অদ্রীশ বর্ধন

প্রশ্ন : আগ্নেয়গিরির নাম ভলক্যানো হল কেন, মা?
মা : বিশ্বকর্মা দেবতাদের এঞ্জিনীয়ার—বলছে আমাদের পুরাণ। রোমানদের পুরাণ বলছে—দেবলোকের কারিগরের নাম ভলকান। ভলকানের কামারশালা ছিল নাকি ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির পেটের মধ্যে। গুড় গুড় গুম্গুম্ আওয়াজ শোনা গেলে, সেই সঙ্গে চুড়ো দিয়ে আগুন আর ধোঁয়া বেরোলেই রোমানরা বলত, এইরে! ভলকান কাজ শুরু করে দিয়েছেন কামারশালায়—হাতুড়ি পিটছেন নেহাইয়ে—বানাচ্ছেন আকাশের বাজ! এইভাবেই আগ্নেয়গিরির নাম হয়ে গেল ভলক্যানো। রোমানদের কাছ থেকে শিখল গোটা ইউরোপের মানুষ। ভলক্যানো মানেই ভলক্যানোর কামারশালা!
প্রশ্ন : আগ্নেয়গিরির মধ্যে পালের গোদা তাহলে ভিসুভিয়াস?
মা : যে অন্ধবিশ্বাস থেকে ভলক্যানো নামকরণ, সে-কথা বলতে গেলেই ভিসুভিয়াসের কথা বলতে হয়। অনেকদিন দামালি বন্ধ রেখেছিল ভিসুভিয়াস। ভলকানের কারখানা লাটে উঠেছে, ভেবেছিল রোমানরা। হাজার বছর গেল কেটে। ভিসুভিয়াসের সারা গা সবুজ হয়ে উঠল গাছপালা ফলফুলে। অনেক শহর গড়ে উঠল তলায়। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় শহর দুটোর নাম হারকুলেনিয়াম আর পম্পেই। বড়লোকদের শহর। আনন্দে ভরা শহর। নিরানন্দ নেমে এল কিন্তু একদিনেই। আজ থেকে প্রায় উনিশ’শ বছর আগে—৭৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ অগাস্ট।
প্রশ্ন : কামারশালা ফের চালু করলেন বুঝি ভলকান?
মা : বড় ভয়ানক ভাবে শুরু করলেন। ২৩ অগাস্ট খুব মাটি কেঁপেছিল, গল্ গল্ করে ধোঁয়া উঠেছিল চুড়ো দিয়ে। শান্ত সুন্দর পাহাড়টার আচমকা বেয়াড়াপনা দেখে হতভম্ব হল সবাই। ২৪ অগাস্ট মাটি কাঁপল আরও জোরে, গুম্ গুম্ গজরানি শোনা গেল ভিসুভিয়াসের পেটের মধ্যে—তারপরেই এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ। সাদা ধোঁয়ার মত মেঘ বেরিয়ে এল চুড়ো থেকে—মুহূর্তের মধ্যে সাদা মেঘ হয়ে গেল কালো মেঘ—মুষলধারে ছাই আর পাথর আছড়ে আছড়ে পড়তে লাগল পম্পেই শহরের ওপর। সেই সঙ্গে ভূমিকম্প। দমাদম ধরাশায়ী হল বাড়ির পর বাড়ি। শুরু হয়ে গেল অগ্নিকাণ্ড। বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ল শহরময়। পাতালঘরে আর বন্ধ ঘরে ঢুকেও কেউ রেহাই পেল না। মণিমুক্তোর থলি নিয়ে পালাতে গিয়ে বড়লোকরা যেমন রাস্তায় শেষ হয়ে গেল—সেইভাবে মৃত্যুবিষের ধোঁয়ায় বদ্ধঘরেও শেষ হয়ে গেল ছোট বড় গরিব বড়লোক—সব্বাই। আট দিন আট রাত আগুন, পাথর আর ছাই বমি করে গোটা পম্পেই শহরটাকে নিখুঁতভাবে কবর দিয়ে গেল একা ভিসুভিয়াস।
প্রশ্ন : হারকুলেনিয়াম শহরকে খতম করল কীভাবে?
মা : ধোঁয়া ওঠা ফুটন্ত, জ্বলন্ত আর তরল কাদার স্রোত বইয়ে দিয়ে। মন্থর গতিতে এগিয়ে এসে ডুবিয়ে দিল অত বড় শহরটাকে। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল হারকুলেনিয়াম।
প্রশ্ন : তাহলে এমন নিখুঁত বর্ণনা কে দিল?
মা : রোমান লেখক ‘কনিষ্ঠ প্লিনি’। সতেরো বছর বয়েসে ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাত তিনি নিজের চোখে দেখেছিলেন। দু-দুটো শহরকে ধ্বংস হতেও দেখেছিলেন। লিখে রেখেছিলেন, ২৪ অগাস্টের ছাই-মেঘ বন্যার আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল ধরিত্রীর ওপর দিয়ে। একমাত্র বৈজ্ঞানিক বিবরণ তাঁর সেই চিঠির গোছা।
প্রশ্ন : প্লিনি তখন কোথায় ছিলেন?
মা : কুড়ি মাইল দূরে। অতদূর থেকেও দেখেছেন, কীভাবে কুচকুচে কালো আর ভয়ানক চেহারার মেঘ মোচড় মেরে-মেরে বেরিয়ে ঠিক যেন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে দমকে দমকে…আগুনের লকলকে জিভ দেখা গেছে অবিকল বিদ্যুৎশিখার মতন। প্রচণ্ড ঝাঁকুনি মেরে বড় বড় বাড়িগুলোর গোড়া পর্যন্ত এক-এক টানে উপড়ে আনা হয়েছে। পরের দিন প্লিনি চলে গেলেন সমুদ্রের ধারে। দেখলেন, মাটি এমনই থরথর করে কাঁপছে যে সমুদ্র পর্যন্ত নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে—তলা দেখা যাচ্ছে। সেইদিনই বিকেল নাগাদ কালো মেঘ তেড়ে এল প্লিনির দিকে—গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে গেল চারিদিক—প্লিনির তখন মনে হয়েছিল, ঠিক যেন বন্ধঘরে বন্দী হয়েছেন—আলো পর্যন্ত ঢুকছে না সে ঘরে। ঘণ্টা কয়েক পরে কেটে গেল মেঘ—দেখা গেল ধুধু ভূদৃশ্য—পুরু ছাইয়ে ঢাকা ঠিক যেন বরফের চাদর পাতা, বিশ হাজার মানুষ বলি হয়ে গিয়েছিল ভিসুভিয়াসের রুদ্ররোষে। লুঠপাট চলেছিল শহরে শহরে—তারপর চম্পট দেয় প্রত্যেকেই। ১৭৪৮ সালে পরিত্যক্ত শহর দুটোকে নতুন করে মানুষের চোখের সামনে তুলে ধরলেন আলকুবিয়েরে নামে এক এঞ্জিনীয়ার—নেপলস-এর রাজার হুকুমে।
প্রশ্ন : প্লিনির বর্ণনা যে বৈজ্ঞানিক, তা জানছো কীভাবে?
মা : বৈজ্ঞানিকরা এ যুগে অগ্ন্যুৎপাত সম্বন্ধে যা জেনেছেন, তার সঙ্গে যে মিলে যাচ্ছে। যেমন ধর, গ্যাস আর শক্ত জিনিস আগ্নেয়গিরির পেট থেকে সোজা উঠে যায় অনেক ওপরে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন একটা পাইন গাছ। লেখক প্লিনির কাকা ঠিক সেই উপমাই দিয়েছেন। ইনি ছিলেন বিজ্ঞান-জানা মানুষ আর নৌ-সেনাপতি। পাহাড়ের মাথার ফুটো দিয়ে শক্ত জিনিস ঠেলে বেরোলে ঘষাঘষি তো লাগবেই। তখন তৈরি হয় স্থির বিদ্যুৎ। চিরুনি দিয়ে শুকনো চল অনেকক্ষণ ধরে আঁচড়ালে যা হয়—তাই। স্পার্কের আওয়াজ তখন বাজের আওয়াজ হয়ে দাঁড়ায়—সাপের চেরা জিভের মত বিদ্যুৎশিখার ঘন ঘন ঝলক দেখা যায়, জ্বালামুখের জ্বলন্ত লাভার আলোয় গনগনে দেখায় গ্যাস আর পাথরের থাম—মনে হয় যেন দাউ দাউ করে জ্বলছে অপরূপ পাইন গাছ। কখনো কখনো এই স্তম্ভ বা পাইন গাছ এত ঘন হয় যে, সূর্যের মুখ ঢেকে দিয়ে আচমকা অমাবস্যার অন্ধকার বানিয়ে নেয়। তেড়েমেড়ে উঁচুতে উঠে গিয়ে বাষ্প জমে জল হয়ে যায়—মুষল ধারে বৃষ্টি পড়তে থাকে। বৃষ্টির জল কাদাটে নদীর আকারে নেমে আসে পাহাড়ের গা বেয়ে অজস্র ধারায়—ডুবিয়ে দেয় সানুদেশের শহর।
প্রশ্ন : আগ্নেয়গিরির গ্যাসে কী কী থাকে, মা?
মা : বেশির ভাগই বাষ্প—অতিমাত্রায় গরম—হাজার ডিগ্রি ফারেনহিট পর্যন্ত হতে পারে। অন্যান্য গ্যাসের মধ্যে থাকতে পারে হাইড্রোজেন ক্লোরাইড, কার্বন ডাইঅক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, মিথেন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন আর আরগন। গন্ধকের নানারকম যৌগিক পদার্থ—যেমন, হাইড্রোজেন সালফাইড আর সালফার-ডাই-অক্সাইড। গ্যাস শুধু আগ্নেয়গিরির ফুটো দিয়ে বেরোয় না—লাভা থেকেও বেরোয়। অগ্ন্যুৎপাত বন্ধ হয়ে যাবার কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পরেও দেখা যায় ভুর ভুর করে গ্যাস বেরোচ্ছে লাভার স্রোত থেকে।
প্রশ্ন : লাভা বেরোবেই অগ্ন্যুৎপাতের সময়ে, তাই না, মা?
মা : অগ্ন্যুৎপাত ঘটলেই যে লাভা বেরোবে—এমন কোনও কথা নেই। প্রথমে ‘কেশে গলা সাফ’ করে নেয় আগ্নেয়গিরি—অতিগরম বাষ্প আর গ্যাস ঠেলে তুলে দেয় শূন্যে—তরল ধাতুর ফোয়ারার মতন লাভার স্রোতও উঠে যেতে পারে সেইসঙ্গে। সাধারণত লাভা গড়িয়ে নামে পাহাড়ের গা বেয়ে। কম গরম বলে, ভেতরে কম গ্যাস থাকে বলে আর বেশি থকথকে হলে ফাটলের চারধারে জমে গিয়ে খাড়াই গম্বুজ বানিয়ে নেয়। একে বলে ‘প্লাগ ডোম’। লাসেন ভলক্যানিক ন্যাশনাল পার্কে এইরকম মোচার মতন দেখতে গম্বুজ ভলক্যানো আছে তেরোটা পঞ্চাশ বর্গমাইলের মধ্যে। এর ব্যতিক্রমও আছে। ১৯০২ সালে মাউন্ট পিলী-র আগুন-বমিতে লাভা ছিল না এক কণাও।
প্রশ্ন: অগ্ন্যুৎপাতে লাভা ছিল না? কেন, মা?
মা : ফাটলের কাছে এসে লাভা জমে গিয়েছিল যে। অস্বাভাবিক একটা ‘প্লাগ ডোম’ তৈরি হয়ে গিয়েছিল মাউন্ট পিলীর চুড়োয়—হাজার ফুট উঁচু। অদ্ভুত সেই গড়ন দেখে লোকে বলেছিল, মাউন্ট পিলী মেরুদণ্ড বানিয়ে নিচ্ছে! কিন্তু সে মেরুদণ্ড টেকেনি। ঘন ঘন গ্যাসের বিস্ফোরণে ভেঙে টুকরো টুকরো হয় গিয়েছিল শিরদাঁড়া।
প্রশ্ন : লাভা কত রকমের হয়, মা?
মা : ব্লক লাভা আর কর্ডেড লাভা। বেশি থকথকে হলে ব্লক লাভা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়ে পাথরের রকমারি চাঙর বানায় বলে—হাওয়াই ভাষায় এর নাম aa; লাভা যখন বেশি তরল থাকে, তখন তার নাম কর্ডেড লাভা—শুকিয়ে গেলে দড়ির মত পাকিয়ে যায় বলে—হাওয়াই ভাষায় এর নাম pahoehoe.
প্রশ্ন: লাভা ঠাণ্ডা হতে কত সময় নেয় বলবে?
মা : তোর মাথার মতই বড্ড বেশি সময় নেয়। ১৮৩০ সালে দেখা গিয়েছিল সিসিল-এর এটনা আগ্নেয়গিরির লাভা থেকে বাষ্প বেরোচ্ছে। অথচ সেই লাভা এটনা-র পেট থেকে বেরিয়েছিল তেতাল্লিশ বছর আগে। ১৭৫৯ সালে লাভার স্রোত নেমেছিল মেক্সিকো-র জোরুল্লো আগ্নেয়গিরি থেকে। সাতাশি বছর পরে দেখা গেল, লাভা থেকে দু-দুটো থামের আকারে বেরোচ্ছে বাষ্প।
প্রশ্ন : আগ্নেয়গিরি থেকে কী কী জিনিস বেরোয়, মা?
মা : লাভা ছাড়াও বেরোয় পাথর, আধপোড়া কয়লা বা অঙ্গার আর ছাই। ১৭৭৯ সালে ভিসুভিয়াস আর একবার রেগে গিয়ে দশ হাজার ফুট উঁচু পর্যন্ত আধপোড়া কয়লা ছুঁড়ে মেরেছিল। ১৮১৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপ সুমবাওয়া-র আগ্নেয়গিরি তামবোরা থেকে এত ঝামাপাথর বেরিয়ে সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়েছিল যে ঠেলে যেতেও পারেনি জাহাজের দঙ্গল। উত্তর-মধ্য ইকুয়েডর-এর আগ্নেয়গিরি টোটোপাক্সি নাকি দু-শ টন ওজনের একটা পাথরের চাঁই ছুঁড়ে দিয়েছিল ন’ মাইল দূরে। আগ্নেয়গিরির ধারেকাছে লাভা, পাথর আর বালি কি ধরনের অবিশ্বাস্য অনুপাতে জমতে থাকে, তার পিলে-চমকানো নিদর্শন। পারিকুটিন আগ্নেয়গিরির জন্ম।
প্রশ্ন : আগ্নেয়গিরির জন্ম! সে যে ভয়ঙ্কর ব্যাপার! কে দেখেছে, মা?
মা : দুলর্ভ সেই সৌভাগ্য হয়েছিল মেক্সিকোর এক রেড ইণ্ডিয়ানের—নাম তার ডাইয়োনিসিয়ো পোলিডো। চাষী মানুষ। কিছুতেই ফসল ফলাতে পারেনি এক টুকরো নিচু জমিতে। ১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের রোদে কাহিল ডাইয়োনিসিয়ো পোড়া সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলেছিল সেই জায়গায়। আগে থেকেই তেতে ছিল জায়গাটা। এখন দেখা গেল, ধোঁয়া উঠছে সেখান থেকে, সিগারেটের ধোঁয়া নয়। মাটি ফেটে গেছে, ধোঁয়া বেরোচ্ছে তার ভেতর থেকে, সেই সঙ্গে শোনা যাচ্ছে গুড়-গুড় পাতাল গজরানি। আচমকা দুলে উঠল পায়ের তলার মাটি। সঙ্গে সঙ্গে কানের পর্দা যেন ফেটে গেল ভয়ঙ্কর হুঙ্কারে—চৌচির হয়ে গেল নিচু জায়গাটা। মাটিতে ঠিকরে পড়েই উঠে দাঁড়িয়ে চোঁ-চোঁ দৌড়েছিল ডাইয়োনিসিয়ো। ছুটতে ছুটতে ঘাড় ফিরিয়ে ছানাবড়া-চোখ মেলে দেখেছিল, ফাটলের মুখে পাথরের টুকরোর এক অকল্পনীয় ফোয়ারা তৈরি হয়ে গেছে—বিপুল বেগে সটাসট পাথর ছিটকে যাচ্ছে আকাশের দিকে।
প্রশ্ন : গল্প বলছ নাকি?
মা : সত্যি ঘটনা গল্পকেও হার মানায়। তিন মাইল দূরে সানজুয়ানে গিয়ে পুরুতঠাকুরের পায়ে আছড়ে পড়েছিল ডাইয়োনিসিয়ো দলবল নিয়ে ফিরে এসে দেখেছিল অবিশ্বাস্য সেই দৃশ্য। নিচু জমিটায় একটা পাহাড় তৈরি হয়ে গেছে—পাথর আর ছাই দিয়ে তৈরি কালো পাহাড়। চুড়োর ফুটো দিয়ে বিরামহীনভাবে ঠিকরে বেরোচ্ছে পাথর, গল গল করে বেরোচ্ছে কালো ধোঁয়া। বালি আর পাথরের পরেই অবিরাম ধারায় বেরোতে থাকে লাভা। এই জিনিসগুলোই জমতে জমতে ফ্যানটাসটিক স্পিডে জন্ম নিল নতুন এক আগ্নেয়গিরি। কাছের গ্রামের নাম অনুসারে তার নাম দেওয়া হল পারিকুটিন। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই উচ্চতা দাঁড়ালো ভিসুভিয়াসের তিন ভাগের এক ভাগের বেশি। ভিসুভিয়াস এই উচ্চতায় পৌঁছোতে সময় নিয়েছে কিন্তু অনেক হাজার বছর। পৃথিবীর বৈজ্ঞানিকদের হাতে-কলমে অনেক শিখিয়ে গেছে এই পারিকুটিন—এখন সে ঘুমোচ্ছে—চুড়োটা শুধু উঁচু হয়ে রয়েছে শঙ্কু বা মোচার মত।
প্রশ্ন : ধুলোও তো বেরোয় আগ্নেয়গিরি থেকে?
মা : প্রচুর বেরোয়। ১৮১৫ সালে তাম্বোরা-র অগ্ন্যুৎপাতের ধুলো গিয়ে পড়েছিল ৮৭০ মাইল দূরে বোর্নিও দ্বীপে। ১৮৮৩ সালে ক্রাকাতোয়া-র অগ্ন্যুৎপাতের বেলায় ১৫০ মাইল দূরেও আকাশ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল ধুলোর দাপটে, ধুলোর পাহাড় জমে গিয়েছিল হাজার মাইল দূরে। ধুলো যেমন আগ্নেয়গিরির ধারেকাছে গা-ছমছমে আঁধার সৃষ্টি করে, ঠিক তেমনি আশ্চর্য আতশবাজির খেলাও দেখায়। ধুলো ভেদ করে জ্বালামুখের ভেতর থেকে ছিটকে আসে আলোর ঝলক আর গলিত লাভার দ্যুতি। তারপরেও আকাশ জুড়ে শুরু হয় ধুলোর মেঘে অপরূপ আলোর নাচন। অনেক উঁচুতে উঠে গিয়ে ভূগোলক প্রদক্ষিণ করার সময়ে আগ্নেয়ধুলোয় সূর্যের বিভিন্ন রঙের প্রতিফলন আর প্রতিসরণ ঘটতে থাকে, চোখ ঝলসানো জমকালো সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত আবির্ভূত হতে থাকে গোটা পৃথিবী জুড়ে। আগ্নেয়ধুলোর মহিমায় তখন স্তম্ভিত হয়ে যায় পৃথিবীর মানুষ।
প্রশ্ন : বাষ্প জমে গিয়ে যে-জল বানায়, তার কীর্তি কী?
মা : শুধু অপকর্মই করে বেড়ায়। আগ্নেয়ধুলোকে কাদা বানিয়ে হুড় হুড় করে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে এসে সবকিছু ডুবিয়ে দেয়। যেমন ডুবিয়েছিল হারকুলেনিয়াম-কে কোটোপাক্সি-ও দেখিয়েছে ওই একই কীর্তি—জঙ্গলের পর জঙ্গল ঢেকে গিয়েছিল কাদায়। ভলক্যানোরা এই কারণেই ভয়ঙ্কর। অথচ চোখ জুড়িয়ে যায় সাবমেরিন ভলক্যানোদের কাণ্ড দেখলে।
প্রশ্ন : সাবমেরিন ভলক্যানো! সেটা কী?
মা : পৃথিবীর সবচেয়ে চোখ ধাঁধানো আগ্নেয়গিরি তো এরাই। সমুদ্রের তলায় এরা জন্মায়। যেমন জন্মেছে এটনা, স্ট্রম্বলি, পীক অভ টেনেরিফ এবং আরও অনেকে। মহাসমুদ্রের তলায় ঘাপটি মেরে রয়েছে আরও নওজোয়ান আর নবজাতক, মহাজাতক আর মহাদামাল আগ্নেয়গিরি—কেউ জানে না সংখ্যায় তারা কত। মাঝেমধ্যে অঙ্গার আর বাষ্প উগড়ে দিয়ে তোলপাড় করে তোলে সমুদ্রের ওপরকার জল—তলদেশে কিন্তু লাভার উদগীরণ চলে সমানে। কখনো সখনো এই লাভাই স্তরে স্তরে জমতে-জমতে জন্ম দেয় নতুন দ্বীপের। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের আগ্নেয়মেখলা তৈরি হয়েছে ঠিক এইভাবে। বড় বিশ্বাসঘাতক হয় কিন্তু এই সাবমেরিন আগ্নেয়গিরিরা।
প্রশ্ন : বিশ্বাসঘাতক আগ্নেয়গিরি? কীভাবে, মা?
মা : নতুন দ্বীপের জন্ম যেমন দেয়, তেমনি আচমকা কোলেও টেনে নিতে পারে পুরনো দ্বীপকে। গড়ছে আর ভাঙছে। একাধারে ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর।
প্রশ্ন : দ্বীপ ভাঙা-গড়ার খেলা কেউ দেখেছে?
মা : ভূমধ্যসাগরে ঘুরঘুর করলে তুই নিজেও দেখতে পাবি। সাবমেরিন আগ্নেয়গিরিদের মস্ত ঘাঁটি ওইখানেই। ১৮৩১ সালে সেখানেই জন্ম নিয়েছিল গ্ৰেহাম দ্বীপ, জল ছেড়ে উঠেছিল ২০০ ফুট উঁচুতে। কিন্তু আলগা পাথরে তৈরি বলে ঢেউয়ের ধাক্কাতেই চোর’পাহাড় হয়ে গেল মাস কয়েকের মধ্যেই। সিসিলি আর গ্রীস দেশের মধ্যে আকছার জন্মাচ্ছে আগ্নেয়দ্বীপ, অদৃশ্যও হয়ে যাচ্ছে ঝটপট।
প্রশ্ন : আগ্নেয়দ্বীপরা বুঝি স্থায়ী হয় না?
মা : হয় বৈকি। বেরিং সাগরের তিনটে দ্বীপ তার চাক্ষুষ প্রমাণ।
প্রশ্ন : লাভার কাজ কি শুধু জমে গিয়ে পাহাড় তৈরি করা?
মা : সব সময়ে নয়। কখনও কখনও অনেক জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে—আগ্নেয়শঙ্কু বানায় না। এ-ধরনের লাভা উদগীরণকে বলা হয় ফাটল অগ্ন্যুৎপাত; অথবা, মালভূমি প্রবাহ—কেন না, চ্যাটালো জমি বা মালভূমিকে ঢেকে দেয় এই লাভা। এ লাভা খুব থলথলে আঠার মত হয় না।
প্রশ্ন : কোথায় কোথায় হয়েছে ফাটল অগ্ন্যুৎপাত?
মা : হয়েছে এই ভারতেই। পশ্চিম ভারতের দক্ষিণাপথ অঞ্চলের দু-লক্ষ বর্গ মাইল জায়গা ঢেকে রয়েছে লাভায়। এখন তা ব্যাসাল্ট পাথর হয়ে গেছে। জায়গায় জায়গায় এই লাভা-পাথর দু-হাজার ফুট পুরু। লাভা-মরুভূমিও দেখতে পাওয়া যায় এই পৃথিবীর ওডাহারাউন অঞ্চলে। আগ্নেয়পাথরের আশ্চর্য মরুভূমি।
প্রশ্ন : সর্বনাশ! ভারতেও আগ্নেয়গিরি আছে?
মা : আঁতকে উঠলি দেখছি। বিচিত্র সুন্দর এই আগুন-পাহাড় একটিও নেই ভারতে।
প্রশ্ন : হিমালয় যদি আগ্নেয়গিরি হয়ে যায়?
মা : কোনও কালে হবে না। হিমালয়ের জন্ম পৃথিবীর প্রথম দিকে যখন ভূত্বকে লণ্ডভণ্ড কাণ্ড চলছে—তখন। দুপাশের ঠেলা খেয়ে উঠেছিল হিমালয়। তার জন্মরহস্য আর আগ্নেয়গিরির জন্মরহস্য তো এক নয়।
প্রশ্ন : কোন রহস্যময় শক্তি এত জিনিসকে পাতাল থেকে মর্ত্যে তুলে দিচ্ছে, তা কি জানা গেছে?
মা : আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত অথবা ফাটল অগ্ন্যুৎপাত ঘটে পৃথিবীর জঠরের উত্তাপের জন্যে। এই উত্তাপের সঠিক উৎস কী, এখনও জানা যায়নি। রহস্যটা এইখানেই। একদল ভূতত্ত্ববিদের মতে, সৃষ্টির প্রথমপর্বে গোটা পৃথিবীটাই ছিল গলিত আর তরল অবস্থায়। তারই কিছু এখনও রয়ে গেছে পেটের মধ্যে—এত গরম আর এত আগুন বমি সেই কারণেই—পেট গরম থাকলে যা হয় আর কি।
প্রশ্ন : এত বছরেও পৃথিবীর পেট ঠাণ্ডা হয়নি?
মা : প্রথম দলের বৈজ্ঞানিকরা বলছেন, তাপ পরিবহণে পাথর তেমন দুরস্ত নয় বলেই গরমকে আটকে রেখেছে ভেতরে। দ্বিতীয় দলের বৈজ্ঞানিকরা বলছেন, ইউরেনিয়াম আর থোরিয়ামের মত তেজস্ক্রিয় পদার্থরা ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে বলেই এত উত্তাপ তৈরি হয়ে চলেছে। সব পাথরেই আছে এই দুটো জিনিস—সাধারণত খুব কম মাত্রায়। কারণ যাই হোক, কিন্তু এত ম্যাগমা সৃষ্টি তো কম কথা নয়।
প্রশ্ন : ম্যাগমা! মানে?
মা : গলিত পাথরকে বলে ম্যাগমা। ম্যাগমার বড় অংশ জুড়ে থাকে সিলিকেট সলিউশনের সঙ্গে মেশানো অক্সাইড আর সালফাইড। চাপের চোটে বাষ্প আর অন্যান্য গ্যাসও ঢুকে থাকে সলিউশনের মধ্যে। তরল পাথর অর্থাৎ ম্যাগমা আশপাশের পাথরের চেয়ে হাল্কা হয়—গ্যাস গুলে থাকে বলে আরও হাল্কা। এই কারণেই ম্যাগমা ভেসে ওঠে ওপর দিকে—তলার চাপে ঠিকরে যায় ফুটোফাটা দিয়ে।
প্রশ্ন : ম্যাগমা আর লাভার মধ্যে তফাতটা তাহলে কী?
মা : ম্যাগমা থেকে যখন বেশির ভাগ গ্যাস বেরিয়ে যায়—পৃথিবীর ওপর পৌঁছে তখন সেই ম্যাগমা-ই লাভা হয়ে যায়।
প্রশ্ন : আগ্নেয়গিরিকে পোষ মানিয়ে মানুষের কাজে লাগানো যায় না?
মা : আগ্নেয় অঞ্চলের প্রচণ্ড শক্তিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে। ইটালিতে মাটি ছেঁদা করে স্টীম জেট বের করে টারবাইন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। স্টীম থেকে বোরিক অ্যাসিড, অ্যামোনিয়াম কার্বোনেট আর সোডিয়াম কার্বোনেট টেনে নেওয়া হচ্ছে। এক্সপেরিমেন্ট হয়ে গেছে ইংলণ্ডে। আমেরিকার অ্যাটমিক এ্যানার্জি কমিশন আড়াই মাইল গভীর ফুটো বানিয়েছিল পৃথিবীর গা ফুঁড়ে। ধরণীর উনুনকে কাজে লাগিয়ে, পৃথিবী জোড়া ভলক্যানিক বেল্ট থেকে অবিশ্বাস্য শক্তি উদ্ধার করার স্বপ্ন খুব বেশি দিন নিছক স্বপ্ন আর থাকবে না।
প্রশ্ন : আগ্নেয়গিরিকে তাহলে কী বলব? দোস্ত না দুশমন?
মা : উপকারের খতিয়ান করলে তুই নিজেই বুঝবি। আগ্নেয়গিরির লাভা বানিয়ে দিয়েছে অনেক দেশ আর অনেক দ্বীপ। লাভার মঞ্চ তৈরি না হলে প্রবাল পোকারা তাদের পাঁজর জমিয়ে দ্বীপ তৈরি করতে পারত না। আগ্নেয় ছাইতে প্রচুর পটাশ থাকে। জমির সার হিসেবে পটাশের তুলনা নেই। জীবন্ত আগ্নেয়গিরির আশপাশের অঞ্চল এই জন্যেই চির-উর্বর—চাষীদের কাছে লোভনীয়। যেমন, জাভা। ম্যাগমার সঙ্গে পৃথিবীর ভেতর থেকে অনেক দামি ধাতু আর খনিজ উঠে এসে মানুষের কাজে লাগছে। কিছু ধাতু ওপর পর্যন্ত উঠতে না পারলেও ম্যাগমা থেকে আলাদা হয়ে যায়। রাজস্থানে সীসে আর দস্তার খনি আছে। মাইশোরে সোনার খনি। তার মানে অতীতে অগ্ন্যুৎপাত ঘটেছিল এসব জায়গায়। সবচেয়ে দামি জিনিসটা বানিয়ে উপহার দেয় আগ্নেয়গিরিরাই। নাম তার হিরে। কয়লাকে প্রচণ্ড চাপ আর তাপ দিয়ে হিরে বানিয়ে রেখে দেয় পুরনো সুড়ঙ্গের মধ্যে। অবিসিডিয়ান অর্থাৎ বাহারি আগ্নেয় কাঁচের জন্যে হাওয়াই বিখ্যাত। এ ছাড়াও রয়েছে ঝামাপাথর অর্থাৎ পিউমিস শিলা—এত হাল্কা যে জলে ভাসে—যা গুঁড়িয়ে মাজনে ব্যবহার করা হয়। আগ্নেয়পাথর দিয়ে রাস্তাঘাট বাড়িও তৈরি হচ্ছে। সিমেন্ট তৈরি হচ্ছে ব্যাসাল্ট গুঁড়োয়। এবার তুই-ই বল, আগ্নেয়গিরি তোর দোস্ত না দুশমন।
প্রশ্ন : অগ্ন্যুৎপাত কি হুঁশিয়ারি ছাড়াই দামালি শুরু করে?
মা : আগে থেকে সাবধান হতে চাস তো? যদি মাটি কাঁপে, পাতালে বাজ পড়ার মত গুড়্ গুড়্ আওয়াজ শোনা যায়, সেই সঙ্গে যদি গ্যাস আর গলিত পাথর বেরোতে থাকে, অথবা যদি আগ্নেয়গিরির ধারেকাছে আচমকা গরম জলের ফোয়ারা জেগে ওঠে, অথবা হু-উ-উ-স করে কাছাকাছি লেক-এর জল কমে যায় বা ঠেলে ওঠে, অথবা সাঁ করে লেক-এর সমস্ত জল যদি তলা দিয়ে বেরিয়ে যায়—তাহলেই জানবি অগ্ন্যুৎপাত আসন্ন। এরপরেও যদি সাধ থাকে, দেখতে পাবি প্রকৃতির আশ্চর্য সুন্দর তুবড়ির খেলা, টের পাবি সর্বনাশা আগ্নেয় ঝড়, আরও অনেক কিছু।
প্রশ্ন : দরকার নেই টের পাওয়ার। শুধু বলো কলকাতার মাটি কি কাঁপবে?
মা : মাঝে মাঝেই তো কাঁপে। মোলায়েম কাঁপুনি। তবে হ্যাঁ, কলকাতা কেঁপেছিল বটে ১৭৩৭ সালে। তিন লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিল। এই শহরেই। বিশ্বের জঘন্যতম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের লিস্টে তাই রয়েছে কলকাতার নাম।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন