অদ্রীশ বর্ধন

প্রশ্ন : পৃথিবীতে কত ব্যাকটিরিয়া আছে, মা?
মা : ১-এর ডানদিকে ২৭টা শূন্য বসালে যত হয়, প্রায় ততগুলো। বিপুল এই ব্যাকটিরিয়া বাহিনীর একটা নগণ্য সংখ্যা কিন্তু রোগ ঘটায় মানুষের শরীরে।
প্রশ্ন : এত ব্যাকটিরিয়া তাহলে আছে কোথায়?
মা : পৃথিবীর সব জায়গায়। বাগানের এক মুঠো মাটিতেই আছে একশ কোটি। মহাসমুদ্রের মেঝে থেকে নমুনা তুলে দেখা গেছে, সেখানেও রয়েছে এক মুঠোয় একশ কোটি। কুমেরু জায়গাটা মানুষের বন্ধু নয় কোনওকালেই—কিন্তু সেখানেও থিকথিক করছে ব্যাকটিরিয়া। এরা রয়েছে মাটিতে, শুষ্ক উপত্যকার পাথরের খাঁজে, এমনকি বিশাল হিমবাহর তলদেশ পর্যন্ত।
প্রশ্ন : বেঁচে থাকে কী করে?
মা : ওদের এই আশ্চর্য ক্ষমতাটাই তো মাথা ঘুরিয়ে দিচ্ছে বৈজ্ঞানিকদের। পৃথিবীতে টিকে থাকতে গেলে যে-সব ধর্ম থাকা দরকার—ব্যাকটিরিয়া সে-সবের ধার ধারে না। অথচ দাপিয়ে যাচ্ছে অদৃশ্য অবস্থায়। অপার্থিব এই ক্ষমতা দেখে হতভম্ব হয়েছেন বৈজ্ঞানিকরা। প্রচণ্ড ডোজের এক্স-রে, আলট্রাভায়োলেট রে আর ভয়ানক ঠাণ্ডা এদের কিস্সু করতে পারে না। এরা অক্সিজেনের মধ্যে যেমন টিকে থাকে, বিনা অক্সিজেনেও তেমনি বহাল তবিয়তে থাকে। এরা হাইড্রোজেন আর কার্বন ডায় অক্সাইড দিয়ে মিথেন আর জল বানায়, সালফেটকে ভেঙে বানায় সালফার। ফ্রি হাইড্রোজেন-ভক্ত ব্যাকটিরিয়ার জন্ম বা ক্রমবিকাশ নিশ্চয় এই পৃথিবীতে হয়নি। তাই সন্দেহ, এরা সমানে আসছে পৃথিবীর বাইরে থেকে।
প্রশ্ন : নতুন ব্যাকটিরিয়া বানাতে পারেন বৈজ্ঞানিকরা?
মা : কিন্তু মানুষের হাতে গড়া নতুন এই ব্যাকটিরিয়ারা তেমন কাজের হয় না—যেমনটা হয় গ্যালাক্সির ল্যাবোরেটরিতে গড়ে উঠলে। যেমন টেকসই, তেমনি নিজ ধর্মে স্থির। ধর্ম হারায় না কোনওক্রমেই—যা ছিল তাই থাকবে, মরেও যাবে, ভেঙেও যেতে আপত্তি নেই, নয়তো দেদার বংশ বাড়িয়ে চলবে—কিন্তু নিজেই নিজেকে একটু একটু করে, অনেক সময় নিয়ে কিছুতেই পাল্টে নেবে না।
প্রশ্ন : এ তো বড় অদ্ভুত শক্তি, মা?
মা : হ্যাঁ, বড় বিচিত্র শক্তি। এ-শক্তি নিশ্চয় পৃথিবীতে পায়নি। পেয়েছে পৃথিবীর বাইরে—বহু গ্যালাক্সির মধ্যে—ক্রমবিবর্তন যেখানে রহস্যময়।
প্রশ্ন : এমন বলছ, যেন পৃথিবীতে থেকেও পৃথিবীর ধর্মে ধর্মান্তরিত নয় ব্যাকটিরিয়ারা?
মা : ব্যাকটিরিয়ার মধ্যে রয়েছে গোটা গ্যালাক্সি জুড়ে থাকার গুণপনা—যা শুধু পৃথিবীতে অস্তিত্ব জিইয়ে রাখার চাইতে অনেক…অনেক ব্যাপক। সারা গ্যালাক্সি জুড়ে যারা টিকে থাকতে পারে, তারা শুধু পৃথিবীর মত ছোট্ট জায়গার জন্যে সৃষ্টি হতে যাবে কেন?
প্রশ্ন : তাহলে তারা অন্য গ্রহেও থাকছে না কেন? গ্যালাক্সি থেকেই যদি এরা আসে তো অন্যান্য গ্রহে যাচ্ছে না কেন?
মা : সে সন্দেহও দেখা দিয়েছে বৈজ্ঞানিকদের মনে। শুক্রগ্রহের ওপর দিকের মেঘের রামধনু দেখে মনে হয়েছে, সেখানে গোলাকার বস্তুকণা আছে—ব্যাকটিরিয়া সাইজের মত ছোট্ট। শুক্রগ্রহ থেকে যে ফিকে হলুদ রঙ ঠিকরে বেরোয়, সেটা হয় সালফার ব্যাকটিরিয়ার জন্যে—ওদেরও রঙ হলুদ। মঙ্গলগ্রহের লাল রঙের মূলেও আছে ব্যাকটিরিয়াদের কারসাজি—এখন হয়ত সেই ব্যাকটিরিয়ারা ঘুমিয়ে আছে মঙ্গলের ধুলোয়—পৃথিবীর এক্সপেরিমেন্ট দিয়ে তাদের জাগানো যাবে না—দরকার অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস আর নেপচুন-এর আবহমণ্ডলে মিথেন আছে֫—নিশ্চয় মিথেন তৈরির ব্যাকটিরিয়াও আছে।
প্রশ্ন : এত ব্যাকটিরিয়া কি ফ্লাইং সসারে চেপে যাচ্ছে গ্রহগুলোয়?
মা : ঝাঁকে ঝাঁকে উল্কাবৃষ্টি হচ্ছে না! পৃথিবীতে পড়ছে বছরে দশ হাজার টন; বৃহস্পতিতে তার একশ গুণ। এ ছাড়াও ধূমকেতুরা ঝেঁটিয়ে যাচ্ছে মাঝেমাঝে—ছেড়ে দিয়ে যাচ্ছে ব্যাকটিরিয়ার ঝাঁক।
প্রশ্ন : ব্যাকটিরিয়া ছাড়াও তো মিথেন তৈরি হতে পারে?
মা : ফ্রি হাইড্রোজেন আর কার্বনডায় অক্সাইড বা কার্বন মনোক্সাইড একটা পাত্রে অনন্তকাল রেখে দিলেও তা থেকে মিথেন তৈরি হবে না। দরকার ক্যাটালিস্ট বা অনুঘটকের। এই ধরনের ঘটকালিতে জুড়ি নেই ব্যাকটিরিয়ার।
প্রশ্ন : কিন্তু মা, আজকের মতো এত রোগ কি আগেও ছিল?
মা : পথিবীর বাইরে থেকে এলেও ব্যাকটিরিয়াদের জুতসই রিজার্ভারে থাকতে হয়েছে। সেই রিজার্ভার কমজোরি হলে ব্যাকটিরিয়াদেরও স্বল্পায়ু হতে হয়েছে—টেকসই বলে টিকে গেছে ব্যাকটিরিয়ারা। বৈজ্ঞানিকরা তর্ক জুড়েছেন এই প্রসঙ্গে। আজকের মানুষ যে-সব ছোঁয়াচে রোগের ব্যাকটিরিয়া-প্রকোপে ভুগছে, দশহাজার বছর আগে পৃথিবীতে তাদের উপযুক্ত রিজার্ভার ছিল না। ভাইরাসের উপমা দিলে বুঝবি। ইনফ্লুয়েঞ্জার ভাইরাস পাখির শরীরের রিজার্ভারে অনেক দিন টিকে থাকে—মানুষের শরীরের রিজার্ভারে কয়েক হপ্তার বেশি থাকতে পারে না। এ-যুগের ওষুধের উন্নতি হওয়ার আগে, বহু বছর বা বহু শতাব্দী ধরে মানুষের শরীর ছিল স্মলপক্স ভাইরাসের নিরাপদ আধার।
প্রশ্ন : তাহলে বলছো, আন্তঃনক্ষত্র ধুলোর উপাদানগুলোয় ব্যাকটিরিয়া আছে?
মা : তারার আলো ঠেকিয়ে রেখেছে এই ধুলো। আমাদের এই গ্যালাক্সিতেই প্রায় বিশ লক্ষ নক্ষত্র রয়েছে। তার প্রত্যেকটা থেকে যদি দশটা পৃথিবীর ওজনের সমান ব্যাকটিরিয়া বেরোয়, তাহলে তার পরিমাণ দাঁড়াবে সূর্যের ওজনের ষাট লক্ষ গুণ। এই গ্যালাক্সির সমস্ত আন্তঃনক্ষত্র ধুলোর সমান। এর মধ্যে কত ব্যাকটিরিয়া আছে, তা ভাবতে গেলেও তো মাথা ঘুরে যায়।
প্রশ্ন : ধুলোর মধ্যে যে ব্যাকটিরিয়া আছে, সে সন্দেহ আসছে কি করে?
মা : উদ্ভিদ আর বেশির ভাগ জন্তুর কোষের দেওয়ালের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটার নাম সেলুলোজ। ব্যাকটিরিয়ার কোষের দেওয়ালে থাকে সেলুলোজের বদলে গ্লাইকন। গ্লাইকনের তাপ ঠিকরে দেওয়ার আর শুষে নেওয়ার ক্ষমতা ঠিক সেলুলোজের মতই। আন্তঃনক্ষত্র দানা-র মধ্যেও অদ্ভুত এই ধর্ম বা প্রপার্টি দেখা গেছে। ব্যাপারটা ভাবলেও কি গা শিরশির করে না?
প্রশ্ন : এই দানা-ই যে ব্যাকটিরিয়া, তার প্রমাণ?
মা : আজকের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কসমিক মাপকাঠিতে খবর রাখেন, কোথায় কি উপাদান কতখানি আছে—নক্ষত্রে, আন্তঃনক্ষত্র গ্যাস বা ধুলোয়। আন্তঃনক্ষত্র বস্তু কতখানি, তাও আজকের যুগে অজানা নয়। হিসেব করে নেওয়া যায় কার্বন, নাইট্রোজেন আর অক্সিজেন দিয়ে তৈরি দানা কতটা আছে। এই তিনটে মৌলিক উপাদান যখন মিলেমিশে ব্যাকটিরিয়া বানায়, তখন যত দানা তৈরি হয়, তাতে তারার আলো যতখানি আটকাতে পারে—এখন তারার আলো বাধা পাচ্ছে ততখানি।
প্রশ্ন : মহাশূন্যে ব্যাকটিরিয়ার আর প্রমাণ নেই, মা?
মা : আন্তঃনক্ষত্র ধুলোর দানাগুলো রড-এর মত হয়—যেমন হয় ব্যাকটিরিয়াদের। আরও আছে, লাল আর নীল আলোকে দানাগুলো আটকে দিলে যে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, দানাগুলো যদি মূলত ব্যাকটিরিয়া হয়—তাহলে ঠিক তাই ঘটতে পারে।
প্রশ্ন : মহাশূন্যের ধকলে বহাল তবিয়তেও থাকতে পারে ব্যাকটিরিয়া?
মা : নানারকম বিকিরণের ফলে বেচারারা ভেঙে যায়। টিকে থাকার জন্যে দেওয়াল-বিহীন আকৃতি গড়ে নেয়—যাকে বলা হয় মাইকোপ্লাজমা কোষ। এদের সাইজ সাধারণ ব্যাকটিরিয়ার দশভাগের একভাগ থেকে পাঁচ ভাগের এক ভাগ পর্যন্ত হয়। তখন এদের গা থেকে যে আলো যেভাবে ঠিকরে যাওয়া উচিত, জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের হিসেবে তা মিলে গেছে। পৃথিবীর পাতালে পার্থিব জীবাবশেষ থেকে কয়লা আর গ্রাফাইট তৈরি হয় অনেক বছর ধরে—এও প্রায় সেইরকম।
প্রশ্ন : মহাশূন্যে ব্যাকটিরিয়া আছে, এটা কি তাহলে প্রমাণিত সত্য?
মা : এখনও অনুমিতি। তবে একটা ঘটনা থেকেই জন্ম এই অনুমিতির। গোটা গ্যালাক্সি জুড়ে আশ্চর্য রকমের সাদৃশ্য রয়েছে আন্তঃনক্ষত্র দানাগুলোর ঠিকরে দেওয়া আর শুষে নেওয়ার ক্ষমতায়। বিস্ময়কর এই সাদৃশ্য সম্প্রতি দেখা গেছে ম্যাগেলানিক ক্লাউড-এ—যা রয়েছে আমাদের এই গ্যালাক্সির বাইরে। বস্তুকণাগুলো সজীব নয়—এই ধারণা নিয়ে আশ্চর্য এই সাদৃশ্যের কোনো ব্যাখ্যা করা যায় না—বরং বলা যায়, দানাগুলোর সাইজ, রাসায়নিক সংগঠন বিস্ময়করভাবে দিকে দিকে একইরকম। স্যার ফ্রেড হয়েল বলেছেন, এর চেয়ে বড় জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আর হতেই পারে না।
প্রশ্ন : মহাশূন্যের ব্যাকটিরিয়া তাহলে কি শূন্য থেকে এল?
মা : বিপুল এনার্জি, যেমন ইলেকট্রিক বা আলট্রাভায়োলেট রশ্মি যদি কয়েকটা সাদাসিধে কেমিক্যালের সংমিশ্রণে ঠুসে দেওয়া যায়, অণুগুলো ভেঙে গিয়ে পরমাণু তৈরি হবে। তখন যদি প্রচুর হাইড্রোজেন, কার্বন, নাইট্রোজেন, আর অক্সিজেন থাকে এই মিক্সচারে, ভেঙে যাওয়া পরমাণুগুলোর কিছু নতুন করে জুড়ে গিয়ে জৈব অণু বানিয়ে নেবে। যতই জটিল হবে এরা, ততই সংখ্যায় কমবে। সেলুলোজ, ক্লোরোফিল বা লম্বা চেন-এর প্রোটিনের ধারেকাছেও কিছু তৈরি হবে না—সামান্য অ্যামিনো অ্যাসিড আর সরল সুগার পাওয়া যেতে পারে। মৌলিক এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে শেষের এই দুটিকে আলাদা করে নিয়ে যদি হাইগ্রেড এনার্জির খপ্পর থেকে বাঁচানো যায়—তাহলে সাদাসিধে জৈববস্তু তৈরি করা যেতে পারে—যা বানিয়ে দেবে জৈব সুরুয়া—‘অরগ্যানিক সুপ’।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন