অদ্রীশ বর্ধন

প্রশ্ন : ভূমিকম্প হলেই সবাই শাঁখ বাজায় কেন, মা?
মা : সবাই বাজায় না। যাদের ধারণা, এই পৃথিবীটা রয়েছে বাসুকির ফণার ওপর—তারাই বাজায়। বাসুকি মাথা নাড়লেই পৃথিবী না কি নেচে নেচে ওঠে। অর্থাৎ ভূমিকম্প ঘটে। তখন শাঁখ বাজিয়ে বাসুকিকে তোয়াজ করা হয়।
প্রশ্ন : সাহেবদের মধ্যে এসব কুসংস্কার নেই, তাই না, মা?
মা : বিলক্ষণ আছে। গ্রীকদের দেবতা পোসিডন শুধু সমুদ্রের দেবতা নন, তিনি নাকি ভূমিকম্পেরও দেবতা। গোটা পৃথিবীর কাঁপুনি তিনি ম্যানেজ করছেন একা—কেননা ডাঙাগুলো তো রয়েছে সমুদ্রেরই কোলে; অর্থাৎ সমুদ্রের দেবতা বহন করছে পৃথিবীটাকে। আবার এমন কিংবদন্তীও শোনা যায় যে, ককেসাস পাহাড়ের মাথা থেকে জীবনদায়িনী জল চুরি করতে গিয়ে এক ভয়ানক দৈত্য বড্ড দাপাদাপি করে বলেই পৃথিবী এত কাঁপে। গ্রীক দেবতা প্রমিথিয়াস-কে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে তো এই ককেসাস পাহাড়েই।
প্রশ্ন : পাঁজি দেখে বলা যায় না কবে কোথায় কখন ভূমিকম্প হবে?
মা : এ রকম গণনা এক সময়ে জ্যোতিষশাস্ত্রের মধ্যেই ছিল। কিন্তু এখন তা লোপ পেয়েছে বললেই চলে। তাই পাঁজিপুঁথি দেখে আর ভূমিকম্পের ভবিষ্যৎবাণী করা যায় না।
প্রশ্ন : পৃথিবীর কাঁপুনি নিয়েও রহস্য?
মা : এক সময়ে ভূমিকম্প ব্যাপারটাই ছিল রহস্যে ঘেরা। কিন্তু যে-বিজ্ঞান রহস্যের ঘোমটা খুলে দিয়েছে, তার নাম সাইজ্মলজি। এ-নামের মধ্যে আছে দুটো গ্রীক শব্দ; তাদের মানে, ভূমিকম্প বিজ্ঞান। ভূমিকম্প বৈজ্ঞানিকদের বলা হয় সাইজ্মলজিস্ট।
প্রশ্ন : ভূমিকম্পের আসল কারণটা তা হলে কী?
মা : মাটির তলায় পাথর-টাথরগুলো যে-ভাবে সাজানো রয়েছে, আচমকা সেগুলো নড়েচড়ে যায়, কোথাও খসে যায়, কোথাও ছিটকে যায়। প্রচণ্ড চাপ আর টানের ফলে এমনটা ঘটে। পায়ের তলায় মাটি তখন থর থর করে কাঁপবেই। এই ধরনের ভূমিকম্পকে বলা হয় টেক্টনিক।
প্রশ্ন : টেক্টনিক মানে?
মা : গ্রীক শব্দ টেকটন মানে, যে-ব্যক্তি বাড়ি ঘরদোর বানায়; টেক্টনিক ভূমিকম্প মানে, পৃথিবীর বিল্ডিংটাকে তছনছ করে ছাড়ে যে কাঁপুনি।
প্রশ্ন : কেন হয় টেক্টনিক ভূমিকম্প?
মা : নানা মুনির নানা মত শুনে কী করবি? যে তত্ত্বটাকে সবচেয়ে বেশি আমল দেওয়া হয়েছে, সেটা শোন; বিল্ডিং ব্লকের এই ধরনের স্থানচ্যুতি ঘটে আইসোসট্যাসির জন্যে। আইসোসট্যাসি মানে, পৃথিবীর ওপর দিকের স্তরে পাশাপাশি লেগে থাকা অংশগুলোর মধ্যে ব্যালেন্স নষ্ট হয়ে যাওয়া। মাথা চাড়া দেয় ফোর্স অব গ্র্যাভিটি। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর ভারসাম্যহীন বস্তুগুলোকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায় পেটের দিকে। মাটি কাঁপে এই কারণেই।
প্রশ্ন : কিন্তু মা, উঁচু পাহাড়ের পাশেই নিচু সমতলভূমির ভারসাম্য তাহলে থাকছে কী করে?
মা : অর্থাৎ আইসোসট্যাটিক থিওরি এ-ক্ষেত্রে ধোপে টিকছে না, এই তো? বৈজ্ঞানিকরা বলছেন, একই তত্ত্ব এ-ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কেন না, পাহাড়দের যতটা ভারি বলে মনে করা হয়, তারা ততটা ভারি নয়।
প্রশ্ন : পাহাড় ভারি নয়! বলছ কী, মা?
মা : পাহাড়ের পাশে সমতলভূমিতে দাঁড়িয়ে একটা ওলন ঝুলিয়ে দিলেই প্রমাণ পাবি। ওলন পাবি রাজমিস্ত্রীদের কাছে। একটা সুতোর ডগায় ঝোলানো ভারি ধাতু। পাহাড়ের পাশে সমতলভূমিতে ঝোলালে ওলন-টা পুরোপুরি লম্বভাবে থাকবে না—পাহাড়ের ওজন আর আয়তন তাকে একটু নিজের দিকে টেনে রাখবে। কিন্তু যতটা টানা উচিত, ততটা নয়। কারণ, পাহাড়ের ভেতরের আর তার নিচের পাথর নিচু জমির পাথরের মত অত ঘন নয়। সব পাহাড়েই ‘শেকড়’ ছড়িয়ে থাকে মাটির মধ্যে দিয়ে। সমুদ্রে ভাসমান হিমবাহর মতন।
প্রশ্ন : বেশ, বেশ, পাথুরে গঠনের ব্যালেন্সটা নষ্ট হচ্ছে কী করে?
মা : পৃথিবীর এই মুখখানার অদলবদল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী নিজেই; এরই নাম ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। পাহাড়ের গা বেয়ে জল নামছে পাহাড়কে ক্ষইয়ে দিয়ে, ঝড়বাতাসেও ঘটছে সেই কাণ্ড, রাবিশ জমছে পাশের চ্যাটালো জমিতে, টন-টন ধুলো এক জায়গা থেকে হাওয়ায় উড়ে গিয়ে জমা হচ্ছে আর এক জায়গায়। এ সবের ফলে ব্যালেন্স নষ্ট তো হবেই।
প্রশ্ন : মাধ্যাকর্ষণ তখন কী অপকর্মটা করছে?
মা : অপকর্ম বলছিস কেন? মাধ্যাকর্ষণ তো চাইছে আগেকার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে। যেখানকার জিনিস সেখানে ফিরে যাওয়া দরকার। তখন পাথর বয়ে যেতে থাকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়—ছাঁচে ফেলে শীতল ইস্পাতকে চাপ মারলে যা হয়, ঠিক তাই। ফলে, আশপাশের পাথুরে গঠনে চাপ পড়ে আর টানাটানি চলে প্রচণ্ড রকমের; শেষে তাতে ফাটল ধরে।
প্রশ্ন : তবে যে শুনি পৃথিবী তরল থেকে শক্ত হচ্ছে বলেই ছোট হচ্ছে, খোসা ফাটছে, পাহাড় ঠেলে উঠছে, জমি ঢেউ খেলে যাচ্ছে—ভূমিকম্পও হচ্ছে। এ-তত্ত্ব কি ভুল?
মা : অনেকেরই আপত্তি আছে এ-তত্ত্বে। প্রথমত, পৃথিবীর জন্ম যে এইভাবেই হয়েছে, তাতে কোনও নিশ্চয়তা নেই। যদি তাই হত, তাহলে আপেলের খোসা কুঁচকে যাওয়ার মত পৃথিবীর জমিও অসংখ্য জায়গায় গায়ে-গায়ে লেগে কুঁচকে থাকত। কিন্তু তা তো নয়। বড় পর্বতমালাগুলো বেশ দূরে দূরে রয়েছে বিশেষ কয়েকটা বলয়ের মধ্যে। স্থানচ্যুতি তত্ত্ব আরও আছে। যেমন, ভূত্বকের অনেক নিচে পরিচলন প্রবাহ মহাদেশের মত পাথরের চাইগুলোকে শম্বুকগতিতে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বলেই যাত্রাপথে তারা মাটিকে কুঁচকে দিয়ে পাহাড়দের ঠেলে তুলছে—এবং ভূমিকম্প হচ্ছে। আর একটা তত্ত্ব অনুসারে, ভূত্বকের তেজস্ক্রিয় খনিজ পদার্থরা এত বেশি উত্তাপ সৃষ্টি করে চলেছে যে, আশপাশের পাথর প্রসারিত হচ্ছে—ফলে, চাপ মেরে ভূমিকম্প ঘটাচ্ছে।
প্রশ্ন : অগ্ন্যুৎপাত থেকেও তো ভূমিকম্প হয়?
মা : তা তো হয়ই। আগ্নেয়গিরির ভেতরে বিস্ফোরণের ফলে অথবা পাথুরে গঠনে ফাটল ধরে বলেই ভূমিকম্প হয়। তবে হ্যাঁ, আগ্নেয় ভূমিকম্পের দাপট হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায় আগ্নেয়গিরির ধারেকাছে। দূরে-দূরে তা বোঝা যায় না। কিন্তু পাথুরে গঠনের ওপর চাপ জমতে থাকে দীর্ঘ সময় ধরে—তারপর আর সইতে পারে না। বেদম বোঝায় কাতর উটের পিঠে একটি মাত্র ঘাস ফেললে যা হয়—এ ক্ষেত্রেও তাই হয়। চাপ সইতে-সইতে পৃথিবীর পাথুরে গঠন যখন হাঁসফাঁস করতে থাকে, তখন সামান্য কারণেই চৌচির হয়ে যায় পাথর—ঘটে ভূমিকম্প। আচমকা সরে যায় চাপ আর টানে কাতর পাথুরে স্তর—কেঁপে ওঠে গোটা পৃথিবীটা।
প্রশ্ন : গোটা পৃথিবী ঝাঁকুনি খায় কেন?
মা : পুকুরের জলে ঢিল ফেললে ঢেউ ছুটে যায় চারদিকে। কিন্তু পৃথিবীর এক জায়গায় কাঁপুনি শুধু পৃথিবীর ওপর দিক দিয়ে যায় না—সব দিক দিয়েই যায়। যে-জায়গাটা কাঁপুনির উৎস তাকে বলা হয় ফোকাস বা কেন্দ্র। আর খাড়া ওপরে ভূপৃষ্ঠের জায়গাটাকে বলা হয় এপিসেন্টার বা উপকেন্দ্র। তীব্রতম ভূমিকম্প ঘটে শুধু উপকেন্দ্রর জায়গাগুলোতেই। তখন তা মারাত্মক আর প্রলয়ঙ্কর।
প্রশ্ন : জাপানে কি ধরনের ভূমিকম্প হয়, মা?
মা : আগ্নেয়গিরির শক্তির জন্যে।
প্রশ্ন : অন্য সব ছোটখাট ভূমিকম্পের কারণ?
মা : কারণ অনেক। একটা হচ্ছে পাহাড়ি অঞ্চলে বড় রকমের ধস।
প্রশ্ন : কাঁপুনির ঢেউ নিশ্চয় অনেক রকমের হয়?
মা : সবচেয়ে হাইস্পিডের ঢেউটা ছোটে ঘণ্টায় প্রায় পাঁচ মাইল গতিবেগে—মাটির সঙ্গে সমান্তরালভাবে। সবার আগে আসে এই তরঙ্গ। তাই এর নাম primary wave বা P-wave; তারপরেই আসে ঘণ্টায় প্রায় তিন মাইল বেগে secondary wave বা S-wave। P-wave পৃথিবীর বস্তুকণার আয়তন পাল্টে দেয় বলে ভূত্বকে ফাটল ধরে। এই কাঁপুনির ফলে বস্তুকণা পেণ্ডুলামের মতো সামনে পিছনে দুলতে থাকে তরঙ্গ যেদিকে ধেয়ে যেতে চাইছে সেই বরাবর। S-wave বস্তুকণার আকার পাল্টে দেয়—বস্তুকণাকে কাঁপাতে থাকে—ছুটে যায় সবদিকে।
প্রশ্ন : ভূমিকম্প নাকি মাটিকে হাঁ করিয়ে বাড়ি-গ্রাম গিলিয়ে নেয়?
মা : অনেকের বিশ্বাস, এহেন ধারণার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। মাটি কাঁপে ভয়ানক ভাবে ঠিকই, ঠিকরে পড়ে চেয়ার-টেবিল, ছিটকে যায় আসবাব। নড়ে যায় বাড়ির ভিত, চিড় ধরে দেওয়ালে। কাঁপুনি বেজায় রকমের হলে ভিত ছেড়ে বাড়ি সরে যায় অন্য জায়গায়, নয়তো হুড়মুড়িয়ে আছড়ে পড়ে মাটিতে। আরও ভয়ঙ্কর কাঁপুনি মাটি ফাটিয়ে দেয়, ফাটল বরাবর জমি বিশ ফুট পর্যন্ত ছিটকে যেতে পারে; মাটি কোথাও খাড়াভাবে বসে যায়, কোথাও উঠে আসে। মাটিতে হাঁ দেখা দেয় ঠিকই—কিন্তু গোটা বাড়ি বা আস্ত একটা গ্রামকে কোঁৎ করে গিলে ফেলতে পারে—একদল বৈজ্ঞানিক এই বিশ্বাসকে পাত্তা দেন না। অথচ আলাস্কায় এই রকম ঘটনাই ঘটেছিল।
প্রশ্ন : বাড়ি গিলেছিল পৃথিবী?
মা : বাড়ি-গাড়ি সব তলিয়ে গিয়েছিল আলাস্কা-র অ্যাঙ্কোরেজ শহরের রাস্তা দু-ফাঁক হয়ে যাওয়ায়। একশ মাইল দূরের এপিসেন্টার থেকে মাটির কাঁপুনি তেড়ে এসে এই কাণ্ড ঘটিয়েছিল ১৯৬৪-র গুড ফ্রাইডে-র দিনটিতে। আশি হাজার বর্গ মাইল জুড়ে জমি যে উঠছে আর নামছে—তা চোখে দেখা গেছিল।
প্রশ্ন : ভূমিকম্পের আওয়াজে নাকি পিলে চমকে যায়?
মা : মাথার চুল খাড়া করে দেয় বইকি। এই আওয়াজের সবটা অবশ্য পৃথিবীর পেট থেকে আসে না। বাড়ি চৌচিরের শব্দ, ইঁট পাথর আছড়ে পড়ার কানে তালা লাগানো আওয়াজ, আতঙ্ক আর্তনাদ—সব মিলিয়ে সে এক অবর্ণনীয় শব্দ-লহরী। এর সঙ্গে মেশে মাটি ফুটিফাটা হওয়ার আওয়াজ। লোমখাড়া তো হবেই।
প্রশ্ন : ভূমিকম্প শুধু ডাঙায় হয় কেন, মা?
মা : সমুদ্রেও হয় রে—তখন তার নাম সমুদ্রকম্প। ধারেকাছে জাহাজগুলোর আছাড়ি-পাছাড়ি দেখে মনে হয় বুঝি চোরা পাহাড়ে ধাক্কা মেরেছে। বড় বড় ঢেউ ধেয়ে যায় ডাঙার ভূমিকম্পের রেশ নিয়ে। সমুদ্রের তলায় চ্যুতির জন্যে দানবিক তরঙ্গ ভয়ঙ্কর করে তোলে সমুদ্রকে। পুকুরের বা হ্রদের জল চঞ্চল হয় কিন্তু অদ্ভুতভাবে—দোলকের মত দুলতে থাকে সামনে পেছনে।
প্রশ্ন : সমুদ্রের তলায় জমিতেও ভূমিকম্প হয়?
মা : কেন হবে না? তখন তাকে সাবমেরিন ভূমিকম্প বলা হয়। এর ফলে জাগে জলোচ্ছ্বাস—জাপানিরা যার নাম দিয়েছে সুনামি। সুনামি-র আগে একটা ‘ৎ’ আছে, বাঙালি জিভে আসে না বলে উচ্চারণ করতে পারলাম না।
প্রশ্ন : জলোচ্ছ্বাসের নাম সুনামি?
মা : জলোচ্ছ্বাসকে ইংরেজিতে বলা হয় Tidal wave; ভুল নাম। এর পেছনে Tide অর্থাৎ জোয়ার-ভাঁটা নেই—আছে ডুবো ভূমিকম্প। সুনামির স্পিড শুনলে হাঁ হয়ে যাবি। ঘন্টায় ৪৫০ মাইল পর্যন্ত হতে দেখা গেছে। গভীর সমুদ্রে কিন্তু সুনামির অস্তিত্ব টের পাবি না। একটা দানব-তরঙ্গ থেকে আরেকটা দানব-তরঙ্গের ব্যবধান কমসেকম ১০০ মাইল—অথৈ জলে তাই টের পাওয়া যায় না। কিন্তু হাড় হিম করে দেয় তীরের কাছে এসে—বিশেষ করে যদি তীরভূমি হয় বেশ ঢালু। প্রথমেই মনে হবে যেন হঠাৎ ভাটার টান এসেছে—ঝাঁ করে নেমে যাবে জল। তারপরেই ফিরে আসবে পঞ্চাশ থেকে দু-শ ফুট কি তারও বেশি উঁচু ঢেউ সৃষ্টি করে—ডুবিয়ে দেয় গ্রাম, শহর—ডাঙার অনেক ভেতর পর্যন্ত চালিয়ে যায় তাণ্ডব নৃত্য।
প্রশ্ন : ভূমিকম্প মাটি কাঁপাচ্ছে, জল ক্ষেপাচ্ছে, আর কী করছে?
মা : শহরে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। জ্বলন্ত উনুন থেকে আগুন ধরে গেলে নিভোনোর জল পাওয়া যায় না, জলের পাইপ ফেটে যায় বলে। যা হয়েছিল লিসবন শহরে—মারা গিয়েছিল বিশ হাজার মানুষ। তিন দিন ধরে আগুন তাথৈ-তাথৈ নাচ নেচেছিল সানফ্রান্সিসকোয়—ডিনামাইট ফাটিয়ে বাড়ি শুইয়ে দিয়ে ঠেকাতে হয়েছিল আগুয়ান আগুনকে। মেসিনা অন্তরীপের (Strait) দু-পাশের দুটো শহরে এক লাখেরও বেশি লোক মারা গিয়েছিল শুধু বাড়ি চাপা পড়ে। বেজায় অলিগলির শহর তো—ভূমিকম্প তেমন জোরালো হয়নি—কিন্তু পাথরের বাড়ি তাদের ঘাড়ে ভেঙে পড়েছে। মিনিট কয়েকের মধ্যেই একটা পেল্লায় সুনামি তেড়ে এসে দুটো শহরেই উদ্দাম নাচ নেচে গেছে। জাপানেও আগুন লেগে মারা গিয়েছিল এক লাখ মানুষ। মাটিতে মিশে গিয়েছিল পাঁচ লাখ বাড়ি। জলের তোড়ে ক্ষয়ে গোল হয়ে যাওয়া বিশাল-বিশাল পাথরের চাঁইকে বোমার মত ফাটিয়ে দিয়েছে উত্তর আসামের পাহাড়ি ভূমিকম্প ১৯৫০-এর অগাস্টে। এ-দৃশ্য স্বচক্ষে দেখেছেন বৃটিশ প্রকৃতিবিদ কিঙডন-ওয়ার্ড। থর থর কাঁপুনির চোটে আবছা হয়ে গিয়েছিল আশপাশের গাছ-পাথর—জমিতে জেগেছিল লম্বা লম্বা ফাটল। সাহেবের তাঁবুতে কিন্তু উল্টে গিয়েছিল শুধু এক গেলাস জল। একেই বলে সাহেবি কপাল!
প্রশ্ন : এ রকম ভয়ানক ভূমিকম্প ভারতে আর ঘটেনি?
মা : বিখ্যাত ভূমিকম্পের লিস্টে পাঁচবার নাম উঠেছে ভারতের। ১৭৩৭-এ কলকাতায়, ১৮৯৭-এ আসামে, ১৯০৫-এ কাংরায়, ১৯৩৪-এ বিহার আর নেপালে, ১৯৫০-এ তিব্বত, চীন, বর্মায়। আসামে পাহাড় ঠেলে উঠেছিল পাঁচ থেকে বিশ ফুট, ইমারত থেকে জঙ্গল—অক্ষত থাকেনি কিছুই। পঞ্জাবের কাংরায়, হিমালয়ের পায়ের তলায়, পনের লক্ষ বর্গ মাইল জায়গায় মারা গেছিল বিশ হাজার মানুষ। প্রায় বিশ লক্ষ বর্গ মাইল জুড়ে মাটি কেঁপেছিল বিহার আর নেপালে—পর-পর ধস নামায়। তিব্বতের পাহাড় ঠেলে ওঠায় পাল্টে গেছিল চীন, তিব্বত, ভারত, ব্রহ্মদেশের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য।
প্রশ্ন : সবচেয়ে বেশি লোক মারা গেছে কোন্ ভূমিকম্পে?
মা : চীন দেশের সাঙক্সি জেলায় ভূমিকম্পে। ১৫৫৬ সালে। মারা গেছিল আট লক্ষ তিরিশ হাজার মানুষ। গুহা ধসে জ্যান্ত চাপা দিয়েছিল, তারপর লেগেছিল দুর্ভিক্ষ আর মড়ক।
প্রশ্ন : অ্যাঙ্কোরেজ শহরের মাটির নাচুনি কিন্তু দেখবার মত দৃশ্য; তাই না, মা?
মা : আরও নাচিয়েছিল নাকি ইংল্যাণ্ডের কোলচেস্টার শহরকে ১৮৮৪-র ২২ এপ্রিল—কাঁপিয়ে ছেড়েছিল গোটা ইংল্যাণ্ডকে। ভূমিকম্প মাটি হাঁ করিয়ে বাড়ি গেলায় এ কথা যাঁরা বলেন, তাঁরাও কিন্তু জানেন, ১০৩ সালে সমারসেটের একটা আস্ত শহর গিয়েছিল ধরিত্রীর উদরে—অথচ ভূমিকম্প বলয়ের মধ্যে পড়ছে না ব্রিটেন দেশটা।
প্রশ্ন : ভূমিকম্প বলয় ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেবে?
মা : ভূমিকম্প যে-যে জায়গায় সবচেয়ে দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড ঘটায়, সেই সব জায়গার ম্যাপ বানিয়ে দেখা গেছে, এগুলো কটিবন্ধের মত ঘিরে আছে প্রশান্ত মহাসাগরকে। প্রশান্তের জলপূর্ণ গর্তটাও তো আগ্নেয়গিরি দিয়ে আংটির মত ঘেরা। একে বলা হয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় বলয়। এখানে ঘটে ৬৮ শতাংশ ভূমিকম্প। আরেকটা হল ভূমধ্যসাগরীয় ভূমিকম্প। —দক্ষিণ ইউরোপ থেকে হিমালয়ের পায়ের তলা পর্যন্ত—এখানে ঘটে ২১ শতাংশ ভূমিকম্প। বাকি ১১ শতাংশের জন্যে বিশেষ কোনও বলয় নেই—যেখানে-সেখানে।
প্রশ্ন : যেখানে-সেখানে ঘটে ভূমিকম্প?
মা : এদের মধ্যেই পড়ে ক্ষুদেকম্প বা মাইক্রোসাইজমস—যা যন্ত্রে ছাড়া ধরা পড়ে না; এই কাঁপুনির কারণ-টারণগুলো সঠিক জানা যায়নি। একদল বৈজ্ঞানিক বলেন, সমুদ্রের ঢেউ উপকূলে আছড়ে গোটা মহাদেশকে কাঁপিয়ে চলেছে। অথাৎ মহাদেশকম্প থেকে ক্ষুদেকম্পের উৎপত্তি। মোট কথা, বলয়ের বাইরেও ভয়ানক ভূমিকম্প ঘটেছে। বৈজ্ঞানিকরা ভূমিকম্পের কুসংস্কার কাটিয়ে দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু ভবিষ্যৎবাণী করতে পারেন না কবে কখন কোথায় কাঁপবে মাটি। সে রকম যন্ত্র আজও আবিষ্কৃত হয়নি। তবে সাইজমোগ্রাফ কাজ দিয়েছে যথেষ্ট।
প্রশ্ন : সাইজমোগ্রাফ?
মা : যে-যন্ত্র ভূমিকম্প-তরঙ্গদের ফর্দ বানাতে পারে, তার নাম সাইজমোগ্রাফ; এই ফর্দ বা লিস্টের নাম সাইজমোগ্রাম। ভূমিকম্পের এই তরঙ্গ-তালিকা থেকে কিন্তু পৃথিবীর ভেতরকার গঠনবৈচিত্র্য সম্পর্কে একটা সুষ্ঠু ধারণা এসে গেছে। এমনকি, কোথায় তরল সোনা, মানে, পেট্রল আছে—এই যন্ত্র তা বলে দেয়। তরঙ্গ-তালিকা ঘেঁটেই প্রায়-নিশ্চিতভাবে জানা গেছে, পৃথিবীর খোসাটায় রয়েছে কঠিন স্তর, তার নিচেও রয়েছে কঠিন আবরণ কেন্দ্রের দিকে; কেন্দ্রটা কিন্তু তরল—কিছু ভূমিকম্প বিজ্ঞানীর মতানুসারে। আর একটা তত্ত্ব বেশি সমর্থন পেয়েছে: পৃথিবীর কেন্দ্রের বাইরেটা তরল, ভেতরটা নিরেট।
প্রশ্ন : সাইজমোগ্রাফ যন্ত্রটা তো তাহলে দারুণ?
মা : গোড়ায় কিন্তু একটা পেণ্ডুলাম—এই হল সাইজমোগ্রাফ। দোলকের নিচে একটা কলম কাগজ ছুঁয়ে থাকে। মাটি কাঁপলেই লম্বভাবে সেই কলম কাগজে রেখাচিত্র এঁকে যায়। মোদ্দা ব্যাপারটা এই।
প্রশ্ন : ভূমিকম্পের তেজ মাপবার কোনও স্কেল কি আছে?
মা : আছে বৈকি। দুটো স্কেল। রিখটার স্কেল দিয়ে বলা যায়, ভূমিকম্পের ফলে কতটা শক্তি বেরিয়ে এল। এক পয়েন্ট বৃদ্ধি মানেই বুঝতে হবে, তার নিচের সংখ্যার দশগুণ বৃদ্ধি। তার মানে, ৫ সংখ্যক ভূমিকম্পের তীব্রতা ৪ সংখ্যকের চেয়ে দশ গুণের বেশি, ১০০ গুণ বেশি ৩ সংখ্যকের চেয়ে, ১০০০ গুণ বেশি ২ সংখ্যকের চেয়ে। সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পের তেজ ৮.৯—লিসবন শহরে ঘটেছিল ১৭৫৫ সালে। ক্যালিফোর্নিয়ার চার্লস রিখটার ১৯৩৫ সালে এই স্কেল আবিষ্কার করেছিলেন। তারও আগে ১৯০২ সালে ইটালির মার্কালি সাহেব ভূমিকম্পগুলোকে ১৩ ভাগে ভাগ করেছিলেন; এই স্কেলের নাম মার্কালি স্কেল। প্রথম ভাগের ভূমিকম্প শুধু যন্ত্রে ধরা পড়ে, সবশেষ ভাগে কাঁপুনিতে সব কিছু ধ্বংস হয়ে যায়—মাটির ঢেউ চোখে দেখা যায়।
প্রশ্ন : সবচেয়ে বড় সুনামি কোথায় দেখা গেছে, মা?
মা : পশ্চিম প্রশান্তের ঈশিগাকি দ্বীপের ওপর দিয়ে গজরাতে গজরাতে ছুটে গিয়েছিল ২৭৮ ফুট উঁচু একটা ঢেউ ১৯৭১-এর এপ্রিলে। দ্বীপ ভাসিয়ে দিয়ে মিশে গিয়েছিল খোলা সমুদ্রে। শুনলে অবাক হবি, সবচেয়ে উঁচু সমুদ্র-তরঙ্গটা কিন্তু সুনামি নয়।
প্রশ্ন : সে কি! দানব-তরঙ্গের নাম সুনামি নয়?
মা : কারণ তার জন্ম ভূমিকম্প থেকে নয় বলে। ১৯৫৮ সালে আলাস্কা-র লিটুয়া উপসাগরে ন’-কোটি টন ওজনের পাথর খসে পড়ে। একটি মাত্র অতিকায় ঢেউ ঠেলে উঠে রে-রে করে ধেয়ে গিয়ে ভাসিয়ে দেয় উল্টো দিকের পাহাড়। ১৭০০ ফুট উঁচু এই ঢেউ পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে জব্দ হয়ে গিয়ে মাথা হেঁট করে ফিরে আসে একই উপসাগরে—তখনও তার মাথা ছিল ২০০ ফুট উঁচুতে!
প্রশ্ন : অ্যাঙ্কোরেজ শহরের জমির নাচ জলকে নাচায়নি কেন?
মা : নাচিয়েছিল বৈকি। জমির ওঠানামার একটু পরেই তেড়ে এসেছিল সুনামির দানব-তরঙ্গ। তার কয়েক ঘণ্টা পরে আর একটা সুনামি মার-মার করে ধেয়ে গিয়ে আছড়ে পড়েছিল ১৮০০ মাইল দূরের ক্যালিফোর্নিয়ার শহর ক্রেসেন্ট সিটিতে।
প্রশ্ন : সবচেয়ে বেশি লোক মেরেছে কোন্ সুনামি?
মা : ১৮৮৩-র ২৭ অগাস্ট ক্রাকাতোয়া-র অগ্ন্যুৎপাতে পর-পর সুনামি জন্ম নিয়ে খতম করেছিল প্রায় ছত্রিশ হাজার মানুষ।
প্রশ্ন : কলকাতায় সুনামি আসবে না তো?
মা : এলে তো কলকাতার জঞ্জাল কয়েক মিনিটেই সাফ হয়ে যেত!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন