অদ্রীশ বর্ধন

প্রশ্ন : নাপাম বোমা শব্দটার মানে কি, মা?
মা : Napthenate Palmitate একটা যৌগিক পদার্থ। Na আর Palm নিয়ে সন্ধি করে হয়েছে নাপাম। নাপাম বমাো প্রথম কারা ছুঁড়েছিল শুনলে অবাক হয়ে যাবি—বাইজানটাইন গ্রীকরা। তাই একে বলা হয় গ্রীক আগুন। গ্রীক আগুনের মূল উপাদানের নাম আগেই বললাম—নাপাম বোমাতেও এই জিনিস আছে। রীতিমত দাহ্য পেট্রোলিয়াম জেলিকে বিশাল গুলতি দিয়ে ছুঁড়ে দিত গ্রীকরা, জলের সংস্পর্শে এলে আপনা থেকেই ধক্ করে জ্বলে উঠত গ্রীক আগুন—তাই বাইজানটাইন যুদ্ধজাহাজে মাথায় করে রেখে দেওয়া হয়েছিল আজব এই আগুনকে। ‘গ্রীক আগুন’ ইতিহাসের গতিও পাল্টে দিয়েছে বলা যায়। ৭১৬-১৮ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম আরবরা কন্সতান্তিনোপল অর্থাৎ আজকের ইসতানবুল-কে অবরোধ করা শুরু করেছিল তাদের কাঠের জাহাজ দিয়ে। শহরের বাইজানটাইন শাসক মশায়রা বেগতিক দেখে শরণ নিয়েছিল আগুনের গোলা অর্থাৎ ‘গ্রীক ফায়ার’-এর। কাঠের জাহাজ জলের ওপর জ্বলে উঠেছিল প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড মশালের মত—পুব ইউরোপে ইসলাম আর ছড়িয়ে যেতে পারেনি। তখনকার ‘গ্রীক ফায়ার’ তৈরি হত কি-কি উপাদান দিয়ে, তা বেশি গোপন করতে গিয়ে ফর্মুলাটাই গেছে হারিয়ে। খুব সম্ভব ন্যাপথা, গন্ধক, পেট্রোলিয়াম, আলকাতরা, তার্পিন তেল, কাঠকয়লা, কলি চুন আর সোরা তো থাকতই।
প্রশ্ন : বলতে পারো প্রথম অস্ত্রগুলো কে, কবে, কোথায় বের করেছিল?
মা : তীর থেকে পরমাণু—পর-পর বলে যাচ্ছি—বাদ দেব কেবল এই ভারতের প্রাচীন পৌরাণিক অস্ত্রদের—প্রমাণ তো এখনও পাওয়া যায়নি। শুরু করছি খ্রিস্টপূর্ব থেকে: খ্রিস্টপূর্ব ৫,০০,০০০-এ ছুঁচোলো লম্বা লাঠি—প্রথম বর্শা—ব্যবহার করা হয়েছিল ইউরোপে। ২,৫০,০০০-এ আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপে এল কুঠারের আকারে পাথর। ৪৫,০০০-এ ডগায় পাথর লাগানো বর্শা—ইউরোপে। ৩০,০০০-এ তীর আর ধনুককে মাথা খাটিয়ে বের করা হয়েছিল আফ্রিকায়। ৩০০০-এ প্রথম ধাতুর তলোয়ার আর ব্রোঞ্জের ঢাল তৈরি হয়েছে মেসোপটেমিয়া আর দক্ষিণ পূব ইউরোপে। লড়াকু গাড়ি, মানে, যুদ্ধরথ তৈরি হল সেই প্রথম। ২০০০-এ মেসোপটেমিয়ায় প্রথম জানা গেল ব্রোঞ্জের বর্মের ব্যবহার শুরু হয়েছে। ৭০০-এ ফিনিশীয় আর মিশরীয়রা দাঁড়-টানা যুদ্ধজাহাজ নামালো সমুদ্রে। ৫০০-এ গ্রীক আর কার্থেজেনিয়ান-রা চালু করল বিশাল গুলতি আর অতিকায় আড়-ধনুক। ২০০-এ চিনদেশ চালু করল হাতে-ধরা আড়-ধনুক।
প্রশ্ন : খ্রিস্টজন্মের পরের ইতিহাস?
মা : ৩০০ সালে ঘোড়সওয়ারের পা-দান তৈরি হল চিনদেশে। ৯৫০ সালে আতশবাজি আর সঙ্কেতের কাজে লাগানোর জন্যে গান-পাউডার ব্যবহার করল চিনদেশের মানুষ। ১২৫০-১৩০০ সালে খুব সম্ভব চিনের মানুষই ব্রোঞ্জ আর লোহার কামান ব্যবহার শুরু করেছিল; ইউরোপে প্রথম কামান ব্যবহারের রেকর্ড রয়েছে ১৩২৬ থেকে। ১৪৯৫-এ হোলি রোমান সম্রাট ‘ম্যাক্সমিলিয়ান প্রথম’ নলচের মধ্যে সামনের দিক দিয়ে বারুদঠাসা রাইফেল চালু করলেন বলে জানা যায়। ১৫৮৫-এ Antwerp অবরোধের সময়ে ভাসমান মাইন-বোমা ব্যবহার করে ওলন্দাজরা। ১৬৫০ সালে ইউরোপে বেয়োনেটের প্রথম ব্যবহার দেখালো ফরাসীরা। ১৮০০ সালে মার্কিন আবিষ্কারক রবার্ট ফালটন হাতেনাতে দেখিয়ে দিলেন সর্বপ্রথম ডুবোজাহাজ ‘নোটিলস’। ১৮৩৩ সালে বীচ-লোডিং বোল্ট-অ্যাকশন রাইফেলের ডিজাইন করে দিলেন প্রুসিয়ান আবিষ্কারক জোহান ড্রেজি এই রাইফেলের পেছন দিক দিয়ে গুলি-বারুদ ভরে ঝটিতি ছুঁড়ে দেওয়া যায়। প্রথম বোমাবর্ষণটা হয়েছিল কিন্তু বেলুন থেকে।
প্রশ্ন : বেলুন থেকে বোমাবর্ষণ? কোথায় মা?
মা : ভেনিসে। মানুষ ছিল না সেই বেলুনে। বেলুন উড়িয়ে দিয়েছিল অস্ট্রিয়ার সৈন্যরা। সালটা ছিল ১৮৪৯। ১৮৬০ সালে প্রথম লোহার পাতমোড়া যুদ্ধজাহাজ HMS Warrior-কে জলে নামায় ইংল্যাণ্ড। ১৮৬২ সালে রিচার্ড গ্যাটলিং আবিষ্কার করলেন ‘গ্যাটলিং গান’—বহু-নলা এই বন্দুক থেকে ঘন ঘন গুলিবর্ষণ করা যায় হ্যাণ্ডেল ঘুরিয়ে; পাঁচ-নলা মডেল থেকে গুলি ছুটতো মিনিটে ৭০০টা, অর্থাৎ সেকেণ্ডে ১১টা থেকে ১২টা। নরহত্যার জন্যে অস্ত্র নয়—বিশ্বশান্তির জন্যে—এই মহান উদ্দেশ্য ছিল ডিনামাইট যিনি আবিষ্কার করেছিলেন—তাঁর মাথায়।
প্রশ্ন : ডিনামাইটের আবিষ্কারক তো আলফ্রেড নোবেল?
মা : হ্যাঁ। সুইডিশ কেমিস্ট। ১৮৬৭ সালে ডিনামাইট আর ১৮৭৫ সালে জেলিগনাইট আবিষ্কার করেছিলেন। দুটো বিস্ফোরকই পৃথিবীতে শান্তি নিয়ে আসবে, দেশে-দেশে এমনই প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা গড়ে তুলবে যে যুদ্ধবাজ দেশগুলোর লড়াকু-মনোভাব নেতিয়ে পড়বে—এই বিশ্বাস ছিল বলেই তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারের প্রতিষ্ঠাতা হয়েছিলেন। যুদ্ধ কিন্তু তারপরেও হয়েছে এবং হচ্ছে।
প্রশ্ন : আরও খুনে হাতিয়ার বেরিয়েছে?
মা : পুরোপুরি অটোমেটিক মেশিনগান আবিষ্কার করলেন আমেরিকান-ইংলিশ ইঞ্জিনীয়ার হিরাম ম্যাক্সিম ১৮৮৪ সালে। ১৯০৬ সালে ইংল্যাণ্ড জলে নামালো বিশ্বের প্রথম ইস্পাতের চাদরে মোড়া টারবাইন-প্রোপেলার-চালিত যুদ্ধজাহাজ HMS Dreadnaught।
প্রশ্ন : আকাশ থেকে মানুষ মানুষের মাথায় বোমা ফেলল কবে মা?
মা : টিনভর্তি ভয়ানক বিস্ফোরক নাইট্রোগ্লিসারিন টুপ টুপ করে এরোপ্লেন থেকে ফেলেছিল ইটালিয়ানরা ১৯১১ সালে লিবিয়া-র আইনজারা-র মানুষের মাথায়।
প্রশ্ন : আকাশ-লড়াই শুরু হল কবে?
মা : ১৯১৫ সালে। জার্মানি আর ব্রিটেন কাঠের ফ্রেম দিয়ে তৈরি বাই-প্লেন উড়িয়ে লড়ে গেছিল শূন্যপথে। ফ্লেমগ্রোয়ার অর্থাৎ আগুন-ছোঁড়ার প্রথম আধুনিক হাতিয়ারের প্রয়োগ ঘটে এই বছরেই—ঘটায় জার্মান সৈন্যরা।
প্রশ্ন : প্রথম ট্যাঙ্ক?
মা : ইংল্যাণ্ড বানিয়েছিল ১৯১৬ সালে—লণ্ডভণ্ড করে ছেড়েছিল উত্তর ফ্রান্সের Somme যুদ্ধক্ষেত্র। তারপরেই এল টার্বোজেট—১৯৩৯ সালে; নামটা খটমটে—Heinkel He 178—শক্তির পরীক্ষা হয়ে যায় জার্মানিতে। জেট ফাইটার এল তার তিনবছর পরেই—১৯৪২ সালে—আকাশে উড়ে গেল অদ্ভুতনামী Messerschmitt Me 262। ওই বছরেই উড়ুক্কু বোমাকে আকাশে উড়িয়ে যুদ্ধবাজদের থমকে দিয়েছিল জার্মানি।
প্রশ্ন : উড়ুক্কু বোমা?
মা : V-1 ফ্লাইং বম্ব। দু’বছর পরেই ১৯৪৪ সালে জার্মানির V-2 অর্থাৎ A-4 রকেট আছড়ে পড়েছিল সদ্যমুক্ত প্যারিসে। এক বছর যেতে না যেতেই আমেরিকা শুরু করে দিল পরমাণু যুদ্ধের ইতিহাস—১৯৪৫ সালে কুড়ি কিলোটন অ্যাটম বোমা ধুলো করে দিল জাপানের হিরোশিমা-কে। ১০ মেগাটন প্রথম হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষাও চালিয়ে গেল আমেরিকা ১৯৫২ সালে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে। প্রথম ইন্টার কন্টিনেন্ট্যাল ব্যালিস্টিক মিসাইল অর্থাৎ ICBM ছুঁড়ে বাজিমাত করেছিল কিন্তু রাশিয়া ১৯৫৭ সালে; SS-6 অথবা Sapwood নামধারী সেই মিসাইলের দৌড় ছিল ৬০০০ মাইল—নরহত্যার জন্যে নয়—প্রথম স্পুটনিক-কে আকাশে তুলে দেওয়ার জন্যে আবিষ্কারটা করেছিল রাশিয়া।
প্রশ্ন : সেই ICBM এখন দেশে-দেশে আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে?
মা : সেটা তো নতুন আবিষ্কারের অপরাধ নয়। ১৯৬৯ সালে প্রথম হ্যারিয়ার ‘জাম্প-জেট’ তৈরি হয়ে খাড়াইভাবে আকাশে উঠে যাওয়া আরম্ভ করেছিল ব্রিটেনেরইরয়াল এয়ারফোর্সে—এখন তাকে কি কাজে লাগানো হচ্ছে? তবে হ্যাঁ, ১৯৭০ সালে জাহাজ থেকে জাহাজ লক্ষ্য করে ছোঁড়ার মত প্রথম মিসাইল বানিয়েছিল ফ্রান্স জাহাজ ধ্বংস করার জন্যেই। তারপরেই এল নিউট্রন বোমা—১৯৭৭ সালে—যা নির্বিচারে নরহত্যা করে যাবে, কিন্তু তাদের বাড়িঘরদোর অটুট রেখে দেবে! বাহবা দেওয়ার মত তাজ্জব এই বোমা বানিয়েছিল মার্কিন দেশ। প্রথম ট্রাইডেন্ট মিসাইলও বানিয়েছিল মার্কিন দেশ ১৯৮৩ সালে—ওই বছরেই এমন ক্ষেপণাস্ত্র চালু করেছিল ইউরোপ, যা জমি থেকে উড়ে গিয়ে খুঁজেপেতে নিয়ে ধ্বংস করবে লক্ষ্যবস্তু। ১৯৮৪-তে লম্বা ধাপে এগিয়ে গেল মার্কিন দেশ স্যাটেলাইট বিধ্বংসী কামান বানিয়ে। তারপর থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত নির্বিচারে নরহত্যার কতরকম উপকরণ যে বেরিয়েছে—তা তো রোজ খবরের কাগজ পড়েই জেনে ফেলেছিস ইরাকে যুদ্ধের দৌলতে। কিন্তু জানিস কি আরবরা একদিন বন্দুক থেকে সিসের বুলেটের বদলে তীর ছুঁড়ত শএুনিপাত করার জন্যে?
প্রশ্ন : বন্দুকের নল থেকে তীর নিক্ষেপ?
মা : ১৩০০ সালে এইভাবেই আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার ঘটিয়েছিল আরবরা। সিসের নয়, লোহার বুলেটও ছোঁড়া হয়েছিল বন্দুক থেকে—১৩২৬ সালে ইটালির কাউন্সিল অফ ফ্লোরেন্সের একটা দলিল থেকে সেই খবর উদ্ধার করা হয়েছে। বিস্ফোরক বস্তুটার আসল আবিষ্কারক কে, তা কেউ না জানলেও দশ শতকে চিনদেশে যে এই জিনিস দিয়ে আতশবাজি তৈরি আর সঙ্কেত সৃষ্টি করা হত—তা আমরা জানি। তবে অনেকেই জানেন না, ইউরোপে গান পাউডারের প্রথম ফর্মুলাটা বানিয়েছিলেন যিনি, তিনি যুদ্ধপাগল সৈন্য নন—একজন শান্তিপাগল সন্ন্যাসী।
প্রশ্ন : সন্ন্যাসীর ব্রেন থেকে গান পাউডারের ফর্মুলা?
মা : নাম তাঁর রজার বেকন—বৈজ্ঞানিকও ছিলেন। জাতে ইংরেজ। ১৩ শতকে তাঁর তৈরি গান পাউডার ফর্মুলায় ছিল সাত ভাগ সোরা, পাঁচভাগ কাঠকয়লা আর পাঁচভাগ গন্ধক। চমকে ওঠার মত আর একটা ঐতিহাসিক খবর দিচ্ছি। ২৯ বছর ধরে একটা শহর ঘিরে গ্যাঁট হয়ে বসে থাকার ঘটনা কখনো শুনেছিস?
প্রশ্ন : ২৯ বছর ধরে শহর অবরোধ? এত ধৈর্য কাদের ছিল মা?
মা : মিশরীয়দের। ধৈর্য, তিতিক্ষা আর সহিষ্ণুতার পরীক্ষায় আজও ইতিহাসে ফার্স্ট হয়ে বসে আছে। খবরটা লিখে গেছেন খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের ঐতিহাসিক হেরোডোটাস। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকের শেষের দিকে ইজরায়েলের অ্যাজোটাস শহরকে ঘিরে ধরে একটানা ২৯ বছর বসেছিল। শেষকালে আত্মসমর্পণ করে সেই শহর। আজকে সেই শহরের নাম Ashdod। ইতিহাস ঘাঁটলে এইরকম আরও আজব খবর পাবি। যেমন ধর, ধার করে কামান এনে একটা দুর্গ চুরমার করে দেওয়া হয়েছিল—তারপর সেই ভাঙা দুর্গ দিয়ে কামানের দেনা শোধ করা হয়েছিল।
প্রশ্ন : কামান দেগে চূর্ণ দুর্গ দিয়ে ঋণ শোধ?
মা : তাজ্জব কি বাৎ সন্দেহ নেই। কিন্তু মহাজনের দেনা শোধ করার এমন নজির পৃথিবীর ইতিহাসে আর নেই। এখানে মহাজন একটা শহর। শহরটার নাম চার্টাস—ফ্রান্সের শহর। টাকা ধার দেয়নি মহাজন—দিয়েছিল খানকয়েক খুনে কামান। ধার নিয়েছিলেন যিনি, তিনি হেঁজিপেঁজি ব্যক্তি নন—ফ্রান্সের ডিউক অফ বারগান্ডি—১৩৬৫ সালে। ক্যামবোল্স্ নামে একটা কেল্লাবাড়িকে গুঁড়িয়ে পাউডার করার ইচ্ছে হয়েছিল ডিউক সাহেবের। কামানের গোলায় অজেয় পাঁচিল ভেঙে পড়তেই ফুরিয়ে গেল কামানের কাজ—কিন্তু দেনা শোধ করতে হবে তো? ডিউক সাহেব মহাজন-শহরকে ক্যামরোল্স্ কাস্ল দিয়ে ঋণমুক্ত হয়ে গেলেন। সেইসঙ্গে আর একটা ঘটনা ঘটিয়ে ছাড়লেন—বিশাল পাঁচিল দিয়ে ঘিরে রাখলেই যে কাস্ল অজেয় থাকতে পারে—এই ধারণার ইতি ঘটিয়ে ছাড়লেন।
প্রশ্ন : কামানের মুখে কেল্লা! কিন্তু মা, ইউরোপে সেই-কি প্রথম কামান ব্যবহার?
মা : না রে। দলিল-টলিল ঘেঁটে জানা গেছে, ইউরোপে প্রথম কামান চালানো হয়েছিল আরও ১৯ বছর আগে; ১৩৪৬ সালে ইংল্যাণ্ডের তৃতীয় এডোয়ার্ড ক্রেসি-র যুদ্ধে গোহারান হারিয়েছিলেন ফরাসীদের। ক্রেসি জায়গাটা ফ্রান্সের উত্তর পশ্চিমে। তবে হ্যাঁ, কামান দেগে নয়—তৃতীয় এডোয়ার্ড যুদ্ধে জিতেছিলেন স্রেফ সেকেলে অস্ত্রের জোরে—ইংরেজদের বিখ্যাত লম্বা ধনুকে মহাওস্তাদ তীরন্দাজরা টেক্কা মেরেছিল কামানকেও! তাই বলে কামানকে হেনস্থা করা যায় না। এমন ঘটনাও আছে যখন তোপের মুখে দুর্গের দেওয়াল উড়িয়ে দেওয়ার জন্যে কামান ঢালাই করা হয়েছে দুর্গের পাঁচিলেরই বাইরে।
প্রশ্ন : সেকী! পাঁচিলের পাশে কামান ঢালাই সেই পাঁচিলই ধসানোর জন্যে?
মা : এরই নাম যুদ্ধ পাগলামি। কন্সতানতিনোপল শহরটা ঘেরা ছিল পর-পর তিনটে পেল্লায় পাঁচিল দিয়ে। হাজার হাজার বছর ধরে কত হানাদার এসেছে কন্সতানতিনোপল-কে লুঠ করবে বলে—কিন্তু পাঁচিল তিনটের সামনে ল্যাজ গুটিয়ে চম্পট দিয়েছে। প্রত্যেকটা পাঁচিল ৩০ ফুট অর্থাৎ প্রায় তিনতলা উঁচু, ১৬ ফুট অর্থাৎ প্রায় দেড়তলা পুরু। এইরকম মহাকায় পাঁচিল ভেদ করে কে ঢুকবে? কন্সতানতিনোপল তাই ছিল অজেয় হাজার হাজার বছর ধরে। কিন্তু একদিন বিখ্যাত এই বাইজানটাইন শহরের মানুষগুলোর চক্ষু চড়কগাছ করে ছাড়ল তুরস্কের সৈন্যরা। সালটা মনে রাখিস—১৪৫৩। ৫৫ দিনের মাথায় শহর দখল করে নিল মাত্র ৭০টা কামান দেগে—তার মধ্যে ১২টা ব্রোঞ্জের কামান ঢালাই করেছিল শহরের পাশে—বেজায় ভারি বলে তাদের টেনে এনে পাঁচিলের পাশে খাড়া করতে বলদ লেগেছিল ১৪০টা, মানুষ ২০০ জন। এক একটা কামানের ওজন ছিল ১৯ টন! ভাবতে পারিস? লম্বায় ১৬ ফুট—নলের হ্যাঁ ২৬ ইঞ্চি, ৩৬০ কেজি ওজনের গোলা ছুঁড়ে ফেলত এক মাইল দূরে। সারা দিনে কিন্তু সাতবারের বেশি গোলা নিক্ষেপ করা যেত না একটা কামান থেকে—অত্যন্ত স্লো।
প্রশ্ন : রণক্ষেত্রে কামান তৈরির কথা কখনো শুনিনি, মা! সে কামান এখন কোথায়?
মা : কোনোটাই আর টিকে নেই। তবে হুবহু ওইরকম একটা কামান ঢালাই করা হয়েছিল ১২ বছর পরে ১৮০৭ সালে দারদানেলেস শহরে—শেষবারের মত তাকে ব্যবহার করা হয়েছিল ব্রিটিশ ফ্রিগেট ‘অ্যাকটিভ’কে ফুটো করার জন্যে। ‘ফ্রিগেট’ মানে তিন মাস্তুলওলা যুদ্ধজাহাজ যাতে ২৮ থেকে ৬০টা কামান থাকে। ‘অ্যাকটিভ’ ফুটো হয়েছিল বটে—কিন্তু জলে ডোবেনি। পেল্লায় সে কামান এখন রয়েছে ‘টাওয়ার অফ লণ্ডনে’।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন