তৃতীয় অধ্যায়

ইন্দ্রাণী তুলি

পাহাড়ি সরলতার চাদরে মোড়া যে মেয়েটা এই বিরাট শহরে পা রেখেছিল, ভাবনায় পড়েছিল সে… একা একা বাঁচবে কীভাবে!

জন্ম থেকে খুবই সুরক্ষিতভাবে বড়ো হয়ে উঠেছে উর্মিল… এই প্রথম তার দুনিয়া দেখতে, নিজের ক্ষমতা যাচাই করতে ঘর ছাড়া।

মাদার সেবাস্টিয়ানের বয়স হয়েছে, সমর্থন করেননি তিনি উর্মিলের এই প্রতিযোগিতার হাতছানিতে সাড়া দিয়ে, উন্মুক্ত দুনিয়ায় পা রাখাকে… এ তো এক ফাঁদ। হ্যাঁ উপার্জন তো করতে হবে সকলকেই, এই হিমাচলে থেকেও কি করা যায় না! সোলান, সিমলা… আরো দূরে মানালি বা ধরমশালায়?

অনাথালয়ের দায়িত্বে থাকা মাদার প্যাট্রিসিয়া, আধুনিক মতধারার মানুষ। উৎসাহ যুগিয়েছিলেন উর্মিলকে। তার সমর্থনে দাঁড়িয়ে বুঝিয়েছিলেন সেবাস্টিয়ানকে।

“পড়াশোনাতে এত ভালো উর্মিল, খুবই ডিসিপ্লিনড আর সপ্রতিভ। সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, ওর তো বাইরের জগতের সঙ্গে পরিচিত হওয়া উচিত মাদার। এই পাহাড়ে সুযোগ-সুবিধে তো সীমিত। আপনি তো একসময়ে ওর জন্যে কত লড়াই করেছিলেন…”

হাসলেন সেবাস্টিয়ান।

“সব লড়াই তো বিফলেই গেল প্যাট্রিসিয়া। আমার কথা ম্যানেজমেন্ট শুনল কই? তাঁরাও অবশ্য তাঁদের যুক্তিতে ঠিক ছিলেন। উর্মিল একাই তো টেন্ডার বাড-এর সদস্য নয়, অনেক ছেলে-মেয়ে আছে… তাদের মধ্যে অনেকের ভবিষ্যৎই সম্ভাবনাময়। উর্মিল ভালো টেনিস খেলে তো রড্রিক দুর্দান্ত শুটার, মেরিলিনের জ্যাভলিন থ্রো অনবদ্য… বেছে বেছে একজনকে সুযোগ দেওয়া তো ঠিক নয়, তাই না?”

দুঃখিত মাদার প্যাট্রিসিয়া বললেন “সেই তো... একজন অরফ্যানের জন্যে ওই প্রভূত টাকা খরচ করতে তাঁরা কেনইবা রাজি হবেন… আর টেনিসের জন্যে পার্সোনাল কোচের দরকার… কী সাঙ্ঘাতিক পরিমাণের অর্থ প্রয়োজন, তা তো শুনলাম! তবে সুযোগ পেলে উর্মিল নিশ্চিতভাবে দেশের মান রাখতো… ভারত হয়তো আবার জগতসভায় শ্রেষ্ঠ আসন গ্রহণ করতো… আর একজন সানিয়া মির্জা পেতাম আমরা…”

―টেনিস প্রশিক্ষণের জন্যেও অবশ্য ওকে বাইরে পাঠাতেই হতো… আমি কথাও বলেছিলাম চণ্ডীগড়ে, বিজয় রানাডের সঙ্গে… উনি নিজের স্বার্থে এসেছিলেন উর্মিলের খেলা দেখতে। অসম্ভব প্রভাবিত হয়ে আমাকে অফার দিয়েছিলেন অবিশ্বাস্য রকমের কম অর্থের বিনিময়ে ওকে ট্রেনিং দেওয়ার, সেই কম অর্থটাও যদিও আমাদের সাধ্যের বাইরে ছিল। আমার টাকা থাকলে, আমিই হয়তো চালিয়ে নিতাম, কিন্তু ওই… পক্ষপাত দোষে দুষ্ট হতাম। আমি তো সকলেরই মা, আমি কী করে তা করি?

চোখে রঙিন স্বপ্ন, আর হাতে

নিয়োগপত্র নিয়ে দিল্লি শহরে পা রাখার পরে একটাই চিন্তা তাড়িয়ে মারতো উর্মিলকে… কেউ যদি থাকতো তার হাত ধরার! সেইরকমই এক মন খারাপের দিনে আমন্ত্রণ এসেছিল এক অফিস পার্টির।

এক নতুন দুনিয়া খুলে গিয়েছিল উর্মিলের চোখের সামনে।

মহিলা-পুরুষ নির্বিশেষে মদের গেলাসে চুমুক দিচ্ছে, টান মারছে সিগারেট-এ… সম্মিলিত নাচে-গানে ভরিয়ে তুলছে জীবনের চাওয়া- পাওয়াকে।

সেখানেই আলাপ হয়েছিল নব্যার সঙ্গে। ভালো লেগেছিল মেয়েটার বন্ধুত্বপূর্ণ সহজ- সরল ব্যবহার।

ধীরে ধীরে নব্যার বাড়িতে যেতে শুরু করেছিল উর্মিল।

“তুই এক কাজ কর উর্মি, পিজি ছেড়ে এখানেই চলে আয়… আমরা চিপ ইন করে নেবো। একটু-আধটু রান্না করতে পারিস তো?”

“সে আমি শিখে নেবো নব্যা… এখানে থাকতে তো আমার ভালোই লাগবে।”

নব্যার অ্যাপার্টমেন্ট-এ থিতু হওয়ার পরে পরেই আলাপ হয়েছিল সঞ্জয়ের সঙ্গে। মাঝে মাঝেই নব্যার ফ্ল্যাট-এ আসতো সে… শুনেছিল, সঞ্জয় নব্যার কাজিন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%