ইন্দ্রাণী তুলি
হরিয়ানার আনিপুরা গ্রাম তোলপাড়, এক গণধর্ষণের প্রতিবাদে। কন্যা ভ্রুণ হত্যা তো চলেই চলেছে। জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী কন্যা শিশু হত্যার কারণে, ভারতবর্ষ থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে প্রায় পাঁচ কোটি মেয়ে।
সমস্যা বিশেষভাবে প্রকট উত্তর ভারতের রাজ্যগুলোতে। সেখানে বিয়ের জন্যে মেয়ে পাওয়া যাচ্ছে না… আর তারই জেরে, দেশজুড়ে রমরমিয়ে চলছে নারী- পাচার চক্র।
খবরের কাগজটা হাত থেকে নামিয়ে রাখলো নব্যা। তার মনে এলো, অনেক পুরনো কথা।
তার অতীত জীবন থেকে তাকে বার করে আনার জন্যে ত্রিবেদী স্যার তার মেহুলী নাম বদলে দিয়ে রেখেছিলেন নব্যা… চেয়েছিলেন, তার জীবনের সবই নতুন করে শুরু হোক।
'সুকুন'-এই থেকে গিয়েছিল নব্যা। বাচ্চাদের সঙ্গে ভালোই সময় কাটছিল তার।
'সুকুন'-এ, নব্যার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল সঞ্জয়, গ্রহীতার রূপে।
“আমার কাজকর্মে এক মহিলার খুব প্রয়োজন নব্যা, তোমার সাহায্য পেলে আমার সুবিধে হয়। যাবে আমার সঙ্গে?”
“তোমাকে দাদা বলেছি, তোমার কাজে লাগলে তো আমার জীবন ধন্য হয়ে যাবে। ডাক্তার স্যরের সঙ্গে একবার কথা বলে নিই?”
দু’জনে মিলেই গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ডাক্তার ত্রিবেদীর সামনে।
সব শুনে খুশি হয়েছিলেন তিনি।
“আমার শুভেচ্ছা রইলো, তোমাদের দুই ভাই-বোনের জন্যে। ভালো থেকো, অনেক উন্নতি হোক। মাঝে মাঝে এসে দেখা করে যেও…”
সঞ্জয়ের সঙ্গে তার ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠেছিল নব্যা।
অনেকগুলো সমাজ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান চালায় সঞ্জয়। তার বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি এই ভালো কাজেই লাগিয়েছে সে।
“দুঃস্থ-অসহায় নারীদের জন্যে একটা আশ্রম তৈরি করেছি, তোমার ওপরে তার সুষ্ঠু পরিচালনের ভার দিতে চাই… আমি জানি, তুমিই পারবে।
মহিলা-আশ্রমের অনুমতিপত্র নিতে হলে এক কেউকেটার সঙ্গে একবার দেখা করতে হবে৷ আমার তো সময় নেই, ওই হোম-এর সব কাজ তুমিই দেখে নাও… পারবে না?”
―পারবো না কেন? তোমার জন্যে আমি সব করতে পারি, আর… এ তো ভালো কাজ।”
জিগ্ণেশ মেহতার ফোন নম্বর আর বাড়ির ঠিকানা মেসেজ করে দিলো সঞ্জয়।
সুন্দর সাজানো বাড়ি।
ড্রয়িং রুম-এই নব্যার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন মেহ্তা সাহেব।
সেন্টার টেবলে পানীয়ের সরঞ্জাম সাজিয়ে রাখা। চোখ পড়তেই একটু থমকে গেল নব্যা।
দেওয়াল জোড়া বইয়ের আলমারি দেখে আবার মনটা প্রসন্ন হয়ে উঠলো তার… ড্রিংক করা তো এখন ফ্যাশনে দাঁড়িয়ে গেছে। আগের দিনে লোকে জানতে চাইতো “তুমি মদ খাও?” এখন জিজ্ঞেস করে “তুমি মদ খাও না?”
পরিবর্তন আসছে সমাজে… কিন্তু তা যদি ভালোর জন্যে হতো!
প্রাথমিক কথাবার্তার মাঝেই দুটো গ্লাসে পানীয় ঢেলে সোডা মিশিয়ে, একটা গ্লাস বাড়িয়ে ধরলেন নব্যার দিকে। বুঝতে পারলো না নব্যা, না বলা সমীচীন হবে কি না... ওই নামজাদা মানুষের সমর্থনের জন্যে পাঠিয়েছে তার দাদা… তিনি যদি ফিরিয়ে দেন?
মনের থেকে মাথার কথাকে প্রাধান্য দিয়ে, হেসে নব্যা বললো, “আমি সফট ড্রিংক নিতে পারি… হার্ড ড্রিংক আমার সহ্য হয় না।”
বেল বাজিয়ে বেয়ারাকে নির্দেশ দিতে, সে সফট ড্রিংকের গেলাস আর কিছু ড্রাই ফ্রুটস নিয়ে এলো।
তারপরে আর কিছু মনে নেই নব্যার।
ঘুম ভেঙেছিল, মেহতা সাহেবের শোওয়ার ঘরে। মাটিতে পড়ে থাকা জামাকাপড় গুছিয়ে নিয়ে, অ্যাটাচড বাথরুমে ঢুকে তৈরি হয়েছিল সে। না, চোখে জল আসেনি। হৃদয় শুকিয়ে পাথর হয়ে গিয়েছিল।
বসবার ঘরে ফিরতে গিয়ে চেনা স্বর কানে বেজেছিল… কে?
“আপনি সন্তুষ্ট তো স্যর! অনেক কষ্টে আপনার জন্যে ফ্রেশ পিস যোগাড় করতে হলো… যখনই দরকার পড়বে বলবেন, বান্দা হাজির থাকবে। তাহলে… আমার পারমিশনটা বেরিয়ে যাবে তো? অনেকদিন ধরে অপেক্ষা করছি।”
“হয়ে যাবে। তুমি আমার খেয়াল রেখো, তোমার যা দরকার, আমি তার বন্দোবস্ত করবো… অ্যাকচুয়ালি জ্যাদা মজা নহী আয়া। ড্রিংক-এ দাওয়া মিশিয়ে শুইয়ে দিতে হলো তো। জ্যারাসা নোক ঝোক, নখরা উখরা ঝেলনে মে যো আনন্দ মিলতা হ্যায়… ছোড়ো, ভুল যাও… ফির কভী…”
...দাদার আসনে বসিয়েছিলাম তোমাকে…
ফিরে যাওয়ার আর কোনো উপায় ছিল না, আশ্রমের কাজে লেগে পড়লো নব্যা।
বুঝতে সময় লাগলো, আর যতদিনে বুঝতে পারলো কী ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সে... ততদিনে অজান্তেই নারী পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে নব্যা।
সঞ্জয়ের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বুঝলো, মহিলাদের প্রতি তার সেই ঘৃণা আবার ফিরে এসেছে পুরো মাত্রায়, যা পুড়িয়ে দিতে দ্বিধা করে না মা-বোন কোনো সম্পর্ককেই।
তার মামি আবার কলকাঠি নেড়েছিলেন সঞ্জয়ের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার জন্যে। ততদিনে মারা গেছেন মহাতকর চাচা… সম্পত্তির কাগজপত্র কিছুই তখনো পর্যন্ত হাতে আসেনি সঞ্জয়ের।
সবে সবে সাবালকত্ব পেয়েছিল সঞ্জয়, তার পরেই তার সম্পত্তির মালিকানা পাওয়ার কথা ছিল।
কাগজপত্র হাতছাড়া করেনি সঞ্জয়ের মামি।
টাকার অভাবে পথে পথে হন্যে হয়ে ঘুরেছে সে, যে কোনো রকম কাজ করতেই তৈরি ছিল সঞ্জয়। ধীরে ধীরে সমাজবিরোধী কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল।
“তুমি নিজে যে পাঁকে ডুবলে, আমাকেও টেনে নামালে সেই পাঁকে… কাজ পাওনি, স্যরের কাছে গিয়ে একবার দাঁড়াতে পারতে! আমি তো ভালো ছিলাম দাদা… বোন বলেছিলে, তার মান রাখলে না? যে ঝঞ্ঝা- বজ্রপাত নেমে এসে আমার জীবনকে শেষ করে দিয়েছিল, সেই আগুনে পুড়িয়ে মারবো আমারই মতো কতগুলো অসহায় মেয়েকে… শেষ করে দেবো তাদের জীবন?” কাঁদছিল নব্যা।
সঞ্জয়ের কোমল বৃত্তিগুলো কবেই যেন সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে গিয়েছিল। নব্যার চোখের জলের কোনো দাম ছিল না তার কাছে।
ঘৃণার আগুনে নিজে যেমন জ্বলছিল, তেমনভাবেই জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিতে চাইছিল গোটা পৃথিবীটাকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন