অদ্রীশ বর্ধন

প্রশ্ন : ইলেকট্রিসিটি আর ইলেকট্রনিক্সের মধ্যে তফাত কী, মা?
মা : দুটোর মধ্যেই রয়েছে ইলেকট্রন প্রবাহ। ইলেকট্রন যখন বয়ে যাচ্ছে তার অথবা কোনও কনডাকটরের মধ্যে দিয়ে—তখন তা ইলেকট্রিসিটি; ভ্যাকুম অথবা সেমিকনডাকটরের মধ্যে দিয়ে বয়ে গেলে তা ইলেকট্রনিক্স। এক কথায়, ইলেকট্রন বিদ্যুৎ-পরিবাহী বস্তুর মধ্যে দিয়ে যেতে পারে—তাদের বাইরে দিয়েও যেতে পারে। প্রথম ক্ষেত্রে ইলেকট্রিসিটি—দ্বিতীয় ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক্স।
প্রশ্ন : বিদ্যুৎ-পরিবাহী বস্তু কী জিনিস?
মা : যাদের মধ্যে দিয়ে কারেন্ট বয়ে যেতে পারে; যেমন, তামা, অ্যালুমিনিয়াম, টাংস্টেন, নাইক্রোম ইত্যাদি।
প্রশ্ন : ভ্যাকুম আর সেমিকনডাকটার?
মা : ভালভ, ট্রানজিস্টার ইত্যাদি।
প্রশ্ন :ইলেকট্রন?
মা : নেগেটিভ বিদ্যুযুক্ত খুব ছোট্ট কণিকা। যে কোনও পদার্থের পরমাণু বিশ্লেষণ করলে তার মধ্যে ইলেকট্রন পাওয়া যায়। হাইড্রোজেনের পরমাণুতে থাকে ১টা, সিলিকনের পরমাণুতে ১৪টা।
প্রশ্ন : কত ছোট্ট হয় এই ইলেকট্রন?
মা : ২২০ ভোল্টে ৬০ ওয়াটের বাল্ব জ্বালালে প্রতি সেকেণ্ডে বালবের তারের মধ্যে দিয়ে ২৩,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০টা ইলেকট্রন বয়ে যায়। দু-হাজার সালে আমাদের এই পৃথিবীর লোকসংখ্যা দাঁড়াবে ছ-শ চল্লিশ কোটি। তাহলে হিসেব করে নে, কতকগুলো পৃথিবীর লোক এক সেকেণ্ডে চলে যাচ্ছে বাল্বের মধ্যে দিয়ে—যদি অবশ্য লোকগুলো হয় ইলেকট্রনের মত পুঁচকে।
প্রশ্ন : দেখা যায় ইলেকট্রনকে?
মা : অত্যন্ত শক্তিশালী ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপেও এরা অদৃশ্য। কোনও দিনই দেখা যাবে না।
প্রশ্ন : তাহলে বুঝব কী করে ওদের চেহারা কীরকম?
মা : চেহারা কথাটা ইলেকট্রনের ক্ষেত্রে খাটে না। বোঝবার সুবিধের জন্যে ধরে নেওয়া যাক গোলমত রেণু—অতিশয় ছোট্ট গোলক। পরমাণুরা ইলেকট্রনদের চেয়ে প্রায় পাঁচ লক্ষ গুণ বড় হয়। কল্পনাতীত ছোট্ট চেহারা বলে এবং চোখে দেখা যায় না বলে, বৈজ্ঞানিকরা রীতিমত সুচতুর প্রক্রিয়ায় এদের ক্ষুদ্রতার মাপ বের করেছেন।
প্রশ্ন : যাদের চোখে দেখা যায় না, তাদের অস্তিস্ব আছে, বিশ্বাস করব কেন?
মা : ইলেকট্রিক তারে হাত দিয়ে ছিটকে পড়লেই বিশ্বাস হবে। এদের চোখে দেখা যায় না, এদের কাণ্ড কানে শোনা যায় না—কিস্সু টের পাওয়া যায় না—শুধু শক্ খাওয়ার সময় ছাড়া। সিল্ক দিয়ে কাঁচ ঘষলে কিন্তু কাঁচ থেকে ইলেকট্রন চলে যায় সিল্কে—অর্থাৎ চলমান ইলেকট্রন তৈরি করে ইলেকট্রিসিটি। গরমে, আলোয়, আলট্রা-ভায়োলেট রশ্মি এবং আরও অনেক শক্তির প্রভাবে পরমাণু থেকে ইলেকট্রন বেরিয়ে ছুটে যায়। এদের এই ছুটোছুটি নিয়ন্ত্রণ করে তাদের কাজে লাগানোর তত্ত্ব আর শাস্ত্র-ই ইলেকট্রনিক্স বিজ্ঞান।
প্রশ্ন : ইলেকট্রিক কারেন্ট বলতে তাহলে বুঝব ইলেকট্রনের ছুটে যাওয়া?
মা : হ্যাঁ। সার্কিটের দুটো পয়েন্টের মধ্যে সব সময়েই বিরাজ করছে একটা ফোর্স। তার নাম ভোল্টেজ। পয়েন্ট দুটো জুড়ে দিলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে এই ফোর্স। হুড়োহুড়ি পড়ে যায় ইলেকট্রনদের মধ্যে। তখন কারেন্ট বয়ে যায় কনডাকটার আর রেসিস্ট্যান্সের মধ্যে দিয়ে।
প্রশ্ন : রেসিস্ট্যান্স কী, মা?
মা : রেসিস্ট্যান্সকে বাংলায় বলা হয় প্রতিবন্ধ। একমাত্র সুপার-কনডাকটর ছাড়া সব বস্তুই ইলেকট্রিক কারেন্ট প্রবাহে বাধা দেয়—কিছু ইলেকট্রিক্যাল এনার্জিকে আলো আর তাপ বানিয়ে দেয়। ইলেকট্রিক বাল্বের টাংস্টেন ফিলামেন্টে আলো জ্বলে এই কারণেই। নাইক্রোম দিয়ে তৈরি হিটারের তার তেতে লাল হয়ে যায় ভ্যাকুয়ামের মধ্যে দিয়ে।
প্রশ্ন : ভ্যাকুম মানে তো যেখানে বাতাস নেই। ইলেকট্রন যায় কীভাবে?
মা : ভালভ-এর মধ্যে বাতাস থাকে না—কিন্তু থাকে ক্যাথোড নামে একটা ধাতু। ইলেকট্রিক দিয়ে তাকে গরম করলেই ছুটে যায় বিদ্যুতের ধারাস্রোত অ্যানোড নামে বিদ্যুৎ-বুভুক্ষু আর একটা ধাতুর দিকে। অর্থাৎ, ভালভের দুটো দরজা—তাই এর নাম ডায়োড। এরপর ১৯০৭ সালে এল তিনটে দরজাওলা টিউব—তার নাম ট্রায়োড—তখন থেকেই সূচনা ঘটল ইলেকট্রনিক্স বিজ্ঞানের। ইলেকট্রনের কম প্রবাহকে বেশি প্রবাহ করে তুলতে পেরেছিল ট্রায়োড। ১৯৪৮ সালে ট্রানজিসটরের আবিষ্কার বিপ্লব এনে দিল ইলেকট্রনিক্স বিজ্ঞানে।
প্রশ্ন : ট্রানজিসটর বিপ্লব ঘটিয়েছে সব্বাই বলে। কিন্তু কীভাবে?
মা : ভালভের চেয়ে অনেক ছোট, বিদ্যুৎ চায় কম অর্থাৎ কম বৈদ্যুতিক শক্তিতে বেশি কাজ করতে পারে, অযথা তাপ বানায় না অর্থাৎ হুটমুট গরম হয় না, অনেক বেশি সময় চালু থাকতে পারে। ট্রানজিসটর দিয়ে তৈরি যন্ত্র খুব হাল্কা বলে যেখানে খুশি নিয়ে যাওয়া যায়।
প্রশ্ন : ট্রানজিসটরে বিদ্যুতের চাহিদা কম বললে। কত কম?
মা : ১০৬ ওয়াট থেকে ১০৩ ওয়াট পর্যন্ত সীমার মধ্যেই বেশির ভাগ ইলেকট্রনিক যন্ত্র চালু থাকে।
প্রশ্ন : ট্রানজিসটর কী দিয়ে তৈরি হয়, মা?
মা : সিলিকন দিয়ে—সিলিকোন নয় কিন্তু। সব সেরা আর সবচেয়ে কাজের সেমিকনডাকটর। বিদ্যুৎ এর মধ্যে দিয়ে যেতে বেগ পায়—কিন্তু একেবারে থেমে থাকে না—যেমন থাকে কাঠ প্লাস্টিকের মত ইনসুলেটরের মধ্যে। ইনসুলেটরের বাংলা মানে অন্তরক; যা অন্তরায় সৃষ্টি করে।
প্রশ্ন : সিলিকন জিনিসটা কী, মা?
মা : মাইক্রোচিপের রক্তমাংস—মাইক্রোচিপ দিয়েই তো তৈরি হয় বেশির ভাগ ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি। আজকের দিনে সিলিকন আমাদের সবাইকেই কোনও না কোনওরকমভাবে ছুঁয়ে আছে, অথচ এর আবিষ্কারের সময়ে আমরা কেউই জন্মাইনি। সুইডিশ কেমিস্ট বারজেলিয়াস ১৮১৭ সালে সর্বপ্রথম সিলিকনকে আলাদা করে বের করেন—তখনও অনেক অপবস্তু ছিল তার মধ্যে। Silicon শব্দটা এসেছে ল্যাটিন Silex বা Silicis থেকে—যার মানে চকমকি পাথর—আদিম যুগে এই পাথর দিয়েই বানানো হত হাতের কাজের যন্ত্র। একা সিলিকন নায়ক হয়ে রয়েছে উপন্যাসের চাইতে বিস্ময়কর সুদীর্ঘ এই কাহিনীর—যার নাম হওয়া উচিত : ‘চকমকি মানুষ থেকে মাইক্রোপ্রসেসর।’
প্রশ্ন : সিলিকন পাওয়া যায় কোথায়?
মা : অপবস্তু মিশানো সিলিকনকে দেদার পাওয়া যায় প্রকৃতির মধ্যে—তখন তা সিলিকন আর অক্সিজেনের যৌগ পদার্থ। বালির প্রধান উপাদান সিলিকা—মরুভূমি আর সমুদ্রসৈকত জুড়ে রয়েছে এই সিলিকা। প্রতিটা বাড়ির ইঁটের মধ্যে রয়েছে সিলিকা। পাখির পালকে, তামাকের ছাইয়ে, স্পঞ্জের কঙ্কালে, অ্যামেথিস্ট এবং আরও অনেক দামি পাথরে রয়েছে সিলিকা। রঙিন মণিপাথর ওপ্যাল-এর রামধনু রঙটা হয় সিলিকা জলের সঙ্গে থাকে বলে।
প্রশ্ন : সিলিকা দিয়ে আর কী কী জিনিস তৈরি হয়, মা?
মা : কাঁচ, কাগজ, ডিটারজেন্ট, বালি-পাথর, কংক্রিট, এনামেল, মাটির বাসন, সুতোর কাপড় আর আঠার উৎপাদন দাঁড়িয়ে আছে সিলিকার ওপর। কোয়ার্জ জিনিসটা আসলে সিলিকন ডায় অক্সাইড। সঠিক স্পন্দাঙ্ক আর সময়ের জন্যে এর ব্যবহার রয়েছে রেডিও ট্রান্সমিটারে, মাইক্রোপ্রসেসরে। সিলিকন আর লোহা থেকে তৈরি হয় সিলিকন ইস্পাত; ইলেকট্রিক মোটর, জেনারেটর, ট্রান্সফর্মারে কাজে লাগে। হাই-টেম্পারেচার তেল, রবার-ছাঁচ, হাইড্রলিক ফ্লুইড, জল-প্রতিরোধক মোম আর পালিশে থাকে সিলিকোন—যা তৈরি হয় সিলিকন, কার্বন আর হাইড্রোজেন থেকে। ১৯৫৮ সালে ‘চিপ’ আবিষ্কারের সময়ে তাই তো বলা হয়েছিল—আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক পদার্থ এই সিলিকন।
প্রশ্ন: সিলিকন কতখানি বিশুদ্ধ হলে ‘চিপ’ তৈরি সম্ভব?
মা : শুনে মাথা ঘুরে না যায়। একশ কোটি সিলিকন পরমাণুর সঙ্গে একটার বেশি অপবস্তু মেশানো পরমাণু থাকলে সেই সিলিকনকে আর বেজায় খাঁটি বলা চলবে না। এহেন অসম্ভব ব্যাপারকেও সম্ভব করেছে বিজ্ঞান। মজা কি জানিস, এমন খাঁটি সিলিকন বানিয়েও তার সঙ্গে খাদ মিশিয়ে দেওয়া হয় ইচ্ছে করেই।
প্রশ্ন : খাঁটি সিলিকনে খাদ মিশনো হয়! কেন?
মা : সিলিকনের বিদ্যুৎ-পরিবাহিতা বাড়ানোর জন্যে। যাতে আরও ইলেকট্রন আরও জোরে ছুটতে পারে। এই পদ্ধতির নাম ডোপিং। খেলাধুলোর দুনিয়ায় ডোপিং চলছে। সিলিকনেও ‘ডোপান্ট’ বস্তু মিশানো হয় অল্প পরিমাণে। পাঁচ লক্ষ ভাগে মাত্র এক ভাগ। তখন সিলিকন আরও ভাল কনডাকটর হয়ে যায়। মাইক্রোচিপ বিপ্লব সম্ভব হয়েছে যে-যে কারণে তাদের একটি এই ডোপিং। ভাল কথা, প্রথম ট্রানজিসটরে কিন্তু সিলিকন ছিল না।
প্রশ্ন : সেকী! প্রথম ট্রানজিসটরে সিলিকন ছিল না! কী ছিল?
মা : জারমেনিয়াম। আমেরিকার বেল ল্যাবরেটরিতে ‘শতাব্দীর আবিষ্কার’ ঘটানো হয়েছিল ১৯৪৭-এর ২৩ ডিসেম্বর। বৈদ্যুতিক সংকেতের অতি সামান্য শক্তিকে বাড়িয়ে নেওয়ার জন্যে এই এক্সপেরিমেন্ট। এক ওয়াটের পাঁচ লক্ষ ভাগের একভাগ শক্তিওলা এই সংকেতকে ট্রানজিসটরে ঢুকিয়ে দিতেই তা বিয়াল্লিশ গুণ বেড়ে গিয়ে পৌঁছে গেল হেডফোনে। এরই নাম অ্যামপ্লিফিকেশন—যা সব রেডিও আর অডিও যন্ত্রে দরকার। আগে এ-কাজ করানো হত বিদ্যুৎ-বুভুক্ষু ভ্যাকুম টিউব দিয়ে—যা অতি-ক্ষুদে সার্কিট দিয়ে তৈরি করতে পারেনি কোনওদিনই—ট্রানজিসটরের দৌলতে সম্ভব হল পুঁচকে সার্কিটের উৎপাদন।
প্রশ্ন : একটা প্রশ্ন। ভ্যাকুম টিউব আর ভালভ কি আলাদা জিনিস?
মা : একই জিনিস। ভ্যাকুম টিউবের বৃটিশ নাম ভালভ।
প্রশ্ন : ‘শতাব্দীর আবিষ্কার’ কারা করেছিলেন?
মা : জন বারজীন, ওয়ালটার ব্র্যাটেন আর উইলিয়াম শকলী। তিনজনেই এ জন্যে নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন—অবশ্য অনেক পরে—১৯৫৬ সালে।
প্রশ্ন : ট্রানজিসটরে জারমেনিয়াম-কে বাদ দেওয়া হল কেন, মা?
মা : এক যুগ ব্যবহার করার পর দেখা গেল, খুবই অল্প তাপসীমার মধ্যে জারমেনিয়াম কাজ করতে পারে। এ ছাড়াও, কাঁচ দিয়ে বিশেষ আস্তরণ বানাতে হত জারমেনিয়াম ট্রানজিসটরে। সিলিকন ব্যবহারে এসব অসুবিধে প্রায় চলে গেল। তিন যুগ ধরে তাই একা সিলিকন দাপট বজায় রেখেছে বেশির ভাগ ট্রানজিসটরে।
প্রশ্ন : ট্রানজিসটর খুব ছোট বলেই তো এই বিপ্লব সম্ভব হয়েছে। কত ছোট?
মা : কল্পনা করে নে একটা কিউব বা ঘনক। যার সব দিকের মাপ এক ইঞ্চি। ১৯৪০ সালে তার মধ্যে একটা মাত্র ভ্যাকুম টিউব বা ভালভ রাখা যেত। ১৯৯০ সালে সেখানে পাতলা চ্যাপ্টা সিলিকন মাইক্রোচিপ বা ইনটিগ্রেটেড সার্কিট রাখা যায় এক কোটি। প্রতিটি মাইক্রোচিপ বা আই-সি’তে থুক থুক করছে আলপিনের ডগার মত ছোট্ট ছোট্ট ট্রানজিসটর।
প্রশ্ন : এত ছোট হয় ট্রানজিসটর?
মা : মাইক্রোচিপের সাইজ বাড়ছে, তার মধ্যে আরও বেশি গিজগিজ করছে ট্রানজিসটর; অর্থাৎ আরও ঘন হয়ে থাকছে। যেমন ধর, ১৯৬২-র মাইক্রোচিপে একটা রাস্তার ভৌগোলিক বৃত্তান্ত ধরা থাকত। ১৯৯০-তে আমেরিকায় তৈরি একটা মাইক্রোচিপে পুরো যুক্তরাষ্ট্রের দুই তৃতীয়াংশের রাস্তাঘাটের বিবরণ থাকতে পারে। যতই জটিল হচ্ছে মাইক্রোচিপ, ততই তার ডিজাইনে দরকার হচ্ছে খোদ কমপিউটারকে—আবার কমপিউটারের দরকার হচ্ছে মাইক্রোচিপকে। ঠিক যেন অগুন্তি ক্ষুদে ফ্ল্যাটবাড়ি তৈরি হয়ে চলেছে খুব অল্প জায়গায়।
প্রশ্ন : দূর ভবিষ্যতে তাহলে যন্ত্রই বানিয়ে নেবে যন্ত্রকে?
মা : ঘটনার স্রোত সেইদিকেই তো চলেছে।
প্রশ্ন : ডোপান্ট কিভাবে পাল্টে দেয় সেমিকনডাকটরের বৈদ্যুতিক প্রকৃতি?
মা : পরমাণুর ইলেকট্রনকে সরিয়ে দেয়; সেই ফাঁকা জায়গায় অন্যদিকের ইলেকট্রন ধেয়ে আসে। এইভাবে তৈরি শূন্যস্থানকে বলে hole; এই ‘হোল’ মানে ফুটো নয়—বলা যায় ভ্যাকান্সি—ঘর খালি বা চাকরি খালির মত। hole নিজেও কিন্তু সরে সরে যাচ্ছে সেমিকনডাকটরের মধ্যে—ইলেকট্রন ছুটছে সেই জায়গার দিকে। ভাবতেও মজা লাগে।
প্রশ্ন : খাঁটি সিলিকনে hole বানায় কোন্ ডোপান্ট?
মা : খুব কম মাত্রায় আর্সেনিক অথবা ফসফরাস। তখন তার নাম P-টাইপ সিলিকন। খুব কম মাত্রায় গ্যালিয়াম বা বোরন দিলে সিলিকনের নাম হয় N-টাইপ সিলিকন।
প্রশ্ন : সিলিকনকে বলেছিলে মাইক্রোচিপের রক্তমাংস, জটিল ট্রানজিসটররা তাহলে কী?
মা : মাইক্রোচিপের নার্ভ আর মাসল।
প্রশ্ন : ইলেকট্রিক কারেন্টকে কন্ট্রোল করছে সুইচ। ইলেকট্রনিক্সকে করছে কে?
মা : ট্রানজিসটর। এক সেকেণ্ডের একশ কোটি ভাগের এক ভাগ সময়ের মধ্যে। অকল্পনীয় স্পিডের অধিকারী বলেই ট্রানজিসটর মির্যাকল-মেকার। একেই বলে ‘মাইক্রোইলেকট্রনিক সুইচ’। পকেট ক্যালকুলেটর, রিস্টওয়াচে রয়েছে এই ধরনের ট্রানজিসটর সুইচ।
প্রশ্ন : ‘সোলার সেল’ আর মাইক্রোচিপ কি এক জিনিস?
মা : না। সূর্যের আলো ধাবমান ইলেকট্রন আর ‘হোল’ তৈরি করে নেয়—সোলার সেল-এর মধ্যে দিয়ে তখন কারেন্ট বইতে থাকে। সিলিকন সেল-এর সঙ্গে বিশেষভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়াম আর গ্যালিয়াম আরসেনাইড ‘সেল’ জুড়ে গড়া হয় ‘সোলার সেল’।
প্রশ্ন : এই কম সময়ে সুইচ-অফ সুইচ-অন করে লাভ কি ট্রানজিসটরের?
মা : রাশি রাশি হিসেবনিকেশ চক্ষের নিমেষে করে ফেলা যাচ্ছে। নইলে কাজ জমেই যাবে পাহাড়ের মত।
প্রশ্ন : বেশি জোড়ে দৌড়োলে বেশি এনার্জি লাগে। ট্রানজিসটরেও তো লাগে?
মা : নিশ্চয়। এই জন্যেই যত দ্রুতগতি মাইক্রোচিপ তৈরি হয়ে চলেছে, ততই তার দাম বেড়ে চলেছে। সিলিকনে তৈরি মাইক্রোচিপের সুইচিং সময় নিত এক ন্যানো-সেকেণ্ড—এক সেকেণ্ডের ১০০,০০,০০,০০০ ভাগের এক ভাগ। এখন তৈরি হয় এক ন্যানোসেকেণ্ডের দশ ভাগের এক ভাগ সময়ের সুইচিং—এই সেমিকনডাকটর তৈরি হচ্ছে গ্যালিয়াম আর আরসেনাইড দিয়ে।
প্রশ্ন : রেডিও আর টেলিভিশনেও মাইক্রোচিপ থাকে?
মা : অন্য ধরনের মাইক্রোচিপ থাকে—তাদের কাজ সুইচিং স্পিড বাড়ানো নয়—হাই-ফ্রিকোয়েন্সি বানানো। হাইস্পিডে সিগন্যালকে অ্যামপ্লিফাই করা।
প্রশ্ন : ‘চিপস্পিড’কে ক্যামেরায় লাগানো হচ্ছে?
মা : আধুনিক ক্যামেরার শাটারস্পিড এক সেকেণ্ডের দু হাজার ভাগের একভাগ তো এই কারণেই।
প্রশ্ন : কত স্পিডে তাহলে ছুটছে ইলেকট্রন?
মা : উপগ্রহের স্পিডে ছোটে সিলিকন মাইক্রোচিপে। কিন্তু এর চাইতে তিন হাজার গুণ বেশি জোরে ছুটলে তবেই রেডিও বা আলোর গতিবেগের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া যাবে। কিছু ইলেকট্রনকে এই স্পিডের কাছাকাছি তোলা হয়েছে—কিন্তু অনেক খরচ করে অনেক দামি মেশিনের ভ্যাকুমের মধ্যে। এই মেশিনের নাম ‘অ্যাটম স্ম্যাশার’।
প্রশ্ন : কত ভোল্ট লাগে এই স্পিড তুলতে?
মা : আলোর স্পিডের অর্ধেক স্পিডে ইলেকট্রনকে ছোটাতে লাগে এক লক্ষ ভোল্ট। অর্থাৎ, চিপ যত দ্রুতগতি হবে, ব্যাটারি অথবা কারেন্ট খরচ তত বাড়বে।
প্রশ্ন : মাইক্রোচিপ তাহলে কত রকমের হয়?
মা : এনার্জি-চাহিদা আর সুইচিং-স্পিডের হিসেবে মাইক্রোচিপ.টেকনোলজিকে মোটামুটি ন-টা ভাগে ভাগ করা হয়। সর্বাধুনিকটায় সিলিকন নেই মোটেই—আছে গ্যালিয়াম আরসেনাইড—অত্যন্ত হাইস্পিড মাইক্রোপ্রসেসরের জন্যে।
প্রশ্ন : মাইক্রোচিপ কি দিয়ে তৈরি হয়?
মা : সিলিকন যাদের মধ্যে আছে, সেইসব বস্তু দিয়ে। আগেই বলেছি, সিলিকন থাকে বালি, কাদামাটি, চকমকি এবং আরো অনেক জিনিসের মধ্যে। পৃথিবীর খোসা অর্থাৎ ভূত্বকের চার ভাগের একভাগেরও বেশি অংশ শুধু এই সিলিকন। খনিজ লোহার মধ্যে থাকে তিন শতাংশ—ইস্পাত বানাতে দরকার হয়। এই সব জিনিসকে প্রথমে কেমিক্যাল দিয়ে শোধন করে নেওয়া হয়—‘মোটামুটি বিশুদ্ধ’ সিলিকন পাওয়া যায়—৯৮ শতাংশ বিশুদ্ধ সিলিকন আলাদা করে নেওয়া হয়। নিদারুণভাবে খাঁটি সিলিকন বানানো হয় ‘জোন রিফাইনিং (Zone Refining) পদ্ধতিতে। সিলিকন রড থেকে বেশির ভাগ অপবস্তু বিদেয় হবার পর CZ পদ্ধতিতে বড় বড় কৃস্ট্যাল তৈরি করা হয় সিলিকন রডের মধ্যে। বিদ্যুৎ চালিয়ে পরীক্ষা করে নেওয়া হয় বিশুদ্ধতা। এরপর মেশানো হয় ডোপান্ট।
প্রশ্ন : কারা তৈরি করে মাইক্রোচিপ?
মা : চিপ তৈরির কারখানাগুলোর ভেতরে ঢুকলে মনে হবে যেন হাসপাতাল বা ওষুধ তৈরির কারখানায় ঢুকেছিস। কর্মীদের বেশির ভাগই মেয়ে—দশ জনের মধ্যে ন’ জন। সাদা কোট, হেলমেট, দস্তানা আর জুতো পরে যেন এক-একজন সার্জন। কাজ হয় অত্যন্ত শোধিত পরিবেশে: এক কিউবিক ফুট বাতাসে একশটার বেশি ধূলিকণা থাকে না, এই একশটার কোনোটাই আধ মাইক্রোমিটারের বেশি বড় হয় না। কাজ শুরু করার আগেই নিখুঁতভাবে মেঝেকে ভ্যাকুম করে নেওয়া হয়। তাপমাত্রার ওঠানামা ঘটে ঠিক দু-ডিগ্রীর মধ্যে—১৯ থেকে ২১ ডিগ্রী সেলসিয়াসের মধ্যে। সবসময়ে শুকনো রাখা হয় বাতাসকে ডিহিউমিডিফায়ার দিয়ে।
প্রশ্ন : প্রস্তুতিপর্বে কতটুকু ভুলচুক ঘটলে চিপস তৈরির বারোটা বেজে যাবে?
মা : এক মিলিমিটারের হাজার ভাগের এক ভাগ সাইজের যদি একটা ধূলিকণা ঢুকে পড়ে, অথবা জলের বাষ্পর ক্ষুদে একটা অণু যদি এসে যায়, অথবা তাপমাত্রার সামান্য এদিক-ওদিক ঘটলেই তৈরির দফারফা হয়ে যাবে যে-কোনো পর্যায়ে।
প্রশ্ন : এবার বলো কীভাবে তৈরি হয় চিপ?
মা : যেভাবে শসা-র ফালি কাটা হয়, সেইভাবে সিলিকনের একটা কৃস্ট্যালকে কেটে স্লাইস বানানো হয়। অত্যন্ত শক্ত হয় এই কৃস্ট্যাল—তাই হিরের করাত দিয়ে কাটতে হয়—বঁটি দিয়ে নয়। প্রতিটি চাকতি হয় এক মিলিমিটার পুরু আর দেড়শ মিলিমিটার ব্যাসের। বিউটিফুল আয়না বানিয়ে নেওয়া হয় হিরে দিয়ে পালিশ করে। অতি-সূক্ষ্ম ফটোগ্রাফিক আর কেমিক্যাল প্রক্রিয়ায় পঞ্চাশ থেকে দু’শটা চিপ-এর জায়গা রাখা হয় এক-একটা চাকতিতে। একই সঙ্গে তৈরি হয়ে যায় হাজার কয়েক ক্ষুদে ট্রানজিসটর।
প্রশ্ন : মাইক্রোচিপের চেহারা-চরিত্র কি নিজে থেকেই তৈরি হয়?
মা : ডিজাইন করে একদল এক্সপার্ট। তারপর কমপিউটার দিয়ে ডিজাইনকে চিপ-সাইজের ২৫০ গুণ করে নেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় ফটোএনগ্রেভিং। ক্ষুদে নেগেটিভ বানানো হয়। চাকতিকে ফারনেসে ঢুকিয়ে অক্সিজেন দিয়ে সিলিকন ডায়-অক্সাইড সৃষ্টি হয়। ফটোরেসিস্ট নামে একরকম কেমিক্যালের প্রলেপ থাকে সেই পাতলা চাকতিতে। এক্সপোজ করা হয় আলট্রা-ভায়োলেট রশ্মি দিয়ে। অদরকারি অংশ ধুয়ে ফেলা হয় অরগ্যানিক সলভেন্ট দিয়ে। তারপর ধোয়া হয় হাইড্রোক্রোলিক এবং আরও একটা অ্যাসিড দিয়ে। এক্সপোজড ফটোরেসিস্ট একেবারেই চলে যায়—সিলিকন ডায় অক্সাইডের প্যাটার্ন বেরিয়ে পড়ে। এত কাণ্ড করা হয় এক মাইক্রোমিটার নির্ভুলতা রক্ষা করার জন্যে। ধর, একটা চাকতিতে ৭৬টা চিপ তৈরি হল। এরপর তাদের হিরের করাত দিয়ে কেটে আলাদা করা হয়। কয়েক মিলিমিটার চৌকো চিপকে ঝালাই করে দেওয়া হয় প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ডে।
প্রশ্ন : প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড?
মা : ক্যালকুলেটরের পেছনের ঢাকনা খুললেই দেখতে পাবি। সরু সরু ধাতুর পাত, আর উঁচু উঁচু গর্ত। সবচেয়ে ছোট্ট অংশটা মাইক্রোচিপ। মাইক্রোচিপ আর প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ডে মিল আছে শুধু একটা জায়গায়—দুটোকেই তৈরি করতে দরকার হয় ফটোগ্রাফিক টেকনিকের। বড় ডিজাইন থেকে বানিয়ে নিতে হয় ছোট নেগেটিভ। তারপর ইনসুলেটিং পাত কেটে, বা ফাইবার গ্লাস কেটে বোর্ড বানিয়ে, তাতে হাল্কা তামার পাত লাগিয়ে, তার ওপর ফটোরেসিস্ট মাখিয়ে—চিপ তৈরির মতই ধাপে ধাপে একই রশ্মি আর রসায়ন প্রয়োগ করে যেতে হয়।
প্রশ্ন : মাইক্রোচিপে এত সূক্ষ্ম ছাঁচ ওঠে কী করে, মা?
মা : এক্স-রে অথবা ইলেকট্রন বীম-এর দৌলতে। পয়েন্ট জিরো জিরো জিরো জিরো ওয়ান মিলিমিটার পর্যন্ত খুঁটিনাটি ফুটিয়ে তোলে ইলেকট্রন বীম।
প্রশ্ন : তাহলে তো বলতে হয়, নিজের জিনিসকে নিজেই বানাচ্ছে ইলেকট্রন?
মা : ভাবনা তো সেইজন্যেই। কমপিউটার বানাচ্ছে মাইক্রোচিপকে—মাইক্রোচিপ লাগছে কমপিউটারে। ভবিষ্যতের ইলেকট্রনিক্স কি তাহলে মানুষের সাহায্য ছাড়াই নিজেদের বিবর্তন ঘটিয়ে চলবে?
প্রশ্ন : কল্পবিজ্ঞান ছাড়ো! ইলেকট্রনিক স্মৃতি কি জিনিস বুঝিয়ে দেবে?
মা : ইলেকট্রনিক মেমারির শুরু ভ্যাকুম টিউব ব্যবস্থা থেকে। কিছু মেমারি ভোলাটাইল—চলে যায়; কিছু নন-ভোলাটাইল—থেকে যায়। ক্যালকুলেটরে যোগবিয়োগ করে সুইচ-অফ করে দিলেই তা চলে যায়—আর ফিরে আসে না। একে বলে ভোলাটাইল মেমারি। কিন্তু গান-বাজনা কথাকে ম্যাগনেটিক টেপে ধরে রেখে সুইচ-অফ করলেও তা চলে যায় না—এর নাম নন-ভোলাটাইল মেমারি। কমপিউটারে তা আরও বেশি হারে ঘটে। সিলিকন মাইক্রোচিপের মেমারি ম্যাগনেটিক মেমারির মত মন্থর নয়—অত্যন্ত হাইস্পিডের।
প্রশ্ন : মাইক্রোচিপের মেমারি ক্যাপাসিটি তা হলে কত?
মা : দশ লক্ষ সংকেতের স্মৃতিকোঠা শুধু একটা চিপ। যে চিপ-এর স্মৃতির ক্ষমতা যত বেশি তার দামও তত বেশি। RAM অর্থাৎ Random Access Memory পদ্ধতিতে একটা Concise Oxford Dictionary-র কয়েকটা পাতা মনে রাখতে পারে। অপটিক্যাল ডিস্কের একটা চাকতিতেই থাকবে গোটা এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা।
প্রশ্ন : আমার মেমারি ক্যাপাসিটি কত, মা?
মা : আন্দাজ করা হয়েছে তোর ব্রেন, আমার ব্রেনের স্মৃতির জায়গায় প্রতি কিউবিক সেন্টিমিটারে যে তথ্য জমা থাকে, তা দশ হাজার মিলিয়ন মিলিয়ন Binary digit সংকেতের সমান। অর্থাৎ মানুষের স্মৃতি মিলিয়ন মিলিয়ন মিলিয়ন এই সংকেত রেখে দিতে পারে—যা মিলিয়ন মিলিয়ন হাই-ক্যাপাসিটি RAM স্মৃতিধর পদ্ধতির সমান। তাহলে তো তোর মেমারি খুব খারাপ নয়!
প্রশ্ন : সংকেতটা কি ধরনের, মা?
মা : মর্স কোডের টরে-টক্কার রূপান্তর 0 আর 1; মর্সের টরে-টক্কায় সংকেত যায় সেকেণ্ডে ১৭টা, ইলেকট্রনিক টরে-টক্কার সংকেত যায় সেকেণ্ডে বহু লক্ষ।
প্রশ্ন : মানুষের মেমারি আর ইলেকট্রনিক মেমারির মধ্যে তফাত?
মা : মানুষের ব্রেনের মেমারি কম স্পন্দাঙ্ক-র রেডিও ওয়েভে ছকা। তিন পাউণ্ড ওজনের ব্রেনের প্রতি কিউবিক সেন্টিমিটারে রয়েছে প্রায় হাজার কোটি নিউরন কোষ। রেডিও ওয়েভ যাচ্ছে এক কোষ থেকে আর এক কোষে, সংযোগসূত্রের মধ্যে দিয়ে। পক্ষান্তরে, কমপিউটারের মেমারি স্রেফ অন আর অফ পদ্ধতিতে চালু থাকে। এই বইটার কমা সেমিকোলন শুদ্ধ সবকিছু কি দশ বছর পরে মনে রাখতে পারবি? যদি পারিস, তাহলে বলব তোর eidetic memory আছে। কমপিউটার কিন্তু পারে—সব জমিয়ে রাখে। তফাতটা এইখানেই।
প্রশ্ন : যাক! এবার বলো তো মাইক্রোপ্রসেসর কি জিনিস?
মা : কমপিউটারের বেশির ভাগ ইলেকট্রনিক্স একটা অথবা কয়েকটা অতীব জটিল মাইক্রোচিপে জড়ো করা থাকে। এর নাম মাইক্রোপ্রসেসর বা সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট। সংক্ষেপে, CPU; মেমারি চিপদের চেয়ে এরা অনেক জটিল।
প্রশ্ন : VDU মানে কী, মা?
মা : Visual Display Unit—তোর টিভিকে দিয়ে VDU বানিয়ে নিতে পারিস। সব VDU আর Tv-ই তো ক্যাথোড রে টিউব।
প্রশ্ন : মাইক্রোপ্রসেসর লাগে কোথায়?
মা : এয়ারকণ্ডিশনার, স্পিডোমিটার, মেডিক্যাল ডায়াগনোসটিক্স, ফটোগ্রাফিক প্রসেসিং, ট্রাফিক কন্ট্রোল, টিভি প্রোগ্রামার, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রো-ওভেন—আরও অনেক জিনিসে।
প্রশ্ন : সিলিকনের দাপট কি চিরকাল এমনি চলবে?
মা : হার মানবে গ্যালিয়াম আরসেনাইড মাইক্রোপ্রসেসর চিপ বা মাইক্রোকমপিউটার এসে গেলেই। মূল ব্যাপার তো ইলেকট্রনের স্পিড—আগেই বলেছি। সিলিকন মাইক্রোচিপে এক মাইক্রোমিটার পেরোতে সময় লাগে ৩০ পাইকোসেকেণ্ড। এক পাইকোসেকেণ্ড মানে, এক সেকেণ্ডকে দশ লক্ষ ভাগ করে, তার প্রতিটিকে আবার দশ লক্ষ ভাগ করলে যা দাঁড়ায়—তাই।’ গ্যালিয়াম আরসেনাইড মাইক্রোচিপে ইলেকট্রন দৌড়বে ছ-গুণ জোরে—মাত্র ৫ পাইকোসেকেণ্ডে পেরিয়ে যাবে এক মাইক্রোমিটার। দেখেশুনে তো মনে হচ্ছে, শেষকালে ভাবনার স্পিডকেও হার মানতে হবে চিপ স্পিডের কাছে!
প্রশ্ন : ইলেকট্রনিক্স যদি আগামী যুগের সুপারম্যান হয়, তাহলে তার শরীরের বর্ণনাটা কি রকম হবে?
মা : পর-পর বলে যাচ্ছি, শুনে নে; প্রথমটা তোর আর আমার,—দ্বিতীয়টা কমপিউটার আর মাইক্রোপ্রসেসরের:
তথ্য সংগ্রহ :
চোখ, কান, মুখ, নাক, স্পর্শ, কম্পন।
টিভির হাল্কা লেখনী, ম্যাগনেটিক টেপ, কী-বোর্ড ইত্যাদি।
হিসেব :
ব্রেন (নিউরন)
সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট—মাইক্রোচিপ।
নির্দেশ :
ডি. এন. এ. সংকেত, অভিজ্ঞতা, শিক্ষা
কমপিউটার প্রোগ্রাম (সফটওয়্যার)।
স্বল্পক্ষণ স্টোরেজ :
ব্রেন: নিউরন (অল্পক্ষণের স্মৃতি)
RAM মাইক্রোচিপ ইত্যাদি
দীর্ঘক্ষণ স্টোরেজ :
ব্রেন: নিউরন (দীর্ঘক্ষণের স্মৃতি), বই, ফিল্ম, রেকর্ড, ইত্যাদি
ডিস্ক, ROM মাইক্রোচিপ, ইত্যাদি
যোগাযোগ :
নার্ভাস সিসটেম, দর্শন, স্বর, গন্ধ, ছোঁয়া, দেহ-ভাষা
তার, রেডিও-সংযোগ
তথ্য প্রদান :
হাতের লেখা, ছবি, কথা, হাঁটা
প্রিন্টার, VDU, কৃত্রিম কণ্ঠস্বর, ইত্যাদি
প্রশ্ন : কমপিউটারের কী-বোর্ডে হাতে টাইপ করা কি গেঁইয়া হয়ে যাচ্ছে না?
মা : ঠিক বলেছিস। ভবিষ্যতে শুধু মুখের কথাতেই কমপিউটার কাজ করবে—কী-বোর্ড উঠে যাবে। কেন না, কী-বোর্ড টিপে বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠাতে সময় লাগে। বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত টাইপিস্ট সেকেণ্ডে ন’বারের বেশি চাবি টিপতে পারে না। দুটো চাবি টেপার ফাঁকে একটা মোটামুটি ভাল মাইক্রোকমপিউটর বিশ হাজার নির্দেশ পাঠাতে পারে। এই সময়টা তো নষ্ট হচ্ছে।
প্রশ্ন : ইলেকট্রনিক্স তাহলে বুদ্ধিমান যন্ত্র হতে চলেছে?
মা : UIM অর্থাৎ Ultra Intelligent Machine যখন তৈরি হবে, তখন আজকের সবসেরা কমপিউটার সে তুলনায় হবে নিছক পোকামাকড়। এই স্বপ্ন দেখেছেন বিশেষজ্ঞ-প্রফেসর জ্যাক গুড। সিলিকন আর গ্যালিয়াম আরসেনাইড মাইক্রোচিপের বাজার যাবে। অসাধারণ কম টেম্পারেচারে কাজ করবে UIM—তরল হিলিয়ামে নিমজ্জিত থেকে। শুরু হবে অপটিক্যাল কমপিউটিং-এর যুগ। অত্যন্ত হাই-ফ্রিকোয়েন্সি রেডিও-তরঙ্গই তো আলোক-রশ্মির উপাদান। এক পাইকোসেকেণ্ডের পাঁচ হাজার ভাগের এক ভাগ সময়ের মধ্যেই রাডার আর স্যাটেলাইটের মধ্যে সংকেত বিনিময় ঘটে যাবে—এখন লাগে ১০০ পাইকোসেকেণ্ড। হলোগ্রাফির বিপ্লব তো এসেই গেছে…
প্রশ্ন : হলোগ্রাফি?
মা : যে কোনো বস্তুর তিন ডাইমেনশনের ফটোগ্রাফিক ছাপ ধরে রাখতে পারে হলোগ্রাম—যা পারে শুধু মানুষের চোখ। যে-বছর ট্রানজিসটরের আবিষ্কার হয়, সেই বছরেই গ্যাবর নামে এক বৈজ্ঞানিক হলোগ্রাম উদ্ভাবন করেন। যে-বছর প্রথম মাইক্রোপ্রসেসর বাজারে ছাড়া হয়, সেই বছরেই গ্যাবর নোবেল প্রাইজ পান। জাপানীরা এর মধ্যেই হাইস্পিড হলোগ্রাফিক সিসটেম বানিয়ে সমস্ত পেটেন্ট সাহিত্যকে ফাইল করে রেখেছে। এরপর আবিষ্কৃত হবে হয়তো এমন এক সাব-অ্যাটমিক বস্তুকণা যা আলোর চেয়ে জোরে ছোটে—তখনই তৈরি হবে ভবিষ্যতের রোবট—মানুষের প্রভু। তখন তাদের মোটর গাড়ি পেট্রলে চলবে না—চলবে বায়োটেকনলজিতে—অর্থাৎ ব্যাকটিরিয়াকেও গোলাম বানাবে তারা ইলেকট্রনিক্স দিয়ে। মোটরগাড়ি তখন হবে শখের গাড়ি—এখনকার ঘোড়ার গাড়ি চড়ার মত। পৃথিবীর নানা অঞ্চলে বসে, গ্রহে গ্রহে বসে, কথা বলা হবে মুখোমুখি—সশরীরে নয়—শরীরী কায়া-রা হাজির থাকবে হলোগ্রাফিতে গড়া ত্রি-মাত্রিক ছায়ার মাধ্যমে। সবকিছুর মূলে থাকবে অদৃশ্য ইলেকট্রন!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন