অদ্রীশ বর্ধন

প্রশ্ন : পৃথিবীতে যদি একটাও জীবাণু না থাকতো, তাহলে খুব আরামে থাকা যেতো, তাই না, মা?
মা : ঠিক উল্টো হত। আরাম হারাম হয়ে দাঁড়াতো। পৃথিবী হবে তখন দারুণ বিপজ্জনক।
প্রশ্ন : বলো কী! জীবাণুরা তো আমাদের শত্রু?
মা : জীবাণুদের কয়েকটা জাত ছাড়া বাকি সবাই আমাদের বন্ধু।
প্রশ্ন : জীবাণুরা আমাদের বন্ধু?
মা : অদৃশ্য বন্ধু। এই জীবাণুদের জন্যেই পৃথিবী এত সুন্দর—বেঁচে থাকার এত আনন্দ। মস্ত কারিগর তারা। খনি থেকে ধাতু বের করছে, কয়লার খনিতে মিথেন গ্যাস সাবাড় করছে, ভিটামিন B12 তৈরি করছে, সমুদ্রে তেল ফেলে দিলে তা সাফ করে দিচ্ছে, প্রাণের গুপ্ত রহস্য ফাঁস করে দিচ্ছে, মেডিক্যাল রিসার্চে নিজেরা যন্ত্র হয়ে গিয়ে কাজ করে দিচ্ছে, সুগন্ধি উৎপাদন করছে, পাউরুটি ফাঁপিয়ে তুলছে, কেমিক্যালদের বানিয়ে নিচ্ছে, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করছে, বজ্জাত পোকামাকড়দের বাগে রাখছে, ঈস্টার আয়ারল্যাণ্ডের পেল্লায় পাথরের মূর্তিগুলোর বয়স কত—তাও বলে দিচ্ছে, মাটিতে কীটনাশক ধ্বংস করে ছাড়ছে, মিথেন তৈরি করছে তা থেকে তাপ সৃষ্টির জন্যে, মধ্যিখানে-তুলতুলে চকলেট বানাচ্ছে, শনের আঁশকে নরম করে দিচ্ছে, হৃৎপিণ্ড আর অন্ত্রের কাজকর্ম ঠিকঠাক চলায় সাহায্য করছে, আরও হাজার হাজার কাজ করে চলেছে।
প্রশ্ন : অবিশ্বাস্য! জীবাণুরা কি বৈজ্ঞানিক?
মা : বৈজ্ঞানিকরাই তাদের দ্বারস্থ হচ্ছে। এই দ্যাখ না, নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট ঠিক করেছে, বায়োলুমিনেসেন্ট ব্যাকটিরিয়াকে কাজে লাগিয়ে হেরোইন খাইয়েদের হাতেনাতে ধরবে। কী ভাবে?—এই ব্যাকটিরিয়া হেরোইন-এর ছোঁয়া পেলেই নিজেদের শরীর থেকে আলো ছাড়তে থাকবে—পুলিশ ধরবে ক্যাঁক করে। হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর সেতালা ব্যাকটিরিয়াকে দিয়ে জমাদারের কাজ করাবেন ঠিক করেছেন। অন্ত্রের বিষাক্ত আবর্জনা সাফ করে দেবে, যাতে তারা রক্তে ঢুকে গিয়ে কিডনি রুগীদের অবস্থা কাহিল করে তুলতে না পারে। আরও শুনবি? কার্ল সাগান বলেছেন, শুক্রগ্রহে অ্যালগি পাঠানো হোক—ফটোসিনথেসিস-এর কাজ চালিয়ে তারাই তো শুক্রগ্রহের গুচ্ছের কার্বন ডাই-অক্সাইডকে অক্সিজেন বানিয়ে ছাড়বে—ঠাণ্ডা করে দেবে ভয়ানক গরম শুক্রগ্রহকে, তারপর শুরু হবে তুমুল বৃষ্টি—প্রায় পৃথিবীর মতনই মনোরম হয়ে দাঁড়াবে শুক্রগ্রহ।
প্রশ্ন : অদ্ভুত কথা বলছো, মা! জীবাণুরা ক্রূর, কুটিল, ভয়ঙ্কর নয়?
মা : সবাই নয় রে। আমাদের স্বাস্থ্য, এমনকি আমাদের অস্তিত্ব পর্যন্ত নির্ভর করছে এই অদৃশ্য বন্ধুদের ওপর। এদের অ-মানবিক দক্ষতাকে যদি কাজে লাগানো যায়—পৃথিবীর বহু সমস্যা মিটে যাবে! জীবাণুদের প্রথম চেনা যায় প্রায় একশ বছর আগে। তাদের শুধু চোখে দেখা যায় না, মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখতে হয়—এত পুঁচকে প্রাণীরা ভাল হতে পারে না কখনোই—এই ঢাক পেটানোর শুরু তখন থেকেই। তারা নাকি রোগ, শোক আর ধ্বংসের বাহক। টিবি, ডিপথেরিয়া, কলেরার জীবাণুদের আলাদা করার পর ভ্যাকসিন আর ওষুধও বেরিয়ে গেল। তারপরেই শুরু হল জীবাণুদের বিরুদ্ধে জেহাদ। মারো, মারো, মেরে শেষ করে দাও সমস্ত জীবাণু! তুই-ও হয়েছিস এই প্রচারের শিকার। মোদ্দা কথাটা ভুলিসনি। জীবাণুরা জৈব ক্রিয়াগুলোকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়—রোগকে ইন্ধন জোগায় না।
প্রশ্ন : আমাদের শরীরের জীবাণুগুলো তাহলে অদৃশ্য শত্রু নয়?
মা : সাবান, জল আর হরেকরকম দুর্গন্ধ নিবারক ব্যবহার করার পরেও চামড়ার প্রতি বর্গ সেন্টিমিটারে থুকথুক করে প্রায় এক লাখ জীবাণু। প্রত্যেক মানুষের শরীরের ভেতরে আর বাইরে যত জীবাণু আছে, তাদের মোট সংখ্যা পৃথিবীতে যত মানুষ আছে, তাদের চেয়ে বেশি। এরা সবাই কি মানুষ মারার চেষ্টা করছে? না। বরং মানুষের স্বাস্থ্য আরও ভালো রাখার চেষ্টা করছে। চামড়ার জীবাণুরা ওস্তাদ জমাদার। জীবাণুনাশক দিয়ে কুঁচকি আর বগলের জীবাণুদের যদি রোজ খতম করা হয়, বাইরের জীবাণুরা তাদের জায়গা দখল করে নিয়ে একজিমা, চুলকানি ইত্যাদি অস্বস্তি বানিয়ে ছাড়বে।
প্রশ্ন : জীবাণু তো মাটির মধ্যেও রয়েছে?
মা : এক চামচ মাটির মধ্যে রয়েছে কমসে কম দু’বিলিয়ন জীবাণু। অনেক কাজ এদের। একটা বড় কাজ হল, মরাগাছ আর প্রাণীর টিশু ভেঙেচুরে পুষ্টিকর কেমিক্যালদের মাটিতে ফিরিয়ে দেওয়া। নোংরা পরিষ্কারে পটু জীবাণুরা থুকথুক করছে মাটির তলায় নর্দমা ব্যবস্থায়। টাইফয়েড আর কলেরার জীবাণুদের ধ্বংস করছে এরাই। রোগ আর ছড়াতে দিচ্ছে না। রাস্তার নর্দমার জল, খাবার জল আর কুয়োর জল মিশে গেলেই কিন্তু সেই জল রোগ বাধিয়ে ছাড়ছে। মাটির তলায় নর্দমায় ব্যাকটিরিয়া, ফাংগাস, প্রোটোজোয়া এবং আরও অনেক জীবাণু অবিশ্বাস্যভাবে সাফ করে দিয়ে নদীতে ফেলার উপযোগী করে দিচ্ছে।
প্রশ্ন : এত নোংরা-বিষকে জীবাণুরা নির্বিষ করছে কীভাবে?
মা : করছে মিলেমিশে—পুরো পদ্ধতিটা আজও পরিষ্কার নয়। তবে, পুরো ব্যাপারটায় কম করে চার ধরনের জমাদারের ভূমিকা খুবই স্পষ্ট। একটা দল তাদের এনজাইম দিয়ে হজম করে ফেলছে সেই সব জিনিস যাদের জলে গোলা যায় না—হজমের পর কিন্তু যা পড়ে থাকছে, তা জলে গুলে যায়। আর একটা দল এই জিনিসগুলোই গাঁজিয়ে অ্যালকোহল আর অ্যাসিড বানিয়ে ছাড়ছে। আর একটা দল এই দুটোকেই গাঁজিয়ে কার্বন-ডাই-অক্সাইড আর হাইড্রোজেন তৈরি করছে। শেষ পর্যায়ে, কিছু ব্যাকটিরিয়া এই দুটো গ্যাসকে জুড়ে দিয়ে মিথেন গ্যাস তৈরি করছে। এত কাজ খুব ঝড়ের বেগে না চললেও জানবি, একটা ন্যাতা-কে পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে ভ্যানিশ করে দিতে পারে জীবাণুরা; প্যারাফিন থেকে রবার পর্যন্ত সমস্ত জিনিস—এমনকি ফেনল-এর মত কীটনাশক পর্যন্ত—যা থেকে তৈরি হয় কার্বলিক অ্যাসিড—তাও ভেঙেচুরে যায় এদের পাল্লায় পড়লে।
প্রশ্ন : কিন্তু মিথেন গ্যাসটা তত ক্ষতিকারক?
মা : তাকে কাজে লাগালেই ল্যাটা চুকে যায়। জীবাণুদের হজমশক্তির দৌলতে যে গ্যাস পাওয়া যায়, তার প্রায় ৭৫ শতাংশই শুধু মিথেন। পাইপে করে সেই গ্যাস টেনে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলে সেই উত্তাপকে কাজে লাগানো হচ্ছে ব্রিটেন। ১৯৭৪ সালে ইউরোপিয়ান ইকনমিক কমিশন দেখিয়েছে, উপহ্রদে নোংরা জমিয়ে, তাতে অ্যালগি-র চাষ করে, প্রচুর মিথেন পাওয়া যায়। একটা শহরের বিশ লাখ মানুষের ফেলে দেওয়া আবর্জনা থেকে একটা ১০০০ মেগাওয়াট পাওয়ার স্টেশন চালু রাখা যায়—৮০,০০০ লোককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে।
প্রশ্ন : নর্দমার ছিবড়েগুলো তো থেকে যাচ্ছে?
মা : তাকে জমির সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়—তার মধ্যে নাইট্রেট, সালফেট আর ফসফেট থাকে—মাটির পুষ্টি তো এরাই।
প্রশ্ন : জলা জায়গায় কাঠ-পাতা পচে গিয়ে কি উপকারটা করছে আমাদের?
মা : আজকের কয়লা পাচ্ছিস সেই পচনের ফলে। তিরিশ কোটি বছর আগে ফার্ন জাতীয় গাছগুলোর জঞ্জাল পচিয়ে ‘পীট’ বানিয়েছিল জীবাণুরা। মাটির তলায় চাপে থেকে তারাই হয়েছে কয়লা।
প্রশ্ন : তাহলে তো কলকারখানা আর চাষ-আবাদের সমস্ত বিষাক্ত আবর্জনা জীবাণুরাই সাফ করতে পারে?
মা : খুবই বিপজ্জনক প্রস্তাব। সমস্ত বোঝা জীবাণুদের ওপর ছেড়ে দেওয়াটা কি ঠিক? আমাদের উচিত শহরের আবর্জনাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কাজে লাগানো—জীবাণুরা অবশ্যই সাহায্য করবে। কয়েক কোটি বছরের ক্রমবিবর্তনের ফলে জীবাণুরা পোক্ত হয়েছে পৃথিবীর ফেলে দেওয়া জিনিসগুলোকে পৃথিবীর ভালো কাজে লাগানোর ব্যাপারে। মাত্র কয়েক শ’ বছর ধরে মানুষ-কেমিস্টরা এন্তার বিষাক্ত কেমিক্যাল ছড়িয়ে যাচ্ছে পরিবেশে—আপ্রাণ সামাল দিয়ে চলেছে জীবাণুরা। যেমন ধর, তেল বওয়া জাহাজগুলো থেকে ফি বছর কুড়ি বিলিয়ন কেজি তেল সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয় ব্যালাস্ট ট্যাঙ্ক সাফ করার সময়ে। সেই বিষ ক্ষতি করছে সমুদ্রের প্রাণী আর গাছের। ১৯৭৪ সালে ইজরায়েলের বৈজ্ঞানিকরা বললেন, তেল-খেকো একরকম ব্যাকটিরিয়া তাঁরা বানিয়েছেন। ট্যাঙ্কের তলানি তারা খেয়ে সাফ করে দেবে, উপরন্তু এমন প্রোটিন বানিয়ে দেবে যা জীবজন্তুর আহার যোগাবে।
প্রশ্ন : একটু আগে বললে, কয়লার খনির মিথেন গ্যাস সাবাড় করছে জীবাণুরা। কীভাবে, মা?
মা : খনি-শ্রমিকদের কাছে ভয়াবহ এই গ্যাসের নাম ফায়ার-ড্যাম্প। আগুনের ছোঁয়ায় ফেটে পড়ে। মস্কোর খনি গবেষকরা মাটি ফুটো করে, তরল পদার্থের মধ্যে এমনসব জীবাণু ঢুকিয়ে দেন যারা মিথেন খেতে ভালবাসে—তার বদলে দেয় জল আর কার্বন-ডাই-অক্সাইড।
প্রশ্ন : পেট্রল সৃষ্টি কি জীবাণুদের কীর্তি?
মা : সমুদ্রের তলানিকে লক্ষ কোটি বছর আগে জীবাণুরাই পেট্রলিয়ামে রূপান্তরিত করেছে, এমন একটা বিশ্বাস ক্রমশ দানা বাঁধছে। মজাটা কি জানিস, আজ সেই পেট্রলিয়াম যখনি ফুরিয়ে আসছে, মাটির নিচে আলট্রা-সেন্সিটিভ ব্যাকটিরিয়া নামিয়ে পেট্রলিয়ামেরই তল্লাসি চলছে—যে পেট্রলিয়ামকে প্রথমে বানিয়েছিল জীবাণুরাই।
প্রশ্ন : বাইরে থেকে পেট্রলিয়াম যদি আর না আসে, তাহলে তো জীবাণুরাই পাল্টা জ্বালানি দিতে পারে?
মা : ইস্ট আর ব্যাকটিরিয়া বানাচ্ছে অ্যালকোহল। সাধারণ ইথাইল অ্যালকোহলের অকটেন নাম্বার হল ৯৯; সমানভাগে অ্যালকোহল আর ৭০-অকটেন পেট্রল মিশোলে অকটেন সংখ্যা উঠে যাবে ৮৮-তে। ‘পাওয়ার অ্যালকোহল’ নামে এই জ্বালানির ৫০ কোটি কিলো গোটা ইউরোপে চলেছিল তিরিশের দশকে। পেট্রলের চাইতে সস্তা হবে এখানেও। তবে হ্যাঁ, ইঞ্জিন পাল্টে নেওয়া দরকার অ্যালকোহলকে পুরোপুরি জ্বালানোর জন্যে। পরিবেশ দূষণও কমবে। ১৯৭৪ সালে আমেরিকান জার্নাল ‘সায়ান্স’-এ পেট্রলে অ্যালকোহল মিশোনোর কথা নতুন করে বলেছিলেন Dr. William Smyers।
প্রশ্ন : ঈস্ট কী জিনিস, মা?
মা : ছত্রাক জাতীয় একরকম জৈব পদার্থ। নানারকম গাছপালা জাতীয় জিনিসকে গাঁজিয়ে দেয়। পাঁউরুটি নরম আর ফাঁপা করবার জন্যে ময়দার সঙ্গে ঈস্ট মিশিয়ে দেওয়া হয়। ঈস্ট থেকে একরকম এনজাইম বেরোয়—রাসায়নিক ক্রিয়া ঘটায় এই এনজাইম।
প্রশ্ন :ঈস্ট কি আরও উপকারে লাগে?
মা : নিশ্চয়। ফেলনা জিনিস থেকে ঈস্ট আর অ্যালগি বানিয়ে নিলে প্রোটিন আর ভিটামিন ঠাসা খাবারের অভাব মিটবে। কাগজের কারখানায় বাজে জিনিস বলে ফেলে দেওয়া হয় ‘সালফাইট লিকার’। এর মধ্যে ঈস্টের চাষ হতে পারে। শহরের আবর্জনায় হোক অ্যালগির চাষ। ইথাইল অ্যালকোহল বেশি করে তৈরি করলে লক্ষ কোটি বছরে তৈরি জ্বালানির জন্যে আর হা-পিত্যেশ করে বসে থাকতে হবে না। রঙ, ল্যাকার, তেল এবং আরও অনেক জিনিসের ‘সলভেন্ট’ হিসেবে কাজে লাগে ইথাইল অ্যালকোহল। ঈস্ট যখন অ্যালকোহল বানায়, তখন যে কার্বনডাই অক্সাইড তৈরি হয়ে যায়, তাকে ‘ড্রাই আইস’ হিসেবেও বেচে দেয় অনেকে। বাড়তি ঈস্ট পশুখাদ্য হিসেবে কাজে লেগে যায়। ফাংগাস অর্থাৎ ছত্রাককে কাজে লাগিয়ে সেলুলোজ থেকে খাবার তৈরির কথাও ভাবা হচ্ছে। ফাংগাস গ্লুকোজকে টেনে বের করবেই সেলুলোজ থেকে। গাছপালা, পুরোনো খবরের কাগজ—সবকিছুই Trichoderma viride ছত্রাকের কাছে মুখরোচক খাদ্য—বিনিময়ে পাওয়া যাবে গ্লুকোজ—অত্যন্ত সস্তায়। ১৯৭৪ সালের জুন মাসে দিল্লি আই-আই-টি’র প্রফেসর টি. কে. ঘোষ অস্ট্রেলিয়ান ইন্সটিটিউট অফ ফুড সায়ান্স অ্যাণ্ড টেকনোলজিতে বলেছিলেন—খবরের কাগজকে ২৪ ঘন্টায় ‘পাতলা মধু’ বানিয়ে দিতে পারে ফাংগাসের এনজাইম। ব্রিটেনের কার্ডিফ ইউনিভার্সিটির গবেষকরা দেখেছেন, কাগজ থেকে প্রোটিনও বানানো যায়। দু-শ গ্রাম মাংসে যতটা প্রোটিন থাকে, তিনশ গ্রাম কাগজ থেকে তা পাওয়া সম্ভব।
প্রশ্ন : কাগজ থেকে মধু, কাগজ থেকে প্রোটিন? ঈস্টের এত বাহাদুরি সেকালের লোক জানত না?
মা : দশ হাজার বছর আগে মেসসালিথিক যুগ থেকেই মানুষ জেনেছিল ঈস্টের কিছু কিছু বাহাদুরি—পাওয়া গেছে তার প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ। মদ তৈরি হয়েছে তখনও। প্রস্তর যুগেও পাঁউরুটি ফাঁপানো হয়েছে ঈস্ট দিয়ে। মাইক্রোব চিরকালই আমাদের বন্ধু।
প্রশ্ন : মাইক্রোব! মানুষ তাদের গিলছে?
মা : গিলছে এবং গতর ঠিক রাখছে। দই ভালবাসিস—সেটা তো মাইক্রোবদের জন্যেই তৈরি হচ্ছে দুধ থেকে। ছানা, চীজ, আচার, ভিনিগার—সবকিছুরই বিশেষ স্বাদ আর সুগন্ধ—সবই মাইক্রোবদের ম্যাজিক কারখানার দৌলতে।
প্রশ্ন : অদৃশ্য বন্ধুদের ম্যাজিক কারখানা আরও আছে নাকি?
মা : এখনও পর্যন্ত যেটুকু জানা গেছে, তার জোরেই বলা উচিত, দণ্ডবৎ অদৃশ্য বন্ধু! ১৯২০-তে পেনিসিলিন তৈরি হয়েছিল যৎসামান্য; কিন্তু মোক্ষম দাওয়াই হিসেবে তার গুণ জানবার পর থেকেই মাইক্রোবদের সাহায্য নিয়ে তাদের উৎপাদন বাড়ানো হল হাজার হাজার গুণ। ঠিক এইভাবে যুদ্ধের চাহিদা মেটাতে ১৯৪৪ সালে জামাইকায় খোলা হয়েছিল খাবার ঈস্ট-এর কারখানা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানিতে মাইক্রোবদের খাটিয়ে গ্লিসারিন তৈরির কাহিনী কে না জানে।
প্রশ্ন : খনি থেকে ধাতু বের করে কী করে, মা?
মা : শুধু পেট্রল নয়, বেশ কয়েকটা দারুণ দরকারি খনিজ তেমন আর পাওয়া যাচ্ছে না বলে মাথায় হাত দিয়েছেন খনি ইঞ্জিনিয়াররা। বিশেষ করে তামা আর ইউরেনিয়াম। দুনিয়া জুড়ে তখন থেকেই ভাবনা শুরু হয়েছে, ব্যাকটিরিয়াদের লেলিয়ে দিয়ে নাগালের বাইরে থাকা ধাতু মিশোনো খনিজ পদার্থ আর খনি থেকে খনিজ তোলার পর ফেলে দেওয়া আবর্জনা থেকে খনিজ উদ্ধার করা হোক। ব্যাকটিরিয়া-বাহিনীর কাজ একটু শ্লথ বটে, কিন্তু বেজায় সস্তা। বিদ্যুতের বা মূলধনের দরকার হয় না। গন্ধক পাচ্ছি মূলত ব্যাকটিরিয়াদের কেরামতিতেই। আগ্নেয়গিরির প্রতাপে কিছু গন্ধক স্তূপ তৈরি হয়ে আছে। কিন্তু সমুদ্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যে সব গন্ধকের স্তূপ তৈরি হয়েছে সেখানে কেরামতি এই ব্যাকটিরিয়াদের, যেমন টেক্সাস-এর গন্ধক। পৃথিবীর গন্ধক-চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ যুগিয়ে যায় একাই। জায়গাটা এককালে মেক্সিকো উপসাগরের অংশ ছিল। ব্যাকটিরিয়া এখানকার ক্যালসিয়াম সালফেটকে গন্ধকে রূপান্তরিত করে। একইভাবে লিবিয়া-র বহু লেক থেকে গন্ধক উৎপাদন সম্ভব। মাইক্রোবদের খাটিয়ে গন্ধক তৈরির সম্ভাবনা সোৎসাহে ভাবা হচ্ছে এই কারণেই। আমেরিকা আর অস্ট্রেলিয়ায় মাইক্রোব লেলিয়ে কপার আর নিকেল উদ্ধার করা হচ্ছে বহু খনিতে। পাওয়া যাচ্ছে ইউরেনিয়াম। আমেরিকায় ম্যাঙ্গানিজ আর রাশিয়ায় সোনা পাইয়ে দিচ্ছে মাইক্রোবরা।
প্রশ্ন : তা সত্ত্বেও জীবাণুদের ধরে ধরে মেরে ফেললে অনেক জীবাণু তো লোপ পাবে?
মা : গুটি বসন্তর জীবাণু তো লোপ পেতেই বসেছে। এই মুহূর্তে প্রায় বিশ হাজার জাতের গাছ লুপ্ত হওয়ার পথে। বিরল গাছ আর প্রাণীদের সংরক্ষণের চেষ্টা যেমন চলছে, ঠিক তেমনি ভাবে বিরল জীবাণুদের টিকিয়ে রাখা উচিত নয় কি? স্মলপক্স ভাইরাস এককালে যেমন রোগ বানিয়েছে, তেমনি রোগ ঠেকাতে সাহায্যও তত করেছে। ভাইরাস অতিশয় ক্ষুদে প্রাণী, অবিশ্বাস্য জটিল তার প্রাণময় দেহ—যাকে কক্ষনো গবেষণাগারে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা যাবে না। এই কারণেই স্মলপক্স ভাইরাসকেও জিইয়ে রাখা দরকার। মাইক্রোব প্রতিভা কখন কীভাবে মানুষের সমস্যার সমাধান ঘটাবে—মানুষ তা নিজেই জানে না।
প্রশ্ন : মাইক্রোব প্রতিভা?
মা : লিচেন অর্থাৎ শ্যাওলা দিয়ে বাতাসদূষণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা কি চলছে না? গাছের গুঁড়ি, দেওয়াল আর কবরখানার বেশ কয়েকটা লিচেন প্রজাতি বাতাসের ভারি ধাতুর ক্ষেত্রে বিলক্ষণ সেন্সিটিভ। Physcia caesia আর Xanthoria parietina নামে দুটো লিচেন টিকতে পারে না বাতাসের সালফার ডাই অক্সাইডের ঘনত্ব দশ লক্ষ ভাগে ০·০৫ ভাগ বেড়ে গেলেই। এদের ম্যাপ বানিয়ে নিয়ে বাতাসে দৃষণের অঞ্চল বের করা গেছে গোটা বৃটেনে। টেকনিকটা খুব সস্তা আর সোজা। বৃটেনের ওপেন ইউনিভার্সিটির আর স্কুলের ছেলেমেয়েরা এই কাজটা করে দিয়েছে। গাছপালা ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে লিচেনরাও লুপ্ত হতে চলেছে। The Vanishing Lichen গ্রন্থে ডক্টর ডেভিড রিচার্ডসন তাই বলেছেন: লিচেনদের বাঁচাও—মানুষেরই স্বার্থে। শান্তশিষ্ট ডেলা ডেলা এই মাইক্রোবরা খাদ্য হয়েও বাঁচিয়ে রেখেছে ইউরেশিয়ান হরিণ, নর্থ আমেরিকার caribou হরিণদের। উই, পোকা, শামুক—এরাও লিচেন খেয়ে বেঁচে থাকে। পাখি তাদের বাসা বানায়। নিউগিনির গুবরে পোকার কায়দায় বহু প্রাণী লিচেনের ছদ্মবেশে নিজেদের লুকিয়ে রাখে শত্রু চোখের আড়ালে। উত্তর গোলার্ধের বহু মানুষ লিচেন রেঁধে খায়—এস্কিমোরা ক্যারিবো-র পেট কেটে অর্ধেক হজম লিচেন খেতে বড় ভালবাসে। জাপানে Umbilicaria esculenta লিচেন সব্জিবাজারে বিক্রি হয়। গত যুদ্ধে রাশিয়া লিচেনের কারখানা খুলেছিল চিনি তৈরির জন্যে। জোলাপ, কাশির ওষুধ, আরও অনেক টোটকা তৈরি হয়ে চলেছে এই লিচেন থেকে। লিচেন থেকে তৈরি অ্যান্টিবায়োটিক, Usnic acid, বিশেষ কয়েকটি চর্মরোগের মোক্ষম দাওয়াই। গাছের ছত্রাক রোগেও রুখে দাঁড়ায় এই লিচেন। সুগন্ধি কারখানার কাঁচা মাল তো এই লিচেন। অনেক রঙ তৈরি হচ্ছে লিচেন থেকে। লিটমাস লিচেনেরই উপহার—অ্যাসিডকে করে লাল, অ্যালকালি-কে নীল—তৈরি হয় Rocella লিচেন থেকে। মমির গায়ে এককালে লিচেন রগড়ে দেওয়া হত। আর এখনকার ‘লিচেন-লজি’ দিয়ে কোন পাথরের কত বয়স, তাও নির্ধারণ করা হচ্ছে; লিচেন কলোনী মাপলেই তা বেরিয়ে যাচ্ছে। এই টেকনিকেই জানা গেছে, ঈস্টার আয়ল্যাণ্ডের পাথরের মূর্তিগুলো তৈরি হয়েছিল ৪৩০ বছর আগে। এত উপকারী প্রাণীদের লোপ পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে বলেই ব্রিটেন লিচেন সোসাইটি ১৯৬৮ সালে রুখে দাঁড়িয়েছিল কলকারখানার বিরুদ্ধে।
প্রশ্ন : লিচেনের মত পরমবন্ধু নয় যারা, তাদের গণহত্যায় আপত্তি থাকবে কেন?
মা : বাঘসিংহ কি আমাদের পরমবন্ধু? তাদের গণহত্যায় কেন আপত্তি? এই প্রথম গোটা বিশ্ব এককাট্টা হয়ে একটা প্রাণীকে পৃথিবী থেকে নির্মূল করতে চলেছে—আগেই বলেছি তার নাম—স্মলপক্স ভাইরাস। মারাত্মক ভাইরাস বা ব্যাকটিরিয়ার বংশ ধ্বংস করতে যাঁরা চান, তাঁরাই কিন্তু জীবাণুবাহী ইঁদুর, পাখি বা মাছির বংশ ধ্বংস করার প্রস্তাব উঠলেই গুম মেরে যাবেন। তিমি বৃহৎ প্রাণী বলেই তাদের লুপ্ত হওয়ার কথা উঠলেই আঁতকে উঠতে হবে, জীবাণুদের জন্যে সেই দরদ থাকবে না কেন? ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে তাদের সৌন্দর্য প্রজাপতি বা কোয়ালা ভালুকের চেয়ে কম নয়। অদৃশ্য বলেই কি তারা উপেক্ষার বস্তু? গবেষণায় সব প্রাণীকেই দরকার হয়, বেশি দরকার হয় মাইক্রোবদের। বায়োলজির দুনিয়া কাঁপানো বহু আবিষ্কার ঘটেছে ব্যাকটিরিয়া আর ভাইরাসদের দৌলতেই—রোগকারক জীবাণুও আছে তাদের মধ্যে। এদের একজনও লুপ্ত হয়ে গেলে প্রাণের প্রকৃতি আর উৎস নিয়ে গবেষণায় বাগড়া পড়বে। বায়োলজির আরাধনায় অনিষ্ট ঘটবে। প্রজাপতি আর হাতির জন্যে প্রাণ কাঁদে, মাইক্রোবদের জন্যে কেন নয়? স্মলপক্স ভাইরাস খতম হয়ে গেলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিঘ্নিত নাও হতে পারে—অন্য বহু রোগকারক জীবাণু চিরবিদায় নিলে তা হতে পারে। সবচেয়ে বড় যুক্তিটা এই: একদিন এই স্মলপক্স ভাইরাসকেই প্রয়োজন হতে পারে বাস্তব প্রয়োজনে—রোগের সঙ্গে লড়াইয়ের জন্যে। এই ভাইরাসের অবিশ্বাস্য ক্ষুদে গঠন প্রণালী, বিশেষ করে DNA, ল্যাবোরেটরিতে কোনোদিনই নতুন করে গড়া যাবে না। লক্ষ লক্ষ বছরের ক্রমবিবর্তনের ফল এই ভাইরাস একবার মুছে গেলে বৈজ্ঞানিকদের ক্ষতি হবে নাকি?
প্রশ্ন : ডি-এন-এ’র কথা তুললে কেন? ভাইরাসের ডি-এন-এ কি কাজে আসবে?
মা : স্মলপক্স ভাইরাসের মত রোগকারক মাইক্রোবও দরকার হতে পারে যে উঠতি বিজ্ঞানে, তার নাম ‘জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং’। প্রকৃতিতে জিন-কম্বিনেশন যেভাবে সম্ভব হয়, এই বিজ্ঞানের টেকনিক তা করতে পারে জিন-দের কাছে এনে জোড়া লাগিয়ে। পশু আর মাইক্রোব কোষের রকমারি ডি-এন-এ জুড়ে দিয়ে প্রাণের প্রবাহকে নানা দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়—ওষুধ, চাষ-আবাদ, জীবাণু শিল্পে যার প্রয়োজন হবেই। দুজন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী সর্বপ্রথম জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর আইডিয়াকে পাবলিসিটি দেন। ডক্টর রজার্স তাই নিয়ে পরে কাজ করেছিলেন। কিন্তু ডক্টর হরগোবিন্দ খোরানা মাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজিতে প্রথম দেখালেন, প্রাকৃতিক কোষে সমস্ত জিন যেভাবে থাকে, ল্যাবোরেটরিতে তা জাল করা যায়। নির্বিষ ভাইরাস মানুষের শরীরে ঢুকে জেনেটিক প্যাসেঞ্জার হয়ে গিয়ে শরীরের রাসায়নিক ক্রিয়া পাল্টে দিতে পারে, এটা জানবার পর থেকেই বিজ্ঞানীরা ভাবছেন, তাহলে শরীরের বিশেষ এনজাইম বা হরমোনের ঘাটতি থাকলে ভাইরাস ঢুকিয়ে দিয়ে তার পূরণ সম্ভব হবে না কেন? ইন্টারফেরনের মত ভাইরাস-সংক্রমণ প্রতিরোধী পদার্থকেও তৈরি করা যাবে না কেন গবেষণাগারের আধারে মাইক্রোজীবদের সাহায্য নিয়ে? সায়েন্স-ফিকশন মনে হতে পারে, কিন্তু নাইট্রোজেন পাকড়ানোর ব্যাকটিরিয়ার জিন আলাদা করে নিয়ে গাছের ডি-এন-এ’র মধ্যে বসিয়ে দিলে যে নতুন কোষ তৈরি হবে, তা একাধারে গাছের ফটোসিন্থেসিস আর পশুর পুষ্টিকর পদার্থ তৈরির ক্ষমতা রাখবে একই কোষের মধ্যে। জিন-দের এইভাবে জোড়াতালা লাগাতে গিয়ে মহাবিপদও ঘটতে পারে—বৈজ্ঞানিকরা তাই হুঁশিয়ার। কিন্তু কোষ-কমপিউটারদের মত নতুন জীবদের বানিয়ে নিয়ে সমুদ্রে, মরুভূমিতে ছেড়ে দেওয়া যাবে—আজকের মাইক্রোবদের জেনেটিক রিজার্ভ তাই খুব দরকারি। ডি-এন-এ হেলিক্স-এর মধ্যে অবিশ্বাস্য তথ্য সংকেত আকারে রয়েছে—ঠিক যেন কমপিউটারের প্রোগ্রামিং। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং তাই ভাবছে নতুন প্রাণ সৃষ্টির কথা।
প্রশ্ন : মাইক্রোব, মানে, এই অণু-জীবরা কত ছোট হয়, মা?
মা : ভাইরাসরা সবচেয়ে ছোট, অ্যালগি আর ফাংগাসরা সবচেয়ে বড়—সাইজরেঞ্জের মাঝামাঝি জায়গায় রয়েছে ব্যাকটিরিয়ারা। তবুও বেজায় ছোট নয়। এক কিউবিক ইঞ্চির একটা বাক্সে মাঝামাঝি সাইজ ভ্যারাইটির একটা ব্যাকটিরিয়ার ৯,০০০,০০০,০০০,০০০ গুলোকে ঢুকিয়ে রাখা যায়। এদের মাপতে হয় মাইক্রোমিটার দিয়ে—যা এক মিটারের দশ লক্ষ ভাগের এক ভাগ। সব চাইতে ছোট আকারের ব্যাস প্রায় দু-মাইক্রোমিটার—তাকে বলা হয় ‘কোক্কাই’। বড়-আকারের ‘ব্যাসিলাই’ লম্বায় দশ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। কয়েক ধরনের মাইক্রো-প্লাজমার ব্যাস মাত্র ০·১৩৫ মাইক্রোমিটার। ভাইরাস আরও ছোট। তাদের মাপার জন্যে দরকার নতুন স্কেল; সেটা এক মিলিমিটারের দশ লক্ষ ভাগের এক ভাগ। স্মলপক্স ভাইরাসের ব্যাস অবশ্য ০·২৫ মাইক্রোমিটার।
প্রশ্ন : এত ছোট বলেই অণু-জীবরা নীচুস্তরের প্রাণী, তাই না, মা?
মা : মোটেই না। এরা আদিম তো নয়ই, বরং অত্যাধুনিক। নীচুস্তরের নয়—রীতিমত নিপুণ কর্মী। সাইজ ছোট বলেই তো এদের তাচ্ছিল্য করা হয়। এই পৃথিবীর সবচেয়ে সফল প্রতিনিধি নির্বাচনের ভোট যুদ্ধে নামলে জিতবে অণু-জীবরা। মানুষের অনেক আগে তারা এই পৃথিবীতে ঘর-সংসার করে এসেছে—নানা প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থেকেছে—মানুষ যা পারছে না। ওই টুকু শরীরে মাত্র একটা কোষের মধ্যে প্রাণ ধারণের সমস্ত ক্রিয়াকর্ম প্যাক করে রেখেছে—যে সবের জন্যে মানুষের দরকার হয় অনেক টিশু আর দেহযন্ত্র।
প্রশ্ন : ছোট্ট হলেই বুঝি দক্ষতা বাড়ে?
মা : একটা জিনিসের ভল্যুম যত তাড়াতাড়ি বাড়ে, তার সারফেস এরিয়া ততটা বাড়ে না। উল্টোভাবে বললে, একটা জিনিস যত ছোট হবে, ভল্যুমের অনুপাতে তার সারফেস এরিয়া অনেক বেশি থাকবে। মানুষের বেলায়, সারফেস এরিয়া-র সঙ্গে ভল্যুমের অনুপাতের হার হয় যদি কুড়ি, বিশেষ একটা ব্যাকটিরিয়ার ক্ষেত্রে তা হবে নব্বই লক্ষ! সে খাবার খাচ্ছে আর ছিবড়ে করে বের করে দিচ্ছে শরীরের আবরণের মধ্যে দিয়ে—ছোট হওয়ার সুবিধে তো এইখানেই। বড় কোষের চেয়ে ছোট কোষে রাসায়নিক কাজকর্ম চলে বেশি দ্রুত। প্রচণ্ড এই ক্ষমতার জন্যেই সিনথেটিক কেমিস্ট হিসেবে ব্যাকটিরিয়া, ঈস্ট আর অন্যান্য মাইক্রোবদের এত কদর—জঞ্জাল সাফ করতেও তাদের জুড়ি নেই।
প্রশ্ন : অণু-জীবরা এত তাড়াতাড়ি সংখ্যায় বেড়ে যায় কীভাবে?
মা : ভল্যুম ঠিক রাখার তাগিদে। ভল্যুম বাড়লেই সারফেস এরিয়া কমছে, খাবার নেওয়া আর জঞ্জাল ফেলে দেওয়ার বিনিময় স্পিড কমছে; তখন ব্যাকটিরিয়াররা বড় কোষটাকে ভেঙে নিয়ে দুটো ছোট কোষ বানিয়ে নেয়। ঈস্টরা কুঁড়ি বানিয়ে ছোট সাইজের হয়ে যায়। ই কোলাই ব্যাকটিরিয়ার পুরো নাম Escherichia coli, মানুষের অস্ত্রে রয়েছে বহাল তবিয়তে—মিনিটে প্রায় কুড়িবার কোষ ভেঙে নতুন কোষ বানাতে পারে। এক চামচ মাংসে ই কোলাই-এর একটা কোষ রেখে দিলে তিন ঘন্টায় তা হাজার গুণ বেড়ে যাবে। এরকমভাবে বংশবৃদ্ধি আর কোনো জীবের পক্ষে কি সম্ভব?
প্রশ্ন : অণু-জীবদের গড়ন কী রকম?
মা : কোষ-ঘেরা দেওয়ালটা এদের শরীরের সবচেয়ে আশ্চর্য জিনিস। ভীষণ শক্ত দেওয়াল; গায়ে অজস্র ফুটো—যাতে কোষের মধ্যে আসা-যাওয়া করতে পারে রকমারি উপাদান। কিন্তু এই আসা-যাওয়াটাকে নিয়ন্ত্রণ করে কোষের মিহি ঝিল্লী। দেওয়াল আগলে রেখে দেয় এই পাতলা পর্দাকে। আর, এই দেওয়াল ভাঙতে গিয়েই গবেষকদের হিমসিম খেতে হয় গবেষণাগারে। কোষের মধ্যে রয়েছে প্রোটোপ্লাজম—রাসায়নিক কর্মকাণ্ডর ফুটন্ত মসলার কড়াই বলা চলে তাকে। বংশগতির উপাদানকে ঘিরে থেকে সেখানকার সঙ্কেতগুলোর তর্জমা করে নতুন কোষ গড়ছে, পুরোনো কোষকে চাঙা রাখছে। ই কোলাই ব্যাকটিরিয়ার জেনেটিক উপাদান ডি-এন-এ অর্থাৎ ডি অক্সিরিবোনিউক্লিক অ্যাসিড-এর বংশগতি নির্দেশকে অনুবাদ করে দিচ্ছে আর-এন-এ অর্থাৎ রিবোনিউক্লিক অ্যাসিড—কোষের এত নির্দেশ আর কাজকর্ম চলছে অজস্র এনজাইম আর প্রোটিনের মধ্যস্থতায়। মানুষ, কপি, চিতা আর অন্যান্য জীবের ক্ষেত্রেও চলছে DNA-RNA-এনজাইম-প্রোটিনের একই বিস্ময়কর ক্রিয়া। বটানিস্টরা Eugleoid প্রাণীদের বলেন অ্যালগি, প্রাণীবিজ্ঞানীরা বলেন জন্তু—কেন না তাদের মুখ, উদর, চোখের মত প্রত্যঙ্গ আছে।
প্রশ্ন : ব্যাকটিরিয়া চলাফেরা করে কিভাবে?
মা : অদ্ভুতভাবে। সবচেয়ে বেশি স্পিড, তোর বা আমার হিসেবে, ঘণ্টায় ০·০০০১ মাইল। জলের মত থকথকে বস্তুর মধ্যে পুঁচকে ব্যাকটিরিয়ার এই স্পিড অবাক করার মত ঘটনা। গুড় ভর্তি সমুদ্রে নৌকা চালানোর সঙ্গে তুলনা করা যায়। নৌকা তখন চলবে না। ব্যাকটিরিয়া কিন্তু চলে। কারও থাকে flagela, কারও থাকে মিথ্যে-পা বা pseudopodia।
প্রশ্ন : ব্যাকটিরিয়া অনাহারে মরে না?
মা : বড় সুবিধাবাদী এরা। খাবার পেলে বোমার মত ফেটে পড়ে বংশবৃদ্ধি করে চলে—না পেলে গুটির মধ্যে ঢুকে ঘাপটি মেরে থাকে—বাইরের হাজার বৈরী পরিবেশেও তার কিস্সু হয় না। সতেরো শতকের জীবন্ত ব্যাকটিরিয়া গুটিও তো পাওয়া গেছে মাটির নমুনায়।
প্রশ্ন : ভাইরাসের গড়ন কী রকম?
মা : ডি-এন-এ ঠাসা—তার চেয়ে একটু বেশি; কয়েক ক্ষেত্রে আর-এন-এ’ও থাকে। এক জীবন্ত কোষ থেকে আর এক জীবন্ত কোষে চালান হয়ে যায় এই ভাইরাস—জীবন্ত কোষগুলো হতে পারে মানুষের, পশুর, গাছের বা ব্যাকটিরিয়ার। অন্যকে ধরেই এদের টিকে থাকা। নিজেদের জোরে বাঁচতে পারে না—তাই এদের কেমিক্যালের মত কৃস্টাল বানিয়ে বোতলে পুরে তাকে তুলে রাখা যায়। কিন্তু জ্যান্ত কোষের সংস্পর্শে এলেই অ্যাটাক করে তক্ষুনি। কোষ ধ্বংস হয়, রোগসৃষ্টি হয়, আবার এই ভাইরাসই বংশগতির ধারা বয়ে নিয়ে যায় কোষের মধ্যে, যে পরিবর্তনটা ঘটায়—তা ক্ষতির বদলে উপকারই করে। ব্যাকটিরিয়া-ভাইরাসকে দেয় colicin নামে হানাদার-প্রোটিন রুখে দেওয়ার ক্ষমতা। টিউলিপ ফুলের অত রঙের বাহার তো ভাইরাস সংক্রমণের জন্যেই হয়।
প্রশ্ন : অণু-জীবদের সহ্যশক্তি কতটা, মা?
মা : ধারণায় আনা শক্ত। ছোট্ট বলে আর তাদের তাচ্ছিল্য করা যায় না। আমাদের স্বাভাবিক বডি টেম্পারেচার প্রায় ৩৭ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড; ৩২-এর নিচে নামলে অথবা ৪১-এর ওপরে উঠলে তক্ষুনি ডাক্তার ডাকতে হয়। ব্যাকটিরিয়ারা এ-ব্যাপারে টেক্কা মারে আমাদের। নিউজিল্যাণ্ড আর আইসল্যাণ্ডের ফুটন্ত প্রস্রবণে তাদের পাওয়া গেছে। মেরু অঞ্চলের আবর্জনায় মাইনাস ১২ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডেও তারা হেসে খেলে রয়েছে। হয়তো একই ধরনের অণু-জীব দু-জায়গাতে নেই—কিন্তু তাপমাত্রার মস্ত ফারাকের মধ্যে তাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি মানুষ বা অন্য জন্তুর তুলনায় অনেক বেশি। অ্যালগি দল বেঁধে বেড়ে ওঠে বরফ-প্রান্তরে অথবা হিমবাহতে—আলাদা কোষগুলোকে দেখা না গেলেও তারা কাতারে কাতারে আছে বলেই বরফ কখনো লাল, কখনো সবুজ হয়ে থাকে। দক্ষিণ মেরুতে ভাসমান বরফের তলায় অ্যালগি সংসার করে—বরফ ভেদ করে আসা অত কম আলো পেয়েও আর অত মারাত্মক ঠাণ্ডাতেও তারা মহাখুশি। আবার দ্যাখ, ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কের উষ্ণ প্রস্রবণে পরমানন্দে থাকে তাপপ্রিয় অ্যালগি আর ব্যাকটিরিয়া। অক্সিজেন না থাকলে মানুষ অক্কা পায়। কিন্তু কিছু ব্যাকটিরিয়া অক্সিজেনের মধ্যে বরং পটল তোলে—অক্সিজেন না থাকলে তোফা বেঁচে থাকে। গ্রেট সল্ট লেক আর ডেড সী-র মারাত্মকভাবে লোনা জল কিছু ব্যাকটিরিয়ার কাছে স্বর্গ বললেই চলে; আবার কড়া অ্যাসিড যে-সব জলা, প্রস্রবণে আর লেকে রয়েছে—সেখানেও তারা বড় সুখে আছে। ১৯৬৮ সালে দক্ষিণ মেরুতে গিয়ে, আগের এক অভিযাত্রীর কুঁড়েতে ঢুকে, ১৯১৩ সালে ফেলে যাওয়া বরফ-জমা মল পাওয়া গেছিল। দেখা গেছিল, ই-কোলাই কোষ তার মধ্যে তখনো টিকে আছে। ১১০ ভোল্ট কারেন্টের শক দিয়েও দেখা গেছে, অণুজীবরা তা গায়ে মাখে না। ডীপ-ফ্রীজের মাইনাস ২০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডে ব্যাকটিরিয়া আর অন্যান্য অণু-জীবদের রেখে দেওয়া হয় গবেষণার জন্যে। চাঁদ আর মঙ্গলগ্রহের পরিবেশ নকল করে তার মধ্যে অণু-জীবদের রেখে দেখা গেছে—তাও তাদের গা-সওয়া।
প্রশ্ন : এত সহ্যশক্তি বলেই কি ওরা পেট্রল বানাতে পেরেছে?
মা : বহু বৈজ্ঞানিক ঠিক তাই মনে করেন। অন্তত নিশ্চয় একটা মস্ত ভূমিকা নিয়েছে অণু-জীবরা। পেট্রল সংশ্লেষণ প্রথম ঘটেছিল সমুদ্রের তলায় নিশ্চয় প্রায় এক লক্ষ পাউণ্ড চাপে—প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে। দুঁদে অণু-জীবদের সহন-ক্ষমতা এর চাইতে অনেক বেশি। বেশি নুন, ৮০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত তাপমাত্রা আর অক্সিজেন না থাকা—এ সবই তো অণু-জীবদের কাছে স্বর্গীয় পরিবেশ। ভয়ঙ্কর এই প্রতিকূল অবস্থায় অন্য কোনো প্রাণ টিকতে পারে?
প্রশ্ন : অণুজীবরা খাবার হজম করে শক্তি অর্জন করে নিশ্চয় অনেক ট্রিক্স্ খাটিয়ে?
মা : যা বলেছিস। ব্যাকটিরিয়ারা বিখ্যাত তাদের metabolic tricks আর অনেকরকম বৈশিষ্ট্যের জন্যে। এই জন্যেই তো ‘প্রাণের রহস্য’ উদ্ঘাটন করতে গিয়ে ওদের বায়োকেমিস্ট্রির শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। মানুষ আর বহু স্তন্যপায়ী জীব বিবিধ জৈব বস্তুকে ভেঙে নিয়ে এনার্জি বানায়। কার্বোহাইড্রেট থেকে গ্লুকোজ তৈরি করতে গিয়ে ধাপে ধাপে কয়েকটা রাসায়নিক বিক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। ফ্যাট থেকেও আর এক পথে এনার্জি টেনে বের করতে হয়। কিন্তু সেলুলোজকে ভেঙে গ্লুকোজ বের করতে পারি না বিশেষ এনজাইমের অভাবে। এই সব ব্যাপারে ব্যাকটিরিয়াদের ট্যালেন্ট মানুষের চেয়ে বেশি। তারা সরাসরি অজৈব জিনিস থেকে এনার্জি বানিয়ে নেয়; যেমন, অ্যামোনিয়া, গন্ধক, লোহা আর নাইট্রাইট্স্ থেকে। জৈব খাদ্য থেকে আমরা আমাদের টিশু বানাই, এনার্জিও জুটিয়ে নিই—কিছু ব্যাকটিরিয়া তাদের কোষের চাহিদা বানিয়ে নেয় অ্যামোমিয়া, কার্বন ডায় অক্সাইড আর জল থেকে। প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট, নিউক্লিক অ্যাসিড—সবই সংশ্লেষণ করে নেয়। পৃথিবীর বেশির ভাগ প্রাণের এনার্জির মূল উৎস সূর্য। কিছু অণু-জীব সূর্য কিরণকে সরাসরি কাজে লাগায়। এদের বলে autotrophs। রোদ্দুরের এনার্জি দিয়ে কার্বন-ডায়-অক্সাইড গ্যাস থেকে নিজেদের জৈব টিশু বানিয়ে নেয়। Beggiatoa ব্যাকটিরিয়া পচা ডিমের হাইড্রোজেন সালফাইড থেকে সালফার তৈরি করে। Nitrosomonas ব্যাকটিরিয়া নাইট্রেট-কে নাইট্রেট বানিয়ে বহাল তবিয়তে টিকে থাকে। এদের এই এনজাইম ক্ষমতাকেই কেমিক্যাল ইণ্ডাস্ট্রিতে খাটানো হচ্ছে। ‘নাক’ যাদের নেই, দুর্গন্ধে যারা নাক সিঁটকোয় না—সেই সব ‘নীচু’ জাতের অণু-জীবরা সঠিক এনজাইম সাপ্লাই করে দুনিয়ার দুর্গন্ধ আর বিষাক্ত বস্তুকে স্রেফ হজম করে ফেলছে। মানুষ কি পারে এই কেরদানি দেখাতে?
প্রশ্ন : কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার নাকি অণু-জীবরা?
মা : কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়াররা অনেক টেম্পারেচার, অনেক প্রেসার, অনেক হুলুস্থূল কাণ্ড ঘটিয়ে যা করছে, অণু-জীবরা নিঃশব্দে ঢাক না পিটিয়ে তার চাইতেও অনেক বেশি কাজ করে চলেছে। গাছ আর প্রাণীদের চাহিদা মিটিয়ে চলেছে কার্বন, নাইট্রোজেন, সালফার এবং আরও অনেক অজৈব বস্তুকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কাজে লাগিয়ে। ওরাই ছেয়ে রেখেছে পৃথিবীকে। সমস্ত অণু-জীবদের কোষগুলোকে একসঙ্গে ওজন করলে দেখা যাবে, পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীর ওজনের চেয়ে পঁচিশগুণ বেশি। ওদের বেশির ভাগই গড়ছে, আমাদের সাহায্য করছে, স্বাস্থ্য বজায় রাখছে—সামান্য কিছু বদমাস দল বেঁধে রোগ ছড়াচ্ছে। ওরকম সমাজশত্ৰু কি আমাদের মধ্যেও নেই?
প্রশ্ন : অণু-জীবরা স্ট্রাইক করলে মানুষ বিপদে পড়বে, এই তো?
মা : পথিবী থেকে মানুষ জাতটা মুছে যাবে যদি সমদ্রের অণুজীবরা অক্সিজেন উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। ডাঙায় গাছ দিচ্ছে বেশির ভাগ অক্সিজেন। কিন্তু পৃথিবীর অক্সিজেনের চাহিদার বেশির ভাগটা দিচ্ছে তো সমুদ্রের অণু-জীবরা। ওরা ধর্মঘট করলে বিশ বছরেই বাতাসে অক্সিজেনের ঘাটতিপূরণ আর ঘটবে না। তখন অনেক অণু-জীব তোফা থাকবে—মানুষ আর থাকবে না।
প্রশ্ন : গাছপালাদেরও কি বেঁচে থাকতে সাহায্য করছে অণু-জীবরা?
মা : নিশ্চয়। এ ওকে সাহায্য করছে—পরস্পরকে টিকিয়ে রাখছে। গাছ থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করছে কিছু ফাংগাস, আবার সেই ফাংগাসই ফসফরাসের মত অনেক পুষ্টির জোগান দিয়ে চলেছে গাছকে।
প্রশ্ন : অণু-জীবরা পশুপাখিদেরও কি সাহায্য করে?
মা : নিশ্চয় করে। গরুবাছুর, ছাগল-ভেড়া, উট-জিরাফ এবং আরও অনেক নিরামিষাশী জন্তু ঘাসপাতা খেয়ে বিলকুল হজম করে। ঘাসপাতায় থাকে প্রচুর সেলুলোজ—যার মধ্যে থাকে কার্বোহাইড্রেট। আগেই বলেছি, সেলুলোজ হজম করার বিশেষ এনজাইম মানুষের নেই—কিছু মাইক্রোবের আছে। তারা দল বেঁধে থাকে কিছু পশুর পেটের মধ্যে—বিনা অক্সিজেনে। এরাই হজম করে। নেপোয় মারে দই, মানে, লাভটা নেয় মাইক্রোবদের গৃহস্বামীরা। তারপর, ধর, মোম হজম করা চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। যে-পাখিরা মোম খেয়ে উল্লাসে ফেটে পড়ে, তাদের মোম হজম করায় পেটের মধ্যে বাসা বেঁধে থাকা একটা ঈস্ট, আর একটা ব্যাকটিরিয়া।
প্রশ্ন : মানুষকেও তাহলে অণু-জীবদের ওপর নির্ভর করতে হয়?
মা : অবশ্যই করতে হয়। নীচু জাতের এই অণু-জীবরাই আমাদের পেটের মধ্যে থেকে ভিটামিন K, ভিটামিন B12 ভিটামিন B গ্রুপের অন্য ভিটামিন তৈরি করছে। খেয়ে পরে নিজেরা বেঁচে আছে, আমাদেরও বাঁচিয়ে রাখছে। জীবাণু-হীন প্রাণীর শরীরে ই-কোলাই ঢুকিয়ে দেওয়ার পর দেখা গেছে, ভিটামিন K-র চাহিদা কমে গেছে, রক্ত ফের জমাট বাঁধছে—না থাকলে রক্তপাত বন্ধ হতেই চায় না। B12 না থাকলে অ্যানিমিয়া হবে মানুষের—গাছপালা মানুষ কেউই এই ভিটামিন বানাতে পারে না। দুধের ল্যাকটোজ যারা সইতে পারে না, তাদের বন্ধু যে অস্ত্র-জীবাণু, সে ল্যাকটোজ এনজাইম দিয়ে ল্যাকটোজ হজম করিয়ে দিচ্ছে। অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার পরেই এই অদৃশ্য বন্ধুদের পাইকারি হারে নিপাত করার ফলটা হাড়ে হাড়ে টের পাই আমরা।
প্রশ্ন : সমুদ্রের প্রাণীদের উপকার করে অণু-জীবরা?
মা : অনেকরকম ভাবে করে—নিজেরাও উপকৃত হয়। একেই বলে মিলেমিশে থাকা। স্কুইড আর কিছু মাছের গা থেকে আলো ঠিকরে বেরোয় আলো-ব্যাকটিরিয়াদের জন্যে—জোনাকির মত এরা আলো ছড়ানোর কেমিক্যাল নিজেরা বানাতে পারে না।
প্রশ্ন : অণু-জীবরা কি পোকামাকড়দেরও বন্ধু?
মা : যে পোকা-মাকড় শস্যের ক্ষেত তছনছ করছে, কেমিক্যাল কীটনাশক দিয়ে যাদের মারতে গিয়ে মানুষ নিজের বিপদ ডেকে আনছে—তাদের ধ্বংস করার জন্যে মৃত্যুদূত হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে বিশেষ বিশেষ মাইক্রোবকে। ঝড়েবংশে সবাইকে নিধন করাটা বোকামি। অণু-জীবদের সে কাণ্ডজ্ঞান আছে। এমনকি রক্তবীজের মত বেড়ে ওঠা খরগোশদের সংখ্যাও কমিয়ে আনা হয় মাইক্রোব লেলিয়ে দিয়ে—ফলে বেঁচে যায় রক্ত জল করে তৈরি করা শস্য।
প্রশ্ন : অণু-জীবরা তাহলে ত্রাতা মধুসূদন?
মা : ফচকেমি বন্ধ হয়ে যাবে এদের সব কীর্তি শুনলে। জার্মানিতে যুদ্ধের সময়ে বিস্ফোরণের নাইট্রোগ্লিসারিন বানাতে গিয়ে গ্লিসারিনে ঘাটতি পড়েছিল। সাবান তৈরির পর অল্পসল্প গ্লিসারিন পাওয়া যায়—তাতে কি হবে? শুধু তো বিস্ফোরক নয়—সেলোফেন, টেক্সটাইল, পেন্টস, এবং আরও অসংখ্য জিনিসে দরকার হয় গ্লিসারিনের। অণু-জীবদের কৃপায় জার্মানি তখন মাসে দশ লক্ষ কিলো গ্লিসারিন বানিয়ে ইজ্জত বাঁচিয়েছিল।
প্রশ্ন : আর কি বানাতে পারে অণু-জীবরা?
মা : অ্যাসিটোন আর বুটানল—খুবই দরকার হয় প্লাস্টিক আর অন্যান্য কারখানায়। বেশ কয়েকটা মাইক্রোব চোস্ত-কেমিস্ট এই সংশ্লেষণের ফিল্ডে—সবচেয়ে ওস্তাদ Clostridium নামে একটা ব্যাকটিরিয়া—অক্সিজেন যাদের কাছে বিষ। শর্করাকে ভেঙে বুটানল আর অ্যাসিটোন ছাড়াও বানিয়ে দেয় নানারকম অ্যাসিড আর অ্যালকোহল। মাইক্রোব মস্ত ইতিহাস রচনা করে দিয়েছে একটা নতুন রাষ্ট্র বানিয়ে দিয়ে।
প্রশ্ন : বলো কী! মাইক্রোব বানিয়েছে নতুন রাষ্ট্র?
মা : ব্যাপারটা সেইরকমই তো দাঁড়াচ্ছে। Chaim Weizmann ছিলেন কেমিস্ট, হলেন ইজরায়েলের প্রথম প্রেসিডেন্ট। কেন? না, তিনি মাইক্রোব দিয়ে সেই প্রথম বেশি করে অ্যাসিটোন তৈরি করেছিলেন বৃটেনের বারুদ-মন্ত্রী ডেভিড জর্জের ইচ্ছায়—১৯১৫ সালে। বিনিময়ে সম্মান চাননি Weizmann—নিজে ছিলেন ইহুদী—তাই চেয়েছিলেন ইহুদীদের জন্যে তোক একটা আলাদা রাষ্ট্র। ১৯৪৯ সালে সৃষ্টি হল ইজরায়েল। মাইক্রোব-মহিমা বুঝতে তোর অনেক সময় লাগবে—এদেরই দৌলতে পরে তৈরি হয়েছে বুটানিডিয়ল—শস্য থেকে—সিনথেটিক রাবার তৈরির জন্যে—তৈরির কৃতিত্ব পেয়েছে ব্যাকটিরিয়া Bacillus polymyxa।
প্রশ্ন : ব্যাকটিরিয়া আরাধনায় আর কি-কি বর পাওয়া যায়, মা?
মা : সাইট্রিক অ্যাসিড—বানাচ্ছে Aspergillus নামে অণু-জীব। এরাই বানাচ্ছে Itaconic acid—প্লাস্টিক আর পেন্টস্ কারখানায় বড় দরকার। গ্লুকোনিক অ্যাসিড—দরকার ওষুধের কারখানায়। ল্যাকটিক অ্যাসিড—তার দরকারের ফিরিস্তি অনেক লম্বা। খাবারে মেশানোর জন্যে ভিটামিন আর অ্যামিনো অ্যাসিড-ও বানিয়ে দিচ্ছে মাইক্রোবরা। অ্যান্টিবায়োটিকস্ তো বানাচ্ছেই। আরও বানাচ্ছে alignate—চটচটে বস্তু—আইসক্রিম, সুপ, আরও অনেক আহার্যকে ঘন করে তোলার জন্যে। Ustilago zeae নামে একটা ছত্রাক বানাচ্ছে Ustilagic acid—পারফিউম তৈরির musk বানাতে খুবই দরকার—খুব সস্তায়—কেমিক্যালি তৈরি করতে গেলে পড়তায় পোষায় না।
প্রশ্ন : পারফিউমের চাইতে অনেক দরকারি তো ওষুধ। বানাতে পারে অণু-জীবেরা?
মা : পলিকিউলের স্ট্রাকচার পাল্টে দিতে পারে। ১৯৩৭ সালে প্রথম দেখা গিয়েছিল, স্টেরয়েড-এর স্ট্রাকচার পাল্টে দিতে পারে ঈস্ট—গেঁটেবাতের মোক্ষম ওষুধ তৈরি করতে দরকার পশুর অ্যাড্রেন্যাল গ্ল্যান্ড। ছ’ হাজার পশু বধ করলে পাওয়া যেত একশ মিলিগ্রাম হরমোন। এখন কয়েকটা গাছের স্টেরয়েড-কে ভেঙেচুরে কর্টিসোন বানিয়ে দিচ্ছে ঈস্ট। ফলে, হু-হু করে দাম পড়ছে কর্টিসোনের। এরপরেও অণু-জীবরা বানিয়ে দিয়েছে প্রেডনিসোন আর বিটামিথাজোন। প্রেডনিসোন-কে বানিয়েছে ডিপথেরিয়া জীবাণুর এক জ্ঞাতিভাই—কর্টিসোনের চাইতে পাঁচগুণ বেশি শক্তিশালী হয়েও প্রেডনিসোন কর্টিসোনের মত অপকার করে না। অণু-জীবদের রাসায়নিক নৈপুণ্যর সব শুনতে গেলে নাওয়া খাওয়া ছাড়তে হবে।
প্রশ্ন : কিসের জোরে কেমিস্টগিরি করছে অণু-জীবরা?
মা : এনজাইমের জোরে।
প্রশ্ন : ভাঙচুর করে নতুন জিনিস গড়ছে এনজাইম? ইঞ্জিনিয়ার নাকি?
মা : এনজাইম ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে রীতিমত গবেষণা চলছে—চালাকি খাটিয়ে অণু-জীবদের দিয়ে কখনো বেশি, কখনো সীমিত এনজাইম তৈরির চেষ্টা করছেন অনেকে। ওষুধপত্রে অণু-জীব এনজাইমের কীর্তিকলাপ এখন কিংবদন্তীর পর্যায়ে পৌঁছেছে। হজম করানোর জন্যে, জমাট রক্তের দানাকে ভেঙে দেওয়ার জন্যে, এনজাইম ম্যাজিক দেখিয়ে চলেছে। মাইক্রো-ক্যাপসুলে ভরে এনজাইম ঢুকিয়েও দেওয়া হয়েছে শরীরে ভাইটাল এনজাইমের ঘাটতি আছে বলে। Asparaginase নামে একটা ব্যাকটিরিয়া-এনজাইমকে লাগানো হয়েছে বিশেষ কয়েক ধরনের রক্তের ক্যানসার চিকিৎসায়। আগে একবার বলেছি, আবার বলছি, কিডনির দোষে রক্তের ময়লা সাফ করার জন্যে ক্যাপসুল ভর্তি এনজাইম ঢোকানো হয়েছে শরীরে। এই যে লিনেনের জামাটা পরেছিস, অণু-জীবরা খেল্ না দেখালে পরতে পারতিস?
প্রশ্ন : লিনেনের জামা করে দিয়েছে অণু-জীবরা?
মা : হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে মাইক্রোব দিয়ে লিনেন বানানোর শিল্প। ইংরেজিতে একে বলে retting—Linum জাতীয় Flax গাছের অদরকারি অংশ পচিয়ে দিয়ে দরকারি অংশটুকু বের করে নেওয়া। শনের সেলুলোজ ধ্বংস করে দিয়ে আঁশগুলোর বন্ধনমুক্তি ঘটায় অণু-জীবরা। তৈরি হয় লিনেন।
প্রশ্ন : এতই যদি ক্ষমতা অণু-জীবদের, বিদ্যুৎ-ঘাটতি মেটাতে পারে না?
মা : ভবিষ্যতে তাও হয়তো হবে। ১৯১১ সালে M C Potter নামে এক ভদ্রলোক জানালেন, ব্যাকটিরিয়াদের ব্যাবহার করে বিদ্যুৎ তৈরি করা যায়। ব্যাকটিরিয়া আর ঈস্ট-কে জৈব পদার্থের মধ্যে রাখলে মৃদু ইলেকট্রিক্যাল কারেন্ট তৈরি হয়। অণু-জীব ব্যাটারি দিয়ে পটার সাহেব ০·৩৬৫ ভোল্টের বিদ্যুৎ তৈরি করেছিলেন। বিশ বছর পরে একজন মার্কিন বৈজ্ঞানিক বানিয়েছিলেন 35 ভোল্ট। লেগে থাকলে মাইক্রোব পাওয়ার হাউস-ই বা হবে না কেন?
প্রশ্ন : নিউটন, ডারউইন, আইনস্টাইনকেও ম্লান করে দেবে নাকি অণু-জীবরা?
মা : নিউটনের মেক্যানিক্স, ডারউইনের ইভলিউশন, আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি-র সমকক্ষ হয়ে যেতে পারে অণু-জীবদের কীর্তি—সেদিন তারা প্রাণের রহস্য উদ্ঘাটন করে ছাড়বে, বিশ্বরহস্য সহজসরল করে দেবে।
প্রশ্ন : প্রাণের রহস্য?
মা : লাইফের ফিজিক্যাল বেসিস কী? প্রাণের কেমিস্ট্রি কী? বিখ্যাত জার্মান বায়োকেমিস্ট Otto Meyerhof দেখিয়েছেন, ঈস্ট গাঁজানোর কিছু এনজাইম রিঅ্যাকশন প্রাণীর পেশিতেও ঘটে চলেছে। সব প্রাণীর গড়ন আর আচরণের গোড়ায় যে একটা মিল আছে, অনেক পণ্ডিত আজকের ইকলজিস্টদের আগেই বলেছিলেন। বায়োকেমিক্যাল Universality শুধু ডারউইনকেই থমকে দিচ্ছে না, পৃথিবীর সমস্ত প্রাণের মূল যে একটাই—তাও বলছে জোরের সঙ্গে। আমরা সবাই এক—এই ঐক্যবোধের নবচেতনা গ্রহের অন্য সব বাসিন্দাদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টে দিচ্ছে। এমনকি অ্যালগি গাছপালার ফটোসিনথেসিস পদ্ধতির চাবিকাঠির সন্ধান জুগিয়ে দিয়েছে—এই পদ্ধতি দিয়েই তো সবুজ গাছ সূর্যের এনার্জিকে ব্যবহার করে কার্বন ডায়-অক্সাইড থেকে সুগার, স্টার্চ আর অন্যান্য কার্বোহাইড্রেট বানিয়ে নেয়।
প্রশ্ন : মাগো, মলিকিউলের স্ট্রাকচার যারা পাল্টাতে পারে, তারা তো মানব-দানবও বানাতে পারে?
মা : পারে বইকি। ১৯২৮ সালে লাজুক বায়োকেমিস্ট ফ্রেড গ্রিফিথ প্রথম দেখিয়ে দিলেন একটা মাইক্রোব কোষের বিশেষ একটা কেমিক্যাল আর একটা মাইক্রোবের স্বভাবচরিত্র এক্কেবারে স্থায়ীভাবে বদলে দিতে পারে। এই কেমিক্যালেরই পরে নাম দাঁড়িয়েছিল DNA। গবেষণা চলেছে E. Coli ব্যাকটিরিয়া নিয়ে। নিরীহ ব্যাকটিরিয়া খুনে ব্যাকটিরিয়া হয়ে যেতে পারে। পরে দেখা গেল ভাইরাসেরও আছে এই ক্ষমতা। DNA ঠিক যেন তথ্যবোঝাই একটা কমপিউটার। এই DNA-র একটু ক্ষতি হলেই সংকেত যাবে পাল্টে—একটা কোষ আর একটা কোষের মত হবে না—মানব তখন দানব হয়ে যেতে পারে।
প্রশ্ন : ভয়ানক কাণ্ড! ডি-এন-এ’কে আগলে রাখার মত অণু-জীব নেই?
মা : তাও আছে। অনেক রকম রেডিয়েশন সহ্য করে আছি কি করে আমরা? Micrococcus radiodurans ব্যাকটিরিয়ার জন্যে। বিকিরণের মারাত্মক ডোজ সইতে ওস্তাদ। মানুষের কোষেও এরা কাজ করছে—একটু কম তেজে যদিও। ডি-এন-এ রেডিয়েশন সইতে পারে না। যদি ড্যামেজড্ হয় রেডিয়েশন বা ক্ষতিকর কেমিক্যালের জন্যে—তাহলেই শুরু হয়ে যায় চার পর্যায়ের মেরামতি তৎপরতা। প্রথমেই কোষ দেখে নেয় ক্ষতিটা হয়েছে নিজের DNA-র ঠিক কোনখানে। তারপরেই দুটো এনজাইম এগিয়ে এসে কেটে বাদ দিয়ে দেয় জঘন্য জায়গাটা। অ্যাকসিডেন্টের পর ছুরি চালানো ছাড়া এদের আর কোনো কাজ নেই। কাটা জায়গার ফাঁক ভরাট করতে এগিয়ে আসে আর একটা এনজাইম—নিখোঁজ অংশটার হুবহু কপি বানিয়ে দেয়। সবশেষে এগিয়ে আসে চার নম্বর এনজাইম—কপি করা অংশটাকে ফাঁকা জায়গায় বসিয়ে বেমালুম জুড়ে দেয়। ডি-এন-এ হয়ে যায় অবিকল আগের মত। অটুট থাকে বংশগতি। বিশেষ এই ব্যাকটিরিয়ার DNA মিস্ত্রীগিরির কায়দাটা এখনও জানা যায়নি। এরকম অণুজীব আরও আছে—তবে এত তুখোড় নয়।
প্রশ্ন : তাহলে কি বলছো অদৃশ্য বন্ধুরা নিরন্তর লড়াই চালিয়ে এই পৃথিবীর সমস্ত প্রাণধারাকে অব্যাহত রেখেছে?
মা : এতক্ষণে বুঝলি!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন