ইন্দ্রাণী তুলি
নির্মলা নিকেতনের বেসমেন্ট-এ বৈঠক শুরু হয়েছে সঞ্জয় আর রামপেয়ারীর মধ্যে। দু’জনেই খুব খুশি আজ… স্কচ-এর বোতল খুলে আনন্দ উদযাপনে ব্যস্ত তারা।
নব্যা খবর পেয়েছিল, তুতুলকে ফিরিয়ে এনে ঘরে বন্ধ করে রেখেছে রামপেয়ারী। নিবেদিতার খোঁজ না পাওয়ায় সে জানতে পারেনি যে, দেশান্তরি হয়েছে তুতুল।
কোন ঘরে বন্ধ আছে সে, খোঁজ করতে করতে বেসমেন্ট-এর জানালার বাইরে এসে দাঁড়ালো নব্যা। পরিত্যক্ত বেসমেন্ট-এর জানালা আজ আলোকিত।
তুতুলকে তো অন্ধকারে রাখার কথা। কত না ভয় পাচ্ছে ছোটো মেয়েটা।
এই নির্মলা নিকেতনের চোরা ব্যবসা বন্ধ হওয়া খুব দরকারি। বন্ধ করতে এবারে কোমর বেঁধে লাগবে নব্যা। হারাবার মতো কিছুই নেই তার কাছে… এক জীবনটা ছাড়া, গেলে যাক।
এইসব অমানুষগুলো, যারা মেয়েদের ভোগ্য পণ্য ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারে না… তাদের রাজত্ব চলতেই থাকবে। মেয়েরা আজ অনেক এগিয়ে জীবনের পথে, কিন্তু কিছু নারী পুরুষের চিন্তাধারায় বদল আনতে এখনো সক্ষম হয়নি তারা।
নারী পাচার আর ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ ঘটেই চলেছে।
একটা আধখোলা জানালার কাছাকাছি পৌঁছতেই টুকরো টুকরো শব্দ ভেসে এলো তার কানে। সাবধানে পা ফেলে জানালার নিচে আধবসা হয়ে কান পাতলো নব্যা।
চেনা স্বর হলেও কার আওয়াজ তা ঠিক বুঝতে পারলো না সে। ইংরিজিতে চলছে কথাবার্তা।
“আজ প্রচুর টাকা আসবে…” সঙ্গে চটুল হাসি।
“হ্যাঁ মাল হ্যান্ডওভার হলেই…”
“তা কী কী মাল আসছে আজ, সঞ্জু?”
“ড্রাগ… আর নতুন মেয়েও।”
হাসির শব্দের সঙ্গে ভেসে এলো পুরুষ কণ্ঠ।
আরে, এ তো সঞ্জয়ের আওয়াজ মনে হচ্ছে।
আস্তে করে মাথা তুলে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করে রক্ত জল হয়ে গেল নব্যার।
সঞ্জয় আর রামপেয়ারী বসে আছে মুখোমুখি। রামপেয়ারীর সম্পূর্ণ নতুন অবতার দেখে অবাক হয়ে গেল নব্যা। কোথায় সেই দেহাতী সাজগোজ আর কথাবার্তা! ঝরঝর করে ইংরিজি বলছে সে।
হাতের ফোনটাকে আগেই সাইলেন্ট করে দিয়েছিল নব্যা, এখন তার ভয়েস রেকর্ডারটা অন করে দিলো, যেটুকু ক্যাপচার করা যায়!
“নতুন ড্রাগ ডীলার-এর খোঁজ করতে হবে। কানুবা ধরা পড়ার পরে, কিছুদিন ওদের সঙ্গে কাজকর্ম বন্ধ রাখতে হবে…”
“এবারের টার্গেট হবে স্কুল কলেজের ছেলে-মেয়েগুলো। সমাজের শিরদাঁড়া একেবারে ভেঙে দিতে পারলেই, সাফল্য আসবে… টাকার গদিতে খেলবো আমরা।”
“পুলিশের ব্যাপারটাতে বেশি সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে, পেয়ারী ম্যাম।”
“বেফিক্র হো জাইয়ে, এসিপি বনশালী আমাদের হাতের মুঠোয়… উনিও থাকতে চান আমাদের সঙ্গে, একই ব্যবসাতে…”
কী সাঙ্ঘাতিক মানুষ এরা… ভাবলো নব্যা। মানুষ বলার যোগ্য? মান আর হুঁশ কোনোটারই বালাই নেই। এই ধরনের লোকগুলোর জন্যেই আজকের যুবসমাজ― যারা নাকি দেশের ভবিষ্যৎ, তাদের এই অধঃপতন। যে ডালে বসে আছে, সেই ডাল’ই কাটছে।
পুলিশকেও হাত করেছে, আর নব্যা ভাবছিল, পুলিশের কাছে যাবে। যে সরষে দিয়ে ভূত ছাড়াবে, সেই সরষেতেই ভূত!
“নব্যা ম্যামের খবর কী? কাজকর্ম ঠিকঠাক করছেন?”
নিজের নাম কানে যেতেই চমকে উঠলো নব্যা, আর আধখোলা জানালাটাতে মাথা ঠুকে গেল।
হুড়োহুড়ি করে বেসমেন্ট-এর অন্য পাশে চলে যেতে যেতেই নব্যা শুনলো, রামপেয়ারী বলছে, “অফিসের কাজই করে সে… বাকি ব্যাপারে নাক গলাতে দেওয়া হয় না তাকে।”
আওয়াজ শুনে, চকিত সঞ্জয় এগিয়ে এসে জানালার বাইরে চোখ রাখলো, তারপরে জানালাটা ভালো করে বন্ধ করে দিলো।
কী করা যায় ভাবতে ভাবতে ওপরে, নিজের ক্যাবিন-এ গিয়ে বসলো নব্যা।
ড্রাগ আর নারী পাচারের খবর আছে… কীভাবে রুখবে সে? কোথায় খবর দিতে হবে? কিছুই তো জানা নেই।
লোকাল পুলিশ থানায় না গিয়ে, নব্যা গিয়ে পৌঁছলো একটু দূরের কনট প্লেস-এ।
ডিউটি অফিসার-এর সঙ্গে দেখা করে তাকে অডিও রেকর্ডিং শুনিয়ে, আরো যা যা শুনেছে নিজের কানে, সে ব্যাপারেও অবহিত করলো তাঁকে। এসিপি বনশালী'র সম্বন্ধে যা যা শুনেছে, তাও জানালো।
“আমার এক্তিয়ারের বাইরে এইসব কাজ ম্যাডাম… এসিপি'র বিরুদ্ধে যাওয়ার ক্ষমতা আমার নেই, তবে কমিশনার সাহেবের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে দেখবো…”
রাত হয়েছে, বাড়ি ফিরবে নব্যা। থানার বাইরে পা রাখতেই তার মুখে কাপড় ঠুসে দিয়ে, ক্লোরোফর্ম নাকে চেপে ধরে তাকে অবশ করে দিলো দুটো শক্ত হাতের মালিক।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন