ইন্দ্রাণী তুলি
সেই দুপুর থেকেই ভীষণভাবে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, আর তার সঙ্গে বইছে হু হু হাওয়া। আকাশের রং পেন্সিলের সীসের মতো কালো। দিন না রাত বোঝা যাচ্ছে না। নব্যার বাড়ির বারান্দায় ঝোলানো দোলনাতে বসে ধীরে ধীরে দুলছিল উর্মিল আর ভাবছিল তার পাহাড়ি জীবনের কথা। সেখানেও থেকে থেকেই বৃষ্টি নামতো… শনশন করে বইতো ঠান্ডা হাওয়া।
নব্যা বাড়িতে নেই, কী যেন একটা কাজে বেরিয়েছে।
বেল বাজার শব্দে হুঁশ ফিরল উর্মিলের। দরজার আই হোল-এ চোখ রেখে সে দেখলো সঞ্জয় দাঁড়িয়ে আছে।
একটু ইতস্তত করে দরজা খুলে, হাসলো উর্মিল। বোকার মতো বললো “নব্যা তো বাড়িতে নেই…” ভুলে গেল যে এই বাড়িটা নব্যারই, তার আত্মীয় আসতেই পারে তার বাড়িতে।
“ভেতরে আসবো?” সঞ্জয়ের কথায় টনক নড়ল উর্মিলের। মনে মনে জিভ কাটলো সে। দরজা থেকে সরে গিয়ে বললো, “আয়াম সো সরি। প্লিজ আসুন।”
উর্মিল দেখলো, সঞ্জয় পুরো ভিজে গেছে। বুঝতে পারলো না, সে কী করবে… চেঞ্জ করতে বলবে কীভাবে?
―আপনি তো ভিজে গেছেন…
একটা টাওয়েল হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো উর্মিল।
গা-মাথা মুছে নব্যার ঘরে ঢুকে, ওর ওয়ার্ডরোব থেকে পায়জামা আর টিশার্ট নিয়ে বাথরুমে গিয়ে ভিজে জামা- কাপড় বদলে এলো সঞ্জয়।
উর্মিল ততক্ষণে রান্নাঘরে ঢুকে চায়ের জল বসিয়ে দিয়েছে।
ট্রে'র ওপরে চায়ের কাপ আর বিস্কিটস নিয়ে ডাইনিং টেবলে রেখে, সঞ্জয়ের দিকে তাকালো উর্মিল।
―তুমি পাহাড়ে বড়ো হয়েছো… কোথায় বাড়ি?
সঞ্জয় হাসলো। ওর হাতে একটা হুইস্কির বোতল।
―এই ওয়েদারে চা কে খাবে?
চোখ ছোটো করলো সঞ্জয়।
―আমাকে একটা গেলাস দাও।
সেন্টার টেবলে গেলাসটা নামিয়ে রেখে উর্মিল বললো, আমি হিমাচলের সোলানে বড়ো হয়েছি… একটা অর্ফ্যানেজ-এ।
চায়ের কাপ তুলে নিয়ে রান্নাঘরে রেখে দিয়ে, সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো উর্মিল।
পাহাড়ের মানুষেরা সমতলের লোকজনকে বিশেষ পছন্দ করে না― মাদার, ফাদার আর সিস্টার্সরা সবসময়ই সাবধান করতেন।
সঞ্জয়ের চোখের দৃষ্টি ভালো লাগে না উর্মিলের। নব্যা যে কখন ফিরবে!
―কোথায় গেলে, উর্মিল কুমারী?
সঞ্জয়ের হাসি মেশানো ডাক ভেসে এলো। এভাবে কতক্ষণ আর আড়ালে থাকা যাবে… সামনে তো যেতেই হবে!
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে, ড্রয়িং রুমে রাখা বেতের চেয়ারে বসল সে। সঞ্জয় আধশোয়া হয়ে আছে, মুখোমুখি রাখা ডিভানে।
―হিমাচলের মানুষেরা তো জড়িবুটিতে বেশ বিশ্বাস রাখে… না?
―গরিব মানুষ তো, কথায় কথায় ডাক্তারের কাছে যেতে পারে না… আর আয়ুর্বেদ শাস্ত্র তো বিজ্ঞান সম্মত!
উর্মিলের বিরক্ত লাগছিল।
―যারে দেখতে নারি, তার চলন বাঁকা।
মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো সঞ্জয়।
―আমিও বিশ্বাস করি। হজরত নিজামুদ্দিনে এক পীরবাবা আছেন, তিনি ওষুধ দিয়ে সবরকম রোগ সারিয়ে দেন।
উৎসুক হয়ে নড়ে চড়ে বসলো উর্মিল।
―নব্যার ঘুম হয় না রাতে, কতবার ওকে বলেছি যেতে, গা'ই করে না। তোমার কোনো অসুবিধে আছে নাকি… যাবে?'
―না, এখনো তো ঠিকই আছি। পাহাড়ের লোকেরা বিশেষ অসুস্থ হয়'ও না… তবে এখন তো আমি আর পাহাড়ে নেই, দরকার হলে বলবো।
কলিং বেল-এর আওয়াজে ধড়ে প্রাণ এলো উর্মিলের। দরজা খুলে, বন্ধুকে ঢুকিয়ে নিয়ে, নিজের রুমে চলে গেল উর্মিল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন