পঞ্চম অধ্যায়

ইন্দ্রাণী তুলি

ভিড় দেখে চোখ কপালে উঠলো উর্মিলের।

রবিবার দেখে নব্যা আর সঞ্জয়ের সঙ্গে নিজামুদ্দিনে, মাজিদ পীরের দরগায় এসেছে উর্মিল। সঞ্জয়ের অনুরোধ এবারে আর ফেলতে পারেনি নব্যা... উর্মিলকেও টেনে এনেছে।

“চল’ই না, দেখে আসি কী ব্যাপার! কবে থেকেই সঞ্জু বলে চলেছে আমাকে… আলস্য লাগছিল। চল, এক আউটিং তো হো হী জায়েগী। খুব সুন্দর জায়গা শুনেছি…”

নানা বয়েসের নারী-পুরুষ- বাচ্চা দাঁড়িয়ে আছে লাইন দিয়ে… গরমে ঘেমে।

অবিশ্বাস্য ব্যাপার… এ যেন অলৌকিক ঘটনা।

নিজামুদ্দিনের দরগা দেখতে লোকজনের আসা যাওয়া তো ছিল’ই, কিন্তু এই শান্ত গ্রামটা যেন হঠাৎ করেই জেগে উঠেছে, মাজিদ পীরের অলৌকিক শক্তির জোরে।

বড়ো বড়ো গাড়ি, শিক্ষিত মানুষের ঢল নেমেছে। গ্রামের দরিদ্র কৃষক সম্প্রদায়ের, অশিক্ষিত লোকজনের বিস্ময়ের সীমা নেই। কবে আর কীভাবে যে এই পীরবাবার নাম ছড়িয়ে পড়েছে, তা কেউ জানে না। শুধু দিল্লি না, বাইরে থেকেও মানুষজন আসছে তাঁর ওষুধের আশায়।

আশেপাশের ডাক্তারের চেম্বার নাকি বন্ধ হওয়ার উপক্রম… অল্প অর্থে কঠিন রোগ নিরাময়ের, এর থেকে আর ভালো ব্যবস্থা তো জানা নেই কারোরই।

“বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর…”

অনেকক্ষণ ধর্ণা দেওয়ার পরে, পীরের কাছে পৌঁছবার সুযোগ পেল সঞ্জয়। হাত ভরে কীসব প্যাকেট আর বোতল নিয়ে বেরিয়ে এলো সে খানিকক্ষণ পরেই।

নব্যা আর উর্মিল ভেতরে গেল, শুধুমাত্র কৌতূহল মেটাতে… উল্টো পাল্টা অসুখের নাম করে কিছু ওষুধ, জল পড়া নিয়ে বেরিয়েই তারা রওনা দিল বাড়ির দিকে।

শাহজাহানাবাদের ঘিঞ্জি অঞ্চলে একটা সরু গলিতে ঢুকে দিশেহারা হয়ে গেল উর্মিল। কোথায় খুঁজে পাবে সে ঠিকানায় লেখা বাড়ির সন্ধান? এ কী বিপদের মধ্যে ফেলল তাকে নব্যা আর সঞ্জয়!

রাতেই তাকে পথ নির্দেশ দিয়ে রেখেছিল সঞ্জয়। কিছু গরিব মানুষের কাছে ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার ভার নিতে তাকে অনুরোধ জানিয়েছিল নব্যা আর সঞ্জয়… তাদের দুজনেরই নাকি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে, ব্যস্ত থাকবে সারাদিন… আর এই ওষুধ পৌঁছনোও খুব জরুরি। সেবামূলক কাজের মাঝে বেড়ে ওঠা উর্মিল আপত্তি জানাতে পারেনি… ভালো লেগেছিল তার, দুঃস্থের সাহায্যে লাগতে পারছে বলে।

নোংরা নর্দমা থেকে উপচে পড়া, বিকট গন্ধভরা কালো জল রাস্তা ভাসিয়ে দিচ্ছে। গা গুলিয়ে উঠলো উর্মিলের, কিন্তু নিজেকে সংযত করে সন্তর্পণে সেই ড্রেন-এর পূতিগন্ধময় আবর্জনা পার করে সে গিয়ে দাঁড়ালো একটা মাংসের দোকানের সামনে। ভাঙাচোরা এক সিঁড়ির নিচে প্লাস্টিক দিয়ে ঘেরা ওই দোকান সবেমাত্র খুলেছে। ছোরা-ছুরি ধার দিয়ে তৈরি হচ্ছে কসাই।

হাতের মুঠোয় ধরা ঠিকানা লেখা কাগজটা মেলে ধরলো চোখের সামনে। দোকানির কাছে গিয়ে ঠিকানা লেখা বাড়িটার হদিস জানতে চাইলো।

ভগ্নপ্রায় এক বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো উর্মিল। এক স্থুলকায় মহিলা রাস্তার কলে বাসন মাজছে। তাকে জিজ্ঞেস করতেই আঙুল তুলে, ওপরের দিকে নির্দেশ করলো সে। বাড়িটা মনে হয় শ'খানেক বছরেরও বেশি পুরোনো… আর সেইজন্যেই হয়তো এখনো দাঁড়িয়ে আছে। সিঁড়ির ভাঙাচোরা অংশ বাঁচিয়ে সন্তর্পণে উপরে চড়লো উর্মিল।

নিচের কলের ধারে ভীষণ রকমের ঝগড়াঝাঁটি শুরু হয়ে গেছে, কলের দখল নিয়ে।

দোতলায় সারি সারি ঘর। নম্বর মিলিয়ে, একদম শেষের ঘরটার সামনে গিয়ে, দরজায় কড়া নাড়লো উর্মিল। বার কয়েক আঘাতের পরে, এক বৃদ্ধ দরজাটা খুলে দাঁড়ালেন। সারা ঘরে মলিনতার চিহ্ন… চারদিকে ঝুলছে মাকড়সার জালের মশারি… মেঝে, বিছানা, টেবিল সব জায়গাতেই ধুলোর আলপনা।

“আপনার জন্যে ওষুধ পাঠিয়েছে সঞ্জয়।” প্যাকেটটা বাড়িয়ে ধরলো উর্মিল।

হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটা নিয়েই উর্মিলকে অবাক করে, ধড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিলেন বৃদ্ধ।

একইভাবে নর্দমা পেরিয়ে, বাড়ির পথে ফিরে চললো উর্মিল। রাস্তায় হঠাৎ করে বৃষ্টি নামতেই, একদম ভিজে গেল সে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%