ইন্দ্রাণী তুলি
নব্যার বাড়ি ছেড়ে এক কামরার একটা ফ্ল্যাটে উঠে গিয়েছিল উর্মিল, সঞ্জয়ের নির্দেশে।
'ব্ল্যাক প্যান্থার' প্রজেক্ট শেষ করে, ফ্ল্যাটে ফিরেছিল উর্মিল। ক্লান্তি কেমন যেন পাকে-পাকে জড়িয়ে ধরেছিল তাকে। জামাকাপড় বদলে, ঠান্ডা জলে ভালো করে চান করলো সে। খুব খিদে পেলেও কিছুই খেতে ইচ্ছে করলো না তার।
একটা ড্রিংক বানিয়ে নিয়ে ভাবনার অগাধ জলে ডুবে গেল সে। তাকে এই অবস্থায় দেখলে কী বলতেন মাদার প্যাট্রিসিয়া! মাদার সেবাস্টিয়ানের মৃত্যুর খবর সময় মতোই এসে পৌঁছেছিল। খুব কেঁদেছিল উর্মিল। তিনিই ছিলেন উর্মিলের মা-বাবা-আত্মীয়-পরিজন সব।
যে অন্ধকার পাঁকে ক্রমশ ডুবে চলেছে সে, সেখান থেকে উদ্ধার পাওয়ার তিলমাত্র উপায় নেই… পথ একটাই! আরো আরো গভীরে চলে গিয়ে, নিজেকে শেষ করে দেওয়া।
সোনালী তরল জ্বলতে জ্বলতে নামছে গলা বেয়ে… উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে সারা শরীরে। বন্ধু নেই, আলো নেই… কী অন্ধকার! আস্থার কথা খুব মনে পড়ছে। সেদিন নব্যার বাড়িতে তার হৃদয় খুলে ধরেছিল আস্থা, বলেছিল স্কুল জীবনের ঘটনা থেকে নিয়ে সবকিছু। উর্মিলকে তার জীবনে পেতে চায় আস্থা… পাগলের মতো ভালোবাসে উর্মিলকে।
উর্মিল তো আস্থাকে শুধুই একজন খুব ভালো বন্ধু মনে করে, সেইভাবেই ভালোবাসে… সে প্রেমে তো শারীরিক আকর্ষণের কোনো স্থান নেই।
বুঝতে পেরেছিল উর্মিল, সেদিনের সেই চুমুর উৎস… আস্থার নজর এড়িয়ে তার ঠোঁট মুছে নেওয়াটা দৃষ্টি এড়ায়নি আস্থার, কষ্ট পেয়েছিল সে। না না, বন্ধুকে কখনোই প্রেমিকার পদে বসানো যায় না… বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যায়।
আস্থাকে হারাতে পারবে না উর্মিল… এই কঠিন বাস্তব-মরুতে সে'ই তো নিয়ে আসে গোলাপ-গন্ধী আতর বারি, সিক্ত করে কাছে টেনে নেয়।
গডরেজ লক-এ চাবি ঘোরানোর আওয়াজে চকিত হলো উর্মিল। ঘড়ির দিকে চোখ গেল, রাত বারোটা প্রায়। ডুপ্লিকেট চাবি থাকে সঞ্জয়ের কাছে। তার যখন ইচ্ছে সে আসতে পারে। দরজা খুলতেই সঞ্জয়ের চেহারা স্পষ্ট হলো দরজার ফ্রেমে।
উঠে দাঁড়াতে গিয়ে মাথাটা টলে গেল উর্মিলের। এখনো সে ভালোভাবে অভ্যস্ত হতে পারেনি মদ্যপানে।
সঞ্জয়ের ভারি আওয়াজে চোখ ফেরালো উর্মিল…
“কাজ হয়েছে? মদ খাওয়ার নমুনা দেখে তো মনে হচ্ছে মিশন সাক্সেসফুল!”
কাছে এসে তার হাতদুটো ধরে পেছনের দিকে মুচড়ে দিলো সঞ্জয়। ব্যথায় ককিয়ে উঠলো উর্মিল।
“কাজ ঠিকমতো না হলে কী হবে, তা নিশ্চয়ই জানা আছে তোমার!”
সঞ্জয়ের কথামতো সব কাজই তো ঠিকঠাক করার চেষ্টা করে উর্মিল… নিজের প্রাণ হাতে নিয়েও। এ'রকম ব্যবহার সঞ্জয় কেন করে তার সঙ্গে, বুঝতেই পারে না উর্মিল। এত যন্ত্রণা দিয়ে কী লাভ হয় ওর?
হঠাৎই ফোন বাজার আওয়াজে চমকে উঠলো উর্মিল। ফোন তুলে নিয়ে সঞ্জয় বললো, “আস্থা… ওই লেসবিটার সঙ্গে তোমার এত মাখামাখি কীসের, কী চায় ও? ওটাকেও ঢুকিয়ে নাও আমাদের দলে!”
“না….” একটা আর্ত চিৎকার বেরিয়ে এলো উর্মিলের মুখ থেকে।
তার গাল টিপে ধরলো সঞ্জয়।
“চোপ সালি। আওয়াজ বার করবি না একদম… মাল বার কর।”
“ছাড়ো আমাকে, আনছি।”
চামড়ার ছোটো ব্যাগটা সঞ্জয়ের হাতে তুলে দিলো উর্মিল।
―কাজ হওয়ার পরে ফোন করার কথা ছিল না?
ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো সঞ্জয়।
―আমি তো ট্রাই করেছিলাম… বার বারই বিজি আসছিল। ভাবলাম, তুমি তো আসবেই বা কল করবে…
ঠাস করে এক চড় এসে পড়লো উর্মিলের গালে। ছিটকে গিয়ে পড়লো সে দেওয়ালের ওপরে। মাথাটা ঠুকে গিয়ে রক্তের ধার নেমে এলো।
―এত ভাবনা তুই তোর প্রেমিকার জন্যেই তুলে রাখ… বুঝলি?
ব্যাগ খুলে দেখে সন্তুষ্ট হলো সঞ্জয়। একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট উড়ে এসে পড়লো উর্মিলের পায়ের কাছে।
―আমার কিচ্ছু চাই না সঞ্জু ভাইয়া, আমাকে ছেড়ে দাও। কাউকে কিছু বলবো না আমি… এই শহরে থাকবোই না। চলে যাবো আমার নিজের জায়গায়… প্লিজ।
হাত জোড় করল সে।
―শনিবারের কাজের জন্যে রেডি হয়ে যাও। নির্দেশ পৌঁছে যাবে সময় মতো।
সঞ্জয় বেরিয়ে গেল, দড়াম করে দরজাটা বন্ধ হলো তার পেছনে।
দম বন্ধ হয়ে আসছে উর্মিলের। পালাবে সে? অক্টোপাসের মতো অগুন্তি শুঁড় আছে সঞ্জয়ের। কোনো না কোনো শুঁড় ঠিক ধরে ফেলবে তাকে।
একটা সিগারেট ধরিয়ে অসাড়ের মতো পড়ে রইল উর্মিল তার ঘরের মেঝেতে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন