গুপ্তচর

অদ্রীশ বর্ধন

প্রশ্ন : মাতাহারি কি সবচেয়ে বড় গুপ্তচর?

মা : মাতাহারি গুপ্তচরই ছিল না, অথচ তাকে এই বদনাম নিয়েই গুলি খেয়ে মরতে হয়েছিল ১৯১৭ সালের অক্টোবর মাসে ফ্রান্সে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে। হ্যাঁ, রূপসী ছিল বটে মাতাহারি, দহরম মহরম ছিল মিলিটারি মহলে, ওরিয়েন্টাল ডান্সে ছিল নম্বর ওয়ান—সেইসঙ্গে বদনাম কুড়িয়েছিল গুপ্তচরগিরির জন্যে। মাতাহারি তার আসল নামও নয়। জাতে ওলন্দাজ। বিয়ে করেছিল স্কটল্যাণ্ডের এক মদ্যপকে। তখন তার নাম ছিল মিসেস মারগারেথা ম্যাকলিয়ড। ইন্দোনেশিয়ায় বিবাহ-বিচ্ছেদ করে ঠিক করেছিল ইউরোপে গিয়ে নর্তকী হবে।

প্রশ্ন : মাতাহারি নামটা কিন্তু গুপ্তচর হিসেবেই কিংবদন্তী হয়ে রয়েছে, তাই না মা?

মা : সে কিংবদন্তী ভেঙেও গেছে ১৯৬৩ সালে সিক্রেট ফাইল খুলে দেখার পর। মাতাহারির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, সে নাকি জামান কাইজারের হয়ে গুপ্তচরগিরি চালিয়েছে। আসলে, ভুল করে নামী জার্মান গুপ্তচর ক্লারা বেনেডিক্স-এর বদলে তাকেই শনাক্ত করে বসে ইংরেজরা ১৯১৬ সালের নভেম্বরে। ওই মাসেই মিসেস ম্যাকলিয়ডকে গ্রেপ্তার করা হয় ‘এস এস হলাণ্ডিয়া’জাহাজে হল্যাণ্ড যাওয়ার পথে। ভুল বুঝতে পেরে পুলিশ তাকে ছেড়েও দেয়। ফের তাকে গ্রেপ্তার করা হয় ফ্রান্সে; অপরাধ—মাদ্রিদে জার্মান স্পাইদের সঙ্গে নাকি যোগাযোগ রেখেছে নাচ-টাচের মাধ্যমে। বিচার হয় প্যারিসে। সৌন্দর্য আর নর্তকী হিসাবে সুখ্যাতি তার কাল হয়ে দাঁড়ায়।

প্রশ্ন : গুপ্তচরদের নাকি বাহিনী আছে দেশে-দেশে?

মা : এদের গালভরা নাম হল ‘ইনটেলিজেন্স এজেন্সি’। যুক্তরাষ্ট্রের CIA-র প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল ১৯৪৭ সালে প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুমান-এর উদ্যোগে। ‘দ্য কোম্পানি’ নামেই পরিচিত কর্মচারীদের কাছে। হেড কোয়ার্টার ভার্জিনিয়ার ল্যাঙলে-তে; দ্বিতীয় কেন্দ্রটা ভার্জিনিয়াতেই—ম্যাকলিন অঞ্চলে। কর্মীর সংখ্যা প্রায় ২৫,০০০; বেশির ভাগই বিশ্লেষক—রুটিন কাজের জন্যে খোলাখুলিভাবে নিযুক্ত। গুপ্ত কাজের জন্যে আছে একদম ভেতরের কিছু লোক—এদের চাকরি ‘প্ল্যানস ডিভিশন’-এ—এরাই চালায় আমেরিকান দূতাবাসগুলোর CIA দপ্তর—যাদের নাম ‘স্টেশন’। CIA-র পুরো নাম ‘সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স এজেন্সি’।

প্রশ্ন : ব্রিটেনেও নিশ্চয় আছে গুপ্তচর সংস্থা?

মা : দুটো আছে। দুটোরই প্রতিষ্ঠা CIA-র আগে—১৯০৯ সালে। একটার নাম M16; কর্মীদের কাছে এর নাম ‘দ্য ফার্ম’। ‘ব্রিটিশ সিক্রেট ইনটেলিজেন্স সার্ভিস’ নামেও সবাই চেনে। সদর দপ্তর লণ্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার ব্রিজ রোডে; বৃটেনের বাইরে থেকে গোপন খবর সংগ্রহ করাই এদের কাজ। MI-এর পুরো নাম ‘মিলিটারি ইনটেলিজেন্স’।এ ছাড়াও আছে M15; পত্তনের সময়ে নাম রাখা হয়েছিল ‘স্পেশ্যাল ইনটেলিজেন্স ব্যুরো’। কর্মীদের কাছে ‘দ্য অফিস’ নামেই পরিচিত। সদর দপ্তর লণ্ডনের কার্জন স্ট্রীটে। ব্রিটেনের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আর অন্য দেশের গুপ্তচরদের খবরাখবর রাখাই এদের কাজ।

প্রশ্ন : রাশিয়ার ইনটেলিজেন্স এজেন্সির নাম KGB?

মা : হ্যাঁ। কর্মীদের কাছে ‘দ্য সেন্টার' নামেই পরিচিত। KGB অর্থাৎ ‘সোভিয়েত কমিটি অফ স্টেট সিকিউরিটি' প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৫৩ সালে—ষোড়শ শতাব্দী থেকে তৎপর রাশিয়ান ইনটেলিজেন্স সংগঠনের ধাঁচে। সদর দপ্তর মস্কোর Dzerzhinsky Square-য়ে। কর্মীর সংখ্যা প্রায় দু লক্ষ। শোনা যায়, রাশিয়ার বাইরে অ-রুশ কর্মীর সংখ্যা সাড়ে সাত লাখেরও বেশি। মূল দায়িত্ব দেশের ভেতরে যেন নিরাপত্তা বজায় থাকে—একই সঙ্গে মিলিটারি শাখা GRU-এর সঙ্গে হাত মিলিয়ে গুপ্তচরগিরি অব্যাহত রাখে বাইরে।

প্রশ্ন : এবার বলো ফ্রান্সের গুপ্তচর বাহিনীর কী নাম?

মা : The Service de Documentation Extericure et Contre-Espionage—সংক্ষেপে, SDECE প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৫৮ সালে। সদর দপ্তর প্যারিসের পুবে—Boulevard Mortier পাড়ায়। বাড়িটাকে কর্মীরা বলে la piscine—কেননা, কাছেই রয়েছে একটা সুইমিং পুল। দেশের বাইরে থেকে গুপ্ত সংবাদ সংগ্রহ করাই এদের কাজ। কর্মীর সংখ্যা প্রায় চার হাজার।

প্রশ্ন : শুনেছি নাকি ইজরায়েলেও আছে স্পাই বাহিনী?

মা : আছে এবং তাদের সদর দপ্তর সর্বদাই হঠাৎ-হঠাৎ বাড়ি পাল্টায় স্রেফ নিরাপত্তার কারণে। এই সংস্থার নাম MOSSAD; প্রতিষ্ঠা ১৯৫০ সালে। ঘাঁটি তেল আভিভে। কর্মী সংখ্যা প্রায় ১২০০। মূল দায়িত্ব দেশের বাইরে। গুপ্তচরগিরি। MOSSAD নামটা এসেছে হিব্রু শব্দ থেকে—যার মানে, ‘ইন্সটিটিউশন ফর ইনটেলিজেন্স অ্যাণ্ড স্পেশ্যাল অ্যাসাইনমেন্ট্স।

প্রশ্ন : গুপ্ত সংবাদ সংগ্রহ করার রেওয়াজ নিশ্চয় আগেও ছিল?

মা : আলেকজাণ্ডার দ্য গ্রেট যে-পদ্ধতিটা মাথা খাটিয়ে বের করেছিলেন, আজও তা কাজে লাগছে। মধ্য প্রাচ্য আর এশিয়ায় অভিযান চালানোর সময়ে অফিসারদের আনুগত্য বিচার করতেন তাদের দিয়ে বাড়িতে চিঠি লিখিয়ে। সেই চিঠি খুলে পড়তেন, অসন্তোষের জায়গা ধরে ফেলতেন এবং তা নির্মূল করতেন।

প্রশ্ন : ‘ফিফথ কলাম’ কাকে বলে, মা?

মা : বাংলায় বলে পঞ্চম বাহিনী। বোঝবার সুবিধের জন্যে বলা হয়—অশ্ব, রথ, গজ, পদাতিক—এই চার বাহিনীর বাইরে যে বাহিনী, অর্থাৎ গুপ্তচর বাহিনী। খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৯-এ পারস্যের নেতা সাইরাস দ্য গ্রেট ব্যাবিলন শাসক বেলসাজারকে হারানোর জন্যে গোপনে বিক্ষুব্ধ ব্যাবিলনিয় পুরুতদের নিয়ে একটা বাহিনী গড়েছিলেন। এই বাহিনী কীভাবে সাহায্য করেছিল সাইরাসকে, তা জানা যায়নি। তবে ব্যাবিলনের দলিল দস্তাবেজ ঘেঁটে জানা গেছে, বিনা রক্তপাতে শহর দখল করেছিল সাইরাসের সৈন্যবাহিনী। আধুনিক যুগে ‘ফিফথ কলাম’ নামটার প্রথম ব্যবহার করেন স্প্যানিশ ন্যাশনালিস্ট জেনারেল মোলা ১৯৩৬ সালে। চার ‘কলাম’ অর্থাৎ সূচীমুখ সৈন্যসজ্জা দিয়ে মাদ্রিদ অবরোধের পর বড়াই করে বলেছিলেন, ‘ফিফথ কলাম’ ইতিপূর্বেই রয়েছে ভেতরে। অর্থাৎ দেশেরই লোক দেশে বসে যখন বিদেশি শএুদের সঙ্গে হাত মেলায়, তখন তাদের বলা হয় ‘ফিফথ কলাম’।

প্রশ্ন : ‘স্প্যানিশ আমার্ডা’ তেড়ে আসছে শুনে বল খেলতে শুরু করেছিলেন কেন স্যার ফ্রান্সিস ড্রেক?

মা : কারণ তিনি গুপ্তচর মারফত অনেক আগেই খবরটা পেয়েছিলেন। স্পেন থেকে তাদের অজেয় বাহিনী রওনা হওয়ার আগেই ইংরেজ নৌবাহিনীর কমাণ্ডার জেনে গেছিলেন—ইংল্যাণ্ড আক্রান্ত হতে চলেছে—তাই নির্বিকার থাকতে পেরেছিলেন। খবর আনার কৃতিত্বটা অবশ্য রানী প্রথম এলিজাবেথের প্রধান উপদেষ্টা স্যার ফ্রান্সিস ওয়ালসিঙহ্যাম-এর। ইনিই গুপ্তচরদের সংগঠন গড়ে তোলেন ইংল্যাণ্ডে এবং তাদের শএুদেশে পাঠিয়ে দেন একদম ভেতরে ঢুকে গিয়ে খবর জোগাড় করার জন্যে। দুঁদে স্পাই অ্যান্টনি স্ট্যানডেন রাজসভাসদ সেজে ঢুকে পড়ে স্প্যানিশ আর্মাডা-র গ্র্যাণ্ড অ্যাডমিরাল মার্কুইস ডি সান্তাক্রুজ-এর অভিযানে। স্পাইয়ের নাম তখন পম্পিও পলিগ্রিনি। সান্তাক্রুজ আর স্পেন অধীশ্বর দ্বিতীয় ফিলিপ-এর মধ্যে যেসব চিঠি বিনিময় হত, পলিগ্রিনিই সেগুলো খুলে পড়ে জানতে পারে স্পেনের মারকুটে প্ল্যান। অভিযানের অনেক মাস আগেই জানিয়ে দেয় স্পাইমাস্টার ফ্রান্সিসকে।

প্রশ্ন : জেমস্ বণ্ড কাহিনী কি সত্যি স্পাইয়ের ঘটনা নিয়ে লেখা?

মা : নিশ্চয়। সোভিয়েত স্পাই সংগঠন SMERSH-কেই জনপ্রিয় করেছেন জেম্‌স্ বণ্ড স্রষ্টা আয়ান ফ্লেমিং। সত্যিকারের KGB ডিপার্টমেন্ট এই SMERSH। নামকরণ হয়েছে উদ্দেশ্য অনুসারে। Smert Shipionen—মানে, মরুক স্পাইরা! দেশের বাইরে সোভিয়েত ইউনিয়নের শএুনিপাত করাই এই সংগঠনের কাজ। সবচেয়ে নামী নিহত ছিলেন ট্রটস্কি—১৯১৭ বিপ্লবের প্রাক্তন বলশেভিক লিডার—মেক্সিকোয় খুন হন ১৯৪০ সালে।

প্রশ্ন : আমেরিকায় CIA-র পত্তন ঘটেছিল কীভাবে, মা?

মা : ব্রিটিশদের দৌলতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে আমেরিকার কোনও কেন্দ্রনিয়ন্ত্রিত গুপ্তচর সংস্থা ছিল না। ১৯৪০ সালে ব্রিটিশ চাপে পড়ে প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট OSS অর্থাৎ ‘অফিস অফ দ্য স্ট্র্যাটেজিক সারভিস’ গড়ে তুললেন দেশের গুপ্তচরদের কাজে সংহতি আনার উদ্দেশ্যে। যুদ্ধশেষে OSS-কে সরকারিভাবে ভেঙে দেওয়া হয়। কিন্তু চাকরিতে থেকে যায় বহু কর্মী। এদেরকে নিয়েই CIA-এর কেন্দ্রীন তৈরি হয় ১৯৪৭ সালে প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের উদ্যোগে।

প্রশ্ন : সত্যি স্পাই থেকে যদি জেম্স্ বণ্ড তৈরি হয়, তাহলে অলীক গল্প পড়ে সত্যি স্পাইরা কি প্রেরণা পায়?

মা : শএুদেশের গুপ্তচর সংস্থার একদম বিবরে প্রবেশ করে যেসব খবর সংগ্রহকারী সেই গুপ্তচরদের ডাকনাম Mole অর্থৎ ছুঁচো। এ নাম প্রথম মাথায় আনেন ব্রিটিশ রোমাঞ্চ লেখক জন লা কারে—আসল নাম ডেভিড কর্নওয়েল—প্রাক্তন M16 অফিসার। ১৯৭৪ সালে লেখা Tinker, Tailor, Soldier Spy নভেলে ‘ছুঁচো’কে চালু করেন ইনিই—পরে নামটা লুফে নেয় সত্যিকারের স্পাইরা।

প্রশ্ন : এখন তো আকাশি গুপ্তচরদের জয়জয়কার, তাই না, মা?

মা : স্যাটেলাইট? তাদেরকেও বোকা বানিয়েছে মাটির মানুষ—অন্তত একটি ক্ষেত্রে। ১৯৮২ সালে ফকল্যাণ্ড যুদ্ধে বৃটেনের রয়াল এয়ার ফোর্স খুব বড়াই করেছিল, যে তারা পোর্ট স্ট্যানলি-র একমাত্র এয়ারপোর্টকে বোমা মেরে অকেজো করে দিয়েছে—আর্জেন্টিনার এয়ারফোর্সের বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছে। আমেরিকান স্যাটেলাইট থেকে তোলা আকাশি ফটোগ্রাফেও দেখা গিয়েছে—বড় বড় বোমার গহ্বর রয়েছে এয়ারপোর্টের রানওয়েতে। যুদ্ধশেষে জান গেল তাজ্জব খবরটা। মুষ্টিমেয় আর্জেন্টাইন সৈন্য স্রেফ বালতি আর কোদাল নিয়ে রাতের অন্ধকারে রানওয়েতে মাটি ছড়িয়ে রাখত, দিনের আলোয় স্যাটেলাইট থেকে মনে হত গহ্বর। রাত হলেই মাটি সরিয়ে উড়িয়ে দিত বিমান—রসদ আর সৈন্য নিয়ে যেত প্রতি রাতে—শেষ সমর্পণের দিন পর্যন্ত।

প্রশ্ন : গুপ্তচরদের রোজগার নিশ্চয় অনেক?

মা : ঠকেও মরে। যেমন বুরবক বনেছিল সিসারো নামে স্পাই। তার আসল নাম এলিসা বাজনা। জাতে তুর্কি। চাকরি করত নিরপেক্ষ তুরস্ক-এর রাজধানী আঙ্কারা-র ব্রিটিশ দূতাবাসে। ১৯৪৩-এর অক্টোবরের এক সকালে রাজদূত স্যার হিউজে বাথটাবে ডুবে গা ধুচ্ছিলেন। টপ-সিক্রেট ডকুমেন্ট বোঝাই বাক্সটা ছিল পড়াশুনার ঘরে টেবিলে। এলিসা টুক করে চাবি থেকে একটা মোমের ছাঁচ বানিয়ে নিয়েছিল। তারপর সারা মাস ধরে ৫২টা ডকুমেন্টের নকল বানিয়ে চড়া দামে বেচেছিল আঙ্কারা-র নাৎসী অফিসারদের কাছে। তুরস্ক তখন চিন্তা করছে ইংরেজদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে হিটলারের বিরুদ্ধে লড়বে কিনা। গুপ্ত সংবাদগুলো খুবই কাজে লেগেছিল জার্মানদের। ‘সিসারো’ সাঙ্কেতিক নামটা জার্মানদেরই দেওয়া—রোমের সুবক্তা সিসারো ছিলেন মস্ত রাজনীতিবিদ খ্রিস্টপূর্ব ১০৬ থেকে ৪৩-এ। মহানন্দে এলিসা স্পাইং চালিয়ে গেল ১৯৪৪-এর এপ্রিল পর্যন্ত। তুরস্ক তদ্দিনে ঠিক করে নিয়েছে যুদ্ধে নাক গলাবে না। তিন লক্ষ পাউণ্ড রোজগারও করে ফেলেছে এলিসা—লুকিয়ে রেখেছে ব্রিটিশ দূতাবাসেই শোবার ঘরের কাঠের মেঝের তলায়। এপ্রিলেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে টাকার আণ্ডিল নিয়ে উধাও হয়ে গেল এলিসা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে আবির্ভূত হল ইস্তানবুলে—মতলব ছিল টুরিস্টদের জন্যে বানাবে বিলাসবহুল হোটেল। তখনই জানল, জামার্নরা তাকে ঠকিয়েছে। জাল টাকা দিয়েছে।

প্রশ্ন : ভারতবর্ষেও নিশ্চয় ছিল গুপ্তচররা?

মা : কৌটিল্য, কামন্দক আর যাজ্ঞবল্ক্য দূত আর গুপ্তচরকে দুটো আলাদা ভাগে ফেলেছিলেন। কামন্দক বলেছিলেন—সবার সামনে কাজ করে যারা, তারা হল দূত—আড়ালে করলে গুপ্তচর। কৌটিল্য গুপ্তচরগিরির ওপর বেশি জোর দিয়েছিলেন; তাঁর অর্থশাস্ত্রের ৪ অধ্যায়ে এই পেশা নিয়ে আলোচনা করেছেন। চর-দের ‘রাজার চোখ’ বলেছেন কামন্দক। একই কথা আছে মহাভারতের উদ্যোগপর্বে। শ্লোকটা এই: চারৈঃ পশ্যন্তি রাজানঃ। শুক্রনীতিসারে রাজাকে রোজ রাতে গুপ্তচরদের কাছ থেকে জানতে হবে আত্মীয়স্বজন, রাজকর্মচারী, অন্তঃপুরিকা আর প্রজাদের মতিগতি কিরকম।

প্রশ্ন : প্রাচীন ভারতবর্ষের গুপ্তচর! এ কাজ করত কারা?

মা : বুদ্ধি যাদের ছুরির মত, কথা যাদের মধুর মত, খাটতে পারে গাধার মত, চকিতে বুঝতে পারে অন্যের মনোভাব—তাদেরকেই বহাল করা হত চরের কাজে। কৌটিল্যের লেখা থেকে মনে হয়, ছাত্র, উদাসীন, গেরস্থ, ব্যবসায়ী, সন্ন্যাসী প্রভৃতিরা ছদ্মবেশে গুপ্তসংবাদ সংগ্রহ করত। জ্যোতিষী আর মেয়েরাও ভাল গুপ্তচর হতে পারত। কৌটিল্য দুই শ্রেণীর গুপ্তচরের কথা লিখেছেন। এক, এক জায়গায় থেকে খবর জোগাড় করার গুপ্তচর; দুই, নানা জায়গায় ঘুরে খবর এনে দেওয়ার গুপ্তচর। নানান গুপ্তচর লাগিয়ে একই খবর সংগ্রহ করার বিধানও দিয়েছেন ক্ষুরবুদ্ধি কৌটিল্য এবং সেই সব গুপ্তচররা যেন কেউ কাউকে চিনতে না পারে। একই পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে মহাভারত আর বিষ্ণুধর্মোত্তরেও।

প্রশ্ন : মহাভারতেও গুপ্তচর বর্ণনা আছে?

মা : শান্তিপর্ব ১৪০-৪১-য়ে আছে—‘পাষণ্ড তাপস প্রভৃতি দুশ্চরিত্র ব্যক্তিদিগকে পররাষ্ট্রে নিয়োগ করা শ্রেয়স্কর। লোকের কন্টক-স্বরূপ দুরাত্মা তস্করেরা উদ্যান, বিহারস্থান, শুন্যাগার, পানাগার, তীর্থ ও দ্যুত সভায় প্রতিনিয়ত গমন করিয়া থাকে।’

প্রশ্ন : কিন্তু মা, কাজটা নোংরা হলেও দেশের মঙ্গল কি হয়নি গুপ্তচরগিরির ফলে?

মা : সেকালের ভারতবর্ষে দুর্নীতিদমন করার ব্যাপারে, দেশে শাসনশৃঙ্খলা টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে গুপ্তচরদের অবদান কম ছিল না। এরাই খবর এনে দিত ঘুষ নিচ্ছে কিনা বিচারপতি অথবা কোনো রাজকর্মচারী। সমাজবিরোধীদের যম ছিল এই গুপ্তচররা—শান্তিভঙ্গ করলে, টাকা জাল করলে, খাবারে ভেজাল মিশোলে, চুরি-চামারি লুঠপাট করলে—এরাই ফাঁসিয়ে দিত দুষ্কৃতিদের। দেশের ভেতরের অবস্থা কিরকম—রাজাকে সে সম্বন্ধে সজাগ রাখত। এক গুপ্তচরের খবর আর এক গুপ্তচর সত্যি বলে ফতোয়া দিলে—পুরস্কার পেত সেই গুপ্তচর। খবর মিথ্যে হলে কিন্তু তার কপালে অনেক দুঃখ লেখা থাকত। ভারতীয় গুপ্তচরদের নাম গ্রীস আর রোম দেশেও পৌঁছেছিল

প্রশ্ন : ইণ্ডিয়ান স্পাইদের সুনাম গ্রীস আর রোমে?

মা : সে দেশের ঐতিহাসিকরা লিখে গেছেন ইণ্ডিয়ান স্পাইদের সম্বন্ধে অনেক কথা। ‘এপিসকোপাই’ নামে এক শ্রেণীর রাজকর্মচারীর কথা বলা হয়েছে; এরা ঘুরে ঘুরে খবর জড়ো করত—রাজাকে অথবা শাসন-অধিকর্তাকে জানিয়ে দিত। স্ট্র্যাবো-র বইতে এদেরকেই বলা হয়েছে ‘এফোরি’। কৌটিল্য যেমন ঘুরে ঘুরে খবর সংগ্রহর জন্যে মেয়ে-গুপ্তচর বহাল করার নির্দেশ দিয়েছেন স্ট্র্যাবোর লেখাতেও পাওয়া যায় সেই পদ্ধতি—নগর আর শিবির ঘুরে খবর জোগাড় করে মেয়ে-গুপ্তচররা। কৌটিল্য বলেছেন, রাজা এদের খবর থেকেই বুঝে নেবেন রাজ্যের কোথায় কোথায় অসন্তোষ দানা পাকাচ্ছে—দরকার হলে বিরোধ পাকিয়ে বিরোধী দমন করবেন—রাজানুরক্তদের বেশি সম্মান দিয়ে দলে টেনে নেবেন। এমনকি বিচারের ব্যাপারেও বিচারকরা বাদী আর বিবাদীর বক্তব্য সমর্থনের জন্যে গুপ্তচর পাঠিয়ে খাঁটি খবর জোগাড় করতে পারেন কৌটিল্যের ব্যবস্থায়।

প্রশ্ন : এখন তো গুপ্তচররা পাশের দেশের খবর আনছে। সেকালে?

মা : সেকালের ভারতবর্ষেও ছিল একই ব্যবস্থা। পাষণ্ড আর প্রচ্ছন্ন তাপসদের দিয়ে অন্য দেশ থেকে খবর জোটানোর উপদেশ আছে মহাভারতে। প্রবাসী রাজদূতদেরও এ কাজ করতে হত—সেই দেশের রাজকর্মচারীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে নিয়ে গুপ্ত সংবাদ বের করে নিতেন। কখনো দেশের ভেতরে যারা রাজার বিপক্ষে, গুপ্তচর বাছা হত তাদের মধ্যে থেকে। অন্য দেশের রাজনৈতিক অবস্থা, টাকাপয়সার অবস্থা, সৈন্যব্যবস্থা, দুর্গ ইত্যাদি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—সব খবর চলে আসত গুপ্তচরদের মাধ্যমে। মহাভারতের দ্রোণপর্বে লেখা আছে, কুরু আর পাণ্ডব দুই দলই গুপ্তচর লাগিয়েছিল সৈন্যবাহিনীর মধ্যেই। বিদেশের গুপ্তচররা গোপন খবর পাঠাতো সাঙ্কেতিক লিপির সাহায্যে।

প্রশ্ন : মহাভারতের গুপ্তচর শিক্ষা নিশ্চয় বৃথা যায়নি পরবর্তীকালে?

মা : তা কি করে বলব? তবে গুপ্তচর দিয়ে শুধু খবর জোগাড় করা ছাড়াও শত্রুদেশকে দুর্বল করাও হয়েছে। শোনা যায়, মগধরাজ অজাতশত্রু এই কূটবুদ্ধি প্রয়োগ করেছিলেন লিচ্ছবি-মগধ যুদ্ধে। লিচ্ছবিদের ঐক্য চুরমার করে দেওয়ার জন্যে মন্ত্রী বস্সকার-কে পাঠিয়েছিলেন। বস্সকার লিচ্ছবিদের মধ্যে অনৈক্য এনে দিয়েছিলেন। অজাতশত্রুর মতলব হাসিল হয়েছিল।

প্রশ্ন : কিন্তু মা, আধুনিক যুগে ছদ্মবেশে খবর জোগাড় করে যারা, তাদেরকে তো গোয়েন্দা-ও বলা হয়?

মা : তা হয়। গুপ্তচর আর গোয়েন্দা নামের মধ্যে একটা মর্যাদার ব্যবধানও তৈরি হয়েছে। মধ্যযুগের ভারতবর্ষে কিন্তু বংশপরম্পরায় গোয়েন্দাগিরি করত একটাই সম্প্রদায়: খোঁজী সম্প্রদায়। অপরাধ নির্ণয় এদের ছিল একচেটিয়া পেশা। রাজা-বাদশা, গেরস্থ-বণিক, হিন্দু-মুসলমান—প্রত্যেকেই দরকার হলে খোঁজী-দের খুঁজত। ইংরেজরা এদেশে আসার আগে জমিদারি-পুলিশের রঙ্গাস্তি চাকরানিরা ছিল খোঁজী গোষ্ঠীর গোয়েন্দা। ইংরেজরা এদের প্রথম হদিশ পায় পাঞ্জাবের গুরগাঁও জেলায়।তারপরেই খবর আসে, নদীয়াতেও রয়েছে খোঁজী গোষ্ঠী। এই জাত-ব্যবসায়ীদের দিয়ে অনেক জটিল মামলার কিনারা করেছেন ইংরেজ বিচারপতিরা।

প্রশ্ন : ভারতীয় ‘খোঁজী’রা তাহলে গুপ্তবিদ্যা শিখিয়েছে ইংরেজদের?

মা : গোটা পৃথিবীকে ‘খোঁজী’রা শিখিয়েছে একটা বিদ্যে: পদচিহ্ন বিদ্যে। খোঁজী’রা এই গোপন বিদ্যে জানত পুরুষানুক্রমে—ইংরেজরা তা জেনে নিয়ে চালু করে ভারতীয় পুলিশমহলে। ইংরেজি পরিভাষাগুলোও দিশি পরিভাষা ‘এড়ী, তল, পেষ, সাঁকো’র নিছক অনুবাদ। রাজস্থানের মরুঅঞ্চলের খোঁজী গোষ্ঠী ‘ট্র্যাকটিং’ নামে আর এক গোপন বিদ্যায় অতিশয় কুশলী। ভারতীয় পুলিশ সেই বিদ্যের কিছুটা শিখে নিয়ে তাকে বিজ্ঞানের রূপ দিয়েছে। তামাম দুনিয়ার পুলিশরা এখন তারই চর্চা করে চলেছে।

প্রশ্ন : ‘খোঁজী’দের নিয়ে সত্যি গোয়েন্দা গল্প লেখা যায় না?

মা : তাদের খুঁজে পেলে তো! রাজস্থান ছাড়া আর সব জায়গায় মুছে গেছে এই জাত-ব্যবসায়ী গুপ্তচর-গোয়েন্দারা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%