ইন্দ্রাণী তুলি
চোখ খুলতেই উঠে বসার চেষ্টা করে বিফল হলো উর্মিল। মাথাটা এখনো ঝিমঝিম করছে। কী হয়েছিল, এখন সে কোথায়… কিচ্ছু বুঝতে পারলো না। ধীরে ধীরে চোখের সামনে থেকে পর্দা সরে যেতেই ভাবনার ভিড় কিলবিল করে উঠলো মাথার মধ্যে।
এরা কি সঞ্জয়ের লোক, নাকি পুলিশের?
বড়ো একটা প্যাকিং বাক্সের ওপরে শুয়ে আছে সে। হাত আর পা বাঁধা রয়েছে বেশ শক্ত করে… নাড়ানোরও ক্ষমতা নেই। দেওয়াল থেকে নেমে এসেছে বরষার ঘন কালো মেঘের মতো ঝুলের ঝালর।
আস্থার কাছে যাচ্ছিল উর্মিল, রামকৃষ্ণ পুরমের পথে।
সঞ্জয়ের নির্দেশে, পতপড়গঞ্জের যাত্রা বাতিল করে উবার ছেড়ে দিয়ে অন্য ক্যাব ধরে, বাড়ি ফিরে এসেছিল উর্মিল। বাড়িতে নিজেকে সুরক্ষিত মনে করেনি সে, মনে এসেছিল আস্থার কথা। ফোনটা তো নেই, নেই পার্সটাও। কালো গাড়ি… ছায়া ছায়া অবয়ব! আর কিছু মনে নেই তার।
টয়লেট-এ যাওয়া দরকার, খিদেও পেয়েছে জোরদার।
খুট-খাট আওয়াজ হতেই, চোখ ঘোরালো উর্মিল। মুখ ঢাকা একটা লোক ঢুকেছে, হাতে একটা থালা।
কাছে এসে দাঁড়াতেই কড়ে আঙুল তুলে দেখালো উর্মিল। হাত আর পায়ের বাঁধন খুলে দিয়েই দূরে সরে গেল মানুষটা। বাঁ-হাত নির্দেশ করলো, একটা দরজার দিকে, তার ডান হাতে ধরা ছোট্ট আগ্নেয়াস্ত্র।
হাত ওপরে তুলে সারেন্ডার করার ভঙ্গিতে বন্ধ দরজার দিকে এগিয়ে গেল উর্মিল।
নোংরা টয়লেট, নোংরা বেসিন… ঘেন্নাতে নাক কুঁচকে উঠলো উর্মিলের। জল নেই কোথাও।
নিঃশব্দে ঘরে ফিরে উর্মিল দেখলো, প্যাকিং বাক্সের ওপরে খাবারের থালা রেখে, আর একটা বাক্স খুলে কী যেন দেখছে সে!
প্যাকিং বাক্সের ওপরে একটা আলগা কাঠের টুকরো পড়ে ছিল। হাতে তুলে নিয়ে সার্ভিস করার দাপটে চালিয়ে দিল, লোকটার মাথা লক্ষ্য করে।
বেশ জোরেই আঘাত করতে সক্ষম হলো উর্মিল, লাগলো লোকটার মাথার পেছনে। দু'হাতে মাথার পেছনটা চেপে ধরে, গুঙিয়ে উঠলো সে। ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করতেই, সপাটে আবার চালালো তার হাতের অস্ত্রটাকে। এবারে লাগলো কানের ওপরে। রক্তের ধার নেমে এলো। জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেল লোকটা।
প্রচণ্ড খিদে অনুভব করলেও খেতে ভয় করলো তার। কে জানে, ওই খাবারে ঘুমের ওষুধ বা মাদক মেলানো আছে কি না! আর সময় নষ্ট না করে বেরোবার রাস্তা খোঁজার জন্যে ব্যস্ত হলো উর্মিল।
সন্তর্পণে এক-দু'পা মেপে মেপে গো-ডাউনের ঘরটা থেকে বেরিয়ে এসে, দরজাটা বন্ধ করে দিল সে। বাইরে বেরোতেই নজর গেল, দু'জন মানুষের ওপরে… গোপন কোনো আলোচনাতে ব্যস্ত তারা, নিশ্চয়ই পাহারায় রয়েছে।
আরো একটা লোককে বেরিয়ে আসতে দেখলো উর্মিল, উল্টো দিকের একটা দরজা দিয়ে। তার হাতে একটা খালি থালা।
তাহলে… আরো কাউকে বন্দি করে রাখা হয়েছে কি এখানে?
থালা হাতে লোকটা সিঁড়ি বেয়ে নেমে যেতেই সাবধান হলো উর্মিল। তার মার্শাল আর্ট ক্লাস-এর ট্রেনিং কাজে লাগাবার সময় এসেছে এবারে। বেড়ালের পায়ে এগিয়ে গিয়ে, একটা লোকের পেছন থেকে, বাঁ'হাতে তার গলাটা চেপে ধরলো উর্মিল। অতর্কিত হামলাতে বিহ্বল হয়ে গেল লোকটা। সামনের লোকটা উর্মিলের কাছাকাছি আসবার চেষ্টা করতেই, তার উদ্দেশ্যে প্রাণপণে চালিয়ে দিলো কাঠের অস্ত্রটা... লাগলো না। হাতের চাপে অন্য লোকটার তখন যাই যাই অবস্থা… তাকে ছেড়ে দিয়ে, দ্বিতীয় লোকটার কুঁচকি লক্ষ্য করে জবরদস্ত লাথি চালাতেই, পড়ে গিয়ে কাতরাতে লাগলো সে।
এদের তো খোলা ছাড়া যাবে না… তার হাতবাঁধা দড়িগুলো সঙ্গেই ছিল। দু'জনের হাত-পা একসঙ্গে বেঁধে, উঠে দাঁড়ালো উর্মিল। খানিক্ষণের জন্যে শান্তি। অন্য ঘরটাতে একবার উঁকি মারতে হবে।
অন্ধকারে চোখ সইয়ে নিতে একটু সময় লাগলো। ধীরে ধীরে ঘরের মধ্যে পা রাখলো উর্মিল। কাঠের একটা সরু চৌকির ওপরে শায়িত একটা শরীর। দরজা খোলার আওয়াজে মাথা ঘোরালো সে। ছায়া ছায়া অন্ধকারে বোঝা গেল না কিছুই।
ভয়ে ভয়ে, উর্মিল কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই, উঠে বসার চেষ্টা করলো সেই অবয়ব। হাত বাঁধা তারও, বিছানার ওপরে একটা থালাতে পড়ে আছে খাবার।
চেহারা স্পষ্ট হলো। নব্যা!
মুখে কাপড় গোঁজা থাকাতে কথা বলতে পারলো না সে… গোঁ গোঁ আওয়াজ বেরোলো।
বাইরের দিকে একবার দেখে নিয়ে হাতের বাঁধন আর মুখের ঠুসি খুলে নিতেই কেঁদে উঠলো নব্যা… দিল্লি শহরে উর্মিলের প্রথম সাহারা দাত্রী।
“তাড়াতাড়ি কর, কাঁদবার সময় নেই।”
ঘর ছেড়ে করিডোর পেরিয়ে, সিঁড়ির দিকে এগোল মেয়ে দুটো।
সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ পেতেই, দেওয়ালের সঙ্গে সেঁটে দাঁড়ালো দু'জনে। খুব বেঁটে, বামন জাতীয় একটা মানুষ ওপরে উঠে আসতেই, নব্যার হাত ধরে, ধীর পায়ে নেমে গেল উর্মিল। এ কি সেই ব্ল্যাক প্যান্থারের বামন মানুষ? কে জানে!
হাত ধরাধরি করে দৌড়ে গেট পর্যন্ত পৌঁছে তারা দেখলো গেটে তালা। গেটে চড়ে অন্য পাশে নামতে নামতেই পায়ের আওয়াজ শোনা গেল... নব্যার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল উর্মিল। দৌড়তে শুরু করলো মেয়ে দুটো।
সঞ্জয়ের আস্তানার ওপরে চোখ ছিল পুলিশ এবং এন সি বি'র। হঠাৎ করে দুটো মেয়েকে ছুটতে দেখে, এগিয়ে এলো সলমানের গাড়ি।
মেঘ না চাইতেই জল! গাড়ি দেখেই রাস্তার ওপরে হাত তুলে দাঁড়িয়ে পড়লো উর্মিল আর নব্যা।
তাদের কাছে কিছুটা শুনেই ওই আস্তানায় হানা দিয়ে প্রচুর প্রমাণ সংগ্রহিত হলো। ধরা পড়লো চার-পাঁচ জন সহকারী… উর্মিলের হাতে তো গোটা তিনেক আগেই আহত হয়েছিল। পুলিশের কাজ সহজ হয়ে গেল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন