পঞ্চবিংশ অধ্যায়

ইন্দ্রাণী তুলি

সঞ্জয় আর ইমরান ধরা পড়তেই উর্মিল আর নব্যা দু’জনেই পুলিশ হেফাজত থেকে ফিরে এসেছিল উর্মিলের ফ্ল্যাটে। তাদের ওপরে নির্দেশ ছিল শহর ছেড়ে না যাওয়ার।

তার প্রাণ বাঁচানোর জন্যে উর্মিলকে জড়িয়ে ধরে ধন্যবাদ জানিয়েছিল নব্যা।

“এবারে আমি যাই?” চোখে জল নিয়ে উর্মিলের দিকে তাকিয়েছিল সে।

―কী করব আমরা নব্যা, আমাদের এই অভিশপ্ত জীবন নিয়ে?

উত্তর দিতে পারেনি নব্যা, এগিয়ে গিয়েছিল দরজার দিকে।

―সঞ্জয় ছাড়া পাবেই, আমাদের আর কিছু করতে হবে না… আমার মৃত্যু তো ওর হাতেই লেখা আছে।

রাতে বসে দু'জন দু'জনের কাহিনী শুনেছিল।

―আরো কত কত মেয়ে তো আছে এই বিশাল পৃথিবীতে… আমরা কেন পেলাম না, একটা সুন্দর জীবন?

নব্যা কাঁদছিল… আশা, বিশ্বাস, ভালোবাসা ভঙ্গ হওয়ার দুঃখ-রাগ-হতাশা ঝরে পড়ছিল অশ্রুধারা হয়ে।

উর্মিলের চোখে ছিল আগুন, যা শুষে নিয়েছিল তার হৃদয়ের কোমলতা।

সোফার ওপরে বসেছিল উর্মিল। রাত প্রায় দু’টো বাজে৷ তার চোখে ঘুম নেই।

চাবি ঘোরানোর শব্দে সচকিত হলো উর্মিল… সময় হয়েছে, এসেছে সঞ্জয়।

ধীর পায়ে নিজের শোওয়ার ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো উর্মিল। মা-বাবা কারুর মুখ দেখেনি সে… মাদার মেরী আর মাদার সেবাস্টিয়ানের চেহারা মনে করে হাতজোড় করলো উর্মিল

…সাহস দাও।

দরজায় ধাক্কা পড়লো। মাংস কাটার ধারালো ছুরিটা হাতে নিয়ে ঘন অন্ধকারে মিশে গিয়ে অপেক্ষায় রইলো উর্মিল।

দরজা খুলে যেতেই দরজার পাশের সুইচবোর্ড হাতড়ালো সঞ্জয়… মুহূর্তেই নরম আলোতে ভরে গেল ঘর। বিছানা তো খালি, কোথায় গেল রান্ডিটা? গ্লাভস পরা হাতের পিস্তলটা শক্ত করে ধরে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল সে।

পর্দার পেছন থেকে বেরিয়ে এলো উর্মিল। তার হাতে ঝলসাচ্ছে চকচকে ছুরি। চোখে প্রতিহিংসার ঝলক।

ষষ্ঠেন্দ্রিয়ের প্রতিক্রিয়াতে ঝট করে ঘুরে দাঁড়ালো সঞ্জয়।

উর্মিলের চোখে চোখ মেলাতে পারলো না সে, আগুন ঝরছে মেয়েটার চোখ দিয়ে। বাঁ’হাত তুলে তাকে কাছে আসতে বারণ করলো উর্মিল।

বিভ্রান্ত সঞ্জয়ের চোখের সামনেই নিজে বাঁ’হাতের কবজিতে বসিয়ে দিলো তার হাতের ছুরিটা।

“তুই কী মারবি আমাকে? আমি নিজেই বাঁচতে চাই না, এই অকরুণ জগতে। আজ পাসনি, কিন্তু তোর পাপের শাস্তি তুই পাবি… সঞ্জয়। এখনো সময় আছে, শুধরে যা।”

কাটা কবজি থেকে অঝোর ধারায় ঝরা রক্ত, উর্মিলের নিজেরই পায়ের ওপরে পড়ে তার সব পাপ ধুয়ে দিচ্ছিল।

ধীরে ধীরে বসে পড়লো উর্মিল, তারপরেই এলিয়ে পড়লো... চোখ বন্ধ হয়ে গেল তার।

হতচকিত সঞ্জয়ের হৃত বোধবুদ্ধি ফিরে আসতে একটু সময় লাগলো।

উর্মিলের আলমারি খুলে লুকোনো লকার থেকে ড্রাগ-এর প্যাকেট, গোটা দুই পিস্তল বার করে পকেট-এ ভরে নিলো সঞ্জয়। একটা পাতলা ছুরি বার করে দরজার তলায় চাপ দিতেই বেরিয়ে পড়লো গোপন চেম্বার… যার কথা উর্মিলেরও অজানা ছিল। সেখানেও রাখা ছিল টুকিটাকি জিনিস… অ্যাম্পুল, সিরিঞ্জ, ঠিকানা লেখা কাগজ।

পুলিশ তদন্ত হবেই, মালগুলো আগে সরিয়ে ফেলা দরকার। ত্রস্ত চোখে খুঁজে বেড়ালো উর্মিলের রাইটিং টেবল-ড্রওয়ার, জামা-কাপড়ের ওয়ার্ডরোব… ডায়েরি জাতীয় কিছু পাওয়া যায় কি না!

কেউ ওকে ঢুকতে দেখেনি বলেই মনে হয়। গ্লাভস থাকায় হাতের ছাপ থাকবে না কোথাও। জ্যাকেট-এর হুডটা মাথায় তুলে দিয়ে যেমন এসেছিল… করিডোর-এর ব্যালকনি দিয়ে, চোরের মতো নেমে গেল সঞ্জয়।

মাদার সেবাস্টিয়ান হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসছিলেন… অনেক চেষ্টা করেও তাঁর কাছে পৌঁছতে পারছিল না তাঁর আদরের উর্মিল।

বন্ধ চোখে ভাসছিল সেই মায়ের সোহাগ… খাইয়ে দিচ্ছেন, পিয়ানো বাজিয়ে প্রেয়ার সং গাইতে শেখাচ্ছেন।

...মা গো, আমি পেরেছি… নিজের জীবন দিয়ে দাসত্ব-শৃঙ্খল ভেঙে, নিতে পেরেছি আসল মুক্তির স্বাদ...

আঘাতে-আঘাতে জর্জরিত উর্মিল এতদিনে তার হারিয়ে যাওয়া সাহস খুঁজে পেয়েছে।

উর্মিলের ফ্ল্যাট-এর দিকে চোখ রেখে, শিকারি বেড়ালের মতো ওঁৎ পেতে তার গাড়িতেই অপেক্ষা করছিল সলমান জাভেদ।

যথাসময়েই নিভে গিয়েছিল ঘরের আলো। বসে থাকতে থাকতে তন্দ্রার ঝোঁকে ঢুলে পড়েছিল সে।

ধীর হাতে ছুঁয়ে তাকে জাগিয়ে তুলেছিল, ড্রাইভার রভনীত।

ঘড়ির দিকে নজর গিয়েছিল। রাত দু’টো বেজে গেছে। উর্মিলের ঘরের জানালায় দেখা যাচ্ছে মৃদু আলো।

উর্মিল জেগে আছে… কেউ এসেছে ওর বাড়িতে?

একটু পরেই নিভে গেল আলো। কিছু গণ্ডগোল তো আছেই… একা যাওয়া ঠিক হবে না। ফোন করে ধাওয়ান আর লোকাল থানার ওসি দত্ত'কে ডেকে নিলো সলমান।

রভনীত এগিয়ে গিয়ে নিঃশব্দে অভিনব উপায়ে দরজা খুলে ফেলতেই বেড়ালের পায়ে ফ্ল্যাট-এ ঢুকে পড়লো চার-চারটে দুঁদে মানুষ।

আলো জ্বেলে দিতেই উদ্ভাসিত হলো বসার ঘর।

শোওয়ার ঘরের আলো জ্বলে উঠতেই দেখা গেল, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ক্রিম রঙের মেঝেতে পড়ে আছে উর্মিল। বাঁ’হাতের শিরা কেটে ফেলায়, রক্ত বেরিয়ে জমাট বেঁধে গেছে। ডান হাতে ধরা আছে রক্ত মাখা চকচকে একটা ছুরি।

আত্নহত্যা… খুন? হাঁটু গেড়ে বসে, উর্মিলের বাঁ’হাতের নাড়ি দেখার চেষ্টা করে মাথা নাড়লো সলমান। মুখে বিষাদের ছায়া ঘনালো।

পোস্ট মর্টেম-এর জন্যে বডি পাঠাবার ব্যবস্থা করে ঘরের দরজা টেনে দিয়ে, তাকে সীল করে দেওয়ার পরে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী কম্পলেক্স ছেড়ে বেরিয়ে গেল সকলে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%