পাতালের জল

অদ্রীশ বর্ধন

প্রশ্ন : পাতালের জল টেনে তুললে ওপরের মাটি পাতালে চলে যেতে পারে?

মা : সুন্দর বলেছিস। ঠিক এইরকম বিপর্যয়ই ঘটেছে আর ঘটে চলেছে দেশে দেশে মধ্য ক্যালিফোর্নিয়ায় সানজোয়াকুইন উপত্যকায় বৃষ্টি কম পড়ে। অথচ চাষআবাদ চোখে পড়ার মত। চাষের জল টেনে তোলা হয় উপত্যকার তলায় প্রায় ২০০০ ফুট পুরু বালি আর কাদার বিছানা থেকে। ফলে, ২৮ ফুট পর্যন্ত মাটি বসে গেছে কয়েক বর্গমাইল এলাকায়। পাতাল-জল লুঠ করার ফলেই এই কাণ্ড ঘটছে দেখে পাহাড় থেকে জল এনে পাতালে ঢুকিয়ে দিয়ে পাতাল-দেবতার রোষ কিছুটা বন্ধ করা গেছে; অথাৎ মাটি এখন ধাঁধাঁ করে বসে যাচ্ছে না। টোকিও শহরতলীতে কিন্তু পাঁচিল গেঁথে সমুদ্রের জল ঢোকা বন্ধ করে দিয়ে রুখে দেওয়া হয়েছে মাটি বসে যাওয়া।

প্রশ্ন : পাঁচিল তুলে সমুদ্র আটকানো! কি বলছ মা?

মা : টোকিও শহরটা একসময়ে বছরে আধফুট হিসেবে পাতাল প্রবেশ করেছে। অনেক পেল্লায় বাড়ির ভিত পাতাল-পাথরে রাখা হয়েছিল বলেই বালিমাটির ওপর ভিত গাঁথা পাশের বাড়িঘরদোর পাতাল-প্রবেশ করায় পেল্লায় বাড়িগুলোকে মনে হয়েছে যেন মাটি ছেড়ে আকাশে ঠেলে উঠছে। ১৯৬১ সালে শহরতলীর ১৫ বর্গমাইল এলাকা সমুদ্র-পৃষ্ঠের নিচে নেমে গেছিল—বিরাট উঁচু টানা লম্বা সমুদ্র-প্রাচীর গেঁথে সমুদ্রের জল আটকানো হয়েছে। একই ঘটনা ঘটেছে সাংহাই শহরেও।

প্রশ্ন : সাংহাই-এরও পাতাল-প্রবেশ?

মা : বিশেষ করে যে-সব শহর সমুদ্র-পৃষ্ঠের খুব কাছে থাকে, তাদের মাটি ফটাফট বসে গেলে অবস্থা সঙীন হয়ে দাঁড়ায়। হাজার ফুট পুরু পাতাল-তলানি থেকে এন্তার জল টেনে তোলা হয়েছিল চিনের সাংহাই শহরে। ১৯২১ থেকে ১৯৭৩-এর মধ্যে বন্দর অঞ্চলে মাটি বসে গেল আট ফুট—সমুদ্রের জল যখন-তখন তাথৈ তাথৈ নাচ জুড়ে গেল গোটা বন্দরে—তখন টনক নড়ল তাদের। মাটির তলায় জল ঢুকিয়ে জলের মাথা সমান রাখতে হয়েছে। লণ্ডন শহরের তলায় আছে খড়িমাটির বিছানা। এই বিছানা থেকেও জল টেনে নেওয়ায় কমপ্যাকশন ঘটেছে—তবে লণ্ডনের কপাল ভালো—এক ফুটের বেশি বসেনি। এই ভাবেই তলিয়ে যাচ্ছে জর্জিয়ার সাভান্না অঞ্চল। টেক্সাসের গ্যালভেসটন অঞ্চলে ৫ ফুটেরও বেশি মাটি বসেছিল ১৯৪৩ সাল থেকে ১৯৬৪-র মধ্যে। এখনও বসছে বছরে ৩ ইঞ্চি হারে। এখানে শুধু জল নয়—পাতাল থেকে তেল টেনেও বের করা হয়েছিল। জাপানের নীগাতা শহরের পাতাল থেকে মিথেন-ঠাসা লবণ-জল টেনে তোলায় মাটি দেবে গেছিল ভয়ানকভাবে। সমুদ্রপৃষ্ঠেরও নিচে। জলের পরেই তেল টেনে তোলা কিন্তু মাটি বসে যাওয়ার একটা বড় কারণ—লস এঞ্জেলস-এর দৃষ্টান্ত ভোলবার নয়।

প্রশ্ন : লস এঞ্জেলস কি এখন জলের তলায়?

মা : লাফিয়ে উঠলি যে! লস এঞ্জেলস-এর দক্ষিণ প্রান্ত রয়েছে লঙ বীচ-এর বন্দর এলাকা। তার ঠিক নিচেই রয়েছে উইলমিঙটন তেলের খনি। ৬০০০ ফুট পাতাল-তলানি থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি তেল আর জল তোলা হয়েছে বছরের পর বছর ধরে। ফলে ৬ মাইল জায়গার জমি বসে গেছে। ডিম্বাকৃতি এই অঞ্চলটার ঠিক মাঝখানে জমি বসেছে ২৯ ফুট, ১৯২৮ থেকে ১৯৭১-এর মধ্যে। ডিম্বাকৃতি খোঁদলের পাশাপাশি জায়গা বসেছে ৯ ফুট। শহরের ক্ষতি অবর্ণনীয়—সবচেয়ে মার খেয়েছে নৌ-বন্দর—যার বেশির ভাগই এখন সমুদ্র-পৃষ্ঠের নিচে—ঘিরে রাখা উঁচু কংক্রিট পাঁচিল দিয়েও কাজ হচ্ছে না—সেই পাঁচিল ক্রমাগত উঁচু করে যেতে হচ্ছে সমুদ্রের জল ঠেকিয়ে রাখার জন্যে। ১৯৫৭ সালে মার্কিন দপ্তর তেল ভোলা বন্ধ করে দিয়ে দু-শ কুয়োর মধ্যে দিয়ে জল ঢালার ব্যবস্থা করেছিল। ফলে, লঙ বীচ-এর সমস্যা কিছুটা মিটেছে। কিন্তু ওয়াটার ইঞ্জেকশন দিয়ে ভেনিস আর মেক্সিকো শহরকে বাঁচিয়ে রাখা যাচ্ছে না।

প্রশ্ন : ভেনিস আর মেক্সিকো শহরে ওয়াটার ইঞ্জেকশন?

মা : পৃথিবীবিখ্যাত ভেনিস শহর তিল তিল করে সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে চলে যাচ্ছে অনেক বছর ধরে। এ শহর গড়ে উঠেছিল ১৩০০ বছরেরও আগে ৩৫ মাইল লম্বা আর ৬ মাইল চওড়া একটা বিশাল লেগুন-এর প্রায় মাঝখানে। লেগুন মানে উপহ্রদ। আংটির মত প্রবাল দ্বীপ দিয়ে ঘেরা হ্রদ—যার মধ্যে সমুদ্রের জল বয়ে যায়। ভেনিসের লেগুনেও জল আসে অ্যাডিয়াট্রিক সাগর থেকে তিনটে খালের মধ্যে দিয়ে—শহর আর সাগরের মাঝের সারি সারি বালির চড়াগুলোকে সমুদ্র-প্রাচীর গেঁথে মজবুত করা হয়েছিল অষ্টাদশ শতাব্দীতে। ভেনিস তলিয়ে যাচ্ছে অনেকদিন ধরেই। ১৯০২ সালে সেন্ট মার্কস গির্জের ঘন্টাঘর আচমকা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়েছিল।

প্রশ্ন : কলকাতায় যেভাবে বহুতল বাড়ি ভেঙে পড়ছে?

মা : বাগড়া দিসনি। ভেনিসের বাড়িগুলোর ভিত মজবুত না থাকায় পুরো অঞ্চল শুওরের গোঁ নিয়ে তলিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে। শহরের প্রায় ৭০ শতাংশ সমুদ্র-পৃষ্ঠের চার ফুটের ওপরে নেই। বন্যার জল নিয়ম করে টপকে যাচ্ছে এই উচ্চতা—ঢুকছে শহরে। ওই অঞ্চলে এই ধরনের বানের জলকে বলা হয় acqua alta; গত শতাব্দীর শেষে দেখা দিত পাঁচ বছরে একবার, ১৯৩০ সালে বছরে একবার, ১৯৬০ সালে বছরে তিনবার, ১৯৬৬ সালে ঘটিয়ে দিল রীতিমত প্রলয়। সেন্ট মার্কস স্কোয়ারের জলে ডুবে থাকা এখন তো দৈনিক কাগজের মুখরোচক খবর হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশ্চর্য এই শহর যে পাতালে চলে যাচ্ছে তিল তিল করে—ঘন ঘন বন্যার প্রবেশই তার মোক্ষম প্রমাণ।

প্রশ্ন : ভেনিসের বাড়িগুলোর ভিত মজবুত নয় বললে কেন, মা?

মা : কাঠ দিয়ে তৈরি বলে। উপহ্রদের জল যেখানে খুব গভীর নয়, সেই-সেই জায়গায় কাঠের গাদা মাটিতে ঢুকিয়ে তার ওপর তৈরি হয়েছে বাড়ি। উপহদের তলায় রয়েছে কিন্তু চতুর্থ ভূতাত্ত্বিক যুগের ২৬৫০ ফুট পুরু না-জমাট বস্তু, তারও তলায় রয়েছে প্লায়োসিন যুগের, অথাৎ মধ্যাধুনিক যুগের ঠিক পরের তৃতীয় যুগের, আরও না-জমাট বস্তু। প্রথম স্তরে রয়েছে ৫০ শতাংশ বালি, ৩৫ শতাংশ পাঁক, ১৫ শতাংশ কাদামাটি। সমুদ্রের পাশে ব-দ্বীপ জাতীয় অঞ্চলে এ-ভাবে বাড়ি গড়লে তা তলাবেই। ভেনিসও তলাচ্ছে। এ ছাড়াও আছে আর একটা কারণ।

প্রশ্ন : নিশ্চয় জল টেনে বের করা হচ্ছে ভেনিসের তলা থেকে?

মা : ঠিক ধরেছিস। একে তো প্রাকৃতিক কারণে মাটি বসে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্যার জল নেচে নেচে যাচ্ছে, গোদের ওপর বিষফোড়ার মত জল তোলা হয়েই চলেছে পাতাল থেকে।

প্রশ্ন : প্রাগৈতিহাসিক যুগে ভেনিসের মাটি বুঝি ডুবতো না?

মা : তখনও ডুবেছে প্রায় বিশ ফুটের মত। রোমানদের সময়ে ডুবেছে আরও ৬ থেকে ১০ ফুটের মত। কিন্তু আধুনিককালে প্রায় ৭০০০ ফুট কুয়ো থেকে জল তোলার ফলে উপহ্রদের শহর বসে যাচ্ছে হু-হু করে। এর সঙ্গে মণি-কাঞ্চন যোগ ঘটিয়েছে সমুদ্রের নিজেরই মাথা উচু করা। এ দুর্বিপাক ঘটছে গোটা পৃথিবী জুড়ে—টেম্পারেচার বাড়ছে, মেরু-বরফ গলছে, সমুদ্রের জল বাড়ছে—বছরে ০·০৬ ইঞ্চি হারে বেড়েই চলেছে।

প্রশ্ন : ভেনিসকে বাঁচানোর জন্যে ওয়াটার-ইঞ্জেকশন করেও লাভ হয়নি বলছো?

মা : পাতাল-প্রবেশ একটু কমেছে—বন্ধ হয়নি। দুটো কাজ করলে ভেনিসকে বাঁচানো যায়। এক, সাগর আর ভেনিসের মাঝে খালগুলোয় পর-পর বাঁধ তৈরি। এতে অবশ্য শহরের জঞ্জাল ফেলবার জন্যে অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। দুই, গোটা শহরটাকে হ্যাঁচকা মেরে একটু ওপরে তুলে দেওয়া। চারশ ফুট গভীর আর আট মাইল লম্বা পাঁচিল দিয়ে গোটা ভেনিসকে ঘিরে ধরে ওয়াটার ইঞ্জেকশন করলেই নিচের বন্দী জলের ঠেলায় শহর চড়-চড় করে উঠে আসবে। এতেও যদি কাজ না হয়, বিখ্যাত লেগুন একসময়ে গিলে নেবেই বিখ্যাত ভেনিসকে।

প্রশ্ন : মেক্সিকোর কপাল পুড়ছে কিভাবে মা?

মা : মেক্সিকো শহরটা গড়ে উঠেছে নজর কাড়ার মত জায়গায়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭৪০০ ফুট ওপরে থেকেও পুরো তল্লাটটা থালার মত চ্যাটালো—থালার কিনারা থেকে মেঘলোকের দিকে ধেয়ে গেছে সারি সারি পাহাড়। চ্যাটালো জায়গাটা গোল নয়—লম্বাটে; লম্বায় প্রায় ৫০ মাইল, চওড়ায় ১৫ মাইল। বহু ক্ষুদে নদী ঝিরঝিরিয়ে বয়ে চলেছে তার ওপর দিয়ে। চ্যাটালো প্রান্তরের তলায় রয়েছে পুরু পাতাল-তলানি—কিনারা ঘিরে পাহাড় বরাবর রয়েছে আগ্নেয়পাথর আর সেকেলে চুনাপাথরের তলানি। চ্যাটালো অঞ্চলের পাতাল-তলানির নরম কাদামাটির মধ্যে আছে montmorillonite নামে একটা কাদা-খনিজ, যাকে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের তলায় রেখে হাজার হাজার গুণ ম্যাগনিফাই করে দেখা গেছে ভেতরে রয়েছে বিস্তর ফাঁপা নল; জল ধরে রাখার পক্ষে যাদের তুলনা নেই।

প্রশ্ন : মেক্সিকোর নিচে ফাঁপা নল বোঝাই মাটি? তাহলে সেখানে শহর তৈরি হল কেন মা?

মা : যখন তৈরি হয়েছিল, তখন মাটি নিয়ে এত গবেষণা কেউ করত না। মেক্সিকোর ঠিক নিচের পাতাল-তলানির শতকরা ৮৮ ভাগ জল ধরে রেখেছে ফাঁপা নলের মধ্যে—শতকরা ১২ রয়েছে নিরেট বস্তু। এরকম জায়গায় কোনো বড় শহর গড়ে উঠলে ধরণী তাকে কোলে টেনে নেবেই। মেক্সিকোর কপালে ঘটেছে একই দুর্দশা।

প্রশ্ন : কবে থেকে মা ধরণী কোলে টানছেন মেক্সিকোকে?

মা : প্রথম তা নজরে পড়ে উনিশ শতকের শেষের দিকে। ১৭০ ফুট নিচের বালির স্তর থেকে পাম্পে করে তখন দেদার জল তোলা হচ্ছিল। ১৯৫৯ সাল নাগাদ শহরের বেশির ভাগই চলে গেল ১০ ফুটেরও বেশি নিচে। সবচেয়ে বেশি দাবানি ২৫ ফুট পর্যন্ত। অর্থাৎ প্রায় আড়াইতলা বাড়ির ছাদ মাটির লেভেলে এসে ঠেকল পুরো বাড়ির পাতাল-প্রবেশ ঘটায়। শহর তখন ছড়িয়ে পড়েছে, পাতাল থেকেও জল পাম্প করে তোলা হচ্ছে। ১৮৯৮ থেকে ১৯৩৮-এর মধ্যে মাটি বসেছে বছরে ১·৬ ইঞ্চি হারে, ১৯৪৮-৫২’তে বছরে এক ফুট হারে। ১৯৪৮য়েই সিদ্ধান্ত হয়েছিল ওয়াটার ইঞ্জেকশন না দিলে মেক্সিকোর পাতাল-প্রবেশ রোগ সারানো যাবে না—তা সত্ত্বেও বহু বছর ধরে ৩০০০-এরও বেশি কুয়ো এন্তার জল সাপ্লাই করেছে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়া শহরকে আর ক্ষইয়ে দিয়েছে শহরের মূল ভিতকে। মাটি যে বসছে নলকূপ থেকে জল তোলার ফলে, তা তো চোখের সামনেই দেখা গেছে। নলকূপের ইস্পাতের নল মাটি থেকে উঠে রয়েছে ১৮ ফুট ওপরে—সেখানকার মাটি বসেছে ২০ ফুট নিচে। কমপ্যাকশন যে চলছে পাতাল-তলানির মধ্যে—এর চেয়ে লক্ষণীয় প্রমাণ আর হয় না।

প্রশ্ন : নলকূপ না হয় মাথা খাড়া করে রইল, ভারি বাড়িগুলোর কি হল মা?

মা : মেক্সিকোর ঠিক মাঝখানে আছে অপূর্ব সুন্দর প্যালেস অফ ফাইন আর্টস। প্রাসাদ তৈরি শুরু হয়েছিল ১৯০৪ সালে—১৯৩৪-এর আগে শেষ হয়নি। প্রাসাদের ভিত রাখা হয়েছিল মাত্র দশ ফুট পুরু কংক্রিটের বিছানায়। এই দশ ফুটের মাথা ছিল জমি বরাবর—একই লেভেলে। প্রাসাদ তৈরি শুরু হওয়ার আগেই দেবে গেছিল কংক্রিট শয্যার মাঝের দিকটা। বাড়ি তৈরি শুরু হতেই দেবে গেল আরও খানিকটা। মানে, ঢুকে গেল মাটির মধ্যে। ১৯০৮ সালে কিছুটা তৈরি প্রাসাদ মাটিতে ঢুকে গেল পাঁচ ফুট পর্যন্ত, দু’বছর পরে চিড় খেল কংক্রিটের দশ ফুট পুরু শয্যা। ১৯১০ সালে সত্তর হাজার থলি ভর্তি সিমেন্ট ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়েছিল কংক্রিটের নিচের তলানিতে।

প্রশ্ন : সিমেন্টের ইঞ্জেকশন?

মা : সিমেন্টের মশলাও বলতে পারিস। কিন্তু মিহি কাদামাটি নিজের মধ্যে দিয়ে ছড়িয়ে পড়তে দেয়নি এই মশলাকে—জায়গায় জায়গায় চাপ চাপ ডেলা ডেলা হয়ে আরও ওজন চাপিয়েছে নরম কাদামাটির ওপর—ফলে মাটি আরও বসেছে। পাঁচ বছর পরে ইস্পাতের চাদরের পাঁচিল মাটিতে ঢুকিয়ে ঘিরে দেওয়া হল প্রাসাদকে—যাতে প্রাসাদের চাপে তলাকার মাটি বাস্তুহারা হয়ে বাইরে বেরিয়ে যেতে না পারে।

প্রশ্ন : ইস্পাতের সঙ্গে কাদামাটির লড়াই?

মা : সে লড়াইতে আবার জিতে গেল কাদামাটিই। কেন না, চাপের চোটে কমপ্যাকশন ঘটিয়ে মাটি তখন আয়তনে গুটিয়ে যাচ্ছে। কি আর করা যায়। মেহনত যখন জলেই গেল, প্রাসাদ তৈরিতেও ক্ষ্যামা দেওয়া হল না। তৈরি হয়ে যাওয়ার পর দেখা গেল, প্রাসাদ আরও ঢুকে গেছে মাটির মধ্যে। এখন তা রয়েছে পাশের রাস্তার দশ ফুট নিচে। সিঁড়ি বেয়ে নেমে ঢুকতে হয় প্রাসাদের নিচের তলায়—দোতলায় যাওয়া বরং অনেক সহজ। প্রাসাদ-তোরণ মূল বাড়ি থেকে ভেঙে বেরিয়ে এসেছে, চারপাশের রাস্তাও ফেটেফুটে হেলে পড়েছে পেল্লায় প্রাসাদের দিকে।

প্রশ্ন : তাহলে কি মেক্সিকোয় কলকাতার মত বহুতল বাড়ি নেই?

মা : কেন থাকবে না? প্যালেস অফ ফাইন আর্টস-এর একটা বাড়ি পরেই ১৯৫১ সালে গড়ে উঠেছে ৪৩ তলা টাওয়ার ল্যাটিনো আমেরিকানা’। এ-বাড়ির সদর দরজা রয়েছে রাস্তার ওপরেই—মাটিতে ঢুকে যায়নি।

প্রশ্ন : নিশ্চয় নলকূপ থেকে আর জল তোলা হয় না মেক্সিকোয়?

মা : ১৯৫২ সাল থেকে বাইরে থেকে জল আমদানি শুরু হয় মেক্সিকোয়—পাতাল জল পাম্প করে তোলা বন্ধ হয়—তার পরের বছর পাম্প করে পাতালে জল ঢোকানো শুরু হয়। ১৯৭৪ সালে দেখা গেল, বছরে এক ইঞ্চির বেশি মেক্সিকো আর তলাচ্ছে না।

প্রশ্ন : কিন্তু ‘টাওয়ার অফ ল্যাটিন আমেরিকানা’ তো তৈরি হয়েছিল তারও আগে। পাতাল-প্রবেশ করল না কেন?

মা : কারণ ৪৩ তলা উঁচু ভারি বাড়ির ভিত গাঁথা হয়েছিল ১১০ ফুট নিচে বালি পাথরের শক্ত জায়গায়। তাকে ঘিরে আছে যে মাটি, তা থেকে জল তোলা হয় না পাম্পে করে—সে মাটিতে কমপ্যাকশনও ঘটেনি। বড় শহরের বড় বাড়িগুলো তৈরি হচ্ছে এই কায়দাতেই—এক কথায় যাকে বলা হয় ‘আণ্ডারপাইনিং’।

প্রশ্ন : কলকাতায়?

মা : যতদূর জানি, কলকাতার প্রথম বহুতল বাড়ি তৈরি হয়েছিল গঙ্গার পাড়ে। ঠিক যেন একটা পাহাড়। সেই পাহাড় তো আজও হেলে পড়েনি গঙ্গার দিকে। কলকাতা তো একটা গামলা বললেই চলে। এখনকার বহুতল বাড়িদের ভেঙে পড়ার কারণটা ভালো ইঞ্জিনিয়াররা ভালোভাবেই জানেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%