অষ্টাদশ অধ্যায়

ইন্দ্রাণী তুলি

খাঁচায় পোরা বাঘের মতোই, নিজের ঘরে পায়চারি করছিল সঞ্জয়। কানুবা ধরা পড়েছে। ওকে বার করার ব্যবস্থা করা দরকার... ইমিডিয়েটলি।

উর্মিলের পেছনেও হুলিয়া লেগেছিল, এবারে মেয়েটাকে ধরলেই হয়ে গেল।

ওই আস্তানা থেকে ওকে সরানো দরকার। ফোনটা হাতে নিলো সঞ্জয়।

বাড়ি ফিরে স্নানঘরে ঢুকেছিল উর্মিল। আজ খুব গরম ছিল, প্যাচপ্যাচে। ঘাম হয়েছে, স্নান না করলেই নয়। শাওয়ার চালানোর আগেই ফোন বাজার শব্দ কানে এলো। নিশ্চয়ই সঞ্জয়… ওই লোকটা কোনো পেমেন্ট দেয়নি, তাইই কল করছে বোধহয় সঞ্জু। কী হবে এখন? প্রচণ্ড রকমের শাস্তি লেখা আছে তার কপালে।

তাড়াতাড়ি বেরিয়ে হ্যান্ড সেট'টা হাতে নিলো উর্মিল।

অচেনা নম্বর… ট্রু কলার-এ নাম দেখাচ্ছে, আদনান কুরেশি। বাপরে, এ আবার কে... ওই লোকটা নাকি যে এসেছিল তার সঙ্গে দেখা করতে?

না ধরলে আবার বিপত্তি… সঞ্জয় হয়তো কল করছে, অন্য নম্বর থেকে।

শিরদাঁড়া বেয়ে একটা কনকনে ঠান্ডা স্রোতের ধারা নেমে গেল, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। ওহ জিসাস! প্লিজ সেভ মি। কেন এই চঙ্গুলে ফাঁসতে দিলে আমাকে… বাঁচাতে পারতে তো!

আজকের প্যাকেট'টাতে ড্রাগ ছিল মনে হয়। নিজেকে খুব বড়ো এক অপরাধী মনে হলো উর্মিলের। মাদার প্যাট্রিসিয়াকে মনে পড়লো… কত আশা কত ভরসা ছিল ওঁর, উর্মিলের ওপরে। বলেছিলেন “ভালো কাজের সঙ্গেই নিজেকে জুড়ে রাখবে সবসময়ে…” কী সাঙ্ঘাতিক ভালো কাজে যে মেতে রয়েছে সে…

এই রে, ফোনটা থেমে গেছে। রিটার্ন কল করলো উর্মিল।

সঞ্জয়ের হিসহিসে গলা ভেসে এলো দূরভাষে।

“কোথায় থাকিস, কোথায়? আজ বিরাট লফড়া করেছিস… এক্ষুনি চলে আয়। আমি মেসেজ করছি অ্যাড্রেস, অন্য ফোনটায়। এই ফোন নিয়ে বেরোবি না…”

চান-টান মাথায় উঠলো। শাড়ি ছেড়ে তাড়াতাড়ি একটা জীনস আর টপ গলিয়ে নিয়ে ফ্ল্যাট-এ তালা দিয়ে বেরিয়ে পড়লো উর্মিল।

উবার-কার এসে গেছে। কোড দিয়ে উঠে বসলো সে। পতপড়গঞ্জের ঠিকানা… কে জানে সে কোথায়? বহুদূর যেতে হবে… ভয়ে সিঁটিয়ে রইলো উর্মিল।

চোখ বন্ধ করতেই সঞ্জয়ের কীর্তিকলাপের কথা মনে ভীড় করে এলো। কানাঘুষায় কানে এসেছে, কোন জঙ্গী গ্রুপকে অস্ত্র-শস্ত্র আর টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করতে নেমেছে সে। সঞ্জয়ও আসল অপরাধী নয়, চুনোপুঁটি’ই… ওর পেছনে কে আছে, কে জানে!

সমান অপরাধে অপরাধী তো উর্মিল নিজেও। যখন জানতে পেরেছিল, এই অন্ধগলিতে ঢুকে পড়েছে সে… তক্ষুনি সাহস করে নিজেকে শেষ করে দিতে পারলেই ঠিক হতো… আগে ধারণা ছিল না, সে এতটাই ভীতু। সঞ্জয়ের হাতের পুতুল হয়ে গেছে উর্মিল, যেমন নাচাচ্ছে, তেমনই নাচছে।

কিলোমিটার খানেক গিয়েছে কি যায়নি, মেসেজ ঢুকলো উর্মিলের ফোন-এ।

“গাড়ি ছেড়ে দাও, অন্য ক্যাব নিয়ে বাড়ি ফিরে যাও… পরে কথা বলছি।”

পার্স থেকে ছোট আয়নাটা বার করে, মুখ না ফিরিয়েও গাড়ির পেছন দিকটা দেখার চেষ্টা করলো উর্মিল। একটা গাড়ি রয়েছে খুব কম ব্যবধানে। তার পিছু নিলো কেউ? খবর পেয়েই তাকে মেসেজ করেছে সঞ্জয়… কিন্তু জানায়নি কিছু।

গাড়ির বিল মিটিয়ে নেমে পড়লো উর্মিল। কোন জায়গা এটা, জানেও না সে। গাড়ি থেকে নামার পরে কিন্তু কোনো গাড়ি আর দেখতে পেল না উর্মিল… গাড়িটা জাস্ট ম্যাজিকের মতো ভ্যানিশ হয়ে গেছে।

সঞ্জয় ঠিক কী করতে চাইছে, বুঝতে পারলো না উর্মিল।

ক্যাব ধরে বাড়ির দিকে চললো সে।

ধরমেশ ধাওয়ানের ফোন পেয়ে রিয়াজ খান নড়েচড়ে বসলেন।

“সলমানের ফোন এসেছিল স্যার। ওই মেয়েটাকে ট্র‍্যাক করতে, ওর বাড়ির কাছেই ছিল ও। উবার ডেকে যাত্রা শুরু করেছিল মেয়েটা। মাঝপথেই গাড়ি ছেড়ে দিয়ে অন্য ক্যাব ধরে ফিরে গেছে। ওরা কি বুঝতে পেরে গেল যে, ওদের ফলো করা হচ্ছে?”

“যেভাবেই হোক, এদের গিরোহ্ ভেঙে দিতে হবে ধাওয়ান। সব খবরই ওরা আমাদের আগেই পেয়ে যাচ্ছে কী করে? কী সাঙ্ঘাতিক নেটওয়ার্ক দেখেছো! সলমান কি ভেরোনিকার দিকে নজর রাখছে… ওর থেকেই খবর পাওয়া যাবে।”

“অবশ্যই স্যার… আমি যোগাযোগ রাখছি সলমানের সঙ্গে। খবর পেলেই জানাবো আপনাকে। ডোন্ট ওয়রি স্যার, আমরা সফল হবোই…”

লালবাহাদুর শাস্ত্রী কম্পলেক্স-এ উর্মিলের ফ্ল্যাট। তার পাশেই সেলেব্রিটিদের জিম 'হেলথ স্পট', সেখানে বেশ কিছুটা সময় কাটাচ্ছে অফিসার সলমান। নজর রাখা যাচ্ছে, ওই হাউজিং সোসাইটি থেকে কে বেরোচ্ছে আর সেখানে ঢুকছেই বা কে!

এক্সারসাইজের ঢোঙ রচিয়ে, ইন্সট্রাক্টর-এর সঙ্গে ভাবসাব জমিয়ে ফেললো সলমান জাভেদ।

পার্সোনাল ট্রেনার বিনোদের চোখে প্রশংসা ঝলকে উঠলো, মুখ ফুটে বলেই ফেললো, “দুর্দান্ত ফিজিক স্যার আপনার। রেগুলার প্র‍্যাকটিস আপনাকে শেপ-এ রাখবে।

আমি জেনারালী সেলেব্রিটি ট্রেনিং করাই… খুব টাফ। আপনি যেরকম চাইবেন করবেন… জোরাজোরি নেই।”

এক্সারসাইজ ফ্রীক সলমান ভুলেই গেলেন, তিনি কী করতে এসেছিলেন এই জিম-এ।

রাত একটা নাগাদ স্কার্ফটাতে মুখ ঢেকে চুপি চুপি কম্পলেক্স-এর পেছনে ছোটো গেট-এর দিকে এগোল উর্মিল। ওই গেটেও রাতে তালা দেওয়াই থাকে, নজর এড়িয়ে টপকানো যায় যদিও। গেট-এর কাছে পৌঁছে নিজেকে একটা বড়ো গাছের পেছনে লুকিয়ে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করলো উর্মিল। ওয়াচম্যান একটু নজরের বাইরে যেতেই, সুযোগ নিলো সে। আরে! লতা-গুল্মে ঘেরা পাঁচিলের খানিকটা অংশ ভাঙা… সারানো হয়নি? ঈশ্বর সদয় মনে হচ্ছে।

বুকে ক্রস এঁকে ঝোপ-ঝাড় সরিয়ে ফাঁক গলে, বাইরে বেরোলো উর্মিল। জামার হাতাটা ছিঁড়ে গেল ফ্যাঁশ করে। জ্বলুনিতে বুঝলো, হাতেও আঁচড় লেগেছে।

পাগলের মতো দৌড়ে অনেক দূরে, লোকালয়ের বাইরে চলে যেতে চাইলো উর্মিল... যত দূরে যাওয়া যায়। খাওয়া হয়নি সারাদিন। কাজে বেরোবার আগে খেতে পারেনি, প্রবল উত্তেজনাতে… আর তারপরে তো একের পর এক ঘটনার ঘনঘটা। পা দুটো কাঁপছে, কিন্তু থামার উপায় নেই। টেনিস খেলার প্রশিক্ষণ কাজে এলো… দৌড়তে থাকলো সে।

একটা ক্রস রোড-এ পৌঁছে শ্বাস নিতে দাঁড়িয়ে পড়লো উর্মিল।

কতগুলো কুকুর… সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে উর্মিলের দিকে। পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো উর্মিল, পারলে শ্বাসও বন্ধ করে রাখতো।

কাছে এসে কুকুরগুলো তাকে একটু শুঁকে, দূরে চলে গিয়ে নিজেদের মধ্যে প্রচণ্ড তর্কাতর্কি শুরু করে দিলো।

একটা চলতি ট্যাক্সিকে হাত দেখাতেই থামলো সে… মুখ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, “কাঁহা…?”

আস্থার কাছে বহুবার শোনা নামটাই মুখে এসে গেল, “রামকৃষ্ণ পুরম…”

“বহুত দূর হ্যায় ম্যাডাম… মীটরকে উপর দোসো জ্যাদা দে দেনা।”

সীটের ওপরে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করলো উর্মিল।

ফোনটা বেজে বেজে বন্ধ হয়ে গেল।

রি-ডায়াল করতেই রেকর্ডেড ভয়েস বলে উঠলো, ‘এই নম্বর এখন পরিষেবার বাইরে।’

আস্থা কল নিচ্ছে না কেন? এরকম তো আগে কখনো হয়নি। মাঝরাতেও কল করেছে উর্মিল, সাড়া দিয়েছে আস্থা… দরকারে বন্ধুর দরজায়ও এসে দাঁড়িয়েছে সে।

ওর ঠিকানাটাও তো জানে না উর্মিল, কীভাবে পৌঁছবে ওর বাড়ি?

ওরই মতো কোনো বিপদে জড়িয়ে পড়েনি তো আস্থা? হতেই পারে, তার বিপদের কথাও তো জানে না আস্থা… তার জীবন অবশ্য উর্মিলের মতো না… তার বাবা-মা আছে, আছে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

জোরদার ব্রেক দিয়ে গাড়িটা থেমে গেল। সামনের সীট-এ উর্মিলের মাথাটা ঠুকে যেতে ব্যথা পেল সে। রাস্তার টিমটিমে আলো এসে পড়েছে, সামনে আড়াআড়িভাবে দাঁড়ানো একটা কালো গাড়ির ওপরে।

দুটো ছায়া শরীর এগিয়ে এলো উর্মিলের ক্যাব-এর দিকে। চোখের পলক পড়ার আগেই দরজা খুলে দুটো বলিষ্ঠ হাত উর্মিলকে টেনে-হিঁচড়ে বার করে নিলো গাড়ি থেকে। ক্যাব-এর ড্রাইভারকে দেখতে পেল না উর্মিল। ঝাঁঝালো গন্ধযুক্ত একটা রুমাল তার নাকে চেপে ধরতেই কয়েক সেকেন্ড ছটফট করেই এলিয়ে পড়লো সে।

কালো গাড়ির পেছনের সীট-এ তার শরীরটা ডাম্প করে, দ্রুতগতিতে বেরিয়ে গেল গাড়িটা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%