ইন্দ্রাণী তুলি
মাধ্যমিক পাস করে সঞ্জয় কর্নাল থেকে দিল্লিতে এসেছিল, কলেজে ভর্তি হতে। ছোটোবেলাতেই মা মারা যাওয়ায়, বাবা আবার বিয়ে করেছিলেন নিজের থেকে বয়সে অনেক ছোটো এক মেয়েকে।
সেই নারী তার ব্যর্থতা ঢাকার জন্যে অহেতুক অত্যাচার করতো বালক সঞ্জয়ের ওপরে।
একা থাকতে ভালবাসতো সঞ্জয়, মা মারা যাওয়ার পরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে যেন শামুকের খোলে ঢুকে পড়েছিল সে। বন্ধুদের চোখের সামনে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল সঞ্জয়… সবাইকেই এড়িয়ে চলতো।
বাবা কী বুঝেছিলেন, স্কুল ফাইনাল-এর পরে তাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন দিল্লিতে, তার মামা… মা'র এক তুতো- ভাইয়ের বাড়িতে।
সঞ্জয় দিল্লি যাওয়ার পরে পরেই বাবার মৃত্যু সংবাদ এসেছিল… নতুন মাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সঞ্জয়ের নামে প্রচুর সম্পত্তি রেখে গেছিলেন তার বাবা যা অনেকেরই লোভের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
দিল্লিতে আসার কিছুদিনের মধ্যেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলাতে, তাকে ভর্তি করতে হয়েছিল ডাক্তার ত্রিবেদীর 'সুকুন' আশ্রমে।
ছোটো ছেলেটা তার মাকে হারাবার পর থেকেই বদলে যাচ্ছিল দিনে দিনে… তার বাবা ভেবেছিলেন, স্থান বদল করলে হয়তো সে আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠবে স্নেহময়ী মামির মধ্যে তার মাকে খুঁজে পেয়ে।
সঞ্জয়ের বাবার ছোটোবেলার বন্ধু মণীশ মহাতকর চাচা তার বন্ধুপুত্রের এই বদলে যাওয়া চরিত্রে মর্মাহত হয়েছিলেন, নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন 'সুকুন' এ… তাঁর বন্ধু ডাক্তার ত্রিবেদীর পরামর্শ অনুযায়ী।
সঞ্জয়ের মামা-মামির অনেক বাধা-প্রতিবাদের পরেও তাকে নিয়ে মহাতকর চাচা পৌঁছেছিলেন 'সুকুন'-এ, সঞ্জয় আশ্রয় পেয়েছিল ডাক্তার ত্রিবেদীর স্নেহ ছায়ায়।
আঙিনায় গাড়ি ঢোকার পরে, তাকে গাড়ি থেকে নামতে অনুরোধ করলেন তার চাচা। সে কিন্তু নিজেকে গুটিয়ে গাড়ির কোণায় নিয়ে বসেছিল। রাজি ছিল না গাড়ির বাইরে পা রাখতে। মহিলা নার্সের আগমনে সেই আগ্রাসন আরো বেড়ে উঠেছিল। চোখের ভাব সম্পূর্ণ ভাবে বদলে গিয়েছিল।
ডাক্তার ত্রিবেদীর সহমর্মিতা আর মেল অ্যাটেন্ড্যান্ট পরমীতের সহায়তায় তাকে ডাক্তারের চেম্বারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল।
কথাবার্তা আর সম্মোহনের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করতে বেশি সময় লাগেনি ডাক্তার ত্রিবেদীর।
মামি এসেছিলেন তাঁর অনুযোগ নিয়ে। ডাক্তারকে জানিয়েছিলেন, “সঞ্জয় একদম সুস্থ আছে ডক্টর, মেন্টাল অ্যাসাইলামে তাকে ধরে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই… তার বাবার সম্পত্তি গ্রাস করতেই এই চাল চেলেছেন মণীশ মহাতকর।”
প্রতিবাদ জানিয়ে ডাক্তার ত্রিবেদী বলেছিলেন “মণীশ আমার ছোটোবেলার বন্ধু… ওকে আমি ভালো করেই চিনি, আর মেন্টাল অ্যাসাইলাম বলবেন না, আমাদের সংস্থা মনের কারবারি… আমরা অসংলগ্ন মানসিক অবস্থার মানুষকে এই কঠিন জগতের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার যোগ্য করে, তার নিজের স্থান তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি মাত্র।”
ডাক্তার ত্রিবেদী তাঁর স্বাভাবিক শীতলতা বজায় রেখে, সঞ্জয়ের মামিকে অপেক্ষা করতে অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
সঞ্জয়কে তার মামির সামনে নিয়ে আসতেই, প্যানিক অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়েছিল সঞ্জয়… বেশ কয়েকদিন একেবারে শান্ত থাকার পরে।
চোখ বন্ধ করে, থর থর করে কাঁপতে শুরু করেছিল সে। ডাক্তার ত্রিবেদীর হাত শক্ত করে ধরে কিছু বলতে চেষ্টা করছিল সে, তার মামির দিকে আঙুল তুলে… তাঁর দিকে না তাকিয়েই।
মামি তার কাছে আসার চেষ্টা করছিলেন, আদরের সম্ভাষণের সঙ্গে।
টেবিলের ওপরে রাখা পেপার ওয়েট উঠিয়ে, সঞ্জয় ছুঁড়ে মেরেছিল মামির দিকে।
এরকমই কিছু ঘটবে আঁচ করেই, অভিজ্ঞ পরমীত মহিলাকে আড়াল করে দাঁড়িয়েছিল, নিজেকে সুরক্ষিত রেখেই।
ডাক্তার ত্রিবেদীর চোখের নির্দেশে, তার হিংস্র আচরণের জন্যে সঞ্জয়কে দু’দিক থেকে ধরে, ঘরের বাইরে নিয়ে গিয়েছিল পরমীত আর মুন্না।
সঞ্জয়ের ভীত-সন্ত্রস্ত মামি কণিকাকে একা পেয়ে তার চোখে চোখ রাখলেন ডাক্তার।
―কি মনে হলো, একদম সুস্থ তো আপনার ভাগ্নে? বাড়ি নিয়ে গিয়ে সামলাতে পারবেন তো?
মুখ নিচু করে দোপাট্টার কোণ নিয়ে আঙুলে জড়াতে থাকেন কণিকা।
―আপনার স্বামী আসেননি কেন? আমার ওঁকেও দরকার, সঞ্জয়ের চিকিৎসার সুবাদে।
ভয়ের ছায়া পড়লো কণিকার চোখে, কিন্তু নিজেকে সুরক্ষিত করতে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলো সে।
―কেন তাকে কী দরকার! তার সময় নেই… আর ওর দেখাশোনা আমিই করতাম।
―নিজের সন্তানের মতো, পবিত্র একটা নাবালক ছেলের সঙ্গে এইধরনের কাজ করতে আপনার বাধলো না? নিজের সন্তান হলে পারতেন! আপনার ছেলের সঙ্গে যদি একই কাজ করে কেউ?
―কী বলতে চান… কী করেছি আমি? নিজের ছেলের মতোই আদর-ভালোবাসা দিয়েছি সঞ্জয়কে…
কথা কেটে ডাক্তার বললেন, আমি সব জানি, দরকার পড়লে প্রমাণ করতেও পারবো।
―আমি পুলিশের কাছে যাবো, অন্যায়ভাবে আমার ভাগ্নেকে এখানে আটকে রাখার অভিযোগ নিয়ে।
―যেতে হবে কেন, এখানেই ডেকে নিচ্ছি পুলিশকে… আপনার অভিযোগ প্রমাণ করবেন।
জোঁকের মুখে নুন পড়তেই গুটিয়ে গেল রক্তচোষা।
―বাড়ি যান, পুলিশের সঙ্গে সেখানেই দেখা হবে। আপনার বিরুদ্ধে এক নাবালকের যৌন শোষণের অভিযোগ দায়ের করা আছে পুলিশের কাছে… আর আপনাকে সমর্থন করার জন্যে, আপনার স্বামীর বিরুদ্ধেও। আপনি আসুন এবারে… অনেক শুভেচ্ছা রইলো।
মেয়েদের সহ্য করতে পারে না তাই সঞ্জয়কে একদম আলাদা করে রাখলেন ডাক্তার ত্রিবেদী… পরমীত আর মুন্নার হেফাজতে।
গানে-গল্পে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে… পৃথিবীর ভালো দিকগুলো ওর সামনে উদ্ঘাটিত করে, ওর হৃত বিশ্বাস ফিরিয়ে নিয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেলেন ডাক্তার।
'ভাই-দুজ'এর উৎসবের মাধ্যমে, ভাই-বোনের সুন্দর সম্পর্ক বোঝাতে, মেয়েদের নিয়ে এসেছিলেন সঞ্জয়ের সামনে।
ধীরে ধীরে সেরে উঠছিল সঞ্জয়… প্রায় বছরখানেক বাদে বেশ সুস্থ সঞ্জয়কে তার বাবার বন্ধু মণীশ মহাতকারের হাতে তুলে দিয়েছিলেন মনস্তাত্ত্বিক ডাক্তার ত্রিবেদী।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন