অদ্রীশ বর্ধন

প্রশ্ন : জাতীয় নেতার মুণ্ড শূন্যে ছিটকে দেওয়ার মত ঘটনা কখনও ঘটেছে?
মা : না। তবে ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা আছে গুপ্তঘাতকদের অজস্র বর্বর কাহিনী। রাশিয়ার নিহিলিস্টরা কি কম কাণ্ড করেছে! জারের ঘোড়াকে শূন্যে ছিটকে দিয়েছে বোমা ফাটিয়ে—তার পরের বোমায় চেহারা পালটে দিয়েছে স্বয়ং জারের।
প্রশ্ন : কোন্ জার মা?
মা : রাশিয়ার মহাবিপ্লব যখন ঘটেনি—তার আগে লোমহর্ষক খুনখারাপিতে ছেয়েছিল রাশিয়া দেশটা। কৃষক আর অভিজাতদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছিল বিদ্বেষ আর চক্রান্ত। নিহিলিস্টদের বোমার ঘায়ে হাত-পা উড়ে যাওয়া অথবা বিলকুল খতম হয়ে যাওয়াটা ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। কেউ আর তেমন চমকে উঠত না। জার দ্বিতীয় আলেকজাণ্ডার খুনের হুমকির পরোয়া করতেন না। ভূমিদাসদের তিনি চিরকালের মত মুক্তি দিয়েছিলেন, আইনকানুনের বিস্তর সংস্কার করেছিলেন। কিন্তু তাতেও পুরুষানুক্রমে সন্ত্রাসের রাজত্বর অবসান ঘটানো যায়নি। নিহিলিস্টদের চোখে সম্রাট তখন অত্যাচারী রাজবংশের শিরোমণি ছাড়া কিছুই নয়। নৃশংস মৃত্যুই নাকি তাঁর একমাত্র প্রাপ্য শাস্তি। তাই একদিন রক্ষীদের হাজার সজাগতা সত্ত্বেও সম্রাটের খাবার ঘরের নিচে রাখা হয়েছিল অত্যন্ত শক্তিশালী বোমা। গুমখুনিরা জানত, কখন খেতে বসেন সম্রাট। বোমা ফাটবে ঠিক তখনই। কিন্তু রাখে কেষ্ট মারে কে! ১৮৮০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় বোমা রাখা হল—আর ঠিক সেইদিন সেই সময়েই আলেকজাণ্ডার রুটিন ভঙ্গ করলেন। ভাইপোর সঙ্গে অন্য ঘরে বসে কথা বলতে লাগলেন। বলে পাঠালেন, খেতে আজ দেরি হবে। ঠিক সাড়ে ছটায় গোটা খাবার ঘরটা ছিটকে গেল প্রাসাদের বাইরে শূন্যে—ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ল ৭৬ জন রাজরক্ষী—সোনার থালা আর সিল্কের চাদর ঘিরে রইল ছিন্নভিন্ন দেহগুলোকে। সেন্ট পিটার্সবার্গের বিখ্যাত উইনটার প্যালেসের একটা দিক পুরো ধ্বংস হয়ে গেছিল এই বিস্ফোরণে—আওয়াজ শোনা গেছিল কয়েক মাইল দূর থেকে। দ্বিতীয় আলেকজাণ্ডার বড় গোঁয়ার ছিলেন বলে এ যাত্রা বেঁচে গেলেও খুন হয়ে গেলেন ঠিক ১৩ মাস পরে।
প্রশ্ন : নিহিলিস্টদের বোমায়?
মা : হ্যাঁ। প্রাসাদের একটা দিক উড়িয়ে দিয়েও জার-কে খতম করা যায়নি শুনেই নিহিলিস্টরা ফের কোমর বেঁধে লেগেছিল। যে রাস্তা দিয়ে জার যেতেন প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে—সেই রাস্তা এমনিতেই ফাঁকা থাকত। রাস্তার পাশে চিজ বিক্রির দোকানঘর খুলে বসেছিল নিহিলিস্টরা। নামেই দোকান। মেঝে খুঁড়ে সুড়ঙ্গ বানিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল রাস্তার তলা পর্যন্ত। খোঁড়া মাটি রাখা হত চিজের পিপেতে। জানি না, এই ঘটনা থেকেই শার্লক হোমসের একটা কেস লেখা হয়েছিল কিনা। যাই হোক, কানাঘুষোয় কিন্তু গোয়েন্দাবাহিনীর টনক নড়ায় বন্ধ করে দেওয়া হল চিজের দোকান। জারকেও হুঁশিয়ার করা হল। কিন্তু কাঠগোঁয়ার ভদ্রলোক কোনও কথাই কানে তুললেন না। ‘খুনের ভয়ে কয়েদি হয়ে থাকব নাকি বাড়িতে?’ এই বলে বেরোলেন সৈন্যদের একটা অনুষ্ঠান দেখবেন বলে। নিহিলিস্টরা বোমার বাণ্ডিল নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল নানা দিকে। অনুষ্ঠান থেকে ফেরবার সময়ে বিশেষ একটা ব্রিজের ওপর তাঁর ঘোড়ায় টানা গাড়ি উঠতেই একজন নিহিলিস্ট মেয়ের হাতে দুলে উঠল একটা রুমাল। সেই হল সঙ্কেত। খবরের কাগজে মোড়া একটা প্যাকেট হাতে একজন পুরুষ আপন মনে হাঁটতে হাঁটতে আচমকা প্যাকেটটা ছুঁড়ে দিলে ঘোড়ার পায়ের তলায়। আগুন আর বিস্ফোরণের মধ্যে দিয়ে দেখা গেল শূন্যে ছিটকে যাচ্ছে সামনের ঘোড়া। বাকি ঘোড়াগুলোও টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। কসাক রক্ষীরা মারা গেল, জখমও হল, তালগোল পাকিয়ে গেল কাঠ আর লোহায় মোড়া গাড়িখানা।
প্রশ্ন : জার-ও মারা গেলেন?
মা : না। তিনি ভাঙা গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে জখমদের দিকে এগোতেই প্যাকেট হাতে এগিয়ে এল আর একজন, জিজ্ঞেস করল নরম গলায়—লাগল নাকি? জার বললেন—‘আঁচড়ও লাগেনি।’ সঙ্গে সঙ্গে লোকটার হাতের প্যাকেট আছড়ে পড়ল সটান রাজার ওপর। এবারের বিস্ফোরণ আরও প্রচণ্ড। সম্রাটকে আর চেনাও যাচ্ছিল না। ধড়ে প্রাণ রয়েছে তখনও—মারা গেলেন প্রাসাদে ফিরিয়ে আনার পর।
প্রশ্ন : ওইরকম বিস্ফোরণের পরেও বেঁচে ছিলেন?
মা : আমেরিকার প্রেসিডেন্ট লিঙ্কনের ক্ষেত্রেও এইরকম পরমায়ুর জোর কিছুটা দেখা গেছে সেদিন ছিল ক্যাবিনেট মিটিং। গৃহযুদ্ধে পরাজিত বিরোধী পক্ষের এক গুপ্তচর আর এক তরুণ সেনানীকে ক্ষমা করে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরছেন ৫৫ বছরের সদ্য নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। স্ত্রী মেরী বললেন—‘চলো, একটা মজার নাটক দেখে আসবে ফোর্ড থিয়েটারে।’ ৮টায় নাকেমুখে গুঁজে দুজনে চলে গেলেন থিয়েটারে। বসলেন স্টেট বক্সে। দোলনা চেয়ারে বসে দুলতে-দুলতে নাটকের মজায় সব ক্লান্তি যখন ভুলে গেছেন, ঠিক তখনি এক ছোকরা এসে দাঁড়ালো প্রেসিডেন্টের পেছনে। রাত তখন দশটা। লোকটার নাম জন উইলকিস। রোমিওর ভূমিকায় অভিনয় করেই চলে এসেছিল খুন করবে বলে। নাটক করে নাম করতে পারেনি বলে বড়াই করেছিল—‘এবার এমন নাটক করব যে গোটা আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়বে আমার নাম।’ গৃহযুদ্ধে পরাজিত পক্ষের সমর্থক সে। ছোট্ট পিস্তল তুলে গুলি করেছিল লিঙ্কনের বাঁ কানে—গুলি ব্রেনের মধ্যে গিয়ে আটকে গেছিল ডান চোখের পেছনে। বেঁচেও ছিলেন কিন্তু ভোর পর্যন্ত। গুপ্তঘাতক? সে তো গুলি করেই স্টেট বক্স থেকে লাফিয়ে ১৪ ফুট নিচে নেমেই গলা ফাটিয়ে সোল্লাসে বলেছিল—এইভাবেই শেষ হোক অত্যাচারীর দল। কিন্তু পতাকায় ডান পা জড়িয়ে যাওয়ায় ভেঙে গেছিল বাঁ পা। তারপরেও ঘোড়া হাঁকিয়ে পালিয়েছিল বটে, কিন্তু প্রাণে বাঁচেনি।
প্রশ্ন : Assassin শব্দটার আসল মানে কী মা?
মা : ক্রুসেড। যুদ্ধের সময়ে বিশেষ এক গুপ্ত মুসলিম সম্প্রদায় ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে শত্রু হত্যা করে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে যেত। এ কাজ করতে হত ‘হাশিশ’ নামে মাদক দ্রব্য খাওয়ার পর। ‘হাশিশ’ প্রভাবে থাকার সময়ে তাদের ‘হাশাশিন’ বলে ডাকা হত। এই শব্দটাই মধ্যযুগীয় ল্যাটিনে ঢুকে গিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপের নানা ভাষায়। ইংরেজিতে Assassin শব্দটা চালু হয় সতেরো শতকে। যে কোনও খুনির ক্ষেত্রেই এ-শব্দের ব্যবহার থাকলেও বিশেষ করে রাজনৈতিক হত্যার সময়ে শব্দটার চল বেশি আছে। আঠারো শতকে যুক্তরাষ্ট্রে দলবদ্ধ গুমখুনের রাজত্ব চালিয়েছিল সেরা গুমখুনি চিনে সমাজবিরোধীরা—পাল্লা দিয়ে গেছিল আইরিশ আর ইটালিয়ানরা। অভাব ছিল না গুপ্ত সমিতির। অদ্ভুত তাদের নাম। যেমন, মরা খরগোশ। ইটালিয়ানরা স্বদেশের দারিদ্র্য এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে এসে খুলে বসেছিল নিজেদের গুপ্ত সমিতি ‘মাফিয়া’। মাফিয়া মানে জানিস তো? সিসিলিয়ান সমাজবিরোধীরা পাহাড়ে পালিয়ে গিয়ে মাফিয়া অর্থাৎ খাটো ঝোপঝাড় আগাছায় গা ঢেকে থাকতো বলে তাদের নাম দাঁড়িয়েছিল মাফিয়া। ১৮৮০-তে এই মাফিয়ারাই নিউ অর্লিয়েন্সে ‘ব্ল্যাকহ্যাণ্ড’ অর্থাৎ ‘কালোহাত’ নাম নিয়ে ঢুকে পড়ে চালিয়ে গেছিল লোমহর্ষক সন্ত্রাসের রাজত্ব বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল এদেরই কুকীর্তির ফলে।
প্রশ্ন : মহাযুদ্ধের পেছনে ছিল ‘কালোহাত’?
মা : জানিস তো প্রথম মহাযুদ্ধ আরম্ভ হয়েছিল অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক আর আর্চডাচেসকে গুপ্তহত্যা করা হয়েছিল বলে। সার্বিয়া-র বিপ্লবী ‘কালো হাত’ ছিল তার পেছনে। ১৯১৪-র ২৮ জুন জোড়া খুনের নায়ক ছিল একজন ছাত্র—তাকে অতিয়েছিল ‘বুল’ অর্থাৎ ‘ষাঁড়’ নামধারী এক অতি কদাকার আর দৈত্যাকার পুরুষ—আসল নাম তার ড্রাগুটিন ডিমিট্রিয়েভ—ছিল আর্মি অফিসার, তলায় তলায় গড়ে তুলেছিল ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক গুপ্ত সমিতি—কালোহাত। জোড়া খুনের কয়েক হপ্তার মধ্যেই সার্বিয়া আক্রমণ করে অস্ট্রিয়ান সেনাবাহিনী—শুরু হয় পৃথিবী জুড়ে রক্তঝরা যুদ্ধ! পৃথিবীর ভারসাম্যই পাল্টে গেছিল সেই যুদ্ধে—ভুল প্রমাণিত হয়েছিল বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডিসরেলি-র কথা
প্রশ্ন : ডিসরেলি কী বলেছিলেন, মা?
মা : বলেছিলেন—‘গুপ্তহত্যা কখনই বিশ্ব ইতিহাস পাল্টে দেয়নি।’ ওঁর মৃত্যুর পরেই, অষ্ট্রিয়া রাজবংশের এই ডবল মার্ডারের পরেই, মৃত্যুর কালো ছায়া নেমে এসেছিল দু’ কোটি লোকের মাথায়—ঝাঁকুনি খেয়েছিল পৃথিবীর ইতিহাস।
প্রশ্ন : গুমখুনিরা কেন এমন নরপিশাচ হয়ে যায় মা?
মা : কারণ অনেক। পাগলামি, ঈর্ষা, লোভ। মূল এই তিনটে কারণ থেকেই কার মাথায় শেকড় চালিয়ে দেয় বিকৃত দেশপ্রেম, কেউ অর্জন করতে চায় কুখ্যাতি, কেউ চায় আতঙ্ক থেকে মুক্তি। যেমন ঘটেছিল ক্যাথরিনের ক্ষেত্রে। আতঙ্ক আর উচ্চাশা মিলেমিশে তাঁকে গুপ্তঘাতক করে তুলেছিল। জীবনে ব্যর্থ মানুষ মনকে যখন বোঝায় যে অমুক দেশনেতা বা রাজপরিবারের কাউকে খতম করতে পারলেই ভয়ানক একটা অন্যায়ের প্রতিকার করে ফেলা যাবে—তখন ভয়ঙ্কর সেই বদ্ধমূল ধারণা থেকেই জন্ম নেয় হত্যার লিপ্সা। শেক্সপিয়র এই কারণেই বলেছিলেন—Uneasy lies the head that wears a crown! মুকুটধারীর মাথা স্বস্তিতে থাকতে পারে না কখনই!
প্রশ্ন : অভিশপ্ত মুকুট?
মা : না তো কি! শুধু মুকুট পরার অপরাধে কত ভালো মানুষকে প্রাণবলি দিতে হয়েছে। ‘ষাঁড়’ নামধারী নরপিশাচের মত আরও এক গুপ্তঘাতক যুগোশ্লাভিয়ার রাজা আলেকজাণ্ডারের হৃৎপিণ্ড বুলেট মেরে ফুটো করে দিয়ে যুগোশ্লাভিয়া আর হাঙ্গেরির মধ্যে যুদ্ধ বাধানোর উপক্রম করেছিল ১৯৩৪-এর অক্টোবরে। নাম তার পিটার কেলম্যান। রেগে আগুন জনতা তাকে পিটিয়েই মেরে ফেলে। ‘ষাঁড়’-কে অবশ্য পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল তার প্রথম পৈশাচিক রাজহত্যার জন্যে।
প্রশ্ন : গুপ্তহত্যার জন্যে পুরস্কার?
মা : ‘ষাঁড়’ ছিল আর্মি লেফটেনান্ট—সার্বিয়ার রাজা আর রানীকে নৃশংসভাবে খুন করার পুরস্কার পেল কর্নেল হয়ে গিয়ে। সেই তার প্রথম গুপ্তহত্যা। বৃহত্তর সার্বিয়া-র স্বপ্ন দেখত যে তপ্তমস্তিষ্ক সৈন্যরা—‘বুল’ ছিল তাদের পালের গোদা। দেশের মঙ্গলের জন্যে যাদের পরলোকে যাওয়া দরকার, তাদের খতম তালিকাও তৈরি করেছিল ‘বুল’। ফর্দের প্রথমেই ছিল দুর্বল রাজা আলেকজাণ্ডার আর তার কুটিল রানী ড্রাগা-র নাম। নানারকম শয়তানি চক্রান্তে বোঝাই রানী ড্রাগা-র মাথা। তাই একদিন দলবল নিয়ে চণ্ডাল ‘বুল’ হানা দিল প্রাসাদে গভীর রাতে। ডিনামাইট ফাটিয়ে ফিউজ করে দিল সমস্ত আলো। কিন্তু খুঁজে পাওয়া গেল না রাজা আর রানীকে। তারপরেই দেখা গেল, শোবার ঘরের লাগোয়া গুপ্তঘরে লুকিয়ে জানালা দিয়ে রক্ষীদের ডাকছে রাজা আর রানী। তেড়ে গেল ‘বুল’ চ্যালাদের নিয়ে। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দুজনকে আধমরা করার পর রানীকে চ্যাংদোলা করে তুলে ফেলে দিলে জানালা—দিয়ে রাজার পেটে এত জোরে তরোয়াল ঢুকিয়ে দিল ‘বুল’ যে তলোয়ার পেট ফুটো করে আটকে গেল কাঠের মেঝেতে। তখনো রাজা মরেনি দেখে তাঁকেও চ্যাংদোলা করে জানালা গলিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিতেই তিনি দুহাতে গোবরাট আঁকড়ে ধরেছিলেন। একজন কশাই সৈন্য তলোয়ারের এক কোপে আঙুলগুলো কেটে বাদ দিতেই নিচে আছড়ে পড়েছিলেন আলেকজাণ্ডার।
প্রশ্ন : ‘কালোহাত’ গুপ্তসমিতি তখন গড়ে উঠেছিল?
মা : না। এরপর থেকেই দক্ষিণী স্লাভ-দের এক করে আরও বড় দেশ যুগোস্লাভিয়া গড়ে তোলার স্বপ্নে বুদ হয়ে যায় ‘বুল’—১৯১১-র মে মাসে জন্ম নিল কুখ্যাত ‘কালোহাত’। ‘আসল’ সার্বিয়া-র সমস্ত শএুনিধনই ছিল এই সমিতির প্রধান লক্ষ্য। ১৯১২ থেকে ১৯১৪-র মধ্যে প্রায় ১২০টা গুপ্তহত্যা চালিয়ে গেছে ‘কালোহাত’। ১৯১২-তে সেরা গুপ্তঘাতকদের ভিয়েনা পাঠিয়েছিল ‘বুল’ অস্ট্রিয়ার মহারাজা ফ্রান্সিস জোসেফের রক্ত ঝরানোর জন্যে। ব্যর্থ হয় ষড়যন্ত্র। তারপরেই তিন ছাত্রকে তাতিয়ে অস্ট্রিয়ারই আর্চডিউক ফ্রান্সিস ফার্দিনান্দ-কে খুন করায় ‘বুল’। যে-ছেলেটা খুন করেছিল, তার বয়স তখন একুশও নয়। যক্ষ্মায় ধুঁকছে। জেলখানাতেই মারা যায় দু-বছর পরে। তাতে বয়ে গেল ‘বুল’-এর। যুদ্ধের সময়ে ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মতই লড়েছে—আবার ‘কালোহাত’কেও চালু রেখেছে। ১৯১৪-র সেপ্টেম্বরে ঘাতক পাঠিয়ে দিল বুলগেরিয়ার রাজা ফার্দিনান্দ-কে খতম করার জন্যে। গুলি ফসকে যাওয়ায় ঘাতকের হয় মৃত্যুদণ্ড।
প্রশ্ন : ক্যাথরিন কে মা? যার কথা বললে একটু আগে?
মা : ইনিও ছিলেন রানী—রাশিয়ার রাজা তৃতীয় পিটারের বউ। বিয়ের ১৭ বছর পরে, রাজার বয়স যখন মোটে ৩৪, লোক লাগিয়ে রানী তাঁর গলা টিপে মারেন। কারণ, কাউন্টেস ওরোনোফের সঙ্গে রাজার মেলামেশা দেখে ভয় পেয়েছিলেন ক্যাথরিন। এরপর থেকেই পৈশাচিক হত্যালীলা শুরু হয় রাশিয়ার রাজপরিবারে। ক্যাথরিনের কাছ থেকে মুকুট পাওয়ার পাঁচ বছর পরেই ঘুমন্ত অবস্থায় খুন হলেন পিটারের ছেলে রাজা প্রথম পল। রাজা দ্বিতীয় আলেকজাণ্ডারের বোমায় মরার কথা আগেই বলেছি—ইনি ছিলেন পিটারের প্রপৌত্র।
প্রশ্ন : রানীরাও তাহলে গুপ্তহত্যা চালায়?
মা : ইতিহাসে রয়েছে এই ধরনের বিকৃত হত্যালালসার আরও অনেক ঘটনা। যেমন ডোমিটিয়া। এঁর স্বামী ছিলেন রোম-রাজা ডোমিটিয়ান। বিকৃতমস্তিষ্ক অত্যাচারী ছিলেন বলে প্রত্যেকেরই চক্ষুশূল ছিলেন। বর্বর স্বামীকে ভাড়াটে ঘাতক লাগিয়ে শোবার ঘরেই খুঁচিয়ে মারেন রানিসাহেবা। এ ঘটনা ঘটে খ্রিস্টপূর্ব ৯৬-তে। তবে ইতিহাসপ্রসিদ্ধ পারিবারিক গুপ্তহত্যা পরম্পরার শুরু খ্রিস্টপূর্ব ৪১-এ। উন্মাদ রোমসম্রাট ক্যালিগুলা নিহত হওয়ার পর থেকেই। শূন্য রাজসিংহাসনে বসানো হল অনিচ্ছুক তিবেরিয়াস ক্লডিয়াস-কে। পয়লা নম্বর বইয়ের পোকা তিনি। তাই দেশশাসন তুলে দিলেন বউদের হাতে। বিশেষ করে তৃতীয় আর চতুর্থ স্ত্রীর হাতে। এঁদের নাম মেসালিনা আর অ্যাগ্রিপ্পনা। বদ স্বভাবের জন্যে খ্রিস্টপূর্ব ৪৮-এ খুন হলেন মেসালিনা। পথের কাঁটা সরে যাওয়ায় অ্যাগ্রিপ্পিনা ছেলে নিরো-কে দিয়ে ক্ষমতা দখল করবেন ঠিক করলেন। কিন্তু রয়েছে আর এক পথের কাঁটা—তরুণ ব্রিটানিকাস। অ্যাগ্রিপ্পিনা তাঁকে বিষ খাইয়ে শেষ করে দিলেন। সম্রাট বানালেন সতেরো বছরের ছেলে নিরো-কে।
প্রশ্ন : ছেলের জন্যে এত খুন?
মা : সেই ছেলেই মা-কে খুন করিয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৫৯-য়ে। মায়ের কতৃত্ব সইতে না পেরে। নিরোর রক্তেও যে রয়েছে উন্মত্ততা আর নৃশংসতা। ২৯ বছর বয়সে, রোম জ্বালিয়ে দেওয়ার চার বছর পর, গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্যে নিজেই নিজের বুকে ছোরা বিধিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন।
প্রশ্ন : রাজারাজবাড়া বেশির ভাগই মরেছেন আত্মীয়-স্বজনের হাতে?
মা : সবসময়ে নয়। ইংল্যাণ্ডের পঞ্চম এডোয়ার্ডের বয়স যখন মোটে তেরো, তখন তাঁর নিজের কাকা ডিউক অফ গ্লসস্টার বেচারাকে টাওয়ার অফ লণ্ডনে আটকে রাখেন ১৪৮৩-তে—সেখানেই দম আটকে মারা যায় ছেলেটা। রিচার্ড তৃতীয় হয়ে যান খুনে কাকা। তবে বেশির ভাগ নৃপতিদের নৃশংস নিধন ঘটে অজানা অচেনা মাথাপাগল গুপ্তঘাতকের হাতে। যেমন ইটালির রাজা আমবার্তো গুপ্তঘাতকের মরণ-মার এড়িয়ে গিয়ে বলেছিলেন, ‘এ তো আমাদের পেশাগত ঝুঁকি’। ঠিক তারপরেই আততায়ীর গুলিতে মারা গেলেন ১৯০০ সালে। কুইন ভিক্টোরিয়ার ওপর গুপ্তঘাতক চড়াও হয়েছিল ছবার। ১৮৫৮-র জানুয়ারিতে অ্যানার্কিস্ট নিকোলা ওরসিনি-র ছোঁড়া বোমার ধোঁয়ার মধ্যে থেকে অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে এসে তৃতীয় নেপোলিয়ন বলেছিলেন, রাজা লুইস ফিলিপের ওপর যদি দশটা হামলা হয়ে থাকে তো এখনও আমার পাওনা আরও ছ’টা—এই নিয়ে তো হল মোটে চারটে! একথা যখন বলছেন, তখন তাঁকে ঘিরে পড়ে রয়েছে ৫৬ জন মারাত্মকভাবে জখম মানুষ—তাদের মধ্যে মারা যায় আটজন। মরতে-মরতে বেঁচে গিয়েও প্যারিস অপেরার দিকে যেতে-যেতে ফ্রান্সের রাজা চতুর্থ হেনরি পাথরের মূর্তির দিকে আঙুল তুলে বলেছিলেন, ‘যে গুপ্তঘাতক খুন করে পালাতে চায় না, তাকেই বেশি ভয়!’ রাজা চতুর্থ হেনরিও প্রাণ দিয়েছিলেন গুপ্তঘাতকের ছোরার মারে। আর এটাও তো ঠিক যে, বেশির ভাগ গুপ্তঘাতক এমনই ‘ফ্যানাটিক’ হয় যে পালাবার কথা মাথায় না রেখেই খুন করার জন্যে ক্ষেপে ওঠে।
প্রশ্ন : খুন করেও পালাতে চায় না, সে কেমন ঘাতক মা?
মা : কারণ তাদের মাথায় মস্ত ক্ষোভের দংশন চলে অবিরাম—তাই তারা নিজেদের চাইতে বেশি করে ভাবে: যার জন্যে এই যন্ত্রণা, আগে তাকে নিকেশ করা যাক। বিকৃত এই ধারণার ফলেই তারা এমন একজনকে টার্গেট হিসেবে বেছে নেয় যে ব্যক্তি এই জীবনের সমস্ত বিতৃষ্ণার মূল—যে এই জীবনের সমস্ত চাওয়ার প্রতিবন্ধক। ক্ষমতা আর সুবিধার প্রতীকী মুকুটমণি তো রাজা অথবা রাষ্ট্রনায়ক—অন্তরের ঘৃণা উপচে পড়ে তার ওপর—মনে করে, একে খতম করলেই পাল্টে দেওয়া যাবে পৃথিবীর চেহারা। ক্রমাগত গুমরে থাকতে-থাকতে, একটার পর একটা ঘটনার চাপান পড়তে পড়তে, বিকৃত বিশ্বাস অন্ধ বিশ্বাস হয়ে গিয়ে তাকে ‘ফ্যানাটিক কিলার’ করে তোলে। জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হচ্ছে কর্নেল এডওয়ার্ড ডেসপার্ড—বৃটেনের তৃতীয় জর্জ-কে নিকেশ করার চক্রান্ত এঁটেছিলেম বৃটিশ সরকারের খোলনলচে পাল্টে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। আধপাগল হয়ে আশার ছলনায় ভুলে গিয়ে গুলিয়ে ফেলেছিলেন সুস্থ বিচারবুদ্ধি। একই বিকৃতিতে আচ্ছন্ন হয়েছিল লিঙ্কনের গুপ্তঘাতক—নইলে গুলি চালিয়েই ১৪ ফুট নিচে লাফিয়ে পড়ে, পা ভেঙে ফেলেও অমন চেঁচায়—প্রতিশোধ নিয়ে গেল দক্ষিণ দেশ! একইরকম প্রতিহিংসা চরিতার্থতা আর অনুশোচনার অভাব দেখা দিয়েছিল ট্রটস্কি-র গুপ্তঘাতকের ক্ষেত্রেও।
প্রশ্ন : নির্বাসিত রাশিয়ান নেতা লিওন ট্রটস্কি?
মা : দু-বার খুনের চেষ্টা হয় তাঁর ওপর। প্রথমবার কয়েকশো মেশিনগান-বুলেট থেকে বেঁচে যান স্বামী-স্ত্রী খাটের আড়ালে বসে পড়ে। দ্বিতীয়বার গুপ্তঘাতকের লেখা পাণ্ডুলিপি খতিয়ে দেখতে মাথা নিচু করতেই কুঠার নেমে আসে তাঁর মাথায়। ঘাতক তাঁর বাড়িতে আসত। সেদিন বর্ষাতির তলায় নিয়ে এসেছিল বন্দুক আর কুঠার। কুঠারের একদিক ছুঁচোলো, আর একদিক হাতুড়ির মত। পেছন থেকে কুঠার তোলার মুহূর্তে ট্রটস্কি একটু ঘাড় ফিরিয়েছিলেন বলে কুঠার খুলি ফুটো করে ঢুকে যায় আড়াই ইঞ্চি—আর সিকি ইঞ্চি বেশি ঢুকলেই তক্ষুনি মারা যেতেন ৬১ বছরের বৃদ্ধ। কিন্তু মর্মান্তিক চেঁচিয়ে উঠতেই ছুটে আসে দুজন বডিগার্ড। ট্রটস্কির ব্রেন কিন্তু মারাত্মক চোট পেয়েছিল। অসাড় হয়ে গেছিল একটা হাত—আর একটা হাত আপনা থেকেই বৃত্ত রচনা করেছিল শূন্যে। অপারেশনের আগে শেষ বক্তব্যে বলেছিলেন, রাজনৈতিক গুপ্তঘাতকের মার খেয়ে মরতে চলেছি আমি।’
প্রশ্ন : সব গুপ্তঘাতকই কি এমনি উম্মাদ?
মা : সব্বাই তো নয়—ভাড়াটে গুপ্তঘাতকরা দিব্বি ঠাণ্ডা মাথায় খুনখারাপি চালিয়ে যায়। ট্রটস্কি-র গুপ্তঘাতককে উন্মাদ প্রমাণ করা যায়নি তারই কথাবার্তা থেকে। আবার জন হিঙ্কলি নামে ২৩ বছরের যে-ছোকরা ১৯৮১-র ৩০ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান-কে গুলি করেছিল—তাকে কিন্তু পাগল বলেই রেখে দেওয়া হয়েছে পাগলা গারদে। ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’ নামে একটা সিনেমায় সে দেখেছিল প্রেসিডেন্ট হতে চলেছেন এমন এক নেতাকে গুপ্তহত্যা করার রোমহর্ষক দৃশ্য। এই সিনেমারই এক কিশোরী অভিনেত্রীকে একটা চিঠি লিখে রেখে সত্যিকারের প্রেসিডেন্টকে খুন করতে বেরিয়েছিল জন হিঙ্কলি। তার বড়লোক বাবা দশ লক্ষ ডলারেরও বেশি খরচ করে ছেলেকে শুধু পাগল প্রমাণ করে প্রাণে বাঁচাতে পেরেছিলেন। আরথ ট্রটস্কি-র গুপ্তঘাতক খোশ মেজাজে জেলে বসে ছবি আঁকত, টিভি আর রেডিও মেরামত করত। গোটা জেলের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা দেখাশুনোর ভার ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল তার ওপর। মুক্তির পর প্রাহাতে শুরু করে নতুন জীবন রেডিও আর টিভি মেক্যানিক হিসেবে।
প্রশ্ন : পাগলরা তাহলে খুন করলেও তাদের মৃত্যুদণ্ড হয় না?
মা : যুক্তরাষ্ট্রে এই আইন নিয়েই তো ঝড় উঠেছিল। ১৮৪৩ সালে ড্যানিয়েল এম. ন্যাটেন নামে এক ব্যক্তি ব্রিটেনের প্রাইম মিনিস্টার মনে করে প্রাইম মিনিস্টারের প্রাইভেট সেক্রেটারিকে গুলি করে মেরে ফেলে—কিন্তু বেকসুর খালাস পেয়ে যায় মাথা খারাপ বলে। ১৮৩৫ সালে রিচার্ড লরেন্স নামে এক রঙমিস্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট অ্যানড্রু জ্যাকসনকে গুলি করেও মারতে পারেনি—নিজেকে সে ইংল্যাণ্ড আর যুক্তরাষ্ট্রের রাজা বলে জাহির করত—তাই তাকে রাখা হয় পাগলা গায়দে।
প্রশ্ন : গুপ্তহত্যার হিড়িক বিদেশেই বেশি?
মা : স্বদেশেও কি কিছু কম? রাজনৈতিক খুনের রেওয়াজ সেকালেও ছিল—একালেও চলেছে। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বর্ণনা আছে ঘাতকদের খপ্পর থেকে নৃপতিদের রক্ষা করার নানা রকম কৌশলের। তার মানে গুপ্তঘাতকরা তখনও ছিল ভারতবর্ষে। নইলে রাজা ভদ্রসেন নিজের ভাই-এর হাতে খুন হলেন কেন রানীর শোবার ঘরেই? ছেলের হাতে নিহত হননি রাজা কারূষ? কৌটিল্য তো ওইজন্যেই নির্দেশ দিয়েছিলেন—রাজা যেন আগেভাগে জানিয়ে না রাখেন কবে কোন্ রানীর শোবার ঘরে জিরোতে যাবেন। অজাতশত্রু না হয় বাবা বিম্বিসারকে স্রেফ না খাইয়ে মেরেছিলেন—আবার পেট ভরে খাইয়েও তো মেরে ফেলার কায়দা জানত এই ভারতের গুপ্তঘাতকরা—খাবারে আর শরবতে মেশানো থাকত বিষ—তাই রাজার জিভে পৌঁছোনোর আগে অন্যের জিভে টেস্ট করা হত খাবারদাবার। কাশ্মীরের ইতিহাস রাজতরঙ্গিনী পড়লেই দেখবি রাজনৈতিক খুন কত রকমের হতে পারে। আলাউদ্দিন খিলজি তো ১২৯৬ খ্রিস্টাব্দে একাধারে কাকা আর শ্বশুরমশাইকে খুন করেই সুলতান হয়েছিলেন। মহম্মদ বিন তুঘলক তোরণ চাপা দিয়ে মেরেছিলেন বাবাকে। পেশোয়া রাজারা জানতেন গুপ্তহত্যার নারকীয় কায়দা-কানুন। কত আর বলব? কিছু গুপ্তঘাতক সত্যিই উন্মাদ, আর কিছু চায় রাতারাতি নামী হয়ে যেতে। ১৮৮১-তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট গারফিল্ডকে গুলি করে চার্লস গিটো চেয়েছিল প্রচারটা যেন ভালভাবে হয়। ১৯০১ সালে প্রেসিডেন্ট ম্যাকিনলে-কে গুলি করে গুপ্তঘাতক লিওন জোলগোজ টেক্কা মারতে চেয়েছিল আগের বছরের আর এক গুপ্তঘাতককে—শেষের এই নরাধমটি ইটালির রাজার ওপর গুলি করে অর্জন করেছিল বিপুল কুখ্যাতি। অস্ট্রিয়ার আর্চডিউকের গুপ্তঘাতক গ্যাভরিনো প্রিন্সিপ ছোকরা কেবল কল্পনা করতে পারেনি দুটো মাত্র বুলেট বোমা-বারুদের প্রলয়ঝড় তুলবে পৃথিবী জুড়ে।
প্রশ্ন : ইদানীং দেখা যাচ্ছে কেন শুধু বোমা আর গুলিই গুপ্তঘাতকদের খুব পছন্দ?
মা : অর্থাৎ গুপ্তহত্যা নয়—বৈজ্ঞানিক প্রকাশ্যহত্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মহাত্মা গান্ধী গুলি খেয়েছেন সবার চোখের সামনে। ইন্দিরা গান্ধীর অতি বিশ্বস্ত দেহরক্ষী দুজন বুলেট বর্ষণ করেছিল খোলাখুলি। রাজীব গান্ধীর মৃত্যু হল জীবন্ত বোমা (!) বিস্ফোরণে বিপুল জনতার সামনেই। ১৯৮০ থেকেই জাতীয় নেতাদের ওপর গুপ্তঘাতকদের হামলা চলছে কড়া সিকিউরিটি সত্ত্বেও—বদ্ধ উন্মাদ অথবা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বদ্ধবিশ্বাসীকে আটকে রাখা যাচ্ছে না কোনোভাবেই। এ যেন লোহার ঘরে সাপের প্রবেশ! মিশরের প্রেসিডেন্ট সাদাত ১৯৮১-র ৬ অক্টোবর মিলিটারি প্যারেড দেখতে দেখতে ঝাঁঝরা হয়ে গেলেন নিজের সৈন্যদের গুলিতেই—উড়ন্ত বিমানগুলোয় কেউ টেরও পেল না—প্রেসিডেন্ট আর নেই। লেবাননে ১৯৮২’র ইলেকশনে প্রেসিডেন্ট বশির সাহেব ভোটে জিতেও প্রাণে বাঁচলেন না—প্রায় ৬০০ পাউণ্ড বিস্ফোরণ ঠাসা বোমায় উড়ে গেল তিনতলা বাড়ি—মাত্র ৩৪ বছরেই শেষ হয়ে গেলেন ভাবী প্রেসিডেন্ট—লেবাননের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন এমনই ঘোঁট পাকানো যে বোঝা গেল না বোমা রেখেছে কোন্ কাপুরুষ! ফিলিপাইনের জনপ্রিয় নেতা বেনিগনো অ্যাকুইনো তিন বছর নিবাসনে থেকে দেশে ফেরবার আগেই টেলিফোনে স্ত্রী-কে বলেছিলেন—ম্যানিলা এয়ারপোর্টে নামলেই গুলি করা হবে আমাকে—তার পরেই গুপ্তঘাতক গুলি করবে নিজেকে। হলও তাই।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন