অদ্রীশ বর্ধন

প্রশ্ন : টেলিস্কোপ কার আবিষ্কার, মা?
মা : কৃতিত্বটা অনেককেই দেওয়া হয়। গ্রীস দেশে ডেমোক্রিটাস নামে এক দার্শনিক ছিলেন। দেশ ভ্রমণ ছিল তাঁর প্রচণ্ড নেশা। বিখ্যাত এই চিন্তাবিদের নামা উদ্ভট ভাবনা-চিন্তার জন্যে সবাই তাঁকে ‘লোক হাসানো দার্শনিক’ বলে ডাকতো। যিশুখ্রিস্ট ধরায় আসার ৩৫৭ বছর আগে ইনি দেহ রাখেন। শোনা যায়, ইনি নাকি এমন একটা যন্ত্রের ব্যবহার জানতেন, যা ‘দূরের জিনিসকে কাছে নিয়ে আসত’। আমাদের এই ‘মিল্কি ওয়ে’ গ্যালাক্সি যে অগণিত নক্ষেত্রের সমষ্টি, এমন কথা তিনি প্রায়ই বলতেন।
প্রশ্ন : কোথায় সেই যন্ত্র?
মা : মনে তো হয় না এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার সত্যিই তিনি করেছিলেন। করলে কি যন্ত্রটা থেকে যেত না? তবে হ্যাঁ, তাঁর সময়কার মানুষদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ভাবনা-চিন্তা করতে তিনি পেরেছিলেন। আর একজন ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, নাম রজার বেকন।
প্রশ্ন : কী ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন রজার বেকন?
মা : ১২৬০ সালে তিনি লিখেছিলেন, ‘অবিশ্বাস্য রকমের দূরত্বে থেকে ক্ষুদ্রতম হরফ-ও আমরা পড়তে পারি। খুব খুদে সৈন্যবাহিনী খুব বিরাট হয়ে দেখা দিতে পারে, এবং খুব দূরে থাকলেও খুব কাছের বলে মনে হতে পারে। ঠিক এইভাবে সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রদের চেহারাগুলোকে নামিয়ে আনা যেতে পারে এবং শত্রুবাহিনীর ঠিক মাথার ওপর দেখানো যেতে পারে।’ এইরকম আরো উদ্ভট কথা বলার বাকি ছিল রজার বেকনের। যা শুনে মনে হয়, কোনওটাই ঘটে যাওয়া ব্যাপার নয়—সবই পিলে-চমকানো ভবিষ্যৎবাণী।
প্রশ্ন : এভাবে ভবিষ্যৎ-টেলিস্কোপের কথা আর কেউ বলেছেন?
মা : টমাস ডিগেস নামে এক ভদ্রলোক রানি প্রথম এলিজাবেথের আমলে তাঁর সৈন্যবাহিনীর মনে সাহস জোগাতে মহা ওস্তাদ ছিলেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানের সমস্যা সম্পর্কে বেশ কিছু লেখাও লিখেছিলেন। ইনিই বলতেন—‘আমার বাবা লিওনার্ড ১৫৭০-এ পরলোকে গেছেন বটে, কিন্তু তাঁর কাছে এমন কাঁচ ছিল, যা দিয়ে সাত মাইল দূর থেকেও গোপন জায়গার সমস্ত দৃশ্য তিনি দেখতে পেতেন।’ এ কথায় কতটা রঙ চড়ানো ছিল তা না জানা গেলেও, ডিগেস-এর মৃত্যুর অল্পকালের মধ্যেই হ্যান্স লিপারসে নামে একজন ইংরেজ ভদ্রলোক সত্যি সত্যিই একখানা টেলিস্কোপ বানিয়েছিলেন।
প্রশ্ন : প্রথম টেলিস্কোপ? কোন সালে, মা?
মা : ১৬০৮ সালে। দ্বিতীয় টেলিস্কোপও তৈরি হয় ওই একই সালে। তৈরি করেন একজন ওলন্দজ, নাম, জোহানেস অ্যানড্রিয়ান জুন।
প্রশ্ন : তাহলে গ্যালিলিও টেলিস্কোপ আবিষ্কার করলেন কবে?
মা : ১৬০৮ সালের আবিষ্কারের খবর আগুনের মত ছড়িয়ে পড়ার পর। শুনল অনেকেই, কিন্তু গুরুত্বটা ধরতে পারলেন শুধু গ্যালিলিও। অঙ্কের অধ্যাপক ছিলেন। অপরিসীম ধৈর্য আর দক্ষতায় নিজেই বানালেন একটা টেলিস্কোপ। বানালেন কিন্তু একটা বাজনার টুকরো অংশ থেকে।
প্রশ্ন : বাজনা থেকে টেলিস্কোপ বানালেন গ্যালিলিও?
মা : অরগ্যানের একটা পাইপ নিলেন, তার দুই প্রান্তে দুটো লেন্স বসালেন। তাতে বিবর্ধন অথাৎ ম্যাগনিফিকেশন ঘটল মাত্র তিন গুণ। পরে অবশ্য তিরিশ গুণ বিবর্ধন করতে পারে এমন একটা টেলিস্কোপ বানিয়েছিলেন গ্যালিলিও। এই দিয়েই দেখেছিলেন চন্দ্রপৃষ্ঠের পাহাড়দের, দেখেছিলেন ‘মিল্কিওয়ে’ গ্যালাক্সিতে খুব আবছা তারাদের সমষ্টি, এবং আবিষ্কার করেছিলেন বৃহস্পতি গ্রহের চারটে বড় উপগ্রহকে। দেখেছিলেন, শনি গ্রহের অদ্ভুত আকৃতি; মস্ত একটা আংটি অথবা বেশ কয়েকটা আংটি শনিকে ঘিরে রয়েছে বলেই যে-চেহারাটা এরকম বিদঘুটে—জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্য ছাত্ররা তা পরে দেখিয়েছিলেন।
প্রশ্ন : টেলিস্কোপে কী থাকে, মা?
মা : সব টেলিস্কোপেই অবশ্য থাকে (১) একটা কনভেক্স লেন্স (অবজেকটিভ) অথবা একটা কনকেভ আয়না (রিফ্লেক্টর অথবা স্পেকুলাম); থাকে নলের এক প্রান্তে—যাতে দূরের জিনিস থেকে এসে পড়া আলো-কে এক জায়গায় জড়ো করে ঝকঝকে প্রতিবিম্ব ফুটিয়ে তুলতে পারে। (২) একটা লেন্স—তার নাম আইপিস—প্রতিবিম্বর বিবর্ধন ঘটিয়ে চোখের সামনে নিয়ে আসার জন্যে।
প্রশ্ন : রিফ্র্যাক্টিং টেলিস্কোপ আর রিফ্লেক্টিং টেলিস্কোপের মধ্যে তাহলে তফাতটা তাহলে কী?
মা : যে-টেলিস্কোপের অবজেকটিভ (কনভেক্স লেন্স) থাকে, তাকে বলা হয় রিফ্র্যাক্টিং টেলিস্কোপ; স্পেকুলাম (কনকভ আয়না) থাকলে তার নাম রিফ্লেক্টিং টেলিস্কোপ।
প্রশ্ন : দুটোর মধ্যে সেকেলে টেলিস্কোপ কোনটা?
মা : রিফ্র্যাক্টিং টেলিস্কোপ।
প্রশ্ন : শুধু চোখে তারা দেখা যায় না, টেলিস্কোপে দেখা যায় কীভাবে?
মা : তারাদের আলোকরশ্মিগুলো টেলিস্কোপে ঢুকে সমান্তরালভাবে নেমে এসে অবজেক্টিভের ফোকাস বিন্দুতে প্রতিবিম্ব সৃষ্টি করে—আই পিস তার বিবর্ধন ঘটিয়ে দেয় বলে চোখ তাকে দেখতে পায়। ‘আইপিস’টা আসলে একটা ম্যাগনিফাইং গ্লাস। বিস্তর আলোকরশ্মি চোঙা আকারে অবজেক্টিভের মধ্যে ঢুকে ঘন আর ছোট্ট হয়ে যায় আইপিস দিয়ে বেরিয়ে আসার সময়ে। ফলে, অনেক বেশি আলো ঢোকে চোখে—টেলিস্কোপ না থাকলে যা হত না। তারাদের উজ্জ্বলতাও বেড়ে যায় এর ফলে।
প্রশ্ন : আদি রিফ্র্যাক্টিং টেলিস্কোপে কি কোনো অসুবিধে ছিল?
মা : লেন্সগুলো বেজায় ভারি হত বলে কিনারা বরাবর ফিটিং-এর পর ওজনের জন্যেই আলোকরশ্মির বিপথন ঘটত; ফলে, বিকৃত হত প্রতিবিম্ব। অর্থাৎ, আলোকরশ্মি পথ চলার নিয়ম না মেনে বিপথে চলে যেত। এই বিপথন ছিল দু-রকমের: এক, লেন্সের কিনারা দিয়ে ঢোকা আলোকরশ্মি অন্যদের আগে এসে পড়ত ফোকাস বিন্দুতে; দুই, লাল রশ্মিদের আগে নীল রশ্মিরা এসে যেত ফোকাস বিন্দুতে।
প্রশ্ন : এই ত্রুটি মেরামতের চেষ্টা কেউ করেননি?
মা : প্রায় পৌনে দু’শ বছর আগে একজন ইংরেজ চশমা নির্মাতা আলোকরশ্মির এহেন বেয়াড়াপনা বন্ধ করে দিয়েছিলেন অবজেক্টিভে দুটো কাঁচ লাগিয়ে; বাইরের দিকে ক্রাউন কাঁচ থেকে তৈরি কনভেক্স কাঁচ—ভেতর দিকে ফ্লিন্ট কাঁচ থেকে তৈরি কনকেভ কাঁচ।
প্রশ্ন : নিউটন কোন্ টেলিস্কোপ তৈরি করেছিলেন?
মা : উনি আবিষ্কার করেছিলেন রিফ্লেক্টিং টেলিস্কোপ ১৬৬৬-৬৯ সালে। ১৬৭১ সালে তৈরি টেলিস্কোপটা এখন ব্রিটেনের রয়াল সোসাইটির সম্পত্তি। এ টেলিস্কোপে বর্ণবিপথন ঘটে না।
প্রশ্ন : আকাশ দেখতে কোন্ টেলিস্কোপ কাজে লাগে?
মা : দুটোই। সবচেয়ে বড় টেলিস্কোপগুলো অবশ্য রিফ্লেক্টিং।
প্রশ্ন : ম্যাগনিফাইং করার ক্ষমতাটাই যখন টেলিস্কোপের আসল ক্ষমতা, তখন সব ক্ষেত্রেই তা করে নেওয়া হয় না কেন?
মা : প্রতিবিম্বর সঙ্গে অপবস্তুগুলোও বিবর্ধিত হয়ে যায় বলে। আবছা বস্তুকে কিছু দূর পর্যন্ত বিবর্ধিত করা যায়—তারপর করলে এত আবছা হয়ে যাবে যে আর দেখাই যাবে না।
প্রশ্ন : টেলিস্কোপ তৈরি কি খুব ঝঞ্ঝাটের ব্যাপার?
মা : শখের টেলিস্কোপ তুই নিজেও বানাতে পারিস। কিন্তু বড় বড় টেলিস্কোপে তৈরি চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। খুব হুঁশিয়ার হয়ে বানাতে হয় অবজেক্টিভ লেন্স অথবা আয়নাকে। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কেটে যায় একখানা মাত্র অবজেক্টিভ বানাতে। তাপমাত্রার সামান্য হেরফের ঘটলেই অবজেক্টিভ জখম হতে পারে বলে ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্ট উইলসনের দশ হাজার পাউন্ড ওজনের একশ ইঞ্চি আয়নাকে দিনের বেলায় রেখে দেওয়া হয় জলের জ্যাকেটে, গম্বুজঘরে থাকে ইনসুলেটেড অবস্থায়।
প্রশ্ন : টেলিস্কোপে নাকি উল্টো ছবি দেখা যায়?
মা : আকাশ দেখার টেলিস্কোপে সেই রকমই দেখায়। পৃথিবীর পিঠে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর জিনিসকে দেখার টেলিস্কোপে আরও খানকয়েক বাড়তি লেন্স বসিয়ে উল্টো প্রতিবিম্বকে সিধে করে নেওয়া হয়।
প্রশ্ন : ‘অপেরা গ্লাস’ কি জিনিস, মা?
মা : একজোড়া গ্যালিলিও-টেলিস্কোপ। ‘আই পিস’-এর জায়গায় থাকে কনকেভ লেন্স। আধুনিক বাইনোকুলার বা প্রিজম ফিল্ড গ্লাস-এর প্রতি নলে থাকে একটা করে রিফ্লেক্টিং প্রিজম—অনেক স্পষ্ট দেখা যায়।
প্রশ্ন : টেলিস্কোপের ব্যবহার কি শুধু আকাশ দেখার জন্যে?
মা : অনেক যন্ত্রপাতিতেও টেলিস্কোপ লাগানো থাকছে। যেমন, সারভেয়রের লেভেল আর থিয়োডোলাইট রেঞ্জ ফাইণ্ডার, টেলিস্কোপিক রাইফেলসাইট, এমন ল্যাবোরেটরির সূক্ষ্ম দাড়িপাল্লাতেও।
প্রশ্ন : পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টেলিস্কোপ তা হলে কাকে বলব?
মা : আজ যে বড়, কাল তাকে টেক্কা মেরে যাচ্ছে আর একটা। মাউন্ট উইলসনের হুকার রিফ্লেক্টর অনেক দিন ধরেই বৃহত্তম হয়ে বসেছিল। তারপর তার চাইতেও বড় দানবিক রিফ্লেক্টরের আবির্ভাব ঘটল ১৯৪৮ সালে আমেরিকার মাউন্ট পালামোরে। ৪৫০ টন ওজনের বিশাল এই টেলিস্কোপকে চালানো হত যে মোটর দিয়ে, তার হর্স পাওয়ার খুবই কম—এক হর্স পাওয়ারের বারো ভাগের এক ভাগ। আয়নার ব্যাস ৫ মিটার। কিন্তু একেও হারিয়ে দিল রাশিয়ার ক্রিমিয়া অঞ্চলের ৬ মিটার রিফ্লেক্টিং টেলিস্কোপ। এই মুহূর্তে আরও বড় বড় রিফ্লেক্টর তৈরি হয়ে চলেছে পৃথিবীর নানা জায়গায়—এদের ব্যাস ৮ থেকে ১০ মিটারের মধ্যে। সবচেয়ে বড়টার মাপ ১০ মিটার।
প্রশ্ন : ১০ মিটার ব্যাস-এর রিফ্লেক্টর! এ টেলিস্কোপ বসছে কোথায়?
মা : হাওয়াই-তে। মাউন্ট মনা কিয়া পাহাড়ের ওপরে ১০,০০০ ফুট উঁচুতে—যেখানে বাতাস খুব পাতলা। এটাও কিন্তু আর পৃথিবীর সবসেরা রিফ্লেক্টিং টেলিস্কোপ নয়।
প্রশ্ন : আরও ভাল টেলিস্কোপ? কোথায় মা?
মা : আকাশে।
প্রশ্ন : আকাশে দূরবীন ঝুলছে?
মা : ঝুলছে নয়, ঘুরছে। পৃথিবীকে ঘিরে পাক খাচ্ছে। ফ্লোরিডার কেপ কার্নিভাল থেকে ১৯৯০ সালের ২৪ এপ্রিল তাকে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ, আগুন আর ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে ‘ডিসকভারি’ শাটল-এর পিঠে চাপিয়ে শূন্যে তুলে দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন : কে সে?
মা : হাব্ল স্পেস টেলিস্কোপ; সংক্ষেপে H.S.T, বিখ্যাত আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডুইন হাবল-এর নাম অমর হয়ে রইল বিশ্বের এই অষ্টম বিস্ময়ের নামের মধ্যে। ১৯২০ সালে ইনিই তো প্রথম জেনেছিলেন, বিশ্ব জগৎ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে এবং আমাদের এই গ্যালাক্সির মত হাজার হাজার গ্যালাক্সি রয়েছে ব্রহ্মাণ্ডে।
প্রশ্ন : ভূঁইফোড় বিস্ময় নাকি? এতদিন শুনিনি তো?
মা : কিন্তু শুনেছেন তামাম দুনিয়ার সমস্ত জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। অথচ H.S.T. মোটেই সবচেয়ে বড় টেলিস্কোপ নয়। মূল আয়নাটার ব্যাস মোটে ২.৪ মিটার।
প্রশ্ন : কেন H.S.T. পৃথিবীর সবসেরা টেলিস্কোপ?
মা : পাহাড়ে বসানো যে-কোনও দূরবীনের চাইতে এর ক্ষমতা অনেক অনেক বেশি। বৃহত্তম না বলে একে পৃথিবীর সূক্ষ্মতম টেলিস্কোপ বলাই সঙ্গত। তারা কাঁপে কেন আমরা সবাই জানি। বাতাসের স্তরের মধ্যে দিয়ে আসবার সময়ে তারার আলোর প্রতিসরণ আর বিকৃতি ঘটে বলে। খুব অস্পষ্ট আলোকরশ্মিকে শুষে নেয়। নক্ষত্র আর ছায়াপথ থেকে আসা আলট্রা ভায়োলেট আর ইনফ্রা-রেড বিকিরণকেও ফিলটার করে বের করে দিয়ে পৃথিবীতে বসানো দূরবীন পর্যন্ত পৌঁছতে দেয় না। অথচ এই সব বিকিরণের তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য থেকে জ্যোতিষ্কদের চরিত্র সম্বন্ধে জানা যায় অনেক তথ্য। আকাশ-দূরবীনের নেই এ-সব অসুবিধে।
প্রশ্ন : কেন নেই, মা?
মা : H.S.T. পৃথিবীকে পাক দিচ্ছে মাটি থেকে ৩৭০ মাইল ওপরে। বাতাসের ঝগড়া সেখানে নেই। ফলে, অনেক দূর পর্যন্ত ‘দেখতে’ পায় স্পষ্টভাবে। প্রতিবিম্বর স্পষ্টতা মতের দূরবীনের চেয়ে দশগুণ বেশি। দূরের বস্তু যদি ৪০ গুণ বেশি অস্পষ্ট হয়, H.S.T. তাকেও কড়া নজরে রাখে। তার মানে, চাঁদের বুকে ম্যাড়ম্যাড়ে মোমের আলোও এর নজর এড়ায় না। চার হাজার কিলোমিটার দূরের মোটরগাড়ির বাঁদিকের আর ডানদিকের হেডলাইটের তফাত ধরবার অবিশ্বাস্য ক্ষমতাও আছে H.S.T.-র। আরও অনেক সুবিধে আছে আকাশ-দূরবীনের। সংক্ষেপে জেনে রাখ, হাব্ল্ স্পেস টেলিস্কোপ চার গুণ বেশি গভীরে উঁকি মারতে পারে, ২৫ গুণ বেশি ক্ষীণ বস্তুকে ঠাহর করতে পারে, দশ গুণ বেশি খুটিনাটি পর্যবেক্ষণ করতে পারে মর্ত্যের বৃহত্তম দূরবীনের চেয়ে।
প্রশ্ন : আবহাওয়া খারাপ হলে?
মা : মর্ত্যের দূরবীনেরা অকেজো হয়। বছরে ১২০ থেকে ১৫০টা রাত কাজ দেয় আকাশ স্পষ্ট থাকে বলে। আকাশ-দূরবীন দিয়ে কিন্তু প্রতিদিনই ১০/১২ ঘন্টা ধরে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
প্রশ্ন : ওজন কত H.S.T.-র?
মা : মাত্র সাড়ে এগারো টন—আকাশে তুলে দেবার সময়ে। বেশির ভাগই তো কমপিউটার। মূল আয়নার ব্যাস ২.৪ মিটার—আগেই বলেছি। তৈরি হয়েছে টাইটানিয়াম সিলিকেট কাঁচ দিয়ে—তার ওপরে আছে অ্যালুমিনিয়ামের পাতলা প্রলেপ—এক সেন্টিমিটারের ষাট লক্ষ ভাগের এক ভাগ পুরু। সাইজ মোটামুটি একটা স্কুল বাসের মতন—জোড়া লাগানো প্রকাণ্ড দুটো সিলিণ্ডার।
প্রশ্ন : পৃথিবীর বৈজ্ঞানিকরা আকাশ-দূরবীনের ভেতর দিয়ে দেখেন কী করে?
মা : উপগ্রহ মারফত ছবি চলে আসে পৃথিবীতে।
প্রশ্ন : ক্যামেরা নেই আকাশ-দূরবীনে?
মা : দুটো অত্যন্ত হালফ্যাশনের ক্যামেরা আছে। একটা দিয়ে ছড়িয়ে থাকা অনেকখানি দৃশ্যর ছবি তোলা যায়। সৌরজগতের সব কিছুর আর অন্যান্য নক্ষত্রদের সম্ভাব্য গ্রহ-উপগ্রহের ছবি তোলার উপযুক্ত এই ক্যামেরা। আর একটা ক্যামেরা অনেক দূরের অতি-অস্পষ্ট নক্ষত্রপুঞ্জ, ইস্ক্রুপের পাকের মত প্যাঁচালো গ্যালাক্সি আর গ্যালাক্সি-পুঞ্জদেরও ছবি তুলতে পারে। অন্যান্য যন্ত্রপাতির মধ্যে আছে একটা হাইস্পিড ফটোমিটার; সেকেণ্ডে ৫০,০০০ বার আলোর হেরফের ঘটলেও চুলচেরা হিসেব দেয় আলোর তীব্রতার। আর আছে দুটো স্পেকট্রোমিটার।
প্রশ্ন : নিজে চরকি পাক খেতে খেতেও জ্যোতিষ্ককে নজরে রাখতে পারে আকাশ-দূরবীন?
মা : পারে বইকি। নজর থেকে সরে যায় না। একটা উপমা দিলেই ক্ষমতাটা আন্দাজ করতে পারবি। দেড় কিলোমিটার দূর থেকে মানুষের একগাছি চুল কতখানি চওড়া—তার ঠায় হিসেব রাখতে পারে H.S.T.; সেকেণ্ডে চল্লিশবার অবস্থানের হিসেব চলে যায় কমপিউটারের কাছে।
প্রশ্ন :আকাশ-দূরবীন টিকবে কতদিন?
মা : বছর পনেরো তো বটেই। ২/৩ বছর অন্তর শাটল্-রা উড়ে গিয়ে মেরামতি চালিয়ে আসবে—আরও জবরদস্ত করে তুলবে।
প্রশ্ন : কতদূরের ছবি তুলবে আকাশ-দূরবীন?
মা : ১২০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরের গ্যালাক্সির ছবি তুলবে। মাউন্ট পালোমারের দূরবীনের দৌড় ৩০ কোটি আলোকবর্ষ পর্যন্ত। এক আলোকবর্ষ মানে সেকেণ্ডে ১,৮৬, ২৮১ মাইল স্পিডে আলোকরশ্মি এক বছরে যতটা পথ যেতে পারে। এ ছাড়াও ক্ষীণ আশা আছে, অন্য নক্ষত্রদের ছানাপোনা গ্রহ-উপগ্রহদেরও দেখতে পাবে।
প্রশ্ন : আরও কী কী অসম্ভব কাণ্ড করতে পারে আকাশ-দূরবীন?
মা : কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানীর ধারণা, পৃথিবী থেকে ব্রহ্মাণ্ডের দশ শতাংশ মাত্র দেখতে পাই। বাকি নব্বই শতাংশকে বলা হয় ‘কৃষ্ণ বস্তু’—হয়ত খুব অস্পষ্ট নক্ষত্র আর গ্যালাক্সি দিয়ে গড়া। আরও অজানা বস্তু থাকতে পারে এই ‘কৃষ্ণ বস্তু’র মধ্যে। যদি থাকে, হাবল্ তাকে আঁচ করবার সূত্র ধরিয়ে দিতে পারে। সবচেয়ে বড় রহস্যটাকেও ভেদ করবে; বিগ ব্যাং-এর পর ব্রহ্মাণ্ডর জন্ম হল কীভাবে, নিখিল বিশ্ব গড়ে উঠল কীভাবে—সেই সূত্র ধরিয়ে দেবে। জীবদেহের ‘বিল্ডিং ব্লক’ অর্থাৎ কার্বন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন এল কোথেকে, তাও বলে দিতে পারে। ধারেকাছে ‘ব্ল্যাক হোল’ ঘাপটি মেরে থাকলে, তার ঠিকানাও দিয়ে দেবে।
প্রশ্ন : আকাশ-দূরবীনকে কী ধরনের টেলিস্কোপ বলব, মা?
মা : নিউটনীয় ধাঁচের টেলিস্কোপ। অথাৎ নিউটন যে-ধরনের টেলিস্কোপ ব্যবহার করেছিলেন—সেই ধরনের। আজও আমরা তিন ধরনের টেলিস্কোপ ব্যবহার করে চলেছি। রিফ্লেক্টিং দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। রিফ্র্যাক্টর-এর দৌড় ৪০ ইঞ্চি লেন্সের ওপরে যেতে পারেনি—Yerkes টেলিস্কোপে যা আছে। এ ছাড়াও আছে রেডিও টেলিস্কোপ।
প্রশ্ন : রেডিও দূরবীন?
মা : জ্যোতিষ্কদের রেডিও-তরঙ্গকে ধরে—আলোক-তরঙ্গকে নয়। ধাতুর চাদর দিয়ে তৈরি একটা কনকেভ ‘আয়না’ রেডিও-তরঙ্গদের প্রতিফলিত করে কেন্দ্রীভূত করে আয়নার ফোকাস বিন্দুতে রাখা একটা এরিয়েল-এর দিকে। সঙ্কেতগুলো যে খুব বোধগম্য, তা নয়। ইংলণ্ডের জড্রেল ব্যাঙ্কে আছে একটা বিরাট রেডিও টেলিস্কোপ—একসময়ে তা ছিল পৃথিবীর বৃহত্তম। এখন আর নয়।
প্রশ্ন : আজকের বৃহত্তম রেডিও-টেলিস্কোপ তা হলে কে?
মা : দোলনার মত যে ঝুলছে Arcciboতে দুটো পাহাড়ের মাঝে; তৈরি হয়েছিল ১৯৬৩-তে। চাকতিটার ব্যাস হাজার ফুট। নিউ মেক্সিকোতে প্রকাণ্ড আকারে ২৭টা চাকতি জুড়ে ১৯৮০-তে যেটা বানানো হয়েছে, তা একখানা ১৭ মাইল ব্যাসের চাকতি দিয়ে আকাশের রেডিও পর্যবেক্ষণের সমান। সত্যিকারের প্রথম রেডিও টেলিস্কোপ তৈরি হয়েছিল আমেরিকায় ১৯৩৭ সালে।
প্রশ্ন : সব তো বুঝলাম, কিন্তু কনকেভ আর কনভেক্স কাঁচের তফাতটা কি?
মা : বাংলায় বললেও বুঝবি না। ছবি এঁকে বুঝিয়ে দিচ্ছি।
কনকেভ


প্রশ্ন : সবচেয়ে অদ্ভুত টেলিস্কোপ কোন্টি, মা?
মা : গোরস্থানের দূরবীন সেটি। তাকে খাড়া করা হয়েছে যে থামটার ওপর, সেই থামের মধ্যে রয়েছে জেমস লিক নামে এক ধনী, দানবীর, জমিদারের কঙ্কাল। তাঁর টাকাতেই তৈরি হয়েছিল ক্যালিফোর্নিয়ার লিক মানমন্দির—সমাধি-স্তম্ভটা রয়েছে এইখানেই।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন