ধস

অদ্রীশ বর্ধন

প্রশ্ন : ওমা, পাতাল রেল খোঁড়াখুঁড়ি করে ফেলে রাখার জন্যে নাকি ধস নামতে পারে?

মা : ইঞ্জিনিয়াররা ঠিকই বলেছেন। একটা ঘটনা বলছি। ১৯৬৫ সালে কেনটাকির লেক্সিংটনে একটা বাড়ি তৈরি হচ্ছিল। ভিতের জায়গায় সিমেন্ট ঢেলে দিচ্ছে একটা লরি। আচমকা শোনা গেল একটা চাপা গুড় গুড় শব্দ। লরির তলার মাটি যেন মুখ হাঁ করে গিলে ফেলল গোটা লরিটাকে। দেখা গেল, ১২ ফুট গভীর গর্তের তলায় উল্টে পড়েছে লরি।

প্রশ্ন : আচমকা মুখ হাঁ করল কেন মাটি?

মা : লেক্সিংটন চুনা পাথরের জমিতে রয়েছে প্রচুর গুহা। একটি মাত্র ছোট্ট গুহার ছাদ ধসে পড়ায় তলিয়ে গেছে গোটা লরিটা। সবাই ধরে নিয়েছে পায়ের তলায় মাটি কখনও পল্কা হতে পারে না। আচমকা যখন ধসে যায়, পিলে চমকে ওঠে তখনি। বিশ্বাসই হতে চায় না।

প্রশ্ন : কত রকম ভাবে মাটি ধসে পড়ে?

মা : অনেক রকম ভাবে। আচমকা একটু জায়গা বসে যেতে পারে—বাড়ির একদিকের ভিত ভুস্ করে মাটিতে ঢুকে যেতে পারে—অথবা একটু-একটু করে একটা আস্ত শহর মাটিতে ঢুকে যেতে পারে। যেমন ঘটছে ভেনিস শহরের ক্ষেত্রে। কখনও মাটি বসে যায় স্রেফ প্রাকৃতিক কারণে, কখনো মানুষের কারসাজির ফলে।

প্রশ্ন : মানুষের কারসাজি?

মা :পুরোনো খনিগুলো ধসে যায় তো মানুষের কেরামতির জন্যেই। প্রকৃতি মাটিকে শক্ত করেই গড়েছেন—কিন্তু বেশির ভাগ ধস নামে মানুষ তাকে ফোঁপরা করে দিয়েছে বলে।

প্রশ্ন : সিভিল ইঞ্জিনিয়াররা তাহলে করছেন কী?

মা : সমস্যার ধরনটা তাঁরা আঁচ করতে পারলে সুরাহা নিশ্চয় করে দেবেন। ছোটখাট জায়গায় মাটি বসে গেলে তার একটা বিহিত করা যায়। কিন্তু মূল সমস্যাটা তো কখন কোথায় মাটি বসে যেতে পারে—সেটাই আগেভাগে জানা। পাতাল যদি ফোঁপরা থাকে—যেমন চুনাপাথরের গুহা—পাতাল পর্যন্ত ফুটো না করলে তাদের অস্তিত্ব ধরা যায় না। তত্ত্বগতভাবে মাটি বসে যাচ্ছে, এ কথা যদিও বা বলা যায়—বাস্তবিক ক্ষেত্রে এরকম ভবিষ্যৎবাণী করা মুশকিল। মাটি বসছে জানবার পরেও, তা রোধ করতে যাওয়াও ভয়ানক খরচের ব্যাপার। যেমন ভেনিস শহর। তলিয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে—কিন্তু তা রোধ করতে যাওয়ার খরচটা এতই বেশি যে শুনলে বিশ্বাস হবে না।

প্রশ্ন : পাতাল কেন ফোঁপরা হয়ে যায়, মা?

মা : প্রাকৃতিক পরিবেশেই চুনাপাথর, জিপসাম আর পাথুরে লবণ জলে গুলে যায়। সবচেয়ে কম জলে গোলে চুনাপাথর। জিপসাম আর পাথুরে লবণের সঙ্গে চুনাপাথরের আরও একটা পার্থক্য আছে। সাধারণত চুনাপাথর বেশ শক্ত পাথর; পাতালে এই পাথর জলে গুলে যে গুহার সৃষ্টি হয়—তাদের ছাদও মোটামুটি বেশ মজবুত। মাটি বসে যাওয়ার ঘটনা আকছার ঘটে চলেছে চুনাপাথুরে অঞ্চলেই—গুহাদের জন্যে। ঠিক উল্টো হল পাথুরে লবণ। অনেক নরম পাথর। জলে বেশি করে গুলে যায়। তাই মাটি বসে যায়। তবে গুহর সৃষ্টি প্রায় হয় না বললেই চলে। জিপসাম জিনিসটা রয়েছে চুনাপাথর আর লবণের মাঝামাঝি জায়গায়। কখনো মাটি বসিয়ে দিচ্ছে, কখনো ঠেলে তুলছে।

প্রশ্ন : জিপসাম মাটি ঠেলে তুলছে? পাতালের দানব নাকি?

মা : জিপসাম হল গিয়ে ন্যাচারাল হাইড্রেটেড ক্যালসিয়াম সালফেট। অর্থাৎ, যে-ক্যালসিয়াম সালফেটের মধ্যে প্রকৃতি নিজেই জলের অণু রেখে দিয়েছেন। ক্যালসিয়াম সালফেট জিনিসটাই ভীষণভাবে জলে গুলে যায়। অথচ পৃথিবীর নানান জায়গায় পুরু পাথুরে স্তরের অংশ হিসেবে থাকে এই ক্যালসিয়াম সালফেট। বেশির ভাগই জিপসাম অবস্থায়—কখনও-কখনও ক্যালসিয়াম সালফেট অবস্থায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স, রাশিয়া এবং এ-ছাড়াও আরও অনেক দেশের মাটির তলায় রয়েছে দুটো বস্তুই। এদেরই সলিউশন মাটি বসিয়ে দিচ্ছে এই সব দেশে। বাড়তি সমস্যাটা এই : জলহীন ক্যালসিয়াম সালফেট পাতালে জলের সংস্পর্শে এসে জিপসাম বনে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়তনে বেজায় বেড়ে যাচ্ছে—অথাৎ ফুলে ফেঁপে উঠছে। ফলে, ঠেলে উঠছে জমি। ভুতুড়ে বিস্ফোরণের কারণ তো এরাই।

প্রশ্ন : ভুতুড়ে বিস্ফোরণ?

মা : অ্যানহাইড্রাইট ফুলে ফেঁপে ওঠার ফলে জমি প্রচণ্ডভাবে ওপর দিকে ছিটকে যেত বলে উত্তর-পশ্চিম টেক্সাসে বহু বছর ধরে শোনা গেছে পিলে চমকানো বিস্ফোরণের আওয়াজ। ১৯৫৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, নোভিকা শহরের কাছে পাতালের জমি আচমকা বেড়ে যাওয়ায় কয়েকশ ফুট জায়গায় জমি খাড়াইভারে উঠে গিয়েছিল ১৮ ফুট ওপরে—মাটি আর পাথর ব্যাঙের ছাতার মত এত জোরে তেড়ে গেছিল আকাশপানে যে আধমাইল দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা লোক কুপোকাৎ হয়েছিল ছিটকে আসা পাথরের চোট খেয়ে। তবে হ্যাঁ, জিপসামের ওপরকার জমির নড়াচড়ার ফলে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনাটা ঘটে জমি বসে যাওয়ায়—জলে গোলা জিপসাম সরে যাওয়ার ফলে। যেমন ঘটেছে নিউ মেক্সিকোর রোজওয়েল বটমলেস লেকে—খাড়াইভাবে জমির পাতালপ্রবেশ ঘটেছে বারবার—সবচেয়ে বড় গহুরটা ১২০ ফুট গভীর—৩০০ ফুট ব্যাস। আস্ত শহর পর্যন্ত লণ্ডভণ্ড হয়েছে জিপসামের জন্যে।

প্রশ্ন : শহর লণ্ডভণ্ড হয়েছে জিপসামের জন্যে?

মা : জার্মানির সেই শহরের মাটি বসে যাওয়ায় বহু বাড়ি দুমড়ে মুচড়ে হেলে পড়েছিল। জিপসামের জন্যে সবচেয়ে বড় যে শহরটা টলমল করে চলেছে—নাম তার প্যারিস। শহরতলির জমি যখন তখন তলিয়ে যাচ্ছে—ইঞ্জিনিয়াররা মাথায় হাত দিয়ে বসেছেন। এর চাইতে বড় শহরেও এই দুর্বিপাক ঘটছে হয়তো আজও—জানা নেই আমার।

প্রশ্ন : তুমি যে বলেছিলে, নুনের জন্যেও মাটি বসে যায়?

মা : সবচেয়ে বেশি মাটি বসার দুর্ঘটনা ঘটে পাথুরে লবণ জলে গুলে গিয়ে পাতাল ফোঁপরা করে দিলে। ক্যানাডার উইণ্ডসরে ১৯৫৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আচমকা দুখানা বাড়ি সোজা ঢুকে গিয়েছিল ২৭ ফুট গভীর গর্তের মধ্যে; পাশের জমি থেকে নুনজল টেনে নেওয়ার ফলে। ১৯৭০ সালের ২১ নভেম্বরের রাত্রে উত্তর ভারতের রাঞ্জ গ্রামের লোকজন আতঁকে উঠেছিল কানের পর্দা ফাটানো আওয়াজে—সেই সঙ্গে ভয়াবহভাবে কাঁপছিল বাড়িঘরদোর। বাইরে ছিটকে গিয়ে সবাই দেখেছিল, ৫০ ফুট উঁচু একটা বাঁশঝাড় হঠাৎ যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছে। তারপর দেখা গেল, বাঁশঝাড় তলিয়ে গেছে ৬০ ফুট ব্যাসের একটা গর্তে—ধরণী আচমকা দ্বিধা হয়েছে সেখানে। কিন্তু কেন? রাঞ্জ গ্রাম তো রয়েছে আগ্নেয় লাভার ওপর, তাহলে? এই লাস্তরের তলায় ছিল নুনের স্তর। অনেকদিন ধরে তা জলে গুলে গিয়ে পাতালকে ফোঁপরা করে দিয়েছিল—ওপরের ভারি পাথর ধসে পড়েছে তার মধ্যে। গিলে নিয়েছে বাঁশঝাড়কে। বৈজ্ঞানিক কারণটা জানা না থাকলে নিশ্চয় মনে হবে, অবশ্যই বাঁশঝাড়ের ভূতের কাণ্ড!

প্রশ্ন : বাঁশ-ভূত নয় মা, এ যে নুন-ভূত! শহর গিলতে পারে?

মা : কোঁত করে গিলে নিয়েছিল ক্যানাডার রোজ টাউনকে। ১২ মাইল জায়গা জুড়ে মাটি বসে গিয়েছিল ৩০০ ফুট গভীরে। কেন জানিস? ৪০০ থেকে ৭০০ ফুট পুরু নুনের স্তর ছিল ৫০০০ ফুট গভীরে। ক্যানাডার ক্রেটার লেক তৈরি হয়েছে তো এইভাবেই। রেল স্টেশন পর্যন্ত গিলে নিয়েছে তোর নুন-ভূত!

প্রশ্ন : রেল স্টেশন গিলেছে?

মা : ক্যানসাসের Rosel রেল স্টেশন রাতারাতি তলিয়ে গেছিল মাটি বসে যাওয়ায়—সঙ্গে সঙ্গে জলে ভরাট হয়ে যায় ৭০ ফুট গভীর গর্ত। স্টেশনের টিকি পর্যন্ত আর দেখা যায়নি। এরকম ঘটনা অনেক আছে। এগুলো ঘটছে প্রাকৃতিক কারণে—কিন্তু মানুষের কারসাজিতে নুনের স্তর সরে গিয়ে মাটি ধসিয়ে দিচ্ছে নানা জায়গায়। পাম্পে করে নুন জল টেনে বের করা হয় নুনের খনি থেকে। সবচেয়ে বিখ্যাত নুন-ভূতের মাটি ধসানো ঘটেছে ইংল্যাণ্ডের Cheshire প্রান্তরে। অত্যন্ত একঘেয়ে ভাবে চ্যাটালো এই তেপান্তরের মাঠের পুব আর পশ্চিমে রয়েছে পাহাড়। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই এখানকার মাটি বসে গেছে পাতাল নুন গলে সরে যাওয়ায়—তাই দেখা যায় ৩০ ফুট গভীর গহ্বরের পর গহুর। কয়লা খুঁজতে গিয়ে নুনের খনির সন্ধান পাওয়া যায় এখানে ১৬৭০ সালে। নুন তোলা শুরু হয় ১৬৮২ থেকে। তারপরেই ফটাফট করে বসে যেতে থাকে মাটি—জল এসে ভরাট করে দিত গোটা খনি। ১৯২৮ সালে নরউইচের একটা চালু খনি পরিত্যক্ত হয় এই কারণে। নরউইচের ডানকার্ক শহরতলীতে বাড়ি হেলে পড়েছে রাস্তার ওপর দু ফুট পর্যন্ত, কোনও বাড়ি পাশের বাড়ির ওপর হেলে গিয়ে তাকেও হেলিয়ে দিচ্ছে; লম্বায় আর চওড়ায় হাজার ফুট অঞ্চল বসে গেছে ৪০/৫০ ফুট গভীরে; প্রায় ৪০০ বাড়ির বারোটা বেজেছে আচমকা ধরণী দ্বিধা হওয়ায়—প্রতি বছর বেড়েই চলেছে মাটি ধসার জায়গা। সবচেয়ে দর্শনীয় মাটি বসে যাওয়া ঘটেছে ডানকার্কে।

প্রশ্ন : দর্শনীয়?

মা : ১৮৮০ সালের ৬ ডিসেম্বর ভোর ৬টায় লোকের ঘুম ছুটে যায় ভয়ানক গুড় গুড় গুম গুম আওয়াজে—সেই সঙ্গে আধমাইল জুড়ে মাটি হেলে দুলে উঠতে থাকে আওয়াজের তালে তালে। মাটি চৌচির হয়ে যেতেই হুস হুস করে বেরিয়ে আসতে থাকে বাতাস আর গ্যাস। একটা জায়গায় তেড়ে উঠে আসে কাদার গরম ফোয়ারা—১২ ফুট হাইটে। পাতালে পুরোনো খনির প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড দেওয়াল ধসে পড়ায় জল তেড়েমেড়ে ঢুকছিল বলেই এত বাতাস সশব্দে বেরিয়ে আসছিল ফুটোফাটা দিয়ে। এ জল আসছিল Wincham নদী থেকে—পুরো নদীটাই ঢুকে যাচ্ছিল পাতালে। নদীর জলও শেষে ঢুকে পড়ল পাতালে—সেইসঙ্গে আস্ত একটা হ্রদের জল। ঘূর্ণিপাক দেখা দিল বিশাল গহ্বরে—ঘুরতে ঘুরতে মাঝের জল নেমে গেল ১২ ফুট নিচে।

প্রশ্ন : চুনাপাথর আর নুন ছাড়াও নিশ্চয় অন্য কারণ আছে মাটি বসে যাওয়ার পেছনে?

মা : আছে বইকি। জমির নিচে যে তলানি জমেছে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে, তা যখন ওপরের মাটির চাপে চেপেচুপে আয়তনে কমে যায়, জলকে চেপে বের করে দেয়—তখন ওপরকার মাটি বসে যায়। ভূতাত্ত্বিকরা এই ব্যাপারকে বলেন compaction। চূড়ান্ত নজির হল, গাছপালার পাতাল-তলানি, যাকে বলে pcat—লক্ষ লক্ষ বছরের চাপে এই peat হয়ে যাচ্ছে কয়লা। আসল ভলুমের টেন পার্সেন্ট কমে গেলেই কয়লা হচ্ছে। যেটুকু কমছে—সেটুকুই জল বেরিয়ে যাওয়ার ফলে ঘটছে। ইংল্যাণ্ডের Fenland অঞ্চলে কমপ্যাকশনের ফলে peat গুটিয়ে যাওয়ায় জমি নেমে গেছিল ৮ ফুট ১০ ইঞ্চি নিচে, অথাৎ এক শতাব্দীতে শতকরা ৫৬। এখনও compaction চলছে সেখানে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর ফ্লোরিডা এভারগ্লেড অঞ্চলে peat গুটিয়ে যাওয়ায় জমি বসছে প্রতি বারো বছরে এক ফুট। ক্যালিফোর্নিয়ার sacrameno delta-তে peat আয়তনে কমছে বলে সেখানকার জমি সমুদ্র-পৃষ্ঠের নিচে নেমে গেছে—নদীতে বান এলেই পুরো তল্লাট ডুবে যায়।

প্রশ্ন : কাদাও তো চাপের ফলে জল বের করে দিয়ে ছোট্ট হয়ে যায়। তখন?

মা : তখনো compaction হয়—মাটি বসে যায়। হল্যাণ্ডে সাগরপাড়ের যে জমিকে বাড়িঘরদোরের জন্যে গোছানো শুরু করেছিলেন ওলন্দাজ ইঞ্জিনিয়াররা, তাঁরা দেখেছেন ২৫/৩০ পার্সেন্ট কাদার কমপ্যাকশন ঘটছে। কাদার কমপ্যাকশনে peat compactionএর মত রাসায়নিক রদবদল ঘটে না বলে তার ভবিষ্যৎবাণীও করা যায় ১৪ আর ১৫ শতকে ব্রিস্টলের টেম্পল চার্চ তৈরির আগেই দুর্বিপাকটা টের পাওয়া গেছিল। অ্যাভন নদীর ভিজে পলিমাটির ওপর নির্মিত হওয়ার ফলে টাওয়ার এখন চারফুট হেলে পড়েছে—হেলে পড়েও খাড়া রয়েছে। নটিংহ্যামে ট্রেন্ট নদীর পলিমাটির ওপর তৈরি কলকারখানাও কিছু তলিয়েছে, কিছু হেলেছে—এমনটা যে ঘটবে, আগেই তা বলা হয়েছিল।

প্রশ্ন : ব-দ্বীপ তাহলে বিপজ্জনক?

মা : ব-দ্বীপগুলোর মাটি বসে যাওয়ার পেছনে শুধু compaction নয়—অন্য কারণও আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি নদীর ব-দ্বীপে প্রতি শতাব্দীতে গড়ে ০.২৯ ফুট মাটি বসে যাচ্ছে compaction-এর জন্যে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে, তলানির চাপে ভূস্তরের নিজেরই বসে যাওয়া—প্রতি শতাব্দীতে তা বসছে ০·০৭ ফুট হিসেবে। গোদের ওপর বিষফোড়ার মত সমুদ্রপৃষ্ঠ উঠে যাচ্ছে প্রতি শতাব্দীতে ০·৩২ ফুট হিসেবে—এটা অবশ্য ঘটছে পৃথিবীর সব সমুদ্রেই। সব মিলিয়ে কি ঘটছে? ১৯৩৮ সালে ব-দ্বীপের Balize শহর চলে গেল চার ফুট জলের তলায়—তার ৩০ বছর আগেই অবশ্য শহর ছেড়ে চলে গেছিল লোকজন মহামারী শুরু হওয়ায়।

প্রশ্ন : Compaction-এর মূলে তাহলে রয়েছে চাপের চোটে জল বেরিয়ে যাওয়া? জল ঢুকিয়ে দিলেই তো হয়?

মা : কিছু পাতালতলানিতে জল দিলে ফলটা হবে একই—জমি বসে যাবে। পৃথিবীর নানান জায়গায় বাতাসে উড়ে এসে একরকম খুব মিহি মাটি জমা হয়—একে বলে Loess; প্রথম দফায় তা জলে ভিজলেই তার মধ্যে hydrocompaction শুরু হয়ে যায়; তার মানে, কণাগুলো নড়েচড়ে বসে ভালোভাবে গুটিয়ে-সুটিয়ে যাওয়ার জন্যে। ক্যালিফোর্নিয়ার সেন্ট্রাল ভ্যালীতে এর ফলে মাটি বসে গেছিল ১৫ ফুট—বাড়ি, রাস্তা, পাইপ লাইন, কুয়ো, খাল—জখম হয়েছিল সবই।

প্রশ্ন : কিছু বাড়ির আধখানা বসে যায়, আধখানা খাড়া থাকে কেন?

মা : ভাল প্রশ্ন। নটিংহ্যামে এক সারি বাড়ির শেষ বাড়ির দেওয়াল বসে যাচ্ছে দেখে বাড়ি খালি করে দেওয়া হয়। গোয়েন্দাগিরির ফলে একটা ম্যাপ পাওয়া গেল এবং জানা গেল, পুরো প্লটটার তলায় পাথর খুঁড়ে বের করা হয়েছিল এক সময়ে। তার খানিকটা ভরাট করে দেওয়া হয়। নতুন বাড়ি তৈরির সময়ে আগের খবর নেওয়া হয়নি। শেষ বাড়ির শেষ দেওয়াল জঞ্জালের ওপর থাকায় তার compaction হয়েছে—বসে গেছে বাড়ির আধখানা। পাথরের ভিতে থাকায় অন্য বাড়ি আস্ত থেকেছে। কমপ্যাকশন সব জায়গায় সমানভাবে হলে এরকমটা ঘটত না।

প্রশ্ন : পিসা-র Leaning Tower কেন হেলে পড়েছে, মা?

মা : পিসা খুব প্রাচীন শহর। গড়ে উঠেছিল চ্যাটালো জায়গায়—প্রায় সমুদ্র পৃষ্ঠের লেভেলে। পাশেই Apennines পাহাড়ের রেঞ্জ। পুরো সমতলটার তলানি মাটি বেজায় নরম—বড় বাড়ি তৈরির উপযুক্ত মোটেই নয়। লিনিং টাওয়ারটা আসলে একটা গিজার লাগানো ঘন্টাঘর। ১১ শতকে তৈরি হয় এই গির্জে। তৈরির পর থেকেই বসে যেতে থাকে; কিন্তু খুব একটা ক্ষতি হয়নি; চওড়ার অনুপাতে হাইট বেশি না হওয়ায় খুব হেলে পড়েনি। একশ বছর পরে ঘন্টাঘর তৈরি আরম্ভ হয় খুবই দুর্বল জমির ওপর—ভিতটাও মোটই মজবুত করা হয়নি। কাজ শুরু হয় ১৯৭৩ সালে। বছর কয়েক পরে তিনটে তলা তৈরি হওয়ার পরেই টাওয়ার এমনই হেলে পড়ে যে আর্কিটেক্ট কাজ ছেড়ে দিয়ে চম্পট দেয় পিসা থেকে। আর ওজন না পড়ায় টাওয়ার আর হেলেনি। ১২৭৫ সালে এলেন আর একজন বিল্ডার। তিনি দেখলেন, টাওয়ার যখন আর হেলছে না, তখন যেদিকে হেলেছে, সেইদিকে বাড়তি গাঁথনির সাপোর্ট দিয়ে আরও উঁচু করা যাক টাওয়ারকে। কিন্তু আবার হেলতে থাকে টাওয়ার। বিদায় নিলেন এই আর্কিটেক্ট—এলেন তৃতীয় স্থপতি। তিনিও একদিকের গাঁথনি মজবুত করে টাওয়ার নির্মাণ করলেন ১৩৫০ সালে। তখন থেকেই বিরামবিহীনভাবে টাওয়ার হেলেই চলেছে—এখন তা ১৭ ফুটেরও বেশি হেলে রয়েছে।

প্রশ্ন : ঠিক যেন জ্যান্ত টাওয়ার, তাই না, মা?

মা : তোর মুণ্ড। হেলে পড়ার মূল কারণটার টেকনিক্যাল নাম—differential settlement। এক একদিকে এক-এক হারে মাটি বসছে—টাওয়ার বেচারি ভুগছে টানাপোড়েনে। মোট মাটি বসেছে প্রায় ৬ ফুট—সামনের দরজার সিঁড়ি দিয়ে পৌঁছোতে হলে ওপরে না উঠে নিচে নেমে যেতে হবে। ৬ ফুট হল গড় হিসেব। দক্ষিণ দিকে বসেছে ৯ ফুট, উত্তর দিকে ৩ ফুট। টাওয়ারের ঠিক তলায় রয়েছে Pliocene যুগের তলানি আর কাদার স্তর—যা কিনা আংশিকভাবে আগ্নেয়গিরির পেট থেকে বেরিয়েছিল। এই স্তরটা প্রায় ১৫ ফুট পুরু, টানলে বাড়ে, চাপ দিলে খুবই কমে যায়। টাওয়ারের ভিতটা আংটির মত—ব্যাস ৬০ ফুট—মাটির মধ্যে গাঁথনি গেছে মাত্র কয়েক ফুট। টাওয়ারের হাইট ১৮০ ফুট—অথাৎ ‘চওড়ায় যা, তার তিনগুণ। এরকম ইমারত তলতলে কাদামাটির ওপর তৈরি হলে তো হেলবেই। তলায় বালির বিছানা না থাকলে পিসার টাওয়ার কবে পড়ে যেত!

প্রশ্ন : বালির বিছানায় পিসার টাওয়ার?

মা : কাদামাটির স্তরের ঠিক নিচেই রয়েছে ১৫ থেকে ৩০ ফুট পুরু বালির বিছানা। বালি বড় টেটিয়া। চেপেচুপে ছোট করা যায় না। কাদামাটির মত অত নড়তে চড়তেও চায় না। বালির ওপর প্রাসাদ হয় না ঠিকই—কিন্তু এই বালির দৌলতেই টাওয়ারের মাটিতে বসে যাওয়া অনেকটা কম হচ্ছে—হেলছেও কম।

প্রশ্ন : সাতশ বছরেও পড়ে গেল না কি শুধু বালির বিছানার জন্যে?

মা : বালি আর ভিতের মাঝের কাদামাটি অনেক মজবুত হয়ে গেছে Compaction-এর ফলে জল বেরিয়ে যাওয়ায়—তাই ৭০০ বছরেও আছড়ে পড়েনি। ১৫ থেকে ৩০ ফুট পুরু বালির বিছানার মধ্যেও পাতলা কাদামাটির স্তর আছে; এই স্তর দক্ষিণ দিকে বেশি পুরু; কমপ্যাকশন সেইদিকেই বেশি হয়েছে টাওয়ার হেলেছে সেই কারণেই। আরও আছে। বালির নিচে রয়েছে আরও পলকা কাদামাটি ১৩০ ফুট গভীরতা পর্যন্ত—এই গভীরতা থেকেই বালির বিছানা ফের শুরু হয়েছে। ওপরের তিনটে স্তরের ক্রমাগত নড়াচড়ার ফলেই টাওয়ার হেলেই চলেছে। আবার বলছি, এই তিনটে স্তর, হল, ওপরকার কাদামাটি, মাঝের বালি, তলার কাদামাটি।

প্রশ্ন : পৃথিবীবিখ্যাত লিনিং টাওয়ারের মরণদশা কি আসন্ন?

মা : ১৩০ ফুট গভীরতায় যে বালির বিছানা রয়েছে, পাতাল-গাঁথনি সেই পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে লিনিং টাওয়ারকে ঠিক এই অবস্থায় রেখে দিতে পারে আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনিক। লিকুইড সিমেন্টের ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়েছিল পাতাল তলানিতে—কিস্সু ফয়দা হয়নি, তাই দরকার এখন পাতাল-গাঁথনির। কিন্তু এইরকম হেলেপড়া একটা টাওয়ারের তলায় গাঁথনি গেঁথে যাওয়াটা বড় ঝুঁকির ব্যাপার। যদি হুড়মুড়িয়ে পড়ে যায়? অনেকবছর ধরেই অনেক প্ল্যান তৈরি হয়েছে—তৈরি হয়ে চলেছে এখনও। কপাল ভাল থাকলে প্ল্যানমাফিক কাজ চালালে সুফল দেখা দেবে। কিন্তু ঠুটো জগন্নাথের মত বসে থাকলে আর বড় জোর একশ বছর—লিনিং টাওয়ার মাটিতে শুয়ে পড়বেই। এই বিপর্যয় রোধ করতে পারে শুধু সাহসী মানুষ।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%