ষষ্ঠ অধ্যায়

ইন্দ্রাণী তুলি

বৃষ্টিতে ভিজে, সন্ধের দিকে বেশ জ্বর এসেছে উর্মিলের। বাড়ি ফিরে চেঞ্জ করে উর্মিলের খোঁজ করলো নব্যা… তাকে অসময়ে বিছানাতে শোওয়া দেখে, এসে বসলো উর্মিলের পাশে। কপালে হাত রাখতেই বুঝে গেল উর্মি অসুস্থ... একটা ওষুধ খাইয়ে দিয়ে নিজের কাজে চলে গেল নব্যা।

কল বেল বাজতেই উঠে দরজা খুলে নব্যা দেখল, একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে। সেলস গার্ল ভেবে, মুখের ওপরেই দরজা বন্ধ করে দিতে যাচ্ছিল সে… বুঝতে পেরেই হাত বাড়িয়ে দরজার পাল্লাটা ধরে হাসলো আস্থা। বললো “আমি উর্মিলের বন্ধু আস্থা। ও এখানেই থাকে তো... আপনি নব্যা ম্যাম?”

―ওমা… তাই? আয়াম সো সরি ডিয়ার। তোমার কথা শুনেছি উর্মির কাছে, দেখা হয়নি তো… এসো এসো। উর্মির একটু জ্বর এসেছে, যাও ওর ঘরে। ওর ভালো লাগবে।

অনেকদিন পরে আস্থাকে দেখে খুব খুশি হয়ে, আনন্দের চোটে তাকে জড়িয়ে ধরলো উর্মিল। খুশির বাঁধ ভাঙলো আস্থার মনেও।

উর্মিলের পাশে বসে, তার মাথায় বিলি কেটে আরাম করে দিচ্ছিল আস্থা, মেয়েটা চট করেই ঘুমিয়ে পড়লো।

খুব সহজ-সরল মেয়ে এই উর্মিল… একদিন আস্থাও কি এমনই সিধে সাধা ছিল না?

কালিম্পং ছেড়ে প্রথম যখন এই শহরে পা রেখেছিল সে, তার চোখ ছিল রঙিন স্বপ্নে মাখা।

আস্থা কখনো তার প্রিয় সখি উর্মিলকে বলে উঠতে পারেনি যে সে ভালোবাসার কাঙাল… তবে পুরুষের নয়, নারীর। সে বড়ো সহজ ব্যাপার নয়… বেশিরভাগ মানুষের দৃষ্টিতেই এই ব্যবহার পার্ভার্শন-এর নামান্তর। সেক্সোলজিস্টরা কিন্তু এ'ধরনের মানসিক অবস্থাকে রোগ বলতে নারাজ।

উর্মিল জানে, সাওন ওর বয়ফ্রেন্ড… একদিন বিয়ে করে, সুখে সংসার করবে তারা। কিন্তু সাওন বলে কারো অস্তিত্বই যে নেই, তা কী করে জানবে উর্মিল?

কিশোরীবেলাতেই আস্থা বুঝেছিল, ও আর সবার থেকে আলাদা। যে বয়সে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ জন্মায়, সে বয়সে ছেলেদের দেখলে ওর বন্ধুদের মতো ওর হৃদয়ে দোলা লাগতো না… নিজের সত্তাকে লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করেও কীভাবে যেন সে জড়িয়ে গিয়েছিল মালবী প্রধানের সঙ্গে।

মুহূর্তের মধ্যে খড়ের চালে লাগা আগুনের মতো সারা স্কুলে ছড়িয়ে পড়েছিল খবরটা, মালবীর নুন-লংকা মাখানো পরিবেশনে, পাবলিক খেয়েওছিল তারিয়ে তারিয়ে।

ছোটোবেলাতেই আকাশ দেখতে শিখিয়েছিলেন বাবা। সখ্যতা গড়ে উঠেছিল আকাশের সঙ্গে, বিশেষ করে চাঁদ নিয়ে খুবই আচ্ছন্ন থাকতো সে। একাধিক মানসিক আঘাতের ঘটনা জড়িয়ে আছে ওই রূপোর থালার মতো ঝকঝকে, নিটোল গোল চাঁদের সাথে।

পূর্ণিমার রাতেই হাতের শিরা কেটে, অচৈতন্য অবস্থায় বাথরুম-এ পড়েছিল আস্থা। আর একটু দেরি হলেই বিপদ ঘটে যেতো।

পূর্ণিমার চাঁদের রূপোলী মায়ায় জড়িয়ে গিয়ে, তারই হাতছানিতে গিয়ে পৌঁছেছিল, বাড়ির ছাদের কার্ণিশে।

রাখে কেষ্ট মারে কে?

ভবিতব্য! ফাদার ফাঁলো'র অক্লেশ পরিশ্রমে সুস্থ হয়ে ফিরে আসতে হয়েছিল তাকে। অন্য স্কুলে পাঠিয়ে তার সম্মান বাঁচিয়েছিলেন সহৃদয় ফাদার। তাঁর স্নেহধন্যা ছিল অসহায় মেয়েটা… তিনি আজ অমৃতলোকে। তাঁর উদ্দেশ্যে প্রণাম জানালো আস্থা। সেই সহৃদয় মহামানবের সাহায্যেই আজকের এই চাকরি… নাহলে হয়তো অস্তিত্বই থাকতো না তার।

তার স্বরূপ জানতে পারলে, উর্মিল কি ঘৃণা করবে তার প্রিয় সখিকে? দু’জনেই পিউরিটান ক্যাথলিক আবহাওয়ায় মানুষ হলেও, আধুনিকতার হাওয়ার সঙ্গে নিজেকে বদলে ফেলেছে আস্থা আর সেই গোঁড়া মানসিকতা থেকে এখনো বেরিয়ে আসতে পারেনি উর্মিল।

তাহলে… কেন যে এই মেয়েটার কাছে বারে বারে ছুটে আসে আস্থা, কী পাওয়ার আশায়?

ঘুমন্ত উর্মিলের কপালে স্নেহ চুম্বন এঁকে দিল আস্থা। মনে মনে বললো

… আছে আছে, এখনো ভালোবাসা- সরলতা- স্বার্থহীনতা আছে এই পৃথিবীতে।

ভোরের নরম আলো চোখে পড়তে ঘুম ভেঙে উঠে বসলো উর্মিল। সারা গায়ে ব্যথা, শরীর এখনো তাপ জড়ানো।

ঘুম ঘুম-স্বপ্ন মাখা চোখে নিজের ঘরটাকেই নতুন লাগলো উর্মিলের। রাতে আস্থা ছিল কি তার সঙ্গে… চলে গেল?

ধীরে ধীরে উঠে খাট ছেড়ে নামলো সে। হলের ডিভানে আধশোয়া হয়ে টিভি দেখছে আস্থা… হাতে চায়ের কাপ, নিজেই বানিয়ে নিয়েছে মনে হয়। নব্যাকে দেখতে পেল না উর্মিল, ঘুমোচ্ছে বোধহয়।

পেছন থেকে আস্থার চোখ চেপে ধরতেই ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে হাত বাড়িয়ে, উর্মিলের গলাটা জড়িয়ে ধরলো আস্থা।

“আরে, তুই উঠে পড়েছিস? চা খাবি… এখন কেমন লাগছে?”

―আজ তো ছুটি রে… থাকবি আমার কাছে? তুই পাশে থাকলে খুব ভরসা পাই।

―দাঁড়া, আগে তোর জন্যে কফি নিয়ে আসি, তুই তো কফি পছন্দ করিস… ভালো লাগবে। কফি-বিস্কিটের সঙ্গে একটা প্যারাসিটামল নিয়ে নে।

রান্নাঘরে ঢুকে চোখ ছাপিয়ে আসা অশ্রুধারা মুছে নিলো আস্থা।

...লোভ দেখাস না উর্মি, কাঙালকে দেখাস না শাকের খেত… আমারও তো তোর কাছে থাকতেই ইচ্ছে করে… নিজেকে কন্ট্রোল করা মুশকিল হয়ে যাবে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%