সপ্তম অধ্যায়

ইন্দ্রাণী তুলি

...এক কিম্ভুত কিমাকার পশু, বিকটাকার হাঁ মুখে তাড়া করে চলেছে উর্মিলকে। প্রাণপণে দৌড়চ্ছে উর্মিল… পা আর চলছে না, ধরা পড়েই যাচ্ছে প্রায়। পাথরে ঠোক্কর খেয়ে পড়ে যেতেই, পা কামড়ে ধরলো সেই বীভৎস জানোয়ার। তীব্র আর্তনাদ বেরিয়ে এলো উর্মিলের বুক চিরে… রক্তে ভিজে যাচ্ছে জমি, ঘাস-পাতা, মাটি…

ঘেমে নেয়ে উঠে বসলো উর্মিল… গলা শুকিয়ে কাঠ... কী ভয়াবহ স্বপ্ন!

শুরু হয়েছিল দিল্লির বিভিন্ন মহল্লায় পীরের ওষুধ পৌঁছে দেওয়ায়।

গরিব মানুষের সেবা করছে মনে করে, না করতে পারেনি, কানে বেজেছিল মাদার প্যাট্রিসিয়ার মুখে শোনা কথাগুলো... সন্তুষ্টই ছিল উর্মিল।

ওষুধের ব্যাগ বড়ো হচ্ছিল ধীরে ধীরে।

দরিয়াগঞ্জে পৌঁছে উর্মিল দেখলো, মোড়ে মোড়ে পুলিশের ব্যারিকেড। গাড়ি, বাস সবই ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

সমস্যাটা কী জানার জন্যে একপাশে সরে দাঁড়ালো সে। কথাবার্তায় বোঝা গেল, ওষুধের আড়ে মাদক দ্রব্য বিতরিত হচ্ছে পুরো দিল্লি জুড়ে। পুলিশের কাছে খবর আছে আজ ড্রাগ আসবে দরিয়াগঞ্জে।

ধীরে ধীরে নব্যা আর সঞ্জয়ের আসল রূপ খুলে যাচ্ছিল উর্মিলের চোখের সামনে… ভয়ঙ্কর এক জালে ধরা পড়ে, অগাধ জলে ডুবে যাচ্ছিল উর্মিল।

সঞ্জয় নব্যার ভাই নয় আর ওদের কাজকর্ম সোজা পথে চলে না। যতদিনে বুঝতে পেরেছিল, ততদিনে বেশ ভালোরকম জড়িয়ে পড়েছিল পাহাড় থেকে সমতলে নেমে আসা সহজ-সরল, নরম মনের মেয়েটা। পালাতে চেয়েছিল উর্মিল, কিন্তু এই জীবনটাতে প্রবেশ সহজ হলেও বেরিয়ে আসা কঠিন… মুক্তির একমাত্র পথ মৃত্যু।

কার্পেটের তলা থেকে চাবি নিয়ে দরজা খুলে, ফ্ল্যাটে ঢুকলো উর্মিল। পোশাক বদলে, বার কাউন্টার থেকে রেড ওয়াইনের বোতল নিয়ে দেরাজ থেকে ওয়াইন গ্লাসে খানিকটা দ্রাক্ষাসব ঢেলে, বরফ কুচি মিশিয়ে নিয়ে, গিয়ে বসলো বারান্দার ঝুলাতে। আঙুলের ফাঁকে জ্বলছে সিগারেট। হাতে সঞ্জয়ের ছবি, ফ্রেম থেকে বার করে আনা। তার পুরো মুখটা সিগারেটের ছ্যাঁকায় ছ্যাঁকায় পুড়িয়ে ছাই করে দিলো উর্মিল।

...আই হেট ইউ সঞ্জয়, আই হেট ইউ... হেট ইউ… হেট ইউ!

মিউজিক সিস্টেম-এ গান বাজছে...

“রঞ্জীশ হী সহী… দিল হী দুখানে কে লিয়ে আ...”

চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে, উর্মিলের নাইট স্যুট ভিজিয়ে দিলো।

চোখে ভেসে উঠলো সোলানের পাহাড়। চোখের সামনে ভাসলো, একটা বড়ো পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছে উর্মিল। ঝুর ঝুর করে ঝরে পড়ছে নির্মল-শুভ্র তুষার। তার পা ডুবে রয়েছে, ঘুঙুর বাজিয়ে ঘূর্ণি তুলে ছুটে যাওয়া এক পাহাড়ি ঝোরার কনকনে ঠান্ডা জলে।

তুষারকণার সঙ্গে সঙ্গে উর্মিলের আবেগ আর দুঃখগুলোও বৃষ্টিধারায় ধুয়ে যাচ্ছে।

সঞ্জয়ের সঙ্গে সম্বন্ধটা গিয়ে দাঁড়িয়েছে দেওয়া আর নেওয়াতে। স্নেহ-প্রীতির তো প্রশ্নই ওঠে না। প্রায়, প্রায়ই তার নিষ্ঠুরতার শিকার হতে হয় উর্মিলকে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%