার জন্যে ইন্দ্রকে নিক্ষেপ করতে হয়েছিল তাঁর রহস্যময় অস্ত্র—বজ্র।
প্রশ্ন : পাথরের পাতালঘর উড়িয়ে দেওয়ার যন্ত্র ছিল না?
মা : ‘শক্তি’ নামে একটা প্রাচীন অস্ত্র ধেয়ে যেত অনেক দূরে—হিমালয়কেও নাকি বিদীর্ণ করতে পারত। এ-অস্ত্রকে দুহাতে তুলে পাঠাতে হত। তাহলে কেন পাথরের পাতালঘর অথবা কংক্রিটের বাঙ্কার ফুটো করতে পারবে না? বাগদাদে আমেরিকানরা কিন্তু লেসার বোমা দিয়ে এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে।
প্রশ্ন : লেসার বোমা?
মা : স্কাডবিধ্বংসী প্যাট্রিয়ট আর নেভির টোমাহক মিসাইলের পরেই হিরো হয়ে গেছে এই লেসার বোমা। আমেরিকার টেক্সাস ইন্সট্রুমেন্টস কোম্পানি আশ্চর্য এই অস্ত্র বানিয়ে রেখেছিল পাতালে লুকোনো সোভিয়েত মিসাইল খতমের জন্যে—তাই দিয়ে উড়িয়েছে বাগদাদের বাঙ্কার। হিটলারের ভি-টু’র জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে অ্যাটম বোমা ফেলা হয়েছিল এশিয়ার মাটিতে, সাদ্দামের ভয়ে না জানি এবার এরকম আরও কত অস্ত্রের পরীক্ষা চলবে এশিয়ার মাটিতে! নিউক্লিয়র আর নিউট্রন বোমার আবিভাব ঘটলেও ঘটতে পারে। এয়ার ফোর্সের লেসার-গাউডেড ২০০০ পাউণ্ড বোমা থেকেই বাগদাদের ৫০০ পাউণ্ড লেসার বোমা তৈরি হয়েছিল। ১৫০০ পাউণ্ড ইস্পাত খোলসের মধ্যে থাকে ভয়ানক বিস্ফোরক tritnol। খোলসের গড়ন এমনই যে কংক্রিট ফুটো করে ঢুকে যায় অনায়াসে—ফিউজটা থাকে ল্যাজের দিকে—প্রথম ধাক্কায় যাতে ফিউজ উড়ে না যায়; সবটা ঢুকে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক সেকেণ্ডের কম সময়ের মধ্যে উড়ে যায় ফিউজ—ফেটে যায় লেসার বোমা। নাকের ওপর লাগানো লেসার নির্দেশক উড়িয়ে নিয়ে আসে লেসার বোমাকে সঠিক লক্ষ্যের দিকে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন