ইন্দ্রাণী তুলি
কলিং বেল বাজছিল… সাড়া দিচ্ছিল না কেউ।
চিন্তায় পড়ে গেল আস্থা, কী হলো মেয়েটার… ভালো আছে তো?
জোরে জোরে দরজায় ধাক্কা দিতে শুরু করলো সে। অসুস্থ হয়ে থাকলে উঠে আসবে কীভাবে?
অনেক দূর থেকে যেন আওয়াজ ভেসে আসছিল। সম্বিত ফিরতে উঠে বসতে চেষ্টা করে অসফল হলো উর্মিল। মাথাটা টলছে, কপালের ক্ষত থেকে রক্ত বেরিয়ে শুকিয়ে জমাট বেঁধে গেছে।
চোখ গেল সোফার দিকে, কভারটা পুড়ে কালো হয়ে আছে। কী করে হলো… হে জিসাস, তার হাতের সিগারেটেই পুড়েছে… আরো কত বড়ো অঘটন ঘটতে পারতো!
দরজায় ধাক্কা পড়লো প্রচণ্ড জোরে।
কোনো রকমে নিজেকে টেনে তুলে উঠে দাঁড়ালো উর্মিল।
দরজা খুলে দেখলো আস্থা। হাতে যেন চাঁদ পেলো উর্মিল। আস্থাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলো সে।
উর্মিলকে জাপটে ধরেই ঘরে ঢুকলো আস্থা। একটা সোফার ওপরে উর্মিলকে বসিয়ে, তার পায়ের কাছে বসলো সে। উর্মিলের হাঁটু দুটো জড়িয়ে ধরে, উদ্বেগের চোখে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে আস্থা বুঝবার চেষ্টা করল কী হয়েছে তার।
“তোর শরীর খারাপ… কপালে চোট লাগল কী করে?”
কপালের ক্ষতটাতে হাত বোলাতেই, সামনে এসে দাঁড়ালো সঞ্জয়ের ভয়ঙ্কর চেহারাটা।
চোখের জল মুছে সে বললো, “জানি না রে… মাথাটা ঘুরে গিয়েছিল বোধহয়। পড়ে গিয়ে চোট পেয়েছি। কাণ্ড দেখ না, হাতের সিগারেট-এ সোফার কভারটাও পুড়ে গেছে। ল্যান্ড লেডীকে কী জবাব দেব?”
কভারটা সরিয়ে দেখল আস্থা, সোফাতে দাগ ধরেছে, পোড়েনি। কভারের ওপর দিয়েই ফাঁড়া কেটেছে।
―কভার বদলে দেওয়া যাবে, ভাবিস না… কফি করি, খাবি?
গত রাতে সঞ্জয় চলে যাওয়ার পরে মনে মনে কামনা করেছিল আস্থাকে… টেলিপ্যাথি? আজই আস্থা এসে দাঁড়িয়েছে তার দ্বারে।
―ফোন ধরছিলি না কেন রে?
―কে জানে, কেমন মড়ার মতো ঘুমিয়েছি… ফোন-বেল কিছুরই আওয়াজ শুনতে পাইনি। রাগ করেছিস?
আস্থার গলাটা জড়িয়ে ধরলো উর্মিল।
―ক’টা বাজে রে... দুটো? দিন না রাত! কিছুই খেয়াল নেই আমার।
―রাত দুটো বাজে। চল ঘরে, একটু ঘুমিয়ে নিই আমরা দু'জনেই।
―এই অসময়ে তুই! কী হয়েছে রে আস্থা?
―কিছু না, ঘুম আসছিল না… তোর কথা খুব মনে পড়ছিল, চলে এলাম। তাড়িয়ে দিবি?
আস্থাকে জড়িয়ে ধরে উঠে দাঁড়ালো উর্মিল।
―কী যে বলিস! তুই জানিস না কী ভীষণভাবে তোকে চাইছিল আমার মন। ঈশ্বর প্রেরিত দূত তুই… আমার গার্ডিয়ান এঞ্জেল।
আস্থার গালে চুমু দিলো উর্মিল।
ঘুমিয়ে পড়েছে উর্মিল। কত নিষ্পাপ একটা মুখ। ঘুম নেই আস্থার চোখে, উর্মিলের মাথায়- ঘাড়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে সে। কতদিন যে এরকম শান্তিতে ঘুমোয়নি আস্থা। প্রবল ইচ্ছে জাগলো, উর্মিলের নরম ঠোঁটে একটা চুমু খেতে।
...কে আছে রে তোর জীবনে, কার কথা ভেবে কষ্ট পাস তুই… আমাকে একটু ভালোবাসতিস যদি, আমার জীবন ধন্য হয়ে যেত।
ঘুমের ঘোরে কী যেন বিড়বিড় করছে উর্মিল… কান পাতলো আস্থা।
“... আমাকে ছেড়ে যাস না… আমার খুব বিপদ… কেউ নেই আমার, তুই ছাড়া…”
“কোথায় যাবো রে তোকে ছেড়ে… আমারো যে আর কেউ নেই সোনা!”
বিছানা ছেড়ে উঠলো আস্থা। এক বিছানাতে থাকলে সামলাতে পারবে না সে নিজেকে।
উর্মিলের আদর পেতে, উর্মিলকে আদর করতে ইচ্ছে করবে তার।
কিন্তু উর্মিলের ইচ্ছের দাম দেবে সে, বন্ধু হয়েই থাকবে সারাজীবন।
সোফায় শুয়েই কাটিয়ে দেবে সে, বাকি রাতটুকু।
ভোরের আলো চোখে পড়তেই চোখ খুলে গেল আস্থার, একটু ঘুম এসেছিল। বেডরুমে উঁকি দিয়ে দেখলো, পা’দুটো মুড়ে বুকের কাছে নিয়ে অসাড়ে ঘুমোচ্ছে উর্মিল। আওয়াজ না করে, বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলো আস্থা।
রান্নাঘরের স্ল্যাব-এর ওপরে, উর্মিলের জন্যে একটা নোট ছেড়ে রেখে বেরিয়ে পড়লো সে।
বেশ বেলা করে ঘুম ভাঙলো উর্মিলের।
ঘড়ি দেখে সে ভাবলো, কতদিন পরে এরকম নিশ্চিন্তে ঘুমোলাম আমি… আমার কাছে আস্থা থাকাতে, ভরসা পেলাম? কে জানে!
বিছানা ছেড়ে, বসবার ঘরে এসে দেখলো, আস্থা নেই। কফি চাই… রান্নাঘরে ঢুকতেই নজরে এলো চিট'টা।
“সো জা রাজকুমারী… সো জা। চললাম... অফিস যেতে হবে, জরুরি মীটিং আছে… দেখা হবে। কল করিস।”
ফোনে মেসেজ আসার শব্দে বাইরে এলো উর্মিল, সেন্টার টেবিলের ওপরে রাখা ফোনটা তুলে দেখলো, সঞ্জয়।
“কালকের কাজটা যেন ঠিক মতো হয়!”
বার্তায় নিহিত হুমকিটা কানে বাজলো উর্মিলের।
রিপ্লাই করে দিলো "হয়ে যাবে।"
কফি বানিয়ে সোফা'র ওপরেই আধশোয়া হয়ে রইলো সে। মনে চিন্তারা ঘুরপাক খাচ্ছে, কী তার ভবিষ্যৎ!
বার বারই মনে আসে, এই জীবন রাখার থেকে তো শেষ করে দেওয়াই ভালো। সাহস হয় না… মনে পড়ে যায়, অর্ফ্যানেজ-এর লেটেসিয়ার কথা, কবজির শিরা কেটে মরতে চেয়েছিল। কী হয়েছিল জানে না উর্মিল, তখন সে খুবই ছোটো ছিল।
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ায় ভালো হয়ে ফিরে এসেছিল। নাহ, আধমরা হয়ে বাঁচতে চায় না উর্মিল। শিওর শট পন্থা বলে দেবে কে? মৃত্যুটা শত প্রতিশত গ্যারান্টেড থাকলে তবেই সেদিকে যাবে উর্মিল।
কফি'র কাপে চুমুক দিল… ধ্যাৎ ঠান্ডা হয়ে গেছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন