দ্বাদশ অধ্যায়

ইন্দ্রাণী তুলি

ক্লাস ইলেভেনে পড়ার সময়ে, ম্যাথ টিউশনে অয়নের সঙ্গে প্রথমবার দেখা হয়েছিল মেহুলীর। চোরা চোখের চাউনি বদল, পেন- খাতা নেওয়া- দেওয়ার সময়ে একটুকু ছোঁয়া… ভালো লাগা আর তারপরেই প্রেম।

তুফান মেলের গতিতে এগিয়ে গিয়েছিল সম্পর্কটা।

পড়াশোনায় মেহুলী মোটামুটি ভালো হলেও, ওদিকে একদমই মন ছিল না অয়নের।

ওই বয়সে এতকিছু দেখার মন থাকে না… থাকে শুধু চোখের দেখা। অয়নের চেহারা খুব সুন্দর। মেহুলী ওকে রণবীর বলে ডাকতো। মেহুলী ছিল খুবই সাধারণ চেহারার মেয়ে।

সাধারণভাবে গ্র‍্যাজুয়েশন করার সঙ্গে সঙ্গে কম্পিউটারে ডিপ্লোমা নিয়ে, একটা কাজ জুটিয়ে নিয়েছিল অয়ন।

ছোটোবেলাতেই মেহুলীর বাবা মারা গিয়েছিলেন, মা অনেক কষ্টে বড়ো করে তুলেছিলেন তাকে।

অয়নের বাবা-মা কেউই ছিলেন না, মামার বাড়িতে মানুষ। চাকরি পেয়ে একটা বাড়ি ভাড়া করে উঠে গিয়েছিল সে… আশ্রয়দাতার দিকে আর ফিরেও তাকায়নি।

মেহুলীর সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে নিজেই এসেছিল অয়ন। আপত্তি করার বিশেষ জায়গা ছিল না মেহুলীর মায়ের।

মেহুলী ভেসে গিয়েছিল সুখের সাগরে।

বিয়ের পরে পরেই অয়নের স্বরূপ সামনে এসেছিল।

রোজ রাতেই আকণ্ঠ পান করে ফিরতো সে। মহিলা সংসর্গের কথাও কানে আসতে থাকলো মেহুলীর। ভীষণ কল্পনাপ্রবণ, আর রোমান্টিক মেহুলীর সব স্বপ্ন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল।

মেহুলীকেই বাজার-হাট করতে হতো। রাস্তায় বেরোলেই পাড়ার কয়েকটা ছেলে পেছনে পড়তো। কখনো চটুল গানের কলি, কখনো অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি, বা পথ আটকানোর চেষ্টা করে চলতো তারা।

অয়নকে বহুবার অভিযোগ জানিয়েও কোনো সুরাহা হয়নি। সে বলেছিল “আজকালের মেয়েরা সবাই নিজেকে বাঁচিয়ে চলার শিক্ষা নিয়েই বড়ো হয়। স্বাবলম্বী হও… আমাকে বিরক্ত কোরো না। আমার কাছে সময় নেই।”

অবাক বিস্ময়ে অয়নের দিকে তাকিয়ে ছিল মেহুলী… এ কার সঙ্গে জীবন যাপনের শপথ নিলো সে? পুরো জীবন তো পড়েই আছে, কীভাবে কাটবে?

তরকারি ফুরিয়ে গিয়েছিল। রোজ রোজ মাছ- মাংস খাবার উপায় রাখেনি অয়ন। মদের পেছনেই তার সব টাকা চলে যেতো। মাঝে মাঝেই মেহুলীকে হুমকি দিতো সে, তার মা'র থেকে টাকা নিয়ে আসার জন্যে। মা কোথা থেকে দেবে টাকা! বোঝাতে পারেনি মেহুলী, ফলে প্রায়ই কপালে জুটতো বেদম মার।

বাজার থেকে ফিরছিল মেহুলী। হঠাৎ করে ঝমঝমিয়ে নেমেছিল বৃষ্টি। পাড়ার চায়ের দোকানটাও কে জানে কেন বন্ধ ছিল সেদিন! তারই চালার নিচে আশ্রয় নিয়েছিল মেহুলী। ঝড়-বৃষ্টি শুরু হতেই, আলো নিভে গেল।

...যাকগে, ভিজে ভিজেই চলে যাই না'হয়, কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবো…

পথে নামতেই জমি ফুঁড়ে উঠে এলো ছেলেগুলো। নিজেকে বাঁচাবার জন্যে অনেক চেষ্টা করেছিল মেহুলী, কিন্তু রাস্তায় লোকজন ছিল না, বৃষ্টির আওয়াজ আর মেঘের গর্জনে তার চেঁচামেচি কারোর কানেই যায়নি।

ছেলেগুলোর অশ্লীল কথাবার্তা, অভব্য ইঙ্গিত আর বিচলিত করছিল না মেহুলীকে… বিপদ বারণ মধুদাদাকে স্মরণ করেছিল সে।

জোর করে ওরা তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল বন্ধ কারখানাটার বাইরের শেড-এ।

বাড়ির কাছাকাছি যে এরকম একটা ঘটনা ঘটবে, ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি মেহুলী।

চার-চারটে অমানুষে ছিঁড়ে খেয়েছিল তাকে।

পরের দিন অজ্ঞান-অচৈতন্য মেহুলীর ছিন্নভিন্ন শরীরটা আবিষ্কার করলো কারখানার চৌকিদার মহাতাব দুবে। চেঁচামেচি করে লোক জড়ো করার আগে মেয়েটার শতছিন্ন পোশাক ঢেকে দিলো নিজের গায়ের শার্ট দিয়ে।

কারখানার কর্মচারীদের মধ্যে কেউ কেউ চিনতে পেরেছিল মেহুলীকে, নামে নয়… চেহারায়। মেহুলীর স্বামীকে খবর দিতে পৌঁছেছিল।

বিশেষ ইচ্ছে না থাকলেও, লোকলজ্জার খাতিরে এসে দাঁড়িয়েছিল অয়ন। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসাও করানো হয়েছিল।

কারখানার কর্মচারীরাই বলেছিল, খুঁজে বার করবে অপরাধীদের।

কিছু ভাবার অবস্থায় ছিল না মেহুলী। সারা গায়ের আঁচড়-কামড়ের থেকেও অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তার মন। বাথরুমে ঢুকে বালতি বালতি জল ঢেলে নিজেকে পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছিল… স্নান ধারায় মিশে গিয়েছিল চোখের জল।

রাতে জ্বরের ঘোরে ভুলভাল বকে চলেছিল মেহুলী। তার খবর নেওয়ার কেউ ছিল না।

নিজেকে চার দেওয়ালের মধ্যে বন্ধ করে ফেলেছিল সে।

রাতের অন্ধকারে মেহুলী তার শরীরে শত শত বিষাক্ত বিছের কামড় খেয়ে উঠে বসার চেষ্টা করে বিফল হলো। তার শরীরের ওপরের ভারি দেহের উপস্থিতি অবশ করে ফেলেছিল তাকে। ধাক্কা দিয়ে সরাতে গিয়ে অসফল হলো মেহুলী। প্রবল নিষ্পেষণে ভেঙেচুরে যাচ্ছিল তার কোমল শরীর... মনে হয়েছিল, সেই রাতের পশুগুলোই আবার ফিরে এসেছে।

ঘরে এসেছিল অয়ন, বলেছিল "পাঁচজনে খাওয়া এঁটো দেহ পাঁচজনের ভোগেই লাগুক।"

যাকে ভালোবেসেছিল, তার এই আচরণ মেহুলীর কল্পনার বাইরে ছিল। ক্ষতবিক্ষত শরীর তো সারিয়ে তোলা যায় কিন্তু যে আঘাত দিয়েছিল অয়ন― তা মেহুলীর মনটাকে বিধ্বস্ত করে ফেলেছিল।

বার বার চেষ্টা করেছিল সে, তার এই অপবিত্র শরীরটাকে শেষ করে দিতে।

কীভাবে সে গিয়ে পৌঁছেছিল ডাক্তার ত্রিবেদীর 'সুকুন'-এ, তা আর মনে করতে পারে না মেহুলী। তাকে মনে করাবার প্রয়াসও নেয়নি কেউ।

ডাক্তার ত্রিবেদী বলেছিলেন, “আমাদের মনকে আমাদের বোঝানো দরকার যে, অযাচিত দুর্ঘটনাগুলোকে যত তাড়াতাড়ি ভুলে যাওয়া যায় ততই মঙ্গল। এই পচা-গলা সমাজটাকে বদলানো খুব প্রয়োজন। ধর্ষণ করে যারা, তারা অপরাধী। সবাই নয়... কেউ কেউ, কখনো কখনো শাস্তিও পায় বটে কিন্তু সেই খবর নিয়ে রগরগে আলোচনা করে সুখ পায় যে আপামর জনসাধারণ, তাদের কোনো সাজা কখনো হয় না।”

মেহুলী সুস্থ হয়ে উঠেছিল অনেক দিনের শুশ্রূষাতে, কিন্তু সে আর তার বাড়িতে ফিরে যেতে চায়নি।

ডাক্তার ত্রিবেদীর অনুরোধে, ওই আশ্রমের বাচ্চাদের নাচ- গান- আঁকা শিখিয়ে তার বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%