ইন্দ্রাণী তুলি
অজানা নম্বর থেকে ফোন এসেছিল… নেওয়াটা বিপজ্জনক, কিন্তু ওইটুকু ঝুঁকি তো এই ব্যবসায় টিকে থাকতে গেলে নিতেই হবে!
খুশি হলো সঞ্জয়। নতুন সাপ্লায়ার… ইউনিক কিছু মাল দেখাতে চায়। ক্যাশ রেডি করতে হবে। জিনিস পছন্দ হলেই হাতে হাতে ডেলিভারি।
দিল্লি-হরিয়ানা সীমান্তে, যমুনার কী যেন চর আছে একটা… গুগল ম্যাপে দেখে নিতে হবে। আজ আর গাড়ি-টাড়ি নিলো না সঞ্জয়, সোজা গিয়ে বসলো সিটি বাস-এ। কেমন থমথমে হয়ে আছে আকাশ, গুমোট গরম। জোরে নামবে মনে হচ্ছে।
জানালার পাশে সীট পেয়ে খুশি হলো সঞ্জয়।
বাস কিছুদূর এগোতে না এগোতেই ধুলোভরা ঝোড়ো হাওয়া ঝাপটা মারলো তার চোখে-মুখে। আঁধি… খুব খানিকটা ধুলো উড়িয়ে চলে যাবে। ততক্ষণে বাসের জানালাগুলো ফটাফট বন্ধ করে ফেলেছে যাত্রীরা।
এই ঝোড়ো হাওয়া একদম সহ্য করতে পারে না সঞ্জয়… প্যানিক অ্যাটাক হয়।
ফেরী করে সঞ্জয় গিয়ে পৌঁছলো ওখলা বার্ড স্যাংকচুয়ারীতে।
কী আশ্চর্য! এখানে তো কখনো আসেনি সে আগে, কিন্তু… কেমন যেন ভীষণ চেনা লাগছে জায়গাটা। প্রকৃতির অকুণ্ঠ দানে ভরে আছে সেই চর-দ্বীপ।
গাছপালার আড়ালে লুকোনো একটা ভিলাতে দেখা করার কথা তাদের।
কম্পাউন্ডের পাঁচিলটা জায়গায় জায়গায় ভাঙা। পাঁচিল, বাড়ির দেওয়াল সবই ঢেকে গেছে বট-পাকুড়-অশ্বত্থ গাছ আর নানাধরণের গুল্মে। পোড়োবাড়ি নাকি? কাউকে তো দেখাও যাচ্ছে না। অনেক সুরক্ষা নিয়েই এরকম স্থানে দেখা করার কথা বলেছে সেই সাপ্লায়ার। রাতে দেখা করার কথা, এতদূর রাস্তা তাই তাড়াতাড়িই চলে এসেছে সঞ্জয়, কেউ দেখে না ফেলে… ভেতরে গিয়ে অপেক্ষা করাই ভালো।
ঢোকার কী বন্দোবস্ত? নড়বড়ে কাঠের গেটটাতে হাত দিতেই অদ্ভুত একটা গা ছমছমে আওয়াজ করে খুলে গেল সেটা।
বড়ো বড়ো ঘাসে ঢাকা, নুড়ি পাথরের পথ ধরে বাড়ির দরজায় গিয়ে দাঁড়ালো সঞ্জয়।
কী আশ্চর্য রকমের চেনা লাগছে বাড়িটা… আর তার পারিপার্শ্বিক।
সঞ্জয়ের মনের আয়নাতে ভেসে উঠলো সব… চলচিত্রের ছবির মতো। দরজা খুলে ঢুকলেই টানা দালান, দু'ধাপ নামলেই প্রশস্ত উঠোন। সামনে দুটো ঘর। ডানহাতে সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়।
কলিং বেল খুঁজলো সঞ্জয়, দেখতে পেলো না… আর দরজা খুলে দিতে কেইবা বসে আছে অপেক্ষায়?
দরজার গায়ে হাত দিয়ে আলগা করে ঠেলে দেখতে গেল… খুলে গেল দরজাটা। যেমন ছবি আঁকা ছিল তার কল্পনার জগতে, ঠিক তেমনই। গায়ে কাঁটা দিলো সঞ্জয়ের।
সন্তর্পণে ভেতরে ঢুকে ধুলোমাখা সিঁড়ির ওপরে বসে পড়লো সে। লোকজন না থাকলেও ছোটো-খাটো জংলী পশু… সাপখোপ তো থাকতেই পারে।
বাড়ির ভেতরটা অবিশ্বাস্য রকমের পরিষ্কার… লোকজনের আসা-যাওয়া আছে বলেই মনে হয়।
প্রচণ্ড জোরে মেঘ গর্জন শোনা যেতে চমকে উঠে প্রায় পড়েই যাচ্ছিল সঞ্জয়। উঠোনে নেমে গিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলো, ঘন-কালো মেঘে ঢেকে গেছে তার মুখ… বিদ্যুতের ঝলকানি থেকে থেকে চিরে দিচ্ছে আকাশের বুক।
কীভাবে ফিরবে সে? রাত্তিরে নিশ্চয়ই ফেরী পাওয়া যাবে না… কাউকে জিজ্ঞেসও করা হয়নি।
রাত নেমে আসায় অস্থির হয়ে পড়লো সঞ্জয়। কখন আসবে সেই মানুষ? ফোন নম্বরটাতে কল করার চেষ্টা করে যাচ্ছে সে ক্রমান্বয়ে... সুইচড অফ।
এই বাড়িতেই থাকতে হবে। রাতটা কোনোরকমে কাটিয়ে দিতে পারলেই সকালের ফেরী ধরে বাড়ি ফিরে যাবে সে। আহাম্মকী হয়ে গেছে… আগে-পিছে চিন্তা না করেই, ঝাঁপিয়ে পড়েছে… নাহ, এবারে একটু সমঝে বুঝে চলার সময় এসেছে, ছোটো খোকাটি আর নেই সে।
লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু… মা বলতেন।
ছোটোবেলাটা সামনে এসে দাঁড়ালো। তুমি কেন চলে গেলে মা, আমাকে ছেড়ে? তুমি যাওয়ার পরেই আমার জীবনে অন্ধকার নেমে এলো। চোখ ভিজে উঠলো পাথর হৃদয় সঞ্জয়ের।
ধীরে ধীরে সিঁড়ি চড়ে দোতলায় পৌঁছলো সঞ্জয়। সারে সারে ঘর, কোথাও তালা নেই।
হাত দিয়ে হাল্কা করে ঠেলতেই হাট করে খুলে গেল দরজা। সুন্দর-সাজানো ঘর। বিছানায় পরিষ্কার চাদর পাতা। স্টাডি টেবল-এ রাখা জলের গেলাস। অবাক হলো সঞ্জয়… কেউ যেন জানতো সে আসবে। তারই জন্যে ঘর সাজিয়ে, অপেক্ষায় রয়েছে কেউ।
খিদে খিদে পাচ্ছিল। খাবার এখানে কোথায়? ব্যাকপ্যাক থেকে বিস্কিট-এর প্যাকেট বার করে খেয়ে, জল খেয়ে নিলো সে।
আজ আর কেউ আসবে বলে মনে হচ্ছে না। আজকের রাতটা যাক… কাল দেখা যাবে।
শুয়ে পড়লো সঞ্জয়।
...কুচকুচে কালো এক ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে, মরুভূমি পার হয়ে যাচ্ছে সঞ্জয়। চারিদিকে ছোটো-ছোটো বালুর ঢিপিতে ভরা জায়গাটার যেদিকেই তাকাও, একই রকম লাগে। ছোটোবেলায়, গল্প-কাহিনীতে পড়েছে সে, কত মানুষের মৃত্যু হয়েছে এই মরু প্রান্তরে, পথ হারিয়ে। পথ হারিয়ে ফেলবে না তো তার ঘোড়া?
সুন্দর করে সাজানো একটা তোরণদ্বার পার করে একটা সুপ্রাচীন মন্দিরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো সেই অশ্ব। পাশেই এক বিরাট জলাশয়, কিন্তু জল অনেক নিচে। অনেক সিঁড়ি পেরিয়ে তবেই জলের কাছে পৌঁছনো যাবে… এই কি তবে সেই বিখ্যাত ধাপ-কুঁয়া… সঞ্জয় কি তবে রাজস্থানে পৌঁছে গেছে?
হাত ধরে ঘোড়া থেকে নামিয়ে নিলেন ঘোমটায় মুখ ঢাকা এক রমণী। তাঁর মুখ দেখার চেষ্টা করেও দেখতে পেলো না সঞ্জয়।
চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে পথ-ঘাট… মরুস্থল।
মিহি আওয়াজে মহিলা বললেন, “এ হলো আমাদের সবথেকে পুরোনো মন্দির।”
আধো অন্ধকারে ছায়া ছায়া মূর্তি দেখা গেল… মনে হলো যেন ত্রিশূল হাতে মহিষাসুরমর্দিনী।
মহিলাটি প্রদীপ হাতে নিতেই দেবী দুর্গার চোখদুটি জ্বলে উঠলো… ভীষণ চেনা সেই চোখের চাউনি। কিছুতেই মনে করতে পারলো না সঞ্জয়।
মন্দির থেকে বেরোতেই তার চোখ গেল সিঁদুর মাখা হাড়িকাঠের দিকে।
পেছন থেকে ধাক্কা মেরে কে যেন তাকে ফেলে দিলো, আর তারপরেই হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে তার মুণ্ডুটা আটকে দিলো হাড়িকাঠের মধ্যে...
ভ্যাপসা-গুমোট গরমের অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে গেল সঞ্জয়ের। ঘামে ভিজে গেছে সারা শরীর… স্বপ্ন!
ঘন কালো অন্ধকারে ঢেকে গেছে চারপাশ, সামান্যতম আলোও নেই কোত্থাও। সঞ্জয়ের জীবনের মতোই দুর্ভেদ্য আঁধারে ঘেরা।
উঠে বসে কিছু বুঝতে পারল না সঞ্জয়। অদ্ভুত এক অনুভূতি জড়িয়ে ধরল তার সম্পূর্ণ সত্তাকে। শিরদাঁড়া বেয়ে কনকনে বরফের ঠান্ডা স্রোত নামতে থাকে। গলা শুকিয়ে কাঠ… ঢোঁক গিললো সঞ্জয়। কিছু দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু তার মনে হচ্ছে সে ছাড়াও ওই ঘরে আরো কেউ আছে। ঘাড়ের কাছে একটা বরফ শীতল নিঃশ্বাস পড়তে ভয় পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে চারদিকে দেখলো সঞ্জয়… কেউ নেই। অন্ধকারে চোখটা আস্তে আস্তে সয়ে যাচ্ছে। ঘর ছেড়ে বাইরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো সঞ্জয়।
মেঘে ঢাকা পড়েছে চাঁদ। বিষন্ন আলোতে জঙ্গল-নদী সবকিছুই খুব মায়াময় দেখাচ্ছে।
হঠাৎ শনশন করে ছুটে এলো ঝোড়ো হাওয়া… মেঘ কেটে বেরিয়ে এলো আধখানা চাঁদ। মেঘের আকার বদলে গিয়ে রূপ ধরেছে এলো চুলের এক মহিলার। তার আঁচল উড়ছে, কোঁকড়া চুল উড়ছে… তার দৃষ্টি নিবদ্ধ সঞ্জয়ের মুখের ওপরে। দৃষ্টিটা খুব চেনা সঞ্জয়ের।
ধীরে ধীরে নেমে এলো সেই মূর্তি… ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে সে... সঞ্জয়ের চোখে চোখ রেখে কী যেন প্রশ্ন করতে চায়!
ক্ষত-বিক্ষত সঞ্জয়ের ফালা ফালা করে চিরে দেওয়া নগ্ন শরীর আবিষ্কৃত হয় যমুনা নদীর চরে, এক বাংলোর বারান্দায়... বুকে এক গভীর ক্ষত… তার নীল হয়ে যাওয়া দেহে নেই এক বিন্দু রক্ত কণা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন