ঊনবিংশ অধ্যায়

ইন্দ্রাণী তুলি

তুতুল আসার পরে পরেই নির্মলা নিকেতনে এসেছিল মণিরা।

সেখানে একসাথে কয়েকদিন কাটিয়ে, বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল মেয়ে দুটোর মধ্যে।

বারকয়েক পালাবার ব্যর্থ চেষ্টা করে ফিরে এসেছিল তারা। বেড়ে গিয়েছিল জুলুমবাজির মাত্রা।

নির্মলা নিকেতন ছেড়ে পালানো সহজ ব্যাপার নয়... ফিরে আসতে হয় প্রায় সবাইকেই। পলায়নপর মেয়েগুলোর ওপরে নেমে আসে অত্যাচারের খড়গ।

গরম লোহার শিক দিয়ে সারা শরীর দেগে দেওয়া হয় বড়োদের।

আলো-বাতাসহীন, গুমোট-ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরে ইঁদুর-আরশোলা-টিকটিকির সঙ্গে আটকে রাখা হয় ছোটো মেয়েদের, খাওয়া-দাওয়া সব বন্ধ করে দিয়ে।

পালাবার কথা চিন্তা করার আগে দু’বার ভাবতো মেয়েরা, আর মুক্তির অভিলাষকে মনের ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে না দিয়ে, নিজেদের সঁপে দিতে বাধ্য হতো সেই পঙ্কিল নর্দমার জগতে।

মণিরার কাস্টমার― সম্ভ্রান্ত এক মহিলা, নিশ্চিন্ত আনন্দ এসে দাঁড়িয়েছিলেন নির্মলা নিকেতনের দরজায়।

বিপুল অর্থের বিনিময়ে কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন তাকে।

কাস্টমার এনেছিল নিবেদিতা, আর তাই রামপেয়ারীর গুড বুক-এ স্থান পেয়েছিল সে।

উৎসাহিত নিবেদিতা এবারে তুতুলকে মুক্তি দেওয়ার খেলায় মেতেছিল।

গভীর রাতে নিকেতনের পেছনের দরজা দিয়ে বার করে দিয়েছিল তুতুলকে। চেনা-জানা ট্যাক্সিওয়ালা চুনীলালের হাতে তাকে তুলে দিয়ে বলেছিল, “যেভাবেই পারিস, এই বাচ্চাটাকে ওর বাবা-মা'র কাছে ফিরিয়ে দিয়ে আয় ভাই। তুই যা চাস, আমার যা সাধ্য আমি দেবো তোকে।”

ড্রাইভার চুনীলালের হাতে সে ধরিয়ে দিয়েছিল তুতুলের বাড়ির ঠিকানা।

তুতুলকে নির্মলা নিকেতনে ফিরিয়ে এনেছিল রামপেয়ারী, ড্রাইভার চুনীলালেরই সাহায্যে।

দশ বছরের তুতুলকে চুনীলালের হাতে তুলে দিয়ে, রামপেয়ারী বলেছিল, “আজকের মতো এই মেয়ে তোমার। তোমার ভালো কাজের ইনাম।”

রাতভর নারকীয় অত্যাচার চালিয়েছিল সে ওই ছোটো মেয়েটার ওপরে। সে নিজেও হয়তো মেয়ের বাবা… তার একবারও মনে পড়েনি।

দিল্লি আগ্রা হাইওয়ের পাশের জঙ্গলে পাওয়া গিয়েছিল গণ-ধর্ষিতা নিবেদিতার ছিন্নভিন্ন লাশ।

ক্ষত-বিক্ষত তুতুলকে তাড়াহুড়ো করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল মুম্বাই।

মণিরাকে নিয়ে নিশ্চিন্ত ম্যাডামের গাড়ি গিয়ে পৌঁছল ওবেরয় শপিং মল-এ।

শপার্স স্টপ-এ ঢুকে মণিরাকে তিনি বললেন, “যাও তোমার ইচ্ছেমতো জামা, জুতো কিনে নাও। আমি এখানে বসছি।”

চোখের পলক পড়ল না মণিরার… এরকম শপিং মল সে শুধু বাইরে থেকেই দেখেছে… কী কিনবে সে, কীইবা জানে!

অসহায় চোখে ম্যামের দিকে তাকিয়ে সে বললো, “আমার কিছু চাই না।”

হেসে উঠে দাঁড়ালেন ম্যাম। মণিরার হাত ধরে ঘুরে ঘুরে নানারকমের জামা, জুতো, বই আর খেলনা কিনে দিলেন তিনি।

মণিরা ভাবে, তার ভাগ্য খুব ভালো, নাহলে কাজের মেয়েকে এত কিছু কিনে দেয় কেউ! তুতুল যদি আসতো তার সঙ্গে, কত ভালো হতো।

ম্যামের মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হলো, ছোটো সে। আচ্ছা, তাহলে এর দেখাশোনা করার জন্যেই হয়তো মণিকে নিয়ে এসেছেন ম্যাম।

“আমাকে কী কী কাজ করতে হবে ম্যাম?” কাস্টমার-এর বিশ্রামকক্ষে গিয়ে, তাঁর পায়ের কাছে দাঁড়ালো মণি।

“মন দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। পড়তে পারো?”

অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে মণি। এ আবার কেমন কাস্টমার!

“আমার মেয়ে পলাশ, আজ থেকে তোমার ছোটো বোন। ওর খেয়াল রাখবে, খেলা করবে ওর সঙ্গে। আমার কাছে আগে পড়াশোনা শিখে, তারপর স্কুল-এ যাওয়া। পলাশের পড়াশোনার দায়িত্ব কিন্তু তোর মণি। পারবি না? তোর নব জন্ম হলো… আমাকে মা বলে ডাকবি… আজ থেকে তোর নাম মণীষা।”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%