ইন্দ্রাণী তুলি
অনেকদিন পরে আস্থার সঙ্গে বেরিয়েছে উর্মিল। অনেক চেষ্টা করেও তাকে উর্মিল জানাতে পারেনি, তার বর্তমান অবস্থার কথা।
“চা খাবি, ভাঁড়ের চা… পুরো দিল্লিতে শুধু এই টাপরিটাতেই পাওয়া যায়।”
―তুই যেন পুরো দিল্লির অলিগলি চিনিস! হাসলো উর্মিল।
দু'ভাঁড় চা নিয়ে, পেতে রাখা বেঞ্চ-এ গিয়ে বসলো দুই সখী।
―ওরে বাপরে… খড়ি চম্মচ শক্কর ডালি হ্যায় রে।
দূর করে চায়ের ভাঁড়টা ছুঁড়ে দিলো উর্মিল লিটার বিন-এর দিকে।
―এই খোড়ি শক্কর’টা কী? ভুরু কোঁচকালো আস্থা।
―খোড়ি নহী রে বাঙ্গালি… খড়ি। হা হা করে হেসে উঠলো উর্মিল।
―যতটা শক্কর দিলে চম্মচ খড়ি থাকে… বুঝলি বুদ্ধুরাম!
নির্মল হাসিতে যোগ দিয়ে হেসে উঠললো আস্থাও।
―আজ আমরা সারাদিন ধরে ঘুরবো, রাস্তার খাবার খাবো… সব।
―পেট নাকি রাবণের চুলহা? আচ্ছা চল দেখি কত খেতে পারিস! আজকে হোক স্ট্রীট ফুড অ্যাডভেঞ্চার। হাসলো উর্মিল।
চাটের দোনাটা হাতে ধরে, কাঠের চামচ দিয়ে পাপড়ি চাটের খানিকটা ধীরে ধীরে মুখে তুলে দিতেই, অনাবিল আনন্দে মুখ ভরে উঠলো দুই বন্ধুর। ঝালে চোখে জল এলো উর্মিলের… ওর ঝাল খাওয়ার অভ্যেস নেই।
রোল, দোসা, মসালা কোলা… “বাস বাস আর খেতে পারবো না রে।” পেট চেপে ধরে কাতর স্বরে বললো আস্থা।
―আচ্ছা… তুই নাকি দিল্লির রাস্তার সব… সব খাবার খাবি?
আস্থার পিঠে দুম করে একটা কিল মেরে বললো উর্মিল।
“... কিন্তু দিল্লি দরবারের মাটন রোগান জোশ আর তন্দুরি রুটি না খেয়ে তো বাড়ি ফিরবোই না।
আমি কিন্তু পাক্কা বাঙালি রে, উর্মিল। খাওয়া আর বেড়ানো ছাড়া কিছু ভালো লাগে না আমার।”
রাত এগারোটার সময়েও দিল্লি দরবার লোকে ঠাসা। বাইরে অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে কতজন।
―অ্যাই… খাওয়ার জন্যে এই লাইন দেওয়া পোষাবে না আমার… অন্য রাস্তা দেখ।
বিরক্ত উর্মিল বললো।
অনাথাশ্রমে মানুষ হয়েছে, মোটা খাবারে পেট ভরলেই খুশি সে। খাবারের বিলাসিতা তার নেই… তবে বন্ধুর ইচ্ছের দামও তো দিতে হয়!
―আচ্ছা, চল তবে অন্য কিছু খাই… বিশেষ খিদেও নেই যদিও।
―আমারও একই অবস্থা… কিছু প্যাক করে নিবি? আজ থাকবি আমার সঙ্গে?
―তুই কিন্তু বিল্লিকে মাছ খাবার আমন্ত্রণ জানাচ্ছিস… চোখ ঘুরিয়ে বললো আস্থা।
খাউ গলির স্টল থেকে চিকেন রেশমি কবাব আর তাওয়া রোটির অর্ডার দিয়ে অপেক্ষায় রইলো দুই বন্ধু।
মাখন, পেঁয়াজ, মশলা মেশা পোড়া মাংসের গন্ধ নাকে ঢুকে হারিয়ে যাওয়া খিদেটাকে চাগিয়ে তুললো।
উর্মিলের পাশেই আধশোয়া হয়ে রইলো আস্থা।
―আমি আমার হিমাচলে ফিরে যেতে চাই আস্থা, এখানে একদম ভালো লাগছে না।
―কত কাঠখড় পুড়িয়ে এলি এখানে, কত ভালো জব তোর… ছেড়ে দিবি? কী করবি হিমাচলে ফিরে গিয়ে… মাদারদের ঘাড়ে বোঝা হয়ে বসতে তো চাইবি না!
―না না, বোঝা হবো কেন? কিছু না কিছু তো করবোই।
মুখে বললেও সে বুঝলো, এই শহর ছেড়ে যাওয়া তার হবে না, কখনই… একমাত্র মুক্তি মৃত্যুতে। জানে উর্মিল, আর বেশিদিন আয়ু নেই তার।
আস্থার দিকে ফিরে দেখলো, সে উদাস হয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে আছে।
―কী হয়েছে… উদাসী কিঁউ? কী ভাবছিস, তোর সাওনের কথা! দেখা করা একদিন, নাকি ভয় পাস… আমি উড়িয়ে নেবো তোর ফিয়াঁসেকে!
―নাহ কিছু না, চল খেয়ে নিই। এরপরে আর হজম হবে না।
মাইক্রো ওভেন-এ মাংস- রুটি একটু ঘুরিয়ে নিয়ে, দুই বন্ধুতে বসে গেল ডাইনিং টেবল-এ।
রুটিতে জড়িয়ে, সুস্বাদু মাংসের কবাব মুখে তুলে পরিতৃপ্তিতে চোখ বন্ধ করলো আস্থা।
“কী ভালো… খেয়ে দেখ!”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন