গীতা

অদ্রীশ বর্ধন

প্রশ্ন : গীতা কবে লেখা হয়েছিল, মা?

মা : শাস্ত্ৰপুরাণের হিসেবে খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার একশ দুই বছরে লেখা হয়েছিল গীতা। কিন্তু বিলেতের পণ্ডিতরা দেখিয়ে দিয়েছেন, আর্যরা উত্তর পশ্চিম ভারতে এসেছিলেন খ্রিস্টপূর্ব দেড় হাজার বছরের কাছাকাছি। তাহলে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ ঘটেছিল খ্রিস্টজন্মের এক হাজার থেকে সাতশ বছরের মাঝামাঝি। গীতা লেখা হয়েছিল সেই সময়ে!

প্রশ্ন : গীতায় তাহলে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের গল্প আছে?

মা : ওরে না। যুদ্ধের কোনও গল্পই নেই গীতাতে। আছে শুধু শ্রীকৃষ্ণের ভাল ভাল উপদেশ আর কথা। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শুরুর আগে অর্জুন দেখতে চেয়েছিলেন, দুই দলের সৈন্যদের চেহারা। শ্রীকৃষ্ণ রথ রেখেছিলেন দু-দলের মাঝে। অর্জুনের আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেছিল দু-দলের সৈন্যদের দেখে। লড়াইয়ের মাঠে জড়ো হয়েছে তাঁরই চেনা জানা আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব। কেউ গুরুজন কেউ স্নেহাস্পদ। যুদ্ধ করলে তো এরা মরবেই। তখন রাজত্ব করবেন কাদের নিয়ে? ভীষণ ভেঙে পড়লেন অর্জুন। শুয়ে পড়লেন রথে। হাত থেকে পড়ে গেল গাণ্ডীব ধনুক। শ্রীকৃষ্ণকে বললেন রথ ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। এ যুদ্ধ তিনি করবেন না। শ্রীকৃষ্ণ তখন যুদ্ধের মাঠেই বুঝিয়ে সুঝিয়ে অর্জুনকে রাজি করান। অর্জুনের রাজি হওয়া পর্যন্ত কথাবার্তা নিয়েই গীতার গল্প।

প্রশ্ন : কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের গল্প তাহলে কোথায় আছে?

মা : মহাভারতে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বই।

প্রশ্ন : আর গীতা?

মা : এতে আছে ৭০১টা শ্লোক। এর মধ্যে ৫৭৫ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণের কথা, ৮৫টা শ্লোকে অর্জুনের প্রশ্ন, ৪০টা শ্লোকে সঞ্জয় রেডিও ঘোষকের মত খবরের সূচনা করেছেন, আর একটি মাত্র শ্লোকে ধৃতরাষ্ট্র কুরুপাণ্ডব যুদ্ধের খবর শোনাতে আদেশ দিয়েছেন।

প্রশ্ন : রেডিও ঘোষক ছিলেন নাকি সঞ্জয়?

মা : ব্যাপারটা বেশ মজার। যুদ্ধ হচ্ছে কুরুক্ষেত্রে—এখনকার হরিয়ানায়। ধৃতরাষ্ট্র থাকেন হস্তিনাপুরে। তিনি অন্ধ। যুদ্ধের খবর পাওয়া যায় কী করে? ব্যাসদেব বললে—‘বেশ তো, দিব্যচক্ষু দিচ্ছি তোমাকে, সেই চোখে তুমি যুদ্ধ দেখতে পাবে।’ ধৃতরাষ্ট্র মাথা নেড়ে বললেন, ‘তা হয় না। আমারই আত্মীয়স্বজন মারা যাচ্ছে, এ দৃশ্য কি দেখা যায়? আমি বরং শুনতে চাই। দিব্যচক্ষু দিন আমার প্রাইভেট সেক্রেটারি সঞ্জয়কে, সেই আমাকে যুদ্ধের খবর শুনিয়ে যাবে।’ ব্যাসদেব তখন দিব্যচক্ষু দিয়েছিলেন সঞ্জয়কে। সঞ্জয় শুনিয়েছিলেন ধৃতরাষ্ট্রকে। ঠিক যেন টেলিভিশনে দেখেছিলেন আর রানিং কমেন্টারি দিয়ে গেছিলেন। মনে তো হয়, ব্যাসদেব যাকে দিব্যচক্ষু বলেছেন আসলে সেটা একটা অত্যন্ত পাওয়ারফুল টিভিসেট।

প্রশ্ন : বটে! গীতার গল্প তাহলে সঞ্জয় বলে গেছেন?

মা : হ্যাঁ। মহাভারতের ভীষ্মপর্বের ২৫ থেকে ৪২ এই ১৮টা অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ আর অর্জুনের কথাবার্তা লেখা আছে।

প্রশ্ন : শ্রীকৃষ্ণের ৫৭৫টা শ্লোকে কী বলা হয়েছে, মা?

মা : ১৫৩টা শ্লোকে মানুষের স্বাভাবিক কাজকর্ম সম্পর্কে উপদেশ দিয়েছেন, ১৭৫টা শ্লোকে তিনি নিজে কে সেই পরিচয় দিয়েছেন, ২৪৭টা শ্লোকে মানুষের জীবনের সমস্ত দিক তুলে ধরেছেন, সেইসঙ্গে জগতের সব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।

প্রশ্ন : মানুষের জীবনের সমস্ত দিক? জগতের সব বিষয়? মানে?

মা : জন্ম, মৃত্যু, প্রাণের বিরামহীন গতি, বাইরের প্রকৃতি, জীবাত্মা, ব্রহ্ম, পরমাত্মা, সৃষ্টি, সমাজব্যবস্থা, শরীর ভাল রাখতে গেলে কী কী জিনিস কীভাবে খাওয়া দরকার, এ ছাড়াও আরও নানারকম তত্ত্ব আর তথ্য।

প্রশ্ন : গীতার বক্তব্য তাহলে কী মা?

মা : মূল বক্তব্য দুটো; এক, মানুষের স্বাভাবিক কাজ যা, সে তাই করুক। তাহলেই দিব্যজীবন পাবে। দুই, শ্রীকৃষ্ণ নিজে কে, আর তাঁর পরিচয়। এই দুটো ব্যাপার ভালভাবে বুঝলে সমাজে আর সংসারে সুখ-শান্তি এনে ফেলা যায়। যুদ্ধ করব না বলে অর্জুন বেঁকে বসেছিলেন বলেই গীতার প্রয়োজন হয়েছিল। অর্জুন ছিলেন রাজ্যপাল। তাঁর কাজ তিনি করবেন না কেন?

প্রশ্ন : কী কী কারণে যুদ্ধে নারাজ হয়েছিলেন অর্জুন?

মা : এক: অৰ্জুন ক্ষত্রিয় ঠিকই, কিন্তু ক্ষত্রিয়র কাজ তো শত্র্বুবধ। ঠাকুর্দা ভীষ্ম আর গুরুদেব দ্রোণাচার্য কি তাঁর শত্ৰু? দুই: এদের মেরে ফেলবেন কেন? রাজ্যের লোভে? চেনাজানা সবাইকে খতম করে রাজ্যলাভে তাঁর দরকার নেই। তিন: এত বড় যুদ্ধে বেশির ভাগ পুরুষই মারা যাবে। বাচ্চাকাচ্চা, বুড়োবুড়ি, বিধবা কুমারীদের নিয়ে রাজত্ব করবেন? আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব যদি মরেই গেল তাহলে রাজত্বটা করবেন কাদের নিয়ে?

প্রশ্ন : ঠিকই তো বলেছিলেন অর্জুন। শ্রীকৃষ্ণ কী ওকালতি করলেন?

মা : অর্জুনের মনের এই, তিনটে বাধাই যে ঠিক নয়—একে একে তা বুঝিয়ে দিলেন শ্রীকৃষ্ণ। প্রথম বাধা: ঠাকুর্দা, গুরুদেব আর চেনাজানা রাজাদের মারা সম্ভব নয়। শ্রীকৃষ্ণ বুঝিয়ে দিলেন, কৌরবসভায় এই ঠাকুর্দা আর গুরুদেবই তো বলেছিলেন, কৌরবদের নুন খান তাঁরা, কাজেই লড়াই করবেন তাদের হয়ে। অন্য রাজারা যুদ্ধ করতেই চেয়েছিলেন চুপচাপ থেকে। যদি যুদ্ধে জেতেন, লুটের ভাগ তো পাবেন। দুর্যোধনদের মত পাপিষ্ঠদের দলে যখন এঁরা ভিড়েছেন, তখন তাঁদের কেন বধ করা যাবে না? দু নম্বর বাধা: গুরুজনদের মেরে রাজ্যের ধনদৌলত ভোগ করা কি যায়? শ্রীকৃষ্ণের ওকালতি, ন্যায় যুদ্ধে জিতলে ধনদৌলত লাভ তো ঘটবেই। তৃতীয় বাধা: গণহত্যা। এইটেই অর্জুনের সবচেয়ে বড় বাধা। শ্রীকৃষ্ণ তখন জলের মত বুঝিয়ে দিলেন কেউই মরছে না। সাপ যেমন খোলস পালটায়, মানুষও তেমনি পুরোনো খোলস ফেলে দিয়ে নতুন খোলস নেয়; অর্থাৎ নতুন করে জন্মায়। প্রাণটা ঠিকই থাকছে, তার মৃত্যু নেই। সুতরাং অর্জুন গণহত্যা করে ফেলবেন—এটা এক্কেবারে ভুল ধারণা। এ যুদ্ধে শুধু খোলসগুলো পড়ে থাকবে, নষ্ট খোলস ছেড়ে প্রাণ খুঁজবে অন্য খোলস। কাজেই অর্জুন যেন তাঁর স্বাভাবিক কাজ, মানে লড়াই করে যান।

প্রশ্ন : আচ্ছা মা, স্বাভাবিক কাজ বলতে শ্রীকৃষ্ণ কী বলতে চেয়েছেন?

মা : স্বভাব অনুযায়ী কাজ করা। সবার স্বভাব কি একরকম হয়? হয় না। কেউ ঝগড়াটে, কেউ ভালমানুষ, কেউ উপকারী, কেউ গাইয়ে। প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু গুণ আছে। শ্রীকৃষ্ণ এই গুণগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন: সত্ত্ব, রজো আর তমো। যার যেমন স্বভাব, সেই স্বভাবের চিহ্ন হচ্ছে তার গুণ। সত্ত্ব গুণ যার মধ্যে বেশি, সে নির্মল স্বভাবের মানুষ, ভাল আর মন্দর তফাত বোঝে, জ্ঞানী হতে চায়। রজো গুণে মানুষ লোভী হয়। তমো গুণে মানুষের সবরকম ভুল ধারণা হয়। আবার বলি, এই গুণগুলিই মানুষের স্বভাব ঠিক করে নেয়। কাজের ধারাও ঠিক হয়ে যায়।

প্রশ্ন : স্বভাব অনুযায়ী কাজের ধারা ঠিক হয়ে যায়?

মা : রবীন্দ্রনাথের গুরুজনরা তাঁকে বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি পড়িয়ে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নিজের স্বভাবে যে কাজ করলেন, তাতে সমাজ আর সংসারের উপকার হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ গীতায় তাই বলেছেন, স্বভাব অনুযায়ী কাজ করলে সবারই ভাল। কাজ যে করে, সে কর্মী। স্বভাব অনুযায়ী কাজের চার রকম কর্মীগোষ্ঠিও উনি তৈরি করে দিলেন—সমাজের ভালোর জন্য: ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র।

প্রশ্ন : এরা তো চার জাতের মানুষ?

মা : ভুল। এরা চার কর্মীগোষ্ঠীর মানুষ। কর্মীগোষ্ঠীর নাম দিয়েছিলেন বর্ণ। যার যে গুণ, সে সেই বর্ণের মানুষ, অথবা সেই ইউনিয়নের মানুষ। ব্রাহ্মণের স্বভাব শান্ত। তার কাজ, তপস্যার কাজ। ক্ষত্রিয়ের কাজ বীরত্ব আর প্রভুত্ব। বৈশ্যের কাজ চাষ-আবাদ ব্যবসা, টাকা না থাকলে রাজত্ব চলবে কি করে? শুদ্রের স্বভাব ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্যদের পরিচর্যা করা। কেউ কিন্তু কারও চেয়ে ছোট নয়। কারও হাতে বেশি ক্ষমতা জড়ো হচ্ছে না। উঁচু-নীচু বলে কিছু থাকছে না। শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, শূদ্রের কাজ অন্য তিন বর্ণের পরিচর্যা করা—যে কাজগুলো সমাজে খুবই দরকারি, শূদ্ররা অন্য তিন বর্ণের দাস, এমন কথা বলা হয়নি।

প্রশ্ন : তাহলে দেখা যাচ্ছে, মানুষের কাজ করার ওপরেই শ্রীকৃষ্ণ বেশি জোর দিয়েছেন?

মা : ঠিক তাই। তাঁর নির্দেশে কোনওরকম সাম্প্রদায়িকতা বা গোঁড়ামি নেই। স্বভাবমত কাজ করো—সুন্দর সমাজ গড়ে তোলো। ব্রাহ্মণ বংশে জন্মালেও যেমন ব্রাহ্মণ থাকা যায় না—শূদ্র বংশে জন্মালেও তেমনি শূদ্র থাকা যায় না। তার স্বভাব, তার কাজ তাকে অন্য বর্ণে অন্য জাতে অন্য আসনে নিয়ে যায়। দশে মিলে কাজ করলে সমাজেরই মঙ্গল। একা সব কাজ তো করা যায় না। সমাজ সংস্থায় এই হল শ্রীকৃষ্ণের ব্যবস্থাপত্র—হাজার হাজার বছর আগে তিনি আরও একটা কথা বলেছিলেন—যা টের পেয়েছে এ যুগের বৈজ্ঞানিকরা।

প্রশ্ন : শ্রীকৃষ্ণের আরও এক ব্যবস্থাপত্র মানে?

মা : উনিই বলেছিলেন, শুধু মানুষের সঙ্গে মানুষ হাত মিলিয়ে চললেই তো হবে না—ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ আর ব্যোম—এই পাঁচটা আদিম উপকরণের সঙ্গে সহযোগিতা দরকার। গাছপালা কেটে ফেলার পরিণামটা কি ভয়াবহ হয়েছে, এখনকার গবেষকরা তা বুঝেছেন। সেই সঙ্গে বেড়ে চলেছে পরিবেশ দূষণ। মানুষের তেষ্টার জল, নিঃশ্বাসের বাতাসেও এখন বিষ ঢুকে পড়েছে।

প্রশ্ন : পড়াশুনোর ক্ষেত্রেও শ্রীকৃষ্ণের কথা খেটে যায়, তাই না, মা?

মা : ছাত্রছাত্রীরা তাদের স্বভাব অনুযায়ী ঠিক বিষয় বেছে নিলে তাদের শক্তির অপচয় হবে না, কাজ করা আরও সহজ হবে, মানুষের production বাড়বে, দেশের দারিদ্র্য ঘুচবে। সব কাজই যজ্ঞ। যজ্ঞে ফল পাওয়া যেতে পারে, নাও পাওয়া যেতে পারে। সেইজন্যে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ফলের দিকে তাকিয়ে কাজ না করে কাজকে পুজো করার মত দ্যাখো। কাজ করার এইটাই মস্ত কৌশল—কাজ, কাজ, কাজ—নিষ্ঠা আর শ্রদ্ধা থাকলে মানুষের ভেতর থেকে শক্তি বেরিয়ে আসে। মানুষ তখন অতিমানুষ হয়ে যেতে পারে।

প্রশ্ন : কাজ করেই সুপারম্যান হওয়ার কথা শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন?

মা : শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন বসুদেব আর দেবকীর ছেলে। রাজা কংসের ভাগ্নে। পাণ্ডবদের মা কুন্তীর ভাইপো। অর্জুনের সম্বন্ধী। এইটাই তাঁর সব পরিচয় নয়, তিনি ছিলেন যদুকুলের নম্বর ওয়ান সেরা মানুষ। মানুষ হয়েও নিজের কর্মযোগ প্র্যাকটিস করে মানুষী শরীরেই মানুষশ্রেষ্ঠ হয়েছিলেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%